Tell me who I am 2 part 8 (3)
আয়সা ইসলাম মনি
আম্বিয়া অন্য দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। ঢোক গিলে বললেন, “তুই কাহিনি আগা।”
ফাতিমা চুপচাপ বসে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। নাক টেনে নিয়ে কেঁপে কেঁপে বললেন, “এরপর হুট কইরাই তোমার জামাইয়ের অবহেলা বাইড়া গেল। আগে যেইহানে এক মাসে একটা চিঠি দিত, এরপর দুই মাসেও একটা চিঠি আইত না। আর তার চিঠির লেখা এতই কম হইত যে, চোখ বুলাইবার আগেই শ্যাষ হইয়া যাইত। ক্যান যে এমন করত, বুঝবার পারি নাই। শাউড়ীও ওই দিনের পর থেইকা আরো কষ্ট দিত, কাম করাইত বেশি বেশি। আর কথায় কথায় খোঁটা তো দিতই।”
কিছুটা থেমে গলা ভারি করে বললেন ফাতিমা, “তারপর কয় মাস পর তারান্নুম এই দুনিয়ায় আইল। মেয়ে চমৎকার অপরূপা হইছে দেইখা আমি যে কি খুশি হইছিলাম! খুশির ঠেলায় চোখ দিয়া পানি ঝরছিল অবিরাম। অবশ্য, বাপ সুন্দর তাই মাইয়াও সুন্দর হইছে! কিন্তু মাইয়া দেইখা শউরবাড়ির কেউ খুশি হইল না। শাউড়ী আম্মা তো উলটা অভিশাপ দিয়া বসল। কইল, এই মাইয়ার জীবনেও নাকি বিয়া হইব না, মায়ের মতোনই অভাগা হইব। আরো কত কি কইল! আমি কোলে মাইয়াটারে আগলাইলাম। অথচ সেইসব কথা শুইনা কান ধইরা যাইত, মন তো ছিন্নভিন্ন হইতোই।”
একটু দম নিয়ে সে আবার বলল, “এরমধ্যে আকবর আমারে একটা চিঠি পাঠাইলো। তাতে ছোট ছোট কয়েকটা লাইন লেখা আছিল, ‘শোন ফুলপরী, তোর জন্য আকবর যেমন মরতেও পারবে, তেমন মারতেও পারবে। আমি তোর উপর নজর রাখতে চাইছিলাম, কিন্তু তোর বদনাম হতে পারে ভেবে কিছুই করলাম না। তবে চিঠিতে তুই আমারে বর্তমানের সব কিছু জানাবি, খোদার কসম বল যে কিচ্ছু লুকাবি না।’
আমি এই চিঠির কোনো উত্তর দিলাম না। হাতের মুঠোয় মোচড়াইয়া ছিড়ড়া ফালাইয়া দিলাম। পরে এক মাসের মাথায় আবারও একইভাবে চিঠি পাঠাইল।”
ফাতিমা হালকা বিরক্তি মিশানো স্বরে বলল,
“আমার লোকটার উপর খুব রাগ ধরত, ক্যান উনি অন্যের বউয়ের উপর এত টান দেখায়? আমার তো কোনো দরকার নাই এই মায়ার। আমার জন্য আমার স্বামীই যথেষ্ট। তাই কোনোটার উত্তর দিই নাই। এরপর টানা এক বছর… একটা বছর পর রমজান আইল বাসায়। আমারে যেন দুই চোখে সহ্যই করতে পারত না। মেয়ে হইছে দেইখা তার রাগ আরো বাড়ল। মেয়েটারে কোলেও নিল না, ঠিকমতো তাকাইলও না। বুকটা দুই টুকরো হইয়া গেল আমার। যারে এত ভালোবাসি, এত বিশ্বাস করি—সে ক্যান আমারে আর আমার মাইয়ারে এত অবহেলা করতেছে? আমারে বাদ দিলাম, কিন্তু নিজের মাইয়ারে কি মানুষ ভালো না বাইসা থাকবার পারে?
সে শহরে ফেরার দিন আমি তার সামনে দাঁড়াইলাম। কইলাম, ‘আমার কি কারণ জানার অধিকার নাই? ক্যান এমন করতেছেন? মাইয়াটারে একবার দেখেন। একদম আপনার মতন হইছে। চেহারায় মায়া এমন যে আশেপাশের সবাই কয়, বড় হইলে আগলাইয়া রাখতে হইব, না হইলে কত ছেলের জানি মন আটকাইয়া যাইব। একবার তাকান, দেখেন, শান্তি পাইবেন।’
কিন্তু তাও সে তাকাইল না। জামা পরতে পরতেই মিনিট কয়েক কাইটা গেল। আমি চাতকের মতোন শুধু তার মুখের দিকে চাইয়া রইলাম, কিছু একটা শুনব বইলা।
হঠাৎ ব্যাগ লইয়া দরজার দিকে যাইবার আগে সে পিছন ফিইরা কইল, ‘ওই মেয়ে কি সত্যিই আমার মেয়ে?’
আমি একেবারে হতভম্ব। চোখ দুইটা বড় হইয়া গেল। কইলাম, ‘আপনার কি হইছে? এ যে আপনারই মাইয়া। হঠাৎ এই প্রশ্ন ক্যান করতেছেন?’
সে কিছু না শুইনা প্রত্যেক বারের মতোন পকেট থেইকা কিছু টাকা বের কইরা গুঁইজা দিল আমার হাতে। কইল, ‘মেয়ের জন্য জামাকাপড়, খাবার কিনবে। তবে আমি যা শুনেছি, তা যেন ভুল হয়। পাটোয়ারী বাড়ির বদনাম যেন না হয়। বুঝেছ?’
আমি হকচকাইয়া গেলাম। ভিতর থেইকা ভয় আর উত্তেজনায় কাঁপতেছিলাম। বদনাম? মানে? এইটা সে কি কইল?
ঢোক গিললা কইলাম, ‘আমি আপনার কথার মানে ধরতে পারি নাই।’
সে অন্য দিকে ফিররা কইল, ‘মা চিঠিতে সব জানিয়েছেন। তোমার প্রেমিক মাকে কি কি বলেছিল, সেগুলোও বলেছে। যদিও নিজ চোখে দেখিনি, তাই পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি। তবে যদি সত্যি হয়, ডিভোর্স পেপার খুব দ্রুত পেয়ে যাবে।’
এই বইলা ব্যাগটা কাঁধে তুইলা চইলা গেল।
আমি কিছুই কইবার পারলাম না। হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া রইলাম শুধু। এহন হয়ত জিগাইবা, ক্যান কই নাই? সে তার মারে নিজের চাইতেও বেশি বিশ্বাস করে। তার মনে যহন ঢুইকা গেছে, তখন আমি পা ধইরা কাঁনলেও কোনো লাভ হইত না। তবুও রাগ হইছিল আকবরের উপর। প্রচণ্ড রাগ। কে কইছিল তারে অমন পোদ্দারি দেখাইতে? মনে মনে কত অকথ্য ভাষায় গাল দিলাম তারে…
এরপরও আরেকবার আকবর চিঠি পাঠাইলো। ঐ একই কথা, ‘বাড়ির সব ঠিক আছে তো? তোর গায়ে কেউ হাতে তুলে নাই তো? তুই কেমন আছিস? ছেলে-মেয়ে ঠিক আছে? মেয়েটা দেখতে কেমন হয়েছে রে? কিছু হলে আমারে শুধু একবার বল, এক্ষুনি তোরে নিয়া আসব ওই জাহান্নাম থেকে।’
কিন্তু আমি তহন এমন রাগান্বিত আছিলাম যে চিঠির উত্তরে লিখখা ফালাইলাম, ‘আর কোনোদিন যেন আপনার চিঠি আমার কাছে না আসে। কোন আক্কেলে এইসব বলেন? আমার পক্ষে লড়ার জন্য আমার স্বামী আছে। আপনার এত টানের কারণ আমি বুঝি না। আবার যদি চিঠি দেন, সম্মান করা মুশকিল হইয়া যাইব।’
চিঠি পাঠানোর পর ভাবতেছিলাম, হয়ত তার বুক বিদ্ধ হইছে, কষ্ট পাইছে। কিন্তু সত্য তো এই—আমি তো পরের বাড়ির বউ।
ঠিক তেমনই হইল। এরপর টানা কয়েক বছর তার খবর নাই। চিঠি তো দূর, এই চৌধুরি বাড়তে যহন আইতাম, সামনে পোরযোন্ত কোনোদিন পরে নাই। মনে আছে, আম্মা? ওইবার কৌশিকা ভাবি আইছিল কারান আর আরিয়ানরে লইয়া?”
এতক্ষণ ঘোরের ভেতর ডুবে থাকা আম্বিয়া মেয়ের প্রশ্নটা শুনলেন না। যেন মাটির বুক ভেদ করে কোথাও তাকিয়ে আছেন। ফাতিমা মায়ের নিশ্বাসের ভারী টান অনুভব করলেন। সে আলতো করে দুই হাত বাড়িয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলেন। আম্বিয়া অপ্রস্তুতভাবে কেঁপে উঠলেন; হঠাৎ করে জমে থাকা শীতলতা ভেঙে গেল। তবু মেয়ের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন তিনি।
ফাতিমা তাকে কোনো প্রশ্ন না করে ধীর গলায় বলতে থাকলেন, “ওইবার আমি, রমজান, তারান্নুম, তালহাও গেলাম। তারান্নুমরে দেইখাই ভাবি কি যে খুশিইই! আশপাশের মানুষও কইতে শুরু করল, তারান্নুম পাইছে মামির রূপ। কৌশি ভাবিরে দেখলেই যেমন গ্রামের বাতাসে আলোড়ন উঠত, তারান্নুমরে দেইখাও তাই হইল। ভাবি তারান্নুমের মাথায় হাত রাইখা দোয়া দিল। কইল, তার নাকি মেয়ের শখ আছিল, আল্লাহ দিল না। আমি ক্যান জানি ভাবির চোখের ভিত্রে সেই না-পাওয়া শখের একটা আভা দেইখা ফেলছিলাম। মনে হইল, মাইয়াটারে দেইখা তার বুকের ভেতর লুকানো কোনো অভিমান গলিয়া পড়তেছে।
ওই কয়দিন তারান্নুমরে যে যত্নে রাখল, মনে হইছিল আমার থেইকাও সে ভালো পারব মাইয়াটারে সামলাইতে, আগলাইয়া যতোন কইরা রাখতে।
আমার এহনো মনে আছে, ওই সময় গ্রামের সব ঘরের বউরা শাড়ি পড়ত। কিন্তু একমাত্র আমার মর্ডান কৌশি ভাবি থ্রিপিস বা জামা পড়ত। তার বিদেশি চেহারায় কত সুন্দর মানাইত সেই জামাগুলান! বাতাসে উড়ত তার জামার ঘের, মনে হইত শহরের সিনেমার নায়িকা আইছে আমগো গেরামে। চুলগুলাও আমগো মতোন আছিল না। কাঁধ ছাড়াইয়া কিছুটা নিচে পড়ত। বাদামি রঙের সেই চুলগুলা দেখলেই মনে হইত যেন পাখির পালকের মতোন সফট, রেশমের মতোন মসৃণ। কি রূপটাই না আছিল মাইয়ার! একদম আমগো মিরার মতোন। মিরারে দেখলে ভাবি নিজেরে খুঁইজা পাইত। তাই না, আম্মা?”
প্রশ্নটা শুনে হঠাৎ চমকে উঠলেন আম্বিয়া। যেমন আকস্মিক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কোনো মানুষ মুহূর্তেই স্থবির হয়ে যায়, তেমন। বিস্ফোরিত চোখে তাকালেন মেয়ের দিকে। তার চোখে ঝলসে উঠল অচেনা আতঙ্ক, অতীতের ছায়া যেন হঠাৎ বর্তমানের ঘরে ঢুকে পড়েছে। তিনি চুপচাপ, অসাড় হয়ে রইলেন। দেখলেন, ফাতিমার দৃষ্টি কেমন ব্যাকুল হয়ে ঝুলে আছে তার উত্তরের অপেক্ষায়। মেয়ের প্রশ্ন এবার কানে গিয়েছিল, কিন্তু ভেজা চোখ অন্য দিকে সরিয়ে নিলেন। কৌশিকার কথা তিনি কখনো মুখে তোলেন না। তুলতে চানও না; অতীত যেন সামনে না আসে এই ভাবনায়।
এদিকে ফাতিমা মায়ের নিভে যাওয়া চোখমুখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন। কণ্ঠের ভেতর দ্বিধা জমে থাকলেও শেষমেশ সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, “একটা কথা কও আম্মা, কৌশি ভাবি এহন কই আছে—ওইটা তুমি জানো, তাই না?”
আম্বিয়া ঠোঁট কামড়ে নিলেন, “কৌশির কাহিনি জানলে বুক পুইড়া কয়লা হইয়া যাইব তোর।”
ফাতিমা থেমে গেলেন, তবে অল্প পরেই নরম স্বরে বললেন, “আম্মা, আমি কাহিনি শোনার লাইগা না, শুধু জানতে চাই, মানুষটা কই আছে এহন। এতদিনে কি সুখে আছে, না আমগো মতোন বুকের ভিতর দাহ লইয়া ঘুরতাছে?”
অবশেষে বহু নিশ্বাস গিলে আম্বিয়া ভাঙা গলায় বললেন, “আইজ একুশ বৎসর… একুশটা বৎসর ধইরা কৌশিরে খুঁজতাছি আমি। পুরা পুষ্পানগর তন্ন তন্ন করছি, ঢাকাত পা বাড়াইছিলাম, তবু পাইলাম না। যদি একবার… একটা মাত্র বার যদি ওরে পাইতাম, দুই হাত জোড় কইরা ক্ষমা চাইতাম। মরার আগে একবার হইলেও ওরে যদি দুই চোক্ষে দেখতে পারতাম…”
মায়ের এমন অগ্নিদগ্ধ স্বীকারোক্তি শুনে ফাতিমা আরও তীব্র উদ্বেগে কেঁপে উঠলেন। তার কণ্ঠ ভারি হয়ে এলো, “আমি নিশ্চিত, তুমি কিছু জানো আম্মা। কও না, কি হইছিল ১৯৯৬ সালের পহেলা ফাল্গুনে? ভাবি ক্যান হঠাৎ অদৃশ্য হইয়া গেল? আমারে তো কইতে পারো!”
হঠাৎই আম্বিয়ার বুক ফেটে গেল কান্নায়। আর্তনাদের মতো বাঁধভাঙা সেই কান্নায় ফাতিমা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। জীবনে কোনোদিন মায়ের চোখে এমন নিরেট বেদনার অশ্রু সে দেখেনি। মনে হচ্ছিল, কণ্ঠরোধী এক অদৃশ্য শোকের বাঁধ আজ ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আম্বিয়ার মুখাবয়বে।
ফাতিমা তড়িঘড়ি মায়ের হাত ধরে ফেললেন, দু’হাত জড়িয়ে পায়ের কাছে বসে ভিজে কণ্ঠে বললেন, “ও আম্মা, আম্মা গো… তুমি কান্দো ক্যান? মা, তুমি তো কান্দার মানুষ না। এতদিন বুকের ভেতর কী এমন ব্যথা জমাইছ, আম্মা? কও না আমারে…”
কিন্তু আম্বিয়া কোনো জবাব দিলেন না। শুধু বুক ভেঙে কেঁদে গেলেন। তার গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছিল, নিশ্বাসগুলোও এলোমেলো হয়ে পড়ছিল।
ফাতিমা মায়ের পা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। মুখ উঁচু করে বেদনার্ত কণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ও মা… মাগো… তুমি চুপ ক্যান? আমি তোমার মাইয়া, আমারে তো বলবা। লুকাইয়ো না! কাইন্দো না আম্মা, তোমার চোখের পানিতে আমার বুকও ফাইটা যাইতেছে।”
অনেকক্ষণ পর আম্বিয়া কাঁপা হাতে আঁচল তুলে চোখের পানি মুছলেন। নাক টেনে গলা ভারি করে বললেন, “তুই কাহিনি আগা। কিন্তু আর কোনোদিন কৌশির নাম নিস না। আমি জবাব দিতে পারুম না। বাঁধা আছে।”
প্রায় দশ মিনিট ফাতিমা চোখে কৌতূহল, বিস্ময়, আর ভেতরে জমাটবাঁধা অসহায়তা নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো, হঠাৎ অচেনা কাউকে দেখছেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কোনো প্রশ্ন করলেন না, উত্তরও চাইলেন না। শুধু চুপচাপ মায়ের কাছ থেকে একটু দূরে সরে বসলেন।
অন্যদিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলতে শুরু করলেন, “একদিন ভাবিরে দেহি নিজের রুমে বিছানায় বসা। তরুরে সামনে বসাইয়া সুন্দর কইরা সাজাইতেছিল— ছোট্ট ঠোঁট দুইটায় কড়া লাল লিপস্টিক, ফরসা গালে হালকা লাল ব্লাশঅন, মাথায় একখান ফুলের মতোন ফিতা দিয়া উপরে উঠাইয়া জুটি বাইন্দা দিছিল। মাইয়াটারে দেইখা মনে হইতেছিল সদ্য ফুটন্ত শিউলি ফুল। আমি দরজার কাছে দাঁড়াইয়া হাসতেছিলাম। ভাবির যতোন করার ভঙ্গি দেইখা বুক ভইরা গেছিল।
হঠাৎ আমারে দেইখা ভাবি কইল, ‘ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন, ফাতিমা? প্লিজ, কাম হিয়ার।’
আমি ধীরে ধীরে আগাইয়া তার পাশে বইলাম। দেহি মাইয়াটা ভাবির কোলে বইসা ভাবিরে জড়াইয়া ধইরা হাসতাছে। ভাবি হাইসা কইল, ‘দেখো আমাদের তরুকে! কেমন পুতুলের মতো লাগছে! আমি না ওর একটা নাম দিয়েছি—ফিওরেললিনা। কেমন শোনায়?’
আমি অবাক হইয়া জিগাইলাম, ‘এইটার মানে কি, ভাবি?’
ভাবি চওড়া হাসি দিয়া কইল, ‘ইতালিয়ান ভাষায় এর মানে হচ্ছে ছোট্ট ফুল। আমার মা আমাকে এই নামে ডাকত। তোমার পছন্দ হয়েছে?’
আমি হাইসা কইলাম, ‘খুউউব।’
ভাবি হাইসা আবার হালকা দুষ্টুমি শুরু করল মেয়েটারে নিয়া। আচমকা মাইয়ার গালে একটা টুকুস কইরা চুম্বন খাইল। তরুও দেহি খিলখিল কইরা হাইসা মামির গলা ধইরা তার গালে ছোট্ট একখান চুমু দিল। ভাবি আনন্দে ওর গাল দুইটা ধইরা টাইনা, ‘আউউ, আমার সোনা বাবুটা!’ কইয়া ওরে কোলে নিয়া জড়াইয়া ধরল।
আমি হালকা হাসলাম, কিন্তু কিছু কইলাম না। অনেকটা সময় চুপচাপ দুইজনের খুনশুটি দেখতেছিলাম। তারপর সাহস কইরা কইয়া উঠলাম, ‘একটা কথা বলতাম, ভাবি… যদি কিছু মনে না করেন।’
সে হাসল, ‘Oh, dear! Why are you asking for permission? বলে ফেলো।’
আমি মাথা নীচু কইরা কইলাম, ‘তরুরে আপনার কাছে রাখবেন?’
ভাবি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাইয়া কইল, ‘এভাবে কেন বলছ! ও থাকুক না কিছুদিন। আমার তো ওকে অনেক পছন্দ হয়েছে। মেয়েটার প্রাণ খুলে কথা বলার ভঙ্গি আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমার কারানকে দেখো, মুখই খোলে না।’
আমি মৃদু হাইসা কইলাম, ‘কিছুদিনের জন্য কই নাই। সারাজীবনের জন্য। ওর বিয়া না হওয়া পর্যন্ত ও এইখানেই থাকুক। আমি ওর দায়িত্ব আপনাকেই দিলাম। নিবেন?’
ভাবি প্রথমে অপ্রস্তুত হইয়া গেল। খানিকটা ইতস্তত বোধ কইরা আমার দিকে ঝুঁইকা কইল, ‘কিছু কি হয়েছে, ফাতিমা? সারাজীবন শব্দটা… আমার কাছে কেমন অদ্ভুত শোনালো। সব ঠিকঠাক তো? তুমি নিশ্চিন্তে সব বলতে পারো আমাকে।’
আমি হাসলাম। অশ্রুর আভাস লুকানোর চেষ্টা কইরা কইলাম, ‘অমন কিছুই না, ভাবি। তরু আপনারে আমার থেকেও বেশি ভালোবাইসা ফেলছে। আর আমি তো ওরে দেখতে এই বাড়িতে আসবই।’
ভাবি স্বস্তি পাইল না কথায়।
‘তবুও, বাচ্চা মেয়ে তো! মাকে ছাড়া থাকবে কীভাবে?’
আমি শান্তভাবে উত্তর দিলাম, ‘পারব। হয়ত সময় লাগব, কিন্তু পারব। আর ভাবি, দুইটা বাচ্চা মানুষ করা এক বাড়িতে আমার পক্ষে কষ্ট হইয়া যায়। কাজকর্ম সামলাইতে যাইয়া ওগো ঠিক মতো সময় দিতে পারি না।’
ভাবি হাসল।
‘ওহ তাই! আমি ভাবলাম অন্য কিছু। টেনশন করো না। ওকে আমি কেমন ভালোবাসব আর যত্ন করব, সেটা পরেরবার আসলে বুঝবে। তোমার শুকনো মেয়েটাকে গুলুমুলু, নাদুসনুদুস বানিয়ে ছাড়ব একদম।’
এই কইয়া সে তারান্নুমের পেট ধইরা মজা করতে লাগল। মেয়েটাও কাতুকুতু পাইয়া হাইসা লুটোপুটি খাইল।”
ফাতিমা এক মুহূর্ত থামল। কণ্ঠটা ভারী করল, “কারণটা তো তুমি জানো, আম্মা। ওই বাড়তে যা ঘটে, আমি চাই নাই আমার মাইয়া সেইটা সহ্য করুক। ওর কানে যেন কারো অপমানের শব্দ না পৌঁছায়, তাই ওই ভাবির কাছে রাখা। আর আমি জানতাম, ভাবি তারান্নুমরে কোনো দিক দিয়া কমতি রাখব না, বরং বেশিই দিবে।”
তারপর নিস্তব্ধ কণ্ঠে একটানা বলতে থাকল, “ওই বাড়তে ফিরবার পর কাটল দুইটা বছর। এরমধ্যে কৌশি ভাবিও হারাইয়া গেল। আমি পইড়া রইলাম অবমাননা আর দগ্ধ দিনের ভেতর। তহনই একদিন অনেক বছর পর আকবরের চিঠি আইল।
ও লিখছিল, ‘আমি জানি ফাতমা, তুই ভালো নেই। শুধু একবার বল, আমি তোকে ওই নরক থেকে নিয়ে আসব। খালাম্মার সামনে দাঁড়িয়ে তোর সম্মান রাখব। তুই বললেই আমি তোকে বিয়ে করব। তোকে যেভাবে অপমান করা হইছে, মনে পড়লে বুক ছিঁড়ে যায়। ইচ্ছে করে সবগুলারে শেষ করি। আর হ, তুই জিগাইছিলি আমার এত টান কেন—কারণ আমি তোকে পনেরো বছর আগ থেকেই ভালোবাসি। এখনো ভালোবাসি। আর সারাজীবন বাসব।’
কিন্তু সেই চিঠি আমার হাতে পড়ে নাই। শাউড়ীর হাতে পড়ছিল। সে পাটোয়ারী বাড়ির সবার সামনে দাঁড়ায়া আমারে মা*গী থেইকা শুরু কইরা যত নোংরা গালি আছে দিছে, লাথিও মারছে। আমি বুঝাইলাম, কানলাম, কিছুই শুনল না।
এরপর যহন রমজান আইল, ওই চিঠি আম্মা তার হাতে দিল। সে চিঠি পইড়া রাগে আমারে সবার সামনেই জুতা খুইলা মারল। আম্মা, সেই দিন আমি মাটিতে পইড়া রইলাম। আমি এত এত বুঝাইলাম, কানলাম, ক্ষমা চাইলাম, পা ধরলাম তার, কিন্তু সে শোনে নাই। একটা কথাও শোনে নাই। ছোট্ট তালহাটা সামনেই এই দৃশ্য দেখল। দেখল আমার ব্যথায় ফুইলা, লাল হইয়া যাওয়া শরীর। দেখল আমার চিৎকার। দেখল আমার অসহায়তা। ছেলেটা কাঁনতেছিল, আমারে ধরতে চাইছিল, কিন্তু ওরে টান দিয়া নিয়া গেল ভিত্রে।
আমার শরীর আগুনের মতোন জ্বলতে লাগল। সাতদিন বিছানায় লটপট করলাম ব্যথায়। আমার বুকের কাছে শুধু পইরা থাকত তালহাটা। আমার যতোন করত। ছেলেটা মায়ের এমন অবস্থা দেখতেছে, এইটা আমার সহ্য হইল না। তাই ওরে ঢাকা ভাইজানের কাছে পাঠাইয়া দিলাম পড়াশোনার কথা কইয়া।
এরপর থেকে আমার জীবন শুধু মাইর আর গালিতে ভইরা গেল। কিন্তু জানো আম্মা, ভুল কিন্তু আমার আছিল না।”
ফাতিমা চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকালেন। কণ্ঠে শীতল কাঁপুনি নিয়ে বললেন, “ভুল কার আছিল জানো?”
আম্বিয়া ঝাপসা চোখে তাকিয়ে মেয়ের সব কথা গিলে নিলেন। বুকের ভেতরে জমাট বাঁধা কষ্ট কেবল ঠান্ডা গলায় বের হয়ে এলো, “আকবরের।”
ফাতিমা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। রাগে তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল। এবার ফুঁসতে থাকলেন তিনি।
শক্ত গলায় উচ্চারণ করলেন, “না, রমজানের।”
আম্বিয়া আঁতকে উঠলেন। চোখ বিস্ফোরিত, ভ্রূ কুঁচকে গেল।
“কি কস, মাইয়া?”
ফাতিমার চোখ লালচে। ঠোঁট থরথর করছে। গলা কেঁপে উঠল, তবু তিনি থামলেন না, “ঠিকই কইছি। আমারে ওরা ভুল বুঝাইছে। আকবর ওইদিন শুধু ওইটুকুন লেখে নাই। ও কেমনে বিয়ের আগে থেইকা আমার প্রেমে পড়ছিল, রাত-দিন জাগছিল আমারে পাওনের লাইগা, একতরফা ভালোবাসা লইয়া বাঁচছিল—সব লিখছিল। আমারে না, আব্বারে প্রস্তাব দিছিল, সেই কথাও লিখছিল। অর্থাৎ ওই চিঠিতে এমন কিছুই বুঝায় নাই, যে তার লগে আমার সম্পর্ক চলে।”
ফাতিমা হাঁপ ছাড়লেন। কিন্তু বুকের ভেতরে জমাট বাঁধা আগুন হঠাৎ বের হয়ে আসতে চাইল। হাত মুঠো করে রাখলেন। কঠিন গলায় বললেন, “কিন্তু ওই চিঠি কাচি দিয়া কাইটা শাউড়ী শুধু উপরের লেখাটুকুন রাইখা দিছিল। রমজানরে ওইটাই দেখাইছে। আর ওই কাটা চিঠির টুকরাগুলান আমি পাইছিলাম শাউড়ীর ঘর গুছাইবার সময়। বালিশের নিচে লুকানো আছিল। আমি তহন মনে মনে কি যে খুশি হইছিলাম! এইবার তাইলে প্রমাণ করতে পারুম। রমজানরে দেখাইয়া, বুঝাইতে পারুম। কিন্তু… কিন্তু শাউড়ী টান মাইরা ওই কাগজ নিয়া গেল। আমার চোখের সামনেই পুরাইয়া দিল। আমি চিৎকার করলাম, ধরলাম, কিন্তু পারলাম না। ওই মুহূর্তে বুকটা এমন কইরা ফাটতেছিল, যেন রক্ত বাইর হইব।”
আম্বিয়া প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে থরথর করে কাঁপতে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ঠোঁটও কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না।
ফাতিমা আবার শক্ত হলেন। গলায় কষ্ট জমে কাঁটার মতো বিঁধছে। তবুও চোখের দৃষ্টি স্থির রেখে চোয়াল শক্ত করে বললেন, “তুমি এহন কইবা, এইহানে রমজানের দোষ কই? কিন্তু শুনো আম্মা, দোষ ওইখানেই। আমারে একটুখানি বিশ্বাস করলে, একবার জিগাইলে, ওই অভিশাপের বোঝা বইতে হইত না।
একটা মানুষ যদি নিজের স্ত্রীকেও বিশ্বাস না করে, অন্যের কাটা-কাটা অর্ধেক চিঠিতে ভরসা করে, সেই দোষ কি তার না? রমজান আমারে জুতা দিয়া মারল, গালি দিল, মানুষে ভরা উঠোনে অপমান করল—কিন্তু একটাবারও চোখে চোখ রাখল না, একটাবারও জিগাইল না, ‘ফাতিমা, সত্যি ক?’ এইখানেই তো তার অপরাধ, আম্মা! অপরাধ না?”
ফাতিমা দাঁড়িয়ে থেকে বিষাক্ত কণ্ঠে বললেন, “আর ওর বড় দোষ, ও কোনোদিন আমারে ভালোবাসে নাই। আমারে মিথ্যা দেখাইছে সারাজীবন। সব… সব মিথ্যা দেখাইছে।”
কণ্ঠে কাঁপন থাকলেও ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভ তার গলাকে আরও ধারালো করল।
“তুব্বার তহন দুই বছর বয়স। এতদিন ওগো সব অত্যাচার সহ্য করছি চুপচাপ। রমজান বাসায় আসলেই আমারে শুধু মারত। লাঠি, জুতা, ছাতা—কি দিয়া যে মারে নাই! আমি কত কইছি, কত কাঁনছি, কোনো লাভ হয় নাই।
তাছাড়া তুব্বাও মাইয়া আর আমার মতোন গায়ের রং পাইছে দেইখা, কত রকমের বিষ কইছে সবাই। একদিন তো কইল, ‘এই মেয়েটারে জীবন্ত কবর দে, অবৈধ, কার না কার জানি সন্তান। এর জন্মই বেহুদা। শুধু শুধু ভাত নষ্ট করবে।’
নিজের গায়ে কলঙ্কের দাগ লাগার পর কত কথা শুনতে হইছে, কিন্তু আমি মুখ খুলি নাই। খুললেও যে কেউ শুনতে চাইত না, তাই নীরব আছিলাম সবদিন। ভাবছিলাম, চুপ থাকলে হয়ত ঘরটা টিকব।
তহন বাটন ফোনের যুগ। রমজানেরও ওই ফোন আছিল। সেইদিন সে গোসল করতে গেছিল পুকুরপাড়ে। আমি সবে তুব্বারে গোসল করাইয়া আইনা বিছানায় বসায়ে ওর মাথাটা মুছতেছিলাম। হঠাৎ ফোনের টুংটাং শব্দে চমকাইয়া উঠলাম। তার ফোনে কোনোদিন হাত দেই নাই, সে নিজেই মানা করত। কিন্তু ওইদিন বারবার শব্দ হওয়ায় হাত বাড়াইলাম।
স্ক্রিনে লেখা ‘আমার জান’ নামটা দেইখা বুকটা হিম হইয়া গেল। নিজের চোখে বিশ্বাস হইল না। কৌতূহল আর ভয়ের দোলাচলে মেসেজ খুললাম। এমন সব রসালো শব্দ, এমন সব উষ্ণ বাক্য—যা আমার জবান দিয়াও উচ্চারণ করা যাইব না। আগের মেসেজগুলো খুলতে লাগলাম, নিচে নামতে নামতে দেহি শ্যাষই হয় না। মনে হইতেছিল, বহু বছরের অন্তহীন প্রেমকথা।
আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলতে লাগল। রাগে মাথা গরম, চোখে পানি গড়ায়া পড়তেছিল। যারে আমি নিঃশেষ কইরা ভালোবাসলাম, যার জন্য এই কয়েদখানার মতোন শউরবাড়িতে বছরের পর বছর পার করছি, তার কিনা অন্য প্রেমিকা আছে! আর সেইটা এক-দুইদিনের না—বহু বছরের।
ঠিক তহনই রমজান ঢুকল ঘরে। সদ্য গোসলের পানি শুকায় নাই, কিন্তু তার মুখ রাগে লাল, চোখ জ্বলজ্বল করতেছিল। হিংস্র দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইল। হুট কইরা আমার হাত থেইকা ফোনটা হিঁচকাইয়া নিল। চোখ দিয়া মনে হইতেছিল আগুনের তীর ছুঁড়তেছে আমার দিকে। আমি কিছু কওয়ার আগেই তার হাতের তরাম কইরা থাপ্পড় পড়ল আমার গালে।
আমি হাত দিয়া নিজের গাল চাইপা ধরলাম। ব্যথায় মনে হইল ওই জায়গার হাড্ডি ভাইঙা যাইতেছে। অথচ যেইখানে আমার মারার কথা আছিল, আর মারল কিনা সে! সে কটমট কইরা আমার বাহু চাইপা ধরল। এমনভাবে যে ওই জায়গায় গর্ত হইয়া গেল।
গলা কাঁপাইয়া গালি দিল, ‘ওই মা*গী! তুই আমার ফোন ধরছিস কোন সাহসে? কতবার বলছি, আমার ফোনে হাত দিবি না। তাও তোর এই নষ্ট হাত দিয়ে ধরলি কেন?’
রাগে আমার মাথায়ও আগুন ধরল। ফুঁসতে ফুঁসতে আমিও তার গালে একখান চড় মাইরা দিলাম। রমজান স্তব্ধ হইয়া গেল। কিছুক্ষণ অবাক হইয়া চোখ বড় কইরা চাইল। তারপর সাপের মতোন ফোঁস ফোঁস কইরা আবার আমার দুই বাহু পিষ্ট করল। কণ্ঠে বিষ ঢালল, ‘বে*শ্যার ঘরের বে*শ্যা! তোর এত শক্তি কি পরপুরুষের ছোঁয়া লাগার পরে হয়েছে?’
আমি ছটফট করতে করতে ক্রোধে রূঢ় মুখে কইলাম, ‘মুখ সামলাইয়া কথা কন, নইলে আবারও মারতে পারুম। অহনার লগে কয় বছরের সম্পর্ক আপনার?’
সে থমকাইলো। চোখের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য চমক জ্বইলা উঠল। তারপর দাঁত খিঁচাইয়া কইল, ‘ওহ আচ্ছা! তোর তাহলে সবই জানা হয়ে গেছে? বিয়ের আরো দুই বছর আগে থেকেই আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতাম। কিন্তু অহনার ফ্যামিলি তেমন উচ্চবংশীয় না হওয়ায়, মা রাজি ছিলেন না। তাই আমিও তোকে বিয়ে করতে বাধ্য ছিলাম। কিন্তু গোপনে ও আর আমি অনেক আগেই… তাছাড়া তোর বাপ যদি চেয়ারম্যান আর উচ্চবংশীয় না হতো, তোর মতো এই মুখের মেয়েকে আমি বিয়ে করতাম? এই রমজান? আমার জন্য হাজারো সুন্দরী নারীরা অপেক্ষা করেছিল। আর অহনার তো তুই পায়ের নখেরও যোগ্য হবি না। সর, আমার চোখের সামনে থেকে। আর হ্যাঁ, আমার গায়ে হাত তোলার অপরাধের শাস্তিটা তোলা রইল।’
কইয়া এমন ধাক্কা দিল যে আমি ড্রেসিং টেবিলের কাচের বোতলে মুখ থুবড়াইয়া পড়লাম। কাচের টুকরা হাতের ভেতর ঢুইকা গেল। র*ক্ত পড়তেছিল। কিন্তু ওই শারীরিক ব্যথা আমারে কাঁন্দাইতে পারল না। বুকের ভেতরের আগুন সব ব্যথা ঢাইকা দিল।
আমি দাঁত কামড়াইয়া উঠলাম। হাতের কাচের টুকরা শক্ত কইরা ধরলাম। তাতে হাতের ক্ষত বাড়ল। কম্পিত গলায় কইলাম, ‘তার মানে আমি আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী?’”
মিরা কিছুটা বিস্মিত হয়ে চুপচাপ আব্দুর রহমানকে দেখল। তার কণ্ঠে ভেতরের উদ্বেগ প্রকাশ পেল, “কি হয়েছে, বাবা?”
আব্দুর রহমান গভীরভাবে নিশ্বাস নিয়ে চিন্তিত স্বরে বললেন, “আপনি বাসায় আসুন, আম্মাজান। ফোনে সব বলা সম্ভব নয়। কিছু কথা মুখোমুখি বলা জরুরি।”
তারপর মা–বাবা আর মেয়ের মধ্যে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার আলাপ হলো। মিরা ধীরে ধীরে খুলে দিল তার অন্তরের সবকিছু: এই কয়দিনে তার কর্মকাণ্ড, কারানের নিরবচ্ছিন্ন যত্ন, পুরোনো চৌধুরি বাড়ির প্রত্যেকের মমত্ববোধ ও ভালোবাসা। এসব শুনে মমতাজ আর আব্দুর রহমানের মুখে আনন্দের আভা ছড়িয়ে পড়ল।
অন্যদিকে রান্নাঘরে কারানের রান্নাও প্রায় শেষ দিকে। এক এক পদের ঝাঁজালো বাষ্প উঠছে চুলোর উপর থেকে। সে বাইরে থেকে তাদের কথোপকথন কান খাড়া করে শুনছিল, তবু হাতের কাজ বন্ধ করেনি। হঠাৎই সে দুই হাত বুকের কাছে বেঁধে পেছনে ফিরল। দৃষ্টি আটকে গেল মিরার উপর। মেয়েটির হাসিখুশি মুখ দেখে এক মুহূর্তের জন্য তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই মুখটা জমে গেল কঠিন অভিব্যক্তিতে।
তার ভেতরের অন্ধকার সত্তা ফিসফিস করে উঠল, “তুমি যে রূপে আমাকে দেখছো, সেটি কেবল একটি মুখোশ। বিনিথ ইট, আমি একেবারেই ভিন্ন মানুষ, মিরা। আই অ্যাম অ্যা রুথলেস হান্টার। আমার সিক্রেট চেম্বার আর কাজগুলোর খবর যদি কোনোদিন জানতে পারো, ইউ মাইট ওয়ান্ট টু ডিস্ট্রয় মি উইথ হেট্রেড। আমি কতটা পৈশাচিকভাবে একেকটা খু’ন করি— যদি নিজের চোখে দেখতে, তুমি ভেঙে পড়তে, স্টারলিং। বিকজ ইন দোজ মোমেন্টস, আই টার্ন ইনটু অ্যা ব্লাডথার্স্টি বিস্ট; ওদেরকে টুকরো টুকরো করে আগুনে ফেলে, মশলা মাখিয়ে রান্না করে…”
তার মুখে হঠাৎ ব্যাকুল হাসি খেলল। চোখের রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। স্বাভাবিক রূপের বদলে একটি হিংস্র, নির্বিকার, অমানবিক রূপ প্রকাশ পেল। চোখগুলো সরু, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিরাকে দেখতে থাকল; মিরাকে যেন চোখ দিয়েই গিলে ফেলছে। ভ্রূ কুঁচকে উঠল ক্রোধে ও বাসনায়।
পরে আবার বলল, “সেই রূপে আমি নিজেকেও ভয় পাই। বাট হোয়েন আই সি ইউ, তখন সেই রূপ আমার মধ্যে আরও ফেরাল হয়ে ওঠে। আই বিকাম জেলাস অব মাইসেল্ফ ইন দ্যাট ফর্ম, তোমাকে পাওয়ার জন্য ডেসপারেট হয়ে উঠি। তোমাকে তো চাইলেই পেতে পারি, তবু সেই রূপে কেন চাই না, জানতে চাও? বিকজ মাই ব্রুটালিটি উড ডিস্ট্রয় ইউ, তোমার শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেবে। অ্যান্ড আই নেভার ওয়ান্ট টু লুজ ইউ। আমি চাই, তুমি চিরকাল আমার পাশে, আমার কব্জায় থাকবে। এভরিথিং আই ডু কামস ফ্রম দ্য ডেপথ অব মাই লাভ।”
তার চোখে পাগল করা উন্মত্ততা জ্বলে উঠল। সে আবারও ফিসফিস করল, “ইয়েস, আ’ম আ ব্রুটাল। ইয়েস, আ’ম আ কি’লার। বাট ওয়ান থিং রিমেইন্স আনচেঞ্জড—আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসার মধ্যে কোনো ভণিতা নেই, নেই কোনো মিথ্যে।”
কারান হাত দুটো দিয়ে চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে নিল। গভীর এক নিশ্বাস মুখ থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর আবার রান্নার কাজে মন দিল।
এদিকে মিরার ফোনে কথা শেষ হয়ে গেছে। আনন্দে হেসে ফোন কেটে দিল সে। সোফায় বসে থাকা অবস্থাতেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে একবার কারানের দিকে তাকাল। দেখল, সে ব্যস্ত চুলোর দিকে। মিরার মুখে এবার অদ্ভুত এক দ্বিধা ও ভয়ের রেখা ফুটে উঠল। নীরবে ওড়নাটা সোফায় ফেলে উঠে দাঁড়াল। ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে কারানকে জড়িয়ে ধরল। গলার স্বর হঠাৎ করেই নরম মখমলের মতো হয়ে গেল, “হানি…”
কারান ভালো করেই জানত মিরার এত কোমল হওয়ার পেছনের কারণ। তবুও সে মুখে কোনো আবেগ ফুটতে দিল না, ঠান্ডা গলায় বলল, “শুনছি।”
মিরা আংশিক অনিশ্চয়তায় আমতাআমতা করে বলল, “একটা কথা… মানে, তুমি কি শুনেছ?”
“কি?”
মিরা এবার আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে, তার কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ল, “যাই? প্লিজ, না করো না।”
কারান হাতের কাজ না থামিয়েই শুষ্ক স্বরে বলল, “আমি পারমিশন দিয়েছিলাম?”
মিরা মাথা নীচু করে, ভয় মিশ্রিত আবেগে বলল, “মা-বাবাকে যে কথা দিয়েছি…”
কারান কোনো উত্তর দিল না। শুধু গম্ভীর মুখে কাজ চালিয়ে যেতে লাগল। নীরবতা সহ্য করতে না পেরে মিরা আবার বলল, “সত্যি বলছি, সাত দিনের বেশি একটা দিনও থাকব না।”
এবার কারান ঘুরে দাঁড়াল। চোখে শীতল আগুন নিয়ে ভ্রূ উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “সাত দিন? বউকে ছাড়া আমি সাত মিনিট থাকতে পারি না, আর তুমি বলছো সাত দিন? যে কারণে কিনা একদিন থাকতে না পেরেই দুবাই থেকে মাঝরাতে দেশে ফিরে এসেছিলাম!”
মিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ওটা তো জেলাসির কারণে এসেছিলে।”
“না। বউকে ভালোবাসি বলে এসেছিলাম।”
মিরা মুখ বেঁকিয়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে অনুকরণ করল, “বউকে বালোপাছি বলে এছেছিলাম…”
কারান কটমট করে হাত উঠাল, “একটা দেব, বেয়াদব! আবার ভেংচায়!”
মিরা হেসে অনুনয়ভরা স্বরে বলল, “তিন দিন… শুধু তিন দিন। বারণ করো না, প্লিজ।”
কারান আবার কাজে মন দিল। “না।”
মিরা এবার আকুতি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, “আচ্ছা… দুইদিন। এটা ফাইনাল।”
“একদিনের বেশি একটা দিনও না।”
মিরা হঠাৎ ফুঁসে উঠল৷ ক্ষোভে মুখখানা রক্তিম হয়ে উঠল। ভ্রূ কুঁচকে বলল, “হয়েছে। একদিনের জন্য গিয়ে আর কি করব! যাব না।”
“ঠিক আছে।”
মিরা তার পিঠে হালকা ঘুসি মেরে, দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “ঠিক আছে, তাই না?”
কারান হেলদোলহীন, নিখুঁত মনোযোগে কাজ করতে লাগল। মিরা আবার নেতিয়ে পড়া গলায় বলল, “প্লিজ, দুটো দিন। প্লিজ, কারান। জান… ওই জান… হানিইইই… কারান, শোনো না। উমম…”
কারান গম্ভীর মুখে মিরার দিকে তাকাল। মিরার হঠাৎ ক্ষুদ্র ও ভ্রান্তময় মুখের দিকে তাকিয়ে হয়ত ভেতরে মায়া জাগল। বলল, “কবে যাবে? কাল দিয়ে আসব?”
মিরা খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল, “তুমিও যাবে নাকি?”
“না। তোমাকে দিয়ে আসব। তবে আমি বাংলাদেশেই কাজে ব্যস্ত থাকব।”
কারান যাবে না দেখে মিরার মন খারাপ হলেও সে কেবল মাথা নীচু করল, “আচ্ছা।”
“যাও, টেবিলে বসো। আমি সবকিছু সার্ভ করে দিচ্ছি।”
মিরা হাসি দিয়ে কারানের গালে আলতো চুমু খেল। এরপর হেলতে দুলতে টেবিলের কাছে মৃদু আনন্দের সঙ্গে বসল।
কারান আস্তে আস্তে নিখুঁত মনোযোগের সঙ্গে, সেই একশত রকমের পদ একে একে পরিবেশন করতে লাগল। ঘরটিতে রান্নার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়তে থাকল। খাবারগুলো দেখে মিরার মুখ আরো উজ্জ্বল হলো। উৎফুল্লতায় চোখের তারা প্রসারিত হয়ে গেল।
হঠাৎ কারানের ফোনের রিংটোনের শব্দ ভেসে এলো। সে টেবিল থেকে নাম্বার দেখে মিরার দিকে তাকাল, ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কথা বলবে না।”
মিরা মাথা অল্প করে নাড়াল।
কারান ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভারি, তীক্ষ্ণ কণ্ঠের শব্দ ভেসে এলো, “এখন তুই কোথায় আছিস?”
কারান বাকি পদগুলো সার্ভ করতে করতে ভাবলেশহীন জবাবে বলল, “পৃথিবীতেই।”
“শালা, মজা নিস? কি করছিস ভাই তুই? আসবি না নাকি?”
“বউয়ের সাথে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলছি।”
মিরার চোখ বড় হয়ে গেল। সে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ কারানের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই সময় ফারহান বলল, “তুই শালা আমার লয়ালিটিতে ভাঙন ধরাতে চাস। আমি মোটেও বিয়ের আগে তোর বোনের সাথে ওসব করতে চাই না।”
“গুড বয়। আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে তুইও ভালো হয়ে গেছিস,” কারান হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল।
“তরুকে কবে জানি আমি কিডন্যাপ করে আনি, আর সব দোষ তোর।”
“নিয়ে নে, তোরই জিনিস! তবে তোর অতিরিক্ত আদরে ও যদি আমার কাছে কমপ্লেইন করে, তোর পয়েন্ট কাটতেও আমার হাত একটুও কাঁপবে না।”
মিরা হা করে কারানের পায়ে হালকা খোঁচা দিল। কারান তার লজ্জার মুখ দেখে আরও আনন্দ নিয়ে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
ফারহান ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল, “কি ভাই তুই? বন্ধুর ভবিষ্যৎ বাতি নষ্ট করবি বলতে তোর লজ্জাও লাগেনি?”
কারান কটমট করে বলে উঠলো, “এখন কি তোর সামনে নিজের জিনিস দেখাব নাকি? পুরুষ আমি, লজ্জা লাগবে কেন, ফা’কিং বি’চ!”
ফারহান জিভ কাটল, বিদ্রুপ মিশ্রিত স্বরে বলল, “লজ্জা যেহেতু তোর নেই-ই, এখন থেকে আর জামাকাপড় পড়িস না।”
মিরা এদিকে মনে মনে লজ্জার ভাঁজে শেষ। তার কান গরম হয়ে গেছে। শরীর গুটিয়ে কারানকে ছাড়ানোর জন্য বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ দুজন এতটা অপ্রত্যাশিতভাবে সরাসরি যে সবকিছু বলতে পারবে, সে কল্পনাও করতে পারেনি। সে চোখের উপর হাত রাখল, ভেতরে ফিসফিস করল, “হে আল্লাহ! দুইটার মুখে গ্লু লাগিয়ে দাও। তরু রেএএ! আমি কারান নামক ওলকপিকে বিয়ে করে যে ভুল করেছি, তুইও ফারহান নামক ফুলকপিকে বিয়ে করে একই ভুল করিস না। হে খোদা, মুখে দেখি কিচ্ছু আটকায় না এদের।”
কারান গম্ভীর মুখে বলল, “আমার হাতে একটা খুন্তি আছে, বুঝলি?”
ফারহান বুঝে গেল, এটা ছিল এক ধরনের উদুম কেলানি দেওয়ার ইঙ্গিত। তাই সে হেসে ইনিয়েবিনিয়ে বলল, “আচ্ছা মামা, তুই রান্না কর। আমি ওয়াশরুম থেকে ঘুরে আসি।”
হঠাৎ করেই কল কেটে দিল।
কারান তো মনে মনে হেসে খুন, কিন্তু চোখ উলটে সামনে তাকাতেই দেখল মিরা বাঘিনীর ন্যায়ে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মৃদু আক্রোশ ও অনমনীয় দৃষ্টি অবলোকন করে কারান হেসে মিরার কোমর ধরে টেনে আরো কাছে আনল। একটু ঝুঁকে সম্মোহনী গলায় বলল, “যেভাবে তাকিয়ে আছো, মনে হচ্ছে খেয়ে ফেলবে। কি বলো, বেডে যাব নাকি?”
মিরা ঠোঁট কামড়ে, লজ্জা লুকানোর চেষ্টা করে শুধালো, “তুমি এতটা নির্লজ্জ কেন, কারান? না না, তুমি না, তোমরা! এগুলো… ছিইই! এতক্ষণ কি সব বললে? তাও কিনা বউয়ের সামনে!”
কারান ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, “বউকে দেখেই তো সংযত ছিলাম।”
মিরা হতবাক হয়ে বলল, “এতক্ষণের এইটিন প্লাস কথার উপরেও কি কিছু আছে?”
“এইটিন প্লাস? আমরা তো এইটিওয়ান প্লাস কথা বলি,” কারান কণ্ঠে বিদ্রুপ মিশিয়ে বলল।
মিরা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। কারান হালকা হেসে বলল, “এভাবে তাকিয়ে সময় নষ্ট করো না। খেয়ে নাও। তারপর তোমাকে একটা জিনিস শেখাতে অন্য ঘরে নিয়ে যাব।”
গাড়িটি ধীর গতিতে রাস্তার ধারের এক প্রাচীন গাছের পাশেই থামল। গাছের ছায়ায় হেলানো একটি সাইকেল, যার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মালিক। গাড়ি থেকে নামল ইলিজা। তার গায়ে সবুজ কুর্তা আর ঢিলেঢালা ব্যাগি জিন্স, কাঁধে দায়সারাভাবে ঝুলানো সাদা ওড়না। চুলগুলো সরলভাবে পনিটেল স্টাইলে জুটি করা। পিঠে একটি ব্যাকপ্যাক।
ইলিজা হেসে সামনের দিকে তাকাতেই কাব্য তার দিকে লক্ষ্য করল। আজকের কাব্য বেশ গম্ভীর, গুছানো, মুখেও প্রাপ্তবয়স্কতার ছাপ স্পষ্ট। গাঢ় সবুজ পাঞ্জাবি তার আভাকে আরও অনবদ্য করে তুলেছে। পায়ে দামি লোফার, হাতে একটা ঘড়ি, চোখে লুকানো একটা তীক্ষ্ণ ভাব—সবমিলিয়ে অপূর্ব লাগছিল তাকে।
ইলিজা এগিয়ে আসতেই টের পেল, বুকের ওপর দু’হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে থাকা কাব্যের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল কেবল তার দিকেই। তবে ইলিজা কাছে আসতেই কাব্য হালকা কেশে চুলে হাত বুলিয়ে নিল।
ইলিজা মৃদু হাসি ছড়িয়ে বলল, “কী ব্যাপার, বলুন তো? আজ তো আপনাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। উপরন্তু, আমার পোশাকের রঙের সঙ্গেও অদ্ভুতভাবে মিলে গেছে আপনারটা। কাহিনি কী?”
কাব্য চোখ নামিয়ে হালকা হেসে বলল, “না মানে, আমিও তখন থেকে তাই ভাবছি, দুজনের রং অজান্তেই কীভাবে মিলল দেখুন!”
ইলিজা ভ্রূ সামান্য উঁচিয়ে বলল, “দেখছি তো। সাথে আরও অনেক কিছুই দেখছি। আজ মুখটা কেমন অন্যরকম মনে হচ্ছে, চোখেও প্রেম প্রেম ভাব। আবার সাইকেল এনেছেন… আপনার মতলব তো সুবিধার ঠেকছে না।”
কাব্য চওড়া হেসে বলল, “তা মতলবে একটু অসুবিধে আছে বৈকি।”
ইলিজা চোখ বড় করে, বিস্মিত কণ্ঠে বলল, “মানে? এই ফাঁকা জায়গায় কেন ডাকলেন বলুন তো?”
কাব্য ইলিজার সামান্য অবসন্ন অবস্থা দেখে আশস্ত কণ্ঠে বলল, “হয়েছে। আর ঘাবড়াতে হবে না। চলুন, আজকে সারাদিন আপনাকে নিয়ে ঘুরব।”
ইলিজা খুশিতে হেসে লাফিয়ে উঠল, “কোথায় কোথায় ঘুরাবেন?”
“আগে সাইকেলে উঠে বসুন। তারপর দেখি কোথায় যাওয়া যায়। চিন্তা নেই, জাহান্নামের পথ আমি চিনি না। গেলে দুজনে জান্নাতের দিকেই পা বাড়াব।”
এরপর কাব্য সাইকেলটি টেনে তুলে দাঁড় করাল। উঠে বসে সামনের দিকে দৃষ্টি ফেলে বলল, “আসুন।”
ইলিজা হালকা হেসে পিছনে উঠে বসল। পা দুটো সঙ্গমে একই দিকে ফেলে রাখল।
কাব্য সতর্ক কণ্ঠে বলল, “আরে, ধরে বসুন। পরে হাত-পা ভাঙলে আপনার মা-বাবার কাছে জবাবদিহি দিতে হবে। আর মেয়ের পা ভাঙা ছেলেকে নিশ্চয়ই তারা জামাই হিসেবে মেনে নেবে না। তার থেকে বড় কথা—আপনার চিকিৎসার জন্য আমার কতগুলো টাকা ব্যয় হবে, বলুন তো?”
ইলিজা খপ করে হেসে বলল, “বাব্বা! এত চিন্তা! আপনিও দেখি আমার বাবা-মায়ের মতোই। আমার থেকে টাকার চিন্তা, চেয়ার-টেবিলের চিন্তা বেশি।”
কাব্য মুচকি হাসল। ইলিজা আলতো করে কাব্যের কাঁধে হাত রাখল। হাতটা যদিও কাঁপছিল। বুকের ভেতরে কেমন একটা শিরশিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। একটু পর কাব্য সাইকেল চালাতে শুরু করল। হালকা বাতাসে দুজনেরই চুল দুলতে লাগল, যেন প্রকৃতিই তাদের মধুর সময়ে অংশগ্রহণ করছে। আশেপাশে পড়ে থাকা পাতা পথটিকে আরও স্নিগ্ধ ও প্রাকৃতিক রূপে পূর্ণ করছিল। ইলিজা হেসে হাত ছড়িয়ে উপরে পড়া একটি পাতা ধরে কাব্যের মাথায় ছুঁড়ে দিল। কাব্য হালকা হাসি দিয়ে মাথা এদিক ওদিক করে পাতাটি ঝেড়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর ইলিজা কৌতূহলপূর্ণ কণ্ঠে বলল, “এভাবেই সাইকেল ভ্রমণ করাবেন নাকি? কোথাও বসবেন না?”
“হ্যাঁ, সামনেই। ওই তো, এসে গেছি।”
সাইকেলটি নদীর পাড়ে থামল। ইলিজা নামল, কাব্যও পাশে নেমে সাইকেলটি লক করল। বলল, “চলুন, নদীর পাড়ে বসি।”
ইলিজা মাথা নেড়ে পিছু নিল। নদীর পানি হালকা ঢেউ খেলছে, দূরে কয়েকটা রঙিন নৌকা ধীরে ধীরে পার হচ্ছে। নদীর ওপাশে উঁচু ধানের শিষ দুলছে, আর নিকটবর্তী জলের কিনারায় কচুরিপানার মধ্যে হালকা বেগুনি-সাদা ফুল ফুটে আছে। সব মিলিয়ে দৃশ্যটি চোখ ভরে যাওয়ার মতো স্নিগ্ধ ও শান্ত।
ইলিজা মুগ্ধ হেসে বলল, “অসম্ভব সুন্দর জায়গাটা। শহরের কোথাও যে এমন জায়গা আছে, আমি তো জানতামই না।”
কাব্য হেসে বলল, “একটু ওয়েট করুন।”
এরপর উঠে আস্তে আস্তে নদীর পাড়ে নেমে গেল। ইলিজা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। কাব্য নদীর পাড়ে গিয়ে ঝুঁকে একটি কচুরিপানা ফুল তুলতে গেল। ইলিজা পিছন থেকে সতর্কভাবে বলল, “আরে কাব্য, পড়ে যাবেন তো। সাবধানে।”
কাব্য গলা উঁচিয়ে বলল, “পড়ব না।”
এরপর কাব্য একটি কচুরিপানার ফুল তুলে আনল। ফুলগুলো দূরে থাকায় নাগাল পেতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, জলেই পড়ে যেত যদি একটু অসাবধান হত। ইলিজা সেই দৃশ্য দেখে মুখ ছোট করে বসেছিল। একটু পর কাব্যকে নিরাপদে ফিরে আসতে দেখে মুচকি হাসল।
কাব্য নিচে দাঁড়িয়ে হাতটা বাড়িয়ে বলল, “হাতটা ধরে একটু উপকার করুন। নাহলে মাটি ধরে উপরে উঠতে হবে, আর ময়লা লেগে আমার সুন্দর পাঞ্জাবিটার তেরোটা বাজবে।”
ইলিজা হেসে তার হাত শক্ত করে ধরল। কাব্য উপরে উঠে ফোঁস করে একটি নিশ্বাস ছেড়ে পাশে বসল। ইলিজার দিকে ফুলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “এভাবেই সারাজীবন শক্ত করে হাতটা ধরে রাখবেন, কেমন?”
ইলিজা লজ্জায় মুচকি হাসল। গালজোড়ার টকটকে রঙে এবং চোখের মৃদু দীপ্তিতে তার লাজের চুম্বকীয় উপস্থিতি যেন পুরো মুহূর্তকে আরো মধুর করে তুলল। ইলিজা হাতে ধরা ফুলটা দেখতে দেখতে বলল, “কি দরকার ছিল এত কষ্ট করে আনার? তাছাড়া গাছের ফুল যে গাছেই সুন্দর।”
কাব্য হালকা হাসি দিয়ে বলল, “কথাটা সঠিক হলেও পাশে বসে থাকা ফুলটার হাতে এই ফুলটা আরও বেশি মানাচ্ছে।”
ইলিজা স্বচ্ছ হেসে ফুলের নরম সৌন্দর্যের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিচ্ছিল; গালের সাথে কয়েকবার ফুলটা মিলিয়ে নিল। কাব্য আরও কিছুটা কৌতূহ্যভরে বলল, “তবে একটা জিনিস মানাচ্ছে না।”
ইলিজা চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল, “কি?”
“আপনার সাদা ওড়নাটা।”
এই বলে প্যান্টের পকেট থেকে একটি ছোট শপিং ব্যাগ বের করল। তারপর ভেতর থেকে একটি সবুজ ওড়না টেনে আনল। দামি, ঝলমলে সুতোয় সূক্ষ্ম কাজ করা, অপূর্ব নকশার সমাহারে তৈরি ওড়নাটি। কাব্য ধীরে ধীরে ওড়নাটি ইলিজার গলায় পেঁচিয়ে দিতে লাগল। মাথার ওপর দিয়ে টেনে বলল, “এবার দেখুন, কি সুন্দর লাগছে! দুজনকে দেখলে মনে হচ্ছে সদ্য বিবাহিতা যুবক-যুবতী। এতটা অপরূপ কেন আপনি? আপনার এই স্নিগ্ধ চাহনি একদম বুকে গিয়ে লাগে। আমাকে খু’ন করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।”
ইলিজা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের মধ্যে বোঝাই গেল না, কী ঘটল। কাব্যের শান্ত চাহনি, ওড়নাটা পড়ানোর এই নীরব খামোখা মুহূর্ত—সবকিছুই নতুন, অচেনা, কিন্তু আনন্দময়। তার বুকের ভেতর একটি শিরশিরে, কোমল স্পন্দন নেমে এলো।
কিছুক্ষণ তারা দুজন নীরব দৃষ্টিতে একে অপরকে দেখতে থাকল। কাব্য ঢোক গিলে কয়েকবার নরমভাবে শ্বাস নিতে লাগল, কারণ ইলিজার সৌন্দর্য তার মানসিক আবেগকে প্রলুব্ধ করছিল। অবশেষে কাব্য হেসে একটু দূরে সরে বলল, “ওড়নাটা কেমন হয়েছে, বললেন না তো?”
ইলিজার হুঁশ হঠাৎ ফিরে এলো। হতচকিত দৃষ্টিতে তার চোখ আটকে গেল গায়ে থাকা সবুজ ওড়নার অমায়িক সৌন্দর্যের দিকে। নীচের সাদা ওড়নাটিকে কৌশলে টেনে এনে হাতের মুঠোয় ধরল। এতক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃতির অপ্রতিম সৌন্দর্যও তার নজরে এতটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি, যতটা ওড়নাটাকে মনে হচ্ছে। কাব্যের ওড়নাটা যেন জাদুকরী, মায়াবী আভায় তার চোখের কোণ পর্যন্ত আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ইলিজা ওড়নার এক প্রান্ত ধরে কোমল স্পর্শে নাকে ঘেঁষে গন্ধ টেনে নিল। বিষয়টি লক্ষ্য করে কাব্য হালকা হাসি দিয়ে অন্য দিকে তাকাল। তার অন্তরঙ্গ আবেগের প্রশান্তি পুরো মুখাবয়ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইলিজা গভীরভাবে বলল, “অসম্ভব… অসম্ভব সুন্দর। জানেন, আমি খুব খুঁতখুঁতে স্বভাবের মেয়ে। সাধারণভাবে কোনো কিছুই দীর্ঘস্থায়ী মনে ধরে না। কিন্তু এটা… এই ওড়নাটা এত বেশি ভালো লাগছে যে মনে হচ্ছে এই একটা ওড়না দিয়েই সারাজীবন চলতে পারব। এত সফট, আর রংটাও কি দারুণ!”
কাব্য তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে হেসে বলল, “হ্যাঁ, আপনার ফরসা গায়ে ফুটে উঠেছে একদম। তবে এই ওড়না খুঁজতে পুরো দুই দিন লেগে গেছে আমার।”
ইলিজা অবাক হয়ে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “দু-দিন কেন?”
“মনমতো পাচ্ছিলাম না। আর যেটা মনমতো হচ্ছিল, তার আবার ডাবল সংস্করণ ছিল। আর আমার ইলিজার গায়ে যে জিনিস থাকবে, যদি অন্য কারো গায়ে একই জিনিস দেখতে পেতাম, তা সহ্য করা আমার জন্য অসম্ভব হতো।”
ইলিজার ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটল।
“একটা কথা বলুন তো—আপনি কি ভালোবাসেন, নাকি মায়ায় পড়েছেন?”
কাব্য গভীর কণ্ঠে বলল, “ভালোবাসা স্বাধীন, অথচ মায়া বাঁধন। ভালোবাসলে মানুষ তার মায়ায় আটকে থাকে না। কিন্তু মায়ায় পড়লে, ভালোবাসা নিজেই আসতে বাধ্য হয়। একজন মানুষ অনেককেই ভালোবাসতে পারে, কিন্তু মায়ায় শুধুমাত্র একজনেরই পড়ে।”
এরপর ইলিজার দিকে গভীর চাহনিতে বলল, “আর আমি আপনার মায়ায় পড়েছি। কিছু বুঝলেন?”
তার চোখের গভীর দৃষ্টি, গলার গভীর স্বর—এমন নিখুঁত এক উপলব্ধি, যা ইলিজার মনকে স্থির করল। তাই ইলিজা মুহূর্তটা পালটে দিতে হঠাৎ কপালে হাত রেখে বলল, “ইশ! দেখুন, ভুলেই গিয়েছিলাম।”
কাব্য কপাল কুঁচকে বলল, “কি?”
ইলিজা হালকা হেসে ব্যাগের চেইন খুলে একটি হটপট বের করল। এরপর কাব্যের হাতে সেটা ধরিয়ে দিল। কাব্য অবাক হয়ে একবার ইলিজার পানে তাকাল। ইলিজা ইশারায় খোলার ইঙ্গিত দিল। কাব্য চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে হটপটটি খুলল। এক একটি বাক্স বের হতে লাগল। দেখে কাব্যের বিস্ময় চরমে পৌঁছাল। এক এক বক্সে সাজানো ছিল বিভিন্ন পদ—এক বক্সে রাখা বিভিন্ন রকমের আচার, অন্য বক্সে রাখা সূক্ষ্মভাবে শুকানো পিঠের স্তর, পরবর্তীতে ছিল মাছের নানা রান্না, আরেকটাতে সরগরম সবজি, গরুর রেজালা আলাদা করে রাখা, এবং শেষটিতে সুবাসিত পোলাও। কাব্য কিছুই বুঝতে পারছিল না। চোখে বিস্ময়, মুখে অগোছালো হতচকিত ভাব নিয়ে তাকাল ইলিজার দিকে।
ইলিজা হালকা হাসি দিয়ে বলল, “পিঠে আর আচারটা বাদে বাকিগুলো হটপটে ঢুকিয়ে রাখুন। নাহলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে।”
কাব্য কিছুটা বিভ্রান্তি প্রকাশ করে বলল, “আমি ঠিক বুঝলাম না।”
ইলিজা মুখ ফুলিয়ে, নির্ভুল হাতের নিখুঁত অঙ্গভঙ্গিতে সবকিছু গুছিয়ে একটা পাশে সরিয়ে রাখল।
“মাকে বলেছি, আজকে সারাদিন আবিদার বাসায় থাকব। আর ওর জন্যই এসব নিয়ে যাচ্ছি। মেসে থেকে ঘরোয়া খাবারের স্বাদ তো পান না, তাই আপনার জন্যই ভুজুংভাজুং বলে নিয়ে এসেছি। এখন প্রথমে জলপাইয়ের আচারটা টেস্ট করে দেখুন, এটা আম্মু লা জাবাব বানায়।”
কাব্য হঠাৎ আবেগে ভেঙে পড়ল। কপালে দুই হাত বেধে মাথা নামাল, নিশ্বাস দীর্ঘ ও গভীর হলো, অন্তরঙ্গ অনুভূতির চাপ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছিল। ইলিজা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে শান্ত মুখে বলল, “কি হলো? খাবেন না নাকি? তাহলে প্যাক করে রাখি, বাসায় গিয়েই নাহয় খাবেন।”
কিন্তু তার কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই কাব্য হঠাৎ ঘুরে বসল, দু’হাত দিয়ে ইলিজার তুলতুলে, কোমল হাতগুলো নিজের শক্তিশালী হাতের মধ্যে আবদ্ধ করল। ইলিজার চোখ বড় হয়ে রকমারি অশান্তি আর বিস্ময়ে মুখমণ্ডল কেমন লালচে হয়ে উঠল। হতচকিত হয়ে কিছুটা কেঁপে উঠলো। কাব্য ছলছল চোখে, গভীর আবেগে ভরা স্বরে বলল, “১৪ হাজার টাকার বেতনে আপনি কি আমার সঙ্গে সংসার করতে রাজি, মিস ইলি?”
হঠাৎ প্রশ্নের প্রাঞ্জল অর্থ উপলব্ধি করতে ইলিজার কিছুটা সময় লাগল। তবে কাব্যের গভীর দৃষ্টি, প্রকাশিত আকুলতার স্পর্শ তাকে শান্ত করে দিল। দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লো, হালকা কণ্ঠে বলল, “এত টাকা দিয়ে কি করব আমরা?”
কাব্য কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে বলল, “এই মাত্র কিছু টাকাকে এত মনে হলো? আপনার কেবল দু’টি ড্রেস কিনলেই তো এই টাকা শেষ হয়ে যাবে।”
ইলিজা হেসে বলল, “তাহলে আমাদের মেয়েদের বিষয়ে আপনার ধারণা কম।”
“ভুল বললেন। মেয়েদের ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই।”
“তাই তো জানেন না। আমরা মেয়েরা যেমন দশ হাজার টাকায় মল থেকে কাপড় কিনে পড়তে পারি, আবার তিনশো টাকা দিয়ে ফুটপাথের ড্রেসও নির্দ্বিধায় পড়তে পারি। শুধু চোখে পছন্দ হওয়া চাই।”
কাব্য মাথা নাড়িয়ে বলল, “কিন্তু আমি আপনাকে কখনোই ফুটপাতের ড্রেস কিনে দেব না।”
ইলিজা অবাক চোখে বলল, “কেন? খারাপ কি?”
“খারাপ বলিনি। অসম্মানও করি নি। আমি নিজেও ওখান থেকে পোশাক কিনে পড়ি। তবে আমি চাই আপনার উপস্থিতি সর্বদা রাজরানির মতো হোক। আর রানীরা কখনো রাস্তার জিনিস পরিধান করে না।”
ইলিজা নীচু স্বরে হেসে বলল, “রানি?”
কাব্য ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি রেখেই বলল, “হ্যাঁ, আমার মনের আর আমার কুঁড়েঘরের একমাত্র রাজরানি হবেন?”
ইলিজা অন্যদিকে তাকিয়ে আস্তে করে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলল, “ভেবে দেখব।”
কাব্য কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দেখল সকালের কোমল রোদ ইলিজার মাথায় পড়ে রহস্যময় এক আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। কাব্য দুই হাত দিয়ে তার মাথা আড়াল করল। ইলিজা হেসে বলল, “এভাবে রোদ আড়াল করা যায়?”
কাব্য উঠে ইলিজার অন্য পাশে গিয়ে বসল। ইলিজার তুলনায় অনেকটা লম্বা হওয়ায় পুরো রোদটা এবার তার গায়েই পড়ল। এটা অবলোকন করে ইলিজা বলল, “আরে, এবার যে আপনার গায়ে রোদ লাগছে!”
“সে লাগলে ক্ষতি কি! আপনি সুন্দর মানুষ, গায়ের রং সুন্দর থাকাই মানায়। আমি কালো মানুষ, রোদ আর কি কালো করবে?”
ইলিজা চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ নিঃশব্দ রইল। তারপর বিষণ্ন গলায় বলল, “আপনাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। কারণ আমার দৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম রংকে আপনি অপমান করেছেন। যদি একবার নিজের প্রতিচ্ছবি আমার চোখে দেখতে পেতেন, বুঝতে পারতেন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুপুরুষটা কতটা অনন্য ও মহিমান্বিত।”
কাব্য স্তব্ধ বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে রইল। চোখদুটি প্রসারিত, ঠোঁট সামান্য উন্মুক্ত। অনির্বচনীয় এক শিহরন মুহূর্তেই দেহমনে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তার কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। ভাবতেই পারেনি, ইলিজা এতটা দার্শনিক ও রূপময় ব্যঞ্জনায় তাকে অঙ্কন করতে পারে। ইলিজার দৃষ্টিতে সে যে এতটা মোহনীয় ও বিরল সত্তা—এই উপলব্ধি বুকের অন্তস্তলকে পরম পুলকের জোয়ারে ভাসিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ দুজনেই নির্বাক হয়ে সামনের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের দিকে চেয়ে রইল। হালকা বাতাসে সবুজ পাতাগুলো যেন মধুর নীরব সংগীতে দুলছিল।
অবশেষে অল্প বিরতির পর ইলিজা স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল, “আপনার মানিব্যাগটা দেখি।”
কাব্য হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল। কোনো প্রারম্ভিক প্রশ্ন না করেই, নিজের পকেটের গভীরতম স্থান থেকে বের করে ইলিজার হাতে মানিব্যাগটি প্রেরণ করল। ইলিজা অবাক হয়ে বলল, “প্রশ্ন করলেন না, কেন চাইলাম?”
“দরকার পড়বে না।”
ইলিজা হালকা হেসে বলল, “দেখব ঠিক কত টাকা খরচ করলেন। এই পরিপাটি লুকস, ওড়নার মূল্যমান বিবেচনা করে নিশ্চিত হতে চাই, আপনার হাতে বাকি মাস চলার মতো আসলেই অর্থ আছে কিনা।”
“টাকা আছে। ছোট একটি চাকরি নিয়েছি। তাই চাকরির প্রথম বেতন দিয়েই আজকের আয়োজন।”
ইলিজা উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, “ওমা! আমাকে তো বললেন না। কংগ্রেস!”
তার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস আর দৃষ্টিতে দীপ্তি দেখে কাব্য মৃদু হাসল। বলল, “আপনি যা কল্পনা করছেন, তা নয়। আমি কেবল পিজ্জা ডেলিভারি বয়ের কাজ নিয়েছি। পরিচিতজনের কারণে অ্যাডভান্স পেয়েছি। তবে যেদিন প্রকৃত মর্যাদার চাকরি পাব, সেদিন সরাসরি আন্টি-আঙ্কেলের সামনে দাঁড়িয়ে আপনাকে চেয়ে নেব।”
ইলিজার গাল মুহূর্তেই টকটকে লাল আভায় দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। সংকোচে চোখ নামিয়ে মানিব্যাগটি খুলল। ভেতরে নিখুঁতভাবে গোঁজা ছিল বৃষ্টিভেজা দিনে তোলা তারই একখানা প্রতিচ্ছবি। দৃষ্টি স্থির হলো ছবির উপর, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ তাকানোর সাহস করল না। কাব্যের চোখে ধরা পড়লে লজ্জা অগ্নিশিখার মতো তাকে গ্রাস করবে ভেবে দ্রুত মানিব্যাগটি ফিরিয়ে দিল।
তবুও অন্তরে অদ্ভুত এক রাজকীয়তা ভর করল। মনে হলো, আজ সে যেন সমগ্র পৃথিবীর রানি। শরীর জুড়ে স্নিগ্ধ শিহরন বয়ে গেল, হৃদয় থেকে নির্গত হলো গভীর স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস। পুরুষের মানিব্যাগের অন্তঃস্থলে নিজের প্রতিচ্ছবি থাকা, এ যেন জীবনের বিরলতম সৌভাগ্য।
সে মুখ ফিরিয়ে হালকা হাসল। তারপর মৃদু স্বরে বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”
কাব্য শান্ত কণ্ঠে বলল, “জি।”
ইলিজা গভীরভাবে কাব্যের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করি মাঝে মাঝে; আপনি সবকিছুতেই নিজেকে অপরাধী ভাবেন। ক্ষুদ্র কিছু ভুলে, অথবা কিছু না করলেও মনে হয়, কোনো না কোনো বিষয়ে ভয় পাচ্ছেন। কীসের এত ভয় পান, বলুন তো?”
Tell me who I am 2 part 8
হঠাৎ করা প্রশ্নে কাব্য সামান্য ভড়কে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর স্বাভাবিকভাবে বলল, “সমাজের।”
ইলিজা কপাল কুঁচকে বলল, “মানে?”
কাব্য দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমি… আমি জেলে গিয়েছিলাম, ইলিজা।”
