খান সাহেব পর্ব ২৫
সুমাইয়া জাহান
সুমুরা আজ ফিরে যাবে। একে একে সকলের লাগেজ গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সকলে নাস্তা করেই দশটার ভেতরেই বেরিয়ে পড়বে। একটু লেট করেই বেরোনোর প্ল্যানিং করেছে সকলে। সুমু সকাল সকাল ফোনে টাইপিং নিয়ে বসেছে। আপাতত ফুল রেডি সে। এখন শুধু তার একটাই কাজ, গল্প লেখা। শেরাজ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করছে। হাতে ঘড়িটা পরে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে “দি ম্যান” পারফিউমটা তুলে নিয়ে ইউজ করে লাগেজে ঢুকিয়ে রাখল। পুরো রুম পারফিউমের ঘ্রাণে ম’ম করছে। সুমু ফোনটা রেখে শেরাজের পেছনে এসে দাঁড়াল। শেরাজ একহাত দিয়ে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের পাশে এনে সুমুকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। আয়নাতে দুজনের চোখ একে অপরকে দেখছে।
সুমু চোখ বন্ধ করে শেরাজের শরীর থেকে ঘ্রাণটা বুক ভরে টেনে নিয়ে বলল,
“আপনার সাথে আমাকে মানায়, না খান সাহেব। আপনার স্কিন টোন আমার স্কিন টোনের থেকেও অনেক বেশি উজ্জ্বল। আপনার পাশে দাঁড়াল আমাকে কালো মনে হয়।”
শেরাজ সুমুকে নিয়ে দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“তুমি যদি কোনোদিনও আমার চোখ দিয়ে তোমাকে দেখতে পারতে, তাহলে নিঃসন্দেশে তুমি নিজেই নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর নারীর উপাধি দিতে।”
“আপনাকে একটা প্রশ্ন করব, খান সাহেব?”
“উফ, সুইটহার্ট! তুমি আবার আমার কাছে পারমিশন চাইছো? আমি তোমাকে বলেছিনা…”
“আচ্ছা সরি! তাহলে প্রশ্নটা শুনুন, আপনার এই পারফিউম দুইটার মানে আমি বুঝিনা। একটা “দি ম্যান”, যেটা আপনি অলওয়েজ ইউজ করেন। আর একটা হলো “ডার্ক সাইড”, যেটা আপনাকে এখন পর্যন্ত আমি ইউজ করতে দেখিনি। আর “ডার্ক সাইড” পারফিউমটা কেমন মাফিয়া টাইপ। এমন মাফিয়া টাইপ নামের পারফিউম আপনি কেনো ইউজ করেন?”
শেরাজ সুমুর প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই বাহির থেকে রাহিনের ডাক ভেসে এলো। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বলল,
“চলো, ব্রেকফাস্ট করে আসি। সকলে ডাকছে।”
শেরাজ সুমুকে নিয়ে বাহিরে বেরিয়ে এলো। সকলে ওদেরই অপেক্ষায় বসে আছে। দুজনে গিয়ে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসল। নিজেদের পছন্দমতো খাবার প্লেটে নিল। সকলে একসাথে নাস্তা করতে ব্যস্ত হলো।
রুমে এসে সুমু আবারও ফোনটা নিয়ে ফেসবুকে ঢুকল। শেরাজ বেলকনিতে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করতে লাগল। দশটায় বেরোবে তারা। এখন নয়টা পঁয়তাল্লিশ বাজে। গাড়িতে সব লাগেজও তোলা হয়ে গেছে তাদের। মাত্র খেয়েছে বলে, এই পনেরো মিনিট সকলে রেস্ট নিচ্ছে।
সুমু ফেসবুকে গার্লস ড্রেস কালেকশনের বিভিন্ন পেজে ঢুকে ড্রেস দেখছে। কিনুক, আর নাই কিনুক কালেকশন দেখতে তার ভালো লাগে। হঠাৎ একটা পেনন্সিল, অফ সোল্ডার ওয়েস্টার্ন ড্রেস দেখে মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এলো তার। পিকটা ফোনে সেভ করে হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে পিকটা শেরাজকে সেন্ড করে লিখল,
“আই রিয়েলি ওয়ান্ট টু ওয়েয়ার দিস আউটফিট।”
টেক্সটটা সেন্ড করে সুমু বেলকনির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আবারও ফোনে নজর দিলো। সুমু টেক্সট করার দু’মিনিটের মধ্যে শেরাজ টেক্সটটা সিন করল। সে সুমুর টেক্সটের কোনো উত্তর না দিয়ে বেলকনি থেকে রুমে উঠে এলো। তারপর ক্যাবার্ড থেকে কিছু একটা নিয়ে আবারও বেলকনিতে চলে গেল। শেরাজের কোনো রেসপন্স না পেয়ে সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বেলকনির দিকে। হঠাৎ ফোনে টুং টুং করে দু’বার শব্দ হতেই ফোনের দিকে নজর দিলো সে। হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে দেখল, শেরাজ একটা পিক সেন্ড করেছে তাকে। সে ছবিতে দেখল, শেরাজের হাতে বেল্ট পেঁচানো। পিকের নিচে ছোট্ট একটা টেক্সটটে লেখা,
“হোয়াই নট ডালিং।”
সুমু বড় করে ঢোক গিলে ফোনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল রুম থেকে। শেরাজ সুমুকে ভয়ে পালিয়ে যেতে দেখে মিটিমিটি হাসল। ল্যাপটপের কাজ শেষ করে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে সেও বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। ঘড়ির কাঁটায় সময় রাত একটা পনেরো। রাহিনরা অনেক আগেই শেরাজদের পিছনে ফেলে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। শেরাজ গাড়ির স্পিড নরমাল মুডে রেখেছে। বাসায় তাড়াতাড়ি ফিরে যাবার তাড়া নেই তার মধ্যে। সুমু গাড়ির জানালা দিয়ে রাতের শহর দেখছে। সোডিয়ামের আলোতে পুরো রাস্তা আলোকিত। রাতের শহর সুমুর সবসময় পছন্দ। দুই একটা গাড়ি সাই সাই করে সুমুদের গাড়ির পাশ কেটে চলে যাচ্ছে।
শেরাজ খুব দক্ষ হাতে ড্রাইভিং করতে করতে বলল,
“তুমি একটু ঘুমিয়ে নিতে পারতে, সুইটহার্ট।”
বাহির থেকে চোখ সরিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল সুমু। একদম পিওর জেন্টলম্যান তার খান সাহেব। এই মানুষটা এখন তার জীবনসঙ্গী, আজও তার বিশ্বাস হয়না।
সুমুকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“আমার এখন একটা কাজ করতে খুব ইচ্ছা করছে, সুইটহার্ট?”
সুমু দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বলল,
“রাস্তা-ঘাটে এসব করতে মন চাই আপনার? আপনি দেখছেন না এখন আমরা রাস্তায় আছি। আশপাশ দিয়ে কতো গাড়ি যাচ্ছে। এরমধ্যেও আপনার এইসব মন চায়? লোকে দেখলে কি ভাববে?”
“তাহলে, চলো যায়।”
“কোথায়?”
“যেখানে কেউ দেখতে পাবেনা, সেখানে।”
“আপনি কি বিয়ের আগে থেকেই এমন অসভ্য ছিলেন? নাকি বিয়ের পরে হয়েছেন?”
“দু’টো দুষ্টু কথা বললাম বলে, তুমি আমাকে “অসভ্য” উপাধি দিলে। আর কাজে করলে তুমি আমাকে আর কি কি উপাধি দিতে, গড নোজ। বাই দ্যা ওয়ে, এই শেরাজ খানের জীবনে একটি মেয়েই প্রেম, ভালোবাসা আর বউ হিসাবে এসেছে। আর সেই মেয়েটা “তুমি”। আর অসভ্যতামি আমি শুধু আমার সেই বউয়ের সাথেই করি।”
“তাই বলে রাস্তায়?”
“ঠোঁট থেকে হাতটা সরাও। আমি এখন তোমাকে চুমু খাব না। শেরাজ খান যেখানে সেখানে রোমান্স করেনা।”
“তাহলে আপনি যে বললেন, কিছু একটা করতে ইচ্ছা করছে, তাহলে সেটা কি?”
“তোমাকে কোলের ওপর বসিয়ে লজ্জা দিতে ইচ্ছা করছে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল শেরাজের দিকে। শেরাজ পুনরায় বলল,
“এখন তোমাকে কোলের ওপর বসালে আমার গাড়ি ড্রাইভ করা বাদ দিয়ে অন্য কিছু ড্রাইভ করতে ইচ্ছা করবে। তাই আপাতত কোলের ওপর বসালাম না। অ্যান্ড মোস্ট ইমপর্টেন্ট, তোমাকে তো সবার আগে আমার টাচের যোগ্য হতে হবে, আর তাই এই ইচ্ছাটাকে দমিয়ে রাখলাম।”
সুমু একটু চেঁচিয়ে বলল,
“চুপ করুন।”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“চুপ করলে তোমাকে লজ্জা দিবো কি করে, সুইটহার্ট?”
“আমাকে লজ্জা দিয়ে কি পান আপনি?”
“শান্তি। তোমার লজ্জামাখা মুখটা দুনিয়ার সবথেকে বেশি লোভনীয়, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, আবেদনময়ী জিনিস। যেটা দেখলে এই শেরাজ খান শান্তি পায়।”
একটু থামল শেরাজ। হ্যান্ড ঘড়ি থেকে সময়টা চেক করল সে। সুমু জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে বলল,
“স্টপ দ্যা কার, খান সাহেব।”
“হোয়াই?”
“প্লিজ! থামান।”
শেরাজ ব্রেক কষলো। গাড়ি থামাতেই সুমু গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। পুরো রাস্তা শুনশান। সুমু পায়ের থেকে জুতা খুলে গাড়িতে রাখতে যেতেই শেরাজ জুতো জোড়া সুমুর হাত থেকে নিয়ে নিল। সে বা’হাতে জুতো জোড়া ধরে ডান হাত দিয়ে সুমুর হাত ধরে আস্তে আস্তে সামনের দিকে হাঁটা ধরল। দুজনেই হেঁটে গাড়ি থেকে অনেকটা দূরে চলে এলো। আচমকাই সুমুর একটা আজব আবদার মাথায় আসলো। সে হাঁটা বাদ দিয়ে শেরাজের দিকে ঘুরে তাকাল। সুমুর তাকানো দেখে শেরাজের আর বুঝতে বাকি নেই যে, তার প্রেয়সীর এমন করে তাকানোর মানে কি। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে সুমু এখন কিছু একটা চাইবে। সুমু কিছু বলার আগেই শেরাজ বলল,
“বলে ফেলো, কি বলতে চাও?”
সুমু ঘনঘন কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটে বলল,
“আমার অনেক ইচ্ছা নিজের প্রিয় মানুষটার সাথে কোনো এক জ্যোৎস্না রাতে, ফাঁকা শুনশান রাস্তায় হাত ধরে হাঁটব আর ড্যান্স করব। ওই যে একটা ভিডিও আছে না, দুজন ভালোবাসার মানুষ রাতের বেলায় একসাথে ড্যান্স করে। ওই যে ওই গানটা। ওয়েট আপনাকে দেখাই, ফোনটা বের করুন।
শেরাজ কোনো কথা ছাড়াই পকেট থেকে ফোনটা বের করে সুমুর হাতে দিল। সকালেই রাহিন আর স্যান্ডিকে দিয়ে নতুন ফোন আনিয়েছে শেরাজ। সুমু ইউটিউব থেকে ভিডিওটা সার্চ করে শেরাজকে দেখাল। ভিডিওটা দেখে শেরাজ বলল,
“তুমি জীবনটাকে সিনেমার মতো ভাবো, সুইটহার্ট?
সুমু একটু উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“জীবনটা কি কখনও সিনেমার মতো হয়, খান সাহেব? যারা অভিনয় করে মানে সিনেমার হিরো-হিরোইনরা, তাদের আসল জীবনটাও তো সিনেমার মতো হয়না। কিন্তু, আমার জীবনের একটা ঘটনা সিনেমায় মতো ঘটেছে।”
“কোন ঘটনা, সুইটহার্ট?”
“আপনাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসাবে পাওয়ার ঘটনাটা।”
শেরাজ আলতো হেসে সুমুর দেখানো ভিডিওটা আবারও দেখল। সে ফুল গানটা অডিও ডাউনলোড করল। গানটা প্লে করে ফোনটা পকেটে রেখে সুমুর হাত ধরে রাস্তার মাঝে নিয়ে এলো। সুমুর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি তোমার কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখবো না, সুইটহার্ট। হোক সেটা সিনেমাটিক, তবুও পূরণ করব। স্বপ্ন দেখার আর আবদার করার অধিকার শুধু তোমার। আর সেগুলো নিখুঁতভাবে পূরণ করার দায়িত্ব শুধু আমার।”
কথাগুলো বলেই এই ফাঁকা শুনশান রাস্তার মধ্যে শেরাজ সুমুর সাথে ড্যান্স করতে শুরু করল। গানের প্রথম কলি শেষ হতেই শেরাজ সুমুর কোমর ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। লম্বায় সুমু শেরাজের কাঁধ সমান। সে পা উঁচু করে শেরাজের গলা সমান হতেই শেরাজ তার কোমর ধরে উঁচু করে নিজের দু’পায়ের ওপর তার দু’পা রাখলো। সুমু দু’হাত দিয়ে শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরল। দুজনে কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল। দুজনের কানের ভেসে এলো গানের মিষ্টি একটা লাইন।
“ইয়ে কেয়া বাত হ্যায় আজ কি চান্দনি মেঁ
কে হাম খো গেয়ে প্যায়ার কি রাগিনী মেঁ
ইয়ে বাহোঁ মেঁ বাহেঁ
ইয়ে বেহেকি নিগাহেঁ
লো আনে লাগা জিন্দেগি কা মজা
ইয়ে রাতেঁ, ইয়ে মওসাম, নদী কা কিনারা
ইয়ে চাঞ্চাল হাওয়া!”
গানের লাইনটা শুনে শেরাজ নিঃশব্দে দুষ্টু হেসে বলল,
“ওয়ান ডে! মিক্সসিং আওয়ার ড্রিংকস, মিক্সসিং আওয়ার মিউজিক টেস্ট,
মিক্সসিং আওয়ার লিপস্,
মিক্সসিং আওয়ার হ্যান্ড,
মিক্সসিং আওয়ার বডি,
এন্ড মিক্সসিং আওয়ার স্পার্ম।”
কথাগুলো সুমুর কানে পৌঁছাতেই চোখ মেলে তাকাল সে। শেরাজের পায়ের ওপর থেকে নেমে কোমরে দুইহাত বেঁধে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি সবসময় আমাকে লজ্জায় ফেলেন। আপনি… আপনি একটা অসভ্য, ফাজিল, নষ্ট পুরুষ। সবসময় ছিঃ মার্কা কথা আপনার ঠোঁটের আগায় লেগেই থাকে।”
কথাগুলো বলে সুমু রাস্তার ওপর থেকে জুতো জোড়া পরে নিলো। তাড়াহুড়ো করে হেঁটে যেতেই রাস্তার ওপর পরে থাকা ইটের টুকরোতে লেগে সে পড়ে যেতে নিলেই শেরাজ ধরে নিল থাকে। সুমু পড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গেলেও তার জুতো জোড়া ছিঁড়ে গেল। শেরাজ লাথি মেরে জুতো জোড়া রাস্তার বাহিরে ফেলতে নিলে, সুমু তাকে বাধা দিয়ে বলল,
“এই জুতো জোড়া ফেলবেন না, খান সাহেব। আমার খুব পছন্দের এই জুতো জোড়া।”
শেরাজ জুতো জোড়া পুনরায় হাতে তুলে নিয়ে সুমুকে কোলে তুলে নিল। দু’পা এগিয়ে যেতেই কি যেন মনে করে আবারও দাঁড়িয়ে পড়ল সে। হাত থেকে সুমুর জুতো জোড়া ফেলে দিল রাস্তার ওপর। জুতো জোড়া ফেলে দেওয়াতে সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তো বললাম খান…”
কথাটা শেষ করার সময় দিল না শেরাজ। সে সুমুর ওষ্ঠ নিজের দখলে নিয়ে নিল। সুমু কোলের মধ্যে একটু নড়েচড়ে উঠতেই শেরাজ সুমুর ওষ্ঠ ছেড়ে দিয়ে বলল,
“ডিস্টার্ব করে না, সুইটহার্ট। ডোন্ট মুভ। আর মাত্র দু’মিনিট, প্লিজ। আই প্রমিজ, দশ সেকেন্ডের মধ্যে আর একবারও তোমাকে টাচ করব না।
সে আবারও সুমুর ওষ্ঠ নিজের দখলে নিল। নিজের মর্জি মতো সুমুর ওষ্ঠের ওপর নিজের রাজত্ব চালিয়ে ছেড়ে দিল সুমুর ওষ্ঠ। একটু ঝুঁকে আবারও সুমুর জুতো জোড়া হাতে তুলে নিয়ে সামনে এগিয়ে চললো। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি না তখন গাড়ির ভেতর বললেন, আপনি যেখানে সেখানে রোমান্স করেন না। তাহলে মাত্র এইটা কি ছিল?”
“এইটা সত্যি যে, আমি যেখানে সেখানে রোমান্স করিনা। তবে চোখের সামনে এতো কড়া ডোজের নেশালো আফিম থাকলে, আমি নিজের রুলস ব্রেক করে যেখানে সেখানে রোমান্স করতে বাধ্য হই।”
“তাই বলে, এই রাস্তার মধ্যে আপনি এইসব করবেন?”
“আই কুড নট কান্ট্রোল মাইসেলফ, সুইটহার্ট। তোমার ঠোঁট জোড়া আফিমের মতো টানছিল আমাকে।”
“আপনি একটা…”
“এমন সুন্দর রোমান্টিক নাইটে, চোখের সামনে তোমার মতো এতো কড়া ডোজের অ্যালকোহল থাকলে আমি একটুখানি টেস্ট করতেই পারি। এইটা আমার জন্য মাত্রই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।”
“আপনি যে বললেন, দশ সেকেন্ডের মধ্যে আর আমাকে টাচ করবেন না। তা কোলের ওপর রেখে আপনি বুঝি আপনার করা প্রমিজ রাখছেন?”
“আহ, সুইটহার্ট! প্রমিজ করা কথা তো এখনো শুরু হয়নি। তোমাকে গাড়িতে বসানোর পর শুরু হবে। দেখেছো, তোমার জন্য আমি কতো বড় স্যাক্রিফাইস করলাম। পুরো দশ সেকেন্ড আমি তোমাকে টাচ করব না। এই সুইটহার্ট! দশ সেকেন্ড অনেক বেশি হয়ে যায়। পাঁচ সেকেন্ড করি, হ্যাঁ?”
সুমু রাগী লুকে তাকিয়ে একটু চেঁচিয়ে বলল,
“আপনাকে কে বলেছে এতোবড় স্যাক্রিফাইস করতে? এতোবড় স্যাক্রিফাইস করে তো আপনি আমাকে উদ্ধার করে দিবেন।”
“আচ্ছা, দশ সেকেন্ডই থাক। আমি না হয় একটু কষ্ট করে সহ্য করে নিব।”
সুমু আর কিছু বলল না। সে জানে, এই লোকটা মুখ খুললেই ছিঃ মার্কা কথা ছাড়া ভালো কোনো কথা বলেনা। এই ভেবে সুমু চুপচাপ শেরাজের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল। শেরাজ আলতো হেসে তাকে নিয়ে এগিয়ে চললো গাড়ির দিকে।
সিকদার বাড়িতে আজ আবারও রান্নার ধুম পড়েছে। আনোয়ার সিকদারের মেয়ে জামাই আজ আসবে আজ। তবে এতো এতো মেনু সব করা হচ্ছে সুমু আর শেরাজের জন্য। কাল অনেক রাত করে ফিরেছে রাহিনরা। সুমুর বিয়ের দিন এতো কান্ড ঘটাতে কেউ খুব একটা আনন্দ করতে পারেনি, আর খাওয়া দাওয়া তো কারোই ঠিকমতো হয়নি। তাই আজ সকাল সকাল আনোয়ার সাহেব, রিসাত সাহেব আর শামীম সাহেব মিলে জমিয়ে বাজার করে এনেছেন। হাসি বেগম আর মিনা বেগম আজ মেয়ে জামাই আসছে শুনে দুজনেই রান্না খুশি মনে জমিয়ে করছেন। আর তিনদিন পর রিসাত সাহেব আবারও দুবাইতে ফিরে যাবেন বলে খুশি বেগমও রান্নাতে হাত লাগিয়েছেন। বলা যায় এখন ভাবি, ননদরা মিলে জমিয়ে রান্না করছেন।
শেরাজরা কেউ বাসায় নেই। সকলে মিলে কোথাও একটা বেরিয়েছে। সুমু বেডের ওপর শুয়ে গল্প লেখায় ব্যস্ত। হঠাৎ কিছু একটা মনে করে টাইপিং বন্ধ করে দিল সে। বেড ছেড়ে উঠে দরজাটা আস্তে ভেজিয়ে দিয়ে আবারও ফোনটা হাতে নিয়ে ইউটিউবে ঢুকে “তেরে লিয়ে” গানটা প্লে করল। ওড়নাটা কোমরে বেঁধে ড্যান্স শুরু করল রুমের মধ্যে। সে তার খান সাহেবকে পেয়ে যাওয়ার উপলক্ষ্যে, এইটা তার একার সেলিব্রেশন।
হঠাৎ শেরাজ রুমের মধ্যে ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। রুমের বাহির থেকে আস্তে করে দরজাটা ঠেলে উঁকি দিয়ে সুমুর কান্ড দেখে কপাল কুঁচকে ফেললো সে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ত্রিশ সেকেন্ডের একটা ভিডিও ক্লিপ নিল। গানটা অর্ধেক হতেই রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দরজার সাথে কাঁধ হেলিয়ে দুইহাত বুকের ওপর বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল সে। সুমু এখনও খেয়াল করেনি শেরাজকে। হঠাৎ ড্যান্স করতে করতে আয়নার দিকে চোখ পড়তেই চোখ কপালে উঠল সুমুর। তাড়াতাড়ি করে কোমর থেকে ওড়না খুলে গায়ে জড়িয়ে গানটা বন্ধ করে দিল। শেরাজ দু’হাত পকেটে গুঁজে ধীর পায়ে হেঁটে সুমুর পেছনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“এই অসময়ে এইভাবে ড্যান্স কেনো করছো তুমি?”
সুমু শেরাজের দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“সেলিব্রেশন করছিলাম” খান সাহেব।”
“কিসের সেলিব্রেশন?”
“আপনাকে নিজের বেটার হাফ হিসাবে পেয়ে যাবার সেলিব্রেশন।”
“তাহলে তো আমারও সেলিব্রেশন করা উচিত। আর এমন হট, রোমান্টিক একটা গানে তুমি একা ড্যান্স করছো কেনো?”
“তাহলে পার্টনার কই পাবো? আপনি তো বাসায় ছিলেন না। আর এই সেলিব্রেশন একান্তই আমার।”
শেরাজ পকেট থেকে ডান হাতটা বের করে সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ক্যান আই বি ইওর ডান্স পার্টনার, ম্যাম?”
সুমু শেরাজের হাতের ওপর হাত রেখে মুচকি হেসে বলল,
“অফ কর্স! ছিরফ অ্যাছে নেহি, আপকো তো ম্যা আপনে ইশারো পার ভি নাচাউংগী।”
সুমুর কথায় শেরাজ মুচকি হেসে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“অর ম্যা আপকো আপনে বেড পার।”
শেরাজের শেমলেস, অসভ্যমার্কা কথাশুনে সুমু এখন আর অবাক হলো না। বরং গায়ে জড়ানো ওড়নাটা সুন্দর করে মাথায় দিল। একটা চুলও যাতে না দেখা যায় এমনভাবেই ওড়নাটা মাথায় দিয়ে বলল,
“আস্তাগফিরুল্লাহ্!”
সে দু’হাত দিয়ে মোনাজাত ধরে রুমের ছাদের দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,
“হে আল্লাহ্! তুমি তোমার সকল বান্দাকে হেদায়েত দান করো, আমিন।”
কথাটা বলেই সে শেরাজের দিকে তাকাল। আচমকাই শেরাজকে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে দেখে এক ছুট্টে সে বের হয়ে গেল রুম থেকে। শেরাজ আলতো হেসে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
ডাইনিং টেবিলে সকলে উপস্থিত। আজ দুই মেয়ে জামাইকে বসিয়ে খাওয়ানো হবে। শেরাজ আর নয়ন! আনোয়ার সাহেব, রিসাত সাহেব, শামীম সাহেব আর ইফতিয়াক সাহেবকে জোর করে বসিয়েছে তাদের সাথে। আইয়ুব, সামিয়ারা পরে খাবে বলেছে। ইফতিয়া, রাইশা, তিশা আর রাইফও বসেছে সুমুদের সাথে। রাইফ আর তিশা খাবার নিয়ে সোফায় চলে গেছে। তারা দুজন টিভি দেখবে আর খাবে। শেরাজের পাশে সুমু, সুমুর পাশে মাইশা, আর মাইশার পাশে নয়ন বসেছে। শেরাজের মুখোমুখি ইফতিয়া বসেছে আর সুমুর মুখোমুখি রাইশা।
দুই জামাইয়ের সব পছন্দের খাবার রান্না করা হয়েছে আজ। হাসি বেগম আর মিনা বেগম খাবার পরিবেশন করছেন। খুশি বেগম সোফায় বসে আছেন। হঠাৎ ইফতিয়া পা দিয়ে শেরাজের পায়ে খোঁচা মারল। সে কাজটা এতো তাড়াতাড়ি করল, আর মুখের ভাবটা এমন করে খাচ্ছে যাতে শেরাজ আন্দাজ না করতে পারে খোঁচাটা কে মেরেছে। কিন্তু শেরাজের কোনো রিয়েকশন না পেয়ে ইফতিয়া মাথা তুলে তাকাল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার সে শেরাজকে দেখে তেমন কিছুই বুঝল না। সে মনে মনে খুশি হলো এই ভেবে যে, শেরাজ কিছুই বুঝতে পারেনি। সে আবারও একি কাজ করতেই হঠাৎ সুমু উঠে দাঁড়িয়ে হাসি বেগমের ওপর একটু চেঁচিয়ে বলল,
“মুরগিটা কে রান্না করেছে” আম্মু?”
“আমি! কেনো কি হয়েছে?”
“তুমি জানোনা আমি মুরগিতে বেশি ঝাল খাই। আজ মুরগি রান্নাটা একটুও ভালো হয়নি। আমি আর খাব না।”
হাসি বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“আজ সকলে খাবে বলে ঝাল কম দিয়েছি। একদিন একটু ঝাল কম হয়েছে বলে তুই না খেয়ে রাগ করে উঠে যাবি?”
“হ্যাঁ, যাব আম্মু! খাবারে আমার পছন্দম তো স্বাদ না হলে, ওই খাবার খাওয়া আর না খাওয়া সমান আমার কাছে।”
কথাগুলো বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সুমু। ইফতিয়া সুমুকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বলল,
“কোন রাজার ঘরের মেয়ে রে তুই? তোর এতো ন্যাকামি মার্কা রাগ আসে কোথা থেকে? কে সহ্য করবে তোর এই রাগ? কেউ সহ্য করবেনা।”
সুমু বাঁকা হেসে বলল,
“ওহ, রিয়েলি?”
সুমু আর কিছু না বলে প্লেট থেকে মুরগির লেগপিচটা হাতে তুলে নিয়ে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই শেরাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“রাজার ঘরের মেয়ে না হলেও, কোনো এক রাজার একমাত্র রাণী ও। এখন, তোমাকে হয়তো আবার আমার এইটা বলে দিতে হবেনা যে, কোন রাজার রাণী ও । আর তুমি হয়তো জানোনা হয়তো, প্রতিটি বাবার কাছে তার মেয়েরা রাজকন্যা হয়।”
কথাগুলো শুনে সুমু মুচকি হেসে হাঁটা ধরল। শামীম সাহেব শেরাজকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বলল,
“তুমি উঠলে কেনো? তুমি বসো।”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“আসলে আব্বু! বউ রাগ করে, না খেয়ে চলে যাচ্ছে। তো একজন ভালো স্বামী হিসাবে এখন আমার উচিত তার রাগ ভাঙিয়ে, তাকে নিজের হাতে মুরগির মাংস ঝাল ঝাল করে রান্না করে খাওয়ানো।”
শামীম সাহেব থমকে গেলেন। হাসি বেগম পানি এগিয়ে দিলেন। আনোয়ার সাহেবরা এমন ভাবে খেয়েই চলেছেন, যেন তারা এতোক্ষণের বলা কোনো কথায় শোনেনি। সুমু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে শেরাজের কথা শুনে অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করল না।
শেরাজ ছুঁটল সুমুর পিছু পিছু। সুমু সিঁড়ি বেয়ে করিডরে পা রাখতেই ঘাড় বাঁকিয়ে ইফতিয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। শেরাজ ছুটে এসে সুমুর হাত ধরে হাসি বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,
“ফ্রিজে আর চিকেন আছে, আম্মু?”
হাসি বেগম মৃদু হেসে বললেন,
“তোমাকে কিছু করতে হবেনা, বাবা। আমি ওর জন্য আবারও মাংস রান্না করে আনছি।”
“না আম্মু! রাগ যেহেতু আমার বউ করেছে, সেহেতু আমার বউয়ের রাগ আমি ভাঙাব। আপনি শুধু বলুন চিকেন আছে কিনা?”
“হ্যাঁ বাবা! আছে।”
“ওকে, ধন্যবাদ আম্মু!” সে সুমুর দিকে তাকিয়ে সুমুর হাত টেনে বলল,
“চলো কিচেনে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনাকে রান্না করতে হবেনা।”
“চুপ! চলো কিচেনে।”
“আপনি রান্না করতে পারেন?”
“শেরাজ খান পারেনা এমন কিছু এই দুনিয়াতে নেই। আর এই মডার্ন যুগে এসে কিছু আগে থেকেই শিখতে হয়না। একটু একটু আইডিয়া আছে আর বাকিটার জন্য ইউটিউব আছে।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে কিচেনে নিয়ে গেল। বড়রা বাদে ছোটরা সকলে আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল। আনোয়ার সাহেবরা খেয়ে ওপরে চলে গেলেন।
মাইশা নয়নের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“দেখো, কীভাবে বউয়ের রাগ ভাঙাতে হয়, বউকে ভালোবাসতে হয়। দেখো, দেখে কিছু শিখো।”
নয়ন চাঁপাস্বরে বলল,
“আমি তোমাকে আমার মতো করে ভালোবাসি, বউ। চলো, এবার বাসায় ফিরে আমি তোমাকে মুরগি, মাছ, ডিম সব রান্না করে খাওয়াব।”
মাইশা মুখ বাঁকিয়ে খাওয়ায় মন দিল। নয়ন হতাশ হয়ে একপলক মাইশার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেও খাওয়াতে মন দিল।
শেরাজ ফ্রিজ থেকে চিকেন বের করে রাখল। সুমু কাজে হাত লাগাতে গেলে শেরাজ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। কিছুতে হাত লাগাবে না।”
সুমু বাধ্য হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ইফতিয়া খেয়ে ওপরে চলে গেলো সুমু ইফতিয়াকে চলে যেতে দেখে বলল,
“আপনি রান্না করুন। আমি ওয়াশরুম থেকে এক্ষুনি আসছি।”
শেরাজ সম্মতি দিতেই সুমু রান্নাঘর ছেড়ে ওপরে চলে এলো। সে ইফতিয়ার রুমের সামনে এসে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। ইফতিয়া বিছানার ওপর আধশোয়া হয়ে ফোনে স্ক্রল করছিল। সুমুকে রুমে আসতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুই এইঘরে কেনো এসেছিস? তোর জন্য তো তোর খান সাহেব এখন ঝাল ঝাল করে মুরগি রান্না করছে। সেটা রেখে এখানে কেনো এলি?”
সুমু বাঁকা হেসে বলল,
“তোকে একটু দেখতে এসেছি। কতোদিন তোকে দেখিনা বল তো?”
ইফতিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সুমুর কথার মানে সে বুঝতে পারল না। সুমু আচমকাই ইফতিয়ার ফোনটা নিয়ে নিল। ইফতিয়া কিছু বলার আগেই সুমু বলল,
“ভয় নেই। তোর সিক্রেট কিছু দেখব না। শুধু একটা গান প্লে করব।”
কথাগুলো বলে সুমু একটা গান প্লে করল। সে ফোনটা আবারও বিছানার ওপর রেখে আরও এগিয়ে গেল ইফতিয়ার কাছে। হঠাৎ ইফতিয়ার দু’পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে মোচড় দিতেই ইফতিয়া চিৎকার করতে নিল। সুমু তার বা’হাত দিয়ে ইফতিয়া ডান হাত মুচড়ে ধরে ইফতিয়ার পিঠের সাথে লাগিয়ে ডান হাত দিয়ে ইফতিয়ার মুখ চেপে ধরল। গানের আওয়াজ আর মুখ চেপে ধরাতে ইফতিয়ার চিৎকার বাহির পযর্ন্ত গেল না।
সুমু বাঁকা হেসে অগ্নি চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমার খান সাহেবকে স্পর্শ করার খুব শখ তোর তাই না? লজ্জা নেই তাই না তোর?”
ইফতিয়ার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ে সুমুর হাত ভিজে যাচ্ছে। সুমু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমার খান সাহেবের দিকে চোখ তুলে তাকালে, তোর চোখ আমি তুলে নেব। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ। তোর মতো কাল নাগিনদের নজর থেকে আমার খান সাহেবকে বাঁচাতে আমি আমার জান দিতেইও পারব, আবার হাজারো জান নিতেও পারব। মাইন্ড ইট।”
সুমু ধাক্কা মেরে ছেড়ে দিল ইফতিয়াকে। সে চলে যাবার জন্য পা বাড়িয়ে আবার দাড়িয়ে পড়ল। ইফতিয়ার দিকে আবারও আঙুল তাক করে বলল,
“আমার খান সাহেবের সাথে আর কোনোদিনও এই ধরনের অসভ্যতামি করতে আসলে, আমার হাতের প্রথম খুনটা তুই হবি।”
কথাগুলো বলে সে হনহনিয়ে চলে গেল রুম থেকে। বিছানার ওপর বসে ইফতিয়া কাঁদতে লাগল। রাগ, ব্যথা একসাথে চোখের পানির সাথে বের করতে লাগল সে।
রান্নাঘরে এসে সুমু দেখল, শেরাজ পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে নাকে জলে চোখের জলে এক করেছে। সে হেসে শেরাজের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই শেরাজ বলল,
“পা-টা পুরো ভেঙে দিয়ে এসেছেন, সিংহিনী? নাকি এখনো পা-টা ঠিক আছে?”
সুমু শেরাজের হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে পেঁয়াজ কাটতে কাটতে বলল,
“রান্নার দিকে ফোকাস করুন, খান সাহেব। এই ব্যাপারটায় ফোকাস আপনার না করলেও চলবে।”
শেরাজ মুচকি হেসে সুমুর পেছনে দাঁড়িয়ে তার দু’হাতের ওপর হাত রাখল। সুমু মুচকি হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তার খান সাহেবকে দেখে নিল। শেরাজ আলতো হেসে সুমুর গালে একবার ঠোঁট ছুঁয়ে দুজনে একসাথে পেঁয়াজ কাটল। একে একে সব কিছু কেটে নিয়ে রান্না বসাল শেরাজ। সুমু তার পাশে দাঁড়িয়ে আপেল খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে শেরাজকে রান্নার মধ্যে বিরক্ত করছে। সুমুর জ্বালাতন হাসি মুখে সহ্য করতে করতে রান্না শেষ করল সে। রান্না শেষ করে একটা বাটিতে মাংস তুলে নিল। তারপর সুমুর হাত ধরে ডাইনিংয়ে নিয়ে এলো। ডাইনিংয়ে এখন ইফতিয়া, রাইশা আর বড়রা বাদে বাকি সকলে উপস্থিত। হাসি বেগম সকলকে খাবার পরিবেশন করে উপরে চলে গেছেন।। শেরাজ সুমুকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসল। তারপর মাংসের একপিছ সুমুকে খাইয়ে দিল। সকলে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। সুমু মাংসের টুকরোটা খেয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
খান সাহেব পর্ব ২৪
“ডেলিশাস!”
শেরাজ হাসল সুমুর কমপ্লিমেন্ট শুনে। রাহিনরা আর ধৈর্য্য ধরতে পারল না। তারা রান্নাঘর থেকে শেরাজের বাকি রান্না করা চিকেনটুকু এনে সকলে খেতে শুরু করল। সকলে খেয়ে খুব ভালো ভালো রিভিউ দিল, সেই সাথে শেরাজের পিছনে লাগল। সুমু, সামিয়া, নাজমিন, তিশা, মাইশা, রাইফ হাসতে লাগল ওদের দুষ্টুমি দেখে।
