খান সাহেব পর্ব ৪২
সুমাইয়া জাহান
অফিসের এক ব্যস্ত সকাল। এস.কে লাক্স-এর দরজা খোলা মাত্রই নেমে এলো ঝড়। এস.কে হেডকোয়ার্টার যেন সকাল থেকেই আলোয় ঝলমল করছে। কাচের দেওয়াল দিয়ে ঢুকে পড়ছে রোদের কণা, আলোয় ভেসে যাচ্ছে প্রতিটা করিডর। অথচ ভিতরের পরিবেশটা রোদের মতো শান্ত নয়। ভেতরে যেন ছোটখাটো একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কারণ, দ্য সোল অফ এস.কে শুট ভাইরাল হয়ে গেছে। কাল রাতেই ছবি আর ভিডিও শুটগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হয়। আজ সকাল থেকেই ইনবক্সে ইনবক্স ভর্তি মেসেজ। ই-মেইলের সার্ভার প্রায় ক্র্যাশের পথে। অর্ডারের নোটিফিকেশন এমন গতিতে আসছে, যেন কেউ রিফ্রেশ না করেও বারবার পেজ আপডেট হয়ে যাচ্ছে।
“কে এই মেয়েটি? সাদা শাড়িতে, খোলা চুলে, সূর্যকিরণে ঝিলমিল মুখ? তার চোখে এমন এক গল্প আছে, যেটা এক ঝলক দেখলেই মানুষ আটকে যায়। শি লুকস লাইক আ মিস্ট্রি ওভেন ইন সিল্ক”, এক ব্রিটিশ ফ্যাশন ব্লগার টুইট করে লিখেছেন।
দেশ–বিদেশের ব্র্যান্ড থেকে প্রস্তাব আসছে—“উই ওয়ান্ট হার অ্যাজ আওয়ার মিউজ।”
সবার একটাই প্রশ্ন, “হু ইজ দিস সোলফুল উওম্যান?”
কিন্তু শেরাজ খান, এস.কে-র রাগী, স্টোয়িক সিইও, আজও একই মানুষ। তিনি জানেন, শুটে যার মুখ আড়ালে, তার নাম ‘সুমাইয়া জাহান’। তিনি জানেন, মেয়েটি তার স্ত্রী। কিন্তু তিনি এই রহস্যময়ী নারীকে সামনে আনবেন না। কোনরকম পাবলিসিটি তার জন্য বরাদ্দ না। সুমু শুধুই তার। শুধু তার ভালোবাসা, তার মায়া, তার পৃথিবী।
শেরাজ স্কার্টিং করে ঢুকে যায় অফিসে। ধূসর শার্ট, হাতা গুটানো, হাতে রোলিক্স ঘড়ি, মুখে চিরাচরিত গম্ভীর অভিব্যক্তি। মাথার চুল আজ সামান্য এলোমেলো। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তি। সুমুর জেদের জন্য সকাল সকাল একটা স্যান্ডউইচ খেয়ে এসেছে। অফিসের অবস্থা শুনে ব্রেকফাস্টটাও ঠিকমতো করতে পারেনি সে।
সুমু অনেক করে বলেছিল,
“খান সাহেব, খালি পেটে যাবেন না প্লিজ। একটা তো খেয়ে যান।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে কিছু না বলে খেয়ে নিয়েছিল। শুধু যাওয়ার সময় সুমুর কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলেছিল,
“সুইটহার্ট, নিজের খেয়াল রেখো। বিকালে নিতে আসব।”
স্যান্ডি টেবিলের উপর ল্যাপটপ খুলে বসে আছে। চারদিকে একসাথে পাঁচটা স্ক্রিন চলছে। পিআর টিম লাইন ধরে দাঁড়িয়ে, ডিজাইন টিমের মুখে তীব্র উত্তেজনা, কিন্তু ভেতরে চাপা দুশ্চিন্তা। শেরাজ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ সব শুনছে। হঠাৎ সে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
“শাট এভরিথিং ডাউন। নো ফারথার ফটোস অফ হার।”
সবার মুখ পাথর। স্যান্ডি ফিসফিস করে বলল,
“বাট সার, ভোগ কোরিয়া হ্যাজ সেন্ট আ ডিরেক্ট রিকোয়েস্ট। দেয় ওয়ান্ট টু ফিচার হার ইন দেয়ার ‘মিস্টিক বিউটি’ কলাম। দ্যাট’স হিউজ।”
শেরাজ এক দৃষ্টিতে তাকাল,
“শি ইজ নট ফর সেল”
ব্র্যান্ড মিটিং চলছে। আইয়ুব, নিহাল, সারবাজ, রাহিন সবাই এসে গেছে। নতুন লাইন এস.কে কোর-এর লুকবুক ডিজাইন হচ্ছে। অথচ সবাই বুঝছে, এস.কে লাক্স-এর ভাইরাল শুট ছাপিয়ে কিছুই নেই এখন। রহস্যময়ী মেয়েটার ছবি দেখে ইউরোপিয়ান রিটেইলাররা রিস্টক চাচ্ছে। মিডল ইস্টের ইনফ্লুয়েন্সাররা জানতে চাইছে, “ইজ শি ওমানি?”
রিয়াদ ফোনে কথা বলছে। সে কথা শেষ করে এসে বলল
“এস.কে, কাতার ৫০টা প্রি-অর্ডার এসেছে, সব ওই মায়াবতী কালেকশনের।”
আরবাজ খুনসুটি করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভাই, ফেস না দেখিয়েও ভাবিজি তো ভাইরাল।”
শেরাজ চোখ তুলে তাকাল না,
“ওয়ার্ক, নট ওয়ার্ডস!”
পেটটা হালকা ডাক দিচ্ছে। স্যান্ডউইচটা ছিল ছোট, আর এখনো লাঞ্চ আসেনি। সুমুর ফোন এসেছিল একবার। শেরাজ ফোনের কাছে ছিল না বলে রিসিভ করতে পারেনি। পরে সুমু মেসেজে লিখেছে,
“লাঞ্চ টাইম, খান সাহেব। আই কেপট ইউর ফেভারিট চিকেন র্যাপ রেডি। ওয়ান্ট মি টু ব্রিং ইট টু দ্য অফিস?”
শেরাজ একহাত দিয়ে ফোনের স্ক্রিন ছুঁয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর টাইপ করল,
“নো নিড, সুইটহার্ট। স্টে হোম। রেস্ট।”
মেসেজটা পড়ে সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কিছুটা ভেবে সে সিদ্ধান্ত নিল, সে আজ খাবার নিয়ে অফিসে যাবেই। যে ভাবা সেই কাজ। দুপুর টাইমে সকলে খেয়ে ঘুমাচ্ছে। সুমু নিজেও এখনো খায়নি। সে ফোনটা নিয়ে তার শাশুড়ির ফোনে মেসেজ দিল।
“আপনার ছেলে সকালে ঠিকমতো খেয়ে বের হয়নি। আজ তার কাজের অনেক চাপ। আমি জানি সে দুপুরের লাঞ্চটাও করার সময় পাবেনা। আপনারা ঘুমাচ্ছেন, তাই আর কাউকে ডেকে তুলে বিরক্ত করলাম না। আমি আপনার ছেলের অফিসে খাবার নিয়ে যাচ্ছি। আমি জানি ঘুম থেকে উঠে আপনি আমার এই মেসেজটা দেখলে রেগে যাবেন। কিন্তু আমার কিছু করার নেই, আম্মু। এক আল্লাহ আর দুই আমার খান সাহেবের আগে দুনিয়াতে আমার কাছে বড় কিছুই নেই। আমি অফিসে গেলাম, আম্মু। রিয়াজ আর ফিরোজা এখনো ঘুমায়নি, তাই ওদের দুজনকে সাথে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি বাসার গাড়ি নিয়েই বের হবো। আসি আম্মু।”
মেসেজটা সেন্ড করে সুমু কিচেনে গেল। খাবার প্যাক করে নিয়ে রুমে এসে বোরকা পড়ে রেডি হয়ে রিয়াজ আর ফিরোজাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অফিসের উদ্দেশ্যে।
দুপুরের রোদের তেজি আলোয় গাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের সোনালি রোশনাই ছুঁয়ে যাচ্ছিল সুমুর হিজাবের প্রান্ত। পরনে কালো বোরকা, সুন্দরভাবে পিন করা হিজাব, হাতে শেরাজের জন্য বানানো তার প্রিয় খাবারের একটি ছোট কন্টেইনারে বিরিয়ানি, দই বড়া, আর মিষ্টি দই। পাশে ছোট্ট ফিরোজা। পরনে হলুদ রঙের ফ্রকে, চুলে ফুলের ক্লিপ, হাতে একটা ছোট ব্যাগ। আর ফিরোজার পাশে রিয়াজ।
“ভাবিজি! আমি বলছি, আপনি আমার লাইফের পার্টনার হয়ে যান। ভাইয়া তো বোরিং। ইউ ডিসার্ভ সামওয়ান ইয়াংগার।”
সুমু হাসল রিয়াজের কথা শুনে। ফিরোজা হাসতে হাসতে বলল,
“রিয়াত ভাইয়া, নিউ ফ্রেন্ড আমাল ভাবিজি। আমাল এস.কে ভাইয়ার মিত্তি বউ। তোমাল হতে দিব না। আমাল এস.কে ভাইয়া সবথেতে বেতি হ্যান্ডথাম।”
ওদের দুজনের কথার মাঝে গাড়ি এসে থামে এস.কে কর্পোরেট হাউসের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে সুমুরা অফিসের ভেতর পা রাখল।
সুমু রিসেপশন পা রাখতেই, সকলে থমকে গেল। তার সৌম্য ব্যক্তিত্ব, শান্ত চোখ, মাথা নিচু করে লজ্জায় হাঁটা সবকিছু যেন এক ছায়াসংগীতের মতো বাজে চারপাশে। এস.কে কর্পোরেট হাউসের গেট দিয়ে ঢুকতেই রিসেপশনে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
রিসেপশনিস্ট বলল,
“ওই ওই! ওইটা হয়ত স্যারের ওয়াইফ? দেখ, কালো বোরকা, মাথায় হিজাব।”
অফিসের সিনিয়র এক এক্সিকিউটিভ তানিশা বলল,
হুঁ! এত কিছু করেও মেয়ে তো গ্রামের মতোই রয়ে গেছে। দেখে বোঝা যায়, স্টাইলিশ নয় একটুও।”
অন্য সহকর্মী লুবানা বলল,
“শুধু সুন্দর হলেই তো হয় না। স্যারের পাশে এই মেয়েকে মানায় না।”
অধরা নামের একটি মেয়ে চোখ বড় করে বলল,
“এই মেয়ে এস.কে-এর মালকিন হবে। আফটার অল লাভ ম্যারেজ। আর আমরা দেখো, অফিসে হাড়ভাঙা খাটছি। এতগুলো বছর এখানে জব করছি। এখন পযর্ন্ত স্যারকে ইমপ্রেস করতে পারিনি।”
সকলের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন। শেরাজ কাজের ফাঁকে এলইডি স্ক্রিন তাকাতেই সুমুকে দেখতে পেল। সে কেবন থেকে বেরিয়ে এলো। তার চোখ সোজা সুমুর ওপর। অফিসে এতদিন যে মানুষটা হুকুমের স্বরে চলে, আজ সে একেবারে নরম মেঘ হয়ে গেছে। সে ফিরোজাকে কোলে তুলে নিয়ে নরম স্বরে বলল,
“তুমি এখানে কেনো এসেছ, সুইটহার্ট? তাও এই দুপুর বেলায় গরমের মধ্যে।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“মাথাটা কি গেছে আপনার? বাড়িতে এসি, গাড়িতে এসি, এখানেও এসি। গরম কোথায়?”
তখনই সারবাজরা সকলে ক্যান্টিন থেকে এসে শেরাজের পাশে দাঁড়াল। রাহিন সুমুর মাথায় হাত রেখে বলল,
“কেমন আছিস, সুমু?”
“ভালো ভাইয়া!”
অফিসের সমস্ত স্টাফ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। নিহাল অফিসের সকল মেয়ে স্টাফগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“ভাবিজি, এইখানে প্রতিটা মেয়ে আপনার স্বামীর ক্রেজি ফ্যান। আপনি জানেন না, আপনার স্বামীর জন্য আমরা কত মেয়েকে না করেছি। আর শুধু তাই নয়, এই অফিসের অনেক মেয়ে স্টাফের কাজ চলে গেছে, শুধু আপনার স্বামীর জন্য। কোনো মেয়ের মধ্যে বেশি লুতুপুতু টাইপ ভাব দেখলে, আপনার স্বামী সে মেয়েকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে।”
সারবাজ বলল,
“এস.কে-র ব্র্যান্ডের পেছনে আজ যার অবদান, সেই আত্মা তুমি সুমু। দ্য সোল অফ এস.কে।”
সুমু চোখ নামিয়ে বলল,
“আমি শুধু ওনার স্ত্রী।”
রিয়াজ বলল,
“ভুল! আপনি আমার লাইফের ফিউচার পার্টনার।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুই আবার শুরু করলি, রিয়াজ?”
সবাই হেসে ফেলল। অফিসের সকলের মধ্যে আবারও গসিপ শুরু হলো। তানিশা কঠিন গলায় বলল,
“উনি তো হিরো। কিন্তু ওনার এমন একটা ওয়াইফ।”
লুবানা বলল,
“এই মেয়ে কিভাবে? স্যার তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট লিডার টাইপ। কিন্তু এই মেয়ে তো গৃহিণী মার্কা বউ।”
অধরা বলল,
“তোমাদের মনে আছে দু’বছর আগে অদ্রিতার কথা? স্যার ওকে রিজেক্ট করাতে ও স্যারের জন্য ভরা অফিসে অমাদের সকলের চোখের সামনে পয়জন খেয়ে নিয়েছিল।”
তানিশা আবারও বলল,
“তোমরা এই মেয়ের কথা বলছ? স্যারের মামাতো বোন ওমান শহরের নাম্বার ওয়ান সুন্দরী মডেল রোজা চৌধুরী স্যারের জন্য পাগল। স্যার তো সেই মেয়েকে পযর্ন্ত পাত্তা দেয়নি।”
সকলের মধ্যে গসিপ শুনে আরবাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনাদের মিটিং শেষ হয়ে গেলে যার যার কাজে যান।”
মেয়েগুলোর মধ্যে এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা পারিসা নামের একটি মেয়ে নিজের ডেস্কে বসে বলল,
“উফফ… কতো ভাগ্যবতী মেয়েটা। শেরাজ খানের মতো মানুষটা তাকে ভালোবাসে। দেখেছ! আহা বোরকা পরেও কী গ্লো।”
শেরাজরা সকলে কেবিনে ঢুকে গেল। রিয়াজ নিজের ভাইয়াকে জ্বালানোর জন্য বলল,
“ভাবিজি আমার ফিউচার ওয়াইফ। ভাইয়া বেশি এক্সাইটেড হইওনা।”
শেরাজ ফিরোজার হাতে চকলেট দিয়ে বলল,
“তোর তো এখনো পেন্সিল কাটার বয়স, আর তোমার এখনই পার্টনার চাই?”
রিয়াজ আর শেরাজের মধ্যে হালকা খুনশুটি শুরু হয়ে গেল। সুমু ওদের দেখ হেসে চোখ নামিয়ে রাখল।
হঠাৎ অমিত বলল,
“ভাবিজি আমাদের ব্র্যান্ডের আসল ইনফ্লুয়েন্সার।”
আইয়ুব বলল,
“ভাবিজি, অফিসে আসার আগে আমাদের জানিয়ে আসতেন। আমরা একজন গিয়ে আপনাকে নিয়ে আসতাম। আর তাছাড়া আপনি বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসবেন এইটা জানলে আমরা ক্যান্টিনে খেতে যেতাম না।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“আমি বেশি করে এনেছি; ভাইয়া। চাইলে আপনারা সকলে টেস্ট করতে পারেন।”
সাইফ বলল,
“আজ তো পেট ফুল বুক। ইনশাআল্লাহ, অন্য একদিন ট্রাই করব।”
আরবাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“ব্রো আর ভাবিজি মধ্যে একটু একান্ত সময় দরকার। চলো, আমরা সকলে বাহিরে যায়।”
সকলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। সারবাজ ফিরোজাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। সকলে বেরিয়ে যেতেই শেরাজ তার ডেস্ক থেকে রিমোট তুলে নিল। রিমোটে নিয়ে সে স্মার্ট প্রাইভেসি গ্লাস সুইচে চাপ দিল। সাথে সাথে কেবিনের থাই গ্লাস ব্ল্যাক হয়ে গেল। বাহির থেকে আর কিছু দেখা গেল না।।
সুমু হিজাব, বোরকা খুলে ফেলল। প্লেটে এনে খাবার সার্ভ করতে লাগল। শেরাজ ডেস্ক থেকে ফোনটা তুলে ইনস্টাগ্রামে ঢুকে ফ্রেন্ডস গ্রুপে টেক্সট করল।
“থ্যাঙ্ক ইউ বয়’স।”
ফোনটা জায়গা মতো রেখে সে সুমুর হাত থেকে খাবারের প্লেটটা ডেস্কের ওপর রাখল। নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে সুমুকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে চোখ বন্ধ করে সুমুর বুকে মুখ গুজল। সুমু শেরাজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,
“কি হয়েছে? টায়ার্ড লাগছে?”
শেরাজ চুপ করে রইল। সুমু সময় দিল তাকে। সে একহাতে শেরাজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, আরেক হাতে শেহরাজকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। বাইরের পৃথিবী যেন থেমে যায় তাদের কাছে। অফিসের হর্ষধ্বনি, হিংসা, ব্যস্ততা সব যেন দূর হয়ে গিয়ে, একটা ছোট্ট কাচঘেরা ঘরে তারা দু’জন, ভালোবাসা আর শুদ্ধ বন্ধনে বাঁধা পড়ে রইল।
শেরাজ কিছুসময় পর বলল,
“এনার্জি নেই বডিতে, তাই এনার্জি বাড়াচ্ছি। আর অনেক বেশি গরম লাগছে। এসির ফুল টেম্পারেচারে দিয়েও কাজ হচ্ছেনা। তোমার আগুনে ঝলসে যাচ্ছি আমি।”
“না খেয়ে থাকলে এনার্জি আসবে কোথা থেকে?”
“তোমার থেকে আসবে। তোমার সঙ্গ আমাকে স্বস্তি দেয়, সুইটহার্ট।”
সুমু শেরাজের মাথায় ঠোঁট ছোঁয়াল। শেরাজ চোখ বন্ধ অবস্থায় বলল,
“এখন একটু ফিল্মি ভাইব চাই।”
“মানে?”
চোখ মেলে তাকাল শেরাজ। সে ল্যানলাইনে কল করল। কেবিনের ডোর আনলক করে দিল। সুমু কোল থেকে উঠতে গেলে শেরাজ তাকে শক্ত করে ধরে রাখল। কেবিনে স্যান্ডি এলো। শেরাজদের দিকে না তাকিয়ে একটা স্টান্ট ফ্যান এনে ফুল পাওয়ার দিয়ে ওন করে দিয়ে গেল। স্যান্ডি যেতেই ফোনটা হাতে নিয়ে বলল,
“একটা মিউজিক প্লে করব। মিউজিকের সাথে আমরা দুজন তাল মেলাব।”
“আপনি খাবেন না?”
“হুম! তার আগে একটু রোমান্টিক ভাইব চাই।”
সে সুমুর বেঁধে রাখা চুলগুলো খুলে দিল। সুমুর কোমর সমান চুলগুলো অবাধ্য হয়ে উড়তে শুরু করল। শেরাজ অডিও স্পিকারে “তু হি হে আশিকী” গানটা প্লে করল। ফোনটা আগের জায়গায় রেখে সুমুরকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে গানের সাথে তাল মিলিয়ে গেয়ে উঠল,
তু হি হে আশিকী, তু হি আওয়ারাগি,
তু হি হে জিন্দেগী, তু হি জুদা!
তু ইবতে দা মেরি, তু ইনতে হা মেরি,
তু হি মেরা জাহা, তু হি জুদা!
তু মেরে রুবারু, হার সে মে তু হি তু
তু পেহেলি আরজু, তু হি জুদা!
তু হি হে আশিকী, তু হি আওয়ারাগি,
তু হি হে জিন্দেগী, তু হি জুদা!
দিল নে কাহা থা, না তারপেগা,
ফির আজ দিল ধারকে কিউ যায়ে!
খাবোনে তায় কিয়া থা খোনা,
ফির আজ কিউ পালাট ও আয়ে!
তুজ মে লিখা হু মে, তুজ জে জুদা হু মে,
তু মেরা রোগ হে, তু হি দাওয়া!
তু হি হে আশিকী, তু হি আওয়ারাগি,
তু হি হে জিন্দেগী, তু হি জুদা!”
গান শেষ হতেই সুমু বলল,
“অনেক হয়েছে। এবার খেয়ে নিবেন, আসুন।”
শেরাজ সুমুকে টেনে কোলের ওপর বসিয়ে রেখে বলল,
“উহুম! এইভাবেই খাব।”
সুমু আলতো হাসল। খাবারের প্লেট থেকে খাবার তুলে শেরাজকে ধীরে ধীরে খাইয়ে দিল। শেরাজ এক লোকমা খাবার মুখে নিচ্ছে তো, সুমুর বুকের ওপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে চিবাচ্ছে।
খাওয়ানো শেষ হতেই সুমু শেরাজকে পানি খাইয়ে দিয়ে বলল,
“অল্প চাপ নিবেন মাথায়। আর অমাকে ছাড়ুন, কফি করে আনছি।”
শেরাজ ছেড়ে দিল সুমুকে। সুমু উঠে চলে গেল কফি বানাতে।
বাহিরে সারবাজরা এতোক্ষণ সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছে। এখন সকলে তাকিয়ে আছে শেরাজের কেবিনের দরজার দিকে। নিহাল, আইয়ুবের কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভেতরে কী বাসর হচ্ছে নাকি? কতক্ষণ হয়ে গেল এখনো দরজা খুলছেনা। এস.কে কী শুধু দুপুরের লাঞ্চ করছে নাকি লাঞ্চের সাথে স্পেশাল কিছুও খাচ্ছে?”
রিসান হেসে বলল,
“এতক্ষণ মিউজিক চলছিল। তুই এতোক্ষণ দরজা বন্ধ মানে বুঝতে পারছিস? ভিতরে এখন স্ক্রিন প্লে চলছে। এই এস.কে এত ডেস্পারেট কেনো ভাই?”
ফাহিম বলল,
“এই দৃশ্য কেউ দেখতে না পারলেও, সকলে বুঝতে পারছে ভেতরে রোমান্স চলছে।”
আইয়ুব আফসোস করে বলল,
“এস.কের সাথে আমিও বিয়েটা করে নিলে পারতাম। এইসব দেখলে বুকে ব্যথা হয় রে। নেক্সট বিডিতে গিয়ে ব্রাউন গার্লের সাথে বিয়েটা করে নিব। তারপর আমিও এস,কে মতো রোমান্স করব।”
ওদের কথোপকথনের মধ্যে শেরাজ হাতে কফির কাপ নিয়ে কেবিন থেকে বের হলো, পাশে সুমু। দুজনে কেবিন থেকে বেরিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একটা ছোট্ট সাজানো টেবিল, সাথে ফুলের তোড়া। টেবিলের পেছনে ব্যানারে ইংরেজি অক্ষরে বড় করে লেখা,
“ওয়েলকাম টু এসকে, মিসেস খান। আওয়ার সোল, আওয়ার স্ট্রেংথ।”
শেরাজ আর সুমুকে দেখে সবাই মিলে একসাথে বলে উঠল,
“কংগ্র্যাচুলেশনস মিস্টার অ্যান্ড মিসেস খান। দ্য সোল অফ এস.কে।”
টেবিলের ওপর কেক, হোয়াইট চকলেট আর লাল গোলাপের থিমে। সকলে মিলে ওদের কেক কাটতে বলল। সুমু, শেহেরাজ আর ফিরোজা মিলে কেক কাটল। পুরো অফিস রুম জমে উঠল একটা ছোট ওয়েলকাম পার্টিতে।
সূর্যের আলো কিছুটা নরম হয়ে এসেছে, দুপুর গড়িয়ে বিকেল ধরতে চলেছে। কলেজ চত্বরে হালকা কোলাহল। গাছের নিচে ছায়ায় বসে আছে কিছু ছাত্রছাত্রী। ফারিয়া কলেজ ভবনের পাশ দিয়ে হেঁটে নিজের ক্লাসে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ক্লাস রুমে ঢুকতেই তার সামনে তিনজন ছেলে এসে দাঁড়াল। ফারিয়া কপাল কুঁচকে বলল,
“প্রবলেম কি তোর, শাওন? পথ আটকে দাঁড়ালি কেনো?”
“পথ আটকে কেনো দাঁড়িয়েছি তুমি বুঝোনা?”
ফারিয়া রাগিস্বরে বলল,
“এই তুই আমাকে তুমি করে বলছিস কেনো?”
“তুমি তো জানো ফারিয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
ফারিয়া বিরক্ত হলো।
“দেখ শাওন, আমি তোকে ভালোবাসিনা। দয়া করে, আমাকে জ্বালাতন করা বন্ধ কর।”
ফারিয়া চলে আসতে নিলে শাওন পেছন থেকে ফারিয়ার হাত টেনে ধরল। ফারিয়া পেছন ঘুরে তাকিয়ে ঠাস করে চড় মারে শাওনের গালে। তার চোখে পানি অথচ কন্ঠে রাগ নিয়ে বলল,
“আর কোনোদিন আমার সাথে এমন অসভ্যতা করতে আসলে মেরে সিঁধে করে দিব, যা ভাগ।”
শাওন রেগে গেল। আঙুল তুলে ফারিয়াকে হুমকির স্বরে বলল,
“তোকে আমি দেখে নিব, ফারিয়া। আজকের এই চড়ের মাশুশ তোকে তোর সম্মান দিয়ে চুকাতে হবে।”
ফারিয়া কিছুটা ঘাবড়ে গেল। কিন্তু মুখে সাহসের ছাপটা বজায় রাখল। ছেলে তিনটা চলে গেল। ফারিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে কলেজ ত্যাগ করে।
বিকেলের নরম আলো কেবিনের জানালা বেয়ে ভেতরে ঢুকছিল। রায়য়ান চৌধুরী নিজের কালো চেয়ারে বসে এক হাতে ডেস্কে রাখা কাগজগুলো উল্টাচ্ছিল, অন্য হাতে পেন ঘোরাচ্ছিল বিরক্ত ভঙ্গিতে। চোখে মুখে স্পষ্ট রাগের ছাপ।
“দ্য সোল অফ এস.কে”–শেরাজ খানের নতুন কালেকশনের এতটা পাবলিসিটি, এতটা হাইপ সবকিছুই যেন রায়য়ানকে আরও অসহিষ্ণু করে তুলছিল। সে হঠাৎ চেয়ারের হ্যান্ডলে এক চাপ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কঠিন গলায় ডেকে উঠল,
“মাহিন!”
পিএ মাহিন দ্রুত কেবিনে ঢুকল। একটু কুঁচকে গেল তার মুখ।
“জি, বস!”
রায়য়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
“এই ‘সোল অফ এস.কে’ নিয়ে মিডিয়ায় যা চলছে, সব রিপোর্ট কালেক্ট করো। কারা কারা ব্যাকিং করছে, কারা স্পনসর করছে, আমি সব জানতে চাই।”
এক মুহূর্ত থেমে, চোখ সরু করে বলল,
“আর শেরাজ খানের মুভমেন্টও নজরে রাখবে। এবার ওর উত্থান বেশিদিন চলতে দেব না।”
মাহিন চুপচাপ মাথা নেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। রায়য়ান নিজের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। চোখে ঠান্ডা কিন্তু ভয়ঙ্কর রাগের ঝিলিক। পেছনে রাখা ডেস্কের ফোনের দিকে একবার তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা তুলে নিয়ে দ্রুত একটা নাম্বার ডায়াল করল।
কিছুক্ষণ রিং হতেই ওপাশ থেকে আরিয়ান চৌধুরীর গম্ভীর গলা ভেসে এলো,
“বল, কল করেছিস কেনো?”
রায়য়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
“শুনেছিস, শেরাজের “দ্য সোল অফ এস.কে’ এখন মিডিয়ার হট টপিক।”
আরিয়ান একটু বিরক্ত গলায় উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, চারদিকে ওরই নাম শুনছি। এত পাবলিসিটি, মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সব হয়েছে বেবিগার্লের জন্য। এই শুট করছে সুমু।”
রায়য়ান চেয়ারে বসে, হাতের আঙুল দিয়ে ডেস্কের ওপর টুকটুক করে শব্দ তুলতে লাগল। নিচু গলায় বলল,
“শুধু পাবলিসিটি না, ব্যাকআপও পেয়ে গেছে। কিছু করতেই হবে এখন।”
আরিয়ান একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,
“প্ল্যান কী?”
রায়য়ান হালকা হাসল, ঠান্ডা অথচ বিষাক্ত গলায় বলল,
“শিগগিরই জানবি! তবে এক কাজ কর, একটু শেরাজের কাছাকাছি থাক। ও কী প্ল্যান করছে, কাকে টার্গেট করছে, সব খোঁজ চাই। একটা ভুলও চলবে না।”
আরিয়ান হালকা গলায় হেসে বলল,
“আমি ওইসব পারব না। ছয়মাস পর আমার শুট আছে। তিনমাস পর ফিরতে হবে। যদি বেবিগার্লকে পটানোর কোনো টিপস জানিস, তাহলে সেটা বল।”
রায়য়ান ভ্রু কুঁচকালো।
“তুই আমার কাছে মেয়ে পটানোর টিপস চাইছিস? আমার কাছে?”
“ওহ সরি! তুই তো এইসব পারিস না।”
রায়য়ান ফোনটা কানে ধরে বসেছিল। ওপাশে আরিয়ান অপেক্ষায়। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে রায়য়ান দাঁতে- দাঁত চেপে বলল,
“শোন শালা, শেরাজকে ভাঙতে হলে কুত্তার মতো গিয়ে মারামারি করে লাভ নাই। ওর সবকিছুই বতর্মানে ওর ওয়াইফের মধ্যে আটকে গেছে। শেরাজকে ধ্বংস করতে পারবে কেবল ওর ওয়াইফ। সুমু ওর দুর্বলতা।”
রায়য়ান আবারও ব্যঙ্গ করে বলল,
“তুই তো আবার বিশাল কোরিয়ান হিরো। তোকে দেখলে হিরোইনরা পাগল হয়ে যায়। তুই শালা এখন কার বাল ছিঁড়িস রে?”
আরিয়ান ওদিক থেকে রাগে দাঁত চাপা দিয়ে বলল,
“চুপ কর শালা। এক এক সময় এক এক রকমের কথা বলিস তুই।”
“ভুল কিছুতো বলিনা। এখন বাদ দে এসব। কিছু কর আরিয়ান। এস.কের থেকে সুমুকে সরাতে তোকে আমি সব রকমের হেল্প করব।”
“তোকে কিছু করতে হবেনা। সময়মতো আমি ঠিক সরিয়ে নিব।”
কল কেটে দিল আরিয়ান। রায়য়ান ফোন ছুঁড়ে ফেলে দিল ডেস্কের ওপর। কেবিনের ভেতর ভারি নীরবতা নেমে এলো। রায়য়ানের চোখে এখন শুধুই এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের আগুন।
রাত এগারোটা। শীতল রাতে গাড়ির গর্জন থেমে গেল খান ম্যানশনের সামনে। সুমু গাড়ি থেকে নামতেই একটা ক্লান্তি মাখানো হাসি দিল। আজকের দিনটা ছিল লম্বা, ঘরোয়া, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ক্লান্তিকর। আজকের শুট ক্যানসেল করছে শেরাজ। অফিসের কাজ শেষ করে সবাইকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিল সে। সারবাজরা অনেক আগেই ফিরে এসেছে। শুধু শেরাজ আর সুমু বাহিরে ছিল।
ঘরে ঢুকেই শেরাজ সুমুকে কোমল গলায় বলল,
“তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো, সুইটহার্ট। আমি একটু ফোনে সোশ্যাল মিডিয়ার অবস্থা দেখে আসি।”
সুমু মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। শেরাজ বেডের পাশে বসে নিজের ফোন হাতে নিল। আনমনা ভঙ্গিতে স্ক্রল করছিল মেসেজ আর মেইলগুলো। ঠিক তখনই, আচমকা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ‘স্যান্ডি’ নামটা ভেসে। শেরাজ কলটা রিসিভ করে একটু বিরক্ত গলায় বলল,
“বলো, কী হয়েছে?”
ওপাশ থেকে স্যান্ডির কণ্ঠস্বর কাঁপছিল,
“স্যার… স্যার একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে”, সে যেন ভয় আর গিল্টিতে গলা শুকিয়ে ফেলেছে, “স্যার, আজ… আজ ডোজটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা… ছেলেটা মারা গেছে, স্যার।”
শেরাজ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। তার চোখের তারা যেন আগুনের মতো জ্বলে উঠল।
“হোয়াট? কি বলছ তুমি? তুমি কি ভুলে গেছ, সুমুর যে ক্ষতি করতে চায় সে লোক পযর্ন্ত পৌছানোর জন্য এই ছেলেটা আমাদের একমাত্র উপায় ছিল,”
শেরাজের কন্ঠে আগুন। স্যান্ডি আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু শেরাজ ততক্ষণে ফোনটা জোরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ফোনটা মেঝেতে পড়ে দুই টুকরো হয়ে গেল। সে রাগে অন্ধ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের সেন্টার টেবিল লাথি মেরে উল্টে দিল। মুহুর্তে কাচের টেবিলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এতেই শেরাজ থেমে থাকল না। ঘরের প্রতিটা জিনিস এলোমেলো করে ফেলল সে। ঘরটা যেন এক নিমিষে রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।
ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে বের হলো সুমু। ভেজা চুল গালে লেপটে আছে। চোখে বিস্ময় আর ভয়। সে ছুটে এলো শেরাজের কাছে।
“খান সাহেব, প্লিজ, শান্ত হন। কী হয়েছে বলুন?”
সে শেরাজের সামনে এগিয়ে এলো তাকে থামানোর জন্য। কিন্তু রাগে অশান্ত শেরাজকে সামলাতে গিয়ে শেরাজের হাতে ভুলবশত এক ধাক্কায় সুমু দু’পা পিছিয়ে গেল। পায়ে কাচের টুকরো ঢুকে গেল। ব্যাথায় ‘আহ’ করে উঠল সে। মুহূর্তেই শেরাজের হুশ ফিরল। তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।
“সুইটহার্ট, ব্যথা পেয়েছ?”
সে এগিয়ে এলো সুমুর কাছে, ভয় মাখা দৃষ্টিতে। এতক্ষণের তুলনায় শেরাজ সুমুর অবস্থা দেখে আরও বেশি পাগলামি শুরু করল। সে হাত বাড়াল মেঝেতে পড়ে থাকা কাচের দিকে নিজের হাত ক্ষত বিক্ষত করবে বলে। সুমু আটকালো তাকে। সে কোনো কথা না বলে চুপচাপ শেরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শেরাজের গা থেকে তখনও রাগের তাপ ছুটছিল, কিন্তু সুমুর কোমল স্পর্শ আর নিঃশব্দ ভরসায় তার বুকের ভেতরের ঝড় থেমে গেল। সে দুইহাতে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। চুলের গোড়ায় ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে ক্ষমা করে দাও, সুইটহার্ট। আমি… আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ বুকের সাথে আরো জড়িয়ে ধরল। তাদের পৃথিবী তখনো অশান্ত, কিন্তু দুজনের স্পর্শে তাদের সেই ছোট ভালোবাসার জগৎ নিঃশব্দে, ধীর ধীরে শান্ত হয়ে আসছিল। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙা আসবাবের দিকে আর একবারও তাকাল না শেরাজ। তার সমস্ত মনোযোগ এখন শুধু সুমুর মুখে। সেই নরম, ভীত চোখে, যেখানে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু নিঃশব্দ ভালোবাসার ভাষা রয়েছে।
সে সুমুকে কোলে তুলে ধীরে ধীরে বেডের কাছে এলো। ফাস্ট এইড বক্স এনে যত্ন করে সুমুর পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে সুমুর পায়ে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে রাগ আর অপরাধবোধে। সুমু দু’হাতে শেরাজের মুখের দু’পাশ ধরে তাকে দেখতে লাগল। তার চোখে অদ্ভুত মায়া। না, কোনো প্রশ্ন নেই। না, কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা অনুচ্চারিত আহ্বান।
“বলুন খান সাহেব, নিজের ভেতরের জ্বালাটা আমাকে দিন, আমি সইব।”
শেরাজ চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। তার দেহের সব শক্তি যেন হঠাৎই হারিয়ে গেল। সে নিজের মাথাটা ধীরে সুমুর কোলে রাখল, যেন একটা বিধ্বস্ত যুদ্ধবাজ এখন নিজের একমাত্র আশ্রয়ে ফিরে এসেছে। সুমু নরম হাতে তার চুলে হাত বুলাতে লাগল। চুলের ভেতর দিয়ে সুমুর নরম আঙুলের চলাচল ছিল যেন তার সব রক্তগরম ভাব প্রশমিত করার ওষুধ।
সুমু নরম কণ্ঠে জানতে চাইল,
“আপনি ঠিক আছেন, খান সাহেব?”
শেরাজ খুব স্বাভাবিক মুখ করে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ সুইটহার্ট, আমি ঠিক আছি।”
সুমু বুঝল, তার খান সাহেবের ভেতরে কিছু একটা চলছে, খুব বড় কিছু। সুমু আবার জিজ্ঞেস করল ধীরে,
“আপনি কী বলবেন না, কী হয়েছে?”
শেরাজ ছোট্ট একটা হাসি দিল, কিন্তু সে হাসির ভেতর একটা ভয়ঙ্কর ক্লান্তি ছিল। সে গলা নামিয়ে বলল,
“একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। আর কিছু না।”
সুমু তার হাত ধরে রাখল, চুপচাপ। সে আর জোর করল না। কারণ সে জানে, তার খান সাহেব নিজের ভেতরের যুদ্ধ কাউকে সহজে দেখায় না। সে নিজেই সেইসব যুদ্ধ লড়ে, নিজেই রক্তাক্ত হয়।
শেরাজ সুমুর হাতটা শক্ত করে ধরল, যেন ওর স্পর্শ থেকে একটু শান্তি খুঁজে নিচ্ছে।
“পায়ে ব্যথা করছে, সুইটহার্ট?”
খান সাহেব পর্ব ৪১
“না! এই সামান্য কেটে যাওয়াতে আপনি যেই পাগলামি করছেন, তাতে ব্যথারা ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে।”
শেরাজ আলতো হাসল। সুমু তার হাসি দেখে বলল,
“ফ্রেশ হয়ে আসুন। অনেক রাত হয়েছে।”
শেরাজ উঠে বসল। ওয়াশরুমে গিয়ে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে এসে সুমুকে জড়িয়ে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো।
