মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৫
তাসনিয়া নুর
চিৎকারের উৎস খুঁজতে পিছনের দিকে অগ্রসর হয় মাহির, আবইয়াজ, মেহু । একটু এগিয়ে গিয়ে সামনের দৃশ্য দেখেই ‘থম’ মেরে দাঁড়িয়ে যায় তারা। সামনে আহির দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে একটু দূর ফাহিম নামের এক ছেলে মাটিতে শুয়ে মৃগী রোগীর মতো হাত দুদিক ছড়িয়ে ছটফট আর চিৎকার করেই চলেছে। এর মধ্যে তাদের কানে এসে বাজে আরেকটা শব্দ, কে যেনো ‘উউ আআ’ শব্দ করছে। মাহির ঘাড় তুলে উপরে তাকায় সাথে সাথে তার মুখ হা হয়ে গিয়েছে। আবইয়াজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে উপরের দিকে ইশারা করে সে । সামনে একটা বাঁশঝাড় রয়েছে বেশি না কম জায়গার মধ্যে কয়েকটা গাছ। বাঁশঝাড়ের উপর বসে আছে এক লোক, সেখানে বসে বসে এমন আওয়াজ করেই চলেছে।
— কি হয়েছে এখানে?
নিস্তব্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে আবইয়াজের ঠান্ডা স্বরের প্রশ্ন যথেষ্ট ছিল তাদের ভীতি আরও বারিয়ে দেওয়ার জন্য। আহির পিছনে ফিরে বুকে হাত দেয়, রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— এভাবে কেউ রাতের আঁধারে পিছন থেকে ডাকে? কি ভয়টাই না পেয়েছি।
— আর তুই যে রাতে এতো জুড়ে চিৎকার করছিস সেটা কি হ্যাঁ । আর এতো রাতে বাহিরে কি করছিস?
আবইয়াজের প্রশ্নে আহির বলতে আরম্ভ করে,
— একটু আগে বাহির থেকে কার যেনো চিৎকার শুনতে পেলাম। তাই বাহিরে বেরিয়ে আসি । এখানে আসতেই দেখি এক লোক রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কি যেনো ফিসফিস করছিল। তাই আমিও ভয়ে এক চিৎকার দিলাম, তারপর দেখি লোকটা ‘আআ উউউ’ করে দৌড়ে বানরের মতো গাছে উঠে পড়ে । আর কোথা থেকে এই ছেলেটা এসে মাগো খালাগো করে চিৎকার করে মৃগী রোগীর মতো ছটফট শুরু করেছে।
এবার আহির ছেলেটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এই তুই কেনো এমন করছিলি?
ছেলেটা শুষ্ক ঢোক গিলে প্রতু্ত্তর করে,
— আপনিই তো ভূত ভূত করে চিৎকার করতাছিলেন হেই ডরেই দো মাডিতে হুইত্তা গেলাম । ভূত যেন আমারে দেখলে ডরাইয়া ভাইগ্গা যায় ।
মাহির হাত তালি দিয়ে বিদ্রুপ প্রশংসা করার মতো বলে উঠে,
— ভাই এতো বুদ্ধি তুই রাখছ কই? তোরে তো একটা নোবেল ফিক্কা মারা উচিত।
মাহিরের প্রশংসায় ফাহিম দাঁত কেলিয়ে হাসে। এতো প্রশংসা কেউ তার কোনোদিন করেনাই। সবাই খালি বলদ ডাকে। তাই আজ সে মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে যতদিন মাহির থাকবে সে তার পিছনে সারাদিন ঘুরবে আর সেবা করবে।
—- সবই বুঝলাম কিন্তু গাছের উপর লোকটা কে?
এবার সামনের দিকে অগ্রসর হয় সকলে । ফাহিম সামনে গিয়ে জুড়ে চিৎকার দিয়ে বলে,
— আরে এইডা দি জহির চাচায় ।
নিচ থেকে ভেসে আসা শব্দে জহির নিচের দিকে মাথা নোয়ায়। সে খানিকটা বিব্রত বোধ করে । একটু আগে ভয়ে গাছে চড়ে গিয়েছিলো । এখন যদি সবাই জানতে পারে তাহলে ইজ্জত যাবে।
জহির আস্তে ধীরে গাছ থেকে নেমে পড়ে। এবার সটান হয়ে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে,
— তোমরা এতো রাইতে বাহিরে কি করো?
— তার আগে আপনি বলেন এই রাতে গাছের উপর আপনার কি? ভয় পেয়েছিলেন বুঝি।
জহির আড়চোখে মাহিরের দিকে তাকায়।
— ঔইসব ভয় ডর জহিরের মনে নাই । ঘরে গরম লাগতাছিল তাই হাওয়া খাইতে আইছি । বাঁশঝাড়ের উপর বইস্সা চন্দ্রবিলাস করতাছিলাম ।
— কিন্তু চাচা আজকে তো চাদঁ উঠে নাই।
জহির মিয়া কটমট দৃষ্টিতে ফাহিমের দিকে তাকায়। পোলাডাকি তার বেইজ্জতি করেই ছাড়ব?
—- এত রাইতে বাহিরে থাকা ভালা না যান সবাই ঘরে যান।
আর এক মূহুর্ত থাকলো না। বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। ফাহিম মুখ টিপে হেসে,
— চাচা সেই লেভেলের ভয় পাইছে।
সকাল দশটা ঘুমে আচ্ছন্ন আহির । হঠাৎ করে কেউ কাঁধ ঝাঁকালে ঘুমের বেঘাত ঘটায় বেশ বিরক্ত সে। কিন্তু সেসবে পাত্তা না দিয়ে আবারও ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়। তবে ঘরে উপস্থিত ব্যক্তির আহিরের ঘুম সহ্য হলো না। সে আবারও ডাকতে আরম্ভ করে । এক পর্যায়ে আহির ঘুম থেকে বিরক্তি নিয়ে উঠে বসে আহির । বড্ড ঝাঁঝালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— সমস্যা কি এতো সকালে ডাকছিস কেনো? শান্তিতে কি একটু ঘুমাতে পারবো না তোদের জন্য?
— এটাকে কেউ ঘুম বলে? বেঁচে আছো নাকি মরে গেছো তাও আন্দাজ করতে পারিনা মাঝে মাঝে ।
আহির এবার রাগী চোখে মাইরাকে বললো,
— তুই যা তো আমার সামনে থেকে। নইলে এক আছাড় মেরে নিচে ফেলে দিব ।
— চিত্রা আপু সবাইকে ডেকেছে নিচে চলো । আর যদি না যাও আমি আম্মুকে বলে দিব তুমি আমার খেয়াল রাখনি উল্টো আমাকে মেরেছো ।
আহির চোখ পাকিয়ে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে । তার দিকে তাকিয়ে মাইরা ভেংচি কেটে রুম থেকে বেরিয়ে যায়, আহির ও বের হয়।
করিডরে আবইয়াজ, মাইরা, মেহু, চিত্রা দাঁড়িয়ে কি যেনো ফিসফাস করেই চলেছে । মাহির ঢলোঢলো পায়ে এগিয়ে এসে,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৪
— কি হয়েছে? এত সকালে তোদের ভাঙ্গা রেডিও ছেড়ে আমার ঘুম ভাঙলি কেনো?
— সারাদিন তো গাধার মতো ঘুমাও আর এদিকে আমরা এতক্ষণে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে চলে এসেছি।
আহির চিত্রার দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে বললো,
— বাংলাদেশ যেহেতু ঘুরা শেষ এখন পুরা দুনিয়া ঘুর। আমাদের কেনো ডেকে তুলেছিস?
মাইরা চিত্রা একে অপরের দিক তাকিয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে,
— কারন আমরা মিশনে যাচ্ছি ।
আহির, মাহির, আবইয়াজ তরাক করে মাথা তুলে একসঙ্গে বলে উঠে,
— আবার মিশননন ।
এদের এমন রিয়েক্শন দেখে মেহু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠে । এমন করার কারণ সে বুঝতে পারলো না…
