Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬২

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬২

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬২
ছায়া

রাত তখন গভীর চারপাশ নিস্তব্ধ,শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।ইলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের স্মৃতিগুলো হাতড়াচ্ছিল।হঠাৎ শাহরিয়ারের ফোনের তীক্ষ্ণ ভাইব্রেশন শব্দে তার ধ্যান ভাঙল।শাহরিয়ার তখন ল্যাপটপে কিছু কোডিং চেক করছিল,মেসেজটা আসতেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।শাহরিয়ার দ্রুত মেসেজটা ওপেন করল। সেখানে লেখা:
> “কাবির তোমরা যেখানে আছো সেই লোকেশনটা আর সিক্রেট নেই।খান বাড়ির ভাড়া করা লোক আর ডিবি-র একটা টিম ওই এরিয়ার টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করছে।আধা ঘণ্টার মধ্যে ওরা ওখানে পৌঁছাবে মুভ নাউ”

শাহরিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।সে জানত কাজটা এত সহজ হবে না। মেহেরাব খান এবং রাশেদ তালুকদার প্রভাবশালী মানুষ,তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকার পাত্র নন।সে দ্রুত ইলার ঘরে গিয়ে দাঁড়াল।
শাহারিয়ারঃ- ম্যাম আমাদের হাতে সময় খুব কম এখনই বের হতে হবে।
ইলা অবাক হয়ে তাকাল।
ইলাঃ- কেন শাহরিয়ার ভাই কী হয়েছে?
শাহারিয়ারঃ- ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে। হয়তো কোনোভাবে আইপি ট্র্যাক করে ফেলেছে।আপনি দ্রুত তৈরি হয়ে নিন, মাত্র পাঁচ মিনিট সময় পাবেন। আরিয়ান স্যারের দেওয়া ওই পেনড্রাইভ আর ল্যাপটপটা নিতে ভুলবেন না।
ইলা আর প্রশ্ন করল না সে বুঝতে পারছে পরিস্থিতি কতটা ঘোলাটে। শাহরিয়ার ইতিমধ্যে বাইরে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রেখেছে।

অন্ধকার গলি দিয়ে শাহরিয়ার খুব সাবধানে গাড়ি বের করল।হেডলাইট জ্বালাল না, পাছে কেউ দেখে ফেলে। শহর পার হয়ে হাইওয়েতে উঠতেই সে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল।
ইলা পেছনের সিটে বসে কাঁপছিল। তার মনে হচ্ছে এক অজানা গন্তব্যের দিকে সে ছুটে চলেছে।
ইলাঃ- শাহরিয়ার ভাই, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
শাহারিয়ারঃ- ম্যাম, আরিয়ান স্যারের সেই স্বপ্নের ঠিকানায়। সিলেটে ওখানে স্যার আপনার জন্য একটা দুর্গ বানিয়ে রেখেছেন।বাইরের কেউ সহজে ওখানে পৌঁছাতে পারবে না। আর ওই এলাকাটা আমার পরিচিত,ওখানে আমার কিছু বিশ্বস্ত লোক আছে যারা আপনার ছায়া হয়ে থাকবে।
ইলা জানালার বাইরে তাকাল। অন্ধকার চিরে গাড়িটা এগিয়ে চলেছে। মনে মনে ভাবল,
“আরিয়ান, তুমি মরেও আমাকে কতটা আগলে রাখছো তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আমার জন্য দোয়া।”
ভোর হতে না হতেই গাড়ি সিলেটের চা বাগানের আঁকাবাঁকা পথ ধরল। চারদিকে সবুজের সমারোহ আর কুয়াশার চাদর। পাহাড়ের ঢালে একটা ছবির মতো সুন্দর ডুপলেক্স কাঠের বাড়ি দেখা যাচ্ছে।
শাহরিয়ার গাড়িটা বাড়ির প্রধান গেটে থামাল। যেখানে বড় করে লিখা “ইলারিয়ান এর স্বপ্নবাগান”
গাড়ি থেকে নেমে ইলা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ঠিক যেমনটা আরিয়ান ভিডিওতে বলেছিল। ছিমছাম শান্ত আর স্নিগ্ধ। বাড়ির সামনে ফুলের সমাহার যেখানে ইলাফুলের জন্য হাজার হাজার ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। এগুলো এক দিনের ফল না আরিয়ান ফুল প্রেমি এটা সবাই জানে।কিন্তু আরিয়ান এই সুন্দর ফুলের মাঝে ফুলের রানি ইলাফুল কে রাখতে চেয়েছিলো তাই ইলা এখানে আসার আগেই সব সাজিয়ে রেখেছিলো।
শাহারিয়ারঃ- ম্যাম এটাই আপনাদের সেই স্বপ্নের বাড়ি। এখানে আপনাকে কেউ বিরক্ত করবে না। আমি নিচের তলায় থাকব, আর আপনার দেখভালের জন্য একজন বিশ্বস্ত মহিলাকে ঠিক করে রেখেছি। আপনি এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ।

ইলা বুক ভরে নিশ্বাস নিল সে। তার মনে হলো, এখানে শুধু সে আর তার অনাগত সন্তান নয়, আরিয়ানের অস্তিত্বও মিশে আছে বাতাসের প্রতিটি কণা জুড়ে।
ইলা মনে মনে হাসল। এক বিষণ্ণ হাসি। সে জানাল, তার বাবা-মা তাকে খুঁজছেন, কিন্তু এই দূরত্বটুকু এখন খুব প্রয়োজন। তাদের বুঝতে হবে, সম্পর্কের চেয়ে জেদ বড় হলে কী পরিমাণ মাসুল গুনতে হয়।
ইলা পেটে হাত দিয়ে আলতো করে হাত বোলাল।
ইলাঃ- ভয় নেই সোনা তোর বাবা আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে গেছেন। আমরা এখন শান্তিতে থাকব।
অন্যদিকে, আতরাইতে মেহেরাব খান আর রাশেদ তালুকদার সেই বাড়িতে এখন পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটছেন। আদিব বারবার ফোন করছে বিভিন্ন জায়গায়, কিন্তু কোনো সূত্র মিলছে না।
আদিবঃ- ফুফু আব্বা, ওরা অনেক বেশি স্মার্ট। আমাদের প্রতিটি মুভ ওরা আগে থেকেই জেনে যাচ্ছে।
মেহেরাব খান পাথরের মতো বসে রইলেন। তিনি বুঝতে পারছেন, লড়াইটা এখন আর শুধু তার বউমার সাথে নয়, লড়াইটা আরিয়ানের রেখে যাওয়া সেই অদৃশ্য শক্তির সাথে, যা ইলাকে ঘিরে রেখেছে।
ইলা বাড়িটা দেখছে তার মনে হচ্ছে সে কোনো রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছে। আরিয়ান ভিডিওতে যা বলেছিল, চোখের সামনের এই দৃশ্য তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি সুন্দর। ঠিক যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস।

বাড়িটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কাঠে তৈরি একটি ডুপলেক্স বাড়ি। এর ঢালু ছাদ আর পাথরের তৈরি দীর্ঘ চিমনিটা আভিজাত্য আর শান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় কাঁচের জানালা দিয়ে বিকেলের সোনালি রোদ ভেতরের আসবাবপত্র গুলোকে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
আর সব থেকে আকর্ষণ এর জিনিস হলো বাড়ির চারপাশ ঘিরে আছে অগণিত বুনো আর বিদেশি ফুলের গাছ। গোলাপি ডালিয়া, বেগুনি ল্যাভেন্ডার আর হলুদ সূর্যমুখী মিলে যেন এক রঙের উৎসব বসিয়েছে।এই ফুলের গন্ধে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে, যা ইলার ক্লান্ত মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিচ্ছে।
প্রধান ফটক থেকে বাড়ি পর্যন্ত চলে গেছে আঁকাবাঁকা একটি পাথুরে পথ। প্রতিটি পাথরের ভাঁজে মিশে আছে আরিয়ানের ভালোবাসা আর ইলার জন্য রাখা আগাম সুরক্ষা। যতদূর যায় শুধু ফুল আর ফুল
আরিয়ান তার ইলাফুল এর জন্য একটা ফুলের রাজ্য বানিয়ে দিয়েছে।আর সেখানকার রানি হলো “ইলাফুল”
বাড়ির ঠিক পেছনেই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ পাহাড় আর ঘন বন। আকাশটা সেখানে একদম নিচু হয়ে মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলছে।ইলা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল আরিয়ানের সেই কথাগুলো
“ইলাফুল, আমাদের একটা বাড়ি হবে যেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব। চারপাশটা ফুলে ফুলে ভরে থাকবে, আর পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাব আমরা।”
আজ আরিয়ান নেই, কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব। ইলা ধীর পায়ে পাথরের পথ ধরে এগোল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আরিয়ানের গলার স্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,

> “ভয়েজ কিং আপনি ঠিক এমনই চেয়েছিলেন না? দেখুন আপনার ইলাফুল আজ আপনার তৈরি করা এই নন্দন কাননে চলে এসেছে। এখানে কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
ইলা যখন পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের লুকোচুরি দেখছিল,তখন বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা শাহরিয়ারের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে শাহরিয়ারের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।ফোনের স্ক্রিনে নামটা সেভ করা ‘আমার জুলিয়েট’
শাহরিয়ার ফোনটা রিসিভ করে একটু আড়ালে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,
শাহরিয়ারঃ- বলেন ম্যাডাম আপনার খবরা খবর কী? আমার শ্বশুর মশাইয়ের এখন কী অবস্থা?ওনারা কি এখনো ওনার ছেলের বউকে পাগলের মতো খুঁজছেন নাকি কিছুটা শান্ত হয়েছেন?
ফোনের ওপাশ থেকে নোহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলল,
নোহাঃ- কাবির মজা ছাড়ো তুমি কাজটা মোটেও ঠিক করছ না।অন্তত আব্বু-আম্মুকে সত্যিটা জানানো উচিত ছিল। ইলা ভাবিকে নিয়ে ওনারা যে কী পরিমাণ টেনশন করছেন, সেটা তুমি সামনে না থাকলে বুঝবে না। আম্মু তো খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।
শাহরিয়ারের মুখের হাসি কিছুটা মিলিয়ে গেল। সে নোহাকে খুব ভালোবাসে, কিন্তু আরিয়ানের শেষ নির্দেশ তার কাছে সবকিছুর উপরে।

শাহরিয়ারঃ- নোহা তুমি আবেগ দিয়ে ভাবছ, আর আমি ভাবছি বাস্তবতা দিয়ে। ওইদিন হাসপাতালে ইলা ম্যাম এর বাবা মা যা করতে যাচ্ছিলেন, তারপর ইলা ম্যামকে ওনাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া মানে তার আর বাচ্চার বড় কোনো ক্ষতি হওয়া। আরিয়ান স্যার আমাকে ইলা ম্যাম এর ছায়া হতে বলেছিলেন, আর আমি সেটাই করছি।
নোহাঃ- আমি জানি কাবির, ভাবির সুরক্ষা আমাদের কাছেও অনেক বড়। কিন্তু এভাবে আমাদের থেকে লুকিয়ে রেখে তুমি আব্বু-আম্মুর মনে যে কষ্ট দিচ্ছ, সেটা কি ঠিক? ওনারা তো কষ্ট পাচ্ছে ওনাদের ভুলটা কোথায় ছিল বলো আমাকে ভুল তো ইলা ভাবির বাবা মা করেছে।

শাহরিয়ারঃ- বুঝতে পারা আর শুধরে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে নোহা। ইলা ম্যাম এখনো মানসিকভাবে খুব বিধ্বস্ত। এই মুহূর্তে কোনো নাটকীয়তা উনার সহ্য হবে না। আপাতত উনি শান্তিতে থাকুক। তুমি শুধু বাড়ির পরিস্থিতির দিকে নজর রাখো,কোনো নতুন ঝামেলা হলে আমাকে জানিও।নোহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
নোহাঃ- ঠিক আছে কিন্তু কথা দাও, ভাবি আর বাচ্চা পুরো সুস্থ থাকলে তুমি নিজেই ওনাকে নিয়ে আসবে। আমি আর কতদিন আব্বুর অভিনয় করবো যে আমি কিছু জানি না?
শাহরিয়ারঃ- কথা দিলাম সময় হলে ইলা ম্যাম নিজেই ফিরবে। সাবধানে থেকো জুলিয়েট।
ফোনটা রেখে শাহরিয়ার যখন উপরের বারান্দার দিকে তাকাল,দেখল ইলা অপলক দৃষ্টিতে বাগানের ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে। শাহরিয়ার মনে মনে বলল,
“স্যার আমি হয়তো অনেকের কাছে ভিলেন হচ্ছি,কিন্তু আপনার আমানত রক্ষা করতে আমি সব অপবাদ মাথা পেতে নিতে রাজি।”
মনে মনে এটা ভেবে শাহরিয়ার তার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নোহার সাথে কথা বলার পর তার মনটা অতীতে ফিরে গেল।

অনেকেই হয়তো ভাবছে শাহরিয়ার কেন ইলার জন্য নিজের ক্যারিয়ার, জীবন সব বাজি ধরছে। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক পাহারসম কৃতজ্ঞতার গল্প।
শাহরিয়ার এর অতীতঃ
শাহরিয়ার এই দুনিয়ায় একদম একা। এতিম খানায় বেড়ে ওঠা ছেলেটার মাথার ওপর কোনোদিন আপনজনের ছায়া ছিল না। দুই বছর আগে ঘটনাক্রমে নোহার সাথে তার পরিচয় এবং প্রেম নোহা তখন ক্লাস ৯ এ পড়তো। কিন্তু একজন এতিম,পরিচয়হীন যুবকের পক্ষে খান বাড়ির মেয়ের দিকে তাকানো ছিল দুঃসাহসের নামান্তর।
সেদিন ছিল বৃষ্টির বিকেল শাহরিয়ার আর নোহা যখন আত্রাই নদীর পারে দাঁড়িয়ে নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছিল, ঠিক তখনই আরিয়ান তাদের দেখে ফেলে।আরিয়ানের সেই তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে শাহরিয়ারের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল, আজ হয়তো তার শেষ দিন।
কিন্তু আরিয়ান সেদিন শাহরিয়ারকে মারধর বা পুলিশে না দিয়ে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়েছিল।নির্জন এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে আরিয়ান বলেছিল

আরিয়ানঃ- “আমার বোনকে ভালোবাসার সাহস যখন করেছ, তখন তাকে আগলে রাখার যোগ্যতাও তোমার থাকতে হবে শাহরিয়ার। আমি চাই না আমার বোন কোনো পরিচয়হীন মানুষের সাথে জীবন কাটাক।”
শাহরিয়ার মাথা নিচু করে বলেছিল,
শাহারিয়ারঃ- স্যার আমার এই পৃথিবীতে কেউ নেই।”
আরিয়ান তখন তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিল
আরিয়ানঃ- আজ থেকে আমি আছি। আমি তোমার সব ব্যবস্থা করছি। তোমাকে গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেব, কিন্তু শর্ত একটাই নোহার বিয়ের বয়স না হওয়া পর্যন্ত এই সম্পর্কের কথা বাড়ির কেউ জানবে না। তুমি নিজেকে প্রমাণ করো, তারপর আমি নিজে তোমাদের বিয়ে দেব।”

আরিয়ান তার কথা রেখেছিল। শাহরিয়ারের মেধা আর আরিয়ানের ছত্রছায়ায় সে আজ চৌকস এক অফিসার। আরিয়ান তাকে শুধু পেশাই দেয়নি, তাকে একটা পরিচয় দিয়েছে, ভাই হিসেবে আগলে রেখেছে।
আজ আরিয়ান নেই, কিন্তু তার সেই উপকারের ঋণ শাহরিয়ার কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। ইলা আর তার অনাগত সন্তান এখন শাহরিয়ারের কাছে শুধু আরিয়ানের আমানত নয়, তার অস্তিত্বের অংশ। আরিয়ান তাকে বিশ্বাস করে নোহার দায়িত্ব দিয়েছিল, আর মরার আগে দিয়ে গেছে তার ইলাফুলের দায়িত্ব।শাহরিয়ার মনে মনে বলল
“স্যার, আপনি আমাকে শূন্য থেকে পূর্ণতা দিয়েছেন। আজ যদি আমাকে সারা দুনিয়ার সামনে ভিলেন হতে হয়, কিংবা নোহার থেকে দূরে থাকতে হয়, তবুও আপনার পরিবারের সুরক্ষায় আমি এক চুলও নড়ব না। এটাই আপনার সেই এতিম ছোট ভাইয়ের কৃতজ্ঞতা।”

উপর থেকে ইলা নিচে তাকিয়ে দেখল শাহরিয়ার শক্ত মুখে দূরে তাকিয়ে আছে। ইলা জানে না এই মানুষটার ত্যাগের গভীরতা কতটুকু,আর কেনোই বা এতটা আগলে রেখেছে তাকে কিন্তু সে এটা বুঝতে পারছে যে, ঝড়ের রাতে বাতিঘর হয়ে শাহরিয়ার তাকে ঠিক পথেই নিয়ে যাচ্ছে।
শাহরিয়ার বাগানের রাস্তা দিয়ে হাটছিলো তখন তাকে কোনো হিরোর চেয়ে কম মনে হচ্ছে না।৬ ফুট উচ্চতা সুঠাম দেহের গঠন আর জিম করা পেশিবহুল শরীর সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত পৌরুষদীপ্ত চেহারা।
গোয়েন্দা বিভাগের এই চৌকস অফিসারের প্রতিটি পদক্ষেপে মিশে আছে এক অদ্ভুত আভিজাত্য আর স্টাইল।
তার শার্প জ-লাইন আর গভীর কালো চোখের চাহনিতে এমন এক সম্মোহনী শক্তি আছে যে, যে কেউ প্রথম দেখাতেই তার ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়তে বাধ্য।

পরনে তার নেভি ব্লু রঙের একটি ফিটিং টি-শার্ট আর কার্গো প্যান্ট,যা তার সুগঠিত শরীরের ভাঁজগুলোকে স্পষ্ট করে তুলেছে। শাহরিয়ার শুধু সাহসীই নয়,সে অসম্ভব রকমের সুদর্শন এবং স্টাইলিশ।
বাড়ির বারান্দা থেকে ইলা নিচে তাকিয়ে শাহরিয়ারকে দেখছিল।সে মনে মনে ভাবল আরিয়ান কেন এই ছেলেটির ওপর এতোটা ভরসা করেছিল তা আজ স্পষ্ট। শাহরিয়ারের ব্যক্তিত্বের মধ্যেই এক ধরণের নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে।
শাহরিয়ার পকেট থেকে ফোন বের করে নোহার একটি ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।এই পাথরের মতো শক্ত হৃদয়ের মানুষটিও যে কতটা রোমান্টিক হতে পারে, তা কেবল নোহাই জানে।তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা সেই রহস্যময় হাসিটি কেবল নোহার জন্যই বরাদ্দ।
হঠাৎ সে খেয়াল করল ইলা ওপর থেকে তাকে দেখছে।শাহরিয়ার মুহূর্তেই তার রোমান্টিক ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলে গম্ভীর হয়ে গেল। সে দ্রুত ইলার কাছে এগিয়ে এল।
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম আপনি এখনো ঘুমাননি? রেস্ট করুন আপনার শরীরের জন্য ভালো না এর স্ট্রেস। ভেতরে যান প্লিজ।

ইলা আলতো হেসে বলল
ইলাঃ- শাহরিয়ার ভাই আপনি আরিয়ানের কথা এতোটা মানেন কেন? আপনার কি নিজস্ব কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই?
শাহরিয়ার কিছুক্ষণ চুপ থেকে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল
শাহরিয়ারঃ- আমার চাওয়া-পাওয়া বলতে কেবল এই দুনিয়ায় আরিয়ান স্যারের আমানতগুলোকে সুস্থ রাখা। আমি যখন পরিচয়হীন এক এতিম ছিলাম, তখন স্যার আমাকে টেনে তুলেছিলেন। আমার মতো সাধারণ একজনকে এই লাইফস্টাইল, এই চাকরি দিয়েছে। তাই আমি আরিয়ান স্যারের দেওয়া সম্মানের মর্যাদা রাখতে চাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬১

ইলা শাহরিয়ারের কথায় এক গভীর বিষণ্ণতা আর কৃতজ্ঞতা খুঁজে পেল। এই মানুষটি নিজের জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে আজ তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।শাহরিয়ার ঘড়ি দেখে বলল
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম আজ বিকেলে আপনাকে নিয়ে বাগানের চারপাশ একটু হেটে দেখাবো। ভয় পাবেন না এখানে আপনি সুরক্ষিত।
ইলা মাথা নাড়ল সে জানে এই সুদর্শন যুবকের চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ক্ষুরধার মস্তিষ্ক, যা তাকে পৃথিবীর সব বিপদ থেকে আড়াল করে রাখবে।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৩