খান সাহেব পর্ব ১২
সুমাইয়া জাহান
মাঝে কেটে গেছে একটা দিন। আজ মাইশাকে সকলে মিলে আনতে যাবে। নয়নদের বাড়িতে বউ ভাতের রিসেপশন আছে আজ। খুশি বেগম, হাসি বেগম হাতে হাতে নাস্তা বানাচ্ছেন। মিনা বেগম সকলকে নাস্তা সার্ভ করছেন। আনোয়ার সাহেব, রিসাত সাহেব, ইফতিয়াক সাহেব, শামীম সাহেব বসে খাচ্ছেন। আনোয়ার সাহেব খাওয়া শেষ করে, সকলকে তাড়াতাড়ি নাস্তা করে মাইশাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য রেডি হতে বলে চলে গেলেন বাজারের উদ্দেশ্যে। বাড়ির বড়রা খেয়ে উঠতেই ছোটরা এসে বসলো। রাহিন ও তার সব ফ্রেন্ডরাও এসেছে। সুমু, সামিয়া, নাজমিন, তিশা আর রাহিনের ফ্রেন্ডরা বসলো খেতে। রাইফ বাড়িতে নেই। মাইশার শশুর বাড়িতে সে। ইফতিয়াকে খুশি বেগম খাইয়ে দেবেন। তাই সে এখন সোফায় বসে টিভি দেখছে। সুমু আর শেরাজ মুখোমুখি একে অপরের বিপরীতে বসে আছে। সুমু খাবার মাঝে আড়ে আড়ে অনেকবার শেরাজের দিকে তাকিয়েছে। কিন্তু শেরাজের সেদিকে কোনো হেলদোল নেই। সে আপন মনে দক্ষ হাতে স্পুন দিয়ে খাবার মুখে তুলছে। আইয়ুবরা খেতে খেতে টুকটাক কথা বলছে।
সকলে খেয়ে রেডি হতে চলে গেল। আনোয়ার সাহেব, মিনা বেগম, হাসি বেগম আর আশাবানু যাবেন না। আনোয়ার সাহেবের মতে, সকলে চলে গেলে বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাবে। জামাই আসবে আজ। অনেক বাজার করতে হবে। অনেক রকমের রান্নাবান্না করতে হবে, তাই তারা বাসায় থাকবেন। আশাবানুর পায়ের ব্যথা বেড়েছে, তাই তিনি যাবেন না। আনোয়ার সাহেব নাস্তা করে বেরিয়েছেন বাজারের উদ্দেশ্যে। রিসাত সাহেররাও থাকতে চেয়েছিলেন বাসায়। কিন্তু আনোয়ার সাহেব বারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মেয়ে-জামাই আনতে বড়দের যেতে হয়। কথাটা শুনে রিসাত সাহেবরা আর কিছু বলেননি।
ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে দশটা। আনোয়ার সাহেব বাজার থেকে চলে এসেছেন। এসেই সকলকে তাড়া দিচ্ছেন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে পরার জন্য। একে একে সকলে হাজির হলো ড্রয়িংরুমে। সুমুও নেমে এলো। সুমুর পরনে গোলাপী কালারের সারারা। রোজকারের মতো আজও সিম্পল সাজ। মাথায় সিম্পল টিকলি, কানে আর হাতে সেম ডিজাইনের অর্নামেন্টস। গলায় আজ কিছু পড়েনি সুমু। চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিক।
সামিয়ার পরনে কালো কালারের আনারকালি কুর্তা উইথ প্লাজু। নাজমিনের পরনে জ্যাকেট গাউন। তিনজনে একসাথে বাহিরে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির বাকি সকলেও উপস্থিত ড্রয়িংরুমে, শুধু শেরাজ ছাড়া। রাহিন সকলকে গাড়ির কাছে যেতে বলে শেরাজের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ি বয়ে নেমে এলো শেরাজ।
সকলে বাহিরে এসে অলরেডি গাড়িতে উঠে পড়েছে। শুধু শেরাজ আর রাহিন ওঠেনি। শেরাজকে আসতে দেখে ইফতিয়া নেমে গেল গাড়ি থেকে। সে আজ শেরাজের সাথে এক গাড়িতে যাবে বলে ঠিক করেছে।
ইফতিয়াকে নামতে দেখে সুমু রাগে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল। শেরাজ আর রাহিন এগিয়ে আসছে গাড়ির দিকে। বিষয়টা লক্ষ করলো শেরাজ। তার পরনে ব্ল্যাক ব্লেজার আর ব্ল্যাক সুজ, ব্লেজারের প্রতিটা বোতাম খোলা রেখেছে, যার ফলে ভেতরে পরা ব্ল্যাক শার্ট দৃশ্যমান। রোজকারের মতো বা হাতে ব্ল্যাক রোলিক্স ঘড়ি, ডান হাতে ব্ল্যাক ব্রেসলেট, বা হাতের অনামিকা আর বুড়ো আঙুলে ব্ল্যাক রিং। ডান কানে ব্ল্যাক এয়ারপডস আর চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাস। হিরোর মতো হেঁটে আসলো গাড়ির কাছে।
রাইশা, সামিয়া, নাজমিন, সুমু আর রিসাত সাহেব এক গাড়িতে উঠেছে। ইফতিয়াক সাহেব, শামীম সাহেব, তিশা আর খুশি বেগম এক গাড়িতে উঠেছে। সারবাজ, আরবাজ, রিসান, নিহাল, অমিত, সাইফ, রিয়াদ, ফাহিম, আইয়ুব এক গাড়িতে।
ইফতিয়াকে নামতে দেখে শেরাজ রাহিনের কাছে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এই নোংরাটা আমাদের গাড়িতে গেলে, আমি কোথায়ও যাব না। সেই সাথে তোর বোনকেও যেতে দিব না। এই নোংরাটাকে সরিয়ে আমার সুইটহার্টকে আমাদের গাড়িতে আনার ব্যবস্থা কর।”
রাহিন শেরাজের মুখের দিকে আহাম্মকের মতো একপলক তাকাল। তারপর সে মনে মনে বলল,
“এই বন্ধুগুলোর সামনে তার এক তিল পরিমানও সম্মান নেই। বিশেষ করে এই এস.কের সামনে। এখনতো অন্তত বড় ভাই হিসেবে একটু সম্মান দিতে পারে। তা না, বড় ভাইয়ের সামনে তারই ছোট বোনকে অসভ্যের মতো “সুইটহার্ট” বলে ডাকছে।”
কথাগুলো মনে মনে বলে, সে ইফতিয়াকে বলল,
“ইফতিয়া! তুই গাড়ি থেকে নেমেছিস কেনো?”
ইফতিয়া বললো,
“গাড়িতে জায়গায় হচ্ছেনা ভাইয়া, তাই নেমেছি।”
রাহিন সুমু, সামিয়া আর নাজমিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোরা তিনজন নেমে আয়। ইফতিয়ার ছোট ফুফুমনির সাথে যাওয়া উচিত। ওর হাতের অবস্থা খুব খারাপ। ও বরং ছোট ফুফুমনির সাথে একই গাড়িতে যাক।”
ইফতিয়ার মুখটা কালো করে বলল,
“সুমুরও তো হাতের অবস্থা ভালো না। তাহলে সুমুও আমাদের সাথে একই গাড়িতে যাক।”
“সুমুর হাতের অবস্থা তোর হাতের মতো ওতো খারাপ না। আর গাড়ি বেশি থাকতে চাপাচাপি করে যাবার তো কোনো মানে নেই। তুই যা গাড়িতে ওঠ।”
ইফতিয়া বাধ্য হয়ে রাগে গজগজ করতে করতে গাড়িতে উঠল। রিসাত সাহেব গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি বেরিয়ে গেল মেইন রোডে। খুশি বেগম চোখের ইশারায় নিজের মেয়েকে শান্ত থাকতে বলল।
সুমু, নাজমিন, সামিয়া গিয়ে বসল শেরাজদের গাড়িতে। তখনই আইয়ুব আর সারবাজও উঠে বসল শেরাজদের গাড়িতে। ওদের উঠতে দেখে রাহিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিরে, তোরা এই গাড়িতে কেনো এলি?”
আইয়ুব দাঁত কপাটি বের করে হেসে বলল,
“জায়গায় হচ্ছিল না, তাই চলে এলাম।”
রাহিন খুব ভালো করেই জানে আইয়ুব কেনো এই গাড়িতে এসেছে। তাই আর কিছু বলল না।
আইয়ুব আর সারবাজ নেমে আসতেই নিহালদের গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। এখন শুধু পড়ে আছে শেরাজদের গাড়ি। শেরাজ গিয়ে উঠে বসল ড্রাইভিং সিটে। রাহিন বসল শেরাজের পাশে। শেরাজের হাতে রেড বুলের বোতল। বোতলে একটা চুমুক বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল সে। ভিউ মিররটা সুমুর দিকে সেট করে নিল। দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘুরালো। রাহিন মিউজিক অন করে দিল।
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। শেরাজ মাঝে মাঝে রেড বুল ক্যানের বোতলে চুমুক দিচ্ছে আর আড়ে-আড়ে মিররের ভিতর দিয়ে উদাসীন মেয়েটাকে দেখছে। যে এখন গাড়ির জানালা দিয়ে প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত। শেরাজ মনে মনে বলল,
“মাই ব্ল্যাক ফেইরী…
তোমার নাম আমি কারও কাছে বলি না,
তোমার হাসি আমি হাজারো ভিড়ের মাধে লুকিয়ে দেখি।
তুমি জানো না, তবুও আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে
গোপনে লেখা থাকে শুধু তোমারই নাম।”
হঠাৎ সুমুর চোখ গেল মিররের দিকে। তার মনে হলো খান সাহেব এতোক্ষন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। এবার সুমুরও কিছু সময় পর পর মিররের দিকে তাকাতে লাগল।
প্রায় একঘন্টা ত্রিশ মিনিট ড্রাইভিংয়ের পর গাড়ি এসে থামল মাইশার শশুর বাড়ির সামনে। পথে আসতে আসতে আইয়ুব আর নাজমিন অনেকবার ঝগড়া লাগিয়েছিল। শেষে শেরাজ ধমকেরস্বরে বলেছিল,
“আর একবার ঝগড়া করলে দুটোকেই গাড়ি থেকে নামিয়ে দেবো।”
গাড়ি থেকে নামিয়ে দেবার ভয়ে দুজনের একজনও আর মুখ দিয়ে টু শব্দ করেনি। শেরাজদের গাড়ি সবার শেষে ছাড়লেও মাইশাদের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছিল শেরাজ। তাই একসাথেই গাড়ি মাইশাদের বাড়ির সামনে এসে থেমেছে।
গাড়ি থেকে সকলে নামল। মাইশার শশুর বাড়ির লোকজন তাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে এলো, সেই সাথে অনেকগুলো মেয়েও এসেছে। মেয়েগুলোর নজর শেরাজ আর শেরাজের ফ্রেন্ডদের দিকে। শেরাজের দিকে তাকিয়ে মেয়েগুলো মুচকি মুচকি হাসছে। মাইশার শশুর আফজাল সাহেব এসে সকলের সাথে কুশল বিনিময় করে সবাইকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। বড়রা আগে-আগে হাঁটছেন আর ছোটোরা পিছে পিছে। হঠাৎ একটা মেয়ে এসে শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে শেরাজকে ধাক্কা মারতে গেল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শেরাজ সরে গেল, ওমনি মেয়েটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। সকলে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ক্রাশের সামনে পড়ে গিয়ে মেয়েটার লজ্জায় মাথা কাটা যাবার অবস্থা। মেয়েটার সাথের একটা মেয়ে এসে তাকে টেনে তুলে বলল,
“কোথাও ব্যথা পাসনি তো লামিয়া?”
লামিয়া নামের মেয়েটা নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে হনহন করে চলে গেল। বাকি মেয়েগুলোও ছুটলো তার পিছু পিছু। সুমুরা সকলে বাড়ির ভেতর ঢুকলো। মাইশা সকলকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। একে একে সকলে মাইশার সাথে দেখা করল। পার্টির অধিকাংশ ছেলেমেয়ে শেরাজকে ঘিরে ধরেছে, ফটোগ্রাফ নেবার জন্য। আফজাল সাহেব সকলকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বললেন,
“ওরা মাত্র এসেছে। ওদের কেউ ডিস্টার্ব করোনা।”
তিনি শেরাজদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“বাবারা! তোমরা এখানে বসো।”
কেটারিংঙের একটা ছেলেকে ডেকে বললেন,
“ওদের শরবত, মিষ্টি, ফল, এনে দাও।”
শেরাজ আফজাল সাহেবকে বললেন,
“আপনি বেশি ব্যস্ত হবেন না আঙ্কেল। আমরা ঠিক আছি। এখন কিছু খাব না।”
আফজাল সাহেব বাধ সাধলেন। তিনি বললেন,
“কিছু খাব না বললেতো শুনবো না, বাবা। আজ সব তোমাদের জন্য এরেঞ্জ করা। এখন একটু ফ্রুট জুস অন্তত নাও।”
আফজাল সাহেবের অনুরোধে শেরাজসহ শেরাজের সব ফ্রেন্ডরা ফ্রুট জুস নিল। বাকিরা সকলে মাইশা কাছে। সুমু মাইশার কাছে গিয়ে বলল,
“কেমন আছো আপু?”
মাইশা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“ভালো! তুই কেমন আছিস? বাকিরা সকলে কেমন আছে?”
“আলহামদুলিল্লাহ্!”
সুমুর সাথে বাকিরাও মাইশার সাথে কথা বলল। আফজাল সাহেব সকলকে নিয়ে গিয়ে চেয়ার বসালেন। সকলকে ফল, মিষ্টি, শরবত দিলেন।
সামিয়া, সুমুকে বলল,
“মাইশা আপুকে আজ খুব সুন্দর লাগছে তাইনা আপু?”
সুমু সামিয়ার কথায় মুচকি হেসে মাইশার দিকে তাকাল। মাইশা স্টেজের ওপর বসে আছে, পাশে নয়ন। মাইশার পরনে জ্যাকেট স্টাইলি লেহেঙ্গা। মুখে প্রসাধনীর ছোঁয়া। নয়নের পরনে কালো ব্লেজার। দুজনকে কি অপরূপ সুন্দর লাগছে। দুজনে একসাথে বসে কথা বলছে আর হাসছে। সুমু নয়নের জায়গায় তার খান সাহেবকে আর মাইশার জায়গায় নিজেকে ভাবছে। দৃশ্যটা আনমনে ভেবে মুচকি হাসল সে। তারপর লজ্জায় মাথা নামিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল, যেই মানুষটা এখন হিরোর মতো বসে ফোনে স্ক্রল করতে ব্যস্ত। শেরাজের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সুমু মাইশার দিকে তাকাল। তখনি তার চোখ পড়ল লামিয়া নামের মেয়েটার দিকে। মেয়েটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে শেরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার পাশে তখনকার মেয়েগুলোও আছে। সুমুর রাগ হলো ভীষণ, তবে এইটা মাইশা আপুর শশুর বাড়ি। এইখানে কিছু করতে পারবে না সুমু।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আনমনে টেবিল থেকে ফ্রুট জুসটা নিতে গেল সুমু। তখনি হাতের ধাক্কা লেগে ফলের রসটা সুমুর ড্রেসের ওপর পড়ল খানিকটা। সুমু চট করে উঠে দাঁড়াল। সে উঠে মাইশার কাছে গিয়ে ওয়াশরুমটা কোনদিকে জেনে নিয়ে ওয়াশরুমে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়াচ্ছিল। তখনি সামনে এসে দাঁড়াল লামিয়া নামের মেয়েটা। ঠোঁটে তার মুচকি হাসি। মেয়েটা দেখতেও সুন্দর। তবে এই সৌন্দর্য সুমুর কাছে বিষাক্ত মনে হলো। মেয়েটা ঠোঁটে হাসি রেখেই বলল,
“তোমার নাম কি?”
সুমুও ভদ্রতাসূচক আলতো হেসে উত্তর দিল,
“শেখ সুমাইয়া জাহান!”
মেয়েটি হেসে বলল,
“আমি লামিয়া। তোমার মাইশা আপুর মামাতো ননদ। তুমি নিশ্চয় ওয়াশরুমে যাবে? এসো আমার সাথে। আমি তোমাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাচ্ছি।”
সুমু আর কোনো কথা না বলে লামিয়া নামের মেয়েটার সাথে চলে গেল। মেয়েটা সুমুকে ওয়াশরুম দেখিয়ে দিলো। সুমু ওয়াশরুমের ভিতরে গিয়ে ফ্রুট জুস পরা জায়গাটা ক্লিন করে নিল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল মেয়েটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সুমু কিছুটা আবাক হলো। মেয়েটা সুমুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“হয়ে গেছে তোমার?”
সুমু আলতো হেসে মেয়েটার প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে বলল,
“আপনি কি কিছু বলতে চান?”
মেয়েটা হাসি মুখেই “হ্যাঁ” বলল। সুমু জিঙ্গাসাসূচক ভঙ্গিমায় তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা একটু সময় নিয়ে বলল,
“তুমি আর শেরাজ খান একি বাড়িতে থাকো?”
এমন প্রশ্নশুনে সুমুর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে মুখে বলল,
“কেনো বলুন’তো? এই প্রশ্নের উত্তর জেনে আপনার কি কাজ?”
মেয়েটা এখনো হাসি মুখ নিয়েই তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। মুখে লজ্জার আভাস নিয়ে সে বলল,
“জানো, আমি শেরাজের অনেক বড় ফ্যান। শুধু ফ্যান না, আমি শেরাজকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু কোনোদিনও ভাবিনি মানুষটাকে কখনো দেখতে পাবো। জানো, আমি ইনস্টাগ্রামে ওকে কতো টেক্সট দেই। কিন্তু ও উত্তর দেওয়াতো দূরে থাক, মেসেজ রিকোয়েস্ট এক্সসেপ্টই করেনা।”
মেয়েটার কথাশুনে সুমুর পা থেকে মাথা পযর্ন্ত জ্বলে যাচ্ছে। তবুও সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,
“কিন্তু আপনি এগুলো আমাকে কেনো বলছেন আপু? এইসব শুনে আমি কি করব?”
“তুমি আমাকে একটু হেল্প করবে?”
সুমুর কপালের মাঝে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে বলল,
“কি হেল্প?”
মেয়েটা তার হাত থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ দেখিয়ে বলল,
“এইটা একটু শেরাজকে দিতে পারবে?”
সুমু লামিয়ার হাতে থাকা কাগজটার দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সরি!”
কথাটা বলেই সুমু চলে যাবার জন্য পা বাড়াচ্ছিল। তখনি লামিয়া সুমুর সামনে গিয়ে বাধা দিয়ে দাঁড়াল।
সুমু মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করে ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল;
“প্রবলেম কি আপু?”
মেয়েটার মুখে আগের সেই হাসিটা আর দেখা গেল না। সে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“তোমাকে পারতেই হবে। প্লিজ, এইটুকু হেল্প করো।”
“আপনাকে তো বললাম আপু, আমি পারব না। নিজের জিনিস নিজে গিয়ে দিন। প্লিজ, আমাকে বিরক্ত করবেন না। তাহলে এর পরিনাম আপনার জন্য খুব একটা ভালো হবেনা। এইটা মাইশা আপুর শশুর বাড়ি, আর তাই আমি কোনো ঝামেলা করতে চাইনা। “
মুহূর্তেই মেয়েটা ক্ষেপে গেল। সে রাগ দেখিয়ে বলল,
“কি করবে তুমি? তোমাকে তো কাজটা করতেই হবে। এই লামিয়াকে তুমি চেনো না।”
কথাটা বলেই সে সুমুর হাত ধরে জোর করে কাগজটা দিলো। এমন কান্ডে সুমু নিজের রাগটাকে আর ধরে রাখতে পারল না। আচমকায় লামিয়ার হাত মুচড়ে পিঠের সাথে চেপে ধরল সুমু। মেয়েটা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল। সুমু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে দাঁতের সাথে দাঁত চেঁপে বলল,
“বলেছিলাম না আপনাকে পরিনাম ভালো হবে না। আমার কপালে কি প্রেমের ঘটক লেখা আছে নাকি? যে আমি আপনার প্রেমের ঘটকালি করব। ভুল মানুষকে দিয়ে ভুল কাজ করাতে চেয়েছেন আপনি। আর সাথে অনেকগুলো ভুলও করেছেন। আপনার প্রথম ভুল, আপনি আমার খান সাহেবের দিকে নজর দিয়েছেন। আপনার দ্বিতীয় ভুল, আপনি আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে দিয়ে এই কাজটা করাতে চেয়েছেন। আপনার তৃতীয় ভুল, আমি বারণ করার পরেও আমাকে জোর করেছেন। কি জানো বললেন আপনি? আপনাকে আমি চিনি না। তাহলে আপনিও শুনে রাখুন। এই সুমুকে আপনি চিনেন না। আমার জিনিসের দিকে হাত বাড়ালে সেই হাত আমি ভেঙ্গে রেখে দিবো।”
কথাগুলো বলেই মেয়েটার হাত ধাক্কা মেরে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল সুমু।
ব্যথায় মেয়েটার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। হাতটা অস্বাভাবিক লাল হয়ে গেছে। প্রচন্ড রাগে ফেঁটে পড়ছে মেয়েটা। শক্ত হাতে চোখের পানি মুঁছে সে বিড়বিড় করে বলল,
“আমার নামও লামিয়া। এর প্রতিশোধ আমি নেবোই।”
সুমু এসে বসলো সামিয়ার পাশে। আফজাল সাহেব মেয়ের বাড়ির সকলকে একসাথে খেতে বসালো। আনোয়ার সাহেব ফোন করে বলেছেন যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়ে-জামাইকে পাঠিয়ে দিতে। রিসাত সাহেবরা খেয়েই মেয়ে-জামাইকে নিয়ে বেরিয়ে যাবেন।
আইয়ুব খেতে বসে নাজমিনের প্লেটে এটা-ওটা তুলে দিচ্ছে আর বলছে,
“খাও মেয়ে! ভালো করে খাও। এই বডি নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করতে শক্তি লাগবে তো। শক্তি না পেলে ঝগড়া করবে কিভাবে? ঝগড়া করতে শক্তি লাগবে তো। খাও! খেয়ে শক্তি বাড়াও।”
আইয়ুবের কথা শুনে সকলে খাচ্ছে আর ঠোঁট টিপে হাসছে। আর নাজমিন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আইয়ুবের দিকে, কিন্তু কিছুই বলছেনা।
সকলের খাওয়া শেষ। বিদায়ের পালা। নয়নের আর কোনো ভাই-বোন না থাকায় লামিয়াকে সাথে নিল। এতে লামিয়া মহাখুশি। এই সুযোগে সে সুমুকে শিক্ষা দিতে পারবে, আর শেরাজের আশেপাশে থাকতে পারবে। সকলে একে একে গাড়িতে উঠে পড়ল।সকলের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলো রিসাত সাহেবরা।
বাড়ি ফিরতে-ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল। আজ সকলে অনেক টায়ার্ড। মাইশা আর নয়নকে মাইশার রুমে থাকতে দেওয়া হলো। আসার পর থেকে আনোয়ার সাহেব নিজের মেয়ে জামাইয়ে আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখেননি। এটা-ওটা খায়িয়েই যাচ্ছেন। রাত দশটা পযর্ন্ত সকলে আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে চলে গেছে। আড্ডায় সকলে মিলে ঠিক করেছে পরশু ঘুরতে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে এখনো ঠিক করেনি, কাল ঠিক করবে। আজ সবাই টায়ার্ড, তাই ঘুমাতে চলে গেছে।
ঘড়িতে সময় রাত বারোটার কাছাকাছি। মিনা বেগম, খুশি বেগম আর ইফতিয়া জেগে আছেন। তিনজনে মিলে গোপন আলাপে ব্যস্ত।
মিনা বেগম বললেন,
“কি এমন কথা আপা, যার জন্য এতোরাতে ফোন করে ডেকে আনলেন? আবার আপনার ভাইজানকেও বলে আসতে দিলেন না।”
“ভাবি! আপনাকে সোজাসুজি বলছি, আপনি সুমুকে কষ্ট পেতে দেখতে চান?”
“হ্যাঁ, চাই আপা! ওই মেয়েটার জন্য আমার ছোট মেয়েটাকে কতো কষ্ট পেতে হয়। আপনার ভাইজান সবসময় আমার মেয়েকে ওর সাথে তুলনা দেয়। কেনো? কি এমন আছে ওই সুমুর মধ্যে যে আমার মেয়েকে ওর মতো হতে হবে। মেয়েটা আমার কাছে এসে কাঁদে। মা হয়ে সহ্য হয়না আমার। আমি চাই ওই সুমু কাঁদুক। কিন্তু কিভাবে আপা?”
খুশি বেগম হেসে বললেন,
“আমার কাছে একটা প্ল্যান আছে ভাবি।”
মিনা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“কি প্ল্যান?”
“সুমুর বিয়ে দিয়ে।”
মিনা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন,
“বিয়ে? কিন্তু কার সাথে?”
“আমার বান্ধবী হাসনার ছেলের সাথে। ছেলেটা খুব ভালো। একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু হাসনার সেই মেয়েকে একদম পছন্দ না। হাসনা মাইশার গায়ে হলুদে এসে সুমুকে পছন্দ করে। পরে আমাকে জানায়। আমিও রাজি হই।”
“কিন্তু ভাবি ছেলেটাতো অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে। সুমুকে বিয়ে করতে কেনো রাজি হবে?”
খুশি বেগম বাঁকা হেসে বললেন,
“সেই ব্যবস্থাও করে ফেলেছি। গায়ে হলুদের দিন আমি সুমুর কিছু ছবি হাসনাকে দেই, ওর ছেলেকে দেখানোর জন্য। কিন্তু ওর ছেলেতো ছবি দেখলোই না। কল করে হাসনা আমাকে জানায়। ছেলে কিছুতেই রাজি হচ্ছেনা ইভেন মেয়ের ছবি পযর্ন্ত দেখেনি। তখন আমি হাসনাকে বলি অসুস্থতার নাটক করে ছেলেকে রাজি করাতে। হাসনা আমার কথা মতো কাজ করে। এখন হাসনার ছেলে, হাসনাকে কথা দিয়েছে যে, সে তার মায়ের সব কথা শুনবে। নিজের ইচ্ছেতে না হোক বাধ্য হয়ে ছেলেটা বিয়েতে রাজি। আর এতেই আমার লাভ। বিয়ের পর সুমু স্বামীর ভালোবাসা কোনোদিনও পাবেনা। আর হাসনাও সুমুকে বাড়ির কাজের লোকের মতো করে রাখবে, অত্যাচার করবে, কথা শোনাবে। সুমুকে সারাজীবন চোখের জল ফেলতে হবে।”
কথাগুলো বলেই হেসে উঠলেন খুশি বেগম। সেই সাথে মিনা বেগম আর ইফতিয়াও হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে খুশি বেগম বললেন,
“ভাবি! ভাইজানকে আপনার রাজি করাতে হবে। এই শুক্রবারেই সুমুর বিয়েটা দিয়ে দিতে হবে।”
মিনা বেগম মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
আড়াল থেকে সব কথা শুনলো দুজন মানবী। কথাগুলো শুনে আর একমিনিটও দাঁড়াল না তারা। ছাদের দিকে পা বাড়াল দুজনেই।
ছাদের এককোণে দু’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে কালো হুডি পরিহিত একজন লোক। মানবী দুজন লোকটার পিছনে এসে দাঁড়াল। লোকটি পিছনে না তাকিয়েই বলল,
“এনি আপডেট?”
একজন মানবী খুশি বেগমের পুরো প্ল্যানের কথা খুলে বলল লোকটিকে।
কথাগুলো শুনে লোকটা বাঁকা হেসে বলল,
“ছেলেটার নাম্বার জোগাড় করে দিতে পারবে?”
“জি, পারব।”
খান সাহেব পর্ব ১১
“ওকে! ট্যুর থেকে আসার পর নাম্বারটা জোগার করবে। আর এই ফোনটা রাখো। যেকোনো আপডেট এই ফোনের মাধ্যমে আমাকে জানাবে।”
ফোনটা হাতে নিয়ে মানবী দুজন চলে গেল। লোকটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে বলল,
“তোমাকে আমার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। সি ইউ উইল বি মাই সুইটহার্ট।”
