Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৯

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৯

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৯
Tahmina Akhter

অভিজাত এক রেস্টুরেন্ট এর সামনে গাড়ি থেমে গেছে। রিনি বেরিয়ে গেল প্রথমে। তারপর, আলো। ওরা দুজন নেমে যাবার পর মেঘালয় গাড়ি পার্ক করার জন্য আরেকটু সামনের দিকে অগ্রসর হলো।
এত এত ভিড় আর অচেনা মানুষের ভিড়ে আলোর নিজেকে কেমন একা মনে হচ্ছে। কই দেশে থাকতে তো এমন মনে হয়নি! কারণ, দেশটা হয়তো তার নিজের ছিল বলে! পথঘাট অচেনা হলেও দেশের মানুষগুলো যেন নিজেদের আপনজনের মতই।
রিনির মোবাইলে আরাফাতের কল এসেছে। রিনি এক্সকিউজ মি বলে আলোর কাছ থেকে সামান্য দূরে গিয়ে অবস্থান করলো। আলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করছে। ঠিক তখনি সেখানে একজন নিগ্রো ছেলে মাটি ছুঁয়ে থাকা আলোর শাড়ীর আঁচল তুলে ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে বলল,

— Are you indian or bangladeshi ? You are so pretty and ho…..
বাকি কথা সম্পূর্ণ করার আগে কেউ এসে নিগ্রো ছেলেটাকে এক ধাক্কায় আলোর কাছে দূরে সরিয়ে দেয়। আলো যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। এতক্ষণ ভয়ে আর বিব্রতকর অবস্থায় থেকে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
ছেলেটা পড়ে যাবার আগেই নিজেকে সামলে ফেলল। কিন্তু, মেঘালয় হিংস্র বাঘের ন্যায় ছেলেটূর জ্যাকেটের কলার ধরে কঠোর স্বরে বলল,
—How dare you? You touch my girl?
This is my girl! Are you understand? She is only mine.Stay away from her!
বিক্ষিপ্তভাবে কথাগুলো বলেই মেঘালয় সেই ছেলের কলার ছেড়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,

— Hey, men why are getting angry? I am just….
— husss, don’t say any word? Go away from here.
ব্যস ছেলেটা চলে গেল। আর আতংকিত আলো এতটাই প্যানিকড হয়ে গিয়েছিল যে মেঘালয় এবং সেই ছেলেটার মধ্যকার কথোপকথন শুনতে পায়নি। আলো ভয়ে ভয়ে বারবার নিজের শাড়ীর আঁচল টেনে শরীর ঢেকে ফেলছে।
মেঘালয়ের শরীর রাগে কাঁপছে। আলোর দিকে তাকিয়ে রইল কয়েেক সেকেন্ড। ভূত দেখে ভয় পাওয়ার মত চমকে আছে আলোর মুখটা। মেঘালয়ের ইচ্ছে করলো আলোকে বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে আশ্বাস দিয়ে বলতে,
— বোকা মেয়ে, ভয় পাচ্ছো কেন? আমি যতদিন বেঁচে আছি কে তোমাকে স্পর্শ করবে? কে এমন দুঃসাহস দেখাবে? মেঘকে পার করে তবেই না আলোকে স্পর্শ করতে পারবে?
এরইমধ্যে রিনি ছুটে এসে আলোকে একপাশে জড়িয়ে ধরল। আশ্বাস দিয়ে বলল,
— কি হয়েছে? এখানে মাঝে মাঝে এমন হয়। তুমি ভয় পেয়ো না।
— নর্মাল বলতে তুমি কি বোঝাতে চাইছো, রিনি? যার যখন ইচ্ছে তাকে ছোঁবে? হাউ রিডিকিউলাস। কেউ কাউকে অনুমতি দেবার আগ পর্যন্ত….
কথাটি শেষ করতে পারল না মেঘালয়। রাগের বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হতে পারে ভেবেই নিজেকে সামলে ফেলল। তারপর, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রিনিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— ভেতরে যাও।
রিনি আলোকে সঙ্গে করে ভেতরে চলে গেল। মেঘালয় না নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারছে আর না ভুলতে পারছে সেই দৃশ্য!

রিনির হাত ধরে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল আলো।
দরজা খুলতেই উষ্ণ এক বাতাস এসে লাগল শরীরে। বাইরের ঠান্ডা হাওয়া যেন মুহূর্তেই গা থেকে ঝরে গেল।
এটা “The Ivy” লন্ডনের অভিজাত আর বিখ্যাত এক রেস্টুরেন্ট। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল হলদে আলো, ছিমছাম সাজ, টেবিলগুলোতে সাদা কাপড় জড়িয়ে দেয়া, কিছু টেবিলের কোথাও কেউ ওয়াইন হাতে বসে আছে। কোথাও আবার পরিবার নিয়ে এসেছে ডিনার করতে। চারপাশে ইংরেজি উচ্চারণে ভেসে আসা কথা
“Lovely evening, isn’t it?”
“Cheers!”
“Happy birthday!”
রেস্টুরেন্টের এক কোণায় ছোট্ট একটা বার্থডে পার্টি চলছে। রঙিন বেলুন, কেক, আর বেশ কয়েকজনের হাসির শব্দ। সব মিলিয়ে একদম অন্যরকম এক পরিবেশ। আলো একটু থমকে গেল। তার শাড়ি, তার চেহারা, এই ভিড়ের মাঝে যেন আলাদা করে চোখে পড়ে যাচ্ছে। কয়েকজন স্থানীয় ব্রিটিশ নারী আলোর দিকে তাকিয়ে হাসল। একজন তো ফিসফিস করে বলে ফেলল,

“Her saree is gorgeous…”
আরেকজন মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
আলো লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠিক তখনই সামনে থেকে হাত নেড়ে ডাক দিল এক ছেলে,
— Finally! You guys are here!
কথাটি বলেই আরাফাত আড়চোখে তাকায় রিনির দিকে। লাল জামদানিতে তার একদিন পুরনো বউটাকে নতুন নতুন বউ মনে হচ্ছে। ইচ্ছে করছে বউটাকে সকল বাধা উপেক্ষা করে বলতে,
— চলো তো রিনি, পৃথিবীর সব ভিড়ভাট্টা কাটিয়ে পৃথিবীর বাইরে চলে যাই আমরা? তোমাকে এত চোখে লাগছে কেন বলো, তো? আমি তো আমার জীবনের সব লক্ষ্য ভুলে যাচ্ছি। আমার জীবনের লক্ষ্য এখন তুমি। তোমাকে জিতে না পাওয়া অব্দি আমার লক্ষ্য যে পূরণ হবে না।
আরাফাতের এমন গা কাটা দেয়া চাহনি দেখে রিনি দৃষ্টি নত করে ফেলল। লোকটার কি হলো ভাবছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
আলো একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল। অচেনা মানুষ… অচেনা জায়গা… সবকিছুই তার কাছে নতুন।
এমন সময় পিছন থেকে ধীর কণ্ঠ

— You okay?
আলো ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলো মেঘালয়কে। মেঘালয়ের রাগ অনেকটাই কমে গেছে এখন।
কিন্তু চিন্তা এখনও রয়ে গেছে। আলো কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নাড়ল। মেঘালয় একটু এগিয়ে এল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন কিছুই হয়নি।
— যদি তোমার অস্বস্তি লাগে, আমার পাশেই থেকো।
কথাটা খুব সাধারণ ছিল… কিন্তু আলোর বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। গত আটবছর আগের মানুষটা যেন তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এখন!
আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনের অজান্তেই এক পা এগিয়ে মেঘালয়ের কাছে পাশে গিয়ে দাঁড়ায় । ওই সময়ই কেক কাটা শুরু হলো। সবাই একসাথে গাইছে—

“Happy Birthday to you…”
আলো তাকিয়ে রইল দৃশ্যটার দিকে। হঠাৎ করেই তার মনে হলো, এই শহরটা যতই অচেনা হোক। এই ভিড় যতই অচেনা হোক, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটা তার খুব নিজের। এতটাই নিজের যে সেই মানুষটাকে মৃত্যুর পরও সৃষ্টিকর্তার কাছে দাবি করে পেতেও পারবে।
কেক কাটার পর এক ইংরেজ ভদ্রলোক এসে বলল,
— Would you like some cake, miss?
আলো একটু থমকালো… ইংরেজিতে উত্তর দিতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলল। অথচ, এমন ভুল কখনো হয় না তার।
— I? yes? thank you?
ভদ্রলোক হেসে বলল,
— No worries at all.
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘালয় মৃদু হেসে ফেলল আলোর কান্ড দেখে। তারপর, আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— Relax… you’re doing fine.
আলো তাকাল তার দিকে। মেঘালয় আলোর চোখের দিকে সরাসরি তাকাতেই দেখতে পেলো আলোর মিছে রাগ আর কিঞ্চিৎ লজ্জা।

— হাসছেন কেন?
— কারণ, যখন তুমি অনেক নার্ভাস ফিল করো তখন তোমাকে অনেক কিউট লাগে দেখতে।
আলো একেবারক থমকে গেল। কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। চারপাশে হাসি, কোলাহল, গান আর সেই ভিড়ের মাঝখানে দুজন মানুষের মধ্যে নিঃশব্দে তৈরি হতে লাগল নতুন করে এক মূল্যবান সম্পর্ক।
কেক কাটার পর ধীরে ধীরে মিউজিকের সুর বদলে গেল। হালকা জ্যাজ টাইপ সুর বাজতে শুরু করল।
কেউ কেউ জোড়া বেঁধে ডান্স ফ্লোরে চলে যাচ্ছে।
রিনি হেসে বলল,
— Oh my God, I love this song! I’m going to dance!
সে টেনে আরাফাতকে নিয়ে ফ্লোরে চলে গেল। আরাফাত যেন এই রিনিকে চিনতে পারছে না কারণ, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!!
আলো একা দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে জোড়ায় জোড়ায় মানুষ। তাদের হাসি, স্পর্শ, কাছাকাছি দাঁড়ানো দেখে তার বুকের ভেতরে অদ্ভুত অনুভূত হতে শুরু করল। ঠিক তখনই একজন লম্বা, সুদর্শন ব্রিটিশ ছেলে এগিয়ে এলো। স্মার্ট স্যুট, হাতে ওয়াইন গ্লাস।

— Excuse me… would you like to dance?
আলো একদম থমকে গেল।
— I… I don’t—
সে না বলার আগেই ছেলেটা হাত বাড়িয়ে দিল,
— Just one dance Pretty…
আলো দ্বিধায় পড়ে গেল। ঠিক তখনই তার কব্জি টেনে কেউ থামিয়ে দিল। আলো পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো মেঘালয়কে। মেঘালয়ের চোখে আবার সেই রাগের আভাস যা রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢোকার আগে দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু এবার রাগটা অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত মনে হচ্ছে । মেঘালয় বেশ শান্ত গলায় জবাবে লোকটাকে বলল,
— She’s not interested.
ছেলেটা একটু অবাক হয়ে বলল,
— I was just asking…
মেঘালয় এক পা এগিয়ে এল
— And I just answered.
পরিস্থিতি একটু অস্বস্তিকর হয়ে উঠতেই ছেলেটা হালকা হাসি দিয়ে সরে গেল। তবে যাওয়ার আগে বলে গেল,
— Alright, mate. Chill.
আলো নিঃশ্বাস ফেলল। হাত ছাড়াতে পারল না।মেঘালয় এখনও তার কব্জিটা ধরে আছে। কয়েক সেকেন্ড কেটে যাবার পরও কেউ কিছু বলল না। তারপর মেঘালয় ধীরে বলল,

— Dance করবে?
আলো অবাক হয়ে বলল,
— আমি? আমি তো পারি না…
— আমিও না।
— তাহলে?
মেঘালয় আলোর সামনে হালকা ঝুঁকে বলল,
—তাহলে আমরা শিখব, একসাথে।?
আলোর বুকটা কেঁপে উঠল। সে না বলতে পারল না। মেঘালয় তাকে নিয়ে গেল ডান্স ফ্লোরে। মিউজিকটা আরও হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে যেন ।
মেঘালয়ের এক হাত আলোর কোমরের কাছে থেমে গেল। স্পর্শ করার আগে একটু থামল, যেন অনুমতি চাইছে। আলো চোখ তুলে তাকাল। কিছু বলল না। কিন্তু চোখ নামাল না। মেঘালয় ধীরে ধীরে বাম হাত রাখল আলোর কোমড়ে। ডান হাতে আলোর বাম হাত ধরল। আলোর একহাত মেঘালয়ের বুকের বাম পাশে রাখা।
প্রথম কয়েক সেকেন্ড দুজনেই অস্বস্তিতে কাটিয়ে দেয়।।

— Relax…
মেঘালয় ফিসফিস করে বলল আলোকে ।
— পারছি না…
আলো মৃদু স্বরে জবাব দিলো।
— আমার দিকে তাকাও।
আলো তাকাল। ভুলে গেল চারপাশের সবাইকে।
এখন এই মূহুর্তে শুধু এই মানুষটা, এই চোখ, এই স্পর্শ এই সবকিছু যেন জরুরি হয়ে গেছে তার কাছে। কে বলবে গতকাল থেকে আজ এই সন্ধ্যা অব্দি এই মানুষটা আলোকে চোখে দেখেও না দেখার ভান করেছে!
ধীরে ধীরে তাদের পা মিউজিকের সাথে মিলে গেল। একসময় আলো নিজেই খেয়াল করল, সে আর ভয় পাচ্ছে না। মেঘালয়ের আচমকা গম্ভীর হয়ে বলল।
— ওই ছেলেটা যখন তোমাকে ডান্সের জন্য বলল তুমি কি তাকে হ্যাঁ বলতে?।
আলো থমকে গিয়ে বলল,

— না…
— কেন?
মেঘালয় পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চাইল। আলো একটু ভেবে বলল
— কারণ… আমি কমফোর্টেবল ছিলাম না।
মেঘালয় একটু ঝুঁকে এলো আলোর দিকে। কণ্ঠটা আরও নিচু করে প্রশ্ন করল,
— আর এখন?
আলো নিঃশ্বাস আটকে গেল। ভীষণ জড়তা নিয়ে বলল,
— এখন ঠিক আছি।
মেঘালয়ের ঠোঁটের কোণে খুবই হালকা হাসি ফুটল। যা আলোর নজরে পড়ল না।
— Good.
বলেই মেঘালয় আলোর কাঁজল চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মিউজিক থেমে গেল। কিন্তু তারা দুজনেই কেউ নড়ল না। কয়েক সেকেন্ড নীরবতায় কেটে গেল তারপর মেঘালয় খুব আস্তে করে আলোকে বলল,

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮

— কেউ তোমাকে স্পর্শ করুক এটা আমি সহ্য করতে পারি না!
আলো তাকিয়ে রইল। তারপর, ফিসফিস করে প্রশ্ন করল,
— কেন?
এই প্রশ্নটা যেন শূন্যে ঝুলে রইল। মেঘালয় জবাব দেয় না। শুধু আলোর হাতটা একটু শক্ত করে ধরল আর আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন মনে হচ্ছে মেঘালয়ের চোখই জবাব দিলো,
“কারণ… তুমি আমার।”

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬০