Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৬

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৬

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৬
ছায়া

ট্রেনটা ছেড়ে যাওয়ার মাত্র দশ মিনিট পর।প্ল্যাটফর্মের এক কোণে লেডিস বাথরুমের দরজা খুলে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল ইলা।চোখ ফোলা, মুখ ফ্যাকাশে,কিন্তু এখন আর কাঁদছে না। যেন সব কান্না শেষ হয়ে গেছে, বাকি শুধু একটা খালি ভাব। হাতে ছোট্ট ব্যাগটা ঝুলছে, চুল এলোমেলো,কাপড়ে এখনো গুদামের ধুলো লেগে আছে।
ইলা দেখেই আরিয়ানের বুকটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।পাশে দাঁড়ানো রাফায়েল আর সামিরও একসাথে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।সামির ফিসফিস করে বলল,

সামিরঃ- আলহামদুলিল্লাহ ভাবি ঠিক আছে।
রাফায়েলের চোখে এবার আর কোনো দ্বিধা রইল না।সে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
রাফায়েলঃ- নাটক অনেক হয়েছে আরিয়ান। এবার আমি সব খুলে বলব। তুই আর আটকাস না।
আরিয়ান হাত বাড়িয়ে রাফায়েলের কব্জি চেপে ধরল।
আরিয়ানঃ- দাঁড়া ও এখনো রেগে আছে। এগুলো শুনলে আরো ভেঙে পড়বে।
রাফায়েল হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
রাফায়েলঃ- আর ভাঙার কী বাকি আছে বল তো? তুই নিজের হাতে ওর বিশ্বাস ভেঙেছিস। এখন অন্তত সত্যিটা জানুক ওর কাছে আর লুকিয়ে লাভ নেই।
আরিয়ান কিছু বলতে পারল না শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।রাফায়েল দ্রুত পায়ে ইলার কাছে গেল।ইলা তাকে দেখেই থমকে দাঁড়াল। চোখে আবার সেই ঘৃণা আর ব্যথার মিশেল।
রাফায়েল নরম গলায় বলল,

রাফায়েলঃ- চলে গেলে না যে?
ইলা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
ইলাঃ- মেয়েদের বিয়ের পর তো শ্বশুরবাড়িই সব।আর আমি যাবই বা কোথায়? যে বাড়ি থেকে বিনা অপরাধে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল, সেখানে ফিরে যাব? না মামার বাড়ি? না বাবার বাড়ি? কোথাও তো আমার জায়গা নেই।
কথাগুলো শুনে রাফায়েলের বুকটা ভারী হয়ে গেল। সে একটু চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বলল,
রাফায়েলঃ- আল্লাহ তোমাকে তোমার স্বপ্নের পুরুষের সাথেই বিয়ে দিয়েছেন ইলা।তুমি জানো না কিন্তু সত্যিটা এটাই।
ইলা একটু হেসে উঠল তবে হাসিটা তিক্ত।
ইলাঃ- স্বপ্নের পুরুষ?আপনি এখনো মজা করছেন?
রাফায়েল গভীর শ্বাস নিয়ে বলা শুরু করল।

রাফায়েলঃ- শোনো ইলা এই সেই ‘শাওন’ যাকে তুমি ভালোবেসে ছিলে এই সেই ভয়েজ কিং এই সেই আসলে শাওন। “মেজর আরিয়ান খান শাওন” রাহাতকে এই পুরো প্ল্যানে ঢোকানোর পেছনে আরিয়ানের হাত ছিল ঠিকই। কিন্তু উদ্দেশ্যটা যা তুমি ভাবছ তা নয়। আরিয়ান চেয়েছিল তোমার মন থেকে শাওন নামের অতীতটা চিরতরে মুছে ফেলতে।ও জানত তুমি তোমার ভয়েজ কিং কে ভালোবাসো। ও চেয়েছিল তোমার মধ্যে ভালোবাসা তৈরি করে তার পরে তোমাকে এ সব বলতে।তাই ও আমাদের সাথে সব কিছু শেয়ার করেছিলো কিন্তু আরিয়ান আস্তে আস্তে তোমার প্রেমে আসক্ত হয়ে যাচ্ছিলো। তাই সেদিন রাতে আরিয়ান ফোন করে বলে ও আর পারছে না। তাই যত তারাতাড়ি সম্ভব তোমাকে সব কিছু বলে দিবে। শাওন দেখতে চেয়েছিলো ও তোমার মধ্যে কত টূকু ভালোবাসা তৈরি করতে পেরেছে। তাই শাওন বলে এই প্লান করতে কিন্তু আমাদের জানা ছিলো না রাহাত শাওনের শত্রু। শাওন এর প্লান ছিলো রাহাত শুধু তোমার সাথে কথা বলবে। যা যা বলেছে এর উত্তরে তুমি কি বলো। কিন্তু তোমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া এটা আমরা কেউ জানতাম না। রাহাত যে পাগলামি করে ফেলল আরিয়ানের ক্যালকুলেশনে এটা ছিল না।ইলা মাথা নেড়ে বলল,

ইলাঃ- আপনাদের ড্রামা বাজি গল্প আমি আর বিশ্বাস করি না।এসব গল্প আমি আর শুনতে চাই না।
রাফায়েল একটু থেমে বলল,
রাফায়েলঃ- ঠিক আছে এক মিনিট দাঁড়াও।
সে দ্রুত আরিয়ানের কাছে গিয়ে কানে কানে কিছু বলল।আরিয়ান প্রথমে মাথা নেড়ে না করতে চাইল কিন্তু রাফায়েল জেদ ধরায় শেষে ফোন বের করল।কয়েক সেকেন্ড কিছু টাইপ করে কিছুক্ষণ পড়ে মাথা নাড়ল।
আরিয়ানঃ- হয়ে গেছে।
রাফায়েল ফিরে এসে ইলার সামনে দাঁড়াল।
রাফায়েলঃ- তোমার টিকটক আইডিতে ডুকো।
ইলাঃ- আমি এসব অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছি।
রাফায়েলঃ- তোমার ফোনটা একটু দাও।

ইলা অনিচ্ছুকভাবে ফোনটা এগিয়ে দিল। রাফায়েল দ্রুত একটা টিকটক খুলল তারপর রাফায়েল হাসল।ইলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। রাফায়েল ইলার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
রাফায়েলঃ- এবার দেখো এই তো তোমার সেই ভয়েজ কিং।
স্ক্রিনে ওপেন হল একটা টিকটক প্রোফাইল নাম শাওন সেই চেনা আইডি যে আইডিতে এক সময় ইলা পড়ে থাকতো। কখন নতুন ভিডিও আসবে।প্রোফাইল পিকচার সেই আগের টাই এখনো চেঞ্জ করেনি। ইলার চিনতে খুব একটা অসুবিধা হলো না এটা তার ভয়েজ কিং এর আইডি।
ইলা স্তব্ধ হয়ে গেল স্ক্রল করতেই দেখল শত শত ভিডিও। রিসেন্ট কিছুক্ষণ আগে করা একটা ভিডিওতে। আরিয়ান আর ইলার বিয়ের দিনের একটা ছবি। আর একটা ছোট ক্যাপশন
শাওনের ক্যাপশনঃ
আমার “ইলাফুল” যে ফুল হাজার কাঁটার ভিড়েও নিজের সৌরভ হারায় না।
ইলার হাত কাঁপতে শুরু করল ফোনটা ধরে রাখতে পারছিল না।চোখ দিয়ে আবার পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো রাফায়েল নরম গলায় বলল,

রাফায়েলঃ- তুমি যাকে ভয়েজ কিং ভাবতে সে আর কেউ না তোমার স্বামী। আরিয়ান খান শাওন তোমাকে অনেক আগে থেকেই ভালোবাসত।শুধু বলতে পারেনি কোনো এক অজানা কারণে । তুমি সব কিছু ডিলিট করে দেয়ার পরে শাওন অনেক খুজেছে তোমাকে। সবার মেসেজের মাঝে তোমাকে খুজতো বার বার। কিন্তু তুমি আর মেসেজ করনি। এভাবে শাওন ও হাল ছেরে দিয়েছিলো। তুমি যখন ওকে বিয়ে করলে শাওন তখনো জানতো না তুমি সেই ইলা। ও আমার থেকে সব কিছু শুনেছে। আমরা সেদিন বলেছিলাম সসব কিছু বলে দিতে কিন্তু ও পেয়েছিলো তোমাকে যেভাবে কষ্ট দিয়েছে সেভাবেই ভালোবেশে নিজের করে নিয়ে সব কিছু বলবে। কিন্তু তোমার মাথায় এখনো শাওনের অধ্যায়টা ঘুরে এটা জানার পরে ওর এই প্লান মাথায় এল। ও চাইনি তুমি কখনো ওর সাথে থেকেও মনে মনে শাওনকে খুঁজে বেড়াও। ও চেয়েছে তুমি অকে মেজর আরিয়ান খান নামে চিনো। তোমার ভয়েজ কিং হিসেবে নয়। তাই এই পাগলামি করেছে ও যা করেছে তোমাকে ভালোবেসে করেছে।
ইলা ফোনটা বুকে জড়িয়ে ধরল কাঁদতে কাঁদতে বলল,

ইলাঃ- আমি… আমি জানতাম না… আমি তো ভেবেছিলাম…
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান আর সামিরের দিকে তাকাল আরিয়ানের চোখেও পানি। কিন্তু সে এগোল না শুধু দাঁড়িয়ে রইল। ইলা আস্তে আস্তে দৌড়ে গেল আরিয়ানের দিকে। থেমে দাঁড়াল ইলা দুজনের মাঝে মাত্র কয়েক পা দূরত্ব ইলা কাঁপা গলায় বলল,
ইলাঃ- আপনি… সত্যিই আমার ভয়েজ কিং?
আরিয়ান পকেটে হাত ডুকেয়ে দারিয়ে মাথা নাড়ল।কথা বলতে গিয়ে গলা আটকে গেল। শুধু ফিসফিস করে বলল,
আরিয়ানঃ- সরি ইলাফুল আমি সব নষ্ট করে দিয়েছি শুরু হওয়ার আগে।
ইলা আর কিছু বলল না শুধু ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো আরিয়ান কে ধরতে চেয়েও ধরলো না। আরিয়ান পকেট থেকে হাত বাড়িয়ে দিলো। এটা দেখে ইলা এগিয়ে গিয়ে আরিয়ানের বুকে মাথা রাখল।আরিয়ান দুহাত দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।দুজনের চোখ দিয়েই পানি গড়িয়ে পড়ছিল।প্ল্যাটফর্মের আলোয় দুজনের ছায়া এক হয়ে গেল।
ইলা আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে চোখ বন্ধ। দুজনেরই চোখের পানি এখনো শুকায়নি।ফোনটা এখনো ইলার হাতে স্ক্রিনে তার ভয়েজ কিং এর প্রোফাইল খোলা। ইলার বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে পড়ছে আবার নতুন করে জোড়া লাগছে।সে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,

ইলাঃ- সত্যি আপনি আমার ভয়েজ কিং আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।আপনি আমার এত কাছে ছিলে অথচ আমি জানতামই না যে আপনি আমার সেই ভয়েজ কিং।
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না শুধু ইলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।তার গলাটা ভারী হয়ে গেছে।ইলা হঠাৎ পিছিয়ে গেল একটু চোখ তুলে আরিয়ানের চোখে তাকাল। চোখ দুটো লাল, ফোলা কিন্তু এবার সেই চোখে ঘৃণা নেই।আছে অসীম কষ্ট, অভিমান আর একটা অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা।ইলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
ইলাঃ- আমি আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি আমার ভয়েজ কিং আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো নওরিন কে ভালোবাসেন এখনো। তাই আমি আপনাকে বলেছিলাম আমি আপনার জীবন থেকে চিরতরে চলে যাব। কিন্তু আমি তো জানতাম না আপনি আমাকে এতটা ভালোবাসেন। আমি… আমি কী করব এখন? আমার মনে হচ্ছে আমি আপনার কাছে অযোগ্য হয়ে গেছি।
কথা শেষ করতে করতে ইলার কান্না আর ধরে রাখতে পারল না সে দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল।থরথর করে কাঁপছে পুরো শরীর।আরিয়ান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ইলার সামনে।প্ল্যাটফর্মের ঠান্ডা মেঝেতে হাঁটু রেখে হায় দিয়ে ইলার হাত শক্ত করে ধরল। চোখ তুলে ইলার চোখে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,

আরিয়ানঃ- আমার “তিলবতী”
ইলা চমকে উঠল এই নামটা কেনো এটা আবার কেমন না।আরিয়ান কখনো এত নরম গলায় ডাকেনি আগে।
আরিয়ান গভীর শ্বাস নিয়ে আবার বলল,
আরিয়ানঃ- “তিলবতী” চলেন প্রেম করি।
ইলা স্তব্ধ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।আরিয়ানের চোখে পানি কিন্তু এবার সে হাসল একটা ছোট্ট,ভাঙা হাসি।
আরিয়ানঃ- আমি আর কোনো নাটক করব না।কোনো পরীক্ষা করব না কোনো লিয়ান, কোনো রাহাত, কোনো কিছু আপনার ধারের কাছেও আসতে দিবো না। আমাদের একটা অন্য পৃথিবী হবে যেখানে শুধু আপনি আর আমি থাকবো।আমি আপনার জন্য গান গাইব, আপনি আমার জন্য হাসবে। আমি আপনাকে হাসাবো আমি কান্না করাবো। আবার আমি আপনার কান্না মুছব,শুধু আপনি আমার রাগ ভাঙাবে। আমরা ঝগড়া করব আবার এক সাথে থাকবো। কিন্তু আর কখনো একে অপরকে হারাতে দেব না।

ইলা কাঁদতে কাঁদতে হাসল আরিয়ানের এমন প্রোপোজ শুনে হাসির সাথে পানি মিশে গেল। ইলাও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল আরিয়ানের সামনে দুজন এখন একই লেভেলে। ইলা আরিয়ানের গালে হাত রেখে বলল,
ইলাঃ- আপনি জানেন আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।আমার ভয়েজ কিং এর থেকেও আমি আমার স্বামীর প্রতি আসক্ত হয়ে গেছি। এই এক মাসে আপনি আমার মনে বাসা বেধে ফেলেছেন। আজ আমি চেষ্টা করেছিলাম চলে যাওয়ার। স্টেশনে এসে ট্রেনে উঠেছিলাম কিন্তু মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যাচ্ছে।আমি আপনার কাছে ফিরতে চাইছিলাম কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম আবার যদি আমার এই মনটা ভেঙে যায়।
আরিয়ান ইলার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে দিল।
আরিয়ানঃ- আর কোনো ভুল হবে না লিটিলহার্ট আমি প্রতিজ্ঞা করছি।এবার থেকে সব সত্যি বলব আর কিছু লুকোব না।এখন থেকে শুধু ভালোবাসব খুব বেশি ভালোবাসব।
ইলা হঠাৎ আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল জোরে যেন আর কখনো ছাড়বে না।আরিয়ানও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দুজনের চোখ বন্ধ প্ল্যাটফর্মের আলোয় দুজনের ছায়া এক হয়ে গেছে।
দূরে দাঁড়িয়ে রাফায়েল আর সামির মুচকি হাসছে রাফায়েল ফিসফিস করে বলল,

রাফায়েলঃ- অবশেষে… শান্তি।
সামির রাফায়েল হেসে তাদের দিকে এগিয়ে আসে বলল
সামিরঃ- এবার তোদের দুজনের জন্য একটা বড় পার্টি দিতে হবে ভাই।
ইলা আরিয়ানকে জিগ্যেস করলো
ইলাঃ- তিলবতী ডাকার কারণ কি একটু বলবে।আমি তো মায়াবতী শুনেছিলাম ভালোবেসে কিন্তু তিলবতী এটা কেমন নাম।
আরিয়ান ইলার কাছে এসে বলল
আরিয়ানঃ- আপনি আমার তিলবতী তো এই যে আপনার আর আমার বাম হাতের বুড়ো আঙুলে সেম জায়গায় আমাদের তিল আছে।
ইলাঃ- ও আচ্ছা এই কারণ
আরিয়ান মাথা ঝাকিয়ে না বলল, ইলা কপালে ভাজ ফেলল। আরিয়ান ইলার মাথা নিজের মুখের কাছে টেনে এনে কানে কানে বলল

আরিয়ানঃ- আপনি আমার তিলবতী হওয়ার কারণ আপনার পেটের নিচে ঐ বিউটিস্পোট এর জন্য।
ইলা আরিয়ানের এই কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। আরিয়ান ইলাকে লজ্জা পেতে দেখে হেসে দেয়। ইলা আরিয়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- তিলবতী বলে আরেকবার ডাকুন তো।
আরিয়ান হেসে উঠল নরম গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- তিলবতী… আমার তিলবতী।
ইলা চোখ বন্ধ করে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল।দুজনের মাঝে এখন আর কোনো দূরত্ব নেই।শুধু ভালোবাসা খাঁটি, নিখাদ, অটুট।

TIME skip…..
প্ল্যাটফর্মের আলোটা এখন আর ততটা ঠান্ডা লাগছে না।ইলা আর আরিয়ান দুজনে হাতে হাত রেখে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল।ইলার চোখ এখনো ভেজা কিন্তু ঠোঁটের কোণে একটা ছোট্ট, লাজুক হাসি ফুটে উঠেছে। আরিয়ানের হাতটা ইলার হাতকে শক্ত করে ধরে আছে যেন আর কখনো ছাড়বে না।
দুজনে হাঁটছে প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে যাচ্ছে। কোনো তাড়া নেই কোনো কথা নেই। শুধু পায়ের শব্দ আর দুজনের নিঃশ্বাসের ছন্দ।দুজনের মাঝে অদৃশ্য সুতোর মতো জড়িয়ে যাচ্ছে।ইলা অজান্তেই আরিয়ানের হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরল।আরিয়ান মাথা নিচু করে ইলার দিকে তাকাল চোখে চোখ রেখে মুচকি হাসল। দূরে দাঁড়িয়ে রাফায়েল আর সামির।
দুজনেই চুপচাপ দেখছে এই দৃশ্যটা রাফায়েলের চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি ঠোঁটে হালকা হাসি সে ফিসফিস করে বলল,

রাফায়েলঃ- দেখ অবশেষে ওরা দুজন আবার একসাথে।
সামির মাথা নাড়ল গলা ভারী হয়ে এল।
সামিরঃ- এত ঝড়ের পরও এই মুহূর্তটা দেখার জন্যই তো সবকিছু সহ্য করা যায় ভাই।
রাফায়েলের চোখ সামান্য সরু হয়ে এল, যেন কোনো পুরোনো কষ্ট মনে পড়ে গেছে কিন্তু সাথে সাথেই হাসি ফিরে এল।
রাফায়েলঃ- আমরা অনেক ভুল করেছি কিন্তু আজ দেখে মনে হচ্ছে সব ভুলের মাশুল দিয়েও এই মুহূর্তটা পাওয়া গেছে।
হাটতে হাটতে আরিয়ান গান গাওয়া শুরু করলো
গান :

~Sohneya yoon tera sharmana~
~ meri jaan naa lele~
~Kaan ke peeche zulf chhupana~
~meri Jaan, kya kehne~
~Zaalima tauba tera nakhra~
~iss ke waar, kya kehne~
ইলা হঠাৎ থেমে গেল আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
ইলাঃ- এই গান আমার খুব প্রিয় ছিল আমি সব সময় শুনতাম।
আরিয়ান নরম গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- জানি আপনি সেই সময় বলেছিলেন আপনার এই গান পছন্দের। তাই তো আমি এই গানটা মনে মনে গাইতাম সব সময়।
ইলা চোখ বড় করে তাকাল তারপর হঠাৎ আরিয়ানের বুকে মুখ গুঁজে দিল।আরিয়ানও তাকে জড়িয়ে ধরল দুজনে দাঁড়িয়ে রইল ঠিক মাঝখানে।চারপাশের লোকজন, ট্রেনের শব্দ, সবকিছু যেন মিলিয়ে গেছে। শুধু আছে গান আর দুটো হৃদয়ের ছন্দ।
রাফায়েল সামিরের কাঁধে হাত রেখে বলল,

রাফায়েলঃ- চল আমরা ওদের থেকে বিদায় নেই ওদের একটু একা থাকতে দেই আজকের রাতটা ওদের।
সামির হেসে বলল,
সামিরঃ- হ্যাঁ আর কাল থেকে নতুন করে শুরু এবার কোনো নাটক থাকবে না যা থাকবে সেই সব ভালোবাসা।
রাফায়েল আর সামির ইলা আর আরিয়ানের কাছে এগিয়ে এসে বলল
রাফায়েলঃ- এবার আমাদের বিদায় পালা তুই ইলা নিয়ে বাসায় যে।
সামিরঃ- ভাবি আসি অন্য কোনো সময় এসে আড্ডা দিবো আজ শুধু আপনাদের দিন।
রাফায়েল আর সামিরের সাথে বিদায়ের পর ইলা আর আরিয়ান গাড়িতে উঠল।আরিয়ান স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি স্টার্ট দিল।রাতের রাস্তা নির্জন চাঁদের আলোয় পুরো পথটা যেন রূপালি হয়ে আছে।ইলা পাশের সিটে বসে একটু হেলান দিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।চোখে এখনো সেই ভেজা ভাব কিন্তু মুখে একটা শান্ত হাসি।হঠাৎ ইলা ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল।

ইলাঃ- আমি একটা ফোন দেই পরি আর হালিমাকে না জানালে ওরা আমাকে খুন করে ফেলবে।
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- অকে, ওদেরতো সব শোনানোর আছে।
ইলা প্রথমে পরিকে কল দিল পরি ধরতেই ইলা হালিমাকেও কনফারেন্সে যোগ করল লাউডস্পিকার অন।ইলা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
ইলাঃ- হ্যালো ভন্ডরা ফাইনালি আমি আমার ভয়েজ কিং-এর সাথে।
ওপাশে দুই সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা তারপরই যেন বোমা ফাটল।
হালিমা চিৎকার করে উঠল,
হালিমাঃ- কী কইলি তুই ভয়েজ কিং তুই কি পাগল হয়ে গেছিস ইলা? এতদিন ধরে আমরা তোকে বোঝাচ্ছি আর তুই এখন আবার সেই পুরানো পাগলামিতে ফিরে গেলি? আরে বোকাচোদা তুই কি মাথায় গোবর ভরে রাখিস নাকি?
পরি এখনো কিছু বুঝতে পারছে না শুধু বলল,
পরিঃ- মানে? কী হইছে আবার?
হালিমা থামছে না।

হালিমাঃ- আরে এই মেয়েটা আবার সেই ভয়েজ কিং-এর পিছে লাগছে এই ইলা, তুই কি জীবনে আর কোনো কাজ নাই? শুধু গলার স্বর শুনে শুনে বার বার পাগল হবি?আরে হারামজাদি, তোর মাথায় কি ঘাস জন্মেছে?
ইলা হাসতে হাসতে আরিয়ানের দিকে তাকাল আরিয়ান ড্রাইভ করতে করতে হেসে ফেলল।হালিমার গালি শুনে তার মুখে দুষ্টুমির হাসি।ইলা হালিমাকে থামানোর চেষ্টা করল,
ইলাঃ- এই হালিমা চুপ কর!তুই এত চিল্লাইস কেন?
হালিমা আরও জোরে চিৎকার দিল,
হালিমাঃ- চুপ করব কেন তুই তো ঐ একটা জিনিসই শিখছিস জীবনে ভয়েজ কিং-এর পিছে ছোটা আর আমার মুখ বন্ধ করা আর কী পারবি তুই?
ইলা এবার ঝাঁঝালো হয়ে উঠল,
ইলাঃ- তোর জন্মই তো হয়েছে আমার কাছে ঝাড়ি খাওয়ার জন্য।এখন চুপ কর না হলে ফোন কেটে দিব।
হালিমা একটু থেমে তারপর আবার বলল,
হালিমাঃ- কিন্তু ইলা সিরিয়াসলি তুই বুঝার চেষ্টা কর।এটা ঠিক করিস নি তোর আরিয়ান ভাইয়ার কাছে ফিরে যাওয়া উচিত। ও তোকে সত্যিই ভালোবাসে।
ইলা বিরক্ত হয়ে বলল,

ইলাঃ- আচ্ছা দাঁড়া ভিডিও কল দেই দেখাই তোদের দেখাই আমার ভয়েজ কিং কে।
ইলা ভিডিও কল চালু করল ক্যামেরাটা প্রথমে নিজের দিকে, তারপর ধীরে ধীরে আরিয়ানের দিকে ঘুরিয়ে দিল।আরিয়ান ড্রাইভিং সিটে বসে আছে।এক হাত স্টিয়ারিং-এ, অন্য হাতে ইলার হাত ধরা সে শুধু মৃদু হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- হ্যালো গার্লস
ওপাশে দুইজন মৃত্যুর মত নীরবতা তারপর হঠাৎ দুজনের একসাথে চিৎকার “সিরিয়াসলি”
ইলা হাসতে হাসতে ক্যামেরা নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল,
ইলাঃ- এই দেখ এই আমার দুষ্টু, বেডা পরি…আমার ভয়েজ কিং এই সেই আরিয়ান খান শাওন ওরুফে মেজর আরিয়ান খান শাওন।
পরি এখনো হতভম্ব

পরিঃ- মানে? আরিয়ান ভাইয়াই ভয়েজ কিং কীভাবে? কখন? কেন?
হালিমা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল যেন।
হালিমাঃ- আমার জীবনটা শেষ আমি এতদিন যাকে ভয়েজ কিং বলে গালি দিচ্ছিলাম সে তো আমাদের আরিয়ান ভাইয়া জাতির দুলাভাই ইলা তুই আমাকে এই লজ্জা দিলি? আমি তো এখন লজ্জায় মরে যাব।
ইলা আর আরিয়ান দুজনেই হাসতে লাগল।আরিয়ান গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,
আরিয়ানঃ- হালিমা এখন থেকে গালি দেওয়ার আগে একটু চেক করে নিও
হালিমা এখনো অবিশ্বাসের সুরে বলল,
হালিমঃ- ভাইয়া আমি আসলে… আমি তো ভাবছিলাম কোনো একটা অচেনা লোক…কিন্তু আপনি তো আমাদের বাড়ির লোকই আর ইলা তুই আমারে এত বড় ধাক্কা দিলি।তোর সাথে দেখা হক খালি
ইলা হাসতে হাসতে বলল,

ইলাঃ- এখন বুঝলি? আমার ভয়েজ কিং কোনো অচেনা মানুষ না আমার নিজের স্বামী।
পরি এবার হেসে উঠল,
পরিঃ- ওয়াও… এটা তো সিনেমার চেয়েও বেশি রোমান্টিক আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।
হালিমা শেষে হালকা হেসে বলল
হালিমাঃ- যাক… অন্তত শেষটা ভালো হইল।কিন্তু ইলা, পরের বার যদি এমন কোনো নাটক করিস আমি তোকে আর ছাড়ব না।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৫

ইলা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল আরিয়ানও হাসল। গাড়িটা রাতের রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।ফোনের ওপাশে দুই বান্ধবী এখনো হাসছে, গালি দিচ্ছে, আবার অভিনন্দন জানাচ্ছে।
আর ইলা-আরিয়ানের মাঝে এখন শুধু একটা নীরব প্রতিজ্ঞা আর কখনো কোনো ভুল বোঝাবুঝি হবে না।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৭