Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৬৮

খান সাহেব পর্ব ৬৮

খান সাহেব পর্ব ৬৮
সুমাইয়া জাহান

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। শেখবাড়ির ড্রয়িংরুম আর বাগান ঝলমলে আলোয় ভরে উঠেছে। রঙিন ফেয়ারিলাইটে মোড়া প্রতিটি গাছ, চারপাশে সাজানো ফুল, আর মঞ্চে ঝকঝকে ব্যাকড্রপ—পুরো বাড়িটা যেন স্বপ্নপুরীর মতো।
মেয়েদের হাসি, আর গান মিলেমিশে চারদিকে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে দিয়েছে। অতিথিরা ধীরে ধীরে আসছে। সবাই রঙিন পোশাকে, চোখে মুখে উচ্ছ্বাস সকলের।

সকলের কাছে আজকের রাত শুধু একজন নয়—আজ তিনজন কনের মেহেন্দী ও সাঙ্গীত। তাদের নতুন জীবন শুরুর যাত্রা। সামিয়া, ফারিয়া, আর নাজমিন—তিনজনই সাজঘরে বসে আছে। তাদের সাজ আর চুড়ির টুংটাং শব্দে উৎসবটা আরও বর্ণময় হয়ে উঠেছে।
ইফতিয়ারা সকলেই এসেছে। মিনা বেগমরাও এসেছে, কিন্তু মাইশারা আসেনি। তার দু’বছরের ছোট ছেলেকে নিয়ে সে এতোটা দূরে আসতে চায়নি।
অনুষ্ঠান শুরু হতে এখনো অনেক দেরি। সকলে এখন রেডি হতে ব্যস্ত। সাজঘরে সকলে রেডি হতে হতে একে অপরের সঙ্গে হাসিমুখে গল্প করছে।
শেরাজ রুমে নেই, সে বন্ধুদের কাছে গেছে। সুমু নিজের রুমের দরজা হালকা বন্ধ করে রেডি হচ্ছে। সে আজ লেহেঙ্গা পড়বে, কিন্তু বিপদ হয়েছে সে একা একা লেহেঙ্গার জিপার লাগাতে পারছে না। কাউকে যে ডেকে বলবে, সেটাও সে পারছে না। সে জানে সকলে এখন রেডি হতে ব‍্যস্ত।
সুমু চুলগুলো হাতখোপা করে একটা কাটা গুঁজে দিল খোপার মধ্যে। তারপর আবারও জিপার লাগানোর চেষ্টা করল। কিন্তু এবারেও সে ব্যর্থ। ঠিক তখনই রুমে হঠাৎ ঢুকে এলো শেরাজ। সুমুর সেদিকে খেয়াল নেই, সে এখনো মেঝের দিকে চোখ রেখে জিপার টানার চেষ্টা করছে।

শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর পেছনে দাঁড়াল। নিজের ঠাণ্ডা হাতের উল্টো পিঠ সুমুর উন্মুক্ত পিঠ বেয়ে নামাল। হঠাৎ ছোঁয়ায় সুমু ভয় পেয়ে কেঁপে উঠে সামনে থাকা আয়নার দিকে তাকাল। চোখ রাখল শেরাজের চোখে। শেরাজ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুমুর উন্মুক্ত পিঠের দিকে। সুমুর নিঃশ্বাস ঘন হয়ে উঠল।
শেরাজ সুমুর দু’কাঁধে হাত রেখে আয়নার দিকে তাকাল। এবার তার চোখ পড়ল সুমুর চোখের গভীরে। কিছুক্ষণ থেমে থেকে ধীরে ঠোঁট রাখল সুমুর পিঠে। সুমু ভ্রু কুঁচকে চোখ বুজে নিয়ে নিঃশ্বাস আটকে রাখল নিজের। শেরাজ ঠোঁট সরিয়ে নিতেই সুমু চোখ মেলে তাকাল।
সে এক ঝটকায় সুমুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। সুমু দু’হাত শেরাজের বুকের ওপর ঠেকিয়ে রাখল। শেরাজ একটানে সুমুর খোপা থেকে কাটা খুলে ফেলল। কাটা খোলার সাথে সাথে কোমর ছাপানো চুলগুলো ঢলে পড়ল তার উন্মুক্ত পিঠজুড়ে।
শেরাজ সুমুর কিছু চুল হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখ বন্ধ করে বুকভরে ঘ্রাণ নিল। সুমুর নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল। শেরাজ চোখ মেলে তাকিয়ে সামান্য ঝুঁকে সুমুর গলায় মুখ গুঁজে দিল। সুমু নিজেকে সামলে কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“আপনার কি হয়েছে, খান সাহেব? আমার আপনাকে স্বাভাবিক লাগছে না। বলুন না, আমাকে কি হয়েছে?”
শেরাজ মুখ গুঁজে রেখেই মৃদু গলায় বলল,
“স্বাভাবিক আমি! কিন্তু তোমার কাছে এলেই আমি স্বাভাবিক থাকতে পারি না, সুইটহার্ট। তোমার শরীরের এই গন্ধ, এই নজর কাড়া রূপ, এসব কিছু আমার ভেতরটা এলোমেলো করে দেয়।”
সুমুর বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। সে ঠোঁট কামড়ে শেরাজের দিকে তাকাল, যেন কিছু বলতে চাইছে, অথচ ভাষা পাচ্ছে না। তার গালে লাল আভা ফুটে উঠেছে। শেরাজ এবার মাথা তুলে গভীর চোখে তাকাল সুমুর দিকে। দু’হাত দিয়ে তার কোমর চেপে ধরে বলল,
“তুমি জানো না সুইটহার্ট, তোমাকে এইভাবে দেখলে আমার ভেতরে কী আগুন জ্বলে ওঠে। আজকের এই রূপে, আমার ভেতরের আগুনটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই না, কেউ তোমাকে এই রূপটাতে দেখুক।”
সুমু ভয়ে-লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“কথা ঘোরাচ্ছেন? কি হয়েছে আমাকে বলা যায় না?”
শেরাজ হালকা হাসল। তারপর ধীরে সুমুকে আয়নার দিকে ঘোরাল। সুমু নিজের চোখ আয়নায় রাখল, কিন্তু তার ভেতরের ভয় আর লজ্জা তাকে অস্থির করে তুলছে। শেরাজ আয়নায় চোখ রাখল না। সে সরাসরি সুমুর দিকে তাকাল। একহাতে সুমুর চুল সরিয়ে দিয়ে তার ঠোঁট নামিয়ে নিল সুমুর কাঁধের ওপর। সেখানে ফুটে থাকা ছোট্ট বিউটি স্পটের ওপর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল ধীরে।
সুমুর শরীর কেঁপে উঠল। তার চোখ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে এলো। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল, ঠোঁট কেঁপে উঠল। সেই ক্ষণিকের স্পর্শ যেন তার ভেতরটাকে আবারও গলিয়ে দিল। শেরাজ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল, যেখানে সুমুর চোখ বন্ধ, গাল লাল হয়ে উঠছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“তোমাকে সংস্পর্শে এলে নিজেকে সামলানো অসম্ভব।”

সুমুর গলা শুকিয়ে এলো। সে চোখ মেলে তাকাল আয়নার দিকে। শেরাজ সুমুকে আবারও নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তার চোখে এবার অন্য রকম কোমলতা ফুটে উঠেছে। সুমু অস্থির হয়ে পড়ছে, বুক উঠানামা করছে দ্রুত। শেরাজ হঠাৎ হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল সুমুর সামনে। সুমু বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল। শেরাজ ধীরে হাত বাড়িয়ে সুমুর লেহেঙ্গার ওপর আলতো করে হাত রাখল, ঠিক সুমুর পেটের কাছে।
সুমুর শ্বাস আটকে গেল। সে বুঝতে পারল শেরাজ কি করতে চাইছে। শেরাজের আঙুল কেঁপে উঠছে, যেন আবেগ সামলাতে পারছে না। তারপর ধীরে, খুব যত্ন করে সে সুমুর পেটের অংশ থেকে লেহেঙ্গা তুলে তার পেটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সুমুর চোখ ভিজে উঠল মুহূর্তেই। তার শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু এবার ভয়ের জন্য নয়। শুধু মমতা আর ভালোবাসায় ভরা অনুভূতিতে। শেরাজ চোখ বন্ধ করে পেটের ওপর ঠোঁট রেখে ফিসফিস করে বলল,

“এখানেই আমার পুরো পৃথিবী, সুইটহার্ট। তুমি আর আমাদের ছোট্ট ভালোবাসা। তোমাদের ছাড়া আমার কোন অস্তিত্ব নেই।”
সুমুর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি। সে শেরাজের চুলে হাত রেখে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আপনিই আমার ভরসা, খান সাহেব। আমাদের দু’জনের ভরসা।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“দুজন না, পাঁচজন। আমাদের একসাথে চারটা চ‍্যাম্প আসবে।”
সুমু হেসে ফেলল শেরাজের কথা শুনে। শেরাজ ধীরে সুমুর পেটে হাত রাখল, তারপর ঠোঁট ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হঠাৎ আচমকাই সে যেন নিজের জগতে ঢুকে গেল। ঠোঁট সরিয়ে কান পেতে রাখল সুমুর পেটের কাছে, যেন ওখান থেকে সে তার বাচ্চার সব কথা শুনতে পাবে। সে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“শুনছো, ছোট্ট দুষ্টুরা? আমি কিন্তু একেবারেই খুশি না, জানো? তোমাদের মাম্মাকে একা রেখে আমি কোথাও যাই না, অথচ তোমরা আসার পর থেকে, তোমার মাম্মা কেবল তোমাদের নিয়েই ব্যস্ত। আমার খবর একটুও নেয় না।”
সুমু মৃদু হাসল। তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে, অথচ ঠোঁটে ভালোবাসায় ভরা হাসি লেগে আছে। শেরাজ আবারও বলল,

“আর শোনো, আমি কিন্তু তোমাদেরকে আগে থেকে বলে রাখছি, তোমাদের মাম্মার হাসিটা কেবল আমার জন্য। তোমরা চাইলে খেলাধুলা করবে, কাঁদবে, আমাকে ডিস্টার্ব করবে—সব মেনে নেব। কিন্তু আমার বউয়ের হাসি চুরি করতে দিব না”, সে হঠাৎ মুখ গম্ভীর করে সুমুর পেটে আবারও ঠোঁট ছুঁয়ে বলল, “বুঝেছো? কথা দিলেই আমি তোমাদেরকে সুপারহিরোর মতো সবকিছু এনে দেব।”
সুমু দু’হাত দিয়ে শেরাজের চুলে হাত বুলিয়ে দিল। শেরাজ আবার ঠোঁট পেটের কাছে রেখে ফিসফিস করে বলল,
“তোমরা তাড়াতাড়ি এসো, আমার ছোট্ট চ্যাম্পরা। আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। তোমাদের হাত ধরতে হবে, তোমাদের সাথে খেলতে হবে, তোমাদের মাম্মাকে আরও বেশি বিরক্ত করতে হবে”, শেরাজ মাথা ঝুঁকিয়ে সুমুর পেটে কাছে মুখ নিল, “শোনো ছোট্ট চ্যাম্পরা, তোমাদের মাম্মা কিন্তু একেবারেই কথা শোনে না। আমি কত বলি, নিয়ম করে খাও, বিশ্রাম নাও, কিন্তু না, সে সবকিছুতেই জেদ ধরে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না।”
সে একটু থেমে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর সুরে বলল,

“তোমরা প্লিজ তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি একা একা পারছি না তোমাদের মাম্মাকে সামলাতে। তোমরা এলে আমরা মিলে মিশে শাসন করব, ঠিক আছে?”
সুমু হাসছে। শেরাজ আবারও বলল,
“তোমরা থাকলে তোমরা মাম্মাকে বলবে—মাম্মা, তুমি ঠিকমতো না খেলে আমরা রাগ করব। তখন দেখবে তোমাদের মাম্মা আর অবাধ্য হবে না।”
সুমুর ঠোঁটে আবারও তার অজান্তেই মিষ্টি হাসি খেলে গেল। সে শেরাজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু গলায় বলল,
“আপনি জানেন, আপনি এখন কতটা বাচ্চাদের মতো আচরণ করছেন?”
শেরাজ মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
“বাবা আর সন্তানের পার্সোনাল কথার মাঝে ডিস্টার্ব কোরো না।”
সুমু হেসে মাথা নাড়ল। শেরাজ আবার সুমুর পেটে ঠোঁট ছোঁয়াল।
“শোনো চ্যাম্পরা, আমি তো নামও ভেবে রেখেছি। যদি তোমাদের একজন মেয়ে হও, আমি নাম রাখব ‘সিমরান’। শুনতেই কেমন মিষ্টি, তাই না? আর যদি ছেলে হও, তবে নাম হবে ‘শেরান’। একদম বাপ কা বেটা-বেটি।” একটু আবারও বলল, “তবে জানো তো, তোমাদের মাম্মা আমার এসব নাম মানতে চাইবে না। সে নিজের মতো নাম ভেবে রেখেছে। তাই তোমরা তাড়াতাড়ি এসো, আর আমরা একসাথে মাম্মার সাথে তর্ক করব, বুঝলে?”
সুমু হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“আপনি সত্যিই একেবারে পাগল হয়ে গেছেন। বাচ্চারা আসার আগেই নাম নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছেন।”
শেরাজ ভ্রু তুলে দুষ্টু চোখে তাকিয়ে বলল,
“তুমি জানো না, আমি কতোটা এক্সসাইটেড ওদের জন্য। আমার সন্তান হ‍্যাঁ, সুইটহার্ট। আমাদের সন্তান। আমি বাবা হবো, সুমু। তুমি জানো, আমার কতোটা অহংকার হয়। অহংকারে তো মাটিতে পা-ই ফেলতে ইচ্ছা করে না। দ‍্য ওয়ার্ল্ড ফেমাস শেরাজ খান বাহাদুরখেল বাবা হবে। তার ছোট ছোট চ‍্যাম্পরা আসবে। আমি চাই ওরা তাড়াতাড়ি আসুক। আমি ওদের দুনিয়ার সব সুখ এনে দিব।”
সুমুর গাল বেয়ে আবারও পানি গড়িয়ে পড়ল। শেরাজ আবারও সুমুর পেটের ওপর আলতো করে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,

“চ্যাম্পরা! মাম্মার যত্ন নিও, ঠিক আছে? ভেতরে থেকে তোমরা তোমাদের মাম্মাকে বলো সময়মতো খেতে, বিশ্রাম নিতে, আর আমি বাইরে থেকে বলব। আমি বাইরে থেকে দেখছি, তোমরা ভেতর থেকে সামলাও।”
সুমু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। তার চোখের পানি অঝরে ঝরছে, অথচ ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। তার মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব ভালোবাসা যেন এই মুহূর্তে তার জন্যই সঞ্চিত হয়ে আছে।
শেরাজ হেসে আবারও সুমুর পেটে ঠোঁট ছুঁয়ে মৃদু গলায় বলল,
“শোনো চ্যাম্পরা, তোমরা কিন্তু তোমাদের মাম্মাকে বেশি জ্বালাবে না। মনে রেখো, এইটা আমার বউ। তোমাদের মাম্মাকে আমি সবথেকে বেশি জ্বালাবো।”
সে দুষ্টু ভঙ্গিতে চোখ মেরে সুমুর দিকে তাকাল। সুমু অবাক হয়ে হেসে উঠে বলল,
“তাহলে আমার শান্তি কোথায়? আপনার একসাথে মিলে আমাকে জ্বালাবেন, আর আমি শুধু সহ্য করব?”
শেরাজ গম্ভীর হয়ে বলল,

“না, না, তুমি ভুল বুঝছ। আমি জ্বালাবো আদর দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। আর ওরা…” সে পেটে হাত বুলিয়ে বলল, “ওরা জ্বালাবে দুষ্টুমি দিয়ে। মানে আমরা একসাথে মিলে তোমাকে হাসাবো, খুশি করবো।”
সুমু হালকা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিয়ে বলল,
“আপনাদের পার্সোনাল কথা শেষ হলে আমাকে জানাবেন, আমি আবার রেডি হবো।”
শেরাজ হেসে উঠে দাঁড়িয়ে আবার সুমুকে কাছে টেনে নিল। সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে সুমুর দু’পা নিজের পায়ের ওপর নিয়ে বলল,
“না না, তুমি কোথাও যাবে না। তুমি রেডি হবার আগে তোমাকে আরেকটা প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
“কিসের প্রতিশ্রুতি?”
শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“এই যে আমার ছোট্ট চ্যাম্পরা আসছে, তুমি ওদের জন্য নিজের যত্ন নেবে। নিয়ম করে খাবে, বিশ্রাম নেবে। না হলে আমি কিন্তু ওদের সাথে মিলে তোমার বিরুদ্ধে কেস করব।”
সুমু অবাক হয়ে হাসল,

“কেস করবেন? মানে?”
শেরাজ গম্ভীর মুখে বলল,
“হ্যাঁ, পুরো পারিবারিক আদালতে। আমি আর আমার ছোট্ট চ্যাম্পরা হবো বাদী, আর তুমি একমাত্র আসামী। অভিযোগ হবে— ‘চ‍্যাম্পদের মাম্মা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না’।”
সুমু হাসতে হাসতে শেরাজের ঠোঁটে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝেছি! আমি এখন থেকে নিয়ম করেই খাব, ঠিক আছে?”
শেরাজ সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“প্রমিজ?”
সুমু মাথা নাড়ল,
“প্রমিজ!”
শেরাজ খুশিতে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“এইবার বউজান, এখন তুমি রেডি হতে পারো।”

সুমু নিঃশ্বাস আটকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল শেরাজের চোখে। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে আয়নায় সামনে চলে গেল।
সুমু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আয়নার ভেতর তার প্রতিচ্ছবি, গলায় গয়না, কানে ঝুমকা ঝলমল করছে। কিন্তু তার নিজের চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো, গয়নার জৌলুস নয়, বরং তার চোখের ভেতরে জমে থাকা আবেগই তাকে সবচেয়ে সুন্দর করে তুলেছে।
শেরাজ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে, তৃপ্তির হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে, যেন আজ সুমুকে সে প্রথমবার দেখছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“জানো, আজকে তুমি শুধু আমার বউ নও, তুমি আমার বাচ্চাদের মাম্মাও। আর এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।”
সুমু হেসে নিচু চোখে আয়নার দিকে তাকাল। তার ঠোঁট কেঁপে উঠছে, কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না।
শেরাজ সুমুকে টেনে নিয়ে চেয়ারে বসাল। সে তার পকেট থেকে একটা গয়নার ছোট বক্স বের করল। সুমু তাকাতেই শেরাজ বক্স থেকে একটা গোল্ডের ডেলিকেট ব্রেসলেট বের করে তার হাতে পরিয়ে দিল। সুমু তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ তার হাতের ওপর ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমু আলতো হাসল। শেরাজ সুমুর ঠোঁটের কাছে এগোতেই সুমু মুখ সরিয়ে নিয়ে গেল। শেরাজ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“জান! ও বেবি,
সোনার ময়না পাখি!
কবে তুমি হবে আমার, আসবে বুকে।”
সুমু কপাল কুঁচকালো। হঠাৎ বাইরে থেকে ফারিনের ডাক ভেসে এলো,
“সুমু আপু, তাড়াতাড়ি এসো।”
সুমু আবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য শ্বাস নিল। শেরাজ একপাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। সে ধীরে এসে সুমুর হাত ধরে বলল,
“চলো, যাওয়া যাক?”
সুমু ধীরে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। শেরাজ তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। দুজনে একসাথে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের আলো ভেতরে ঢুকে পড়ল, সঙ্গীতের সুর ভেসে এলো তাদের কানে।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই সকলে তাকাল। মেয়েরা ফিসফিস করে উঠল, বয়োজ্যেষ্ঠরা হাসিমুখে দোয়া করল। সুমু আর শেরাজ হাসিমুখে গার্ডেনে চলে গেল।

ঘড়িতে সময় রাত দশটা। অনুষ্ঠান শুরু হলো। আজকের মেহেন্দী ও সাঙ্গীতের প্রধান আকর্ষণ যদিও সামিয়া, নাজমিন আর ফারিয়া, তবু সকলের চোখ আটকে গেছে অন্য দিকে। সকল অবিবাহিত মেয়েরা বারবার চেয়ে দেখছে— শেরাজ, রায়য়ান, আরিয়ান আর শেরাজের বন্ধুদেরকে।
শেরাজের চোখের দৃষ্টি এখনো যেন সুমুর দিকে আটকে আছে। রায়য়ান আর আরিয়ানও নিজের স্টাইল নিয়ে উপস্থিত। তাদের উপস্থিতি যেন কিছুকে আলোড়িত করছে। মেয়েদের মধ্যে ফিসফিস ও হালকা কৌতূহল। কেউ কেউ চোখ সরাতে পারছে না। কেউ কেউ তাদের দেখে লজ্জায় হাসছে।
শেরাজ সুমুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে রেখে একটু পাশে হেঁটে গেল, একটা কল করার জন‍্য। সে চলে যাওয়ার সঙ্গে সাথেই সুমুর পাশের চেয়ারে এসে বসল, রায়য়ান। সুমু ভদ্রতাসূচক হাসি দিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। রায়য়ান হাসিমুখে সুমুর সাথে কথা বলতে শুরু করল।
শেরাজ ফোনে কথা বলতে বলতে সুমুর দিকে তাকিয়ে দেখল, রায়য়ান সুমুর পাশে বসে আছে। দুজনে হেসে কথা বলছে। শেরাজ কল কেটে ফোনটা পকেটে রেখে হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“বালাম মেরে চিটার হো গ‍্যায়ে,
বাজ সে টিটার হো গ‍্যায়ে!
পাড়েসন কি নাজরো কে,
অ্যাটেনশন সি কার হো গ‍্যায়ে!”
শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“ভাসুর আর ভাবিজি মিলে কি এতো গল্প হচ্ছে?”
রায়য়ান ভেতর ভেতর রেগে গেল এমন সম্মোধন শুনে। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ভাসুর মানে? রায়য়ান তো আমার ফ্রেন্ড। আপনি তো রায়য়ানকে চিনেন না।”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“তোমার ফ্রেন্ড মানে আমার ভাই। আর আমার ভাই মানে তোমার ভাসুর বা দেবর।”
সুমু ঠোঁট টিপে হাসল। রায়য়ান উঠে দাঁড়িয়ে চাপাস্বরে বলল,
“তোর এক্সাইটমেন্ট একটু বেশি হয়ে গেছে।”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,

“এক্সাইটমেন্ট? না, না! এটা যত্ন, রায়য়ান। আমি থাকতে আমার বউকে কেউ বিরক্ত করতে পারবে না।”
রায়য়ান আর কোন কথা না বলে চলে গেল। শেরাজ তার চলে যাওয়ার দিকে বাঁকা হেসে তাকিয়ে রইল।
অনুষ্ঠান শুরু হলো। সামিয়া, নাজমিন আর ফারিয়া সুন্দর করে সেজে বসে আছে। পিয়াস, আইয়ুব আর শাহরুখও রেডি হয়ে এসেছে। আজ পিয়াসের সব বন্ধু এসেছে। সেই সাথে তার পার্টির লোকজনও আজ উপস্থিত।
ইফতিয়া, রায়য়ান আর আরিয়ানকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বসে আছে। সে বুঝতেই পারছে না কাকে আগে দেখবে, কার দিকে আগে নজর রাখবে। তার প্রতিটি দৃষ্টি যেন তাকে অস্থির করে তুলছে।
ইশিতা, ইনায়া, নাতাশা, আলিশা আর রোজা সুমুর পাশে বসে আছে। রোজা যদিও সুমুর পাশে বসেছে, কিন্তু সুমুর সঙ্গে কথা বলছে না। তার চোখে লুকানো ঘৃণা আর ভেতরে বিরক্তি স্পষ্ট। ইনায়া দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সারবাজের দিকে নজর রাখছে। যে এখন মৃদু হেসে তার বন্ধুদের সঙ্গে মিশে আছে। রাহিনও বন্ধুদের সাথে বিষন্ন মনে দাঁড়িয়ে আছে।

অনুষ্ঠান পুরো জমজমাট হয়ে উঠেছে। চারপাশে রঙিন আলো, হাসি, গান আর চুপচাপ ফিসফিস— সব মিলেমিশে এক অনন্য উৎসবের পরিবেশ তৈরি করছে। সামিয়া, ফারিয়া আর নাজমিনের হাতে মেহেদী পড়ানো হচ্ছে। তাদের হাতে চেহারার মতোই উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে। মাঝে মাঝে তারা একে অপরের হাত দেখছে, হেসে উঠছে। সামিয়া উপরে হাসিখুশি থাকলেও, ভেতর ভেতর সে একটু একটু করে মরছে।
পিয়াস, আইয়ুব আর শাহরুখও বন্ধুদের সঙ্গে মিশে আড্ডা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে তারা হালকা ঠাট্টা করছে, তালে তালে নাচের ছন্দে হাত নাড়ছে। তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের প্রাণকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
এদিকে গার্ডেনের একপাশে শেরাজ, স‍্যান্ডির সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মেয়েরা তার সাথে সেলফি তোলার জন‍্য আসছে আর স‍্যান্ডি সবাইকে সরিয়ে দিচ্ছে। শেরাজ কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে বারবার সুমুর দিকে তাকাচ্ছে। সুমু এখন লেহেঙ্গার ঝলমলে রঙে মোড়া, আর শেরাজের চোখ শুধু তার বউয়ের দিকে। যার প্রতি তার ভালোবাসা আকাশছোঁয়া।

অন‍্যদিকে, আরিয়ান অটোগ্রাফ আর ফটোগ্রাফ দিতে ব‍্যস্ত। তার এখন এসব মেয়েদের বিরক্ত লাগছে, কিন্তু সে ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতেও পারছে না। তার পাশে রায়য়ান গম্ভীরমুখে বসে ফোনে স্ক্রল করছে। মেয়েরা চেষ্টা করছে আরিয়ানের সাথে সাথে রায়য়ানের থেকেও একটু মনযোগ পেতে, কিন্তু রায়য়ানের গম্ভীর মুখ দেখে কেউ আর তাকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেনা।
গান আর তালের সঙ্গে হঠাৎ মঞ্চে ড‍্যান্স পারফরম্যান্স শুরু হলো। আলো কমে গিয়ে রঙিন লাইটগুলো মঞ্চে ঘুরতে লাগল। মেয়েরা হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাসে মাতল, ছেলেরা শিস দিয়ে উৎসাহ দিল। পরিবেশ আরও সরগরম হয়ে উঠল।
সামিয়া, নাজমিন আর ফারিয়া হাতের মেহেদী শুকাতে শুকাতে সেই নাচ দেখছে। বাইরে থেকে তারা হাসছে, হাততালি দিচ্ছে, কিন্তু সামিয়ার চোখে অদ্ভুত এক খালি দৃষ্টি। তার মুখে হাসি থাকলেও, ভেতরে ভেতরে যেন কিছু একটার অভাব কুরে কুরে খাচ্ছে।
সুমু সকলের সাথে বসে কথা বলছে। শেরাজ পাশে এসে দাঁড়াতেই সবার দৃষ্টি তাদের দিকে ঘুরে গেল। মেয়েদের মধ্যে পুরো কৌতূহল আর ফিসফিসানি। শেরাজ নিচু হয়ে সুমুর কানে মৃদু স্বরে বলল,

“চলো, একটু বাইরের হাওয়া খেয়ে আসি।”
সুমু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। তারপর নিচু চোখে হালকা মাথা নাড়ল। শেরাজ হাত বাড়িয়ে দিল। সুমু লজ্জা সামলে হাত রাখল তার হাতে। দুজন গার্ডেনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল। চারপাশে ঝুলন্ত ফেয়ারি লাইট আর ফুলের গন্ধে ভরে উঠেছে রাতের হাওয়া।
রোজার চোখ আটকে গেল এই দৃশ্যে। তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“কেন জানি না, ওদের একসাথে দেখলেই মনে হয়, এদের মাঝে ঢোকা অসম্ভব।”
হঠাৎ সে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলল তার। সে বাঁকা হেসে বলল,
“একটা সময় আসবেই, যখন এই মায়া ভেঙে যাবে।”
মঞ্চে আবার করতালি উঠল, কিন্তু গার্ডেনের সেই ছোট্ট পথ ধরে শেরাজ আর সুমুর হাঁটা যেন চারপাশের সবকিছুকে ম্লান করে দিল। হঠাৎ শেরাজ সুমুকে বলল,

“সুইটহার্ট, একটু দাড়াও। তোমার কিছু পিক তুলি।”
সুমু হাসিমুখে সম্মতি জানালো। শেরাজ ক্যামেরার ফ্রেমে সুমুর হাসি আর চোখের দীপ্তি বন্দি করতে ব্যস্ত হলো। সুমু একেকবারে একেক রকমের লাজুক ভঙ্গিতে পোজ দিচ্ছে। কখনও ঠোঁটে হালকা হাসি, কখনও কানের দুলে হাত দিয়ে পোজ দিচ্ছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে এক ছেলের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ইশ! কি জিনিস মাইরি। ভাই তো জিতছেন। এমন মাল সবাই পায় না, ব্রো।”
তার পাশ থেকে আরেকটা ছেলে বলল,
“ভাই এইটা সুমু না? যার পিছনে আপনি কতো ঘুরেছেন?”
ছেলেটা দাঁত কেলিয়ে বলল,

“আরে হ‍্যাঁ রে! মালটাকে এতো ভালোবাসলাম, কিন্তু মালটা আমাকে বুঝলো না। আর আমিও পিয়াসের বোন বলে, জোর করে তুলে নিতে পারিনি।”
কথাগুলো শেরাজের কান পযর্ন্ত যেতেই তার মুখের হাসি নিভে গেল। তার চোখে মুহূর্তেই ভয়ঙ্কর রাগের ঝিলিক নেমে এলো। কথাগুলো এড়িয়ে গেল না স‍্যান্ডি, শেরাজের ফ্রেন্ডস, আরিয়ান আর রায়য়ানকেও। তারও কথাগুলো শুনে রেগে গেল। আরিয়ান আর রায়য়ান উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা দুজন এগিয়ে আসতে গেলেই অমিত, সারবাজরা গিয়ে সামলালো তাদের।
সুমু অবাক হয়ে ঘুরে তাকাল। ছেলেটা হাসতে হাসতে সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ এক’পা এক’পা করে এগিয়ে গেল ছেলেগুলোর দিকে। সুমু চমকে উঠে বলল,
“ছেড়ে দিন, খান সাহেব। এখানে কিছু করবেন না।”
কিন্তু শেরাজ থামল না। সে একেবারে ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার গলার স্বর নিচু, কিন্তু এতটা কঠিন যে চারপাশের বাতাসও ভারী হয়ে উঠল,

“আরেকবার বল তো, কাকে মাল বললি?”
ছেলেটা হকচকিয়ে গেল। পর মুহুর্তে সে হেসে বলল,
“হিরোগিরি দেখানো হচ্ছে, তাও আমাদের এলাকায় এসে? আরে ভাই মজা করে বলেছি। এতো সিরিয়াস কেন নিচ্ছেন?”
শেরাজ তার শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“মজা? আমার বউকে নিয়ে বাজে কথা বলার নাম যদি তোর কাছে মজা হয়—তাহলে আমি আমার মজার করার ধরনটা তোর ওপর ট্রাই করি?”
সারবাজরা দৌড়ে এসে শেরাজকে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“আরে আরে, এস.কে অনুষ্ঠান চলছে। প্লিজ, শান্ত হ।”
শেরাজ চোখ রক্তবর্ণ করে ছেলেটার কলার ছেড়ে দিল। কিন্তু খুব কাছে ঝুঁকে গর্জে উঠে বলল,
“তোর সাথে খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে। এলাকা আর পাওয়ারের দাপট তোর পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে, সামনে দিয়ে বের করে আনবো মাদারফাকারের বাচ্চা।”
সে সোজা ঘুরে গিয়ে সুমুর হাত ধরল। সুমু এখনো অস্থির, তার বুক কাঁপছে। শেরাজ মৃদু স্বরে বলল,

“চিন্তা করো না। সব মিটিয়ে নিলাম।”
সে সুমুর হাত শক্ত করে ধরে ভিড়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেল। তার মুখ গম্ভীর, চোখে আগুনের মতো দ্যুতি। আশেপাশের লোকজন সবাই টের পাচ্ছে, কিছু একটা ঘটে গেছে। ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল চারপাশে। বাড়ির বড়রা সবাইকে সামলে নিল।
সুমু নিঃশব্দে হাঁটছে, তার বুকের ভেতর কাঁপন থামছেই না। সে জানে শেরাজের রাগ ভয়ঙ্কর, আর আজ তাকে আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব ছিল।
শেরাজ সোজা গার্ডেনের এক কোণে গিয়ে থামল। তারপর হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ল, যেন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সুমুর দিকে ঘুরে সে আস্তে বলল,
“সুইটহার্ট, তোমাকে কেউ বাজে কথা বললে আমার সহ‍্য হয় না। আমি শুধু চাই, তুমি জানো, তুমি আমার সম্মান, আমার অহংকার।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল। সে আস্তে করে বলল,
“কিন্তু আপনি এভাবে রেগে গেলে, আমি ভয় পাই।”
শেরাজ হালকা হেসে তার মুখের ওপর হাত রাখল।
“ভয় পেও না। তোমাকে ভয় দেখানো নয়, তোমাকে রক্ষা করাই আমার কাজ।”

সুমু নিচু চোখে মাথা নাড়ল। সে তার হাত শেরাজের হাতে আরও শক্ত করে ধরা দিল। এদিকে ভেতরে অনুষ্ঠান জমে উঠছে। সামিয়া, নাজমিন আর ফারিয়ার হাসি-আড্ডা, মেহেদির ঘ্রাণ, আর সুরের ঝংকারে চারপাশ মুখর। কিন্তু আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক জোড়া চোখ ঠিকই লক্ষ্য করেছে শেরাজ আর সুমুর এই মুহূর্ত।
রায়য়ান পাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে সিগারেট ধরাল। আরিয়ান দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বসে রইল।
অমিত হেসে চোখ টিপে সারবাজকে বলল,
“দেখেছিস? এটাই হলো আসল কানেকশন। যে যার জন্য পাগল, তাকে রক্ষা করতে এভাবেই দাঁড়াতে হয়।”
নিহাল মুচকি হেসে বলল,
“এজন্যই মেয়েরা আজও এস.কে,কে দেখলে পাগল হয়ে যায়। কারণ ও শুধু হ্যান্ডসাম না—ও একসাথে পাগল, লেডি কিলার আর প্রোটেক্টিভ।”
গার্ডেনের আলোয় তখন শেরাজ সুমুকে বুকে টেনে বলল,
“চলো, আবার ভিড়ে যাওয়া যাক। আজকের রাতটা শুধু তোমার হাসির জন্য।”

সুমু তার কাঁধে মাথা রাখল। ধীরে ধীরে দুজনে আবার মেহেন্দীর আসরে ফিরে গেল। এদিকে, অনুষ্ঠান চলতে চলতে পিয়াসের পার্টির দুই ছেলে—আশিস আর জিসান—মেয়েদের মধ্যে নিজের স্টাইল দেখাতে শুরু করল। তারা ইফতিয়া আর ফারিনের পিছনে লেগেছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে।
ফারিনের সামনে এসে আবারও আশিস আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,
“শোনো, তুমি আমাকে মেনে নাও বা না নাও, আমি কিন্তু তোমাকেই চাই।”
ফারিন তার কাঁধ থেকে ওড়না টেনে ঠিক করে নিল, তারপর সোজা চোখে তাকিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“আমার উত্তর তো আপনি আগেই পেয়েছেন। আরেকবার যদি এভাবে আমার সামনে আসেন, সরাসরি আমার ভাইয়াকে বলব। তখন সামলাতে পারবেন তো?”
আশিসের মুখের রঙ তৎক্ষণাৎ বদলে গেল। পিয়াসের নাম শুনেই সে গিলে ফেলল তার সব বাড়তি সাহস। বিড়বিড়িয়ে কিছু বলে সরে গেল সে। কিন্তু চোখে তবুও একরাশ অপমান আর জেদ রয়ে গেল।
অন্যদিকে, জিসান ইফতিয়ার কাছে এসে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল,

“একটা সুযোগ দিলেই দেখবে, তোমাকে কতোটা স্পেশালভাবে রাখতে পারি।”
ইফতিয়া ভ্রু কুঁচকে, বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিল,
“আপনাকে আমার ভালো লাগেনি। আপনি আমার চয়েজ জানেন?”
জিসান একটু হেসে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“বলো তোমার কেমন ছেলে পছন্দ, আমি তেমন হয়ে দেখাব।”
ইফতিয়া বিরক্ত হয়ে চেয়ার থেকে উঠে চলে গেল, ফারিনও তার হাত ধরে পেছনে পেছনে বেরিয়ে এলো। দূর দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান, রায়য়ান আর শেরাজ পুরো দৃশ্যটা খেয়াল করছিল। শেরাজের গম্ভীর চোখ এক মুহূর্তের জন্য আশিসআর জিসানের ওপর পড়তেই ছেলেদুটো একেবারে চুপ মেরে গেল।
এই কান্ড দেখে রায়য়ান, আরিয়ানকে বলল,
“এদের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বেপরোয়া বাচ্চা। এখানে সবগুলো কি মেয়ে পটাতে এসেছে নাকি?”
আরিয়ান ঠাণ্ডা গলায় বলল,

“মেয়ে মানুষ এমনই হয়। শুধু টানে, তাই না?”
দুজনেই একসাথে দূরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা সুমুর দিকে তাকাল। সুমু হাসিমুখে অনুষ্ঠান দেখতে ব‍্যস্ত।
নাচ-গানের পর্ব প্রায় শেষের দিকে। এদিকে সামিয়া নিজের হাতে পিয়াসের নাম লিখতে চাইছে না। হঠাৎ পিয়াস গিয়ে মেহেদী আর্টিস্টের হাত থেকে মেহেদী নিয়ে নিল। সে ধীরে সামিয়ার হাত ধরল। সামিয়া মাথা নিচু করে বসে আছে। দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে রাহিন। পিয়াস আলতো হেসে সামিয়ার হাত‍ে নিজের নাম লিখে দিল।
চারদিক থেকে হাততালি, উচ্ছ্বাস আর চিৎকারে পরিবেশ মুখর হয়ে উঠল। অনুষ্ঠান আরও রঙিন হয়ে গেল। স্টেজে মেয়েদের ডাক পড়ল। প্রথমেই সামিয়াকে উঠে আসার জন্য বলা হলো। চারপাশ থেকে সবাই উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু সামিয়া সবার সামনে হালকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল।

“না! আমি পারব না। আমার একটু অসুবিধা আছে।”
পিয়াস সবাইকে বারণ করল। তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, কেউ আর সামিয়াকে জোরাজুরি করল না। তবে সামিয়ার চোখেমুখে স্পষ্ট হলো, কিছু একটা তাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিচ্ছে।
স্টেজে উঠে গেল ফারিয়া-শাহরুখ আর নাজমিন-আইয়ুব। অডিও স্পিকারে বাজতে শুরু করল জনপ্রিয় এক গান ‘মেহেন্দি লাগা কে রাখনা’। তালে তালে দু’জোড়া জুটি নাচতে শুরু করল। আলো ঝলমলে স্টেজ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাদের হাসি আর নাচের ছন্দে।
শাহরুখ ফারিয়ার হাত শক্ত করে ধরে ঘুরিয়ে নাচাচ্ছে, ফারিয়ার হাসি যেন সবার মন মাতিয়ে তুলল। নাজমিন আর আইয়ুবও চমৎকার কেমিস্ট্রি দেখাচ্ছে—তাদের চোখের ইশারা, ছোট ছোট মুভস দেখে দর্শকদের হাততালি থামছেই না। অডিয়েন্সে বসে থাকা মেয়েরা আরও উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“উফফ, শাহরুখের সাথে ফারিয়ার জুটি একদম ফায়ার। আইয়ুব-নাজমিনের কিউটনেসটা দেখেছো? পারফেক্ট!”
সামিয়া সব চুপচাপ বসে দেখছে। তার ঠোঁটে জোর করে টেনে আনা হাসি। কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা চোখ এড়িয়ে গেল না রাহিনের।
পিয়াস তার পাশে বসল। সামিয়ার হাত আস্তে ধরে নিচু স্বরে বলল,

“তুই না চাইলে, কেউ তোকে বাধ্য করতে পারবে না। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে, তুই হাসছিস, অথচ ভেতরে অনেক কষ্ট চেপে রেখে।”
সামিয়া এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“সবাই ভাবে আমি স্ট্রং, কিন্তু মাঝে মাঝে নিজের ভেতরেই হারিয়ে যাই।”
পিয়াস একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“যতদিন আমি আছি, ততদিন তোর একা হারিয়ে যাওয়ার আর সুযোগ নেই।”
সামিয়া তার দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে চোখ নামিয়ে নিল। পিয়াসও আলতো হেসে অনুষ্ঠান দেখাতে মন দিল।
এদিকে, স্টেজে নাচ শেষ হলো। তুমুল হাততালিতে মুখর হলো হলঘর। নাচ-গানের পর এবার গার্ডেনে ভেতর থেকে গলা উঠল,

‘এবার সামিয়া আর পিয়াস! তোমরা দু’জন একটা গান গাও।”
সামিয়া ভ্রু কুঁচকে একটু বলল,
“না, না! আমি পারব না।”
পিয়াস মুচকি হেসে তার দিকে তাকাল।
“কেন পারবি না? তুই তো খুব ভালো গাস। আজ তুই গান না গাইলে, অনুষ্ঠানটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”
সামিয়া আবারও আপত্তি জানাতে চাইল, কিন্তু চারপাশের চাপে আর পিয়াসের চোখের দৃষ্টিতে না বলতে পারল না। শেষমেশ সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
অডিয়েন্স উল্লাসে ফেটে পড়ল। স্টেজে উঠে মাইক হাতে নিল পিয়াস। সে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“শুরু তুই কর, আমি সাথ দেব।”
সামিয়া গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,

“ফারিয়া আপু আর শাহরুখ ভাইয়া, তোমরাও এসো।”
শাহরুখ আর ফারিয়া উঠে এলো। সামিয়া মুচকি হেসে বলল,
“তোমরা আগে শুরু করো।”
এরই মধ্যে আইয়ুব ইচ্ছা করে রাহিনকে টেনে নিয়ে স্টেজের ওপর এসে বলল,
“রাহিন কিন্তু অনেক সুন্দর গায়। তোমাদের সাথ‍ে রাহিনও গলা মেলাবে।”
রাহিন আপত্তি করতেই, আইয়ুব চাপাস্বরে বলল,
“যা বলছি, চুপচাপ কর।”
রাহিন একবার সামিয়ার দিকে তাকিয়ে রাজি হলো। ফারিয়া মুচকি হেসে শাহরুখের দিকে তাকিয়ে গান ধরল,
আমাকে ভুলে যেও না,

বিরহের গান গেও না!
ফারিয়া থামতেই শাহরুখ সুর ধরল,
হোওওও
আমাকে ভুলে যেও না,
বিরহের গান গেও না!
এবার সামিয়া সুর ধরল,
কখনও দুঃখ পেও না,
কখনও না!
রাহিন সামিয়ার দিকে তাকিয়ে সুর ধরল,
তুমি আমার,
শুধু আমার!
রাহিন থামতেই পিয়াস সুর ধরল
আমি তোমার,
শুধু তোমার!

শেরাজ দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছে। সুমু মুগ্ধ হয়ে গান শুনছে। ইফতিয়া চুপচাপ বসে আরিয়ানের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে—যেন গানটা শুধু তার জন্যই বাজছে।
এদিকে আলিশা রায়য়ানকে দেখছে। ইনায়া তাকিয়ে আছে সারবাজের দিকে। এতো আনন্দের মাঝেও যেন কারো কারো হৃদয়ের ভাঙা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে।
গানের শেষ লাইন শেষ হতেই গার্ডেনে হাততালিতে গর্জে উঠল। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল,
“ওয়ান্স মোর, রাহিন! ওয়ান্স মোর!”
সকলে রাহিনের গানের গলা শুনে মুগ্ধ। সামিয়া রাহিনের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। পিয়াস সামিয়াকে নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে এলো। তাদের সাথে স্টেজ থেকে নেমে এলো শাহরুখ-ফারিয়াও। রাহিন সকলের অনুরোধে আবারও গান ধরল,

“ইতনি মহাব্বাত কারো না,
ম্যায় ডুব না যায়ু কাহি!
ওয়াপাস কিনারে পে আনা,
ম্যায় ভুল না যায়ু কাহি!
দেখা যাবসে হ্যায় চেহেরা তেরা,
ম্যায় তো হাফতো সে শোয়া নাহি!
বোল দো না জরা,
দিল মে যো হ্যায় ছুপা,
ম্যায় কিসি সে কহুংঁগা নেহি!”
সামিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। সে ঘুরে তাকাল রাহিনের দিকে। রাহিনের চোখ তার দিকেই আটকে আছে। সামিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। সে না পারছে সহ‍্য করতে, আর না পারছে কাউকে মুখ খুলে বলতে।

“মুঝে নিন্দ নেহি আতি হে আকেলে,
খাওয়াবো মে আয়্যা কারো!
নেহি চাল সকুংগা তুমহারে বিনা ম্যায়,
মেরা তুম সহারা বানো!
এক তুমহে চাহনে কে আলাভা,
ওর কুছ হামসে হোগা নেহি!
বোল দো না জরা,
দিল মে যো হ্যায় ছুপা,
ম্যায় কিসি সে কহুংগা নেহি!”
পিয়াস সামিয়ার হাত ধরল। সামিয়ার একবার নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার চোখে পানি টইটুম্বুর করছে। রাহিন তাকিয়ে দেখল দুজনকে একসাথে। তার ঠোঁটে কোণে ব‍্যথাতুর হাসি ফুটে উঠল।

“হামারি কামি তুমকো মেহেসুস হোগি,
ভীগা দেংগী যাব বারিশে!
ম্যায় ভার কার কে লায়া হুঁ আখো মে আপনে,
আধূরি সি কুছ খওয়াহিশে!
রূহ সে চাহনে ওয়ালে আশিক,
বাতে জিসমো কি কারতে নেহি!
বোল দো না জরা,
দিল মে যো হ্যায় ছুপা,
ম্যায় কিসি সে কহুংঁগা নেহি!”
গান শেষ হতেই আবারও গার্ডেনে হাততালিতে গর্জে উঠল। সবাই উচ্ছ্বসিত, আবারও রাহিনের নাম ধরে ডাকতে লাগল। এতো ভিড়ের মধ্যেই সামিয়া স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। সে দ্রুত বেরিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই পিয়াস তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। সে বিস্মিত হয়ে বলল,
“কি হয়েছে? কোথায় যাচ্ছিস? আর তোর চোখে পানি কেন?”
সামিয়া থতমত খেয়ে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল। সে নিচুস্বরে বলল,

“আসলে, আমার মাথাব্যথা করছে। আমি আর এখানে থাকতে চাই না। চারপাশে এতো শব্দ আমাকে অসহ্য যন্ত্রণা দিচ্ছে।”
পিয়াস তার মুখের দিকে গভীরভাবে তাকাল। সে কিছু একটা বুঝে ফেললেও চেপে গেল। মরিয়া ভঙ্গিতে সে সামিয়ার হাতটা আরো শক্ত করে ধরল।
“চুপ করে এখানে দাঁড়া। এতো ছটফট করিস কেন তুই?”
সামিয়া ঝাঁকুনি দিয়ে হাত ছাড়াতে চাইল,
“আমাকে ছাড়ুন, আমি রুমে যেতে চাই।”
পিয়াস হালকা রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“চল, আমি দিয়ে আসছি।”
সামিয়া তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়ল,
“না! আমি পারব। আমি একাই চলে যাব।”
পিয়াস এবার কিছুটা ধমকের সুরে বলল,
“একদম চুপ করে থাক। চল, আমি দিয়ে আসছি।”
সে সামিয়ার হাত শক্ত করে ধরল। চারপাশের সবাই বিষয়টা খেয়াল করলেও কেউ কিছু বলল না। তবে কয়েক জোড়া চোখ তাদের দিকে উদ্বেগ হয়ে তাকিয়ে রইল। রাহিন দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল। তার চোখে ব্যথার রেখা ঘন হয়ে উঠল।
পিয়াস সামিয়ার হাত শক্ত করে ধরে গার্ডেন হাউজের ভেতরের করিডর দিয়ে তাকে রুম পর্যন্ত পৌঁছে দিল। রুমে এসে সে সামিয়াকে পেইন কিলার দিয়ে বলল,

“একটু রেস্ট কর। আমি কাউকে পাঠাচ্ছি তোর কাছে।”
সামিয়া বাঁধা দিয়ে বলল,
“তার দরকার নেই। আমি এখন একটু ঘুমাতে চাই। কেউ এলে আমার ডিস্টার্ব হবে।”
পিয়াস মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সে রুমের দরজা বন্ধ করে দিল, কিন্তু একবারও সামিয়ার মুখের দিকে আর তাকাল না। তার চোখে যেন চাপা রাগ আর অস্থিরতা একসাথে জমে আছে।
সামিয়া বিছানায় বসেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকের ভেতর কেমন শূন্যতা তৈরি হলো। সে উঠে গিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। রাহিনের কণ্ঠ এখনো যেন তার কানে বাজছে। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
অন্যদিকে, পিয়াস ভারী পায়ে আবার গার্ডেনে ফিরে এলো। গার্ডেন তখনো উৎসবে মাতোয়ারা। লাইট, মিউজিক, হাসি-আড্ডায় চারদিক জমজমাট। ইফতিয়া, ফারিনকে টেনে নিয়ে রাহিনের কাছে এলো। সে হেসে বলল,

“তুমি তো আসলেই অন্য লেভেলের গায়ক, রাহিন ভাইয়া। আমাদের তো মনে হচ্ছিল, গানটা শুধু আমাদের জন্যই গাইছ।”
ফারিনও মুচকি হেসে মাথা নাড়ল,
“একদম! কণ্ঠ শুনে এক মুহূর্তের জন্য আমরা অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম।”
শাহরুখ মজা করে বলল,
“আরে, এভাবে যদি বারবার গান গাও, তাহলে তো আর কোনো মেয়ে বাকি থাকবে না—সবাই তোমার ফ্যান হয়ে যাবে।”
সবার হাসির মাঝে রাহিন চুপচাপ রইল। তার চোখ স্থির হয়ে আছে নিচের দিকে। চারপাশের আনন্দ যেন তার ভেতরে পৌঁছাচ্ছে না।
নাজমিন লক্ষ্য করল রাহিনের মুখের অভিব্যক্তি। সে কাছে এসে নিচুস্বরে বলল,

“আপনি ঠিক আছেন তো, ভাইয়া?”
রাহিন সামান্য হেসে মাথা নাড়ল,
“হ্যাঁ, আমি একদম ঠিক আছি।”
কিন্তু তার কণ্ঠের ভেতরে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। এই দৃশ্য দূরে দাঁড়িয়ে রায়য়ান খেয়াল করছিল। সে সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছেড়ে আরিয়ানকে বলল,
“দেখেছিস? গান যে আসলে কাকে ছুঁয়ে গেছে, সেটা কমবেশি সবাই বুঝছে।”
আরিয়ান চোখ কুঁচকে তাকাল সামিয়ার ফাঁকা চেয়ারের দিকে, তারপর বলল,
“হুম, সত্যি কথা বলেছিস। এ গল্পের ভেতরে অনেক আগুন চাপা আছে।”
রায়য়ান হেসে বলল,
“আর সেই আগুনই একদিন সবাইকে জ্বালাবে।”
বাগান জুড়ে আবারও করতালিতে গর্জে উঠল। কিন্তু ভিড়ের মাঝেও কিছু দৃষ্টি একে অপরের দিকে ছুটে গিয়ে আটকে থাকল—যেখানে ভালোবাসা, ব্যথা আর অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষার লুকোচুরি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ঘড়িতে রাত প্রায় তিনটা। রাস্তা নিঃশব্দ, শুধু দূরের এক ফ্লিকারের বাতি হালকা ঝলসে উঠছে। চারপাশে কোনো মানুষের পদধ্বনি নেই। গাছের ছায়া দানবের মতো হেলে হেলে পড়ছে রাস্তায়। হঠাৎ হাওয়ার সঙ্গে সেকেন্ডের জন্য পাতার শব্দ ভেসে এলো।
অর্ণব তার পার্টির লোকদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরছে। হাতে সিগারেট, ঠোঁটে গান গুনগুন করছে। রাতটা যেন তার কাছে একেবারে হালকা লাগছে। সে সুমুদের বাড়ি থেকে সোজা পার্টির লোকদের সাথে আড্ডায় গিয়েছিল। তাই আজ বাইকটাও নেই তার সাথে। সে হালকা মাতাল অবস্থায় শুনশান রাস্তা দিয়ে আনন্দের সাথে হেঁটে আসছে।
হঠাৎ সামনেই দেখতে পেল—একটা অভয় দাঁড়িয়ে আছে। অর্ণব কপাল কুঁচকে বলল,
“এই কে রে?”
অভয়টা হঠাৎ কোমর থেকে একটা বড় ছুরি বের করল। অর্ণব আঁতকে উঠে দু’পা পিছিয়ে গেল। অভয়টা এগিয়ে আসতেই অর্ণব প্রাণপণে দৌড় দিল। অনেকটা পথ ছুটে এসে পিছনে তাকাল—কেউ নেই। হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে না বাঁচতেই সামনে চোখ পড়ল তার—আরেকটা অভয় দাঁড়িয়ে।
অর্ণব ভয়ে এবার উল্টো দিকে দৌড় দিল। কিছু দূর গিয়ে আবার পেছনে তাকাল। কিন্তু ফাঁকা রাস্তা, কেউ নেই। সে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের মনকে বলল,

“না, আমি ভুল দেখছি। এত রাতে মদ-সিগারেটের নেশায় ভ্রম হচ্ছে হয়তো।”
এই ভেবে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু আচমকাই তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। ভয়ে সে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে পালাতে যাবার আগেই দেখতে পেল—চারদিক থেকে আরও দুই অভয় তাকে ঘিরে ফেলেছে।
অর্ণব হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কপালে ঘাম জড়ো হয়েছে। শেষে সামনে আসা অভয়টা গম্ভীর গলায় বলল,

“তোরা দুজন এখানে কি করিস?”
আরিয়ান কপাল কুঁচকে বলল,
“তোরা দুজন কি করিস, তাই বল?”
রায়য়ান বাঁকা হেসে বলল,
“তোরা কি করিস তাই বল? আমি এখানে এটাকে মারতে এসেছি।”
তিনজনের মুখে ভয়ঙ্কর কঠিন অভিব্যক্তি। অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল। সে তো জানেই না, ওরা তিনজনই আলাদা আলাদাভাবে আজ রাতে তাকে শিকার করতে এসেছে। আর না শেরাজরা কেউ জানতো যে, অন্য দু’জনও আসবে।
প্রথমে আরিয়ান অর্ণবের কলার ধরে টেনে নিয়ে বলল,
“আরেকবার বল তো, কাকে মাল বলেছিলি?”
শেরাজ দাঁত চেপে বলল,
“আমার বউকে নিয়ে বাজে কথা বলিস, তাই না? আজ বুঝবি, সম্মান নিয়ে খেলা কাকে বলে।”
রায়য়ান ধূমপানের ধোঁয়া ছাড়ল অর্ণবের মুখের সামনে,
“আমি আবার কারো মুখ থেকে সুমুর নাম এভাবে শুনতে পারি না। সেখানে তুই ওকে মাল বললি?”
আরিয়ান ধীর গলায় ফিসফিস করে বলল,
“অনেকদিন পর আজ কাউকে পরপারে পাঠাব। আই এম সো এক্সসাইটেড।”
অর্ণব চারপাশে তাকাল, তার চোখে আতঙ্ক জমে উঠল। তিন দিক থেকে তিনজন এগিয়ে আসছে, তাদের ক্রোধে অগ্নিগর্ভ চোখ। পালাবার কোনো রাস্তা নেই। অর্ণব হকচকিয়ে চোখ মেলে তাকাল। সে এখন বুঝতে পারছে—এরা তিনজন কারা। সে শেরাজদের হালকার ওপর নিয়ে হেসে বলল,

“বাহ্! এক ফুলের তিন মালি। ইন্টারেস্টিং তো বিষয়টা। একজনকে মাল বললাম, প্রতিবাদ করতে তার তিনজন আশিক এসে হাজির হলো। শালি, বিদেশি তিনটা জোশ জিনিস নিজের জন্য রেখেছে। আর এই আমি… আমি কি এতই খারাপ দেখতে যে, আমাকে একটা সুযোগও দিল না?” সে একটু থেমে গলা চড়িয়ে বলল, “বিশ্বাস করেন ভাই, আপনাদের মতো আমিও ওকে খুশি করে দিতাম। কিন্তু শালি একবারও আমাকে চান্স দিল না। নিজেকে এমন দেখাতো, যেন ওর মতো পবিত্র নারী পৃথিবীতে নেই! আরে আমায় আগে বলতো, ওর আপনাদের মতো…”
অর্ণব তার কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ ঝড় নামল। শেরাজের হাত উঁচু করে তার হাতে থাকা হাতুরি দিয়ে অর্ণবের মাথায় এমন এক বারি দিল যে মুহূর্তেই তার কপাল ফেটে রক্ত ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। রক্তের সাথে মগজের অংশ ছিটকে গিয়ে দূরে আছড়ে পড়ল।

অর্ণব চিৎকার করার আগেই আরিয়ান নিজের হাতে থাকা বন্দুক বের করে অর্ণবের শরীর ঝাঁঝরা করে দিল একের পর এক গুলিতে। তার বুক, পেট আর পা দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল ঝর্ণার মতো।
শেষ আঘাতটা করল, রায়য়ান। তার চোখে অমানবিক ক্রোধ। সে হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে অর্ণবের শরীরের প্রতিটি অংশে এমনভাবে কুপিয়ে দিল, যেন অর্ণবের শরীর আর মানুষ বলে চেনার উপায় না থাকে। হাত, বুক, পিঠ, পা—সব জায়গায় রক্তাক্ত ক্ষত, মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো।
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু শোনা যাচ্ছিল অর্ণবের শেষ নিঃশ্বাসের করুণ শব্দ। তারপর একসময় সেটাও থেমে গেল। তিনজন দাঁড়িয়ে রইল রক্তমাখা হাত আর শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে। তাদের চোখে তখনও আগুন, আর ভেতরে এক অদ্ভুত আমানুষিক রাগ। কারণ তারা জানত—এতো সহজ মৃত্যু কারো পর্যাপ্ত শাস্তি হতে পারে না।
অর্ণবের নিথর দেহটা পড়ে আছে রক্তের সাগরে। তার শরীর ছিন্নভিন্ন, প্রতিটি কোণা থেকে রক্ত ঝরছে। শেরাজ, রায়য়ান আর আরিয়ান পরস্পরের দিকে তাকাল—তাদের চোখে কোনো ভয় নেই, নেই অনুতাপও। শুধু আছে ঠাণ্ডা, ভৌতিক এক প্রশান্তি।

খান সাহেব পর্ব ৬৭ (৩)

শেরাজ ঝুঁকে অর্ণবের ছেঁড়া বুক থেকে এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে হাতে তুলে নিল। তার ঠোঁটে বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। সে মাংসর টুকরোটা রাস্তার পাশে ঘুরঘুর করতে থাকা ক্ষুধার্ত কুকুরগুলোর সামনে ছুঁড়ে দিল।
কুকুরগুলো প্রথমে ঘ্রাণ নিল, তারপর হঠাৎ যেন উন্মাদ হয়ে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রক্তমাখা মাংস নিয়ে তারা ছিঁড়ে খেতে শুরু করল অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে। গর্জন আর দাঁত বসানোর শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
রায়য়ান আর আরিয়ানও একইভাবে অর্ণবের দেহ থেকে টুকরো টুকরো মাংস ছিঁড়ে কুকুরদের দিকে ছুঁড়ে দিল। অল্প সময়ের মধ্যে অর্ণবের শরীরের অনেকখানি অংশ কুকুরদের খাদ্যে পরিণত হলো। রাতের আঁধারে, শুনশান রাস্তায় হাহাকার আর রক্তের গন্ধে ভরপুর এক বিভীষিকাময় দৃশ্য তৈরি হলো। কুকুরগুলো রক্তাক্ত মুখ তুলে তৃপ্তির সাথে হাঁপাচ্ছে, আর শেরাজরা তিনজন ঠাণ্ডা চোখে দাঁড়িয়ে সেটা উপভোগ করছে—যেন তাদের প্রতিশোধের পূর্ণতা এভাবেই হলো।

খান সাহেব পর্ব ৬৯