মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২০
তাসনিয়া নুর
নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে চিত্রা, মাইরা। মাথায় শুধু ভেসে যাচ্ছে কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। এতো উদ্যম সাহস মেহুর মাঝে কোথা থেকে আসলো? আজকাল মেয়েটাকে একদম চেনা যাচ্ছে না। কখনও মনে হয় ননির পুতুলের ন্যায় নরম আবার কখনও মনে হয় শক্ত ইস্পাত।
অন্যদিকে চোরা চোখে চারদিক পর্যবেক্ষণ করে পা টিপে টিপে মাহিরের রুমে প্রবেশ করে ননী। মাহির বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে আছে । ননী এবার মাহিরের কাছে গিয়ে ঝুঁকে বসে পড়ে । মুখে তার মুচকি হাসি ।এই অবেলায় ঘুমের মানে বের করতে পারলোনা ননী। তবে ভালোই হয়েছে তার জন্য এখন মন ভরে মাহির ভাইকে দেখতে পারবে। জেগে থাকলে লোকটা তাকে পাত্তাই দেয়না শুধু পালাই পালাই করে ঘুরে বেড়ায়। কথাটা ভেবেই ননী মুখ ভেংচি কাটে।
ননী আরেকটু ঝুকে আসে মাহিরের কাছে। ঘুমন্ত অবস্থায় কি নিস্পাপ দেখাচ্ছে তার শখের পুরুষকে। ননী আলতো করে মাহিরের কপালে পড়ে থাকা সিল্কি চুলগুলো সরিয়ে দেয় ।
ফর্সা মুখ খানায় হালকা লাল ঠোঁট তার উপর কালো কুচকুচে একটা তিল। ননীর এবার বড্ড লোভ হলো ঠোঁটটা একবার ছুয়ে দেখার। একটু সাহস নিয়ে যেই ঠোঁট স্পর্শ করতে যাবে তার আগেই মাহির একটু নড়েচড়ে উঠে । ভয়ে ননী একটু পিছিয়ে যায়। মাহিরকে আবারও নাড়াচাড়া করতে দেখে ননী ভয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। রুমে কিছুর শব্দ পেতেই মাহির দ্রুত চোখ খুলে, কিন্তু তেমন কিছু নজরে না আসায় আবারও ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো।
রুম থেকে বেরিয়ে এসেই ননী যেনো হাফ ছেড়ে বাচঁলো । ইশ যদি মাহিরের সামনে ধরা পরে যেতো তাহলে কি হতো? ননী আর কিছু না ভেবে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
ছাদের এক কোনে দাঁড়িয়ে গুনগুনিয়ে গান গাইছিল মেহু । সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাতে ছাদে বারবি কিউ পার্টি হবে। সব কিছুর তোড়জোড় চলছিল ছাদে। মেহু গুনগুনিয়ে গান গাইতে দেখে আবইয়াজ তার কাছে এগিয়ে আসে। গলা খাকারি দিয়ে বলে,
— এখানে একা দাঁড়িয়ে কি করছিস?
মেহু পিছন ঘুরে আবইয়াজের সাথে দৃষ্টি মিলিয়ে বলল,
— আচ্ছা আকাশের নাম কেনো আকাশ রাখা হলো? মাটি কেনো রাখা হলো না? সূর্য কেনো সূর্য হলো? চাঁদ কেনো সুর্য হলো না?
মেহুর এমন উদ্ভট প্রশ্নে আহাম্মক বনে গেলো আবইয়াজ। আবইয়াজ এক ঠোঁট উপরে তুলে বলল,
— মাথার ব্রেন কি ঠিক আছে? নাকি পুরোটাই গিয়েছে?
মেহু বড় একটা শ্বাস ফেলে এক হাত কোমরে রেখে বলল,
— কিছুদিন ধরে ব্রেনটা অনেক জ্বালিয়ে মারছিল।সুযোগ পেলেই শুধু এদিক ওদিক গুতো মারছিল। তাই বুদ্ধি করে ব্রেনটাকে বালতির ভেতর পাউডার দিয়ে চুবিয়ে রেখে এসেছি । ময়লা পরিষ্কার হয়ে গেলেই পুকুরের পানিতে ধোয়ে রোদে শুকাতে দিয়ে দিব । কাজটা ঠিক করেছিনা?
আবইয়াজ যেনো অবাকের চরম লেভেলে পৌঁছে গিয়েছে? বলে কি এই মেয়ে?
আবইয়াজ এবার মেহুর কাছে গিয়ে কপালে গলায় চেক করল জ্বর হয়েছে কিনা, কিন্তু না জ্বর তো নেই । কিন্তু এদিকে এতক্ষণ বকবক করতে থাকা মেহু আবইয়াজের হঠাৎ স্পর্শে কেমন বোকা বনে গেলো । হঠাৎ করে মেহুর কি হলো কোনো কিছু না ভেবেই আবইয়াজের জায়গা মতো নিজের হাঁটু দিয়ে লাথি মেরে দিল।
আবইয়াজের জান যায় যায় অবস্থা, কোনো রকমে সেখানে চেপে ধরে খুব কষ্টে মুখ থেকে বের করল,
— ডাইনি আর জায়গা পেলি না মারার? তোকে অভিশাপ দিলাম তুই কোনোদিন বাপ হতে পারবিনা।
আবইয়াজ সেভাবেই চেপে ধরে সেখান থেকে সামনে চলে যায়। পাশে বারবি কিউ করা হচ্ছে। ট্রুথ অর ডেয়ার খেলার ফাহিম নিচ থেকে একটা বোতল নিয়ে আসে। সবাই গোল হয়ে বেসেছে । আবইয়াজ এবার বোতলটা নিচে রেখে ঘুরিয়ে দেয়। বোতল ঘুরতে ঘুরতে থামে মাহিরের দিকে। আবইয়াজ এবার প্রশ্ন করে,
— কি নিবি ট্রুথ নাকি ডেয়ার?
মাহির এবার চিন্তা করে যদি সে ডেয়ার নেয় তাহলে না জানি তাকে দিয়ে এরা কি করাবে। এদের বিশ্বাস নেই জনসম্মুখে ইজ্জত ধৌয়ে দিবে।মাহির ভেতরে শ্বাস টেনে বলল,
— ট্রুথ নিলাম।
পাশ থেকে আহির হাত উচিয়ে চিৎকার করে বলল,
— আমি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব।
আবইয়াজ মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে ।
আহির মাহিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— আজকে কয়টা ফার্ট দিয়েছিস?
— এটা কেমন প্রশ্ন?
— বেশি কথা না বলে উত্তর দে।
মাহির শুষ্ক ঢোক গিলে ।আশেপাশে তাকিয়ে দেখে সবাই তাকিয়ে আছে । ছিহ কি বিশ্রী পরিস্থিতি। মাহির আহিরের দিকে তাকিয়ে ভাবে এটা কি আসলেই তার ভাই?
না কিছুতেই এই ছেলে তার ভাই হতে পারে না। নিশ্চিত সে পেটে থাকতে তার মা যখন হসপিটালে গিয়েছিল তখন অন্য একটা বাচ্চার সাথে ঝগড়া লেগে গিয়েছিল। তাই হয়তো ওই ছেলে তার ভাইকে সরিয়ে নিজে এসে পড়েছে। তার থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।
না জানি তার আসল ভাইটা এখান কোথায় আছে কেমন আছে।
মাহিরের ভাবনার মাঝেই আহির আবার বলে উঠে,
— কি হলো উত্তর কেনো দিচ্ছিস না?
— উত্তর দেয়ার মতো প্রশ্ন করেছিস তুই?
আবইয়াজ এবার বলল,
— এত কথা না বলে আহিরের প্রশ্নের উত্তর দে।
— আল্লাহর গজব পরবে তোদের উপর তোরা যা শুরু করে দিয়েছিস আমার সাথে ।
আহির হাই তুলে বলল,
— অন্যের ডায়ালগ মারা বন্ধ করো পিয়। তাড়াতাড়ি উত্তর দে নইলে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিব একদম।
মাহির আর কি করবে। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে বলল,
— আমি তো আর গননা করিনি। তবে হবে হয়তো পাচঁটা।
সাথে সাথে সকলে অট্টহাসিতে ফেটে পরে । ননী নাক মুখ কুঁচকে মাহিরের দিকে তাকিয়ে রয় ।
আবইয়াজ আবারো বোতল ঘুরানো আরম্ভ করে। এবার থামে মেহুর দিকে।
মাইরা মেহুকে জিজ্ঞাসা করে,
— ট্রুথ অর ডেয়ার?
—. ট্রুথ।
মাইরা এবার ফট করে জিজ্ঞেস করে বসে,
— তুমি তো আগে সারাক্ষণ আবইয়াজ ভাইয়ার পিছন পিছন ঘুরে বেড়াতে । কিন্তু এখন তো ভাইয়াকে পাত্তাই দেও না। কেনো? আর ভালোবাসো না?
ফট করে সবাই মাইরার দিকে দৃষ্টি তাক করে। চিত্রা মনে মনে ভাবে কোথায় কি বলতে হবে এই মেয়ে এখনও জানে না। এখন যদি মেহু উঠে চলে যায়। কিন্তু চিত্রাকে অবাক করে মেহু শান্ত হেসে বলে উঠে,
— ভালোবাসা কি এতই সহজ? নাকি ভালোবাসার মানুষটাকে ভুলে যাওয়া সহজ? ভুলে যেতে পারলে সেটা কোনোদিন ভালোবাসা হতে পারেনা এটা স্রেফ মোহ। আর মেহু কোনোদিন মোহের পিছনে ছুটে না।
মেহুর প্রত্যেকটা কথা কেনো যেনো আবইয়াজের বুকে বিধলো । তার তো খুশি হবার কথা ছিল, সে তো সবসময় চাইতো মেহু যেনো তাকে ভুলে যায়। তাহলে আজ কেনো এমন লাগছে?
বেশ বিরক্তি বোধ করলো আবইয়াজ।
কেউ আর কথা না বাড়িয়ে খেলায় মনোনিবেশ করে ।
এবার আহিরের পালা। আহির বেশ ভেবে চিন্তে ডেয়ার নিল। বেশির থেকে বেশি কি আর দিবে হয়তো ডান্স নাহলে খাঁ এইসবই তো, এছাড়া আর আছেই বা কি?
আহিরের ধারনাই সঠিক ছিল তাকে নাচতে দেয়া হলো ঠিকই কিন্তু যেটা তার ভাবনার উর্ধ্বে ছিল তাকে শাড়ি পড়ে নাচতে হবে।
আহির তো প্রথমে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলনা। শেষে জুড় করে তাকে শাড়ি পড়িয়ে দিল।
আহিরের অবস্থা দেখে সবাই হেসে কপোকাত। এদিকে মাহির বেজায় খুশি একদম ঠিক হয়েছে এর সাথে।
চিত্রা বেশ কয়েকটা ছবি ফোনে কেপচার করে নেয়।
সেই রাত কেটেছিল বেশ আনন্দ ফুর্তিতে। শেষ রাতে সকলে নিজ নিজ রুমে চলে গিয়েছে।
সকাল নয়টা কি দশটা। বাহির থেকে ভেসে আসা হট্টগোলের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আবইয়াজের। পিটপিট চোখ মেলে চারদিক পর্যবেক্ষণ করে, আবারো ভেসে আসে চেঁচামেচির শব্দ ।
আহির এসে আবইয়াজের দরজা নক করে বলতে থাকে,
— আবইয়াজ দরজাটা খুল ।
আবইয়াজ চোখ কচলাতে কচঁলাতে দরজা খুলে বলল,
— কি হয়েছে এভাবে ডাকছিস কেনো? আর বাহিরে এত হট্টগোল কিসের?
মাহির এবার হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— সকাল থেকে মেহুকে পাওয়া যাচ্ছে না। সব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি তা ও পাইনি কোথাও ।
মেহুর নিখোজ হওয়ার সংবাদ শুনে আবইয়াজের ঘুম উবে গেলো । সচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কিহ সকাল থেকে মেহুকে পাওয়া যাচ্ছে না আর তুই খবরটা এতক্ষণে আমাকে দিচ্ছিস।
মাহির আমতা আমতা করে বলে,
— আসলে তাড়াহুড়োর চক্করে তোর কথা মাথায় আসে নি।
— লাইক সিরিয়াসলি? সেসব বাদ দে আগে বল ওকে কল দিয়েছিলি?
— হুম কিন্তু ফোন ওর ঘরেই পরে আছে ।
আবইয়াজ এবার চিন্তিত হলো। মাহির দিকে তাকিয়ে বলে,
— চল ।
হনহনিয়ে চলে যায় আবইয়াজ।
সারা ঘর, গ্রামের আশেপাশে মেহুকে খুঁজেছে আবইয়াজ তবে কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
শেষে হতাশ হয়ে আবইয়াজ সোফায় ধ্বপ করে বসে পরে । খলিল আহমেদ চিন্তিত স্বরে বলেলন,
— কোথায় চলে গেলো মেয়েটা? আমাদের উচিত পুলিশ কমপ্লেন করা।
আবইয়াজ দু ধারে মাথা নেড়ে বলে,
— চব্বিশ ঘন্টা হওয়ার আগে পুলিশের কাছে গিয়ে লাভ নেই। তাছাড়া আমরা জানিনা এখনও মেহু কোথায় আছে। কেউ যদি কিডন্যাপ করে থাকে তাহলে সমস্যা হবে । তাই যা করার আপাতত আমাদেরই করতে হবে।
বর্ষা বেগম আতঙ্কিত হয়ে বললেন,
— কিডন্যাপ? কিন্তু কে করবে? ও তো এখানের কাউকেই চিনে না ।
আহির চিন্তিত স্বরে বলে,
— সেটাই তো ভাবছি।
ননীর মাথায় হুট করে কিছু একটা খেলে গেলো। সে ধীর পায়ে আবইয়াজের সামনে গিয়ে বলল,
— মেহু কোথায় আমি জানি।
সকলে ফট করে ননীর দিকে তাকায়। এতগুলো মানুষের চাহনি দেখে ননী আরেকটু ঘাবড়ে গেলো । ননী চিত্রার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপু মনে আছে কালকের ঘটনা? আমার মনে হয় ওই টেরা মামুন আপুকে নিয়ে গিয়েছে আর কোথায় নিয়ে গিয়েছে সেটা ও আমি জানি।
আবইয়াজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কালকে কি হয়েছিল? আর এই টেরা মামুনই বা কে?
ননী এবার আস্তে ধীরে সব কাহিনী খুলে বলে। সবকিছু শুনে আহির, মাহির, আবইয়াজ হা।
ননী এবার তাড়াহুড়া করে বলল,
— আমাদের উচিত তাড়াতাড়ি সেখানে যাওয়া।ওই মামুন অনেক ভয়ানক। যদি আপুর কোনো ক্ষতি করে দেয়?
আবইয়াজ আর দেরি না করে বলে,
— তাড়াতাড়ি চল ননী ।
কথাটা বলে আবইয়াজ দ্রুত গতিতে হাঁটা ধরে। ননী, চিত্রা, আহির, মাহির, মাইরা আবইয়াজের পিছনে ছুটে।
ননী সবাইকে নিয়ে থামে নির্জন পরিত্যক্ত একটা গোডাউনের সামনে । আশেপাশে মানুষ নেই বললেই চলে। আবইয়াজ চিত্রা কে বলল,
— তোরা এখানে থাক আমি আহির মাহির গিয়ে দেখে আসছি।
চিত্রা সম্মতি জানায়। গোডাউনের সামনে দাঁড়াতেই আবইয়াজ লক্ষ্য করে তেমন কোনো ফাঁক ফোকর নেই ভিতরে কি হচ্ছে দেখার। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থামে উপরে ছোট একটা জানালার মতো দেখা যাচ্ছে ।
আবইয়াজ সেদিকে পা বাড়ায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে জানালাটা অনেকটা উপরে তাই কোনো কিছু সাহায্য ছাড়া দেখা সম্ভব না।
আবইয়াজ মাহিরকে ডেকে বলল,
— মাহির এখানে আয় তো ।
আবইয়াজের ডাক শুনে মাহির সেদিকে এগিয়ে যায়। মাহির যেতেই আবইয়াজ তাকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে সোজা করে দাড় করায়। পাশে থাকা পাইপ ধরে মাহিরকে কিছু বুঝার সুযোগ না দিয়েই ঠাস করে তার কাঁধে উঠে পড়ে । এমন কিছু হবে মাহির ভাবতে ও পারেনি। এমন বলিষ্ঠ দেহি পুরুষকে নেয়া বুঝি এতই সহজ?
মাহিরের জীবন যায় যায় অবস্থা। মুখ দিয়ে চিৎকার বের হতে নিলে আহির তার মুখ চেপে ধরে । এ কেমন অত্যাচার করা হচ্ছে তার সাথে?
আবইয়াজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উকি মেরে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মেহুকে যে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে তা বেশ বুঝতে পারলো।
আবইয়াজ মাহিরের উপর থেকে নেমে পড়তেই মাহির আর্তনাদ করে উঠে । মনে হচ্ছে আজ আর বাঁচবে না। আহারে তার লাল টুকটুকে বউটাকে দেখা হবে না। বউ যেদিন জানবে তার স্বামী অনেক আগেই মারা গিয়েছে নিশ্চিত সেদিন তার বউ কেঁদে কুটে দুনিয়া ভাসাবে ।
এদিকে আবইয়াজ পড়েছে বিপাকে কি করবে বুঝতে পারছেনা । উল্টা পাল্টা কিছু করলে যদি মেহুর ক্ষতি হয়ে যায়?
আহির, মাহির, মাইরা, ননী, চিত্রা, আবইয়াজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে কি করা যায় । হঠাৎ করে চিত্রা চিৎকার দিয়ে বলল,
— আইডিয়া।
আহির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল,
— কি?
চিত্রা শয়তান হেসে আবইয়াজের দিকে তাকায়। আবইয়াজ যেহেতু ভালো একজন এক্টর তাই চিত্রা আস্তে ধীরে নিজের প্ল্যান বলতে আরম্ভ করে। সব কিছু শুনে আবইয়াজ নাকোচ করে দেয়। সে কিছুতেই এইসব করতে পারবেনা। শেষে অনেকে ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইল করে রাজি করিয়ে নিল ।
লাল একটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস তার সাথে কাঁধ সমান চুল, ঠোঁটে টকটকে লিপস্টিক দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবইয়াজ। গোডাউনের দরজার বাহিরে খটখট শব্দ শুনতে পেয়ে দরজা খুলে টেরা মামুনের চেলা আবির । দরজা খুলে না তাকিয়েই বলে,
— ওই কে রে? এমনে দরজা বারি কেন দেছ?
— হ্যালো হ্যান্ডসাম। আই এম ইউর সুইটি ।
পুরুষালি সাথে হালকা নারী কন্ঠস্বর পেয়ে সামনে তাকায় আবির। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলিষ্ঠ দেহি এক নারী, ঠোঁট কেমন কামড়ে ধরে রেখেছে। চোখের পাপড়িগুলো শুধু পিটপিট করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এটা মেয়ে নাকি ছেলে বুঝতে পারল না আবির।
তবে টেরা মামুন তো তাকে দেখেই ফিদা। এ তো একদম বিদেশী নারী।
টেরা মামুন দৌড়ে এসে আবইয়াজের সামনে দাঁড়িয়ে লালসা চোখে তাকিয়ে বলল,
— কে তুমি সুন্দরী রুপসী ।
আবইয়াজ এবার মামুনের কাছে গিয়ে তার কপাল থেকে গাল পর্যন্ত স্লাইড করে বলে,
— আম ইউর সুইটি ডার্লিং ।
মনে মনে আবইয়াজের রুহ কিডনি গলে যাচ্ছে ।এ কোন পাল্লায় পড়ল সে ।
আবির মামুনের কানে কানে বলে,
— ভাই এডা বেডা নাকি বেডি?
মামুন আবিরের মাথায় চাটা মেরে কানে ফিসফিস করে বলে,
— আরে এইটা বিদেশী মাইয়া। ব্যায়াম করে তো তাই বডি এমন। আহ কি সুন্দরী দেখ রে আবির।
এবার আবির ও খুশিতে গদগদ হলো । দু জন আবইয়াজের হাত ধরে ভিতরে টেনে নিয়ে যায়। ভেতরে গিয়েই আবইয়াজ লক্ষ্য করে মেহুকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। মুখে টেপ মারা। ‘উউউউ’ ‘উউমম’ শব্দ করছে ।
আবইয়াজ নাটক করে মামুনের গলা জড়িয়ে বলে,
— বেইবি ও কে? এমন মাছের মতো নাড়াচাড়া করছে কেনো? হুয়ায়?
মামুন খুশি হয়ে আবইয়াজের পেট জড়িয়ে বলল,
— এই মাইয়া বেশি উড়ছিল তাই একবারে বন্দি করে দিছি।
আবইয়াজের পছন্দ হলো না মামুনের জড়িয়ে ধরা । সে পুরুষালি কন্ঠস্বরে ধমকে বলে,
— শালা সর। গায়ে হাত দিবি না।
টেরা মামুন থতমত খেয়ে বলে,
— কি??
আবইয়াজ বুঝতে পারে সে ভুল করে ফেলেছে। তাই আবারও মামুনের গলা জড়িয়ে বলল,
— বেইবি আমি কিছু বলি নি। ওই মেয়েটার মুখ খুলে দাও। আমার ওর শব্দ ভালো লাগছেনা।
অপরদিকে মুখ ঘুরিয়ে আবইয়াজ বিড়বিড়য়ে আওড়ায়,
— হালা টেরা।
মামুন ইশারা করতেই তার আরেক চেলা গিয়ে মেহুর মুখ খুলে দিল। মুখ খুলা পেয়েই মেহু রাগান্বিত স্বরে,
—শুধু মুখ কেনো খুলেছিস? সাহস থাকলে হাত একবার খুলে দে। তোদের যদি টিকটিকির ভর্তা বানিয়ে তেলাপোকার শর্বত না খাইয়েছি তাহলে আমার নাম মেহু না। শালা মিষ্টি কোমড়ার নাতি। বেগুন পচাঁ আলুর চপের গোষ্ঠী । হাত খুল আমার ।
মেহুর উদ্ভট কথায় থতমত খেয়ে গেলো উপস্থিত সকলে। আবইয়াজ মামুনের গলা আরেকটু জড়িয়ে বলল,
— বেইবি এই মেয়ে কি বলছে এসব । ওর হাত তুমি এখনই খুলে দিবে আমিও ওর সাহস দেখব।
টেরা মামুন আতঙ্কিত হয়ে বলল,
— না এই মেয়ে খুব জুড়ে মারে । ব্যাথা লাগে।
আবইয়াজ এবার মামুনের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
— বেইবি তুমি এতটুকু একটা মেয়েকে ভয় পাচ্ছো?
এদিকে আবইয়াজের ধাক্কা সামলাতে না পেরে মামুন মুখ থুবড়ে পরে গেলো ।
আবইয়াজ মুখ ভেংচি কেটে বলল,
— দাড়াও আমি নিজেই ওর হাত খুলে দিচ্ছি।
আবইয়াজ তাড়াহুড়ো করে মেহুর হাত খুলে দেয়। মুখে তার বিজয়ের হাসি । এদিকে হাত ছাড়া পেয়েই পাশে পরে থাকা মোটা লাঠিটা নিয়ে আবইয়াজকে মারতে আরম্ভ করে মেহু। মারতে মারতে মেহু বলে উঠে,
— অনেক বেইবি বেইবি করছিলি তাই না। আজকে তোর বেইবি তোর পেট দিয়ে বের করব ন্যাকা।
মারতে মারতে এক পর্যায়ে মেহু টেনে আবইয়াজের আলগা চুল খুলে ফেলে। ইতোমধ্যে আবইয়াজের বুক থেকে একটা বড় সাইজের কমলা নিচে পরে গিয়েছে।
আবইয়াজ আর না পেরে আর্তনাদ করে বলে,
— উইমা আর মারিস না। এটা আমি রে আমি । তোর হিটলার বড় আব্বুর একমাত্র, টসটসা, খাসা, হ্যান্ডসাম মাল । আই মিন ছেলে । ছেড়ে দে মা পালিয়ে বাঁচি।
মেহু এবার মার থামিয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় দাঁড়িয়ে পরলো । আবইয়াজ বহু কষ্টে মুখ থেকে কথা বের করে চিৎকার করে বলল,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৯
— আয় রে আমার টিমটিম দল
আয় রে আয় তোর ভাইকে মেহু
ডাইনি চিবিয়ে খায় ।
এতক্ষণ ধরে আবইয়াজের এটা শুনার জন্য বাহিরে দাঁড়িয়ে ছিল সবকটা । প্ল্যান ছিল আবইয়াজ সব কিছু ঠিকঠাক করে এটা বললেই তারা বুঝে যাবে আর তারা ভিতরে আক্রমণ করবে। কিন্তু কথা হলো আবইয়াজ মেহু ডাইনি এই লাইনটা কেনো বলল? এমন তো ছিল না ডায়ালগটা।
