খান সাহেব পর্ব ৪৩ (২)
সুমাইয়া জাহান
এস.কে লাক্স-এর কনফারেন্স রুম। সেখানে উপস্থিত শেরাজ খান (সিইও), স্যান্ডি (ক্রিয়েটিভ হেড), সারবাজ (স্ট্র্যাটেজি হেড), আরবাজ (অপারেশন্স হেড), এবং বিদেশি ক্লায়েন্ট, মি. লোগান, মিস ইউমি, মি. রড্রিগেজ।
শেরাজ খান স্থির অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“গুড মর্নিং এভরিওয়ান। থ্যাঙ্ক ইউ ফর জয়নিং আস টুডে। লেটস টক অ্যাবাউট হোয়াট ট্রুলি ড্রাইভস এসকে লাক্স—সামথিং উই প্রাউডলি কল দ্য সোল অফ এস.কে।” (সুপ্রভাত সবাইকে। আজকের জন্য ধন্যবাদ। চলুন আমরা কথা বলি আমাদের ব্র্যান্ডের আসল চালিকা শক্তি নিয়ে। যাকে আমরা বলি দ্য সোল অফ এস.কে।)
মি. লোগান মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“লুকিং ফরওয়ার্ড টু ইট, মিস্টার খান।” (এই বিষয়ে শুনতে আগ্রহী, মি. খান।)
স্যান্ডি হেসে বলল,
“দ্য সোল অফ এস.কে ইজন্ট জাস্ট ফ্যাশন। ইট’স আইডেন্টিটি, কালচার, অ্যান্ড কনফিডেন্স স্টিচড ইনটু এভরি ডিজাইন। হোয়েদার ইট’স এসকে লাক্স অর এস.কে কোর, আওয়ার মেসেজ রিমেইনস বোল্ড ইয়েট পার্সোনাল।” (দ্য সোল অফ এস.কে শুধু ফ্যাশন না। এটা পরিচয়, সংস্কৃতি, আত্মবিশ্বাস। যা প্রতিটি ডিজাইনের সঙ্গে জড়িত। সেটা এস.কে লাক্স হোক বা এস.কে কোর আমাদের বার্তা সবসময় ব্যক্তিত্বপূর্ণ এবং সাহসী।)
মিস ইউমি বললেন,
“ওয়াট মেকস ইয়োর কালেকশনস স্ট্যান্ড আউট গ্লোবালি?” (আপনাদের কালেকশনগুলোকে কী জিনিস বিশ্বজুড়ে আলাদা করে তোলে?)
সারবাজ একটু ঝুঁকে বলল,
“বিকজ ইট’স নট জাস্ট অ্যাবাউট ট্রেন্ডস।
উই ক্রিয়েট ইমোশন। ইচ পিস ক্যারিজ আ স্টোরি, এসপেশালি ইনস্পায়ার্ড বাই দ্য এলিগ্যান্স অব দ্য ইস্ট অ্যান্ড মিনিম্যালিজম অব দ্য ওয়েস্ট।” (কারণ এটা শুধু ট্রেন্ড নিয়ে নয়। আমরা অনুভূতি তৈরি করি। প্রতিটি পোশাকের আছে একটা গল্প — পূর্বের শালীনতা আর পশ্চিমের সরল সৌন্দর্য থেকে অনুপ্রাণিত।)
মি. রড্রিগেজ বললেন,
“অ্যান্ড দা সাস-টে-ইন-আ-বি-লি-টি অ্যাঙ্গল?” (আর স্থায়িত্বের দিকটা?)
আরবাজ বলল,
“উই ইউজ এথিক্যালি সোর্সড মেটেরিয়ালস অ্যান্ড ইনশিউর এভরি স্টেপ ফ্রম স্কেচ টু শেলফ ইজ এনভায়রনমেন্টালি রেসপনসিবল। দ্যাট ইজ আওয়ার লং-টার্ম প্রমিস।” (আমরা নৈতিকভাবে সংগ্রহ করা উপকরণ ব্যবহার করি এবং স্কেচ থেকে শেলফ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পরিবেশবান্ধবভাবে সম্পন্ন করি। এটিই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।)
শেরাজ খান গম্ভীরভাবে বলল,
“এসকে ইজ নট জাস্ট আ ব্র্যান্ড। ইট’স আ মুভমেন্ট। ইট’স হোয়্যার হেরিটেজ মিটস ইনোভেশন। অ্যান্ড দ্য সোল অব এসকে? ইট’স ট্রুথ। র’। রিফাইন্ড। রিয়াল।” (এস.কে কেবল একটা ব্র্যান্ড না। এটা একটা আন্দোলন। এটা যেখানে ঐতিহ্য আর নতুনত্ব একসাথে হাঁটে। আর দ্য সোল অফ এস.কে মানে? এটা সত্য। খাঁটি। পরিশীলিত। বাস্তব।)
ক্লায়েন্টরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকালেন। মি. লোগান আবারও বললেন,
“মাস্ট সে, দিস ইজ মোর দ্যান উই এক্স-পেক-টেড। ইউভ বিল্ট নট জাস্ট আ ফ্যাশন হাউস, বাট আ ফি-লো-সফি।” (আমি বলতেই পারি, এটা আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। আপনি শুধু একটা ফ্যাশন হাউসই গড়ে তোলেননি, একটা দর্শন তৈরি করেছেন।)
শেরাজ হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
““উই ডোন্ট ফলো ফ্যাশন। উই লিড উইথ সোল।” (আমরা ফ্যাশন অনুসরণ করি না। আমরা আত্মা দিয়ে নেতৃত্ব দিই।)
ঘড়িতে তখন দুপুর বারোটা পঁচিশ। শেরাজের চোখে এখনো মিটিংয়ের উত্তেজনার ছাপ। বিশাল ডিলটা ফাইনাল হয়েছে। ক্লায়েন্ট হাত মিলিয়ে বাহবা দিয়েছে। সহকর্মীরা উল্লাসিত। রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই একগাদা হাসিরেখা আর হাত এগিয়ে এলো তার দিকে। কিন্তু তার মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীরতা।
আরবাজ দরজা ঠেলে বেরিয়ে এসে পকেট থেকে ফোন বের করে অন করল। স্ক্রিনে একগাদা ইশিতার মিসড কল ভেসে উঠল। ঠোঁটটা হালকা শুকিয়ে গেল আরবাজের। বাসা থেকে এতোগুলো কল দেখে আরবাজ কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেল। সে কল ব্যাক করতেই দু’বার রিং হতেই কল রিসিভ করল ইশিতা।
“হ্যালো, ইশিতা!”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো কান্না ভেজা গলা,
“আপনি কোথায় ছিলেন? ফোন কেনো বন্ধ ছিল? আর ভাইয়া.. ভাইয়া কোথায়?”
আরবাজের কপালের মাঝখানে ভাঁজ পড়ল।
“কাঁদছো কেনো? আমরা মিটিংয়ে ছিলাম, তাই ফোন বন্ধ ছিল। কি হয়েছে বলো?”
“সুমু হসপিটালে!”
“হোয়াট? কি বলছো তুমি? হসপিটালে মানে?”
ইশিতা কান্নাভেজা গলায় সবটা খুলে বলল আরবাজকে। আরবাজ সবটা শুনে ধীর হাতে কলটা কেটে দিল। উদাস মনে হেঁটে শেরাজের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“ব্রো!”
শেরাজ সকলের সাথে হেসে কথা বলছিল। আরবাজের ডাক শুনে পেছন ঘুরে তাকাল সে। আরবাজের মুখের অবস্থা দেখে শেরাজ ভ্রু কুঁচকালো। আরবাজ আমতা আমতা করে বলল,
“ভাবিজি… ভাবিজি হসপিটালে ভর্তি।”
শেরাজ থমকে গেল। হৃদয়ের মধ্যে যেন কোনো কিছু ছিঁড়ে গেল মুহূর্তে। এতক্ষণ ঠোঁটে লেগে থাকা হাসিটা মুহুর্তেই গায়েব হয়ে গেল। সে আরবাজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কী সব বলছিস তুই? সুমু হসপিটালে ভর্তি কেনো হবে? ও তো বাড়িতে।”
“ভাবিজি বাড়িতে ছিল না। চৌধুরী ম্যানশনে ছিল। সেখান থেকে ওনার প্যানিক অ্যাটাক হয়। অ্যাস্টার রয়্যাল আল রাফা হসপিটাল, ঘুবরা-তে ভর্তি করানো হয়েছে ভাবিজিকে।”
শেরাজের পা আর একটুও না থেমে থাকল না। সে সোজা অফিস থেকে বেরিয়ে গেল।
গাড়ির গতি যেন রাস্তাকে ছিঁড়ে ছুটছে। শেরাজের মনে শুধু একটাই মুখ, তার সুমু। সে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছে। চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। গাড়ির ব্রেকে হঠাৎ করেই কষে ধরে শেরাজ। চোখে নেমে আসে অন্ধকার। হসপিটালের গেটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে এক মুহূর্তও দেরি না করে ছুটে যায় ভিতরে। রিসেপশন ডেস্কে দাঁড়ানো নার্স কেবল চোখ তুলে তাকাতেই শেরাজ গর্জে ওঠে,
“সুমাইয়া জাহান, কোন রুমে উনি?”
নার্স ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জবাব দেয়,
“স্যার, দ্বিতীয় তলায়। পেশেন্টকে ভিআইপি কেবিন নেওয়া হয়েছে। কেবিন নাম্বার ২০৩।”
শেরাজ ছুটে গিয়ে ওঠে সিঁড়ি বেয়ে। লিফটের জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই তার। বুকের মধ্যে যেন কিছুর চাপা নিঃশ্বাস আটকে আছে।
কেবিনের দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় সে। ভিতর থেকে ভেসে আসছে নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে মনিটরের টুঁট টুঁট শব্দ। দরজায় হাত রেখে একটু কাঁপে তার আঙুল। প্রেয়সীর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে সে। বাইরে তখন এক গুচ্ছ পরিচিত মুখ তাকিয়ে আছে অশান্ত শেরাজের দিকে। অনন্যা খাতুন, রোজা, রুহি খাতুন, ফিরোজা, মৌ সেন, সাহাবাজ খান, শেহেজাদ খান সবার চোখেই দুশ্চিন্তার ছাপ।
অনন্যা খাতুন একটু এগিয়ে এসে বললেন,
“শেরাজ বেটা, আমি…”
তার কথার মাঝখানেই শেরাজ এক হাত তুলে থামিয়ে দিল। চোখ দুটো লাল, মুখে তীব্র চাপা রাগ। শান্ত অথচ কাঁপা কণ্ঠে সে বলল,
“আগে আমি আমার ওয়াইফকে দেখব, তারপর বাকিটা শুনব। তবে সবটা শুনব ওর মুখ থেকে। অন্য কারো না।”
তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা, এমন এক চেনা আগুন। যেটা থামিয়ে দিল চারপাশের সকল শব্দকে। অনন্যা খাতুন থমকে গেলেন। রোজার ঠোঁট কাঁপছে। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সাহাবাজ খান এক চুল এগিয়ে এসে থেমে গেলেন। মৌ সেন ফোন বের করে আরিয়ানকে টেক্সট করে বলল, “এই মুহুর্তেই কোরিয়ার উদ্দেশ্যে ওমান ছাড়াতে।”
শেরাজ কারও মুখের দিকে না তাকিয়ে আস্তে করে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। তার পায়ের শব্দ যেন হাসপাতালের করিডরে অনুরন করে তুলল। সুমু কেবিনের বেডে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। অক্সিজেন মাস্কে ঢাকা মুখ, চোখ বন্ধ, ত্বক নিস্তেজ। শেরাজের গলা শুকিয়ে এলো। বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠল। তার পা যেন শক্ত হয়ে গেল। চোখের সামনে সুমুর এত অসহায়ভাবে শুয়ে থাকায়, তার সমস্ত পৃথিবী মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো, আর গলা শুকিয়ে এলো। তার হৃদয়ে যে চাপ, তা যেন আরও বেড়ে গেল। এক মুহূর্তে তার মাথায় হাজারো চিন্তা আসতে থাকে, কিন্তু কিছুই যেন ঠিকভাবে ভাবতে পারছেনা। কেবিনের ভেতর থাকা নার্সটি এগিয়ে এসে বলল,
“একি, আপনি এইভাবে ভেতরে চলে এলেন কেনো? এখন কারো ভেতরে আসার পারমিশন নেই। যান বাহিরে, যান।”
শেরাজ ঘাড় কাত করে নার্সটির দিকে তাকাতেই নার্সটির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠল। নার্সটি আমতা আমতা করে ‘সরি’ বলে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
শেরাজ ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বসে পড়ল সুমুর পাশে। সুমুর একটা হাত ধরে নিজের কপালে ঠেকাল। কাঁপা গলায় বলল,
“সুইটহার্ট! আমি এসে গেছি। শুনতে পারছ? আমি থাকতে কিছুই হবে না তোমার।”
তার কণ্ঠ ভারি হয়ে এসেছে। চোখের কোণে জল জমে ওঠেছে, কিন্তু সে কান্না চেপে রাখল। এমন সময় ডাক্তার সোজা সুমুর কেবিনে এসে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মিস্টার খান, ইয়োর ওয়াইফ হ্যাড এ প্যানিক অ্যাটাক। ইট ওয়াজ কজ্ড বাই সেভিয়ার স্ট্রেস, বাট দেয়ার’স নো নিড টু ওরি। শি’জ স্টেবল নাউ। দ্য অক্সিজেন হেল্প্ড উইথ হার ব্রিদিং, অ্যান্ড শি’জ রিকভারিং ওয়েল। ইট্স ইম্পর্ট্যান্ট শি রেস্ট্স অ্যান্ড অ্যাভয়েড্স এনি স্ট্রেস ফর দ্য নেক্সট ফিউ ডেইজ, বাট হার ফিজিক্যাল কন্ডিশন ইজ ইমপ্রুভিং। আই’ভ গিভেন এ স্লিপিং ইনজেকশন। নাউ, শি ইজ স্লিপিং।” (মিস্টার খান, আপনার স্ত্রী প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন। এটি প্রচণ্ড মানসিক চাপের কারণে হয়েছিল, তবে চিন্তার কিছু নেই। এখন উনি স্থিতিশীল। অক্সিজেনের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিক হয়ে এসেছে, এবং উনি ভালো আছেন। কিন্তু বিশ্রাম প্রয়োজন, এবং পরবর্তী কিছু দিন মানসিক চাপ এড়িয়ে চললে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। তবে শারীরিক অবস্থা এখন ভালো। আমি ঘুমের ইনজেকশন দিয়েছি। এখন উনি ঘুমাচ্ছে।)
শেরাজ ডাক্তারের কথা শুনে মাথা নেড়ে, সুমুর দিকে তাকাল। সে মুহূর্তের জন্য কিছু বলতে পারল না, শুধু হাতের মুঠো শক্ত করে ধরল।
ডাক্তার আবারও বললেন,
“দিস কাইন্ড অফ ইনসিডেন্ট ইজ টেম্পরারি। উইথ সাম রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্সেশন, শি’ল রিকভার কুইকলি। বাট ইউ মাস্ট ইনশিওর দ্যাট শি ডাজ়ন’t ফেস এনি ইমোশনাল স্ট্রেইন ডিউরিং দিস পিরিয়ড।” (এটা সাময়িক ঘটনা। বিশ্রাম এবং শিথিলতার মাধ্যমে উনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। তবে, আপনাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, উনি যেন মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকে এই সময়টাতে।)
শেরাজের চোখে চিন্তার ছাপ। সে ধীরে ধীরে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ, ডাক্টর। আই উইল স্টে বাই হার সাইড। আই ওয়োন’t লিভ হার এলোন।” (ধন্যবাদ, ডাক্তার। আমি ওর পাশে থাকব। ওকে একা ছেড়ে যাব না।)
ডাক্তার বের হয়ে গেলেন। শেরাজ সুমুর হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“সুইটহার্ট, ইউ’আর গোইং টু বি ফাইন। আই’ম রাইট হিয়ার উইথ ইউ, অলওয়েজ।” (সুইটহার্ট, তুমি ঠিক হয়ে যাবে। আমি এখানেই আছি, সবসময় তোমার সঙ্গে।)
শেরাজ সুমুর হাতে ঠোঁট ছুঁয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে কোথাও একটা টেক্সট করল। ফোনটা আবারও পকেটে রেখে সুমুর হাত ধরে সুমুর দিকে অপলক তাকিয়ে রইল সে।
কেটে গেলো একটা ঘন্টা। হাসপাতালের কেবিনের দরজার বাইরে সবাই অপেক্ষায়। কিন্তু কেবিনের ভেতর থেকে শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলে দিয়েছে, “ভেতরে কেউ আসতে পারবেনা। সে তার ওয়াইফের কেবিন কাউকে এলাউ করবেনা।”
শেরাজ এখনো সেই চেয়ারে বসে, যেটা সুমুর বেডের একদম পাশে। ডান হাতে সুমুর হাত ধরা, বাম হাতে সুমুর মাথায় কোমলভাবে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। তার রুক্ষ, খাঁজ কাটা মুখের প্রতিটা রেখায় ক্লান্তি আর চোখে ভয়। ভেতরে ভেতরে একটা অস্থিরতাও আছে।
হঠাৎ সুমুর শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। মুখটা কুঁচকে গেল, ঠোঁট কেঁপে উঠল। ঘুমের মধ্যেই সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“দূরে থাকুন। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। খান সাহেব আমাকে বাঁচান।”
শেরাজ সাথে সাথেই উঠে দাঁড়িয়ে তার গাল ছুঁয়ে বলল,
“সুইটহার্ট, শান্ত হও। আমি আছি। আমি তোমার কাছেই আছি।”
ঠিক তখনই, সুমু আচমকা জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে বসল।
“খান সাহেব!”
সে হাঁপাচ্ছে, চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে আছে, শরীর কাঁপছে। শেরাজ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের ভেতর টেনে নিল।
“শান্ত হও। আমি আছি তোমার কাছে। কিছু হয়নি তোমার। শান্ত হও তুমি।”
কিন্তু সুমু কিছুই শুনছে না। সে কাঁপছে, পাগলের মতো আচরণ করছে। সে কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“ও আমাকে ছুঁতে চেয়েছিল। আমার খুব ভয় করছে। ও… ও আমাকে বাঁচতে দেবেনা। ওরা, ওরা আমাদের আলাদা করে দিতে চায়।”
শেরাজ সুমুকে আর শক্ত নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলল,
“তুমি আমার। কেউ তোমাকে ছুঁতে পারবেনা, কারণ তুমি আমার। শুধু আমার। কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবেনা।”
সুমু শেরাজের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। সে নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে শেরাজের শার্টটা খামচে ধরল।
“আপনার বুক ছাড়া আর কোনো জায়গা নিরাপদ না আমার জন্য। আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না, খান সাহেব।”
শেরাজ চুপচাপ গভীর শ্বাস ফেলল। সে সুমুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল যেন তার শরীর দিয়েই ঢাল তৈরি করে দেয় সুমুর চারপাশে। সে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার গায়ে একটা আঁচড়ও আমি আসতে দিব না।”
সুমু তখনো কাঁপছে। কিন্তু তার হাত ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। শেরাজের বুকের মধ্যে সে আরাম খুঁজে নিল। সেখানে সে সুরক্ষিত। শেরাজ সুমুর ভেজা চোখে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“এবার ঘুমাও, সুইটহার্ট। তোমার শরীরটা ভালো না। ইউ নিড রেস্ট।”
সুমু মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠ এখনো কাঁপছে।
“আমি ঘুমাতে পারব না, খান সাহেব। চোখ বন্ধ করলেই সেই সব দৃশ্য আবার ফিরে আসে।”
শেরাজ চুপ হয়ে গেল। সুমু হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“আমি আপনাকে না জানিয়ে ও বাড়িতে যেতে চাইনি, খান সাহেব।”
শেরাজ চুপ করে রইল। সুমু ধীরে ধীরে কান্নাভেজা গলায় সবটা খুলে বলে তাকে। শেরাজ সুমুর কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখে রাগের আগুন যেন আগেই অনন্ত অন্ধকারে জ্বালানো হয়েছিল। তার শরীরের প্রতিটি কোষ যেন রাগের আগুনে পুড়ছে। সুমু থেমে গেল। শেরাজ ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল যেন তার মধ্যে এক তীব্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে সামলে নিচ্ছে। তার হাত মুঠো হয়ে গেল, এবং হাতের আঙুলগুলো যেন শক্ত হয়ে উঠল। সে সুমুর সামনে কিছুই প্রকাশ করতে চায় না। তাই গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলালো।
“আই এম সরি, সুইটহার্ট। আমার জন্য আজ তোমার এই অবস্থা।”
“আপনার কোনো দোষ নেই। আমার উচিত হয়নি আপনাকে না জানিয়ে বাসা থেকে বের হওয়া।”
শেরাজের হৃদয়ে ভয়ঙ্কর জ্বালা ছড়িয়ে পড়েছে। সে জানে, সে যদি এখানেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, তবে সব কিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাই এখন সুমুর পাশে শান্ত থাকার প্রতিজ্ঞা করল। সে নিজের আগুনকে নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখল। কিন্তু এই শান্ত থাকার মধ্যে এক অজানা লড়াই চলছে।
সে সুমুকে অনেক বুঝিয়ে আবারও ঘুম পাড়াল। সুমু শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়ল। শেরাজ সুমুর পাশে বসে রইল কিছুক্ষণ, তার মুখের দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ উঠে দাঁড়াল শেরাজ। বিস্মৃত মনে, কেবিনের থেকে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলো। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা অনন্যা খাতুনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে আগুনের ঝলক, অথচ মুখে কোনও রাগ নেই। সে সোজা অনন্যা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি বলেছিলে, সুমু গার্ডেনে ফিরোজার সাথে। তাহলে সুমু চৌধুরী ম্যানশনে কীভাবে পৌঁছাল, মম?”
অনন্যা খাতুন ছেলের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি আমতা আমতা করে বললেন,
“বেটা… আসলে…”
একহাত উঁচু করে অনন্যা খাতুনকে থামিয়ে দিল সে। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
“আমাকে মিথ্যা কেনো বললে, মম?”
অনন্যা খাতুন এক পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু কোনও কথা বলল না। তার চোখে ধরা পড়ছে কিছুটা ভয়। শেরাজের চোখের আগুন দেখে সে বুঝতে পারল, আজ তার ছেলেকে সামলানো তার পক্ষে সম্ভব না।
সাহাবাজ সাহেব ছেলেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। উপস্থিত সকলেই বুঝতে পারছে এই মুহুর্তে এখানে একটা ছোটখাটো ঝড় বয়ে যাবে। আফতাব চৌধুরী আর আদনান চৌধুরী এসেছিলেন হসপিটালে। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তারা বাড়িতে ফিরে গেছেন। রোজা, মৌ সেন, আফিয়া খাতুন আর ফিরোজাও বাড়িতে চলে গেছে। আইয়ুবরা সকলে শেরাজকে বোঝাল। শেরাজ অনন্যা খাতুনকে আবারও বলল,
“কাল ভোর ছয়টায় তোমার বড় ভাই, বড় ভাইয়ের বউ আর তাদের গুনধর মেয়েকে খান ম্যানশনে হাজির হতে বলবে। এইটা হসপিটাল, আর ভেতরে আমার ওয়াইফ অসুস্থ। তাই আমি আপাতত চুপ রইলাম।”
কথাগুলো একদমে বলে শেরাজ আবারও কেবিনে ঢুকে গেল। অনন্যা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার পেছন পেছন সাহাবাজ সাহেব আর আফিয়া খাতুনও ছুটল। শেহেজাদ সাহেব, সারবাজ আর আরবাজকে বলে বেরিয়ে এলেন হসপিটাল থেকে। আইয়ুবরা সকলে কেবিনের বাহিরে দাঁড়িয়ে রইল।
শাহরুখ উপর থেকে নিচে নেমে এলো। দু’হাতে কপাল ধরে বলল,
“কাকিমনি, আমাকে এককাপ ব্ল্যাক কফি করে দিবে, প্লিজ। মাথাটা প্রচণ্ড ধরেছে।”
হাসি বেগম রান্নাঘর থেকে কফি করে এনে শাহরুখের হাতে দিয়ে বললেন,
“আশিক কবে ফিরবে বাড়িতে? ছেলেটা বড্ড অবাধ্য হয়ে গেছে। পড়াশোনা ঠিকমতো করবেনা। শুধু বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো।”
“চলে আসবে, কাকিমনি। গেছে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে। ওর বয়সটাই এখন এমন।”
হাসি বেগম কিচেনে যেতে যেতে বললেন,
“তুই আর সজিবও তো ওর বয়সে ছিলি। কই তোরা তো এমন ছিলিনা।”
শাহরুখ কফির কাপের চুমুক দিয়ে সোফার ওপর বসল। ওপর থেকে সামিয়া আর নাজমিন এসে শাহরুখের পাশে বসল। নাজমিন টিভি অন করল। শাহরুখ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সন্ধ্যা হতেই টিভি নিয়ে বসলি। পড়াশোনা নেই তোদের? যা গিয়ে পড়তে বস।”
শাহরুখের ধমক খেয়ে দু’বোন উঠে দাঁড়াল। ওপরে চলে যেতে নিলেই শাহরুখ পিঁছু ডাকল দুজনকে। সামিয়া আর নাজমিন আবারও এসে শাহরুখের সামনে দাঁড়াল। শাহরুখ আবারও কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
“ফারু কই রে? আজ সারাদিন দেখলাম না।”
সামিয়া মৃদুস্বরে বলল,
“জানিনা! আপুর কি জানি একটা হয়েছে। বিকালে গিয়েছিলাম ফুফিমনিদের বাড়িতে। ফারিয়া আপু তো আমাদের সাথে ঠিকমতো কথায় বলল না।”
শাহরুখ ভ্রু কুঁচকালো। কফির কাপটা সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল। সামিয়া আর নাজমিনকে আবারও রামধমক দিয়ে বলল,
“এখনো দাঁড়িয়ে আছিস এখানে? যা গিয়ে পড়তে বস।”
শাহরুখ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সামিয়া আর নাজমিন আহাম্মকে মতো তাকিয়ে রইল শাহরুখের যাবার দিকে।
বাইক এসে থামল ফারিয়াদের বাড়ির সামনে। সুমি বেগম পিয়াস এসেছে ভেবে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন।
আরে শাহরুখ বাবা? হঠাৎ? আমি ভাবলাম পিয়াস এসেছে।
শাহরুখ চোখে জিজ্ঞাসু ভাব নিয়ে বলল,
“ফুফুমনি! ফারু কোথায়?”
“ওতো নিজের রুমেই আছে। তুই ডিরেক্ট ওর রুমে চলে যা। আর মাঝে মাঝে আসিস আমাদের বাড়িতে। তোরা তো আসিসই না।”
শাহরুখ হালকা মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। ফারিয়ার রুমের সামনে এসে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে ফারিয়া বলল,
“উফ আম্মু! বললাম তো ভালো লাগছেনা। যাও তো।”
শাহরুখ ঢুকে এলো রুমে। ফারিয়া উঁপুর হয়ে শুয়ে আছে। শাহরুখ গিয়ে ফারিয়ার পাশে বসতেই ফারিয়া উঠে বসে বলল,
“কি আম্মু…”
চোখ বড় হয়ে গেল ফারিয়ার। মৃদুস্বরে বলল,
“ভাইয়া তুমি?”
“হ্যাঁ আমি! কি হয়েছে তোর? ঠিক আছিস তুই?”
ফারিয়া চোখ নামিয়ে নিল।
“হ্যাঁ! আমি ঠিক আছি ভাইয়া।”
শাহরুখ গলা নরম করে বলল,
“তুই আমাকে মিথ্যা বলতে শিখলি কবে থেকে? তোর ওই চুপ হয়ে যাওয়াটা, চোখ নামিয়ে কথা বলা, সব বুঝি আমি। কী হয়েছে বল? এখনই।”
ফারিয়ার চোখ ভিজে উঠল। সে কিছু না বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। শাহরুখ নির্বাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,
“ফারু! যদি কেউ কিছু বলে থাকে বা কিছু হয়ে থাকে, আমাকে বল।”
ফারিয়া বলতে চাইল না। শাহরুখ অনেক জোর করার পর কলেজের সব ঘটনা খুলে বলে সে। হঠাৎ সবকিছু নিঃশব্দ এক মুহূর্ত। শাহরুখ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। ফারিয়া মাথা নিচু করে বিছানায় বসে।
ফারিয়া কাঁপা গলায় বলল,
“তুমি জোর না করলে আমি বলতাম না ভাইয়া। কিন্তু আমি আর পেরে উঠছি না। ওই ছেলেটাকে অনেকবার বারণ করেছি আমি।”
“পিয়াস ভাইয়া বা তোর নেতা বাবাকে বলিসনি কেনো?”
“ভাইয়া বা বাবা জানতে পারলে অনেক বড় ঝামেলা হবে।”
শাহরুখ চোখ নরম, কণ্ঠ কঠিন করে বলল,
“ছেলেটা কে, ফারিয়া?”
ফারিয়া ধীরে ধীরে বলল,
“কলেজের একটা ছেলে।”
“কতদিন ধরে বিরক্ত করছে?”
“প্রায় অনেকদিন।”
শাহরুখ চোখে জ্বলন্ত আগুন, কিন্তু গলার স্বর ঠাণ্ডা করে বলল,
“তুই এসব এতদিন লুকিয়ে রাখলি কেন?”
“আমি ভেবেছিলাম নিজেই সবটা সামলে নিতে পারব।”
“কাল আমি কলেজ যাব। নিজে দেখে আসব কে সেই ছেলে। কাল রেডি থাকিস। আমি নিতে আসব।”
ফারিয়া দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। সে কাঁপা গলায় বলল,
“না ভাইয়া, তুমি এসব ঝামেলায় জড়াবে না, প্লিজ।”
শাহরুখ আর দাঁড়াল না। পেছনে ফারিয়াকে রেখে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
ঘড়িতে সময় রাত নয়টা। গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির গেটে পৌঁছাল। শেরাজ সুমুকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করল। সুমু এখনো দুর্বল, তবে শেরাজ সুমুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। গাড়ি থেকে নামার পর শেরাজ সুমুকে কোলে তুলে ঘর ভিতরে নিয়ে এলো। তার চোখে অস্থিরতা, মুখে এক ধরনের নির্দিষ্ট শীতলতা। সুমু কাঁপা কাঁপা হাতে শেরাজের শার্ট আঁকড়ে ধরে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে নিল, যেন তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত ভীতি আর ক্লান্তি বেরিয়ে যায়। শেরাজ সুমুকে বেডে শুইয়ে দিয়ে নিজে ফ্রেশ হয়ে নিল। ফ্রেশ হয়ে এসে সে সুমুর পাশে এসে বসল। সুমুর প্রতি তার পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করে রাখল। হঠাৎই দরজায় টোকা পড়ল।
আফিয়া খাতুন মিষ্টি কণ্ঠে বললেন,
“সুমু মামনি, আমি তোমার জন্য কিছু হেলদি খাবার এনেছি। রাত অনেক হয়েছে। তোমাকে এগুলো খেয়ে মেডিসিন খেতে হবে।”
আফিয়া খাতুন হাতে একটি বড় ট্রে নিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। যার মধ্যে রয়েছে তাজা ফল, সবজির স্যুপ, এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার। ইশিতাও আফিয়া খাতুনের সাথে এসে দাঁড়াল। তার হাতে আরও কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার।
ইশিতা স্নেহভরা কন্ঠে বলল,
“এগুলো তুমি খেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে, সুমু। আমরা চাই তুমি দ্রুত উঠে দাঁড়াও।”
সুমু চোখে কিছুটা ক্লান্তি নিয়ে খাবারগুলোর দিকে তাকাল। কিন্তু তার মুখে খাবার জন্য কোন আগ্রহ নেই। সে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
“না, আমি এখন কিছু খেতে চাইনা। আমি ভালো আছি।”
শেরাজ সুমুর পাশ থেকে উঠে দাঁড়া। তার চোখে চিন্তা, কিন্তু একই সাথে দৃঢ়তা।
“তুমি খাবে, সুইটহার্ট। তোমার শরীরের জন্য এইসব দরকার। খাব না বললে তো চলবেনা। তোমার সুস্থতা আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
সুমু শেরাজের ইচ্ছার বাহিরে কিছু বলতে পারল না। শেরাজ আফিয়া খাতুনের হাত থেকে খাবারের ট্রে নিয়ে বলল,
“তোমরা এখন গিয়ে রেস্ট নাও। আমি আছি ওর কাছে।”
আফিয়া বেগম আলতো হেসে বললেন,
“তুমি মামনিকে খাইয়ে দাও। বাড়িতে আজ কারোই মন মেজাজ ভালো নেই। সকলে একটু পরে এসে মামনিকে দেখে যাবে।”
কথাগুলো বলে আফিয়া খাতুন আর ইশিতা বেরিয়ে গেল। শেরাজ সুমুকে খাবার খাওয়ানো শুরু করল। তার চোখে এক ধরনের কঠোর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। সুমু ধীরে ধীরে খেতে শুরু করে। সে অনুভব করল, তার খান সাহেব তার জন্য কতটা যত্নশীল।
শেরাজ সুমুকে খাওয়ানোর মধ্যে নিজেও হালকা খেয়েছে। কারন সুমুর জেদ, সে তার খান সাহেব না খেলে, নিজেও খাবেনা। খাওয়ানো শেষ হতেই অনন্যা খাতুন বাদে বাড়ির সকলে এসে সুমুকে দেখে গেছে।
হঠাৎই দরজা আবারও খুলে গেল। একে একে শেরাজের বন্ধুরা রুমে প্রবেশ করল। আইয়ুব হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“সরি ডিস্টার্ব করলাম। এখন কেমন আছেন, ভাবিজি?
সুমু আলতো হেসে আইয়ুবের কথার উত্তর দিয়ে সবাইকে বসতে বলল। শেরাজ শক্ত গলায় বলল,
“এখন বসতে হবেনা। তোমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। ওরা অন্য একদিন বসবে।”
শেরাজের বারণ শুনে আইয়ুবরা সকলে যে যেখানে পারে বসে পড়ল। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল সকলের দিকে। সুমু আইয়ুবদের কাণ্ড দেখে আলতো হাসল।
এমন সময়, রাহিনের ফোনে ভিডিও কল করল সামিয়া আর নাজমিন। দুজনেই সুমুকে দেখার জন্য আকুল হয়ে আছে। রাহিন কল রিসিভ করে সুমুর হাতে দিল। সামিয়া কান্নাভেজা গলায় বলল,
“কেমন আছো, আপু? শুনলাম তোমার শরীর ভালো না।”
পাশ থেকে নাজমিন বলল,
“হ্যাঁ, আপু। আমরা খুব চিন্তায় পড়ে গেয়েছিলাম। সকলে চিন্তা করবে ভেবে বাসার কাউকে জানায়নি। তুমি নিজের খেয়াল রেখো।”
সুমু ঠোঁটে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে নাজমিন আর সামিয়ার সাথে কথা বলাতে মন দিল। এই সুযোগে শেরাজকে আইয়ুবরা টেনে রুমের বাহিরে নিয়ে গেল। তারা সবাই উদ্বিগ্ন, চোখে চিন্তার ছাপ, যেন কিছু একটা বাজে ঘটবে কিন্তু কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।
আইয়ুব চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
“তুই তো কিছুই বলছিস না, এস.কে। আমাদের ভয় লাগছে। তোর মাথায় কী ভয়ংকর খেলা চলছে বল তো?”
নিহাল মৃদু সুরে বলল,
“ভাই, তোর এই শান্ত থাকা ব্যাপারটা আমাদের জন্য বড় রকমের চিন্তার বিষয়। তুই তো অগ্নির মতো। এটা কীভাবে সহ্য করছিস?”
সাইফ বলল,
“তোর মতো উত্তপ্ত মানুষের কাছ থেকে এমন শান্ত থাকা আমরা কীভাবে মেনে নেব? আমরা কেউ জানিনা তুই করতে চাইছিস। কিন্তু এত শান্ত থাকার মধ্যে কিছু তো লুকানো আছে?”
শেরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে সকলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হালকা করে স্নিগ্ধভাবে হাসল। কিন্তু তার চোখের গভীরে এক ধরনের নিঃশব্দ আগুন জ্বলছে। সে শান্তভাবে বলল,
“তোরা কী মনে করিস? এই মুহুর্তে আমার কী করা উচিত? সুমুর অবস্থা দেখেছিস? এখন আমি অশান্ত হলে ওর ওপর বাজে ইফেক্ট পড়বে।”
অমিত কিছুটা ভেবে বলল,
“আমরা জানি, এস.কে। কিন্তু তোর মতো একজন মানুষের মাথায় যে কী ভয়ংকর কৌশল চলছে, সেটা আমাদের জন্য একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তুই যে ছেড়ে দেওয়ার মতো মানুষ না।”
ফাহিম এগিয়ে এসে বলল,
“তুই নিজেকে এইভাবে শান্ত রেখে, আমাদের ভাবনা বাড়াস না। আমরা তো বুঝতে পারছি না, তোর মধ্যে কী চলছে। প্লিজ বল এস.কে।”
রাহিন বলল,
“সুমুর এই অবস্থা আমার সহ্য হচ্ছেনা। যে মেয়েটা কাউকে ভয় পায়না। সে আজ ভয়ে পাগলের মতো ব্যবহার করছে।”
রিয়াদ মাথা নেড়ে বলল,
“তোকে চিনি আমরা এস.কে। তোর মতো মানুষ চুপ থাকা মানে ভেতরে আগুন জ্বলছে।”
সারবাজ অসহায় কন্ঠে বলল,
“এইখানে বসে আছি ঘন্টা খানেক। একটা শব্দও করলি না। আমরা কী তোর আপন না?”
সাইফ আফসোসের সুরে বলল,
“শুধু তাকিয়ে আছিস। তোর চোখ কেমন ভয়ংকর লাগছে রে ভাই।”
রিসান কপাল কুঁচকে বলল,
“তুই তো আগুন। এখন এত ঠাণ্ডা কেন রে? কী ঘটাতে যাচ্ছিস, প্লিজ বল।”
আরবাজ বলল,
“যা করবে, ভেবে করবে ব্রো। ভুলে যেওনা, এখন তোমার জন্য আরেকটা মানুষ বেঁচে থাকে।”
সারবাজ বলল,
“ভয় পাচ্ছি রে ভাই। তোকে চুপ দেখলে মনে হয় তুই একটা কিছু এমন করবি, যা কেউ ভাবতেও পারবে না।”
রিয়াদ মাথা নেড়ে বলল,
“তোর মাথায় কী চলছে জানি না। কিন্তু এইভাবে থাকলে আমরা পাগল হয়ে যাব। কিছু একটা বল।”
ফাহিম শান্ত কণ্ঠে বলল,
“তুই চুপ থাকলে আমরা তোর ভেতরেটা বুঝতে পারি। কিন্তু ভাই, তুই একা কিছু করিস না। বল, আমাদেরকেও পাশে দাঁড়াতে দে।”
সবার কথা শুনে একদৃষ্টিতে সবাইকে দেখল শেরাজ। চোখে চাপা অগ্নি। মুখে একটুও শব্দ নেই। একটুখানি গলায় টান পড়ল, যেন কিছু একটা চেপে যাচ্ছে। সে চুপচাপ আবারও রুমের দিকে ফিরে গেল।
ঘড়িতে সময় রাত দুটো। সুমুর ভয়ে প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। শেরাজ একের পর এক জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছে। মেডিসিন জলপট্টি দুটোই হার মেনেছে সুমুর শরীরের জ্বরের কাছে। জ্বর কমার কোনো নাম নেই। জ্বরের ঘোরে শুধু এইটাই কথা বলে যাচ্ছে সুমু।
“আমাকে যেতে দিন। দয়া করে আমার সম্মান নষ্ট করবেন না।”
শেরাজ সুমুকে বেড থেকে তুলে নিজের উন্মুক্ত বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে। ঘুম নেই তার চোখে। প্রেয়সীর এমন করুণ অবস্থা তাকে নাজেহাল করে তুলেছে। সে আর কোনো উপায় না পেয়ে সুমুকে কোলে করে উঠে দাঁড়াল। সুমু নিভু নিভু চোখে একবার তাকাল তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ সুমুকে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। নিঃশব্দে ঝর্নার পানি ছেড়ে দিল। ঠাণ্ডা পানি যেন একমাত্র উপায় সুমুকে জ্বর থেকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার। সুমুর পরনে শেরাজের ব্ল্যাক টি- শার্ট। ফর্সা শরীরের সাথে ভিজে লেগে গেলে টি-শার্ট। ফর্সা ত্বকের উপর ভিজে থাকা কাপড়ের রেখাগুলো যেন শেহেরাজের সহ্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছিল। সুমু অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে, সেই সাথে কাঁপছে তার ওষ্ঠ জোড়া। শুধু ঠাণ্ডায় নয়, ভেতরের দুর্বলতা, জ্বর আর পরিচিত এক অনুভূতির স্রোতে। প্রচন্ড শীতে শেরাজের খালি পিঠ আঁকড়ে ধরল সে। তার নখ অস্পষ্টভাবে বসে গেল শেরাজের পিঠে। ঝর্নার ঠাণ্ডা পানি টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়ছে দুজনের শরীরে। ওয়াশরুমের সেই নীরব কোণ যেন সাক্ষী হয়ে উঠেছে এক নিঃশব্দ অনুভূতির।
ভিজে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে দুই মানুষ। একজন জ্বরাক্রান্ত ভালোবাসায়, আরেকজন সেই ভালোবাসার অতল স্রোতে ভেসে যাওয়া পাহাড়।
সুমুর ফর্সা, গোল মুখ, কোমর ছাড়ানো রেশমি চুলের আড়ালে যেন এক অপরূপ সৌন্দর্যের রূপকথা। গলায়, কানে, হাতে, আঙুলের হীরের অলংকারগুলো যেন খুব সূক্ষ্মভাবে ঝিকিমিকি করছে জলকণায়। সুমু চোখ বন্ধ করে মাথা হালকা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার সামনেই। ফর্সা, ঘন ভেজা চুল চোখে ওপর পড়ে আছে। তীক্ষ্ণ নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। তার জিম করা শরীরের প্রতিটি রেখায় টান, কিন্তু চোখে রয়েছে এক ধরণের গভীরতা, যেন প্রেম আর দহনে একসঙ্গে জ্বলছে সে। সুমু আরও বেশামাল হয়ে উঠল। শীত থেকে বাঁচার জন্য শেরাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সেই মুহূর্তে শেরাজের চোখ লাল হয়ে উঠল। আবেগ, তীব্র ভালোবাসা, আকর্ষণ, আর ভয় মিশে এক অনিয়ন্ত্রিত ঝড় বয়ে গেল তার ভেতর। তবুও সে নিজেকে ধরে রাখল। কারণ, সুমু অসুস্থ। আর সুমুকে সুস্থ করাই এখন তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শেরাজ একটুও নড়ল না। সে কেবল চোখ দিয়ে আঁকছে সুমুকে। তার ভালোবাসা, তার দুর্বলতা, তার সমস্তটা আঁকছে সে। মুহূর্তটা যেন স্থির। সময় থেমে আছে তাদের জন্য।
সুমুর শরীর একটু ঠাণ্ডা হতেই, জলধারা বন্ধ করে ধীরে ধীরে সুমুকে কোলে করে বের করে আনলো শেরাজ। সোফার ওপর বসিয়ে মাথার চুল যত্ন করে মুছে দিল সে। কাবার্ড খুলে নিজের একটা সাদা শার্ট বের করল। সুমুকে চেঞ্জ করিয়ে দিয়ে বেডের কাছে নিয়ে গেল। বেডে শুইয়ে দিয়ে ব্লাঙ্কেট দিয়ে সুমুর পুরো শরীর যত্ন করে ঢেকে দিয়ে কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল।
ভোর পাঁচটা। নিভু নিভু আলোয় আফতাব চৌধুরীদের গাড়ি এসে থামল খান ম্যানশনের সামনে। চারপাশ নিস্তব্ধ। রাতের ঠাণ্ডা এখনও বাতাসে জমে আছে।
গাড়ি থেকে নেমে আফতাব চৌধুরী, মৌ সেন আর রোজা সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজায় হাত রেখেই চমকে উঠলেন সবাই। দরজা খোলা। খান ম্যানশনের দরজা এত সকালে খোলা থাকা ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। মৌ সেন একটু অবাক হয়ে আফতাব চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এই সময় দরজা খোলা? কিছুই বুঝতে পারছি না।”
সন্দেহ মিশ্রিত পদক্ষেপে দরজায় হাত দিলেন আফতাব চৌধুরী। দরজা ধাক্কা দিতেই মৃদু কড়কড় শব্দে খুলে গেল। শেরাজদের বাড়ির ড্রয়িংরুম সাধারণত স্নিগ্ধ আলোয় শান্ত থাকে। কিন্তু আজ এক অদ্ভুত ভয়াবহতায় আলোকিত।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাজকীয় সিংহাসনে বসে আছে শেরাজ খান। চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটা নেই। চোখ জোড়া জ্বলছে অদ্ভুত কঠোরতায়। এক হাতে রেড বুলের ক্যান ধরা, অন্য হাতের আঙুলে হালকা ঘোরাফেরা করছে রাবার ব্যান্ড। পরনে সাদা শার্ট, চোখে আগুন। তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুই বডিগার্ড, আর ঠিক পেছনে স্যান্ডি। ডান পায়ের ওপর বাম পা তুলে রাখা তার। সামনে রাখা এক রহস্যময় বড় কাঠের বাক্স। বাক্সটির ওপরে গেঁথে রাখা শত শত ধারালো ছুরি। প্রতিটিই চকচক।
মৌ সেন ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলেন।
“শেরাজ বেটা! এইসব কী?”
মৌ সেনের কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। রোজা অস্বস্তিতে এদিক ওদিক তাকাল। তারা দু’জনেই এক পা এক পা করে ঘরের ভেতর পা রাখল। আফতাব চৌধুরী পেছনে পেছনে এলেন।
তিনি কথা শেষ করার আগেই, এক অদ্ভুত শব্দে থমকে গেল সবাই। চুপচাপ ঘরটায় একটা ছিটকে পড়া তরলের শব্দ যেন কিছু একটা টপটপ করে পড়ে চলেছে। কাঠের বাক্সের ওপর কিছু তরল পড়ার আওয়াজ। নিঃশব্দ ঘরে সেই আওয়াজ যেন বোমার মতো প্রতিধ্বনিত হলো। সবাই একসাথে তাকাল ছাদের দিকে। হঠাৎ ভেসে আসে মৌ সেন আর রোজার আতঙ্কিত আর্তনাদ।
“আরি…আরিয়ান বেটা!”
ঝাড়বাতির নিচে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে আরিয়ান চৌধুরীকে। শরীরটা উঁপুর করে ঝুলছে। পিঠ বেয়ে রক্ত ঝরছে টুপটাপ করে নিচে কাঠের বক্সটার ওপর। ছুরিগুলোর ফাঁকে ফাঁকে রক্ত জমে উঠেছে। আরিয়ানের বরাবর কাঠের সেই ছুরি গেঁথে রাখা বড় বক্সটি রাখা। ওপর থেকে আরিয়ানকে ছেড়ে দিলে বক্সের ওপর পড়ে আরিয়ানের শরীরের প্রতিটি স্তর ছুরির আঘাতে ঝাঝরা হয়ে যাবে।
মৌ সেন ছুটে এসে আরিয়ানের ঝুলন্ত দেহের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন।
“আমার ছেলে আরিয়ান। না, এটা হতে পারে না। আফতাব! কিছু করো।”
রোজা পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে ছুটে গিয়ে কাঠের বক্সটাকে ঠেলে সরাতে চাইল।
“ওকে নামাও এস.কে! ব্রো, আমার ব্রো।”
আফতাব চৌধুরী স্তব্ধ। তার কপালের রেখায় আতঙ্ক গেঁথে গেছে। বাড়ির সকলে ছুঁটে এলো ড্রয়িংরুমে। ড্রয়িংরুমের দৃশ্য দেখে সকলে আতঁকে উঠল। এ কান্না ও ভেঙে পড়া পরিবেশে হঠাৎ করেই শেরাজ দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল। চোখে বিদ্ধকারী রাগের ঝলক।
“চুপ করুন!”
তার গলার স্বর এতটা কঠিন যে রোজার হেঁচকি থেমে গেল। মৌ সেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। শেরাজ সামনে এসে রোজার দিকে তাকাল, ঠাণ্ডা অথচ হিংস্র গলায় বলল,
“আমার পাগলিটা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। প্রচণ্ড জ্বর আর ভয়ে ছটফট করেছে। মাত্র তিনটা ঘন্টা হলো ও ঘুমিয়েছে। তাও ঘুমের মেডিসিন খেয়ে। এইখানে উপস্থিত কারো ন্যাকামির জন্য যদি ওর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তাহলে গড সুয়ার, এই নিভু নিভু বডিটা, পিওর ডেড বডিতে পরিনত করতে আমি এক সেকেন্ড ও ভাবব না।”
মৌ সেন কান্নাভেজা গলায় বললেন,
“আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও, শেরাজ।”
শেরাজ চোখ সরাল না, ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“সুমুও মনে হয় এইভাবে বলেছিল কাল। আমি এখন সেই শেরাজ, যে সব সম্পর্কে বাহিরে গিয়ে বিচার করে। ভালোবাসা যখন কাউকে রক্ষা করতে পারে না, তখন ন্যায় নিজে রক্তে হাত রাঙায়। আর আমি এখন তাই।”
ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশে। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন অনন্যা খাতুন। মুখে উদ্বেগ, কিন্তু চোখে শাসনের জোর। তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে বললেন,
“শেরাজ বেটা! আরিয়ানকে ছেড়ে দে। কী করেছে ও? কেনো এমন করছিস? তুই কী পাগল হয়ে গেছিস?”
শেরাজ চোখ সরাল না। তার মুখের একপাশে হালকা ব্যঙ্গের রেখা।
“ও কি করেছে সেটা ওর মা আর বোনকে জিঙ্গাসা করো, মম।”
অনন্যা খাতুন ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিচু গলায় বললেন,
“ও যাই করুক। তুই বিচার করার কেউ না। তুই আদালত না শেরাজ।”
শেরাজ হাসল। ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“আদালত সময় নেয়, মম। আমার বউয়ের চোখের জল সময় নেয় না। ওর গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল তোমার আদরে আরিয়ান।”
অনন্যা খাতুন একটু থমকে গেলেন। কণ্ঠে মমতা আর শক্তির মিশ্রণ করে বললেন,
“আরিয়ান যদি এমন কিছু করেও থাকে, তাহলে তুই অন্যভাবে ওর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা কর। কিন্তু এইভাবে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজের হাত রক্তাক্ত করিস না। তুই যদি নিজেকেই হারাস, তাহলে সুমুকে কে রক্ষা করবে?”
শেরাজের থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। ঠোঁট আঁটসাঁট করে, চোখ সরিয়ে নিল সে।
“আমি কখনও নিজেকে হারাবো না, মম। আমি সেই পুরুষ, যে স্ত্রীকে চোখের সামনে রেখে অন্যের বুক থেকে রক্ত ঝরায়।”
“তুই কী সব বলছিস শেরাজ? একটাবার তাকিয়ে দেখ ছেলেটার কী অবস্থা করেছিস। অমানুষের মতো মেরেছিস ছেলেটাকে। সামনে ছেলেটার নিউ ড্রামা ছিল। এইসব কেনো করলি তুই শেরাজ?”
সাহাবাজ সাহেব অনন্যা খাতুনকে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন,
“তুমি শুনতে পারছ না? খান বাড়ির বউয়ের সম্মানের দিকে হাত বাড়িয়ে ছিল তোমার বড় ভাইয়ের ছেলে। ও যে এখনো জীবিত আছে, এইটাই ওর ভাগ্য।”
শেহেজাদ সাহেব এগিয়ে এসে বললেন,
“সত্যি ভাবিজি! এরপরেও আপনি আরিয়ানের পক্ষে কথা বলবেন? নিজের ছেলের, ছেলের বউয়ের কথা একবারও ভাববেন না? মানলাম আপনি সুমুকে মেনে নেননি, কিন্তু তবুও সুমু এই বাড়ির বউ। ওর সাথে এ বাড়ির সম্মান জড়িয়ে আছে। আর কিছু না ভাবেন। অন্ততপক্ষে এ বাড়ির সম্মানের কথা ভাবুন।”
অনন্যা খাতুন গর্জে উঠে বললেন,
“সম্মানের কথা ভাবতে গিয়ে একটা মানুষকে মেরে ফেলতে হবে? এইটা কেমন বিচার ওর? ও কি সৃষ্টিকর্তা যে, বিচার করছে? বিচার করার মালিক ওই ওপরে যে বসে আছে, তার। আপনার ভাইপোর না।”
শেরাজ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। চারপাশ নিস্তব্ধ। তার চোখ দুটো রক্তিম আঁধারের মতো জ্বলছে। সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“এই দুনিয়ায় অনেক ভুল মাফ হয়। কিন্তু সুমুর কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করলে আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলব না।”
শেরাজের গলা আরও নিচু হলো। সে ভয়ানক ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“ওর একটা চুলেরও ক্ষতি করার চেষ্টা করলে। আমি সৃষ্টিকর্তা হতে পারব না, কিন্তু শয়তান হয়ে উঠতে সময় লাগবে না। গডের শাস্তি দেরিতে আসে। আর আমারটা এক সেকেন্ডেই এসে যায়।”
সে একবার রক্তে ভেজা ছুরির বাক্সের দিকে তাকাল।
“এই কাঠে আজ ওর রক্ত ঝরে পড়ছে। ও যদি আর কোনোদিন আমার বউয়ের ছায়ার দিকেও কেউ তাকায়। এই ছুরি গুলো আর গুণতে হবে না। সবগুলো আমি ওর শরীরে গেঁথে দিব।”
সে থামল। তাকাল মৌ সেন আর রোজার দিকে।
“বাঁচতে চাইলে সুমুর নাম মনে থেকে মুছে ফেলুন। আর যদি আমার কথাগুলো ভুলে যান। তাহলে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমি এখনো বেঁচে আছি।”
শেরাজ বক্সের ওপর গেঁথে রাখা একটা ছুরিতে আঙুল ছোঁয়াল।
“যে হাত আমার সুমুকে স্পর্শ করতে চাইবে, সে হাত আমি ছুরি দিয়ে কাটব না। সে হাত গাছ থেকে ছিঁড়ে নেওয়া ফলের মতো উপড়ে ফেলব। তারপর সেটা তারই গলায় গুঁজে দেব, যেন পৃথিবীর কোনো ডাক্তারও তাকে বাঁচাতে না পারে।
সে এক পা করে এগিয়ে এলো রোজার দিকে।
“আর তুই… রোজা তুই কী ভাবিস? আমি কিছু করব না, কারণ তুই আমার আত্মীয়? আত্মার চেয়ে বড় সম্পর্ক আমার বউ। ওর চোখে এক বিন্দু জল দেখলেও আমি এমন ভয় সৃষ্টি করব, তখন তোর নিজের ছায়াকে দেখলেও তোর ভয় লাগবে।”
সে এবার ঠাণ্ডা চোখে মৌ সেনকে দেখল।
“এই দুনিয়ায় কারো সাহস হবে না আমার বউয়ের দিকে হাত বাড়ানোর। কারণ আমি শুধু মানুষ মেরে ফেলি না। তাদের অস্তিত্বকেও মুছে দিই। এমনভাবে, যেন তারা কোনদিন ছিলই না।”
মৌ সেন ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“তুমি আর কী করতে চাইছ?”
শেরাজ বাঁকা হেসে তার বডিগার্ডকে ইশারা করলো। তারা সাথে সাথে আরিয়ানকে বেঁধে রাখা দড়ির ঢিল ছেড়ে দিল। উপস্থিত সকলে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠল। হঠাৎ শেরাজের হাসির শব্দে সকলে চোখ মেলে তাকাল। আরিয়ানের শরীরে ছুরিগুলো ছুঁয় ছুঁয়। মৌ সেন দৌড়ে এলেন ছেলের কাছে। একটা দমবন্ধ করা নিঃশব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। শেরাজ হাসি থামিয়ে বলল,
“সুমু আমার শান্তি। কেউ যদি সেই শান্তিকে নষ্ট করার চেষ্টা করে, তাহলে আমি কী করতে পারি, আজ শুধু ট্রেলার দেখালাম। পুরো সিনেমা দেখতে চাইলে, আবার চেষ্টা করো।”
শেরাজ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার পায়ের শব্দে যেন সময় থেমে গেছে। মুখে কোনো রাগ নেই। শুধু একটা অস্বাভাবিক শান্তি যেটা দেখে কারো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারে। তার গলায় গাম্ভীর্য, যেন মৃত্যুর সুর।
“তোমরা ভাবছ, আমি ওভাররিঅ্যাক্ট করছি? সুমুকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছে বলে প্রতিশোধ নিচ্ছি? না! আমি প্রতিশোধ নিচ্ছি না। আমি নিয়ম বানাচ্ছি। আমার সুমুকে স্পর্শ করলে, পৃথিবী থেকে মুছে যাওয়ার নিয়ম।”
সে একটা ছুরি তুলে নিয়ে ধীরে আরিয়ানের গালে ছুরিটা দিয়ে স্পর্শ করে বলল,
“আমি মানুষ মারি না। আমি ইতিহাস থেকে নাম মুছে ফেলি। এমনভাবে মুছি, যেন জন্মই নেয়নি।”
তার গলা থেমে গেল এক মুহূর্ত। সে আবারও রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুনলাম ওর হাত চেপে ধরেছিলি। আর একবার ধরিস, তারপর তোর রক্তে লিখে দেব, সুমু কার বউ।”
সে মৌ সেনের দিকে একেবারে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মামনি আপনি যদি ভেবে থাকেন, আপনার বয়স আপনাকে বাঁচাবে। তাহলে ভুল ভাবছেন।”
শেরাজ আরিয়ানের কাছে গিয়ে ছুরি দিয়ে গালে ছোট করে একটা টান দিয়ে বলল,
“সুমু আমার দূর্বলতা এইটা তোরা জানিস। ও আমার শেষ পবিত্রতা। কেউ যদি ওর দিকে তাকায়, আমি তার চোখ উপড়ে নিব। কেউ যদি ওর নাম নেয়, আমি তার জিভ কেটে নিব। আর কেউ যদি ওর পথ আটকে দাঁড়ায়, তাহলে আমি তাকে দুনিয়া থেকে মুঁছে ফেলব। আজকের দিনটা মনে রাখিস, আরিয়ান। ওকে নিয়ে যদি আর একটাও স্বপ্ন দেখিস। তাহলে তোকে আমি চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দিব।
শেরাজ একটু থেমে বাঁকা হেসে বলল,
“ছেলেকে কোরিয়াতে চলে যেতে বলেছিলেন, তাইনা? ভাবলেন কীভাবে আমার হাত থেকে ও বেঁচে যাবে? মাটির তলে পুঁতে রাখলেনও, সেখান থেকে ওকে টেনে বের করে নিয়ে আসতাম আমি।”
আরিয়ানকে আবারও ওপরে তোলা হলো। শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“দড়ি ছেড়ে দাও।”
ঠিক তখনই মৌ সেন আর রোজা এসে শেরাজের পায়ের সামনে বসে পড়ল। শেরাজ বডিগার্ডকে হাত উঁচু করে থামতে বলল। রোজা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“এস.কে প্লিজ… আমার ব্রো’য়ের সাথে এমন করো না।”
তার কণ্ঠে কান্না আর অনুযোগ মিশে আছে।
“আমার দোষ ছিল আমি জানি। কিন্তু দয়া করে ব্রো’কে ছেড়ে দাও।”
সে চিৎকার করে উঠল। চোখে জল মুছতে মুছতে আবারও বলল,
“প্লিজ, এস.কে! ক্ষমা করে দাও।”
মৌ সেনও আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে কাঁদছে।
“আমার ছেলেটা, আমার ছেলেটা আর সুমুর দিকে তাকাবে না শেরাজ।”
একে একে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলে শেরাজকে রিকোয়েস্ট করল। নিজের বাবার অনুরোধে শেরাজ ছেড়ে দিল আরিয়ানকে। বডিগার্ড দুজন আরিয়ানের রক্তাক্ত দেহটা নামিয়ে আনলো। আরিয়ানকে নামিয়ে আনতে সকলে মিলে ঘিরে ধরল তাকে। মৌ সেন ছেলের শোকে কান্নায় ভেঙে পড়ল। শেরাজ বিরক্ত হয়ে বলল,
“ন্যাকামি বাড়ির বাহিরে গিয়ে করুন। অসহ্য লাগছে।”
মৌ সেন, রোজা আর অনন্যা খাতুন ছলছল চোখে আরিয়ানকে ধরে রাখল। কাঁপা হাতে মৌ সেন বুকে টেনে নিল ছেলেকে। রক্তমাখা গায়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে আরিয়ান চোখ বুজে পড়ে রইল। দুজন বডিগার্ড এসে আরিয়ানকে গাড়িতে তুলে দিল। ড্রয়িংরুমটা নিঃশব্দ হয়ে পড়ল আস্তে আস্তে। বাড়ির প্রায় অধিকাংশ মানুষ হসপিটালের দিকে রওনা হলো।
শেরাজ স্থির চোখে শেষবারের মতো সেই রক্তরঞ্জিত কাঠের বাক্সের দিকে তাকাল। স্যান্ডিকে সবকিছু সরাতে বলে, ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ওয়াশরুমে ঢুকে কপাল ঠেকিয়ে রাখল ঠাণ্ডা টাইলসে। পানি ছাড়ল। গরম স্রোতে শরীর ভিজে উঠল। কিন্তু ভেতরের আগুন। সেই আগুন এখনো জ্বলছে। তার সময় যেন থেমে গেয়েছিল সেই মুহূর্তেই, যখন সে শুনেছিল, কেউ তার কলিজাতে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছে। সে পানির নিচে সে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। কোনো শব্দ নেই, শুধু আত্মার মধ্যে কাঁপন।
শাওয়ার শেষে সাদা তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে নিঃশব্দ পায়ে রুমে এলো। ঘরটা অন্ধকার। কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা সূর্যের আলো এসে পড়েছে বিছানার ওপর। সুমু ঘুমিয়ে আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে ছোট ছোট শব্দে। এতটা নিষ্পাপ, এতটা শান্ত যেন শেরাজের হৃদয় ছুঁয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখে এখন যুদ্ধ শেষে ফিরে আসা যোদ্ধার অবসর বিষণ্নতা। সে বিছানায় উঠে বসল। সুমুর পাশে শুয়ে পড়ল। তার ডান হাতটা দিয়ে সুমুর কোমরের চারপাশে জড়িয়ে নিল। মাথা রাখল সুমুর গলার কাছে। সেই চেনা সুবাস সে চোখ বন্ধ করে বুক ভরে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার শরীরে যে স্পর্শ করতে চেয়েছিল, আমি তাকে ছেড়ে দেইনি। তুমি কিছু জানো না। আমি তোমাকে কিছু জানতেও দিব না।”
সুমু হালকা নড়ে উঠল। ঘুমের ঘোরে তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি খেলে গেল। সে কিছু বোঝেনি, তবু যেন উপলব্ধি করেছে, তার খান সাহেব তার পাশেই আছে।
শেরাজ আরেকটু কাছে সরে এলো। ঠোঁট ছোঁয়াল সুমুর কপালে।
খান সাহেব পর্ব ৪৩
“তুমি আমার শান্তি, সুইটহার্ট। আর এই শান্তির জন্য আমি সব কিছু পুড়িয়ে দিতে রাজি।”
সুমু চোখ না খুলেই শেরাজের বুকের দিকে আরও একটু গুটিয়ে গেল। শেরাজ তার হাতটা সুমুর কোমরের চারপাশে আরও শক্ত করে জড়িয়ে রাখল। সে সুমুর গালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। বাইরে তখন সকালের পবিত্র বাতাস। কিন্তু ঘরের ভেতরে, একটুখানি কোমলতা, একটুখানি নিঃশ্বাস, আর অগাধ ভালোবাসায় একত্রে জড়িয়ে শুয়ে রইল সুমুরাজ।
