খান সাহেব পর্ব ৬১
সুমাইয়া জাহান
“আর সি: দ্য ব্ল্যাক হেভেন”
একটা রহস্যময়, আধুনিক, উচ্চশ্রেণির ভিলা – মুম্বাই শহরের প্রিমিয়াম লোকেশন, মালাবার হিল-এ অবস্থিত। চারপাশে গাছপালা, পাহাড়ঘেরা ঢালু রাস্তা, আর নিচে দূরে দেখা যাচ্ছে আরব সাগরের ঢেউ। পুরো বাড়িটি যেন রায়য়ান চৌধুরী-এর ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। নীরব অথচ তীক্ষ্ণ, আধুনিক অথচ রুক্ষ, আলোকিত অথচ রহস্যময় ঘেরা বিশাল একটি লাক্সারিয়াস হাউজ। তিনতলা বিশিষ্ট এই ভিলাটি কাচ, কাঠ, ও পাথরের সংমিশ্রণে তৈরি – সাদা ও ধূসর রঙে আধুনিক স্টাইলের বিল্ডিং। রাতে সাদা এলইডি লাইটে আলোকিত এই বাড়ি বাইরে থেকে দেখে মনে হয় যেন কোনো বিলিয়নেয়ারের সিক্রেট মিশন হেডকোয়ার্টার। ঢালু রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে রায়য়ানের কালো স্পোর্টস অ্যাস্টন মার্টিন গাড়িটি।
বাইরের সিঁড়ি ও বেলকনি ঘেরা বিশাল কাচের দেয়ালগুলোয় ঝকমক করছে রাতের শহরের আলো। মূল দরজা স্লাইডিং কাচের, সিকিউরিটি ফিঙ্গারস্ক্যান দিয়ে খোলে। ভেতরে ঢুকলেই বিশাল ওপেন স্পেস – মার্বেল ফ্লোর, ছাদ থেকে নিচে ঝুলে থাকা আধুনিক ঝাড়বাতি। একদিকে কালো ও কাঠের সোফা, মধ্যবর্তী কাচের সেন্টার টেবিল, আর পেছনে লাইব্রেরি–গাঢ় বাদামি কাঠের বুকশেলফে বিদেশি দামী বই। সাউন্ডপ্রুফ গ্লাসে ঘেরা কনফারেন্স লাউঞ্জ। একদিকে বড় স্ক্রিন ও একাধিক মনিটর। সে এখানেই তার গোপন মাফিয়া প্ল্যান, বিজনেস লাইন, এবং নজরদারির কাজ করে। পেছনে সাদা-কালো ম্যাপ অফ ওয়ার্ল্ড— রায়য়ানের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের চিহ্ন। বেডরুমে বিশাল বিছানা, কালো শিট আর লেদার হেডবোর্ড। পাশে অটোমেটিক স্মার্ট কাচের জানালা— যার বাইরে সাগরের দৃশ্য দেখা যায় আর দূরে হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা যায়। আলাদা ওয়াক-ইন ক্লোজেট, যেখানে কেবল কালো, ধূসর, নেভি ব্লু, সাদা কালারের স্যুট ও কালেকশন। বাড়িটির পুরো ছাদ জুড়ে আছে কাচ ঘেরা জিম, ছিমছাম বার কাউন্টার, আর কোণায় একটি গোপন হেলিপ্যাড। রায়য়ান মাঝেমধ্যেই এখান থেকে হেলিকপ্টারে করেই গোপন মিটিং বা বিদেশে চলে যায়।
রাত একটা পেরিয়েছে।
আরব সাগরের ফিসফাস ঢেউ যেন দূর থেকে কোনো গোপন বার্তা দিচ্ছে। সাদা এলইডি লাইটে আলতো আলোয় ঝকমক করছে সি ভিলার মার্বেল ফ্লোর। ঝুলে থাকা ঝাড়বাতির আলোর নিচে বসে আছে রায়য়ান চৌধুরী। তার মুখে এক নিঃশব্দ তৃপ্তির ছায়া। আজকের দিনটা তার কাছে বিজয়ের। মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর রাজ্য আজ তার পায়ের নিচে নতজানু। কালো লেদার সোফার কোণে হেলান দিয়ে বসা রায়য়ান, ডান হাতে হুইস্কির গ্লাস, যার ভেতর বরফের টুকরো গলে গিয়ে পানীয়টিকে আরও গভীর করে তুলেছে। সে একবার চুমুক দিয়ে চোখ তুলে তাকাল সামনে রাখা স্ক্রিনে। সেখানে এক পেইজে চলছে লাইভ ফিড। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাহিন। কালো শার্ট, কানে ব্লুটুথ, যেখানে আপডেট আসছে রায়য়ানের ব্যবসা, অস্ত্রচুক্তি, সিক্রেট মিটিং আর আজকের অপারেশনের সফলতা নিয়ে।
“স্যার! আজকের ডিলটা কনফার্ম হয়ে গেছে। দুবাই থেকে কন্টেইনার রওনা দিয়েছে। কাল সন্ধ্যার মধ্যে পৌঁছে যাবে, সাসুন ডকে।”
রায়য়ান হেসে চুমুক দিল। অদ্ভুত এক হাসি— যার ভেতরে মিশে আছে দম্ভ, প্রশান্তি, আর এক পশলা বিষণ্নতা।
“আমার দুনিয়ায় যা কিছু আসে, সবই আমার নিয়মে চলবে। আর যা যাবে, সে চলে গেলেও তার স্মৃতিতে আমি বন্দী থাকব চিরকাল।”
আজ রায়য়ান থামছে না। সে একেরপর এক খেয়েই চলেছে।
“স্যার, আপনি এবার রেস্ট নেবেন? বারোটা থেকে তো আপনি একটানা…”
রায়য়ান হাত তুলে ইশারা দিল। চোখ বন্ধ করে হেলান দিল লেদার হেডরেস্টে।
“ঘুম? আজ নয়, মাহিন।”
মাহিন কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার অভ্যেস আছে এই নীরবতার। সে জানে, এই চুপ করে বসে থাকা মানুষটিই কাল হয়তো এক ইশারায় কাউকে সরিয়ে দেবে পৃথিবী থেকে, আবার সেই মানুষটাই রাতভর বসে থাকবে কারও ছায়া আঁকড়ে ধরে।
সাউন্ডপ্রুফ ভিলার ভেতরে নেমে এলো নিঃশব্দ রাজকীয়তা। রায়য়ান চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
“মাহিন!”
মাহিন সোজা হয়ে দাঁড়াল,
“জি, বস!”
“তুই কীভাবে খবর পেয়েছিলি?”
মাহিন একটু দ্বিধা করে বলল,
“বস, আমাদের লোক তো আগে থেকেই ওখানে নজর রাখত। আর সেদিন আপনি নিজেই গিয়েছিলেন। কিন্তু আপনার সময় হয়ে গিয়েছিল বলে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিলেন। তবে আমাদের লোক ছিল। আর তারাই খরবটা দেয়।”
রায়য়ান হালকা বাঁকা হেসে বলল,
“কখনও কখনও কিছু গল্প শুরু হয়, শেষ হওয়ার জন্য নয়— শুধু হৃদয়ে বেঁচে থাকার জন্য।”
সে শরীর দুলিয়ে হাসল। গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে আবারও চোখ বন্ধ করল। তার মন-মস্তিষ্কে একন অনেক কিছু চলছে, তবে সেগুলো অপ্রকাশিত।
রুমে শুয়ে আছে সুমু। এখনো অচেতন সে। অচেতন না বরং অচেতন করে রাখা হয়েছে তাকে। হয়ত ইনজেকশন, কিংবা কোনো ঘুমের ওষুধ দিয়ে। নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর একটাই শব্দ— ওর নিঃশ্বাস। হঠাৎই সুমুর চোখের পাতা নড়ে উঠল। হালকা করে হাত-পা নাড়িয়ে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল সে। রুমের নরম আলো তার চোখে লাগতেই চোখ ঢেকে ফেলল হাত দিয়ে। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে হাতটা সরিয়ে আবার তাকাল চারপাশে। চোখ বড় হয়ে গেল ওর। অপলকে তাকিয়ে রইল চারদিকে।
একটা বিলাসবহুল রুম। নরম সাদা কার্পেট, আরামদায়ক রাজকীয় বিছানা, চকচকে মার্বেলের মেঝে, সিলিং থেকে ঝুলে থাকা কাচের ঝাড়বাতি, দেয়ালে আধুনিক আর্ট আর একপাশে বড় কাচের জানালা—যেখান দিয়ে শহরের আলোয় ঝলমলে রাত দেখা যাচ্ছে। নিজেকে এই ঘরের ভেতরে দেখে বিস্ময়ে হা করে রইল সে। ঠিক তখনই দরজার হালকা শব্দ হলো। সুমু তাকাল সেদিকে। একজন মহিলা ঢুকল। বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে হবে। তার পরনে কালো আর সোনালি বর্ডারের কুর্তি। মুখে অদ্ভুত মায়া জড়ানো, হাতে একটা ট্রে— যেটাতে খাবার রাখা। মহিলাটি মৃদু হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো সুমুর দিকে। সুমুর ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আপনি কে? আর আমি কোথায়?”
মহিলা একটু ঝুঁকে নরম কণ্ঠে বললেন,
“তুমি জেগে উঠেছ, এই তো ভালো খবর। এখন চুপচাপ এগুলো খেয়ে নাও। অনেকক্ষণ না খেয়ে আছো।”
সুমু ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরে কোনো শক্তি নেই। মাথা ঘুরে উঠল তার। মহিলা দ্রুত ট্রেটা টেবিলে রেখে ওকে ধরে ফেলল।
“আহ্ না না, একদম উঠে বসো না এখন। তুমি খুব দুর্বল।”
“আমাকে এখানে কে এনেছে? এটা কোথায়?”
মহিলাটি শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দেব, তুমি আগে সুস্থ হও তারপর।”
সুমু ধোঁয়াশার চোখে তাকিয়ে রইল মহিলাটার দিকে। চেনা নয়, মুখটা একেবারেই অচেনা। কিন্তু কণ্ঠটা বড় অদ্ভুতভাবে শান্ত। সে একটু কাঁপা গলায় বলল,
“আপনি কে? আমি কোথায়? প্লিজ, বলুন।”
মহিলাটি পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“ভয় পেও না, প্রিন্সেস। তুমি এখন সুরক্ষিত জায়গায় আছো। তোমাকে এমন অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। ডাক্তার এসে দেখে গেছে, এখন অনেকটাই ঠিক আছো তুমি।”
“এসব আমার প্রশ্নের উত্তর নয়। কে আনলো আমাকে এখানে? আমি এখানে কেন? এটা কোথায়?”
মহিলাটি একটু হেসে বললেন,
“সময়মতো সব জানতে পারবে। আপাতত নিজের যত্ন নাও। কাল সকালে কেউ একজন তোমার সাথে দেখা করতে আসবে। তখন সব উত্তর পাবে তুমি।”
সুমুর চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট হলো। সে ধীরে ধীরে উঠে বসল, কিন্তু শরীরটা কেমন দুর্বল হয়ে পড়েছে। মহিলাটি এগিয়ে এসে তাকে বসতে সাহায্য করল। তিনি ট্রে থেকে এক বাটি স্যুপ তুলে ধরে বললেন,
“তোমার নাম সুমু, তাই না? খুব সুন্দর নাম। খাও, আমি তোমার পাশে বসে আছি।”
সুমু নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে। কাল কেউ দেখা করতে আসবে—এই কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জানে না কে, কেন, কী উদ্দেশ্যে। কিন্তু বুকের ভেতর একটা অজানা কাঁপুনি কাজ করছে। সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে? আপনি আমাকে চিনেন?”
মহিলাটি থতমত খেয়ে বললেন,
“তোমার ডকুমেন্টের মধ্যে তোমার নাম দেখেছি, সেখান থেকেই জেনেছি।”
সুমু আর কিছু বলল না। সে আপাতত শান্ত থাকার চেষ্টা করল। অপেক্ষা করল কাল সকালের। অন্যপ্রান্তে, একটা সিক্রেট রুমে মনিটরে চোখ রেখেছে একজন লোক। চোখে গভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। সে ফিসফিস করে বলল,
“ওয়েলকাম মিসেস খান। ওপস সরি! শুধু সুমাইয়া জাহান ওরফে সুমু।”
নরম সকালের আলো জানালার পর্দা পেরিয়ে ঘরের ভিতর ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও যেন একটা শান্ত অথচ অভিজাত পরিবেশ। রুমের কোণায় রাখা ডিফিউজার থেকে ভেসে আসছে হালকা ল্যাভেন্ডার গন্ধ। সুমু ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। এখনো তার শরীরে কিছুটা দুর্বলতা। সে উঠে বসল না, শুধু চোখে-মুখে আশ্চর্যের ছাপ নিয়ে চারপাশটা দেখছে।
ঠিক তখনই দরজাটা খোলার শব্দ হলো। কাল রাতের মহিলাটি ভেতরে ঢুকলেন, তবে এবার তার সঙ্গে আরও একজন মেয়ে এসেছে। মেয়েটির বয়স সুমুর বয়সের কাছাকাছি। গায়ের রং ফর্সা, সিল্কি লম্বা কোমর সমান খোলা চুল, গোলাপি ঠোঁট, টানা গভীর মায়াবী চোখ— মেয়েটি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। তার পরনে বেবি পিংক লং গাউন, গলায় ছোট্ট হিরের পেন্ডেন্ট ঝলমল করছে।
মেয়েটি ঘরে ঢুকে প্রথমেই থমকে গেল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল বেডে শুয়ে থাকা সুমুর উপর। সুমুর চোখের গভীরতা, সৌন্দর্য, কোমল মুখভঙ্গি— যেন কোনো রূপকথা থেকে উঠে আসা এক রাজকন্যা। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। তার মুখে স্পষ্ট বিস্ময়।
“এত সুন্দর!” মনে মনে বলে উঠল সে। তবে মেয়েটির সেই বিস্ময়ের নিচে লুকিয়ে থাকা অন্য এক অনুভূতি ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দেয় হালকা ঈর্ষা। এই মেয়েটি, যে চুপচাপ বিছানায় বসে আছে, অর্ধ-বিস্মৃত চাহনিতে তাকিয়ে আছে, কোনো সাজগোজ ছাড়াই এতটা মোহময়। তাকে দেখে মেয়েটির নিজের সাজানো সৌন্দর্যই নিজের কাছে কিছুটা মলিন ঠেকল। সে মুখে কিছু না বললেও, চোখে স্পষ্ট লেগে রইল সেই দ্বন্দ্ব। ভেতরে ভেতরে সে স্বীকার করে নিল, সুমু তার চেয়েও বেশি সুন্দরী।
মহিলাটি নরম স্বরে বললেন,
“এই যে প্রিন্সেস, উঠে পড়েছে? দেখো কে এসেছে। ওর নাম আলিশা। আমার একমাত্র মেয়ে।”
আলিশা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। মুখে মিষ্টি হাসি, তবে চোখের ভিতর এখনও বিস্ময় আর সূক্ষ্ম এক ঈর্ষার রেখা লুকানো।
“হাই!”
সুমু তাকাল মেয়েটির দিকে। সুমুর গভীর চোখে চোখ পড়তেই খানিকটা দ্বিধা পড়ে গেল মেয়েটি। তবুও সে মিষ্টি হেসে বলল,
“আমি আলিশা। এখানেই থাকি। তোমাকে দেখতে এলাম।”
সুমু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল মেয়েটার চোখে। সে খুব আস্তে বলল,
“ধন্যবাদ! কিন্তু এখানে থাকেন মানে? এটা আপনাদের বাড়ি নয়?”
“না! আমরা এখানে আশ্রিত বলতে পারো। এই বাড়িটা যার, তিনি এখানে থাকেন না। তাই তার অনুপস্থিতিতে আমরা এই বাড়িটির দেখাশোনা করি।”
আলিশা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল বিছানার পাশে। তার মুখে হাসি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছে। সে মনে মনে বলল,
“এই মেয়েটার মুখে কোনো কৃত্রিমতা নেই, চোখে একরকম স্বচ্ছতা আছে। এমন কী আছে ওর মধ্যে? এতো স্নিগ্ধ অথচ এতো গভীর কেন মেয়েটি। আমি এতো সাজি, এতো চেষ্টা করি পারফেক্ট থাকতে, তবুও এই মেয়েটা শুধু চোখ মেলে তাকিয়েই দৃষ্টি কাড়ছে।”
পাশ থেকে মহিলাটি তখন আবার বললেন,
“আলিশা তোমার পাশে থাকবে আজ কিছুক্ষণ। তুমি চাইলে ওর সঙ্গে কথা বলতে পারো। আর তোমার যা প্রয়োজন সবটাই ও দেখবে।”
সুমু ধীরে বলল,
“আপনাদের এতো যত্নে আমি সত্যি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আপনারা এখনো বললেন না, আমি এখানে কেন? কে আনলো আমাকে এখানে?”
মহিলাটি একবার আলিশার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নেড়ে বললেন,
“সব জানতে পারবে, সুমু। তবে এখন তোমার আরেকটু বিশ্রাম দরকার। সময় হলে, সব জানবে। আমি এখন যাই, আমার নিচে অনেক কাজ পরে আছে।”
কথাগুলো বলে মহিলাটি রুম ত্যাগ করলেন। রুমে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। আলিশা তাকিয়ে রইল সুমুর মুখের দিকে। মনের ভেতর এক বিষণ্ন হাহাকার বেজে উঠল তার। সে মনে মনে বলল,
“ও যদি এখানে থেকে যায়, তাহলে…”, সে হঠাৎ সে বলে ফেলল, “তুমি খুব সুন্দর, জানো?”
সুমু একটু অবাক হয়ে তাকাল। ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
“আপনি নিজেও কম সুন্দর নন। কিন্তু আপনি কী জানেন, আমাকে এখানে কে এনেছে?”
আলিশা আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ, জানি তো! তবে আমরা তো সমবয়সী হবো। তুমি আমাকে তুমি করে সম্মোধন করো।”
সুমু উতলা হয়ে বলল,
“কে এনেছে আমাকে এখানে? প্লিজ, বলুন।”
“এই বাড়ির মালিক!”
“এই বাড়ির মালিক? তিনি কে? নাম কি তার?”
“জানতে পারবে তুমি। আমাদের এর থেকে বেশি কিছু বলার অনুমতি নেই।”
সুমু কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে আলিশার দিকে তাকিয়ে রইল। সে ধীরে চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। সকালের আলোটা তখনো জানালার কাচে লেগে ঝিলমিল করছে, কিন্তু সুমুর মনজুড়ে নামতে শুরু করেছে এক অজানা অন্ধকার। সে মৃদুস্বরে বলল,
“এই বাড়ির মালিক কে? আমি তো তার কোনো ক্ষতি করিনি, তাহলে আমাকে কেন এখানে আনা হলো?”
আলিশা এবার আর কিছু বলল না। হঠাৎ তার মুখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা চলে এলো। সে চেয়ার থেকে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। চোখ নামিয়ে নিচু গলায় বলল,
“তোমাকে এখানে আনা হয়েছে, কারণ তুমি হয়ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সুমু হতবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“গুরুত্বপূর্ণ? কার জন্য? কেনো? আমি তো কিছুই জানি না।”
আলিশা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের লম্বা চুলে আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। হঠাৎ সে ঘুরে দাঁড়াল। চোখের গভীর দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“তুমি যদি জানতে, যে কেউ একজন তোমাকে রাতের এখানে অন্ধকারে তুলে এনেছে, শুধু নিজের পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার জন্য। তখন কেমন লাগবে তোমার?”
সুমু উত্তরের আশায় তাকিয়ে রইল আলিশার দিকে। আলিশা ধীরে ধীরে বিছানার দিকে ফিরে এলো। এবার তার চোখে ঈর্ষা নয়, বরং একধরনের দমিয়ে রাখা কষ্টের ছায়া। সে নিচু গলায় বলল,
“এই বাড়ির মালিক কখনো কাউকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু তোমাকে দিয়েছে। তোমার জন্য বিশেষ ঘর, বিশেষ সুরক্ষা, এমনকি আমি… আমি তার কোনোদিন এতটা মনোযোগ পাইনি, যতটা তুমি পাচ্ছো। তুমি জানো, তোমার জন্য রূপকথার রাজকন্যাদের মতো করে একা ঘর সাজানো হয়েছে।”
সুমু ধীরে বলল,
“কিন্তু আমি তো এসব কিছু চাইনি। আমি তো জানিও না সে কে।”
আলিশা হেসে উঠল। তার সেই হাসি তিক্ততায় ভরা।
“সবাই চায় না, তবুও পায়। আর কেউ কেউ সব চেয়েও, কিছু পায় না”, সে গম্ভীর হয়ে বলল, “দশটার দিকে তোমার দেখা হবে তার সঙ্গে। তখন বুঝবে, তুমি কেন এখানে। সে সবটা খুলে বলবে তোমাকে। আর ওইসব গুরুত্ব পাবার কথা, ওসব আমি শুধু মজা করে বলেছি। তুমি কিছু মনে কোরো না। যে তোমাকে এখানে এনেছে, সে নাকি তোমাকে রাস্তায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছে। আর তুমি তো একা মেয়ে। ওতো রাতে একটা মেয়েকে তো রাস্তায় একা ফেলে আসতে তো পারেনা। তাই তোমাকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। তাছাড়া তোমাকে এতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে. কারণ তুমি এখানের গেস্ট।”
সুমু আর কিছু বলল না। বলতে ইচ্ছাও করল না তার। তার মাথায় এখন নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। আলিশা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে বলল,
“চলো, তোমাকে যে রুমটা দেওয়া হয়েছে, সেখানে নিয়ে যাই। ওই ঘরের সঙ্গে লাগোয়া একটা বেলকনি আছে। সেখান থেকে অনেক সুন্দর প্রকৃতি দেখা যায়। আমি তোমার খাবারটাও ওই রুমেই নিয়ে যাচ্ছি, চলো।”
সুমু মাথা নেড়ে বলল,
“এখানেই ভালো লাগছে আপাতত। কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না।”
আলিশা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে এলো। তার চোখে ক্লান্তি আর দুঃখের ছাপ। সে নিচু গলায় বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে! তবে রুমটা দেখলে হয়তো ভালো লাগবে তোমার।”
সুমু হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে আনমনে বলল,
“আমি আমার সব ভালো লাগা, সুখ, শান্তি, ভালো থাকার কারণ, আমার খুশি ছেড়ে এসেছি। এখন দুনিয়ার কোনো সুখ আর আমাকে সুখী করতে পারবে না।”
আলিশা কৌতূহল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
“মানে?”
সুমুর ধ্যান ভাঙল। সে জোরপূর্বক হেসে বলল,
“না, কিছুনা!”
“তাহলে চলো, সুমু।”
সুমু কিছু বলার আগেই আলিশা তার হাতটা আলতো করে ধরল। সুমু চমকে তাকাল মেয়েটার দিকে। তার চোখে রাগের এক ক্ষণিক ঝিলিক দেখা গেল। আলিশা আঁতকে ওঠে দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে গলা কাঁপা গলায় বলল,
“সরি! আমি আসলে…”
মেয়েটা থেমে গেল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল অপরাধীর মতো। সুমু নিজের আবেগ সামলালো। একটু দম নিয়ে নিজের মধ্যে কৃত্রিম এক কোমলতা এনে মৃদু হেসে বলল,
“ইটস ওকে! কিছু হয়নি।”
আলিশা চোখ তুলে তাকাল সুমুর দিকে। চোখের কোনায় এক বিন্দু লজ্জার অশ্রু চিকচিক করে উঠল। সে কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইল। সুমু এবার নিজে থেকেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“চলো!”
আলিশা চমকে তাকাল তার দিকে। কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হালকা মাথা নাড়ল। দুজন ধীরে ধীরে রুমটির দরজার দিকে এগিয়ে গেল। রুমের দরজাটা খুলতেই করিডোরের নরম আলো এসে পড়ল সুমুর মুখে। তার মুখে ধরা পড়ল এক অদ্ভুত চিন্তার ছাপ। চোখে ধীরে গাঢ় হলো এক দ্বিধার রেখা, তবুও সে এগিয়ে গেল।
দুজন ধীরে ধীরে করিডর ধরে হাঁটছে। বাড়িটা খুব নীরব, যেন সময় এখানে একটু ধীর হয়ে গেছে। সুমুর চোখ ধীরে ধীরে চারপাশ ঘুরে বেরালো। তার মনে হলো, এই বাড়ির প্রতিটি কোণে কিছু না কিছু লুকিয়ে আছে। আলিশা মাঝে মাঝে সুমুর দিকে তাকাচ্ছে। সে কিছু বলতে চাইছে, আবার থেমে যাচ্ছে। হঠাৎ সে বলল,
“এই যে, এই ঘরটাই তোমার জন্য ঠিক করা হয়েছে।”
সে সামনে থাকা একটি রাজকীয় দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজার গায়ে হাতের ছোঁয়ায় খুলে যায় ওটা। একটা নরম কোমল আলো ভেসে এলো ভেতর থেকে। সুমু চুপচাপ ঘরের ভেতর পা রাখল। তার চোখ ধীরে ধীরে খাপ খায় সেই ঘরের ভিতরের সৌন্দর্যে। ঘরটা যেন কোনো রূপকথার রাজকন্যার জন্যই বানানো। সুমু অবাক হয়ে তাকাল। একটি রঙিন, স্বপ্নময় এবং রাজকন্যা থিমযুক্ত বাচ্চাদের বেডরুম। ঘরটির মূল আকর্ষণ হলো ছাদটি, যেখানে অসংখ্য ছোট ছোট গোলাপি আলো দিয়ে তারাভরা আকাশের মতো তৈরি করা হয়েছে, আর তার সঙ্গে আছে কিছু উজ্জ্বল শুটিং স্টার টাইপের আলো। পুরো আলোটি এলইডি লাইটের সাহায্যে করা। রুমটির পিছনের দেয়ালে একটি রাজপ্রাসাদের ডিজাইন আঁকা, যেখানে মিনার ও গোলাপি-পার্পেল আলোয় আলোকিত রাজকীয় থিম ফুটে উঠেছে। একটি বড় প্রজাপতি ওয়ালে ঝুলে আছে যা ঘরটির ফ্যান্টাসি ভাইব বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিছানার ওপর হালকা গোলাপি চাদর ও পিলো, একটি বড় পার্পেল রঙের টেডি বিয়ার আর মাথার দিকে একটি সুন্দর নেট-ক্যানোপি ঝুলানো, যেন রাজকন্যার ঘুমের জায়গা। বিছানার পাশে আছে ছোট সাইড টেবিল, যার ওপর বড় বড় টেডি বিয়ার রাখা। মেঝেতে একটি কার্পেট বিছানো, যেটি বিভিন্ন রঙে ডিজাইন করা। বাম পাশে ওয়ালজুড়ে সাদা কালার ওয়্যারড্রোব রাখা। তার ওপর হার্ট শেপ নিখুঁত সুন্দর ডিজাইন করা। পুরো হার্ট শেপটি এলইডি লাইট দিয়ে ডিজাইন করা। যার হ্যান্ডেলগুলো সোনালি রঙের। পুরো ঘরটি গোলাপি, পার্পেল ও হালকা নীল মিশ্রণে একটি কল্পনার জগৎ তৈরি করেছে। রুমটির ডান দিকে দেয়ালে একটি প্রাসাদের মত পেইন্টিং ও ক্যানোপি লাগানো আছে, যার মাথায় মুকুটের ডিজাইন, যেন এটি সত্যিই কোনো রাজপ্রাসাদের অংশ। ডানপাশের বিছানার সামনে আছে একটি বড় সাদা প্লাশ ডল রাখা। ডান পাশে মেঝেতে একটি আরামদায়ক সাদা ক্লাউড-শেপ চেয়ারের মতো বসার জায়গা আছে। দু’টি সাইড টেবিল আছে, যার উপর বড় বড় ডল রাখা। একপাশে একটা বড় জানালা। জানালা দিয়ে আসা বাতাসে হালকা পর্দা দুলছে। বেলকনির দরজা খোলা, আর সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য।
সুমু চুপচাপ তাকিয়ে রইল সবকিছুর দিকে। আলিশা হালকা গলায় বলল,
“এই ঘরটা আমার কেউ কখনও ব্যবহার করেনি। এই প্রথমবার কারো জন্য এই ঘরটা এভাবে সাজানো হয়েছে।”
সুমু মৃদু গলায় বলল,
“অসাধারণ! কিন্তু আমার জন্য কেনো?”
আলিশা হেসে ফেলল, সেই হাসিতে মিশে রয়েছে কিছু না বলা দুঃখ।
“তোমার সেই প্রশ্নের উত্তর আজ দশটার পর হয়ত তুমি নিজেই পাবে”, এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে আবারও বলল, “আমি এখন যাই। তোমার খাবার কিছুক্ষণ পরেই পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর কিছু দরকার হলে টেলিকমে কল করো।”
সে ঘুরে চলে যেতে যেতে থেমে গেল দরজার কাছে। একবার ফিরে তাকাল। সুমু তখনো বেলকনির দিকে তাকিয়ে। পেছন ফিরে না তাকিয়েই সুমু বল,
“তুমি বলেছিলে, দশটায় সে আসবে?”
“হ্যাঁ, ঠিক দশটা!”
“ভালো! আমিও দেখতে চাই কে সেই মহান ব্যক্তি।”
সুমু ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে এখন আর আগের মতো ক্লান্তি নেই, বরং আছে এক নতুন প্রস্তুতির ছাপ। আলিশা হালকা মাথা নেড়ে চলে গেল। ঘরের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরজুড়ে নেমে এলো এক নিঃশব্দ অপেক্ষা। সুমু জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই কথা ভাবে, ‘এসব কি কারও কোনো প্লান।’
নিঃশব্দ অপেক্ষার মধ্য দিয়ে সময় গড়িয়ে যায়। সুমু এখনো বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। সে এখানো কিছু মুখে তুলেনি। ঘড়ির কাটায় সময় নয়টা উনষাট। দরজায় হালকা কড়া নাড়ার শব্দ। সুমু চমকে উঠল। সে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভয় নিয়ে সে দরজার হাতলে হাত রাখল। হালকা ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে এক লম্বা, অভিজাত চেহারার পুরুষ। পরনে হালকা অফ-হোয়াইট শার্ট, স্লিভ রোল করে রাখা, নিচে স্লিমফিট ট্রাউজার। চোখে এক ধরণের আত্মবিশ্বাস আর নরম অভিব্যক্তি, কিন্তু ঠোঁটে চাপা একটা গম্ভীরতা। সুমু তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে। লোকটির হেয়ারস্টাইল ‘কুইফ’ কাটের আধুনিক রূপ। সামনের দিকের চুলগুলো উঁচু করে পিছনের দিকে ব্রাশ করে রাখা। ঘন চুলগুলোতে ভলিউম এবং লেয়ারিং দেওয়া। সামনের কিছু চুলে হালকা প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড হাইলাইট করা, সাইডের চুলগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও পুরোপুরি ফেইড করা না। তার চোখ দুটি গাঢ় বাদামী, আকৃতিতে তুলনামূলকভাবে ছোট, এবং সামান্য নিচের দিকে টানা। ভ্রু’গুলো ঘন এবং ছিমছাম। নাক সোজা এবং মাঝারী আকৃতির। ঠোঁটজোড়া পাতলা, যার ওপরের প্রান্তে একটি সূক্ষ্ম বাঁক রয়েছে। চোয়াল শার্প এবং ডিফাইনড। হালকা গোঁফ ও দাড়ি আছে— সব মিলিয়ে ক্লাসিক হ্যান্ডসাম লুক। তার স্কিন টোন ফর্সা এবং একেবারে পরিষ্কার। কোনো দাগছোপ নেই। নিঃসন্দেহে, তাকে এক কথায় সুদর্শন পুরুষ বলা চলে। লোকটি হালকা হেসে বলল,
“কেমন লাগলো রুমটা?”
সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সেসব পরে হবে, আগে বলুন আপনি কে?”
লোকটি এক পা ভেতরে এগিয়ে এসে বলল,
“আমি রায়য়ান চৌধুরী। এই বাড়িটা আমার। আর আমরা এখন ইন্ডিয়াতে।”
সুমু চোখ সরু করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটা তার কর্ণপাত হতেই সে রেগে গিয়ে বলল,
“সে আপনি রায়য়ান চৌধুরী বা রাশিয়ান চৌধুরী হন না কেনো, তাতে আমার কী? ইন্ডিয়াতে মানে কী? আমি আপনাকে চিনি না। আপনি আমাকে এখানে কেনো এনেছেন?”
রায়য়ান এক মুহূর্ত চুপ রইল। সে শান্ত গলায় বলল,
“আপনাকে আমি রাস্তায় অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিলাম। একদম নিঃসাড় হয়ে পড়েছিলেন। আমি এয়ারপোর্ট যাচ্ছিলাম, তখন আপনাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি। ওতো রাতে একা একটা মেয়েকে রাস্তায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে আমি ফেলে আসতে পারিনি। আর এদিকে আমারও ইন্ডিয়াতে আসাটা জরুরী ছিল। আপনাকে ওতো রাতে কোথায় রেখে আসব। তাই আপনাকে সাথে নিয়ে এসেছি।”
সুমুর চোখে মুহূর্তেই ক্ষোভ জমে উঠল।
“আপনি আমাকে চিনেন না, আমি আপনাকে চিনিনা। আমি মরে পরে থাকতাম, তাও ভালো ছিল। আপনাকে কে বলেছে আমাকে এখানে নিয়ে আসতে?”
“আমি কেবল একজন মানুষ হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকে কাজটা করেছি। নারীদের প্রতি আমার সম্মান আছে। এই বাড়িতে শুধু আমি না, আরও দুজন নারী আছেন। আর আপনি বলুন, ওই অবস্থায় আমার কী আপনাকে ফেলে রেখে আসা উচিত ছিল?”
সুমু দু’ধাপ পেছনে সরে গিয়ে বলল,
“আপনি ভাবলেন আমাকে না জানিয়ে একটা অচেনা দেশে রেখে দিলেই আপনি আমার চোখে মহান হয়ে যাবেন?”
রায়য়ান শান্তভাবে বলল,
“অচেনা দেশ তাতে কি হয়েছে? এই বাড়িতে আরও দুজন নারী আছে। তারা আমার রক্তের না তবুও আপন। আর এই বাড়িতে সার্ভেন্টের অভাব নেই। সকলে এখানে সুরক্ষিত। আর আপনি জানেন, আপনার জন্য আমার ফ্লাইট মিস হয়ে গেছে। আপনার অবস্থা ভালো ছিল না। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মতো করে প্রাইভেট জেটে করে নিয়ে এসে এই বাড়িতে রাখি, যাতে আপনি বিশ্রাম পান, সুস্থ হন। এখন আপনি আমাকে দোষ দিচ্ছেন?”
সুমু এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে রেগে গিয়ে বলল,
“ফ্লাইট আপনি নিজেই মিস করেছেন, তো আমাকে বাঁচাতে কে বলেছিল আপনাকে? কেউ জানে না আমি কোথায় আছি, কী অবস্থায় আছি। একটা সম্পূর্ণ অচেনা দেশে, অচেনা লোকের বাড়িতে। এখানে নিজেকে বন্দি মনে হচ্ছে আমার।”
রায়য়ান একটু কণ্ঠ উঁচু করে বলল,
“আমি আপনাকে বন্দী করিনি। দরজার তালা নেই, আপনি যেতে চাইলে যেতে পারেন। শুধু এইটুকু মনে রাখবেন, আপনি যখন চোখ খুলেছিলেন, তখন আপনার কষ্ট হচ্ছিল। জ্ঞান হারাচ্ছিলেন বারবার। আমি আপনাকে হাসপাতালে নিতে পারতাম। কিন্তু তখন যেভাবে চলছিল, আপনার লাইফ নিরাপদ ছিল না। আপনি কী জানেন, কে বা কারা আপনাকে ঐ অবস্থায় ফেলে রেখে গিয়েছিল?”
“আপনি কে? আমার এই সব ব্যক্তিগত বিষয়ে মাথা ঘামানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
রায়য়ান ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আমি জানি না, আপনি কে। কিন্তু আপনি যদি চান, আমি আপনাকে কাল সকালেই রওনা করিয়ে দেব। যেখানে আপনি যেতে চান, চলে যাবেন। তবে আমি আপনার বিপদ দেখে চুপ করে থাকতে পারতাম না। আমি দুঃখিত, যদি আপনার এতে কোনো অসুবিধা হয়ে থাকে।”
সুমু কয়েক মুহূর্ত থেমে গেল। তার মধ্যে বিভ্রান্তি, অপরাধবোধ, কিন্তু সঙ্গে রাগও রয়ে গেল।
“আমি এখনই চলে যাব। কারো দয়া নিয়ে আমি বাঁচতে চাই না।”
সে পেছন ঘুরে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল। রায়য়ান গম্ভীর গলায় বলল,
“যাবেন? এই অবস্থায় কোথায় যাবেন আপনি? এখানকার কাউকে চেনেন? রিয়াল, ফোন, কিছু আছে আপনার কাছে। কোথায় যাবেন?”
সুমু দাঁড়িয়ে পড়ল। দরজার দিকে মুখ করা, কিন্তু চোখ বন্ধ করে রেখেছে। রায়য়ান আরও নরম কন্ঠে বলল,
“আপনার যদি মনে হয় আমি আপনাকে কষ্ট দিয়েছি, তবে আমি দুঃখিত। কিন্তু এখন অন্তত নিজেকে সামলান। আপনি অনেক দুর্বল, শারীরিকভাবেও, মানসিকভাবেও।”
সুমু কিছু বলল না। সে নিজেকে শক্ত করে রেখেছে। বুকের ভেতর হিম হয়ে থাকা ক্ষোভ, ভয় আর অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে গলতে থাকল তার। তবে সে সেটা কিছুতেই সেটা প্রকাশ করতে চায় না। রায়য়ান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আপনার যা ভালো লাগে, তাই করুন। দরজা খোলা। আমি বাধা দেব না। তবে এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে অন্তত নিজের শরীরটা ঠিক করে নিন। আপনি এখন ঠিকভাবে হাঁটতেও পারছেন না।”
সুমু তবুও কিছু বলল না। রায়য়ান একটু সময় নিয়ে আবারও বলল,
“আপনি বললেন, আপনার কারও দয়া চাইনা। তাহলে, আপনি বলুন কোথায় যাবেন? আমি আপনাকে পৌঁছে দেব।”
সুমুর মাথায় ভাবনা এলো, ‘ সত্যি তো এখন সে কোথায় যাবে? বাংলাদেশে? না সে এখন কিছুইতে বাংলাদেশে ফিরতে পারবে না। তাহলে কোথায় যাবে সে?”
সুমুর ভাবনার মাঝে রায়য়ান আবারও বলল,
“বলুন কোথায় যেতে চান? আপনি কী ওমান ফিরে যাবেন? তাহলে, আমি জেট রেডি করছি। আমার লোকেরা আপনাকে ওমান ফিরিয়ে দিয়ে আসবে।”
“না! আমি ওমানে ফিরতে চাই না।”
“তাহলে, কোথায় যাবেন?”
“জানিনা! শুধু জানি? কারো দয়া নিয়ে বাঁচতে চাইনা। আমি নিজে কিছু করতে চাই।”
“আপনার প্রচন্ড আত্মসম্মান।”
“থাকাটা স্বাভাবিক নয় কি?”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি যেহেতু কোথায় যাবেন, জানে না। তাহলে আপনি আমার এখানেই থাকুন।”
“কিন্তু…”
“আহ! আগে আমাকে পুরোটা শেষ করতে দিন।”
সুমু চুপ করে গেল। রায়য়ান মৃদু হেসে বলল,
“আপনাকে কারো দয়ায় বাঁচতে হবেনা। আপনি যেহেতু বললেন, আপনি নিজে কিছু করতে চান, তাহলে তাই করুন। কিন্তু এই মুহুর্তে আপনি একা কিছু করতে পারবেন না। আপনাকে অবশ্যই কারো না কারো হেল্প নিতে হবে। তাই বলছি, আপনি আমাকে আপনার বন্ধু ভেবে আপাতত আমার সাহায্য নিতে পারেন। পরে যখন নিজে বড় কিছু করে ফেলবেন, তখন না হয় আমার সাহায্য আমাকে শোধ করে দিলেন। এভাবে করলে আপনি নিজেও কিছু করতে পারবেন, আর আপনাকে কারো দয়ায় বাঁচতেও হলো না।”
বাতাসে মৃদু ল্যাভেন্ডার ঘ্রাণ ভেসে এলো, কিন্তু তা সুমুর ভিতরের ঝড়কে শান্ত করতে পারল না। সুমু ধীরে বলল,
“কিন্তু আপনি আমাকে কেনো সাহায্য করতে চাইছেন?”
“ওই যে বললাম, বন্ধু ভাবতে পারেন। আপনার বন্ধু ভাবতে সমস্যা হলে, শুভাকাঙ্ক্ষী ভাবতে পারেন।”
“কিন্তু, আমি এতো সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারিনা।”
“এছাড়া আর কোনো উপায় আছে আপনার কাছে? আর, তাছাড়া ওমান শহরের রাস্তা থেকে আপনাকে ইন্ডিয়াতে এনেছি। আপনার ক্ষতি করার ইচ্ছা থাকলে, আরও আগেই করতে পারতাম।”
রায়য়ানের কথাগুলো শুনে সুমু চুপ করে রইল। তার মনের ভেতরে এখনো লড়াই চলছে। ‘বিশ্বাস করবে কিনা, এখানে থাকবে কিনা, সাহায্য নেবে কিনা।’ কিন্তু যতই সে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে, ততই যেন মন ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। রায়য়ান একটু অপেক্ষা করে বলল,
“আপনি এখন কথা না বললেও চলবে। ভাবার জন্য সময় নিন। আমি আপনাকে কোনো কিছুতে বাধ্য করছি না। শুধু এটুকু চাইছি, নিজেকে আরও একটু সময় দিন। এই বাড়িতে কেউ আপনাকে প্রশ্ন করবে না, তাড়া দেবে না। আপনি সম্পূর্ণ স্বাধীন।”
শেষ কথাগুলো যেন অচেনা কোমলতার মতো এসে ধাক্কা দিল সুমুর কঠিন আবরণে। সে কিছু না বলে একটু পাশ ফিরে দাঁড়াল, যেন নিজের ভেতরের যন্ত্রণাটা লুকাতে চাইছে। রায়য়ান আর কিছু না বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছাকাছি পৌঁছে সে একটু থেমে পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
“টেক ইওর টাইম। আর হ্যাঁ, আপনি এখানে থাকলে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টই পাবেন। আর এই বিষয়টা নিয়ে আপনি কোনো বাধা দিতে পারবেন না। এই রুমটা আপনার। এই রুমে ব্রেকফাস্ট পাঠানো হয়েছে, খেয়ে নিন। যদি একা একা খেতে ভালো না লাগে, নিচে আসতে পারেন।”
সে চলে গেল। ঘরজুড়ে আবারও নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সুমু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ বাদে সে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ করেনি রায়য়ান। সে একবার করিডরে তাকাল— কেউ নেই। সুমু নিচে নামার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু একটা অস্বস্তি তাকে আবারও রুমে ফিরিয়ে আনলো।
শেরাজ একটা রুমে একা বসে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো পড়ে আছে তার পাশে রাখা কফি মাগের ওপর, যেটা ছুঁয়েও দেখেনি সে। হঠাৎ রুমের দরজা ধাক্কায় খুলে গেল। ভেতরে একে একে ঢুকে পড়ল আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন আর রিসান। সবার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে উঠল শেরাজের। ঠাণ্ডা গলায় সে বলল,
“অফিস নেই তোদের?”
আইয়ুব গলা চড়িয়ে বলল,
“প্রবলেম কি তোর? ভাবিজিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আর তুই এখানে ঠাণ্ডা মাথায় বসে অফিস ক্যালকুলেশন দেখছিস?”
শেরাজ চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“তো কী করব? ও নিজের ইচ্ছেতে চলে গেছে। আমি কি তার ওপর প্যারোল দিয়েছিলাম?”
সারবাজ গর্জে ওঠে বলল,
“তুই সিরিয়াসলি বলছিস এই কথা?”
শেরাজ চেয়ারে হেলে পড়ল। ঠোঁটে ঠাণ্ডা এক তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেল তার।
“হ্যাঁ, বলছি! ওর জন্য তো আর আমার বিজনেস বন্ধ রাখতে পারব না। তোরা চাইলে ইনায়ার কাছে রিজাইন দিয়ে দে। আমি নিউ লোক হায়ার করব। কেউ চলে গেলে জীবন থেমে থাকে না। একজন সিক্রেট মাফিয়া আর একজন বিজনেসম্যান— এই দুই পরিচয়ের নিচে আবেগ কাজ করে না। আমাদের মতো মানুষের কাছে টাকাটাই সব।”
নিহাল ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“তুই শুধু সিক্রেট মাফিয়া আর বিজনেসম্যান না এস.কে। তুই এ কজন হাজব্যান্ডও। আর আমাদের বন্ধু। আমরা সবাই ভাবিজিকে চোখে হারাই। সে হারিয়ে গেছে বলে আমরা খুঁজে বেরাচ্ছি। তাহলে, তুই কী করে এতটা নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছিস?”
শেরাজ রাগে গর্জে উঠে বলল,
“কারও চেহারায় কিছু লেখা থাকে না। মেয়েরা সুন্দর হয়, রহস্যময় হয়, আবার বিশ্বাসঘাতকও হয়। ও গেছে ভালো করেছে।”
অমিত নিচু গলায় বলল,
“ভুল করছিস, এস.কে। এইরকম কথা বলার লোক তুই না। তুই তো ভাবিজিকে চোখে চোখে রাখতিস।”
শেরাজ থমকে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলল। আবার চোখ মেলে তাকিয়ে বলল,
“চোখে চোখে রাখতাম বলেই হয়ত আজ চোখের আড়ালে চলে গেছে।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শেরাজের ঠাণ্ডা অথচ তীক্ষ্ণ কথায় যেন সবার মুখে তালা পড়ে গেল। কেউ কিছু বলতে পারল না। নীরবতায় ছুঁয়ে গেল রুমের প্রতিটা কোণ। শুধু হৃদয়ের ধুকপুকানি টের পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ দরজা খুলে রুমে ঢুকে পড়ল স্যান্ডি। তার মুখে সদা চেনা পেশাদার হাসি।
“স্যার, সব রেডি!”
সবার চোখ ঘুরে গেল স্যান্ডির দিকে। একসাথে সবাই প্রশ্ন করে উঠল,
“কী রেডি?”
স্যান্ডি কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ইউএসএ যাচ্ছি আজ রাতেই, একটা বড় ডিল সাইন করতে। কবে ফিরব বলতে পারছিনা। আর কে জানে, হয়তো এইবার তোদের জন্য একটা নতুন বিদেশী ভাবিজি নিয়েই ফিরব।”
শেরাজের ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপাত্মক হাসি। তার এতো ঠাণ্ডা কথা শুনে মুহূর্তেই রুমে হুলুস্থুল পড়ে গেল। আইয়ুব চিৎকার করে বলল,
“তুই কী পাগল হয়ে গেছিস?”
আরবাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ভাবিজি হারিয়ে গেছে আর তুমি বিদেশে যাচ্ছো? এটাই তোমার ভালোবাসা?”
রিয়াদ তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“ভেবেছিলাম তুই তোলপাড় করে ফেলবি সব, খুঁজে বের করবি ভাবিজিকে।”
নিহাল রাগ দেখিয়ে বলল,
“তুই ফালতু ডিলের জন্য দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিস? তোর মাথা ঠিক আছে এস.কে?”
রিসান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তুই এস.কে নাকি অন্য কেউ?”
সকলে হতাশ হয়ে চুপ করে গেল। প্রত্যেকের চোখে আগুন। শেরাজ একটুও পাত্তা দিল না। তার চোখে অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। সে ধীরে ধীরে একটা কফির কাপ হাতে তুলে নিয়ে কফিতে ছোট চুমুক দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আমার লাইফ, আমার ডিসিশন। তোদের এসব সো কলড ড্রামাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি কাউকে এক্সপ্লেইন করি না, বুঝলি?”
সবাই শেরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ঠাণ্ডা চোখ, কফির কাপ হাতে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিমা— সব মিলিয়ে যেন সে এক অন্য মানুষ। কেউ যেন এই লোকটাকে চিনতে পারছে না। ওদের ভাবনার মধ্যে নিহাল বলল,
“রাহিন তুই কিছু বল ওকে।”
রাহিন তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“আমার কিছু বলার নেই। আমি জানিনা, ও কি করতে চাইছে। কিন্তু আমার ওর প্রতি বিশ্বাস আছে। ও যাই বলুক না কেনো। আমি জানি, ও সুমুর কোনো ক্ষতি হতে দিবে না।”
সকলে রাহিনের কথায় অবাক হলো। শেরাজ হাসল। সারবাজ রাগ দেখিয়ে বল,
“ওর প্রতি এতো বিশ্বাস কেনো তোর? শুনছিস না, ও কি বলছে?”
আরবাজ, সারবাজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বাদ দাও, ব্রো। ও নিজেই ওর পিচ্চি বউয়ের শোকে আছে। বিডিতে কি একটা প্রবলেম হয়েছে। সামিয়া ভাবিজি আর পিয়াস মানে সামিয়া ভাবিজির ফুফুমনির ছেলেকে নিয়ে। শুনলাম সেই ছেলে নাকি ভাবিজিকে ভালোবাসে।”
সারবাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল আরবাজের দিকে। চাপা গলায় বলল,
“তুই কীভাবে জানলি এই কথা?”
আরবাজ গলা নিচু করে বলল,
“আইয়ুব ব্রো বলল। নাজমিন ভাবিজি নাকি তাকে জানিয়েছে। আর রাহিন ব্রো তো জানেই সব। কিন্তু সুমু ভাবিজি নিখোঁজ হওয়াতে ব্রো চুপ করে আছে।”
সবাই রাহিনের দিকে তাকাল। নিহাল ধীরে বলল,
“রাহিন, তুই আমাদের জানাসনি কেনো এসব?”
রাহিন মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলল,
“এসব বাদ দে তোরা। এসবের থেকেও বেশি ইম্পর্টেন্ট এখন, সুমু।”
ওদের কথার মধ্যে বাহিরে একটা অদ্ভুত আওয়াজ হলো। সকলে দরজা দিকে তাকাতেই দেখল আরিয়ান এসেছে। চোখ মুখের অবস্থা করুণ। আরিয়ান শেরাজের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গর্জে বলল,
“সুমু, কোথায় এস.কে? রোজা বলল, তুই নাকি ওকে মেরে গুম করে দিয়েছিস?”
শেরাজ এগিয়ে এসে বলল,
“তোর মুখ বন্ধ রাখ, আরিয়ান। আমার বউ, আমি যা ইচ্ছা তাই করব। তোর কাছে কৈয়ফিয়ত দিতে হবে আমাকে?”
“তুই বল, তুই সুমুকে কিছু করিসনি?”
শেরাজ মাথা ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এই ব্যাপারে আমি কাউকে কোনো জবাব দিতে বাধ্য না।”
“তুই জবাব দিবি। কারণ সুমু শুধু তোর বউ না, আমার ভালোবাসাও।”
শেরাজের ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে গেল। সে আরিয়ানের কলার চেপে ধরে দেয়ালে ঠেসে দিয়ে বলল,
“আরেকটা শব্দ বললে, তোর মুখ ভেঙে ফেলব আমি। ভালোবাসা? তুই কী জানিস ভালোবাসা কী জিনিস? আমার সামনে আমার বউকে ভালোবাসি, বলিস। শালা মাদারফা*কা*রের বাচ্চা! কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলব তোর।”
আইয়ুব, রিয়াদ, আর আমিত দৌড়ে এসে শেরাজকে টেনে সরিয়ে দিল। আইয়ুব চিৎকার করে বলল,
“এস.কে থাম, ওকে ছেড়ে দে!”
রিয়াদ আরিয়ানকে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“এইটা তোদের যুদ্ধ করার সময়? এখনো নিজেদের ইগো নিয়ে থাকবি তোরা? এই মুহুর্তে অন্তত এসব বন্ধ কর।”
শেরাজ চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,
“ইগো? তোরা জানিস না আমি কী হারিয়েছি। ওই মেয়েটা ছাড়া আমি কিছু না, কিছু না বুঝলি? আর এই মাদারফা*কা*রের বাচ্চা আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলে ভালোবাসি।”
আরিয়ান দম নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, ভালোবাসি! আর সারাজীবন বাসবো।”
শেরাজের চোখ অন্ধকার হয়ে এলো। সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল আরিয়ানের দিকে। সারবাজ আর রাহিন ছুটে এসে আরিয়ানকে শেরাজের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। শেরাজ গর্জে উঠে বলল,
“ওকে আমার সামনে থেকে সরা, নয়তো আজ ওর লাশ সত্যি সত্যি এখানে পড়ে যাবে।”
আরিয়ান তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“এবার সুমুকে আমি খুঁজে বের করবোই। আর তোর থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাব ওকে। আমি কোরিয়াতে চলে যাব ওকে নিয়ে। তারপর আমরা বিয়ে করে ভালো একটা লাইফ কাটাব। আর শোন এস.কে…”
শেরাজ তাকাল। আরিয়ান শেরাজের সামনে গিয়ে আলতো হাসল। সে মুখ শেরাজের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমাদের ফাস্ট রেইনবো কিসের একটা সুন্দর ভিডিও করে তোকে সেন্ড করব। আর তারপর তুই…”
কথা শেষ করতে পারল না আরিয়ান। শেরাজ এক ঘুষিতে আরিয়ানকে মাটিতে ফেলে দিল। ঘুষি এতটাই জোরালো ছিল যে, আরিয়ানের ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো। সারবাজ, রিয়াদ, রাহিন, আইয়ুব সবাই ছুটে এলো শেরাজকে ধরে রাখতে। রাহিন গর্জে উঠে বলল,
তুই পাগল নাকি, এস.কে? এখন মানুষ মারবি?
শেরাজ গর্জে উঠে বলল,
“তুই আমার জায়গায় থাকলে বুঝতি। তোরা কেউই বুঝবি না, আমি কীভাবে প্রতিটা রাত পার করেছি। একেকটা ঘন্টা যেন গলার মধ্যে ছুরি দিয়ে সময় গুনতে হচ্ছে। আর এই ছাগলটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বউকে নিয়ে রেইনবো কিস করার কথা বলে।”
শেরাজ আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোর মুখে এমন কথা আসে কীভাবে? শুয়োরের বাচ্চা, আমার বউ নিয়ে তুই ফালতু কথা বলিস? ভিডিও করবি? তোর রেইনবো কিসে আমি আগুন লাগিয়ে দিব শুয়োরের বাচ্চা। তোর ঠোঁট কেটে আমি কুত্তা দিয়ে খাওয়াব”, সে ছুটে এসে বলল, “তুই মরবি আজ, তুই মরে যাবি আজ।”
আইয়ুব, রিয়াদ, রাহিন, আমিত, সারবাজ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে শেরাজকে টেনে ধরল। শেরাজ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল সবাইকে। তাকে এখন থামানো সত্যিই কঠিন। আরিয়ান মাটিতে পড়ে হাঁপাচ্ছে। মুখ দিয়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তবুও ঠোঁটে সেই তাচ্ছিল্যের হাসিটা থেকে গেছে। শেরাজ গর্জে উঠে বলল,
“তোর মুখ আমি ছিঁড়ে ফেলব। আমার সুমুকে নিয়ে তুই এভাবে কথা বলিস? ও শুধু আমার, শুধু আমার।”
রাহিন জোরে ধাক্কা দিয়ে শেরাজকে পেছনে ঠেলে দিয়ে বলল,
“তুই আর একটা কথাও বলবি না, শেরাজ। তোরা দুজনই পাগল হয়ে গেছিস। এইটা ভালোবাসা না, এইটা সাইকো অবসেশন।”
আরিয়ান হেসে রক্তমাখা ঠোঁট দিয়ে বলল,
“সাইকো? বলতেই পারিস। তবে এই মুহুর্তে আমার ইনটেনশন ছিল এস.কে’কে হাইপার করে তোলা। আর আমি সেটাতে সাকসেস।”
শেরাজ আগুন চোখে তাকিয়ে বলল,
“হোয়াট দ্যা…”
সারবাজ শেরাজকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তোরা দুইজনই শেষমেশ প্রমাণ করে ফেললি, সুমু কোনো মানুষ না, ও শুধু তোদের কাছে একটা অবজেক্ট। যাকে নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া করা যায়।”
সারবাজের কথায় ঘরজুড়ে ছায়ার মতো নেমে এলো। এক পিনপতন নিস্তব্ধতা যেন চারপাশকে গিলে খাচ্ছে। শেরাজের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, বুকের ধকধক শব্দ যেন শোনা যাচ্ছে। আরিয়ান মাটিতে বসে পড়ল। চোখে ঠাট্টা আর ক্লান্তির বিষাদমাখা রেখা। সে ঠোঁটের কোণা থেকে রক্ত মুছতে মুছতে ফোঁস করে বলল,
“আমি যাচ্ছি সুমুকে খুঁজতে।”
এক মুহূর্তও দেরি না করে পকেট থেকে ফোন বের করল আরিয়ান। কোথাও একটা কল করল সে। কল রিসিভ হতেই গর্জে উঠে বলল,
“পুরো ওমান শহরে কারফিউ জারি করো। যতগুলো ইউনিট, গাড়ি, হেলিকপ্টার আছে— সব নামাও। সুমুকে খুঁজে বের করতেই হবে। পুরো শহর তোলপাড় করে দাও। আমি সুমুকে চাই, অ্যাট এনি কস্ট।”
কথাগুলো বলে আরিয়ান বেরিয়ে গেল। শেরাজ চুপচাপ বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল,
“তোমাকে ভুলে যাওয়াটা সম্ভব না। চাইলেও পারব না। কারণ তুমি আমার নিঃশ্বাসের মতো, প্রতিটি মুহূর্তে জড়িয়ে আছো আমার অস্তিত্বে। যদি দুটি উপায় হতো, এক তোমাকে ভুলে যাওয়া, না হলে মরে যাওয়া। তাহলে আমি হয়তো বেঁচে থাকা নয়, নিঃসংকোচে মৃত্যুকেই বেছে নিতাম আমি। কারণ, তোমাকে ভুলে যাওয়া আমার অসম্ভব ছিল, কিন্তু মরে যাওয়া সম্ভব ছিল।”
তার ভাবনার মাঝে আইয়ুব পিছনে গিয়ে বলল,
“আরিয়ান খুঁজতে গেল, তুই যাবিনা?”
শেরাজ দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“না!”
আইয়ুব রাগ দেখিয়ে বলল,
“তাহলে এতোক্ষণ আমার বউ, আমার বউ করছিলি কেনো?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“শেরাজ খান কখনো হারতে শিখেনি। ও বেশি বলছিল, তাই ওকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম, যে ওটা আমার বউ।”
শেরাজের কথায় ঘরের আবহাওয়া আরও ভারী হয়ে গেল। আইয়ুব তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। উপস্থিত কেউ বুঝতে পারল না শেরাজ আসলে কী করতে চাইছে।
সন্ধে নামার আগেই রায়য়ান আবারও সুমুর রুমে ঢুকল। আজকের রায়য়ান চৌধুরী পুরোটা অস্বাভাবিক। তার হাতে ট্রে ভর্তি খাবার, তাতে সাজানো ফল, একগ্লাস জুস, কিছু হালকা খাবার। রায়য়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। সুমু চুপচাপ জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখের নিচে কালি, ঠোঁট শুকনো, সকাল থেকে এখনো কিছু খায়নি। রায়য়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ট্রেটা পাশের টেবিলে রাখল।
“সবাই খেয়েছে। আপনি কেনো এখনো কিছু মুখে তোলেন নি?”
সুমু মুখ তুলে তাকাল না, কোনো কথাও বলল না। রায়য়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“একটু খান! আপনার শরীর আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।”
সুমু মুখ ঘুরিয়ে রায়য়ানের দিকে তাকাল।
“আপনি যদি সত্যিই আমাকে সাহায্য করতে চান, তাহলে একটা ফোন দিন আমাকে মাত্র এক মিনিটের জন্য।”
রায়য়ান কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে গেল। তার চেহারা থমথমে। মনে মনে দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। সে জানে, ফোন দেওয়ার মানেই হচ্ছে ঝুঁকি নেওয়া। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা ভেঙে, সে আস্তে করে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিল। সুমু ফোনটা হাতে নিল। সে কিছু না বলেই আবার ধীরে ধীরে ফোনটা ফিরিয়ে দিল। রায়য়ান অবাক হয়ে চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল সুমুর মুখের দিকে।
“কিছু বলতে চান? সংকোচ করবেন না। আমি শুনছি, আপনি বলুন।”
“আমি আসলে…”
“নতুন ফোন চাই?”
“না মানে! আমার কিছু দরকার নেই। আমি এমনিই…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই রায়য়ান পাশের টেবিলের ফোন নিয়ে কোথাও কল করল।
“আমার জন্য একটা নিউ ফোন পাঠাও, ফাস্ট।”
সুমু হতবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“আরে! আপনি কেনো…”
“আর বলতে হবে না। আমি বুঝে গেছি, আপনি কী বলতে চাইছেন। সংকোচ করার কিছু নেই। যখন নিজে কিছু করে ফেলবেন, তখন সব ব্যাক করে দিবেন।”
সুমু চোখ নামিয়ে নিল। সেই চোখে কৃতজ্ঞতা আর দ্বিধার মিশেল তার। রায়য়ান ধীরে ধীরে খাবারের প্লেটটা সুমুর সামনে বাড়িয়ে বলল,
“একটু খেয়ে নিন। আপনার শরীরের তো যত্ন নিতে হবে। যতটুকু পারেন, প্লিজ।”
সুমু চোখ নামিয়ে নিল। তার মন ভার। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে কান্না।
“আমার খিদে নেই!”
রায়য়ান নরম স্বরে বলল,
“আপনি হয়ত কষ্টে আছেন। হয়ত কোনোকিছুর দ্বারা আঘাত পেয়েছেন। আমি আপনার সেসব বিষয়ে কিছু জানতে চাইব না। ইভেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন, আপনার ফ্যামিলি মেম্বারদের কারো নাম আমি জানতে চাইব না। আমি শুধু এখন একটা কথায় জানি, আপনি এখন আমার কাছে আছেন মানে এখন আপনি আমার আমানত, আমার দায়িত্ব। আপনার সুস্থতা এখন আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
সুমু কিছু না বলে প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ধীরে ধীরে একটু খাবার তুলে নিল চামচে। ধীরে ধীরে খেতে শুরু করল। রায়য়ানের চোখে হালকা প্রশান্তি দেখা গেল। একটু ভেবে নিয়ে সে বল,
“চলুন, আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাই।”
সুমু চমকে উঠে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চান আপনি?”
রায়য়ান শান্ত গলায় বলল,
“একটা জায়গায়। যেখানে গেলে আপনি নিজের দিকে আবার তাকাতে পারবেন। নিজের দুঃখগুলো থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াতে পারবেন।”
সুমু দম আটকে এলো গলায়।
“কিন্তু আমি আপনাকে…”
রায়য়ান তার কথার মাঝেই বলল,
“ভয় পাচ্ছেন?”
সুমু একটু চুপ থেকে বলল,
“হ্যাঁ!”
রায়য়ান তাকিয়ে রইল সুমুর চোখের দিকে।
“ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি যদি আপনার জায়গায় থাকতাম, আমিও পেতাম। কিন্তু আপনি আমাকে সত্যি বিশ্বাস করতে পারেন।”
সুমু ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। সে রাজি হলো যেতে। সে দেখতে চায়, এই রায়য়ান চৌধুরী নামের রহস্যময় মানুষটি তাকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়।
রায়য়ান সুমুকে নিয়ে গেল বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে। সেখানে এক বিশাল হলরুম। ভেতরে ঢুকেই সুমু থমকে গেল। ঘরটা যেন এক নিজস্ব জগত। এক পাশে আধুনিক জিম সেন্টার কার্ডিও থেকে ইয়োগা সব কিছু সাজানো। অন্য এক পাশে ঝকঝকে বিউটি পার্লার। আরেক সাইডে সাজানো এক ছোট শপিং কর্নার, কসমেটিকস, ড্রেস, জুয়েলারি, হেয়ার কেয়ার, স্কিন কেয়ার- এ টু জেড, একজন নারীর নিজেকে আধুনিকা হিসাবে গড়ে তোলার জন্য যা যা দরকার সবই যেন এখানে।
সুমু অবাক চারপাশে তাকাল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে ধীরে বলল,
“আমাকে এখানে কেন আনলেন?”
রায়য়ান হালকা হেসে বলল,
“একটু অপেক্ষা করুন, সব জানতে পারবেন”, সে ফোনে বের করে বলল, “কামিং!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমের ভেতরে ঢুকে এলো পাঁচজন নারী। সকলেই ফর্মাল পোশাকে, সুগঠিত, স্মার্ট। তারা সুমুর সামনে একে একে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। রায়য়ান ইশারা করে বলল,
“ওরা সবাই আজ থেকে শুধু আপনার জন্য। ওরা আপনাকে সাহায্য করবে। আপনি যেভাবে চাইবেন, ঠিক সেভাবেই।”
সুমু তাকিয়ে রইল বাকরুদ্ধ হয়ে। রায়য়ান ধীরে ধীরে বলল,
“আমি জানি, আপনি নিজেকে বদলাতে চান। আপনি নিজের জন্য কিছু করতে চান। ঠিক এই জায়গাটাকে আমি তৈরি করেছি, কেবল সেই মানুষটার জন্য, যে নিজের অতীত পেছনে ফেলে সামনে হাঁটতে চায়। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, এই পরিবর্তনটা হবে সম্পূর্ণ আপনার ইচ্ছায়, আপনার শালীনতায়। আপনি যেটা চাইবেন না, সেটা কেউ আপনাকে করতে বলবে না”, রায়য়ান কিছুটা থেমে আবারও বলল, “আপনি যদি সত্যি চান, নিজেকে দেশের শীর্ষ দশ সেরা নারীর মধ্যে নাম্বার ওয়ান হিসেবে প্রমাণ করতে, তাহলে সেই পথটা এখন থেকেই তৈরী করতে শুরু করুন। আমি পাশে থাকব আপনার। দ্বিধা করবেন না।”
সুমু তাকিয়ে রইল রায়য়ানের চোখের দিকে। সে একটু রাগিস্বরে বলল,
“আপনি আমার সাথে মজা শুরু করেছেন? আপনি আমাকে চিনেন? না চিনে আপনি আমাকে এমনি এমনি এতো সাহায্য করছেন, তাই না? এই সত্যি করে বলুন, আপনার উদ্দেশ্যে কি?”
উপস্থিত সকলে সুমুর রায়য়ানের সাথে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস দেখে অবাক। এরমধ্যেই আলিশা এসে বলল,
“কোনো উদ্দেশ্যে নেই। তুমি ভুল করছ? আমি আর আমার মমও এমন ছিলাম। আমরা খুব সাধারণ ছিলাম। আমাদের ওতি বিপদের দিনে এই মানুষটা আমাকে আর আমার মম’কে সাহায্য করেছে। আজ আমি এতো স্মার্ট শুধু এই মানুষটার জন্য। কিন্তু পরে আমার আর ভালো লাগেনি, তাই আর নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাইনি। কিন্তু তোমার মধ্যে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ইচ্ছা আছে। আর তাই উনি তোমাকে সাহায্য করছেন?”
সুমু তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“তো উনি কি রাস্তায় যারা বিপদে পড়ে, সবাইকে এভাবে নিজের বাসায় তুলে এনে সাহায্য করে?”
আলিশা আলতো হেসে বলল,
“এমনটা নয়, সুমু। উনি সত্যি সবাইকে হেল্প করে। কিন্তু যাদের মধ্যে নিজেকে প্রমাণ করার মতো সাহস থাকে, তাদের পাশে শেষ পযর্ন্ত থাকে। আর কাউকে হেল্প করতে তো কোনো ক্ষতি নেই, তাই না?”
সুমু আলিশার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“তুমি বলছ, আমি পারব?”
আলিশা ধীরে কাছে এসে সুমুর হাতে হাত রাখল।
“তুমি পারবে, যদি নিজেকে বিশ্বাস করো। আমরা সবাই ছিলাম কোথাও না কোথাও ভাঙা। কিন্তু এই মানুষটা আমাদের বলেছিল, ভাঙা মানেই শেষ না। তোমার চোখে আমরা সেই আগুনটা দেখছি, যেটা নিজেকে বদলাতে পারে। এখন শুধু সাহস আর তোমার ইচ্ছাটা লাগবে, সুমু।”
সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কিছু বলছে না। আশপাশের মেয়েগুলোও তাকিয়ে আছে ওর দিকে। রায়য়ান সামনে এসে ধীরে বলল,
“আপনার সময় লাগতে পারে আমাকে বিশ্বাস করতে। আমি চাপ দিচ্ছি না। আপনি যদি আজ ফিরে যেতে চান, আমি গাড়ি বের করে দেব। কিন্তু যদি মন থেকে একবার চেষ্টা করতে চান, তাহলে এই দরজাটা আপনার জন্য খোলা থাকবে। আজ থেকেই আপনি শুরু করতে পারেন এক নতুন জীবন, আপনার শর্তে, আপনার মতো করে। আর এমন’তো নয় যে এসবের জন্য আপনাকে ওয়েস্টার্ন পড়তেই হবে। ট্রেডিশনাল আর শালীনতার মধ্যে দিয়েও নিজেকে প্রমাণ করা যায়। ওয়েস্টার্ন বা নারী খোলামেলা স্বভাব আমার নিজেরই পছন্দ না। আপনি নিজেকে শালীনতার মধ্যে দিয়ে তৈরী করুন।”
আলিশা হেসে বলল,
“তুমি অসম্ভব সুন্দরী, সুমু। তোমার জন্য এইটাই বেস্ট হবে। তুমি ভেবোনা তোমাকে নিজের রুপ বিক্সি করে এসব করতে হবে। না সুমু! এক্ষেত্রে রুপ, গুণ— দুটোই ম্যাটার করে। তুমি নিজের গুণের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করবে।”
সুমু চোখ নামিয়ে ফেলল। তার বুকের ভেতর সাহস যোগানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ সে চোখ তুলে রায়য়ানের দিকে তাকাল।
“আমি থাকছি, কিন্তু আমি আমার নিয়মে চলব। নিজেকে অন্য কেউ বানানোর জন্য না, নিজেকেই খুঁজে পেতে এই যাত্রা। আপনার সাহায্য আমি নেব, তবে আমার পথ আমি নিজেই তৈরি করব।
রায়য়ান মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সকলে খুশি হলো সুমুর রাজি হওয়াতে। আলিশা সুমুর হাত শক্ত করে ধরে তাকে সাহস দিল।
রাত গভীর। সবকিছু নিস্তব্ধ। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। সুমুর ঘরের আলো ম্লান। বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ তার। হঠাৎ সুমুর রুমে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। কেউ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। দরজা খোলা হয়নি, অথচ লোকটা যেন কোন শব্দ না করেই ভেতরে ঢুকে এলো। রুমের মধ্যে হালকা আলোতে লোকটির দেহের গঠন স্পষ্ট। ওভার সাইজ হুডি পরা, মাথায় হুডি তোলা, মুখটা মুখোশ দিয়ে ঢাকা, পায়ে বুট জুতো আর হাতে গ্লাভস পরা। লোকটি সুমুর পাশে বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। কিছুক্ষণ সময় যেতে লোকটা পকেট থেকে বের করল একটা ছোট সিরিঞ্জ, একটি হালকা ডোজের ঘুমের ইনজেকশন। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে সে ইনজেকশনটা সুমুর বাহুর পাশে খুব সতর্কভাবে পুশ করল। কোনো ব্যথা নেই, কোনো অস্বস্তি নেই। ইনজেকশনটা শুধু সুমুকে আরও গভীর ঘুমে পৌঁছে দিল। লোকটা এবার অন্য পকেট থেকে বের করল একটা ছোট সিলভার বোতল— লোকাল স্প্রে। সে খুব আস্তে, নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে স্প্রে করলো সুমুর গলার জোলাইনের কাছে। তারপর আরও একটু নিচে, বিউটি বোনের কাছাকাছি দ্বিতীয়বার স্প্রে করল। স্প্রে শেষে সে বোতলটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে দু’মিনিট বসে রইল। হঠাৎই সে ঝুঁকে পড়ল সুমুর গলার ওপর। স্প্রে করা জায়গায় আস্তে করে দাঁত বসিয়ে দিল। খুব ধীরে কামড়ে ধরল সে।
খান সাহেব পর্ব ৬০ (২)
একটা অদ্ভুত রক্তাভ ছোপ ছড়িয়ে পড়ল সুমুর ফর্সা ত্বকে। পাঁচ মিনিট পর সে সরে এলো। গলার পাশে একটা গোল ক্ষতচিহ্ন। লোকটা হাত বাড়িয়ে আলতো করে সেই জায়গায় আঙুল ছোঁয়াল। তবুও সে থামল না। এইবার বিউটি বোন থেকে একটু নিচে স্প্রে করা অংশে কামড় বসাল। একটু বেশি সময় নিয়ে দাঁত বসাল। কামড়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখল সে। এই কামড়টা আগেরটার চেয়ে গভীর। রক্ত বেরিয়ে হলো। সুমু কিছু টের পেল না। ঘুমে অচেতন সে। লোকটা ধীরে ধীরে সরে এলো। ক্ষত জায়গাগুলো এক নজর দেখল। অদ্ভুত শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। একহাতে সুমুর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল, অন্য হাতে মুখোশ একটু সরিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল সুমুর কপালে। কিছুক্ষণ বসে থেকে যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই নিঃশব্দে চলে গেল। বিছানায় পড়ে রইল নিথর সুমু। গভীর ঘুমে সে। কিছুই জানলো না, কিছুই বুঝল না। শুধু ঘরের হালকা আলোয় স্পষ্ট হয়ে রইল দুটো ক্ষতচিহ্ন, গলায় আর বিউটি বোনের নিচে। আর রইল রক্তের হালকা রেখা আর এক রহস্যময় রাত।
