খান সাহেব পর্ব ৩৯ (২)
সুমাইয়া জাহান
অনুষ্ঠান শেষে গেস্টরা সকলে বিদায় নিচ্ছে। সুমু ঘুরে ঘুরে শপটা দেখছে। ‘আফগান মিনি মাট’-এর এক কোণে রাখা হ্যান্ডক্রাফটেড আফগান চকলেট। ঝিনুকের মত বক্সে সাজানো, হালকা বাদাম, কেশর, খেজুর মেশানো। সুমুর চোখ চকচক করে উঠল। সে মুখে হাসি টেনে বলল,
“এই চকলেটগুলো আমার। সে একটানা পাঁচটা গিফট বক্স চকলেট হাতে তুলে নিল।”
তখনই পেছনে শেরাজ এসে দাঁড়াল।
“এইটা কি আমার দোকান লুট?”
সুমু বড় বড় চোখ করে সামনে তাকাল। তারপর পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে শেরাজের দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
“আমি তো আপনার বউ, তাই এটা আমার অধিকার।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হ্যান্ডক্রাফটেড গিফট বক্স চকলেট’ এগুলোর প্রাইজ ৫ থেকে ৮ ওমানি রিয়াল, মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১,৪০০ থেকে ২,৩০০ টাকা। তাহলে তুমি নিয়েছো মোট ৫ বক্স। তাহলে টোটাল প্রাইজ ৪০ ওএমআর। বাংলাদেশী টাকায় ১১,৪০০ টাকা। দাও, ৪০ রিয়াল দাও।”
সুমু নাটক করে চোখ বড় বড় করে বলল,
“আপনি তো বলেছিলেন, আপনার যা সব আমার। তাহলে এখন এই শপ আর এই চকলেট আমার।”
শেরাজ ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে বলল,
“টাকা না দিলে এই চকলেট পাবেনা।”
সুমু এক টুকরো চকলেট ছিঁড়ে তার মুখে ঠেসে দিল।
“রসিদ লিখে রাখুন, ভালোবাসার দামে বিক্রি হয়েছে।”
শেরাজ চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। সুমু শেরাজের পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরখ করে বলল,
“চকলেটের দাম চাই আপনার?”
“হ্যাঁ!”
“ঠিক আছে, তাহলে এখনই দিচ্ছি।”
সুমু এক ঝটকায় শেরাজের প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। শেরাজ চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“এই! তুমি আমার ওয়ালেট…”
সুমু পাত্তা না দিয়ে ওয়ালেটের ভেতর থেকে কার্ড টেনে বের করে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি ডাকল।
“সান ভাইয়া!”
স্যান্ডি এগিয়ে এলো। চোখ মেঝের দিকে রেখে বলল,
“ইয়েস ম্যাম!”
“এই কার্ডটা রাখুন। ওনার চকলেটের দাম যা হয়েছে কেটে নিন।”
স্যান্ডি হেসে ফেললো। শেরাজ হাসি লুকিয়ে বলল,
“তুমি কি জানো, আমি এখন বললে এই শপের ক্যামেরা ফুটেজ সরাসরি আমার শাশুড়ি আম্মুকে পাঠাতে পারি?”
সুমু এক টুকরো চকলেট মুখে পুরে ফিসফিস করে বলল,
“আম্মু বলবে, মেয়ে আমার ঠিক জায়গাতেই বিয়ে হয়েছে।”
শেরাজ চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু মুখের হাসিটা লুকোতে পারল না। তবুও কোনোমতে হাসি লুকিয়ে বলল,
“এই বাটপারি কার থেকে শিখলে, সুইটহার্ট?”
সুমু আবারও চকলেটের টুকরো মুখে পুরে শেরাজকে পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরখ করল। শেরাজ দাঁড়িয়ে, দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা, চোখে এফবিআই স্পেশাল অ্যাজেন্টের ভঙ্গি। সুমু আলতো হেসে বলল,
“চকলেট তো আপনারই দোকানের।”
“তো? এই দোকান এখন প্রেমের নয়, প্রফিটের জায়গা।”
সুমু নাটকীয় ভঙ্গিতে মুখে হাত দিয়ে বলল,
“বাঁচাও! এমন অমানবিক স্বামী পেয়ে আমি সর্বস্বান্ত।”
শেরাজ স্যান্ডিকে ইশরা করল চলে যেতে। স্যান্ডি চলে গেল। সুমু চকলেট মুখে দিয়ে গুনগুন করছে। শেরাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। চোখে সেই পরিচিত আগুনের এক ঝলক। সে সুমুর একদম সামনে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল,
“চকলেটের দাম টাকা নয়, সুইটহার্ট।”
সুমু কপট ভয় পেয়ে বলল,
“তাহলে কি?”
শেরাজ হালকা হেসে চোখ নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার লিপস।”
সুমু চকলেট খাওয়া বাদ দিয়ে চোখ বড় করে তাকাল।
“কি বললেন?”
শেরাজ আর কোনো শব্দ না করে সুমুর হাত ধরে সাইউে নিয়ে গেল। তারপর ধীরে পায়ে সুমুর কাছে গিয়ে মুখটা সুমুর একেবারে কাছাকাছি নিয়ে বলল,
“তুমি যা চকলেট নিয়েছো, তার দাম অনুযায়ী আমি তোমাকে এখন পাঁচটা লং ডিপ চুমু খাব।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“পাঁটচা নিয়েছি।”
শেরাজ চোখ ছোট করে, ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“তাহলে আজ রাতটা লম্বা হবে, সুইটহার্ট।”
কথাটা বলে শেরাজের ঠোঁট ছুঁয়ে যায় সুমুর কপালে, তারপর গাল, তারপর…
সুমু হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“একটা চুমুর মধ্যে এত ইন্টারেস্টt? বিকাশ করে দিতাম, বললেই হতো।”
শেরাজ হেসে ফেলে, তারপর ধরা গলায় বলল,
“আজ রাতটা ভয়ংকর হবে।”
কথাটা বলে শেরাজ সুমুর ওষ্ঠ নিজের ওষ্ঠের আয়ত্বে নিল। কিছুক্ষণ বাদে সরে দাঁড়াল শেরাজ। সুমু লজ্জা পেয়ে ইশিতাদের কাছে চলে গেল। সুমু চলে যেতেই শেরাজের চারপাশ ঘিরে ফেলে তার পুরো গ্যাঙ্গ। সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল আইয়ুবদের দিকে। প্রথমে মুখ গম্ভীর করে আইয়ুব বলল,
“এস.কে একটা কথা বলি? তুই কি এখন রোমান্সে নাকি কো-অপারেটিভ প্রজেক্টে ঢুকেছিস? মানে ভাই, রোমান্সে এমনভাবে সিরিয়াস হয়ে গেছিস, যেন কোনো অফিস প্রজেক্টে ঢুকে গেছিস। রোমান্সকে খুব পেশাদারভাবে নিয়েছিস। যখন তখন যেখানে সেখানে শুরু করিস।”
রিসান যোগ দিল আইয়ুবের সাথে,
“পাঁচটা চকলেটের দাম পাঁচটা ডিপ চুমু? এই রেট যদি বাজারে ছড়ায়, তোর প্রেমের আইপিও-তে লাইনে দাঁড়াবে সবাই। তুই ভাবতে পারছিস এস.কে এই রেট যদি সবাই জানতে পারে, তাহলে দুনিয়া সব চকলেট পাগলি, চকলেট ব্যবসায়ীদের সাথে প্রেম করতে চাইবে। তখন মনে হবে, প্রেমটা একটা ব্যবসা বা শেয়ার বাজার।”
নিহাল গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি বুঝতে পারছিনা, চকলেটটা খেল কে? ভাবিজি নাকি এস.কে? এস.কের চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, ও বলতে চাইছে, সুমু তুমি আমার চকলেট ফ্যাক্টরি, আর আমি তোমার ট্যাক্স অফিস।”
সারবাজ হাত কানে দিয়ে অভিনয় করে বলল,
“আল্লাহ! প্রেম কি মিষ্টি, কি গরম। আমি ডায়াবেটিসের মানুষ। ওদের এই প্রেম এত মিষ্টি, এত গরম, যে কারো দেখলেই ডায়াবেটিস হয়ে যাবে। আমার সহ্য হচ্ছেনা এত রোমান্স।”
অমিত মেঝেতে কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল,
“আমি খুঁজছি, আমাদের রাগি, নিরামিষ এস.কে মেঝেতে গলে পড়ে গেছে কি’না।”
আরবাজ ভ্রু কুঁচকে বলে বলল,
“তবে ভাই, আমি তোমাদের দুজনের রোমান্স দেখে ভয়ে আছি। হঠাৎ করে একদিন দেখব, ‘শেরাজ অ্যান্ড সুমাইয়া ওয়েডিং কর্পোরেশন লিমিটেড!’ওদের প্রেম যেন একটা প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে। যেটা খুব তাড়াতাড়ি এই ‘আফগানি মিনি মার্ট- এর মতো ওপেন করবে আমাদের এস.কে ব্রো।”
সাইফ হাসতে হাসতে বলল,
“ভাই, তুই অফিশিয়ালি প্রেমে ব্যাংক্রাপ্ট।”
শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখে। সে চোখ ছোট করে বলল,
“তোদের সবার মধ্যে একটা কথা কমন. তোরা কেউ প্রেমে সাকসেসফুল না। শুধু আমিই একমাত্র প্রেমে শেয়ারহোল্ডার।”
সবাই একসাথে হুংকার দিল,
“খান সাহেবের তো লাভ শেয়ার বাজারে বুম।”
শেরাজ হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“এখন থেকে তোদের চকলেট কিনতে হলে…”
সকলে মিলে একসাথে বলল,
“কী?”
“তোদের সকলের প্রথমে প্রেমের পারমিশন লাগবে। আর আমার পারমিশন আমার একমাত্র লাইসেন্স, আমার সুইটহার্ট।”
আইয়ুব দুই হাত কোমরে রেখে বলল,
“ভাই, আজ তো দেখলাম চকলেটের বিল শোধ হলো, লাভকার্ডে। তাই বলছি, আমি তোকে একটা চুমু খাই, তুই আমাকেও চকলেট দে।”
ফাহিম সিরিয়াস মুখ করে বলল,
“বিকাশ-এর চেয়ে চুমুতে ট্রানজ্যাকশন ফাস্টার লাগে? প্রেমে টাকা লাগেনা, চুমু দিলেই সব হয়ে যায় এত ফাস্ট। তাহলে, আমরাও তোকে একটা করে চুমু দিচ্ছি। আমাদের কেও চকলেট দে।”
রাহিন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“বাহ! কার্ড সোয়াইপ করতেই সুমু সোয়াইপ করল তোর হৃদয়।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকালো।
“সুমু না তোর বোন?”
“সেটা তুই মেনেছিস কখনো?”
শেরাজ আর কোনো কথা বলল না। এবার সারবাজ মেঝেতে কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল,
“এইখানে কারো লজ্জা নামের জিনিস পড়ে আছে। শেরাজের ছিল মনে হয়।”
রাহিন শেরাজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ভাই, তুই তো এতদিন কুল ছিলি, এখন দেখি ফুল ডেইরী মিল্ক।”
আরবাজ বুদ্ধিমান ভঙ্গিতে চশমা তুলে বলল,
“আজকের শিক্ষণীয় কথা, প্রেম করলে টাকার দরকার নাই, শুধু একটা কার্ড, একটা চকলেটের বিজনেস আর একটা কিউট বউ লাগবে।”
রিয়াদ হেসে বলল,
“ভাই, একটা চকলেটের দাম যদি একটা চুমু হয়, তাহলে আমি এস.কে-কে রোজ চুমু খেতে রাজি আছি। কিন্তু, আপাতত আমি ডায়েটে আছি।”
শেরাজ সবার দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করে বলল,
“তোরা সবাই এখনই শপ ছেড়ে বের হ। আমি আজ থেকে শপে ‘ফ্রেন্ড-বর্জিত শপ’ সাইনবোর্ড ঝুলাব।”
সারবাজ হেসে বলল,
“ভাই, আমরা যাব ঠিকই, কিন্তু একটা কথা…”
সবাই একসাথে চিৎকার করে বলল,
“খান সাহেব, চকলেট দিলে কিস ফ্রি।”
শেরাজ হাসল। ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল। নিহাল হতাশ কন্ঠে বলল,
“আহ! এমন একটা বউ থাকলে আমিও ওয়ালেট লুট হতে দিতাম খুশি মনে।”
রিসান বলল,
“ভাবি তো ভাবি না, একদম চকলেট কুইন।”
আইয়ুব বলল,
“ভাইরে, আমরা তো শুধু এটিএম এর পিন জানি, কারো হৃদয়ের পিন তো জানিনা।”
সারবাজ আফসোস করে বলল,
“এইসব দেখে মনটা একদম ‘সিঙ্গেল ভিক্টিম সাপোর্ট গ্রুপ’ খুলতে ইচ্ছা করছে।”
অমিত হঠাৎ হু হু করে কাঁদার ভান করে বলল,
“আমার তো বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল, এখানো বউ তো দূরে থাক একটা গার্লফ্রেন্ড ও জুটল না কপালে।”
আরবাজ বলল,
“আমাদের জন্য প্রেম মানে নেটফ্লিক্স আর নুডলস। আমার বউ তো আমাকে পাত্তাই দেয়না।”
নিহাল একদম দুঃখী মুখ করে বলল,
“ভাই, আমরা কি মানুষ না? আমাদের প্রেম কবে আসবে উবার করে?”
শেরাজ একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। সে এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল,
“তোরা সবাই মিলে একটা কাজ কর। আমার শপের সামনেই একটা ‘“সিঙ্গল পিপল জোন’ বানিয়ে নিস। এক কাপ চা, আর এক কাপ আফসোস ফ্রি।”
রাহিন বলল,
“ভাই, তুই এখন পাক্কা প্রেমিক। আমাদের আর মানুষই ভাবিস না।”
তারপর সবাই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল,
“শেরাজ খান, প্রেমের ডাকাত, সিঙ্গেলদের দুশমন।”
শেরাজ সবাইকে বের করে দিল শপ থেকে। তারপর সুমুদের নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
আবহাওয়ার অবস্থা আজ ভালো না। সন্ধ্যা থেকে মেঘ জমেছে আকাশে। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল শেরাজরা। সুমুরা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই শেরাজের ফোনে কল এলো। সুমুদের বাড়ির ভেতরে যেতে বলে শেরাজ কল রিসিভ করার জন্য সাইডে চলে গেল। সুমু রুমে এসে বোরকা চেঞ্জ করে নিল। আজ তার পরনে সাদা শাড়ি। আয়নার একবার নিজেকে দেখে নিল সে। শেরাজ রুমে এলো। সুমুকে একবার দেখে বলল,
“আমার একটা মিটিং পড়ে গেছে। এক্ষুনি যেতে হবে।”
“এখন মিটিং?”
“হ্যাঁ! নিউ শপ তো, সেই বিষয়ে মিটিং।”
“ওহ আচ্ছা! ঠিক আছে যান।”
শেরাজ আলমারি থেকে ফর্মাল ড্রেস বের করে রেডি হয়ে নিল।
“কখন ফিরবেন?”
“চিন্তা করোনা। তাড়াতাড়ি চলে আসব।”
শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। সুমু শেরাজের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ। করিডরে একা দাঁড়িয়ে শেরাজের অপেক্ষায় সুমু। শেরাজ এখনও ফেরেনি। সুমু একা দাঁড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে স্ক্রল করছে। আরিয়ান রুম থেকে বের হতেই সুমুকে দেখতে পেল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে সুমুর পাশে এসে দাঁড়াল। আরিয়ান নীরবে, নিঃশ্বাস ফেলেই যেন ভয় জাগাতে চাইল।
“এমন করে একা একা দাঁড়াতে নেই, সুমু। এই বাড়িতে সবাই ভালো মানুষ না। কেউ কেউ খুব বেশি মনোযোগী ও হয়ে যায়, যেমন আমি।”
সুমু চমকে পাশে তাকাল। আরিয়ানকে দেখে সে কোনো কথা না বলে রুমের দিকে অগ্রসর হতেই, আরিয়ান সামনে এসে সুমুর পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,
“চলে যাচ্ছো কেনো? একটু কথা বলো। আমি সত্যি খুব মনযোগী তোমার প্রতি।”
সুমু কপাল কুঁচকে স্থির গলায় বলল,
“আপনার এই মনোযোগ খুব অস্বস্তিকর, আরিয়ান ভাইয়া।”
আরিয়ান হেসে একটু ঝুঁকে বলল,
“উফফ! ভাইয়া? জোরে লাগল ডিয়ার। তোমার গলার কাঁপুনি, চোখের রাগ, সব দেখে ফেলেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি চাইলে খারাপ হতে পারতাম। এখনও পারি। কিন্তু হব না।”
সুমু এক ধাপ পিছিয়ে গেল।
“আপনি হয়তো অভ্যস্ত, আপনাকে সবাই সহ্য করে নেয়। কিন্তু আমি করব না। আমি ‘না” বলতে জানি। আর আপনি কী পারেন না পারেন, সেটা প্রমাণ করার দরকার নেই। আমি ভয় পাই না, আমি ঘৃণা করি।”
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি।
“ঘৃণা” মজার জিনিস। অনেক ভালোবাসার শুরু হয় সেখান থেকেই, জানো তো? এমনকি তোমার খান সাহেবের মতো পুরুষও একদিন…” একটু থামল আরিয়ান। চোখে অদ্ভূত আগুন আর ঠোঁটে অদ্ভূত হাসি টেনে বলল, “ভুল করতেই পারে।”
সুমু এবার একেবারে কাছে এগিয়ে এলো। তার চোখে আগুন।
“আপনি নিজের সীমা না জানলে, আমি তা শিখিয়ে দিতে জানি। আপনি যাকে দুর্বল ভাবছেন, সে যদি কখনো ভয় না পেয়ে দাঁড়িয়ে যায়, আপনার মুখেই থুথু ফেলবে একদিন।”
“থুথু? ইন্টারেস্টিং! তুমি জানো, তোমার মতো তেজি, আত্মসম্মানী মেয়ে সবসময়ই আমার প্রিয়। কারণ ওদের ভেতরে কী চলছে, তা জানার জন্য সময় দিতে হয়। আর আমি সময় দিতে ভালোবাসি।”
সুমু কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে একধরনের সতর্কতা।
“আপনি হয়তো সময় দিতে ভালোবাসেন, কিন্তু সবাই সময় নিতে চায়না, আরিয়ান ভাইয়া।”
আরিয়ান ঠোঁট টিপে হাসল।
“তোমার চোখে ওই ভয় মিশ্রিত আত্মবিশ্বাসটা খুব ভালো লাগে, সুমু। কে জানে, তুমি যদি এস.কে’র না হতে, তাহলে হয়তো আমি…”
সুমু আবারও এক ধাপ পিছিয়ে গেল। এবার তার চোখে কাঁটার মতো তীক্ষ্ণতা।
“আপনি ‘হয়তো’ দিয়ে শুরু করেছেন, আর আমি ‘না’ দিয়ে শেষ করছি। আমার চারপাশে জায়গা কম, আর আমার চারপাশে সম্মান ছাড়া কারও জায়গা হয় না।”
আরিয়ান একটু থমকে হেসে বলল,
“তোমার মতো সোজা মেয়ে খুব কম দেখেছি। খেয়াল রেখো, এমন সোজা পথে হাঁটলে কেউ না কেউ টেনে ধরবেই।”
সুমু ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“যারা টেনে ধরে, তাদের হাতই বেশি ভাঙে। আর হ্যাঁ, আমার পথে আলোর ছায়া নিয়ে খেলতে আসবেন না, অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন।”
“অন্ধকার যদি হয় তোমার ভেতরের, তাহলে আমি লক্ষ কোটিবার হারিয়ে যেতে রাজি আছি।”
“সামনে থেকে সরে দাঁড়ান। আমাকে যেতে দিন।”
“আরে থাকো না। ভালোই তো লাগছে। তাছাড়া, তোমার হাজব্যান্ড এখনো আসেনি।”
সুমুর রাগে গা জ্বলছে। আরিয়ানের চোখে লোভ স্পষ্ট। সে বাঁকা হেসে বলল,
“তুমি জানো যখন প্রথম তোমাকে দেখি, মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা আমার। উফফ! কি অদ্ভুত সুন্দর ফিলিংস। কিন্তু, তুমি তো ভুল মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছ। শেরাজ তো কেবল রাগ করতে জানে, মায়া দিতে নয়। তুমি চাইলে আমি তোমায় এমন জীবন দিতে পারি। যেখানে শুধু ভালোবাসা থাকবে, রাগ নয়, ভয় নয়।”
“আপনি একটা ভুল করেছেন। আপনি যাকে দুর্বল ভেবেছেন, সে একজন স্ত্রী। যার নামের পাশে ‘শেরাজ খান’ জুড়ে আছে। আর যার হৃদয়ের পাশে রাগ নয়, আগুন জ্বলছে।”
“শেরাজের নাম নিয়ে তোমার এত অহংকার? শেরাজের ভালোবাসা নিয়ে তোমার এত গর্ব? তাহলে এতো রাতে তুমি একা কেনো, সুমু? ওইরকম একটা রাগী লোকের থেকে তো কেউ ভালোবাসা পায় না, পায় শুধু শাসন। তুমি হাসো, কিন্তু আমি জানি, তুমি আসলে একা।”
“খান সাহেব আমাকে যে সম্মান আর ভালোবাসা দেয়, সেটা আপনি কোনোদিন কাউকে দিতে পারবেন না।”
আরিয়ান ঘন নিঃশ্বাস ছাড়ল।
“তুমি জানো, যদি আমি চাই এক রাতেই তোমার পুরো পৃথিবীটা পাল্টে দিতে পারি। তোমার ওই তথাকথিত শেরাজ তোমায় সময় দেয় না। ফুফুমনি তোমাকে কত অপমান করে। তুমি শুধু একটাবার ‘হ্যাঁ’ বলো, সব বদলে যাবে সুমু। আমি তোমাকে অনেক ভালো রাখব। দুনিয়ার সব সুখ তোমার পায়ের কাছে এনে ফেলব।”
“আপনি যতটা নিচে নামতে চান, নামুন। কিন্তু মনে রাখবেন, একটা মেয়ের সম্মান ভাঙতে গেলে, আপনাকে প্রথমে নিজের বিবেক পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আর রইল, সুখের কথা? আমার খান সাহেবের সামান্য উপস্থিতিতে আমি যে সুখ পায়, সেই সুখের কাছে দুনিয়ার সব সুখ তুচ্ছ।”
আরিয়ান ধীরে- ধীরে ওর দিকে এগোলো।
“ভেবো না, আমি ভয় পাই তোমার স্বামীকে। সে শুধু চিৎকার করতে পারে। আর আমি কাজ করি, নীরবে।”
সুমু পিছিয়ে গেল। পেছতে পেছতে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে গেল তার। আরিয়ান দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“তুমি যদি এতটা ‘স্মার্ট’ আর আত্মসম্মানী না হতে, তাহলে অনেক কিছু বদলে যেত, সুমু। এস.কে কী এমন দেখল তোমার মধ্যে আমি জানি না, তবে আমি বেশ ভালোভাবেই অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছি।”
সুমু দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনি দেখার অধিকার রাখেন না।”
“তবুও দেখছি। আর মজার ব্যাপার, তুমি তো কখনও থামাওনি আমাকে। একা থাকো, চোখে চোখ রাখো, চুপচাপ শুনে যাও।”
সুমু এবার এক ধাপ কাছে এগিয়ে এলো। গলায় ভয়ানক শীতলতা। রাগে নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে।
“শুনুন, আপনি ভুল ভেবে ফেলেছেন। আমি আপনার বন্ধু না, আপনাকে সহ্য করার বাধ্যতাও আমার নেই। ভুলে যাবেন না, আমি আপনার ভাইয়ের বউ। এই সম্পর্কের ওজন আপনি বোঝেন না। তাই বলছি, সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আরেকবার এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বাজে কথা বললে, আমি নিজে গিয়ে খান সাহেবকে সব বলব। তখন কী হবে, সেটা ভাবার সময়ও পাবেন না আপনি। আর চুপ থাকা মানে মেনে নেওয়া না। কখনও কখনও চুপ থাকা মানে শুধরানো জন্য একটা সুযোগ দেওয়া।”
আরিয়ান ব্যঙ্গ করে হাসল। সুমু আবারও বলল,
“আপনি ‘আরিয়ান ভাইয়া’, কিন্তু সেটা ঠিক ততদিন পযর্ন্ত, যতদিন পর্যন্ত আপনি আপনার সম্মান ধরে রাখতে পারবেন। আর না পারলে আপনি শুধু ‘একটা নাম’ হয়ে থাকবেন, যেটা আমি শুধুমাত্র ঘৃণা করে উচ্চারণ করব।”
আরিয়ান বাঁকা হাসল। তার ঠোঁটে কুৎসিত হাসি। সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“এই চুলের গন্ধ, এই নিঃশ্বাস, এস.কে জন্যই সব? একটু বাঁচিয়ে রাখো আমার জন্য?”
সুমু একটুও ভয় না পেয়ে বলল,
“আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি, আর সেটাই আপনাকে ঘৃণা করার জন্য যথেষ্ট।”
আরিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে, গলায় বিষ নিয়ে বলল,
“তুমি ভীষণ সুন্দর, সুমু। আমি অনেক মেয়ে দেখেছি, কিন্তু তোমার চোখে ভয় নেই, আর তাতেই নেশা চড়ে, জানো?”
সুমু ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আপনি নেশা বলেন আর অসভ্যতা, দুটোরই নাম একটাই– আমার ক্ষেত্রে এসব নোংরামি।”
“তুমি বুঝতে চাইছ না আমাকে। এস.কে থাকলে পারতে কী এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে?”
“খান সাহেব থাকলে আপনি এই জায়গায় থাকার সাহস করতেন না। এখন আমি একা আছি, আর আমি নিজের সম্মান রক্ষা করতে জানি। আপনার মতো নিচ মনোবৃত্তির মানুষদের জন্য আমার ভয় নেই, আছে ঘৃণা।”
আরিয়ান থেমে গেল। মুহূর্তের জন্য যেন সুমুর চোখে ভয় না দেখতে পেয়ে তার ভেতরের দম্ভটাও কেঁপে ওঠল। সুমু আবারও বলল,
“আরেকবার এমন আচরণ করলে, আমি চুপ করে আরেকটি মুহূর্তও থাকব না। ভদ্রভাবে দূরে থাকুন, না হলে আমার প্রতিবাদ হবে এতটাই ভয়ংকর, আপনি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পারবেন না।”
আরিয়ানের নজর সুমুর পা থেকে শুরু করে বুকে এসে থামল। ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি নিয়ে বলল,
“তোমার চোখে আগুন, কিন্তু শরীরটা? সেটা তো আগুনে পোড়ানোর জন্য না। ছুঁয়ে দেখার জন্য। তোমার আচরণে মায়া আছে। আর এই হোয়াইট শাড়িতে তোমাকে তো জাস্ট…”
সুমু চোখে বিস্ফোরণ। সে গলা স্বাভাবিক রেখেই বলল,
“আপনার মতো লোকের হাতের ছোঁয়ায় মেয়ে মানুষ পুড়ে ছাই হয় না, বরং সেই হাতই পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। আপনি মেয়েদের শরীর বোঝেন, আত্মা বোঝেন না।”
“তুমি বলো, তুমি আমার ভাইয়ের বউ। কিন্তু তোমার চোখে তো অন্য ভাষা দেখি। এস.কে বুঝে না, আমি বুঝি। এমন রূপ, কেউ চাপা দিয়ে রাখতে পারে?”
“আপনার মতো পঁচা মন যার থাকে, সে সাদা কাপড়েও কালি খোঁজে। আপনি যা ভাবছেন, সেটা হলো আপনার কল্পনা, নয়তো বিকৃত লালসা। আর একটা কথা মনে রাখবেন, আমার ইজ্জত আর সম্মান, আপনার মতো লোকের খেলনা না।”
“তোমার ঠোঁট এত সুন্দর। অধিকার থাকলে অন্যভাবে চুপ করাতাম।”
সুমু চোখে ঘৃণার আগুন।
“আপনার চোখে সম্মান নেই, তাই মুখেও নেই। আমার ঠোঁট আপনি কল্পনাতে রাখলেও তো আপনার কলিজা ছিঁড়ে বের করে আনবে আমার খান সাহেব। আর আপনি বাস্তবে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেন? নিজের নোংরা মানসিকতার পরিচয় দেওয়া বন্ধ করুন। আমি শুধু মুখে প্রতিবাদ করিনা, দরকার হলে হাতও ব্যবহার করি। কিন্তু আফসোস, আপনার মতো নোংরা লোককে চড় মারার জন্য স্পর্শ করলে আমার হাত নোংরা হবে।”
“এই ভয় দেখিয়ে কী হবে, সুমু? তোমার ‘না’ এর মধ্যেও আমি ‘হ্যাঁ’ শুনতে পাই। তুমি যতই রাগ করো, ততই তোমাকে নিজের করে পেতে ইচ্ছে করে।”
সুমু এবার সম্পূর্ণ শান্ত। সে ঠান্ডা আগুনের মতো করে বলল,
“আপনার কল্পনায় আমি আগুন। বাস্তবে আমি আগ্নেয়গিরি। আপনার স্পর্শতো দূরে থাক, আপনার ছায়াও যদি আমার ওপর পরে, তাহলে আপনি নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ, আমি আবারও বলছি, আমি আপনার ভাইয়ের স্ত্রী। এই পরিচয়েই মাথা উঁচু করে বাঁচি, আর আপনাকে ঘৃণা করে দেখি। এখন সরে যান।”
আরিয়ান ঠোঁটে একরাশ নোংরা হাসি নিয়ে বলল,
“যেতে তো তোমাকে দিব না। তুমি জানো সুমু, আমার কল্পনায় তোমাকে সাদা শাড়িতে দেখলে মনে হয় তুমি স্বর্গের রূপ। শরীরটা তুলোর মতোই নরম, স্পর্শের জন্যে চিৎকার করে আমার মন।”
“আপনার জিভ পঁচে গেছে। তাই হয়তো রূপ দেখে নয়, শরীর দেখে মুগ্ধ হন। আপনি নারী দেখেন না, দেখেন কেবল ভোগের বস্তু।”
“তোমার ঠোঁট এত সরু, তবুও কথায় এত বিষ। কিন্তু এই বিষও যদি আমার ত্বকে মিশে যায়, আমি দুঃখ করব না।”
“আপনি যতই বিষ পানি করতে চাননা কেনো? আমি আগুনের ফুলকি। আমার শরীর, আমার সম্মান স্পর্শের বাইরে। আর আপনার মতো মানুষদের জন্য তো নয়-ই।”
“তুমি কি জানো, ভয় দেখাতে গিয়ে তুমি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে যাচ্ছো? তুমি যত রেগে যাচ্ছো, আমার ততটাই ইচ্ছে করছে তোমাকে…”
সুমু কঠিন গলায় বলল,
“আপনার ইচ্ছে একটা ঘৃণার গল্প। আপনি ভাবেন, আমার চোখের ভয় বা আগুন আপনাকে শক্তি দেবে। তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। আমি আপনার মতো পুরুষদের মুখে থুথু দিতে জানি।”
“এস.কের নাম নিয়ে বাঁচবে না, সুমু। ও তোমার শরীরকে এই আরিয়ান চৌধুরীর ছোঁয়া থেকে দূরে রাখতে পারবেনা।”
সুমু ঘৃণাভরা গলায় বলল,
“আপনি যা ভাবছেন তা স্বপ্নেও হবে না। আপনি যতটা নিচুতে আছেন, আমি ততটাই উঁচুতে। আপনি আমার ‘না’ বোঝেন না, তাইনা?”
আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে বিকৃত হাসি হেসে বলল,
“তোমার এই চোখে জেদ আছে ঠিকই, কিন্তু আমি জানি মনের ভেতর একটা খালি জায়গা আছে, যেটা এস.কে পূরণ করতে পারেনি।”
সুমু ধীরে ধীরে এক’পা সামনে এগিয়ে এলো। চোখে আগুন, ঠোঁট কঠিনভাবে চেপে ধরা। কণ্ঠ নরম কিন্তু প্রতিটি শব্দ ছুরির মতো ধারালো,
“আপনার মতো নোংরা, নিচু মানসিকতার মানুষের সাথে কথা বলাটাই রুচিতে বাঁধে। মুখে থেকে যে গন্ধটা বেরোচ্ছে, তা শুধু ঘৃণা নয়, আপনার চরিত্রের দুর্গন্ধ। আপনার মতো লোকদের জন্য আমার কাছে আছে শুধু ঘৃণা। আর আমি এমন একজনের স্ত্রী, যার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই সম্মানের আশ্রয়। আপনি সেই ছায়ার ধারে আসার যোগ্যও নন। তাই নিজের জায়গা চিনে কথা বলুন।”
আরিয়ান হাসল। সুমু আবারও বলল,
“আপনি আমাকে স্পর্শ করার স্বপ্ন দেখার আগে আয়নায় গিয়ে নিজের চোখ দেখুন। সেখানে আপনার প্রতি আমার ঘৃণা দেখতে পারবেন। আজ থেকে আমার কাছে আপনি একটা ধিক্কারের নাম, আর কিছু না।”
আরিয়ান আবারও এগিয়ে আসতে গেলেই, সুমু আরিয়ানের মেইন পয়েন্টে হাঁটু দিয়ে মারল। ব্যথা জায়গায় হাত রেখে আরিয়ান চোখমুখ কুঁচকে কোমর বাঁকিয়ে ঝুকে পড়ল। এই সুযোগে সুমু দৌড়ে রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল।
নাজমিনের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে আইয়ুবের নামটা ভেসে উঠল। নাজমিন কল রিসিভ করে ঘুমচোখে বলল,
“আপনি কি চান? আমি কি এই রাতের বেলায় না ঘুমিয়ে এখন আপনার ফালতু কথা শুনব?”
আইয়ুব হেসে বলল,
“তুমি তো আমার ব্রাউন গার্ল। আমার ওপর রাগ করে আছো?”
“না! ফোন রাখুন, ঘুমাব।”
“তুমি রাগ করলে বেশি কিউট লাগো।”
“প্রেম সকালে করব, এখন ঘুমাই।”
“না! এখন প্রেম করার সময় তুমি জানো না? রাত গভীর হলে প্রেম করতে হয়।”
“উফফ! ঘুমান তো। হুদাই বাজে কথা বলে, আমার মাথা ব্যথা বানাইয়েন না।”
“ভালোবাসা মানেই তো মাথা ব্যথার ঔষধ খাওয়া, আর তুমি তো আমার ছাম্মাক ছালো, একটা মিষ্টি দুষ্টু ব্যথা।”
“আপনাকে আমি ছেড়ে দিব একদিন। হুদাই প্যারা, ভালো লাগেনা।”
“ছাড়লেও তুমি থাকবে আমার ওয়াইফাই কানেকশনের মতো। না থাকলেও নাম দেখা যায়।”
নাজমিনের মেজাজ গরম হলো। সে কল কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে আবারও শুয়ে পড়ল।
বাহিরে বৃষ্টি পড়ছে। একটার দিকে বাড়ি ফিরল শেরাজ। সুমু মন খারাপ করে শুয়ে আছে। শেরাজ ফ্রেশ হবার জন্য ওয়াশরুমে যেতে গিয়েও ফিরে এলো। সুমুর পাশে বসে সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”
“না!”
শেরাজের বিশ্বাস হলোনা সুমুর কথা। সে উঠে দাঁড়াতেই সুমু হাত টেনে ধরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে।”
সুমু ভয় পেয়ে গেল। সে চায় না এই মাঝরাতে কোনো ঝামেলা হোক। সে শেরাজের হাত টেনে ধরে বলল,
“বাসার জন্য মন খারাপ। সবাইকে অনেক মিস করছি।”
শেরাজ বসল সুমুর পাশে। সুমু জড়িয়ে ধরল তাকে। চোখ ভিজে উঠল সুমু। কান্নাজড়িত গলায় বলল,
“আমার খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে।”
শেরাজ একবার জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকাল। সুমুর মন খারাপ বলে আর না করল না। ড্রয়ারে একটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে এসে ফর্মাল ড্রেসেই সুমুকে নিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হলো। আরিয়ান পানি নিয়ে উপরে ওঠার সময় ওদের দুজনকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বৃষ্টি পড়ছে। ছাদের চারদিকে জমে আছে নীরবতা আর বৃষ্টির শব্দ। সাদা শাড়িতে ভিজে সুমু দাঁড়িয়ে আছে ছাদের এক কোণে। তার ভেজা চুল, চোখের নিচে পানির রেখা, আর ভেজা আঁচলের আড়ালে এক অপার্থিব সৌন্দর্য।
শেরাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। সাদা শার্টের হাতা গুটিয়ে রাখা, চুলে বৃষ্টির জল। এক হাঁটুমুড়ে সে বসল সুমুর পায়ের কাছে। সুমুর পা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। পকেট থেকে নুপুর বের করে আলতো হাতে সুমুর পায়ে পরিয়ে দিল। সে একটু ঝুঁকে সুমুর পায়ের ওপর ঠোঁট ছোঁয়াল। শেরাজ হঠাৎ এমন নরম স্পর্শে মৃদু কেঁপে উঠল সুমু। শেরাজ মুখ তুলে তাকাতেই পা নামিয়ে নিল সে। শেরাজ আবারও তাকাল সুমুর পায়ের দিকে। এমন সময় ছাদের দরজার এসে দাঁড়াল আরিয়ান। তার হাতে ফোন। সে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। শেরাজ আর সুমুকে এমন অবস্থায় দেখে রাগ জ্বলে উঠল আরিয়ানের মস্তিষ্ক। সে সুমুদের কাছে যাবার জন্য পা বাড়াতে গিয়েও থমকে গেল। রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে স্থান ত্যাগ করল।
শেরাজ ছাদের দরজার দিকে তাঁকিয়ে বাঁকা হাসল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে নেশালো কন্ঠে বলল,
“তোমায় কেউ দেখতে পাবেনা, সুইটহার্ট। এই ছাদ, এই রাত, এই বৃষ্টি আর শুধু আমি আর তুমি।”
সুমু বৃষ্টি ভেজা ঠোঁটে বলল,
“ছাদের মধ্যে এইসব কি শুরু করেছেন? আমার পায়ের সামনে বসে আছেন। কেউ দেখতে পেলে আমাকে খারাপ ভাববে। বলবে স্বামীকে পায়ের কাছে বসিয়ে রেখেছি।”
শেরাজ ধীরে সুমুর পায়ে হাত রাখল।
“তোমার গলায় ওই চেইনটা আমার স্পর্শ চাই, কারো চোখ না।”
সে উঠে দাঁড়িয়ে সুমুর গলায় থাকা ডায়মন্ডের চেইন খুলে নিল। তারপর কানের দুল, হাতের ব্রেসলেট একে একে খুলতে থাকে সে। শেরাজের শীতল হাতের প্রতিটা স্পর্শে যেন সুমুর সময় থেমে যায়। বৃষ্টির ভেজা শাড়ির নিচে সুমুর সারা দেহ কাঁপছে, ভালোবাসায়, লজ্জায়, আর তার খান সাহেবের অনিবার্য টানেই। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র পুরুষটাই তার জগৎ ‘শেরাজ খান।’ যে তার অলঙ্কার নয়, আত্মা খোঁজে ব্যাকুল। সুমুর হৃদয়জুড়ে এখন শুধুই একটাই শব্দ ‘খান সাহেব।’ তার সমস্ত সত্তা ভিজে গেছে, শুধু বৃষ্টিতে না, শেরাজের চাহনিতে। ভেজা শাড়ির ফাঁকে বুকের নিচে কাঁপছে লাজ আর একরাশ না বলা আকাঙ্ক্ষায়।
শেরাজ ঘোর লাগা চোখে তাকাল সুমুর দিকে। শেরাজ চোখে বৃষ্টি নেই, ছিল না কোনোদিন, থাকতো শুধু আগুন। আর সেই আগুন এখন জ্বলছে তার মনের ভিতর, আর সুমুর ভেজা অবয়বের প্রতিটা রেখায়। সে মুখ এগিয়ে নিয়ে সুমুর কানে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি জানো না সুইটহার্ট, এই সাদা শাড়িটা ঠিক কতটা অন্যায় করছে আমার সঙ্গে। তুমি জানো না, তোমার এই ভেজা কাঁপুনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।”
তার হাতটা ধীরে ধীরে উঠে যায় সুমুর কাঁধে। আঁচলটা একটুখানি সরালেই, সুমুর নিঃশ্বাস থমকে যায়।
“খান সাহেব, না প্লিজ…”
শেরাজ সুমুকে ভয় দেখিয়ে আলতো হাসল। শেরাজের হাসিমাখা ঠোঁট ছুঁয়ে যায় সুমুর কপাল, তারপর গালের কোণে, আর একটুখানি নামতেই, সুমু চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার হৃদয়ের মধ্যে তখন একটা যুদ্ধ। লজ্জা বনাম আকাঙ্ক্ষা। তবু সে নিজেকে সরায় না। সে চোখ বন্ধ রেখে বলল,
“আপনি আমায় এমন করে স্পর্শ করলে, আমি এলোমেলো হয়ে যায়।”
শেরাজ আবারও সুমুর কপালের ঠিক মাঝখানে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“তোমাকে এলোমেলো দেখতে চাই। আমার এলোমেলো স্পর্শ থেকে বাঁচতে তোমায় পালাতে দেখতে চাই। তোমায় শুধু ছুঁতে চাই, প্রতিটা লজ্জা পেরিয়ে, তোমার আত্মা পর্যন্ত পৌঁছাতে চাই।”
হঠাৎ একটা বিদ্যুত চমকালো। সুমু শিহরিত হলো, কিন্তু তাতেও শেরাজের স্পর্শ থেমে গেল না। বরং সে সুমুকে নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। শেরাজ আবারও সুমুর কাঁধে হাত রাখল। তার চোখে আজ রাগ নেই। আছে শুধু তৃষ্ণা, যেটা কোনো জল মেটাতে পারে না। হঠাৎ, এক ঝটকায় সে সুমুকে কোলে তুলে নিল। সুমুর ভয় রুদ্ধ হয়ে শেরাজের বুকে চাপা পড়ল।
“খান সাহেব, আশেপাশের বাসা থেকে কেউ দেখবে।”
“দেখুক না! জানুক সবাই, তোমার স্বামী শুধু তোমাকেই চায়। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস, প্রতিটা কাঁপুনির অধিকার আমার।”
বৃষ্টির মধ্য দিয়ে সে ধীরে ধীরে হেঁটে গেল। ভেজা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। তার প্রতিটা পদক্ষেপে যেন সে তার মালিকানা দাবী করছে সুমুর প্রতি। সুমু আজ চুপ। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে শেরাজের ঘাড় জড়িয়ে ধরল। তার অশান্ত বুকে শেরাজের বুকের সঙ্গে বুক লেগে আছে। তার মনে হচ্ছে, তার ছোট দেহটা ঢেকে আছে তার খান সাহেবের বুকের ছায়ায়। শাড়ির কাপড়ের আর কোনো অস্তিত্ব যেন নেই।
দরজা খুলে তারা ঢুকে পড়ল বেডরুমে। শেরাজ সুমুকে বিছানায় রাখল না। সে সুমুকে দাঁড় করিয়ে দিল জানালার সামনে। জানালার কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলরাশি। চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা, শুধু বৃষ্টির শব্দে যেন এক সুর বেজে চলেছে।
সাদা শাড়িটা গায়ে লেগে আছে সুমুর। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে ধীরে ধীরে সুমুর চুলের ভেজা গোছা একপাশে সরিয়ে দিল।
“তুমি জানো, এই ঘাড়ে আমার ঠোঁট কখনো থেমে থাকতে পারে না।”
সে ঠোঁট ছোঁয়ায় সুমুর গলায়। গলা বেয়ে তার ঠোঁটের স্পর্শ নেমে যায় কাঁধ ছুঁয়ে পিঠের মাঝ বরাবর। সুমুর নিশ্বাস যেন থেমে গেল।
“খান সাহেব, আমি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে দেয়ালে মিশিয়ে দিল।
“দূর্বল হয়ে যাও, সুইটহার্ট। দূর্বল হয়ে যাও, যেন আমি তোমার প্রতিটা দূর্বলতাকে নিজের করে নিতে পারি।”
তার হাত এবার ধীরে ধীরে সুমুর শাড়ির আঁচল খুলে দিল। না! কোনো তাড়াহুড়ো নয়, শুধু ভালোবাসায় মোড়া গতিতে। সুমুর শরীর থেকে খুলে নেওয়া অলংকারগুলো পকেট থেকে বের করে মেঝেতে ফেলে দিল শেরাজ। সুমু চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীরটা কাঁপছে, কিন্তু সে সরছে না। শেরাজ তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার শরীর না, সুইটহার্ট। আমি তোমার আত্মাকে ছুঁতে চাই।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“আমার আত্মা অনেক আগেই পুরোপুরি আপনার হয়ে গেছে।”
শেরাজ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সুমুর ভেজা চুলের ফাঁকে, চোখেমুখে ছিল অদ্ভুত এক শান্তি, অথচ ভেতরটা যেন ঝড়ো সমুদ্র। শেরাজ মৃদু গলায় বলল,
“তুমি জানো? এই বৃষ্টি, আমাকে তোমার কথা মনে করায়। সেই প্রথম দেখা, প্রথম স্পর্শ।”
সুমু চোখ নামিয়ে ফেলল। বৃষ্টি যেন আরও জোরে পড়তে লাগল। শেরাজ ধীরে ধীরে তার মুখের দিকে এগিয়ে গেল।
“তুমি কি জানো, আমি কতটা ভয় পাই? যদি কোনোদিন তোমায় হারিয়ে ফেলি?”
সুমু কাঁপা গলায় বলল,
“সৃষ্টিকর্তা না চাইলে আপনি আমায় হারাবেন না। আমি আছি, সব সময়, সব বৃষ্টিতে, সব নির্জনে, শুধু আপনার জন্য।”
হঠাৎ করে শেরাজ রুমে হিটার অন করল। বাহির থেকে আসা আলো নরম হয়ে এসেছে। চারপাশে যেন এক ঘোর লেগে আছে। সুমুর ঠোঁট কাঁপছে। শেরাজ তার ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“তোমার ঠোঁট কাঁপছে, সুইটহার্ট। ‘খান সাহেব’ বলে ডাকো তো একবার।”
সুমু লাজুক হেসে বলল,
“খান সাহেব!”
শেরাজ তার ঠোঁটে আবারও আলতো ছোঁয়া দিল। তারপর একে অপরের আলিঙ্গনে হারিয়ে গেল। কিছু সময় যেতেই শেরাজ সুমুকে দিয়ে ছেড়ে বলল,
“আই ব্যাডলি নিউ ইউ, সুইটহার্ট।”
শেরাজের কণ্ঠটা যেন বর্ষার মাঝরাতে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির মতো গাঢ় ও মায়াময়। কথাটা বলার সময় শরাজের চোখ আটকায় সুমুর চোখে। সেই চোখে ছিল একধরনের তৃষ্ণা, এক গভীর চাহনি, যা কোনো ভাষায় বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। শেরাজের বলা কথার মাঝে ওদের দুজনের নিঃশ্বাস মিলিয়ে গেল। শেরাজ এক হাতে সুমুর গাল স্পর্শ করল, তার ঠোঁটের ডগায় ছুঁয়ে দিল একরাশ আগুন চোখে ছিল তৃষ্ণা, যাতে মিশে আছে প্রেমের অদ্ভুত কোমলতা।
বৃষ্টির শব্দের মাঝে নিঃশব্দ দুজনের ওষ্ঠের ছোঁয়া চলল দীর্ঘ সময়, যেন সময় থেমে গেছে। সুমুর হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে, শেরাজের স্পর্শে তার সারা শরীরে বৃষ্টির মতোই ঠান্ডা অথচ জ্বলন্ত আবেশের অনুভূতি হচ্ছে।
ঘরটা অন্ধকার। শুধু জানালার বাইরে বিদ্যুতের আলোয় মাঝে মাঝে ঝলকে উঠছে তাদের মিলন।
শেরাজ ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি জানো, এই বৃষ্টিভেজা রাতটা আমি শুধু তোমার জন্য রেখে দিতে চাই। চুপিচুপি, শুধুই আমাদের ভালোবাসার জন্য।”
সুমু কোনো উত্তর দিল না। তার ঠোঁটজোড়া অস্বাভাবিক মাত্রায় কাঁপছে। চোখের পাতায় জমে আছে ভিজে অনুভব, বৃষ্টির নয়, শুধু শেরাজের ছোঁয়ার। শেরাজ ধীরে ধীরে তার মুখের আরও কাছে এসে বলল,
“তোমার শরীরের এই ভেজা ঘ্রাণ, এই কাঁপুনি, আমাকে পাগল করে দিচ্ছে, সুইটহার্ট। আমি যদি এখন নিজেকে আটকে রাখি, তবে সে আমি হবো না। সে হবে কেবল এক সমাজভীরু শেরাজ।”
সুমুর চোখে একধরনের নীরব আগুন। সে জানে, কিছু বলতে গেলেই সব ভেঙে পড়বে। তবু সে বলেল,
“আপনি আমার দিকে এমন করে তাকাবেন না, খান সাহেব। আমার আজ আবারও নতুন করে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।”
শেরাজের ঠোঁট ছুঁয়ে যায় এবার তার গলার ঠিক নিচে, যেখানে শাড়ির আঁচল আর জল একসাথে মেখে রেখেছে তৃষ্ণা।
“তোমার লজ্জা, আমার শান্তি।”
তার হাতটা এবার নামল সুমুর কোমরে। সুমু আবারও কেঁপে উঠল। শেরাজ হেসে ফেলল। সেই হাসি কোনো পাপের নয়, ছিল এক ধরনের প্রেমের দুঃসাহস, এক ভালোবাসার অধিকার।
“সৃষ্টিকর্তা তোমায় আমার কপালে লিখেছে, সুইটহার্ট। তুমিই কেবল আমার হক।”
তাদের মাঝখানে তখন শুধু একটুখানি দূরত্ব। জানালার বাইরের ঝড় বাড়ছে, আর ঘরের ভিতরে দুজন মানুষের মনের ভেতরের ঝড় বাড়ছে। আচমকা সুমু শেরাজকে জড়িয়ে ধরল।
শেরাজ তখন আর থামল না। সে সুমুকে কোলে তুলে নিল। বৃষ্টির শব্দে হারিয়ে গেল শাড়ির ভেজা ঘ্রাণ আর নিঃশ্বাসের তীব্রতা। শেরাজ ধীরে পায়ে সুমুকে বিছানায় বসিয়ে দিল। সুমুর ভেজা শাড়ি তখন তার গায়ের সাথে লেপটে আছে, আর চোখে জমে আছে এক স্বপ্নপূরণ দৃষ্টি।
“আপনি কি জানেন, আমি ভয় পাই এই মুহূর্তগুলোকে?”
“কেনো?” শেরাজ তার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কারণ আপনি যখন এতটা কাছে থাকেন, তখন আমি নিজেকে আর নিজের মধ্যে রাখতে পারি না।”
শেরাজ একহাতে সুমুর চিবুক তুলে ধরে, সুমুর চোখে গভীরভাবে তাকিয়ে মৃদুস্বরে গেয়ে উঠল,
“এক দিল হে,
এক জান হে,
দোনো তুজপে কুরবান হে!
এক মে হু,
এক ইমান হে,
দোনো তুজপে কুরবান হে!”
গান থামিয়ে সে মুচকি হেসে বলল,
“আজ রাতে, এই বৃষ্টির সুরে, আমি তোমায় নিজ হাতে গড়ে নিতে চাই। একদম আমার মতো।”
কথাটা বলে টেবিল থেকে ফোনটা নিল। তারপর ফোনে প্লে করল “জিন্দেগী ছে চুরাকে” গানটা। ফোনটা জায়গার মতো রেখে সে আবারও সুমুর কাছে এলো। শেরাজের ঠোঁট এবার নামছে সুমুর গলার নিচে, তারপর বিউটিবোনে। তার প্রতিটা ওষ্ঠের ছোঁয়া যেন একেকটা ফুল হয়ে খসে পড়ছে সুমুর ত্বকে।
সুমুর শরীরের ভেতরটা কাঁপছে। সে শিহরিত, সে নিঃশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। শেরাজ তার কানে আবারও ফিসফিসিয়ে বলল,
“তোমার ভেজা শরীর, এই কাঁপুনি, আমার সত্তার ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি তোমার ভিতরে ঢুকে যেতে চাই। শুধু শরীরে না, আত্মায়, নিঃশ্বাসে আর হৃদয়ের গভীরে।”
বিছানার চাদরে তাদের ছায়া গলে গেল, বৃষ্টির শব্দে হারিয়ে গেল সুমুর শেষ লাজের আওয়াজ। সুমু ঢাকা পড়ে গেল শেরাজের বলিষ্ঠ দেহের আড়ালে, যেন প্রেমের গোপন পত্র খুলে পড়ছে, অক্ষরে অক্ষরে। সুমুর হৃদয়ে তখন শুধু একটাই শব্দ,
“খান সাহেব, খান সাহেব, খান সাহেব!”
খান সাহেব পর্ব ৩৯
চোখে চোখ, ঠোঁটে ঠোঁট রেখে তারা হারিয়ে গেল এক প্রেমের মহাসাগরে। যেখানে ভাষা নেই, লজ্জা নেই। শুধু ছোঁয়া আছে, ভালোবাসা আছে। এই রাতে আবারও তারা শুধু দেহ নয়, একটা আত্মা হয়ে মিশে গেল। এই রাতে আরও একবার কোনো শরীরের খেলা ছিল না, ছিল আত্মার এক গভীর, নিঃশব্দ অগ্নিস্নান। বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে। কিন্তু, রুমের ভিতরে দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের পাল্লা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ভারি হচ্ছে।
