খান সাহেব পর্ব ৪৭
সুমাইয়া জাহান
রুমটা আজ অচেনা। দেয়ালে যে ঘড়িটা টিকটিক করে চলতো, আজ তার শব্দ নেই। হয়তো ব্যাটারি ফুরিয়েছে, অথবা শেরাজ নিজেই থামিয়ে দিয়েছে। সময়ের দরকার কি তার জীবনে? সময় থেমে গেছে। তার বুকের ঠিক মাঝখানে ভারী করে সময় থেমে গেছে। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা বইগুলো খোলা। পাতাগুলো উল্টে গেছে হাওয়ায়। সুমুর প্রিয় ফুলদানিটা আজ তিন টুকরো হয়ে পড়ে আছে কার্নারের ধারে। পুরো রুম লন্ড-ভন্ড, দেখে মনে হচ্ছে কেউ বহু পুরানো আক্রোশ মিটিয়েছে রুমটার সাথে।
বিছানার এক কোণে উপুড় হয়ে পড়ে আছে শেরাজ। সাদা চাদর তার দেহের ওপর। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে চোখের ওপর পড়ে আছে। নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। না, এটা শান্তির নিঃশ্বাস নয়, এটা ক্লান্তির নিঃশ্বাস। বুকের ভেতর থেকে জমে থাকা কিছু না বলা কথার ভারে ভারাক্রান্ত নিঃশ্বাস।
হঠাৎ বাতাসে জানালার পর্দা সরে গিয়ে একটুকরো সোনালি রোদ এসে পড়ে শেরাজের মুখের ওপর। চোখের পাতার ভাঁজে এসে লেগে থাকে সেই আলোটা। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে যায় তার। ক্লান্ত ভ্রু দুটোতে জড়ানো থাকে কিছু অব্যক্ত অভিমান। আজ যেন এই আলোটাও তার শত্রু। সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। ঘোলাটে চোখে দেয়ালের দিকটা একবার দেখে কিছুই চিনতে পারে না। চারপাশটা যেন ঝাপসা তার কাছে। গলা শুকিয়ে গেছে তার, যেন অনেক বছর ধরে কথা বলেনি।
সে উঠে বসল না। শুধু ঘাড়টা ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। বাহিরে পাখির ডাক অসহ্য লাগছে তার কাছে। শেরাজ চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তার বুকের ভেতরে কিছু একটা চাপা পড়ে আছে। হয়তো না বলা কিছু, নয়তো হারানো কিছুর অভিমান, কিংবা শুধুই একটা নাম, যা সে এখন মনে করতে পারছেনা। সে এখনো জানেই না, কাল রাতে নীরবতার যে স্বস্তি সে অনুভব করেছিল। সেটি নেহাতই ছিল এক ভুল বোঝাবুঝির জ্যোৎস্না। সে জানেই না, নিজেরই হাতে সে ছিঁড়ে ফেলেছে একটি চুপচাপ প্রসারিত হাত, যেটি তার ভালো থাকার কারণ একমাত্র ছিল।
সে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল আরও কিছুক্ষণ। রোদের রেখাটা তার চোখ থেকে না সরে, বরং ধীরে ধীরে ঘাড় বেয়ে বুক অবধি নামল। গায়ের ভেতর কোথাও যেন উঠল তার। সে উঠে বসল। মাথাটা ভার লাগছে। অসহ্য যন্ত্রণায় সে কপালের দুপাশ চেপে ধরে বসে পড়ে বিছানার ধারে। ঘরের বাতাস থমথমে, যেন কিছু একটা ঘটেছে। হঠাৎ রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে সে কেঁপে উঠল। ড্রেসিং টেবিলের ওপর সব জিনিস এলোমেলো, আয়নাটা ভেঙে আছে। চুড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। পর্দা আধখোলা, জানালার কাচে আঙুলের আঁচড়, বেডসাইড টেবিলটা উল্টে পড়ে আছে। গ্লাসের ভাঙা টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়াল সে। গলার রুদ্ধস্বরে এক ঝটকায় চিৎকার করে বলল,
“সুমু! কই তুমি?”
কোনো সাড়া এলো না। শেরাজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। হাঁপাতে হাঁপাতে সে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা খোলা, ভেতরটা ফাঁকা। সে আবারও ডাক ছাড়ল।
“সুইটহার্ট! তুমি কোথায়?”
তবুও কোনো সাড়া নেই। শেরাজ রুমের দরজার দিকে তাকাল। রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে আরও মরিয়া হয়ে উঠল সে। ফোনটা খুঁজে বের করে নাম্বার ডায়াল করল। শেরাজের মাথা ঝিমঝিম করছে, কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা তাকে থেমে থাকতে দিচ্ছে না। হঠাৎ নিঃস্তব্ধ রুমের ভেতর একটানা কাঁপা শব্দ শোনা গেল। সুমুর ফোন বাজছে। শেরাজ তড়িঘড়ি করে শব্দের উৎস খুঁজে বেড়াতে লাগল। ড্রেসিং টেবিলের নিচ থেকে একটু দূরে, পর্দার পাশে মেঝেতে পড়ে আছে সুমুর ফোনটা। হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলল সে। কয়েক সেকেন্ড ফোনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল সে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে তার। চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“ফোন রেখে কোথায় গেল মেয়েটা? আর এই রুমটা এভাবে…”
নিজেকেই প্রশ্ন করল সে। হঠাৎ শেরাজের দৃষ্টি আটকে গেল মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ছোপ ছোপ রক্তের দিকে। বুকের ভেতর কেমন যেনো ধক করে উঠল তার। গলার ভেতরটা শুকিয়ে এলো। পা জমে গেল মাটির সাথে। আস্তে করে বলল,
“এই রক্ত? সুমুর?”
ঝুঁকে রক্তের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। মনে করার চেষ্টা করে, গত রাতে ঠিক কী হয়েছিল? কিন্তু মনের পর্দা যেন ঘোলা কুয়াশায় ঢেকে গেছে। মাথার ভেতর যন্ত্রণাটা চিৎকার করছে। সে কপাল চেপে ধরে একবার চোখ বন্ধ করে ধীরে পা বাড়াল দরজার দিকে। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে রুমের এক কোণে, জানালার নিচে ভেঙে পড়ে থাকা একটা বস্তুর দিকে। ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল সে। ধীরে পা ফেলে পৌঁছায় জিনিসটার কাছে। হাত বাড়িয়ে তোলার সময় বুকটা কেঁপে উঠল তার। আঙুলের ফাঁকে এসে ধরা দেয় একটা ভাঙা প্রেগনেন্সি কিট। ভাঙা হলেও টেস্ট স্ট্রিপটা এখনো স্পষ্ট। কিটটার মাঝে লেগে থাকা রক্তের ফোঁটার ওপর ভেসে আছে দুটো দাগ। সে অবাক চোখে তাকাল।
“পজিটিভ!”
শেরাজ স্তব্ধ। হাতটা কাঁপছে তার। চোখের পলক পড়ল না। ঠোঁট খোলা, কিন্তু কথা বেরোয় না আর। সে যেন আটকে গেছে। অস্ফুট গলায় বলল,
“সুমু, এইটা কী করেছো তুমি আমার সাথে? কবে হলো এসব?”
শেরাজ আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বুকের ভেতরটা ব্যথায় চেপে আসছে তার। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও কিটটা শক্ত করে ধরে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। তার চোখ খুঁজছে শুধু সুমুর মুখ।
ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল সে। চারপাশে তাকাল, কিন্তু কেউ নেই ড্রয়িংরুমে। ঘড়ির কাটায় বেলা ১:২৭ বাজে। শেরাজ গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“সুমু!”
তার কণ্ঠের তীব্রতা গোটা বাড়ি কাঁপিয়ে তুলল। শেরাজ আবারও ডাকল,
“মম, ড্যাড! সবাই কোথায়?”
ড্রয়িংরুমে ছুটে এলো সকলে। অনন্যা খাতুন ছুটে এসে ছেলের কাছে গেল। ছেলের অবস্থা দেখে তিনি মরিয়া হয়ে উটলেন। চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“শেরাজ, কি হয়েছে বেটা? একি হাল হয়েছে তোর?”
শেরাজ সকলের মাঝে সুমুকে খুঁজল। সুমুকে দেখতে না পেয়ে বলল,
“মম, সুমু কোথায়?”
অনন্যা খাতুন ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“সুমু কোথায় মানে? ও’তো তোর সাথে তোর রুমে ছিল। তোরা তো ঘুমাচ্ছিলি।”
“নেই মম। আমার রুমের দরজা ভেতর থেকে লক ছিল। সুমু ছিল না রুমে। কোথায় গেল ও?”
অনন্যা খাতুন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। সাহাবাজ সাহেব চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“কোথায় গেলো মানে? তোমাদের রুমের দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। আর সুমু মামনি তো নিজের রুমে ছিল। ও’তো এখানে কাউকে চেনেনা, কোথায় যাবে? আর বাড়ির মেইনগেট ও বন্ধ ছিল।”
শেরাজ দিশেহারা হয়ে এদিক ওদিক তাকাল। শ্বাস কষ্টের মতো এক অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরল। সে যেন নিজের উপরেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। সারবাজ এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলল,
“কি হয়েছে তোর? কাল থেকে তোর বড্ড অদ্ভুত ব্যবহার দেখছি। কাল অফিসে কেবিনের সবকিছু ভাঙচুর করেছিস। টেবিল, গ্লাস, ল্যাপটপ সব ছুঁড়ে মেরেছিস। আমাদের সবাইকে তুই নিজে চেঁচিয়ে অফিস থেকে বের করে দিয়েছিস।”
শেরাজ হতভম্ব হয়ে তাকাল সরাবাজের দিকে। তার ঠোঁট কাঁপছে, গলা শুকিয়ে আসছে।
“আমি? আমি এসব করেছি? কখন? আর আমি’তো অফিসে ছিলাম। বাড়িতে কখন ফিরলাম?”
সে হাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরল। স্মৃতি খুঁজে পায় না কিছুতেই। সে আবারও বলল,
“আমি তো ঘুম থেকে উঠে ওকে দেখিনি। ও কোথায়?”
হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথায় কুঁকড়ে উঠল সে। চোখে অন্ধকার নেমে এলো। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল,
“আহ! আমি কিছু মনে করতে পারছি না। আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে।”
সবাই একসাথে দৌড়ে এগিয়ে এলো তাকে ধরতে। অনন্যা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে ছেলের মাথা বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
“শেরাজ, শান্ত হ বেটা। প্লিজ, শান্ত হ। তোকে ডাক্তার দেখাতে হবে।”
সারবাজ নিচু গলায় আরবাজকে বলল,
“কিছু একটা হয়েছে ওর সাথে। কাল ওর ব্যবহার আর আজ ওর ব্যবহার একদম আলাদা। আর ও কি বলছে? সুমু রুমে নেই মানে?”
আরবাজ কিছু না বলে চুপ করে রইল। ইশিতা এসে বলল,
“আমি আর আম্মু পুরো বাড়ি খুঁজে দেখলাম, সুমু কোথাও নেই।”
শেরাজ তখনো চিৎকার করছে।
“সুমু, সুমু কোথায়? প্লিজ কেউ আমাকে বলো ও কোথায়? আমি তো কিছুই করিনি। আমি’তো অফিসে ছিলাম। এখানে কখন এলাম?”
সারবাজ একটু চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“তোর কী সত্যি কিছু মনে নেই?”
শেরাজ তাকাল সারবাজের দিকে। হঠাৎ তার কিছু একটা মনে পড়তেই সে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের রুমে চলে গেল। নিচ থেকে সকলে তাকিয়ে রইল শেরাজের যাওয়ার পানে। অনন্যা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে সাহাবাজ সাহেবের কাছে এসে বললেন,
“আমাদের ছেলেটার কি হয়েছে, বলো তো? আর সুমুই বা কোথায়? কি হচ্ছে এসব?”
বাড়ির সকলে চিন্তায় পড়ে গেল। বেশ কিছুসময় পর শেরাজ ফিরে এলো। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে গিয়ে শেরাজ দুই হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখে অজানা ভয়। অনন্যা খাতুন দৌড়ে এসে শেরাজকে ধরল। বাড়ির সকলে এগিয়ে এলো শেরাজের কাছে। শেরাজ কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের হাতের মুঠোটা সকলের সামনে খুলে দেখিয়ে বলল,
“এই কিটটা পজিটিভ!”
তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ঠোঁট কাঁপছে কথা বলতে, তবুও সে বলল
“ও প্রেগন্যান্ট, মম! আমি, আমি বাবা হতে যাচ্ছি। আমার বেগম আমাকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখটা দিতে যাচ্ছিল, আর আমি কিনা তাকেই কাল রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে বাসা থেকে বের করে দিলাম।”
অনন্যা খাতুনের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল,
“বের করে দিয়েছিস মানে? তুই কেনো সুমুকে বের করে দিতে যাবি, শেরাজ?”
শেরাজের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকটা ধুকধুক করে উঠছে। চোখের সামনে ঘূর্ণির মতো ভেসে উঠে কিছু ঝাপসা ছবি। এক লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে, কাঁপা গলায় সে বলতে শুরু করল,
“আমি জানি না, মম। ফুটেজে যা দেখলাম মম, ও বারবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলার চেষ্টা করছিল। ওর চোখে কত ভয়, কত আশা ছিল। ও শুধু একটা সুখের খবর দিতে চেয়েছিল আমাকে। আর আমি? আমি ওকে বৃষ্টির মধ্যে বের করে দিলাম? ওকে আঘাত করলাম।”
অনন্যা খাতুন আর কিছু বলার সাহস করলেন না। শেরাজ আবারও বলল,
“আমি নিজেই নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে পারছি না, মম। কীভাবে পারলাম আমি? আমি তো একটা অভিশাপ।”
সে কাঁপা হাতে নিজের বুকের ওপর আঘাত করতে করতে বলল,
“ও বলেছিল, আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই। ওর গলায় কত আবেগ ছিল, কত কাঁপুনি ছিল। আমি শুনিনি, মম। আমি শোনার মতো মানুষই না। আমি তো ভালোবাসা বুঝিই না। আমি শুধু নিজের রাগ, নিজের অহংকারকেই ভালোবেসেছি। আর যে আমাকে ভালোবাসতো তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি। ও এখন কোথায়, মম? কেমন আছে আমার বউ আর বাচ্চাটা? ও কি কাঁদছে আমার জন্য? ও কি ভেবেছে আমি ওকে চিরদিনের মতো ফেলে দিলাম? ও কি জানে আমি এখনও ওর গায়ের গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছি? আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে শুধু সুমু। শুধু ও, মম। কিন্তু ও আমার কাছে নেই, আমার পাশে নেই, এই বুকের ওপর মাথা রাখার জন্য নেই। আমি শূন্য হয়ে গেছি, মম। আমি তো ভালোবাসতাম ওকে। কিন্তু কাল রাতে ওকে আমি কষ্ট দিয়েছি, মম। ও আঘাত পেয়েছে। আমি এগিয়ে যাইনি।”
অনন্যা খাতুন ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। শেরাজ পাগলের মতো ফিসফিস করে বলল,
“ও আমাকে ক্ষমা করবে না, মম। এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখটা আমার হাতে দিতে গিয়ে, ও আজ সবচেয়ে কষ্ট নিয়ে এই বাড়ির বাহিরে বেড়িয়েছে। আমি বের করে দিয়েছি। ওর হাত কেটে গেছে। না জানি কতো ব্লিডিং হয়েছে। আমি শুধু চিৎকার করতে করতে বলেছিলাম, চলে যাও, চলে যাও এখান থেকে। ও ভয় পেয়ে গিয়েছিল, মম। আমি ওকে বাইরে বের করে দিয়েছি। তাও এমন এক রাতে, যখন ঝড়ের সাথে বাজ পড়ছিল।”
সাহাবাজ সাহেব এগিয়ে এসে শেরাজের পাশে বসে বললেন,
“সুমুকে পাওয়া যাবে। ও কোথায় যাবে? ও’তো এখানে কিছু চিনেনা। রাহিনকে কল করে দেখো।”
আরবাজ ধীরে বলল,
“রাহিনের কাছে নেই। আমি রাহিনদের জানিয়েছি, ওরা সকলে আসছে।”
শেরাজ নিজেই নিজেকে ব্যঙ্গ করে হেসে বলল,
“আমি আমার জীবন থেকে সবচেয়ে মায়াবতী মেয়েটাকে বের করে দিয়েছি, মম। যে আমার সন্তানের মা হতে চলেছে। আমি ওকে ভালোবাসি, জানটা দিয়ে ভালোবাসি। কিন্তু এ কেমন ভালোবাসা? ও কষ্ট পাচ্ছিল, আমি পাশে দাঁড়াতে পারিনি। আমি একটা পশু হয়ে গেছি, তাই কালরাতে নিজের কলিজাতে নিজেই আঘাত করেছি।”
সবাই স্তব্ধ। কেউ কিছু বলতে পারছে না। অনন্যা খাতুন ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“তুই খারাপ না, বেটা। তোর কিছু একটা হয়েছে। আমরা তোকে ডাক্তার দেখাব। কিন্তু এখন, এখন আমাদের আগে সুমুকে খুঁজে বের করতে হবে।”
শেরাজ মাথা তুলে চিৎকার করে বলল,
“আমি খুঁজে আনব ওকে। আমাকে যদি পায়ে হেঁটে পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে হয়, তবু আমি আমার সুমুকে ফিরে আনব। ও আমার বেগম, আমার সন্তানের মা, আমার জান, আমার ভালোবাসা। ওকে ছাড়া আমার কোনো মূল্য নেই।”
হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল। চোখে রক্তিম শঙ্কা। দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরে। পাগলের মতো এদিক ওদিক ছুটে ছুটে দেখতে লাগল। বাড়ির সকলে মিলে আশেপাশে খুঁজে দেখল, কিন্তু কোথাও পেল না সুমুকে।
শেরাজ গার্ডেনে ফিরে এসে দাঁড়াল। চোখে ভয় আর জেদে ভরা। সারবাজকে কড়া গলায় বলল,
“আমার যতদূর আন্দাজ, আমাকে কিছু একটা খাওয়ানো হয়েছিল। এইটা একটা প্ল্যান ছিল। সবকিছু সাজানো।”
সারবাজ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“কি বলছিস তুই?”
“ঠিকই বলছি। আমার অফিস, আমাদের বাড়ি, সব জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ আমার সামনে চাই। পুরো ওমান শহর তোলপাড় করে ফেল। সুমুকে চাই আমার। ওকে খুঁজে বের কর। ওর বড় কোনো ক্ষতি হবার আগেই আমার সুমুকে ফিরিয়ে আন। যত লোক আছে লাগিয়ে দে। যা যা করা লাগে কর।”
সারবাজ শেরাজের চোখের ভাষা বুঝে নিল। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ফোনে একের পর এক কল করতে লাগল। সে স্যান্ডিকে ফোন করে বলল,
“টিম রেডি করো। বন্দরে, এয়ারপোর্টে, শহরের সব এক্সিট পয়েন্টে চেকপোস্ট বসাও।”
শেরাজ নিঃশব্দে একবার আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে জমে থাকা অশ্রুর কণা
চোখের কোণে না গড়িয়ে ভিতরেই দগ্ধ হয়ে গেল। আকাশটা সাদা-কালো মেঘে ঢাকা। ধীরে ধীরে গ্যারেজের দিকে হাঁটল সে। নিজের কালো রোলস-রয়েস বোট টেইল গাড়িটার দরজা খুলে বসে পড়ল। গাড়ি ছুটে চলল তার মালিকের প্রিয় মানুষকে খুঁজতে।
ওমান শহরের এক প্রান্তে পুরোনো ধ্বংসপ্রায় প্রাসাদের নিচে নির্মিত এক গোপন লাক্সারিয়া হাউজ। বাইর থেকে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না, এই প্রাসাদের নিচে এত আধুনিক, এত নিঃস্তব্ধ একটা লাক্সারিয়া হাউজ আছে। হাউজটির দেয়ালজুড়ে সাউন্ডপ্রুফিং। আলো-আঁধারির খেলা চলে সবসময়। হাউজটির একটা রুমের মাঝখানে এক সুবিশাল বিছানায় সাদা চাদরের মাঝে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে সুমু। তার মুখটা ফ্যাকাশে, ঠোঁটের কোণায় হালকা রক্তের দাগ, চোখ এখনো বন্ধ, নিঃশ্বাসটা ভারী। সে এখনো জানে না, সে এখন কোথায়, কার হাতে বন্দি।
পাশের রুমে হাতে ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে বসে আছে রায়য়ান। তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি। সে মৃদু স্বরে বলল,
“ডোজ কাজ করেছে মাহিন, কিন্তু বেশিক্ষণ না। ওর স্মৃতিশক্তি প্রখর। জেগে উঠলেই কিছু কিছু মনে পড়তে পারে। তোমরা সাবধানে থেকো। এস,কে যেন কিছুতেই এখানে পৌঁছাতে না পারে।”
মাহিন হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বস, একটা কথা বলি? এই মেয়েটাকে এতো যত্নে রাখেছেন কেন? নরম বিছানা, কাঁচা ফুলের গন্ধ, এমনকি বডি হিটও ঠিক রাখা হচ্ছে। অন্য কেউ হইলে তো…”
মাহিনের কথার মাঝখানেই চেয়ার ঘুরিয়ে রায়য়ান তাকাল তার দিকে। ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসির সাথে তীব্র ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলল,
“এস.কের ওয়াইফ, মাহিন। যে সে কেউ না। যেভাবে ইচ্ছে ফেলে রাখলে, পাপ লাগবে।”
মাহিন একটু চুপ করে গেল। একটু সময় নিয়ে ধীরে বলল,
“তাহলে খেলাটা আসলেই বড়, তাই না বস?”
রায়য়ান উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সুমুর রুমের দিকে। মাহিন ও এলো পিছু পিছু। রুমের দরজা খুলে দিল সে। রায়য়ান রুমের মধ্যে ঢুকে এগিয়ে গেল সুমুর বিছানার কাছে। তার চোখে বিদ্রূপ আর এক ধরনের আগ্রহ। সে হালকা বাঁকা হেসে বলল,
“খেলা তো মাত্র শুরু। এস.কের হৃদয়টা যেখানে সবচেয়ে নরম, সেটাকে হাতের মুঠোয় না নিলে, এস.কে কষ্টটা টের পাবে কীভাবে?”
মাহিন এক কোণে দাঁড়িয়ে কেমন যেন অস্থির হয়ে রইল। মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“বস, মেয়েটা প্রেগনেন্ট। শুনলাম শেরাজ খান নাকি এখনো কিছু জানে না।”
রায়য়ান চেয়ারে বসল। গলা ছেড়ে হাসতে লাগল। তার এমন পাগল হাসিতে, যেন চারপাশের দেয়াল কাঁপছে। হাসতে হাসতে বলল,
“কি দারুণ সারপ্রাইজ। এস,কে জানে না, তার রাজ্যের সবচেয়ে দামি উত্তরাধিকারীর অস্তিত্বের কথা।”
তার চোখে খুশির ঝলক। সে হঠাৎ হাসি থামিয়ে দিল। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে কঠিন কণ্ঠে বলল,
“সিংহের বাচ্চা সিংহই হয়, মাহিন। এই বাচ্চা বাঁচতে দেওয়া যাবে না। এইটাও ওর শক্তি। এই শক্তিটাই গুঁড়িয়ে দিতে হবে প্রথমে।”
মাহিন থমকে গেল। মুখে আতঙ্ক তার। রায়য়ান ঘাড়টা বাঁকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“একটা নার্স আন। তবে এমন, যেন দেখতে লাগে কাজের মেয়ে। মাস্ক-গ্লাভস পরে আসুক। এই কাজটা নিখুঁতভাবে শেষ করতে হবে। এমনভাবে যেন, সুমু ভাবে ওর মিসক্যারেজ হয়েছে। আর এইটাই হবে শেরাজ খানের ভেঙে পড়ার প্রথম ধাপ। তার রাজ্য, তার ভালোবাসা, তার উত্তরাধিকার সবকিছু আমি একে একে ছিনিয়ে নেব। আর, সে শুধু দেখবে, কিছু করতে পারবে না।”
মাহিন একপলক তাকাল সুমুর দিকে। সুমু তখনো অজ্ঞান, কিন্তু তার গর্ভে আরেকটি প্রাণ ধুকধুক করছে। আর সেই প্রাণ এখন মৃত্যুর মুখোমুখি।
শেরাজের গাড়ির চাকা দাঁড়িয়ে গেল চৌধুরী ম্যানশনের সামনে। সিকিউরিটি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেরাজের চোখ দেখে এক চুল শব্দ করতেও সাহস পেল না কেউ। শেরাজ গেট ঠেলে, সিঁড়ি মাড়িয়ে বদ্ধ উন্মাদের মতো ঢুকে পড়ল ভেতরে। চোখে আগুন, শার্টের বোতাম দুটো ছেঁড়া, চুল এলোমেলো। এমন অবস্থায় ওকে দেখে চৌধুরী পরিবার হতবাক।
রুহি খাতুন চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“শেরাজ, এই কী অবস্থা তোমার? কী হয়েছে, বেটা?”
রোজা দৌড়ে এসে বলল,
“এস.কে, তুমি এভাবে? আর কি হয়েছে তোমার?”
মৌ সেন হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“তুমি এ বাড়িতে কেনো এসেছো?”
শেরাজ একবারও কারও চোখের দিকে তাকাল না। সিঁড়ি দিয়ে ঝড়ের বেগে উঠে গেল উপর তলায়। সে পা বাড়াল আরিয়ানের ঘরের দিকে। মৌ সেনরা সকলে দৌড় গেল পিছু পিছু।
আরিয়ান তখন নিজের ফোনে কিছু দেখছিল। শেরাজ রুমে ঢুকেই গান তাক করল আরিয়ানের দিকে। মৌ সেনরা সকলে ছুঁটে এসে শেরাজকে থামানোর চেষ্টা করল। শেরাজ কারো বাঁধা শুনলো না। সে দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল,
“সুমুকে কোথায় রেখেছিস, বল?”
আরিয়ান আচমকা শক পেয়ে পেছনে সরে গিয়ে বলল,
“হোয়াট দ্য হেল! কি বলছিস তুই?”
“দেখ আরিয়ান, সত্যি করে বল সুমু কোথায়? ওকে কোথাও পাচ্ছিনা। তোকে আমি মেরেছিলাম, তাইনা? সেই প্রতিশোধ নিচ্ছিস?”
আরিয়ান এবার দাঁত খিঁচিয়ে জবাব দিল,
“আমি কিছু করিনি। দেখ হয়তো তোর সাথে থাকতে চায়না বলে, সুমু নিজেই কোথাও একটা চলে গেছে।”
শেরাজ গর্জে উঠল,
“সুমু আমাকে ছাড়া এক পাও চলেনা। তোকে আমি চিনিনা ভেবেছিস? সত্যি করে বল আরিয়ান, সুমু কোথায়? ওর কিছু হলে আমি তোকে ছাড়ব না, আরিয়ান।”
আরিয়ান হঠাৎ রেগে উঠল। গলা চড়িয়ে বলল,
“সুমুর কিছু হলে তুই আমাকে না, আমি তোকে ছাড়ব না।”
“এতক্ষণ তোকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম, সুমু কোথায় আছে সেটা জানব বলে। বাট তুই তো… চল সমস্যা নেই। ওকে আমি খুঁজে নিবো। তবে তোকে আর এক সেকেন্ডও দুনিয়াতে নিঃশ্বাস নিতে দিব না।”
শেরাজ ফায়ার করার জন্য ট্রিগার টিপতে যাবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল তার। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সারবাজের নাম। শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা রিসিভ করে বলল,
“কি খবর বল?”
ওপাশ থেকে কি বলল শোনা গেল না। শেরাজ আর একসেকেন্ড ও দাঁড়াল না। সে কল রেখে দিয়ে আরিয়ানের চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এইবারও বেঁচে গেলি।”
শেরাজ বেরিয়ে গেল রুম থেকে। সবাই চুপ। আরিয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মৌ সেন এসে পথ আটকে বলল,
“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
“তুমি শুনলে না মম, সুমুকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা?”
“তাতে তোর কি? তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
“আমি সুমুকে খুঁজতে যাচ্ছি। এই সুযোগ। সুমুকে খুঁজে পেয়ে গেলে, আমি ওকে নিয়ে কোরিয়াতে চলে যাব।”
রোজা ভ্রু কুঁচকে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৪৬ (২)
“এই অবস্থায় তুমি ওই মেয়েকে খুঁজতে যাবে, ব্রো?”
আরিয়ান আর কোনো কথা বলল না। সে সোজা বেরিয়ে গেল সুমুকে খুঁজতে। পেছন থেকে মৌ সেন তাকে আটকানোর চেষ্টা করেও, আটকাতে পারল না।
