Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৯

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৯

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৯
jannatul firdaus mithila

হিমশীতল কক্ষ! গোলাকার নরম বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে মাহি। জ্ঞান ফেরার নাম অব্ধি নেই এখনো। মেইডেন ইরা চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন মাহির পায়ের কাছে। বারেবারে উদ্বিগ্ন চোখে হালচাল দেখছেন মেয়েটার। এরইমধ্যে কক্ষের দুয়ারের দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড দু’জন কেমন সশব্দে পা ফেললেন মেঝেতে। মেইডেন তক্ষুনি বুঝে গেলেন — মনস্টারের আগমনী সংকেত! সঙ্গে সঙ্গে মাথা নুইয়ে সরে দাঁড়ালেন বিছানার কাছ থেকে। দু’হাত পেটের কাছে বেঁধে রেখে দাঁড়িয়ে আছেন মধ্যবয়সী, দৃষ্টি নত তার। কিয়তক্ষন বাদে সেই নুইয়ে রাখা দৃষ্টিতে তিনি কেবল দেখলেন — দরজা দিয়ে দাম্ভিক কদমে ভেতরে ঢুকেছে মনস্টার। হাতের দু-আঙুলের ইশারায় তাকে বোঝালো — ঘর থেকে বের হতে। মেইডেন আজ্ঞাকারী মানুষ! তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে খানিক কুর্নিশ জানিয়ে ফটাফট কদমে চলে গেলেন ঘর ছেড়ে।

তিনি যেতেই গার্ডদের মধ্য থেকে একজন একইভাবে দৃষ্টি নত রেখে কক্ষের ভারী দরজাটা আলগোছে টেনে দিলেন। বিশালাকার কক্ষটি এবার সম্পূর্ণ মুগ্ধের আয়ত্ত্বে। সুদর্শন যুবক কেমন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কামরার মাঝ বরাবর। উদোম গায়ে তার লেপ্টে আছে বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা। ঘাড় সমান চুলগুলো থেকে সম্পূর্ণ বুক-পিঠে চুইয়ে পড়ছে পানি। পরনে কেবলমাত্র ঢিলেঢালা কালো রঙা ট্রাউজার! একহাতে তার হুইস্কির বোতল, অন্যহাতের মধ্যমা এবং তর্জনীর ভাঁজে জ্বলছে মোটা সিগার। যুবকের বাদামী চোখজোড়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আপাতত বিছানায় পড়ে থাকা মাহিতে নিবদ্ধ। কপালে তার গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ, দৃঢ় চোয়াল ফুটে আছে শক্তভাবে। সে নিজের দৃষ্টি ঠায় বজায় রেখে একটু একটু করে সিগারের শেষ ভাগে টান বসাচ্ছে বেশ। কক্ষের সম্মুখের দেয়ালে ঝুলন্ত লম্বা ঘড়িটায় ঘন্টার কাটাঁ ঢংঢং শব্দ তুলে বাজছে, জানান দিচ্ছে — মধ্যরাতের আগমনী বার্তা। মুগ্ধ শুনল, ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে ধীরে ধীরে সিগারের কলুষিত ধোঁয়াগুলো বের করতে করতে পা বাড়ালো বিছানার কাছে।

ঘুমন্ত নিষ্পাপ মাহি! দিনদুনিয়ার সকল মোহ মায়া যেন মেয়েটার মুখে বিরাজ করেছে আজ। সফেদ রঙা সিল্কের গাউনে কি শুভ্রই না দেখাচ্ছে তাকে! অথচ মুগ্ধের মতো নির্দয় মানবের মন গললো না তা দেখে। সে এগিয়ে এসে দাঁড়াল মাহির মাথার কাছে। অতঃপর একমুহূর্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে, হাতে থাকা হুইস্কির বোতলটা সামান্য উঁচিয়ে এনে মুখ দিয়ে টেনে খুলল বোতলের ক্যাপ। তারপর ক্যাপটা সজোরে দূরে ছুঁড়ে ফেলে অসভ্য ছেলে ঘটায় আরেক কান্ড! হুইস্কির বোতলটা মাহির মুখের ওপর উল্টো করে ধরতেই সম্পূর্ণ বোতল থেকে তীব্র গন্ধযুক্ত এলকোহল ঝরঝরিয়ে পড়ল মাহির মুখের ওপর। একে-তো হুটহাট তরলের ঝাপটা, তারওপর এহেন মাত্রাতিরিক্ত গন্ধযুক্ত! মাহির অচেতন মস্তিষ্ক সজাগ হতে খুব একটা সময় নিলো না যেন। নিবুনিবু চোখে মেয়েটা কেমন ধীরে ধীরে চোখদুটো মেললো। কিয়তক্ষন ঝাপ্সা চোখেই তাকিয়ে রইল সম্মুখে। সামনে তো কেউ নেই! মাহির অচেতন মস্তিষ্ক এখনো ফাঁকা। ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে ঘোলাটে অবস্থা কাটতেই মেয়েটা কেমন নড়েচড়ে উঠল। তখনকার ঘটনাগুলো সবটা একে একে মনে পড়তে লাগল। মুহুর্তেই মেয়েটার চোখেমুখে খেলে গেল এক অনিমেষ আতঙ্কের ছাপ! সে তৎক্ষনাৎ উদ্বিগ্ন হয়ে শোয়া ছেড়ে উঠে বসে। বোকার ন্যায় নিজের দিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দৃষ্টি ফেলে অস্ফুটে শুধায়,

“ আমি এখনো মরিনি? বেঁচে আছি তাহলে? না-কি স্বপ্ন দেখছি এখনো?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই মাহির কর্ণকুহরে ভেসে এলো অতিপরিচিত এক গম্ভীর অথচ খোঁচা মারা কন্ঠ,
“ কাছে আয় বান্দীর মেয়ে! কান বরাবর কষিয়ে কয়েকটা বসালেই বুঝবি — জেগে আছিস না-কি স্বপ্ন দেখছিস!”
তক্ষুনি ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায় মাহি। দেখতে পায় বলিষ্ঠ পুরুষের ছয়খন্ড বিশিষ্ট উদরের পেশি। মাহি শুকনো ঢোক গিললো সামান্য। রয়েসয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল মুগ্ধের কঠিন মুখপানে। শুষ্ক হয়ে যাওয়া অধরজোড়া জিভ দিয়ে খানিক ভিজিয়ে নিতেই মুগ্ধ কেমন তেতেঁ উঠল কেন যেন। তৎক্ষনাৎ কপালের চামড়ায় বিরক্তির ভাঁজগুলো বেশ স্পষ্ট করে, চিড়বিড় করা কন্ঠে বলল,
“ নির্লজ্জ লুচ্চা মেয়েছেলে! পুরুষ মানুষ দেখলেই ঠোঁট ভেজাতে মন চায় তাই-না? ছিহঃ ছিহঃ! অসভ্য মেয়ে একটা!”
হতভম্ব মাহি! লোকটার ভয়ে ঠোঁট শুকিয়েছে তার, অথচ এহেন শুকনো কাঠ হয়ে যাওয়া অধরজোড় একটুখানি জিভ দিয়ে ভেজানো নিয়ে লোকটা তাকে এতকিছু শুনিয়ে দিলো? মাহি মোটেও চুপচাপ হজম করল না কথাটা। তক্ষুনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল,

“ আপনি আমার ঠোঁটের দিকে তাকালেন কেনো? আমার ঠোঁট, আমি যা মন চায় আমি করব! কামড়াতে মন চাইলে কামড়াবো, ভেজাতে মন চাইলে ভেজাবো। আপনি তাকাবেন কেন? দোষ তো তাহলে আপনার চরিত্রে!”
এহেন একখানা পুচকে মেয়ের মুখে চরিত্র নিয়ে কথা শোনায় সে-কি তেজ দেখাচ্ছে মুগ্ধ! দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তক্ষুনি হাত থেকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল হুইস্কির খালি বোতলটা। মুহূর্তেই এক বিকট শব্দে কাঁচের বোতলটা কেমন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে গেল পুরো মেঝেতে। মাহি হতবিহ্বল! কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক দানবীয় হাতের থাবা এসে বসল তার চুলের গোছায়। মাহি ককিয়ে ওঠে চুলের তীব্র যন্ত্রণায়। ঠোঁট গলিয়ে আর্তনাদ ভাসছে তার। চোখদুটো নিমিষেই হলো ছলছল। মুখ কুঁচকে ব্যাথাগুলো হজম করার পায়তারা করতেই শোনা গেল মুগ্ধের গর্জে উঠা কন্ঠ,

“ ইউ ব্লা*ডি বিচ! কোন সাহসে তুই আমার চরিত্র নিয়ে কথা তুললি? উত্তর দে জানোয়ারের বাচ্চা! তোর মতো যাচ্ছে তা-ই মেয়ের এতবড় স্পর্ধা আসে কোত্থেকে? যে কিনা আমার, দি শ্যাডো মনস্টারের চরিত্র নিয়ে কথা বলে!”
কিচ্ছু শুনছেনা মাহি, ঠোঁট কামড়ে কেবল সহ্য করে যাচ্ছে ব্যথাগুলো। এদিকে মুগ্ধের রাগ তরতর করে বাড়ছে বৈ কমছেনা। মাহিকে এখনো চোখমুখ কুঁচকে রাখতে দেখে সে তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিলো মাহির চুলের গোছা। মাহি ভাবলো হয়তো দানবটা ছেড়েছে তাকে, তবে সে কি আর জানতো? দানবটা নিজের আসল দানবীয় রূপে ফিরবে এক্ষুণি! মুগ্ধ কেমন নির্দয়ভাবে মাহির ডানহাতের কব্জি টেনে হাতের তালুটা উম্মুক্ত করল। অতঃপর চোখের পলকে সে হাতে জ্বলন্ত সিগারটা চেপে ধরল নির্দয় মানব। মাহি চেঁচাচ্ছে! বুকভাঙা আর্তনাদে ছটফটিয়ে যাচ্ছে অনবরত। হাতটা মোচড়াতে থাকলেও লাভের লাভ তো হচ্ছেই না, উল্টো হাতটা মচকে যাচ্ছে তার। এদিকে মুগ্ধের বাদামী চোখদুটো জ্বলছে। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব ফের শক্ত হাতে গলা চেপে ধরে মাহির। এবারে বোধহয় গলার স্বর হারাবে মাহি, নয়তো কন্ঠা ফাটবে যেকোনো সময়। বেচারি হাঁপাচ্ছে, কন্ঠায় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে তার শ্বাসরুদ্ধ হচ্ছে ক্রমশ! এদিকে মুগ্ধ নামক ভয়াল যুবকের পেশিবহুল হাতখানা দৃঢ় হচ্ছে দেখো! মাহির নিভে যাওয়া চোখপানে তাকিয়ে থেকে সে কেমন হিংস্র কন্ঠধ্বনিতে আওড়ায়,

“ সবাই তোর বাপের মতো রে জানোয়ারের বাচ্চা? নেক্সট টাইম কথাবার্তা বলার আগে বুঝেশুনে বলবি, কেননা আমি আবার অবাধ্য পুরুষ! নিজের জিভ আর হাতের ওপর বিন্দুমাত্র ভরসা নেই আমার। দেখা যাবে কোনো একদিন তোর জিহবার লাগাম ছুটে গেলে আমারও হাতের লাগাম ছুটে যাবে। হয়তো সেদিন সবার আগে তোর জিহবাটাকে টেনে ছিঁড়ে এনে প্রাডাকে খাওয়াব দ্যান তোর শরীরটা খাওয়াব সাইকিকে। মাইন্ড ইট!”
নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে মাহির। ছটফটানো কমে যাচ্ছে ক্রমশ। মুগ্ধ দেখল, বরাবরের ন্যায় এবারেও বিরক্ত হয়ে ছেলেটা কেমন দাঁত খিঁচে বলল,
“ এতবার গলা চেপে ধরি, তারপরও তোর দমটা একেবারে আঁটকায় না কেনো? বারবার চোখ উল্টে ফেলিস অথচ গলা ছেড়ে দিলে ঠিকই আবারও নিশ্বাস টানিস! এ্যাই তুই ম*রতে পারিস না? এতো এতো মা’র খেয়েও ক্যামনে মুখে মুখে তর্ক করিস তুই? বেলাজা বান্দীর মেয়ে!”

কথাটা বলেই চট করে হাতটা সরিয়ে ফেলে মুগ্ধ, সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার গাল বরাবর শুধু শুধুই সপাটে আসায় এক চড়! দূর্বল মাহি তৎক্ষনাৎ ছিটকে পড়ল বিছানায়। কন্ঠার ব্যথায় জান যায় যায় অবস্থা তার। মুগ্ধ ঠোঁট পিষে হাসলো মেয়েটার করুণ অবস্থা দেখে। একপা আলগোছে বিছানার ওপর উঠিয়ে এনে হালকা ঝুঁকে এলো মাহির দিকে। অতঃপর মাহির চুলগুলো পেছন থেকে একহাতে চেপে ধরে মুখ নামিয়ে আনলো মাহির কান বরাবর। ক্রুর কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,
“ আই হেট ইউ! আই জাস্ট হেট ইউ। এই পৃথিবীতে আমি যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে থাকি তাহলে সেটা হচ্ছিস তুই! যার গায়ে ঐ বাস্টার্ডের র*ক্ত! যতদিন না পর্যন্ত একটু একটু করে তিলে তিলে যন্ত্রনা দিয়ে তোর গা থেকে শেষ র*ক্তবিন্দুটা আমি ঝরিয়ে নিচ্ছি, ততদিন পর্যন্ত না চাইলেও বাঁচতে হবে তোকে। তুই যতবার নিজে থেকে ম*রতে চাইবি ঠিক ততবার তোকে ম*রণ যন্ত্রণা উপভোগ করাব আমি কিন্তু কিন্তু কিন্তু তোকে মা*রব না সাথে সাথে।”

শুনলো মাহি। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সহ্য করল সবটুকু কষ্ট। মুগ্ধ রয়েসয়ে ছেড়ে দিলো মাহির চুলের গোছা। সঙ্গে সঙ্গে আবারও এক হেঁচকা টানে মাহিকে ঘুরিয়ে নিলো নিজের দিকে। কান্নারত মাহি লাল হয়ে যাওয়া চোখদুটো দিয়ে কেমন তাকিয়ে রইল হতবাকের ন্যায়। এদিকে মুগ্ধের চোখেমুখে এক ভিন্ন আগুন। সে তৎক্ষনাৎ শক্ত থাবা বসায় মাহির চোয়াল বরাবর। নিজের অর্ধেকটা ভর মাহির ক্ষুদ্রকায় শরীরের ওপর ছেড়ে দিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ খুব তো চরিত্র নিয়ে কথা শোনাচ্ছিলি বান্দীর মেয়ে! বেশ তো, চরিত্রে যখন দোষ লাগবেই তাহলে কিছু করার পরেই দোষ লাগুক! আগে তোকে নিজের র*ক্ষি*তা বানাই! সো আয়…গিভ মি আ কিস!”

মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাতের থাবা এবার চোয়াল ছেড়ে ঠোঁট অব্ধি চলে এসেছে মেয়েটার। চেপে ধরেছে মাহির নরম গোলাপি অধরজোড়া। মাহি ছটফটাচ্ছে! ছাড়া পেতে উদ্বিগ্ন মেয়েটা হাত-পা ছুঁড়ছে বেশ। মুগ্ধ ফের নিজের বলিষ্ঠ দেহের নিচে মাহিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তার ভাব এমন, এই বুঝি মেয়েটাকে পিষে ফেলবে নিজের বলিষ্ঠ দেহের নিচে! সে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে মাহির অধরের দিকে। দু’জনার ঠোঁট যখন প্রায় ছুঁইছুঁই আচমকা মুগ্ধের চোখ পড়ল মাহির ছলছল চোখদুটোর দিকে। সপ্তদশীর চোখদুটো যেন কোন সাধারণ চোখ নয়, এ যেন এক নিখাঁদ গভীর ফাঁদ! মুগ্ধ থমকায়। লম্বা ঘনপল্লব বিশিষ্ট হরিণী চোখদুটো অসহায়ের মত তাকিয়ে আছে তার পানে। তাদের কতশত নিরব অভিযোগ! আশ্চর্য হলেও সত্যি! মুগ্ধ বেশ পড়তে পারছে তাদের অভিযোগ। তারা চিৎকার করে জানান দিচ্ছে — মুগ্ধ খারাপ, হিংস্র! মুগ্ধের বুকের বাঁপাশের পিঞ্জরের মাঝে লুকিয়ে থাকা পাথুরে অঙ্গটা কী লাফাচ্ছে? সে হঠাৎ দ্রিম দ্রিম শব্দ তুলছে কেনো? কি সমস্যা এর? মুগ্ধের একমুহূর্ত ইচ্ছে করল এক্ষুণি বেয়াদব অঙ্গটাকে ছুরি দিয়ে কেটে গা থেকে আলাদা করে ফেলতে। তার হাতদুটো কেমন আলগা হলো তার অজান্তেই।

এই ফাঁকে মাহি নড়ল! তক্ষুনি মুগ্ধের নজর পড়ল মেয়েটার নরম তুলতুলে অধরজোড়ার পানে। আশ্চর্য! এতো সুন্দর কেন মেয়েটার ঠোঁট দুটো? মনে হচ্ছে কোনো শিল্পী তার সারাজীবনের দক্ষতা দিয়ে একটু একটু করে এঁকেছে মেয়েটার ঠোঁট দুটো। তাদের তিরতির কম্পন নিশ্বাস আঁটকে দিচ্ছে নির্দয় মানবের। তার এতক্ষণের ক্রুরতা কোথায় যে পালালো কে জানে! চোখেমুখে ভর করল এক অদৃশ্য মায়াজাল। পিয়ার্সিং করা বাদামী ঠোঁটদুটো এবার হিংস্রতায় নয় বরং মুগ্ধতায় এগিয়ে আসতে চাইছে মেয়েটার নরম তুলতুলে অধরজোড়ার পানে। ওদিকে মাহি নিস্তব্ধ! বোধহয় তার ভাষ্যমতে চরিত্রহীন লোকটার চরিত্রহীন কার্যকলাপে বুক ভেঙে যাচ্ছে তার। অসহায় সপ্তদশীর না চাইতেও মেনে নিতে হচ্ছে সব। সে কেমন চোখমুখ কুঁচকে রেখেছে দেখো! মুগ্ধ এগুচ্ছে, মাহির তিরতির করতে থাকা ওষ্ঠপুটের সৌন্দর্য দেখে হুট করেই গলা শুকালো তার। এই প্রথম তার ঠোঁট দুটো এক অজানা তৃষ্ণায় ধুঁকছে যেন! সে তৎক্ষনাৎ জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নেয় একপলক। ভীষণ কামুকতায় ডুব দিয়ে মাহির ওষ্ঠপুটের সাথে নিজ অধর ডুবাতেই যাবে ওমনি তার কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠল এক ভয়ানক চিত্র!

লাল শাড়িতে সেজে থাকা এক সুন্দরী, তার পাদু’টো আলতা রাঙা! ললাটে স্পষ্ট বিয়ের সাজ। রমনীর ঘুমন্ত র*ক্তা*ক্ত মুখখানা মনে পরতেই তৎক্ষনাৎ শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে মুগ্ধের। বলিষ্ঠ পুরুষ যেন এতক্ষণে নিজের সম্বিৎ ফিরে পেল। তক্ষুনি মাহির ওপর থেকে উঠে গিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ায় সে। নিশ্বাস ক্রমশ জোরালো হচ্ছে তার, বুকের উঠানামা বেড়েছে করুণভাবে। মুগ্ধ রয়েসয়ে নিজের হাতদুটো সামনে এনে দেখে — তারা ফের কাঁপছে। বদনখানিও বোধহয় কাঁপছে তার। চোখের সামনে সবটা আবারও ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে কেন যেন। ওদিকে বিছানায় চোখমুখ কুঁচকে পড়ে থাকা মাহি দেখল না যুবকের এহেন ছটফট! দেখল না যুবকের কাঁপতে থাকা বদন। মুগ্ধ আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না সেথায়। তক্ষুনি ঢুলতে থাকা পায়ে ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। এদিকে বেশ কিছুক্ষণ হয়ে যাবার পরও গায়ে কোনো উটকো স্পর্শ না পেয়ে পিটপিট করে চোখ খুলে মাহি। সম্মুখে মুগ্ধকে দেখতে না পেয়ে তক্ষুনি চোখদুটো খুলে ফেলল এক ঝটকায়। আশেপাশে নজর বুলিয়েও মুগ্ধের কোনো হদিস পায়নি মেয়েটা। এতে যেন বুক চিঁড়ে ভীষণ স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরুলো তার। সময় নিয়ে দু’হাতে আলগোছে কাঁপতে থাকা বুকখানা চেপে ধরে, মেয়েটা কেমন ফুপিয়ে ওঠে। ব্যাথায় জর্জরিত কন্ঠায় একবুক কষ্ট নিয়ে অস্ফুটে আওড়ায়,
“ প্রকৃতি কাউকে খালি হাতে ফেরায় না হিংস্র মানব! রিভেঞ্জ অফ নেচার বলেও কিছু একটা থাকে। আজ আপনি আমায় ঠিক যতটা কষ্ট দিচ্ছেন, আল্লাহ করুক — এর দ্বিগুণটা যেন আপনাকে ভোগ করতে হয়।”

কাঁপা শরীর! টলমল পায়ে কোনরকমে প্যালেসের সেন্ট্রাল টাওয়ারের একমাত্র কামরা অব্ধি চলে এসেছে মুগ্ধ। বিশাল বড় কাঠের দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে আলগোছে ডান হাতটা উঠিয়ে রাখল দরজার ডানপাশের সেন্সর বোর্ডটার ওপর। মুহূর্তেই সেন্সর বোর্ড থেকে একখানা লাল রশ্মি বেরিয়ে এসে মুগ্ধের হাতখানা স্ক্যান করল সেকেন্ড ত্রিশেক সময় নিয়ে। অতঃপর স্ক্যান শেষে বিশালাকার দরজাটা খুলে গেল আলগোছে। মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ ভেতরে ঢুকলো। চোখের সামনে সবকিছু নিভে যাচ্ছে তার। মাথাটা ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়! আবারও, আজ আবারও তার প্যানিক এট্যাক উঠল। মুগ্ধ সইতে পারেনা এ কষ্ট! সইতে পারেনা পুরনো কথাগুলোর বিষাক্ত স্মৃতি! যুবক উদ্ভ্রান্তের ন্যায় অন্ধকার ঘরটায় ছুটল। কিছুটা এগিয়ে পা ঘোরালো বামদিকে। সেথায় পাঁচ কদম হেঁটেই হাত বাড়ালো সম্মুখে, বিশাল এক ধাক্কা দিতেই সামনে থেকে সরে গেল একখানা দরজা।মুগ্ধ কোনরূপ কালবিলম্ব না করে গোপন ঘরটায় প্রবেশ করে। হন্তদন্ত হয়ে পাগলের মতো অন্ধকার হাতড়ে দরজার কাছের সুইচটা টিপে দিতেই পুরো ঘরময় ছড়িয়ে গেল লাল ঘোলাটে আলোর বাতি।

দেখা গেল গোপন এ কামরার চারপাশের কাঁচের দেয়ালে সংরক্ষিত বিভিন্ন বিদেশি নামি-দামি ড্রা*গস। মুগ্ধ ঝাপসা চোখেই সামনে এগোয়। কাঁচের বাক্সে সংরক্ষিত উচ্চমাত্রার ড্রা*গ*সের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই বাহাতের কঠিন মুষ্টিবদ্ধ ঘুষি বসায় কাঁচের দেয়ালটার গায়ে। তৎক্ষনাৎ ঝনঝনিয়ে ভেঙে গেল দেয়ালটা। সেই সাথে কাঁচের টুকরো অংশ বিঁধে গিয়ে হাতটা থেঁতলে গেল মুগ্ধের। এতে অবশ্য বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই যুবকের। সে কেমন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় কাচেঁর বক্স থেকে ড্রা*গ*সটা তুলে এনে সিরিঞ্জ ভর্তি করল কাঁপা কাঁপা হাতে। অতঃপর আর দেরি না করে সে নিজেই নিজের বাহাতের মোটা শিরায় এক ঝটকায় পুশ করে দিল সবটুকু ড্রা*গ*স। সঙ্গে সঙ্গে পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে মুগ্ধের। বদনখানির অসহ্য কাঁপনে বেচারা কেমন হাঁটু গেঁড়ে বসলো মেঝেতে। চোখদুটো বুঁজে আসছে তার। মাথাভর্তি যন্ত্রণা গুলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে যেন। যুবকের মুখ থেকে অস্ফুটে কেবল বেরুলো,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৮

“ মা…ডাকব?”
অতঃপর? অতঃপর বলিষ্ঠ যুবক তার টানটান দেহ নিয়ে তক্ষুনি লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে মাথা রাখল পরম আয়েশে। আপনমনে বিড়বিড় করল,
“ ও আমার কেউ না মা! ও আমার শত্রু!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১০

1 COMMENT

Comments are closed.