Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৩৩

খান সাহেব পর্ব ৩৩

খান সাহেব পর্ব ৩৩
সুমাইয়া জাহান

সুমুরা বিকাল চারটা মধ্যে শেখ বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। অলরেডি পুরো গ্রামের মানুষ জেনে গেছে যে, শামীম শেখের বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তাই গ্রামের সব মহিলারা, যুবতি মেয়েরা, বাচ্চারা–সকলেই সুমুদের গাড়ির দিকে উঁকি মারছে। সুমুদের বাড়ির সামনে পাঁচটা অটো গাড়ি এসে থেমেছে। শেরাজ মাইক্রো নিতে চাইলেও সুমু নিতে দেইনি। পুরো গ্রামীণ পরিবেশের মানুষদের মতো জীবন কাটানো যে কতোটা শান্তির, সেটার কিছুটা ফিল শেরাজদেরকে দিল সুমু।
শেরাজরা অটো থেকে নামতেই শামীম সাহেব আর হাসি বেগম ছুটে এলেন। তাদের সঙ্গে এলো এক বৃদ্ধা মহিলা। তিনি এসেই বললেন,

“কই? কই? আমাদের সুমুর জামাই কই? কই? কোনডা? এহহানে তো সবগুলোই চান্দের টুকরার নাহাল দ‍্যাখতে। এর মধ্যে আমাগো সুমুর জামাই কোনডা?”
সুমু আর শেরাজ একসাথে বৃদ্ধা মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ মহিলাটিকে সালাম দিল। বৃদ্ধা মহিলা শেরাজের সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
“আমি তো ভাবছিলাম চান্দের টুকরা। এতো দেহি পুরা একখানা চান্দ পাইছে আমাগো, সুমু।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাঁচিয়ে একটু ভাব নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পুরো একটা চাঁদ পেয়েছো তুমি, সুইটহার্ট।”
“আরে নাতজামাই, আমার নাতনিকে আর কতো দ‍্যাখবা। এইবার এই বুড়িটার দিকেও একটু তাকাও। লাইন ক্লিয়ার আছে বুঝছো। তোমার দাদাজান আরও দশবছর আগে তার এই সুন্দরী বউটা রাইখা চইলা গেছে।”
শেরাজ আলতো হেসে মাজেরা বেগমকে একটু সাইডে নিয়ে বলল,

“দেখব কি দাদি? আমার এমন সুন্দরী বউ থাকতে তোমার কুঁচকে যাওয়া চামড়ার প্রতি ফিল আমার আসবে না। আমার আবার সবকিছু টাইট আর টানটান পছন্দ। তুমি তো কুঁচকে ঝুলে গেছো। তোমাকে একটা চুমু খেতে হলেও আমাকে আগে তোমার গাল আয়রন করে নিতে হবে। তোমার জন‍্য তোমার বয়সী একটা জামাই খুঁজে দেব।”
মাজেরা বেগম ফোকলা দাঁতে হাসলেন। সকলে মিলে মাজেরা বেগমের সাথে কিছুক্ষণ হাসি-ঠাট্টা করল। এরপর শামীম সাহেব সবাইকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
সুমুদের দোতালা বাড়ি। শামীম সাহেব আর সাখাওয়াত সাহেবের বাবার তৈরি করা অনেক পুরানো বাড়ি। তবে সময়ের সাথে সাথে দুই ভাই মিলে বাড়িটির অনেক উন্নতি করেছে। সাখাওয়াত সাহেবের তিন ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে সজীব সৌদিতে থাকে, মেঝো ছেলে শাহরুখ মেডিকেল স্টুডেন্ট, ছোট ছেলে আশিক আনার্স চতুর্থ বর্ষের স্টুডেন্ট, আর ছোট মেয়ে নাজমিন দশম শ্রেণির ছাত্রী। শামীম সাহেবের ছোট বোন সুমি বেগম নিজ এলাকার ছেলে মুস্তাক সিকদারের সাথে প্রেমের সম্পর্ক করে বিয়ে করেছেন। মুস্তাক সিকদার বর্তমানে নিজ ইউনিয়ন খান্দারপাড়া এলাকার চেয়ারম্যানের পদে আছেন। সুমি বেগমের দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় ছেলে পিয়াস বাবার মতো রাজনীতিতে যোগদান করেছেন। মেঝো মেয়ে ফারিয়া ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী আর ছোট মেয়ে ফারিন প্রথম বর্ষের।

হাসি বেগম বাসায় ফিরে সকলের জন‍্য রান্না করছেন। তার হাতে হাতে সহযোগিতা করেছেন তার প্রাণ প্রিয় একমাত্র জা রুমা বেগম। তাদের দুই জায়ের মধ্যে অনেক ভাব। দুজনে সবসময় দুই বোনের মতো থাকে। হাসি বেগম যেমন সজীব, শাহরুখ, আশিক আর নাজমিনকে নিজের সন্তানের মতো দ‍্যাখে। রুমা বেগমও সুমু আর সামিয়াকে সবসময় নিজের সন্তানের মতোই দেখে এসেছে।
হাসি বেগম সুমুকে বললেন সবাইকে নিয়ে দোতালায় চলে যেতে। হাসি বেগম আগে থেকেই রুমা বেগমকে সবটা জানিয়ে রেখেছিলেন। রুমা বেগম নিজ হাতে দোতলায় প্রতিটা ঘর পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন করে রেখেছেন। শেরাজ, আইয়ুব আর মাইশাদের দোতলায় থাকতে দেওয়া হবে, আর বাড়ির বাকিরা সকলে নিচ তালায় থাকবেন।
সুমুরা তাদের কথামতো ওপরে চলে গেল। সকলে ফ্রেশ হয়ে সবটা গুছিয়ে নিতে নিতে রাত আটটা বেজে গেল, তাই আজ সকলে তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে যার যার রুমে চলে গেছে।
সুমু বিছানা করছে। শেরাজ বেলকনিতে বসে ল‍্যাপটপে কাজ করছে। পাশের রুমে থেকে হঠাৎ স‍্যান্ডির কল দেখে ভ্রু কুঁচকালো শেরাজ। কল রিসিভ করে এয়ারপডস কানেক্ট করল সে।

“স‍্যার! আপনি আরিয়ান স‍্যারের নাম্বার, আইডি ব্লক করেছেন কেনো? আরিয়ান স‍্যার আপনাকে তার নাম্বার আর আইডি আনব্লক করতে বলেছে। তিনি আপনার সাথে ইম্প‍র্টেন্ট কথা বলতে চায়।”
কথাগুলো চুপচাপ শুনল শেরাজ। কল কেটে দিয়ে আরিয়ানের আইডি আনব্লক করে আরিয়ানকে কল করল সে। আরিয়ান কল রিসিভ করতেই শেরাজের কানে মিউজিকের শব্দ এলো। ব‍্যাপারটা শেরাজ ইগনোর করে বলল,
“হোয়াটস ইওর প্রবলেম আরিয়ান? সমস্যাটা কি তোর? বিডিতে আমি একটা বিয়ের ইনভিটিশনে এসেছি। নিজে বিয়ে করতে আসিনি। তোর ব‍্যবহারের মনে হচ্ছে আমি তোর বিয়ে করা বউ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। আর তাই, তুই তোর বউয়ের চিন্তাই নিব্বাদের মতো সারাদিন আমাকে কল করে পাগল হয়ে যাচ্ছি। সেই সাথে আমাকেও বিরক্ত করছিস। কি চাইটা কি তোর আমার কাছে?”

“তোর বউ!”
“মানে? কি বলতে চাইছিস তুই?” ভ্রু কুঁচকে এলো শেরাজের।
থতমত খেলো আরিয়ান। সে কথা কাটানোর জন‍্য বলল,
“আসলে, না মানে এস.কে! আমি বলতে চাইছিলাম যে, তুই আমার বউ নিয়ে কি পালিয়ে যাবি? পালাব তো আমি, তাও তোর বউকে নিয়ে। একবার শুধু তুই বিয়েটা কর। তোর মনে আছে ছোটবেলায় তুই আমার সাথে সবকিছু শেয়ার করতিস। আর যেটা করতিস না সেটাও আমি অভিনয়ের কাঁদুনি কেঁদে কেড়ে নিতাম।”
“সময় পাল্টেছে, আরিয়ান। আগে তুই নিজেই বাচ্চা ছিলি। আর এখন, এখন তুই নিজেই বাচ্চা ফুটানোর কাজ করে বেরাস।”
“আহ এস.কে! সময় পাল্টেছে, তবে ভাইদের প্রতি ভাইদের ভালোবাসা নয়। তুই তো তোর ভাইদের জন‍্য প্রাণটাও দিয়ে দিতে পারিস।”
বাঁকা হাসল শেরাজ। সে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

“ভাইদের প্রটেক্ট করার জন‍্য প্রাণ দিতে হলে, দিব। ঠিক তেমনই নিজের বউকে প্রটেক্ট করার জন‍্য প্রাণ নিতে হলে, নিব।”
“বউ শেয়ার করেই তো তুই তোর এই ভাইয়ের প্রাণ বাঁচাবি। বেশি না এস.কে, অনলি ওয়ান নাইটের বেড পার্টনার হিসাবে তুই তোর ফিউচার ওয়াইফকে আমার সাথে শেয়ার করিস। জানিস ইশিতা মেয়েটা না…”
দাঁতে- দাঁত চেপে শেরাজ গর্জে উঠৈ বলল,
“মাদারফা*কা*রের বাচ্চা! জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব তোর। কি করেছিস তুই ইশিতার সাথে?”
“কাম ডাউন এস.কে! কাম ডাউন। তোর মুখে স্ল‍্যাং বড্ড বেমানান শোনায়। আমি ইশিতার সাথে কিছুই করিনি। শুধু একটু বাজে নজরে দেখেছিলাম আর কি। এমনিতে তুই তো জানিস, এই এ.সি চৌধুরী কুকুরের মতো কারো এঁটোতে মুখ দেয়না। আমার তো শুধু তোর এঁটোটাই পছন্দ, এস.কে। তুই এক কাজ কর। তুই আমার সিস রোজাকে বিয়েটা কর। তাহলে আর তোর বউয়ের দিকে নজর পড়বেনা আমার। কিন্তু, অন‍্যকোনো মেয়ে বিয়ে করলে তো…”
“আরিয়ান, আমার মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানিস? তুই আমার মামার প্রটেকশন ফেটে বেরিয়ে যাওয়া মিস্টেক প্রডাক্ট।”
আরিয়ান তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,

“আরে এখানে মনে হওয়ার কি আছে? এইটাতো মৃত্যুর মতোই সত‍্য একটা কথা। আমি তো জানি আমার মম অ‍্যান্ড ড‍্যাড বিয়ের আগেই…”
কথাটা শেষ করল না আরিয়ান। সে বা’হাত দিয়ে মুখটা ডেকে আবারও বলল,
“থাক আর বলতে পারব না। আমার লজ্জা করে। হাজার হলেও তারা আমার মম অ‍্যান্ড ড‍্যাড। কিন্তু জানিস তো এস.কে মাঝে মাঝে আমার ড‍্যাডের ওপর আমার বড্ড রাগ হয়। লোকটার এতো টাকা-পয়সা থাকেও সেদিন একটা প্রটেকশন প‍্যাকেট কিনতে গিয়ে এতোটা কৃপণতা করেছিল কেনো বল তো? কোন ব্রান্ডের প্রটেকশন কিনে ইউজ করেছিল বল তো, যেটা ব‍্যবহার করতে গিয়ে ফেটে গিয়েছিল? আমি শিওর প্রটেকশনের প‍্যাকেটটা আমার ড‍্যাড ফুটপাত থেকে কিনেছিল।”

“হ‍্যাঁ, তুই একটা কাজ কর। ভালো মানের প্রটেকশনের বিজনেস শুরু কর। সেগুলো বিভিন্ন ফুটপাতে কম দামে সেল কর। তাহলে কি হবে বল তো? আর কেউ আমার মামার মতো ওতি উত্তেজনায় ফুটপাত থেকে প্রটেকশন কিনে রুম ডেট করতে গেলেও, সেই প্রটেকশন ফেটে তোর মতো মিসটেক প্রডাক্ট পৃথিবীতে আসবে না।”
আয়িয়ান আবারও লজ্জা পাবার অভিনয় করে বলল,
“যাহ দুষ্টু কি বলে এইসব। তুই জানিস না, প্রটেকশনের বিজনেস করলে অর্ধেকের বেশি প্রটেকশন তো আমার নিজেরই ব‍্যবহার করা হয়ে যাবে, এতে আমার বিজনেসের লস হবেনা বল?
শেরাজ আর কথা না বাড়িয়ে কলটা কেটে দিল। মাথা ঠান্ডা করার জন‍্য শান্তির প্রয়োজন, আর সেই শান্তি, সে তার প্রেয়সীর কাছে সে পাবে। তাই সে সুমুকে ডাক দিল। সুমু বেলকনিতে আসতেই শেরাজ সুমুর হাত ধরে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে সুমুর কোমর দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সুমুর বুকের সাথে মাথা লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল। সুমু একহাতে শেরাজের গলায় জড়িয়ে অন্যহাতে শেরাজের মাথায় বিলি কেটে দিয়ে বলল,

“আমি আপনাদের কোনো কথা শুনিনি। তবে এখন আপনার অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি, যে কল করেছিল সে আপনাকে রাগানো জন‍্যই কল করেছিল। আর সে তার উদ্দেশ্যে সফল ও হয়েছে। আপনি কেনো অন্যের উদ্দেশ্য সফল হতে দিবেন। কেউ যদি কোনো বাজে উদ্দেশ্য নিয়ে আপনাকে কিছু বলে, তাহলে আপনি সবসময় তার উদ্দেশ্যের বিপরীতটা আপনার মধ্যে ফুটিয়ে রাখবেন। যেমন ধরুন কেউ আপনাকে রাগাতে চাইল, আপনি আপনার ঠান্ডা, ডোন্ট কেয়ার মেজাজটা আর সামনে ফুটিয়ে রাখবেন। সবাইকে দাম দিবেন না। জাস্ট ইগনোর, খান সাহেব। কখনো কারো বাজে উদ্দেশ্যে সফল হতে দিবেন না।”
শেরাজ চুপ করে রইল। সুমু আবারও একটু উৎসাহ কন্ঠে বলল,
“খান সাহেব, আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করবেন?”
শেরাজ মৃদু মাথা নাড়ল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“শীততো প্রায় শেষের দিকে। আমি না এবছর খেজুরের রস খায়নি। আপনি আমাকে কাল সকালে খেজুরের রস খাওয়াতে নিয়ে যাবেন?”

“কোথায় পাওয়া যায়?”
“এইতো আমাদের গোপালগঞ্জ খালেকবাজারে। নিয়ে যাবেন?”
“ঠিক আছে নিয়ে যাব। কিন্তু, এখানে তো আমার বাইক, কার কিছুই নেই। অতো সকালে গাড়ি পাব কোথায়?”
সুমু একটু ভাব নিয়ে বলল,
“এই সুমু থাকতে আপনি গাড়ির চিন্তা করছেন? এই সুমুর কাছে সব সমস্যার সমাধান আছে। শুনুন, আমার শাহরুখ ভাইয়া আর আশিক ভাইয়ার বাইক আছে। আমরা তো অনেক ভোরে যাব। ওরা বাহিরে যাবার আগেই ইনশাআল্লাহ আমরা ফিরে আসতে পারব।”
“তুমি একটা জিনিস দেখেছো, সুইটহার্ট? তোমার কাজিনের নাম শাহরুখ। আমার কাজিনের নামও শাহরুখ। মিল আছে আমাদের মধ্যে, তাই না?”
“হুম, হুম! এখন আপনি বলেন নিয়ে যাবেন কিনা?”
“ওকে সুইটহার্ট! তুমি যখন বলেছো, তখন তো আমাকে অবশ্যই নিয়ে যেতে হবে।”
সুমু খুশি হয়ে শেরাজকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তাহলে চলুন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি।”
শেরাজ সুমুকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে সুমুকে বেডে শুইয়ে দিয়ে রুমের লাইট অফ করে দিল। তারপর সুমুর পাশে শুয়ে সুমুর গলায় মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করল।

ভোর পাঁচটা বাজতেই সুমু এলার্ম ঘড়ির শব্দে লাফ দিয়ে উঠে বসল। শেরাজকে ঘুম থেকে টেনে তুলে শাহরুখের রুমে গিয়ে শাহরুখকে ঘুম থেকে তুলল সে। বাইকের চাবি এনে শেরাজের হাতে দিল। হাসি বেগম খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠেন। সুমু আর শেরাজ হাসি বেগমকে বলে বেরিয়ে গেল।
কুয়াশার চাদরে ডেকে আছে পুরো ধরনী। সুমু মুক্ত পাখির মতো দু’হাত মেলে দিয়ে বাইকের পেছনে বসে আছে। পুরো একঘন্টা বিশ মিনিট লাগল শেরাজদের খালেকবাজার পৌঁছাতে। সুমু বাইক থেকে নেমে দাঁড়াতেই শেরাজ বাঁধ সাধল। সুমুকে বাইকের কাছে দাঁড়াতে বলে সে নিজে গেল রস কিনতে।
রস বিক্রেতার কাছে এসে পুরো চারটা দু’লিটারের বোতল ভরে রস দিতে বলল। রস বিক্রেতা দু’লিটারের চারটা বোতল ভরে রস দিল। শেরাজ রসের বোতল একটা ব‍্যাগে ভরে বলল,

“মামা এইটা জার্মস মুক্ত তো?”
“কি কইলেন স‍্যার? জাম? জাম এই শীতের সময় পাবেন কই? আর খেজুরের রস দিয়ে জাম খায়না তো, সাহেব।”
“আরে মামা, জার্মস। জার্মস মানে জীবাণুমুক্ত তো?”
“আরে সাহেব কি কন? এক্কেরে স‍্যাভলন আর স‍্যানিটাইজার দিয়ে স‍্যানিটাইজ করা খেজুরের রস আমার। কোনো জীবাণু নাই। একদম পিওর।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এই মধ্যে বাদুরের মুখ দিয়ে বের করা অমৃত পড়েছিল না তো? আমি কিন্তু আবার যেকোনো জিনিসের খুব গভীর পযর্ন্ত গিয়ে খতিয়ে দেখি।”
“আরে না, সাহেব। কইলাম না স‍্যাভলন আর স‍্যানিটাইজার দিয়ে স‍্যানিটাইজ করা। আপনি নিশ্চিন্তে খাইতে পারেন।”

“এইটা আমি না, আমার বউ খাবে। যদি আপনার এই স‍্যাভলন আর স‍্যানিটাইজার দিয়ে স‍্যানিটাইজ করা একদম পিওর জীবাণু মুক্ত খেজুরের রস খেয়ে আমার বউয়ের কোনো প্রবলেম হয়, তাহলে পরের দিন এসে আপনার পেছনের জীবাণু স‍্যাভলন আর স‍্যানিটাইজার দিয়ে স‍্যানিটাইজ করে আমি জীবাণুমুক্ত করব। সেই সাথে আপনার এই স‍্যানিটাইজ করা জীবাণুমুক্ত খেজুরের রসের ব‍্যবসা আপনার পেছনে দিয়ে ঢুকিয়ে সামনে দিয়ে বের করব।”
কথাগুলো বলে চলে এলো শেরাজ। রস বিক্রেতা আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ সুমুর কাছে এসে রসের বোতলের ব‍্যাগটা দিল। সুমু বোকার মতো বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থেকে বলল,
“এতো কেনো?”
“তুমি যতোটা পারো খাও। আর বাকিটা বাসায় সকলের জন‍্য নিয়ে যাব।”
“কিন্তু, খাব কিভাবে?”
“ওয়ান মিনিট!”
শেরাজ পাশের একটি চায়ের দোকান থেকে ওয়ান টাইম দুটো কাপ কিনে আনলো। সুমুকে বাইকে বসতে বলে আবারও বাইক স্টার্ট দিল সে।

বাইকে এসে থামল একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে। সুমুকে বাইকের ওপর বসে থাকতে বলে শেরাজ বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। বাইকে সাথে কোমর হেলিয়ে দাঁড়াল শেরাজ। সুমু বাইকে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। শেরাজ ওয়ান টাইম কাপে রস ঢেলে সুমুর হাতে দিল। সুমু কাপে চুমুর দেওয়ার সময় শেরাজের চোখ আঁটকালো সুমুর শুকনো অধরের দিকে। সুমু শেরাজকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচিয়ে তাকিয়ে থাকার কারণ জিঙ্গাসা করল। শেরাজ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে দুষ্টু হেসে বলল,
“তোমার ওই শুকনো ঠোঁটে ভেজা ভেজা একটা চুমু খেতে খুব ইচ্ছা করছে, সুইটহার্ট।”
“আপনি না দিন দিন বড্ড নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছেন। লজ্জা শরম কি রোজ সকালে ওয়াশরুমে গিয়ে কমোডের মধ্যে ফেলে ফ্ল‍্যাশ করে দিয়ে আসছেন?”
“আসলে বউ হয়েছে টা কি বলো তো? নতুন নতুন বিয়ে করেছি তো। আবার অনেক বেশি জামাই আদর পাচ্ছি। তাই পেটের মধ্যে এতো ভালো ভালো খাবারের জায়গা করতে গিয়ে লজ্জা শরমের জায়গা হচ্ছেনা। যতোটুকু লজ্জাশরম আছে সেটাও রোজ সকালে ওয়াশরুমের সাথে কমোডের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। এখন আমি তো আর কমোডের থেকে লজ্জাশরম তুলে রাখতে পারব না। আর তাছাড়া বিয়ের পর আমি একজন রোমান্স কিং আল্ট্রা প্রো ম‍্যাক্স হয়ে গেছি। যখন তখন সেখানে সেখানে রোমান্স পেয়ে যায়।”

“দয়া করে একটু হলেও লজ্জা শরম ধরে রাখুন। নয়তো আপনার এই যখন তখন যেখানে সেখানে পেয়ে যাওয়া রোমান্স আল্ট্রা প্রো ম‍্যাক্সের জন‍্য আমার মানসম্মান থাকবেনা।”
শেরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও বলে উঠল,
“আমি কি তোমার কথা ফেলতে পারি, বউ? ট্রাস্ট মি বউ! তুমি বলার সাথে সাথে এই মাত্রই আমি চোখের পলক পড়তে ঠিক যতোটুকু সময় লাগে, ঠিক ততোটুকু সময় ধরে আমার কিডনির ভেতর থেকে চেষ্টা করলাম একটুখানি লজ্জাশরম ধরে রাখার। কিন্তু মাঝপথে কি হলো জানো?”
সুমুর ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“কি হলো?’
“লজ্জা শরম এসে আমাকে বাঁধা দিয়ে বলল, থাম শেরাজ, থাম। নিজের বিয়ে করা আপন বউয়ের সামনে লজ্জা পাওয়াটাই তো দুনিয়ার সবথেকে বড় নির্লজ্জতার প্রমাণ। বউয়ের সামনে যে পুরুষ লজ্জা পায়, সেই পুরুষ হলো দুনিয়ার সব থেকে বড় নির্লজ্জ পুরুষ। তুই তোর বউয়ের সামনে নিজের মধ্যে সামান্যতম লজ্জা শরমকে অবশিষ্ট রেখে নিজেকে নির্লজ্জ প্রমাণ করতে পারিস না। আর তাই বউয়ের সামনে লজ্জা শরম রাখার মতো এতো বড় নির্লজ্জ কাজ আমি করতে পারব না, বউ। আমি কিছুইতে তোমার সামনে লজ্জা পেয়ে নিজেকে এতো বড় নির্লজ্জ প্রমাণ করতে পারব না।”
সুমু আর কোনো কথা বাড়াল না। রসটুকু শেষ করে বলল,
“চলুন বাসায় ফিরে যায়।”
শেরাজ বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট করল। গাড়ি ছুটল নিজ গতিতে। সুমু শেরাজকে শক্ত করে ধরে বলল,

“খান সাহেব!”
“হুম সুইটহার্ট!”
“আমি আপনার কাছে একটা জিনিস চাইব, দেবেন?”
“যেখানে গোটা আমিটাকেই তোমার নামে করে দিয়েছি, সেখানে দুনিয়ার বাকিসব কিছু আমার কাছে চাওয়াটা আর সেটা তোমার কাছে এনে দেওয়াটা আমার কাছে মামুলি জিনিস। তবে অবশ্যই সেই মামুলি জিনিসটার নাম আমার সুইটহার্ট মুখে নেওয়ার পর, সেই জিনিসটা আমার কাছে দুনিয়ার সবথেকে দামি আর সুন্দর জিনিস হয়ে যাবে। বলেছিলাম না, স্বপ্ন দেখার আর আবদার করার অধিকার শুধু তোমার। আর সেগুলো নিখুঁতভাবে পূরণ করার দায়িত্ব শুধু আমার। একবার বোলকে তো দেখো, সুইটহার্ট।”

“ওমানে ফিরে আমার জন‍্য একটা পারফিউম বানিয়ে এনে দেবেন?”
“পারফিউম?”
“হুম পারফিউম। একদম ইডনিক ব্র‍্যান্ডের একটা পারফিউম। যেই পারফিউম আজ পযর্ন্ত কেউ ব‍্যবহার করেনি, সেই পারফিউম।”
“ঠিক আছে বানিয়ে এনে দিব। তবে সেটা কোন ব্র‍্যান্ডের পারফিউম, সুইটহার্ট? আর পারফিউম কিসের স্মেল দিয়ে তৈরি করতে চাও।”
“ব্র‍্যান্ডের নাম “সুমুর খান সাহেব”।”
শেরাজ বাইকের ব্রেক কষল। পেছন ফিরে সুমুর দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল।
“পারফিউম ব্র‍্যান্ডের নাম “সুমুর খান সাহেব”। আর সেই পারফিউমের স্মেল আপনার শরীরের স্মেল দিয়ে তৈরি করতে চাই। এই পারফিউমটা শুধুমাত্র আমার জন‍্যই তৈরি করা হবে। একদম ইউনিক।”
শেরাজ একটু হেসে বলল,

“পাগলিটা আমার পাগল হয়ে গেছে।”
“উহুম! একদম সুস্থ সবল মস্তিষ্কে বলছি, আমার খান সাহেবের শরীরের স্মেল, আমার কাছে দুনিয়ার সবথেকে সুন্দর স্মেল। এই স্মেল দুনিয়ার যেকোনো পারফিউমকে হার মানাবে। এতো সুন্দর স্মেল থাকতে আমি কেনো অন‍্যকোনো কিছুর স্মেল দিয়ে পারফিউম বানাব? পারফিউম যদি ব‍্যবহার করতেই হয়, তাহলে সেই পারফিউমের স্মেল হবে আমার খান সাহেবের শরীরের স্মেল।”
একটু থামল সুমু। আবারও বলল,
“আপনি জানেন খান সাহেব, বিয়ের পর একটা মেয়ের কাছে তার স্বামীর শরীরের স্মেল আর তার স্বামীর বুকের বা’পাজরে লেগে থাকা ঘামের গন্ধ দুনিয়ার সবথেকে সুন্দর সুভাস হয়।”
“আচ্ছা, ওমান ফিরে তোমাকে সাথে নিয়ে গিয়ে বানিয়ে এনে দিব। তবে, আমি তো তোমার সাথেই থাকি তাহলে এই পারফিউমের কি দরকার?”
“আপনি যখন সাথে থাকবেন তখন তো পারফিউমের প্রয়োজন পড়বেনা। কারন তখন তো পুরো পারফিউমের গোউাউনটাই আমার সাথে থাকবে। কিন্তু, যখন বাহিরে যাবেন, অফিসে যাবেন। তখন আমার ওই পারফিউমটা দরকার পড়বে। তাছাড়া আমাদের দুজনের রুমের মধ্যে আপনার শরীরের স্মেল থাকলেও আমাদের রুমের বাহিরে তো আর থাকবেনা। তাই তখন ওই পারফিউমটা ব‍্যবহার করলে আমি পুরো ঘরময় ঘুরে বেরালেও মনে হবে আপনি আমার সাথেই আছেন।”

“ওকে, সুইটহার্ট। তুমি আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসো।”
গাড়ি স্টার্ট দিল শেরাজ। সুমু কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও বলল,
“আমি আপনাকে ভালোবাসিনা, খান সাহেব।”
আবারও বাইকে ব্রেক কষল শেরাজ। পেছন ফিরে কিছুক্ষণ সুমুকে ভালো করে দেখে বলল,
“আমি বলছি না যে, আমাকে ভালোবাসতেই হবে। আমি শুধু চাই, তুমি আমার বুকটাকে নিজের জীবনের সবথেকে শান্তিপূর্ণ স্থান মনে করো। আমি বলছি না যে, আমাকে ভালোবাসতেই হবে। আমি শুধু চাই, তুমি আমার হাত দুটোকে দুনিয়ার সবথেকে শক্ত দড়ি মনে করো। আমি বলছি না যে, আমাকে ভালোবাসতেই হবে। আমি শুধু চাই, একটা বদ্ধ গহীন অন্ধকার ঘরে তুমি আমার সাথে নিজেকে নিরাপদ মনে করো। আমি বলছি না যে, আমাকে ভালোবাসতেই হবে। আমি শুধু চাই, তোমার যেকোনো খারাপ অবস্থায় তুমি আমাকে তোমার জন‍্য ভরসাযোগ্য স্থান মনে করো। আমি বলছি না যে, আমাকে ভালোবাসতেই হবে। আমি শুধু চাই, তোমার খুব কষ্টে তুমি আমাকে তোমার জন‍্য তোমার অতি প্রিয় ডায়েরির এক একটা শূন্য পাতা মনে করো।”
সুমু আলতো হেসে বলল,

“আপনি আমার ভালোবাসা, না খান সাহেব। আপনি আমার মায়া। আপনি আমার জীবন। ভালোবাসা ভোলা যায়, খান সাহেব। কিন্তু মায়া? মায়া ভুলে থাকা যায়না। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে। কিন্তু জীবন না থাকলে মানুষের অস্তিত্ব কিসের?”
শেরাজ সুমুকে আর একটু কাছে টেনে আনলো। সুমু অবাক হয়ে বলল,
“কি করছেন? এইটা রাস্তা। কতো মানুষজন দেখেছেন?”
“তার মানে তুমি বলতে চাইছো, যেখানে মানুষ থাকবেনা, সেখানে তোমাকে নিয়ে গিয়ে আমি আদর করতে পারি?”
“আপনি যাবেন? নাকি আমি হাঁটতে শুরু করব?”
শেরাজ হেসে বাইক স্টার্ট করল। সুমু পেছন থেকে তাকে শক্ত করে ধরে রাখল।

আটটা পনেরোতে বাসায় ঢুকল শেরাজ। সুমু এসেই ওপরে চলে গেল। আইয়ুবরা শেরাজকে ঘিরে ধরল। শেরাজ হাসি বেগমের হাতে রসের বোতলগুলো দিল।
ইফতিয়া দৌড়ে এসে বলল,
“আপনারা খেঁজুরের রস খেতে গিয়েছিলেন? কই আমাদের তো একবারও বললেন না। আমারও যেতাম।”
শেরাজ বিরক্ত নিয়ে তাকাল ইফতিয়ার দিকে। সে কপালের মাঝে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে বলল,
“আমার করা এতো অপমান যদি তোমার মধ্যে পাঁচ সেকেন্ডের জন‍্য হলেও লজ্জার সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে এবছর আমি একটা অ‍্যাওয়ার্ড শো’র অর্গানাইজেশন করব। আর সেই অ‍্যাওয়ার্ড শো’তে এবছরের বেস্ট এবং সেরার সেরা লজ্জাবতী নারীর অ‍্যাওয়ার্ড আমি নিজ হস্তে তোমাকে দান করব।”
ইফতিয়া রাগে ফেটে পড়ল। কথাগুলো বলে শেরাজ তার প্রিয় সুর দুই ঠোঁট দিয়ে তুলতে তুলতে চলে রুমে চলে গেল।
সুমু ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে। শেরাজ পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

“কি নিষ্ঠুর তুমি, সুইটহার্ট। কি নিষ্ঠুর তোমার মায়া। সারাদিন আমার মন আর মস্তিষ্কের মধ্যে তোমার চিন্তাই ঘোরে। তোমার মায়ারা এতোটাই নিষ্ঠুর যে, আমার আমিটাকে নিয়ে ভাববার এক সেকেন্ডও সময় দেয়না।”
সুমু মুচকি হেসে বলল,
“দরজা খোলা।”
“তাহলে লক করে দিয়ে আসি?”
“আপনি একটা…”
“রোমান্টিক বর।” সুমুর কথা কেড়ে নিল সে।
সুমু মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“কচু!”
শেরাজ হঠাৎ করেই বলল,
“আর মাত্র ছয়দিন, সুইটহার্ট। তারপর তোমাকে নিয়ে আমি আমার দেশে ফিরব। তারপর…”
শেরাজের কথা শেষ হলোনা। সুমু নিজেকে শেরাজের থেকে ছাড়িয়ে নিল। বেলকনিতে গিয়ে গোলাপের তিনটা পাপড়ি ছিঁড়ে আনলো সে। দুটো পাপড়ি বড় আর একটা ছোট। সুমু পাপড়ি তিনটাকে হাতের তালুর ওপর সাজিয়ে শেরাজের সামনে ধরে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৩২

“তারপর এইটা।”
শেরাজ ভ্রু বলল,
“আমার স্পার্ম’কে তোমার এতোটা দূর্বল মনে হয়, সুইটহার্ট? আমার এক বিন্দু স্পার্ম একসাথে চারটা চ‍্যাম্প আনার ক্ষমতা রাখে।”
সুমু মিটিমিটি হাসল। হঠাৎ নিজ থেকে হাসি বেগমের ডাক পড়তেই দুজনে নিচে চলে গেল।

খান সাহেব পর্ব ৩৪