খান সাহেব পর্ব ৭২
সুমাইয়া জাহান
কেটে গেল দশদিন। পিয়াসের অবস্থা এখন স্থিতিশীল। তাকে আজ সকলে দেখতে এসেছে। কেবিনে এখন ভিড় জমেছে—শাহরুখদের পরিবার, পিয়াসের বন্ধুরা, পিয়াসের মা-বাবা—সবাই একে একে এসে বসেছে পাশে। কেউ ফল নিয়ে এসেছে, কেউ ফুল, আবার কেউ শুধু দু’টো সান্ত্বনার কথা বলে চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিনের পর থেকে তাকে আর দেখতে আসেনি সুমুরা।
পিয়াস বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, মুখে হালকা ক্লান্তি হলেও চোখে একটা অদ্ভুত রহস্য। সবাই যখন তার শরীর নিয়ে চিন্তিত, সে তখন চুপচাপ চারপাশে তাকাচ্ছে– যেন একটি কাঙ্ক্ষিত মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
মুস্তাক সিকদাররা পিয়াসের সাথে হালকা কথাবার্তা বলে, হাসি-ঠাট্টা করে পরিবেশটা একটু হালকা করার চেষ্টা করল। কিন্তু ডাক্তারদের বলে যাওয়া নিয়মে একসময় সবাইকে কেবিন খালি করার অনুরোধ জানালেন তারা। মুস্তাক সিকদার সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
“আচ্ছা, তোমরা কাল আবার এসো। এখন, ওকে বিশ্রাম নিতে দিতে হবে।”
মুস্তাক সিকদারের কথা শুনে একে একে সবাই বেরিয়ে যেতে লাগল। কেউ ফুলের তোড়া রেখে দিল টেবিলে, কেউ ফলের ব্যাগটা বেডের নিচে রেখে গেল।
কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সুমি বেগম ছেলেকে স্নেহভরে কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর তিনিও বেরিয়ে গেলেন। মুহূর্তেই ভিড়ভাট্টায় ভরা কেবিনটা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু রয়ে গেল শাহরুখ। দরজা আস্তে বন্ধ হতেই নীরবতা নেমে এলো—কেবল যন্ত্রপাতির টিকটিক শব্দ আর এয়ারকন্ডিশনের হালকা গুঞ্জন।
পিয়াস বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে রইল। চোখে অদ্ভুত রহস্যময় দৃষ্টি—যেন সে কারো অপেক্ষায় আছে। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। পিয়াস হালকা শ্বাস নিল, নিজের সঙ্গে নিজে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“না, আমি হার মানব না। সামু আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা। শেরাজ খান যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন, আমি তাকে হারাবো। অন্তত চেষ্টা করে মরবো।”
হঠাৎ পাশ থেকে শাহরুখ বলল,
“কিছু বললি?”
পিয়াস ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“না।”
“তাহলে কিছু ভাবছিস?”
“হুম!”
“কি?”
“তোর বোনের কথা।”
“এতোকিছু হবার পরেও তুই ওর কথাই ভাবছিস?”
পিয়াস ঠোঁটের কোণে ব্যথাতুর হাসি ফুটিয়ে গেয়ে উঠল,
“এই প্রেম যে অবুঝ পাখি,
যদি বুকের খাচায় রাখি,
ওই দূরের আকাশ তাকে ডাকে রে…
ডাকে রে….
জানি সময় জোয়ার ভাটা,
থাকে গোলাপ ফুলেও কাটা,
তবু মন যে তারই ছবি আঁকে রে…
আঁকে রে….”
গান থামিয়ে সে মৃদু গলায় বলল,
“ওর কথা কী করে ভুলে যাব আমি? ছোটবেলা থেকে ওর প্রতিটা হাসি, প্রতিটা কান্না—সবটাই আমার রক্তে মিশে আছে। যে মানুষটার জন্য আমার জান কুরবান, তাকে কী করে ছেড়ে দিই?”
শাহরুখ এক মুহূর্ত চুপ রইল। তারপর চোখে একধরনের ক্ষোভ আর মৃদু দুঃখ জড়িয়ে বলল,
“পিয়াস, ভালোবাসা মানেই অধিকার নয়। ভালোবাসা মানে সম্মান, মুক্তি, এবং যদি সেটা না পাওয়া যায়—তাহলে হার মেনে নেওয়া। তুই এখন উল্টাপাল্টা করলে, সামুর জীবন সমস্যা হবে। আমি জানি, তুই সামুকে ভালোবাসিস, তবে সামু তো রাহিনকে ভালোবাসে। তুই রাহিনের ক্ষতি করলে, সামু কষ্ট পাবে। তুই কি সেটাই চাস?”
পিয়াসের ঠোঁটের কোণে আবারও মৃদু হাসি ফুটল—কিন্তু সেই হাসিতে ছিল অস্থিরতা,
“আমি ওকে কষ্ট দিতে চাই না। আমি চাই ও আমার সাথে থাকুক। আমি চাই ওকে প্রতিটা দিন আমার চোখের সামনে দেখতে। আমি ওকে ছাড়তে পারব না, শাহরুখ।”
শাহরুখের চোখে এক ধরণের কঠোরতা জমে উঠল যা আগে দেখা যায়নি। সে ধীরভাবে বলল,
“তুই যদি সত্যিই ওকে ভালোবাসিস, তবে তোর প্রথম পদক্ষেপটা হবে—তোর অহংকার ত্যাগ করে ওর সুখের ওকে জন্য ছেড়ে দেওয়া। ও যদি রাহিনকে বেছে নেয়, তুই ওর জন্য রাগ, জেদ, অথবা কোনো নোংরা পরিকল্পনা রাখবি না। ওর প্রতি তোর ভালোবাসা যদি নিঃস্বার্থ হয়, তাহলে তুই ওর মুক্তি চাইবি—দখল না”
পিয়াস চুপ করে শুনলো শাহরুখের কথা। সে একটু সময় নিয়ে ধীরে বলল,
“একা থাকতে চাই।”
শাহরুখ আর কিছু বলল না। সে চুপচাপ উঠে বাহিরে চলে গেল।
ঘড়িতে সময় রাত সাড়ে নয়টা। সামিয়া মন খারাপ করে বসে আছে। ড্রয়িংরুমে কোণে ছোট্ট সোফায় বসে সে বারবার হাত মুঠো করছে, আবার খুলছে। চোখ ভিজে উঠছে, বুকের ভেতরটা যেন পাথরচাপা কষ্টে ভার হয়ে আছে। পিয়াসের এই অবস্থার জন্য সে এখনো নিজেকেই দায়ী করছে। সে
মনে মনে বলল,
“যদি আমি একটু আগে বুঝতে পারতাম, যদি আমি ওনাকে থামাতে পারতাম। তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। আমি সবার থেকে দূরে হয়ে গেলাম আজ। আমার বাবাও আমাকে দোষ দিচ্ছে।”
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে হাসপাতালের সেই দৃশ্য—পিয়াসের রক্তাক্ত শরীর, ফ্যাকাশে মুখ, আর অচেতন দৃষ্টি। সামিয়া নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল, যেন কান্নাটা জোর করে আটকাচ্ছে।
ঠিক তখনই রাহিন এসে চুপচাপ তার পাশে বসল। কিছু না বলে কেবল সামুর হাতটা নিজের হাতে নিল।
“সামু, নিজেকে দোষ দিস না। এটাতে তোর কোনো দোষ নেই।”
সামিয়া মাথা নাড়ল। চোখ মুছে বলল,
“না রাহিন ভাই, সব আমার দোষ। আমি যদি ওনাকে শুরু থেকেই আরও কঠিনভাবে এড়িয়ে যেতাম, তাহলে হয়তো আজকে উনি এমনটা করত না।”
রাহিন নরম গলায় বলল,
“মানুষের সিদ্ধান্ত মানুষ নিজে নেয়। তুই তো ওকে আশা দিসনি, ও নিজে নিজের মতো ভেবেছে। আর তুই যদি বারবার নিজেকে দোষী ভাবিস, তাহলে শুধু তোর কষ্ট বাড়বে। পিয়াসের জন্যও তুই শক্ত থাক—যেন ও বুঝতে পারে, তুই তার জন্য অনুতপ্ত নোস।”
সামিয়া চুপ করে রইল, তবে চোখের জল এবার গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। রাহিন তার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তারা দুজনে নীরব হয়ে বসে রইল। বসার ঘরে ভারী এক নীরবতা নেমে এলো। ঠিক তখনই সিঁড়ির কাছে শব্দ হলো। দু’জন একসাথে তাকাতেই দেখল—আইয়ুব আর নাজমিন নেমে আসছে।
নাজমিন দ্রুত এগিয়ে এসে সামিয়ার পাশে বসল।
“সামু, তুই আবারও কাঁদছিস? আবার নিজেকে দোষ দিচ্ছিস, তাই তো?”
সে স্নেহভরে সামিয়ার গাল মুছিয়ে দিল।
আইয়ুব হালকা মুচকি হেসে বলল,
“এই যে, সবাই তোমাকে বলছে—এটা তোমার দোষ না। তুমি কেন বারবার নিজের কাঁধে সব দোষ তুলে নিচ্ছো? সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ তো আর আমাদের হাতে থাকে না।”
রাহিন একটু স্বস্তির হাসি দিয়ে বলল,
“ভালোই হলো তোরা এলি। সামুকে আমি একা সামলাতে পারছিলাম না।”
নাজমিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, তাই নাকি? তবে আমরা থাকতে সামু কাঁদবে না। তাই না সামু?”
সামিয়া কিছু না বলে শুধু ম্লান হাসি দিল। তার চোখের কোণে লুকোনো জল আবার ঝলমল করে উঠল।
এরই মধ্যে বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠল। তারা একে অপরের দিকে তাকাল। সামিয়া হালকা কাঁপছিল, নাজমিন তার হাত ধরে রাখল।
আইয়ুব দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে দরজা খোলার পর চোখ বড় করে তাকাল। বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে রায়য়ান, আরিয়ান, রোজা আর আলিশা।
আইয়ুব ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোরা? এখানে কি চাস?”
রায়য়ান এক হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
“আগে ভেতরে চল। বাহিরে দাঁড়িয়েই সব কথা শেষ করব নাকি?”
আইয়ুব একটু সন্দেহভাজন চোখে ওদের দিকে তাকাল। তারপর দরজা থেকে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে, ঢোক। কিন্তু ভিতরে তোদের জন্য কোনো ঝামেলা চাইনা।”
রায়য়ানরা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। রাহিন দূর থেকে লক্ষ্য করছিল। সে রায়য়ানদের দেখে শেরাজকে মেসেজ করল।
এক মিনিটের মধ্যে সকলে নিচে নামল। শেরাজ-সুমু, ইনায়া-সারবাজ, ইশিতা-আরবাজ, স্যান্ডি, নাতাশা, নিহাল, অমিত, রিসান, রিয়াদ, শাহরুখ, সাইফ, ফাহিম—যেন পুরো একটা গ্যাঙ্গ মিলে ড্রয়িংরুমে হাজির হলো।
ড্রয়িংরুমটা মুহূর্তেই টানটান উত্তেজনায় ভরে উঠল। একদিকে রায়য়ান, আরিয়ান আর রোজা—তাদের চোখেমুখে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসের ছাপ। অন্যদিকে শেরাজ-সুমু আর পুরো গ্যাং, একসাথে দাঁড়িয়ে যেন একদম ফ্রন্টলাইনে প্রস্তুত। হঠাৎ আলিশা দৌড়ে সুমুর কাছে এলো। সে সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“বিডিতে এসে তোমার থেকে আলাদা কীভাবে থাকি সুমু? তাই চলে এলাম তোমার কাছে।”
সুমু ভদ্রতাসূচক হাসল। শেরাজ ধীরে ধীরে রায়য়ানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে সেই পরিচিত ঠান্ডা আগুন আর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। সে চাপাস্বরে বলল,
“তোরা এখানেও এসেছিস, মানে সাহসটা এখনও শেষ হয়ে যায়নি বুঝি?”
রায়য়ান মৃদু হাসল।
“সাহস আছে বলেই এসেছি, এস.কে। কিছু কথা আছে, যেটা মুখোমুখি না বললে জমে থেকে বিষ হয়ে ঝরবে।”
ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সবাই দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি। শেরাজ একটু সরে গিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“তোরা হঠাৎ এখানে কীসের জন্য হাজির হোলি?”
আরিয়ান মৃদু হেসে সোফায় বসে পড়ল। রায়য়ান চাপাস্বরে বলল,
“কারণটা খুবই সোজা, এস.কে। এখানে একটা মানুষ আছে, যাকে আমি দূর থেকে বহুদিন ধরে চাইছি। হয়তো কেউ জানে না, কিন্তু আমি জানি, আমার জীবনটা ওই একজনকে ঘিরেই।”
তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল সুমুর ওপর। শেরাজের চোখে ক্ষীণ লাল রেখা ফুটে উঠল।
এরপর আরিয়ান উঠে এসে বলল,
“আমি লুকিয়ে কিছু বলি না। সবার সামনে বলে দিচ্ছি—সুমুকে আমি ভালোবাসি।”
ঘর নিস্তব্ধ। হঠাৎ রোজা হেসে বলল,
“ভালোবাসা শুধু তোমাদের একার নেই, ব্রো। আমিও তো ভালোবাসি। তবে আমার ভালোবাসা অন্য কারও জন্য।”
সে ধীরে ধীরে শেরাজের দিকে তাকাল।
“এস.কে! আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সুমুর মাথায় যেন সাথে সাথেই রক্ত উঠে গেল। সে এগোতে গেলেই ইশিতা এসে তাকে আটকে দিল।
শেরাজ মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইল। তার ঠোঁটের বাঁকা হাসি আরও গভীর হলো। সে চাপাস্বরে আরিয়ান আর রায়য়ানকে বলল,
“মজার ব্যাপার! আমার সুইটহার্টকে ভালোবাসার লাইনে দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। আর আমাকেও বাদ দিচ্ছে না কেউ। ভালোই আমাদের দুজনকে নিয়ে শুরু করেছিস। আমি মাথা কতক্ষণ ঠান্ডা রাখতে পারব জানিনা। তবে এদিকে তাকিয়ে দেখ, আমার শেরনী অলরেডি আগুনের মতো জ্বলছে।”
আরিয়ান হেসে বলল,
“তোর সব রিলেটিভরা এখানে আছে—তাহলে আমরা আলাদা থাকব কেন? আমরা তো এখানেই থাকব। তাই চলে এলাম।”
শেরাজ অল্প হাঁটল, তার চোখে আগুন আরও জ্বলে উঠল। সে ধীরে ধীরে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চলার পথে তো আর কেউ বাঁধা দেয়নি, আরিয়ান। তাই যেখানে খুশি চলে যেতে পারিস। কিন্তু আমার বউয়ের নামে করা বাড়িতে কারা থাকবে—সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত তো আমার বউই একমাত্র নেবে।”
রোজা এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। সুমু রোজাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল। রোজা সুমুর সামনে দাঁড়িয়ে আলতো হেসে বলল,
“মানছি তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো না। আজ পযর্ন্ত আমাদের যতবার দেখা হয়েছে, শুধু ঝামেলায় হয়েছে আমাদের মধ্যে। কিন্তু সুমু! এইটা তো তোমার কান্ট্রি বলো। আমরা তোমার শত্রু হলেও, আপাতত তোমার দেশে, আমরা তোমার গেস্ট। তোমার কি উচিত না আমাদের খেয়াল রাখা?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“অবশ্যই না। কারণ এখানে আপনাদের আমি ডেকে আনিনি।”
রোজা পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“ব্রো! চলো। এখানে দাঁড়িয়ে আর অপমানিত হবার দরকার নেই।”
সে সুমুর পাশে দাঁড়ানো আলিশাকে বলল,
“তুমিও চলো। তোমাকেও তো এখানে সুমু আসতে বলেনি। তুমি তো আমাদের সাথে এসেছ। চলো আমাদের সাথে।”
সে আবারও সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার মতো অকৃতজ্ঞ মেয়ে খুব কম দেখেছি। যারা তোমার বিপদের দিনে পাশে ছিল, আজ তুমি তাদেরকেও….”
সুমু একহাত তুলে রোজাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“কৃতজ্ঞতা ওদের রাখলে প্রকাশ পাবে। কিন্তু তোমাদের দুই ভাইবোনেকে নয়।”
সে আলিশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমার বন্ধু আলিশা। এখানে কেউ না জানুন, অন্ততপক্ষে তুমি জানো, আমি তোমাকে আর আন্টিকে কতটা ভালোবাসি।”
আলিশা সুমুর দুহাত ধরে বলল,
“আমি জানি সুমু। তুমি কিছু মনে করো না। তুমি না চাইলে আমরা এখানে…”
“তোমরা এখানেই থাকবে আলিশা। অন্ততপক্ষে, তুমি তো আমার কাছেই থাকবে। আর আমি কাউকে বলিনি এখান থেকে চলে যেতে। মিসেস শেরাজ খানের বাড়িতে কেউ থাকার জন্য এসেছে আর আমি তাদেরকে তাড়িয়ে দিব, এমন শিক্ষা আমার শশুর-শাশুড়ি আমাকে দেয়নি।”
আরিয়ান লাগেজ ধরে বলল,
“তাহলে তো হয়েই গেল। আমরা এখানেই থাকছি।”
সে সুমুর সামনে এসে বলল,
“তা আমার রুমটা কোনদিকে বেবিগার্ল?”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“শুনেছি, বড় ভাইয়ের বউ নাকি মায়ের সমতুল্য হয়। আমার স্বামীর মুখে শুনেছিলাম, আপনার আর তার একই দিনে জন্ম হলেও, আমার স্বামী আপনার থেকে বড়। সেই হিসাব অনুযায়ী, আমি আপনার ভাবিজি। একদম মায়ের সমতুল্য।”
আরিয়ান বাঁকা হেসে চাপাস্বরে বলল,
“ছ্যাহ, বেবিগার্ল। আমার তোমার মতো সুন্দরী দেখতে একটা মম আছে তো। শুধু তোমার মতো সুন্দরী দেখতে একটা বউ নেই।”
শেরাজ এক ঝটকায় এগিয়ে এসে আরিয়ানকে টেনে সরিয়ে বলল,
“আরিয়ান, সীমা পার করিস না। থাকতে এসেছিস, চুপচাপ থাক। বেশি বাজে বকবিনা।”
আরিয়ান সামান্য হেসে হাত গুটিয়ে নিল,
“ওরে বাবা, রাগ করলে তোর চোখের আগুনে কেউই টিকতে পারে না। আরে, আমি তো শুধু মজা করছিলাম।”
সারবাজ এগিয়ে এসে শেরাজের কাঁধে হাত রাখল,
“এস.কে, শান্ত হও। অতিথি হয়ে এসেছে—বাদ দে।”
সুমু শান্ত ভঙ্গিতে সবার দিকে তাকাল, তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“থাকা না-থাকা ওদের ব্যাপার। তবে অসভ্যতা করার চেষ্টা করলে, এই দুই ভাইবোন এই বিডির মাটিতে আমার হাতে মারা পড়বে।”
রোজা ঠোঁট কামড়ে হেসে সামান্য এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে হিংস্রতা,
“সুমু! তুমি খুব সাহসীদের মতো কথা বলো। কিন্তু ভুলে যেও না—এই খেলাটা তোমার হাতে শেষ হবে না।”
রায়য়ান পাশে দাঁড়িয়ে সবটা নিরব চোখে দেখছিল। সে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“আজকের জন্য যথেষ্ট হয়েছে। আরিয়ান! বাজে কথা বন্ধ কর।”
আরিয়ান দু’হাত তুলে বলল,
“ঠিক আছে! আমি আর দুষ্টুমি করব না।”
সে সুমুর দিকে একটু ঝুঁকে বলল,
“আমাদের রুমগুলো?”
শেরাজ স্যান্ডির উদ্দেশ্যে বলল,
“সান! ওদের রুমগুলো দেখিয়ে দাও।”
স্যান্ডি এগিয়ে এসে বলল,
“ওকে স্যার।”
স্যান্ডি আরিয়ানদের নিয়ে চলে গেল। ড্রয়িংরুমে সকলে তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সুমু শেরাজের হাত শক্ত করে ধরল। শেরাজ স্বভাবসুলভ ঠান্ডা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে দিল।
ড্রয়িংরুমে বিশাল নীরবতা এলো। সারবাজ আর ইনায়া এক কোণে দাঁড়িয়ে একে অপরকে কনফিড করে খুবই কম শব্দে বলল,
“এবার চোখ খোলা রাখতে হবে। ওরা সহজেই পিছু হটবে না।”
রাহিন টেবিলে হাত ঠুকল। তার কণ্ঠে চিন্তার ছাপ,
“এটা মোটেও ভালো হলো না। এস.কে, ওদের এখানে রাখাটা কি ঠিক হবে?”
নিহাল হালকা হেসে বলল,
“ঠিকই আছে, ভাই। ওরা আমাদের সাথে থাকলে, ওদের উদ্দেশ্য আমরা সহজেই বুঝতে পারব, আর সাবধানে থাকতে পারব। ছোট ঝামেলা করার লোকজন নয় ওরা। ওরা করলে, ব্লাস্ট করবে। আর আমার সিক্সসেন্স বলছে, ওরা বড় কিছু করার জন্যই এসেছে।”
শাহরুখ সোফায় হেলান দিয়ে হাই তুলে বলল
“এই দুই ভাইবোন মৃত্যুর পরেও শুধরাবে না।”
সুমু ধীরে ধীরে চারপাশের সবার দিকে তাকাল। তার মুখ শান্ত, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ওরা যতই চেষ্টা করুক, আমাদের আলাদা করতে পারবে না। কিন্তু আমার চিন্তা আলিশার জন্য। ও তো….”
হঠাৎ নাজমিনের ফোনটা বেজে উঠল। থেমে গেল সুমু। নাজমিন সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“ফারিয়া আপু কল করেছে। হয়তো পিয়াস ভাইয়ার কোন খবর। তোমরা থাকো। আমি কথা বলে আসছি।”
নাজমিন চলে গেল কথা বলতে। ড্রয়িংরুমে সকলে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত হলো।
পাঁচ মিনিট পর নাজমিন এসে বলল,
“একটা অন্য খবর আছে।”
সকলে তার দিকে তাকাল। নাজমিন একটু সময় নিয়ে বলল,
“আজ সকালে সকলে মিলে পিয়াস ভাইয়াকে দেখতে গিয়েছিল। বিকালে তিশা আর ইফতিয়া নাকি খুশি আন্টিকে বলেছে, তারা হসপিটাল থেকে আসার সময় কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্ট দেখেছে এবং সেখানে খেতে যাবে। খুশি আন্টি নাকি বারণ করেনি। দুইবোন সন্ধ্যার দিকে বের হয়েছিল। এখন রাত এগারোটা বাজে, তিশা নাকি আরও দুঘন্টা আগে বাড়িতে ফিরে এসেছে। কিন্তু ইফতিয়া আসেনি। ও বাড়ির পরিস্থিতি এমনিতেও ভালোনা। এরমধ্যে খুশি আন্টি মেয়ের জন্য পাগলের মতো কাঁদছে।”
সামিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ওই মহিলা এখনো আমাদের বাড়িতে পড়ে আছে কেন? ড্রামা তো সেদিনই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আনোয়ার মামাদের সাথে উনি কেন চলে যায়নি?”
সুমু সামিয়াকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে নাজমিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“তিশা কি জানেনা, ইফতিয়া কোথায় গিয়েছে?”
“না! তিশাকে রেস্টুরেন্টে বসিয়ে রেখে ও বেরিয়েছিল। তারপর আর ফিরে আসেনি। তিশা অনেক খোঁজাখুঁজির পর ওকে না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরে এসেছে।”
ড্রয়িংরুমে এক ঝটকায় টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। নাজমিন আবারও বলল,
“আর একটা কথা! তিশা জানিয়েছে, আমাদের বিয়ের দিন থেকে ইফতিয়া কোনো একটা ছেলের সাথে ফোনে অনেক কথা বলত। কিন্তু ছেলেটা কে, সেটা ও জানেনা।”
রাহিন চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল,
“মানে ইফতিয়া এখন নিখোঁজ? এটা তো সিরিয়াস ব্যাপার।”
শাহরুখ চোখ বড় করে বলল,
“এত ঝামেলার মধ্যে আবার নতুন ঝামেলা। কেউ আবার ওকে…”
সে কথাটা শেষ করার আগেই শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“কিডন্যাপ না। হয়তো নিজেই কোথাও চলে গেছে।”
সকলের নিঃশ্বাস যেন থেমে গেল।
সারবাজ ধীরে ধীরে বলল,
“এস.কে! তুই কি নিশ্চিত?”
শেরাজ চোয়াল শক্ত করে মাথা নেড়ে বলল,
“ওই মেয়ের যা পবিত্র ক্যারেক্টার, আমার ওরজন্য এর থেকে ভালো কিছু মাথায় আসছেনা।”
সুমুর বুক কেঁপে উঠল। সে তাড়াহুড়ো করে শেরাজের হাত চেপে ধরল,
“খান সাহেব, প্লিজ! এমনসময়ে এসব কথা বলবেন না।”
শেরাজ দাঁত চেপে বলল,
“ওর জন্য বেশি ভালোবাসা দেখিওনা তো।”
সুমু হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“হতে পারে, ওকে আমরা কেউ পছন্দ করিনা। আর ও পছন্দ করার মতো কোনো কাজ এখন পযর্ন্ত করেনি। কিন্তু তাই বলে, মেয়েটা নিখোঁজ হয়েছে শুনেও ওকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করব?”
“তো? ভালো কি করেছে, যে সেটা বলব?”
সুমু উচ্চস্বরে বলল,
“খান সাহেব!”
“হোয়াট?”
সুমু আর কোন কথা না বলে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। শেরাজ নাতাশাকে ইশারা করল। নাতাশা দৌড়ে গিয়ে সুমুকে ধরে বলল,
“ম্যাম! চলুন, আমি আপনাকে রুমে দিয়ে আসছি।”
সুমু নাতাশার সাথে চলে গেল। সাইফ এগিয়ে এসে বলল,
“সমস্যা কি তোর এস.কে? ভাবিজির সাথে ঝগড়া কেন করলি?”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“সুইটহার্ট আজ, বউ অন ফায়ার হয়ে আছে। দেখে ভালোই লাগছিল। আরিয়ানের সাথে যেভাবে কথা বলল, ওর রাগ দেখে আমার ওর সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছা করছিল। বউটা অনেকদিন ঝগড়া করেনা আমার সাথে, তাই ইচ্ছা করে একটু ঝগড়া করলাম।”
সাইফ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“পুরুষ মানুষ বউয়ের সাথে ঝগড়া থেকে দূরে থাকতে চায়। আর তোকে দেখে মনে হচ্ছে, ভাবিজির সাথে ঝগড়া করে তুই বেশ মজা পেয়েছিস।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি রেখে বলল,
“হুম, ঠিক ধরেছিস। ওর রাগ, ওর রাগের আগুন—সবকিছুই আমার জন্য একধরনের আনন্দের। আর তুই জানিস, আমার সুইটহার্ট যখন রেগে যায়, তখন ওর চোখের ভিতর এক অদ্ভুত শক্তি জ্বলে। সেটা দেখতে ভালোই লাগে।”
রিসান হেসে বলল,
“ঠিক আছে, কিন্তু বেশি করিস না। ভাবিজি বেশি রেগে গেলে, তার চোখের রাগের আগুন সামলাতে পারবি তো?”
শেরাজ হালকা কণ্ঠে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৭১ (২)
“সুইটহার্টের ভেতরের আগুন, আমি জানি কীভাবে ঠান্ডা করতে হয়। আর যদি কখনও সীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে আমি জানি কীভাবে ওকে আবার শান্ত করতে হয়। বউটা আমার—এটা মনে রাখতে হবে।
সকলে হেসে উঠল। কিন্তু এতো আনন্দের মাঝেও সকলের ভেতর একটা টেনশন রয়ে গেল।
