Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪১

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪১

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪১
ছায়া

এক মাস পরে…
এক মাসের ভেতরে অনেকটা বদলে গেছে সবকিছু।HDU থেকে এখন আরিয়ান সাধারণ কেবিনে।আরিয়ান এখন হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে,শুধু শরীরটা এখনো দুর্বল। বুকের ক্ষত শুকোচ্ছে আস্তে আস্তে হাত-পায়ের দাগ গুলো হালকা হয়ে এসেছে। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দুইজন দুইজনের অনেকটা কাছে চলে এসেছে কিন্তু কেউ কাউকে মনের ভাব প্রকাশ করেনি।ইলা এই এক মাসে নিজের অজান্তেই আরিয়ানের অভ্যাস হয়ে গেছে। ওষুধের সময় মনে করানো,খাবার খাইয়ে দেওয়া,সবকিছুতেই যেন সে স্বাভাবিকভাবেই “স্ত্রী” হয়ে উঠেছে।
আরিয়ান বেডে আধশোয়া অবস্থায় জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। ইলা পাশের চেয়ারে বসে ফল কেটে দিচ্ছে। হঠাৎ আরিয়ান চোখ ঘুরিয়ে তাকাল ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি।

আরিয়ানঃ- এই যে ম্যাডাম এক মাসে আমার দিকে তাকানোর স্টাইলটা বেশ বদলে গেছে কিন্তু আপনার।
ইলাঃ- বেশি কথা বলবেন না ডাক্তার নিষেধ করেছে না বেশি কথা বলতে এই ১ মাসে কতবার এই কথা বলবো।
আরিয়ানঃ- ডাক্তার কথা বলতে বাড়ন করেছে কিন্তু ডাক্তার তো এটা বলেনি যে, আপনার দিকে তাকালে হার্টবিট বাড়ে যাবে।
ইলা থমকে গেল ফল কাটার ছুরিটা একটু কেঁপে উঠল।
ইলাঃ- আপনি আবার শুরু করলেন।
আরিয়ানঃ- শুরু তো সেদিনই হয়েছিল যেদিন আপনার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো।
ইলাঃ- কি ফ্লাটিং বাজ ছেলে রে বাবা প্রথম দিনে দেখেই না কি জোরে একটা থাপড় মেরে দিয়েছেন।
কথাটা বলে ইলা মাথা নামিয়ে নিল।চোখে একরাশ ভয় লজ্জা আর অদ্ভুত টান।ইলা এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।কারণ আরিয়ান তাকে ভালোবাসে এটা সে বুঝে গেছে।কিন্তু এই ভালোবাসা এত গভীর এত আগ্রাসী যে মাঝে মাঝে সে নিজেই ভয় পেয়ে যায়। আরিয়ান হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ইলার আঙুলে টোকা দিল।
আরিয়ানঃ- এই যে এত সিরিয়াস কেন? আমি তো এখনো ঠিকমতো হাটতেও পারি না,ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
(ইলা মনে মনে বলল)

ইলাঃ- ভয়টা আপনার শরীর নিয়ে না আপনার চোখ নিয়ে।
আরিয়ান এক মুহূর্ত চুপ করে গেল।তারপর ধীরে বলল।
আরিয়ানঃ- এখন এই চোখেই তো আপনার বেঁচে থাকার কারণ।
ইলা আর কিছু বলল না ঠিক তখনই দরজায় নক।ভেতরে ঢুকলেন সাজু আর অফিসার রায়হান।দু’জনের হাতেই ফাইল। রায়হান হালকা হাসি দিয়ে বললেন
রায়হানঃ- মেজর আরিয়ান খান শা……
আরিয়ান ইশারস করে বাকিটা বলতে না দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো। মিলিটারি সবাই কম বেশি ইশারা ভালো করেই বুঝে তাই আরিয়ান বলার সাথে সাথে রায়হান আর কিছু বলল না
রায়হানঃ- আরিয়ান মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত এসেছে।
আরিয়ান সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করল। ইলা তৎক্ষণাৎ বালিশ ঠিক করে দিল।
সাজুঃ- তোমাকে তিন মাসের মেডিকেল লিভ দেওয়া হচ্ছে। পুরো রেস্ট কোনো ফিল্ড ওয়ার্ক না।
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল

আরিয়ানঃ- তিন মাস মানে আমি বোরিং হয়ে যাবো।
ইলাঃ- আপনি একদম চুপ থাকবেন আপনাকে ক্রিকেট খেলার জন্য ছুটি দেয় নি রেস্ট করার জন্য ছুটি দিয়েছে।
রায়হান হালকা হেসে কাগজ এগিয়ে দিলেন।
রায়হানঃ রিলিজ পেপার আজই হসপিটাল ছাড়তে পারবে।
ইলার বুকটা হালকা ধক করে উঠল। হাসপাতালের নিরাপদ দেয়াল ছাড়িয়ে বাইরে সে জানে বাইরে মানেই বাস্তবতা। ইলা সব কিছু গুছিয়ে রেডি হয়ে নিলো।

Time Skip….
হসপিটালের বাইরে আরিয়ান আর ইলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ ইলা দেখতে পেল এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক মধ্যবয়সী নারী। চোখে অসহায়ত্ব হাতে একটা ব্যাগ। সে ফারহানা চৌধুরী লিয়ানের মা। ইলা বুঝে ওঠার আগেই মহিলা এগিয়ে এসে আরিয়ানের হাত ধরে ফেললেন।
ফারহানাঃ- বাবা… আমাকে ক্ষমা করো।
তার কান্নায় আশেপাশের সবাই থমকে গেল।
আরিয়ান হতভম্ব। ইলা কাঁপা চোখে তাকিয়ে আছে।
ফারহানাঃ-আমার ছেলেটা অসুস্থ… আমি জানি ও ভয়ংকর ভুল করেছে। কিন্তু ও খুনি না বাবা। ও শুধু ভুলভাবে ভালোবাসতে শিখেছে।
তিনি কাঁপা গলায় লিয়ানের অতীতের কথা বলতে লাগলেন আবিদা, প্রতারণা, মানসিক ভাঙন, ট্রিটমেন্ট, সব। ইলা চোখ নামিয়ে ফেলল।আরিয়ানের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এলো।
ফারহানাঃ- আমি ওকে দেশের বাইরে নিয়ে যাবো ট্রিটমেন্টের জন্য।প্লিজ ওর নামে কেসটা করবে না।
এক মুহূর্ত নীরবতা তারপর আরিয়ান ধীরে ইলার দিকে তাকাল। ইলা কিছু বলল না শুধু চোখে অনুরোধ। আরিয়ান ফোন বের করে সাজুকে কল দিল।

আরিয়ানঃ- স্যার লিয়ানের নামে কোনো কেস ফাইল করবেন না মেডিকেল গ্রাউন্ডে রিলিজ দিয়ে দিন।
কল কেটে আরিয়ান ফারহানার দিকে তাকাল। আরিয়ানের চোখে এবার আর দয়া নয় কড়া সতর্কতা।
আরিয়ানঃ- আন্টি শুধু আপনার জন্য আমি ছেড়ে দিলাম এবার।কিন্তু নেক্সট টাইম আমার ইলাফুলের দিকে যদি নজর দেয় আমি ঐখানেই ক্রসফায়ার করবো।
ফারহানা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নেড়ে বললেন
ফারহানাঃ- আমি কথা দিচ্ছি বাবা লিয়ান আর এমন ভুল করবে না।
লিয়ানের মা চলে গেলেন বাইরে দেখা গেল সবাই দাঁড়িয়ে আছে।আরিয়ানের বাবা-মা, দুই বোন।ইলার বাবা-মা রায়েদ, পরি, আদিব, হালিমা সবাই। নাফিজা চোখ ভেজা কণ্ঠে বললেনঃ
নাফিজাঃ- আমার ছেলেটা ফিরে এসেছে।ইলা মা আমার ছেলের জীবনটা বাঁচিয়েছে।
ইলা মাথা নিচু করল ঠিক তখনই আদিব এগিয়ে এসে বলল
আদিবঃ- ভাই শুনলাম তোমার তিন মাস লিভ দিয়েছে তার মানে কি জানো এখন তোমাকে আমরা বোর করে মারবো।

আরিয়ানঃ- আমি তো আহত বেশি হাসালে আবার অপারেশন লাগবে মাথায়।
আদিবঃ তাহলে অপারেশনের দরকার নেই ইলাকে বলবো মাথায় বারি দিতে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইলা লজ্জায় পরির পেছনে লুকাল রায়েদ হাসতে হাসতে বলল
রায়েদঃ- ইলা সাবধানে থাকিস এই লোকটা এখন অফিসে না যেতে পেরে সারাদিন তোর সাথে খিট খিট করবে।
পরিঃ ঠিক বলছো ভাইয়া তবে কথাটা অন্য ভাবে হবে মেজর সাহেব এখন ফুল-টাইম রোমান্টিক মুডে থাকবে।
আরিয়ান একটি সিরিয়াস হয়ে বলল
আরিয়ানঃ- কি হচ্ছে এই সব এখানে সবাই বড় রা আছে।
ইলা মনে মনে নিজের মনে বলল
ইলাঃ- ইস.!আসছে আমার ভদ্রলোক রে এই ১ মাসে জানে হয়ে গেছে আপনি লুচ্চার PHD করা।
আরিয়ানঃ- আপনি কি কিছু বলছেন ইলাফুল??
ইলা চোখ তুলে তাকাল এই প্রথম ভয়টা একটু একটু করে কমছে।হয়তো সে এখনো পুরোপুরি সাহসী হয়নি।
ইলাঃ- ইলা কই না তো আমি আবার কি বলবো।

সবার থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকা শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে আরিয়ানরা আত্রাই এর উদ্দেশ্য রওনা দিলো একটা গাড়িতে আরিয়ান ইলা ড্রাইভার আর অন্য গাড়িতে মেহেরাব খান, নাফিযা,নোহা এবং নেহা।
গাড়ি গুলো যখন ধীরে ধীরে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় ঢুকলো ইলার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি কাজ করছিল।নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ তাই ইলা রিলাক্স হওয়ার জন্য জানালার বাইরে পাকা ধান নিয়ে যাচ্ছে সেটা দেখছে, দূরে পুকুর এ কিছু লোক মাছ ধরছে, তাল গাছ খেজুর গাছ সবকিছু যেন একেবারে নতুন জগৎ।
ড্রাইভিং সিটে ড্রাইভার ড্রাইভ করছে। পাশের সিটে আধশোয়া হয়ে আরিয়ান বসে আছে। পিছনের সিটে ইলা জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ড্রাইভার আয়নায় চোখ রেখে হাসল।
“ভাবী এইটাই আমাদের আত্রাই শহরের মত ধুলো বালি নাই কিন্তু মানুষের মন গুলো মাটির মত সহজ সরল।
ইলা একটু নার্ভাস হাসি দিয়ে বলল
ইলাঃ- আমি তো গ্রামেরি মেয়ে ভাইয়া তবে আপনাদের গ্রামটা একটু বেশি সুন্দর।
আরিয়ান চোখ বন্ধ রেখেই বলল
আরিয়ানঃ- সমস্যা নেই আমি তো আছি আপনাকে আমাদের পুরো গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাবো।
ইলাঃ- আপনি তো এখনো পুরো সুস্থ না।

আরিয়ানঃ- আপনাকে আগলে রাখার জন্য আমার পুরো সুস্থ হওয়া লাগে না। আমি আপনার জন্য সব সময় সুস্থ।
ইলার গাল লাল হয়ে গেল ড্রাইভার খুকখুক করে হাসল।
“ভাই একটু ব্রেক করেন এমন কথা বললে গ্রামে ঢুকেই ভাবীর হার্টবিট বেড়ে যাবে।
গাড়িটা গ্রামের ভেতর ঢুকতেই কয়েকজন বাচ্চা দৌড়ে আসলো গাড়ির দিকে
“এই যে আমাদের ক্যাপটেন আসছে সাথে নতুন ভাবী আসছে”
কথাটা যেন বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে গেল চারদিকে গাড়িটা একটা ছোট রাস্তায় ডুকলো দুই পাশে লাইন লাইন করে লাগানো তাল গাছ চারদিকে ধানের জমি। কেউ ধান নিয়ে যাচ্ছে কেউবা ধান কাটছে।এমন মন মূগ্ধ করা পরিবেশে দেখতে দেখতে গাড়িটা একটা গেটের সামনে দাড়ালো। দারোয়ান গেট খুলে দিতেই ইলা দেখতে পেলো দুইতলা একটা বাড়ি। বাড়িটা দূর থেকেই আলাদা করে চোখে পড়ার মতো।সাদা আর হালকা কাঠের রঙে তৈরি বাড়িটা যেন চারপাশের সবুজের সঙ্গে মিশে আছে। বাড়ির চারদিকে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সাজানো বিশাল বাগান ঠিক যেনো মনে হচ্ছে কেউ ধৈর্য আর সৌন্দর্য মিলিয়ে বাড়ির চারপাশে বাগান গড়ে তুলেছে। (এক কোথায় ফুল প্রেমি)
ইলা গাড়ি থেকে নেমেই দেখে প্রবেশপথে বাঁকানো পাথরের পথ,ইলা সেই রাস্তা ধরে হাটতে লাগলো দু’পাশে নিখুঁতভাবে ছাঁটা ছোট ছোট ঝোপ।পথ ধরে হাঁটলেই চোখে পড়ে নানা রঙের ফুলের সমারোহ লাল পিওনি, হাজারি গোলাপের গাছ সারি সারি করে লাগানো, সাদা লিলি, বেগুনি অর্কিড আর হলুদ ডেইজি এত এত ফুল দেখে ইলার কিছুক্ষণের জন্য শাওনের কথা মনে পড়ে যায়। সে এখন এখানে থাকলে হয়তো ফোন বের করে ভিডিও করা শুরু করে দিতো। আরিয়ান ইলাকে এভাবে দেখে জিজ্ঞেস করলো

আরিয়ানঃ- এই ইলাফুল এত এত ফুল দেখে কি নিজেকে হারিয়ে ফেললেন অন্য জগতে??
ইলাঃ- তেমন কিছু না এত এত ফুল দেখে একজনের কথা মনে পড়ে গেলো।
আরিয়ানঃ- সেই লোকটা কি স্পেশাল কেউ?
ইলাঃ- ছিলো এক সময় কিন্তু এখন না।
ইলা আর কিছু না বলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর তার মাঝেই বিশেষভাবে চোখে পড়ে গেলো কাঠগোলাপ এর গাছগুলোর দিকে সাদা আর হালকা গোলাপি রঙের মোটা পাপড়ি বাতাসে দুলে দুলে মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। ইলার মনে পড়ে গেলো আবার শাওনের কাঠগোলাপ নিয়ে করা ভিডিও গুলো।
আবার কিছু দূর যেতেই দেখতে পেলো বাগানের এক কোণে ছোট্ট কৃত্রিম জলাশয়, স্বচ্ছ পানিতে ভাসছে পদ্মফুল, তার ধারে বাঁশ আর বনসাই গাছ সাজানো। ঠিক পাশেই কাঠের তৈরি সুন্দর করে বানানো চেয়ার টেবিল। যেখানে বসে চা খাওয়ার সময়টা যেন ধীরে বয়ে যায়। চারপাশে কালার বাতি ঝোলানো লাইট সন্ধ্যা নামলেই বাগানটাকে রূপকথার মতো করে তোলে।
সামনে দেখা যায় দোতলার ব্যালকনিতে একটা দোলনা সেখান থেকে হয়তো পুরো বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়।এত সব জিনস দেখতে দেখতে ইলা প্রবেশের দরজায় চলে আসলো ইলা দেখে দরজার পাশে দারিয়ে আছে কয়েকজন মহিলা। তাদের কারো হাতে পান কারো হাতে মিষ্টির প্লেট।
ইলা সিরি দিয়ে উপরে উঠতেই একদল মহিলা একসাথে তাকিয়ে রইল। নতুন বউ দেখার সেই কৌতূহলী দৃষ্টি মাথা থেকে পা পর্যন্ত তারা ইলাকে দেখছে।একজন বয়স্ক মহিলা ফিসফিস করে বলল

“ মুখটা কেমন ফর্সা রে এত আমাদের ক্যাপ্টেন এর সাথে অনেক সুন্দর মানিয়েছে রে।
আরেকজন বলল
“ চুপ কর চোখ লাগবি এভাবে বলতে হয় না তার থেকে বল “মাশাআল্লাহ “
মহিলাদের পাশ কাটিয়ে একজন ভদ্র মহিলা এগিয়ে এসে ইলার কপালে টিপ দিয়ে দিল ছোট একটা।সে হচ্ছে আরিয়ানের ছোট চাচার বউ মিনা।
মিনাঃ- মাশাআল্লাহ খুব লক্ষ্মী বউ আমাদের।
ইলা এই সব দেখে অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।আরিয়ান ধীরে ধীরে ইলার কাছে আসলো সবাই সম্মান করে জায়গা করে দিল আরিয়ানকে।
মিনাঃ- তা মেজর সাহেব আপনার শরীর কেমন এখন?
আরিয়ানঃ- ভালো আছি চাচি আপনাদের দোয়ায়।
ঠিক তখনই এক কিশোরী ফিসফিস করে বললঃ- ভাবী কি খুব লজ্জুক নাকি?
ইলা শুনে ফেলল কথাটা কিন্তু কিছু বলল না ইলা আরিয়ান দিকে তাকালো আরিয়ান চোখ টিপে বলল
আরিয়ানঃ তোমাদের ভাবী লজ্জুক না শুধু আমাকে ছাড়া কথা কম বলে।
আরিয়ানের কথা শুনে সবাই হেসে দেয় ইলা তাকিয়ে তাকিয়ে রাগী চোখে তাকাল। সেই সময় আবার গাড়ির হর্ণ বাজলো সবাই পিছনে তাকালো দেখে মেহেরাব খানরাও চলে এসেছে।
সবাই জানে আরিয়ানের বাবা অনেক রাগি আর এখন যদি দেখে নতুন বউকে এভাবে দারিয়ে রেখেছে তাহলে অনেক রাগ হবে তাই ইলালে নিয়ে সবাই ভিতরে গেলো।
ড্রোইং রুমে ইলাকে আলাদা করে বসানো হলো।চারপাশে গ্রামের মহিলা ও মেয়েরা ঘিরে ধরেছে।সবার অনেক প্রশ্ন

“কোথাকার মেয়ে?
“সে কি রান্না পারো?
“মেজর সাহেব এর রাগ কি সহ্য করতে পারবে?
এভাবে প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে সবাই ইলা এত এত প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে যায়। তবুও একটু কাঁপা গলায় বলল
ইলাঃ- আমি চেষ্টা করবো সব কিছু মানিয়ে নেয়ার।
একজন হেসে বললঃ- নতুন বউ মানেই এমন।
হঠাৎ একজন ছোট মেয়ে বললঃ- ভাবী ক্যাপ্টেন আবার আমাদের মত আপনাকে ও মারবে না তো?
মেয়েটার এই একটা কথা শুনে ঘরে হঠাৎ হাসির রোল পড়ে গেলো।ইলা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। কারণ ইলা অলরেডি তাদের ক্যাপ্টেন এর কাছে অনেক বার মার খেয়ে গাল লাল করে ফেলেছে। ঠিক তখনই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান গম্ভীর স্বরে বলল
আরিয়ানঃ- আমি শুধু নিজের শত্রুকে মারি বউকে না।
পিচ্চি মেয়েঃ- এ আমরা তোমার কোন কালের শত্রু তাহলে ক্যাপ্টেন যে তুমি আমাদের মারো।
আরিয়ানঃ- তোদের দল এর সব কয়াটা বজ্জাত এর হাড্ডি আমি বাড়ি আসলেই তোর দাদি আমার কাছে বিচার দেয় তোদের নামে।
পিচ্চি মেয়েঃ- এহ মিথ্যা কথা কি বিচার দেয় শুনি।
আরিয়ানঃ- তুই তোর দলের সবাইকে নিয়ে নিজের ক্ষের বেগুন, টোমেটো চুরি করে বিক্রি করি।
আরিয়ানের এই কথা শুনে ইলার সাথে সবাই আবার হাসল। পিচ্চি মেয়ে কিছুটা লজ্জা পেয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে বলল

পিচ্চি মেয়েঃ- বেশ করেছি চুরি করেছি পিকনিক এর টাকা দেয় না তো কি করবো তাই এই সব করি।
সবার হাসি মজার মাঝ খানে মেহেরাব খান আসলে আরিয়ান সহ বাকি সবাই চুপ হয়ে যায়। মেহেরাব খান সোফাতে বসে সবার উদ্দেশ্যে বলে
মেহেরাবঃ- অনেক কথা হলো এখন তো তাদের বিশ্রাম করতে দিতে হবে। আর আরিয়ান ৩ মাসের ছুটিতে আসছে তাই গল্প করার অনেক সময় এখন আপাতত তাদের বিশ্রাম নিতে দিন সবাই।
সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেলো।নোহা আর নেহা ইলাকে নিয়ে দোতলার শেষ প্রান্তের ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা খুলতেই ইলার চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
ঘরটা শুধু একটা শোবার ঘর না এটা যেন আরিয়ানের নিজের তৈরি করা একটা আলাদা জগৎ।
ভিতরে ঢুকতেই প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ে, সেটা বিশাল ব্যালকনি সেখান থেকে বাইরে পুরো বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়। অন্য পাশে জানালায় সাদা পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে, আর রোদের আলো ঘরের ভেতর ঢুকে নরম একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
ঘরের রঙগুলো খুব শান্ত অফ-হোয়াইট দেয়াল, গাঢ় কাঠের ফ্লোরিং আর কালো-বাদামি শেডের ফার্নিচার। সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজানো, কোথাও একটুও অগোছালো ভাব নেই। দেখলেই বোঝা যায়, এই ঘরের মানুষটা শৃঙ্খলাকে অভ্যাসে পরিণত করেছে।

ঘরের মাঝখানে বড় একটা কিং সাইজ বেড। সাদা বেডশিটের ওপর ধূসর আর নীল রঙের কুশনগুলো পরিপাটি করে সাজানো। বেডের হেডবোর্ডটা কাঠের তৈরি, খুব সিম্পল কিন্তু ভীষণ এলিগ্যান্ট। বেডের এক পাশে ছোট একটা সাইড টেবিল, তার ওপর মিলিটারি স্টাইলের টেবিল ল্যাম্প আর একটা ঘড়ি সবকিছু একেবারে লাইনে রাখা।
এক কোণে চোখে পড়ল গাঢ় কাঠের আলমারি। আলমারির দরজা আধা খোলা, ভেতরে কাপড়গুলো রঙ আর সাইজ অনুযায়ী সাজানো। কোনো অতিরিক্ত জিনিস নেই, যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই।
আরেক পাশে একটা বড় বুকশেলফ। সেখানে সারি সারি বই মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি, ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান আর কিছু ফিকশন। মাঝখানে কয়েকটা ফ্রেম রাখা একটায় ইউনিফর্ম পরা আরিয়ানের ছবি, চোখে সেই চেনা দৃঢ়তা। আরেকটায় তার বাবা-মায়ের সাথে তোলা পুরোনো একটা ছবি।
ঘরের এক পাশে ছোট একটা ওয়ার্কস্টেশন। পরিষ্কার টেবিল, ল্যাপটপ, কিছু ফাইল আর একটা নোটবুক। নোটবুকের পাশে রাখা কলমগুলোও নির্দিষ্ট জায়গায়। ইলা অবাক হয়ে খেয়াল করল এই ঘরে বিশৃঙ্খলার কোনো জায়গা নেই।
তবু সবকিছুর মাঝে একটা নরম ছোঁয়া আছে। জানালার পাশে রাখা ছোট্ট গাছটা, বেডের পাশের টেবিলে রাখা হালকা সুগন্ধি মোমবাতি যেন শক্ত খোলসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোমল মনটার ইঙ্গিত।ইলার সব কিছু ঘুরে ঘুরে দেখা দেখে নোহা হেসে বলল,

নোহাঃ- ভাবী ভাইয়ার ঘরটা ঠিক ভাইয়ার মতোই। বাইরে শক্ত, ভেতরে খুব গোছানো।
নেহাঃ- আর পরিষ্কার নিয়ে কথা বলাই যায় না।আমরা ঢুকলেও নাকি আগে হাত পা ধুয়ে তার পরে ডুকতে হবে!
ইলা মৃদু হেসে ঘরের চারপাশটা আবার একবার দেখল।এই ঘরটা তাকে অদ্ভুতভাবে শান্ত লাগছে।মনে হচ্ছে এই জায়গাটায় থাকলে কেউ অযথা জোর করে কিছু চাইবে না, আবার একা থাকতেও দেবে না।ঠিক তখনই দরজার পাশে আরিয়ানের গলা শোনা গেল,
আরিয়ানঃ- এই ঘরটা এখন শুধু আমার না,এখন থেকে এটা আপনারও।
ইলার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।আরিয়ান কে আসতে দেখে নোহা আর নেহা ইলাকে রুমে রেখে চলে গেলো। ওরা চলে যেতেই ঘরটা হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল। জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে। লণ্ঠনের রঙিন আলো বাগান জুড়ে জ্বলে উঠছে।
ইলা হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ল সারাদিনের ক্লান্তি যেন এবার শরীরটা টের পেল।ঠিক তখনই আরিয়ান এগিয়ে এসে বলল,

আরিয়ানঃ- ফ্রেশ হয়ে নিন অনেক লম্বা জার্নি ছিল।
ইলাঃ- আপনিও তো ক্লান্ত আপনি ফ্রেশ হবেন না?
আরিয়ানঃ- আমি আপনার পরে যাবো লেডিস ফাস্ট।
ইলা আর কিছু না বলে ওয়াশরুমের দিকে গেল। আরিয়ান ও রুমের বাইরে চলে গেল।ইলা বাথরুমে ডুকে দেখে বাথরুমটাও ঘরের মতোই পরিষ্কার আর আধুনিক সাদা মার্বেলের দেয়াল, আয়নার পাশে হালকা আলো। ঠান্ডা পানির ছোঁয়ায় ইলার মনে হলো মাথার ভেতরের সব অস্থিরতা ধুয়ে যাচ্ছে।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। হালকা রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ পরেছে, চুল আলতো করে ভেজা। নিজেকেই একটু অপরিচিত লাগছে নতুন ঘর, নতুন পরিচয়। ঠিক তখন দরজায় নরম একটা টোকা।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আমি ভেতরে আসবো?

ইলাঃ- জি… আসুন।
আরিয়ান ধীরে ভেতরে ঢুকল তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল ইলার দিকে তাকিয়ে।
আরিয়ানঃ- এই রঙটা আপনাকে মানিয়েছে।
ইলাঃ- আপনি ফ্রেশ হবেন না?
আরিয়ানঃ- হ্যাঁ যাচ্ছি।
ইলাঃ- দারান আমি হেল্প করছি
আরিয়ানঃ- হেল্প?
ইলাঃ- ডাক্তারের নির্দেশ বেশি ঝুঁকি নিতে মানা করা হয়েছে।
আরিয়ানঃ- ঠিক আছে তাহলে হেল্প করুন।
ইলা আলতো করে আরিয়ানের হাত ধরল। সেই স্পর্শে আরিয়ান অজান্তেই শক্ত হয়ে উঠল। বাথরুমে ঢুকে সে আরিয়ানকে বসতে সাহায্য করল। টাওয়েল এগিয়ে দিল শার্ট খুলতে সাহায্য করল। ইলার হাতগুলো একটু কাঁপছে, কিন্তু মনোযোগে কোনো ঘাটতি নেই।আরিয়ান নরম গলায় বলল
আরিয়ানঃ- চাপ নিচ্ছেন কেনো এতো আমি আপনার সামনে শার্টলেস হবো না?
ইলাঃ- আমি আবার কই চাপ নিচ্ছি আর আপনি শার্টলেস হলেই বা আমার কি আমি তেমন মেয়ে না।
এই কথাটায় আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল আর কিছু বলল না।ফ্রেশ হয়ে বেরোলে আরিয়ানের চেহারায় অন্যরকম শান্তি। ইলা তার চুলের পাশে আলতো করে তোয়ালে ধরিয়ে দিল।ইলা কিছু বলল না শুধু চোখ নামিয়ে রাখল।

রাতের খাবারের ডাক আসতেই দু’জনে নিচে নামল।ডাইনিং রুমে ঢুকতেই সবাই তাকিয়ে রইল। বড় গোল টেবিলে খাবার সাজানো। ভাত, মাছের ঝোল, মুরগির রোস্ট, শাকভাজি, ডাল ঘরের তৈরি গরম খাবারের গন্ধে ইলার বুক ভরে গেল।রহিমা চাচি ( তাদের বাড়িতে কাজ করে) হাসিমুখে বলল,
রহিমাঃ- এই নাও বউমা আজ আত্রাই এর রান্না খেয়ে দেখো।
নাফিযা পাশে বসে বললঃ- ইলা মা যদি কিছু না ভালো লাগে কিন্তু বলবা।
নোহাঃ- ভাইয়া কিন্তু খাবার পছন্দ না হলে মুখে বলে না শুধু বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে।
আরিয়ানঃ- এইসব অপবাদ বিশ্বাস করবেন না।
খাবার খাওয়ার শেষ করে প্রশ্ন শুরু হলো
মেহেরাবঃ- বউমা খাবার কেমন লাগছে? আমাদের গ্রামে থাকতে পারবে তো?
ইলা এবার একটু স্বচ্ছন্দভাবে হাসল।
ইলাঃ- সবই ভালো লাগছে আব্বু আর ভয় নয় আমি শিখে নেব সব কিছু।
নেহাঃ- এই তো ভাবী আমাদের মতোই।
মেহেরাব খান এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন হঠাৎ বললেন,
মেহেরাবঃ- গ্রামে থাকলে মানুষকে আপন করে নিতে হয়। বউমা এই বাড়িটা এখন তোমারও তাই নিজের মত করে থাকবে।
ইলাঃ- আমি চেষ্টা করবো আপনাদের মেয়ে হয়ে থাকতে।
ইলা বুঝতে পারল এই বাড়ির মানুষগুলো ধীরে ধীরে তাকে আপন করে নিচ্ছে আরিয়ান পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,

আরিয়ানঃ- ভয় পাচ্ছেন এখনো?
ইলাঃ- ভয় পাচ্ছি তবে অন্য কিছুএ।
রাতে দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ইলা বসে আছে আরিয়ানের কিং সাইজ বেডে কিছুটা নার্ভাস। আরিয়ান বেডে বসে হালকা হেলান দিয়ে আছে।
আরিয়ানঃ- কেমন লাগলো আমাদের আত্রাই? এবং মানুষদের?
ইলাঃ- সবাই খুব ভালো কিন্তু আমি একটু ভয় পাচ্ছি।
আরিয়ানঃ- এই গ্রামের লোকজন আপনাকে খেয়ে ফেলবে না ইলাফুল।
ইলাঃ- আরে আমি সেটা বলিনি আমি কি মানিয়ে নিতে পারবো সব কিছু।
পুরো বাড়িটা ধীরে ধীরে নীরব হয়ে এসেছে।বাইরে হালকা শীতের হাওয়া বইছে,পাতাগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘষা লেগে মৃদু শব্দ করছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে ইলার গায়ে কাঁপন ধরাচ্ছে।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪০

ঘরের আলোটা নরম আরিয়ান বিছানার এক পাশে বসে আছে এখনো আধো শোয়া হয়ে আর ইলা দাঁড়িয়ে আছে আলমারির সামনে। বিছানার ওপর সুন্দর করে রাখা একটা কম্ফর্টার। মোটা, নরম শীত আটকানোর জন্য একদম পারফেক্ট।
কিন্তু সমস্যাটা কম্ফর্টার না সমস্যাটা অন্য কিছু ইলা বুঝতে পারছে না সে কী করবে। আরিয়ান এর সাথে এক কম্ফর্টার এর কিভাবে থাকবে।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪২