মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৭
তাসনিয়া নুর
কিছুক্ষন দৌড়ানোর পর আহিরের স্মরন হয় তার বাইক সে ফেলে এসেছে কথাটা মাথায় আসতেই তার পদযোগল স্থির হয়ে যায়। যে পথ ধরে এতক্ষণ দৌড়ে এসেছিল ঠিক সেই পথেই আবার এগিয়ে গেলো। গন্তব্যে পৌছাতেই দেখতে পেলো রিফাত এখনও বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর মুখে অস্থিরতা নিয়ে চারদিকে দৃষ্টি বুলাচ্ছে । আহির বিড়বিড় করে কয়টা খাস বাংলায় গালি দিয়ে দিলো আর অপেক্ষা করতে লাগলো কখন এই আপদ সরবে সেই সুযোগে সে বাইক নিয়ে পালাবে । কিছু সময় অতিবাহিত হয় রিফাত অন্য দিকে হাঁটা ধরে সেই সুযোগে আহির বাইকের কাছে গিয়ে বাইক স্টার্ট দেয়। বাইকের আওয়াজ কর্নপাত হতেই রিফাত ঘুরে দাঁড়ায় । আহিরকে দেখতে পেয়ে জুড়ে ডাক দিয়ে বলে
— হ্যান্ডসাম দাড়াও আমাকে রেখে যেয়োনা। আমি…..।
আর কিছু শুনার প্রয়োজন বোধ করলো না আহির সে যেনো যেতে পারলেই বাঁচে । ফুল স্পিডে বাইক চালানোর পর এক জায়গায় বাইক থামিয়ে বুকে হাত দিয়ে জুড়ে জুড়ে শ্বাস নিতে থাকে আর আওরায়
— চৈত্রমাসের আগুন তোকে যদি আমি শিক্ষা না দিয়েছি তাহলে আমার নাম ও আহির না। তুই শুধু দেখ কি করি আমি।
ঠিক সেই মুহূর্তে আহিরের পকেটে থাকা ফোনখানা কর্কশ ভাবে বেজে উঠে । আহির বিরক্তি নিয়ে মোবাইল বের করে কল রিসিভ করে। কল রিসিভ হয়েছে বোঝতে পেরে অপর প্রান্তে থাকা মাহির বলে উঠে
— কোথায় আছিস তুই? কখন থেকে কল করছি ধরছিস না কেন? গরুকে ঘাস খাওয়াতে গিয়ে আবার নিজে খাওয়া শুরু করসিনি তো?
আহিরের চটে থাকা মেজাজ আরও চটে গেলো। আহির রাগে অনেক গুলি কথা শুনিয়ে দেয়, মাহির বুঝতে পারে বড় ধরণের কিছু ঘটেছে তাই নরম. স্বরে বলে
— কি হয়েছে তোর?
আহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে আস্তে সম্পন্ন কথা বলতেই মাহির হাসতে হাসতে অস্থির হয়ে পরে আর বলে
— ভাই তোর সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো? না মানে ভার্জিন আছিস তো?
আবারো হাসা শুরু করে মাহির। ঠিক সেসময় পিছন থেকে ভেসে আসে
— কে রে আমার লুঙ্গি চুরি করেছে?
মাহির তৎক্ষণাৎ পিছন ঘুরে তাকায় তার থেকে কিছুদূর দাঁড়িয়ে আছে এক লোক বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ হবে। লোকটাকে দেখে মাহিরের ভ্রু কুঁচকে যায় কেনোনা লোকটার পড়নে ছেড়া গেঞ্জি । পড়নের লুঙ্গিটা কেটে হাঁটু পর্যন্ত করা হয়েছে কাঁধে প্লাস্টিকের বস্তা ডান হাতে ধরে রাখা বড় লাঠি। লোকটা মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলে
— দে দে আমার লুঙ্গি দে।
— আমি কেনো আপনার লুঙ্গি নিবো? আমি লুঙ্গি পরিনা।
হুট করে ঘটে গেলো আরেক কান্ড লোকটা কাঁধে থাকা বস্তাটা মাহিরের দিকে ফিক্কা মেরে বলে
— হতচ্ছাড়া আমার লুঙ্গি চুরি করেছিস দাড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা ।
কথাটা শেষ করেই মাহিরের দিকে ছুটলো। মাহির তখনও হতবম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গায়ে এক বাড়ি পড়তেই তার হুশ ফিরে আসে লোকটা তার গায়ে আঘাত করেছে। মাহির রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই লোকটা বলে
— দে দে আমার লুঙ্গি দে নইলে আজ তোর মাথা ফাটিয়ে দিব।
মাথায় বারি দেওয়ার আগেই মাহির ছুট লাগালো লোকটা তার পিছু ছুটতে লাগলো দু হাতে লাঠি ধরে মাথার উপরে । মাহির ছুটছে আর বলছে
— আরে কে আছো বাঁচাও এই লুঙ্গি ওয়ালা আমার প্যান্ট ছিড়ে দিচ্ছে রে ও মা রে…।
আরো কিছুক্ষন ছুটার পর মাহির একটা গাছের পিছন লুকিয়ে জুড়ে জুড়ে শ্বাস নিতে থাকে তারপর ভালোভাবে নজর ঘুরিয়ে দেখে না পাগল টাকে দেখা যাচ্ছে না। কাঁধে কারো স্পর্শ পড়তেই চমকে উঠে মাহির আস্তে করে মাথা ঘুরাইতেই দেখে অন্য একটা লোক, মাহির নিজের বুকে হাত চেপে ধরে , লোকটা তাকে বলে
— ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম..।
— কি ভেবেছিলে ওই লোকটা এসেছে?
বলেই লোকটা হাসতে শুরু করলেন। মাহির চোখ ছোট করে লোকটার দিকে তাকায়, লোকটা এইবার নিজের হাসি থামিয়ে বলতে আরম্ভ করে
— ওনার নাম মফিজ । একটা লুঙ্গি আট বছর ধরে ব্যবহার করছিলো, তো একদিন হলো কি গোসল শেষে রোদে শুকাতে দিয়ে ঘরে চলে গিয়েছিলো কিছুক্ষন পর আসার পর দেখে তার লুঙ্গি গায়েব কে যেনো চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। তারপর থেকে রাস্তা রাস্তা ওই লুঙ্গির জন্য ঘুরে বেড়ায়, আর যাকেই দেখে তাকেই লুঙ্গি চুর মনে করে। একটা লুঙ্গি তাকে পাগল বানিয়ে দিলো।
— একটা লুঙ্গি ব্যবহার করলে তাহলে গোসল এর পর কি পড়তো??
— ওনার বউয়ের মেক্সি?
— তাহলে বউ কি পড়তো।
লোকটা এইবার লজ্জা পেয়ে বললো
— বউ কাথার নিচে থাকত যতক্ষণ না পর্যন্ত লুঙ্গি শুকাচ্ছে।
লোকটা এইবার নিজের চোখ মুছে তার চোখ দিয়ে টুপটুপ পানি পড়ছিল। কিন্তু মাহির নিজের হাসি থামিয়ে রাখতে পারলোনা সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। মাহিরের হাসি দেখে লোকটার ভ্রু জুড়া কুঁচকে যায় । মাহির বুঝতে পারে তার হাসি দেয়া উচিত হয়নি তাই সে মুখ চেপে ধরে কিন্তু হাসি কি আর বাধ মানে বেহাইয়ার মতো আসতেই থাকে। মাহির এইবার হাসি ঢুক করে গিলে ফেলার মতো করে বলে উঠে
— আহারে বেচারা কি দুঃখ। কিন্তু আপনি এত কিছু জানলেন কিভাবে?
— কারণ ওইটা আমার আব্বা । কথাটা বলেই লোকটা এইবার জুড়ে চিৎকার দিয়ে বলে আব…ব্বা আমার আব্বা ।
মাহির এবার ভাবুক কন্ঠে বলে
— তাহলে আপনি আপনার বাবাকে একটা লুঙ্গি কেনো কিনে দিচ্ছেন না?
মাহিরের প্রশ্নে লোকটার কাদুকাদু ফেইস এইবার সিরিয়াস শক্ত করে নিজের দিকে আঙুল তাক করে দেখিয়ে বলে
— এই আমাকে দেখছো আমার এই শার্ট আর প্যান্ট আমি যখন তেইশ বছরের ছিলাম তখন আমার আব্বা আমায় কিনে দিয়েছিলো আজ আমার বত্রিশ বছর আমি এখনো এইটাই পড়ছি।
— কেনো আপনি কি গরিব ? আপনার টাকার অভাব?
মাহির মনে মনে ভাবলো ইসস রে লোকটা কি অসহায় একটা কাপড় কত বছর ধরে পড়ছে। মাহিরের খুব খারাপ লাগলো কিন্তু তার খারাপ লাগা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। লোকটা মাহির কে বলে
— আমি কেনো গরিব হতে যাবো আমি চল্লিশ হাজার টাকা প্রতি মাসে কামাই করি।
— তাহলে কাপড় কেনো কিনছেন না?
— ওমা কাপড় কিনলে টাকা খরচ হয়ে যাবেনা।
লোকটার কথা শুনে মাহিরের দুনিয়া ঘুরে গেলো বলে কি এই লোক। তার জীবনে এতো বড় কিপটুস সে কোনোদিন দেখেনি না আর বসা যাবেনা মাহির তরিগরিতে উঠে পরে আর চলে যেতে নেয়। লোকটা মাহিরের হাত ধরে জিজ্ঞেস করে কোথায় যাচ্ছো? মাহির বলে
— আসলে আপনাদের জন্য অনেক খারাপ লাগছে তো তাই আপনার আর আপনার বাবার জন্য লুঙ্গি আনতে যাচ্ছি।
লোকটার চোখ চকচক করে উঠে সে চশমা খুলে চোখের পানি মুছে বলে
— ধন্যবাদ তোমার জন্য আমি আর আমার আব্বা নতুন কাপড় পরতে পারবো।
— জি তাহলে আসছি।
মাহির দ্রুত গতিতে চলতে আরম্ভ করে কিছু দূর যাওয়ার পর পিছন ঘুরে দেখে লোকটা এখনও চোখের পানি মুছচে। মাহির দু হাত কোমরে ঠেকিয়ে বলে
— আসছে কাপড় দিব এরে, দিবো তো আমার বাল দিব তোমাকে। বাপ ছেলে দুটোই বড় মাপের খিলারি হালা কিপ্টার বংশধর । হুহ..
মুখ ভেংচি দিয়ে চলে যায় মাহির।
কোমরে সাদা টাওয়াল জরিয়ে শাওয়ার নিচ্ছে আবইয়াজ । সারা শরীর সাবানে মাখামাখি মাথায় সাবানের ফেনার পাহাড় গড়েছে । শরীরে সাবান মাখছে আর ডান্স করছে হঠাৎ মন চাইলো গান গাওয়ার তাও নিজে বানিয়ে আচ্ছা সে ভালো সিঙ্গার সবাই জানে এখন নিজ থেকে একটা সং লিরিক্স বানিয়ে দেখা যাক । ফিউচার এ সং রাইটার হওয়া যাবে কিনা। আবইয়াজ এবার গলা খাঁকারি দিয়ে গেয়ে উঠে
আমি গোসল করতে আসছি
শরীরে ডাভ সাবান মাখি
হেই ফোস ফোস ফোস
ঠান্ডা ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে
কি আরাম লাগেরে ওরে ওরে
আহারে আহারে
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৬
গান শেষ করে আবইয়াজ নিজের কাঁধে চাপর মেরে বলে
— তুই ফিউচার এ বড় রাইটার হবি দেখেনিস ।
কথাটা শেষ করতেই সাবানে স্লিপ খেয়ে ফ্লোরে আছড়ে পরে আবইয়াজ ।
