Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ১৮

খান সাহেব পর্ব ১৮

খান সাহেব পর্ব ১৮
সুমাইয়া জাহান

সিকদার বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় পুরো দমে শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির সকলে কাজে ব‍্যস্ত। কিন্তু বিয়ের কনের জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। হাসি বেগম মেয়ের কাছে বসে আছেন। বিয়ের কোনো কাজে হাত লাগাতে পারছেন না তিনি। সুমুর জ্বর নামানোর জন্য সব রকমের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আজ বিয়ে, জ্বরের জন্য নাকি তারা বিয়ে ফেলে রাখতে পারবেন না। মান-সম্মানের প্রশ্ন এইটা। হাসি বেগম এমন নানান কথা বলে সুমুকে বকছেন আর জল পট্টি দিচ্ছেন। সুমু ঘোলা চোখে একবার চোখ খুলছে তো একবার বন্ধ করছে। আনোয়ার সাহেব রিফাতদের রাতে আসতে বলেছে। সুমু খুব ভালো করে বুঝতে পারছে, সবার কাছে তার থেকেও বেশি মান-সম্মান আর বিয়েটা ইমপ‍র্টেন্ট।

হাসি বেগম তাকে হালকা খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলেন। তারপর সুমুকে ঘুমাতে বলে হাসি বেগম রুম ত‍্যাগ করলেন। সুমু সিলিং ফ‍্যানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আজ সুমুর সত্যি ইচ্ছা করছে পালিয়ে কোথায়ও চলে যেতে। সে তো সবার কথাভাবে। কই, কেউ তো তার কথা ভাবল না। কেউ একবার জিঙ্গাসাও করেনি, সে এই বিয়েটা করতে চায় নাকি চায় না। চোখদুটো অসম্ভব রকমের জ্বলছে তার। চোখ বেয়ে তপ্ত নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে। প্রচন্ড যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যেতে চাইছে তার। হাতদুটোও অসম্ভব ব‍্যথা করছে।
সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাবার পর নিজের হাতদুটোকে দেখে অবাকের শেষ সিমানায় চলে গেছিল সে। কেউ খুব নিখুঁতভাবে ধারালো কিছু দিয়ে যত্নসহকারে রিফাত নামটি কেটে দিয়েছে। হাতদুটো দেখার পর থেকেই হাতদুটোকে লুকিয়ে রেখেছে সে। এখন পযর্ন্ত কেউ তার হাতদুটো দেখতে পায়নি। কথাগুলো আনমনে ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করল সুমু। তার এখন একটু ঘুমের প্রয়োজন।

সন্ধ্যারাত। সিকদার বাড়ি কৃত্রিম আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। পার্লার থেকে মেয়েরা সুমুকে সাজাতে এসেছে। জ্বরটা এখনও কমেনি সুমুর। মাথা ব‍্যথাটাও আছে। সকালে অল্প খেয়ে ঔষধ খেয়েছিল সে। তারপর থেকে এখন পযর্ন্ত কিছু খায়নি। কিছু খেলেই বমি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। শরীরটাও খুব দূর্বল।এখন ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে আছে সে। আজ নিজেকে কাঠের পুতুলের মতো মনে হচ্ছে তার। পার্লারের মেয়েরা তখন থেকে তাকে সাজিয়েই চলেছে। বিরক্ত হচ্ছে সুমু। তবে বাধা দিচ্ছেনা। পাঠাকেও বলি দেওয়ার আগে এইভাবে সাজানো হয়।
মাইশা, নাজমিন, সামিয়া বসে আছে বিছানার ওপর। বাড়ির সকলেই অলরেডি রেডি হয়ে গেছে। সকালে কেউ দেখার আগেই দুই হাত থেকে ব‍্যান্ডেজ খুলে ফেলেছিল সে, যাতে কারো প্রশ্নের সম্মুখীন না হতে হয়। রিফাতরা নাকি রওনা দিয়েছে প্রায় ত্রিশমিনিট আগে। রিফাতদের বাসা বেশি দূরে নয়। আসতে একঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট মতো লাগে।

সুমুর পরনে ডীপ পিংক কালারের বেনারসি। মুখে প্রসাধনীর ছোঁয়া। শরীর ভর্তি ভারি ভারি অর্নামেন্টস। পার্লারের মেয়েরা সাজ শেষ করতেই মাইশা উঠে এলো সুমুর কাছে। সুমুর দুই কাঁধ ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল সে। মাশাআল্লাহ বলে সুমুর থুতনি ছুঁয়ে চুমু খেয়ে আলতো হেসে বলল,
“আজতো অন্তত মুখটা গোমড়া করে রাখিস না। একটু হাস। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে তোকে হাসতে দেখিনি। শরীরটারও কি অবস্থা তোর। সেদিন তো জ্বরটা কমে গিয়েছিল। সেই জ্বরটা আবার হঠাৎ ফিরে কেনো আসলো সুমু? কি হয়েছে তোর ? আমাকে অন্তত বল। শরীর কি খুব খারাপ লাগছে?”
সুমু জোরপূর্বক হাসল, তবে কোনো কথা বলল না। হঠাৎ বাহিরের চেঁচামেচি শুনে মাইশারা সুমুকে রুমে থাকতে বলে নিচে চলে গেল।
বাগানে প্রচুর চেঁচামেচি হচ্ছে। মাইশা, সামিয়া আর নাজমিন এসে উপস্থিত হলো বাগানে। আনোয়ার সাহেব চিৎকার করছেন খুশি বেগমের ওপর। শামীম সাহেবর বুকে ব‍্যথা করছে। তিনি বুকে হাত দিয়ে চেয়ারে বসে আছেন। হাসি বেগম মুখে কাপড় গুজে কাঁদছেন। মেহমানরা সকলে কানাঘুষা করে কথা বলছেন।
আনোয়ার সাহেব আবারও চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

“মেয়েটার এখন কি হবে ভাবতে পারছিস তুই খুশি? তোর জন‍্য আজ মেয়েটার গায়ে কলঙ্ক লাগবে। হাসনার ছেলের সম্পর্কে নাকি তুই সব খবর নিয়েছিস? এই তোর খবর নেওয়ার নমুনা? আমাদেরকেও তুই খবর নিতে দিসনি। বলেছিস, ছেলে নাকি লাখে একটা। তাহলে এখন কই সেই ছেলে? মাঝরাস্তায় মিথ্যা কথা বলে গাড়ি থেকে নেমে কোথায় পালিয়েছে সে? জবাব দে খুশি।”
খুশি বেগম আমতা আমতা করে বললেন,
“আমি সত্যি বুঝতে পারিনি ভাইজান। রিফাত যে এমন করবে, আমি ভাবতেও পারছিনা ভাইজান।”
আনোয়ার সাহেব গর্জে উঠে বললেন,
“তাহলে, এখন সুমুর কি হবে? পাড়া-প্রতিবেশী কি বলবে বল? মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে গেল আজ।”
সামিয়া আর নাজমিন হন্তদন্ত পায়ে ছুটে গেল সুমুকে খবরটা দিতে। রুমের সামনে এসে দুজন হাঁপাতে হাঁপাতে রুমে ঢুকল ওরা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় রুমে সুমুকে দেখতে পেল না ওরা দুজন। রুম থেকে বেরিয়ে পুরো বাড়ি খুঁজল তারা, কিন্তু কোথায়ও পেল না সুমুকে। দৌঁড়ে নিচে নেমে আসলো ওরা দুজনে।
গার্ডেনে এসে সামিয়া চিৎকার করে কান্না করে দিয়ে বলল,
“আম্মু! আপু রুমে নেই। পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি আমরা দুজনে। আপু পুরো বাড়ির কোথায়ও নেই।”

আরেকটা বোমা ফাটলো যেন সিকদার বাড়ির গার্ডেনে। সকলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে সামিয়ার দিকে। শামীম সাহেব আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শেরাজ এতোক্ষণ বসে বসে সকলের সার্কাস দেখছিল। সামিয়ার কথাশুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। শান্ত মস্তিষ্কে রাগ উদয় হলো তার। সুমু যে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, সেই বিষয়ে শেরাজের কোনো সন্দেহ নেই। রাগে হাত মুঠো করে ফেলল সে। তারপর শান্তস্বরে রাহিনকে ডেকে বলল,
“রাহিন! এক্ষুনি গাড়ি বের কর।”
রাহিন ছুটে গিয়ে গাড়ি বের করল। শেরাজ বাগান পেরিয়ে যেতেই পা থমকে গেল তার।
খুশি বেগম ঠাট্টারস্বরে বললেন,
“ভাইজান! এতোক্ষণ আমাকে বলছিলেন, কিন্তু এখন কাকে বলবেন? আমার বান্ধবীর ছেলে না হয় পালিয়েছে। তাহলে এখন আপনার আদরের ভাগনি কোথায় ভাইজান? এই মেয়েকে আগে থেকেই আমার সন্দেহ হতো। বিয়ের কথা শোনার পর থেকেই অদ্ভুত ব‍্যবহার করছে। ওকে আমার স্বাভাবিক লাগেনি। দেখো গিয়ে, সে হয়তো কোনো নাগরের সাথে পালিয়ে গেছে। ওর চরিত্র তো কোনো কালেই ভালো ছিল না।”
হাসি বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“এইসব তুই কি বলছিস খুশি? আমার সুমুর চরিত্র নিয়ে কথা বলছিস তুই? আমার মেয়েটা আগে এমন কি করেছে, যার জন‍্য তুই আজ ওর চরিত্র নিয়ে কথা বলছিস?”
মিনা বেগম মুখ ভেঙিয়ে বললেন,
“কিছু মনে করবেনা আপা, তবে সুমুর স্বভাব আমার নিজেরও কোনোকালে ভালো লাগেনি। আপনি ওর মা বলেই হয়তো আপনার চোখে এইসব ধরা পড়েনি বা ধরা পড়লেও হয়তো ওই চোখে দেখেননি।”
হঠাৎ করে একজন মহিলা বলল,
“কি বিয়ে রে বাবা! এমন বিয়ে তো আমি আমার জন্মে কোনোদিনও দেখিনি। বর-কনে দুজনেই পালিয়ে গেল। ছেলেদের গায়ে তো কলঙ্ক লাগেনা, কিন্তু মেয়েদের গায়ে? মেয়েদের গায়ে তো কলঙ্ক লাগে। কি মেয়েরে বাবা! বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে গেল। আসলে কি জানো তোমরা সবাই, শুরু রূপ থাকলেই হয়না, কপাল লাগে। মেয়েটা অলক্ষী বলেই তো এমন হয়েছে আজ। ওই মেয়েকে এখন কে বিয়ে করবে? ভালো ঘরের ছেলেতো দূরে থাক, কোনো রাস্তার ছেলেও ওই মেয়েকে বিয়ে করবে না।”

মহিলাটির বলা কথাগুলো শুনে মিনা বেগম আর হাসি বেগম খুশি হলেন। বিয়েটা না হোক, সুমুর বদনাম হয়েছে, আর এতেই তারা খুশি। শেরাজ আর দাঁড়িয়ে রইল না। কিছুক্ষণের জন‍্য কথাগুলো গিলে নিল সে। নিজের রাগটাকে সংযত করে গাড়ির কাছে চলে গেল সে।
শামীম সাহেব বুকে ব‍্যথা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে বললেন,
“আমার মেয়ের সম্পর্কে আমি কারো মুখে আর একটাও কথা শুনতে চাই না।”
তিনি হাসি বেগমের দিকে আঙুল তাক করে বললেন,
“আমার মেয়ের কিছু হলে, তোমাকে আমি দেখে নিব।”
কথাগুলো বলে বুকের ব‍্যথায় মাটিতে বসে পড়লেন শামীম সাহেব। সকলে ছুটে গেল তার কাছে। হাসি বেগম স্বামীকে ধরে কেঁদে উঠলেন। আনোয়ার সাহেব হন্তদন্ত হয়ে ডাক্তারকে কল করলেন।

শেরাজ ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে। তার সব ফ্রেন্ডরাও তার সাথে এসেছে। পুরো রাস্তায় একটা কাকপক্ষীও নেই। সুমুর দেখা এখনও পায়নি তারা। কে জানে মেয়েটা কোথায় আর কতদূর চলে গেছে। শেরাজের মনটা খুব অশান্ত হয়ে আছে। অজানা ভয় তাকে আকড়ে ধরেছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল সামনে থাকা কিছু ছেলের দিকে। যারা একটা মেয়েকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি ভয়ে বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। মেয়েটির চিৎকার শুনে ছেলেগুলো উচ্চস্বরে হাসছে। শেরাজের আর বুঝতে বাকি রইল না মেয়েটা কে। গাড়ি থামিয়ে নেমে এগিয়ে গেল সকলে। ছেলেগুলোর চোখে গাড়ির আলো পড়তেই বিরক্তিবোধ করলো তারা। হাত দিয়ে চোখ ডেকে রাগিস্বরে বলল,

“এই, কারা রে তোরা?”
কথাটা শেষ করতে দেরি হলেও, ছেলেটার মুখে ঘুষি পড়তে দেরি হল না। মুহুর্তেই ছেলেগুলো রেগে তেড়ে গেল। শেরাজের ফ্রেন্ডরা ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলেগুলোর ওপর। সুমু রাস্তার একসাইডে ভয়ে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইল। বিয়ের কথা মনে পড়তেই সামনের বড় মাঠের দিকে দৌঁড় লাগাল সুমু।
ছেলেগুলো শেরাজদের সাথে না পেরে, ভয়ে উঠে দৌঁড়ে পালাল। শেরাজ হাত ঝাড়তে ঝাড়তে পেছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখল সুমু নেই। চারদিকে ঘুরিয়ে দেখতেই তার চোখ গেল খোলা মাঠের দিকে। তার ঠোঁটের কোনো বাকা হাসি দেখা গেল। আচমকাই সে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসল। রাহিনদেরকেও আদেশ করল গড়িতে উঠতে। রাহিনরা কিছু না বুঝে, উঠে পড়ল গাড়িতে। শেরাজ গাড়ি র্স্টাট দিল। রাহিনরা তিনটি গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। কারণ শেরাজ কাউকে গাড়িতে ওঠার টাইম না দিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল। রাহিন আর আইয়ুব আগে থেকেই গাড়িতে উঠে বসেছিল। সারবাজরা বাকি দুটো গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল। শেরাজ গাড়ি স্টার্ট দিতেই, সারবাজ আর নিহাল ও গাড়ি স্টার্ট দিল।

ফাঁকা মাঠ দিয়ে সুমু দৌড়াচ্ছে। হঠাৎ সে কিছু একটা সাথে পায়ে লেগে পড়ে গেল। পেছন ফিরে পায়ের দিকে তাকাতেই গাড়ির আলো লাগল তার চোখে। হাত দিয়ে চোখ ঢাকল সুমু। হঠাৎ গাড়ির ভেতর শেরাজকে বসে থাকতে দেখে আত্মা কেঁপে উঠল তার। সে খুব ভালো করেই জানে, তার খান সাহেব তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। তারপর সকলে মিলে জোড় করে বিয়ে দিয়ে দিবে তাকে। মনে মনে কথাগুলো ভেবে বিড়বিড়ায়ে সে বলল,
“না, আমি আর কিছুতেই ওই বাড়িতে ফিরে যাব না। একবার যখন বেরিয়ে এসেছি আর ফিরব না।”

পায়ের ব‍্যথা নিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। দৌড়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই গাড়িগুলো ঘিরে ফেলল তাকে। গাড়িগুলো ঘুরছে সুমুর চারপাশ দিয়ে। মাঝখানে সুমু দাঁড়িয়ে আছে। পালানোর রাস্তা খুঁজছে সে, কিন্তু গাড়িগুলো তার চারপাশ দিয়ে ঘোরার ফলে সে পালাতে পারছে না। অচমকাই গাড়িগুলো থেমে গেল। প্রথম থেমে যাওয়া গাড়ি থেকে শেরাজ বেরিয়ে এলো। শেরাজ নামার পরপর রাহিনরাও নেমে দাঁড়াল। সুমু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার অশান্ত চোখগুলো পালানোর রাস্তা খুঁজছে। শেরাজদের ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, আবারও দৌঁড় লাগাল সে। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। শেরাজ তার বলিষ্ঠ হাত দিয়ে সুমুর হাত চেপে ধরে ধরল। সুমু এখনও ঘুরে তাকিয়ে দেখেনি, তার হাত ধরে রাখা মালিকটির দিকে। কিন্তু সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, তার হাত ধরে রাখা মানুষটা আসলে কে। এই স্পর্শ তার বড্ড চেনা। আগেও অনেক বার পরিচিত হয়েছে সে এই স্পর্শের সাথে। সুমুর পা জোড়া অবশ হয়ে গেল। ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে সে। শেরাজের হাতের মধ্যে থাকা হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। সে পালাতে চায়। হঠাৎ ভয়টাকে গিলে সে আমতা আমতা করে বলল,

“আ…আমাকে পি..প্লিজ ছেড়ে দিন। আমি বা..বাসায় ফিরতে চাইনা। আ..আমি এই বি..য়েটা করতে চা..চাইনা। হাতটা ছাড়ুন, প্লিজ।”
শেরাজের ভাবমূর্তি বোঝা যাচ্ছেনা। সে সুমুর হাত চেপে ধরে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। আচমকাই সুমুর হাতটা ছেড়ে দিল শেরাজ। সুমু হাতের বাধন আলগা হতে দেখেই কোনোকিছু না ভেবে পালানোর জন‍্য দৌড় লাগাতে গেল, তখনই শেরাজ আবারও সুমুর হাত চেপে ধরে সুমুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারল। থাপ্পড়ের টাল সামলাতে না পেরে মাঠের ঘাসের ওপর পড়ে গেল সুমু। মাঠের ঘাসের ওপর পড়ে থাকা ছোট্ট ইটের টুকরোর সাথে ডানহাতটা লেগে কাটা জায়গা দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হতে শুরু করল তার। মুখে হাত রেখে কেঁদে উঠল সে। কিছুক্ষণ সময় যেতেই কান্নাটাকে কোনোমতে গিলে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে মারলেন কেনো? আমার গায়ে হাত তোলার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
শেরাজ দুইহাত মুষ্টিবদ্ধ করে তেড়ে যাচ্ছিল সুমুর দিকে। রাহিনরা এসে আটকালো তাকে। সুমু কান্নারত অবস্থা রাহিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“রাহিন ভাইয়া! তোমার চোখের সামনে তোমার এই অসভ্য বন্ধু আমার গায়ে হাত তুলল, আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছো? কিছুই বলবে না তুমি তোমার এই বন্ধুকে?”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বলল,
“ওকে চুপ করতে বল রাহিন। আর একটা কথা ওর মুখ থেকে বের হলে, আমি ভুলে যাব ও তোর বোন। মেরে এখানেই পুঁতে রেখে যাব ওকে।”
সুমু উচ্চস্বরে বলল,
“মারুন। মেরে পুঁতে দিন। তারপরেও আমি না আর ওই বাসায় ফিরব, আর না এই বিয়েটা করব।”
শেরাজ সুমুর বাহু ধরে টেনে তুলল তাকে। পায়ের ব‍্যথায় “আহ্” করে মৃদ‍ু শব্দ করল সুমু। সুমুর আর্তনাদের শব্দ শেরাজের কর্ণে যেতেই পাঁজাকোলে তুলে নিল সে সুমুকে। কোলের মধ্যে সুমু হাত-পা ছুড়তে শুরু করল। শেরাজ সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সুমুকে নিয়ে গেল গাড়ির কাছে। গাড়ির দরজা খুলে ছুড়ে মারল তাকে গাড়ির ভেতর। ফ্রেন্ডদের জন‍্য অপেক্ষা না করে গাড়িতে গিয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল সে। রাহিনরা সকলে অন‍্য গাড়িতে উঠে পড়ল। মাঠ ছেড়ে তিনটা গাড়ি চলে গেল মেইনরোডে।

সিকদার বাড়ি পুরো থমথমে। প্রতিবেশীরা সুমুর চরিত্র নিয়ে নানান খারাপ মন্তব্য করেছেন। বর্তমানে সকলে চুপ করে আছে বাকি নাটক দেখার জন‍্য। শামীম সাহেবের শরীরের অবস্থা এখন একটু ভালো। মিনি হার্ট এট‍্যাক করেছিলেন তিনি। বাড়িতেই ডাক্তার এনে চিকিৎসা করা হয়েছে তার। ডাক্তার ঘুমের ইনজেকশন দিয়েছেন তাকে।
গার্ডেনে সকলে থমথমে মেজাজে সুমুর অপেক্ষায় বসে আছে। হঠাৎ বাড়ির গেট দিয়ে ফুল স্পিডে তিনটা গাড়ি ঢুকল। গার্ডেনের সকলে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামিয়া, নাজমিন, তিশা, রাইফ, রাইশা, ইফতিয়া, লামিয়া ছুটে গেল গাড়ির কাছে। শেরাজ সুমুকে টেনে বের করল গাড়ি থেকে। কাউকে কোনো কথা বলতে দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে সে সুমুর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল বাড়ির ভেতর। তার পেছন পেছন সকলে ঢুকল বাড়ির ভেতর।
শেরাজ সুমুকে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে ছুড়ে মারল বেডের ওপর। সুমু অনবরত কেঁদেই চলেছে। স‍্যান্ডি লাগেজ হাতে নিয়ে শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। স‍‍্যান্ডির কাছ থেকে লাগেজ নিয়ে লাগেজটা খুলল শেরাজ। ভেতর থেকে টকটকে লাল রঙের একটা লেহেঙ্গা বের করে ছুড়ে মারল সুমুর মুখের ওপর। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“পনেরো মিনিট টাইম দিলাম তোমাকে। এই পনেরো মিনিটের মধ্যে নিজের গায়ের সবকিছু চেঞ্জ করবে তুমি।”
সে মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই লাগেজে যা যা আছে সবকিছু দিয়ে পনেরো মিনিটের মধ্যে ওকে নতুন করে বিয়ের সাজে সাজিয়ে দাও। আর হ‍্যাঁ, সবার আগে ওর হাতদুটো ব‍্যান্ডেজ করে দিও। তোমাদের কাজ শেষ হয়ে গেল আমাকে জানাবে।”
সে পুনরায় সুমুর দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“ওরা সাজানো পর যদি তোমার চোখ থেকে এক বিন্দু পরিমাণও পানি পড়ে মেকআপ নষ্ট হয়, তাহলে আমার থেকে খারাপ তোমার জন্য কেউ হবে না। একটা চড় ডান গালে পড়েছে। আর একটা চড় তোমার বামগালে পড়বে। মেকআপ ছাড়াই দুটো চড় তোমার গালে ব্ল‍্যাশারের মতো কাজ করবে। যার কোনো সাইড ইফেক্ট নেই, একদম ন‍্যাচারাল ব্ল‍্যাশার।”

ঠান্ডা গলায় সুমুকে শাসিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল শেরাজ। মাইশারা কিছুই বুঝল না। তারা শুধু রোবটের মতো শেরাজের হুকুম পালন করার জন‍্য রুমের মধ্যে ঢুকলো। ঠিক পনেরো মিনিটের মধ্যে সুমুকে নতুন করে বিয়ের সাজে সাজালো মাইশা। সুমুর শরীরে পরিহিত লেহেঙ্গা থেকে শুরু করে সমস্ত অর্নামেন্টস নিউনিক আর অনেক এক্সপেনসিভ। প্রতিটা জিনিস চোখ ধাধানো সুন্দর। সুমুকে দেখতেও অপূর্ব সুন্দর লাগছে। মাইশারা তাকে পুরোপুরি রেডি করে শেরাজকে ডাকতে চলে গেল।

বাগানে বড়রা সকলে উপস্থিত। কেউ বুঝতে পারছেনা শেরাজ ঠিক কি করতে চাইছে। আনোয়ার সাহেব অনেকবার শেরাজকে প্রশ্ন করেছে, কিন্তু শেরাজ কোনো উত্তর দেয়নি। সে ব্ল‍্যাক ব্লেজার পরে দুইহাত পকেটে গুজে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ সামিয়া এসে শেরাজকে বলল,
“ভাইয়া! আপু পুরো তৈরি।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে শেরাজ বাড়ির ভেতরে চলে গেল। কিছুসময় বাদে সুমুকে হাত ধরে নিয়ে এলো গার্ডেনে। সুমু রোবটের মতো মাথা নিচু করে হেঁটে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে তার ভিতরে প্রাণ নেই। কাজী সাহেব চলে গিয়েছিল, রাহিন গিয়ে কাজীকে আবারও নিয়ে এসেছে।
শেরাজ সুমুকে সাথে নিয়ে কাজীর সামনে গিয়ে বলল,

“বিয়ে পড়ানো শুরু করুন, কাজী সাহেব।”
উপস্থিত সকলে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। আনোয়ার সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“বিয়ে পড়ানো শুরু করবে মানে? পাত্র নেই। কার সাথে বিয়ে হবে?”
শেরাজের ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দিল,
“আমার!”
সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। সুমু বিস্ফোরীত নয়নে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। হঠাৎ তার শেরাজের সেদিন রাতের বলা কথাগুলো মনে পড়তেই সুমুর রাগ হলো। সে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বলল,
“কিছুতেই না। আমি আপনাকে কিছুতেই বিয়ে করব না। কাজী সাহেব এইখানে কোনো বিয়ে হবে না।”
শেরাজ অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকাল সুমুর দিকে। শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে তখনের চড়ের কথা মনে পড়তেই চুপসে গেল সুমু।
খুশি বেগম রাগিস্বরে বললেন,

“তুমি বিয়ে করবে মানে?”
“হ‍্যাঁ, আমি বিয়ে করব।”
আনোয়ার সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,
“তুমি ঠিক কি বলছো, ভেবে বলছো?”
“শেরাজ খান তার জীবনের প্রতিটা সিদ্ধান্ত ভেবেই নিয়েছে, শুধু একটা সিদ্ধান্ত ছাড়া।”
আনোয়ার সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“কোনটা?”
শেরাজ আনোয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সেটা আপনার না জানলেও চলবে, আঙ্কেল।”
সে কাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি বিয়ে পড়ানো শুরু করুন।”
আইয়ুব আর রাহিন কাজীকে শেরাজ আর শেরাজের বাবার নাম বলে দিল। কাজী সাহেব শেরাজের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“দিনমোহর কতো লিখব বাবা?”
শেরাজ একপলক সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এককোটি লিখেন আর সাথে আমার নামটাও লিখেন।”
উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।প্রতিবেশীরা কানাঘুষা শুরু করল। কাজী অবাক হয়ে বললেল,
“এতো টাকা লিখব বাবা?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“শেরাজ খানের বউয়ের মূল‍্য আরও অনেক বেশি কাজী সাহেব। এই সামান্য টাকার থেকেও শেরাজ খানের বউয়ের পায়ের একটা নখের মূল‍্য অনেক বেশি।”
উপস্থিত সকলে একেরপর এক অবাক হয়েই যাচ্ছে। কাজী সাহেব আবারও বললেন,
“সে বুঝলাম! কিন্তু তোমার নামটা কেনো লিখতে বলছো, বাবা?”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“বউ শুধু পালাতে চাইছে, কাজী সাহেব। তাই দেনমোহরের সাথে সাথে কগজে কলমে নিজেকেও লিখে দিলাম, যাতে বউ পালাতে চাইলে বা কখনো আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইলে, দেনমোহর হিসাবে আমাকেও সাথে নিয়ে যেতে পারে। তবে টাকার দেনমোহরটা বউকে আমি আগেই দিয়ে দিব। এখন আপনি বেশি প্রশ্ন না করে বিয়ে পড়ানো শুরু করুন।”

কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। সুমুকে কবুল বলতে বলা হলো। কিন্তু সুমু কবুল কিছুতেই বলবেনা বলে ঠিক করেছে। শেরাজ সুমুর কানের কাছে গিয়ে একটু চাপাস্বরে বলল,
“একটু তাকিয়ে দেখো, এখানে সকলে উপস্থিত আছে। শুধু তোমার বাবা মানে, আমার শশুরমশাই ছাড়া।”
সুমু মাথা তুলে তাকাল। সে শামীম সাহেবকে খুঁজল, কিন্তু পেল না। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার আব্বু এখানে নেই কেনো খান সাহেব?”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“কারণ, তোমার বাবা এখন আমার কাছে বন্দি। যদি তুমি বিয়েটা আর কোনো ঝামেলা ছাড়াই চুপচাপ করে নাও, তাহলে বিয়ে শেষে তুমি তোমার বাবাকে চোখের সামনে দেখতে পাবে।”
সুমুর আজ তার খান সাহেবকে অচেনা লাগছে। এই মানুষটাকে চিনতে পারছেনা সে। সুমু করুণস্বরে বলল,
“আপনার তো অন‍্যকেউ আছে, খান সাহেব। তাহলে আমাকে কেনো বিয়ে করতে চাইছেন?”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“কারণ, আমার একটা দিয়ে হয় না, তাই তোমাকেও বিয়ে করছি। পেয়ে গেছো তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর? এখন কবুলটা বলবে নাকি তোমার আব্বুকে আমি…”
শেহেরাজ কথাটা শেষ করার আগেই সুমু তিন কবুল বলে দিল। আইয়ুবরা উচ্চস্বরে “আলহামদুলিল্লাহ্” বলে উঠল। কাজী সাহেব শেরাজকে কবুল বলতে বলল। শেরাজ বেশি সময় না নিয়ে পরপর তিন কবুল বলে দিল। সকলে আবারও একসাথে “আলহামদুলিল্লাহ্” বলে উঠল। তারপর দুজনে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করল। বিয়ে সম্পূর্ণ হতেই শেরাজ আইয়ুবকে ডেকে কিছু একটা বলল। আইয়ুব কাজীকে নিজের সাথে নিয়ে চলে গেল। পাঁচ হাজার টাকা কাজীর হাতে দিল আইয়ুব। কাজী খুব খুশি হয়ে শেরাজ আর সুমুর জন‍্য দোয়া করল।
সুমুর মাথাটা ঘুরছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি পড়ে যাবে সে। নিজেকে শক্ত রেখে চাপাস্বরে সে বলল,
“এইবার আমার আব্বুর কাছে আমাকে নিয়ে চলুন, খান সাহেব।”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,

“এখনতো আমাদের বাসর বউ। শশুরআব্বুর সাথে কাল দেখা করো। চলো, এখন রুমে যাই।”
সুমু বিরক্ত হলো। সে রাগটাকে দমিয়ে রেখে বলল,
“প্লিজ! বলুন না, আব্বু কোথায়?”
“তোমার আব্বু বাড়িতেই আছে। তার একটা মিনি হার্ট এট‍্যাক হয়েছিল, এখন ঘুমাচ্ছে।”
সুমুর বুকের ভিতরটা কেঁপে করে উঠল। আজ তার আব্বুর এই অবস্থার জন‍্য নিজেকে দায়ী করল সে। আব্বুর কথা ভাবতেই কেঁদে উঠল সে। উঠে দাঁড়িয়ে শামীম সাহেবের কাছে যেতে নিবে তখনই মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল সে। শেরাজ তার বলিষ্ঠ হাত দিয়ে ধরে ফেলল তাকে। কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে পাঁজাকোলে তুলে নিল তাকে। রাহিনকে ডাক্তার ডাকতে বলে, বাড়ির ভেতরে যাবার জন‍্য পা বাড়াতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল সে। গার্ডেনের সকলকে একবার পরখ করে বলল,
“আজ, এই মুহূর্ত থেকে সুমু শেরাজ খানের লিগ‍্যাল ওয়াইফ মিসেস সুমাইয়া খান। আজকের পর কেউ ওর চরিত্র নিয়ে কোনো বাজে কথা বললে, তাকে জাহান্নাম থেকে আমি স্বয়ং শেরাজ খান নিজ দায়িত্বে ঘুরিয়ে আনব। সো, বি কেয়ারফুল।”
সকলকে ঠান্ডা মাথায় শাসিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল বাড়ির ভেতর। নিজের রুমে এসে সুমুকে বেডে শুইয়ে দিল।

সিকদার বাড়ির সকলে আজ চুপ করে গেছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। মেহমানদের খাইয়ে সকলে নিজ নিজ রুমে চলে গেছে সকলে। রাতে কারো খাওয়া হয়নি। সকলে খুব ক্লান্ত। সুমুর শরীরের দূর্বলতার জন‍্য স‍্যালাইন দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে ঘুমের ইনজেকশন। ইফতিয়া নিজের মায়ের কাছে বসে কাঁদছে। খুশি বেগম একদম চুপ মেরে গেছে। রাইশা আর লামিয়ারও মন খারাপ। মিনা বেগম নিজের রুমেই আছেন। নিজেদের এমন সুন্দর প্ল‍্যান ভেস্তে গিয়েছে বলে সকলেই চুপ মেরে গেছে। শামীম সাহেবের ঘুম আর ভাঙেনি। হাসি বেগম স্বামীর পাশেই আছে।
শেরাজ ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে তার বড় বড় দুইটা লাগেজ। রাহিনরা শেরাজের দিকে উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। হঠাৎ শেরাজ লাগেজ থেকে সমস্ত জিনিস বের করে লাগেজ সহ আগুন জ্বালিয়ে দিল।
রাহিন নিরবতা ভেঙে বলল,

“রিফাত কোথায় এস.কে?”
“হানিমুনে!”
অমিত বিরক্তসূচক শব্দ করে বলল,
“এখন প্লিজ হেয়ালি করিস না এস.কে। খুলে বল সবটা। রিফাতের সাথে কি করেছিস তুই?”
স‍্যান্ডি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“স‍্যার ঠিকিতো বলেছে। ওই ছেলেটা এখন হানিমুনে।”
উপস্থিত সকলে এইসাথে “কি” বলে উঠল। শেরাজ ছাদের শেষ প্রান্তে গিয়ে দুইহাত পকেটে গুজে দাঁড়িয়ে বলল,
“রিফাতের বিয়ে হয়ে গেছে আজ সন্ধ্যায়। এখন রিফাত হানিমুনে গেছে।”
সারবাজ একটু ভেবে বলল,
“বিয়ে কার সাথে হলো ওর?”
“ওর গার্লফ্রেন্ডের সাথে।”
আরবাজ এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কিন্তু ব্রো! তুমি ওই ছেলেটাকে কিছু না বলে ছেড়ে দিলে?”
“তোরা হয়তো ভুলে যাচ্ছিস, কোনো নির্দোষ মানুষকে আমি আঘাত করিনা।”
আইয়ুব গম্ভীরগলায় বলল,
“ও সুমুকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, তাহলে ও কীভাবে তোর কাছে নির্দোষ হলো?”
শেরাজ আইয়ুবের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“ও সুমুকে বিয়ে করতে চায়নি। ও অজান্তা নামের একটা মেয়েকে ভালোবাসে। রিফাতের মা রিফাতকে নিজের অসুস্থতার ভয় দেখিয়ে বিয়েতে রাজি করিয়েছিল। এই বিয়েটা সুমুকে সারাজীবনের জন‍্য কষ্ট দেবার জন‍্য করানো হতো, কারণ রিফাত কোনোদিনও সুমুকে তার ভালোবাসার মানুষটার জায়গা দিতে পারত না। সুমুর এই বিয়েটা প্ল‍্যান করে দেওয়া হচ্ছিল।”
রাহিন ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কিন্তু ফুপি আন্টিতো বলল যে, রিফাত ভালো ছেলে। নিজের ইচ্ছায় মত দিয়েছে। আর রিফাতের সম্পর্কে নাকি তিনি সব খবর নিয়েছিল।”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“সবটা মিথ্যা ছিল। প্ল‍্যান মাফিক সব করা হয়েছিল। আর এই প্ল‍্যানের পিছনে ছিল খুশি আন্টি, মিনা আন্টি আর ইফতিয়া।”
সকলে অবাক হয়ে গেল। রাহিন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ রাহিনের অবস্থা বুঝতে পেরে সবটা খুলে বলল সবাইকে। রাহিন আর কোনো কথা বলল না। চুপ করে রইল সে।
নিহাল ধীরে বলল,

“তাহলে এগুলো কেনো পোড়ালি? রিফাতের টাকায় কেনা বলে?”
শেরাজ হেসে বলল,
“এগুলো সব আমার টাকায় কেনা।”
“তাহলে পোড়ালি কেনো?”
“প্রথমত, এগুলো রিফাতের পছন্দ করা। দ্বিতীয়ত, রিফাতের গার্লফ্রেন্ড আজ এই সেম জিনিস পড়ে রিফাতকে বিয়ে করছে। সেদিন রিফাতের পছন্দ করা সবকিছু দুটো করে কেনা হয়েছিল, সুমু আর অজান্তার জন‍্য। সুমুর জন‍্য কেনা জিনিসগুলো আমার টাকায় কেনা। আর অজান্তারগুলো রিফাতের টাকায় কেনা। রিফাতের পছন্দ করা জিনিস আমার বউ ব‍্যবহার করবে, তোরা ভাবলি কি করে? আর যেগুলো পরিয়ে রিফাত তার গার্লফ্রেন্ডকে আজ বিয়ে করেছে, সেই সেম জিনিস পরিয়ে শেরাজ খান তার সুইটহার্টকে বিয়ে করবে। টু ফানি।”
রিসান কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে বলল,

“খুশি আন্টিদের প্ল‍্যান সম্পর্কে তুই কি করে জানলি?”
“আমরা বলেছি।”
সকলে পেছনে ঘুরে তাকাল। সামিয়া আর নাজমিন দাঁড়িয়ে আছে ছাদের দরজার কাছে। ওদের দুজনকে দেখে সকলে অবাক হলো। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমরা ওকে একা রেখে এখানে এসেছো কেনো?”
নাজমিন গলারস্বর নিচু করে বলল,

খান সাহেব পর্ব ১৭

“আপনি এখন রুমে যান, ভাইয়া। আপুর এখন আমাদের থেকেও আপনাকে দরকার বেশি।”
আইয়ুব হেসে বলল,
“এস.কে! আজতো তোর বাসর রাত, কিন্তু আজতো তুই বাসর করতে পারবি না। সুমুতো ঘুমিয়ে আছে। থাক মন খারাপ করিস না। সুমু সুস্থ হলে আমরা সকলে মিলে তোদের জন‍্য লাক্সারি বাসর রাতের ব‍্যবস্থা করব।”
শেরাজ রাগি লুক নিয়ে একপলক আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। শেরাজ ছাদ ছেড়ে যেতেই সকলে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।

খান সাহেব পর্ব ১৯