Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৪৪

খান সাহেব পর্ব ৪৪

খান সাহেব পর্ব ৪৪
সুমাইয়া জাহান

ঘড়িতে সময় দুপুর বারোটা। নরম রোদ জানালা বেয়ে ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতর। সাদা পর্দায় রোদের ছায়া যেন জলরঙে আঁকা কোনো ছবি। ঘরের ভেতরে এক অপূর্ব শান্তিময়তা।
সুমু ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। একটুও তাড়াহুড়া নেই তার চোখেমুখে। জ্বরটা অনেকটাই কমে গেছে, কিন্তু শরীরটা এখনও একটু দুর্বল। সে অনুভব করল পাশে একটা উষ্ণতা। তাকিয়ে দেখল, শেরাজ তার পাশে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ, গভীর নিদ্রায়, মুখে প্রশান্তির ছায়া।
সুমুর হাতটা অসাবধানে ছুঁয়ে গেল শেরাজের কাঁধ। শেরাজ চোখ মেলে তাকাল। হালকা হেসে বলল,

“ঘুম ভেঙেছে, সুইটহার্ট?”
সুমু কিছু বলল না, শুধু চেয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। বাইরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘরের এক কোণে রাখা ফুলদানিতে সাদা টিউলিপগুলোও যেন আজ একটু বেশি সজীব।
শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ, আর জ্বর নেই। এখন শুধু আমার স্পেশাল স্পার্ম, মেডিসিন আর ডার্ক রোমান্সের দরকার। তাহলে, এই দূর্বলতাও কেটে যাবে।”
সুমু হালকা হাসল। শেরাজ চাদরটা টেনে সুমুকে আর একটু কাছে টেনে নিল। তাদের পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেল। শুধু এই ঘরটায় জেগে আছে ভালোবাসা, শান্তি, এবং দুজনার নিঃশব্দ মুগ্ধতায়– যারা শুধু একে অপরের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব আর বেঁচে থাকার কারন খুঁজে পায়।
সুমু ক্ষণিকের জন‍্য চোখ বন্ধ করে আবারও ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। পাশে শুয়ে থাকা প্রিয় মানুষটিকে দেখে একটা প্রশান্তি খেলে তার চোখে। হালকা গলা ভারি করে সে বলল,

“আপনি আজ অফিস যাবেন না?”
শেরাজ চোখ বন্ধ করে জবাব দিল,
“না! অফিসের কাজ সামলানোর মতো লোক অনেক আছে।” সে চোখ খুলে এক দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আমার বউকে সামলানোর জন্য তো একমাত্র আমিই আছি, তাই আজ আমি তাকেই সামলাব।”
সুমুর গাল লাল হয়ে উঠল। চোখ নামিয়ে ফেলে সে। দুজনেই একসাথে উঠে বসল। শেরাজ উঠে সুমুর ওড়নাটা তুলে দিল তার কাঁধে।
“চলো, ফ্রেশ হয়ে আসি দুজন। তারপর আমি নিজে কিচেনে গিয়ে তোমার জন্য কিছু বানাব।”
“আপনি রান্না করবেন?”
শেরাজ হেসে বলল,

“হ‍্যাঁ! আমার পাগলিটা অসুস্থ। আমার উচিত তার সব রকমের সেবা-যত্ন করা।”
সে বেড থেকে নেমে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে সুমুকে কোলে তুলে নিল।
“আরে, খান সাহেব কি করছেন? নামান আমাকে। আমি এইটুকু হেঁটে যেতে পারব।”
“না, তুমি এখনো দূর্বল। হাঁটলে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। শেরাজ হাঁটতে শুরু করল ওয়াশরুমের দিকে। নরম আলো আর নিঃশব্দ দুপুর সাক্ষী হয়ে রআল তাদের একান্ত ভালোবাসার আর শেরাজের ছোট্ট ছোট্ট যত্নের।
ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে ধীরে ধীরে বের হচ্ছিল সুমু। মাথাটা একটু ভার লাগছিল ঠিকই, তবে সে পাত্তা দেয়নি। পরনে শেরাজের সাদা শার্ট। সুমুর উন্মুক্ত পায়ের হাঁটুর কিছুটা ওপর পযর্ন্ত ঢেকে গেছে শার্টের কাপড়ে। সে একবার নিজের পায়ের দিকে তাকাল। শেরাজ দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছে তাকে, তবুও সে ওয়াশরুম থেকে বেরোনোর জন‍্য পা বাড়াল। হঠাৎ ঘরের আলোটা ঘোলাটে হয়ে উঠল চোখে। মুহূর্তের মধ্যে শরীরটা কেঁপে উঠল। হেলে পড়ে যেতে নিল সে। ঠিক তখনই শেরাজ জড়িয়ে ধরল তাকে।

“সুইটহার্ট! ঠিক আছো তুমি? শেরাজের কণ্ঠে আতঙ্ক।
সুমু ওপর নিচ মাথা ঝাকাল। শেরাজ রাগিস্বরে বলল,
“পাকামি না করলে চলেনা, তাই না?”
সুমু চোখ বন্ধ অবস্থায় আলতো হেসে শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। শেরাজ কোলে তুলো নিল তাকে। সুমু দু’পা দিয়ে শেরাজের কোমর আর দু’হাত দিয়ে শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরে শেরাজের কাঁধের চোখ বন্ধ করে মাথা রাখল। সুমুকে কোলে রেখে ফ্রেশ হয়ে নিল শেরাজ। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সুমুকে বেডের ওপর বসিয়ে দিল। সুমুর দু’পা ব্লাঙ্কেট দিয়ে ঢেকে দিল। হাত দিয়ে সুমুর চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি রুমে বসো। আমি এখনই খাবার নিয়ে আসছি।”
সুমু চপচাপ বসে রইল। রুমের দরজায় নক পড়ল। শেরাজ কপাল কুঁচকে তাকাল। তারপর এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অনন্যা খাতুন। তার মুখে জড়ানো একরকম অপরাধবোধ। তার সঙ্গে দুজন সার্ভেন্ট। একজনের হাতে সিলভার ট্রে ভর্তি ফল, আরেকজনের ট্রে’তে নানান রকমের খাবার খিচুড়ি, মুরগির ঝোল, টক দই, গরম গরম রুটি।
শেরাজ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার মায়ের চোখের দিকে।

“তুমি এখানে?”
অনন্যা খাতুন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“আমার ছেলের বউ অসুস্থ, তাই ভাবলাম খাবার নিয়ে আসি আর ছেলের বউকে একটু দেখেও আসি।”
শেরাজ অবাক হলো। দরজা থেকে সরে দাঁড়াল সে।
“এসো!”
রুমের ভেতর পায়ের ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে বসে থাকা সুমু ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে ভদ্রভাবে বসল। পরনে শেরাজের শার্ট বলে, তার মধ্যে জড়ানো লজ্জা, আর একরাশ দ্বিধা কাজ করছে। সে মাথা নিচু করে অনন‍্যা খাতুনকে সালাম জানালো।
অনন্যা খাতুন এক ঝলক তাকিয়ে দেখল মেয়েটাকে। সাদাসিধে, অসুস্থ কিন্তু শান্ত। তিনি খাবার রাখার নির্দেশ দিলেন সার্ভেন্টদের। রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। সার্ভেন্ট দু’জন খাবারের ট্রে রেখে মাথা নিঁচু করে চলে গেল।
অনন‍্যা খাতুন শেরাজের হাত ধরে রুমের বাহিরে টেনে আনলো। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“হসপিটাল থেকে ফিরলে কখন?”
অনন‍্যা খাতুন শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অনেক্ষণ আগে। এসে তোমাদের জন‍্য রান্না করেছি। কিন্তু তুমি কী মানুষ আছো আর? এখন পর্যন্ত আরিয়ানকে দেখতে গেলেনা। আরিয়ানের অবস্থা খুব খারাপ। কীভাবে মেরেছো ওকে? ওই একটা মেয়ের জন‍্য তোমার মামুদের সাথে আমাদের এত পুরানো সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে যেতে চলেছে। তুমি কি পারবে না এই মেয়েটাকে ছেড়ে দিতে?”
শেরাজের চোখে অদ্ভুত এক জেদ নিয়ে বলল,
“চাইলেও ওকে ছাড়তে পারব না, মম। একটা সম্পর্ক কেনো? এরকম হাজারটা সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে গেলেও, আমি ওকে ছাড়তে পারব না। ও আমার রক্তের ভেতর মিশে গেছে। আমি চাইলে কী আর ওকে উপড়ে ফেলতে পারি? ও আমার নিঃশ্বাসে মিশে গেছে। ওকে ছাড়া আমি অপূর্ণ, আমি অন্ধকার। ও শুধু আমার ভালোবাসা না, ও আমার শান্তি। ওকে হারালে আমি থাকব না। আমি ভেঙে পড়ব, ধ্বংস হয়ে যাব। চাইলেও আমার হৃদয় থেকে ওকে ছিঁড়ে ফেলতে পারব না। ও আমার অভ‍্যাস হয়ে গেছে। আমার সকাল, আমার রাত, আমার নিঃশব্দ প্রার্থনা– সব জায়গায় শুধু ওর নাম। আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি ওর নাম খুঁজে পাই। ওকে ছেড়ে দেওয়া মানে নিজেকে মেরে ফেলা। আর তুমি ওকে ছেড়ে দিতে বলছ? তুমি তো আমার কাছে আমার জীবনটায় চেয়ে বসলে, মম। আমি তো নিজেকে ছেড়ে দিতে পারি না, মম।
অনন‍্যা খাতুন চোখে বিস্ময়। তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,

“এতটা ভালোবাসো ওকে?”
“বিশ্বাস করো, মম। ইচ্ছা করে কিছু করিনি। সবকিছু এমনিতেই ঘটে গেছে। আমি নিজেকে থামাতে পারিনি। আমি বারবার নিজেকে থামাতে চেয়েছি, কিন্তু পারিনি। ওর চোখে একফোঁটা পানি দেখলে মনে হয়, আমার পৃথিবীর সব আলো নিভে যাচ্ছে। যেদিন ও কষ্ট পায়, সেদিন আমার দুনিয়াকে বিষাক্ত মনে হয়। ওর হাসি আমার শান্তি, আর ওর ব্যথা আমার শাস্তি। বিশ্বাস করো, আমি জানতাম না, এসব কবে হলো। আমি চেষ্টা করেছি, বারবার চেষ্টা করেছি নিজেকে আটকাতে। কিন্তু প্রতিবার ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ভেঙে পড়েছি। ওর কান্না আমার বুক ছিঁড়ে ফেলে। মনে হয়, কেউ আমার হৃদয় ছিঁড়ে ফেলছে নিজের হাতে। ওর কষ্ট আমার শরীর পোড়ায়। আর ওর একটু হাসি, সেইটাই আমার পুরো পৃথিবী। আমি যদি একদিন ওকে না দেখি, মনে হয় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাব। আমি ওকে ভালোবাসিনি, মম। আমি ওর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।

ভালোবাসা বললে কম হয়ে যায়। আমি ওকে নিজের মধ্যে গেঁথে ফেলেছি। আমি ওর চোখে কষ্ট দেখতে পারি না মম, পারি না। যখন ও কাঁদে, মনে হয় পুরো পৃথিবী আমার বিরুদ্ধে হয়ে গেছে। ওই মেয়েটার নিঃশ্বাসে আমি বাঁচি। যে আমার ছায়া হয়ে সবসময় আমার পাশে থাকে, তাকে আমি কীভাবে ছেড়ে দিই? ও না থাকলে আমি শেরাজ না। আমি শুধু একটা ফাঁকা শরীর। ভালোবাসি না, মম। আমি তাকে নিয়ে বাঁচি। আমি চেষ্টা করেছিলাম নিজেকে অন‍্যভাবে বাঁচাতে, ওকে এড়াতে, ভুলতে। কিন্তু আমি ব‍্যর্থ হয়েছি। তুমি জানো, মম? ওর একটু কষ্ট, আমার সমস্ত দুনিয়াকে অন্ধকার করে দেয়। আর ওর একটু হাসি জন‍্য আমি নিজের জীবনটাও বাজি রেখে দিতে পারি। তাকে হারানো মানে, বেঁচে থেকেও মরে যাওয়া, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে প্রতিদিন। আমি এসব চাইনি। কিন্তু আমার বুকের ভেতরটা তো শুনে না। সেখানে প্রতিটি হৃদস্পন্দনে শুধু ওর মুখটা ভেসে ওঠে। ওর গায়ে আঘাত লাগে তো আমার শরীরে দাগ পড়ে, ব‍্যথা হয়। ওর চোখে কষ্ট জমলে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না। ওকে আমি ছাড়তে পারব না, মম। চাইলেও না। ও আমার ভালোবাসা না। ও আমার শেষ আশ্রয়। ওকে হারালে, আমি শুধু একটা দেহ হয়ে যাব। একটা বেঁচে থাকা লাশ। দুনিয়াতে সৃষ্টিকর্তার পর এখন আমি শুধু ওকে মনে করি। প্রতিদিন আমার প্রার্থনায় শুধু ওর নাম থাকে। কখনও নিজের জন্য কিছু চাইনা। শুধু ওর ভালো থাকার দোয়া করি।”
একটু থামল শেরাজ। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে তার। গলার স্বর কেঁপে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে হাঁটুমুঁড়ে বসে পড়ল অনন‍্যা খাতুনের সামনে। মাথা নিচু করে বলল,

“ওকে ভালো না বেসে আমি থাকতে পারিনি। ওকে ছেড়ে দিলে আমি বেঁচে থাকব না, মম। আমি শুধু নিঃশ্বাস নেব। কিন্তু সেই নিঃশ্বাসে আর জীবন থাকবে না। মানুষকে ছেড়ে দেওয়া কঠিন কিছুনা। কিন্তু, যাকে ভালোবেসে শিরায় শিরায় প্রবেশ করিয়ে ফেলেছি, তাকে ছেড়ে থাকা অসম্ভব।”
অনন‍্যা খাতুনের চোখে পানি দেখা গেল। তিনি আজ ছেলের ভালোবাসা অনুভব করলেন। তিনি শেরাজের হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে তাকে নিয়ে রুমে এসে সুমুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তিনি একমুহূর্ত সুমুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে জড়িয়ে থাকা অভিমান আর অপ্রকাশ্য স্নেহ যেন ভেসে খুব ধীরে উঠেছে। তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“এই রূপের মায়ায় শুধু পুরুষ কেনো, যেকোনো মেয়ে মানুষ পড়তে বাধ্য, সুমু। তোমার চোখের দিকে তাকালেই, একটা সম্পূর্ণ জীবন আঁকা হয়ে যায়। তোমার রূপের মায়া এমন, যেকোনো পুরুষের দৃষ্টি তোমার দিক থেকে ফেরানো খুবই কঠিন।”
অনন‍্যা খাতুন একটু থামল। দৃষ্টি নামিয়ে আবারও বলল,

“তোমার কি মনে হয়? তোমার এই রূপের, এই নীরব মায়ার টানে আমি পড়িনি? পড়েছি! বহু আগেই পড়েছি। তবে রোজার জন্য, নিজের ভাইয়ের মেয়ের জন্য প্রকাশ করিনি। ছোট থেকে তো ওকে দেখে এসেছি। ওর জন্য আমার মধ্যে মায়া কাজ করে। রোজার মা, আমার ভাইয়ের বউ, শুনলাম কাল সেও নাকি তোমাকে আরিয়ানের বউ হিসাবে চেয়েছে। সে নাকি তোমার সৌন্দর্য আর গুণে মুগ্ধ। তোমার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটা ঘটনা আমি আজ সকালে শুনেছি, সুমু। আরিয়ান অন‍্যায় করেছে। কিন্তু, ওকে আমি কিছু বলতে পারি না। কারণ, ও তো আমার আরেকটা সন্তান। ছোটবেলা থেকে শেরাজ, আরিয়ান আর সারবাজকে একসঙ্গে আমি বড় করেছি। রোজাকেও আমি বড় করেছি। ওদের সব কষ্ট আমার বুকের মধ্যে এসে জমে। একদিন ভাবিজি হঠাৎ এসে আরিয়ানকে নিয়ে চলে গিয়েছিল। আমি কিছু বলতে পারিনি। শুধু চুপচাপ কেঁদেছি।

রোজা, আরিয়ান ছোট থেকে মায়ের আদর ঠিকমতো পায়নি। আমি তাদের শোধরাতে চেয়েছি, বড় করেছি, ওদের আগলে রেখেছি। আমার যা ছিল, আমি তাই ওদের দিয়েছি। ওদের কিছু হলে, আমার বুকে কষ্ট হয়। ওদের মধ্যে একজন তোমাকে আর একজন আমার ছেলেকে চায়। আমি জানি, আমি ওদের এই ইচ্ছা কোনোদিনও পূরণ করতে পারব না। এই ইচ্ছা পূরণ করতে গেলে একসাথে চারটা জীবন নষ্ট হবে। আমি কি করব বলো, সুমু? নিজের সন্তানদের জন্য আমার যতটা কষ্ট হয়, ওদের জন্যও আমার ঠিক ততোটাই কষ্ট হয়। রোজা আর আরিয়ান, ওরা তো আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে। ওরা যতোই দূরে থাকুক, ওদের কান্না আমি বুঝি। আবার শেরাজ? ওর কষ্টও আমার বুকের ভেতর ঝড় তোলে। তুমি বলো, একজন মা হিসাবে আমি কীভাবে বিচার করব? কোনটা ছেড়ে কোনটা আগলে রাখব?”

সুমু স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখে যেন এক পশলা পানি জমে উঠল তার। অনন্যা খাতুনের গলায় লুকিয়ে থাকা মমতা আর বিষণ্নতা তার হৃদয় ছুঁয়ে গেল গভীরভাবে। এই নারী, যিনি আজ অবধি তাকে মেনে নিতে পারেনি, সেই নারীর চোখে আজ এক আশ্চর্য রকম ভাঙা স্নেহ, এক ধরণের স্বীকারোক্তির রেশ।
সুমু ধীরে ধীরে অনন‍্যা খাতুনের হাত ধরল। শেরাজ পাশ থেকে উঠতে চাইলেও, সুমু হাতে ইশারা করে তাকে থামিয়ে দিল। খুব নিচু গলায় বলল,

“আপনি যেটা করেছেন, সেটা একজন মা হিসাবে করেছেন। আপনার আমার ওপর চাপা একটা রাগ ছিল, আমি জানি। রোজা আপু আর আরিয়ান ভাইয়া আপনার সন্তানসম, এটাও আমি জানি। আমি কখনোই চাইনি তারা কষ্ট পাক। আমি শুধু খান সাহেবকে ভালোবেসেছি নিঃশব্দে, নিরবে। কাউকে কষ্ট দিয়ে নয়।”
চোখের কোণ মুছে এক চিলতে হেসে সে আবারও বলল,
“আপনি যদি আজ আমাকে স্বীকার না ও করেন, তবুও আমি জানব, আপনি আমার প্রতি কঠোর ছিলেন শুধু রোজা আপুর চোখের পানি আর কষ্টকে দূর করার জন‍্য। আমি আপনাকে দোষ দেইনা। আপনি একজন মা, আপনি কেবল মা হয়ে সবাইকে ভালোবেসেছেন। সকলের ভালো চেয়েছেন। আর এই চাওয়াটা কোনো অন‍্যায় নয়।”
অনন্যা খাতুন একটু কেঁপে উঠলেপ। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ দুটো আরও একটু ঝাপসা হয়ে আসছে। শেরাজ চুপচাপ বসে মা বউয়ের কথা শুনছে।

অনন্যা খাতুন সুমুর চোখে চোখ রাখল। সুমুর চোখে তিনি যেন এক সমুদ্র গভীরতা খুঁজে পেলেন। সেখানে কষ্ট, ভালোবাসা, ত্যাগ, আর একটুকরো নিষ্পাপ আশ্রয়। ধীরে ধীরে তিনি হাত বাড়ালো। সুমুর মাথার ওপর নরম করে রাখলেন সেই মায়ের হাতটা, যেটা এতদিন ছিল অদৃশ্য দেয়ালের ওপারে। আজ সেই দেয়াল গলে জল হয়ে নেমে আসে স্নেহের আকারে। তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন,
“আজ আমি আমার ছেলের ভালোবাসার কথা শুনলাম। তুই তো আমার মেয়ের মতো, তাই তোকে আমি তুই করেই বলছি।” একটু থেমে আবারও বললেন, “তুই আমার ছেলের জীবন। তোকে চোখের আড়াল করলেই ওর বুকটা ভেঙে যায়। তুই শুধু সুন্দর না মামনি, তুই সহ্যশীল, তুই শক্তি। তুই আমার ছেলের ভালোবাসা। তোর মাথার ওপর আজ দোয়ার হাত না রাখলে অন‍্যায় করা হতো।”
সুমুর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। অনন‍্যা খাতুন ছেলে আর ছেলের বউয়ের দিকে স্নেহের হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুজনে একসাথে আঁকড়ে ধরল অনন‍্যা খাতুনকে। অনন্যা খাতুন ধীরে ধীরে দুজনকে সরিয়ে দিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। তারপর ঘুরে গিয়ে টেবিল থেকে একটা ট্রে তুলে আনলত। সেখানে রাখা কিছু গরম খাবার, তার হাতে তৈরি। তিনি ট্রে’টা নিয়ে এসে বললেন,

“এইসব তোদের জন্য বানিয়েছি।”
তিনি প্রথমে এক চামচ খাবার তুলে সুমুর মুখে দিল, তারপর আবারও খাবার তুলে শেরাজের মুখে দিল। দুজনকে একসাথে খাইয়ে দিয়ে পূনরায় জায়গা খাবারের ট্রে রেখে এসে ওদের পাশে এসে বসলেন। মৃদু হেসে বললেন,
“ভুল-বোঝাবুঝি, রাগ, অভিমান সব থাকবে। কিন্তু তোরাও যেন একে অপরের ছায়া হয়ে থাকিস। আমি তোকেও ভালোবাসি, মামনি। আজ থেকে তুই শুধু আমার ছেলের বউ না, তুই আমার মেয়ে।”
অনন্যা খাতুন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখে তখন একটা প্রশান্তির দীপ্তি। তিনি প্রথমে সুমুর কপালে চুমু খেলেন। সুমু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ধীরে অনন্যা খাতুনের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ফেলল। সেই বুকটা, যেটা এতদিন দূরে ছিল তার জন্য, আজ যেন আশ্রয় হয়ে এসেছে। অনন্যা খাতুন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“আর কষ্ট পাবি না, মামনি। আমি আছি তোদের পাশে। সব ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু কর।”
তিনি শেরাজের সামনে দাঁড়িয়ে শেরাজের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলেন।
“তোদের দু’জনকে একসাথে দেখে আমার মন শান্তি পায়। তুইও রাগ কমাস, শেরাজ। মায়ের কথা বোঝা বড় কঠিন। কিন্তু ভালোবাসাটা তো তোদের জন্যই।”
শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে অনন‍্যা খাতুনকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ধন্যবাদ, মম!”
সুমু, মা ছেলের এমন সুন্দর দৃশ‍্য দেখে আলতো হাসল। অনন‍্যা খাতুন ছেলেকে ছেড়ে সরে দাঁড়ালে। হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে আস্তে আস্তে দরজার দিকে চলে গেলেন। যাবার আগে থেমে আবার একবার ফিরে তাকালেন ওদের দিকে। চোখে তৃপ্তি নিয়ে বললেন,

“তোদের দু’জনকে এইভাবেই দেখতে চাই সারাজীবন।”
তিনি চলে গেলন। অনন্যা খাতুন চলে যাওয়ার পর ঘরটা নীরব হয়ে গেল। দুজনেই কিছু বলল না। সুমু জানালার দিকে তাকিয়ে রইল, আর শেরাজ তাকিয়ে রইল সুমুর মুখের দিকে। হঠাৎ শেরাজ নিচু গলায় বলল,
“কাঁদছ কেনো, সুইটহার্ট?”
সুমু কিছু বলল না। শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর কাঁধে হাত রাখল।
“আমি এতদিন মম’কে বোঝাতে পারিনি। কিন্তু, আজ তিনি বুঝেছে। সবটা তোমার জন‍্য হয়েছে।”
সুমু আস্তে করে বলল,
“আমি কিছু করিনি।”
শেরাজের খুব শান্ত কন্ঠে বলল,
“তুমি আছো, এটাই সব কিছু।”
সুমু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“খান সাহেব!”
“হুঁ!”
“আজ খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে।”
শেরাজ এগিয়ে এসে সুমুর মাথাটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিল।
“কাঁদো! আমি আছি।”
সুমু চোখ বন্ধ করে শোনে শেরাজের বুকের মধ্যে ধুকপুক শব্দ। তার কপালের ওপর শেরাজের ঠোঁট ছুঁয়ে থাকে চুপচাপ। বাইরে দুপুরের আলো কাচে ভেদ করে ঘরের ভেতর পড়ে। হাওয়ায় সাদা পর্দাটা আস্তে আস্তে দুলে উঠে।

সকালের ক্লাস শেষ হতেই ক্যাম্পাসে হইচই। কলেজ ক‍্যাম্পাসে বড় আকারে ঝড় বয়ে গেছে। ফারিয়াকে কাল বিরক্ত করার ঘটনাটা আজ কলেজ ক‍্যাম্পাসে ঢুকতেই কিছু ছেলে পিয়াসের কানে তুলে দেয়। রাগে পিয়াস সেই মুহুর্তে ছেলে তিনটাকে ধরে এনে কলেজ মাঠ প্রাঙ্গনে ফেলে ইচ্ছামতো মেরেছে। তিনজনকেই ভর্তি করানো হয়েছে হসপিটালে। মার খেয়ে তিনজনেরই অবস্থা কাহিল। এম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের।
ছাত্রলীগ অফিস ঘরের সামনে তখন পিয়াস বসে আছে। চোখে সানগ্লাস, পরনে ব্ল‍্যাক শার্ট। পাশে পনেরো, বিশজন ছেলে। পিয়াস বসে ফোনে কথা বলছে।
“হ্যাঁ বাবা, আমি নিজেই পাঠিয়ে দিয়েছি টাকা। হসপিটালের বিলও আমি পেমেন্ট করে দিয়েছি।”
বাবার সাথে কথা শেষ করে কল কাটে পিয়াস। ক্যাম্পাসের সকলে ভয় পেয়ে আছে। প্রিন্সিপালের রুম থেকে বেরিয়ে শাহরুখ সোজা পিয়াসের কাছে গিয়ে বলল,
“তুই জানিস, আমি প্রিন্সিপালের সাথে মিটিং ঠিক করে ফেলছিলাম। তাহলে তুই কেনো এই সিনক্রিয়েটটা করলি?”
পিয়াস গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি ছাত্রলীগ করি ভাই। সিদ্ধান্ত নিজে নিই। আর তুই ভাবলি কী করে, আমার বোনকে উল্টাপাল্টা কথা বলা আমি সহ্য করব?”
শাহরুখ ধীরে বলল,
“ফারিয়া আমার কেয়ারে ছিল, আছে। আমি সবটা সামলে নিতাম।”
পিয়াস হেসে বলল,
“তোর কেয়ারটা আমি জানি, ভাই। তুই মুখে বলিস না, কিন্তু চোখে তো সিকিউরিটি গার্ড বসানো থাকে সবসময়। আমার বোনকে পছন্দ করিস, অথচ মুখে বলিস না। যেদিন ওর অন‍্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিব তখন বুঝবি।”
“মজা করিস না তো।”
“রেগে যাচ্ছিস কেনো ভাই? আচ্ছা, বাদ দে।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পিয়াস। শাহরুখের কাঁধ ধরে এক পাশে নিয়ে গিয়ে গলা নামিয়ে বলল,
“সামিয়ার কী খবর রে? অনেকদিন তোদের বাসায় যাওয়াও হয়নি। কাজের চাপ তো, তাই ওর খোঁজটাও নেওয়া হয়নি ঠিকমতো।”
শাহরুখ চোখ টিপে হালকা হেসে বলল,

“কেন রে, মনে পড়ছে বুঝি?”
“আরে না রে ভাই, এমনি জাস্ট। অনেকদিন দেখা হয় না তাই বললাম। ও ভালো তো?”
“ভালোই আছে। হাসিখুশি অলওয়েজ।”
পিয়াস মুখ নামিয়ে হালকা হাসল। কিন্তু হাসির আড়ালে চেপে থাকা একটা দীর্ঘশ্বাস যেন বের হতে চায় তার।
“তুই হঠাৎ সামিয়ার খবর নিচ্ছিস কেন? কিরে, প্রেমে পড়লি নাকি?”
পিয়াস চোখে একটু কঠিন ভাব এনে, গলা গম্ভীর করে বলল,
“জানিস না মনে হয়? শোন, প্রেম করার টাইম আমার নেই। যাকে ভালোবাসি, তাকেই একবারে বউ করে ঘরে তুলব। যারা সত্যিকারের পুরুষ, তারা প্রেমের নামে ঘুরাঘুরি করে না। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেয়।”
শাহরুখ চুপ করে গেল। পিয়াসের চোখে একটা আলাদা দৃঢ়তা, একরকম তীব্র ভালোবাসার ছাপ। সে ধীরে ধীরে বলল,

“মাধ্যমিক পাস করলেই তোদের বাসায় গিয়ে প্রস্তাব দিব। তখন একটা দিনও দেরি করব না। জানি, ও আমাকে ভাইয়া ডাকে। ওর চোখে আমি আলাদা কেউ নই, শুধু ভাইয়া ছাড়া। কিন্তু আমার কাছে ওই একটা মেয়েই সব।”
“তুই জানিস, সামিয়া এসব কিছু জানেই না। আর ও তোকে কখনো সে চোখে দেখেইনি।”
“জানি! কিন্তু ভালোবাসা তো কখনো সমান হয় না, ভাই। কারও শুধু গল্প, কারও জীবন। আমি জানি ওর কাছে আমি কখনোই ওর জীবন হবো না, তবুও একটা আশা তো রাখতেই পারি, তাইনা?”
শাহরুখ হাসতে হাসতে বলল,
“তুই হঠাৎ এত ভাবুক ভাব নিচ্ছিস কেন রে? আগে প্রিয়া প্রিয়া করতি, আর এখন সামিয়া সামিয়া। আবার বলছিস প্রেম করিস না?”
“প্রিয়া ছিল মজা। সামিয়া হলো মানে।”
“মানে?”
পিয়াস সিগারেটের আগুন নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেললো দূরে।

“মানে? যাকে দেখে বুকের ভেতর কিছু আলাদা রকম অনুভূতি হয়। স্রেফ পছন্দ না, রেসপেক্ট আসে। ওর হাসিটা দেখলেই আমার মনে হয়, এমন একজন থাকলে জীবনের সব টেনশন চলে যাবে। আমি চাই না গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে ওর হাত ধরে ঘুরে বেড়াই। আমি চাই, ও কোমরে আচঁল গুঁজে আমার জন‍্য সকালে নাস্তা বানাক।”
শাহরুখ আশ্চর্য হয়ে, নরম গলায় বলল,
“তুই সিরিয়াসলি ভালোবাসিস ওকে?”
“ভালোবাসা না ভাই। ভালো থাকার স্বপ্ন দেখি ওকে নিয়ে। আমি জানি ও এখনো ছোট, এইসব বুঝে না। আমাকে ভাইয়ার জায়গায় রাখে। তবুও ভাবি একদিন হয়তো ও বুঝবে।”
“তুই একটা ম্যাচিউর ছেলে। ভেবে করিস, যা করবি।”
“আমি প্রেমে বিশ্বাস করি না। আমি ওই বয়সী মেয়ের সাথে রোমান্স করার জন্য কোনো ফ্লাটে ঢুকি না। আমি এক নারীতে আসক্ত। আমি সামিয়ার মাধ্যমিক শেষ হবার অপেক্ষায় আছি। মাধ্যমিক শেষ করলেই ওর বাড়িতে গিয়ে বলব, আপনাদের মেয়েকে আমি আমার স্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই।”
“আর ও যদি না চায়?”

পিয়াস একটু চুপ থেকে, তারপর গভীর গলায় বলল,
“তাহলে আমি পিছু হটবো। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত, আমি ওর আশেপাশে থাকব। একজন ভাই নয়, একজন মানুষ হয়ে। ওর পাশে ছায়ার মতো থাকব, যতক্ষণ না ও বুঝতে পারে আমার জায়গা ওর মনে ঠিক কোথায়।”
“তোর কী মনে হয়, বিয়ের পর ও তোকে ভালোবাসবে?”
“অবশ্যই! আমার ভালোবাসাটা এখন একপাক্ষিক। আর যারা সত্যি ভালোবাসে, তারা টিনএজ প্রেমে সময় নষ্ট করে না। তারা দায়িত্ব নেয়। আমি বিয়ের পর ওকে সময় দেব, বড় করব, বোঝাব। আমি চাই না ও আমার প্রেমিকা হোক, আমি চাই ও আমার স্ত্রী হোক। সঙ্গী হোক, পথচলার।”
“তুই আলাদা রে, পিয়াস। সময়ের আগে বড় হয়েছিস।”
“না রে ভাই, সময় আমাকে বড় করে দিয়েছে।”
শাহরুখ পিয়াসের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ঠিক আছে, থাক তাহলে। আমি একটু মেডিকেলে যাব।”
শাহরুখ কলেজ ত‍্যাগ করল। পিয়াস চলে গেল তার অফিসের ভেতর।

আরিয়ানের অবস্থা এখনও সংকটজনক। আইসিইউ-এর সামনে একটা অদৃশ্য টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে আছে। মনিটরের টিকটিক শব্দ, নার্সদের ছোটাছুটি, আর মৌ সেনের নির্বাক মুখ যেন মুহূর্তগুলোকে আরও ভারী করে তুলেছে। চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই কেউ। ফ্লোর জুড়ে নিস্তব্ধতা, যেন সব কথা জমে আছে বুকের ভেতরে।
সাহাবাজ সাহেব আর অনন্যা খাতুন বিকেল নাগাদ এসে পৌঁছালেন হসপিটালে। মৌ সেন একবার তাকিয়ে আবারও আগের মতো চুপচাপ বসে রইলেন। রোজা তার মায়ের পাশে বসে আছে। সাহাবাজ খান সোজা আইসিইউ-র কাচের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ভেতরে মেশিনে জড়ানো আরিয়ানের নিথর দেহ দেখেই বুকটা ধক করে উঠল তার।

মৌ সেন কাঁদছিল না, কিন্তু তার চোখের তলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অনন্যা খাতুনও চুপচাপ সাহাবাজ সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখে কোনও মন্তব্য নেই। কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত ব্যথা, যা তিনি প্রকাশ করতে পারছেন না।
ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। গ্লাভস খুলে সংক্ষিপ্তভাবে বললেন,
“পেশেন্ট’স কন্ডিশন ইজ স্টিল ক্রিটিক্যাল। কিন্তু আমরা ব্লিডিং কিছুটা থামাতে পেরেছি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বুঝতে পারব কতটা রেসপন্ড করছে তার শরীর।”
এই একটুখানি কথায় যেন সবার দম ফিরে এলো। মৌ সেন কাঁপা গলায় বললেন,
“আমার ছেলেটা বাঁচবে তো?”
ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন,
“আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, ম্যাম।”
কেউ আর কিছু বলল না। আফতাব চৌধুরী চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। অনন্যা খাতুন মাঝে মাঝে প্রার্থনার মতো কিছু বিড়বিড় করে বলছেন। রোজা তার মায়ের পাশে বসে নিচুস্বরে বলল,
“কারো জীবন ঝড়ের মতো বদলে যায় মুহুর্তেই। কেউ বাঁচে, কেউ টিকে থাকে শুধু অপেক্ষায়। আর অপেক্ষা? তা তো কখনো কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরিক্ষা। আজ আমাদের সময়টা বদলেছে। কে বলতে পারে, কাল হয়তো অন‍্যকারো সময় বদলালো।”
মৌ সেন তাকালেন মেয়ের দিকে। রোজার চোখে আগুন। সে মৌ সেনের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল।

সন্ধ্যাটা আজ অসাধারণ সুন্দর। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে মিষ্টি ঠান্ডা। শেরাজ আজ খুব সাধারণভাবে সেজেছে। কালো শার্ট, হাতা গুটানো, একধরনের আত্মবিশ্বাস মিশে থাকা একটা নীরব সৌন্দর্য। সুমু আয়নার সামনে বসে চুলে চিরুনী করছে। চোখে একধরনের স্বপ্নী ভাব। পরনে সাদা চুরিদার, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। হঠাৎ পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে কাঁধে পড়ল।
“চলো, একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই তোমাকে।”
সুমু অবাক হয়ে তাকাল,
“এখন?”
“হুম!”
সুমু আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে উঠে দাঁড়াল। শেরাজ তার হাত ধরে বাসা থেকে বেরিয়ে এলো।
গাড়ির জানালার পাশে বসে সুমু চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে। শহর পিছিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আলো-আঁধারির খেলা পেছনে ফেলে তারা এগোচ্ছে কোনো এক অনন্তের দিকে। সুমু জানে না তারা কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু তার মুখে কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ সে জানে, তার খান সাহেব যখন কিছু বলেন, তাতে সব সময় একটা গভীর মানে লুকিয়ে থাকে।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গাড়ি থামল শহরের একটু বাইরে, একটা ক্লাসিক পারফিউম স্টুডিওর সামনে। চারপাশ চুপচাপ। গেইটে লেখা: “ফ্র‍্যাগর‍্যান্স অব ইমোশন্স”
কাচের দরজা খুলতেই এক মোহময় সুবাসে ভেসে গেল ভিতরটা। চন্দন, চামেলি, কাশ্মীরি কস্তুরি, আর অসংখ্য অজানা সুগন্ধি।
সুমু একটু চমকে গেল।
“এটা কোথায়?”
শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“ভালোবাসার গন্ধ যেখানে বানানো যায়।”
সে একটু থেমে, একদম সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
তুমি একবার বলেছিলে, আমার শরীরের স্মেল দিয়ে তুমি পারফিউম বানাতে চাও, মনে আছে?”
“আপনি মনে রেখেছেন?”
“তোমার বলা প্রতিটা শব্দ আমার বুকের ডায়েরিতে লেখা থাকে, সুইটহার্ট।”

শেরাজ সুমুর হাত ধরে আর একটু ভেতরে গেল। সেখানে একজন প্রফেশনাল নোজ স্পেশালিস্ট অপেক্ষা করছে। টেবিলে রাখা আছে নানা সুগন্ধি উপাদান, কিছু চেকলিস্ট, আর একটা ছোট্ট বোতল।
শেরাজ তার নিজের পরা শার্ট, ব্যবহৃত পারফিউম, ঘাড়ের পাশে জমে থাকা সেই একান্ত ব্যক্তিগত গন্ধের উৎসগুলো দিতে লাগল বিশ্লেষণের জন্য।
সুমু বসে আছে এক কোণে। সে জানত না, তার খান সাহেব সত্যিই একদিন এই গন্ধকে বোতলের মধ্যে ধরে রাখার ব্যবস্থা করে ফেলবে।
শেরাজ সুমুর কাছে এগিয়ে এলো। সুমুর হাতে কিছু চকলেট দিল। সুমু সেগুলো খুশি মনে খেতে শুরু করল।
প্রায় ঘণ্টাখানেকের পরীক্ষার পর সেই বিশেষ সুগন্ধি তৈরি হলো। একধরনের নরম কাঠের উষ্ণতা, সঙ্গে সাইট্রাসের মতো সতেজতা, একটু আফগান কস্তুরির ছোঁয়া, আর এক গভীর পুরুষালি ঘ্রাণ, যা ছিল একান্তই শেরাজের শরীরের। পারফিউমের নাম রাখা হলো,
“সুমুরাজ এসেন্স”
বোতলটা হাতে নিয়ে সুমুর নাকের কাছে ধরল শেরাজ। সুমু চোখ বন্ধ করে বুক ভরে ঘ্রাণ টেনে নিয়ে বলল,
“আমার খান সাহেব!”
শেরাজ মুচকি হাসল। সুমু চোখ খুলে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এইটা শুধু পারফিউম না, এটা আপনার অস্তিত্ব। আমি যখনই চোখ বন্ধ করব, মনে হবে আপনি আমার আশেপাশে। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছেন।’

শেরাজ ধীরে এসে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“আর তুমি আমার রক্তে মিশে আছো। তুমি হলে আমার ভালোবাসার সংজ্ঞা, সুমু।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ বিল পেমেন্ট করে দিয়ে সুমুকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। গাড়িতে বসে সে সুমুকে একটু কাছে টেনে নিল। সুমুকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল।
গাড়ি এসে থামল একটা র্নিজন জায়গায়। শেহ
রাজ আর সুমু গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। দুজনে মিলে একটা গাছের পাশে বসল। শেরাজ এক হাতে সুমুর কোমর জড়িয়ে সুমুকে কাছে টেনে এনে কাপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৪৩ (২)

“ভালোবাসা শুধু দেখা বা ছোঁয়া না। ভালোবাসা একটা গন্ধ, যা একবার শরীরের সাথে মিশে গেলে কোনোদিন আর শরীর থেকে আলাদা হয় না।”
সুমু চোখ বন্ধ করে শেরাজের নরম ছোঁয়া অনুভব করল। চোখ মেলে শেরাজের চোখে চোখ রেখে বলল,
“ভালোবাসা যে শুধু চোখে দেখা যায় এমনটা নয়। ভালোবাসা কখনো কখনো ঘ্রাণেও খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু অনুভবের গভীরতায়।”

খান সাহেব পর্ব ৪৫