খান সাহেব পর্ব ২৬
সুমাইয়া জাহান
বিকালের মিষ্টি রোদ পরিবেশটাকে আরও মিষ্টি করে তুলেছে। সুমু ছাদে মাদুর বিছিয়ে পেনসিল, পেপার নিয়ে বসেছে। মন তার ছবি আঁকাতে। খুব মন দিয়ে সে স্কেচ করছে, তার খান সাহেবের স্কেচ। শেরাজ ফোনে কথা বলতে বলতে ছাদে এলো। সুমুকে ছাদে দেখে দাঁড়িয়ে গেল সে। কল কেটে নিঃশব্দে হেঁটে এসে সুমুর পাশে বসল। পাশে কারও উপস্থিত টের পেয়ে সুমু ঘাড় কাত করে তাকাল। পাশে শেরাজকে বসে থাকতে দেখে মুচকি হেসে আবারও স্কেচে মন দিল। শেরাজ একটু ঝুঁকে স্কেচটা ভালো করে দেখে বলল,
“তুমি খুব সুন্দর স্কেচ করো, সুইটহার্ট। তবে আমি তোমার থেকেও বেশি সুন্দর করে স্কেচ করতে পারি।”
সুমু অবাক হয়ে তাকাল শেরাজের দিকে। সে আলতো হেসে বলল,
“আপনি সত্যি স্কেচ করতে পারেন?”
“ইয়েস সুইটহার্ট!”
সুমু, শেরাজের দিকে একটা পেপার আর পেনসিল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ওকে, তাহলে এই নিন পেপার, পেনসিল। একটা সুন্দর স্কেচ বানান তো দেখি।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল পেপার, পেনসিলের দিকে। তারপর সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এইসব নরমাল, সস্তা পেপার, পেনসিল দিয়ে আমি স্কেচ বানাইনা।”
“ওহ, আচ্ছা তাই? তাহলে কতোটা এক্সপেনসিভ পেপার, পেনসিল দিয়ে আপনি স্কেচ বানান শুনি?”
“উমম! শুনতে চাও?”
“হ্যাঁ! বলুন। সেগুলো কেমন পেপার, পেনসিল যেগুলো দিয়ে আপনি স্কেচ বানান?”
“আমার জন্য এক্সপেনসিভ পেপার হলো, তোমার এই সুন্দর দেহটা আর এক্সপেনসিভ পেনসিল হলো, আমার এই সুন্দর দাঁতগুলো। যেগুলো দিয়ে আমি খুব সুন্দর স্কেচ বানাতে পারি। বিশ্বাস না হলে একবার সুযোগ দাও, স্কেচ বানিয়ে দেখাচ্ছি।”
সুমু কপাল কুঁচকে একটু উচ্চস্বরে বলল,
“অসভ্য, নির্লজ্জ পুরুষ। আপনার মুখে কখনও ভালো কথা আসেনা, তাই না?”
“আসে তো সুইটহার্ট। শুধু তোমাকে দেখলেই আমার সভ্য মুখটা অসভ্য কথা বলতে শুরু করে।”
সুমু পাশ থেকে রঙের কৌটা থেকে রং নিয়ে শেরাজের গালে লাগিয়ে দিয়ে বলল,
“তাহলে আপনার এই অসভ্য মুখটা বন্ধ রাখুন।”
শেরাজ সুমুর কথায় পাত্তা না দিয়ে আস্তে আস্তে নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে গেল সুমুর দিকে। সুমু কোমর বাঁকা করে নিজের মুখ সরিয়ে নিতে লাগল। শেরাজ একহাতের সাহায্যে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে সুমু কাছে টেনে আনল। সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“দেখুন, খান সাহেব! এইটা কিন্তু ছাদ। এখানে দুষ্টুমি…”
সুমু কথাটা শেষ করার আগেই শেরাজ তার গালে লেগে থাকা রঙ সুমুর গালে লাগিয়ে দিল। সুমু বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল দূরের আকাশের দিকে। শেরাজ তার মুখটা সরিয়ে আনতেই সুমু ঠোঁট ফুলিয়ে তাকাল তার দিকে। শেরাজ আলতো হেসে তার কানে কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ইউ আর মাই পার্সোনাল প্রপার্টি, তাই তোমার সাথে আমি যা খুশি করতে পারি। যা খুশি বলতে পারি। আমি তোমার কাছে সবসময় নষ্ট, অসভ্য, নির্লজ্জ পুরুষ হয়েই থাকতে চাই। বউয়ের সামনে যে পুরুষ অসভ্য, নির্লজ্জ, নষ্ট পুরুষ হয়না, সেই পুরুষ তো কোনো পুরুষই না। নির্লজ্জতার কিছুই দেখোনি এখনও। সঠিক সময় আসুক, আমি তোমাকে লাইভ দেখাব নির্লজ্জতা কাকে বলে।”
সে পাশ থেকে একটা পেন নিয়ে সুমুর হাত টেনে তার হাতে নিয়ে, সুমুর হাতের তালুর ওপর বড় বড় করে লিখে দিল,
“শেরাজ’স ওয়াইফি”
“পার্সোনাল প্রপার্টি অফ শেরাজ খান”
হঠাৎ ছাদের দরজায় কেউ নক করতেই সুমু শেরাজের থেকে একটু দূরে গিয়ে বসল। মাইশা হাসি মুখে এগিয়ে এলো ওদের দিকে। শেরাজ উঠে ফোনে স্ক্রল করতে করতে ছাদ ত্যাগ করল। মাইশা এসে সুমুর পাশে বসে বলল,
“কি? বরের স্কেচ তৈরি করা হচ্ছে?”
“হ্যাঁ আপু! অনেকদিন আঁকাআঁকি করা হয় না, তাই আজ একটু চর্চা করে দেখলাম।”
“আচ্ছা শোন! তোর ভাইয়া বলেছে, রাত নয়টার দিকে আমাদের সবাইকে নিয়ে ফুচকা খেতে বেরোবে। শেরাজ ভাইয়াকে বলিস। আর শোন! সুন্দর একটা শাড়ি পরিস। আমিও পরব।”
“কিন্তু আপু…”
“কেনো কিন্তু নয়, সুমু। দু’বোন একসাথে জামাই নিয়ে ফুচকা খেতে বের হবো। নয়টার মধ্যে রেডি থাকিস কেমন?”
“আচ্ছা, আপু!”
“তাহলে এখন রুমে যা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এখন আর ছাদে থাকিস না।”
কথাগুলো বলে মাইশা চলে গেল। সুমুও সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ছাদ ত্যাগ করল। সে নিঃশব্দে রুমের মধ্যে ঢুকে পেপার, পেনসিল টেবিলের ওপর রাখল। শেরাজ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। সে সুমুকে খেয়াল করেনি। সুমু চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এলো। রান্নাঘরে গিয়ে নিজ হাতে সকলে জন্য চা বানাল। সকলকে চা দিয়ে দু’কাপ চা নিয়ে আবারও ওপরে চলে এলো। রুমে ঢুকে বেলকনিতে গিয়ে শেরাজের মুখের সামনে চা ধরল। কলটা কেটে চায়ের কাপটা হাতে নিল শেরাজ। বেলকনিতে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসে সুমুকে আস্তে করে টেনে নিজের কোলের ওপর বসাল। নিজের হাতে থাকা চায়ের কাপটা সুমুর মুখের সামনে ধরল। সুমু মুচকি হেসে চায়ের কাপে চুমুক বসাল। শেরাজ আলতো হাসল। সে সুমুর মুখের সামনে থেকে চায়ের কাপ সরিয়ে নিজে চুমুক বসাল। সুমু টেবিল থেকে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে বলল,
“নিচে যাবেন না?”
“না!”
“কেনো?”
“এমনি!”
“সকলে নিচে আছে। শুধু আমরা দুজন ওপরে। চলুন নিচে যাই।”
“আমার একটু কাজ আছে, সুইটহার্ট।”
“ওকে, তাহলে আমি নিচে যায়। আপনি কাজ করুন।”
সুমু উঠে যেতে নিলে শেরাজ আবারও সুমুকে টেনে কোলের ওপর বসিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুমি এখন কোথাও যাবে না, এখানেই থাকবে। আমরা নতুন কাপল। আমরা নিচে না গেলে কেউ কিছু মনে করবে না। আর না আমাদের কেউ ডাকতে আসবে।”
“কিন্তু, আপনি তো এখন কাজ করবেন বললেন?”
“হুম! কিন্তু আগে বউ, তারপর কাজ। এখন তুমি এখানে চুপ করে বসে থাকো।”
সুমু শেরাজের বুকে মাথা রাখল। সে শেরাজের পারফিউমের গন্ধ বুক ভরে টেনে নিল। হঠাৎ কি মনে করে মাথা তুলে তাকাল সুমু। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“টি-শার্ট খুলুন।”
শেরাজ অবাক হলো সুমুর এমন কথায়। সে দুষ্টু হেসে বলল,
“সুইটহার্ট! তুমি আমার বডি দেখতে চাইছো, সেটা আগে বলবেনা।”
“বাজে কথা বলা বন্ধ করে, খুলুন। আমি আপনাকে অন্য একটা টি-শার্ট এনে দিচ্ছি। এইটা খুলুন।”
শেরাজ আর কোনো কথা না বলে টি-শার্ট খুলতে নিলে সুমু শেরাজকে থামিয়ে বলল,
“আমাকে একটু ছাড়ুন। আমি আরেকটা টি-শার্ট নিয়ে আসি।”
শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিতেই সুমু উঠে গিয়ে আরেকটা টি-শার্ট নিয়ে এলো। শেরাজ জ্যাকেট খুলে টি-শার্ট খুলে সুমুর হাতে দিল। সুমু মাত্র আনা টি-শার্ট শেরাজের হাতে দিলো। টি-শার্ট পরে শেরাজ জ্যাকেটটাও ওপরে পরে নিল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচাতেই সুমু বলল,
“আপনি একটু বসুন। আমি এক্ষুনি আসছি।”
“কিন্তু, কোথায় যাচ্ছো?”
“আসছি এক্ষুনি। বসুন আপনি।”
শেরাজের পরিহিত টি-শার্ট নিয়ে সুমু রুমে চলে গেল। শেরাজ ফোনে মন দিল। পাঁচ মিনিট বাদে সুমু এসে শেরাজের সামনে দাঁড়াল। শেরাজ ফোন থেকে চোখ সরিয়ে আস্তে আস্তে সুমুর পা থেকে মাথা পযর্ন্ত তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
সুমুর পরনে শেরাজের টি-শার্ট। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে ঘন ঘন চোখের পল্লব নাড়তে নাড়তে ঘাড় কাত করে ভ্রু নাচাল। ঠোঁটে তার লেগে আছে দুষ্টু হাসি। শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সে হাত দিয়ে হেঁচকা টান মেরে দেওয়ালে সাথে মিশিয়ে দাড় করাল সুমুকে। দেওয়ালে সাথে সুমুর দু’হাত চেপে ধরে বলল,
“আমাকে মারার প্ল্যান করেছো, তাই না? কতো কষ্ট করে নিজেকে এখন পযর্ন্ত সামলে রেখেছি, সেই বিষয়ে তোমার কোনো আইডিয়া আছে?”
বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ল শেরাজ। সে চোখ বন্ধ করে বড় করে ঢোক গিলে আবারও চোখ মেলে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে সিডিউস করোনা, সুইটহার্ট। আমি একবার কন্ট্রোললেস হলে, আমাকে তুমি কন্ট্রোল করতে পারবেনা। আমার ছোঁয়া তোমার এই ছোট্ট দেহটা সহ্য করতে পারবেনা। আমি ডেস্পারেট হলে, কিন্তু আমাকে শান্ত করতে, তোমাকে সারারাত কান্না করতে হবে। তোমার দেহের প্রতিটা ভাঁজে আমার ভালোবাসার স্কেচ বানিয়ে তবেই আমি শান্ত হবো। তখন তোমার চোখের পানিতেও মন গলবেনা আমার। আমি ছুঁতে আসলে, তোমার ওই কান্নামাখা করুণ চোখটার দিকে একবারও তাকাব না। নিজের তৃষ্ণা না মিটানো পযর্ন্ত তোমাকে একচুল পরিমাণও ছাড় দিব না আমি। আমি না চাওয়া পযর্ন্ত আমাকে থামাতেও পারবে না তুমি। একমাস লজ্জায় আর ব্যথায় বেড ছেড়ে রুমের বাহিরে যেতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। তখন কিন্তু রুমের মধ্যেও তোমাকে পর্দা করে চলতে হবে। দুনিয়ার কোনো পেইন কিলার তোমার শরীরের ব্যথা কমাতে সক্ষম হবে কিনা জানিনা আমি।”
সুমু মুখ ফুটে কিছু বলতে নিলে, শেরাজ থামিয়ে দিল সুমুকে। সে সুমুর ঠোঁটে ওপর হাত রেখে বলল,
“নাড়াচাড়া যেহেতু দিয়েছো, সেহেতু এখন আমাকে একটু তো সহ্য করতেই হবে। সো, ডোন্ট শাউট ডালিং। একটু চুপচাপ সহ্য করে নাও।”
কথাটা বলেই শেরাজ একহাত দিয়ে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে আরেক হাত দিয়ে সুমুর মুখ চেপে ধরে তার গলায় মুখ ডোবালো। চোখ দিয়ে পানি চলে এলো সুমুর। হাতে পানির ছোঁয়া পেতেই শেরাজ তাকে ছেড়ে দিল। ফর্সা গলায় রক্তবর্ণ ধারণ করেছে সুমুর। শেরাজ তার চোখের পানি মুছে দিয়ে তার ভেজা চোখে পাতার ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“পেইন হচ্ছে, সুইটহার্ট?”
সুমু ওপর নিচ মাথা নাড়াল। শেরাজ আলতো হেসে সুমুকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
“এইটুকুই সহ্য করতে পারোনা। আর আমি পুরোপুরি তোমাকে যেদিন চাইব, সেদিন আমাকে সহ্য করবে কীভাবে?”
শেরাজ সুমুকে নিয়ে বেলকনিতে রাখা চেয়ারের ওপর বসল। সে সুমুকে কোলর ওপর বসিয়ে সুমুর গলায় লাল হয়ে যাওয়া জায়গাটাতে আলতো ঠোঁট ছোঁয়াল।
সুমু একটু নিচুস্বরে বলল,
“একটা গান শোনাবেন, খান সাহেব?”
শেরাজ মুচকি হেসে বলল,
“শোনাতে পারি, তবে তোমাকেও আমার সাথে গলা মেলাতে হবে।”
সুমু মুচকি হেসে সম্মতি জানালো। শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“তাহলে, গিটারটা নিয়ে এসো।”
সুমু খুশি মনে উঠে গিয়ে গিটারটা নিয়ে এলো। শেরাজের হাতে গিটারটা দিয়ে পাশের চেয়ারে গিয়ে বসল। শেরাজ গিটার হাতে নিয়ে মৃদু সুর তুলে গান গাইতে শুরু করল,
“তু হির মেরি, তু জিস্ম মেরা
ম্যা রানঝা হু, লিবাছ তেরা”
“আয়ু কারিব তু,
ছুলুমে তেরি রুহ
বিন তেরে ম্যা হু বেনিশা”
“সামান্দার মে, কিনারা তু
জো বিগরুমে, সাহারা তু”
নিচ থেকে মাইশার ডাক ভেসে আসতেই শেরাজ আর সুমু উঠে দাঁড়াল। সুমু রুমে গিয়ে টি-শার্ট চেঞ্জ করার জন্য ওয়াশরুমে চলে গেল। চেঞ্জ করে এসে সে চুলগুলো খুলে দিল। তারপর দু’জনে একসাথে নিচে চলে গেল।
তারা দুজন ড্রয়িংরুমে আসতেই মাইশা বলল,
“সুমু রেডি এখন হয়ে নে। অলরেডি রাত আটটা বেজে গেছে। আজ একটু বেশি ঠান্ডা পড়েছে। বড়রা সকলে খেয়ে রুমে চলে গেছে। আমরা এখন বের হবো। বাহির থেকে খেয়ে আসব। যা গিয়ে রেডি হয়ে নে।”
সুমু সম্মতি জানিয়ে আবারও ওপরে চলে গেল। আলমারি থেকে একটা গোলাপি রঙের শাড়ি বের করল। ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে শাড়িটা পরে নিল। তবে সমস্যা হলো কুঁচি ঠিক করার সময়। তখনই শেরাজ রুমে ঢুকলো। সুমু শেরাজকে ডাক দিয়ে বলল,
“খান সাহেব, শুনুন! আমাকে এই শাড়িটা পরতে একটু হেল্প করেন না, প্লিজ।”
“যদি খোলার সময় হেল্প নাও, তাহলেই পড়তে সাহায্য করব।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে পেছন ফিরে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“থাক লাগবে না। আমি একাই করে নিচ্ছি।”
শেরাজ এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। আয়নায় মধ্যে দিয়ে সে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“লাগবে না মানে? আর এখন তুমি শাড়ি কেনো পরছো?”
“বাহিরে যাব, তাই শাড়ি পরছি।
“তুমি যে শাড়ি পরে বাহিরে যাবে, এই ব্যাপারে তুমি কার থেকে পারমিশন নিয়েছো?”
সুমু কিছু না বলে হাত দিয়ে চুল খোঁপা করতে লাগল। শেরাজ আয়না থেকে চোখ সরিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। সে হাত বাড়িয়ে সুমুর কাঁধ থেকে ব্লাউজটা একটু সরাল। সে আর একটু এগিয়ে গিয়ে সুমুর কাঁধের ওপর থাকা তিলটার দিকে সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তোমার মুখের বা’পাশের থুঁনি নিচে একটা বিউটিস্পর্ট আছে, ওইটা আমি জানি। তোমার ডান গলায় একটা বিউটিস্পর্ট আছে, ওইটাও আমি জানি। কিন্তু তোমার ডান কাঁধে যে এতো সুন্দর একটা বিউটিস্পর্ট আছে, জানতাম না তো।”
সুমু দুষ্টু হেসে বলল,
“আমার এমন অনেক জায়গায় তিল আছে, যেগুলো সম্পর্কে আপনি এখানো জানেন না।”
“তাহলে খোলো।”
“মানে?”
“মানে হলো পরনের সবকিছু খোলো, আমি দেখব।”
“কি দেখবেন?”
“তোমার কোথায় কোথায় বিউটিস্পর্ট আছে, ওইটাই দেখব। আমি তোমার বর। আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আর এখন পযর্ন্ত আমি জানিনা তোমার কোথায় কোথায় বিউটিস্পর্ট আছে? ইশ! মান-সম্মান আর রইলো না আমার।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? টাইম হয়ে গেছে, আমাদের বেরোতে হবে।”
“তাহলে শাড়িটা পাল্টে এসো।”
“কিন্তু খান সাহেব…”
“চুপ! তাড়াতাড়ি যাও। শাড়ি পরে তুমি কোথায়ও বেরোতে পারবে না। বোরকা থাকলে বোরকা পরে এসো, নয়তো লং গোল ড্রেস পরে হিজাব বেঁধে এসো।”
“কিন্তু…”
“আর একটা শব্দ মুখ থেকে বের করলে, আমি এখন তোমার শরীরের অবস্থা দেখব না। দরজা লক করে তোমার সাথে এমন কিছু করব, বাহিরে যাওয়া তো দূরে থাক, বেড ছেড়ে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় থাকবে না তুমি।”
সুমু চোখ রাঙিয়ে বাধ্য হয়ে শাড়ি পাল্টে বোরকা আর হিজাব পরে নিল। সে শেরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“কেমন লাগছে আমাকে?”
শেরাজ বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“একদম ইসলামিক শেহেজাদী।”
সুমু মুচকি হেসে শেরাজের হাত ধরে রুম ছেড়ে বের হলো। তারা নিচে আসতেই মাইশা সুমুকে দেখে বলল,
“হুমম! বুঝতে পেরেছি। শাড়ি তো দূরে থাক ভাইয়া তোকে নরমাল ড্রেস পযর্ন্ত পরতে দেয়নি। একেবারে ডিরেক্ট বোরকা পরিয়ে নিয়ে এসেছে।”
“আসলে আপু…”
“থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। বাবার আদেশ যেখানেই যায় রাত এগারোটার মধ্যে সকলকে বাড়িতে ঢুকতে হবে। সুমু শোন! আমরা প্রথমে চিনির ফ্যাক্টরিতে যাব। তারপর মার্কেট থেকে ফুসকা খাব। দেন, রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার করে বাসায় ফিরব।”
“আচ্ছা, আপু!”
সকলে মিলে একসাথে বের হলো বাসা থেকে। আনোয়ার সিকদারের বাসা থেকে মার্কেট আর ফ্যাক্টিরিতে পায়ে হেঁটে যেতে মাত্র বিশ মিনিট লাগে, তাই সুমুরা পায়ে হেঁটেই গেল।
সকলে চিনির ফ্যাক্টরির আশপাশ দিয়ে ঘুরছে। শেরাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ কল আসতেই সে সুমুকে নাজমিন আর সামিয়ার সাথে থাকতে বলে একটু সাইডে গেল।
জায়গাটা খুব সুন্দর। সোডিয়ামের আলোতে সবটা আরও সুন্দর দেখতে লাগছে। সুমু, নাজমিন আর সামিয়া একসাথে ঘুরছে। বাকিরা যার যার মতো আছে। মাইশা আর নয়নও একসাথে। রাহিনরা সকলে একসাথে। ইফতিয়া আর রাইশা একসাথে। তিশা আর রাইফ বাড়িতেই আছে। শীত বেশি পরেছে বলে, ওদের সাথে আনেনি তারা।
সুমুরা হাঁটতে হাঁটতে একটু দূরে আসতেই একটা ছেলে এসে দাঁড়াল সুমুদের সামনে। সুমু ছেলেটাকে চিনে আলতো হাসল। ছেলেটাও একগাল হেসে বলল,
“হেই বিয়াইন! কেমন আছেন?”
“জি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“এদিকে কোথায় এসেছেন?”
“আসলে, সকলের সাথে একটু ঘুরতে এসেছি।”
শেরাজ ফোনে কথা বলতে বলতে সুমুর দিকে তাকিয়ে দেখল, সুমু একটা ছেলের সাথে কথা বলছে। ফোনে কথা বলা বাদ দিয়ে সে সুমুর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল। এদিকে সুমু কথা বলেই যাচ্ছে। হঠাৎ কথা বলতে বলতে সুমুর চোখ গেল শেরাজের দিকে। ভয়ে বড় করে ঢোক গিললো সে। গিয়ে লুকাল সামিয়ার পিছনে। সামিয়ার পেছন থেকে উঁকি মেরে শেরাজকে দেখতে যেতেই সে দেখল, শেরাজ সেখানে নেই। চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পেছনে ফিরে তাকিয়ে ভয় পেয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল সুমু।
সে ভয়ে দৌড় দিতে যেতেই শেরাজ বলল,
“ডোন্ট মুভ। আর এক’পা বাড়ালে, পা ভেঙ্গে এখানেই রেখে যাব।”
সুমু দাঁড়িয়ে পড়ল। শেরাজ পেছন থেকে গম্ভীরস্বরে বলল,
“ছেলেটা কে?”
সুমু ঘুরে তাকাল শেরাজের দিকে। সে দাঁত কেলিয়ে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আসিফ নামের ছেলেটি এসে বলল,
“আসসালামু ওয়ালাইকুম ভাইয়া! আমি আসিফ। সম্পর্কে সুমুর বিয়াই। আনোয়ার আঙ্কেলের চাচাতো বোনের মেয়ের সাথে আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে।”
“শাট আপ!”
শেরাজের ধমকে কেঁপে উঠল দুজনে। শেরাজ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তোমার থেকে কিছু জানতে চেয়েছি?”
আসিফ মাথা নিঁচু করে দাঁড়িয়ে নিচুস্বরে বলল,
“জি না ভাইয়া!”
“তাহলে চুপ করে থাকো। আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো, সি ইজ মাই পার্সোনাল প্রপার্টি। সো, আমার পারমিশন ছাড়া ওর সাথে কথা বলা যাবে না। এখন তোমার বিয়াইন ম্যারিড, তাই এখন থেকে ওর সাথে হেসে হেসে হোক আর নরমালি হোক, কোনো ভাবেই কথা বলার প্রয়োজন নেই, ছোট ভাই।”
শেরাজ শেষের কথাটা বলার সময় ছেলেটার কাঁধের ওপর একহাত রাখল। সে চোখ দিয়ে ইশারা করল ছেটাকে চলে যেতে। মুহূর্তেই আসিফ ওই জায়গা ত্যাগ করল।
শেরাজ আবারও সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কোনো বিবাহিত নারী তার স্বামীর হুকুম ছাড়া অন্যকোনো পুরুষের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলাটাকে ইসলাম কি বলে, সুইটহার্ট?”
“সরি, খান সাহেব!”
“ইটস ওকে, সুইটহার্ট! তবে নেক্সট টাইম এইসব জিনিসগুলো মাথায় রাখবে। এখন চলো। নাজমিন, সামিয়া তোমরা ও চলো।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে নিয়ে গেল। রাহিনদের ডাক দিতেই সকলে এক জায়গায় এসে জড়ো হলো। শেরাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“বয়েস অ্যান্ড গার্লস! সকলের খেয়াল আছে কয়টা বাজে? এখন আর ঘুরতে হবেনা। কে কি খাবে, খেয়ে বাসায় চলো।”
সকলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারপর সকলে মিলে মার্কেটের মধ্যে ঢুকল। মার্কেটে ঢুকতেই শেরাজের চোখ গেল কিছু বখাটে ছেলে দিকে। যারা এখন খারাপ নজর দিয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। শেরাজ ছেলেগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে সুমুদের সাথে চলে এলো ফুচকার ভ্যানের কাছে। সে ফুচকাওয়ালার উদ্দেশ্যে বলল,
“মামা! ফুচকা খেয়ে যদি আমার বউ ভালো বলে, তাহলে আপনাকে আমি ফুচকার দামের থেকেও হাজার টাকা বেশি দিব।”
পাশ থেকে নয়ন বলল,
না ভাই শেরাজ। আজ আমি সকলকে ট্রিট দেবো বলে এনেছি। আপনি টাকা দিতে পারেন না।”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“আপনি না হয় ফুচকার দামটা দিয়েন। ফুচকা যদি ভালো হয়, সেই দামটা না হয় আমি দেবো।”
নয়ন হেসে সম্মতি জানালো। শেরাজ ফুচকাওয়ালার উদ্দেশ্যে আবারও বলল,
“মামা তার আগে আপনাকে এই ভ্যানটা একটা ফাঁকা জায়গায় নিতে হবে। এই মার্কেটের মধ্যে এতো লোকজনের মাঝে আমার বউয়ের খেতে অসুবিধা হবে।”
ফুচকাওয়ালা মামা হেসে বললেন,
“কোনো সমস্যা নেই, বাবা। চলেন, আমি আপনাগো লইয়া সাইডে যাইতাছি। ওই স্টেশনের পাশে বেশি মানুষজন নাই। এইহানে চলেন।”
সকলে মিলে স্টেশনের পাশে এসে দাঁড়াল। একে একে সকলকে চেয়ার দেওয়া হলো। ফুচকাওয়ালা সকলের জন্য ফুচকা বানাচ্ছে। আইয়ুব ফুচকার দোকানের সামনে গিয়ে ক্যামেরা ওন করে ব্লগ বানানো শুধু করল। ফুচকাওয়ালা মামা সকলের হাতে হাতে ফুচকা এনে দিল। শেরাজের হাতে ফুচকা দিতে যেতেই শেরাজের ফোন বেজে উঠল। শেরাজ ফুচকাওয়ালার উদ্দেশ্যে বলল,
“মামা! ফুচকার প্লেটটা আমার বউয়ের হাতে দিন।”
ফুচকাওয়ালা ফুচকার প্লেট সুমুর অন্য হাতে ধরিয়ে দিল। সুমু ফুচকার প্লেটটা নিয়ে বলল;
“আপনার এই ফোনটা সারাদিন বাজতেই থাকে?”
“ইমার্জেন্সি কল, সুইটহার্ট।”
“হুম বুঝছি। তাহলে কী আপনি ফুচকা খাবেন না?”
“না, তুমি খেয়ে নাও।”
“উহুম! একটা হলেও আপনাকে খেতে হবে।”
“ওকে, তাহলে খাইয়ে দাও।”
সুমু মুচকি হেসে একটা ফুচকার প্লেট কোলের ওপর রেখে অন্যটা থেকে একটা ফুচকা নিয়ে শেরাজকে খাইয়ে দিল। শেরাজ ফুচকা খেতে খেতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“কোলের প্লেটটা এই চেয়ারের ওপর রাখো। আমি কলটা পিক করে আসছি।”
সুমু শেরাজের কথায় সম্মতি জানিয়ে ফুচকা খাওয়াতে মন দিল। শেরাজ স্যান্ডির কাছে এসে বলল,
“তোমার ম্যামের দিকে একটু নজর রেখো। আমি আরিয়ানের সাথে কথা বলে আসছি।”
শেরাজ আরিয়ানকে কল ব্যাক করে দূরে চলে গেল কথা বলার জন্য। এদিকে, সুমুরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আইয়ুব ব্লগ বানাতে গিয়ে ফুচকাওয়ালা মামার বায়োডাটা শুনে ফেলেছে। ব্লগের মধ্যে নিহাল নিজের ফুচকা রেখে রাহিনের ফুচকা কেড়ে খাচ্ছে। আইয়ুব সেই ভয়ে ফোন অমিতের হাতে দিয়ে নিজের প্লেটের ফুচকা গপগপ করে খেয়ে, সারবাজের ফুচকার প্লেট কেড়ে নিয়ে দৌড় মেরেছে। দূরে গিয়ে পুরো ফুচকা শেষ করে আবারও এসে ক্যামেরা ধরেছে সে। সকলে ওদের অবস্থা দেখে হাসছে।
সবশেষে আইয়ুব ফুচকাওয়ালা মামার সামনে এসে বলল,
“মামা! স্মাট ফোন আছে আপনার? থাকলে দিন তো। একটা কাজ আছে।”
ফুচকাওয়ালা মামা পকেট থেকে তার ফোন বের করে আনলক করে আইয়ুবের হাতে দিল। আইয়ুব ফোনটা হাতে নিয়ে ইউটিউবে ঢুকে “শেরাজকে ব্লগস” লিখে সার্চ করে শেরাজের একাউন্টটা সাবস্ক্রাইব করে দিল। তারপর সে আবার ব্লগ শুরু করে বলল,
“মামা! একাউন্ট আমি সাবস্ক্রাইব করে দিয়েছি। যে আপনাকে হাজার টাকা দিবে বলেছে, তার একাউন্ট এইটা। ও ঠিকমতো একাউন্টটা ইউজ করে না। একটুও সময় দেয় না একাউন্টটাতে। ওই মাঝে মাঝে আমরা একটু ভিডিও পোস্ট করি। আপনি ভিডিওগুলো দেখবেন কেমন। আর এখন আমার সাথে বলুন,
“সাবস্ক্রাইব কি জিয়ে, লাইক কি জিয়ে, কমেন্ট কি জিয়ে, অর শেয়ার কি জিয়ে আপনি ফ্রেন্ডকে সাথ।”
ফুচকাওয়ালা মামা আইয়ুবের সাথে সাথে কথাগুলো বলল। আইয়ুব খুশি হয়ে ফুচাওয়ালার চুলহীন টাক মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“মামা! আপনার ওয়ার্ল্ড কাপটা তো খুব তেলতেলে। পুরাই মাখন। দাড়ান একটু হাত বুলাই।”
আইয়ুবের সাথে সাথে সারবাজরা ও এসে ফুচকাওয়ালার মাথায় হাত বুলাতে লাগল আর “ওয়ার্ল্ড কাপ” বলে চেঁচাতে লাগল। মাইশারা ওদের কান্ড দেখে হাসতে হাসতে পাগল হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে শেরাজ এসে বলল,
“সুমু কোথায়?”
সকলের টনক নড়ল। আশেপাশে তাকিয়ে সুমুকে দেখতে পেল না কেউ। শেরাজ দু’হাত পকেটে গুঁজে ভ্রু কুঁচকে স্যান্ডির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“সুমু কোথায়, সান?”
স্যান্ডি কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আ…আসলে স্যার…”
গর্জে উঠলো শেরাজ। সে চেঁচিয়ে বলল,
“আই সেইড, হ্যয়ার ইজ, সুমু?”
কেঁপে উঠল স্যান্ডি। আইয়ুব দৌড়ে এসে বলল,
“কাম ডাউন, এস.কে। এতো হাইপার হচ্ছিস কেনো? সুমু আছে হয়তো এখানে কোথাও। রিয়েক্ট করিসনা, ব্রো। আমরা সকলে দেখছি সুমু কোথায়।”
“আশেপাশে আছে? তাহলে কোথায় সুমু দেখা আমাকে? আমি সানকে সুমুর দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম। জাস্ট দশটা মিনিট ও সুমুকে দেখে রাখতে পারল না।”
স্যান্ডি আমতা আমতা করে বলল,
“স…সরি স্যার! আমি আসলে…”
“জাস্ট শাট আপ।”
শেরাজের তখনের ছেলেগুলাের কথা মনে পড়ল। সে আর একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে দৌঁড়ে মার্কেটে ভিতরে ঢুকলো। গিয়ে দেখল, সেখানে সেই ছেলেগুলো নেই। শেরাজের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে পাগলের মতো খুঁজতে লাগল সুমুকে। রাহিনরা সকলে খুঁজেছে সুমুকে। মিনিট বিশেকের মধ্যে শেরাজের ফোনে আইয়ুবের কল এলো। ফোনটা রিসিভ করে কথাগুলো শুনে কলটা কেটে দিল সে । দৌড়ে এলো আইয়ুবদের কাছে। আইয়ুব হাত দিয়ে ইশারা করে সুমুকে দেখাল।
সুমু মার্কেটে ঢুকতেই যেই বকুল ফুল গাছটা, সেখানে বসে বকুল ফুল কুড়াচ্ছে। এখানে লাইটের আলো কম আর শেরাজ হন্তদন্ত হয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে ছুটেছে বলে, তখন সুমুকে খেয়াল করেনি। সুমু সকলের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে আছে।
মাইশা দৌড়ে এসে সুমুকে ধরে বলল,
“তুই এখানে কি করছিস, সুমু? আমরা তোকে কতো খুঁজেছি জানিস? আর তুই এখানে বসে ফুল কুড়াচ্ছিস? আমরা সকলে পাগলের মতো তোকে খুঁজে চলেছি। তুই কি ছোট বাচ্চা, সুমু? না বলে এখানে চলে এলি। আমাদের একটু বলে আসতে পারলি না?”
“আসলে আপু! এই ফুল গুলোর ঘ্রাণে চারপাশটা ম’ম করছে। ফুচকা খাবার সময় আমি এই ফুলগুলোর ঘ্রাণ পেয়েছি, তাই এখানে চলে এসেছি ফুল নিতে। আমি তো দূরে কোথাও চলে যায়নি।”
“তবুও তুই একটাবার আমাদের জানিয়ে আসবি না? তুই জানিস তোর জন্য শেরাজ ভাইয়া…”
মাইশার কথার মাঝেই শেরাজ পকেট থেকে হাত বের করে হাত উঁচু করে মাইশাকে থামিয়ে দিল।
“কিন্তু ভাইয়া…”
“উহুম! থামো মাইশা। তোমরা সকলে রেস্টুরেন্টে যাবে বলেছিলে না? যাও, সকলে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে এসো।”
সে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে রাহিনের হাতে দিয়ে বলল,
“ফুচকাওয়ালা মামাকে দিয়ে দিস। আর সবাইকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে, তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসিস।”
রাহিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আর তুই? তুই যাবিনা আমাদের সাথে?”
“না! আমি বাসায় ফিরব। আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। তোরা খেয়ে আয়।”
“তাহলে তোর জন্য খাবার পার্সেল করে নিয়ে আসি?”
“তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি খাব না। তোরা যা, বাই।”
কথাগুলো বলে শেরাজ চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। সুমুও তার পেছন পেছন পা বাড়াতেই শেরাজ দাঁড়িয়ে পড়ল। সে পেছনে না তাকিয়ে বলল,
“আমি বলেছি সবাই। সবাই মানে সবাই। না খেয়ে কেউ যেন বাসায় না ফেরে, রাহিন।”
কথাগুলো বলে চলে গেল শেরাজ। সুমু শেরাজের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। রাহিন ফুচকাওয়ালাকে টাকা দিয়ে এসে সকলকে তাড়া দিল রেস্টুরেন্টে যাবার জন্য।
সুমু যেতে চাইল না বলে রাহিন বলল,
“চল সুমু। এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস না। তখন সবাই বলতে এস.কে যে পার্সোলানি তোকে মিন করেছে, এইটা তুই খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিস। এখন দাঁড়িয়ে না থেকে, চল। তুই না খেয়ে থাকলে, আজ তোর সাথে সাথে আমারও কপাল পুড়বে। দয়া করে চল, বোন।”
সুমু বাধ্য হয়ে গেল রাহিনদের সাথে। সকলে যার যার পছন্দ মতো খাবার অর্ডার করলেও, সুমু কিছুই অর্ডার করল না। ইফতিয়া আর রাইশা হেসে হেসে খাচ্ছে। রাহিন, সুমুর জন্য চাউমিন অর্ডার করল। কিন্তু চাউমিন সুমুর সামনে পড়েই রইল। রাহিন বলেও সুমুকে খাওয়াতে পারল না।
বার্গারে ওয়ান বাইট বসাতেই রাহিনের ফোনে মেসেজ এলো। ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজটা দেখে বড় করে ঢোক গিললো রাহিন। ফোনটা রেখে সে সুমুকে বলল,
“দয়া করে একটু অন্তত খেয়েনে, সুমু। প্লিজ! তোর সাথে সাথে আমার কপালটাও পোড়াস না।”
কথাগুলো বলতে বলতে রাহিনের ফোনে কল এলো। রাহিন উঠে সাইডে গিয়ে ফোনে কথা বলে আবারও এসে বসল। সে ফোনটা সুমুর দিকে এমনভাবে তাক করে ধরল, যাতে কেউ বুঝতে না পারে ভিডিও কলে কেউ আছে। রাহিন সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“সুমু, তুই কি চাস আমি হসপিটালে পড়ে থাকি?”
“মানে? এসব তুমি কি বলছো, ভাইয়া? আমি কেনো চাইব তুমি হসপিটালে পড়ে থাকো?”
“তাহলে প্লিজ, একটু হলেও খেয়েনে।”
“তুমি আমাকে কীভাবে খেতে বলছো, ভাইয়া? উনি না খেয়ে চলে গেল আর আমি এখানে বসে বসে খাব?”
“আরে ওর গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়েছে, তাই চলে গেছে। আমরা ওর জন্য খাবার প্যাক করে নিয়ে যাব। এখন অন্তত খেয়েনে।”
“তাহলে আমার জন্যও প্যাক করো। আমি বাসায় গিয়ে একবারে ওনার সাথেই খাব।”
“তাহলে এই চাউমিন যে নষ্ট হবে। তুই জানিস না, খাবার অপচয়কারীকে আল্লাহ অপছন্দ করে।”
“এগুলো তোমরা খেয়ে নাও।”
“আমরা? কিন্তু আমি তো চাউমিন খাব না।”
সুমু বাকি সকলের দিকে তাকাল। সকলে একসাথে বলল,
“আমরাও খাব না।”
ইফতিয়া আর রাইশা কোনো কথা না বলে নিজেদের মতো খেয়েই চলেছে। সুমু ওদের দুজনের দিকে একবার তাকাল। তারপর বাধ্য হয়ে নিজেই খেতে শুরু করল। পুরোটা না খেলেও, অর্ধেকটা খেলো। রাহিন শেহেরাজের জন্য খাবার পার্সেল করে নিল। সকলে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির উদ্দেশ্যে।
সুমু বাড়ির ভেতরে ঢুকে রাহিনের হাত থেকে পার্সেলটা নিয়ে রুমে চলে এলো। মাইশা সুমুর সাথে যেতে গেলে, রাহিন মাইশাকে আটকে দিয়ে বলল,
“ওদের ব্যাপার ওদের বুঝতে দে। ওখানে এখন ঝড় বয়ে গেলেও, কেউ যাবিনা। সকলে যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়।”
মাইশা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সকলে একে একে নিজেদের রুমে চলে গেল।
সুমু রুমে এসে প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রেখে বেলকনিতে গেল। কিন্তু শেরাজকে বেলকনিতে দেখতে পেল না। বেলকনি থেকে এসে ওয়াশরুম চেক করল। সেখানেও শেরাজ নেই। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে রুম থেকে বের হলো সে। পা বাড়াল ছাদের উদ্দেশ্যে।
ছাদে আসতেই সে দেখল, শেরাজ ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে অর্ধেক খালি ওয়াইনের বোতল। সুমু এগিয়ে যেতে পায়ের সাথে লেগে আরও একটা বোতল দূরে গড়িয়ে চলে গেল। বোতলটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে শেরাজের পাশে দাঁড়াতেই শেরাজ ছাদ থেকে চলে আসার জন্য পা বাড়াল। সুমু দৌড়ে শেরাজের সামনে গিয়ে দু’হাত দু’দিকে মেলে দিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন আপনি? আমি আপনাকে কোথাও যেতে দিব না।”
শেরাজ ওয়াইনের বোতলে আরও একবার চুমুক বসিয়ে বলল,
“সরে দাঁড়াও সামনে থেকে।”
সুমু দাঁড়িয়ে রইল। সে শেরাজের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার কি হয়েছে, খান সাহেব? আই এম সরি, খান সাহেব। আমি বলছি তো আমি ভুল করেছি। কেনো করছেন এমন? তখনও আমার সাথে কোনো কথা না বলে চলে এলেন। এখনও ইগনোর করে চলে যাচ্ছেন। আমি মানলাম, আমি ভুল করেছি। তাই বলে এভাবে আমাকে ইগনোর করবেন? রুমে চলুন। খাবার এনেছি আপনার জন্য। খেয়ে নিবেন চলুন। তারপর আমাকে যতো খুশি ইগনোর করতে চান, করবেন। এখন চলুন, প্লিজ।”
“আমি কি একবারও বলেছি আমি খাব? খাবার আনতে বারণ করেছিলাম না আমি? খাব না আমি। হয়তো এখান থেকে যাও। নয়তো আমাকে যেতে দাও।”
“আমি এখান থেকে গেলে আপনিও এখান থেকে আমার সাথে যাবেন। আপনি এখানে থাকলে আমিও আপনার সাথে এখানেই থাকব।”
“জেদ করোনা, সুমু। যাও এখান থেকে।”
“জেদ তো আপনি করছেন। আর তাই জেদ করে, না খেয়ে এইসব ছাইপাশ গিলছেন।”
“সুমু! তোমাকে যেতে বলেছি আমি?”
“যাব না আমি। বললাম তো আমি ভুল করেছি। শিকার করেছি তো। আমি কীভাবে বুঝবো যে, মাত্র দু’দিনের পরিচয়ে আপনি আমাকে এতোটা ভালোবেসে ফেলেছেন যে, আমি একটু চোখে আড়াল হলে পাগলের মতো আমাকে খুঁজবেন। মাত্র দু”দিনে কারো প্রতি এতো ভালোবাসা কি করে হয়?”
কিছু একটা পরার শব্দে সুমু চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেললো। শেরাজের হাসির শব্দ শুনে সে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, ওয়াইনের বোতলটা ছাদের মেঝের ওপর পড়ে চুরমার হয়ে গেছে। শেরাজ পাগলের মতো হাসতে হাসতে কাঁচের টুকরোর ওপর দিয়ে হেঁটে সুমুর কাছে এসে দাঁড়াল। সুমুকে কিছুক্ষণ পরখ করে দেখে বলল,
“হোয়াট? কি বললে তুমি? মাত্র দু’দিনে কারো প্রতি এতো ভালোবাসা কি করে হয়? আমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করছো তুমি?”
“না, খান সাহেব!”
“তাহলে কি সুমু?”
“আসলে আমি…”
“ইউ জাস্ট কিপ ইওর মাউথ শাট, সুমু। আজকের এই প্রশ্নের মূল্য তোমাকে চুকাতে হবে, সুইটহার্ট।”
কথাগুলো বলে উচ্চস্বরে হাসল শেরাজ। হঠাৎ হাসি থামিয়ে সে আবারও বলল,
“ওকে, তাহলে শোনো! তোমার প্রতি দু’দিনে এতো বেশি ভালোবাসা কীভাবে হলো আমার।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। শেহেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“আমি তোমাকে পুরো দুবছর ধরে চিনি, ডাফার।”
“মানে?”
“মানে, এখন পযর্ন্ত তোমার কয়টা ইনস্টাগ্রাম আইডি নষ্ট হয়েছে?”
সুমু আনমনে উওর দিল,
“তিনটা। আর এইটা আমার চার নাম্বার আইডি।”
“আর প্রতিটা আইডি তুমি স্পেশালি কার জন্য ওপেন করেছো?”
“আপনার জন্য।”
“ওকে! এখন বলতো রাহিন ওমান গেছে ঠিক কতো বছর হলো?”
“পাঁচবছর। কিন্তু খান সাহেব এসবের সাথে…”
“ওয়েট, ওয়েট! আমি বলছি, রাহিন ওমানে যাওয়ার দু’বছর পরে, ওর সাথে আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের পরিচয় হয়। রাহিনের সাথে আমাদের ফ্রেন্ডশিপ তিন বছরের। আর ফ্রেন্ডশিপ মানে তো জানোই? তাকে চেনা, তার পরিবার সম্পর্কে জানা, এইসব নরমাল। রাহিন বাদে আমার যতো ফ্রেন্ড আছে, আমরা সকলে খুব ছোটবেলা থেকেই একে অপরের পরিচিত। আমরা একে অপরের পরিবার সম্পর্কেও জানি। রাহিনের সাথে ফ্রেন্ডশিপ হবার পর রাহিনের সম্পর্কে জানলাম। ওর পরিবার, আত্মীয়স্বজন সকলের সম্পর্কে জানলাম। রাহিন মাঝে মধ্যেই ওর পরিবারের সকলের কথা বলে, ছবি দেখায়। এখন তুমি আমাকে প্রশ্ন করতেই পারে যে, তাহলে তো আমি তোমাকে তিনবছর ধরে চিনি, দু’বছরের কথা কেনো বললাম।”
সে একটু থেমে আবারও বলল,
“তার কারন হলো, রাহিন ওর পরিবার, ওর আত্মীয়স্বজনদের ছবি দেখিয়েছে, আমরাও দেখেছি। ওই পযর্ন্তই এনাফ ছিল সবকিছু। লাস্ট দু’বছর ধরে আমি তোমাকে খুব ভালো করে চিনেছি। তুমি ছিলে আমার ফলোয়ার লিস্টের একমাত্র মেয়ে যার অ্যাটিটিউড দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। যার ইগো, অ্যাটিটিউড আমাকে ডিস্টার্ব করে ছেড়েছিল। আর এইটা কবে হয়েছে জানো?”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শেরাজ বাঁকা হেসে আবারও বলল,
“তোমার হয়তো মনে আছে, দু’বছর আগে একরাতে আমার টাইম রাত বারোটা আর তোমার টাইম রাত দুটোর সময় তুমি আমাকে ফাস্ট টেক্সট করেছিলে। আর সেদিন রাতে তুমি আমাকে টানা তিনঘন্টা ধরে টেক্সট করেছিলে। তোমার টেক্সটের সংখ্যা ছিল ১কে’র অধিক ছিল। আমি সেদিন প্রচন্ড অবাক হয়েছিলাম তোমার ধৈর্য্য দেখে। টানা তিন ঘন্টা কোনো রেসপন্স না পেয়ে ও একটা মানুষ কীভাবে টেক্সট করতে পারে। যেখানে আমি তার টেক্সটগুলো সিন পযর্ন্ত করছিনা, তবুও টেক্সট করেই চলেছে। একটা মানুষের কতোটা ধৈর্য্য থাকলে সে এমন পাগলামি করতে পারে। তুমি জানো, সেদিন আমি তোমার প্রতিটা টেক্সট ইনবক্সে গিয়ে সিন না করেও পড়েছিলাম।
সেদিন রাতে কিন্তু আমি জানতাম না তুমি রাহিনের বোন। কারণ প্রোফাইলে তোমার নিজস্ব কোনো ছবি সেদিন দেওয়া ছিল না। সেই রাতে তোমার করা প্রতিটা টেক্সট হালকা হলেও আমার হৃদয় ছুঁয়েছিল। তার কারন, তোমার করা প্রতিটা টেক্সটটে আমাকে নিয়ে তোমার হৃদয়ে থাকা প্রতিটা অনূভুতি এতো সুন্দর উপস্থাপন করেছিলে যে, টেক্সটগুলো আমার হৃদয়কে ছুঁতে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আমার ফলোয়ার লিস্টের অধিকাংশ মেয়ে আমার জন্য পাগল। আমাকে রোজ টেক্সট করে, ডিস্টার্ব করে। আমার নাম, আমার পিক দিয়ে আইডি ব্যবহার করে। আমার পিক রোজ স্টোরি আপলোড করে। ইনবক্সে কতশত টেক্সট করে।
তবে তোমার মতো করে কেউ তার অনূভুতি উপস্থাপন করতে পারেনি, তাই হয়তো আমার হৃদয় কিছুটা হলেও ছুঁয়েছিল সেদিন। তবে আমি সবসময় নিজের মনের থেকেও নিজের ব্যক্তিত্বকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। সেদিন রাতেও তাই করলাম। নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রাধান্য দিলাম। তবে সেদিন রাতে আর কিছু না হোক একটা জিনিস হয়েছিল ঠিকি। আর সেটা হলো, সেদিন রাতের পর থেকে তুমি স্পেশালি আমার নজরে এসেছিলে।”
আবারও থামল সে। বড় করে নিঃশ্বাস ছেড়ে আবারও বলতে শুরু করল,
“নজরে এসেছিলে ঠিক, কিন্তু ওই টেক্সটগুলো জন্য না। সামান্য কিছু ইমোশনাল টেক্সট কিছুক্ষণের জন্য আমার মন ছুঁতে পারলেও, ওই টেক্সট করা মানুষটি আমার নজরে চলে আসবে, এইটা অসম্ভব। নজরে এসেছিলে তার কারন সেদিন এতো টেক্সট করার পর যখন তুমি আমাকে কল করলে। কলটা দুবার রিং হবার পর আমি কল কেটে দিয়েছিলাম। আর তোমাকে টেক্সট করে বলেছিলাম, ডোন্ট কল। আজব ব্যাপার হলো, আমার ওই একটা টেক্সট, অন্য কোনো মেয়ে তোমার জায়গায় হলে তখন কন্টিনিউ টেক্সট, কল করেই যেত। কিন্তু তুমি কি করলে?
কল তো আর করলেই না, উল্টে টেক্সট করাও অফ করে দিলে। তার থেকেও আজব ব্যাপার হলো, যে মেয়েটা আমি নিউ কোনো পিক, ভিডিও আপলোড করলে সবার আগে সিন করত। তারপর নিজে সেগুলো ফোনের গ্যালারীতে সেভ করে সবার আগে আমাকে মেনশন করে আপলোড করতো, আমার ওই একটা টেক্সটের জন্য সে সবকিছু অফ করে দিল। আমার করা সামান্য ওই একটা টেক্সটে তোমার ইগো হার্ট হয়েছিল সেদিন, আর এইটাই তোমার প্রতি আমার নজর আসার কারন। একদিন রাহিনের পোস্টে তোমার কমেন্ট দেখি। সেদিন কমেন্ট পড়ে জানতে পারি তুমি রাহিনের বোন। তখন আমার মনে পড়ে তুমি রাহিনের ফুফাতো বোন সুমাইয়া। এইভাবেই চললো কিছুদিন।
আস্তে আস্তে তোমার এই ইগো আমার ইগোতে হার্ট করল। এভাবেই আস্তে আস্তে খুব ডিস্টার্বও হচ্ছিলাম আমি। তারপর বাধ্য হয়ে হ্যাকার দিয়ে তোমার আইডি নষ্ট করে দেই। যেদিন তোমার আইডি নষ্ট করলাম, সেদিন রাতেই আবারও তুমি আইডি ওপেন করে আমাকে ফলো করলে। আইডিতে ঢুকে দেখি তুমি। ফাস্ট ফলো আমাকেই করেছো। বাট, যেহেতু আমি তোমাকে ফলো ব্যাক দেইনি, সেহেতু এখন আর তুমি আমার সাথে ইনবক্সে এড নেই। তাই তুমি ওই পদ্ধতিটা ব্যবহার করলে। সেদিন রাতে আমাকে মেনশন দিয়ে আমার পিক, ভিডিও স্টোরি আপলোড করা শুরু করলে। যতোক্ষণ পযর্ন্ত না আমি তোমার একটা স্টোরি আমার স্টোরিতে শেয়ার করে আপলোড দিলাম, তুমি স্টোরি আপলোড দিতেই থাকলে। আমি স্টোরি সিন করে রেখে দিচ্ছিলাম বলে, তোমার জেদ আরও বেড়ে গেল। সেদিন তুমি প্রায় পঁচিশটা মতো স্টোরি আপলোড দিয়েছিলে আমাকে নিয়ে।
যখন আমি তোমার একটা স্টোরি আমার স্টোরিতে শেয়ার দিলাম, তখন তোমার স্টোরি আপলোড দেওয়া বন্ধ হলো। আমি সেদিন প্রচন্ড হেসেছিলাম তোমার অবস্থা দেখে। তবে এইটা আশা করেছিলাম যে, তুমি আবারও আগের মতো টেক্সট করবে। কিন্তু না, তুমি আর টেক্সট করলেনা। তবে আমার পিক, ভিডিও আপলোড দিতে। তোমার টেক্সট’টের জন্য স্টোরিতে “আস্ক মি এনিথিং” পযর্ন্ত পোস্ট করলাম। কিন্তু, সবাই কোয়েশ্চন করলেও, যার জন্য পোস্ট করলাম সেই ইগনোর করল ব্যাপারটা। তারপর আমার খুব পুরোনো আর অনেক বিশস্ত একজন ফলোয়ার নাম “হাফসা”। ওকে তুমি চিনো অবশ্যই। হাফসাকে বললাম আমার যতো ফ্যান, ফলোয়ার আছে তাদের নিয়ে একটা গ্রুপ ওপেন করতে। তবে শুধু মেয়েদের নিয়ে, কোনো ছেলে যাতে না থাকে। হাফসা আমার কথামতো কাজ করল। গ্রুপ ওপেন করা হলো। সকলে গ্রুপে কমবেশি কথা বলত। আর তুমি? তুমি গ্রুপের সব মেসেজ সিন করতে, তবে উওর দিতেনা।
মোজাজটা আরও বিগড়ে গেল। দিলাম গ্রুপে কথা বলা অফ করে। তোমার এতো ইগনোর সহ্য করতে না পেরে একদিন বাধ্য হয়ে তোমাকে টেক্সট করলাম। কিন্তু, তুমি তো তুমি। দুদিন অনলাইনেই এলে না। আর যেদিন অনলাইনে এসে রিপ্লাই করলে, সেদিন আমি রিপ্লাই করা তো দূরে থাক, সিন পযর্ন্ত করলাম না। এভাবেই চললো আরও কিছুদিন। তোমার এতো ইগো, তুমি ওই রিপ্লাইয়ের বাহিরে আর একটা টেক্সটও করলেনা। তাই আমিও সকলের আমাকে মেনশন করা স্টোরি আমার স্টোরিতে শেয়ার দিলেও, তোমারটা দিতাম না। এরপর শুরু করলাম ওয়াক আউট করতে গিয়ে লাইভে আসা। আমি ওয়াক আউট করার সময় লাইভে একটা কমেন্ট বেশি আসে, আর সেই কমেন্টটা হলো “শেরাজ টি-শার্ট উতারো।” তুমি আমার সব লাইভ অ্যাটেন্ড করতে ঠিকই, তবে নো কমেন্টস।
কমেন্ট তুমি কখনোই করতেনা। বাট সেদিন লাইভে এসে একটা ফায়দা হয়েছিল। ওই শার্ট উতারো কমেন্টটা তোমায় আমাকে টেক্সট করতে বাধ্য করেছিল। একটা বাচ্চা মেয়ে ইনবক্সে আমাকে শাসিয়ে টেক্সট করে বলল, “খান সাহেব! যদি লাইভে এসে টি-শার্ট খুলেছেন, তাহলে আপনার খবর আছে। আমি কিন্তু আপনাকে দেওয়া আমার ফলোয়িং তুলে নেব। তারপর আপনার একটা অনেক বড় ফ্যান কমে যাবে।”
এই পর্যায় এসে শেরাজ হাসল। সে ছাদের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়ে আবারও বলতে শুরু করল,
“কি দারুন ব্ল্যাকমেইল হ্যাঁ, সুইটহার্ট? তবে ওইটাই শেষ টেক্সট। তোমার ওই ইগো আমাকে আবারও ডিস্টার্ব করল। আবারও তোমার ওই আইডি নষ্ট করলাম। তারপর আবারও তুমি আইডি ওপেন করলে তোমার নিজের পিক দিয়ে। এইটা দেখে মেজাজ বিগড়ে গেল। আইডিতে মেয়ে মানুষ হয়ে নিজের পিক কেনো দিতে হবে। তার থেকেও বড় কথা হলো, তোমাকে অন্য কেউ কোনো দেখবে? এমন জেলাস ফিলিংয়ের মানে সেদিন বুঝিনি। কিন্তু জেলাস হচ্ছিলাম সেদিন। পার্সোনালি তোমাকে তো আর বলতে পারিনা যে, নিজের পিক প্রোফাইল থেকে সরাও। তাই বাধ্য হয়ে ওই আইডিটাও নষ্ট করে দেই।
তোমার বতর্মান এই আইডিটার বয়স মাত্র সাতমাস। এইটা আমি নষ্ট করিনি। বরং এইটাতে আমি নিজে তোমাকে ফলো ব্যাক দিয়েছি। এই দুটো বছর ঠিক যা যা হয়েছে তোমার সাথে ইনস্টাতে, কোনো কিছুই কাকতলীয় নয়। সব আমার ইচ্ছাতেই হয়েছে। মানতে না চাইলেও এই দু’বছরে সেই প্রথম দিনের নজর, কবে যে ভালো লাগা আর মায়াতে পরিণত হয়েছিল, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। যখনই বুঝতাম যে আমি তোমার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছি, তখনই নিজের মনের বিরুদ্ধে চলে যেতাম। তবুও তোমার প্রতি যে টান অনুভব করি, সেটা মানতে নারাজ ছিলাম। এরপর এলো মাইশার বিয়ের নিউজ। বিডি’তে আসব না বলেও, রাহিনদের হালকা জোড়াজুড়িতে রাজি হয়ে গেছিলাম।
ওরা জানে, ওদের রিকুয়েস্টে আমি বিডি’তে এসেছি। কিন্তু ওরা জানেই না যে, আমি সেচ্ছায় বিডি’তে এসেছি। কেনো এসেছি জানো? কারণ আমি দেখতে চেয়েছিলাম, দূর থেকে তোমার প্রতি যেটা ফিল করি, কাছে আসলেও কি তেমনটাই ফিল করব নাকি আরও বেশি কিছু। তারপর বিডি’তে আসলাম। ব্যাচেলর পার্টির রাতে কাকতলীয়ভাবে তোমার ছোঁয়া, সেই রাতেই আরও একবার খুব কাছ থেকে তোমাকে পরখ করা, তারপর তোমার ডায়েরি, যেখানে খান সাহেবকে নিয়ে তোমার মনের ভেতর থাকা অনুভূতি নিখুঁত সুন্দরভাবে প্রকাশ করা, যখন তখন ইচ্ছাকৃতভাবে তোমাকে দেখার জন্য চা, কফির বাহানা দিয়ে এই রুমে ডেকে আনা, তোমার প্রতি এক্সট্রা অধিকারবোধ, এক্সট্রা শাসন, আলাদাভাবে আগলে রাখা, এইসব কিছুই আমার ভালোবাসার এক একটা ইঙ্গিত ছিল। তুমি জানো?
এতোকিছুর পরেও তোমাকে সত্যি ভালোবাসি কিনা সেটা নিয়ে কোথায় একটা কিন্তু থেকেই গিয়েছিল আমার মধ্যে। কিন্তু, সেটাও ক্লিয়ার হয়ে গেল কক্সবাজারের ওই ঘটনাতে। সেদিন মনে হয়েছিল… থাক এই সম্পর্কে তোমাকে আমি আগেই বলেছি। তাই আজ আর নাই বলি। জানো, তোমার আমার প্রতি ভালোবাসা ঠিক কতটা গভীর তার পরিক্ষাও নিয়েছি আমি। আমার নিজের তোমার প্রতি সত্যি ভালোবাসা নাকি দু’দিনের আবেগ সেটা পরিক্ষা করার জন্য বারবার তোমাকে আমার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছি। কেমন জানি নিজে থেকেই আপনাআপনি একটা অধিকারবোধ চলে আসতো আমার তোমার প্রতি। বাধ্য হলাম নিজের মনের কাছে পরাজয় শিকার করতে। ভালোবাসিনা, ভালোবাসিনা বলেও ভালোবেসে ফেললাম। এই সবকিছু মাত্র এই কয়েকটা দিনে হয়নি, সুমু। দু’বছর আগেই এই সবকিছুই সূচনা শুরু হয়েছিল। আর এই সূচনা তুমি নিজে তৈরি করেছিলে আমার মধ্যে।”
কথাগুলো বলে শেরাজ আবারও হাসল। সুমু দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“মিসেস শেরাজ খান! পার্সোনাল প্রপার্টি অফ শেরাজ খান। আমার ভালোবাসার দিকে আঙুল তোলার মূল্য আপনাকে খুব বাজে ভাবে দিতে
হবে।”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। “তার খান সাহেব তার সকল গতিবিধি দু’বছর ধরে ফলো করছে। তার খান সাহেব তাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করে। ইনস্টাগ্রামে তার সাথে ঘটা সবকিছু তার খান সাহেব ইচ্ছে করে করেছে, এতো বড় সত্যি আজ সুমুকে আবাকের সাথে বাকরুদ্ধ করে দিল। সে তার খান সাহেবের ভালোবাসার দিকে আজ আঙুল তুললো। সেকি ভুল কিছু বলে ফেললো তার খান সাহেবকে। সে তো আর আগে থেকেই এসব জানত না। না না তবুও, না জেনে এতোবড় কথা বলাটা তো অন্যায়। সুমু’তো আজ তার খান সাহেব, তার স্বামীর ভালোবাসার দিকে আঙুল তুললো। এটাতো অন্যায় না, এটাতো পাপ।”
সুমুর ভাবনার মাঝেই শেরাজ সুমুকে ফেলে রেখে ছাদ থেকে চলে গেল। মিনিট পাঁচেক বাদে বাড়ি থেকে গাড়ি বের হয়ে যাওয়ার শব্দে হুঁশ ফিরল সুমুর। সে দৌড়ে গিয়ে ছাদের শেষ প্রান্তে দাঁড়াল। গাড়িটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর বাড়ির ভেতরে এলো। দৌড়ে রুমে ঢুকে ফোনটা নিয়ে রাহিনের ফোনে কল করল। অপরপাশ থেকে কল রিসিভ করে রাহিন কিছু বলার আগেই সুমু বলল,
“ভাইয়া! ভাইয়া, আমি আজ অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি। আর তাই উনি রাগ করে ড্রাঙ্ক অবস্থায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে। তুমি প্লিজ ওনার পিছু পিছু যাও।”
কথাগুলো বলে কেঁদে ফেললো সে। রাহিন সুমুকে কাঁদতে বারণ করে বলল,
খান সাহেব পর্ব ২৫
“তুই চিন্তা করিস না। আমি এখন ওর সাথেই আছি। তুই ফ্রেশ হয়ে একটু ঘুমা। আমি কলটা রাখছি।”
সুমু ফোনটা বিছানার ওপর রেখে উঁপুর হয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল। “সে জানেনা, এর মাশুল তাকে কীভাবে দিতে হবে। তার খান সাহেব আজ কতোটা কষ্ট পেল তার কথায়? সে কীভাবে এই কষ্ট দূর করবে? খান সাহেব কি আর কথা বলবে তার সাথে? তার কান্না কি আজ রাতে আর থামবে? খান সাহেব কি আজ বাসায় ফিরবে?”
সুমুর মনে এখন হাজারটা প্রশ্ন। আজ এই কান্নার বাঁধ মানবেনা যেন।
