খান সাহেব পর্ব ৪৭ (২)
সুমাইয়া জাহান
দুপুর ৩টা ৪২ মিনিট। শেরাজ গাড়ি চালাচ্ছে শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে। এক হাত স্টিয়ারিংয়ে, আরেক হাত ফোনে, চোখ-মুখের অবস্থা ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত। গাড়ির সাউন্ড সিস্টেম অফ। আজ কোনো গান চলছে না, শুধু শেরাজের নিঃশ্বাস আর রাস্তায় ছুটে চলা গাড়ির হুইসেল শব্দ শোনা যাচ্ছে। শেরাজের মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ, তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল, “আরিয়ান চৌধুরী” নামটা।
শেরাজ থমকে গেল। চোখে লালচে আলো আর চোয়াল শক্ত হলো তার। প্রথমে সে ইগনোর করতে চাইল, কিন্তু কিছু সেকেন্ড পর কলটা রিসিভ করে ঠাণ্ডা অথচ বিষাক্ত গলায় বলল,
“বল, এমন সময় কল করলি কেনো? তোর ব্রেন ঠিক আছে?”
আরিয়ান বাঁকা হেসে বলল,
“আছে! তবে তোরটা বোধহয় ওভারহিট হয়ে আছে। তোকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব ভাবছিলাম, ব্যক্তিগত আর ভীষণ জরুরি কথা।”
শেরাজ অধৈর্য হয়ে বলল,
“কাট দ্যা ক্র্যাপ, আরিয়ান। সময় নেই। কুইক বল। অ্যান্ড লিসেন, তুই যদি বাজে কিছু বলিস, আই সুয়্যার, আই’ল্ল রিপ ইয়োর টাং আউট।”
আরিয়ান হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“রিল্যাক্স এস.কে! আমি জানি তোর সময়ের দাম আছে। কিন্তু তুই জানিস, সুমুকে খোঁজার তাড়া আমারও আছে। আমরা দুইজন আলাদা পথ দিয়ে একই জায়গায় ছুটছি। তবে তার আগে একটা ছোট্ট ডিল করি?”
“ডিল?” ভ্রু কুঁচকে এলো শেরাজের।
আরিয়ান হালকা ঠাণ্ডা স্বরে রূঢ়ভাবে বলল,
“হ্যাঁ, একটা সহজ ডিল। সুমুকে যে আগে খুঁজে পাবে সুমু তার হবে। সুমু চায় কি, না চায়, সেটা ম্যাটার করেনা।”
শেরাজ গাড়ির ব্রেক কষে গলায় আগুন নিয়ে বলল,
“আবার বল! জাস্ট ফা*কিং সে দ্যাট এগেইন।”
আরিয়ান হেসে বলল,
“ডোন্ট প্রিটেন্ড লাইক ইউ আর শকড। আমি সুমুকে লাইক করি না, ভালোবাসি। ও নিখুঁত। ওর কান্নাটা আমি শুনতে পাই। আর তুই ওকে শুধু হার্ট করিস। অ্যান্ড দ্যাটস হোয়াই, হুয়েভার ফাইন্ডস হার ফার্স্ট, সি ইজ হিজ।”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“লিসেন, সুমু ইজ মাই ওয়াইফ। সি চোজ মি। অ্যান্ড সি লাভস মি। হু দ্যা হেল আর ইউ টু ডিসাইড হার ফেইট? ইউ অ্যারোগ্যান্ট সন অফ আ। লিসেন টু মি, ইউ মেসড-আপ নার্সিসিস্ট। সি’স নট আ ট্রফি, ইউ সাইকোটিক ট্র্যাশ। দিস ইজ়ন’ট আ ফা*কিং গেইম। অ্যান্ড আই’ম নট ইন দা মুড টু প্লে মাইন্ড গেইমস উইথ সাম প্যাথেটিক রিচ বয় উইথ মমি ইশুস।”
আরিয়ান ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“সুমুর মনে হয়ত তুই আছিস। কিন্তু, বেশিদিন থাকবি না। তাই বললাম, চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ কর। যে আগে খুঁজে পাবে, সেই জিতবে। তোর সাহস থাকলে ডিলটা গ্রহণ কর।”
শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আই ডোন্ট ডু ডিলস উইথ ডিমনস্। অ্যান্ড ইফ ইউ টাচ হার, আই সুয়্যার অন এভ্রি ড্রপ অব ব্লাড ইন মাই ভেইনস্। আই উইল বার্ন ইয়োর গডড্যাম ওয়ার্ল্ড ডাউন। সি’স নট সাম ফা*কিং ট্রফি, আরিয়ান। সি’স এ ফ্লেইম। অ্যান্ড ইউ? ইউ’আর জাস্ট এ ড্যাম মথ। ট্রাই টু টাচ হার। আই’ল বার্ন ইউ এলাইভ।”
আরিয়ান বাঁকা হেসে বলল,
“দেন রেস মি. মিস্টার খান। লেট’স সি হু ফাইন্ডস দ্যা কুইন ফার্স্ট।”
শেরাজ গর্জে উঠে বলল,
“আই’ম নট হিয়ার টু প্লে গেমস। আই’ল ফাইন্ড মাই ওয়াইফ। ইভেন ইফ আই হ্যাভ টু টিয়ার দ্যা সিটি অ্যাপার্ট। অ্যান্ড ইফ আই এভার সি ইউ নিয়ার হার এগেইন। দ্যা নেক্সট কল উইল নট বি অন ফোন। ইট’ল বি এ ফা*কিং ফিউনারাল।”
কল কেটে দিল শেরাজ। আরিয়ান বাঁকা হেসে রায়য়ানের নাম্বারের কল করল। দু’বার রিং হতেই কল পিক করলো রায়য়ান। আরিয়ান উত্তেজিত ও দমবন্ধ গলায় বলল,
“পিক করলি শেষমেশ। কোথায় তুই? শুনেছিস কিছু?”
রায়য়ান গম্ভীর স্বরে মুখে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল,
“কিসের কথা বলছিস? শুনছি তো কতো কিছুই। এই যে এখন তোর কথা শুনছি।”
আরিয়ান রেগে বলল,
“ডোন্ট ফ্লে উইথ মি, রায়য়ান। আই অ্যাম নট ইন দ্যা মুড। সুমু নিখোঁজ। আমি জানি তুই খবর রাখিস সবকিছুর। আর তুই এটাও জানিস।”
রায়য়ান চোখ সরিয়ে অচেতন সুমুর দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“সুমু, মিষ্টি একটা নাম। মেয়েটার চেহারাটাও তো একেবারে কবিতার মতো।”
আরিয়ান চিৎকার করে বলল,
“রায়য়ান! আই এম টেলিং ইউ ইজ দ্যাট গার্ল উইথ ইউ? ডোন্ট প্লে গেমস। আই’ম সিরিয়াস।”
রায়য়ান নাটকীয় সুরে বলল,
“সিরিয়াস? তুই তো সবসময়ই ছিলি অর্ধেক সিরিয়াস, অর্ধেক পাগল। হঠাৎ করেই এতো লাভার বয় হয়ে গেছিস।”
আরিয়ান কাঁপা গলায় বলল,
“তুই জানিস না রায়য়ান, আমি একটা ডিল করেছি শেরাজের সাথে। যে আগে সুমুকে খুঁজে পাবে, সুমু তার। আমার ওকে খুঁজে বের করতেই হবে। বাট, মেয়েটা কোথায় গেল।”
রায়য়ান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ডিল, ডিল, ডিল। ডিয়ার আরিয়ান, তুই তো জানিস না খেলাটা কত বড়। শেরাজ যদি আগুন হয়, আমি ছায়া। আগুনের নিচেই ছায়া লুকিয়ে থাকে। এখন বল তো, তুই কাকে বিশ্বাস করবি? আলোকে, না অন্ধকারকে?”
আরিয়ান এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
“তুই কি বলছিস? সুমু কোথায়, রায়য়ান?”
রায়য়ান চোখ সরিয়ে সুমুর দিকে তাকাল। মুখে অদ্ভুত হাসি টেনে বলল,
“বোকার মতো এমন প্রশ্ন আমাকে কেনো করছিস? আমি কি তোদের মতো লাভার বয় নাকি? বাই দ্য ওয়ে, তুই আবারও নরম হয়ে যাচ্ছিস। আর এই যুদ্ধে যে নরম হবে, সে হারবে।”
আরিয়ান গর্জন করে উঠে বলল,
“আমি নরম না, রায়য়ান। আমি ওকে ভালোবাসি।”
রায়য়ান নরম স্বরে একটু হেসে বলল,
“ভালোবাসিস বলেই ওকে দাবী করিস? শেরাজের মতোই তুইও ভুল করছিস, আরিয়ান। ও একটা মানুষ। কোনো ট্রফি না।”
আরিয়ান সন্দেহ নিয়ে বলল,
“সেসব কথা বাদ দে। আগে বল, তুই কোথাও লুকিয়ে রাখিসনি তো, রায়য়ান?”
রায়য়ান হালকা হেসে বলল,
“ভাই, তুই কী ভাবছিস? আমি কি এতটা ছোট মনের?”
আরিয়ান চোখ কুঁচকে বলল,
“বড় মনেরও তো না। এখন কি করতে চাস, সেটা বল?”
রায়য়ান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে গলায় নকল উৎসাহ নিয়ে বলল,
“আমি হেল্প করতে চাই। আমি নিজের লোক নামাচ্ছি। তুই তো জানিস আমার সোর্স আছে। সাধারণ মানুষদের মতো আমি না। আমি আর তুই একসাথে খুঁজব সুমুকে। আই প্রমিস, সুমুকে খুঁজে বের করব আমরা।”
আরিয়ান নিশ্চিন্ত হতে না পেরে বলল,
“তুই হঠাৎ এত সাহায্যের মানুষ হলি কবে থেকে?”
রায়য়ান একটা অদ্ভুত গা কাঁপানো হাসি দিয়ে বলল,
“কিছু মানুষ চলে গেলেও, সম্পর্ক থেকে যায়। আর আমি তো খারাপ না, আরিয়ান। আমি শুধু আমার মতো ভালোবাসি। হয়তো তা সবাই বুঝে না। “
“তুইও ভালোবাসিস?”
“আরে এই ভালোবাসার, সেই ভালোবাসা না।”
“আচ্ছা, বুঝলাম। এখন চল, লোক নামা। এস.কের আগে সুমুকে খুঁজে বের করতে হবে।”
রায়য়ান বাঁকা হেসে বলল,
“তবে আমি যদি ওকে খুঁজে পাই। তাহলে, ওকে তোর হাতে তুলে দেব কিনা, সেটা এখনো ভাবিনি।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
“মানে? হয়তো তোর হাতে দিতে পারি। নয়তো এস.কের হাতে। আর নয়তো নিজের কাছে রাখতে পারি।”
আরিয়ান রেগে বলল,
“রায়য়ান! ইউ’ভ ক্রসড দ্যা লাইন।”
রায়য়ান ধীরে খুব ঠান্ডা গলায় বলল,
“লাভ, পাওয়ার, পজিশন– এই তিনের মাঝে লাইন থাকে না, আরিয়ান। এস.কের সাথে এবার আসল খেলা শুরু হবে। তুই চিন্তা করিস না। আমি দেখছি কি করা যায়।”
আরিয়ান কল কাটল। রায়য়ান ঘুরে তাকাল সুমুর দিকে। সুমু এখনো নিস্তেজ। নিস্তেজ বললে ভুল হবে, তাকে নিস্তেজ করে রাখা হয়েছে। তার শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা, চুল এলোমেলো, নিঃশ্বাসের শব্দ প্রায় অশ্রুত। ঘরের কোণে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর রায়য়ানের বুটের শব্দ। দুটোই যেন রুমের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করেছে।
রায়য়ান ধীরে ধীরে সুমুর দিকে এগিয়ে এলো। সুমুর পাশে বসে কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে শীতল স্বরে বলল,
“তুমি কে? কী আছে তোমার ভিতরে, আমি এখনো বুঝিনি। তবে একটা কথা মানতেই হবে। তুমি নারী অসাধ্য সাধনকারী। একজন পুরুষ, যার রক্তে গ্ল্যামার, যার জীবন সিনেমার মতো। আর একজন পুরুষ, যাকে মানুষ ভয় পায়, যে নিজের আসল ফর্মে থাকলে, তার সামনে মানুষ নিঃশ্বাস নিতেও ভয় পায়। সেই দু’জন পুরুষই তোমার জন্য ছুটছে। তোমাকে নিয়ে যুদ্ধ করতেও তারা রাজি। আমি জীবনে বহুত মেয়ে দেখিছি, তবে তোমার মতো না।”
সে হালকা হেসে উঠে দাঁড়াল। একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে আবারও পেছনে ফিরে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি জানি না ভালোবাসা কাকে বলে। আই হেট লাভ। ভালোবাসা দুর্বল করে তোলে মানুষকে। আমি দুর্বল হই না। আমি শুধু জয় চাই, কন্ট্রোল চাই। তবুও, তোমার দিকে তাকিয়ে আজ একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। আমি রায়য়ান চৌধুরী আজ নিজেই বলছি, তুমি নারী বাকিদের মতো নও, তুমি মায়াবতী।”
সে আবারও এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ল সুমুর মুখের কাছে। তার নিঃশ্বাস গলায় লাগল সুমুর। কিন্তু সে সরল না। অদ্ভুত দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার জন্য দুইটা পুরুষ, একজন আমার মতো ডার্ক জগতে অভ্যস্ত, আরেকজন হিরো হলেও প্লেবয়, আবেগে ভেসে যাওয়া। তারা দু’জনেই পাগলের মতো ছুটছে। পুরো শহরে এখন তোমাকে খুঁজছে, তোমাকে, কেবল তোমাকে। তুমি যে কী করে এই খেলার রানী হয়ে উঠলে, তা আজও আমার মাথায় ঢোকে না।”
রায়য়ান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আবারও বলল,
“তবে একটা কথা বলে রাখি, সুমাইয়া জাহান। তোমার গন্তব্য আমি ঠিক করব। তুমি কার হবে, সেটা তুমি ঠিক করবে না, আমি করব। কারণ আমি রায়য়ান চৌধুরী, যা বলি তাই করি। আর এই খেলার চূড়ান্ত দৃশ্য এখনো বাকি।”
সে উঠে দাঁড়িয়ে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে নিজের হাতে চেপে ধরে বলল,
“এস.কে যদি দাবী করে, আমি ছিনিয়ে নেব। আরিয়ান যদি ভালোবাসে, আমি জ্বালিয়ে দেব। তুমি আমার কাছে এসেছ, এখন তুমি কোথায় যাবে, সেটা আমি ঠিক করব। তুমি জানো না, তোমাকে পেয়ে আমি আসলে কী পেয়ে গেছি। তুমি শুধু একজন নারী নও, তুমি একটা অস্ত্র। এই দুই পুরুষ, শেরাজ খান আর আরিয়ান চৌধুরী। একজন আগুন, আরেকজন ধোঁয়া। তবে তুমি? তুমি সেই জিনিস, যা এই আগুনকে আরও জ্বালিয়ে দিতে পারে, আর ধোঁয়াকে অদৃশ্য করে দিতে পারে।”
সে ধীরে ধীরে সুমুর মাথার কাছে এসে বসল। সুমুর মুখে হাত ছোঁয়াল না। শুধু দেখে বলল,
“তোমাকে আমি মারব না, কারণ তুমি আমার খেলার গুটি। আর এই গুটিটা না থাকলে খেলা থেমে যাবে। তুমি বেঁচে থাকবে, তবে এই রায়য়ান চৌধুরীর কাছে। তুমি এখন থেকে একটি অস্তিত্ব মাত্র, যার মুক্তি নেই। যার পেছনে ছুটবে হাজার পুরুষ। কিন্তু পৌঁছাতে পারবে না কেউ। কারণ আমি তোমাকে একটা জীবন্ত জালে আটকে ফেলেছি। তুমি হাঁটবে, নিঃশ্বাস নেবে, চোখ খুলবে, কথা বলবে, কিন্তু তুমি আমার খেলার ভিতরেই থাকবে। আরিয়ান ভেবেছে, সে হিরো। শেরাজ ভেবেছে, সে প্রোটেক্টর। তারা জানে না, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাওয়াটাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আর আমি? আমি সেই শত্রু, যে শত্রুকে মারলে খেলা শেষ হয় না, বরং আরও ভয়াবহ হয়। তোমার ওই কোমল চোখ দুটো, শুধু ওদের হৃদয় ভেঙে দেয়নি, আমার ভেতরেও কোনো অচেনা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তবে একটা কথা ভুল করো না যে, আমি কাউকে ভালোবাসি না, আমি দখল করি। নিজের স্বার্থে দখল করি। তোমাকে আমি ভালোবাসিনি। তোমাকে আমি রাখতে চাই। সবার থেকে দূরে, শুধু নিজের করে। তোমাকে বন্দি করে রেখে ওই দুই পুরুষকে ধ্বংস করব আমি।
সে একটু নিচু হয়ে সুমুর কানে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি তাদের শেষ করার অস্ত্র। আর আমি তোমার প্রহরী। তুমি বেঁচে থাকবে, তবে শুধু রায়য়ান চৌধুরীর জগতে। কিন্তু, তোমার মধ্যে আসলে আছেটা কী? আমি সত্যি বুঝিনা ভালোবাসা কাকে বলে। বিকজ আই হেট লাভ, সুমু। কিন্তু তুমি, তুমি বাকিদের মতো নও। তুমি আলাদা। তোমার জন্য দুটো পুরুষ পাগল হয়ে গেছে। একজন হিরো, আর একজন আমার মতো অন্ধকারের মানুষ। তাদের মনের ভিতরেও তুমি রাজত্ব করে ফেলেছো। যা কেউ পারেনি।”
রায়য়ান উঠে দাঁড়াল। এবার তার চোখে খুনের পরিকল্পনা। সে হেসে বলল,
“শেরাজ খান, আরিয়ান চৌধুরী— এই দুই পুরুষকে শেষ করার আসল অস্ত্র তুমি। তুমি এই পুরো খেলার রানী। অথচ নিজেই জানো না তুমি কতটা শক্তিশালী। তোমার শরীরে হাত দিলে শেরাজ পাগল হয়ে যাবে। আর আরিয়ান? সে তো উন্মাদ হয়ে আছে। যেকোনো মূল্যে তার তোমাকে চাই। তোমাকে পাবার জন্য সে শেরাজ খানের মতো মানুষের সাথে টক্কর দিচ্ছে। ও জানে এর পরিণতি ভালো হবেনা, তবুও সে চেষ্টা করছে। আর এরজন্যই তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেই, আমি ওদের ধ্বংস করব। তুমি থাকবে আমার কাছে, এই রায়য়ান চৌধুরীর কারাগারে। সোনার খাঁচায় থাকবে তুমি। যেখানে সূর্য উঠবে ঠিকই, কিন্তু তোমাকে আলো শুধু আমিই দেখব।”
কথা শেষ করল রায়য়ান। সুমুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। মাহিন বাহিরে দাঁড়িয়ে।
“বস!”
রায়য়ান একবার চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“প্রাইভেট জেট রেডি কর। আজ রাত দুটো বাজতেই আমরা ওমান ছাড়ব।”
মাহিন চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“এত তাড়াতাড়ি, বস?”
রায়য়ান চোখ সরিয়ে বলল,
“আরিয়ান এখনো ঘুমিয়ে। সে বুঝতেই পারেনি তার চোখের সামনে দিয়ে রানীটাকে আমি সরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু শেরাজ? সে বসে থাকবে না। সে আগুন। আমাকে থামানোর ক্ষমতা একমাত্র ওর আছে। তাই ওর পৌঁছনোর আগেই আমরা এখান থেকে চলে যাব।”
রায়য়ান একবার উপরের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে খেললো অদ্ভুত এক বিজয়ের হাসি। সে মাহিনের দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,
“এস.কে হয়তো মনে করছে, ও এসে আমাকে শেষ করে দেবে। কিন্তু সে জানে না, খেলাটা আমি শুরু করেছি, আর শেষও করব আমি।”
রায়য়ান হাসতে হাসতে পাশের রুমে চলে গেল। মাহিন তাকিয়ে রইল সুমুকে নিস্তেজ করে রাখা রুমটির দরজার দিকে।
রাতের আকাশটা মেঘে ঢাকা। চাঁদ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে আজ। জঙ্গলের নির্জন রাস্তা ধরে ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে চলেছে এক কালো রোলস-রয়েস। হেডলাইটের আলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। গাড়ির ভিতরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। স্টিয়ারিংয়ে বসা চালকের চোখও টান টান উত্তেজনা, কারণ পেছনে বসে আছে শেরাজ খান।
“এখানেই থামাও,” গম্ভীর গলায় বলল শেরাজ।
গাড়ির চাকা থেমে গেল এক পুরনো পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে। চারপাশে ঘন গাছগাছালি। পাখির ডাকও যেন এখানে ঢোকার সাহস পায় না। ঘরটির বেশির ভাগ জায়গায় ইট ভেঙ্গে পড়েছে, দেওয়ালে ফাটা।
শেরাজ গাড়ির দরজা খুলে নামতেই, স্যান্ডি দৌড়ে এলো। তার কপালে ঘাম, মুখে দুশ্চিন্তা।
“স্যার!”
শেরাজ হাঁটতে হাঁটতে কোমরের পেছন থেকে ধাতব রিভলবারটা বের করল। সে চুপচাপ তাকাল স্যান্ডির চোখে।
“মুখ খুলেছে?”
স্যান্ডি মাথা নাড়ল ধীরে,
“না স্যার! এখনো মুখ খোলেনি। কিন্তু অনেক মার খেয়েছে। আর মার সহ্য করতে পারবে কিনা সন্দেহ।”
শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“সহ্য করবে। কারণ ও জানে, আমি এলে মৃত্যু আসবে।”
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই নিরাপত্তারক্ষী চুপচাপ দরজা খুলে দিল। ঘরের ভেতর একটা কুয়াশাময় অন্ধকার। মোটা কাঠের ফ্লোর, ছাদের এক কোনায় ঝুলছে ভাঙা পাখা। বাতাসে পঁচা রক্ত, ভেজা কাঠ, আর ভয়ের একটা আভাস ভেসে আছে। ঘরের মাঝখানে একজন মধ্যবয়সী লোককে বেঁধে রাখা হয়েছে। লোকটার চুল এলোমেলো, মুখে রক্ত, চোখ অর্ধেক বন্ধ।
শেরাজ এগিয়ে গেল তার সামনে। লোকটি আঁধখোলা চোখে দেখল। তার মুখে ভয়, কিন্তু সে চায় না শেরাজ জানুক, সে ভেঙে পড়েছে।
শেরাজ নিচু হয়ে বলল,
“তুই জানিস না, আমি কতোটা নীচে নামতে পারি।”
সে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। কিছুক্ষণ নিঃশব্দ। শেরাজের হাতে ধরে রাখা রিভলবারটা ধীরে ধীরে উঠছে, নামছে, যেন ধৈর্যের শ্বাস নিচ্ছে। খুব নিচু গলায় সে বলল,
“তুই আমার ড্যাডের বয়সী। তোকে আমি নিজের ভেবেছিলাম। অফিসে আমার চা, কফি তো তুই দিতি। তোর জন্য কতকিছু করেছি আমি। সবচেয়ে বড় কথা, তোকে কতটা বিশ্বাস করতাম আমি।”
লোকটা গলার ভেতর থেকে আওয়াজ বের করার চেষ্টা করে বলল,
“শেরাজ বাবা, আমি…”
“চুপ! তুই আমার খেয়ে, আমার পরে, তারপর আমারই পিঠে ছুরি মারলি? এতো লোভ তোর? ত্রিশ হাজার টাকা স্যালারি দিতাম। প্রতি মাসের শেষে আলাদা করে আরও বিশ হাজার, কেবল তোর ফ্যামিলির জন্য দিতাম। তোর একটা মেয়ের বিয়ের সব খরচ দিয়েছি। তোর ছেলের স্কুল ফিস আমি দেই। আর তুই আমার কফিতে ড্রাগ মিশিয়ে দিলি?”
সে এক পা সামনে এগিয়ে এলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই কি ভেবেছিলি, আমি বুঝব না? তুই জানিস তোর জন্য আজ আমি কী হারিয়ে ফেলেছি? তোর জন্য আজ আমার বউ, আমার সন্তান আমার জীবন থেকে দূরে।”
তার গলা কেঁপে উঠল। চোখে সেই চাপা অন্ধকার, যে অন্ধকারে একজন পুরুষ একা বসে থেকে রাতভর নিজের ভুলে পুড়ে মরে।
“ওর শরীরে ফুলের টোকা সহ্য হয়না আমার। আর সেই আমি ওকে আঘাত করেছি। নিজ হাতে বাসা থেকে বের করে দিয়েছি। আমার বউটা কতো কষ্ট পেয়েছে বল তো? আর সেই কষ্টের কারণ তৈরী করে দিয়েছিস তুই।”
সে আর একটু সামনে এগিয়ে এসে লোকটার গাল চেপে ধরে রক্তমাখা মুখটা নিজের চোখের সামনে এনে বলল,
“তুই জানিস না, আমার সুইটহার্টের চোখের পানির মানে কী। তুই জানিস না, আমি কী হারিয়েছি। আর ঠিক সেই কারণেই তুই এখন জানবি, শেরাজ খান কী জিনিস।”
লোকটা কাঁদতে কাঁদতে শেরাজের সামনে হাত জোর করল। শেরাজ চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে তখন সুমুর কান্নার প্রতিধ্বনি। ঘরটা নিস্তব্ধ। বাতাসও যেন দাঁড়িয়ে শুনছে একজন ভালোবাসার মানুষের হেরে যাওয়ার স্বীকারোক্তি। হঠাৎ স্যান্ডির ফোনটা কেঁপে উঠল। স্যান্ডি তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে ফোন বের করে কথা বলল।
সে কথা শেষ করে কলটা কাটল। শেরাজের দিকে এগিয়ে এসে কিছুটা সংকোচ, কিছুটা তাড়াহুড়োয় করে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৪৭
“স্যার! সময় হয়ে গেছে। এইদিকটা কাল দেখবেন। এখন যেতে হবে। হাতে টাইম নেই। সবাই রেডি। সবকিছু প্ল্যান মাফিক করা হয়েছে।”
শেরাজ ধীরে চোখ তুলে তাকাল স্যান্ডির দিকে। একটা দীর্ঘ মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে, যেন ভেতরে কোনো যুদ্ধ চলছে তার। নিঃশব্দে হাঁটল সে দরজার দিকে। শেষবারের মতো ঘুরে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি আবারও আসব। আর তখন তোর এমন অবস্থা করব, যে দেখবে সেই শিউরে উঠবে।”
