খান সাহেব পর্ব ৬৩ (২)
সুমাইয়া জাহান
সুমু বিছানায় আধশোয়া হয়ে চুল আঙুলে পাকাচ্ছে। তার চোখে যেন একটু নতুন উজ্জ্বলতা এসেছে—জ্বর অনেকটাই কমে গেছে। সে হঠাৎ উঠে বসে বলল,
“আমি একটু শাওয়ার নিয়ে আসি, শরীরটা হালকা লাগবে।”
শেরাজ তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কাউকে টেক্সট পাঠাচ্ছিল। সুমুর কথা শুনে সে ঘুরে তাকাল। তার চোখে একরাশ দুষ্টুমি।
“একা যাবে?”
সুমু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“না! গোটা পৃথিবীর দুধের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, সবাইকে নিয়ে যাবো।”
শেরাজ কাছে এগিয়ে এলো। সুমু আবারও বলল,
মানেটা কি? আমি তো প্রতিদিন একাই যাই।”
শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি ভুলে যাচ্ছো, তুমি এখনও পুরোপুরি সুস্থ না। আমি তোমাকে একা যেতে দেব না।”
সুমু মুখে হালকা বিরক্তি এনে বলল,
“আরে, আমি তো শাওয়ার নিতে যাচ্ছি, পাহাড়ে চড়তে নয়।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এনে ফিসফিস করে বলল,
“পাহাড়ে চড়া আর তোমার শাওয়ার—দুটোই সমান রিস্কি আমার জন্য।”
সুমুর চোখ বড় হয়ে গেল,
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
শেরাজ হালকা ঝুঁকে তার কানের কাছে মুখ এনে বলল,
“মানে তুমি যদি শাওয়ারে ঢোকো, আর মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে ব্যথা পাও?”
“আপনি থাকলে আমি শান্তিতে শাওয়ারও নিতে পারব না।”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“তাই তো বলছি, তোমাকে শান্তিতে শাওয়ার নিতে দেব না। আজ তোমার সিকিউরিটি আমি নিজেই হবো।”
“খান সাহেব, আপনি সত্যি অসহ্য।”
“হুম! কিন্তু এই অসহ্যটাই তো তোমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ।”
সুমু আর কিছু বলার আগেই শেরাজ তার হাত ধরে বলল,
“চলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাই। যদি পড়ে গিয়ে আবার জ্বর বাড়িয়ে ফেলো, তখন তো আমি তোমার কাছে যেতে পারব না। আর এটা আমি কোনোভাবেই হতে দেব না।”
শেরাজের দৃঢ় কণ্ঠে যেন কোনো আপত্তির সুযোগই নেই। সুমু বেডের ওপর বসে থেকেই বলল
“তাহলে আপনি কথা দিন, আপনি ওয়াশরুমের দরজা থেকে ভেতরে এক কদমও এগোবেন না।”
শেরাজ এক ভ্রু তুলে বলল,
“কেনো? আমি তো পাহারা দেব বলেছি।”
“পাহারা দরজার বাইরে থেকেও দেওয়া যায়।”
শেরাজ ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে বলল,
“দরজার বাইরে থেকে যদি পাহারা দিই, তাহলে যদি তুমি ভেতরে পড়ে যাও, আমি কী তখন দরজা ভেঙে ঢুকব?”
সুমু বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনি সবসময় এত বাড়াবাড়ি করেন কেন?”
শেরাজ শান্তভাবে উত্তর দিল,
“কারণ তোমার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি মানেই আমার দায়িত্ব।”
সুমু চোখ ঘুরিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, কিন্তু ভেতরে যাবার কথা ভুলেও ভাববেন না।”
শেরাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, কিন্তু আমি দরজার একদম সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। তোমার এক সেকেন্ড দেরি হলে ভেতরে ঢুকে যাব, মাথায় রাখবে।”
সুমু মুখে একরাশ লাজুক বিরক্তি নিয়ে বসে রইল। সুমুর অবস্থা দেখে শেরাজের ঠোঁটে হালকা দুষ্টু হাসি খেলে গেল।
“বেশি সময় নিচ্ছো না তো, সুইটহার্ট?”
“আপনি কী টাইমার ধরেছেন?”
“না! কিন্তু যদি সময়সীমা পেরিয়ে যায়, আমি জরিমানা নেব।”
“জরিমানা? সেটা আবার কী?”
“তোমার কাছ থেকে আমার পছন্দের কিছু আদায় করব।”
সুমুর গাল লাল হয়ে উঠল। সে চুপ করে গেল। শেরাজের হাসি আরও গভীর হলো। সে সুমুকে আর সময় না দিয়ে কোলে তুলে নিল। সুমু অবাক হয়ে তাকাল। শেরাজ হালকা বাঁকা হেসে সুমুকে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে সুমুকে নামিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল। সুমু ভ্রু কুঁচকে বল,
“এই আপনি দরজা কেন লক করলেন? এক্ষুনি বাহিরে যান।”
শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর দিকে এগোলো। সুমু পিছুতে পিছুতে দেওয়ালের সাথে মিশে গেল। শেরাজ সুমুকে দু’হাতে আটকে দুষ্টু হেসে বলল,
“বউ হও তুমি আমার। বাহিরে কেনো যাবো?”
সুমুর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তার হাত দুটো নিজের ওড়না শক্ত করে চেপে ধরল।
“আপনি সীমা ছাড়াচ্ছেন। আমি এখন অসুস্থ।”
শেরাজ চোখে গভীর দৃষ্টি রেখে নিচু স্বরে বলল,
“সীমা? আমি তো কেবল আমার দায়িত্ব পালন করছি।”
“দায়িত্ব পালনের নাম করে আপনি…”
সুমু কথা শেষ করার আগেই শেরাজ তার চুলের একগুচ্ছ আলতো করে কানের পেছনে সরিয়ে দিল। তার স্পর্শে সুমুর শরীর কেঁপে উঠল। শেরাজ ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“দায়িত্বের আরেক নাম যদি হয় তোমার যত্ন নেওয়া, তাহলে আমি এই সীমা বারবার ভাঙতে রাজি।”
সুমু গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনি খুব বেশি কাছে চলে এসেছেন। আমি সত্যি এখন অসুস্থ।”
শেরাজ আরও এক পা এগিয়ে এলো। তাদের মাঝে ফাঁকা জায়গাটা মিলিয়ে গেল।
“তুমি যখন অসুস্থ হও, আমি দূরে থাকতে পারি না।”
সুমু চুপ করে চোখ নামিয়ে ফেলল। শেরাজ হালকা স্বরে বলল,
“তুমি যদি চাও, আমি এখনই চলে যাব। কিন্তু কে জানে, তোমাকে ভেতরে পড়ে যাওয়া থেকে আমি বাঁচাতে পারব কি না।”
সুমু তাকাল। তার চোখে রাগ, লজ্জা মিশে। সে ভ্রু কুঁচকে বল,
“আমি স্ট্রং! আপনার থেকেও বেশি স্ট্রং।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“কে বেশি স্ট্রং, সেটা তো বেডে গেলেই প্রমাণ হয়। স্ট্রং বলেই আমার এক স্পর্শে, একরাতে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলেছ।”
“আপনি সত্যিই অসহ্য।”
শেরাজ হালকা হেসে ফিসফিস করে বলল,
“আর তুমি ঠিক সেই কারণেই আমাকে সহ্য করো।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। শুধু দুজনের শ্বাসের শব্দ। শেরাজ ধীরে ধীরে তার হাত সুমুর কাঁধে রেখে, এক পা পিছিয়ে এলো।
“ঠিক আছে, শাওয়ার নাও। আমি এখানে থাকব, তোমার পাহারাদার হয়ে।”
সুমু গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“পাহারাদাররা কিন্তু ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে না।”
শেরাজ চোখ মেরে বলল,
“কিন্তু আমি সাধারণ পাহারাদার নই।”
সে পেছন ঘুরে গিয়ে দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সুমু অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। শেরাজের মুখে সেই একই দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সুমু শাওয়ারের পানি অন করার আগেই আচমকা শেরাজ তাকে কাছে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে শাওয়ারের পানি অন করে দিল। শাওয়ারের পানি সুমুর শরীরে পড়তেই সে শেরাজের পিঠ খামচে ধরে ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল। ঠাণ্ডা পানির ধারা সুমুর গলা বেয়ে নামতেই সে হঠাৎ কেঁপে উঠল। শরীর ছোপ ছোপ লাল দাগে পানি পড়তেই যেন আগুনের মতো জ্বালা করে উঠল তার শরীর।
শেরাজ সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু পিছু হটল না। বরং তার বাহুতে আরও শক্ত করে সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কি হলো, বউ? এই জ্বালাও কী আমাকেই দোষ দিবে?”
সুমু বিরক্ত গলায় বলল,
“আপনার জন্যই এসব হয়েছে। এখন আবার মজা করছেন।”
পানির ধারা তাদের দুজনের শরীরে বয়ে যাচ্ছে, চুল ভিজে শেরাজের কপাল থেকে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা পানি। পানির ফোঁটা যত বেশি পড়ছে, সুমুর শরীর তত জ্বালাময় হয়ে উঠছে। সে ব্যথা সহ্য করতে না পেরে তার নক শেরাজের পিঠে গেঁথে দিল। নখের ধারালো আঁচড়ে লাল দাগ কেটে গেল শেরাজের চামড়ায়। শেরাজ তীব্র এক ঘন শ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,
“উফ্! এই ব্যথাটা। তুমি জানো না সুইটহার্ট, এটা আমি কতটা উপভোগ করি।”
সুমুর চোখ বড় হয়ে গেল। সে বিচলিত হয়ে বলল,
“আপনি অসুস্থ নাকি? ব্যথা কোথা থেকে এলো? কী হয়েছে আপনার? দেখান আমাকে।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“হ্যাঁ, তোমার ভালোবাসায় অসুস্থ। দেখো না, তুমি অসুস্থ হয়েও আমাকে সিডিউস করতে ছাড়ছো না।”
“আমি? আমি সিডিউস করছি আপনাকে?”
শেরাজ চোখে গভীর দৃষ্টি রেখে বলল,
“হুম! এই লাজুক রাগ আর তোমার এই নখের আঁচড় তো আমার সর্বনাশ করে দিচ্ছে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তার বুকের ওপর চাপ দিল, কিন্তু শেরাজ নড়লও না। বরং ধীরে ধীরে তার গাল ছুঁয়ে বলল,
“তুমি যতই দূরে ঠেলো না কেন, আমি জানি তুমি আমাকে থামাতে চাইছ না।”
ঠাণ্ডা পানি গা ভিজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু শেরাজের বাহুর শক্ত আলিঙ্গনে সুমুর শরীরের তাপ যেন আরও বেড়ে গেল।
“ছাড়ুন, আমি নিজেই পারব।”
শেরাজের হাতের চাপ একটুও কমল না। সে তার কানে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি পারবে, আমি জানি। কিন্তু পারা আর আমাকে দূরে রাখা—দুটো এক নয়, সুইটহার্ট।”
সুমুর আঙুলগুলো এখনো শেরাজের পিঠে শক্ত করে গাঁথা। সে আলতো হেসে বলল,
“তোমার শরীরের এই ব্যথাগুলো তোমাকে মনে করিয়ে দেবে, আমি তোমার কতটা কাছে ছিলাম।”
সুমু শ্বাস নিতে নিতে বলল,
“আপনি পাগল!”
শেরাজ হেসে নিচু স্বরে বলল,
“তোমার জন্যই পাগল।”
পানি ক্রমাগত গড়িয়ে পড়ছে দুজনের ওপর। চুল ভিজে কপালে লেগে গেছে সুমুর। সে চোখ বন্ধ করে শেরাজের বুকে মাথা গুঁজে দিল। আর কিছু বলার সাহস হলো না তার। শেরাজ আলতো করে তার চিবুক উঠিয়ে চোখে চোখ রাখল।
“দেখছ? অসুস্থ তুমি, আর অসহায় আমি।”
সুমু ঠোঁট কামড়ে চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু তার গালের উষ্ণতা আর বুকের ধড়ফড় শেরাজের চোখ এড়িয়ে গেল না। পানি পড়তে পড়তে মুহূর্তটা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। শেরাজের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে সুমুর ভেজা গাল বেয়ে নামতে থাকল।
“জানো, বউ! এই ভেজা গাল, এই কাঁপুনি—সবই প্রমাণ দেয় তুমি এখনো আমার ছোঁয়াতে নিজেকে সামলাতে পারো না।”
সুমু চোখ বন্ধ করেই বলল,
“আপনি কেনো সবসময় এমন করেন? আমি এখন অসুস্থ।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টেনে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি অসুস্থ হলে তো আমার যত্ন নেওয়ার অজুহাত বেড়ে যায়। আর যত্ন নিতে গিয়ে যদি একটু বাড়াবাড়ি হয়, সেটা কী খুব দোষের?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“আপনার যত্ন মানেই আমার মাথাব্যথা।”
শেরাজ তার কপাল কপালে ঠেকিয়ে বলল,
“তাহলে আমি প্রতিদিন তোমার মাথাব্যথা হবো।”
সুমুর শ্বাস আরও দ্রুত হয়ে গেল। শেরাজ নিজের পিঠের দিকে ইঙ্গিত করে হালকা স্বরে বলল,
“তুমি কি জানো, এই আঁচড়গুলো আমাকে মনে করিয়ে দেবে যে, অসুস্থ অবস্থাতেও তুমি আমাকে সিডিউস করার মতো শক্তি রাখো।”
“আমি ইচ্ছে করে এগুলো করিনি।”
“হয়তো ইচ্ছে করে করোনি। কিন্তু তোমার শরীর তো সব কথা বলে দিচ্ছে, বউ।”
সুমুর গলা শুকিয়ে এলো। ঠাণ্ডা পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার গলা বেয়ে, আর শেরাজের দৃষ্টি সেখানেই আটকে আছে। সে আরও ঝুঁকে এসে বলল,
“এই নখের দাগ, এই কাঁপুনি— এগুলো তো আমার জন্যই, তাই না?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকে এক ধাক্কা দিল, কিন্তু শেরাজের বাহুতে যেন পাথরের মতো শক্তি।
“খান সাহেব, আমাকে দূর্বল করবেন না। আমি এতোটাই অসুস্থ যে, আমার মধ্যে আর সহ্য করার ক্ষমতা নেই।”
“অসুস্থ বলেই তো তোমাকে এমনভাবে ধরতে ইচ্ছে করছে। যাতে তুমি ভুলেই যাও, তুমি অসুস্থ।”
সুমু নিঃশ্বাস ফেলে চোখ সরিয়ে নিল। শেরাজ তার চিবুক আলতো করে তুলে বলল,
“আমার চোখে চোখ রেখে বলো, তুমি এই মুহূর্তটা পছন্দ করছ না?”
সুমু আর কোন কথা বলল না। শেরাজ আর অপেক্ষা না করে শাওয়ারের পানি অফ করে সুমুকে চেঞ্জ করিয়ে দিল। সুমুর চুলে টাওয়েল পেঁচিয়ে সুমুকে কোলে তুলে নিয়ে বাহিরে বেরিয়ে এলো।
বেডরুমে পৌঁছে সে সুমুকে আস্তে করে বিছানায় বসিয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে দিল। তার আঙুলগুলো আলতো করে সুমুর গলা ছুঁয়ে নামতে থাকল। সুমু চোখ বন্ধ করে বসে রইল।
“দেখো, বউ! তোমার ভেজা শরীর, এই উষ্ণ ত্বক—এসব সামলানোর জন্য আমারও তো ইমিউনিটি লাগে।”
“আমি আপনাকে দূরে থাকতে বলেছিলাম।”
শেরাজ হেসে বলল,
“দূরে থাকলে কি তুমি ভালো হয়ে যাবে? নাকি তোমার জ্বালা কমাতে পারবে?”
সুমু চোখ মেলে তাকাল। এরমধ্যেই রুমে ঢুকে এলো সুমুর পোষা বিড়াল ‘কিটি’। সে দু’দিন ধরে নাতাশার কাছে ছিল। বিড়ালের বাচ্চাটা এসেই সুমুর কোলে উঠে বসল। বিড়ালের বাচ্চাটাকে সুমুর কোলে উঠতে দেখে শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এইটা এখন এখানে কেনো এলো? ও দেখতে পাচ্ছেনা, হাজব্যান্ড ওয়াইফের মধ্যে প্রাইভেট টাইম চলছে? নক না করেই রুমে ঢুকে এলো।”
সুমু কিটির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“আজব তো! ও কীভাবে নক করবে? আর ও কেনো-ই বা নক করে আসতে যাবে?”
“ও মিউ মিউ বলে নক করবে। আর হাজব্যান্ড-ওয়াইফের প্রাইভেট টাইমে নক করেই তো আসবে। একটুও ম্যানার্স জানেনা তোমার এই বেয়াদব বিড়ালের বাচ্চা।”
“একদম ওকে বেয়াদব বলবেন না।-
“ওকে, বলব না!”
শেরাজ ইন্টারকমে কল করল। দু’মিনিটের মধ্যে নাতাশা এসে রুমে হাজির হলো। শেরাজ নাতাশার উদ্দেশ্যে বলল,
“এটাকে নিয়ে যান। এটা আমাদের প্রাইভেট সময় নষ্ট করে দিচ্ছে।”
সুমু হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“ও যাবে না। নাতাশা তুমি যাও।”
শেরাজ নাতাশাকে চোখ দিয়ে ইশারা করতেই নাতাশা থতমত খেয়ে বলল,
“ম্যাম! ওর খাবারের সময় হয়ে এসেছে।”
সুমু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখল। সে বিড়ালটাকে একটু আদর করে নাতাশার কোলে দিয়ে দিল। নাতাশা কিটিকে নিয়ে নিচে চলে গেল।
ঘড়ির কাটায় সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সুমু আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটা মনোযোগ দিয়ে দেখছে। গয়নার আলোক ঝলকানো অংশগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা, আর তার চুল ঠিকমতো আছে কিনা তা পরীক্ষা করে নিচ্ছে। রায়য়ানের বাড়িতে একটি বড় পার্টিতে যাবার জন্য রেডি হচ্ছে সে। আজ সে হালকা গোলাপি শাড়ি পরেছে, যার ঝলমলে কাজগুলো সুমুর মাধুর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে। তার মুখে সূক্ষ্ম হাসি, কিন্তু চোখে একটা ছোট্ট অনিশ্চয়তা লুকিয়ে আছে। সে জানে, এই পার্টি শুধু আনন্দ নয়, কিছু জটিলতাও বয়ে আনতে পারে।
নাতাশা পাশে এসে দাঁড়িয়ে সুমুর চুল ঠিক করে দিয়ে বলল,
“আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে, ম্যাম। যেমনটা সবসময়ই লাগে।”
সুমু একটু হেসে বলল,
“খান সাহেব কোথায়?”
“ম্যাম, স্যার আর স্যারের ওই অ্যাসিস্টেন্ট ড্রয়িংরুমে বসে আছে।”
“ড্রয়িংরুমে বসে আছে? গিয়ে দেখোতো কী করছে দুজনে।”
“ওকে ম্যাম!”
নাতাশা চলে গেল। সুমু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবারও একবার নিজেকে দেখায় ব্যস্ত হলো।
নাতাশা নিচে নেমে এলো। নিচে নামতেই সে দেখল, শেরাজ আর স্যান্ডি মিলে কিটিকে ধরে রেখেছে। নাতাশা দৌড়ে গিয়ে বলল,
“কিটিকে এভাবে ধরে রেখেছেন কেনো আপনারা?”
শেরাজ তাকাতেই নাতাশা চুপ করে গেল। স্যান্ডি নাতাশার সামনে এসে বলল,
“ওর ইয়ে চেক করছি। আপনার কোনো সমস্যা?”
নাতাশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ইয়ে মানে?”
“আপনাকে বলব না।”
“এখানেই দাঁড়ান। আমি এক্ষুনি ম্যামকে ডেকে আনছি।”
নাতাশা উপরে চলে গেল। শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“সান, আমার বউ আসার আগে ওর ইয়েটা চেক করো।”
স্যান্ডি থতমত খেয়ে বলল,
“স্যার, আপনি করুন না।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“অসম্ভব! ও যদি মেয়ে হয়? আমি অন্য মেয়েদের এসব দিকে তাকাতে পারব না। আমার ঘরে বউ আছে।”
স্যান্ডি কান্নাভেজা গলায় বলল,
“স্যার, আমার ঘরে বউ নেই। আমি ইনোসেন্ট একটা ছেলে। মেয়েদের দিকে তাকাই না। বিয়ের আগে অন্য মেয়ের এসব দেখলে, আমার গায়ে কলঙ্ক লেগে যাবে, স্যার।”
“আরে সান, ছেলেদের গায়ে কলঙ্ক লাগেনা। তুমি চেক করো।”
স্যার, ওর নাম তো কিটি, তার মানে ও মেয়েই হবে। আপনি ওতো চিন্তা করবেন না।”
শেরাজ রাগি লুকে তাকিয়ে বলল,
“আগে তুমি চেক করো। ও কিটি না ক্যাট—সেইটা চেক করার পরেই বোঝা যাবে।”
স্যান্ডি আর কিছু বলার সাহস পেল না। সে চোখ বন্ধ করে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে বিড়ালটাকে উঁচু করে ধরল। শেরাজের মন ফোনের দিকে। স্যান্ডি প্রথমে এক চোখ খুলে তাকাল। বিড়ালটা ছেলে বিড়াল দেখে সে দু’চোখ খুলে বলল,
“স্যার, এইটা ছেলে বিড়াল।”
শেরাজ ফোন রেখে উঠে দাঁড়াল। সে স্যান্ডির কাছে এসে বিড়ালকে হাতে নিয়ে বলল,
“তাই তো বলি, এই শালা সারাদিন আমার বউয়ের গা ঘেঁষে কোলে উঠে বসে থাকে কেনো। শালা ক্যারেক্টারলেস! অন্যের বউয়ের দিকে নজর।”
“স্যার, এইটা কিটি না ক্যাট। ম্যাম এর ইয়ে না চেক করেই নাম রেখেছে।”
শেরাজ খানিকটা উঁচু গলায় বলল,
“আমার বউ কেন অন্য পুরুষের ইয়ে দেখবে? ভালোই হয়েছে আমার বউ ওর ইয়ে চেক করেনি। কিন্তু দেখলে তো, এই শালা সারাদিন আমার বউয়ের গায়ে লেগে থাকে, কোলে উঠে বসে থাকে। একেবারে চরিত্রহীন, আমার বউ ছাড়া অন্য কিছু বুঝেনা”, সে কিটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই তোকে আমি লেডি কিটি এনে দিব।”
স্যান্ডি লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল,
“স্যার, এই বিড়ালটা আসলেই একটু বেশি ‘অ্যাটাচড’। সব সময় মিয়াও করে ম্যামের কোলে চড়ে বসে।”
ওদের কথাবার্তার মধ্যেই সুমু আর নাতাশা সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। সুমুর মুখে সতেজ এক হাসি, আর চোখে স্পষ্ট একটা আত্মবিশ্বাস। নাতাশা পাশ থেকে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ম্যাম, সব ঠিকঠাক হয়েছে? পার্টিতে যাওয়ার জন্য রেডি তো?”
সুমু মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, আজ একটু আলাদা মেজাজে যাচ্ছি।”
নাতাশা উৎসাহ দিয়ে বলল,
“এই আত্মবিশ্বাসই আপনাকে সবার থেকে আলাদা করবে।”
দুজনে কথা বলতে বলতে নিচে নামল। শেরাজ কিটিকে স্যান্ডির হাতে দিয়ে সুমুর কাছে গেল। নাতাশা স্যান্ডির হাত থেকে কিটিকে নিয়ে কিটির রুমে রেখে আসতে গেল।
শেরাজ সুমুর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আজকে তোমার রূপ যেন পুরো রাতের অন্ধকারকে ছাপিয়ে আলোকিত হয়ে গেছে। তোমার চোখের এই জ্বলজ্বলানি, ওই মাধুর্যময় হাসি — সব মিলিয়ে যেন এক পূর্ণিমার চাঁদের আভা।
সুমু চুপ করে শুনলো। শেরাজ আরও একটু এগিয়ে এসে কণ্ঠস্বর নরম করে বলল,
“তোমার এই সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক নয়, তোমার মনের আলোকেও আলোকিত করে।”
সুমু লাজুক হয়ে একটু তাকিয়ে থেকে বলল,
“এবার যাওয়া যাক?”
“হুম চলো!”
“আর সি: দ্য ব্ল্যাক হেভেন” আজ পুরো অন্যরকম ভাবে সেজেছে। রায়য়ানের বাসার গেটের সামনে ঝলমলে আলো ঝলমল করছে, ড্রেসডাউন আর বিলাসবহুল সাজসজ্জা চোখে পড়ছে। ভেতরে ঢুকতেই সুমুর চোখে পড়ল বড় বড় ক্রিস্টালের ঝুমরি বাতি, আর জানালা দিয়ে প্রবাহিত সন্ধ্যার হালকা হাওয়া পুরো ঘরকে করে তুলেছে স্বপ্নময়। সবার মধ্যে জমে উঠেছে পার্টির মেজাজ। মিউজিকের রিদমে কেউ নাচছে, কেউ হাসছে, আর কেউ মাদকসেবার মাঝে কথা বলছে। রায়য়ান নিজেও মাইক্রোফোন হাতে হাসিমুখে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছে।
সুমু একটু একটু করে সবাইকে চেনে, কেউ তাকে হাই জানাচ্ছে, কেউ প্রশংসার কথা বলছে। নাতাশা সুমুর পাশে এসে বলল,
“ম্যাম, আজকের এই পরিবেশে আপনি অসাধারণ লাগছেন।”
সুমু আলতো হাসল। আরিয়ান আর রায়য়ান দূর থেকে সুমু আর শেরাজকে ঢুকতে দেখে এগিয়ে এলো। আরিয়ান এখন পর্যন্ত রায়য়ানের সাথে কথা বলেনি। রায়য়ান আর আরিয়ানকে একসাথে এগিয়ে আসতে দেখে সুমু একটু অপ্রস্তুত হলো। শেরাজ ওদের একসাথে এগিয়ে আসতে দেখে বাঁকা হাসল।
রায়য়ান একটু এগিয়ে এসে, মাইক্রোফোন হাতে হাসি দিয়ে বলল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, দ্য মোমেন্ট উইভ অল বিন ওয়েটিং ফর হ্যাজ অ্যারাইভড। দ্য পারসন ইন হুজ অনার দিস পার্টি ইজ বিয়িং হেল্ড ইজ হিয়ার উইথ আস টুনাইট। প্লিজ জয়েন মি ইন গিভিং আ ওয়ার্ম অ্যান্ড হার্টফেল্ট ওয়েলকাম টু আওয়ার স্পেশাল গেস্ট, সুমু।”
সবার চোখ সুমুর দিকে ফিরল। সবাই হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাতে শুরু করল। রায়য়ান তার হাসি বজায় রেখে বলল,
“সুমু, তোমার মতো মানুষকে পেয়ে আমরা সবাই ধন্য। আজকের রাতটা শুধু তোমার জন্য, পুরোটা উপভোগ করো।”
পার্টি শুরু হলো একেবারে জমজমাটভাবে। ডিজে বক্স থেকে ভেসে আসছে তীব্র বেসের সঙ্গে ইংলিশ আর হিন্দি গানের মিক্স। হলঘরের একপাশে বার কাউন্টার—রঙিন বোতল, রঙিন ককটেল, আর গ্লাসের টুংটাং শব্দে সরগরম। অন্যপাশে ফুড কর্নারে সাজানো বিভিন্ন দেশের খাবার—সুশি থেকে শুরু করে কাবাব, চকলেট ফোয়ারা থেকে শুরু করে আইসক্রিম বার।
সুমু চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখল। রঙিন আলো, মানুষের হাসির শব্দ, আর মাঝে মাঝে ভেসে আসা ফ্ল্যাশলাইটের ঝলক—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, “আর সি: দ্য ব্ল্যাক হেভেন” সত্যিকার অর্থে স্বর্গের মতো একটা রাত শুরু হয়েছে।
রায়য়ান দূর থেকে সুমুকে দেখে এগিয়ে এলো। হাতে শ্যাম্পেন গ্লাস। সে মুচকি হেসে বলল,
“ইনজয় দ্যা নাইট, প্রিন্সেস।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি নিয়ে খানিকটা পেছনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ আরিয়ান মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“তো লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আজকের পার্টির আসল তারকাদের নিয়ে একসাথে মিলে একটা যুগলবন্দী গান পরিবেশন করা যাক? কেমন হবে? যেমন ধরুন—মিসেস খান, মিস্টার খান, মিস্টার রায়য়ান চৌধুরী আর আমি।”
সবাই উৎসাহে হাততালি দিতে লাগল। সুমু রাজি হলো না। কিন্তু সকলের রিকোয়েস্ট শেষমেশ সে রাজি হলো। রায়য়ান পেছন ফিরে সঙ্গীতের লয় ধরার জন্য মিউজিশিয়ানদের ইশারা দিল। পার্টির বাতাস যেন এক মুহূর্তে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। আরিয়ান সবাইকে স্টেজে ডাকল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে স্টেজে উঠে এলো। তাদের সাথে রায়য়ানও এলো। একজন লোক এসে সুমু, শেরাজ আর রায়য়ানের হাতে মাইক্রোফোন দিয়ে গেল। পার্টিতে উপস্থিত সকলে উৎসাহ দিতে লাগল। হলরুমের লাইট অফ হয়ে গেল। শুধু স্টেজের ওপর স্পটলাইট পড়ল। সুমু একবার শেরাজের দিকে তাকাল। তারপর মনের কোন এক ভাবনা থেকে গান ধরল,
“আই’ম সো লোনলি, ব্রোকেন অ্যাঞ্জেল
আই’ম সো লোনলি, লিসেন টু মাই হার্ট!”
গানের দ্বিতীয় কলি ধরল শেরাজ,
“ইউ, ইউ আর দা ওয়ান
আই মিস ইউ সো মাচ
নাও দ্যাট ইউ’আর গন
ডোন্ট, ডোন্ট বি অ্যাফ্রেইড
আই’ল বি বাই ইওর সাইড
লিডিং দা ওয়ে!”
তারপরের কলি আবারও ধরল সুমু,
“আই’ম সো লোনলি, ব্রোকেন অ্যাঞ্জেল
আই’ম সো লোনলি, লিসেন টু মাই হার্ট
ওয়ান অ্যান্ড অনলি ব্রোকেন অ্যাঞ্জেল
কম অ্যান্ড সেভ মি বিফোর আই ফল অ্যাপার্ট!”
সুমু থামতেই এবার রায়য়ান শুরু করল,
“আই উইশ দ্যাট আই কুড টাচ
টাচ ইউ এগেইন
ফিলিং ইন লাভ
ডোন’t ওয়ান্ট ইট টু আ্যন্ড!”
পরের কলি ধরল আরিয়ান,
“টু, টু ওয়ার্ডস অ্যাপার্ট
লেস ইন আ ড্রিম
ইট’স ব্রেকিং মাই হার্ট!”
গান শেষ হতেই স্টেজে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। না করতালির শব্দ, না ফিসফিসানি —মুহূর্তের জন্য সবাই যেন থেমে গেল। স্টেজে দাঁড়ানো চারজন মানুষের হৃদয়ের ভেতর থাকা গোপন ব্যথা হয়ত আজ একটু হলেও সকলের সামনে প্রকাশ পেল। সুরের শেষ প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার পরও, সেই আবেগমাখা পরিবেশে শ্বাস নেওয়াটাও যেন কষ্টকর হয়ে উঠল। হলরুমের বাতাস ভারী হয়ে এলো—ভরা চোখ, থমকে যাওয়া দৃষ্টি, আর এক গভীর প্রশংসার নীরবতা চারপাশে ছড়িয়ে।
প্রথমে এক কোণে বসে থাকা নাতাশা আর স্যান্ডি পরিবেশটাকে স্বাভাবিক করার জন্য হাততালি দিয়ে উঠল। ওদের দুজনকে দেখে ধীরে ধীরে হাততালি দেওয়া শুরু করল সকলে। ধীরে ধীরে গোটা হলরুম হাততালিতে ভরে উঠল। কারো চোখে অশ্রু, কারো ঠোঁটে বিস্ময়ের হাসি।
শেরাজের দৃষ্টি সুমুর চোখে আটকে রইল। স্পটলাইটে দাঁড়িয়ে সুমুর গাল সামান্য লাল হয়ে উঠেছে, ঠোঁট শুকনো, কিন্তু চোখ ভরা অদ্ভুত এক আলোয়, যেন এই গান গেয়ে সে নিজের হৃদয়ের একটা গোপন ব্যথাময় অংশ সবার সামনে উন্মোচন করে ফেলেছে।
রায়য়ান আর আরিয়ান দু’জনেই মৃদু হেসে মাইক্রোফোন নামিয়ে রাখল। গানের শেষে যেই নীরবতা ভেঙে গেল, এবার শুরু হলো পার্টির আরেকটি উচ্ছ্বাস, ড্যান্সের আবদার। হলরুম জুড়ে সবাই একযোগে চিৎকার করে বলল,
“স্পেশাল গেস্টের ড্যান্স দেখব।”
সুমু সবার ভীড়ে একটু হেসে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“নিজেকে এমন জায়গায় এনেছ—এসব এখন স্বাভাবিক। নিজের মনে কথা শোনো। আমি তোমাকে আমার থেকে দূরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনকিছুতে বাঁধা দিব না।”
সুমুর মধ্যে যেন এক মিষ্টি প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। তার হাত শেরাজের হাতের ওপর নরম করে রেখে সে মাথা ঝোঁকলো। স্পটলাইট ধীরে ধীরে আবার তার ওপর পড়তে লাগল। শেরাজ, আরিয়ান আর রায়য়ান স্টেজ থেকে নেমে গেল। স্পটলাইট একবার অফ হতে সুমু শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে নিল। স্পটলাইট আবার অন হতেই মিউজিক শুরু হলো,
“নাজার জো তেরি লাগি, মে দিওয়ানি হো গায়ি
দিওয়ানি হাঁ দিওয়ানি, দিওয়ানি হো গায়ি
মাশহুর মেরে ইষ্ক কি কাহানি হো গায়ি
জো জাগ নে না মানি তো ম্যায়নে ভি থানি
কাহাঁ থি ম্যায় দেখো কাহাঁ চালি আয়ি
কেহেতে হে, ইয়ে দিওয়ানি, মস্তানি হো গায়ি!”
গানের বিটের সঙ্গে সুমু আজ যেন আর থামল না। সে স্টেজের ওপর ঘুরছে, মনের আনন্দ আর বেদনা মিশিয়ে। হলরুমের সবাই স্তব্ধ হয়ে একটার পর একটা মূর্ছনা শুনছে। আরিয়ান আর রায়য়ান দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার আগেই, শেরাজ তাড়াতাড়ি দৌড়ে গিয়ে সুমুকে ধরে ফেলল। অসুস্থ শরীরের মেয়েটা নেতিয়ে পড়ল তার প্রিয় মানুষটার বুকে। সুমুর জ্বরটা আবারও ফিরে এসেছে। শেরাজ জড়িয়ে ধরে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, যেন সব কষ্ট ও ভয়কে ঢেকে ফেলতে চাইছে সে।
কিছু সময় নীরবতার পর, সুমু ধীরে ধীরে মুখ তুলে শেরাজের দিকে তাকাল। তার চোখে বেদনার পাশাপাশি এক আলোর আভা ঝলমল করছে। আলতো হাসি দিয়ে আস্তে আস্তে বলল,
“আমি তো শুধু আমার আপনিটাকে নিয়ে, আমাদের ছোট্ট একটা সুন্দর সংসার চেয়েছিলাম, খান সাহেব। যেখানে শুধু ভালোবাসা থাকত, কোনো কষ্ট না, কোনো জোরাজুরি না। কিন্তু, আপনারা তিন পুরুষ তো আমাকে নিয়ে খেলতে লাগলেন। আমাকে ফেলে দিলেন আপনাদের জেদের এক আবরণে। আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনার ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয়, কিন্তু পেলাম এক অচেনা যুদ্ধক্ষেত্র।”
শেরাজ কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়ে বলল,
“সুইটহার্ট, আমি জানি আমি সবসময় কঠোর থাকি, কিন্তু আমার এই কঠোরতার নিচে তোমার জন্য অগাধ ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। আমি কখনও তোমাকে দুঃখ দিতে চাইনি। তোমার যন্ত্রণাগুলো আমার হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। তুমি আমার জীবন, আমার শান্তি। যে যুদ্ধক্ষেত্র তুমি দেখেছ, আমি সেটা মুছে দিব। কিন্তু তোমাকে নিজের করে রাখার জন্য যদি এমন যুদ্ধ বার বার ঘোষণা করতে হয় আমার— তবে আমি তাই করব।”
সুমুর চোখে মিশে আছে ক্লান্তি আর আশার আলো, আর শেরাজের চোখে অঙ্গীকার আর সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি। হলরুমের আলো যেন ম্লান হয়ে গেছে, সবাই সুমুরাজের সেই মধুর এবং বিষাদের মিশ্র অনুভূতিতে নিমগ্ন।
শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আমার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ তুমি। আমি যতই কঠোর হই না কেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ের সব দরজা খোলা। তুমি যেখানেই যাও, আমি তোমার সঙ্গে আছি।”
আরিয়ান আর রায়য়ান একটু এগিয়ে এলো সুমুকে দেখতে। কিন্তু শেরাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তারা নিজেকে থামাল। শেরাজ মৃদু বাঁকা হেসে বলল,
“এই জিনিস সামলানোর ক্ষমতা শুধু আমারই আছে— তোদের নেই। তাই, দূরে থাক।”
এক জোড়া হাত জোরালো হয়ে সুমুর কোমর ঘিরে ধরে, ধীরে ধীরে হলরুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন ঘোষণা দিল—সুমুকে আর কেউ কষ্ট দিতে পারবে না। সুমু শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে, অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“জীবনের সমস্ত যুদ্ধ যত কঠিনই হোক, আমি কখনও একা নই, আমার পাশে আছে এমন একজন— যিনি সব যুদ্ধের জন্য সবসময় প্রস্তুত।
রুফটপে হালকা বাতাসে দাঁড়িয়ে আছে রায়য়ান। একের পর এক সিগারেট ফুঁকছে, ধোঁয়া মনমরা আকাশে মিশে যাচ্ছে। তার চোখে অদ্ভুত এক কঠোরতা, যেন অন্তরে বুনেছে কোনো অমীমাংসিত ঘৃণা।
পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মাহিন, চুপচাপ ও স্থির হয়ে। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, শুধু নিঃশ্বাস নিয়েছে গভীর এক নিঃশ্বাস, যেন অনেক কথা জমে আছে তার গলার। সে নিরবতা ভেঙে বলল,
“তিনবছর সময় পেয়েও ম্যামকে কিছু জানালেন না কেনো, বস?”
রায়য়ান আবারও একটা সিগারেট ধরিয়ে হালকা হেসে বলল,
“বললে আমাদের মাঝে বন্ধুত্বটাও থাকত না। ও কখনোই আমাকে গ্রহণ করত না। তিন বছর ধরে যখন ও আমার কাছে ছিল—দিনে মিথ্যা হাসি আর রাতে হৃদয় ছেঁড়া আর্তনাদ নিয়ে ছিল। ওর কান্না কেউ না শুনতে পেলেও, আমি পেতাম। তিন বছর ধরে ও এক সেকেন্ডের জন্যও এস.কে’কে ভুলতে পারেনি।”
“কিন্তু বস, আপনি…”
“আমি চাই ও সুখে থাকুক। আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। কিন্তু আমি চাই ও সুখে থাকুক। ভালোবাসা মানে শুধু নিজের নয়, তার ভালো থাকা দেখতে হয়। থাকুক না সে আমার থেকে দূরে, না হোক সে আমার—তবুও সে সুখে থাকুক।”
“বস, আপনি কেন আপনার মনে কথা প্রকাশ করেন না?”
রায়য়ান হাসল। সে সিগারেট টানতে টানতে বলল,
“যখন বুঝলাম, চোখের জল সব ব্যথা প্রকাশ করতে পারে না। তখন থেকেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখলাম আমার সব ব্যথা।”
“যখন অনুভব করলাম, সব কথা বললেও কেউ বুঝবে না। তখন থেকেই মন খুলে বলা বন্ধ করে দিলাম।”
“যখন দেখলাম, আবেগ প্রকাশ করলে শুধু ক্ষত বাড়ে। তখন থেকেই অনুভূতিগুলোকে নিজের ভেতরে কবর দিয়ে রাখলাম।”
“যখন বুঝতে পারলাম, বুকের ব্যথা মুখ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তখন থেকেই চুপ হয়ে গেলাম।”
“যখন বুঝলাম, বুকের ভার হালকা করার জন্য সব কান প্রস্তুত নয়। তখন থেকেই নিজের সঙ্গেই কথা বলা শিখে গেলাম।”
“যখন অনুভব করলাম, আমার নীরবতা কারও কাছে গল্প নয়। তখন থেকেই শব্দের বদলে নিঃশ্বাসে জমিয়ে রাখলাম আমার সব ব্যথা।”
“যখন দেখলাম, মনের কথা বললেই শুধু ভুল বোঝা হয়। তখন থেকেই চুপ থাকাকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বানালাম।”
খান সাহেব পর্ব ৬৩
“যখন বুঝলাম, সব ব্যথার ভাষা নেই। তখন থেকেই মনে মনে চিৎকার করে বাইরে থেকে নীরব হয়ে গেলাম।”
“যখন শিখে গেলাম, সব কষ্টের ভাষা হয় না। তখন থেকেই নীরবতা হয়ে গেল আমার একমাত্র আশ্রয়।”
পুরো কথাগুলো সে থেমে থেমে বলল। মাহিন শুনলো তার বসের কথা। একটা মানুষ কতটা যন্ত্রণা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে নিজেকে পাথর, পাষাণ করে গড়ে তুলেছে— আজ মাহিন হয়ত তার কিছুটা বুঝতে পারল। হঠাৎ মাহিনের কাঁধে হাত রাখল কেউ। সে পেছনে তাকাতেই দেখল আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।
