খান সাহেব পর্ব ৬৭ (২)
সুমাইয়া জাহান
রাত নেমেছে। ড্রয়িংরুমের বাতি হালকা আলো ছড়াচ্ছে। বাইরে কোলাহলের ছুটি। সব কিছু যেন শান্ত, কিন্তু ভেতরে মনে হচ্ছে আবেগের ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সুমু একা বসে আছে রুমের সোফায়। চোখে এখনও সন্ধ্যার বিস্ময় ও অবাক হওয়া মিশে আছে। বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর নিঃশ্বাসের তাড়না। সে বাইরে থেকে ভেঙে পড়লেও নিজের মনকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
হঠাৎ দরজা খুলে শেরাজ প্রবেশ করল। সুমু তার দিকে তাকাল, কিন্তু কোন কথা বলল না। সে শান্তভাবে শুয়ে পড়ল, যেন নিজের ভেতরের অনুভূতি লুকানোর চেষ্টা করছে। শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর পাশে বসল। সে হাত বাড়াল, কিন্তু সরাসরি স্পর্শ করল না। কেবল চুপচাপ সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল।
সুমু চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিল। মনে হচ্ছে, শেরাজের উপস্থিতি শুধু তাকে শান্ত করছে না, বরং তার হৃদয়ের প্রতিটা অংশে একটা অদ্ভুত কম্পন ঘটাচ্ছে। শেরাজ ধীরে বলল,
“সুইটহার্ট! তুমি আজকের জন্য খুশি না, তাই না?”
সুমু কিছু না বলে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। শেরাজ ধীরে হাত বাড়িয়ে সুমুর চুলের ওপর হালকা আঙুল বুলালো। সুমু নড়ে উঠল, কিন্তু কোন কথা বলল না। মুহূর্তটা নিস্তব্ধ, শুধু তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শেরাজ একটু কাছাকাছি ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“কথা বলবে না?”
সুমু চোখ বন্ধ করে ধীরে বলল,
“আপনার সাথে আর কথা বলব না।”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“কথা বলো, নয়তো আজ রাতে তোমার সাইলেন্ট ভায়োলেন্স আমি বদলে দিবো।”
সুমু রাগ করে উঠে গেল। শেরাজ সুমুকে টেনে নিজের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“নারাজ হো তুম,
পার মে তুমহারি পাস আয়ু,
এক মুসকান সে,
সাব গাম মিটা দু!”
সুমু রাগ দেখিয়ে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে! আমার মেজাজ খারাপ, আর আপনি এখানে বসে বসে শায়েরি বলছেন? ওদেরকে কেন এনেছেন আপনি? আরিয়ানকে আপনি জানেন না? ও আমার সাথে কতটা খারাপ করেছিল ভুলে গেছেন? আর রোজা? রোজাকে কেন আনলেন? ভালো লাগছিল না নাকি রোজাকে ছাড়া? তাহলে রোজার কাছে যান। আমার কাছে কি? আমাকে ছাড়ুন! আমাকে ছোঁবেন না আপনি? আপনি জাস্ট অসহ্য। আমাকে ছাড়ুন। রোজার কাছে যান। আমি…”
শেরাজ সুমুর ঠোঁটে ঠোঁট মেশালো। সুমু দু’হাতে শেরাজকে সরানোর চেষ্টা করল। শেরাজ আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল সুমুকে। কিছু সময় যেতেই শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেতেই সুমু আবারও বলল,
“সরুন আপনি! আমার বিরক্ত লাগছে সবকিছু। এমনিতেই টেনশনে আছি। আপনি আরও টেনশন এনে দিলেন। আপনি…”
শেরাজ আবারও সুমুর ঠোঁটে ঠোঁট মেশালো। এবার আরও দীর্ঘ আর গভীর হলো তার ছোঁয়া। কিছু সময় পর শেরাজ ছেড়ে দিল সুমুকে। সুমু জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে শেরাজের বুকের ওপর ঢলে পড়ল। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা, কিন্তু সেই সাথে একচ্ছত্র অধিকারবোধ।
“সুইটহার্ট! তুমি রাগ করেছ, আমি জানি। কিন্তু আমাকে একটু সময় দাও। আমি শুধু চাই তোমার পাশে থাকতে, সবকিছু ঠিক করতে।”
সুমু হালকা কাঁপতে কাঁপতে পিছনে সরে গেল। কিন্তু শেরাজ তার হাত ধরে আবারও কাছে টেনে আনল।
“আমি জানি, আজকের ঘটনা তোমার জন্য সহজ নয়। ওদের এখানে আসাটা তোমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু এখন কিছু করার নেই, সুইটহার্ট। ওরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
সুমু চোখ বুঁজে ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। তার বুকের ভেতর ঝড়ের মতো অনুভূতি। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শেরাজের কোমলতা ও শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরার ছোঁয়া তাকে আর প্রতিহত করতে পারল না।
“রাগ করে না, বউ। আমি কখনও তোমাকে আঘাত দেব না। আমি শুধু চাই তুমি শান্ত হও, তোমার সব দুঃখ, সব চিন্তা ভুলে যাও।”
সুমু চোখ খুলে শেরাজের দিকে তাকাল। মুহূর্তে চোখে অশ্রু জমল তার। শেরাজ ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে সুমুর চুলের ওপর হালকা আঙুল বুলালো। সে ধীরে মাথা নিচু করে সুমুর কপালে ঠোঁট রাখল। অল্প মৃদু, কোমল চুম্বন—যার মধ্যে লুকানো যত্ন, সুরক্ষা আর গভীর ভালোবাসা। সুমু তার হাত শেরাজের কাঁধে রাখল। তার শরীরের প্রতিটা কোণ যেন শেরাজের ছোঁয়ায় জেগে উঠল। চোখ বন্ধ রেখে সে অনুভব করল, শেরাজ শুধু তার পাশে নেই, তার হৃদয়ও তার সঙ্গে মিলেছে। শেরাজ ধীরে সুমুর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে শুধু প্রেম আর কোমলতা, আরেকদিকে অদম্য অধিকারবোধ।
“আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না, সুইটহার্ট। তুমি আমার সব।”
শেরাজের কণ্ঠে এমন মৃদু আবেগ, যা সুমুর অন্তর থেকে সব ভয় ও দুঃখ মুছে দিচ্ছিল। সুমু হালকা হাসি দিয়ে চোখ মেলে তাকাল। সে ধীরে তার হাত শেরাজের হাতে রাখল। দুই হাত একে অপরকে স্পর্শ করল—শুধু স্পর্শ নয়, তাদের হৃদয়ের নিঃশব্দ কথাবার্তা, ভালোবাসার অদ্ভুত সংলাপ যেন এই স্পর্শে মধ্য দিয়ে শুরু হলো।
পরের দিন সকালে সূর্যের হালকা রোদ যেন নতুন উদ্দীপনা এনে দিয়েছে। সকলে একত্রিত হয়ে বিয়ের শপিং করার উদ্দেশ্যে বের হলো। সামিয়া, নাজমিন, ইনায়া, নাতাশা, ফারিন, ফারিয়া, আলিশা এক গাড়িতে উঠল। নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান, স্যান্ডি এক গাড়িতে উঠল। সুমু, শেরাজ, ইশিতা, আরবাজ, আইয়ুব, সারবাজ এক গাড়িতে উঠল। আর পেছনের গাড়িতে উঠল আরিয়ান, রায়য়ান, রোজা। তাদের শপিংমল পযর্ন্ত নিয়ে যাবে পিয়াস।
গাড়ির মধ্যে হালকা চিৎকার, হাসি-তামাশা আর আগ্রহের আলোচনা। সবাই কী ধরনের পোশাক, গয়না বেছে নেবে—সেসব কিছু নিয়েই আলোচনা চলছে।
সুমুর মনে এখনো কৌতূহল। শেরাজ তার পাশে বসে ফোনে স্ত্রল করছে। গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। সকলের ভেতর খুশির ঝলক।
শপিংমলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই হালকা উত্তেজনা আর রঙিন আলোতে সবাই যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। মেয়েরা সরাসরি পোশাকের দোকানে ছুটল। সুমু, সামিয়া আর নাজমিন একসাথে শাড়ি, লেহেঙ্গা আর ড্রেস দেখছে। সুমু মাঝে মাঝে শেরাজের দিকে তাকিয়ে থাকে। শেরাজ হালকা হাসি দিয়ে তার পাশে বসে আছে। সে কোনো মন্তব্য করছেনা, শুধু সবকিছু চোখে চোখে রাখছে।
ফারিয়া আর ফারিন একসাথে গয়নার দোকানে ঢুকল। তারা হাতের আংটি, চুড়ি আর নেকলেস দেখে একে অপরকে পরামর্শ দিচ্ছে। নাতাশা মাঝে মাঝে সেলফি তুলে রাখছে, আর আলিশা তাদের সঙ্গে মজা করছে।
রাহিন সামনের দিকে হাঁটছে আর সামান্য দূরে বসে থাকা সামিয়ার দিকে নজর রাখছে। রায়য়ান আর আরিয়ানের এসবে কোন ইন্টারেস্ট নেই। তারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে।
কাপড়ের দোকানের ভিতরে রঙিন লেহেঙ্গার সামনে সামিয়া দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এক অদ্ভুত খালি ভাব, মুখে দুঃখের ছায়া। পিয়াস তার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখে উচ্ছ্বাস আর মুখে আনন্দের হাসি। সে সামিয়ার জন্য লেহেঙ্গা হাতে নিয়ে দেখছে, পরখ করছে, এবং সামিয়ার প্রতিটি ছোট ছোট প্রতিক্রিয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তবে সামিয়ার মধ্যে খুশি নেই। সে প্রতিটি লেহেঙ্গা দেখার সময়ে হালকা চোখে তাকাচ্ছে। কোনো আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে না সে। তার মন এখনো রাহিনের কথা ভাবছে। সে জানে, পিয়াসের সঙ্গে থাকার এই মুহূর্তগুলো তার মনে পুরোপুরি আনন্দ আনছে না, আর না কোনদিনও আনতে পারবে।
দোকানের এক প্রান্তে রাহিন দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে সে সমস্ত দৃশ্যটা নজরে রাখছে। পিয়াসের খুশি, সামিয়ার দূরত্বে দুঃখ—সব মিলিয়ে তার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করছে। রাহিনের ব্যথা, বুকের ভেতরের হাহাকার তাকে শেষ করে দিচ্ছে।
আইয়ুব, নিহাল এবং সাইফরা দোকানের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে রাহিনকে লক্ষ্য করল। তারা রাহিনের কাছে এলো।
আইয়ুব বলল,
“দেখছিস তো, ভাই! সামিয়া এখন পিয়াসের সঙ্গে, কিন্তু মনটা সেখানে নেই।”
নিহাল বলল,
“ঠিক বলেছিস, ওর মধ্যে ব্যথা আছে। কিন্তু ও কিছু বলছে না, শুধু সহ্য করছে সব।”
সাইফ হালকা হাসি দিয়ে আইয়ুবকে চাপাস্বরে বলল,
“ভাই, ওর জন্য আমাদের কিছু করা দরকার। না হলে এই পরিস্থিতি ওর জন্য কঠিন হয়ে যাবে।”
রাহিন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সে জানে, সামিয়ার মন খারাপকে দূর করতে, সে ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু আজ, সে শুধু দূর থেকে দেখতে পারে, কাছে গিয়ে কিছু বলতে পারবে না।
ফারিয়া সামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখ সামিয়া, এই লেহেঙ্গাগুলো কত সুন্দর। এইটার মধ্যে তুই একদম ঝলমল করবি। তোর পছন্দ হয়েছে কি?”
সামিয়া হালকা মাথা নেড়ে বলল,
“দেখছি!”
পিয়াস বলল,
“তুই দেখছিস না, সামু। এই লেহেঙ্গা একদম তোর জন্য তৈরি। শুধু তুই পরলেই বুঝতে পারবি, এইটা তোর জন্য পারফেক্ট।”
রাহিন সেই দূর থেকে সবটা দেখছে। সে নিজেকে ধীরে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আইয়ুব রাহিনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চিন্তা করিস না, ভাই। সব ঠিক হয়ে যাবে। সামিয়া যতই মন খারাপ করুক। তোদের শেষটা সুন্দর হবে।”
রাহিন হালকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে বুঝতে পারল, মাঝে মাঝে দূর থেকে দেখা ও মনোযোগ রাখা, কাছাকাছি না থাকা, কিন্তু পাশে থাকার এই নীরব সমর্থনটাই অনেক বড় কিছু।”
নাতাশা, ইনায়ার সাথে সেকেন্ড থার্ড ফ্লোরে গিয়েছিল। নাতাশার হাতে অনেকগুলো টেডি বিয়ার। সে ঠিক করেছে এগুলো তার ম্যামকে দিবে। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল স্যান্ডি। হাঁটার মাঝখানে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াতে পড়ে যেতে নিচ্ছিল নাতাশা। স্যান্ডি তাকে ধরে ফেলল। নাতাশা তার হাত ছাড়িয়ে নিল। শপিংমলের অভিজাত ফ্লোরে দু’জনের মুখোমুখি দাঁড়ানো। আশপাশে ঝলমলে আলো, মানুষজন ঘোরাঘুরি করছে। হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল পরিবেশ।
নাতাশা রাগে গলা উঁচু করে বলল,
“আপনি সব জায়গায় আমার পথে এসে দাঁড়ান কেন? আমাকে ছাড়া কি আর কাউকে চোখে পড়ে না আপনার?”
স্যান্ডি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি ভুলে যাচ্ছেন নাতাশা, এইটা পাবলিক প্লেস। আর শুনুন, আপনার সৌভাগ্য, যে আপনি সবসময় আমার সামনেই পড়েন।”
চারপাশের মানুষ থমকে তাকিয়ে আছে। দু’জনের গলার স্বর ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। নাতাশা দাঁত চেপে বলল,
“এ আসছে আমার কোথাকার কোন হিরো রে, তার সামনে পড়া নাকি সৌভাগ্যের ব্যাপার। লিসেন, আপনার এই দাম্ভিকতা একদিন আপনাকে ধ্বংস করবে। ভাবছেন সবাই আপনাকে পছন্দ করে? আসলে সবাই বিরক্ত হয়ে গেছে।”
স্যান্ডি হাসি চাপতে না পেরে বলল,
“ওহ প্লিজ, আমাকে পছন্দ না করলে মানুষ কেন আমার সঙ্গে থাকতে মরিয়া হয়? বরং আপনার কথায় করুণা হয়—আপনি এখনো আমার সমকক্ষ হতে পারেননি।”
“আপনি আমাকে অপমান করতে খুব ভালোবাসেন, তাই না? কিন্তু মনে রাখবেন, আমি নাতাশা। আমি কারো সমান হতে চাই না। আর আপনার মতো তো, নো ওয়ে।”
স্যান্ডি ভ্রু উঁচু করে তাকাল,
“চেষ্টাও করবেন না, প্লিজ। কারণ যা পারবেন না, তা চেষ্টা করে লাভ নেই।”
চারপাশে সকলে ওদের ঝগড়া শুনে হাসছে। কারো কারো মুখে বিস্ময়। গার্ডরা এগিয়ে এসে দু’জনকে দূরে সরাতে চেষ্টা করল। কিন্তু দু’জনের চোখে চোখ, যেন আগুনের লেলিহান শিখা। ইনায়া, নাতাশাকে সরাতে চাইল। কিন্তু সে আরও এগিয়ে এসে বলল,
“আমি আপনার মতো কৃত্রিম নই। আমি সত্যি মানুষ। আপনার মতো কৃত্রিম হাবার আমার কোন ইচ্ছা নেই।”
স্যান্ডি তেজ দেখিয়ে বলল,
“আর আমি আপনার মতো মাঝারি মানের নই। আমি এক্সক্লুসিভ। মনটাকে একটু বড় করুন। সবসময় ঝগড়া না করে, কখন অন্যকিছু করার চেষ্টা করুন।”
মুহূর্তে ছুটে এলো আইয়ুবরা। অমিত স্যান্ডিকে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“এরা তো অলওয়েজ ঝগড়া করে, যেখানেই যায় কেলেঙ্কারি বাঁধায়।”
নাতাশা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“দেখেছেন? উনি আমাকে সবসময় অপমান করতে চান। আপনারা না আসলে উনি আমাকে আজকেই অপমান করে মাটিতে ফেলে দিতেন।”
স্যান্ডি কপাল কুঁচকে বলল,
“আপনি যেই নাটকবাজ, তাতে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিরও লজ্জা লাগবে। আমি কি আপনাকে ছুঁয়ে ফেলেছিলাম নাকি? বরং পড়তে যাচ্ছিলেন, আমি ধরেছিলাম।”
নাতাশা বিদ্রূপ করে বলল,
“ওহ! তাই নাকি? তাহলে তো আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত? দুঃখিত, আমি এতটা ভদ্র নই।”
স্যান্ডি একটু এগিয়ে এসে বলল,
“জানি, আপনি ভদ্রতা শিখেননি”
নাতাশা আরেক পা এগিয়ে এলো,
“আপনার অহংকার একদিন আপনাকে ভিখারি বানাবে। আর মনে রাখবেন, আমি আপনার মতো নই। আমি সবার নজরে আসার জন্য সার্কাস করি না।”
চারপাশের ভিড় আরও ঘন হয়ে গেল। ইনায়া উদ্বিগ্ন হয়ে নাতাশার হাত টেনে বলল,
“চলো না নাতাশা, এত লোকের সামনে এসব কেন করছ? লোকজন দেখছে আমাদের।”
কিন্তু নাতাশা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে স্যান্ডির চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমি আপনাকে সোজা ভাষায় একবারে ক্লিয়ার করে দিচ্ছি, আমার পথের মধ্যে আর দাঁড়াবেন না।”
স্যান্ডি হেসে বলল,
“আর আমি আপনাকে বাঁকা ভাষায় ক্লিয়ার করে দিলাম, আমি যেখানে ইচ্ছে দাঁড়াব। আপনি থামাতে পারবেন না।”
অমিত, রাহিন, সারবাজরা, স্যান্ডিকে সরিয়ে নিয়ে গেল। অমিত বিরক্ত গলায় বলল,
“সান মামা! তোমাদের দুজনের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? মলজুড়ে তোমাদের ঝগড়া ছাড়া আর কিছু নেই।”
আইয়ুব হাসতে হাসতে সারবাজকে বলল,
“এদের আলাদা না করলে, শপিংমলটা জ্বালিয়ে দিবে।”
নাতাশা বুকের ভেতর জমে থাকা রাগে টেডিগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশের লোকজন এখনো ফিসফিস করছে। কয়েকজন মোবাইলও বের করেছে, ভিডিও করতে চাইছে। নাতাশা কাঁপা গলায় রাগ চেপে বলল,
“আজ না হলে কাল, আমি আপনাকে আপনার জায়গা বুঝিয়ে দেব।”
স্যান্ডির তখন মুখে ঠাণ্ডা হাসি। অমিত তাকে টেনে নিচ্ছে। স্যান্ডি পাল্টা তাকিয়ে বলল,
“চেষ্টা করে দেখুন! তবে মনে রাখবেন, আপনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নন।”
নাতাশার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। ইনায়া ভয়ে ভয়ে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
“চলো, পাগলামি করো না, নাতাশা।”
নাতাশা ঠোঁট কামড়ে স্যান্ডির দিকে শেষবার তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। হঠাৎ শেরাজ আর সুমু এসে হাজির হলো। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে প্রথমে স্যান্ডির দিকে, তারপর নাতাশার দিকে তাকাল।
“এটা কি নাটক হচ্ছে এখানে? মলটা কি তোমাদের ফাইট ক্লাব?”
সুমু ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“এতসব লোকের সামনে নিজেদের এভাবে নিচে নামাচ্ছো? নাতাশা, সান ভাইয়া—তোমরা আসলে কি করতে চাইছো?”
স্যান্ডি কিছু বলতে যাচ্ছিল, শেরাজ হাত তুলে থামাল।
“চুপ! একটা শব্দও না। আমি চাই, তোমাদের এই শিশুসুলভ আচরণ এখানেই শেষ হোক।”
নাতাশা চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু মুঠো শক্ত করে রইল। স্যান্ডি দাঁত চেপে মুখ ফিরিয়ে নিল। আইয়ুব হেসে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করে বলল,
“দোস্ত, এদের কন্ট্রোল করা যায় না। এরা যতদিন বাঁচবে, ততদিন ঝগড়া চলবেই।”
শেরাজ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“ঝগড়া করতে হলে বাসায় গিয়ে করো। বাইরে আর একবার করলে, এবার আমি-ই থামাব, আর সেটা ভালোভাবে না।”
পরিবেশ থমথমে। চারপাশের মানুষজন ধীরে ধীরে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কিন্তু নাতাশা আর স্যান্ডির চোখে চোখ এখনও এক অদৃশ্য লড়াইয়ের আগুন জ্বলছে। শপিংমলের উত্তপ্ত পরিবেশ কিছুটা শান্ত হতেই, হঠাৎ শেরাজের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম দেখে তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। সে এক মুহূর্ত নীরব থেকে, নাতাশা আর ইনায়ার দিকে তাকাল।
“আপনারা দু’জন সুমুকে নিয়ে যান।”
সুমু অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু, আপনি যাচ্ছেন কোথায়?”
“একটা জরুরি কল। আমি কিছুক্ষণ পরেই আসছি।”
ইনায়ারা চুপচাপ মাথা নেড়ে সায় দিল। নাতাশা যদিও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেরাজের চোখের কঠিন দৃষ্টি দেখে থেমে গেল। শেরাজ দ্রুত পা ফেলে শপিংমলের থেকে দিয়ে বেরিয়ে গেল। সুমুকে নাতাশা আর ইনায়া নিয়ে গেল।
বিশ মিনিট পর শেরাজ দ্রুত ভেতরে ঢুকল। ব্ল্যাক শার্টে গম্ভীর রূপ আর চোখে চিন্তার ছাপ। সে এক মুহূর্ত থেমে শ্বাস নিল, তারপর এস্কেলেটরের কাছে এসে দাঁড়াল। একটু ওপরে উঠে আসতেই তার চোখ পড়ল পাশের এস্কেলেটরে। একজন মেয়ে নামছে। তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো বোরকায় ঢাকা শুধু চোখদুটো সানগ্লাস দিয়ে ঢাকা— যেন সে নিজেকে লুকাতে চাইছে।
শেরাজের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত ধাক্কা খেল। সে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে— যেন হাজার বছর পর চেনা কারো সাথে দেখা তার। তার চোখ বড় হয়ে গেল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। মেয়েটি ধীরে ধীরে নিচে নামছে। ভিড়ের মধ্যে সে একদম আলাদা। বোরকার কাপড়ে লুকিয়ে থাকলেও তার ভঙ্গি, তার হাঁটার ধরণ—শেরাজের চেনা। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পাশের এস্কেলেটর দিয়ে নিচে নেমে এসে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটা থমকে দাঁড়াতেই শেরাজ বলল,
“এই লুক নিয়ে কোথায় যাচ্ছো, সুইটহার্ট?”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেরাজ, সুমুর চোখ থেকে সানগ্লাস খুলল। সুমু মৃদু হেসে বলল,
“সকলের ধারণা, বিশেষ করে আপনার বোন রোজা আপুর ধারণা আপনি আমাকে হাজার জনের মধ্যে থেকে খুঁজে নিতে পারবেন না। ওদের কথার কখনও দাম দেইনি। কিন্তু কখনও কখনও এসব মাথামোটাদের সরাসরি প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় যে, সুমুরাজ দুই দেহ, এক আত্মা।”
শেরাজের ঠোঁটে হালকা এক ঝলক হাসি ফুটল। সে সানগ্লাসটা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে সুমুর চোখে গভীরভাবে তাকাল।
“দুই দেহ, এক আত্মা— এটা শুধু কথার খেলা নয়, সুইটহার্ট। আমি যদি অন্ধও হয়ে যাই, তবুও তোমাকে চিনে নেব। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সুমু মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু গালে লালচে আভা ছড়িয়ে গেল। চারপাশে মানুষ চলাফেরা করছে, কেউ খেয়াল করছে না, অথচ তাদের দু’জনের চোখে চোখ যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে দিল। শেরাজ এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরল।
“তুমি ভেবেছিলে আমি তোমাকে চিনতে পারব না? কিন্তু, তুমি ভুলে গেছ, তোমার প্রতিটা অঙ্গ-ভঙ্গি আমার নখদর্পনে।”
“তাহলে আপনি প্রমাণ করলেন, আমি যতই লুকোতে চাই না কেন, আপনি আমাকে খুঁজে বের করবেন।”
শেরাজ হেসে বলল,
“আমার থেকে লুকাতে পারলে তো খুঁজে বের করার প্রশ্ন আসবে।”
“কিন্তু সবাই তো আমাদের এভাবে দেখে না। তাদের ভুল ধারণা, আমরা একে অপরের জন্য নই।”
শেরাজ মাথা নেড়ে ধীরে তার কপালে ঠোঁট রাখল।
“হু কেয়ারস্! আমাদের ম্যাটার আমরা ঠিক করব, দুনিয়া না। তারা হাজার কথা বলুক, কিন্তু আমরা, আমরা সুমুরাজ। যেখানে একটা নাম শেষ হয়, আরেকটা শুরু হয়।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বলল,
“চলো, বাড়িতে ফিরি। সবাইকে আমি কল করে বলছি, বাহিরে আসতে।”
“বাড়ি ফিরব মানে? এদের শেষ হয়নি এখনো।”
“ওরা শেষ করুক। তুমি চলো।”
সুমু মিষ্টি হাসি নিয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ দুহাতে সুমুর মুখটা নিয়ে বলল,
“তুমি পাশে থাকলে, আমার কাছে পুরো স্বপ্নের মতো লাগে। কিন্তু তুমি ছাড়া, লাখো মানুষের ভিড়েও আমি একা।”
সুমু আবার হেসে ফেলল। শেরাজ ধীরে বলল,
“তুমছে রূঠ কার ভি,
দিল তুমহে হি পুকারতা হে।
তুম সামনে হো ফির ভি,
মুঝে খোনে কা ডার সাতা তা হে।
সুইটহার্ট!
মেরি হার সাঁস তুমহারে বিনা আধুরি হে,
তুম হি তো মেরি জিন্দেগি কি সবসে বাড়ি জরুরি হে!”
সুমু লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। শেরাজ দ্রুত ফোন বের করে কল করল। কয়েক মুহূর্ত পর সে কল কেটে দিল।
“সবাই নিচে আসছে। এখন আমরা একসাথে বের হবো।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানলো। শেরাজ তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। এতোক্ষণের সব কাহিনী ওপর থেকে দেখল রোজা, আরিয়ান আর রায়য়ান।
শুনশান রাত। আকাশে ঝলমলে তারা, বাতাসে সামান্য ফুলের ঘ্রাণ, আর শহরের আলো দূরে ঝলমল করছে। নীরবতার মাঝে বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে আসছে। বাইক রেসের জন্য একত্রিত হয়েছে সবাই। আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান আর শেরাজ সকলে রেসিং স্যুট পরে রেডি। আজ স্যান্ডিও রেসে অংশগ্রহণ করবে।
শেরাজ তার বাইকের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা হাওয়া তার মুখে স্পর্শ করছে। সে একহাতে চুলগুলোকে পেছনের দিকে সরিয়ে দিয়ে হেলমেট পরে নিল। তাদের বাইকের হেডলাইট থেকে আলো বের হয়ে রাতের অন্ধকারকে ছেদ করছে। সবাই রেসের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু হঠাৎ শেরাজের নজর যায় সুমুর দিকে। শেরাজ সুমুকে এই রাতের বেলায় বাহিরে আনতে চায়নি। কিন্তু বাড়িতে এখন আরিয়ান, রায়য়ান আর রোজা আছে— এই তিনজনের একজনকেও বিশ্বাস করে না শেরাজ। তাদের জন্যই শেরাজ সুমুকেও সাথে নিয়ে এসেছে। আর সুমুকে দেখে রাখার জন্য তার সাথে এসেছে নাজমিন, ফারিয়া, ফারিন, ইনায়া, নাতাশা, শাহরুখ, সামিয়া, আলিশা, ইশিতা, শাহরুখ, আশিক। তাদের সকলের মধ্যে রেসের ব্যাপারটা নিয়ে এখন টানটান উত্তেজনা। সামিয়া অবশ্য আসতে চায়নি। সকলে মিলে জোর করে এনেছে তাকে।
শেরাজ এখনো সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে। সুমু ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছে। সে হাসিমুখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“খান সাহেব, সাবধানে!”
শেরাজ হালকা হাসল। সে হালকা মাথা নাড়িয়ে সুমুকে আশ্বাস দিল। রেস শুরু হলো। শাহরুখ বাঁশিতে ফু দিল। বাইকগুলো এক মুহূর্তের জন্য স্থির। তারপর—গর্জন, চাকা ঘোরে, ইঞ্জিনের আওয়াজে রাত কেঁপে ওঠে। শেরাজ ফ্রন্টে, অন্যান্যরা প্রতিযোগিতা করছে তার পিছু নেওয়ার জন্য। বাতাসে উড়ে যাচ্ছে উচ্ছাস, নাইট স্কাইতে তারা যেন এক ঝলমলানো রোদ।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুমুর চোখের মধ্যে দারুণ উচ্ছ্বাস আর উদ্বেগ মিশে আছে। সামিয়া হাসি লুকাতে পারল না, ফারিয়া আর ফারিন চিৎকার করে উল্লসিত। ইনায়া, নাতাশা, এবং নাজমিনের মধ্যে হালকা টানাপোড়ন। সুমু শেরাজের প্রতি দৃষ্টি আটকে রেখেছে।
শেরাজের বাইক বাতাস কেটে এগিয়ে চলল। তার পেছনে অন্যরা ঝাপিয়ে পড়ল, কিন্তু স্পিডে সে সবাইকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। রেসের শেষ মুহূর্তে, শেরাজ লাইন ক্রস করে বাইক থামিয়ে রেখে তাকাল সুমুর দিকে। তার চোখে জিতার আনন্দ।
সুমু হালকা হাসল। সকলে চিয়ার আপ করল। আইয়ুবরা সকলে হেলমেট খুলছে। শেরাজ বাইক থেকে নেমে হেলমেট পরা অবস্থায় সুমুর সামনে গিয়ে হাঁটুমুড়ে বসল। সুমু আলতো হেসে হাত বাড়িয়ে শেরাজের হেলমেট খুলে নিজের কোলের ওপর রাখল। দু’হাতে শেরাজ সুমু আগলে নিয়ে হেসে বলল,
“আমার ভিলেন!”
দু’হাতে সুমুকে আগলে ধরে শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“দেখলে সুইটহার্ট? তোমার চোখের ভরসায় আমি আবারও জিতলাম।”
সুমু হালকা হেসে মুখ মৃদু স্বরে বলল,
“খান সাহেব, আপনার জেতার এই কৌশলটা আমার প্রাণের ভয়ের সঙ্গে মিশে যায়। আপনি যেভাবে রাইড করেন, আমার ভয় হয়।”
শেরাজ সুমুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুমি থাকলে আমি ভয় পাই না। বরং তুমি না থাকলে আমি ভয় পাই।”
চারপাশে আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান— সকলে হেলমেট খুলে শিস দিয়ে, হাততালি দিয়ে উল্লাস করছে। নিহাল হেসে বলল,
“দোস্ত, তুই না থাকলে রেসে কোনো মজা নেই। তুই যেন আলাদা এক আগুন।”
আইয়ুব খোঁচা দিয়ে বলল,
“আগুন না, রোমিও! ফাস্ট হওয়ার পরেই বাইক ছেড়ে সরাসরি বউয়ের কাছে চলে গেল।”
সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। ফারিয়া, ফারিন, ইনায়া চিৎকার করছে। নাজমিন আর নাতাশাও তাদের সাথে যোগদান করবে। শুধু সামিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তার চোখে অভিমান, যেন এই রেসের মাঝেও তার মনখারাপ কেউ টের পাচ্ছে না।
শাহরুখ হাসতে হাসতে তার কানের কাছে গিয়ে বলল,
“তুই না চাইলেও তোকে টেনে আনাটা ঠিকই হয়েছে।”
সামিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“আমার একদম ভালো লাগছে না।”
শাহরুখ খোঁচা দিয়ে হেসে বলল,
“আসলেই? নাকি অন্যকারো জন্য মন খারাপ?”
সামিয়া আর কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইল। এদিকে শেরাজ সুমুকে ছাড়ছে না। বাইকের গর্জন থেমে গেছে, রাত আবার শান্ত হয়ে এসেছে। চারদিকে হাওয়া বইছে, চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে পুরো জায়গাটা। শেরাজ সুমুর চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আবার বলল,
“তুমি থাকলে আমি আমার জীবনের সব রেসে জিতব, সুইটহার্ট। তুমি যদি আমার হাত না ছাড়ো, আমি কোনোদিন হেরে যাব না।”
সুমু হেসে তার কাঁধে মাথা রাখল। চারপাশের উল্লাস, হাসাহাসি, খুনসুটি—সবকিছুর ভেতরেও দু’জনের মাঝে যেন অন্য এক দুনিয়াতে চলে গেল।
হঠাৎ দুটো বাইক এসে থামল তাদের পাশে। সকলে তাকাল। আরিয়ান আর রায়য়ান একসাথে হেলমেট খুললো। রোজা আরিয়ানের পেছন থেকে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। তার পরনে ওয়ের্টান। সে গিয়ে আলিশার পাশে দাঁড়াল। রায়য়ান বাঁকা হেসে বলল,
“চল এস.কে, আমাদের সাথেও রেস কর।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। আরিয়ান আর রায়য়ান বাইক রেখে এগিয়ে এলো শেরাজের কাছে। আরিয়ান একটু হেসে বলল,
“ওদেরকে তো হারালি। এবার আমাদেরও হারা।”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“যদি পারি?”
রায়য়ান বলল,
“তাহলে তুই যা বলবি, তাই।”
শেরাজ মাথা নাড়ল। সে বাইকে উঠে বসতেই আরিয়ান বলল,
“আর যদি হারিস?”
শেরাজ পেছনে না তাকিয়ে বলল,
“যা চাইবি, তাই!”
আরিয়ান এসে শেরাজকে সাইডে সরিয়ে নিয়ে গেল। রায়য়ানও চললো তাদের সাথে। শেরাজকে সাইডে এনে আরিয়ান বলল,
“আমরা তিনজনই সুমুর জন্য পাগল। আর তাই রেসে যে জিতবে, সে সুমুকে নিয়ে রেস জেতার পর বাইকে করে লং ড্রাইভে যাবে। আমাদের দুজনের মধ্যে কেউ জিতলে সুমুকে লং ড্রাইভে যাবার জন্য রাজি করাবি তুই।”
শেরাজের রাগ হলো। তবুও সে নিজেকে সুমুর জন্য কন্ট্রোল করে রেখে নিচু স্বরে বলল,
“ও আমার বউ। কোনো ট্রফি না, যেটা নিয়ে তোরা বাজি ধরতে পারিস।”
আরিয়ান ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি টেনে শেরাজের দিকে ঝুঁকে বলল,
“ট্রফি হোক বা না হোক, আমাদের তিনজনের ভালোবাসা তো। আজকের রেসের দাম আছে এস.কে। তুই হেরে গেলে নিজের হাতেই সুমুকে উইনারের কাছে পাঠাবি। তুই তোর দেওয়া কথা ভাঙবি না, তাই তো?”
রায়য়ানের বিশ্বাস সে জিতবে। আর জেতার পর এমন একটা সুযোগ সে হাত ছাড়া করতে চাইল না। তাই সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“আজকের রেসে গতি আর ভাগ্য—দুটোই পরীক্ষা হবে। দেখি কে জেতে।”
শেরাজের চোখে সেই মুহূর্তে এমন এক দৃষ্টি ফুটে উঠল, যেটা দেখে আশেপাশের বাতাসও যেন থমকে গেল। সে দাঁত চেপে ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
“সুমুর নাম নিয়ে বাজি ধরার সাহস কীভাবে হলো তোদের? আমার সুইটহার্টের ওপর তোদের লোভ আমি মাটিতে মিশিয়ে দেব।”
ওদিকে একটু দূরে বসে থাকা সুমু উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে সব লক্ষ্য করছিল। শেরাজকে আরিয়ান আর রায়য়ান সাইডে ডাকার পর থেকেই তার বুক কেঁপে উঠছিল। সে ইশিতার হাত শক্ত করে চেপে ধরে সে বলল,
“ইশিতা, কিছু একটা হচ্ছে। ওরা খান সাহেবকে কিছু বলছে।”
ইশিতা আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করলেও নিজের চোখে চিন্তার ছাপ লুকাতে পারল না। ইনায়া ঠোঁট কামড়ে বলল,
“ওখানে কোনো সাধারণ রেসের কথা হচ্ছে না। আমি ভালো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।”
ফারিয়া উত্তেজিত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“সাধারণ হোক আর না হোক। ভাইয়াকে হারতে পারবে নাকি?”
ফারিন জবাব দিল,
“অসম্ভব! দেখো, উনার চোখ। আগুনের মতো জ্বলছে।”
শেরাজ পা বাড়াতেই পেছন থেকে আরিয়ান বলল,
“হার মেনে নিলি নাকি সুমুর কাছে শেষবারের মতো দোয়া চাইতে যাচ্ছিস?”
শেরাজ জানে, সুমু কাছে গেলে সে এখন আর তাকে রেসে নামতে দিবে না। শেরাজ আর কোনো কথা না বলে ধীরে হেলমেট মাথায় পরল। তার চোখের আগুনটা তখনও স্পষ্ট। ইঞ্জিনের গর্জন উঠতেই চারপাশের নীরবতা ছিন্ন হয়ে গেল।
আরিয়ান আর রায়য়ানও একসাথে বাইকে গিয়ে বসে বাইক স্টার্ট করল। তিনটা হেডলাইট রাতের অন্ধকারকে ছেদ করে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
সুমু অস্থির হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব! প্লিজ, সাবধানে।”
তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। ইশিতা তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বিশ্বাস রাখো, সুমু। ভাইয়া হারার মানুষ না।”
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। বাতাস যেন থমকে গেছে। শাহরুখ ধীরে বাঁশি ঠোঁটে তুলতেই চারপাশে নীরবতা নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যে, বাঁশির শব্দের সাথে সাথে তিনটা বাইক বজ্রপাতের মতো ছুটে গেল সামনে।
প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই শেরাজ এগিয়ে গেল। তার গতি এতটাই তীব্র যে বাতাস কেটে শরীরে হুইসেল তুলছিল। পেছন থেকে আরিয়ান তাকে কাটার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে রায়য়ান একেবারে তার ডান পাশে এসে পড়ল।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের ভিড়ে চিৎকার উঠল। সুমু চোখ বন্ধ করে ফেলল। রেসের ট্র্যাক ঘুরছে। গতি বাড়ছে, ইঞ্জিনের গর্জন আকাশ কাঁপিয়ে তুলছে। শেরাজের বাইক গর্জন তুলে এগিয়ে চলেছে। হাওয়া যেন তার শত্রু হয়েও তাকে পথ করে দিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ পিছন থেকে আরিয়ান গতি বাড়িয়ে বাঁ পাশ দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল।
মুহূর্তেই সকলের মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। নাজমিন চিৎকার করে বলল,
“ওরা ইচ্ছে করে এক্সিডেন্ট করাতে চাইছে।”
কিন্তু শেরাজ চোখের পলকে বাইক কাত করে ব্যালান্স করল। তার চোখে তখন কেবল আগুন, আর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। সে চিৎকার করে বলল,
“আমার বউয়ের নাম নিয়ে বাজি ধরেছিস? এখন দেখবি, বাজি কাকে বলে।”
রায়য়ানও পিছিয়ে ছিল না। সে ডান দিক থেকে শেরাজকে ব্লক করার চেষ্টা করল। দুই পাশ থেকে ফাঁদ পেতেছে ওরা। ট্র্যাকের বাঁক ঘনিয়ে আসছে।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুমু বুক চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে কাঁপা গলায় বলল,
“খান সাহেব!”
আরবাজ আর শাহরুখ একসাথে চিৎকার করে বলল,
“ব্রো, সামলে চালাও।”
বাঁকের মুখে পৌঁছেই শেরাজ হঠাৎ গিয়ার নামিয়ে বাইক হেলে দিল। রাবারের চাকা রাস্তায় ঘষা খেল, স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার বাইক বজ্রপাতের মতো বাঁক কেটে আরিয়ান আর রায়য়ানকে অনেক পেছনে ফেলে দিল।
আইয়ুব লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল,
এস.কে, লিডে!”
সারবাজ হেসে বলল,
“আফটার লং টাইম, এস.কের এমন রেস দেখছি।”
আরিয়ান দাঁত চেপে চিৎকার করে বলল,
“এই রেস শেষ হয়নি, এস.কে।”
তিনটা বাইক ঝড়ের মতো ছুটছে। শেরাজের চোখে তখন শুধু সুমু, শুধু তার ভালোবাসা। সে দাঁত চেপে বলল,
“আমার কাছে জয়ের মানে শুধু ফিনিশ লাইন নয়, আমার জয়ের মানে সুমু।”
শেষ ল্যাপ। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু ইঞ্জিনের গর্জন আর টায়ারের ঘর্ষণের শব্দ। আরিয়ান আর রায়য়ান মরিয়া হয়ে উঠেছে। দু’জন দু’পাশ থেকে শেরাজকে কাটার চেষ্টা করছে। মুহূর্তে ট্র্যাকের বাতাসে টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
সুমু চেয়ারে বসে হাত জোড় করে রেখেছে। চোখে অশ্রু জমে আছে তার। হঠাৎ শেষ বাঁক ঘুরতেই আরিয়ান বাইক হেলে দিয়ে ধাক্কা দিতে গেল, কিন্তু শেরাজ সেই মুহূর্তে ব্রেক কেটে স্পিড ডাবল করল। তার বাইক যেন ঝড় হয়ে রাস্তা চিরে সামনে ছুটল।
রায়য়ান চোখ বড় করে চিৎকার করে বলল,
“অসম্ভব!”
ঝড়ের বেগে শেরাজের বাইক ফিনিশ লাইন ছেদ করে গেল। হেডলাইটের আলো এক মুহূর্তের জন্য রাতকে সাদা করে দিল। লাইন ক্রস করার সাথে সাথেই শেরাজ হঠাৎ বাইক ঘুরিয়ে সোজা সুমুর সামনে এসে থামল। টায়ারের ঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গ উড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
শেরাজের ফ্রেন্ডরা একসাথে চিৎকার করে উঠল,
“এস.কে, এস.কে!”
শেরাজ হেলমেট খুলে ধীরে বাইক থেকে নামল। তার কপালে ঘাম জমেছে, কিন্তু ঠোঁটে বিজয়ের হাসি। সে সরাসরি সুমুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সুমুর গাল বেয়ে পানি পড়ছে। শেরাজ হাঁটুগেড়ে বসে হেলমেটটা মাটিতে রাখল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“জান, আমার জয়ের মানে শুধু রেস না, আমার জয়ের মানে তুমি।”
সুমু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শেরাজের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারপাশে তুমুল হাততালি, চিৎকার আর উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল।
আরিয়ান আর রায়য়ান দাঁতে দাঁত চেপে দূর থেকে তাকিয়ে রইল। তাদের চোখে হারের জ্বালা, আর শেরাজের চোখে শুধু সুমুর ভালোবাসা।
চারপাশে সবাই উল্লাস করছে। ফারিয়া, ফারিন, নাজমিনরা চিৎকার করছে। ইশিতার মুখে স্বস্তির হাসি। সামিয়া, যে এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, এবার সেও হাততালি দিল। সুমু এখনও শেরাজকে আঁকড়ে ধরে আছে। তার চোখে আনন্দের অশ্রু।
কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান আর রায়য়ানের মুখ অন্ধকার হয়ে আছে। রায়য়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এই জয়, জয় না, এস.কে। তোর এই জয়ের দিন বেশিদিন থাকবে না।”
আরিয়ান ঠোঁটে শীতল হাসি টেনে বলল,
“খুব বড় খেলা খেললি, এস.কে। কিন্তু খেলার মাঠ তো এখানেই শেষ না।”
আইয়ুব এগিয়ে এসে শেরাজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ভাই, জয়েই তোকে মানায়।”
শেরাজ হালকা মাথা নাড়ল। তার চোখ তখনও আগুনের মতো জ্বলছে। সে ধীরে সুমুর হাত ধরে কানে ফিসফিস করে বলল,
“চলো, তুমি আর আমি একটু অন্যরকম লং ড্রাইভে যাই।”
সুমু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল,
“এখন? এত রাতে?”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“হুম চলো!”
বেশি কিছু না বলে শেরাজ বাইকের হেলমেট এগিয়ে দিল সুমুর দিকে। সুমু এক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়াল, তারপর হালকা হাসি দিয়ে হেলমেট হাতে নিতে যেতেই, শেরাজ নিজে থেকে সুমুকে হেলমেট পড়িয়ে দিল।
ইশিতা এগিয়ে এসে বলল,
“সাবধানে নিয়ে যাবেন, ভাইয়া।
শেরাজ সম্মতি জানিয়ে বাইকে উঠে, সুমুকে পেছনে বসাল। বাইক স্টার্ট হতেই ইঞ্জিনের গর্জনে চারপাশ কেঁপে উঠল। সুমু আলতো করে শেরাজের কোমর জড়িয়ে ধরল। শেরাজ বলল,
“ভয় পাচ্ছো?”
সুমু মাথা নাড়ল,
“না! আমি জানি, আপনি আছেন।”
রাতের হাইওয়ে ফাঁকা। তারা ভরা আকাশের নিচে, বাতাস চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে, চারপাশে শুধু নীরবতা আর গতির সুর। সুমু চোখ বন্ধ করে বাইকের গতির সাথে শেরাজের বুকে মাথা রাখল। শেরাজের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল। সে বাইক ঘুরিয়ে আরিয়ান আর রায়য়ানের কাছে গেল। বাইক নিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরতে লাগল তাদের দুজনের চারপাশ দিয়ে। বাইক নিয়ে দুজনেই চারপাশ দিয়ে ছয়টা পাক দিয়ে শেরাজ বাঁকা হেসে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল।
রায়য়ান আর আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করল। রোজা অসহায় দৃষ্টিতে শেরাজের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। আলিশা দূর থেকে তাকিয়ে রইল রায়য়ানের দিকে।
খান সাহেব পর্ব ৬৭
রাত অনেক গভীর। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু দূরের কুকুরের ডাকে আর হালকা বাতাসের শব্দে যেন পরিবেশ আরও ভৌতিক লাগছে। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ইনায়া ফোনে কথা বলছে। তার কণ্ঠস্বর চাপা, তবুও নার্ভাস লাগছে।
“হ্যাঁ! আমি সব দেখেছি। কিন্তু আপনি যা ভাবছেন, তা এত সহজ হবে না। আমি ঠিক সময়ে আপনাকে জানাব। আর শুনুন, আমি আর এসবের মধ্যে থাকতে চাই না। আমি সব ছেড়ে দিব।”
কথা শেষ করেই ফোন কেটে দিল ইনায়া। সে ভারী নিঃশ্বাস নিয়ে মাথা একটু নিচু করে দাঁড়িয়ে ঘুরতেই সামনে তাকিয়ে দেখল শেরাজ দু’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।
