Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৪১

খান সাহেব পর্ব ৪১

খান সাহেব পর্ব ৪১
সুমাইয়া জাহান

ওমানের নারীদের জন্য একটি উচ্চ নিরাপত্তার কারাগার। সেই নির্জন, নীরব দেয়ালের ভেতর পাঁচটি বছর কাটিয়ে দিয়েছে এক তরুণী। সুমাইয়া জাহান, যাকে সকলে শুধু ‘সুমু’ নামেই চেনে। তার মুক্তির আর মাত্র এক মাস বাকি। এই দীর্ঘ সময়টা সে কাটিয়েছে নিঃশব্দে, নিভৃতে। খুব কম কথা বলে, চোখে জমে থাকে একরাশ পুরনো আলো আর এক বুক না বলা গল্প নিয়ে। তার অপরাধ এখন আর কারো আলোচনার বিষয় নয়। তার নীরবতা, চোখের ভাষা, আর আচরণের মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজারো অপূরণীয় স্বপ্ন। বাকি কয়েদিদের থেকে সে একটু আলাদা। খুব চুপচাপ, কারো সঙ্গে মিশে না, কারো চোখে চোখ রাখে না। এই বন্দিত্বের পাঁচ বছরে একমাত্র নিঃসঙ্গতা আর প্রিয় স্মৃতিই ছিল তার সঙ্গী। আর প্রতিদিন এক ঘণ্টার জন্য সে পায় এক অন্যরকম শ্রোতা। নাম আলিয়া বিনত সালেহ, কারাগারের এক নারী পুলিশ অফিসার। প্রতিদিন, ঠিক দুপুর তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত, কারাগারের নির্দিষ্ট কাচঘরে হাজির হন সেই পুলিশ কর্মকর্তা আলিয়া বিনত সালেহ। প্রথমে এটা ছিল কর্তব্যের অংশ, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই এক ঘণ্টার সময়টা হয়ে ওঠে আলিয়ার জীবনের অপেক্ষার প্রহর। কারাগারের এক সদা-কঠোর পুলিশ অফিসার আলিয়া বিনত সালেহ। তিনি নিয়ম করে প্রতিদিন আসে। কিন্তু তার চোখেও একধরনের নরমতা ফুটে ওঠে, যখন সে সুমুকে দেখে। কারণ, সুমু প্রতিদিন আলিয়াকে এক ঘণ্টা করে ভালোবাসার গল্প শোনায়। না, কল্পনার প্রেম নয়। তা ছিল তার নিজের, তার হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী, সুমুরাজের গল্প।
আলিয়া আজও এলেন। সুমু ডায়েরিতে কিছু একটা লিখছে। আলিয়া হেসে সুমুর সামনে বসে বলল,

“তুমি তো আর বেশিদিন নেই এখানে। কিছু অন‍্যায়কারীকে খুন করে আইন নিজের হাতে তুলে নেবার ফলে তোমার কারাবাস হয়েছিল। ওমানের মানুষের আন্দোলনের ফলে তোমার ফাঁসি মকুফ করে তোমাকে পাঁচবছরের কারাবাস দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়টা আজ শেষে এসে ঠেকেছে। লাস্ট তিন বছরে যখন তোমার সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন দেখলাম এই ঘরটার প্রতিটা দেওয়াল জুড়ে শুধু “খান সাহেব” লেখা। আবার কিছু কিছু জায়গায় কোনো এক ব‍্যক্তির চিত্র অঙ্কন করা। সেদিন থেকে তোমার প্রতি আমার আগ্রহ জাগল। সেদিনের পর তোমার জীবনের গল্প শুনে আসছি আমি। প্রথম দিকে তুমি একটা শব্দও উচ্চারণ করতে না। আমি অনেক অপেক্ষা করেছি তোমার গল্পটা শোনার। একদিন হঠাৎ টানা ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর অনেক রয়ে সয়ে অনেক অপেক্ষায় অবসান ঘটিয়ে তুমি আমাকে রোজ একটু একটু করে সুমুরাজের গল্প বলতে শুরু করলে। হাতে আর মাত্র একটা মাস আছে। আমি কি আদো এই একটা মাসে সুমুরাজের পুরো গল্প শুনে শেষ করতে পারব?”
সুমু ডায়েরি থেকে চোখ তুলে তাকাল। শুকনো ঠোঁটে হালকা হেসে বলল,

“অসমাপ্ত সবকিছুই সুন্দর। সবটা জেনে ফেললে আপনি আগ্রহ হারাবেন। কিছু জিনিস অসমাপ্ত রেখে সারাজীবন তার প্রতি আগ্রহটাকে বাঁচিয়ে রাখা ভালো।”
আলিয়া অল্প হেসে বলল,
“তা আজ কি লিখেছ ডায়েরিতে? আমি কি পড়তে পারি?”
কারাগারের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে বসে সুমু একটি পুরনো ডায়েরিটা আলিয়ার হাতে দিল। আলিয়া ডায়েরির পাতা খুলে পড়তে শুরু করল।
“যেদিন আপনি প্রথম আমাকে দেখেছিলেন, আপনার চোখ দুটো আমার দিকে ফিরেছিল– ঠিক যেন আগুনের ভেতরে জমে থাকা কোমলতা। আপনি রাগী ছিলেন, অথচ আমার সামনে দাঁড়ালেই আপনার কণ্ঠ থমকে যেত। আপনি আমায় ডাকতেন “সুইটহার্ট বলে”। আর আমি আপনাকে বলতাম “খান সাহেব”। আমরা ছিলাম “সুমুরাজ”। আজও মনে পড়ে, সেই রাতে আপনি কাঁদছিলেন, আর বলেছিলেন, তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।”
সুমু কিছু বলে না। সে শুধু চুপচাপ বসে থাকে। আলিয়া মাঝে মাঝে হঠাৎ থেমে যায়। চোখের জল আর শব্দ একসাথে নামতে পারে না। সে ভাবে, একটা মেয়ে, একটা ডায়েরি, আর একটা অসমাপ্ত ভালোবাসা– এই তিনটেই এখন তার জীবনের নতুন পাঠশালা। তিনি শিখছেন এই মেয়েটার থেকে।
আলিয়াকে চুপ থাকতে দেখে সুমু ধীর কন্ঠে বলল,

“প্রতিদিন এক টুকরো করে সে সুমুর হৃদয় পরতো। আর আপনি জানেন আমার একটা ডাকনাম ছিল, ‘সুইটহার্ট’। তিনি ডাকতেন, আমি তাকে আমি বলতাম ‘খান সাহেব’। আমরা ছিলাম ‘সুমুরাজ’।”
আলিয়া মুগ্ধ হয়ে শোনে। কখনও হেসে ফেলে, কখনও চোখের কোনে জমে ওঠে জল। সুমুর কণ্ঠে থাকে না কোনো অভিযোগ, শুধু থাকে অদ্ভুত এক মায়া যেন সে আজও সেই ভালোবাসার মধ্যেই বাস করে।
আলিয়ার ভাবে, এতটা ভালোবাসা কি সত্যিই হয়? কেউ কি সত্যিই কারাগারে থেকেও এভাবে কারো হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারে? সে বুঝতে পারে, সে আর শুধু ডিউটি করছে না। সে যেন নিজেই প্রতিদিন এক টুকরো করে জীবনের নতুন মানে খুঁজে পাচ্ছে।
সুমু উঠে দাঁড়ায়। কারাগারের নির্জন কোণায়, খালি বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখা আরেকটি মোটা ডায়েরি। যেটিতে সুমু লিখে চলে তার হৃদয়ের গল্প। গল্পের নাম, ‘খান সাহেব’।”
ডায়েরিটা নিয়ে সুমু পূনরায় জায়গায় বসে বলল,

“আমি লিখে রাখি আমাদের কথা, যেটা কেউ জানে না। লিখে রাখি সেই প্রথম ছোঁয়া, সেই শেষ চিঠি, সেইসব অভিমানের সকাল। যদি কোনোদিন আমি না থাকি, কেউ পড়ে জানুক, আমি শুধু ভালোবেসেছিলাম।”
সুমুর কথা শুনে আলিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়। সে বলল,
“তুমি এটা শেষ করো, সুমু। এই গল্পটা মানুষকে জানতে হবে।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“মুক্তির আগের দিন আমি এই ডায়েরিটা আপনার হাতে তুলে দিয়ে যাব। আমি মুক্তি পেয়ে যাচ্ছি, কিন্তু এই গল্পটা এখানেই শেষ নয়। যদি পারেন এই গল্পটা পৃথিবীর কানে পৌঁছে দিয়েন। বলবেন সবাইকে, সুমু শুধু বন্দি ছিল না, সে ভালোবেসেছিল। আর সেই ভালোবাসাই ছিল তার সত্যিকারের পরিচয়।”
আলিয়া আলতো হেসে বলল,
“আজকে কি তোমার সেই খান সাহেবের গল্প আমাকে শোনাবেনা?”
সুমু হাসে। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও পুরানো স্মৃতি বলতে শুরু করে।

একটা সুন্দর সকালের শুরু হলো। সূর্যের প্রথম রশ্মি মেঘের ফাঁক দিয়ে হালকা সোনালী আলো ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীতে। বাতাসে মৃদু শীতলতা, যা শরীরকে এক ধরণের প্রশান্তি দেওয়ার মতো। বাগানের ফুলগুলো গাঢ় রঙে ফুটে উঠতে শুরু করল। আর পাখিরা তাদের মিষ্টি সুরে গান গাওয়া শুরু করল, যেন প্রকৃতির সমস্ত সুখ একত্রিত হয়ে সেই সকালে পাখির কলরবে ভরে উঠেছিল।
শেরাজ বেলকনিতে দাড়িয়ে আছে। হালকা বাতাস তার চুলগুলোকে নাচিয়ে দিচ্ছে, আর তার মুখে এক অদ্ভুত শান্তির রেখা ফুটে উঠেছে। এই সকালে, শেরাজ যেন পুরো পৃথিবীর শান্তি অনুভব করছে। তার চোখে এক ধরনের সুখের ঝলক, যেন কিছুতেই আর কিছু হারানোর ভয় নেই। সে বেলকনি থেকে বাগানের দিকে তাকাল। বাগানের পাশের মাটিতে শিশিরের বিন্দু জমেছে, যেন প্রকৃতি নিজে থেকে অমৃত রচনা করেছে।

শেরাজ বাগানের দিকে থেকে চোখ সরিয়ে নিজের রুমের বেডের ওপর বিড়ালের ছানার মতো গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকা সুমুর দিকে তাকাল। এমন সুন্দর সকাল আর সাথে তার প্রিয় মানুষ। শেরাজের মনে হলো, এমন এক সকালে, তাদের সম্পর্কের সমস্ত গ্লানি আর চাপ যেন হারিয়ে গিয়েছে, শুধু ছিল দুটি হৃদয়ের মাঝে এক অবিরাম ভালোবাসা।
বেলকনি থেকে রুমে এলো শেরাজ। কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
পনেরো মিনিটের মধ্যে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো সে। বেডের দিকে তাকিয়ে দেখল, জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে বিছানায়। ঘড়িতে সকাল সতটা। কিন্তু সুমু তখনো দুটো বালিশ জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে, যেন পৃথিবীর সব শান্তি ওর বুকেই এসে জমে গেছে।
শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে বাথরুমের সামনে, সাদা তোয়ালে গায়ে জড়ানো, ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে চুল মুছতে মুছতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

“সুইটহার্ট, আর কত ঘুমাবে? আমার সাড়ে নয়টায় মিটিং আছে, চা বানাবে না আমার জন‍্য?”
সুমু এক চোখে তাকাল, ব্লাঙ্কেট আরও গায়ে টেনে নিয়ে বলল,
“আপনি তো এস.কে লাক্স-এর মালিক। মিটিং এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু ঘুম? সেটা তো আমি পিছিয়ে দিতে পারি না, তাই ঘুমাচ্ছি।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলো।
“সুইটহার্ট, আমার লেট হয়ে যাচ্ছে। সকালে ব্রেকফাস্ট ছাড়া চলে, কিন্তু তোমার হাতে চা বা কফি না হলে আমার চলে না। সারাদিন মাথা ধরে থাকবে, মেজাজ গরম হয়ে থাকবে।”
সুমু উঠে বসল। চোখে আলসেমি, ঠোঁটে বাঁকা হাসি। শেরাজ একদম কাছে এসে ব্লাঙ্কেট টান দিয়ে সরিয়ে দিল।
“আমি থাকতে এইসব জড়িয়ে শুয়ে থাকো কেনো? তুমি চাইলে আমি মিটিং বাদ দিয়ে সারাদিন তোমার পায়ের কাছে বসে থাকব। কিন্তু, তার বদলে এককাপ চা আর তোমার একটু আদর চাই।”
সুমু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

“ঠিক আছে, আগে ‘ভালোবাসি” বলুন, তারপর চা পাবেন।”
“ভালোবাসি না বলে, দেখিয়ে দিই?”
শেরাজ হঠাৎ সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমুর লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আড়মোড়া ভেঙে নেমে দাঁড়াল বেড থেকে। পরনে হালকা গোলাপি নাইটি, চোখে এখনও ঘুমের ছাপ, কিন্তু ঠোঁটে তার খান সাহেবের ভালোবাসায় গড়া হাসি। সোফার ওপর রাখা ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে নিল।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে চুলগুলো হাত খোপা করে নিয়ে নিচে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। শেরাজও সুমুর সাথে নিচের যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে বলল,
“সকাল সকাল নেশা না ধরালে চলছেনা, তাইনা?”
ভ্রু কুঁচকালো সুমু।
“মানে?”
শেরাজ মুচকি হেসে বলল,
“মানে হলো এই যে, তুমি যখন হাত দিয়ে চুল খোপা করো, তখন আমার ঠিক এইখানে লাগে। পুরো ফিদা হয়ে যায় আমি। কারেন্ট মারে বডিতে, নেশা ধরে মনে।”
বুকের বা’পাশে হাত রেখে কথাগুলো বলল শেরাজ। সুমু হাসল। দুজনে কথা বলতে বলতে নিচে নামল। সাহাবাজ সাহেব বসে পেপার পড়ছেন। সুমু ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়াল সাহাবাজ সাহেবের সামনে। আলতো হেসে বলল,

“আব্বু চা খাবেন?”
সাহাবাজ সাহেব চোখ তুলে তাকালেন। আলতো হেসে বললেন,
“অলরেডি দু’কাপ কফি ফিনিশ করেছি।”
“আচ্ছা আব্বু, ঠিক আছে।”
সুমু চলে যাবার জন‍্য পা বাড়াতেই সাহাবাজ সাহেব পিছু ডেকে বললেন,
“তুমি যদি চা বানাও, তাহলে আরও এককাপ খেতে পারি। কিন্তু তোমার তো কিচেনে যাওয়া বারণ।”
শেরাজ এগিয়ে এলো। দু’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমার জন‍্য চা বানাবে। কিন্তু তুমি আর এককাপ চা, কফি ও পাবেনা।”
সাহাবাজ সাহেব মুখ গোমড়া করে তাকালেন।
“কেনো?”
“কেনো? দাঁড়াও মমকে ডাকি।”
“আরে না। আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম। আমি আর চা খাব না।”
“গুড বয়!”
সুমু বাবা ছেলের কাণ্ড দেখে মুচকি হেসে কিচেনের দিকে পা বাড়াল। কিচেনে আসতেই একজন সার্ভেন্ট বলল,
“মেজো খান সাহেবা, আপনি কিচেনে? বলুন কি লাগবে? এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।”
“আপনাকে বানাতে হবেনা। আমি নিজেই বানাব।”
“কিন্তু মেজো খান সাহেবা, বড় ম‍্যাডাম জানতে পারলে…”
“আমি বলেছি…”
সকলে পেছনের দিকে তাকাল। শেরাজ দু’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। কিচেনে থাকা দুজন সার্ভেন্ট চুলা অফ করে দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল। সুমু গ্যাসটা অন করল। শেরাজ এসে সুমুর পেছনে দাঁড়াল।
“আপনি রান্নাঘরে কেন?” সুমু তাকাল, “আমি তো জানি, আপনি কিচেনে এলে মশলার গন্ধে হাঁচি দেন।”
শেরাজ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ তার শুধু সুমুর দিকে।
“তুমি রান্না করলে, প্রতিটা আইটেম থেকে যে গন্ধ আসে। সে গন্ধে আমার হাঁচি না, প্রেম আসে।”
সুমু কেটলি চাপাল। শেরাজ এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল তাকে। সুমু পরিমাণ মতো দুধ, চিনি দিয়ে বাড়ির সকলের জন‍্য চা বানাল। এককাপ চা শেরাজের হাতে দিয়ে বলল,

“নিন! খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে।”
শেরাজ মুচকি হেসে চা খেতে খেতে বলল,
“চায়ের কাপে তুমি, বিছানার চাদরে তোমার ঘ্রাণ, চোখে তোমার নামে ঘুম, আমার আর কী চাই? দারুন হয়েছে, সুইটহার্ট।”
সুমু চায়ের ট্রে নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে সাহাবাজ সাহেবের হাতে এককাপ চা তুলে দিয়ে আবারও কিচেনে চলে এলো। শেরাজ কাপে শেষ চুমুক দিল, তারপর গভীর চোখে সুমুর দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমার মনে হয়, আজকের সকালটা এত মিষ্টি কেবল তোমার বানানো চায়ের জন্য না, তোমার জন্যও।”
সুমু কিছু বলার আগেই, শেরাজ হঠাৎ তার ওড়নার কোণা টেনে ধরল।
“খান সাহেব, কেউ দেখে ফেলবে। কিচেনের মধ্যে কি শুরু করেছেন?”
“তো কি হয়েছে? দেখুক সবাই, সবাই জানুক, তেরে ইষ্ক পে মেরি জা, ফানা হো যায়ে।”
সুমু চুপ হয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসি। সে শেরাজের হাত থেকে কাপটা নিয়ে সিঙ্কে রাখল।
“আপনি এবার বের হন কিচেন থেকে। চায়ের পর তো সকালের নাশতাও বানাতে হবে।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে বলল

“এক শর্তে যাব।”
“আবার কী শর্ত?”
“আজ সকালের বেড কিস পাইনি। সেটা না দিলে, আমি এখান থেকে নড়ব না।”
সুমু হা করে তাকাল।
“আপনি একেবারে শিশুসুলভ হয়ে গেছেন।”
শেরাজ গম্ভীর মুখ করে বলল
“আমি তো তোমার প্রেমে একেবারে বাচ্চা হয়ে গেছি অনেক আগেই। কিন্তু আমার দুঃখ তুমি আজও বুঝলে না?” একটু থেমে এগিয়ে এলো,
“ভালোবাসলে মানুষ বয়স হারিয়ে ফেলে, বুঝলে না সুইটহার্ট?”
সুমু আর কিছু বলল না। সে হাত বাড়িয়ে শেরাজের গালে আলতো ঠোঁট ছোঁয়াল।
“এবার বের হবেন?”
শেরাজ দরজায় দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে বলল,
“এই সকালটা তোমার মতোই। কোমল, শান্ত আর তীব্র মায়ার ভেতর গাঁথা। আমার জীবনের প্রতিটা সকাল এমনই চাই, সুইটহার্ট।”

সুমু শেরাজকে ঠেলে কিচেন থেকে বের করে দিল। শেরাজ হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলে। সুমু একটু হাসল। কিচেনে ঢুকে চুলের খোপা একটু টাইট করে বাঁধল। হাত ধুয়ে রেডি হয়ে গেল সকালের নাশতার বানানোর জন্য। সে ঠিক করল যেহেতু আজ সে প্রথম সকলের জন‍্য রান্না করছে, তাই খান সাহেবের রুচি অনুযায়ী আফগানি খাবারই বানাবে।
সেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমে ‘নান-এ-আফগানি’ বানাতে শুরু করল। ময়দা, দুধ, ইস্ট আর সামান্য জিরা মিশিয়ে খামির তৈরি করল। হাতের মোলায়েম টাচে মেখে রেখে দিল ফুলতে। এরপর শুরু করল ‘শোরওয়া’ বানানো। গরুর হাড়সহ মাংস দিয়ে হালকা ঝোলের পানিতে, পেঁয়াজ, আদা, রসুন আর আফগানি মসলায় ফুটতে দিল। ঘরের কোণে ছড়িয়ে পড়ল আফগানি রান্নার মন মাতানো ঘ্রাণ। পাশাপাশি আরও করল ‘কাবাব-এ-মুর্গ’। চিকেনের কিমা, লেবুর রস, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, আর সামান্য জাফরান দিয়ে মেখে কাঠিতে গেঁথে প্যানে গ্রিল করল। সবশেষে ‘মাস্ত-ও-খিয়ার’ করল। দইয়ে শশা, পুদিনা আর একটু শুকনো পুদিনার গুঁড়া মিশিয়ে এক বাটি ঠান্ডা রিফ্রেশিং সাইড ডিশ তৈরি করল।

সে একহাতে সব রান্না শেষ করে কিচেন গুছিয়ে রাখল। বাড়ির পুরো রান্নাঘর যেন আফগানির কোন গ্রাম্য সকালের ঘ্রাণে ভরে উঠল।
রান্না শেষ করতে করতে সাড়ে আটটা বাজলো তার। এরমধ্যে ইশিতা অনেকবার কিচেনে এসেছিল সুমুকে সাহায্য করতে। সুমু ইশিতাকে জোর করে বের করে দিয়েছে কিচেন থেকে।
শেরাজ একবারে অফিসে যাবার জন‍্য রেডি হয়ে নিচে নামল। কোথাও না দাঁড়িয়ে সোজা কিচেনের দরজার সামনে এলো। সে দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো রান্না করতে থাকা স্ত্রীর দিকে। চোখে তার একধরনের প্রশংসার মায়া, গলায় একটুকরো ভালোবাসার শীতলতা।
“আমি আসলে জানতাম না, তুমি আফগানদের মতো এতো নিখুঁতভাবে ‘শোরওয়া’ রান্না করতে পারো। কখন শিখলে এসব রান্না?”
সুমু মুচকি হেসে বলল,

“যখন আপনি অফিসে থাকেন, তখন শিখেছি। আর কিছুটা ইশিতার থেকে শিখেছি।”
শেরাজ কিছু বলল না। এগিয়ে এসে একমুঠো নরম ভালোবাসায় ছোঁয়া সুমুর কপালে দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে বেরিয়ে যেতে দুজন সার্ভেন্ট এসে সুমুকে খাবার টেবিলে নিয়ে যেতে সাহায্য করল।
টেবিলে সাজানো হলো সব খাবার। একে একে সবাই এসে বসল। সাহাবাজ সাহেব প্রথমেই ‘কাবাব-এ-মুর্গ’ দেখে চোখ বড় করে বললেন,
“বাহ! আজ সব আফগানি খাবার, তাও আমার বড় ছেলের বউয়ের হাতের।
রিয়াজ ‘নান-এ-আফগানি’ ছিঁড়ে মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
“এই রুটি তো দেখি একেবারে হোটেলের মতো। ভাবিজি, আপনি আমার বেস্ট ভাবিজির সাথে সাথে বেস্ট শেফ।”
শাহরুখ চোখ গোল করে বলল,

“ভাবিজি, ‘মাস্ত-ও-খিয়ার’ টা দারুণ হয়েছে। একেবারে আলাদা টেস্ট।”
অনন্যা খাতুন এক কোণে বসে চুপচাপ খাচ্ছিলেন, মুখে কোনো মন্তব্য নেই, কিন্তু তার হাত থেমে গেছে একটুখানি খেয়ে। মুখে না বললেও চোখে-মুখে স্পষ্ট তিনি এই রান্নার স্বাদে মুগ্ধ।
সারবাজ আর আবরাজ নিচে নেমে এসেই খাবারের ঘ্রাণে চোখ বড় করে ফেলল। সারবাজ চেয়ার টেনে বসে বলল,
“ভাই, আজকে কি আফগান ডে নাকি? আজ সকালেই সব আফগানি খাবার রান্না হয়েছে। তা এইসব কি সুমু করল নাকি?”
আফিয়া খাতুন হেসে বললেন,
“হ‍্যাঁ! খেয়ে দেখ, প্রতিটা রান্নার অসাধারন টেস্ট।”
আরবাজ খাবার মুখে নিয়ে বলল,
“ভাবিজির হাতের ‘কাবাব-এ-মুর্গ’ খেলে তো আমি ডায়েট ভুলে যাব। এতো দারুণ টেস্ট।”
রিয়াজ, শাহরুখের ফোনটা নিয়ে বলল,
“মাই পার্টনারের আজকের এই খাবারের জন্য একটা স্পেশাল ফুড ব্লগ বানাতে হবে। দ্য আফগান মর্নিং বাই সুমাইয়া জাহান, কেমন?”
এমন সময় আরিয়ান এসে বসল টেবিলে। ইশিতা ব্ল‍্যাক কফি রাখল আরিয়ানের সামনে। আরিয়ান কফির কাপে চুমুক বসিয়ে বলল,

“আজকের সব রান্না কি সুমু করেছে? যদিও আমি সকালে হেভি খাবার খাইনা, তবুও স্পেশাল মানুষের স্পেশাল রান্না টেস্ট তো করতেই হয়।”
সে সুমুর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে আবারও বলল,
“সুমু, তুমি কোরিয়ান রান্নাও শিখে নাও। কে বলতে পারে ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে।”
আরিয়ানের কথাটা সকলে নরমাল ভাবে নিলেও শেরাজ আর সুমু ঠিকই আরিয়ানের ইঙ্গিতপূর্ণ কথার মানে বুঝতে পারল। শেরাজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আরিয়ানের দিকে। টেবিল ছেড়ে উঠতে নিলেই সুমু শেরাজের কাঁধে হাত রেখে চোখ দিয়ে ইশারা করে শান্ত থাকতে বলল।
রোজা এসে অনন‍্যা খাতুনের পাশে বসে বলল,
“ইশিতা আমাকে ব্ল‍্যাক কফি দাও।”
ইশিতা কিচেনের দিকে যেতে নিলে সুমু আটকালো তাকে। রোজার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কখনো একটু শরীর নাড়িয়ে খেতে শিখুন বা বাড়িতে অনেক সার্ভেন্ট আছে, তাদের বলুন। ইশিতা এই বাড়ির বউ। ওকে যখন তখন হুকুম করা বন্ধ করুন।”
রোজা কিছু বলার আগে অনন‍্যা খাতুন বললেন,

“ইশিতা যেমন এ বাড়ির বউ, তুমিও তো এ বাড়ির বউ। তা এ বাড়ির বউ হয়ে কোন নিয়মটা মেনেছ? আমার এতদিনের তৈরি করা সব নিয়ম ভেঙে রান্না করেছ।”
“নিজের পরিবারের মানুষের জন‍্য ভালোবেসে রান্না করেছি, আম্মু। এখানে আমি কোনো নিয়ম মানতে পারব না।”
অনন‍্যা খাতুন কিছু বলতে নিলে শেহেজাদ সাহেব বললেন,
“ভাবি, আজ অন্তত নিয়মটা না দেখে রান্নার টেস্টটা দেখুন। সুমু বাংলাদেশী মেয়ে হয়ে আফগানিস্তানে এতগুলো ডিশ রান্না করছে, তাও সবগুলো ডিশ একদম পারফেক্ট করে। আমাদের সুমু মামনির মধ্যে প্রচুর গুণ আছে।”
অনন্যা খাতুন মুখ ঘুরিয়ে বললেন,
“হ‍্যাঁ, গুণ আছে! তবে সবথেকে বড় গুণ মানুষকে কীভাবে বশ করতে হয় সেদিকে।”
ফিরোজা ফোনে কার্টুন প্লে করে ধীর পায়ে হেটে এসে শেরাজের পাশে দাঁড়াল। শেরাজ ফিরোজাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“বশীকরণও একটা প্রতিভা, মম। সুমু সবাইকে নিজের ভালোবাসা দিয়ে বশ করে, যেটা সকলে পারেনা।”
অনন‍্যা খাতুন চুপ করে গেলেন। একজন সার্ভেন্ট এসে রোজাকে কফি দিয়ে গেল। শেরাজ নিজের প্লেট সামনে টেনে নিয়ে আবারও বলল,

“আজকে আমি নিজের হাতে খাব। কেউ স্পুন বা ফর্ক দেবে না।”
সাহাবাজ সাহেব হেসে বললেন,
“প্রেমে পড়লে মানুষ কবে থেকে হাই-জিন লঙ্ঘন করে বসে, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে।”
শেরাজ গম্ভীরভাবে জবাব দিল,
“খাবারে যদি ভালোবাসা মেশানো হয়, তাহলে তা হাত দিয়েই খাওয়া উচিত, বুঝলে ড‍্যাড?”
সবাই হাসতে লাগল। রোজা নাক সিঁটকে বলল,
“কিন্তু এস.কে, তুমি তো সকালে হেভি খাবার খাওনা। তাহলে আজ কেনো খাচ্ছ?”
শেরাজ রোজার প্রশ্ন উপেক্ষা করে সুমু আর ইশিতার উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমরা দুজন বসছ না কেনো? আর সুমু তুমি জানোনা, বাসায় থাকলে আমি তোমাকে ছাড়া খায় না।”
ছোটরা সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। সাহাবাজ সাহেব আর শেহেজাদ সাহেব কিছু না শোনার ভান করে খাচ্ছে। আরিয়ান বাঁকা হাসল। সুমু আর ইশিতা খেতে বসে পড়ল।

ছাদে রোদ নেমেছে নরম করে, হালকা বাতাসে উড়ছে সুমুর ওড়না। নিচে সবাই বিশ্রামে, আর সে এসেছে একটু একা থাকতে। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা গলার শব্দ ভেসে এলো।
“সো, মিসেস খান সাহেবা, একা একা ছাদে? আপনি তো জানেন না, এভাবে একা থাকাটা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।”
সুমু চমকে ঘুরে তাকাল। আরিয়ান ঠোঁটে বিকৃত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে, চোখগুলো ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“আমি একা থাকতে এসেছি। আপনি নিচে চলে যান।”
“না! চলে যাবার জন‍্য তো আসিনি, আপনাকে সঙ্গ দিতে এসেছি।”
তার কণ্ঠে লালসা। চোখে চোখ রাখার সাহস হারাল সুমু, পা পিছিয়ে গেল একধাপ। আরিয়ান এক ধাপ এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল,
“শোনো, এস.কে, তো তোমায় সারাদিন বাসায় ফেলে রেখে অফিস করে। আর আমি? আমি তো এখন আছি। তোমাকে সময় দিতে চাই।”
তার কথাগুলো যেন সাপের বিষের মতো কানে ঢুকছিল। মুখ শক্ত মুখে সুমু বলল,

“দয়া করে, আরেকটাও শব্দ বলবেন না। আপনি যা বলছেন, সেটা আমার খান সাহেব জানলে…”
“জানলে কি করবে? মারবে আমাকে? তোমার জন‍্য একটু মার খেতেই পারি। যদি তার বিনিময়ে তোমাকে পাই।”
সুমু কোনো কথা না বলে ছাদ থেকে চলে আসার জন‍্য পা বাড়াল। আরিয়ান সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি জানো সুমু, মোমবাতি যতই আলো দিক, ওর চারপাশে ছায়া থাকেই? তুমি যতই উজ্জ্বল হয়ে থাকো, ভেতরে একটা ছায়া কিন্তু নিশ্চয়ই রয়ে গেছে। যেটা এখনো ভয় পায়, কাঁপে। আর তাতে আমি আগুন ধরাতে চাই।”
সুমু চোখ সরিয়ে না তাকিয়েই বলল,
“আপনার কথার মাঝে আগুন নয়, বিষ আছে। এবং আমি আগুনকে ভয় পাই না, উল্টো আরও বেলি জ্বালাতে জানি।”

আরিয়ান হালকা হেসে আরেক ধাপ এগিয়ে, সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার শরীরের ভাষা, নিঃশ্বাসের ঘনত্ব সব তো অন্য কিছু বলে। বলো তো, তোমার নিজের কি মাঝে মাঝে এস.কের খাঁচা থেকে একটু উড়তে ইচ্ছে করে না?”
সুমু এবার চোখে আগুন নিয়ে তাকাল, কন্ঠে রাগ আর অপমান ঝরে পড়ে।
“আপনি যতটা ভাবছেন, আমি তার চেয়েও অনেক বেশি নিজের আত্মসম্মানে বিশ্বাসী। আমার মা-বাবা আমাকে প্রিন্সেসের মতো আগলে রেখেছিল। আর আমার খান সাহেব আমাকে রাণীর মতো করে রেখেছে। আমি কারো শখের পুতুল না, আর না আপনি আমাকে নিয়ে আপনার নোংরা ফ্যান্টাসি সাজাবেন।”
আরিয়ান হালকা হেসে বলল,
“তোমার এই শান্ত মুখটার পেছনে একটা দারুণ আগুন লুকানো আছে।”
সুমু একটু পেছিয়ে গিয়ে চোখ সরিয়ে নিল।
“আপনার মতো মানুষদের একটাই অভ্যাস। মেয়েদের চোখে নিজের ইচ্ছা দেখে ফেলেন।”
আরিয়ান আবার এক ধাপ এগিয়ে এলো।
“তোমার চোখ কিন্তু খুব স্পষ্ট, সুমু।”
সুমু ঠোঁট শক্ত করে, চোখে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল

“আপনার চোখে যা পড়ছে, সেটা আপনার কল্পনা। আমার চোখে শুধু একটাই মানুষ, আমার খান সাহেব। তার জন্যই আমার সব ভালোবাসা, সব বিশ্বাস।”
“এস.কে তো বুঝে গেছে তুমি কতটা সহজে পোষ মানো। পুরুষেরা তো এমনিই জিততে ভালোবাসে। সে তোমাকে পেয়ে গেছে, এখন সে নিশ্চিন্ত।”
সুমু দৃষ্টিতে আগুন।
“আপনার জিহ্বার ধার কম নেই। কিন্তু আপনার চোখের আসল রঙটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। আপনি যা বলছেন, সেটা কোনো নিছক কৌতুক নয়, এটা একটা নোংরা খেলার ইঙ্গিত।”
আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার গলায় স্বর তীক্ষ্ণ,
“তোমার রাগেও একটা আকর্ষণ আছে, জানো তো? আমি বাজে লোক হতে পারি, কিন্তু সত্যিটা বলি। তুমি এখনও পুরোপুরি ওই এস.কের হয়ে উঠোনি। তোমার ভেতরে একটা বুনো খাঁচা আছে, সেটা একদিন ভাঙব আমি।”
সুমু ধীরে ধীরে বলল,

“সেইদিন আপনি নিজেই নিজের ছায়া দেখে ভয় পাবেন, মিস্টার চৌধুরী। আপনি জানেন না, একজন সাহসী রাজার রাণীর সম্মান ভাঙতে গেলে, আপনার নোংরা রাজ্য পুড়ে যেতে পারে। আপনার কল্পনায় আমাকে যত খুশি সাজান। বাস্তবে আমি শুধু আমার খান সাহেবের রাণী, কোনো বাজে গল্পের নায়িকা নই।”
সুমু আবারও চলে আসার জন‍্য পা বাড়াতে আরিয়ান আবারও সুমুকে আটকাল।
“এত সহজে পালিয়ে যাচ্ছ? সেদিন রাতেও পালিয়েছ? কথার উত্তর না দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে, তাইনা?”
সুমুর চোখে আগুন। সে দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনার মতো মানুষের কথার উত্তর দেওয়া মানে নিজেকে ছোট করা, সরুন।”
ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ইংরেজিতে অক্ষরে ভেসে উঠল, “আরিয়ান কলিং…”
আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে, গলায় গালি চেপে বলল,
“সিবাল, শালার টাইমিং…”
সুমু সেই সুযোগে ছাদ থেকে দ্রুত চলে গেল। পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল সিঁড়িতে।
আরিয়ান কলটা রিসিভ করে বলল,
“কিরে শালা! বিশেষ মুহূর্তে কল করে সব নষ্ট করলি। তোর জন্য পাখিটা উড়ে গেল।”
রায়য়ান ওপাশ থেকে হাসতে হাসতে বলল,

“পাখি না, রাজহংসী রে, ভাই! তোকে দেখেই তো পালিয়েছে। আর আমি তোর বিশেষ মুহূর্তে না ঢুকলে তোকে হয়ত ইভটিজিং কেস দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দিতো। কাজট তো আমি সমাজসেবাই করলাম।”
আরিয়ান চোখ রাঙিয়ে বলল
“তোকে যদি সামনে পেতাম না, গলা টিপে ধরতাম। সব প্ল্যান সেট ছিল। চোখে ভয়, ঠোঁটে জেদ একেবারে গোল্ডেন টাইমিং। আর তুই এসে ‘টিং টিং’ করলি। সিবাল, মা*দা*রফা*কিং।”
রায়য়ান ঠান্ডা হাসিতে বলল,
“ভয় না, তোর মুখে ছ্যাঁচড়ামি দেখে ভয় পেয়েছে। আর ভাই, মেয়েটা খাঁটি স্বর্ণ। তোর মতো হাতপাখার হাওয়া দিয়ে গলবে না।”
“আমি জানি কাকে কীভাবে গলাতে হয়। এই জেদটাই আমি চাই। একদিন দেখবি, এই রাজহংসী আমার পাখির খাঁচায় বন্দী হবে।”

“তুই কি আসলেই এত বোকা, না অভিনয় করিস? ওই মেয়ের চোখে শুধু এস.কে, ছাড়া আর কিছু নেই। তুই যতই চেষ্টা কর, এসব করতে গিয়ে একদিন তোর এমন অবস্থা হবে, সেদিন তুই নিজের ছায়াকেও ভয় পাবি।”
আরিয়ান গলা নিচু করে, ঠান্ডা স্বরে বলল,
“এস.কে তো তোরও মাথাব্যথার কারণ, তাই না? এত চিন্তা কেন তোর সুমুর জন্য, রায়য়ান?”
রায়য়ান এক মুহূর্ত চুপ, তারপর গম্ভীর হেসে বলল,
“কারণ আমি তোর মতো নোংরা না। আমি ওই মেয়ের চোখে ভয় দেখি না, সম্মান দেখি। আর তুই সেই সম্মানটা ভাঙতে চাস। সাবধান হ, সময় এলেই তুই বুঝবি কার সাথে খেলতে যাচ্ছিস।”
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
“চুপ কর! এমনতেও ভুল টাইমে কল করেছিস। শালা, তোর জন‍্য পাখিটা উড়ে গেল। স্পেশাল মুহূর্তে ডিস্টার্ব করলি, ব্লাডি বিচ।”
রায়য়ান হাসতে হাসতে বলল,

“ভাই, তোকে তো আমি সাহায্য করলাম। ও তোর ভাইয়ের বউ, একটু সম্মান দে।”
আরিয়ান রাগে জ্বলে উঠল।
“তুই হাসছিস? আমার শিকার হাতে এসেছিল রে, চোখে ভয় আর চ্যালেঞ্জ। একেবারে পারফেক্ট। আর তুই কল করে সব নষ্ট করলি।”
“তোকে আমি আগেই বলেছি, মেয়েটার লেভেল এক্সট্রা অর্ডিনারি। তুই যতই ঘুরে বেড়াস, ওকে ছোঁয়া তো দূরের কথা, দৃষ্টি ফেলার যোগ্যতাও তোর নাই।”
“শালায় এখন লেকচার দিচ্ছিস? আমি জানি, কীভাবে মেয়েদের দুর্বলতা বের করতে হয়। ওর চোখে আমি আগুন দেখেছি, ভয় নয়।”
“ওর চোখে আগুন তুই দেখেছিস, কারণ ওর সামনে তুই আগুন লাগানোর মতোই কিছু করেছিলি। কিন্তু সাবধান হ, মেয়েটাকে দেখে আমার মনে হয়েছে, ও তোর মতো আগুনকে নিভিয়ে দিতে জানে। আর শেরাজ তোকে পুড়িয়ে ফেলবে, মনে রাখিস।”
আরিয়ান চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল
“শেরাজ, শেরাজ সবখানে এই শেরাজ। সময় এলেই দেখবি, সিংহের সামনেও শেয়াল দাঁড়ায়। তুই শুধু দেখে যা।”
আরিয়ান একটু থেমে আবারও বলল,

“তোর এই ন্যাকামো শোনার সময় নেই আমার, রায়য়ান। তোর এক ফোনে সব শেষ হয়ে গেল। আজকে ওকে আমি নিজের জায়গায় নামিয়ে আনতাম। বুঝলি, একদম নিচে, আমার সামনে।”
রায়য়ান ঠাণ্ডা গলায় কটাক্ষ করে বলল,
“তোর জায়গা বলছিস? যেটা নোংরামির গর্ত, না খচ্চরদের চাতাল? ওর মতো একটা ক্লাসিক মেয়েকে তুই টানতে পারবি ভাবিস কী করে?”
“ও আমার কাছে চ্যালেঞ্জ। আর চ্যালেঞ্জ আমি হেরে যাই না।”
“এই তোর সমস্যা। সবকিছুকে চ্যালেঞ্জ ভাবিস। মানুষ, অনুভব, ভালোবাসা সবকিছু তোর একটা গেম মনে হয়। কিন্তু এস.কের ওয়াইফ কোনো গেমের ক্যারেক্টার না রে, ভাই। ও নিজেই এস.কের একটা রাজ্য। আর তুই সেই রাজ্যে ঢোকার যোগ্য না।”

“সবাই বলে, ও শুধু শেরাজকে দ‍্যাখে। আর আমার চোখ শুধু ওকে দ‍্যাখে, রায়য়ান। আমি জানি, একেক সময় ওর চোখে কিছু অজানা কাঁপুনি থাকে। ওর এই দ্বিধা থেকেই আমি জানি, একদিন ওর ভিতরটা আমার দিকে ঝুঁকবেই। কারণ, আমি ওকে এখন পযর্ন্ত নোংরা চোখে দেখিনি।”
রায়য়ান গম্ভীর গলায় বলল,
“তুই নিজেকে খুব বিশ্লেষক ভাবিস, না? চোখ দেখে চরিত্র বুঝিস? তোর এই ফালতু বিশ্লেষণে আজ অবধি কেউ কাছে টেনেছে তোকে? তুই আসলে ভয় পাস। এস,কের মতো পুরুষের সামনে তোর আসল মুখটা উন্মোচন হবার ভয়।”
“এস. কে সেই গম্ভীর মুখওয়ালা, সাইলেন্ট রাজা। মুখে শব্দ নাই, শুধু চোখে আগুন! ওকে ভয় পাই আমি? না রে রায়য়ান। ওকে আমি ঝাঁঝরা করে দিতে চাই। আমি ওর সিংহাসন ভাঙতে চাই। ওর বুক থেকে, ওর ভালোবাসার নামটা মুছে দিতে চাই।”

“বাহ! ভালোবাসা মুছে দিতে চাস? তোদের মতো লোকেরা যা পারে না, তাই নষ্ট করতে চায়। তোদের ব্যর্থতা হচ্ছে তোরা কেউ কিছু করতে পারিস না, তাই ভাঙাতে চাস। কিন্তু ভুলে যাস না, শেরাজ শুধু একটা নাম না, সে একটা ভয়। আর তুই যে আগুন জ্বালাতে চাস, সেই আগুনে একদিন তুই নিজেই ছাই হয়ে যাবি।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। আরিয়ানের নিঃশ্বাস ভারী, রায়য়ানের গলায় হিমের মতো শীতলতা।
“ময়লা মন নিয়ে রাণী জেতা যায় না, বন্ধু। ওর রাজ্যে প্রবেশ করতে হলে তোকে রাজা হতে হবে। দুঃখের বিষয়, তুই আজীবন ভাঁড়ই রয়ে গেলি।”
ফোন কেটে গেল। আরিয়ান ফোস ফোস করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, দাঁত চেপে নিজের মোবাইল ছুঁড়ে মারল। চোখে পাগলামী, মুখে একটা ফিসফিসানি,
“আমাকে হেয় করলি তো, রায়য়ান? কিন্তু একদিন ওই রাণী নিজেই হাঁটবে আমার পথ ধরে। তখন তুই আর শেরাজ দুজনেই শুধু দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি।”

রায়য়ান একটা বিলাসবহুল দোতলা অফিস রুমে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। তার ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি। ফোনের ডিসপ্লে অন্ধকার হতে না হতেই, সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
রায়য়ান নিজের সাথেই কথা বলে উঠল,
“শেরাজ খান আর আরিয়ান চৌধুরী! একদিকে সিংহ, আরেকদিকে বাঘ। অথচ এই দুই বুনো জানোয়ারের মাঝে খেলা চলছে একটা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে, নাম সুমাইয়া।”
সে চেয়ার ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল, চোখে কৌশলী ঝিলিক।
“এই দুই ভাইয়ের মধ্যে যত বেশি ফাটল ধরবে, যত বেশি আগুন জ্বলবে, আমার জন্য ততই সুবিধা। কারণ আগুনে শুধু কাঠ না, পোড়ে ভালোবাসা আর বিশ্বাসও।”
তার ঠোঁটে এবার বিদ্রুপের ছোঁয়া।
“সুমু! তুমি তো জানোই না, তুমি নিজের অজান্তেই কী ভয়ঙ্কর একটা খেলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছ। তুমি তো শুধু ভালোবাসা চেয়েছিলে, কিন্তু তোমার কারণে ইতিহাস রচিত হবে। এক মেয়ে, দুই পুরুষ। আর তাদের ধ্বংসের শুরু…”

সে চেয়ার থেকে উঠে এসে ওয়াল শেলফ থেকে একটা ফাইল তুলল। তাতে কিছু কাগজ, ছবি, আর একটা লাল মার্ক দিয়ে গোল করে দেওয়া সুমাইয়ার ছবি। ছবিতে একটা ছোট্ট লেখা, “কি টু দ্য থ্রোন।”
রায়য়ান চোখ সরু করে, ফিসফিস করে বলল,
“ওই এক মেয়েই শেষ করে দেবে খান পরিবারের গর্ব, আর চৌধুরী পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারকে।”
সে নিজের কলার ঠিক করে আবার হাসল, একটা ঠান্ডা, রক্তহীন হাসি।
“এখন শুধু অপেক্ষা। অপেক্ষা সঠিক মুহূর্তের। ঝড় উঠুক। আমি শুধু ছায়া হয়ে সব নিয়ন্ত্রণ করব।”
সুমুকে ছবিটা চোখের সামনে ধরে বলল,
“নারীর মোহ হলো বিষের মতো, পুরুষের হৃদয়ে ঢুকলে তাকে অন্ধ করে ফেলে। মোহের আসক্তি যত বাড়ে, পুরুষের ধ্বংস তত নিশ্চিত।”

ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁই ছুঁই করছে। জানালার বাইরে রোদ ঢলে পড়ছে শহরের বুকে। ঘরের ভেতরে সুমু এখনো জানে না, আজ সন্ধ্যাটা তার জন‍্য অন্যরকম হতে চলেছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে চিরুনি করে নিল। হালকা মেকআপ, চোখে কাজল ঠিক যেন কোনোদিন না বলেও বলা হয়ে যাওয়া প্রস্তুতি। পেছন থেকে একজোড়া হাত গলা জড়িয়ে ধরল তাকে।
“চলুন খান সাহেবা! আজ আপনাকে আমার দুনিয়ার ভিতরটা দেখাতে নিয়ে যাই।”
সুমু চমকে তাকাল, “অফিস?”
“হ্যাঁ! আজ “ইভনিং শুট। দ্য সোল অফ এস.কে শুরু হচ্ছে। আর আপনি তার কেন্দ্রবিন্দু।”
সুমু একটু অস্বস্তিতে পড়ল, “আমি? আমি তো এসকিছু করতে পারি না। তাছাড়া ক্যামেরার সামনে…”
শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আপনি শুধু থাকবেন। বাকি কাজ আলো নিজেই করবে। আর কে বলেছে আপনি কিছু করতে পারেন না? আমি তো সবসময় আপনার পাশে আছি, ম‍্যাডাম।”
এই একটা কথা সুমুর সব অস্বস্তি দূর করে দিল। সে তার খান সাহেবের হাত ধরে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল অফিসের উদ্দেশ্যে।

ভেতরে ঢুকতেই এক জাদুকরী পরিবেশ যেন। চারপাশে আলো, গানের হালকা সুর বাজছে ব্যাকগ্রাউন্ডে। সন্ধ্যার আলোতে স্টুডিওটা যেন স্বপ্নের মতো সাজানো। পুরো টিম প্রস্তুত। লাইট, ক্যামেরা, সিলুয়েট শটের জন্য স্ক্রিপ্ট রেডি।
সুমু একটু সঙ্কোচ নিয়ে চারপাশে তাকাল। লাইটিং টিম, ক্যামেরাম্যান, প্রোডাকশন হেড সবাই যেন তাকে দেখে নীরব শ্রদ্ধায়।
“এই তিনি? সুমাইয়া জাহান? যিনি এস.কে-র প্রাণ দিয়েছেন?
কেউ কিছু না বললেও তাদের চোখ বলছে সব। সুমু স্টুডিওর একপাশে দাঁড়িয়ে, হাতে কাপড়ের নমুনা। হালকা আলো তার গায়ে পড়ছে, আর ক্যামেরা একটু দূর থেকে তাকে বন্দি করছে নীরবতায় মোড়া এক সৌন্দর্যে। সে কাপড় ছুঁয়ে দেখছে, চোখে মুগ্ধতা। কোনো স্ক্রিপ্ট নেই, কোনো সংলাপ নেই, শুধু সত্যিকারের ভালোবাসা।
শেরাজ ভয়েস রেকর্ড করছে,
“ওর ছোঁয়া ছাড়া কিছু পূর্ণ হয় না। সে সামনেই থাকে, শুধু আলোটা নিজের করে না।”
এই মুহূর্তে কেউ জানে না, ঠিক এইভাবে এক ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে, একদিন হয়ে উঠবে কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা।
একজন প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে উঠল,
“সার, দিস ইজ ম্যাজিক। রিয়াল ম্যাজিক।”
টিমের একজন ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ভাই, “গুসবাম্পস চলে আসছে।”
আরেকজন বলল,
“সার, দিস ইজ লাভ। দিস ইজ এস.
কে।”
চাপাস্বরে সকলে সুমুর প্রশংসা করতে লাগল। শেরাজ সকলের প্রশংসা শুনে সুমু দিকে তাকাল। সুমু যেন এখন অন‍্য দুনিয়াতে হারিয়ে গেছে।

শুট শেষ। ঘড়িতে সময় রাত নয়টা সুমু একটু চুপচাপ, নিজের কাজ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।
“আমি কি ঠিক করলাম?”
শেরাজ ধীরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি শুধু ছিলে, সেটাই যথেষ্ট।”
সে সুমুর হাত ধরে বলল,
“চলো, রাতটা কফিতে শেষ করি। আজ তোমার প্রথম অফিসিয়াল “ইভনিং অ্যাজ এসকের সোল গেল।”
সুমু হেসে ফেলে। শেরাজ আর কিছু বলল না, সে জানে, এই মেয়েটিই তার জীবনের একমাত্র স্থির আলো। স্টুডিওর বাইরের আলো নিভে গেল, কিন্তু শেরাজ আর সুমুর মাঝে জ্বলতে থাকে সেই অদৃশ্য ভালোবাসার শিখা। যেটা দেখে না সবাই, কিন্তু ছুঁয়ে যায় নিঃশব্দে। দুজনে একসাথে বেরিয়ে পড়ল ক‍্যাফের উদ্দেশ্যে।
ক‍্যাফের সামনে এসে শেরাজ আর সুমু গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। দুজনে একসাথে ক‍্যাফের ভেতর ঢুকল। শেরাজ কফি কিনে এনে সুমুকে নিয়ে বেরিয়ে এলো ক‍্যাফে থেকে। সুমুর দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৪০

“ডিনার করে তারপর বাসায় ফিরব।”
“ওকে!”
দুজনে হেঁটে গিয়ে নদীর পাড়ে বসল। তাদের চোখ আটকে রইল নদীর পানিতে পড়ে থাকা চাঁদের প্রতিবিম্ভর ওপর।

খান সাহেব পর্ব ৪২