খান সাহেব পর্ব ৪৩
সুমাইয়া জাহান
ঘর জুড়ে নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। মিষ্টি রোদটা ঘরের সাদা কালো পর্দার ফাঁক দিয়ে রুমে ঢুকছে। বাইরে কোথাও দূরে পাখিরা ডাকছে। টুপটাপ শব্দে বারান্দার ফুলের টব থেকে মাঝে মাঝে জল ঝরছে। বাড়ির পুরুষরা সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে গেছে। ঘরজুড়ে শান্তির একটা নিঃশব্দ আলপনা যেন আঁকা হয়েছে।
সুমু ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল। ডান পায়ের পাতায় কাল রাতের কাচের টুকরার কাটা দাগটা হালকা ব্যথা দিচ্ছে। শেরাজ রাতে বারবার উঠে দেখেছে। ড্রেসিং করিয়ে দিয়েছিল খুব যত্নে। সকালে অফিসে বেরোনোর সময়ও অনেকবার পায়ের খবর নিয়েছে।
সুমু ধীরে ধীরে পায়ের ব্যান্ডেজটা খুলল। নরম তুলো দিয়ে একটু অ্যান্টিসেপটিক দিল। তারপর হাতে ডায়েরি নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে বসল। পরনে নীল আনারকলি, খোলা চুলে, পায়ের পাতায় ছোট একটা ব্যান্ডেজ নিয়েও ওর মধ্যে অদ্ভুত এক শান্ত সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়েছে। ডায়েরির প্রথম পাতা খুলে সুমু ভাবল,
“খান সাহেব যদি এখন থাকতেন, হয়ত রাগী মুখে এসে বলতেন, তুমি উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটছ কেন, সুইটহার্ট? তারপর গম্ভীর কণ্ঠে আদরের ভয় দেখাতেন।”
সুমু মৃদু হাসল। ডায়েরিটা হাতে ধরে সামনের নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। হাওয়ায় খোলা চুল আর ডায়েরির পাতা উড়ছে। সে মনে মনে অনুভব করল, “খান সাহেবের ভালোবাসা যেন সুরক্ষার একটা অদৃশ্য চাদর হয়ে সারাদিন ওকে ঘিরে রাখে।” শুধু দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসা শেরাজের মৃদু কণ্ঠস্বর যেন মনে হলো বলল,
“সাবধানে থেকো, সুইটহার্ট।”
ডায়েরিতে দু’পাতা লিখে উঠে দাঁড়াল সে। নরম হাওয়ায় চুল সরিয়ে পায়ের ব্যথাটা ভুলে একটু একটু হাঁটতে চাইছিল এমন সময়, সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে এল ইশিতা। তার নিঃশ্বাসে তাড়া, মুখে হাসি।
“সুমু!”
সুমু অবাক হয়ে তাকাল। ইশিতা কাছে এসে বলল,
“নিচে চলো! বড়মামনি তোমাকে ডাকছে।”
সুমু একটু অবাক হলো। মনটা হালকা দুশ্চিন্তায় কেঁপে উঠল। তবে সে চুপচাপ কোমল ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল।
“আচ্ছা, চলো!”
পায়ে ব্যথা নিয়েই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। জামার ওড়নাটা গুছিয়ে নিল। মনের মধ্যে প্রশ্নের ভিড়।
“কি ব্যাপার? আজ হঠাৎ করে আমাকে ডাকা হলো কেন?”
ইশিতা সিঁড়ির দিকে ইশারা করে বলল,
“আমি হাত ধরে নিয়ে যায়। পা কেটেছে তো তোমার।
সুমু হালকা হেসে ইশিতার কাঁধে হাত রাখল। দুজনে মিলে ধীরে ধীরে নামতে লাগল নিচে, যেখানে অপেক্ষা করছে তার শাশুড়ি। সে ইশিতার হাত ধরে ধীরে ধীরে নিচে নামল। পা-টা একটু ব্যথা করছিল, কিন্তু তার মুখে সেই চিরচেনা কোমল শান্তি।
নিচে নামতেই চোখে পড়ল, সফেদ ঝকঝকে সোফায় বসে আছেন দুজন মহিলা। একজন মৌ সেন, শেরাজের বড়মামনি। পরিপাটি করে সাজানো চুল, হালকা মেকআপ, পরনে নীলচে-সাদা শাড়ি। তার চোখেমুখে একরকম দৃঢ় সৌন্দর্য, আর অভিজাত একটা ভাব। আরেকজন রুহি খাতুন, শেরাজের ছোট মামনি। নরম মুখের আদুরে হাসি, পরনে হালকা গোলাপি শাড়ি। ছোট্ট ফিরোজা মায়ের কোলের মধ্যে বসে আছে। হাতে একটা চকলেট নিয়ে টুপটাপ করে খাচ্ছে। চকলেট খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি করে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরছে।
সুমু ওদের দেখে একটু থমকে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটু ঘন হয়ে এলো। সে বিনীতভাবে সামনে এগিয়ে গেল। মাথা নিচু করে সালাম করল।
“আসসালামু আলাইকুম, বড়মামনি, ছোটমামনি।”
মৌ সেন এক চুলও না নড়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মুখে হালকা একরকম কঠিন সৌন্দর্যের রেখা, যেন মেপে নিচ্ছেন সুমুকে। রুহি খাতুন হেসে বললেন,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, মামনি! কেমন আছো?”
সুমু একটু সঙ্কোচ নিয়ে উত্তর দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি!”
ফিরোজা মায়ের কোল থেকে মুখ তুলে মিষ্টি করে বলে উঠল,
“নিউ ফ্রেন্ড, চতলেত থাবে?”
ওর কোকড়ানো চুল, বড় বড় চোখ, আর কাচুমাচু ভঙ্গি দেখে সুমুর মন একেবারে নরম হয়ে গেল। সে মুচকি হেসে বলল,
“তুমি খাও, বাবু। নিউ ফ্রেন্ড পরে খাবো।”
রুহি খাতুন কোমল দৃষ্টিতে তাকালেন সুমুর দিকে। মৌ সেন সামান্য ঠোঁটের কোণে কঠিন হাসি টেনে বললেন,
“তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল, বসো সুমু।”
সুমু আস্তে করে সোফায় বসে পড়ল। ওড়নার আঁচলটা গুছিয়ে কোলের ওপর রাখল। চোখ নামিয়ে রেখেছে সে। মনের ভেতর অদ্ভুত এক টানটান অনুভূতি। মৌ সেন একটু গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“তুমি তো আর আমাদের বাড়িতে গেলে না, সুমু। শেরাজ বেটার আশায় থাকলে তো তোমার যাওয়া হবে না কোনোদিন। ছেলেটা বড্ড ব্যস্ত। নিয়ে যাবার জন্য সময় পাবে কীভাবে বলো?”
তার ঠান্ডা কণ্ঠে যেন একধরনের অভিযোগ মিশে আছে। সুমু মাথা নিচু করে রাখল, কিছু বলল না। মৌ সেন থামলেন না, কথা চালিয়ে গেলেন,
“তা বলছিলাম, ফিরোজা এখন আমাদের সাথে যাবে।”
তিনি হাত বাড়িয়ে ফিরোজার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“তুমি ওর সাথে চলো। বিকালের মধ্যে ফিরোজাকে নিয়ে আবার এ বাড়িতে ফিরে আসবে।”
রুহি খাতুন তখন কোমল হেসে বললেন,
“হ্যাঁ মামনি! ফিরোজা তো সারাদিন তোমার সঙ্গেই থাকতে চায়।”
ফিরোজা, রুহি খাতুনের কোল থেকে নেমে এসে সুমুর কোলের ওপর উঠে বসে বলল,
“নিউ ফ্রেন্ড, তুমি যাবে আমাদেল বাড়িতে। ইয়ে, তি মজা।”
হাত তালি দিতে দিতে কথাগুলো বলল ফিরোজা। সুমু ফিরোজার উচ্ছ্বাসের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল, কিন্তু মনে মনে একটু দোটানায় পড়ে গেল। সে নরম স্বরে বলল,
“বড়মামনি! আমি খান সাহেবকে না জানিয়ে কীভাবে যাই? আগে খান সাহেবকে জিজ্ঞাসা করি?”
কথাটা শুনে মৌ সেনের মুখটা একটু থমথমে হয়ে গেল। ঠোঁট চেপে বিরক্তি লুকিয়ে বললেন,
“শেরাজ বেটাকে বলার কি আছে, সুমু? বিকালেই তো ফিরে আসবে। ছোট একটা বিষয় নিয়ে আবার শেরাজ বেটার এত ব্যস্ততার মধ্যে ওকে বিরক্ত করা লাগবে?”
রুহি খাতুন কাঁধ ঝাঁকিয়ে হালকা করে বললেন,
“হ্যাঁ মা, এমন কিছু না। সামান্য বেরোনোই তো। তুমি তো বিকালের চলে আসবে।”
সুমু নরম অথচ দৃঢ় গলায় বলল,
“খান সাহেবের অনুমতি ছাড়া আমি এক কদমও বাইরে পা রাখব না।”
ওর কণ্ঠে যেন একরকম গভীর শ্রদ্ধা আর নির্ভরতার সুর বাজছিল। মৌ সেনের চোখে এবার একফোঁটা অস্বস্তির ছায়া পড়ল। একটু কঠিন গলায় বললেন,
“তুমি এখন এই পরিবারের বউ। আর পরিবার মানে শুধু তোমার স্বামী নয়। শশুর, শাশুড়ি, ননদ, দেবর, ভাসুর সকলে মিলে একটা পরিবার। তাই একটা পরিবারের বউয়ের উচিত সকলের কথার দাম দেওয়া, সকলের ইচ্ছাকে মূল্যয়ন করা।”
সুমু মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় মৃদু করে বলল,
“আমি আগে ফোন করে জানতে চাই।”
ঠিক তখনই কিচেন থেকে কড়া কণ্ঠে বেরিয়ে এলো অনন্যা খাতুনের গলা,
“সুমু, তোমাকে যা বলা হয়েছে, তাই করো। এত কথা বাড়ানোর দরকার নেই। শেরাজকে আমি বলে দিব।”
সুমুর মন টানল না। সে একটু ইতস্তত করে বলল,
“আম্মু, ইশিতাও যদি আমাদের সাথে যায়?”
মৌ সেনের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হালকা হাসি ফুটে উঠল। তিনি কিছু বলার আগেই অনন্যা খাতুন বেশ কড়া গলায় বলে উঠলেন,
“ইশিতার আজ বাসায় কাজ আছে। ও যেতে পারবে না।”
তারপর সামান্য থেমে ঠাণ্ডা অথচ চাপা একটা কণ্ঠে বললেন,
“তুমি কি আমার ভাইয়ের বউদের সাথে যেতে সমস্যা দেখছ, সুমু? ওদের সাথে গেলে কি ওরা তোমাকে খেয়ে ফেলবে?”
ঘরের মধ্যে হঠাৎ করে যেন একধরনের ভারি নীরবতা নেমে এলো। সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নিজের জামার ওড়নার কোণ মুঠোয় চেপে ধরল। বুকের ভেতরটা ধকধক করছিল, কিন্তু মুখ তুলে নম্র গলায় বলল,
“না, সমস্যা না আম্মু। আমি যাব।”
সে একটু ইতস্তত করে মোবাইলটা আনলক করল। সে ঠিক করল খান সাহেবকে একটা ছোট্ট টেক্সট পাঠাবে বা কল দিয়ে অনুমতি চেয়ে নেবে। কিন্তু তখনই অনন্যা খাতুন সামনে এসে গম্ভীর গলায় বললেন,
“সুমু, এখন ফোন করার দরকার নেই। ছেলেটা কাজে ব্যস্ত। একটা ফোন গেলেই মন বিগড়ে যাবে। তুমি কি চাও ওর কাজে বাঁধা পড়ুক?”
সুমু ভেতরে ভেতরে দোটানায় পড়ে গেল। নরম গলায় বলল,
“আম্মু, এক মিনিট কথা বললেই তো হবে। আমি একটু জিজ্ঞেস করে নেই?”
অনন্যা খাতুন একটু কঠিন হয়ে বললেন,
“না মানে না। শেরাজকে আমি নিজেই পরে বলব। এখন তুমি যদি আমাদের কথার মূল্য দাও, তাহলে চুপচাপ প্রস্তুত হও।”
মৌ সেন পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে ঠাণ্ডা হাসি টেনে বললেন,
“শেরাজকে সবকিছু জানাতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই, সুমু। তুমি এখন এই পরিবারের বউ। পরিবারের অন্য কারো সিদ্ধান্তেরও সম্মান করতে শিখো।”
রুহি খাতুন একটু নরম স্বরে বললেন,
“মা, তুমি তো বিকালের মধ্যেই ফিরে আসবে। এটা তেমন কিছু না। ভাববে একটা পারিবারিক ভ্রমণ।”
আফিয়া খাতুন বেরিয়ে এলেন রুম থেকে। রুহি খাতুনের পাশে বসে বললেন,
“একবার জানাতে দিন। নিজের স্বামীকে জানাচ্ছে, এতে অসুবিধা কোথায়?”
অনন্যা খাতুন বললেন,
“কেনো আফিয়া? আমি মেনে নেই আর না নেই,তবুও এইটা তো সত্যি যে, ও আমার ছেলের বউ। আর আমার ছেলের বউয়ের ওপর কি আমার কোনো অধিকার নেই?”
“কিন্তু ভাবিজি…”
অনন্যা খাতুন এক হাত তুলে বললেন,
“থাক আফিয়া। কোথাও যেতে হবেনা সুমুকে।”
সুমু খুব শান্তভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা খচখচে কষ্ট হচ্ছিল। খান সাহেবের অভ্যস্ত ভালোবাসা, তার প্রতিটি ছোটখাটো খেয়াল রাখা, সব মনে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করল না। ফোনও করল না। নিচুস্বরে বলল,
“আমি আপনাকে আর আপনার প্রতিটা কথাকে সম্মান করি, আম্মু। আমি খান সাহেবকে কল করব না। আপনি নিজেই তাকে জানিয়ে দিবেন।”
ফিরোজা সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তলো নিউ ফ্রেন্ড, তি মতা হবে।”
সুমু ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আচ্ছা, তুমি বসো। আমি রেডি হয়ে আসছি।”
সুমু আর কোনো কথা বাড়াল না। চোখের কোণ দিয়ে একবার ফোনের দিকে তাকাল, কিন্তু অনন্যা খাতুনের কথা ভেবে আর ব্যাপারটা বাড়াল না। অনন্যা খাতুনের বলা কথা যেন কানে বাজছিল সুমুর, “কাজের সময় ফোন করে বিরক্ত করবে না।”
চুপচাপ নিজের রুমে ঢুকে গেল সে। কাবার্ড খুলে কালো বোরকা বের করল। চোখে মুখে সাদামাটা মেকআপ, একদম পরিমিত। সাদা স্কার্ফটা পরতে পরতে আয়নার সামনে নিজেকে দেখল।
নিচে নামতেই ইশিতা এসে সামনে দাঁড়াল সুমুর। আলতো হেসে বলল,
“সাবধানে যেও, সুমু।”
প্রতিউত্তরে সুমুও আলতো হাসল। মৌ সেন ভ্রু কুঁচকে একবার দেখলেন, তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। অনন্যা খাতুন চোখ সরিয়ে হালকা গম্ভীর স্বরে বললেন,
“সাবধানে যেও। শেরাজ বেটাকে আমি বলে দিব।”
ফিরোজা দৌড়ে এসে সুমুর হাত ধরল।
“চলো নিউ ফ্রেন্ড। মজার অ্যাডভেঞ্চার।”
চৌধুরী ম্যানশনের দৃষ্টিনন্দন গেট পেরিয়ে গাড়ি যখন ভেতরে ঢুকল। সুমুর মন অদ্ভুত এক আশঙ্কায় ভরে উঠল। সে জানেনা কী অপেক্ষা করছে ওর জন্য এই বিশাল প্রাসাদসদৃশ বাড়িতে। খান সাহেবের সেই নির্ভরতার ছায়া আজ কতটা দরকার তা আরও তীব্রভাবে টের পেল সে।
চৌধুরী ম্যানশনের ভেতরে ঢুকে একটা প্রশান্তি ছড়ানো পরিবেশ পেল সে। ভেতরে ঘরগুলো সাজানো। মার্বেলের মেঝে, মখমলি পর্দা, আর ঝকঝকে ঝাড়বাতি ঝুলছে ছাদের মাঝখানে। কিন্তু সুমুর মনকে যেন এই সৌন্দর্যের কিছুই ছুঁতে পারছিল না। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
রুহি খাতুন স্নেহভরে ওর কাঁধে হাত রাখলেন,
“এসো মামনি, এখানে বসো। আমি তোমার জন্য ফল, মিষ্টি নিয়ে আসি।”
কথাটা বলেই সুমুকে নরম একটা সোফার দিকে ইশারা করলেন। সুমু ধীরে ধীরে গিয়ে সোফায় বসল। বোরকার ভেতর থেকেও যেন বোঝা যাচ্ছিল, ওর দৃষ্টি নিচু। মাথা একটু নুইয়ে, হাত দুটো মুঠোবদ্ধ কোরে কোলে রাখল। তা ভেতরে এক অজানা শঙ্কা আর অস্বস্তি জমে উঠছিল ক্রমশ।
রুহি খাতুন হেঁটে চলে গেলেন কিচেনের দিকে। পেছনে পড়ে রইল সুমু। একটা অপরিচিত, অপরিসীম বাড়ির মাঝখানে, যেখানে কেউ ওর খান সাহেবের মতো সজাগ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে নেই। ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো আওয়াজ নেই। ফিরোজা এসেই গার্ডেনে খেলছে।
সুমু সোফায় বসে অন্যমনস্ক হয়ে পায়ের আঙুল দিয়ে কার্পেটের উপর নকশা আঁকছিল। হঠাৎ যেন ভেতরটা আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল। নিজের অজান্তেই তার হাত ব্যাগের ভেতরে ঢুকে গেল। ফোনটা বের করে নিল সুমু। আঙুলটা কাঁপতে কাঁপতে ‘খান সাহেব’ নামের পাশে থাকা কল আইকনের ওপর চলে গেল।
“একবার কথা বলে নিই। একবার জানিয়ে দেই” ভাবল সে।
ফোনে চাপ দিতে যাবে ঠিক তখনই একটা ছায়া এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। সুমু চমকে তাকাল। মৌ সেন ঠোঁটে চাপা কঠিন হাসি নিয়ে নীচু গলায় বললেন,
“একা একা বসে আছো কেনো, সুমু?”
সুমু এক মুহূর্ত দোলাচলে পড়ে গেল। সে ফোনটা নামিয়ে নিল। মৌ সেন এগিয়ে এসে আরও একটু নরম অথচ দৃঢ় সুরে বললেন,
“শেরাজ বেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। তুমি এখন কল করলে, ওর কাজে বাঁধা পড়বে। আর তুমি তো আপনজনের কাছেই এসেছ, এত ভয় পাচ্ছ কেন?”
কথাগুলোর নরমভাবের আড়ালে একটা কাটা গলার তীক্ষ্ণতা লুকিয়ে ছিল। সুমু মাথা নিচু করে ফোনটা ব্যাগে রেখে দিল। কোনো কথা বলল না সে।
রুহি খাতুনের সাথে একজন সার্ভেন্ট এসে সেন্টার টেবিলের ওপর ফল, মিষ্টি, শরবত রেখে গেল। মৌ সেন তার পাশে বসে গ্লাস টেবিলের ওপর সাজানো ফলের প্লেট দেখিয়ে বললেন,
“খেয়ে নাও। এতো সংকোচ করবেনা। এখানে সবাই তোমার নিজের লোক।”
সুমু একটা ক্ষীণ হাসি দিয়ে মাথা ঝুঁকালো, কিন্তু তার হৃদয়ের গহীনে যেন খারাপ কিছু হবার ভয়।
রুহি খাতুন বললেন,
“ভাবিজি আপনারা কথা বলুন। আমি একটু গার্ডেনে যায়, মেয়েটা একা একা কী করছে দেখে আসি।”
রুহি খাতুন চলে গেলেন। মৌ সেন আলতো হেসে বললেন,
“খাও সুমু!”
সুমু ফলের প্লেটের দিকে তাকাল। ফলের টুকরোগুলো রঙিন আর টাটকা হলেও, সুমুর খেতে ইচ্ছা করল না। সে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“আমি খেতে চাই না, ধন্যবাদ।”
মৌ সেন খুব ভালো করেই ধরলেন সুমুর অস্বস্তি। ঠোঁটে অদৃশ্য এক কঠিন হাসি টেনে বললেন,
“ও কিছু খাবে না যখন, তখন আর জোর না করি। চলো, আমি বরং তোমাকে আমাদের বাড়িটা ঘুরে দেখাই।”
সুমু মৃদু গলায় বলল,
“আদনান মামু আর আফতাব মামু কই? তাদের তো দেখছিনা।”
মৌ সেন সুমুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তার হাসিতে এক ধরনের লুকানো অর্থ ছিল।
“আদনান তো অফিসে গেছে, সুমু। আর আফতাব তো এখন খুব বিজি। তার নতুন মুভি আসছে। সেখানে গেছে।”
সুমু আর কোনো কথা বাড়াল না। মৌ সেন সুমুকে প্রথমে একটি বিলাসবহুল রুমে নিয়ে গেল। রুমটি আরিয়ানের। রুমটির প্রতিটি অংশ যেন সাদা সান্নিধ্যে ঢাকা। রুমের মাঝখানে বিশাল আকারের একটি সাদা রঙের বেড, যার উপর রেশমি সাদা বিছানা আর কুইল্ট সাজানো। বেডের মাথার পাশে সোনালী রঙের উঁচু পিলার, আর সেগুলোর ওপরে ঝুলছে হালকা সোনালী আলো। রুমের কোণে কোণে বড় বড় শোপিস আর ডিজাইন করা ফুলের পট। এক কোণে বিশাল সিলভার কালারের ওয়ালমাউন্টেড আয়না। যেখানে সুমুর ছবি টানানো। ছবিগুলো সুমুর বিভিন্ন মুহূর্তের, কিছু হাস্যোজ্জ্বল, কিছু শান্ত। এই ছবিগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে। কেবল দেয়ালেই নয়, ছোট টেবিলের উপর, কাচের ফ্রেমে, এমনকি আয়নার কাছে, যেখানে সুমুর মিষ্টি মুখের ছবি। রুমের পুরো দেয়াল জুড়ে সুমুর বড় বড় ছবি, তার মিষ্টি হাসি আর শান্ত চোখে যেন এক ধরনের অদ্ভুত রহস্য ফুটে উঠল। ছবিগুলোতে সে বিভিন্ন পোশাকে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে। কখনো সাদা শাড়িতে, কখনো গোলাপী লেহেঙ্গায়, কখনো আবার আনারকলিতে। প্রতিটি ছবির মাঝে এক ধরনের গভীরতা, যেন তার জীবনের নানা দিকের প্রতিফলন। রুমের এক কোণে বিলাসবহুল একটি ছোট্ট বসার এলাকা। চারটি সুন্দর কুশন ও একটি কোণার সোফা। সোফার পাশে একটি সাদা মার্বেল টেবিল। যার উপর বেশ কয়েকটি বই, ছোট ক্যান্ডেল আর একটি সোনালী রঙের ভাস্কর্য সাজানো।
আরিয়ানের বেডরুমের মেঝেতে হালকা সাদা রঙের সিল্কের কার্পেট। টেবিলের পাশে বড় একটা আর্কটিক গ্লাস। বিশাল বড় এক ঝলমলে জার, যাতে সুমুর ছবির ফ্রেমগুলো সাজানো।
সুমু রুমে প্রবেশ করে সব দেখল। তার মন চঞ্চল হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছিল না কেনো তার ছবি এত জায়গায় ছড়িয়ে আছে।
“এইসব কি আর কেনো?” তার নিজের মনে বলল। তার মনের মধ্যে এখন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
“এ… এ তো আরিয়ান ভাইয়ার রুম?”
সে কিছুটা অবাক হয়ে বলল। তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক বিভ্রান্তি, “আপনি আমাকে এসব কেন দেখাচ্ছেন? এখানে আমার এতো ছবি কেনো? আরিয়ান ভাইয়া এইসব…”
মৌ সেন তার দিকে মৃদু হাসি দিয়ে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“সবকিছু জানাবে তো, সুমু। কিন্তু প্রথমে তোমাকে আরও একটা জিনিস দেখাতে চাই।”
মৌ সেন সুমুকে ধীরে ধীরে রোজার রুমে নিয়ে গেলেন। দরজা খুলতেই সুমু চোখে পড়ল এক অভিজ্ঞান বেডরুম। পুরো রুমটি অত্যন্ত বিলাসবহুল। প্রতিটি কোণায় আরামদায়ক মিষ্টি আলো আর শান্তি । উঁচু সিলিং, বড় বড় জানালা, আর পর্দার নরম রঙের সঙ্গে মেশানো সোনালী আলোর প্রতিফলন যেন সবকিছুকে এক অসীম শান্তির মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। বেডরুমের মাঝখানে বিশাল একটি সাদা রঙের কিং সাইজ বেড, যার উপর রেশমি বিছানা এবং ফুলেল বালিশ সাজানো। পাশে সুন্দর ছোট ছোট টেবিল, কসমেটিক্সের জন্য সাজানো এক ঝকঝকে আয়না, আর দেওয়ালে শোভিত আর্টের কাজ। তবে এই সৌন্দর্য সুমুর মনকে ছুঁতে পারল না। কারণ রোজার রুমের প্রতিটি দেয়াল জুড়ে শেরাজের ছবি। তার রুক্ষ মুখ, গম্ভীর চোখ, আর সেই অদ্ভুত মৃদু হাসি, যা সুমু একবার দেখলে ভোলার নয়।
রুমের এক কোণে বড় এক ফ্রেমে শেরাজের একটি ছবি। যেখানে তিনি একটি সাদা শার্টে, ভ্রু কুঁচকানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে যেন তার সামনে কিছু গুরুতর সমস্যা রয়েছে। ছবিগুলোর মধ্যে কিছু আরও ব্যক্তিত্ব ছিল।
“এসব…এসব কি?”
সুমু অবাক হয়ে মৌ সেনের দিকে তাকাল, তার কণ্ঠে কিছুটা ভিন্নতা। মৌ সেন একটু হাসলেন, তারপর মৃদু কণ্ঠে বললেন,
“এগুলো শেরাজ বেটার ছবি। তুমি কী কিছু বুঝতে পারছ, সুমু? এটা আমার মেয়ের জীবন। কিছু প্রশ্নের উত্তর তুমি পাবে, কিন্তু আগে আরও কিছু দেখো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে, রুমের বেলকনি থেকে সজোরে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আরিয়ান এবং রোজা। সুমু একে একে তাদের দু’জনকে দেখতে পেল। আরিয়ানের মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর অথচ আড়ম্বরপূর্ণ হাসি। রোজা সবার থেকে এক ধাপ এগিয়ে। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসল, যেন সবকিছুই স্বাভাবিক।
মৌ সেন সুমুর পাশে এসে দাঁড়ালেন। রুমের দরজা ধীরে ধীরে ভেতর থেকে লাগিয়ে দেওয়া হলো। সুমু একে একে সবার দিকে তাকাল। তার মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাসের মিশ্রণ তৈরি হতে লাগলো। সুমুর হৃদয়টা অস্থির হয়ে উঠল। তার চোখের কোণে ঘন কালো কুয়াশা জমছিল। সে দ্রুত এক পা পিছিয়ে গেল। কাঁপা গলায় বলল,
“আপনি… আপনারা আমার সাথে কী করতে চাইছেন? আমাকে এই বাড়িতে আনার উদ্দেশ্যে কী?”
আরিয়ান ধীরে ধীরে সুমুর একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এক অদ্ভুত নেশা যেন সবকিছু কনট্রোল করতে চাইছে। সে মৃদু, আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলল,
“বেবিগার্ল!”
সুমু শিহরিত হয়ে গেল। তার ভিতরটা মোচড় খেলো। সে নিজের অজান্তেই ঘৃণার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিল। এই শব্দটা যেন তার ভিতর একটা বিশাল অন্ধকার ছড়িয়ে দিল। বুকটা চাপা পড়ছিল, যেন সে এখন আর স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। তাড়াহুড়ো করে ফোন থেকে শেরাজকে কল করার জন্য চেষ্টা করল, কিন্তু ঠিক সেই সময় রোজা দ্রুত এসে তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল।
“এটা আপাতত অফ থাক।” রোজা ঠাণ্ডা স্বরে বলে, ফোনটা সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিল।
সুমুর চোখে আতঙ্ক আর বিস্ময় মেশানো। সে জানে, এখন আর কোনো উপায় নেই। পুরো রুমে এক ধরনের চাপানো, অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। সুমু চেষ্টা করছিল কণ্ঠ চেপে রাখতে, কিন্তু তার মন আর শরীর দুটোই কাঁপছে।
আরিয়ান তার চোখে এক ধরনের বিজয়ী হাসি নিয়ে বলল,
“আজ কোথায় পালাবে, বেবিগার্ল? এইটা আমার খাঁচা। আর আজ কিছুক্ষণের জন্য হলেও তুমি আমার খাঁচায় বন্দি।”
মৌ সেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার চেহারায় কোনো বিশেষ অনুভূতি ছিল না, যেন সে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে দেখছিল।
সুমু আতঙ্কিত হয়ে দরজার দিকে তাকাল। তার শরীর কাঁপছে। চোখে ভয় আর হতাশা মিশ্রিত। সে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“আপনারা এমন কেনো করছেন? আমাকে বাড়ি যেতে দিন। আমার ফোনটা দিন। রুমের দরজা খুলুন। আমি চলে যাব।”
মৌ সেন ঠাণ্ডা চোখে সুমুর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এসে বললেন,
“ওয়েট, যাবে তো? এই দেখো, সুমু…”
তিনি রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে গভীর এক নিঃশ্বাস নিয়ে মিষ্টি, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“আমার দুই ছেলে-মেয়ে। দুটোই চাঁদের টুকরা। ছোট থেকে যা চেয়েছে, আমি সব দিয়েছি। আমার প্রথম সন্তান, আমার ছেলে আরিয়ান। ও তোমাকে চায়। আর আমার দ্বিতীয় সন্তান রোজা। শেরাজ বেটাকে চায়।”
থামলেন মৌ সেন। তিনি আবারও কথা বলতে শুরু করলেন,
“তুমি শেরাজকে ছেড়ে দাও, সুমু। আমার ছেলেকে বিয়ে করে নাও। আমি জানি না, আমার ছেলে আর শেরাজ তোমার মধ্যে কি দেখেছে। কিন্তু কাল রাতে যখন ওরা দুই ভাইবোন আমার কাছে এসে, একজন তোমাকে আর একজন শেরাজকে চাইল, আমি একবারও ওদের প্রশ্ন করিনি। তারা চেয়েছে, মা হিসেবে আমি দেব।”
মৌ সেন এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরলেন। তার চোখে এক গভীর দৃঢ়তা যেন তিনি জানতেন, এই মুহূর্তে সুমুকে কীভাবে প্রলুব্ধ করবেন।
“আমি তোমাকে বলছি সুমু, তুমি শেরাজকে ছেড়ে দিলে, আমার মেয়েটা শেরাজকে পাবে। আর আমার ছেলেটা তোমাকে পাবে। আমাদের কোন কমতি নেই, সুমু। তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে সব কিছু দিতে পারি।”
সুমু একে একে মৌ সেনের কথা শুনছিল, তার মন বিষণ্নতায় ভরে গেল। এই কথাগুলো যেন তার আত্মাকে এক পলকেই চুরমার করে দিচ্ছিল। সে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলছিল। আচমকাই সে দৃঢ় হয়ে উঠল। তার ভয় মুছে গিয়ে চোয়াল শক্ত হলো। সে মৌ সেনের হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল। চোখে তার আগুনের মতো সাহস। সে কাঁপা, কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি কোনো পণ্য নই, যে চাইলে কিনে নেওয়া যায়। খান সাহেব আমার স্বামী। তাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আপনারা যতই চেষ্টা করুন, আমি আমার ভালোবাসাকে কখনো ছেড়ে দেব না।”
তার কথা শুনে রোজার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। সে এগিয়ে এসে সুমুর হাত চেপে ধরল, রূঢ়ভাবে ঝাঁকিয়ে বলল,
“তুই কে, হ্যাঁ? আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবি? দেখিস, আজ তোর অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দেব।”
সুমু যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। রোজার জোরে চেঁপে ধরেছে তার হাত। ঠিক সেই সময়, অপ্রত্যাশিতভাবে, আরিয়ান এগিয়ে এসে রোজার হাত সজোরে সরিয়ে দিল। তার চোখে বিদ্রূপ ও রাগের ঝলক। গম্ভীর গলায় বলল,
“রোজা, তুই সীমা ছাড়াচ্ছিস। হাত তুলবিনা ওর গায়ে। আঘাত করবি না ওর শরীরে।”
রোজা হতভম্ব হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ান সুমুর দিকে ফিরল, তার গলার সুর অনেকটা নরম হয়ে এলো।
“আমি কাউকে তোমার গায়ে হাত দিতে দেব না, বেবিগার্ল।”
সুমু এক পা পেছনে সরে গেল। তার চোখ ভরা ঘৃণা আর অসম্ভব একটা আতঙ্কে। সে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে মৌ সেনকে বলল,
“আপনার যদি সত্যিই কোনো সম্মান থাকে, তাহলে আমাকে জোর করে আটকে রাখতেন না। দয়া করে আমাকে যেতে দিন। আমি এখান থেকে যেতে চাই। যদি সামান্য মানবিকতা বেঁচে থাকে আপনাদের মধ্যে, তাহলে আমাকে যেতে দিন। আর আজ আমাকে যা যা বললেন সেসব আমার খান সাহেবের সামনে গিয়ে বলুন।”
মৌ সেন তেড়ে আসতে গেলে আরিয়ান আটকাল। চোখের ইশারায় রোজা আর মৌ সেনকে বেরিয়ে যেতে বলল সে। মৌ সেন প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় পড়লেন, তারপর চাপা ভঙ্গিতে রোজার হাত ধরে বললেন,
“চলো রোজা!”
রোজা অসন্তুষ্ট মুখ করে, বিরক্তিতে ঠোঁট কামড়ে সুমুর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাল। মৌ সেন তার হাত ধরতেই সে মায়ের সাথে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সুমু বেরিয়ে যেতে নিলে আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করে দিল যেন বুঝিয়ে দিল, এই রুম এখন তার তৈরি করা একখানা বন্দি দুনিয়া।
সুমু হতভম্ব হয়ে দরজার দিকে তাকাল। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আরিয়ান ফিরে এসে সুমুর দিকে এক পা এক পা করে এগোতে লাগল। তার চোখে এখন আর রাগের ঝলক নেই, বরং গভীর কোনো আবেগের ছায়া। নরম অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“আমি কাউকে তোমার গায়ে হাত তুলতে দেব না, বেবিগার্ল। আর আজ… আজ তুমি শুধু আমার। তুমি পালানোর চেষ্টা করলেও লাভ হবে না। আজ তুমি আমার খাঁচায় বন্দি। শুধু তুমি আর আমি।”
সুমু আতঙ্কে কয়েক কদম পেছাতে লাগল। তার কণ্ঠ কাঁপছে, সে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না ঠিকমতো। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,
“দয়া করে আমাকে যেতে দিন।”
আরিয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখেমুখে স্পষ্ট লালসার ছাপ। ঠোঁটের কোণে এক ভয়ংকর বিজয়ী হাসি। সে এক ঝটকায় সুমুর দিকে হাত বাড়াল।
সুমু আঁতকে উঠে পাশ কাটিয়ে গেল। ভয়ে আতঙ্কে তার শরীর ঘামছিল। হৃদপিণ্ড যেন ছুটছিল অদম্য গতিতে।
আরিয়ান মজা পেয়ে হালকা হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দ রুমের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারি করে তুলল।
সুমু দৌড়ে রুমের এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। পায়ের কাঁটা স্থান দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো তার। আরিয়ান আবার এগিয়ে এলো। সুমু হাতের কাছে যা পাচ্ছিল, তাই তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারতে লাগল। প্রথমে একটা টেবিল ল্যাম্প ছুঁড়ে মারল। ল্যাম্প মাটিতে পড়েই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আরিয়ান হেসে উঠল যেন পুরো দৃশ্যটা তার জন্য এক অদ্ভুত খেলায় পরিণত হয়েছে।
সুমু এবার টেবিলের ওপরের বইগুলো ছুঁড়ে মারল। তারপর ছোট্ট একটা ফুলদানি। কাচের টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
আরিয়ান একটু সরে দাঁড়াল। তবে তার মুখের সেই মজা পাওয়া হাসি মুছে গেল না একবারও। সে ধীরে ধীরে বলে উঠল,
“উফ! আমার বেবিগার্ল তো অনেক ফাইটার, হ্যাঁ? প্রবলেম নেই; বেবিগার্ল। আগে তুমি করো ফাইট। তারপর আমি করব। তবে এইভাবে না, অন্যভাবে।”
সুমু তখন একেবারে কোণে গুটিয়ে গেল। তার গলা কাঁপছে, চোখে পানি টলমল করছে। সে দু’হাত জোড় করে কেঁপে কেঁপে বলল,
“দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমার সম্মান নষ্ট করবেন না। দয়া করে আমাকে বাঁচতে দিন।”
তার কণ্ঠের করুণ আর্তি সারা রুমের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। সুমুর মুখে করুণ ভিক্ষার সেই আর্তি শুনে কিছু মুহূর্তের জন্য আরিয়ানের চোখের দৃষ্টিও পাল্টে গেল। কিন্তু তার ঠোঁটে তখনও এক অদ্ভুত, গভীর রহস্যময় হাসি খেলা করছিল। তার সামনে তখন দাঁড়িয়ে ছিল এক ভীত, অসহায়, কাঁপতে থাকা সুমু। যার চোখে ছিল শুধুই নিজের সম্মান রক্ষার প্রার্থনা।
সুমু দু’হাত জোড় করে আরও করুণভাবে অনুনয় করল। তার কণ্ঠে কাঁপুনি, চোখে আতঙ্কের ঘন ছায়া। আরিয়ান আরও এগিয়ে আসতেই , ভয়ে সুমুর শরীর আরও কুঁকড়ে গেল। তার বুকের ভেতর তীব্র চাপ অনুভব হলো। মনে হলো যেন তার শ্বাস আটকে আসছে। সে হঠাৎ একহাতে বুক চেপে ধরল। তার হাঁপানির মতো অবস্থা হলো। কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। শুধু তীব্রভাবে নিঃশ্বাস নেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যত চেষ্টা করছে, মনে হচ্ছিল বায়ু পৌঁছাচ্ছে না। তার শরীর আরও বেশি কাঁপছে, মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেয়েছে। সে এখন প্যানিক অ্যাটাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তার ভেতর থেকে অস্ফুট একটা শব্দ বের হলো,
“খান সাহেব, আমাকে বাঁচান।”
তার ফিসফিস করা কণ্ঠ যেন বাতাসে মিশে হারিয়ে যাচ্ছে। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল সে। কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়ল। তার চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে। সে নিজের বুক চেপে ধরে হাঁপাচ্ছিল, দম নিতে পারছিল না। সে যেকোনো মুহূর্তে জ্ঞান হারাবে।
আরিয়ান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার মুখের সেই বিদ্রূপাত্মক হাসি একটুখানি ম্লান হলো।
কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে আবার রহস্যময় ছায়া ফুটে উঠল।
সারা রুম তখন নিঃশব্দ। শুধু সুমুর ছটফটানো নিঃশ্বাসের টুকরো টুকরো শব্দ ভাসছে। সুমুর এ অবস্থা দেখে আরিয়ান কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে গেল। সে দ্রুত দরজা খুলে দিলো। কিন্তু সুমু উঠে দাঁড়াতে পারল না। অনেক কষ্টে নিজেকে টেনে দাঁড় করালো। ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। কিন্তু করিডরে এসেই হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আরিয়ান আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। দ্রুত রোজাকে ফোন করল সে। খবর পেয়ে রোজা, রুহি খাতুনসহ সকলে গার্ডেন থেকে দৌড়ে বাড়ির ভেতর চলে এলো।
রুহি খাতুন সুমুর নিথর শরীর কোলে তুলে নিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। এক সার্ভেন্টকে দ্রুত পানি আনতে বললেন। সার্ভেন্ট দৌড়ে গিয়ে পানি এনে দিলো। রুহি খাতুন সেই পানি সুমুর মুখে ছিটালেন, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। সুমু তখনও নিথর, জ্ঞানশূন্য। ছোট্ট ফিরোজা ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
“নিউ ফ্রেন্ড… চোখ থুলো… প্লিজ।”
মৌ সেন আরিয়ানকে একপাশে টেনে নিয়ে রীতিমতো ধমক দিলেন,
“কী করেছো তুমি ওর সাথে? সুস্থ ছিল ও। এমন হলো কীভাবে?”
আরিয়ান মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
“বিলিভ মি, মম। আই ডিডন্ট ইভেন টাচ হার। আই জাস্ট ওয়ান্টেড টু স্কেয়ার হার আ লিটল। বাট আই ডিডন্ট নো বাংলাদেশি গার্লস আর সো ডেসপারেট অ্যাবাউট দেয়ার অনার। শি প্যানিকড ওভার দ্য ফিয়ার অফ লুজিং ইট অ্যান্ড ফেইন্টেড।” (আমাকে বিশ্বাস করো, মম। আমি ওকে ছুঁয়েও দেখিনি। শুধু একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু,আমি জানতাম না, বাংলাদেশের মেয়েরা নিজের সম্মান নিয়ে এতটা, এতটা ডেস্পারেট হয়। সম্ভবত সম্মান হারানোর ভয়ে প্যানিক অ্যাটাক হয়ে জ্ঞান হারিয়েছে।)
মৌ সেন কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“শাট আপা! শোনো তুমি এইসবের কিছুই জানোনা। তুমি শুধু জানো, তুমি সুমুকে অজ্ঞান অবস্থায় করিডরে পরে থাকতে দেখেছ।”
“ওকে মম!”
“গুড!”
মৌ সেন এগিয়ে গেলেন সুমুর কাছে। সুমুর পাশে বসে বললেন,
“ও আমাকে বলল ওয়াশরুমে যাবে। আমি ওকে রোজার রুমে দিয়ে এলাম। কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যে এত অসুস্থ কীভাবে হয়ে গেল।”
রুহি খাতুন শেরাজকে কল করল, কিন্তু শেরাজের ফোন বন্ধ পেল। রোজা পকেট থেকে সুমুর ফোনটা বের করল। স্ক্রিনের ওপর পনেরো মিনিট আগে শেরাজের করা সতেরোটি মিসকল ভেসে উঠল। রোজা ফোনটা নিয়ে নিজের রুমে ঢুকল। রুমের অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকালো রোজা। মেঝের ওপর সুমুর পরে থাকা ব্যাগের মধ্যে ফোনটা রেখে দিয়ে বেরিয়ে এলো সে।
রুহি খাতুন শেরাজকে ফোনে না পেয়ে অনন্যা খাতুনের ফোনে কল করল। অনন্যা খাতুন কল রিসিভ করতেই সবটা খুলে বলল রুহি খাতুন। অনন্যা বেগম আঁতকে উঠে বললেন,
খান সাহেব পর্ব ৪২
“মেয়েটা সুস্থ অবস্থায় আপনাদের বাসায় গেল। এখন বলছেন এমন অবস্থা। ওকে হসপিটালে নিন। আমরা আসছি। ওই মেয়ে আমার ছেলের জীবন। ওর কিছু হলে শেরাজ আস্ত রাখবেনা কাউকে। ছেলে আমার কিছুক্ষণ আগে আমাকে কল করে বলছে সুমু কোথায়, ও ফোন কেনো তুলছেনা। আমি ওকে বললাম সুমু গার্ডেনে ফিরোজার সাথে। আর ওর ফোন রুমে। ইশিতাকেও আমি কিছুই বলতে দেয়নি। বউয়ের পা কেঁটেছে। সে অবস্থায় বাহিরে বের হয়েছে বলে, একটু রাগ দেখিয়ে আমাকে বলল ওর খেয়াল রাখতে। শেরাজ এখন মিটিং করছে। ওর মিটিং শেষ হবার আগে সুমুকে সুস্থ করে তুলতে হবে।”
কথাগুলো বলে কল কাটলেন অনন্যা খাতুন। তিনি ইশিতাকে বাড়িতে থাকতে বলে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন।
