খান সাহেব পর্ব ৪৬
সুমাইয়া জাহান
কেটে গেল দু’টো মাস। দীর্ঘ, দগ্ধ সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে সবাই। আরিয়ান এখন অনেকটাই সুস্থ। হাসপাতালের ঘর, যেখানে দিনের পর দিন শুধুই নিঃশব্দতা, করুণার গন্ধ আর অনিশ্চয়তার ছায়া ভর করেছিল। আজ সেই ঘরকে বিদায় জানাবে সে। হাসপাতালের করিডরে ভোরের আলো ঢুকে পড়েছে। নার্সরা ব্যস্ত, চিকিৎসকেরা কিছু চূড়ান্ত চেকআপে ব্যস্ত। কিন্তু আজ যেন একটা ভিন্ন উষ্ণতা আছে বাতাসে, যেন হাসপাতালের দেয়ালও অনুভব করছে কারো মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে আসার ছন্দ। আজ আরিয়ানকে নিতে এসেছেন তার মা মৌ সেন, বাবা আফতাব চৌধুরী, এবং বোন রোজা চৌধুরী। মৌ সেন আজ পরেছেন হালকা গোলাপি শাড়ি, কিন্তু চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। তবে ঠোঁটে শান্ত একটা হাসি আছে আজ। এই দুই মাসে মা হয়ে কত রাত নির্ঘুম কেটেছে, কত প্রার্থনা, কত ভয় নিয়ে তার। সব যেন আজ একটুখানি আশার ছায়ায় শান্ত হচ্ছে। আফতাব চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে হাসপাতালের ফর্মালিটিজ শেষ করছেন। তার হৃদয়ের গোপন অনুভূতিগুলো চোখে ফুটে ওঠে না। কিন্তু কাগজে কলমে স্বাক্ষরের সময় যেন হাত খানিকটা কেঁপে উঠছে তার। রোজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে করিডরের এক কোণায়। সে নিজের ফোনে মাঝে মাঝে কিছু করছে, আবার মাঝে মাঝে আরিয়ানের কেবিনের দিকে তাকাচ্ছে। ভাইয়ের জন্য ভেতরে এক অদ্ভুত আবেগ কাজ করলেও, রোজা আজ চুপচাপ। সে যেন আজ সে খুব কম কথা বলেছে।
আরিয়ান হুইলচেয়ারে বসে আছে। তার দুইপাশে তাদের অফিসের দুজন এমপ্লয়ি। একজনের নাম আরোহী, আরেকজনের নাম আইরাত। দুজনেই আরিয়ানকে ভালোবাসে। তারা দুজনেই একে অপরের প্রতি জেলাস। এই দুইমাস দুজনেই আরিয়ানকে দেখতে দু’বেলা করে হসপিটালে এসেছে। কিন্তু সেদিকে আরিয়ানের কোনো নজর নেই। আরিয়ানের হাতে ফোন, স্ক্রিনে সুমুর ছবি। তার মাথার চুল কিছুটা বড় হয়ে গেছে। আজ চোখে একটু ক্লান্তি থাকলেও মুখে ফিরে এসেছে একধরনের প্রশান্তি। গত দুই মাসের ভেতর তার চেহারায় এসেছে এক আশ্চর্য পরিবর্তন, যেন কোনো নতুন অভিজ্ঞতা তাকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, আজ হাসপাতাল থেকে মুক্তি পাওয়ার অর্থ, সেই পুরনো জগতের মুখোমুখি হওয়া। সেই জগৎ, যেখানে সুমু আছে। সেই জগৎ, যেখানে শেরাজ খান আছে। যেখানে আছে গোপন ভালোবাসা, রেষারেষি, প্রমাণের লড়াই, এবং ভেতরের নিরব কান্না জমে আছে।
গাড়ি রেডি। নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ঘেরা বাহন। আরিয়ানকে উঠিয়ে দেওয়া হলো গাড়িতে। চোখে সানগ্লাস, মুখে নির্লিপ্ততা। কিন্তু তার ভেতরের কল্পনায় ভেসে উঠছে সুমুর মুখ। সে বিড়বিড় করে বলল,
“আই এম ব্যাক, বেবিগার্ল!”
আয়নায় দিকে তাকিয়ে সে হাসপাতালের বিল্ডিংটাকেও বিদায় জানালো। সে জানে, এই দুই মাস তাকে বদলে দিয়েছে। এখন সে শুধু একজন কোরিয়ান হিরো নয়, এখন সে একজন হারিয়ে যেতে যেতে ফিরে আসা পুরুষ। আর পুরোপুরি সুস্থ হবার পর তার সঠিক গন্তব্য সুমু।
নরম রোদে ভেজা একটা সুন্দর দুপুর। জানালার পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে। সূর্যের আলো ঠিক সেখান দিয়েই ঘরে ঢুকে পড়েছে। কিছুটা গালবুলির মতো মিষ্টি আর কিছুটা অলসতার মতো শান্ত। বাইরে পাখিরা ডাকছে কখনো কখনো, যেন ঘুমঘোরে গান গাইছে তারা।
চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখা, পাশে একটা খোলা বই। যার পাতায় পাতায় দুপুরের স্বপ্ন লুকিয়ে আছে। আজ সময় যেন থেমে আছে একটু। শুধু হালকা একটা সুর বাজছে মনের মধ্যে। খুব চেনা কারো হালকা হাসি যেন ভেসে আসছে দূর থেকে। এমন দুপুরে গল্প জমে, মনের ভেতর ভালোবাসা গুঞ্জন তোলে। কখনো কেউ পাশে বসে হাত ছুঁয়ে বলে, ‘এই দুপুরটা শুধু তোমার জন্য রেখেছি। এই দুপুরটা মেঘে ঢাকা নয়, কাজের চাপে ভারী নয়, এটা শুধুই একটুকরো শান্তি। একটা নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।” কিন্তু, আজ সুমু একা। শেরাজ অফিসে। আজ দুপুরটা যেন একটু বেশি চুপচাপ। ঘরজুড়ে নীরবতা, যেন সেও অপেক্ষায় আছে কারো জন্য। জানালার পাশে বসে গোলাপি রঙের আলারকালি পরে সুমু। চুল খোলা, হাতে ডায়েরি। এক পাশে পড়ে আছে শেরাজের প্রিয় ঘড়িটা, যেটা সে আজ ভুলে রেখে গেছে। সে ঘড়িটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সুমু ডায়েরির পাতায় লিখল,
“আজ দুপুরটা একটু বেশিই দীর্ঘ মনে হচ্ছে। আপনি আছেন, অথচ নেই। আপনার জন্য চা বানিয়ে টেবিলে রাখতে গিয়ে মনে পড়ল, আজ তো আপনি ব্যস্ত। অথচ বাড়িতে থাকলে এই সময়টায় আমি আপনার চোখে অন্যরকম কিছু দেখতাম। ঘুম না হওয়ার কারণে অভিমান দেখতাম। আজ সেই চোখ নেই, তাই আমার কথাগুলোও চুপচাপ।”
পাতায় পাতায় শব্দরা যেন দীর্ঘশ্বাস হয়ে পড়ছে। শেরাজকে না দেখলে যেসব কথা বলা হয় না, সেসবই প্রতিদিন কাগজে ঝরে পড়ে। সে আবারও লিখতে শুরু করল,
“আপনি অফিসে মিটিং, ক্লায়েন্ট, কাজের ভারে হয়তো একটুও ঘুমাননি। অথচ আমি এখানে বসে শুধু ভাবছি, এখন যদি আপনি বাড়িতে থাকতেন, তাহলে কতো দুষ্টুমি করতেন।”
সুমু হালকা হাসল। তার চোখের কোণে মায়া জমে। ডায়েরি বন্ধ করে আবারও ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল,
“আপনি ফিরুন খান সাহেব। দুপুরটা কেমন যেন অসম্পূর্ণ আপনার ছায়া ছাড়া।”
দরজায় নক পড়ল। ইশিতা ঢুকে এলো রুমের মধ্যে। তার সাথে দুজন সার্ভেন্ট। তাদের হাতে ট্রেতে গরম গরম খাবার। ইশিতা একটু রাগ দেখিয়ে বলল,
“সুমু, কী হয়েছে তোমার? সকালে ঠিকমতো খেতে চাইলেনা। ভাইয়া বকে বকে কিছুটা খাইয়ে দিয়ে গেল। এখন আবার নিচে গেলেনা খেতে। কী হয়েছে সুমু? দেখো, তোমার জন্য কাবুলি পোলাও, খাসির কোরমা, আর একটু বোলানি আর নান এনেছি। আফগানি খাবারের মধ্যে এগুলো তোমার পছন্দ। ভাইয়া অফিস যাবার আগে আমাকে বলে দিয়ে গেছে আজ এসব রান্না করতে। আজ সব তোমার পছন্দের খাবার রান্না করা হয়েছে। কিন্তু, তুমি খেতে এলেনা। মামনি বকাবকি করছে। ইদানিং তুমি এমন করছো। কারো সাথে খাওনা। রুমে খাবার পাঠাই, সেটাও অর্ধেকর বেশি নিচে ফেরত যায়। ভাইয়াকে বলতে চাইলাম, তুমি বললে, তাকে যেন কিছু না জানাই। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। সে ঠিক কী এভাবেই না খেয়ে থেকে হবে?”
কথাগুলো বলতে বলতে ইশিতা খাবারের ট্রে টেবিলের চোখ দিয়ে ইশারা করে রাখতে বলল। সার্ভেন্ট দু’জন খাবারের ট্রে রেখে চলে গেল। সুমু চোখ নামিয়ে খাবারের দিকে তাকাল এলাচ-জাফরানের গন্ধে ঘরটা ভরে গেছে। কিন্তু হঠাৎ যেন কিছু একটা হলো তার ভিতরে। সে নাক টিপে ধরে বসে অস্বস্তিতে মুখ ফিরিয়ে বলল,
“না ইশিতা, খেতে ইচ্ছে করছেনা। গন্ধেই বমি আসছে আমার। নিয়ে যাও এসব।”
“বমি আসছে মানে? তুমি কী অসুস্থ, সুমু? ভাইয়া জানে? দাঁড়াও আমি ভাইয়াকে কল করি।”
সুমু বাঁধা দিয়ে বলল,
“আমি অসুস্থ হলে, আমার আগে তোমার ভাইয়ার চোখে পড়তো। আমি ঠিক আছি ইশিতা। এইসব নরমাল।”
“নরমাল যখন, তাহলে খেয়ে নাও, এসো। আজ আমি খাইয়ে দিচ্ছি তোমাকে।”
“সত্যি আমার খেতে ইচ্ছা করছেনা ইশিতা। প্লিজ, জোর করোনা।”
ইশিতা গাল ফুলিয়ে বলল,
“খেতে ইচ্ছে করছেনা নাকি আমার হাতে খেতে চাইছ না?”
সুমু কপাল কুঁচকালো।
“কী বলো তুমি এইসব? তোমার হাতে খেতে চাইছিনা মানে? আমার এমনি খেতে ইচ্ছা করছেনা।”
“ইচ্ছে করছেনা বললে শুনব না। চলো, হা করো।”
সুমু তবুও খেতে চাইছেনা। ইশিতা জোর করে এক লোকমা তুলে দেয় তার মুখে। মুহূর্তের মধ্যে সুমুর মুখ বিকৃত হয়ে যায়। সে মুখে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“সুমু কী হলো তোমার?”
দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেল সুমু। ইশিতা হতবাক হয়ে পড়ে থাকল এক মুহূর্ত। তারপর ট্রেটা নামিয়ে রেখে ছুটে গেল ওয়াশরুমে। সে সুমুকে ডেকে বলল,
“সুমু, বমি হচ্ছে? তুমি ঠিক আছো তো?”
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানি পড়ার শব্দ এলো। ইশিতা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষা করছে। ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। সুমু টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ধীরে বেরিয়ে এলো। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে, চোখে জল জমে আছে। ইশিতা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো। দুশ্চিন্তায় গলা কেঁপে উঠল তার।
“তুমি ঠিক আছো তো, সুমু? না, এভাবে চলতে পারেনা। আমি ভাইয়াকে এক্ষুনি বলব এইসব।”
সুমু কিছু না বলে ধীরে গিয়ে বেডে শুয়ে পড়ল। বালিশে মুখ গুঁজে রাখল কিছুক্ষণ। তারপর ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
“বাসায় আসুক ইশিতা, আমি নিজে বলব। এখন কল করোনা। সে কাজে ব্যস্ত আছে।”
“কিন্তু সুমু, তোমার থেকে বড় তার জীবনে কিছু নেই। এসব পরে জানতে পারলে ভাইয়া রেগে যাবে।”
“রাগবে না। আমি বুঝিয়ে বলবো। প্লিজ, এখন কিছু বলোনা।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু, তুমি অসুস্থ এটা আগে বলোনি কেনো? কী হয়েছে তোমার?”
“জানিনা কী হচ্ছে! কিছুদিন ধরে খুব মাথা ঘোরাচ্ছে। খাবারের গন্ধ পেলেই বমি আসছে। আজকাল কিছু খেতে মন চায় না।”
ইশিতার চোখ কপালে। ধীরে বেডের পাশে বসে পড়র সে। সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে তাকাল সুমুর দিকে।
“বাই এনি চান্স, তুমি কী প্রেগ…”
সুমু চোখ বন্ধ করল। কোনো উত্তর দিল না সে। ইশিতা সুমুর মাথায় হাত রাখল, চুলে বিলি কাটল ধীরে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ফিসফিস করে বলল,
“সুমু, আমি যা ভাবছি, তা নয়তো? তুমি সত্যি প্রেগ…”
সুমু ধপাস করে উঠে বসল। চোখদুটো বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“দুমাস পিরিয়ড বন্ধ। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো স্ট্রেসে হয়েছে। এসব আমার মাঝে মাঝে হয়। কিন্তু, এই মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, খাবারের গন্ধে অস্বস্তি…”
কথা শেষ করতে না করতেই ইশিতার চোখ খুশিতে চিকচিক করে উঠল।
“তুমি সিরিয়াসলি প্রেগন্যান্ট, সুমু। ও মাই গড! কী খুশির খবর।”
সুমু কিছু বলতে পারল না। তার চোখেমুখে তখনো অবিশ্বাস আর একরাশ বিস্ময়। তার এক হাত বুকের ওপর, যেন হৃদস্পন্দন অনুভব করছে। আরেক হাতে সে আপনাতেই পেটে ছুঁয়ে থাকল আলতো করে। ইশিতার চোখে খুশির ঝিলিক। সে উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাসে করে বলল,
“আমি এখনই গিয়ে সবাইকে বলে আসি। আর ভাইয়াকে একটা কল…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সুমু হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল ইশিতাকে।
“না ইশিতা! আমি আগে টেস্ট করাতে চাই। আমি নিশ্চিত না এখনো। আর তুমি কারো কাছে কিছু বলবে না, প্লিজ। এখন কেউ না জানুক। আমি আগে টেস্ট করি।”
“যদি রেজাল্ট পজিটিভ আসে?”
সুমু চোখে এক চিলতে স্বপ্ন নিয়ে বলল,
“তাহলে সবার আগে আমি সারপ্রাইজ দিতে চাই খান সাহেবকে। ওনাকে সামনে থেকে আমি এই খবরটা বলতে চাই। আর তারপর তার চোখের সেই অভিব্যক্তি, খবরটা জানার পর তার রিয়াকশন আমি চোখের সামনে থেকে দেখতে চাই।”
ইশিতা চুপ করে গেল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল সুমুর মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে, কথা দিলাম! কাউকে কিছু বলব না। কিন্তু সুমু, আমি খুব এক্সাইটেড, আমাদের বাড়িতে নিউ মেম্বার আসবে।”
সুমু হালকা হাসল। তার চোখে এখন অন্যরকম একটা আলো, একটু ভয়, একটু স্বপ্ন, আর খান সাহেবকে ঘিরে এক গাঢ় প্রেমের অনুভূতি। সে জানালার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে ইশিতার দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,
“ইশিতা আমাকে একটা প্রেগনেন্সি কিট এনে দিতে পারবে?”
ইশিতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হেসে বলল,
“ঠিক আছে, আজ বিকেলেই এনে দেবো। কিন্তু আমার ধারণা যদি সত্যি হয়?”
সুমু চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর চমকটা আমি আমার খান সাহেবকে নিজে দেবো।”
ইশিতা আলতো হাসল। সে খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে বলল,
“এই অবস্থায় না খেয়ে থাকা যাবেনা। তোমার যেহেতু খাবারের গন্ধে এখন বমি পাচ্ছে, তাহলে আমি এখন কিছু একটা বানিয়ে আনি, যেটা তোমার ভালো লাগবে।”
ইশিতা চলে গেল। সুমু একা বসে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। পেছনের আকাশটা ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে। সুমু মনে হচ্ছে তা ভেতরেও কী যেন একটা বদলে যাচ্ছে। ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে আছে, “খান সাহেব কলিং!”
সুমুর ঠোঁটে একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শেরাজ গম্ভীর কণ্ঠ বলল,
“খেয়েছ?”
সুমু নরম গলায় বলল,
“না মানে, কিছুটা খেয়েছি।”
“কিছুটা মানে? সুইটহার্ট, তোমার শরীর ঠিক আছে তো?”
সুমু দুষ্টু হাসল। কাচের জানালায় কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,
“আজ একটু অদ্ভুত লাগছে। শরীরটা হালকা ভার লাগছে। আর খাবারের গন্ধ সহ্য হচ্ছে না।”
শেরাজের কণ্ঠ থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে বলল,
“আমি আসছি।”
সুমু তড়িঘড়ি করে উঠে বসল।
“না, না! আপনি আসবেন না এখন। আমি ঠিক আছি। ইশিতা আছে, ও আমার খেয়াল রাখছে।”
শেরাজের কণ্ঠ এবার একটু নরম হয়ে এলো,
“কিছু হলে তুমি লুকাবেনা তো, সুইটহার্ট? আমাকে জানাবে তো?”
সুমুর চোখে জল এসে পড়ল। হাত দিয়ে চোখ মুছে সে বলল,
“কথা দিচ্ছি, কিছু লুকাবো না।”
“ওকে! তাহলে এখন রাখি, সোনা। পরে কল করব।”
“খান সাহেব, শুনুন!”
“হুম বলো!”
সুমু ঠোঁটে দুষ্টু হাসি দিয়ে গান ধরল,
“বন্ধু অফিস যাওয়ার কালে গো,
একটা কোলবালিশ দিয়া গেছে কোলে!
সেই কোলবালিশ লইয়া বুকে,
দ্বিগুন আগুন জ্বলে!”
শেরাজ হেসে ফেলল। সুমুও ঠোঁট কামড়ে হাসছে। শেরাজ হাসি থামিয়ে বলল,
“হেই সুইটহার্ট! তোমাকে অনেক খুশি খুশি লাগছে। আমি কাজে বিজি ছিলাম, তাই ফুটেজের দিকে নজর দেওয়ার সময় পায়নি। কী হয়েছে বলো তো?”
“তেমন কিছুনা, এমনি ভালো লাগছে। আর একটা গান শোনাই?”
“ওকে, শোনাও!”
সুমু দুষ্টু হেসে আবারও গান ধরল,
ওরে মনা,
যৌবনটা বৃথা গেলো, চাইয়া দেখলি না রে
মাখন তোলা রসের গোল্লা, খাইয়া দেখলি না
আমার কাছে আইলে রে তোর, ঠকা হবেনা!”
শেরাজ হঠাৎ একদম গম্ভীর হয়ে গেল। খুব ধীরে গলা নামিয়ে বলল
“তোমার মুখে এই লাইন শুনে আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে।”
সুমু কৌতূহল নিয়ে বলল,
“কী কথা?
শেহেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“যৌবন বৃথা গেল কিভাবে? বউ আমার পাগল হয়ে গেছে নাকি? আজ ভোরেও তো…”
সুমুর শরীর গরম হয়ে এলো। সে লজ্জায় একটু রাগ দেখিয়ে বলল,
“খান সাহেব!”
শেরাজ থামল না। সে আবারও বলল,
“তোমার শরীরের প্রতিটা লোমের গোড়ায় আমার ব্যাড টাচ আছে। প্রতিটা কাঁপুনিতে, প্রতিটি ভারী নিঃশ্বাসে আমার উপস্থিত সচল হয়। তোমার দেহের প্রতিটি ভাঁজ বলে দিতে পারবে তুমি গার্লস হার্টথ্রব শেরাজ খানের পার্সোনাল প্রপাটি।”
সুমু জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি এমন করে বলবেন না।”
শেরাজ এবার হেসে ফেলল।
“তুমি উস্কানিমূলক গান গেয়েছ, আমি শুধু তার উত্তর দিলাম। তুমি যদি চাও, আজ রাতে আরও একবার ডীপলি ব্যাড টাচ করি?”
সুমু লজ্জায় গলা নামিয়ে বলল,
“আমি জাস্ট কিছু ফানি গান শুনালাম আপনাকে। এগুলো আমাদের বিডির গান। আর আপনি…”
শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“আর আমি? আমি তো তোমার শরীরের প্রতিটা গল্প পড়তে চাওয়া পাঠক। একবার শুরু করলে থামা যাবে না।”
সুমু শুধু চুপ করে রইল। তার ঠোঁটে এক চিলতে লজ্জার হাসি। শেরাজের নিঃশ্বাস ভারী হলো। সে কন্ঠে কিছুটা আবেগ জড়িয়ে বলল,
“তোমার ভেতরে একদিন কিছু একটা তৈরি হবে। আমার চারটা ছোট্ট প্রতিচ্ছবি তোমার গর্ভে ঘুমাবে। সংখ্যাটা আরও বেশিও হতে পারে। সেদিন তারা হবে আমার আর তোমার ভালোবাসার চিহ্ন। তোমার মতোই সৌন্দর্য আর আমার মতো আগুনভরা রাগ নিয়ে আসবে ওরা। আমার চারটা ছোটখাটো ভার্সন। ছোট ছোট আফগানি আগুনে রাগী মিনি খানের দল।”
সুমু মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আসছে আমার পাওয়ারফুল জামাই। একসাথে এতোগুলো বেবি দিবেন উনি আমার মধ্যে। একবারে ক্রিকেট টিম বানাতে চাইছেন, মানে বেবি না, যেন ওভারে ওভারে উইকেট।”
শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট মাই স্পার্ম, বেবি। তুমি মুরগির মতো বাচ্চা দিবা। মুরগি ডিম থেকে দেয়, আর তুমি তোমার গর্ভ থেকে ডিরেক্ট দিবা। একবারে ঝামেলা শেষ। বার বার তোমাকে কষ্ট করে প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করতে হবেনা। তারপর বাকি জীবনটা আমরা চিল করে কাটাব। আর তুমি তো, জানোই আমি ক্রিকেট লাভার। ইভেন আমার বাড়ির সকলে ক্রিকেট লাভার। আমার চ্যাম্পরা হবে পুরো একটা ক্রিকেট টিম। ওরা বড় হলে, সবগুলো চ্যাম্পকে আমি একাডেমিতে ভর্তি করে দিব। ওরা সবাই আফগানি ক্রিকেটার হবে।”
“আপনার মাথার কয়টা তার ছিঁড়েছে, খান সাহেব? কী উল্টাপাল্টা বলছেন? আমি কী মুরগি, যে মুরগির মতো বাচ্চা দিব?”
“আরে দিবে দিবে। তুমি শুধু বেবি দিবে না, তুমি ইতিহাস গড়বে। মুরগি একটা ছোট প্রাণী হয়ে, একসাথে এতোগুলো বাচ্চা দিতে পারলে, তুমি মানুষ হয়ে কেনো পারবেনা? তুমিও পারবে, সুইটহার্ট। আমি আমার প্রাইসলেস স্পার্ম দিয়ে তোমার পাশে আছি।”
“আপনার মাথার কোন অংশে পোকা ধরেছে, খান সাহেব? একদিনে ঝাঁকে ঝাঁকে বেবি আসবে, আমি কি ইনকিউবেটর?”
“তুমি ইনকিউবেটর নও, তুমি আমার লাভ মেশিন। আমার হ্যান্ডসাম আর কিউট চ্যাম্পদের, মাম্মা। আর তারা সবাই তোমার মতো সুন্দর হবে, আর আমার মতো গরম মেজাজী।”
সুমু চোখ কুঁচকালো। কিন্তু তার গাল লাল হয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি। কিন্তু সে সেটা চেপে রাখল।
“তাহলে, বেবি আপনি পেটে ধরবেন। আমি পারব না।”
“তুমি পারবে, সুইটহার্ট। একটা ছোট্ট তুমি, একটা ছোট্ট আমি। তারা তোমার গলা ধরে বলবে, ‘মাম্মা! পাপা কই? পাপাকে বলো চকলেট নিয়ে আসতে’।”
“আপনি জানেন খান সাহেব, আপনি অনেক ভালো বাবা হবেন।”
“আর তুমি একজন ভালো মাম্মা হবে। বেস্ট মাম্মা।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ আবারও বলল,
“জানো, যখন তোমায় দেখি, মনে হয়, এই একটা জীবনও বুঝি কম পড়ে যাবে তোমায় ভালোবাসতে।”
সুমুর মুখের হাসি আস্তে আস্তে নিভে গেল। সে কন্ঠে আবেগ জড়িয়ে বলল,
“এসব কথা শুনলে আমি খুব দুর্বল হয়ে যাই।”
“দুর্বল না সুইটহার্ট, তুমি তখন সবচেয়ে শক্ত হয়ে ওঠো। কারণ তখন তুমি আমার ভিতরটা দেখতে পাও।”
সুমু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
“এতো ভালোবাসা কি সত্যি আমার প্রাপ্য ছিল?”
শেরাজ আস্তে হেসে বলল,
“শুধু প্রাপ্য না, তুমি আমার সমস্ত ভালোবাসার কেন্দ্র। তুমি শুধু প্রেমিকা নও, তুমি আমার আশ্রয়, তুমি আমার ঘর। তোমার কোলে মাথা রাখলে মনে হয়, যুদ্ধশেষে শান্তি পেয়েছি।”
দরজা নক পড়ল। সুমু শেরাজকে ‘বায়’ বলে ইশিতাকে ভেতরে আসতে বলল। ইশিতা ঘরে আসতেই সুমু বলল,
“ইশু বেবি! তুমি অলওয়েজ পারমিশন কেনো নাও বলো তো?”
“হাজব্যান্ড ওয়াইফের বেডরুমে পারমিশন নিয়েই ঢুকতে হয়।”
“কিন্তু এখন তো আমার তোমার, কারো হাজব্যান্ডই বাসাতে নেই।”
“হুম তা ঠিক! চলো পরে কথা বলবে, আগে খেয়ে নাও।”
সুমু চুপচাপ বেডের ওপর বসল। ইশিতা খাবার দিয়ে খাইয়ে দিল সুমুকে। খাওয়ানো শেষে ব্যাগ থেকে একটা ছোট প্যাকেট বের করে সুমুর হাতে দিল সে। সুমু প্যাকেটটা দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইশু, এটা?”
ইশিতা নিচু গলায় বলল,
“টেস্ট করে ফেলো, সুমু। অনেকগুলো সাইন মিলে যাচ্ছে।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“তুমি এটা আনলে কোথা থেকে?”
ইশিতা হেসে বলল,
“একজন সার্ভেন্টকে দিয়ে আনিয়েছি চুপিচুপি, কেউ জানে না।”
সুমুর গলার স্বর কাঁপছে। সে কিটটার দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। চোখের সামনে ভাসছে শেরাজের মুখ, তার কথা, ‘তুমি শুধু প্রেমিকা নও, তুমি আমার আশ্রয়, তুমি আমার ঘর।’
সুমু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। হাতে সেই ছোট্ট কিটটা যেন এক রহস্যে মোড়া ভবিষ্যতের চাবি। ইশিতা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সুমু ইশারা করে থামিয়ে দিল তাকে।
“আমি এক্ষুনি আসছি!”
হাত কাঁপছে তার। বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন কানে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে ধীরে ওয়াশরুমে চলে গেল।
ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের চোখে তাকাল। এই চোখে আজ ভয়, কৌতূহল আর একটুকরো স্বপ্ন। কিটটা খুলে নিল সে। সময় যেন থমকে গেল। সময় কাটে এক মিনিট, দু’মিনিট, তিন মিনিট। তার চোখ স্থির হয়ে রইল কিটটার ওপর। ধীরে ধীরে দুটো দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল। দুই লাল দাগ, পজিটিভ। তার নিঃশ্বাস আটকে এলো। কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ চেপে ধরল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। একটা কান্না, যে কান্নায় আছে বিস্ময়, ভালোবাসা আর এক অচেনা মাতৃত্বের আর্তি।
ওয়াশরুমের দরজাটা আস্তে করে খুলে বেরিয়ে এলো। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে।
হাতে শক্ত করে ধরা প্রেগনেন্সি কিট, দুটো দাগ ভেসে আছে।
ইশিতা তখনো বসে আছে বেডের এক কোণে। সে সুমুকে দেখে উঠে দাঁড়াল। সুমু কিছু না বলে কিটটা এগিয়ে দিল তার দিকে। ইশিতা কিটটা দেখে চোখ বড় করে ফেলল।
“সুমু!”
সুমু খুব আস্তে বলল,
“দুটো লাইন, ইশু। দুটো লাল দাগ, এটা কি সত্যি? আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা।”
তার গলা কাঁপছে, ঠোঁটে লেগে আছে হাসি, চোখে চিকচিক করছে পানি। ইশিতা খুশির আবেগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“তুমি, তুমি মা হচ্ছো। সুমু তুমি প্রেগনেন্ট।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“আমার ভেতরে একটা প্রাণ এসেছে, ইশু। খান সাহেব আর আমার ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। আমার খান সাহেবের রক্ত আমার গর্ভে।”
কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলল সে। ইশিতা জড়িয়ে ধরে তাকে।
“তোমরা মা-বাবা হতে চলেছ, সুমু। ভাইয়া খান বাড়ির প্রাণ। খান বাড়ির বংশধর আসছে। তুমি ভাবতে পারছ না সুমু, এইটা সকলে জানতে পারলে ঠিক কী করবে।”
সুমু ইশিতার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছে। সে কান্না গিলে বলল,
“খান সাহেবকে কীভাবে বলব জানি না। উনি শুনলে কী করবেন আমি জানিনা। হয়তো উনি খফরটা শুনলে খুশিতে পাগল হয়ে যাবেন।”
ইশিতা চোখ মুছে হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
“সুমু এটা তো সেলিব্রেট করার মতো খবর। আমি এখনই আসছি।”
সে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সুমু পেছন থেকে হতবাক হয়ে বলল,
“ইশু, কোথায় যাচ্ছো?”
ইশিতা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
“মিষ্টি আনতে। খান বংশের মেজো খান সাহেবা মা হবে, এই খবরে মিষ্টি না খেয়ে থাকা যায়?”
সুমু হেসে ফেলল। গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এই কান্না আর হাসির মিশ্রণে সে যেন নিজেকেও চিনতে পারছে না। সে বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা তার আর শেরাজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
◆◆বিকালের নরম রোদ আর হালকা বাতাসে ফারিয়া ছাদে দাঁড়িয়ে চুল শুকাচ্ছে। ওড়নাটা উড়ছে বাতাসে। পেছন থেকে আস্তে আস্তে উঠে এলো শাহরুখ। দোলনার ওপর বসে বলল,
“ওই ফারু, এইটা তোর কেমন স্টাইল? চুল শুকাতে এসেছিস নাকি নায়িকা সাজতে? শুনলাম আজ কলেজেও যাসনি।”
ফারিয়া চোখ না ঘুরিয়েই বলল,
“তোমার মতো আনস্মার্ট মানুষের কাছে সবকিছুই স্টাইল মনে হয়, যত্তোসব।”
শাহরুখ ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“আজকে বেশ তেজি মুডে আছিস, দেখছি। হ্যাঁ রে, ইনস্টাগ্রামে ওই ছেলেটার পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিয়েছিস কেন?”
ফারিয়া এবার ঘুরে দাঁড়াল। দুই হাত কোমরে রেখে বলল,
“কোন ছেলের পোস্ট? তুমি আবার আমার ইনস্টাগ্রাম ঘাঁটো কবে থেকে?”
শাহরুখ গলা নামিয়ে বলল,
“আমি কিছু ঘাঁটি না। তোর উল্টাপাল্টা কর্ম আমার সামনে দিয়ে ঘোরে। এখন বল, ওই ছেলেকে চিনিস?”
ফারিয়া ঠোঁট বাঁকাল।
“হ্যাঁ, চিনি! আর তাতে তোমার সমস্যা কী? তাছাড়া তুমি এই সময়ে আমাদের বাড়িতে কী করো। আজকাল একটু বেশি আসছো আমাদের বাড়িতে। ব্যাপারটা কি তোমার? ভালোবেসে ফেলেছ নাকি আমাকে?”
শাহরুখ দোলনা থেকে নেমে এক ধাপ এগিয়ে এলো।
“ভালোবাসব আর তোকে? হাউ ফানি! আর শোন, সমস্যা আমার না, সমস্যাটা তোর।”
“কেন? আমাকে কী ভালোবাসা…”
হঠাৎ নিচ থেকে পিয়াসের ডাক ভেসে এলো। ফারিয়া থেমে গেল। শাহরুখ চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। ফারিয়া এগিয়ে এসে বলল,
“আরে, আরে! আমার সঙ্গে একটু সময় কাটাও।”
শাহরুখ হাসল। সে পিয়াসের ডাকে সাড়া দিয়ে বলল,
“কিছু কাজ আছে, পরে আসব।”
শাহরুখ ছাদ ত্যাগ করে। ফারিয়ার ছাদের শেষ প্রান্তে এসে তাকিয়ে রইল শাহরুখের চলে যাওয়ার দিকে।
◆◆অফিসের কেবিন রুমে বসে আছে শেরাজ। চারদিকে সাদা দেয়াল আর বড় একটা ডেস্ক, যেখানে ল্যাপটপ আর কিছু ফাইল পড়ে আছে। শেরাজ তার কাজের মাঝে আইয়ুব আর রাহিনের কেবিনের সিসিটিভি মনিটর দেখে ভ্রু কুঁচকালো। মনিটরে দেখা যাচ্ছে, আইয়ুব আর রাহিন ফোনে কথা বলছে। শেরাজ স্যান্ডিকে কল করল। স্যান্ডি কল রিসিভ করতেই সে গম্ভীর গলায় বলল,
“কেবিনে এসো!”
কল কাটল সে। স্যান্ডি কেবিনে এলো। শেরাজ সিসিটিভি ফুটেজের দিকে আঙুল তাক করে গম্ভীর গলায় বলল,
“আজকে ওই দুটোকে অফিস থেকে না বের করলে, তোমার চাকরি আমি খেয়ে নিব। সেই সাথে অভিশাপ দিব, তোমার কোনোদিনও বিয়ে হবেনা।”
স্যান্ডি অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
“চাকরি খেয়ে নেবেন? আর আমার বিয়ে হবে না? একসাথে হুমকি আর অভিশাপ দিলেন স্যার? দুটো একটু আলাদা আলাদা দিন স্যার। একসাথে দুটো হজম হচ্ছেনা।”
“এমনিতেও তোমার কপালে মেয়ে জুটবে না, সান। আমি জানি তোমার ইঞ্জিনে সমস্যা আছে।”
স্যান্ডি ভ্রু কুঁচকে কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
“স্যার, ইঞ্জিন? আমি গাড়ি নাকি?”
শেরাজ ঠান্ডা গলায় চেয়ারে হেলে বসে উত্তর দিল,
“গাড়ি না হও, গাড়ি চালানোর যোগ্যও তো নেই। স্টার্ট দিলে তো শুধু ঘরঘর শব্দ করে, চলে না।”
স্যান্ডি থতমত খেয়ে গেল। গলার স্বর নামিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
‘স্যার, একটু বেশিই ইঙ্গিতপূর্ণ হলো না? আমিও একদিন বিয়ে করব।”
শেরাজ হাসল না, বরং ঠান্ডা গলায় বলল,
“সত্যি কথা তেঁতো লাগে, সান? ইঞ্জিনে তেল থাকলে তবেই না বিয়ের পথে রওনা হওয়া যায়।”
স্যান্ডি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল মাথা নিচু করে। হঠাৎ মুখ তুলে বলল,
“আমি এখনই আইয়ুব স্যার আর রাহিন স্যারকে বের করে দিচ্ছি, স্যার। শুধু একটা কথা…”
“বলো!”
“আমার ইঞ্জিনে সমস্যা নেই, স্যার। তেল ও ফুল আছে, শুধু গ্যারেজটাই খালি।”
“গ্যারেজ খালি থাকলেও, ইঞ্জিন যদি অকেজো হয়, তাহলে গাড়ি চলেনা। আর গাড়ি নষ্ট গাড়িতে কেউ ওঠেনা, সান।”
“স্যার, সব গাড়ি তো ফার্স্ট হ্যান্ড হয় না। কিন্তু, আমার গাড়ি যে পাবে, সে কিন্তু ফাস্ট হ্যান্ড গাড়ি-ই পাবে।”
শেরাজ কিছু বলল না। স্যান্ডি আবারও বলল,
“স্যার, ওরা ফোনে প্রেম করে আর আমি ভুগি কেন?”
“তুমি সবকিছুর দেখাশোনা করো, মানে ক্যাপ্টেন। জাহাজ যদি ডুবে, দায় তো তোমারই হবে। এখন যেটা বলেছি, করো।”
স্যান্ডি চলে গেল। পাঁচ মিনিট পর আবারও ফিরে এসে বলল,
“স্যার, রাহিন স্যার আর আইয়ুব স্যারের ফোন নিয়ে এসেছি। আপনার কাছে জমা দিলাম।”
“ভালো করেছো। আজ তো নতুন এমপ্লয়ি আসার কথা ছিল, তাই না?”
“হ্যাঁ, স্যার!”
“এখনো এসে পৌঁছায়নি নাকি?”
“না, স্যার।”
“ওকে! এলে আমার কেবিনে পাঠিয়ে দিও।”
“ওকে স্যার!”
স্যান্ডি চলে গেল। শেরাজ আবারও নিজের কাজে মন দিল। সারবাজ কেবিনের দরজায় ঠেলে ঢুকল, হাতে একটা ফাইল।
“এস.কে একটু সময় হবে? একটা জরুরি ব্যাপার নিয়ে কথা বলব।”
শেরাজ কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বল!”
সারবাজ ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“এই রিপোর্টটা পড়বি। কিছু ক্লায়েন্টের ব্যাপারে তথ্য আছে, যাদের সাথে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজেক্টের চুক্তি হতে পারে।”
শেরাজ ফাইল হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বলল,
“ঠিক আছে, তুই আপডেট বল।”
“আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কয়েকটা নতুন টেকনোলজি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। আমরা ওদের থেকে পিছিয়ে পড়লে বিপদ।”
শেরাজ গম্ভীর হয়ে বলল,
“ঠিক বলেছিস। আমাদেরও আপডেট নিতে হবে। পরিকল্পনা করতে হবে দ্রুত।”
“আমি কিছু প্রস্তাব নিয়ে এসেছি, আলোচনা করলে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।”
“ওকে, কাল মিটিং রাখ। দেন, এসব বিষয়ে আলোচনা করব।”
“ওকে!
সারবাজ কেবিন থেকে ফাইল হাতে নিয়ে ফাইল দেখতে দেখতে বেরিয়ে যাচ্ছিল। চোখ ফাইলের পৃষ্ঠায় থাকায় সে সামনে নজর না দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ করে সামনে থেকে দ্রুত হেঁটে আসা একজন মেয়ের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগল। সারবাজের হাত থেকে ফাইল পড়ে গেল। মেয়ে পড়ে গিয়ে চোখ কুঁচকে বলল,
“আপনি কী চোখে দেখেন না নাকি? ফাইল নিয়ে মডেলদের মতো হাঁটছেন কেন?”
সারবাজ রেগে বলল,
“আমি না হয় চোখে দেখিনা। আপনি কেনো দেখেননি? আপনি কি উড়ে উড়ে হেঁটেছিলেন? একটুও ব্রেক নেই আপনার হাঁটার মধ্যে?”
মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত কোমরে বেঁধে বলল,
“ব্রেক তো আমার ভালোই ছিল, আপনার গাড়িটাই বেপরোয়া ছিল।”
সারবাজ হাসতে হাসতে বলল,
“গাড়ি না, ম্যাডাম, আমি মানুষ। আর আপনি তো মনে হচ্ছে হড়বড়িয়া এক্সপ্রেস।”
“লিসেন! আমার নাম ইনায়া, এক্সপ্রেস নয়। আর আপনি মনে হয় অফিসে হিরো সাজতে এসেছেন। ভাব দেখো, মনে হচ্ছে হিরো।”
“আমি হিরো না, আমি এই অফিসের বসের বড় ভাই। আর হিরো যদি হইও, তাহলে আপনার কী? দিনটা তো সুন্দর ছিল, কোথা থেকে এই মেয়ে উড়ে এলো কে জানো।”
“উফ! অহংকারের লেভেল তো গগনচুম্বী। আপনার সাথে তর্ক করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”
“ভুলগুলোই তো সুন্দর গল্প বানায়, ইনায়া এক্সপ্রেস।”
“আমাকে আর একবার এক্সপ্রেস বললে, আপনার খবর করে ছাড়ব আমি।”
সারবাজ চ্যালেঞ্জিং ভঙ্গিতে বলল,
“আগে নিজে ব্রেক কন্ট্রোল করতে শিখুন, তারপর হুমকি দিবেন। আর আমি না হয় ফাইলে দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম, কিন্তু আপনি কি অন্ধ? নিশ্চয় অন্ধ। কারণ, অন্ধ না হলে তো দেখার কথা, যে সামনে থেকে মানুষ আসছে।”
মেয়ে রেগে গিয়ে বলল,
“মানুষ? আপনি? মনে হয়নি।”
“আর আপনি কী? সাজ দেখেতো মনে হচ্ছে, শো”তে এসেছেন।”
“শো’তে আসিনি, তবে আপনার মতো গরুর সামনে দিয়ে হাঁটা যে বিপজ্জনক সেটা বুঝে গেছি।”
সরবাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আপনি মেয়ে তা ঠিক, কিন্তু ভদ্রতা বলতে কিছু জানেন না।”
“ভদ্রতা আপনি শিখাবেন? যে মানুষ ধাক্কা মেরে সরি না বলে উল্টো ঝগড়া করে, তার থেকে পাঠা অনেক বেশি ভদ্র। আর আপনি এসেছেন আমাকে অভদ্র বলতে?”
“আমাকে গরু বললেন, পাঁঠা বললেন। চিড়িয়াখানা খুলেছেন নাকি?”
“না, চিড়িয়াখানা খুল নি। কিন্তু যদি খুলি, আপনাকে প্রথমে বন্দী করব বোকা প্রাণী সেকশনে।”
সারবাজ দাঁত চেপে বলল,
“আপনার মুখের শব্দগুলোকে সার্জারি করে থামানো উচিত।”
“আর আপনার অভদ্রতা রিমুভ করার জন্য অপারেশন দরকার।”
“ভারি অভদ্র তো আপনি। কোন ডিপার্টমেন্টের আপনি?”
“নিউ! আর আপনি কি বুড়ো মানে ওল্ড?”
সারবাজ চোখ সরু করে বলল,
“কথা বলার স্টাইলটা ঠিক করুন। আমি আপনার বসের বড় ভাই।”
“বসের বড় ভাই হয়েও কোনো ভদ্রতা নেই আপনার মধ্যে।”
“আপনি খুব ভদ্রতা জানেন? রাস্তার মেয়েদের মতো তো ব্যবহার। এখানে কেউ রাস্তার মেয়েদের মতো আচরণ করলে, আমি ছেড়ে কথা বলি না। দেখে নেব আপনাকে।”
ইনায়া এক’পা এগিয়ে বলল,
“কি বললেন আপনি? আমার ব্যবহার রাস্তার মেয়েদের মতো? অসভ্য লোক একটা। আর আপনি হুমকি দিচ্ছেন কাকে? আমি সস্তা ভয় পাই না। আমিও আপনাকে দেখে নিব।”
সারবাজ চোখে আগুন নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, মিস। এই অপমানের জন্য আপনি আফসোস করবেন। অফিসের ভেতরেই বুঝিয়ে দেব, কে কী করতে পারে।”
“অফসোস তো আপনি করবেন, যখন বুঝবেন ভুল মানুষের সঙ্গে ঝামেলা করেছেন।”
“আপনার এই অসভ্য মুখ বন্ধ করতে আমার বেশি টাইম লাগবে না।”
সারবাজ চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। ইনায়া মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“গামবাট একটা! হেট ইউ।”
ইনায়া শেরাজের কেবিনের দিকে পা বাড়াল। সারবাজ শুনতে পেলে কথাগুলো। সে পেছন ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“এই কাটপিস,
যা চেপে যা
পাঙ্গা নিয়ে ভুল করছিস!
ইনায়া ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝাঝালো কন্ঠে বলল,
“এই গামবাট,
চল দূর হাট
তখন থেকে ভাট বকছিস!”
সারবাজ এগিয়ে এসে রাগি কন্ঠে বলল,
“প্যাঁচি মুখী!”
ইনায়া আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“এই গামবাট!”
সারবাজও আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“এই কাটপিস!”
দুজনের মধ্যে মারামারি লেগে যাবার মতো অবস্থা। অফিসের সকলে হা করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। এই দৃশ্য দেখে স্যান্ডি, আইয়ুব, আর রাহিনরা সকলে দ্রুত এগিয়ে এলো। আরবাজ ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“বন্ধ করো, ব্রো। অফিসে মারামারি চলবে না।”
আইয়ুব নিজের হাসি ঠেকিয়ে বলল,
“এটা অফিস না রিংম্যাচ? কেউ একজন শান্ত হও।”
হঠাৎ কেবিনের দরজা খুলে গেল। শেরাজ নিজে বেরিয়ে এলো। গম্ভীর মুখ, তীক্ষ্ণ চোখে এক ঝলক তাকায় দু’জনের দিকে। তার চোখে এক ধরণের প্রশ্ন, আর মুখে বিরক্তির রেখা। তাকে দেখে পুরো অফিস নীরব যেন কিছুই হয়নি। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। শেরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,
“কারা ছিল চিৎকারে ব্যস্ত?
কেউ উত্তর দিল না। সবার মাথা নিচু। শেরাজ করিডোর পেরিয়ে সবার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠাণ্ডা চোখে পুরো টিমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এটা কী অফিস নাকি নাট্যমঞ্চ?”
সকলে চুপ। শেরাজ আবারও বলল,
“আপনাদের বেতন দেওয়া হয় নাটক করার জন্য না? আমি এসব টলারেন্স করিনা। এখানে এসব অশোভন আচরণ, চিল্লাচিল্লি, পাঙ্গা নেওয়া চলেনা। আর যারা এগুলো করে, তারা শুনে রাখুন, আমার অফিসে টিকতে পারবেন না।”
শেরাজ তীব্র দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল সারবাজ আর ইনায়ার দিকে। সে সারবাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোর কি আমার অফিসে কাজ করার ইচ্ছা নেই, সারবাজ? যদি তাই হয়, তো প্যাকিং করে এখনই বের হয়ে যা।”
সারবাজ গম্ভীর হয়ে মাথা নিচু করে রাখল। শেরাজ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে, গলার টোন একটুখানি নরম করে চোখে আগুন নিয়ে বলল,
“আর আপনি? নতুন এসেছেন বলে কিছু বলিনি এখনো। কিন্তু যদি ভাবেন আমি এইরকম বেয়াদবি মেনে নেব, তাহলে ভুল করছেন।
আমার সামনে আরেকবার এইরকম আচরণ হলে, আপনার চুক্তিপত্র ছিঁড়ে আমি নিজে বের করে দেব, ক্লিয়ার?”
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শেরাজ চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই চুপ হয়ে গেল। শেরাজ সবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলল,
“নেক্সট টাইম আই ওন্ট রিপিট মাইসেল্ফ। এইটা অফিস, সুনির্দিষ্ট নিয়ম, শৃঙ্খলা, আর পেশাদারিত্বের জায়গা। যারা নিজেদের আচরণ ঠিক রাখতে পারেন না, তারা আমার টিমে থাকার যোগ্য না। আপনারা কী জানেন না, আমি সবকিছু দেখি? এই যে চিৎকার, ঝগড়া, বাজে র্যাগিং ফুটেজে এক এক ফ্রেম দেখে এসেছি। বাচ্চা মনে করেছেন আমাকে?”
একজন এমপ্লয়ি গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু বলতে চাইল, তার আগেই শেরাজ চোখ রাঙিয়ে বলল,
“জাস্ট শাট আপ! কেউ মুখ খুলবেন না। আমার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, নো সাউন্ড।”
অফিস নিঃশব্দ। শেরাজ ধীরে বলল,
“আমার এই অফিস অনেক কষ্টে দাঁড়িয়েছে। এখানে কেউ কারও সঙ্গে অপমানজনকভাবে কথা বলবে না, নাটক করবে না, আর কেউ নিজেকে ড্রামা কুইন ভাবও আমি সহ্য করব না।”
সে ইনায়ার দিকে তাকাল। মেয়েটা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল। শেরাজ গম্ভীরর গলায়, খুব স্পষ্ট করে বলল,
“আর কেউ যদি ভাবে, এই অফিস তার খেলার মা, তাহলে আজই আমার দরজা তার জন্য বন্ধ।” সে এক মুহূর্ত চুপ করে আবারও বলল, “আমার টাইম নষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। আমার ধৈর্যের সীমা খুব ছোট। সবাই বুঝে নিন, এটাই প্রথম এবং শেষ ওয়ার্নিং। নেক্সট টাইম আমি কাউকে ছাঁটাই করতেও দুইবার ভাবব না।”
কেবিনে চলে গেল সে। পুরো অফিস স্তব্ধ। কেউ আর কথা বলল না, হাসল না, কেউ নিজেদের ফোনের দিকেও তাকাল না। সকলে নিঃশব্দে কাজ শুরু করে দিল। সারবাজ নিজের ডেস্কে চলে গেল। মেয়েটির বিড়বিড়িয়ে বলল,
“শেরাজ খান ছবির থেকেও বাস্তবে অনেক বেশি হ্যান্ডমাস। যতই রাগি হোক, চোখে একটা গল্প আছে।”
হঠাৎ একটা মেয়ে পাশে এসে তার পাশে দাঁড়াল। আলতো হেসে বলল,
“হেই, আমি নীলা! একটা কথা বলি?”
ইনায়া ভদ্রভাবে বলল,
“জি, বলুন!”
“ওদিকে নজর দিওনা অতটা। ছ্যাঁকা খাবে, খাঁটি কয়লার ছ্যাঁকা। আমাদের স্যার তো অলরেডি বুক।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
নীলা ফিসফিস করে বলল,
“মানে অনেক কিছু। তুমি যত ভাবছো, উনি তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। স্মার্ট মেয়েরা তার কাছাকাছি যেতে ভয় পায়। আর কেউ ঘেঁষলে ছাই হয়ে যায়। আর হ্যাঁ, স্যারের সামনে বেশি স্মার্টনেস দেখাতে যেওনা। উনি পছন্দ করেন না এইসব। তুমি হয়তো কিছু জানো না, তাই এত সাহস। আমাদের স্যারকে এভাবে দেখলে, খুব খারাপ ফল পাবে।”
“মানে, বুঝলাম না!”
“একটু দূরত্ব রেখে চলো, ইনায়া। ওই মানুষটা কারো জন্য নয়। হিজ অলরেডি ম্যারিড।”
ইনায়া চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“কি বললেন? ম্যারিড?”
নীলা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“আহারে! এতটা সিরিয়াস হবার আগে স্যারের সম্পর্কে একটু রিসার্চ করে নেওয়া উচিত ছিল।”
ওদের কথার মধ্যে সান এসে ইনায়াকে বলল,
-আপনাকে স্যার ডাকছেন!”
ইনায়া আর দাঁড়াল না। হাঁটা ধরল কেবিনের দিকে। সে কিছুটা ধীরে হেঁটে শেরাজের পারমিশন নিয়ে কেবিনে ঢুকল।
“আপনার নাম?”
ইনায়া স্পষ্ট গলায় বলল,
“ইনায়া রহমান!”
শেরাজ বাঁকা হাসল, যেন সে আগে থেকে সবটা জানে। সে কিছু লিখতে লিখতে বলল,
“ইনায়া রহমান, আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করব আপনাকে। আপনি কী সত্যি এখানে কাজ করতে চান? নাকি তিন দিনের মধ্যে ট্রান্সফার লেটার হাতে নিতে চান?”
ইনায়া থতমত খেয়ে গেল। সে চেষ্টা করল নিজের কণ্ঠ স্থির রাখতে।
“আমি কাজ করতে চাই, স্যার।”
“তাহলে মুখ নয়, কাজ চালান। এই অফিসে কে কাকে কী বলল, কে কাকে গামবাট ডেকেছে, এগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার নেই। আপনি যদি নিজেকে প্রমাণ করতে চান, তাহলে একটাই রাস্তা, আপনার পারফরমেন্স।”
“কিন্তু স্যার! উনি তো আমার সাথে…”
শেরাজ ল্যাপটপের দিকে নজর রেখে বলল,
“আপনি অফিসে ঝগড়া করতে এসেছেন, না কাজ করতে?”
“আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলাম, স্যার। কেউ যদি আমাকে অপমান করে, আমি চুপ থাকব না।”
শেরাজের গলার স্বর নিচু কিন্তু ভয়ানক টোন টেনে সে বলল,
“এই অফিসে আমার অনুমতি ছাড়া এক চুলও হিললে, সেটা ডিসিপ্লিন ভায়োলেশন হয়। আর আপনি ঝগড়া করেছেন জনসম্মুখে।”
ইনায়া চুপসে গেল। শেরাজ এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,
“ডু ইউ থিংক আই রান দিস প্লেস ফর স্ট্রিট ফাইটস?”
ইনায়া জেদি গলায়, কিন্তু ভেতরে টানাপোড়ন আর ভয় নিয়ে বলল,
“আমি কাউকে ছোট করিনি, স্যার। আমারও সম্মান আছে।”
শেরাজ চোয়াল শক্ত করে বলল,
“সম্মান নিজে অর্জন করতে হয়, কেউ দয়া করে দেয় না। আপনি যদি এই অফিসে থাকতে চান, তাহলে বুঝে চলা শিখুন। আপনি এখন আমার অফিসের একজন রেজিস্টার্ড স্টাফ। যদি নিজেকে ঠিক করতে পারেন, তাহলে ভালো। আর না পারলে, দরজা খোলা আছে। এই অফিসে কাজ করার জন্য মেরুদন্ড আর আত্মনিয়ন্ত্রণ দরকার। আরেকবার যদি অফিস আপনার লাউড কণ্ঠ শুনতে পাই, তাহলে আই অ্যাসিউর ইউ, আগামীকাল সকালটা এই অফিসে শুরু হবে আপনাকে ছাড়া। অ্যান্ড হ্যাঁ, এটাই আপনার প্রথম ও শেষ সুযোগ। নিজের অবস্থান প্রমাণ কাজে করুন, কণ্ঠে নয়। নাউ নিভ।”
খান সাহেব পর্ব ৪৫
ইনিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে গেল। সে
বেরিয়ে যেতে না যেতেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল স্যান্ডি। দম ফেলতে না ফেলতেই সে বলল,
স্যার! রায়য়ান চৌধুরী, হি ইজ হিয়ার।”
শেরাজ মাথা তুলল না। পেনের ঢাকন লাগিয়ে রেখে বলল,
“আসতে কে দিয়েছে ওকে ভেতরে?”
“সে নিজেই। সিকিউরিটি আটকাতে পারেনি, স্যার। সে বলল, ‘আপনার সাথে দেখে না করে যাবে না’।”
“আসতে দাও। দেখা যাক, পুরোনো ভূত আবার কোন দরজায় কড়া নাড়ছে।”
