Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৩

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৩

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৩
ইশরাত জাহান জেরিন

চিত্রার চোখ ধীরে ধীরে খুলতেই প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলো না। চারপাশটা ঘন অন্ধকার। একটা ভ্যাপসা গন্ধ এখানে। মাথাটা ভারী লাগছে, কপালের পাশে ধুকপুক করছে। একটু নড়তেই টের পেল তার হাত-পা শক্ত করে বাঁধা, মুখেও কাপড় গুঁজে রাখা। এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড… তারপরই স্মৃতি ঝড়ের মতো ফিরে এলো। চিত্রার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠলো।স্বভাবগতভাবেই সে নিজেকে শান্ত করলো। না, প্যানিক করলে চলবে না… বাচ্চার যদি কিছু হয়ে যায়? তার ডান হাত ধীরে নিজের পেটের দিকে টানতে চাইল, কিন্তু বাঁধা। তবুও সে অনুভব করলো সে এখনো ঠিক আছে। হঠাৎ নজর গেল পাশেই। “ফারাজ…” দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে পড়ে আছে ফারাজ। মাথা নিচু, শরীর পুরো নিস্তেজ। কপালের পাশ দিয়ে বেয়ে পড়া রক্তের দাগ শুঁকিয়ে জমাট বেঁধেছে। তার বুক ওঠানামা করছে ঠিকই, কিন্তু জ্ঞান নেই। চিত্রার বুক হুহু করে উঠলো।

সে দ্রুত চারপাশ খেয়াল করলো। দরজার নিচ দিয়ে হালকা আলো ঢুকছে। বাইরে লোকজনের পায়ের শব্দ। সেখান থেকে ভেসে আসছে ভারী বুটের আওয়াজ। দু-তিনজনের কথা ভেসে আসছে বিদেশী অ্যাকসেন্টে
“গার্ডস… অনেক গার্ডস…” সে মনে মনে হিসাব করলো।
তারপর চোখ থামলো মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ভাঙা কাঁচের টুকরোয়। সম্ভবত বোতল। চিত্রার ঠোঁটের কোণে এক ফিকে হাসি ফুটলো। চিত্রা ধীরে ধীরে শরীর ঘুরিয়ে কাঁচের টুকরোটার দিকে এগোতে লাগলো। প্রতিটা নড়াচড়া হিসেব করে করতে হবে তার। কারণ সে জানে, একটা ভুল মানে শুধু তার না… তার সন্তানেরও বিপদ। আর তার ফারাজ এলাহী তো আছেই। তার হাতের বাঁধন কাঁচের ধার ঘেঁষে আনলো। ঘষা… ঘষা… দড়িটা শক্ত, কিন্তু চিত্রার হাতও কম শক্ত না। তার কপালে ঘাম জমে গেল, ঠোঁটের ভেতর কাপড় কামড়ে সে ব্যথা চেপে রাখলো।
আর একটু… আর একটু… হঠাৎ “চিরর…” করে একটা শব্দ হলো। দড়ি কেটে গেল। চিত্রা এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর দ্রুত মুখের কাপড় খুলে ফেললো, পায়ের বাঁধনও খুললো। নিজে মুক্ত হতেই আর দেরি করল না সে। এখানে কেমন করে এসেছে, কাদের কাজ এসব? সব পরে দেখা যাবে। তার আগে বাঁচতে তো হবে? সে তাড়াতাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে ফারাজের কাছে গেল। “ফারাজ… ফারাজ… শুনতে পাচ্ছেন?” কোনো সাড়া নেই। চিত্রা তার মুখে আলতো চাপ দিল। “ফারাজ! উঠুন! আমাদের বের হতে হবে!”

ফারাজের মাথা দুলে উঠলো, কিন্তু চোখ খুললো না।
চিত্রা দ্রুত চারপাশে তাকালো। একটা ক্যান দেখতে পেল। নির্গাত এই ঘরে নেশাপানি করা হয়েছে। সে সেটা টেনে এনে ফারাজের মুখে ছিটানো। হঠাৎ ফারাজ কেঁপে উঠলো। ভ্রু কুঁচকে গেল। “উঃ…” চিত্রার আশা ফিরে এলো। “ফারাজ! শুনতে পাচ্ছেন?” ফারাজ ধীরে চোখ খুললো। প্রথমে ঝাপসা, তারপর স্পষ্ট, “চিত্রা…?”
তার কণ্ঠ দুর্বল। চিত্রা হালকা হেসে বললো, “হ্যাঁ…”
ফারাজ হঠাৎ সোজা হয়ে বসতে চাইল, কিন্তু মাথা ঘুরে আবার থামলো। “তোমার… তোমার কিছু হয়নি তো?” তার চোখ সরাসরি চিত্রার পেটের দিকে।
চিত্রা নরম গলায় বললো, “আমরা ঠিক আছি।”
ফারাজ চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত শ্বাস নিল। আহ স্বস্তি!

তারপর তার চোখ বদলে গেল। ” আমরা এখানে কেমন করে এলাম?”
ফারাজ ভাবার চেষ্টা করল। মাথার যন্ত্রণা যেন বেড়ে গেল। তার মাথায় দু’বার পরপর আঘাত হলো। তারপর কি হয়েছে মনে করতে পারছে না। বালের এক মাথা। এমনিতেও আজ-কাল কিছু মনে থাকে না তার ওপর কোন জাউড়ার ঘরের জাউড়া বারি মারল। শালার নানির পেছনে বাঁশ দিবে। তবে সে নিজেকে সামলালো। চিত্রাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করল, “সত্যি ঠিক আছো তো?”
“হুম। কিন্তু এখন এসব বাদ দিয়ে আমাদের এখান থেকে তো বের হতে হবে।”
“তাই তো। আমি কি বলেছি নাকি এখানে বাসর করব তোমার সাথে?”
“ফারাজ!”

ফারাজ মুখ বন্ধ করতেই চিত্রা উঠে দাঁড়াল। গিয়ে দরজার কাছে কান পাতলো। “চারজন… সামনে। আরও দুজন ডানদিকে করিডোরে,” সে ফিসফিস করে বললো।
ফারাজ মুচকি হাসলো, “ না দেখেই আন্দাজ করে ফেললে? কত শার্প।”
“ভুলে যাবেন না, ক্রিমিনালরা ডালে চললে আমরা চলি পাতায়।”
“হইছে ঢং। তোমার থেকেও আমার বুদ্ধি বেশি। কারণ স্মাগলার ছিলাম।”
” বলুন ক্রিমিনাল ছিলেন।”
“আমার পিছনে ছ্যাছড়ার মতো ঘুরেছো ভুলে যেও না সুন্দরী।”
“আমরা কি উদ্ধার পাবো নাকি ঝগড়াই করব?”
“এখন সত্য বাইরে চলে আসছে তো তাই কত কি বলবা মাবুদ।”
“অনেক হয়েছে, এবার বের হতে হবে। বাইরে আমাদের আজরাইল দাঁড়িয়ে।”
“তাহলে ভেতরে আজরাইলের মৃত্যু।” বলেই চিত্রার দিকে তাকালো ফারাজ। চিত্রা দরজার লক পরীক্ষা করলো। ভেতর থেকে খোলা যাবে না। ফারাজ দেয়ালের পাশে একটা লোহার রড খুঁজে পেল। ভাঙা পাইপ। “রেডি?” সে ফিসফিস করলো।
চিত্রা মাথা নাড়লো। ৩… ২… ১… ফারাজ জোরে দরজায় আঘাত করলো। বাইরে গার্ড চমকে উঠলো, ” হোয়াট দ্যা?!”

দরজা খুলতেই ঝটকা! ফারাজ এক ঘুষিতে প্রথম গার্ডকে ফেলে দিল। চিত্রা পেছন থেকে আরেকজনের হাঁটুতে কিক মারলো। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু উঠে দাঁড়ালোর আগেই ফারাজ তার মেইন পয়েন্টে আঘাত করে বলল,” যাহ কত পাপ করলাম। বীজের বংশবিস্তার রোধ হয়ে গেল। পাপ যেহেতু হয়েই গেল, আরেকটু করি। মজাই লাগছে।” সে কনুই দিয়ে ঘাড়ে আঘাত করলো লোকটির। লোকটির অবচেতন হতে সময় লাগল না।
দরজার বাইরে করিডোরটা আধো-অন্ধকার। লাল আলো ঝিকমিক করছে, সিকিউরিটি অ্যালার্ম বোধহয় আংশিক চালু। দু’জন গার্ড পড়ে আছে। কিন্তু শব্দ ইতোমধ্যে ছড়িয়ে গেছে। চিত্রা নিচু গলায় বলল,
“আরও আসবে।”

ফারাজ হালকা হেসে রডটা ঘুরালো হাতে, “আসুক। আজকে ফ্রি ট্রেনিং দিব।” হঠাৎ বাঁ দিকের মোড় থেকে তিনজন গার্ড একসাথে ছুটে এলো। “স্প্লিট!” চিত্রা মূহূর্তেই নির্দেশ দিলো। ফারাজ ডানদিকে সরে গেল, চিত্রা বামদিকে৷ কিন্তু চোখ দু’জনেরই একে অপরের ওপর। প্রথম গার্ড লাঠি ঘুরিয়ে ফারাজের দিকে আঘাত করতেই ফারাজ নিচু হয়ে এড়িয়ে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তে চিত্রা পিছন থেকে দৌড়ে এসে ঘুরেই স্পিনিং কিক দেয়।
তার পায়ের আঘাত সরাসরি গার্ডের মুখে গিয়ে লাগে। লোকটা পিছনে হেলে পড়তেই ফারাজ সুযোগ নিল।
লোহার রড দিয়ে নিচ থেকে ওপরের দিকে এক আপওয়ার্ড স্ট্রাইক, লোকটার হাত থেকে লাঠি ছিটকে গেল। দ্বিতীয় গার্ড বন্দুক তুলতে যাচ্ছিল চিত্রা সেটা লক্ষ্য করেই মাটিতে স্লাইড করে তার পায়ের গোড়ালি টেনে ধরলো। গার্ড ভারসাম্য হারিয়ে পড়তেই,

“নাও!” চিত্রা তার লাঠিটা ফারাজের দিকে ছুঁড়ে দিল।
ফারাজ মাঝআকাশে সেটা ক্যাচ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে
ডাবল স্ট্রাইক দিলো। একটা রড দিয়ে, একটা লাঠি দিয়ে দুই পাশ থেকে আঘাত করল। তৃতীয় গার্ড পিছন থেকে চিত্রার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু ফারাজ চিৎকার করলো, “ডাক!” চিত্রা এক সেকেন্ডও দেরি করলো না সে নিচু হতেই ফারাজ লাঠিটা ঘুরিয়ে হেড-লেভেল সুইপ দিল। ধাপ! একটা শব্দ হলো। লোকটা সরাসরি দেয়ালে আছড়ে পড়ল। চিত্রা উঠে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলল, “সিঙ্ক ঠিক আছে।”
ফারাজ হেসে বলল, “পার্টনার ঠিক থাকলে সিঙ্ক নিজে থেকেই হয়ে যায়।” ঠিক তখনই করিডোরের শেষে ভারী বুটের শব্দ এলো। এইবার অনেকগুলো। চিত্রা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দ্রুত হিসাব করল। “সামনে গেলে ফাঁদে পড়বো। ডানদিকে একটা সার্ভিস প্যাসেজ আছে।”
ফারাজ ভ্রু তুললো, “তুমি আগে এসেছো নাকি?”

চিত্রা হালকা হেসে বলল, “না। আমি শুধু বের হওয়ার রাস্তাটা মেপে দেখলাম।”
দু’জন একসাথে দৌড় দিল। পিছন থেকে গার্ডদের চিৎকার ভেসে এলো। “স্টপ! স্টপ!”
একটা গুলি ছুটে এলো, ফারাজ চিত্রার হাত টেনে পাশে ফেলে দিল। গুলি পাশ দিয়ে সাঁই করে বেরিয়ে গেল।
চিত্রা উঠে দাঁড়িয়েই বলল, “ঋণ রইলো।”
ফারাজ চোখ টিপে বলল, “গুনে রাখো। সুদসহ নেবো।”
তারপর তারা একসাথে সার্ভিস প্যাসেজে ঢুকে গেল।
অন্ধকার, সরু, কিন্তু সামনে কোথাও একটা আলো আছে… আর পেছনে পুরো সিকিউরিটি এখন তাদের খুঁজছে। সার্ভিস প্যাসেজটা শেষ হতেই একটা বিশাল গুদামঘরের সামনে এসে থামল তারা। আধখোলা শাটারের ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে। বাইরে পায়ের শব্দ। অনেকগুলো। চিত্রা ধীরে বলল, “এটাই এক্সিট… আর ট্র্যাপ।”
ফারাজ মাথা কাত করল, “তাহলে খেলাটা এখানেই শেষ করা যাক।”
ঠিক তখনই গুলির শব্দ কানে বাজল। দু’জন একসাথে পাশের কন্টেইনারের আড়ালে ঝাঁপ দিল। চিত্রা নিচু স্বরে বলল, “আমাদের কাছে কিছুই নেই।”

ফারাজ ঠোঁট বাঁকালো, “থাকবে।”
একজন গার্ড এগিয়ে আসতেই
“৩… ২…” চিত্রা গুনল। “১।”
দু’জন একসাথে বের হলো। ফারাজ প্রথম গার্ডের কব্জিতে আঘাত করে বন্দুক ফেলে দিল। চিত্রা ঘুরে সেটাকে তুলে নিল, মাটিতে গড়িয়েই এক শট দিলো দ্বিতীয় গার্ডের কাঁধে। ফারাজ বন্দুকটা তুলে নিয়ে বলল,
“লোডেড।”
চিত্রা ঠান্ডা গলায়,
“সিঙ্কড।”
এবার দু’জন পাশাপাশি। আরেকদল গার্ড ঢুকল গুদামে। ফারাজ ফিসফিস করে বলল,
“বামটা তোমার।”
চিত্রা মাথা নেড়ে,
“ডানটা আপনার ।”

তারপর দু’জনের ট্রিগার একসাথে চাপা। একজন গার্ড এগোতে গিয়ে থামল, চিত্রা এক পায়ে সামনে এগিয়ে কভার-শুট দিল। ফারাজ একই সাথে হাঁটু গেড়ে বসে নিচ থেকে শট নিল। আরেকজন পেছন থেকে আক্রমণ করতে এলো। চিত্রা বলল, “ফারাজ।”
ফারাজ না তাকিয়েই বন্দুক ঘুরিয়ে গুলি ছুড়ল। লোকটা পড়ে গেল। ফারাজ হেসে বলল,
“বউয়ের দেখি অন্ধের মতো বিশ্বাস করা ভালো।”
চিত্রা হেসে বলল, “আজকে বুঝলেন তাহলে?” শেষে তিনজন গার্ড একসাথে ঘিরে ফেলল। চিত্রা ফিসফিস করে, “লাস্ট মুভ?”
ফারাজ চোখ টিপে বলল, “স্টাইলিশ হওয়া যাক।”
দু’জন একসাথে সামনে এগিয়ে গেল। চিত্রা সামনে লাফ দিয়ে এক গার্ডের বন্দুক সরিয়ে দিল, ফারাজ পাশ থেকে এসে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক শট দিলো। একই মুহূর্তে চিত্রা ঘুরে আরেকজনের পায়ে গুলি করল, ফারাজ তার কাঁধে শট দিল। তৃতীয় জন বন্দুক ফেলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ভয়ে কাঁপছে সে। গুদামঘর নিস্তব্ধ। শুধু ধোঁয়া আর গুলির গন্ধ। চিত্রা ধীরে বন্দুক নামাল,

“এই একজন… বাঁচবে।”
ফারাজ এগিয়ে এসে লোকটার কলার ধরে তুলল,
“ভাগ্য ভালো তোমার।”
চিত্রা কাছে এসে চোখে চোখ রেখে বলল, “কারণ তুমি আমাদের বের হওয়ার দরজা খুলবে।”
লোকটা কাঁপা গলায়, “আমি… আমি কিছুই জানি না—”
ফারাজ থামিয়ে দিল, “আজকে জেনে যাবে চান্দু।”
তারপর দু’জন মিলে তাকে টেনে নিয়ে গেল গুদামের ভেতরের অন্ধকার দিকে। শাটারটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। গুদামের ভেতরটা অন্ধকার। একটা মাত্র ঝুলে থাকা বাতি দুলছে। লোকটাকে একটা চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। হাত কাঁপছে তার। ফারাজ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো শুধু চিত্রার দিকে। চিত্রা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার মুখে কোনো রাগ নেই।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শুধু… অদ্ভুত শান্তি।

“জানো,” সে নিচু স্বরে বলল,
“মানুষের ভয়টা কোথায় থাকে?” লোকটা কিছু বলতে পারল না। চিত্রা তার চারপাশে হাঁটতে লাগল। একবার তার কাঁধে হাত রাখল… আবার সরিয়ে নিল।
“শরীরে না,” সে বলল, “মাথায়।”
ফারাজ হালকা হাসল। এই চিত্রাকে সে নতুন করে দেখছে। চিত্রা একটা টেবিলের ওপর রাখা বন্দুকটা হাতে নিল। ঘুরালো। খেলনার মতো করে।
“আমরা তোমাকে মারব না… অন্তত এখনই না,” সে ফিসফিস করে বলল।
লোকটা হঠাৎ আশা পেল, “প্লিজ… আমি যা জানি সব বলবো।”
চিত্রা থামিয়ে দিল, “ওলে বাবা তাই নাকি?”
সে বন্দুকটা খুলে একটা গুলি ঢুকালো। তারপর ধীরে ঘুরালো চেম্বার। ফারাজ এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
তার চোখে মুগ্ধতা। “রাশিয়ান রুলেট খেলেছো কখনো?”
চিত্রা মুচকি হেসে ফারাজের দিকে তাকাল। লোকটা কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল, “না… না…”
চিত্রা চেয়ার টেনে তার সামনে বসল। দু’জনের চোখ এক লেভেলে। “আজ খেলব।” সে বন্দুকটা তার কপালে ঠেকালো এক সেকেন্ড থামল।

তারপর নিজের কপালে এনে ধরল। ফারাজের নিঃশ্বাস এক মুহূর্ত থেমে গেল। কিন্তু সে কিছু বলল না।
চিত্রা ফিসফিস করল, “লাইফ ইজ ফেয়ার। তাই না?”৷ বলেই সে নিজের কপালে ট্রিগার চাপল।
কিছুই হলো না। সে হেসে উঠল খুব আস্তে। তারপর আবার বন্দুকটা লোকটার দিকে বাড়াল, “ এবার তোমার পালা।”
লোকটা কাঁদতে শুরু করল, “আমি বলবো! সব বলবো! প্লিজ”
“দেরি কিসের?” ফারাজ ধীরে ধীরে কাছে এলো,
লোকটার চুল মুঠো করে ধরল। “বল,” সে নিচু গলায় বলল। লোকটা ভেঙে পড়ল।
সব বলতে শুরু করল। চিত্রা চুপচাপ শুনছে। তবে এই লোক কথার থেকে বেশি কাঁপছে। চিত্রার আর কিছু শোনার আগ্রহ রইল না। মুড সুইং বলে কথা। এই সময় মুড সুইং বেশি বেশি হচ্ছে। ফারাজ চিত্রার কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“জানো বিবিজান এই খেলাটা আমারও খেলার ইচ্ছে কিন্তু মানুষের অভাবে খেলতে পারি না গো।”
“আপনার তো সব খেলাই পছন্দ।”

“ইশরে সেটা আবার বলতে? ধূর লজ্জা পাইয়ে দিলে।
“এই খেলাটা খুব সিম্পল।”
চিত্রা বন্দুকটা খুলে ভেতরে তাকাল,
তারপর ধীরে বলল, ” এই খেলাটা আসলেই মজার একটা বন্দুক… ভেতরে একটা গুলি… তারপর চেম্বারটা ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে কেউ না জানে, গুলিটা ঠিক কোথায় আছে।” সে আঙুল দিয়ে হালকা করে ঘুরিয়ে দিল চেম্বার। “তারপর,” চিত্রা এগিয়ে এলো,
“প্রতিটা ট্রিগার চাপা মানে হয় তুমি বাঁচবে… না হয় শেষ।” ফারাজ চিত্রার দিকে তাকাল। লোকটা হঠাৎ কেঁদে উঠল, “না! না! প্লিজ—” চিত্রা থামল না।

সে চেয়ার টেনে আরো সামনে বসল। দু’জনের মাঝে একটুকরো অন্ধকার। “এই খেলায়,” সে ঠান্ডা গলায় বলল, “সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা কী জানো?” সে বন্দুকটা ধীরে লোকটার কপালের কাছে তুলল। আবার নামাল। “তুমি জানো না তোমার পালাটা শেষ পালা কিনা।”
ফারাজ হালকা হেসে বলল, “সাইকোলজি?… আই লাইক ইট.”
চিত্রা এবার বন্দুকটা নিজের কপালে তুলল। লোকটা চিৎকার করে উঠল, “তুমি পাগল!”
চিত্রা ফিসফিস করল, “হয়তো।” সে আবারও ক্লিক করল। এবারও কিছুই হলো না। সে ধীরে চোখ খুলল।
তারপর বন্দুকটা লোকটার হাতে গুঁজে দিল। “ এবার আবার তোমার পালা।”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল,

“না… না…” ফারাজ পেছন থেকে তার কাঁধ চেপে ধরল,
“খেলা শুরু হলে থামানো যায় না চুনাপাখি ।”
চিত্রা সামনে ঝুঁকল, “ট্রিগার,” সে বলল।
লোকটা কাঁদতে কাঁদতে ট্রিগারে আঙুল রাখল।
কিন্তু চাপার আগেই চিত্রার মুখের ভাব বদলে গেল।
হঠাৎ বিরক্তি। “বোরিং।” সে এক ঝটকায় বন্দুকটা ফিরিয়ে নিল। এক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।
ফারাজ বুঝে গেল এটা আর খেলা না। হঠাৎ গুলির শব্দ হলো। শব্দটা গুদামে প্রতিধ্বনিত হলো। লোকটার শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল। চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো।

ফারাজ তাকিয়ে আছে। “তুমি নিয়ম বানাও…” সে ফিসফিস করল, “…আর ভাঙ্গোও।”
চিত্রা স্থির দাঁড়িয়ে। তার মুখে, গালে। রক্তের ছিটে। লোকটির মগজ ছিটকে তার গায়ে এসে পড়েছে। কি ভয়ানক দৃশ্য। ফারাজের শার্টেও লাল দাগ ছড়িয়ে গেছে। কয়েক মুহূর্ত—কেউ কিছু বলল না। শুধু দু’জনের চোখ একে অপরের দিকে। ফারাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার দৃষ্টি গভীর। অস্বাভাবিকভাবে মুগ্ধ সে চিত্রার এই রূপ দেখে। “তুমি…” সে থামল,
“…একেবারে সীমার বাইরে আজকে।”
চিত্রা কোনো উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
ফারাজ হাত বাড়িয়ে তার গালের পাশে ছুঁলো। রক্তে ভেজা আঙুল থেমে রইল সেখানে। “তোমার এই রক্তিম রূপ আমার শরীরে নেশা ধরাচ্ছে।”
চিত্রার নিঃশ্বাস একটু ভারী হলো। সে এক পা এগিয়ে এলো। দু’জনের মাঝে দূরত্বটা মিলিয়ে গেল।
গুদামের দুলতে থাকা আলোয় তাদের ছায়া একসাথে মিশে যাচ্ছে। চিত্রা ধীরে বলল,
“ভয় লাগে না?”
ফারাজ হালকা হাসল,

“তোমাকে?”
এক সেকেন্ড থামল, “না। তোমার ভেতরের এই অন্ধকারটাকে… ভালো লাগে।”
চিত্রা মাথা একটু কাত করল। ফারাজ আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে তাকে কাছে টেনে নিল। দু’জন মানুষ এক অদ্ভুত টানে জড়িয়ে গেল। তাদের ঠোঁট ছুঁলো, কিন্তু সেটা কোনো কোমল চুম্বন ছিল না। ছিল একটা দাবিদার, হিংস্রতার মিশ্র স্পর্শ। মেঝেতে পড়ে থাকা মৃতদেহটা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তবে চিত্ররাজের সেইসবে কিছু আসে যায় না। ফারাজ আরো হিংস্র হতেই চিত্রা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে?”
“এখানে সমস্যা কি?”
“কেমন অদ্ভুত লাগছে।”

“কিছু হবে না। আমি আছি তো।” বলেই সে চিত্রাকে নিজের আরো কাছে টেনে নিতেই গুদামঘরের সাটার হঠাৎ করে খুলে গেল। চিত্রা সেদিকে তাকাতেই ছিটকে ফারাজকে দূরে সরিয়ে দিয়ে গুদামঘরের সাটারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দিকে চাইল। ফারাজের তাকে দেখে বিরক্ত হলো। এই রোমান্সের সময় ছোটলোকি বাঁধা সহ্য হয়না। জীবনটা পার হলো তার এই বাঁধায় বাঁধায়। আজকে যদি এই বেলের শরবতটাকে চিপড়ে জুস না বানায় তাহলে তার নামও ফারাজ এলাহী না।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯২

সে মুহূর্তেই পকেট থেকে রিভলবার বের করে তাক করতে গেলেই চিত্রা তার হাত ধরে তাকে থামিয়ে দেয়। ফারাজ কিছুটা অবাক হয়ে চিত্রার দিকে তাকায়। চিত্রা পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গিয়ে লোকটার সামনে দাঁড়ায়। তারপর ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “বাবা?”
ফারাজ পেছন থেকে এগিয়ে এসে একবার চিত্রার দিকে অন্যবার লোকটির দিকে তাকিয়ে বলে, “বাবা? কোন বাবা? কার বাবা? এই কাইল্লা তোমার বাবা কেমনে?”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৪

1 COMMENT

Comments are closed.