খান সাহেব পর্ব ৫২
সুমাইয়া জাহান
ঘুমে তলিয়ে সুমু। পরিপাটি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে বালিশের ওপর। নিঃশ্বাস ওঠানামা করছে। হঠাৎ পাশে রাখা সুমুর ফোনে নোটিফিকেশন এলো। সঙ্গে সঙ্গে ফ্ল্যাশলাইট জ্বলে উঠল। আলোটা গিয়ে পড়ল তার মুখে। মৃদু আলোতে সুমুর মুখটা দেখতে পেয়ে সুমুর মাথায় দু’বার হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল শেরাজ। স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো। খুব আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল সুমুর শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটে, যেন প্রাণহীন ঠোঁটে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা, শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট জোড়া একটু ভিজিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা। সে একটা নিঃশ্বাস টেনে বলল,
“যতদিন তুমি আছো, ততদিনই আমি আছি সুইটহার্ট। যদি তোমাকে এই দুনিয়াতে একশো জন কোনো কারণ ছাড়াই নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, তাহলে তাদের মধ্যে একজন আমি। যদি তোমাকে এই দুনিয়াতে কোনো কারণ ছাড়াই নিঃস্বার্থভাবে একজন ভালোবাসে, তাহলে সেই একজন আমি। আর যদি তোমাকে এই দুনিয়াতে কেউ ভালোই না বাসে। তাহলে বুঝে নিও, এই আমিটা আর বেঁচে নেই।”
শেরাজ পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্যান্ডিকে কল করল। স্যান্ডি কল পিক করতে তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শীতল গলায় বলল,
“কেবিনের বাইরে একটা চেয়ার রাখো আর এই ফ্লোরটা এক্ষুনি ক্লিয়ার করো। কেউ যেন এদিকে না আসে, কেউ না। এই ফ্লোরের সবগুলো সিসিটিভি ফুটেজ এখনই অফ করে দাও।”
স্যান্ডিকে পাল্টা কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কলটা কেটে দিল সে। গিয়ে বসল সুমুর পাশে। সুমুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মৃদস্বরে গান ধরল,
“পেহেলে কিউ না মিলে হাম,
তানহা হি কিউ জালে হাম,
মিলকে মোকাম্মাল হুয়ে হে,
ইয়া থে তানহা ভালে হাম!
সওয়ারে… সওয়ারে… সওয়ারে…
না হামারা…. হুয়া,
না তুমহারা…. হুয়া,
ইষ্ক কা ইয়ে সিতাম,
না গাওয়ারা হুয়া,
না হামারা হুয়া,
না তুমহারা হুয়া,
ইষ্ক কা ইয়ে সিতাম,
না গাওয়ারা হুয়া!
শুন বেরিয়া সাওয়ারে,
শুন বেরিয়া সাওয়ারে!”
থামল সে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও বলল,
“পাপীদের হয়তো ভালোবাসতে নেই, সুইটহার্ট। ভুল হয়তো সত্যিই করেছি। নিজের পাপী হৃদয় দিয়ে এক পবিত্র মায়াবতীকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমরা হয়তো অচেনাই ভালো ছিলাম। পাপীদের পবিত্রতাকে ভালোবাসতে নেয়। তোমাকে ভালোবেসে আমার পাপ কিছুটা মোচন হলেও, তোমাকে পাপী বানিয়েছি আমি। ভালোবাসার নামে তোমাকে শুধু কষ্ট দিলাম। ভুল করেছি আমি। পবিত্রতাকে পাপের ছোঁয়া দিয়েছি। আমি তোমাকে ভালো না বাসলে হয়তো তোমার পৃথিবীটা অন্ধকারে নামতো না আমার ছোঁয়ায়।”
গার্ড দুজন নিজেদের ফ্লোরে ফিরে এলো। কিন্তু ফ্লোরটা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। চোখাচোখি করে থমকে দাঁড়াল দুজনে। তাদের মনে প্রশ্ন এলো, ‘এই জায়গা তো সবসময় প্রাণচঞ্চল থাকে, হঠাৎ এত নিস্তব্ধ কেন?’
তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সুমুর কেবিনের দিকে। দরজার সামনে আসতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল তাদের।
‘স্যার!’ বলে একজন গার্ড বিস্ময়ে দৌড়ে গিয়ে বসে পড়ল শেরাজের পায়ের কাছে। শেরাজ নির্বিকারভাবে বসে আছে একটা চেয়ারে। তার সামনে রাখা সেন্টার টেবিলের ওপর দু’পা তুলে রেখেছে অবলীলায়। হাতে বিরিয়ানির প্যাকেট ধরা। মাথা চেয়ারের পেছনে দিকে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে, যেন রাজসিক শান্তিতে বিরিয়ানি উপভোগ করছে সে। চামচ দিয়ে অল্প অল্প করে তুলে নিচ্ছে বিরিয়ান। তারপর ধীরে ধীরে খেয়ে যাচ্ছে, যেন বাইরের দুনিয়ার কোনো কিছুরই হুঁশ নেই তার। স্যান্ডি রোবটের মতো একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চোখেমুখে এক ধরনের ভয়ের ছায়া। গার্ড দুজন মাথা নিচু করে তার পায়ের কাছে বসে পড়ল। একের পর এক কণ্ঠ কাঁপিয়ে তারা বলতে লাগল,
“স্যার, আমরা বুঝতে পারিনি। ভুল হয়ে গেছে স্যার, মাফ করে দিন।”
কিন্তু শেরাজের দিক থেকে কোনো সাড়া নেই। সে যেন তাদের অস্তিত্বই টের পাচ্ছে না। চোখ বন্ধ তার। মুখে অভিব্যক্তির এক বিন্দুও নেই। চামচে ধরা বিরিয়ানির প্রতিটি কণা যেন তার কাছে এই মুহুর্তে পৃথিবীর সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে বসে থাকা এই মানুষটার সামনে এখন যেন সময় থমকে গেছে। গার্ডদের কাঁপতে থাকা কণ্ঠ, স্যান্ডির জমে থাকা দৃষ্টি, সব কিছুকে উপেক্ষা করে শেরাজ খান তার নিজস্ব রাজ্যে নির্বিকারভাবে বিরিয়ানি খেয়ে যাচ্ছে। গার্ড দুজনের কাঁপা কাঁপা গলায় বলা প্রতিটি কথা যেনো বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। শেরাজ খানের কানে একটিও ঢুকল না। তিনি ধীরস্থির ভঙ্গিতে পুরো বিরিয়ানির প্যাকেটটা শেষ করল। বিরিয়ানির মশলার ঘ্রাণ, চামচের শব্দ, আর গার্ডদের নিঃশ্বাস, সব মিলিয়ে এক ধরনের অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ।
বিরিয়ানি শেষ করে শেরাজ মাথাটা একটু তুলে নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে পানির বোতলটা নিল টেবিল থেকে। কোনো তাড়াহুড়া বা রাগ নেই তার মধ্যে। এক নিঃশ্বাসে পুরো পানির বোতলটা শেষ করে ফেলল সে। তারপর ধীরে ধীরে তাকাল গার্ড দুজনের দিকে। চোখদুটো তখনো শান্ত তার, কিন্তু সে শান্ততার নিচে এক ভয়ঙ্কর গর্জন যেন ঘুমিয়ে আছে। গার্ডদের গা দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। স্যান্ডির মুখ তখনো কাঠের মতো শক্ত। শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ডিউটি করতে করতে তোদের এতটাই খিদে পেয়ে গেল, যে তোরা আমার প্রাণ ভোমরাকে একা রেখে খেতে চলে গেলি?”
তার কণ্ঠে রাগ নেই। কিন্তু তার নরম গলার নিচে জমে থাকা বিস্ফোরণ ঠিকই টের পাচ্ছে সবাই। গার্ড দুজন কাঁপতে কাঁপতে ভয়ে ঢোক গিলে একসাথে বলে উঠল,
“আমাদের ভুল হয়ে গেছে, স্যার। আর কোনোদিন এমন ভুল হবে না, কথা দিচ্ছি।”
শেরাজ একরকম হেলে পড়ে থাকা অবস্থায়, হঠাৎ একটা ভয়ংকর ঠান্ডা হাসি হাসল। সেই হাসিতে যেন গার্ডদের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নামতে লাগল। গার্ডদের অবস্থা দেখে হাসি থামিয়ে দিল শেরাজ। গলা আরেকটু নামিয়ে, কণ্ঠে তীব্র অথচ শান্ত হতাশা নিয়ে বলল,
“আর কোনোদিনও ভুল করার সুযোগটাই তো পাবি না তোরা, তাহলে কীভাবে ভুল করবি?”
গার্ড দুজন তার পায়ের কাছে পড়ে একপ্রকার প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগল,
“স্যার, আর একটা সুযোগ দিন। প্লিজ স্যার! ভুল হয়ে গেছে।”
তাদের কণ্ঠে কান্না আর আতঙ্ক মিলেমিশে একসাথে বেরিয়ে এলো। শেরাজ চোখ বুজে কিছুক্ষণ ওদের আহাজারি শুনল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় অদ্ভুত হাসি টেনে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“চল তোদের একটা সুযোগ দেই।”
গার্ড দুজনের চোখে একটুখানি আলো ফুটল। মনে হলো, বুঝি মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরতে চলেছে তারা। কিন্তু শেরাজ হঠাৎ ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে, মৃদুস্বরে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“মূর্খের দল”, সে স্যান্ডির দিকে না তাকিয়েই বলল, “সান নিয়ে এসো।”
স্যান্ডি বিন্দুমাত্র দেরি না করে মাথা নিচু করে সম্মতি জানালো। সে পাশের কেবিনে চলে গেল। মিনিটখানেক বাদে সান বের হয়ে এলো হাতে একটা বড় পার্সেল নিয়ে। স্যান্ডির পিছনে আরও দুজন লোক বেরিয়ে এলো। তাদের হাতেও বড় বড় পার্সেল। পার্সেলগুলো রাখা হলো একে একে টেবিলের পাশে। স্যান্ডির সাথে আসা বাকি দুজন দ্রুত হাত চালিয়ে পার্সেল খুলে ফেলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো অনেকগুলো বিরিয়ানির প্যাকেট। বিরিয়ানির সুগন্ধে পুরো ফ্লোর ভরে উঠল। গার্ডদের মুখে ততক্ষণে ভয়, কৌতূহল আর ঘাম একসাথে মিশে গেছে। শেরাজ তখনো চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে গার্ড দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখানে কতগুলো বিরিয়ানির প্যাকেট আছে জানিস?”
গার্ড দুজন একসাথে ঢোক গিলে বলল,
“না স্যার!”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে আবারও একটু হাসি টেনে নিয়ে বলল,
“পাঁচশো প্যাকেট”, একটু সে থেমে আবারও বলল, “কিন্তু এগুলো এখানে কেন এনেছি, জানিস?”
গার্ড দুজন আরও ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“না স্যার!”
শেরাজ এবার স্যান্ডির দিকে তাকাল। চোখে ক্লান্তি, মুখে হালকা আফসোস নিয়ে বলল,
“ইয়ে লোক কন হ্যায় ইয়ার? কাহা সে আতে হ্যায় ইয়ে লোক? আরে, কোয়ি ইন দোনো কো সমঝাও। ইয়ে জীনা চাহতে হ্যায়, লেকিন ক্যায়সে জিয়েংগে? ইন দোনো কো তো মেরে এক সওয়াল কা জওয়াব ভি নাহি মালুম।”
স্যান্ডি বিন্দু মাত্র হাসল না। সে একটু ভাবুক হয়ে বলল,
“স্যার! ইয়ে দোনো আপ হি কে বডিগার্ড হ্যায়। আপ ইনহে পেহচান নাহি রাহে?”
শেরাজ ধীর ঘুরে তাকাল স্যান্ডির দিকে। স্যান্ডি এক আঙুল ঠোঁটে চেপে নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে বলল,
“তোরা দু’জন আমার বউকে এখানে একা ফেলে খেতে চলে গেছিস, হ্যাঁ?”, সে একটু থেমে চোখ নামিয়ে ধীর গলায় বলল, “যেহেতু তোরা দু’জন আমার বউকে এখানে একা ফেলে রেখে খেতে গেয়েছিলি, মানে তোদের কাছে আমার বউয়ের নিরাপত্তার থেকেও খাওয়াটা বেশি জরুরি ছিল। আর তাই আজ আমি তোদের দুজনকে মন, প্রাণ, পেট, কিডনি, লিভার, ফুসফুস সবকিছু ভরে খাওয়াব, যাতে তোদের জীবনেও আর ডিউটির সময় খিদে না পায়।”
শেরাজের কণ্ঠে নেই না কোনো উচ্চস্বরে ধমক। বরং এতটাই ঠাণ্ডা, যেন কিছুই হয়নি। গার্ড দুজন শিউরে উঠল। শরীর জমে গেল তাদের। শেরাজ চোখ বন্ধ করে ঘাড়ের পেছনের দিকটা হাতে দিয়ে ধরে একবার বামে ডানে ঘোরাল। তারপর ধীরে চোখ খুলে বলল,
“এই সান, আমার গান কই?”
কথাটা ছুরি মতো ছুঁড়ে গেল। স্যান্ডি এক মুহূর্ত দেরি না করে সাইলেন্সার লাগান দুটো গান শেরাজের হাতে ধরিয়ে দিল। শেরাজ গানটা নিলো হাতে। মাথা নিচু করে, ভয়াবহ ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
“এখানে আছে পাঁচশো প্যাকেট বিরিয়ানি। তোরা দুই জন দু’শো পঞ্চাশটা করে প্যাকেট পাবি। চিন্তা করিস না, তোদের লাগলে আরও আনা হবে। এখন মূল কথা হচ্ছে, যতক্ষণ খেতে পারবি, ততক্ষণ তোরা বাঁচবি, মানে যতক্ষণ তোদের মুখ চলবে, ততক্ষণ তোরাও চলবি। যেই মুহূর্তে খাওয়া থামাবি, সেই মুহূর্তেই তোদের খিদে নামের পাখিটাকে আমি এমন এক ট্যুরে পাঠাব, রিটার্ন টিকিট তো দূরের কথা, কফিনটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না তোদের দুজনের।”
গার্ড দুজন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“স্যার, প্লিজ স্যার! এবারের মতো ক্ষমা করে দিন।”
শেরাজ একটু বিরক্ত মুখে গানের মুখটা দুজনের দিকে তাক করে বলল,
“বোকার দল! আমার কাছে প্রাণ ভিক্ষা মানে আরো তাড়াতাড়ি মৃত্যুকে ডেকে আনা। মৃত্যুর আগে তোদেরই মৃত্যুর চল্লিশা তোদের খাওয়াচ্ছি আমি। ধর যদি তোরা ত্রিশ মিনিট ধরে খাস , তাহলে ওই ত্রিশ মিনিটই তোদের লাইফলাইন। তোদের উচিত ওই ত্রিশটা মিনিট প্রাণ খুলে বাঁচা। আর ক্ষমা? আরে এই সান, এরা কারা? এতদিন ধরে আমার সাথে কাজ করে, অথচ এরা এখন পর্যন্ত আমাকেই চিনতে পারেনি। অবশ্য, আমাকে তো আমি নিজের এখন পযর্ন্ত চিনতে পারলাম না, তোরা কীভাবে চিনবি। বাট তোরা এইটা জানিস না, আমার ডিকশনারিতে দয়া, মায়া, ক্ষমা, এগুলো পুরনো পাতার ছেঁড়া শব্দ। আমার অভিধানে শুধু একটাই শব্দ আছে, ফিনিশ।”
সে চেয়ার থেকে উঠে একটু পেছনে সরে দাঁড়াল। গার্ড দুজন কাঁপতে কাঁপতে খাবার গিলতে থাকল। তিন প্যাকেটের পর আর পারছেনা তারা। একজন হেঁচকি তুলল। শেরাজ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
“ব্যস? এইটুকুই তোদের খিদে? এর জন্য আমার বউকে একা রেখে চলে গেলি?”
পরক্ষণেই কোনো শব্দ না করে দুজনের কপালে দুটো নিখুঁত গুলি ঢুকে গেল। রক্ত ছিটকে পেছনে দেওয়ালে গিয়ে লাগল। শেরাজ স্যান্ডির দিকে ঘুরে বলল,
“ছ্যাহ! এরা নাকি আমার গার্ড ছিল এতদিন”, সে রক্তচক্ষু নিয়ে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই জায়গাটা সুন্দর করে ক্লিন করো। এদের দেহ কেটে টুকরো টুকরো করো, তারপর হিউম্যান ফ্লেশ দিয়ে আফগানি স্টাইলের হিউম্যান ফ্লেশ কাবার তৈরি করো। আজ রাস্তায় যত কুকুর আছে, তাদের পেট ভরে খাওয়াও।”
“ওকে স্যার। কিন্তু, এই বিরিয়ানির প্যাকেটগুলো?”
“ওগুলো রাস্তায় যেসব অভুক্ত আছে, তাদের বিলিয়ে দাও। আজ মানব সেবার সাথে, কুকুর সেবাও করে এসো। মানবজাতি মনে না রাখুক, কুকুরজাতি মনে রাখবে।”
চলে গেল সে। স্যান্ডি আরও কিছু লোক এনে নিজের কাজে লেগে পড়ল। সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করতে পারলে, তার কপালেও দুঃখ নাচবে।
পাতালপুরীর মধ্যে খুব বড় ঝড় বয়ে গেছে আজ। রায়য়ান আজ অশান্ত। মাহিন আর রুদ্র কিছুতেই তাকে সামলাতে পারেনি। পুরো রুমটা তছনছ করে ছেড়ে এখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। মাহিন আর রুদ্র মাথা নিচু করে রায়য়ানের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। রায়য়ান সিগারেটে লাস্ট টান মেরে বলল,
“হলো না দেখা। ওই এস.কে চলে এলো। কেবিনের ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে দিল। ও কি করছে আমার সুহাসিনীর সাথে। আমার সহ্য হচ্ছে না, মাহিন।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। চোখ জোড়া দিয়ে আগুনের ফুলকি ঝরছে তার। একটানে শার্টের বোতাম ছিঁড়ে বুকের বা’দিকটায় দেখিয়ে বলল,
“এইখানে আমার খুব ব্যথা করছে, মাহিন। আচ্ছা, আমি তো একটা পশু, পশুদের তো দয়া, মায়া, হৃদয় বলে কিছু নেই। তাহলে আমার মতো পশুর ওই মেয়েটার জন্য কষ্ট হচ্ছে কেনো? কেনো এস.কের সাথে ওকে সহ্য হচ্ছেনা আমার? আমার হৃদয় নেই, তাহলে এখানে জ্বলে কেনো? তবে কি আমার মধ্যেও হৃদয় আছে? আমার মতো পশুর মধ্যে কি হৃদয় জন্মেছে, রুদ্র?”
সে আরও একটা সিগারেট ধরালো। সেই জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরল তার বুকের বা’পাশে। মাহিন আর রুদ্র এগিয়ে আসতে গেলে রায়য়ান একহাত উঁচু করে থামাল তাদের। পুরো সিগারেটটা পুড়ে শেষ হতেই সে বুকের থেকে সরিয়ে ফেলে দিয়ে একটা ছুরি হাতে তুলে নিল। ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। পুরো শার্টটা খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেই নিজেকে বলল,
“মিস্টার রায়য়ান চৌধুরী, ছ্যাহ! তোকে দেখে লজ্জা হচ্ছে আমার। একটা মেয়ের জন্য আজ তোর এই অবস্থা? তুই’না পশু ছিলি? হৃদয় কোথা থেকে এলো তোর মধ্যে? যে হৃদয় তোর বুকের মধ্যে থেকে, অন্য একটা নারীর জন্য কাঁদে, ব্যথা করে, যন্ত্রণা দেয়, কষ্ট পায়, সেই হৃদয় এই রায়য়ান চৌধুরীর চাইনা।”
ছুরি দিয়ে খুব দক্ষ হাতে বুকের ওপর গভীর দাগ কাটল সে। রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল তার বুক দিয়ে। কিন্তু সেদিকে রায়য়ানের কোনো হেলদোল নেই। তার মনে হলো এই যন্ত্রণার থেকেও তার বুকের ভেতর বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে। সে ছুরিটা দিয়ে খুব সুন্দর করে দক্ষ হাতে গভীর ক্ষত করে “সুমু” নামটা লিখল তার বুকের ওপর। তার প্রশস্ত বুকটা রক্তে লাল হয়ে উঠল। মাহিন আর রুদ্র স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারো সাহস নেই এক কদম এগোনোর। রায়য়ানের চোখ এখন এক আশ্চর্য নিঃসঙ্গ জ্বালায় জ্বলছে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“ভুল করেছিলি, রায়য়ান। তুই মনে করেছিলি, তুই পশু। কিন্তু তোর মধ্যে যে একটা মানুষ মরার মতো বেঁচে আছে, সেটা বুঝলি না। তোর মধ্যের সেই মানুষটাকে বাঁচিয়ে তুলেছে ওই মেয়ে, যার নাম সুমু। তুই এখন ওই মেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছিস, রায়য়ান। একটা বিবাহিত মেয়ে তুই ভালোবেসে ফেললি। তোর মতো মানুষের জন্য ভালোবাসা মানেই ধ্বংস।”
এক মুহূর্ত থেমে সে আবার ছুরির দিকে তাকাল। মৃদু হেসে বলল,
“এস.কে, তুই জিতে গেলি। কিন্তু মনে রাখিস, আমি জানোয়ার হয়ে ফিরে আসব। তোর কাছে ও শুধু কষ্ট পাচ্ছে, কাঁদছে। আমার সুহাসিনীর চোখের এক ফোঁটা অশ্রু মানে কারো রক্তপাত। ওকে আমি আমার কাছে এনে খুব আদরে রাখব।”
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এক হাতে বুক চেপে ধরল। রক্ত ফোঁটা ফোঁটা মেঝেতে পড়ছে। মাহিন ধীরে বলল,
“ডক্টর ডাকব, বস?”
রায়য়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। চোখে অশ্রু না থাকলেও তার দৃষ্টি জ্বলছে অন্ধকার এক যন্ত্রণায়।
“না! এই কষ্টটাই আমার শান্তি।”
রায়য়ান বেরিয়ে গেল রুম থেকে। রুমের দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। নিজের রুমে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিল সে। পুরো অন্ধকার রুমটা। ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে নিঃশব্দে হুইস্কির বোতলটা তুলে নিল হাতে। কর্কটা খুলে এক চুমুক বসাল। জ্বলন্ত একটা ঢেউ যেন বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল তার। মেঝের ওপর এলোমেলো হয়ে বসে পড়ল সে। মাথা নিচু, চোখে একরাশ অন্যমনস্কতা নিয়ে খুব ধীরে ফিসফিস করে গেয়ে উঠল,
“রাতেরই আঁধারে,
অজানা ছোঁয়া,
মায়াবী চোখে কি মায়া,
যেন গোধূলি আবীর মাখা…
কি নেশা ছড়ালে,
কি মায়ায় জড়ালো!”
থামল সে। হুইস্কির বোতলে আরেকটা চুমুক দিয়ে বোতলটা নামিয়ে রাখল মেঝেতে। পকেট থেকে আবারও ফোনটা বের করে ফ্ল্যাশ অন করতেই ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। না, ঠিক আলোয় নয়, আলোতে ধরা পড়া এক উন্মাদ ভালোবাসা তার। পুরো রুমটা সুমুর বড় বড় ছবির ফ্রেম আর স্ট্যান্ডি দিয়ে সাজানো। রুমজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুমুর ছবি আর লাইফ সাইজ স্ট্যান্ডিগুলো যেন নিঃশব্দে কথা বলে উঠল, যেগুলোতে একটায় সুমু দাঁড়িয়ে, হাতের ওপরে প্রজাপতিরা খেলছে তার, আর সে প্রাণখুলে হাসছে। আরেকটায়, সুমু কালো শাড়ি পড়ে আয়নার সামনে চুলে হাত দিয়ে খোঁপা বাঁধছে, একদম গিন্নিদের মতো করে। আরেকটায়, বসে আছে এক কোণে গালে একহাত দিয়ে, ঠোঁটে একটা মিষ্টি হাসি নিয়ে— এমন অনেকগুলো স্ট্যান্ডি রুমের মধ্যে সাজিয়ে রেখেছে সে। প্রতিটা স্ট্যান্ডি আলাদা আলাদা ভঙ্গিতে বানানো।
রায়য়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল একটা স্ট্যান্ডির দিকে। আলতো হাতে ছুঁয়ে দিল সুমুর হাস্যজ্বল মুখটা। সে আলতো হাসল। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে গেয়ে উঠল,
“রোজ সকালে তোর মায়াবি ছবি,
চোখে ভাসে তোর মিষ্টি হাসি!
বেলি গাঁথা তোর চুলের বেণী,
মায়াপূর্ণ তোর চোখের চাহনী!
ভালোবাসি তোকে সুহাসিনী,
ভালোবাসি শুধু তোকেই!”
গান থামিয়ে উন্মাদের মতো হাসতে লাগল সে। তার এই হাসিতে কোনো প্রাণ নেয়, আছে শুধু ধ্বংসের নেশা।
সুমুকে দেখার জন্য আজ হাসপাতালে ভিড় জমেছে। কাল সকালে তার অপারেশন, তাই প্রিয়জনেরা ছুটে এসেছে দেখার জন্য। চৌধুরী বাড়ির সবাইও এসেছে। আরিয়ানও এসেছে। কিন্তু কেবিনে ঢোকার পথে তাকে আটকে দেয় শেরাজ। আরিয়ান এখন কেবিনের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে, ভেতরের কাচঘেরা দেয়ালের দিকে ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এক ঝলক সুমুকে দেখার জন্য তার চোখ মরিয়া হয়ে আছে। এদিকে রোজা কারো সাথে ফোনে কথা বলছিল। কথা শেষ করে কেবিনের দিকে এগিয়ে এসে দেখল, আরিয়ান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। রোজা কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে, ব্রো? ভেতরে যাওনি কেনো?”
আরিয়ান দাঁত চেপে গলা নামিয়ে বলল,
“সিবাল! এস.কে আমাকে ঢুকতে দেয়নি।”
রোজা কিছুটা অবাক, কিছুটা বিরক্ত। মুখে প্রশ্ন ফুটে উঠলেও আর কিছু বলল না সে। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা টেনে বলল,
“এদের নাটকের তো শেষ নেই। তুমি টেনশন করো না, ব্রো। তুমি সুমুকে দেখতে চাও, তাই না? আমি ওর একটা পিক তুলে নিয়ে আসব।”
আরিয়ান কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রোজা ঘুরে সোজা কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। কাচের দরজার হ্যান্ডেল ধরতেই তার সামনে এসে দাঁড়াল দুজন নতুন গার্ড।
“স্টপ ম্যাম!”
রোজা ভ্রু কুঁচকে তাদের দিকে তাকাল। একজন গার্ড গম্ভীর গলায় বলল,
“ফোনটা আমাদের কাছে জমা দিয়ে যান, ম্যাম। এই কেবিনে ফোন নিয়ে ঢোকার অনুমতি নেই।”
রোজার চোখ ছোট হয়ে এলো। ঠোঁট শক্ত করে চাপা বিরক্তিতে বলল,
“ফোন নিয়ে ঢুকতে পারব না মানে?”
“এইটাই স্যারের অর্ডার। এই কেবিনে ঢুকতে হলে আপনাকে ফোনটা আমাদের কাছে জমা দিয়ে যেতে হবে।”
রোজা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। পেছন থেকে আরিয়ান বলল,
“ঝামেলা করিস না, রোজা। আমার কাছে দিয়ে যা ফোনটা।”
রোজা তবুও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। সে হনহন করে হেঁটে আরিয়ানের হাতে ফোনটা দিয়ে কেবিনে ঢুকে গেল। আরিয়ান রুমের বাহিরে পায়চারি করতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ গেল একটি নার্সের দিকে, যে এগিয়ে আসছে সুমুর কেবিনের দিকে। আরিয়ান এগিয়ে গেল নার্সটির দিকে। নার্সটিকে চোখের ইশারায় সাইডে সরিয়ে নিয়ে গেল। দুজনে সাইডে এসে দাঁড়াতেই আরিয়ান বলল,
“আপনার কাছে পেপার আর পেন হবে?”
“এখন হবে না, তবে আপনার লাগলে এনে দিতে পারি, স্যার।”
“ওকে, তাড়াতাড়ি নিয়ে আসুন।”
নার্সটি দ্রুত চলে গেল পেপার আর পেন আনতে। মিনিট পাঁচেক বাদে পেপার আর পেন নিয়ে এলো তিনি। আরিয়ান নার্সটির হাত থেকে পেপার আর পেন নিয়ে কিছু লিখে সুন্দর করে পেপারটি ভাঁজ করে দিয়ে বলল,
“শেরাজ খানের ওয়াইফের কেবিন যাচ্ছেন?”
“জি স্যার! ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ। আর ম্যামের মেডিসিনের টাইম হয়ে গেছে। দিয়েছে কিনা সেটাই দেখতে যাচ্ছি।”
আরিয়ান বাঁকা হেসে বলল,
“যখন সকলে বেরিয়ে যাবে, তখন পেশেন্টের হাতে একটা পেপারটা দিবেন। যদি জিঙ্গাসা করে কে দিয়েছে, আপনি কিছু না বলে চলে আসবেন।”
“কিন্তু স্যার…”
নার্সটির কথার মাঝে আরিয়ান তার চোখের সামনে টাকা ধরল। নার্সটি লোভে পড়ে হালকা ঢোক গিলে টাকা আর পেপারটা নিয়ে চলে গেল সুমুর কেবিনের উদ্দেশ্যে।
নার্সটি কেবিনে ঢুকেই হালকা গলায় বলল,
“ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ। আপনাদের এখন বাইরে যেতে হবে। অনেক রাতও হয়ে গেছে, কাল ম্যাডামের অপারেশন, তাই আজ ম্যাডামের ঘুমের প্রয়োজন।”
নার্সের কণ্ঠে শালীনতা, কিন্তু একটা কড়াভাব। সবাই একে একে বিদায় নিতে লাগল। কেউ সুমুর কপালে চুমু দিয়ে, কেউ একরাশ চিন্তা নিয়ে, আবার কেউ নিঃশব্দে দরজার দিকে পা বাড়াল। শেরাজ ফিরোজাকে কোলে নিয়ে সুমুর পাশেই বসে আছে। ছোট ফিরোজা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, মাথাটা শেরাজের বুকে হেলানো। অনন্যা খাতুন ফিরোজাকে নিতে এগিয়ে এলে, শেরাজ নরম গলায় বলল,
“তুমি চলো মম, আমি গাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসি। ফিরোজাকে ডাকতে চাই না এখন।”
অনন্যা খাতুন সুমুর দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,
“কাল আবার আসব, মামনি। সাহস রেখো।”
সুমু মাথা নাড়ল। অনন্যা খাতুন কেবিন থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন। শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সুমুর মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল,
“একটু থাকো, সুইটহার্ট। আমি এক্ষুনি আসছি”, সে নার্সের দিকে তাকিয়ে বলল, “একটু খেয়াল রাখবেন। আমি একটু নিচে যাচ্ছি।”
নার্সটি মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। শেরাজ একবার সুমুর দিকে ফিরে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। সকলে চলে যেতেই নার্সটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। আলতো করে একটা হাসি ঠোঁটে টেনে বলল,
“আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে খুব ভালোবাসেন, তাই না?”
সুমু একটুখানি হেসে জানালার বাইরে তাকাল। রাতের নরম আলোয় তার মুখটা যেন আরও কোমল হয়ে উঠল। সে ধীরে বলল,
“ভালোবাসে বললে বলা হবে না। উনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। অনেক কিছু চাইনি জীবনে, শুধু একজনকে চেয়েছিলাম, যে আমার নিঃশব্দ কান্নাগুলো শুনবে। আর উনি ঠিক সেভাবেই এসেছেন। প্রতিদিন আল্লাহর কাছে যে শান্তি চেয়েছিলাম, উনি সেই শান্তির রূপ হয়ে এসেছেন। আর তাই, ‘ভালোবাসে’ এই একটা শব্দে আটকে রাখলে ভুল হবে। উনি যেন আমার ধৈর্যের পুরস্কার, আর আল্লাহ্র দেওয়া সেই মানুষ, যে আমার চোখে পানি আসার আগেই টের পায় আমি কষ্টে আছি। ভালোবাসার চেয়ে বেশি কিছু উনি আমার জন্য। আর ওনার এগুলো ভালোবাসা না, একপ্রকার পাগলামি বলে ওগুলোকে।”
নার্সটি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সুমুর মুখের দিকে। চোখে একটা অপার প্রশান্তি খেলে গেল তার। হঠাৎ তার মনে পড়ল কাগজটির কথা। গলার স্বরটা একটু নিচু করে বলল,
“আপনাকে একটা জিনিস দেওয়ার ছিল, ম্যাম।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি?
নার্সটি কিছু না বলে কাগজটা পকেট থেকে বের করে সুমুর হাতে তুলে দিল। সুমু পেপারটা হাতে নিল।
“কে দিয়েছে?”
নার্সটি সুমুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপচাপ কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। সুমু কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে কাগজটার ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করল,
খান সাহেব পর্ব ৫১
“তোমার কেবিনের দরজার সামনে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, এস.কে ঢুকতে দিল না। কিন্তু আমার মন ঢুকে গেছে অনেক আগেই, সেটা কেউ থামাতে পারেনি। তুমি জানো না বেবিগার্ল, অপেক্ষা কাকে বলে? যখন একজন মানুষ শুধু একবার চোখের দেখা পাওয়ার আশায় শত রাত জেগে থাকে, আর প্রতিবার তাকে ফিরতে হয়, কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে চোখের সামনে দেখতে না পাওয়ার অন্ধকার নিয়ে, তখন তাকে বলে অপেক্ষা। তোমাকে একবার দেখার তৃষ্ণায় আমি চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। অপেক্ষা করি ঠিক যেমন মরুভূমিতে কেউ এক ফোঁটা পানির আশায় মরিয়া হয়ে ওঠে। তুমি জানো না, আমার এই চোখ দুটো তোমাকে এক ঝলক দেখার জন্য প্রতি রাতে জেগে থাকে। কিন্তু আমার কপাল দেখো, আমাকে প্রতিবারই ফিরে যেতে হয়, না দেখা একটা খালি বুক নিয়ে।”
সুমু বুঝতে পারল এই লেখা কার। সে বেড থেকে নেমে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে জানালা খুলে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিল বাহিরে। আবারও বেডের কাছে ফিরে এসে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল।
