Tell me who I am 2 part 5 (3)
আয়সা ইসলাম মনি
আর.এ ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের রেখা টেনে বলল, “একজন খু’নি আরেকজন খু’নিকে চিনবে, এ তো প্রাকৃতিক নিয়ম। অস্বাভাবিক কিছু নয়।”
ব্লাডশেডের কপাল কুঁচকে গহ্বরের মতো তৈরি হলো। ঠান্ডা গলায় বলল, “খু’নি? কাকে খু’ন করেছ তুমি?”
আর.এ তার আঙুলের লম্বা নখের দিকে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল, “এইভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই জেরা করবে? অবস্কিউর তো বলেছে, আমি গেস্ট। অতিথিকে একটু আপ্যায়ন করবে না? ভয় কীসের? আমরা তো একই নরককুলের।”
ব্লাডশেড তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অবস্কিউরের দিকে স্থির করল। অবস্কিউর মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। দুজনের মধ্যে বোবা ভাষায় কিছু কথোপকথন শেষ হলে ব্লাডশেড গরগর শব্দে আর.এ-এর দিকে চেয়ার টেনে আনল। আর.এ হালকা কটাক্ষের হাসি হেসে বসল।
ব্লাডশেড আর অবস্কিউরও দুটো চেয়ার নিয়ে বসল। তাদের পা দুটো আড়াআড়ি ভঙ্গিতে ছড়িয়ে আছে। ব্লাডশেড আস্তে করে পকেট থেকে একখানা সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরল। তারপর লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে গভীর টান নিল। ধোঁয়ার ঘন কুণ্ডলী ধীরে ধীরে তার মুখ থেকে বেরিয়ে বাতাসে ভেসে উঠে আবার ভেঙে যাচ্ছিল।
সে দুই হাঁটুর ওপর কনুই রেখে হাত দুটো একত্র করে, দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা রেখে মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আর.এ-এর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল।
আর.এ শয়তানি হাসি হেসে ব্লাডশেডের হাত থেকে সিগারেটটা নিতে গেল, কিন্তু ব্লাডশেড দ্রুত তা সরিয়ে নিয়ে শীতল গলায় বলল, “ডোন্ট ওভারস্টেপ ইয়োর বাউন্ডস। এই ঠোঁটের ছোঁয়া কেবল আমার স্ত্রীর একচেটিয়া অধিকার।”
এটা কর্ণগোচর করে আর.এ পেছনে হেলান দিয়ে হঠাৎই উচ্চস্বরে হো হো করে হেসে উঠল।
ব্লাডশেডের চোখ লালচে রঙে জ্বলতে শুরু করল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো, কপালের শিরাগুলো স্ফীত হয়ে ওঠা সহজেই বোঝা যাচ্ছিল। সে কোনো শব্দ না করে ভয়াবহ দৃষ্টি দিয়ে আর.এ-কে গিলতে থাকল।
আর.এ ধীরে ধীরে হাসি থামিয়ে ঠোঁটের কোণে আবার সেই কুৎসিত ব্যঙ্গ এনে বলল, “Sorry, sorry. Don’t mind, but that’s rich coming from you!”
তারপর গলা নীচু করে বলল, “মনে হলো, চোরের মুখে ধর্মের কথা শুনলাম। যে কিনা নিজের পশুত্ব মেটাতে শত শত মেয়ের শরীর ফালি ফালি করেছে, তার মুখে এই স্বামীসুলভ বাচালতা? হাহ?”
ব্লাডশেডের দুই মুষ্টি শক্ত হয়ে গেল। সিগারেটের ছাই মেঝেতে ঝরে পড়তে লাগল। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলল। মুহূর্তেই তার চেহারায় প্রস্তরময় গাম্ভীর্য নেমে এলো। গলা ভারি করে বলল, “ওদের কারোরই সৌভাগ্য হয়নি এই ঠোঁটের আলতো স্পর্শ পাওয়ার। ওরা কেবল ছিল লোভের, তৃপ্তিহীন হিংস্রতার শিকার। যা থেকে মুক্তি পেতে ওরা কাঁপতে কাঁপতে ছটফট করত। ওরা চাইত মরে গিয়ে মুক্তি পেতে, কিন্তু আমি ওদের সেই উপহারও সহজে দেইনি।”
আর.এ একটু মাথা কাত করে, চোখ সরু করে তীক্ষ্ণভাবে ব্লাডশেডকে পর্যবেক্ষণ করল। তারপর হালকা কণ্ঠে বলল, “তোমাকে লয়াল বলব নাকি নিছক পিশাচ, বুঝতে পারছি না।”
“সে বিচার তোমার করার প্রয়োজন নেই। কাকে খু’ন করেছ?”
আর.এ দু’হাত দিয়ে নিজের হাঁটু চেপে ধরল। কটমট শব্দ তুলে আঙুলগুলো ফোটাতে লাগল। তারপর নিস্পৃহ গলায় বলল, “আগে একটা সিগারেট দাও না। মুখ শুকিয়ে কাঠ।”
ব্লাডশেড কোনো কথা না বলে চোখের চাউনি দিয়ে অবস্কিউরকে ইশারা করল। অবস্কিউর নীরবে উঠে এসে পকেট থেকে কালো গিল্টি-ঢাকা একটি সিগারেট প্যাকেট বের করে আর.এ-এর দিকে এগিয়ে ধরল।
আর.এ হালকা চোখ টিপে বলল, “থ্যাংক ইউ, ডিয়ার।”
তারপর প্যাকেট থেকে নিপুণভাবে একটি সিগারেট টেনে বের করে, ঠোঁটে রাখার আগে সেটি উল্টেপাল্টে দেখল। হঠাৎ বিস্ময়ের ভঙ্গি করে বলল, “মাই গড! ট্রেজারার লাক্সারি ব্ল্যাক! তোমরা এই মলিন ঘর, এই পচা মাংস, এই লা*শের গন্ধের মধ্যে বসে এত দামি সিগারেট খাও? তাই তো বলি, এতসব আকাম-কুকাম করার পরও ঠোঁটগুলো এত সুন্দর কেন!”
অবস্কিউর পাশ থেকে বিষময় কণ্ঠে বলল, “তুমি একটু বেশি কথা বলছ না?”
আর.এ তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের তীক্ষ্ণ বাঁক তুলল। তারপর নিজের প্যান্টের পকেট থেকে রুপালি লাইটার বের করে আগুন ধরিয়ে, সিগারেট ঠোঁটে রেখে গাঢ়ভাবে টান নিল। ধোঁয়া তার নাক আর মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে বাতাসে পাক খেয়ে চলে গেল। সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “তোমরা দেখি নিজেদের প্রশংসা নিতে পারো না। যাই হোক, ডোন্ট টেইক ইট সিরিয়াসলি।”
হঠাৎ সে নাক সিঁটকিয়ে মুখ বিকৃত করে বলল, “উহ! ওই লা’শটা সরাও তো। প্রচুর দুর্গন্ধ আসছে।”
ব্লাডশেডের চোখদুটি ক্ষণিকেই অগ্নিসংলগ্ন হয়ে উঠল। মুখের পেশি সামান্য লাল হয়ে, নাকের পাশের শিরাগুলো ফুলে উঠল, আর চোয়ালের পেশি এমন টান মারল যে দাঁতগুলো কড়মড় করে আওয়াজ তুলল। সে চট করে ধাক্কা মেরে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। পাশের টেবিল থেকে দ্রুত হাতে একটি ভারী বন্দুক তুলল। ট্রিগারে আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে, আর.এ-এর কপালের মাঝখানে পিস্তলের মুখ ঠেকিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “তুমি কি আমাদের তোমার চামচা ভেবেছ, নাকি তোমার পালিত কুকুর? যে কথায় কথায় হুকুম জারি করছ!”
আর.এ ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের রেখা টেনে এনে হেসে উঠল। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, কোনো তাড়াহুড়ো বা শঙ্কা ছাড়াই উঠে দাঁড়িয়ে নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটি পিস্তল বের করল। সেটার নল সোজা ব্লাডশেডের কপালের ঠিক মাঝখানে ঠেকিয়ে রাখল।
এটা অবলোকন করে সঙ্গে সঙ্গে অবস্কিউরের দুই চোখ সরু হয়ে এলো। একটুও দেরি না করে চেয়ার থেকে উঠে আড়ালে লুকানো আরেকটি বন্দুক বের করে, বন্দুকের নল সরাসরি আর.এ-এর মস্তিষ্কের ডান দিকে ঠেকিয়ে দিল।
তাদের তিনজনেরই চোখ লালচে, ঘাড়ের রগগুলো ফুলে ফেটে পড়তে চাইছিল। দাঁতের কটমট শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
এমন মুহূর্তে আর.এ হালকা শ্বাস নিয়ে, মুখের একপাশে বিদ্রুপ নিয়ে বলল, “কথা বলতে সুবিধে হবে তাই বলেছি। সরি, ইফ ইট সাউন্ডেড লাইক অ্যান অর্ডার। তোমাদের মতো জন্তুদের শাসন করার কথা ভাবার সাহসও করবো না।”
কিছুক্ষণ আর কেউ নড়ল না। ব্লাডশেড কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে আর.এ-এর দিকে তাকিয়ে রইল।এরপর ধীরে ধীরে বন্দুকটা নামিয়ে, আবার সেটি টেবিলের ওপর রাখল।
অবস্কিউরও বন্দুক নামিয়ে আবার সযত্নে কোমরের কাছে গুঁজে নিল। দুজনেই নিজেদের চেয়ার টেনে রাজার মতো পায়ের ওপর পা তুলে বসে পড়ল।
অবস্কিউর এক ঠান্ডা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ঠোঁটের ওপর আঙুল বুলিয়ে বলল, “প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনও পাওয়া গেল না।”
আর.এ শব্দ তুলে চেয়ারটি পেছনে টেনে নিল। তারপর ধীর স্থির ভঙ্গিতে বসে দৃষ্টি ঘুরিয়ে চোখের ইশারায় ইঙ্গিত করল সামান্য দূরে টেবিলের উপর নৃশংসভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে থাকা শাহানার মৃ*তদেহের দিকে।
ব্লাডশেড নিশ্বাস টেনে কেবল একবার অবস্কিউরের দিকে তাকাল। তাদের দৃষ্টি বিনিময়ে কোনো শব্দের প্রয়োজনই পড়ল না; অবস্কিউর বুঝে নিল তার নিষ্ঠুর দায়িত্ব।
সে উঠে দাঁড়াল। নির্লিপ্ত মুখে এগিয়ে গিয়ে শাহানার ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহাংশসমূহ একে একে তুলে নিল। তারপর নিস্তেজ নিশ্বাস ফেলে লা*শটিকে পুরু কালো ব্যাগে পুরে, সেগুলো নিয়ে আর সাথে একটা চা’পাতি হাতে ধরে নির্বিকার ভঙ্গিতে অন্য একটি কক্ষে চলে গেল।
ঘরটা ছিল আঁধার, শুধুমাত্র বাথরুমের হলুদ ম্লান আলো ফ্লোরের কালো মার্বলে প্রতিফলিত হচ্ছিল। অবস্কিউর শাহানার বিকৃত লা*শটিকে ব্যাগ থেকে টেনে বের করে বাথরুমের ভেজা মেঝেতে রাখল। মেঝের শ্যাওলাধরা টাইলসে লা*শটা পড়তেই গলিত র*ক্ত বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। অবস্কিউর সেখানকার বাথটবের মধ্যে ধীরে ধীরে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ঢেলে দিল।
তারপর সে চা*পাতিটা উঁচু করল। কোনো রকম তাড়াহুড়ো না করে লা*শের উপর ধীরে ধীরে চাপ দিল। সেই চাপ প্রথমে ত্বক কেটে দিল, র*ক্তের গ্লানি উঠে এলো। নির্লিপ্ত নিপুণতায় লা*শের নিম্নাংশ থেকে যৌ*না*ঙ্গ কে*টে আলাদা করে একটা কাচের বিকারের মধ্যে রাখল। বিকারের তরলে সেটি নিমগ্ন হতে হতে ছোট ছোট ফেনা তুলল। বিকারটা একটা তাকের উপরে রাখল।
তখন তাকের দিকে চোখ পড়তেই বোঝা গেল, এমন বিকার এখানে শত শত। তার মধ্যে রাখা স্ত*ন, যৌ*না*ঙ্গ। যার উপর বিকৃত কালো হরফে OWL আর সেই জটিল প্রতীকটি চিহ্নিত করা ছিল।
অবস্কিউর এবার লা*শের বাকিটা টেনে তুলে বাথটবে ফেলে দিল, যেখানে ইতোমধ্যেই হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ঢেলে রাখা ছিল।
প্রথমে শুধু ছোট ছোট বুদ্বুদ উঠল। তারপর মাংসের সাথে অ্যাসিড মিশতেই বাজে গন্ধ ছড়াল। মাংসের লালচে টুকরোগুলো শ্বেত স্ফোটে পরিণত হয়ে আলগা হতে শুরু করল। গলে গিয়ে চামড়া সরে নিচে মাংসের লাল আঁশগুলো দেখা গেল। সেই আঁশগুলোও আস্তে আস্তে জলের মধ্যে ভেসে উঠতে লাগল। হাড়গুলো টিকে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর হাড়ের উপর থেকে মাংসের নরম আবরণ সরে গিয়ে সাদা কাঠামো বেরিয়ে এলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হাড়ও ক্রমশ ফেটে চৌচির হয়ে গলে যেতে লাগল।
পাশে দাঁড়িয়ে অবস্কিউর সেই দৃশ্য দেখতে থাকল।
অন্যদিকে চেয়ারে বসে থাকা ব্লাডশেডের কপালে নীলচে শিরা ফুটে ছিল। সে শুষ্ক গলায় বলল, “হুম। এবার বলো।”
আর.এ তখনো নির্বিকার। ঠোঁটে সিগারেট চেপে ধরা। ধোঁয়া টেনে এক সরু রেখা ফুসফুস থেকে ছেড়ে দিল, সেটি পাক খেতে খেতে ব্লাডশেডের মুখের কাছে গিয়ে মিলিয়ে গেল। এবার সে বলল, “দেশের সুন্দরী মেয়েরা উধাও হচ্ছে, সেটা হয়ত তোমার অজানা নয়।”
ব্লাডশেড ভ্রূ উঁচু করে বলল, “এত মেয়ের মা’র্ডার করেছ, তোমাকে পুলিশ ধরে না কেন?”
“যে কারণে তোমাদের কেউ ধরে না। কারণ কেউ জানেই না মেয়েগুলো মৃ’ত না উধাও, না কি কিডন্যাপড। পুলিশ নিশ্চয়ই ওই মেয়েগুলো উধাও এর পিছনেও তোমাদেরই সন্দেহ করছে।”
ব্লাডশেড হেলান দিয়ে বসে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করল। ঠোঁট টেনে বলল, “পুলিশ নির্বোধ নয়। তারা জানে, আউলরা প্রতিটি শিকারের গায়ে সাইন রেখে যায়।”
আর.এ হালকা মাথা দুলিয়ে বলল, “হুম। রাইট।”
“সুন্দরীদের কেন মারছ? নিজে ভয়ানক সুন্দর বলে ওদের সহ্য হয় না, নাকি কদর্য বলে সুন্দরীদের দেখে হিংসায় গা পুড়ে যায়?”
“তোমার কি মনে হয়?”
“তোমার মতো কীটের মনস্তত্ত্ব জানার জন্য আমি বা আমরা বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্টেড না। তুমি কেন জেনেশুনে এখানে পা রেখেছ? আমরা চাইলে তো তোমাকেও এখানেই টুকরো টুকরো কেটে ফেলতে পারি। ইভেন এখনো পারি, তাহলে?”
আর.এ হালকা হাসল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, “পারবে না জেনেই এসেছি। আর এখানে আসার কারণ হলো ডিল করা।”
ব্লাডশেড চোখ কুঁচকে শীতল গলায় বলল, “কেমন ডিল?”
এই সময় ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে আবার ঢুকল অবস্কিউর। তার হাতের ল্যাটেক্স গ্লাভসে কিছু ভেজা লাল দাগ লেগে ছিল। সে নির্বিকার মুখে এসে আগের চেয়ারটায় বসে পড়ল।
এদিকে ব্লাডশেড চেয়ার ঠেলে উঠল। তারপর একপাশের কেবিনেট থেকে সোনালি আভাযুক্ত হুইস্কির বোতল আর কাচের গ্লাস তুলে আনল। বোতল থেকে মদ ঢেলে এক গ্লাস অবস্কিউরের দিকে ধরল। অবস্কিউর চেয়ার থেকে সামান্য উঠে গ্লাসটা নিয়ে, আবার বসে গ্লাসে চুমুক দিল।
এরপর ব্লাডশেড নিজের জন্য আরেক গ্লাসে ঢেলে নিচ্ছিল। তখনই আর.এ বলল, “আমাকে কি দেখা যাচ্ছে না?”
ব্লাডশেড চেয়ারে বসল। গ্লাস থেকে এক চুমুক নিয়ে বলল, “এত প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট আমি আমার বউকেও দেই না। তোমাকে দিব ভাবলে কীভাবে? প্রয়োজন হলে নিজে নিয়ে খাও।”
আর.এ উঠে দাঁড়াল। তার চোখ কপালে উঠে গেল, কারণ তার সামনে রাখা বোতলটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান মদ ‘ইজাবেলা’জ আইলাই হুইস্কি’। পুরো বোতলটি মোড়ানো ছিল হীরা, প্ল্যাটিনাম ও সাদা স্বর্ণের সূক্ষ্ম নকশা দিয়ে। বোতলের এক পাশে বসানো ছিল গাঢ় লাল রুবি, যেখানে খোদাই করা ছিল Isabella’s Islay এর মনোগ্রাম।
সে গ্লাসে ধীরে ধীরে হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বিস্ময়ে উচ্চস্বরে বলল, “ওহ, ড্যাএএম! সিক্স পয়েন্ট টু মিলিয়ন ডলার! এত টাকা শুধু ড্রিংক করার জন্য ওয়েস্ট করো তোমরা?”
তখন অবস্কিউর বলে উঠল, “কেন, তোমার কি টাকার উপর মায়া হচ্ছে? আমরা তো চাইলে টাকা দিয়ে তোমাকেও কিনে নিতে পারি।”
আর.এ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আমার দাম তোমাদের বাজেটের বাহিরে।”
এ সময় দাঁতে দাঁত চেপে ব্লাডশেড বলল, “বাজে কথা বন্ধ করো। কীসের ডিল করতে চাও?”
আর.এ এসে চেয়ারে বসে, গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “যেহেতু পুলিশ বুঝে ফেলেছে তোমাদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রচুর বেড়ে গেছে, আমার হেল্প তোমাদের অবশ্যই লাগবে।”
অবস্কিউর বলল, “পুলিশের সাথে আমরা নতুন নতুন লড়াই করছি না। মেইন পয়েন্টে আসো।”
ব্লাডশেড অবস্কিউরের কথায় আর.এ-এর দিকে তাকিয়ে তার মুখের অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করল। আর.এ নিশ্বাস নিয়ে বলল, “আমি মেয়ে জোগাড় করে দিব। তাও সব সুন্দরী মেয়েদের। আমি তাদের শুধু চেহারাই নষ্ট করতে চাই। তোমরা বাকি সব…”
অবস্কিউর কথা কেটে বলল, “ওয়েট ওয়েট, তুমি তো আর সাধারণভাবে ফেইস নষ্ট করবে না। হয়ত ওদের মাথাও না থাকতে পারে, তাহলে এমন মৃ’ত মেয়ে দিয়ে কি করব আমরা?”
আর.এ হাঁটুর ওপর কনুই রেখে উত্তরে বলল, “এমন তো নয় যে তোমরা লা’শের সাথে কিছু করোনি বা এটা প্রথম হতে চলেছে। ঠিক আছে, আমি ওদের পুরোপুরি মে’রে ফেলব না। জাস্ট জঘন্য উপায়ে ফেস নষ্ট করব।”
অবস্কিউর একটু ঝুঁকে এসে, কণ্ঠে তীক্ষ্ণ অবিশ্বাস নিয়ে বলল, “এতে তোমার কী লাভ?”
“তোমাদের যা লাভ হয়—শান্তি আসে। আর আমার? আমি সুন্দরীদের শেষ করতে পারব।”
ব্লাডশেড আর.এ-এর চোখে চোখ রেখে বলল, “শুধুই এই কারণ?”
আর.এ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “তোমাদের কাছে হয়ত শুধু এতটুকুই। কিন্তু আমার জীবনের গভীরে এ নিয়ে একটা গোপন বৃত্তান্ত লুকিয়ে আছে, যা এখনই বলতে চাই না। তবে লাভ বলতে, তোমাদের একটা কাজ করতে হবে।”
অবস্কিউর আর ব্লাডশেড একসাথে ভ্রূ উঁচু করল। কিন্তু কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি যে ‘কি কাজ?’
তাই আর.এ নিজে থেকেই বলল, “আজ পর্যন্ত আমি একটাও লা’শ সরাইনি। আমি চেয়েছিলাম পুলিশ লা’শগুলো পেয়ে একটা বড় নেটওয়ার্কের লিডারকে ধরে ফেলবে।”
অবস্কিউর বলল, “লিডারকে বলতে? তোমাকেই তো ধরে নিত।”
ব্লাডশেড হাত তুলে অবস্কিউরের মুখে থামার ইঙ্গিত দিল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোমার কি মনে হয়, আমরা ইউজড জিনিস আবার ইউজ করব?”
আর.এ ঠোঁটের এক কোণে হেসে বলল, “ইউজড মানে? আমি লে’স’বি’য়ান নই। আমি শুধু ওদের চেহারা নষ্ট করব।”
“হুম। দেন?”
“যেটা বলতে চেয়েছিলাম—আমি প্রমাণ রেখে যেতাম এমনভাবে, যা দেখে পুলিশ অন্য কাউকে সন্দেহ করত, আর তাকেই ধরে নিত। কিন্তু এখন সমস্যা হলো, আমার খু’ন করার পর কেউ এসে লা’শগুলো সরিয়ে ফেলছে। এখন সে কে, সেটাই তোমাদের জানতে হবে।”
অবস্কিউর ভ্রূ কুঁচকে বলল, “এটা তো সাধারণ ব্যাপার। যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ রাখা হয়, সে নিজের গোপনীয়তা রক্ষায় প্রমাণ সরিয়ে দিচ্ছে।”
“সম্ভব না বলব না, কিন্তু সন্দেহও খুব কম। ও যতটা হিংস্র আর বুদ্ধিমান, তবে… ওকে সন্দেহ করার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।”
ব্লাডশেড হঠাৎ দাঁত চেপে বলল, “কে সে?”
আর.এ একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল, “ও তোমাদের মধ্যে কারো খুব কাছের একজন।”
একে তো মিরার চোখের ঘুমের ঝাঁপ এখনো পুরোপুরি কেটেই ওঠেনি। তার উপর মাথার ভেতর একের পর এক দুশ্চিন্তার ঢেউ ছোটাছুটি করছিল। তাছাড়া তিনতলার করিডোর থেকে নিচের ড্রয়িং কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা কারানের হাতও ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, তার হাত থেকে লাল র*ক্ত ঝরে পড়ছে। আর মাংসপিণ্ডের মতো কিছু একটা ধরে আছে হাতের মুঠোয়, কিন্তু কি সেটা—মিরা নিশ্চিত হতে পারছিল না।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কারান মিরাকে দেখে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে। এতটাই জোরে চেপে রাখছে মনে হয়, দাঁত ভেঙে যাবে। চাপা স্বরে বলল, “ফা*কিং শি*ট!”
এদিকে মিরা একটু হকচকিয়ে গিয়ে করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকাল। এই সামান্য কয়েক সেকেন্ডের সুযোগই যেন খুঁজে ছিল কারান। চোখে শয়তানি তীক্ষ্ণতা নিয়ে দ্রুত হাতটা উঁচিয়ে হৃৎপিণ্ডটা পাশের স্টোররুমের দিকে ছুঁড়ে মারল। হৃৎপিণ্ডটা গিয়ে কোনো ধুলোমাখা কার্টন বা পুরোনো কাপড়ের গাদায় পড়ল।
তারপর আগের থেকেও দ্রুততর গতিতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে সুপারশপের পলিথিনের প্যাকেট বের করল। প্যাকেটটা ঠান্ডা কাঁচা মাংসের। সেই প্লাস্টিক ছিঁড়ে মাংস বের করে দ্রুত হাতে বলের মতো গুটিয়ে নিয়ে দলাটা হাতে চেপে রাখল। খালি প্যাকেটটা মাটিতে ফেলে দিল। পুরো কাজটা এমন নিপুণ গতিতে সেরে ফেলল যে চোখের পলক ফেলতে ফেলতেই হয়ে গেল। তবুও কারানের বুক ধকধক করে উঠল। গলা শুকিয়ে কাঠ। কি জানি মিরা কতটুকু দেখেছে! কি কি বুঝে বসেছে! তার শ্বাস একদমই নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। সে মুখ গোল করে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লো, কিন্তু বুকের হাহাকার তাতে কমল না। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল।
এদিকে মিরা মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যই সিঁড়ির দিকে তাকিয়েছিল। তারপর আবার চোখ ফেরালো কারানের দিকে। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। ওর মুখে কী ভাব? শঙ্কা? নাকি অবিশ্বাস? কারান ওর চোখের ভাব ধরতে পারল না।
মিরার মাটিতে পা ফেলার শব্দগুলো দ্রুত হয়ে উঠল। সে হঠাৎ ছুটে এসে কারানের সামনে দাঁড়াল। দম নিতে নিতে দু’হাতে কারানের কাঁধ চেপে ধরল। তার চোখে পানি টলমল করছে। কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলল, “কি-কি হয়েছে? কি হয়েছে তোমার? আল্লাহ, এতটা কাটল কীভাবে? কত র-র’ক্ত…!”
মিরার নিশ্বাস ছোট হয়ে আসছিল। বুকটা হাঁপিয়ে উঠছে। কারান কিছুক্ষণ নিঃশব্দে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে অদ্ভুত বিস্ময় খেলা করছে। সে ভেবেছিল, মিরা দৌড়ে এসে প্রথমেই তার হাতের র*ক্তে ভিজে থাকা আঙুলগুলো ধরবে, হৃৎপিণ্ডের মতো লাল দলাটার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠবে, বা তীব্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করবে, ‘এটা কী, কারান? তোমার হাতে কী?’ কিন্তু না। তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই। বরং তার বউ, তার মিরা, কোনো প্রশ্ন না করে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাচ্ছে শুধুমাত্র তার দিকে।
কারানের ঠোঁটের কোণে হালকা শীতল হাসি ফুটে উঠল। চোখজোড়া নরম হয়ে এলো। সে নিজের অজান্তেই মুগ্ধ হয়ে পড়েছে। আপনমনে বলল, “ওহ মাই লেডি, এত ভালোবাসো আমাকে?”
মিরা তখনো ভাঙা ভাঙা শ্বাস নিচ্ছিল। তার বুক ওঠা-নামা করছিল দুঃশ্চিন্তার ভারে। সে কারানের কাঁধে হাত রেখে তার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর তার হাতটা ধীরে ধীরে কারানের পিঠে, বাহুতে, কাঁধে বোলাতে লাগল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল। চোখ ছুটে যাচ্ছিল কারানের জামার ভাঁজে ভাঁজে। কোথাও কোনো ক্ষত আছে কিনা সেটাই খুঁজছে।
কারানের শরীর সম্পূর্ণ ভিজে টসটসে। জামা পুরো লেপ্টে গেছে শরীরে। আর সেই ভিজে ত্বকে আলো পড়ে মনে হয় স্ফটিকের মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছে। তার তীক্ষ্ণ কপাল থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে, সুচালো গালরেখা বেয়ে কঠিন থুতনিতে মিলিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় তার ত্বক আরও বেশি উজ্জ্বল আর দুধের মতো ফরসা মনে হচ্ছে। পেশিগুলো টানটান ও কঠোর হয়ে আছে।
এতটা আকর্ষণীয়, তীব্র সৌন্দর্য নিয়ে তার স্বামী মিরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মিরা একবারও তার দিকে তৃষ্ণাভর দৃষ্টি মেলেনি। মুহূর্তটা স্বাভাবিক হলে, এই ত্রাসময় সুদর্শন পুরুষের মাঝে ডুবে না গিয়ে মিরার উপায় থাকত না।
মিরা এবার কারানের পেছনটা ঘুরে দেখল। পিঠে, কোমরে কোথাও কিছু নেই। তখন সে আবার সামনে এলো। চোখে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে বলল, “এই… কিছু বলছ না কেন? হুম? কীভাবে কাটল? তুমি এত রাতে বাইরে কেন গিয়েছিলে? এতটা… এতটা কাটল কীভাবে? দেখছো, র-রক্ত পড়ছে এখনো। আমাকে কি একটুও শান্তি দিবে না তুমি? এমন কেন তুমি?”
মিরার এক শ্বাসে কথাগুলো বেরিয়ে এলো। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। রাগে, ভয়ে, ভালোবাসায় মিশ্রিত সেই মুখে তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। তার জন্য মিরার চিন্তিত মুখ, কেঁপে ওঠা ঠোঁট দেখলে কারানের ভিতরে তৃপ্তি আসে। সে কিছু বলল না। শুধু স্থির, শীতল চোখে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। মিরা এবার তার জামার কলার দু’মুঠো করে চেপে ধরল।
অস্থির কণ্ঠে বলল, “বোবা হয়ে গেছো তুমি? কিছু বলছো না কেন? আমি মরছি এখানে দুশ্চিন্তায়…”
কারান মিরার বাহু শক্ত করে ধরে এক ঝটকায় টেনে নিল নিজের বুকের ভেতর। মিরা একটু হকচকিয়ে গিয়ে কারানের বুকের সাথে গিয়ে ঠেকল। তার কপাল কারানের কাঁধে লেগে গেল। মিরার গা কাঁপছিল। কারান মিরার চুলের ওপর মুখ ঝুঁকিয়ে আস্তে করে ঠোঁট রাখল। ফিসফিস করে বলল, “রিলাক্স, সুইটহার্ট!”
মিরা চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকটা তখনও ঢিপঢিপ করছে। তবে কারানের কণ্ঠে সহজ ভরসার ছোঁয়া পেলেও তার ভিতর জমে থাকা রাগ-দুঃশ্চিন্তা কি এত সহজে কমে?
তার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। একটু তিরস্কারের কণ্ঠে বলল, “এখন কি রিলাক্স করার সময় নাকি? তোমার এই খামখেয়ালি কথাগুলো একদম ভালো লাগে না আমার।”
সে কারানের কাঁধের ওপর হাত রেখে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল।
“দেখেছ, কতটা কেটে গেছে! র*ক্ত ঝরছে এখনো।”
কারান তার কথায় ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হেসে ফেলল। মিরার এই ভীত-রাগী মুখের মাঝেই মধুর কোনো দৃশ্য খুঁজে পেল সে। মিরার রাগ এবার তেতে চরমে পৌঁছালো। সে দু’হাত দিয়ে কারানের গাল ধরল, হালকা চেপে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “এই হাসছো কেন তুমি? আমি কি হাসির কথা বলেছি? এদিকে এসো।”
তারপর কারানের হাত ধরে টেনে নিয়ে সোফার দিকে হাঁটা দিল। কারান বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ করল না। ভদ্র বাচ্চার মতো সোফায় গিয়ে বসল।
মিরা একটু ঝুঁকে গম্ভীর মুখে বলল, “আমি ফাস্ট এইড নিয়ে আসছি। তুমি একদম কোনো দুষ্টুমি করবে না। বুঝেছ?”
এই কথায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও কারানের ঠোঁটের কোণে কৌতুকমিশ্রিত হাসি খেলে গেল। মিরার ভ্রূ কুঞ্চিত হলো। কারান কি তবে তাকে গম্ভীরভাবে গ্রহণ করছে না?
কারান গলা খাকারি দিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করল।
“সুইটহার্ট, ইট’স ওকে। এত টেনশনের কিছু হয়নি। আর আমি বাচ্চা নই!”
এই বলে সে আবার হেসে ফেলল। সেই হেসে ফেলার ভঙ্গিটা যেন মিরার রাগকে এক নিমেষে আগুনে পরিণত করল। সে দাঁড়িয়ে গলা শক্ত করে বলল, “তুমি বাচ্চার থেকেও ছোট।”
মিরা মুখ শক্ত করে সোজা এগোতে শুরু করল। কিন্তু পিছনে কারানের ভেজা পায়ের শব্দ শোনা গেল। মিরা পা থামিয়ে কাঁধ ঘুরিয়ে তাকাল। চোখমুখ তীক্ষ্ণ করে বলল, “তোমাকে না বসে থাকতে বললাম।”
কথার সঙ্গে কপালটাও কুঁচকে উঠল। ঠিক তখনই মিরার চোখ আটকে গেল কারানের কাঁধে। শার্টের কাপড়টা সেখানে বাজেভাবে ছেঁড়া। লাল র*ক্ত জমে কালচে হয়ে ছড়িয়ে আছে। মিরার পা যেন ছুটে যেতে চাইছিল তার দিকে, হাত বাড়িয়ে সেই ক্ষত ছুঁয়ে দেখতে চাইল। কিন্তু নিজেকে কষ্ট করে সামলে নিল। অস্ফুট কণ্ঠে বলল, “এসে তোমাকে বকা দিচ্ছি।”
সে আবার মুখ ঘুরিয়ে উপরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। এই ফাঁকে কারান রসুইঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে র*ক্তমাখা হাতের মাংসের দলাটা একটা স্টিলের পাত্রে সাবধানে ফেলে দিল। তারপর তাতে একটু পানি ঢেলে রাখল। সেই পানি কাঁচা র*ক্তে গাঢ় লাল হয়ে উঠল। পরমুহূর্তে নিজের র*ক্তাক্ত হাত নিপুণভাবে ঠান্ডা পানির নিচে ধুয়ে ফেলল।
সব শেষে ড্রয়িং রুমের টেবিল থেকে কয়েকটা টিস্যু তুলে হাত মুছতে মুছতে সেও সিঁড়ি বেয়ে মিরার পিছু পিছু উপরে উঠতে লাগল।
মিরা তখন একটা ঘরে ঢুকে ফাস্ট এইড নিয়ে এসে কক্ষ থেকে বের হতে যাবে, তখনই কারানকে দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে বলল, “বারণ করলাম না আসতে? একটা কথাও শুনবে না। চলো, বেডে বসো।”
চেঁচিয়ে উঠলো এবার, “এক্ষুনি আসতে বলেছি।”
কারানের মুখ থেকে এবার হাসি মুছে গেল। চোখ কেমন গভীর হয়ে গেল। কারণ সে জানে, মিরার হাত এই যন্ত্রণার ভার নিতে পারবে না। যদি সে ক্ষ’তের গভীরতা বুঝে ফেলে, তখন তার চোখে নেমে আসবে অশ্রুর প্লাবন। তাই এবার কারানের কণ্ঠে দৃঢ়তা নেমে এলো। হুকুমের মতো বলল, “তুমি পারবে না, সোনা। ছাড়ো, দাও এটা আমাকে।”
সে হাত বাড়িয়ে মিরার হাত থেকে ফাস্ট এইড বক্সটা নিতে চাইল। কিন্তু মিরা ভ্রূ কুঁচকে বক্সটাকে অন্য দিকে সরিয়ে, কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি পারব। তুমি বসো।”
কারানের ঠোঁটের কোণ সামান্য বেঁকে উঠলো। কঠিন সুরে বলল, “জেদ করো না। দাও, বেবি।”
মিরা তবুও দিতে না চাইলে কারান চোখ কঠিন করে তাকালো। এবার কারানের মুখের কঠোরতা দেখে মিরা আর জেদ ধরল না। জানে যে জেদ বাড়ালে কারানের ব্যথা আরো বাড়বে। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার হাতে থাকা ফাস্ট এইড বক্সটা কারানের হাতে তুলে দিল।
কারান হাত তুলে মিরার গাল ছুঁয়ে বলল, “এখন একটু বাইরে যাও, জান। আমার কাজ শেষ হলেই আসছি।”
“কেন? বাইরে যেতে হবে কেন? আমি তোমার পাশে থাকব।”
কারান গভীর নিশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল। মনে হয়, বেদনার সঙ্গে লড়ছে সে। তারপরে ধীর গলায় বলল, “কথা বললে শুনবে মিরা। বাইরে যাও।”
মিরা গরম রাগে বলতে লাগল, “শুধু কেটে গেছে বলে আমি এখন আর কথা বাড়াচ্ছি না।”
তারপর দরজার বাইরে চলে গেল। তখনই মিরা পেছন থেকে দরজাটা আটকে যাওয়ার শব্দ শুনল। সে দরজার দিকে ঝাঁপিয়ে পরে ধাক্কা দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠলো, “আমাকে টেনশনে রেখে দরজা আটকে দেওয়ার মানে কী? দরজা খুলো তুমি! কারান… কারান, দরজা খোলো। এই, শুনছো তুমি? কারান, রাগ হচ্ছে কিন্তু আমার। দরজাটা খোলো, বাবা।”
ভেতর থেকে ক্লান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসল, “কয়েক মিনিট পর।”
মিরা থমথমে হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলতে গিয়েও গলার কাছে এসে শব্দগুলো দলা পাকিয়ে গেল। বুকের গভীরে অজানা আতঙ্ক শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো।
ভিতরে কারানের মুখে এবার কষ্টের দাগ প্রকট হয়ে উঠল। এতক্ষণ মিরার জন্য সমস্ত যন্ত্রণা গিলে রেখেছিল সে। কিন্তু এখন আর চাপা দিতে পারল না। ডান কাঁধের ক্ষ’তটা ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
সে ধীরে ধীরে বিছানায় বসল। বাম হাতে শার্টের বোতামগুলো এক এক করে খুলতে খুলতে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “এত পেইন কেন হচ্ছে? উফফ…”
তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সাবধানতার সঙ্গে এক এক করে বোতাম খুলে শার্টটা পাশে সরিয়ে দিল। হাত বুলিয়ে দেখল, গুলিটা গভীরভাবে ঢুকে আছে কাঁধের ভিতরে। সে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো দরজাটা মজবুতভাবে বন্ধ। এরপর পাশের ছোট ঘরে ঢুকল। সেখানে একটা স্টিলের ট্রের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে কতগুলো চকচকে ডাক্তারি যন্ত্র। যেমন: স্ক্যালপেল, ফোর্সেপস, সুতো-কাঁটা, তুলোর বল ইত্যাদি।
কারান গভীর এক নিশ্বাস নিয়ে ছোট্ট স্ক্যালপেলটা তুলে নিল। গভীর শ্বাস নিয়ে তার ক্ষ’তভরা কাঁধের চারপাশে হাত বুলিয়ে যাচ্ছিল। দাঁত চেপে ধরে র*ক্তমাখা ত্বকের ওপর স্ক্যালপেল বুলিয়ে ক্ষুদ্র একটা চির ধরাল। সেই মুহূর্তে তার গা শিউরে উঠল, কপালের ওপর থেকে এক ফোঁটা ঘাম গড়িয়ে পড়ল। পরবর্তীতে বাম হাতে ফোর্সেপস তুলে ধীরগতিতে ঢুকিয়ে দিল ক্ষ’তের ভেতরে। গু’লিটা খুঁজতে শুরু করল। তার চোখের কোণে ব্যথার তীব্র রেখা ছড়িয়ে পড়ল, মুখ ফেটে একটা হালকা গোঙানির মতো শব্দ বেরোলো। নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে ফোর্সেপসের মাথা ঠক-ঠক করে ধাতব বস্তুতে লেগে গেল। দাঁত শক্ত করে চেপে ধরে ধীর টানে গু’লিটা বের করতেই, কাঁধ থেকে ফোঁটা ফোঁটা র*ক্ত পড়তে শুরু করল। নিচে তাকিয়ে দেখল ফোর্সেপসের মাথায় ধরা এক টুকরো কালো বুলেট।
এতক্ষণ হয়ে গেছে, কারান এখনো দরজা খুলছে না। অথচ মিরার উদ্বেগ অগ্নিপথের মতো বাড়তে লাগল। চিন্তার ছাপ কপালে গভীর ভাঁজের মত ফুটে উঠল। সে সেই তখন থেকেই দরজার সামনে পায়চারি করেই চলেছে। নিশ্বাস ঘন আসছে। একটুও স্বস্তি পাচ্ছে না। মিরা এবার আর ধৈর্য ধারণ করতে পারল না। সে দরজায় বারবার ঠকঠক শব্দ করল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, “কারান, আর কতক্ষণ টেনশনে রাখবে? কী হলো? তোমার কী ব্যান্ডেজ করা হয়েছে? কারান, হানি…”
এদিকে কারান মিরার উদ্বেগপূর্ণ কণ্ঠ শুনে গুলিটা একটা স্টিলের পাত্রে রাখল। সঙ্গে সঙ্গে টং করে শব্দটা সারা কক্ষে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর সে নিপুণভাবে সবকিছু গুছিয়ে লুকিয়ে রেখে সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। নিজের কক্ষে গিয়ে ক্ষ’তস্থানে শক্ত করে ব্যান্ডেজ পেঁচাতে শুরু করল।
অথচ মিরা ব্যাকুল স্বরে ডেকেই চলেছে, “কথা বলছো না কেন? উফফ, কারান… কারানের বাচ্চা… দরজা খোলো তুমি। শোনো, আমার কিন্তু…”
ঠিক তখনই কারান দরজার লক ঘুরিয়ে দিল। দরজা খুলতেই মিরার মুখের ভগ্নচিত্র যেন ওর বুকে কষে আঘাত করল। তার সুন্দরী বউটা কিছুক্ষণের চিন্তায় কী দশা করেছে মুখটার! চিন্তায় কপালে গভীর ভাঁজ পড়েছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের ভেতর থেকেও তার কপাল ভিজে চকচক করছে ঘামে।
মিরা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে কারানের ন’গ্ন বুক শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার দম বন্ধ করা নিশ্বাস ধাক্কা খেল সেখানে। এবার আর চোখের পানি আটকে রাখতে পারল না, গরম ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল কারানের ত্বকে। ফিসফিস করে বলল, “তুমি অমানুষ, কারান। তুমি রুথলেস, হার্টলেস। খুব খারাপ তুমি। খুব, খুব বেশি খারাপ তুমি।”
কারান ঠান্ডা হাসি হেসে মিরার ঘাড়ের এলোমেলো চুলগুলো শিকারির মতো মুঠোয় ধরল। তারপর সেই নরম ত্বকের উপর ঠোঁট বসিয়ে এক তীক্ষ্ণ চুমু আঁকল। মিরার সারা দেহ শিহরনে কেঁপে উঠল। কারান তার ঘাড়ে ঠোঁট ঠেকিয়েই গম্ভীর গলায় বলল, “আমি খুব খারাপ, সুইটহার্ট। কিন্তু কি করবে বলো? তোমার ডেস্টিনি এই অমানুষের সাথেই খোদার হাতে লেখা।”
মিরা রাগে তেতে উঠল। কারানের শান্ত মুখাবয়ব দেখে তার ক্রোধ আরও তীব্র হলো। কটমট করে বলল, “আমার স্বামী ভালোই, তুমি খারাপ বুঝেছ? দেখেছ, আমার অনিন্দ্যসুন্দর স্বামীটার কী হাল করেছ!”
কারান মনে মনে হালকা হাসি দিলো। মিরা তার প্রশংসা আর উদ্বেগ একসঙ্গে প্রকাশ করায় অদ্ভুত মুগ্ধ লাগছে তাকে। মিরার শ্বাস এখনও ব্যস্ত। রাগে, ভয়ে তার বুক ওঠানামা করছে। কারান ধীরে ধীরে দু’হাত তুলল। মিরার আঁশচেরা চোখের জল মুছে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল, “এই চোখের জল সামলাও, মিরা। জীবন আমাদের জন্য কত চমক লুকিয়ে রেখেছে, কে জানে! যখন আমি থাকব না, অথবা আমাদের পরিবারের কেউ হারিয়ে যাবে, তখন না হয় অবাধে কাঁদবে। আর খুশির কান্নাটা আমাদের সন্তানের আগমনের জন্য রেখে দাও। কিন্তু এখন কেন অকারণে কাঁদছ?”
মিরা শাড়ির পাড় দিয়ে চোখের কোণ মুছল। কারানের কথায় শ্বাসের গভীর অস্থিরতা কমে গিয়ে ধীরে ধীরে শান্তির পরশ নামল। সে কপাল কুঁচকে বলল, “দেখি তো, কতটা ক্ষ’ত হয়েছে?”
সে হাত বাড়িয়ে কারানের কাঁধের দিকে এগোল। মিরার আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই কারান হালকা শ্বাস ফেলল। মিরা ক্ষ’ত দেখেই তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “এতক্ষণ কি ঘাস কাটছিলে? ব্যান্ডেজটাও ঠিকমতো জড়াওনি দেখছি।”
কারান হালকা হেসে উত্তর দিল, “তুমি কি চাও, তোমার হাসব্যান্ড সত্যিই ঘাস কাটুক? বলো, মিরা। ইচ্ছে করলে এ ইচ্ছেটাও আমি নিঃশর্তে পূরণ করে দেব।”
মিরা হতাশ এক নিশ্বাস ছাড়লো। তার চোখের দৃষ্টি কারানের ক্ষ’ত থেকে সরে গিয়ে তার চেহারায় স্থির হলো—এই মানুষটিকে কিছু বলা বৃথা। সবসময় এমন ঠাট্টা করে পালটা জবাব দেওয়াই তার স্বভাব। শেষমেশ গলা সামলে, খানিকটা কঠিন ভঙ্গিতে বলল, “আগে বিছানায় গিয়ে বসুন। তারপর আপনার হচ্ছে।”
কারানের ঠোঁটের কোণে নির্মল হাসি ফুটে উঠলো। সে মিরার পিছু পিছু গিয়ে ধীর গতিতে বিছানার কোণে অবতরণ করল। মিরার হাতে তখন ফার্স্ট এইডের তুলো ও অ্যান্টিসেপটিক। কারানের হাতের ওপরের আলগা ব্যান্ডেজটি ফটাফট খুলে ফেলল সে। ক্ষ’তের দৃশ্য দেখে মিরার কণ্ঠে গভীর কষ্টের সুর ঝরে পড়ল, “জান, চলো না ডাক্তারের কাছে যাই। অনেকটা গভীর ক্ষ’ত, নিজস্ব যত্ন যথেষ্ট হবে না।”
“আমার ডাক্তার আমার সামনেই আছে। আর এসব ছোটখাটো বিষয় আমার গায়ে লাগে না।”
কারানের হেয়ালি উত্তরে মিরা কটমট করে বলল, “তা লাগবে কেন? গন্ডারের চামড়া নিয়ে জন্মেছেন যে।”
সে কোমল স্পর্শে কারানের ডান কাঁধের ক্ষ’তস্থানে বৃত্তাকার অঙ্গভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে ক্ষতাবশেষের গভীরতা ও প্রকৃতি বিচার করতে লাগল।
ক্ষ’ত থেকে টলটলে র*ক্তের বিন্দু বিন্দু কনা অবিরাম নিঃসৃত হচ্ছিল, আর মিরার অন্তর জুড়ে গভীর ব্যথার সঞ্চার হচ্ছিল।
সে প্রথমে তুলো দিয়ে অ্যান্টিসেপটিক নিয়ে সযত্নে ক্ষ’তের চারপাশটা আস্তে আস্তে মুছতে লাগল। কারান দাঁত চেপে মুখ শক্ত করে বসে থাকলেও, মিরা তার মুখাবয়বের ব্যথার ছাপ স্পষ্ট বুঝতে পারছিল।
ক্ষ’তের ওপরে সরাসরি অ্যান্টিসেপটিক ঢালার মুহূর্তে কারানের নিশ্বাস গভীর ও ভারাক্রান্ত হলো; দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলে রাখার নিরন্তর চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল, মুখে ক্ষীণ হাসি রাখতে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হলো।
মিরা কপাল ভাঁজ করে বলল, “সবসময় এইভাবে সহ্য করো কেন? ব্যথা লাগলে বলতে পারো না?”
তারপর নতুন তুলো নিয়ে ক্ষ’তটিকে ধীরে ধীরে চাপ দিয়ে র*ক্তরোধ করতে লাগল। কিছুক্ষণ ধরে চেপে রাখার পর র*ক্ত কিছুটা কমে গেলে সে পরিষ্কার গজ নিয়ে ক্ষ’তের ওপর ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে নিখুঁত গিঁট দিল।
সব কাজ শেষ করে মিরা দু’হাত তুলে কারানের গলার চারপাশে জড়ালো, মাথা আলতো করে তার কাঁধে ঠেকিয়ে দিল। নিশ্বাসের হালকা ওঠানামা আর হৃদয়ের দ্রুত স্পন্দন একই সঙ্গে অনুভূত হচ্ছিল দুই হৃদয়ে।
কারান এক হাত দিয়ে মিরার কোমর আবৃত করে ফিসফিস করে বলল, “আমার কষ্টের চেয়ে তুমিই বেশি কষ্ট পাও, কেন বলো তো?”
মিরা কোনো উত্তর দিল না; কেবল চোখ বন্ধ করে তার হৃদয়ের স্পন্দন শুনতে থাকল। ক্ষণিকের নীরবতার পর, ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে বলল, “এবার এক এক করে আমার প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দাও। কোনো খামখেয়ালিপনা দেখালে তোমার কাঁধে একটা ঘুসি মারব।”
কারানের চোখে অসহায় ভাব ফুটে উঠল। মিরা জোর দিয়ে বলল, “এইভাবে তাকিয়ে থেকে পার পাবে না। বলো, এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে? এই ক্ষ’তগুলো কীভাবে হলো? তুমি ভিজলে কী করে? হাতে যে মাংসের দলাটা ছিল, সেটা কী? কোথা থেকে পেয়েছিলে? আর এখন হাত থেকে কোথায় সরিয়ে রেখেছ?”
কারান শান্ত হেসে বলল, “কাম ডাউন, আমার মহারানি। আমি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি না। এত প্রশ্ন একসাথে করায় তুমি হাঁপিয়ে যাচ্ছো।”
“ঢং না করে স্পষ্ট উত্তর দাও।”
“সেদিন না বললে, অনেক দিন দেশি খাবার খাওয়া হয় না, বিদেশি খাবার খেয়ে খেয়ে মুখ ধরে গেছে। তাই গরুর রেজালা, কানাভুনা, কাটলেট করব ভাবছি৷ আর এই কারণেই মাংস কিনতে সুপারশপে গিয়েছিলাম।”
মিরার কণ্ঠে অবাক কপটতা ফুটে উঠল, “মাথা কি একদম খারাপ হয়ে গেছে তোমার? তাই বলে এত রাতে বাহিরে যেতে হবে?”
“তো কি হয়েছে! আমার বউয়ের ইচ্ছে তো পূরণ করতে হবে। তোমার কোনো আকাঙ্ক্ষা অসম্পূর্ণ রাখব না আমি।”
“তাই বলে এই ঝড়ো বৃষ্টির রাতে?”
“বৃষ্টি তো এখন থেমে গেছে, জান। আর আমি গাড়িতেই গিয়েছিলাম। কিচ্ছু হয়নি। দেখো।”
“সে তো দেখলামই, কিছু হয়েছে কিনা! এবার বাকিটা বলো।”
কারান গভীর নিশ্বাস নিয়ে শুরু করল, “ঘুম ভেঙে গিয়েছিল মাঝরাতে। তোমার মুখোমুখি বসে তোমাকে দেখছিলাম অনেকক্ষণ। তারপর আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু আসল না। তুমি তো জানোই, আমি সময় নষ্ট করতে একদম পছন্দ করি না। তাই উঠে পড়লাম। তোমার অপূর্ণ ইচ্ছার কথা মনে পড়ে গেল, শার্ট-প্যান্ট পরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ব্যাক করার টাইমে সাডেনলি গাড়ির ডিজেল শেষ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কিন্তু কোনো সাহায্য পেলাম না। অবশেষে উপায় না পেয়ে হেঁটে ফিরছিলাম। রাস্তার পাশেই একদল মাগারদের দেখতে পেলাম, ওরা ড্রিংক করছে। হঠাৎ ওরা অ্যাটাক করল। ওদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কাঁধে ছু’রির আ’ঘা’ত লাগল। আর এই অবস্থা। এরপর দেখি আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। তাতেই ভিজে গেলাম। আর হাতে গরুর মাংসের প্যাকেট ছিল, সেটাই দেখেছ। উপরে ওঠার আগে কিচেনে ওটা ভিজিয়ে রেখে এসেছি।”
মিরা কড়া দৃষ্টিতে চোখ ঘুরিয়ে বলল, “তোমার মাথার চিকিৎসা করাতে হবে, নাহলে কেউ এত রাতে বের হয়! কেন, ওসব কাল করা যেত না?”
“অলরেডি দেরি করে ফেলেছি, জান৷ সেদিনের ইচ্ছে আজ পূর্ণ করব। আমার তো শাস্তি প্রাপ্য, আমার বউয়ের ইচ্ছে এতদিন ধরে পূরণ করতে পারিনি। কি করব বলো? তোমার পায়ের জন্য তুমি এক মুহূর্তও নিজের থেকে দূরে যেতে দাওনি। তাই চেয়েও বাহিরে গিয়ে মাংস আনতে পারিনি।”
“খুব ভালো করেছেন। এখন হাতের এই অবস্থা হয়েছে, ভালো হয়েছে না?”
“রাগ করো না, সোনা। আমি ঠিক আছি।”
মিরা ধীরে ধীরে কারানের কাছে অগ্রসর হলো। কারানের কাঁধের ক্ষ’তের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিল। সেখানে স্পর্শ করতেই তার হৃদয় কেঁপে উঠলো। মিরার চোখ ছলছল করতে থাকল। কারান সেটা বুঝে ঠান্ডা দৃষ্টি মিরার দিকে ছুঁড়ল। তারপর কোনো কথা না বলে শক্ত হাতে মিরাকে কাছে টেনে নিল। মিরাও নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে কারানের গলা জড়িয়ে ধরল। আধঘণ্টা পেরিয়ে গেলো। মিরা আরও গভীরভাবে কারানের গলা আঁকড়ে ধরল। কারান হালকা হেসে মিরার কোমর শক্ত করে ধরে হঠাৎ টান দিয়ে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।
আচমকা মিরা চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলে বলল, “কারান, আজ একটা সত্যি কথা বলব।”
“হুম।”
“আমি জানি, রাশা ছাড়া তুমি অন্য কোনো নারীকে স্পর্শ করোনি।”
শব্দগুলো যেন র*ক্তাক্ত তরবারির মতো কারানের হৃদয়ে ছুরিকাঘাত করল। এতদিন পর মিরার মুখ থেকে এই অতিপ্রাসঙ্গিক কথা শুনে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। কিন্তু মিরা হঠাৎ এই কথা উচ্চারণ করল কেন? আর মিরা জানে মানে? কারান তো কখনো প্রকাশ করেনি এই বিষয়টি।
কারান ভ্রূ কুঁচকে, মিরার গলা থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা দূরে বসে বলল, “মানে?”
মিরার ঠোঁটরেখায় মৃদু হাসি ফুটে উঠল, “আমি দেখেছিলাম। আর দেখেছি তুমি কত বড় অভিনয়শিল্পী।”
কারান চুপ করে রইল। মাথায় যেন কোনো কিছুই প্রবেশ করল না। এই কয়েক মুহূর্তে মিরা কি তাকে সম্পূর্ণ বশীভূত করে ফেলল?
মিরা এবার গলায় শীতল কঠোরতা মিশিয়ে বলল, “বুঝতে পারোনি, তাই না? তোমাকে একবার বলেছিলাম, তুমি যদি একজন অভিনেতা হও, আমি তোমার জীবন পরিচালিকা। যেদিন তুমি রাশাকে ঘরে নিয়ে এলে, সেদিন থেকেই আমি তোমার ওপর নজরদারি শুরু করেছিলাম। আর ঘরে হিডেন ক্যামেরা বসিয়েছিলাম। কারণ তুমি নিজে বলেছিলে, ‘এখন থেকে আমি প্রতিদিন ঘরে মেয়ে আনব, তোমার কিছু করার থাকলে করে নিও।’ আমিও তাই আমার কর্তব্য পালন করেছিলাম। আমি তোমার সামনে কান্নাকাটি করলেও, মনে মনে আমি হাসতাম। কারণ আমি দেখতে পেতাম, তুমি ওদেরকে ড্রিংক অফার করতে। আর তা পান করেই ওরা বিছানায় পড়ে যেত। সেই ড্রিংকে ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল, যা ওদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচেতন করে রাখত। আর তুমি ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় বসে কাজ করতে। বিশ্বাস করো, তোমার এই কাজটায় আমি অনেক আনন্দ পেতাম। আমি যে কি পরিমাণে হেসেছি! বুদ্ধিটা ভালো ছিল, কিন্তু কাজে লাগেনি।”
কারানের গলা বাধাগ্রস্ত হয়ে এলো, ঢোক গিলে বলল, “তাহলে তুমি সবকিছুই জানতে?”
মিরা চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে এক গভীর নিশ্বাস ফেলল। তারপর ধীর স্বরে বলল, “জানতাম। এমনকি এটাও জানি, রাশাকেও তুমি কিস এর অধিক কিছু করো নি। তবে আমেরিকায় কিছু ঘটেছে কিনা, সে ব্যাপারে আমার নিশ্চিত জানা নেই।”
কারান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমেরিকায় কিছুই হয়নি। কিন্তু তুমি তো তখন সম্পূর্ণ সেন্সলেস ছিলে, বুঝতে পারলে কীভাবে?”
মিরা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে জানালার দিকে অগ্রসর হল। কেমন যেন প্রশান্তির প্রত্যাশায় টেক্সাসের রাতের আকাশের অগাধ গভীরতায় চোখ বোলাল। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, “মেসেজ পড়েছিলাম। রাশার পাঠানো মেসেজে লেখা ছিল, ‘ইউ ডিডেন্ট হ্যাভ টু হিউমিলিয়েট মি লাইক দিস অ্যাট হোম। আই সার্টেনলি ডিডেন্ট কাম রানিং জাস্ট ফর এ মিয়ার কিস।’ তখনই উপলব্ধি করেছিলাম, আমি সেন্সলেস হওয়ার পর আর কিছুই ঘটেনি।”
এটা শুনে কারান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হঠাৎই সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। পর মুহূর্তেই পেছন থেকে মিরার কোমর শক্ত করে দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। ধীরে ধীরে চাপ বাড়িয়ে, কটমট করে বলল, “মিরার বাচ্চা, তাহলে কেন বলেছিলে তুমি কান্না করেছিলে? কেন বলেছিলে কষ্টে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলে? সেইসব নাটক কেন? মিথ্যা কেন বলেছিলে তুমি? এতদিন চুপ করে ছিলে কেন?”
মিরার কণ্ঠে নীরব বেদনা ঝরে পড়ল, “মিথ্যা বলিনি আমি। আমি কান্না করেছিলাম, অনেক কেঁদেছিলাম। আর বলব না? তুমি তো আমাকে এগারো মাস ধরে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছিলে। টর্চারও তো কম করোনি। তাছাড়া আমার স্বামীর প্রথম আলিঙ্গন আমি হলেও, প্রথম চুম্বন তো আমার প্রাপ্য হয়নি। আর এতদিন না বলার কারণ? আমি ভেবেছিলাম তুমি নিজে সত্যিটা বলবে, কিন্তু তুমি কখনোই তা করো নি।”
কারান নিঃশব্দে মিরার কোমর ছেড়ে দিল। তার চোখের পাতা ক্লান্ত হয়ে গেলো। এক দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো। চোখ বন্ধ করে মুহূর্ত কয়েক নিজের মধ্যে গুছিয়ে নিল নিজেকে। তারপর চোখ মেলে মিরার দিকে চাইল। পেছন থেকে তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। মুখ নামিয়ে মিরার কানের কাছে আফসোসজনিত স্বরে বলল, “বলিনি, কারণ তখন সময় আসেনি। আর তুমিও তো অভিনয়ে কম পারদর্শী নও, মহারানি ভিক্টোরিয়া।”
মিরার ঠোঁটে উদাসীন বিদ্রুপ ফুটে উঠল। গলা নামিয়ে বলল, “অভিনয়? উমমম… না, অভিনয় বলতে পারো না। তবে যেহেতু পরিচালক আমি, তাই একটুআধটু অভিনেতার সাথে তাল মেলানো আমারও কর্তব্য ছিল। আর বলো, তোমার সময় কবে আসবে? যেদিন আমি বা তুমি উপরওয়ালার কাছে চলে যাব, সেদিন?”
কারানের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, চোখে কোনো সাড়া নেই। নিজের ভেতরেই কোথাও হারিয়ে গেছে সে। সেই মৌনতা মিরাকে খানিকটা অস্বস্তি দিল। সে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নটা করেই ফেলল, “কারান, এত এত অপূর্ব রূপসি মেয়েরা তোমার সামনে অভাবে বিছানায় পড়ে থাকত। তোমার তো কত সুযোগ ছিল। ওরাও তো এসেছিল কেবল কারান চৌধুরীর স্পর্শের জন্যই। তবুও তুমি ওদের দিকে একটা বার ফিরেও তাকাওনি। তোমার কি একবারের জন্যও ইচ্ছে হয়নি… কিছু করার… মানে ওসব… কিছু উল্টোপাল্টা করার?”
প্রশ্নটা করতে গিয়ে মিরার গলা দু-একবার কেঁপে উঠল। বুকের ভেতর কোথাও স্নায়ু তীব্র টান খাচ্ছিল। কিন্তু সে কারানের মুখ থেকে জানতে চায়।
কারান আচমকা তার কাঁধে শক্ত হাত রেখে তাকে ঘুরিয়ে পেছনে ঠেলে দিল। মিরার পিঠ গিয়ে ঠেকল ঠান্ডা দেয়ালে। তার শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁপন নেমে এলো। কারানের দৃষ্টি সূক্ষ্ম হলো। কঠিন গলায় বলল, “তুমি আমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছ?”
মিরা পলক ফেলল না। মৃদু মাথা নেড়ে বলল, “তুলছি।”
কারান মুখটা মিরার কাছে এগিয়ে এনে ফিসফিস করে বলল, “আমি শত নারীর উ’ল’ঙ্গ দেহ কাঁধে করে বয়ে এনেছি।”
কথাটা শুনে মিরার গলা শুকিয়ে গেলো। তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড প্রচণ্ড গতিতে ধুকধুক করতে লাগল। তবে পরমুহূর্তেই মিরার কপাল কুঁচকে গেল। চোখের দৃষ্টি এমন তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল যেন চোখ দিয়েই কারানকে চূর্ণ করে দেবে। কারান সেই দৃষ্টি উপভোগ করল। ঠোঁটে ক্ষীণ বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কণ্ঠে মাদকতা মিশিয়ে বলল, “এভাবে তাকিও না, বেগম। পৃথিবীর সমস্ত নারীকে সামলে রাখার শক্তি আমার আছে, কিন্তু তোমার এই দৃষ্টি আমাকে সম্পূর্ণ দাসে পরিণত করে দেয়। তোমার সামনে আমি নিরস্ত্র। আমি দুনিয়ার কোনো শক্তির কাছে নত হই না, কিন্তু তোমার এই রূপ আমার সমস্ত ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়। আমি যে আগুনে জ্বলছি, তা দুনিয়ার কোনো নারী নেভাতে পারবে না, শুধু তুমি আমাকে ছারখার করে দিতে পারো।”
মিরা চোখ সরু করে, তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “বিস্তারিত বলো।”
কারান দম নিয়ে শুরু করল, “আমি, ফারহান আর এমেকা একটা ভয়াবহ ট্র্যাপে আটকে গিয়েছিলাম। ওখানে মেয়েদের শরীরে জোর করে ড্রাগ ইনজেকশন দিয়ে পুরোপুরি অচেতন করে রাখা হচ্ছিল, যাতে কোনোভাবেই পালাতে বা চিৎকার করতে না পারে। তারপর তাদের কাপড় ছিঁড়ে সম্পূর্ণ ন’গ্ন করে, শরীর পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছিল দেহে কোনো ক্ষত, দাগ বা রোগ আছে কিনা। কারণ এগুলোকে পরে যৌ*ন শোষণ বা অবৈধ দে’হব্য’ব’সায় বিক্রি করার জন্য প’ণ্য হিসেবে দেখানো হবে। ওখানে অন্তত পাঁচশোর বেশি মানুষ সরাসরি এই কু’কর্মের সাথে যুক্ত ছিল। কেউ হয়ত পা’চা’রকারী, কেউ বা পাহারাদার, কেউ আবার ক্রেতা। ওরা এভাবেই মানুষকে অপ’হরণ করে, ফাঁদে ফেলে বা প্রলোভন দেখিয়ে, মাদক দিয়ে অচেতন করে অ’বৈধ যৌ*ন বাজারে বিক্রি করে দেয়। এই বিজনেস থেকে বছরে ৩২ বিলিয়ন ডলার প্রফিট হয়। আর সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার, এদের অনেকেই কখনো আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না।”
মিরার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল। সে শ্বাস আটকে কিছুক্ষণ কারানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “মানে… মানে হিউম্যান ট্রাফিকিং?”
কারান ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির রেখা টেনে বলল, “Great! I see my starling is quite intelligent.”
মিরা কপাল ভাঁজ করে বলল, “তারপর?”
কারান এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে গলা খাঁকারি দিল। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, “আমাদের হাতে একদম সময় ছিল না। পুলিশকে খবর দেওয়ার উপায়ও ছিল না; সেই জায়গাটা পুরোপুরি বদ্ধ, এমনকি নেটওয়ার্ক সিগনালও ব্লক করা ছিল। এটা পাচা’রকারীদের একটা সাধারণ কৌশল, যেন বাইরে কোনো তথ্য না যায়। আমরা স্থির করলাম, নিজেরাই মেয়েগুলোকে বের করব। কিন্তু ৫০০ মানুষের সামনে আমরা মাত্র তিনজন। ওদের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই আমরা অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলাম। প্রায় দু’ঘণ্টা লুকিয়ে ছিলাম, আর চোখ রেখেছিলাম পরিস্থিতির ওপর। তারপর দেখলাম পাচা’রকারীরা বড় দল থেকে ছোট ছোট গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে। আমরা জানতাম, মূল দালাল ও সশস্ত্র গার্ডরা দূরে গেছে, কিন্তু তখনো প্রায় পঞ্চাশজন পাহারা দিয়ে ওদের আস্তানায় অবস্থান করছিল। ওই সুযোগটাই আমরা কাজে লাগালাম।
পাহারায় থাকা লোকগুলোকে চুপিসারে পেছন থেকে মাথায় আ’ঘাত করে একে একে অচেতন করলাম। ফরচুনেটলি, সেদিন ওরা আমাদের উপস্থিতি আঁচ করতে পারেনি। তারপর তাড়াহুড়ো করে আমাদের গায়ের কোট খুলে একটা একটা করে মেয়ের ন’গ্ন শরীরে জড়িয়ে কাঁধে তুলে নিলাম। সেদিন ওখানে প্রায় দুই শতাধিক মেয়ে ছিল। আমি একাই কাঁধে করে শতাধিক মেয়েকে ওই অবস্থা থেকে টেনে বের করে আনলাম। বাকিদের ফারহান আর এমেকা নিয়ে এলো। পরে স্থানীয় কিছু স্বেচ্ছাসেবক ও এনজিওর সাথে যোগাযোগ করে তাদের হেফাজতে দিয়ে আসলাম।”
এখনকার কথাগুলো কারান সত্যিই বলছে, নাকি মায়াময় বাণীতে মিরাকে বশ করছে—তা তার মুখাবয়বে সামান্যতম ইঙ্গিতেও ধরা পড়ল না। তার বুদ্ধির গভীরতা বোঝা দুষ্কর; মিরার পক্ষে নির্ধারণ করাও কঠিন যে, সে গেম খেলছে নাকি সত্যি। তার গলার প্রভাবশালী স্বর ও শব্দ বাছাইয়ের দক্ষতা যে কাউকে তার বশে আনতে সক্ষম। তাহলে কি এই পর্যায়েও কোনো ছলনা লুকিয়ে আছে?
সম্ভব নয়, আবার অসম্ভবও বলা যায় না।
মিরা নিশ্বাস ফেলে বলল না কিছু। তার চোখের পাতার কাঁপন, ঠোঁটের কোণে ক্ষণিকের অনড়তা বলে দিচ্ছিল সে ভিতর থেকে কতটা নড়ে গেছে।
কারান গলার স্বর গভীর করে বলল, “কিন্তু জানো, ওই মেয়েগুলোর প্রতি আমার একটুও অনুভূতি জাগেনি। আমি আজ অবধি বলতে পারব না, ওরা দেখতে কেমন ছিল, কিংবা ওদের দেহের আকার কেমন ছিল। আমার কাছে ওরা কেবল পুতুলের মতো ছিল, যাদের বাঁচাতে আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আর আমার নিয়ন্ত্রণ হীরার থেকেও অটল ও কঠিন, মিরা। আমার চাহিদা, আমার ক্ষুধা—সব কেবল তোমার জন্যই সংরক্ষিত। অ্যান্ড বেইব, কাম অন, ইউ নো ড্যাম ওয়েল মাই ডি*ক ইজেন্ট সাম লিম্প পিস অফ শি*ট। ইট’স রক ফা*কিং সলিড। ইট স্ট্যান্ডস টল ফর ইউ, অ্যান্ড অনলি ইউ।”
কারানের কথা শুনে মিরার ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি খেলে গেল। সে কারানের বাম বাহু ধরে কণ্ঠে গাঢ় প্রশান্তির সুর এনে বলল, “আমার স্বামীর মাসেল আছে বলতে হবে।”
কারান সামান্য ভ্রূ কুঁচকে অবাক হয়ে মিরার দিকে তাকাল। ভেবেছিল, মিরা এসব শুনে হয়ত অসন্তুষ্ট হবে, চোখ সরিয়ে নেবে বা কোনো বিদ্রুপাত্মক কথা বলবে।
কারান নরম গলায় বলল, “তোমার রাগ হয় না? তোমার স্বামীর কাঁধে অন্য মেয়েরা ছিল!”
“আমি অবুঝ নই, কারান। যেখানে তাদের প্রাণের ভয় ছিল, সেখানে এমন কথা তোলা নিছক নির্বুদ্ধিতা। বরং আমার খুব প্রাউড ফিল হচ্ছে, যে আমার হানি এমন কাজ করেছে।”
কারানের ঠোঁটের কোণে সপ্রশংস হাসি ফুটে উঠল। গভীর কণ্ঠে বলল, “My wife is pretty mature.”
মিরা ভ্রূ কুঁচকে চোখ চওড়া করে বলল, “কিন্তু তোমরা ট্র্যাপে পড়লে কীভাবে?”
“ওটা বিশাল কাহিনি, মিরা।”
“আমার সময় আছে, বলো তুমি।”
“কিন্তু আমার সময় নেই।”
মিরার মুখ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল। চোখ খানিক নরম হয়ে এলো। সে টানা নিশ্বাস ফেলল। হয়ত নিজের ভেতরকার তীব্র কৌতূহল গিলে ফেলছে।
কারান হাত বাড়িয়ে মিরার চিবুক আঙুলের ফাঁকে নিল। তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে এনে চোখে চোখ রেখে বলল, “এখনো এসব জানার সময় আসেনি, মিরা। আর আমি বলতেও চাই না, অন্তত এই মুহূর্তে নয়। যেদিন বলব, সেদিন তুমি পুরো কারানকেই চিনবে। আমার ভেতরের অন্ধকার, আমার লুকোনো যন্ত্রণাগুলো, এমনকি সেই দাগগুলোও যেগুলো আমি কাউকে দেখাতে চাইনি, সে সবকিছু তুমি জানবে। তখন আমি তোমার সামনে বিকারহীন সত্যের ন্যায়ে সম্পূর্ণ ন’গ্ন হয়ে দাঁড়াব।”
মিরা এবার আর তর্কে গেল না। সে জানে, কারান যখন কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন হাজার প্রশ্ন করলেও কোনো লাভ নেই।
কারান তখনো মিরাকে গম্ভীর দৃষ্টিতে দেখছিল। হঠাৎ তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। একটা ভাবনা প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে তার মাথায় আছড়ে পড়ল। যেহেতু কারান নিজেও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে, তার মানে নিঃসন্দেহে মিরা তার স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে। কারানের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা কিছু নেমে গেল।
গলা খানিক শুকিয়ে এলো, কণ্ঠের স্বর ভারী করে বলল, “আচ্ছা… সেই সিসি ক্যামেরাগুলো… সেগুলো কি এখনো আছে?”
মিরা মাথা নেড়ে বলল, “না। আমি অনেক আগেই খুলে ফেলেছিলাম। যখন দেখলাম তুমি বদলে গেছো। আমি বুঝেছিলাম, তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো।”
কারান দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লো। মনে মনে একটা স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। যাক, অন্তত মিরা ওসব কিছু জানে না।
কিন্তু মিরা হঠাৎ আবার কথা তুলল, কণ্ঠে কঠিন তীক্ষ্ণতা এনে বলল, “আর তুমি কি ভেবেছিলে, তুমি পরকীয়া করতে আর আমি সব জেনে-বুঝে তোমার সাথে দিব্যি সংসার করে যেতাম? আমাকে কি ওরকম ন্যাকা টাইপের মেয়ে ভাবো নাকি?”
কারান গভীরভাবে মিরার চোখে তাকাল। এই কয়দিনে অন্তত সে মিরাকে খানিকটা বুঝেছে। মিরা মুখে যতই কোমল হোক, ভেতরটা পাথরের মতো দৃঢ়। কারান ঠোঁটের একপাশে হালকা বিদ্রুপের হাসি এনে বলল, “তাহলে কী করতে? ডিভোর্স দিতে?”
মিরা নাক সিঁটকে বলল, “উঁহুঁ, ভুলেও না। ডিভোর্স দিলে তো তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে, সেটা আমি হতে দিতাম নাকি!”
“তাহলে?”
“তোমাকে খু’ন করে জেলে যেতাম।”
কারান শ্বাস আটকে বিস্মিত চোখে খানিকক্ষণ মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। মিরার এমন ভয়ংকর স্বীকারোক্তি শুনে ভিতরে ভিতরে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল। সে নিজের মনেই বলল, “So proud of you, my love.”
তারপর ঠাট্টার সুরে বলল, “আচ্ছা, তারপর? জেলে একা কীভাবে কাটাতে?”
মিরা মুখ নীচু করল। ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে নিশ্বাস ফেলল। তার গলার স্বর হঠাৎ করেই বিষণ্ন হয়ে গেল, “তোমার মেমোরিজ মনে করে করে। তবে তোমাকে মে’রে ফেললে, আমি হয়ত এক সেকেন্ডও বাঁচতে পারতাম না।”
“এগুলো তো সবাই বলে, মিরা। বাট রিয়েলিটি ইজ অ্যানাদার স্টোরি। না হলে দুনিয়ায় কেউ আর দ্বিতীয় বিয়ে করত না।”
মিরা কথাটা শুনে তীক্ষ্ণভাবে কপাল কুঁচকে ফেলল। মুহূর্তেই সে দুহাতে কারানের গলা এমনভাবে আঁকড়ে ধরল যেন এখনই শ্বাসরোধ করে ফেলবে। কণ্ঠে কোমল হুমকি নিয়ে বলল, “এমনভাবে বলছো যেন আমি ম’রে গেলে তুমি দিব্যি সেকেন্ড বিয়ে করে ফেলবে! করবে নাকি? এখনই বলে দাও, তাহলে বুকের মধ্যে ছু’রি ঢোকানোর শুভ কাজটা করে ফেলি।”
কারানের হাসিটা ফিকে হয়ে গেল, কিন্তু চোখে আগুন জ্বলে উঠল। সে তো এই ভয়ংকর মিরাকেই চেয়েছিল। সে মিরার নাক আলতো করে টেনে গলা গম্ভীর করে বলল, “আমার বাঘিনী, আ’ম টোটালি ক্রাশিং অন ইউ, বেইবি।”
মিরার দিকে ঝুঁকে পুনরায় বলল, “তুমি মা’রা গেলে হয়ত বেঁচে থাকলেও আমি বাঁচতে চাইব না। কারণ তোমার অনুপস্থিতি আমার জন্য ধ্বংসের সমান।”
মিরার ঠোঁট হালকা হাসিতে বেঁকে গেল। সে আরও এগিয়ে এলো। এতটাই কাছে যে কারানের গলা স্পষ্ট টের পেল তার গরম নিশ্বাস। মিরার আঙুল কারানের অ্যাডামস অ্যাপল ছুঁলো। তীক্ষ্ণ নখগুলো হাড়ের তলায় স্পর্শ করল। কারান ঢোক গিলল। গলার শিরাগুলো ওভাবে তার আঙুলের তলায় কেঁপে উঠতে দেখে মিরার চোখ ঝলকে উঠল। কঠিন গলায় বলল, “তুমি কেন এক রাতে হঠাৎ পালটে গিয়েছিলে, কারান? আজ মিথ্যা না বলে সত্যিটাই বলো।”
কারান চোয়াল শক্ত করে ফেলল। ঘাড়ের পেশি স্ফীত হয়ে উঠল। সে জানত, আজ যতই সাবধানে কথাবার্তা চালাক না কেন, যেহেতু পুরোনো কথা উঠেছে, মিরা এই প্রশ্ন তুলবেই। কারান শীতল গলায় বলল, “দুবাইয়ের কাজটা শেষ হোক। পরে এখানে আরেকটা ফাইল ক্লোজ করতে হবে। তারপর তোমার কাছে চিরদিনের জন্য ফিরে আসব। আর এক মুহূর্তও তোমার থেকে আলাদা হব না। তখন তোমাকে সব বলব, মিরা। একদম সবকিছু। ততদিন ওয়েট করো।”
“কিন্তু আমি এখনই সব শুনতে চাই, কারান। কারণ আমি জানি, তোমাকে যেভাবে দেখি, তুমি ঠিক তেমন নও। হয়ত আমার ধারণাগুলোই ভুল প্রমাণিত হবে। তাছাড়া তোমাকে নিয়ে নেগেটিভ কিছু কল্পনায়ও আনতে চাই না আমি।”
কারান দুই বাহু দিয়ে মিরার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মুখটা মিরার কানের কাছে আনল। গলা নামিয়ে বলল, “জেদ ধরো না।”
মিরা গলা সামান্য সরিয়ে তীব্র কণ্ঠে বলল, “ধরতে কোথায় দাও?”
কারানের ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে স্নিগ্ধভাবে মিরার কপালের চুলে ফুঁ দিল। মিরা চোখ বন্ধ করল। কারানের প্রতিটি স্পর্শেই তার আত্মা প্রতিবার সুখের সাগরে ডুব দেয়। এবারও তার ভেতর অজানা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ল, লজ্জার পাট হয়ে ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটল। তাদের নিশ্বাসগুলো একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ল।
কিন্তু মিরার এই অপার্থিব সৌন্দর্য, এই নির্মল হাসি দেখে কারানের হৃদয় বিষণ্নতায় মাখামাখি হয়ে গেল। সে নিজেই অবাক, কীভাবে এমন এক নারী তার জীবনে এসে এতটা আলো ছড়ালো, অথচ সেই আলোর মধ্যেই তার অন্তর ভরা ভয়। সে আনমনে বলল, “আমি ইচ্ছে করেই তোমার সামনে খারাপ থাকতে চাই, মিরা৷ তাহলে পরবর্তীতে ধাক্কাটা হয়ত কম খাবে। কারণ আমি এর থেকেও অজস্র খারাপ। যদি আমাকে ভালো ভাবো, শেষমেশ কষ্টটা তোমারই হবে।”
প্রায় অনেকটা সময় পর মিরা চোখ মেলে গভীর বিষণ্নতায় মিশ্রিত দৃষ্টিতে কারানের দিকে তাকালো। সে উপলব্ধি করল, এই মুহূর্তে কারান তার সামনে সত্যের দরজা খুলতে নারাজ। হয়ত তার গোপন আলামত আরও গভীরে লুকানো। সে নিঃস্ব স্বরে বলল, “একটা কথা বলবে? রাশার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা ঠিক কেমন ছিল? দয়া করে ‘পরে বলব’ বলে এড়িয়ে যেয়ো না। আমার প্রচণ্ড কষ্ট হবে। এটার উত্তর আমি ভীষণভাবে শুনতে চাই। অনেকদিন ধরে এই প্রশ্নগুলো বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছি। এত ঝড়ঝাপটা গেল, কখনো তোমাকে বলা হয়ে ওঠেনি। সব চেপে রেখেছিলাম নিজের ভেতরে। আজ বলো, রাশার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা আসলে কেমন ছিল? সত্যিটা বলবে কিন্তু।”
কারান শীতল, বিচক্ষণ দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকাল। লক্ষ করল, এই প্রশ্নটি মিরার চেহারায় অগণিত কৌতূহলের প্রকাশ পাচ্ছে। নারীরা বোধহয় এমনই! পূর্বক্ষণে যে কথাগুলো কারান অত্যন্ত গুরত্বসহকারে বলেছিল, সেগুলো মিরার কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেনি। অথচ এই একটি প্রশ্নই যেন তার সমগ্র অস্তিত্বকে উৎকণ্ঠার তাপে দগ্ধ করছে। মিরার দৃষ্টি আর তীব্রভাবে চাপা রাখা ক্ষোভের আভা কারানের দৃষ্টি এড়াল না।
কারান গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “রাশা আসলে রাশিয়ান বংশোদ্ভূত। ওর মা বাংলাদেশি। এন-সি স্টেইট ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়েছি আমরা। রাশা অনেকবার প্রোপোজাল দিয়েছিল, বাট আই নেভার টুক ইট সিরিয়াসলি, কারণ এট দ্যাট টাইম ইট ওয়াজ জাস্ট আ পার্ট অফ মাই এভরিডে রুটিন।”
মিরা এবার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “তার মানে আমার স্বামীকে অনেক মেয়ে প্রোপোজাল দিয়েছে?”
“তা তো দিয়েছে।”
মিরার চোখ দুটো লাল অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে উঠল। সে দুহাত মুঠো করে শক্ত করে বলল, “কেউ কি তোমাকে স্পর্শ করেছে?”
কারান আড় হেসে বলল, “আমার বউ কি জেলাস?”
“হ্যাঁ, প্রচণ্ড জেলাস।”
“তোমার হাসব্যান্ডকে স্পর্শ করার সাহস কারো ছিল না।”
“কিন্তু তাকিয়েছে তো?”
কারান থোড়াই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল, “হুম।”
মিরার রাগ আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে কঠোর কণ্ঠে বলল, “আমার ইচ্ছে করছে ওই মেয়েদের চোখ তুলে ফেলি।”
কারান হেসে বলল, “আমার বউ তো দেখছি দিনে দিনে আমার ফিমেইল ভার্সনে রূপান্তরিত হচ্ছে।”
“সে তুমি যা খুশি ভাবো।”
কারান দুই হাতে মিরার দুই কাঁধে জোরালো স্পর্শ রেখে বলল, “মিরা, তুমি যখন সবকিছুই জানতে, তবুও কেন অতগুলো দিন আমাকে কষ্ট দিয়েছো? কেন দূরে থেকেছ? শুধু একটা কিস-এর জন্য?”
মিরা ভ্রূ কুঁচকে, চোখে খাঁটি বিদ্বেষ নিয়ে বলল,
“শুধু? লিপকিসটাকে তোমার শুধু মনে হয়? আমি প্রতি রাত কেঁদেছি এই ভেবে যে আমার স্বামী অন্য নারীর ঠোঁট ছুঁয়েছে। আজও সেই দৃশ্য মনে হলেই তোমার ঠোঁট আর ওই শাকচুন্নি, পিশাচিনী, কালমুখী, নাগিনী রাশার ঠোঁট একসাথে কে’টে ছিঁ’ড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। আর তুমি বলছো শুধু!”
কারান বিস্ময়ে স্থির হয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে থাকল।
মিরা কটমট করে বলল, “কি দেখছ তাকিয়ে?”
এরপর সে ফুস করে শ্বাস নিয়ে ক্ষীপ্ত গলায় অনর্গল এক নিশ্বাসে বলে গেল, “She’s a f’ilthy homewr’eck’er. That sl’utt’y tr’amp. She’s a co’nniving wh’or’e, a ska’nk’y bit’c’h, nothing but a desperate sk’an’k. That gold-digging wh’o’re, that shameless man-stealing ha’g, dirty little sl’u’t, worthless cow, manipulative witch, toxic piece of s’h’it… Aaaaaaaa… f’uck her!”
মিরা থেমে গিয়ে দ্রুত নিশ্বাস ফেলতে লাগল। ক্রোধে তার বুক ওঠানামা করছিল। কারান ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে নখ কাটতে কাটতে মিরাকে দেখতে লাগল। তার কল্পনাতেও ছিল না যে মিরা এত বীভৎস, নিষ্ঠুর গালি জানে। আর তার চেয়েও ভয়াবহ, মিরা নিঃসংকোচে সেইসব বলেও ফেলছে। কারান কয়েকবার কাশি দিয়ে গলা সরু করল। তারপর হাসি চেপে মিরার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, “আসতাগফিরুল্লাহ নাউজুবিল্লাহ, তওবা তওবা… সুইটহার্ট, তুমি ঠিক তো আছো?”
মিরা তীব্র দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল তার দিকে।
Tell me who I am 2 part 5 (2)
“কি মনে হচ্ছে তোমার?”
কারান ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল, তারপর গ্লাসে ঢালা ঠান্ডা পানি এগিয়ে ধরল। মিরা সেই পানি এমন এক টানে খেতে থাকল, মনে হয় নিজের গলার জ্বলন্ত আগুন নেভাচ্ছে। তার চোখমুখ তখনও আগুনের মতো লাল হয়ে আছে। কারান সাহস করল না বলার যে, ‘আস্তে খাও, মিরা’।
তবে পরম মমতায় সে মিরার লাল হয়ে থাকা গাল দু’হাতে আবদ্ধ করে বলল, “আপনাকে দুধ আর গোলাপজলের পবিত্র পানিতে গোসল করাতে হবে, বেগম। আপনার মুখটা একদম অপবিত্র হয়ে গেছে।”
