খান সাহেব পর্ব ৭৩
সুমাইয়া জাহান
সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে এখন একধরনের অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে। ইফতিয়া নিরাপদে ফিরে এসেছে, কিন্তু সবাই এখনো ভয় থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। বাতাসে এখনো সেই রাতের কোলাহল আর আতঙ্কের ছাপ আছে।
খুশি বেগম ভোরে মেয়েকে ফিরে পাবার পর থেকে বুক ভেঙে কাঁদছেন। তিনি ইফতিয়াকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। তিশা তার মায়ের পাশে বসে তার হাত ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তার চোখে অশ্রু হলেও মুখে হালকা স্বস্তির ছাপ।
সুমি বেগম এখনো ভিজে চোখে মুস্তাক সিকদারের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। মুস্তাক সিকদার এবং পিয়াস দাঁড়িয়ে ঘরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পিয়াসের চোখে এখনও রাগ আর উদ্বেগ মিশ্রিত। কিন্তু সে জানে, তার দায়িত্ব এখন শেষ হয়নি।
রুমা বেগমের চোখে স্বস্তির ছাপ ফুটেছে। তিনি ধীরে ধীরে ইফতিয়াকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। হাসি বেগমও শান্ত। তিনি এখন শুধু পরিবারকে শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
পিয়াস ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ইফতিয়ার দিকে তাকাল।
“তুমি ঠিক আছে, তাই না?”
ইফতিয়া মৃদু কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ ভাইয়া! আমি এখন ঠিক আছি। আর আপনাকে ধন্যবাদ। আজ আপনি না থাকলে…”
পিয়াস শুধু মাথা নেড়ে বলল,
“ওসব এখন থাক। এখন পযর্ন্ত কেউ কিছু খায়নি। আমার মনে হয়, খেয়ে সকলের এখন বিশ্রাম নেওয়া উচিত।”
পিয়াসের কথার পর ঘরে এক ধরণের শান্তি নেমে এল। সবাই ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল। খুশি বেগম আবারও ইফতিয়াকে জড়িয়ে ধরলেন।
তিশা ধীরে ধীরে বলল,
“আম্মু! আপু তো এখন ঠিক আছে। এখন আর ভয় পাবার কিছু নেই। তুমি চলো একটু ফ্রেশ হয়ে, কিছু খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবে”
রুমা বেগম কোমল কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ, ঠিক। আর ইফতিয়া, আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। ভয়ঙ্কর রাতটা শেষ। ওটাকে খারাপ স্বপ্ন ভেবে ভুলে যাও।”
হাসি বেগম ধীরে খুশি বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
“সব ঠিক হয়ে গেছে, খুশি। এখন একটু তোর বিশ্রাম নেওয়া উচিত।”
মুস্তাক সিকদার ভ্রু কুঁচকে পিয়াসকে বলল,
“তোমার দায়িত্ব শেষ। এখন তুমি বাড়িতে চলো।”
পিয়াস ধীরে ইফতিয়াকে দেখতে লাগল। তার চোখে রাগের ছাপ কমে এসেছে। সে ধীরে বলল,
“আমি এখন আসছি।”
হাসি বেগম এগিয়ে এসে মুস্তাক সিকদারের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ভাইজান! এভাবে ওকে নিয়ে চলে যাবেন না। সুমি আপা আর ফারিনও তো এখানেই আছে। দয়া করে, সবাই সকালের নাস্তাটা অন্তত করে যান।”
সাখাওয়াত সাহেবও এগিয়ে এসে বলল,
“হ্যাঁ মুস্তাক! আমি তো তোমার থেকে বয়সে বড়। তবুও আমি তোমাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি, এভাবে রাগ করে থেকোনা।”
সুমি বেগম সাখাওয়াত সাহেবের কাছে এসে বললেন,
“এভাবে বলবেন না ভাইজান। আমরা নাস্তা করে, তারপর যাব।”
মুস্তাক সিকদার হালকা ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে রাগ সামলানোর চেষ্টা করল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে নাস্তার টেবিলের দিকে এগোলেন।
পিয়াসও সুমি বেগমের চোখের দিকে একবার তাকিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে চলে গেল। সুমি বেগম হালকা হেসে বললেন,
“চলুন, সকালের নাস্তা করি। সকালটা অন্তত শান্তিতে কাটাই।”
সকলে ডাইনিংটেবিলের কাছে চলে গেল। রুমা বেগম আর হাসি বেগম সকলকে খাবার সার্ভ করে দিল। ফারিয়া ইফতিয়াকে ফ্রেশ করে এনে, টেবিলে বসিয়ে দিল। খুশি বেগমও ফ্রেশ হয়ে এসে, নাস্তা করতে বসল। টেবিলে বসে সবাই নাস্তা শুরু করল।
পিয়াস ধীরে ধীরে ইফতিয়ার পাশে বসল। ইফতিয়া আড়ে আড়ে তার দিকে তাকাল। মুস্তাক সিকদারও টেবিলে বসে চোখে কিছুটা প্রশান্তির ছাপ নিয়ে খাবার খেতে শুরু করলেন। খুশি বেগমের চোখে এবার স্বস্তি ফুটে উঠল। রুমা বেগম আর হাসি বেগম একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি বিনিময় করলেন। শাহরুখ আর ফারিয়াও একসাথে বসে খাওয়াতে মন দিল। সাখাওয়াত সাহেব আর শামীম সাহেব কাজ আছে বলে, তাড়াতাড়ি খেয়ে বেরিয়ে গেল। মুস্তাক সিকদারও কোনোমতে খেয়ে পিয়াসদের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে গেলেন। ড্রয়িংরুমে ধীরে ধীরে শান্তি ফিরে এলো।
হঠাৎ, খাওয়ার মাঝে শাহরুখের ফোনটা বেজে উঠল। সে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখল, স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে “শেরাজ ব্রো” লেখা নামটা। শাহরুখ সঙ্গে সঙ্গে উঠে সাইডে চলে গেল। সে কলটা রিসিভ করতেই শেরাজ ইফতিয়াদের আপডেট নিল। শাহরুখ হাসিমুখে সব উত্তর দিল। হঠাৎ শেরাজ ফোনের ওপাশ থেকে কিছু একটা বলব, আর তাতেই শাহরুখের মুখের হাসি হালকা নিভে গেল। সে তবুও জোরপূর্বক হেসে বলল,
“আমি চেষ্টা করব ব্রো।”
শেরাজ আরও কিছু বলল। শাহরুখ চুপচাপ মন দিয়ে শুনল। সে শেরাজের কথার সাথে সম্মতি জানিয়ে কল কেটে ডাইনিংরুমে ফিরে এলো। চেয়ার বসে সে রুমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু! আজ রাতে শেরাজ ব্রো আমাদের সবাইকে তার বাড়িতে ইনভাইট করেছে। বলল, কোনো একটা অনুষ্ঠান আছে। আমরা সবাই যেন সেখানে উপস্থিত থাকি। আর শুধু আমাদের নয়, পিয়াসদেরও যেতে বলেছে।”
ডাইনিংরুমে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো। সবাই নিজেদের ভাবনায় ডুবে। রুমা বেগম শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“বাড়ির কোনো কর্তাই যেতে চাইবেনা। আর মুস্তাক ভাইজান তো কোনোদিনও যাবেনা।”
পিয়াস ধীরে বলল,
“বাড়ির জামাই ইনভাইট করেছে। আমাদের মধ্যে যতই সমস্যা থাকুক, সবার যাওয়া উচিত। বড়দের আমি রাজি করানোর চেষ্টা করব, তবুও তারা যদি না যেতে চায়, আমরা ছোটরাই না হয় যাব।”
খুশি বেগম হালকা ভ্রু কুঁচকিয়ে ভাবলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“তাহলে ছোটরা যাক। ওখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা আছে, সবাই একসাথে হলে ভালো লাগবে। আর তাছাড়া ইফতিয়ার এখন একটু ভালো পরিবেশ দরকার।”
রুমা বেগম মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন,
“হ্যাঁ! ছোটরাই বরং যাক।”
ফারিয়া আর শাহরুখ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“ঠিক আছে, আমরা যাই।”
সুমি বেগম চুপচাপ বসে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ সে নিরবতা ভেঙ্গে পিয়াসের উদ্দেশ্যে বললেন,
“তুমি সত্যি যাবে?”
হ্যাঁ আম্মু! চাইলে তুমিও যেতে পার।
“না থাক। তোমরাই যাও। এতোকিছুর পরেও তোমার শিক্ষা হবেনা।”
সুমি বেগমের কথা শুনে হাসি বেগম মাথা নিচু করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। পিয়াস তার চলে যাওয়া খেয়াল করে বলল,
“আম্মু! যেটা হয়েছে, সেটা এখন আর বদলানো যাবেনা। সেসব নিয়ে পড়ে থাকলেও চলবেনা। আমি সব ভুলে গিয়েছি। তোমরাও ভুলে যাও।”
পিয়াসের কথায় ডাইনিংরুমে এক ধরণের প্রশান্তি নেমে এলো। সুমি বেগম চুপচাপ বসে মৃদু হাসি দিলেন, যেন তার মধ্যের কিছুটা বোঝা হালকা হয়ে গেছে। খুশি বেগমও ধীরে ধীরে পিয়াসের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
শাহরুখ ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“চল, আমরা সবাই রাতের জন্য প্রস্তুত থাকি। শেরাজ ব্রো নিশ্চয় কিছু আয়োজন করেছেন।”
ফারিয়া হালকা হেসে উত্তর দিল,
“ঠিক বলেছো। এখন অনুষ্ঠানে থাকা মানেই একটু আনন্দ আর স্বস্তি। এ কয়দিনে যা সব গেল। এখন একটু স্বস্তি দরকার।”
ইফতিয়া চুল ঠিক করে চারপাশে তাকাল। রুমা বেগম ও হাসি বেগম টেবিল পরিষ্কার করতে লাগলেন। হাসি বেগম রুমা বেগমের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন,
“এখন সকালের নাস্তা শেষ করি। সন্ধ্যায় যাওয়ার কথা নিয়ে ভাবা যাবে।”
রুমা বেগম মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। তারা দুজনও নাস্তা করতে বসে পড়লেন।
চারপাশে সন্ধ্যা নেমে এলো। বাড়ির চারপাশে লাইটের আলোয় আলোকিত। ছোট ছোট ফেয়ারি লাইটের মালা যেন তারকার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে। প্রবেশদ্বারের চারপাশে সাদা ও গোলাপি রঙের ফুলের আর্চ, যেখানে হালকা সোনালি রিবন লাগানো। প্রবেশদার দাঁড়িয়ে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছে অমিতরা।
ড্রয়িংরুমে বড় বড় ক্রিস্টালের লালিত ল্যাম্প ঝুলানো, যেগুলো থেকে নরম আলো পড়ে ফ্লোর চকমক করছে। সাদা সিল্কের সোফাগুলো সাজানো, পাশের টেবিলে সোনালি ক্যান্ডেল আর ফুল দিয়ে সাজানো।
ডাইনিংরুমের টেবিল সাজানো একেবারে রাজকীয়ভাবে। সিলভার প্লেটের ওপর গোলাপি ও সাদা ফুল। মোমবাতি স্ট্যান্ডে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। চেয়ারের কুশনগুলো হালকা পেস্টেল রঙের, আর টেবিলের মাঝখানে মোমবাতি আলো ছড়াচ্ছে। ড্রয়িংরমের প্রতিটি কোণাতে রাখা ছোট ছোট ফুলদানি আর মোমবাতি। অতিথিরা ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে।
সুমু এখনো পুরোপুরি জানে না আজ কী ধরনের অনুষ্ঠান হবে। সারাদিন ধরে শেরাজ তাকে নিচে যেতে দেয়নি। সকাল থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যা—সমস্ত সময় জুড়ে সুমুর মধ্যে কৌতূহল বিরাজমান।
সে ওয়াশরুমের ভেতর দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে ভাবল,
“আজ কি হতে চলেছে? খান সাহেব কেন আমাকে সারাদিন ধরে আটকে রেখেছেন?”
সুমু ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো। ঘরে ঢুকতেই তার নজরে পড়ল বেডের ওপর রাখা ব্ল্যাক শাড়ির ওপর। তার সাথে রাখা ম্যাচিং অর্নামেন্টস, যেগুলো ঝলমল করছে আলোতে। শাড়ির পাশে একটা ব্যাগে “আন্তোনিও ভিয়েত্রি মুন স্টার” সুজের ব্যাগ রাখা। শাড়ির ওপর ছোট্ট একটা চিরকুট চোখে পড়ল সুমুর। সুমু ধীরে ধীরে তা হাতে তুলে নিল। তারপর একটু সময় নিয়ে চিরকুটটি খুলে পড়তে শুরু করল,
“মাই ব্ল্যাক ফেইরী”
“আজ আমাদের জীবনে একটা স্মরণীয় দিন। নিশ্চয় তুমি আজ সারাদিন রুমের মধ্যে বসে ভেবেছ, আমি কেন তোমাকে রুমে আটকে রেখেছি? আর কিছুক্ষণ ধৈর্য্য রাখো ব্ল্যাক ফেহরী, একটু পরেই তুমি সবটা জানতে পারবে। এখন আসি মূল প্রসঙ্গে, তুমি জানো আমার পছন্দের রঙ ব্ল্যাক। আর একজন পুরুষ তার শখের নারীকে সবসময় তার পছন্দের রঙেই দেখতে চায়। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম নয়। এই নিয়ে তোমার ছোট মলের শাড়ির লিস্টে দুশো বিয়াল্লিশটা শুধুমাত্র ব্ল্যাক শাড়িই হলো। আর তাছাড়া অন্যান্য ব্ল্যাক ড্রেস তো আছেই। তুমি জানো, আমার ব্ল্যাক শার্টের লিস্টেও আজ দুশো বিয়াল্লিশটা শার্ট যোগ হলো। এছাড়া ব্ল্যাক টি-শার্ট আর ব্লেজার তো আছেই। আজ আমি বরাবরের মতো ব্ল্যাকেই নিজেকে রেডি করেছি। তো ম্যাডাম, আপনি কি আজ আরও একবার আমার সামনে ব্ল্যাক ফেইরী হয়ে আসবেন? আমি যে অধীর আগ্রহে আপনার অপেক্ষায়। আপনি যখন ধীরে ধীরে রুমের দরজা খুলে আমার সামনে আসবেন, তখন আমি আপনাকে দেখার মুহূর্তটা চুরি করতে চাই। আমি চাইনা সেই মুহুর্তটা আর কেউ দেখুক। আপনি এক ধাপ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয়ের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাবে। আর যখন আপনি আমার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়াবেন, তখন আমি শুধু আপনাকে একবার ছুঁয়ে দেখব। আপনি কি সাজবেন ম্যাডাম?”
সুমু চিরকুটটা পড়ে মৃদু হাসল। সে চিরকটুটা রেখে শাড়িটা হাতে তুলে নিল। পুরো শাড়িটার ওপর ব্ল্যাক স্টোনের কাজ করা। সুমু আয়নার সামনে গিয়ে শাড়িটা কাঁধের ওপর ফেলে দেখল। তারপর সে রুমের দরজা বন্ধ করে রেডি হতে শুরু করল। সে শাড়িটা পরে কুঁচি ঠিক করল। শাড়ির আঁচলে গুছিয়ে নিয়ে সে একে একে অর্নামেন্টসগুলো পড়ল। তার কোমর ছাড়ানো লম্বা চুলগুলো খোলা রাখল। মুখে হালকা মেকআপ, চোখের স্মোকি শেডো আর ঠোঁটে নিউড লিপস্টিক পরে নিল। নিজেকে পরিপাটি করে সে ধীরে ধীরে আয়নায় দিকে তাকিয়ে শ্বাস নিল। তারপর মনে মনে শেরাজের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবল। তারপর কানের দুল আবারও ঠিক করল। শেষবার সে নিজের রিফ্লেকশনে তাকিয়ে মৃদু হেসে মনে মনে বলল,
“আজ রাতটা নিশ্চয়ই বিশেষ হবে।”
রুমের দরজায় নক পড়ল। সুমু ঘুরে তাকাল। সে শেষবারের মতো নিজেকে আয়নাতে দেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে ধীরে দরজা খুলে দিল। শেরাজ ফোন থেকে চোখ সরিয়ে সুমুর দিকে তাকাল। তার পরনে ব্ল্যাক ব্লেজার, নিচে কালো শার্ট। শার্টের দুটো বোতাম খোলা, যার ফলে তার ফর্সা বুকের কিছু অংশ দৃশ্যমান। সুমু মৃদু হাসল। শেরাজ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সে ফোনটা ধীরে নামিয়ে রাখল। তার চোখে যেন সুমুর ওপর আটকে আছে। ঠোঁটে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল। সুমু এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল,
“খান সাহেব, এমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন কেন?”
শেরাজ ধীরে এক পা এগিয়ে এল। তার গলায় স্বরটা গভীর হয়ে উঠল,
“সুইটহার্ট! তুমি আজ আমার হৃদস্পন্দনটাই থামিয়ে দিলে।”
সুমু হালকা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল, কিন্তু হাসিটা লুকাতে পারল না। শেরাজ ধীরে তার হাত ধরে বলল,
“চলো, আজকের রাতটা শুধু আমাদের জন্য।”
সুমুর হৃদয় কেঁপে উঠল। সে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় দিল। দুইজনের একসাথে নিচে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
দুজনে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। সুমুর মনে কৌতূহল। দুজনে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ দুজনের ওপর স্পটলাইট জ্বলে উঠল। সুমু স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের মাথার ওপর গোলাপের পাপড়ি পড়তে লাগল। তাদের পেছনে গোলাপ দিয়ে সাজানো একটি বড় আর্চ। আর্চের ওপর ইংরেজিতে লেখা, “হ্যাপি ফিফ্থ মেরেজ অ্যানিভার্সারি অ্যান্ড হ্যাপি ফিফ্থ স্ল্যাপ অ্যানিভার্সারি, সুমুরাজ।” চারদিকে নিস্তব্ধতা, কেবল স্পটলাইটের আলোয় দুজন আলাদা হয়ে আছে। শেরাজ হাঁটু মুড়ে বসল। হাতে একটি ডায়মন্ডের আংটি। তার চোখে ভরা ভালবাসা আর দুষ্টুমি মেশানো উজ্জ্বলতা। সুমুর বুকের ভেতর ধক করে উঠল। ঠোঁটে বিস্ময়ের হাসি। শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাপি ফিফ্থ মেরেজ অ্যানিভার্সারি অ্যান্ড হ্যাপি ফিফ্থ স্ল্যাপ অ্যানিভার্সারি, সুইটহার্ট।”
সুমু অবাক হয়ে বলল,
“হ্যাপি ফিফ্থ স্লাপ অ্যানিভার্সারি আবার কী?”
শেরাজের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলল। সে মিষ্টি স্বরে বলল,
“সুইটহার্ট, পাঁচ বছর আগে তোমাকে আমি প্রথমবার চড় মেরেছিলাম, আর সেদিনই তোমাকে আমি আমার নামে সারাজীবনে জন্য লিখে নিয়েছিলাম। আজ সেই দিনটা আমার কাছে অমূল্য। তাই ফিফ্থ অ্যানিভারসারির সাথে ফিফ্থ স্লাপ ডে-ও উদযাপন করব।”
সুমু হাসল। শেরাজ আবারও বলল,
“৫ বছর মানে ১৮২৫ দিন, ৪৩,৮০০ ঘণ্টা, অসংখ্য হাসি, অশ্রু, ঝগড়া আর ভালোবাসা। প্রতিটা মুহূর্তে তোমায় পেয়ে আমি ধন্য। হ্যাপি ফাইভ ইয়ার্স অব আস। পাঁচ বছরে তুমি যতবার আমার ওপর রাগ করেছো, আমি ততবার তোমায় আরো বেশি ভালোবেসেছি। পাঁচবছর ধরে, তুমি সহ্য করছো আমাকে। ব্রাভো, সুইটহার্ট। এর জন্য তোমার একটা মেডেল পাওয়ার কথা।”
শেরাজ সুমুর দিকে আংটি এগিয়ে দিল। সুমু মৃদু হেসে হাত এগিয়ে আংটি পড়ে নিল। শেরাজ সুমুর হাতের ওপর ধীরে ঠোঁট ছুঁয়ে উঠে দাঁড়াল। সে সুমুর একদম কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
“কোনো এক ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ ঠিক এমন একটা রাতে আমি তোমাকে আমার করে নিয়েছিলাম। এখন পযর্ন্ত আমাদের কোনো অ্যানিভার্সারি পালন করা হয়নি। প্রথম অ্যানিভার্সারির একমাস আগে তুমি আমার থেকে দূরে চলে গেলে। এরপর তিনবছর তুমি আমার থেকে আলাদা ছিলে। আমাদের জীবনের চারটা অ্যানিভার্সারি আমরা পালন করতে পারিনি। কিন্তু এই পঞ্চম অ্যানিভার্সারি আমি কীভাবে অবহেলায় ফেলে রাখি বলোতো? আজ এইসব কিছু আমাদের জন্য।”
সুমুর চোখে পানি এলো। শেরাজ হাতে দিয়ে তার চোখ মুছে দিয়ে বলল,
“অ্যানিভার্সারিতো পালন করা হবে। তবে আমার তো স্লাপ অ্যানিভার্সারি পালন করতে ইচ্ছা করছে।”
সুমু মৃদু হেসে চোখ বন্ধ করে তার গাল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নিন! পালন করুন। তবে একটু আস্তে।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। সে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সুমুর গালে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে কানে ফিসফিস করে বলল,
“নেক্সট ওয়েডিং নাইট অ্যানিভার্সারি মানে বাসর রাত বার্ষিকী পালন করব।”
সুমু চোখ মেলে তাকাল। হঠাৎ চারপাশ থেকে হাততালির শব্দ আর লাইট জ্বলে উঠল। দুইজন আশ্চর্য চোখে চারপাশ দেখল। পুরো ড্রয়িংরুম রঙিন আলোতে ভরে উঠল। সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সুমুর বাড়ি থেকে বড়রা ছাড়া বাকি সকলেও উপস্থিত আছে। সকলে একসাথে বলে উঠল,
“হ্যাপি ফিফ্থ অ্যানিভার্সারি, অ্যান্ড হ্যাপি ফিফ্থ স্ল্যাপ অ্যানিভার্সারি, সুমুরাজ।”
সুমু যেন লজ্জায় পড়ে গেল। সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ আমি ভেবেছিলাম এখানে আর কেউ নেই। কিন্তু এখানে তো সবাই আছে। আর আপনিও সবার সামনে আমার গালে…”
সুমু থেমে গেল। একে একে সকলে তাদের উইশ করল। হঠাৎ সঙ্গীতের সূর বেড়ে গেল। পিছন থেকে সুমুর প্রিয় গান বাজতে শুরু করল। সবাই ধীরে ধীরে হাততালি দিয়ে উদযাপন শুরু করল। রুমের একটি পাশে রাখা কেকের উপর হালকা আলো পড়ল। কেকের ওপর ইংরেজিতে বড় করে লেখা,
“হ্যাপি ফিফ্থ অ্যানিভার্সারি, অ্যান্ড হ্যাপি ফিফ্থ স্ল্যাপ অ্যানিভার্সারি, সুমুরাজ।”
শেরাজ ধীরে সুমুর হাতে হাত রাখল। তারপর সে সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চলো! শুরু করি।”
সুমু হালকা হাসল। সে শেরাজের হাত আরও শক্ত করে ধরল। দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে, এই বিশেষ মুহূর্তকে হৃদয়ে সঞ্চয় করল।
তারপর দুজনে ধীরে কেকের কাছে এগিয়ে গেল। দুজনে ধীরে কেক কাটল। সুমুর হাতে থাকা ছুরি শেরাজের হাতে ছুঁয়ে গেল। চারপাশে থাকা সবাই হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল। সকলে একে একে তাদের উপহার দিল। সুমু আর শেরাজ হাসিমুখে সকলের উপহার গ্রহণ করল। হঠাৎ শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“তোমার সাথে এভাবেই সারাটা জীবন কাটাতে চাই। থাকবে তো আমার সাথে?”
সুমু লাজুকভাবে মাথা দোলাল। শেরাজ কেকের ছোট একটি টুকরা তুলে সুমুর মুখের সামনে ধরল। সুমু লাজুক হাসি দিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে একটুখানি কেক মুখে নিল। তারপর সে নিজেও শেরাজকে কেক খাইয়ে দিল।
আইয়ুব ধীরভাবে এগিয়ে এসে বলল,
“সব কেক কি একাই শেষ করবি নাকি? আমাদের জন্য কিছুই রাখবি না?”
শাহরুখ হেসে বলল,
“হ্যাঁ, একটু আমাদের সাথে শেয়ার করো ব্রো।”
শেরাজ কেকের একটা পিচ হাতে নিয়ে শাহরুখদের কাছে এগিয়ে গেল। সে শাহরুখের সামনে গিয়ে কেকের পিচ ধরল। শাহরুখ হা করতেই সে নিজের মুখে কেকের অংশটা ঢুকিয়ে দিল। ড্রয়িংরুমের সকলে হেসে উঠল। শাহরুখ হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“এমনটা তুমি রিয়াজের সাথে করলে, ও তোমাকে ছেড়ে দিতনা। আমি ভালো ছেলে বলেই, তোমাকে কিছু বললাম না ব্রো।”
আইয়ুব পাশ থেকে বলল,
“তুই ভালো হলেও, আমরা তো ভালো নই। এই অমিত! চল, কেকের ওপর এখন পুরোপুরি আমাদের অধিকার।”
সকলে মিলে কেকের দিকে এগিয়ে গেল। শেরাজ আর কিছু বলল না। সে একজন ওয়েটারকে ডেকে বলল,
“ফ্রিজে একটা কেক আছে, ওইটা সবাইকে দিন।”
ওয়েটারটি সম্মতি জানিয়ে চলে গেল। শেরাজও এগিয়ে গেল পিয়াসদের কাছে। এদিকে, সুমু ফারিয়াদের পেয়ে অনেক খুশি। কিন্তু এমন একটা দিনে তার মা-বাবা আর বড়রা কেউ আসেনি বলে, সুমুর একটু মন খারাপ হলো। হঠাৎ সুমুর মনে হলো, সে অনন্যা খাতুনকে ভিডিও কল করবে। সেই ভাবা সেই কাজ। সুমু সাইডে গিয়ে অনন্যা খাতুনের ফোনে ভিডিও কল করল। ফোনে ভিডিও কল রিং হতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অনন্যা খাতুনের মুখ স্ক্রিনে ভেসে উঠল। তার মুখে আলতো হাসি, চোখে কোমলতা। সুমু সালাম দিল। তিনি মৃদু হেসে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ্! আমার মামনির দিকে কারও নজর না লাগুক।”
সুমু হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“আজ তো আমাদের পাঁচ বছরের অ্যানিভার্সারি, আম্মু। এসব আপনার ছেলের প্ল্যান।”
অনন্যা খাতুনের চোখে সন্তুষ্টির ছাপ ফুটে উঠল। তিনি হালকা হেসে বললেন,
“জানি তো। আজ সকালে কথা হয়েছে আমার তার সাথে।”
“আম্মু! আব্বু, ফিরোজা, রিয়াজ, ছোটমা-ছোটবাবা কোথায়?”
“তোমার আব্বু আর ছোটবাবা শপে গিয়েছে। শেরাজরা কেউ নেই বলে, ফিরোজাও বাড়িতে গিয়েছে। আর রিয়াজ ঘুমাচ্ছে। কিন্তু আজ তোমাদের জন্য আনন্দের দিন। তবে তোমার মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, মন খারাপ। কি হয়েছে মামনি? আরিয়ান কিছু করেছে? ওকে আমি বারণ করেছিলাম, ওখানে যেতে। কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি।”
সুমু লজ্জার সাথে হাসল। তার চোখে সামান্য পানি জমল,
“আজ সবাই আসে নি। আম্মু-আব্বুও আসেনি। তাই একটু মন খারাপ হয়ে গেছে।”
অনন্যা খাতুন হাসি দিয়ে বললেন,
“বাবা-মা আসেননি মানে আনন্দ কমবে না। আমাদের দোয়া তো সবসময় তোমাদের সঙ্গে। এখন খুশি হও, আর এই স্মরণীয় রাতটি উপভোগ কর।”
সুমুর মনটা হঠাৎ হালকা হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে হাসল,
“ধন্যবাদ আম্মু। আপনার কথা শুনে সব মন খারাপ চলে গেল।”
দুইজন আর কিছুক্ষণ কথা বলল। দুজনে হাসি-মুখে ভিডিও কল শেষ করে। সুমু নতুন উদ্যমে পার্টির জন্য নিজের জায়গায় ফিরে এল।
ইফতিয়া, সামিয়া, নাজমিন, ইশিতা, ইনায়া, নাতাশা, ফারিয়া, আলিশা আর ফারিন একসাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ফারিন সবার সাথে কথা বললেও, সামিয়াকে এড়িয়ে চলেছে। তাই সামিয়াও আর চেষ্টা করেনি ওর সাথে কথা বলার। সুমু এসে ইফতিয়া উদ্দেশ্যে বলল,
“কি অবস্থা?”
ইফতিয়া আলতো হেসে বলল,
“ভালো!
সুমু চলে যেতে চাইলে, ইফতিয়া সুমুর হাত ধরে বলল,
“আমাকে পারলে মাফ করে দিস সুমু। আমি তোর সাথে অনেক অন্যায় করেছি।”
সুমু মৃদু হেসে ইফতিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আজ একটা সুন্দর দিন, এসব কথা থাক। আমি তোর করা কোনোকিছুই মনে রাখিনি। তাই কষ্ট পাসনা। সুমু অনেক আগেই তোকে মাফ করে দিয়ছে।”
ইফতিয়ার চোখে ধীরে ধীরে স্বস্তির ছাপ ফুটতে লাগল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে এক ঝলক হাসল।
এদিকে, আরিয়ান আর রায়য়ান একসাথে বসে আছে। আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এসব আমার সহ্য হচ্ছেনা। তুই থাক এখানে। আমি যাচ্ছি।”
আরিয়ান উঠে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই রায়য়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“শুনেছি, নিষিদ্ধ ফলটাই নাকি সবচেয়ে মিষ্টি লাগে। তাইতো যা পাওয়া সহজ, তা মানুষকে টানে না, কিন্তু যা পাওয়া যায় না, সেটাই মানুষকে পাগল করে তোলে।”
আরিয়ান বিরক্তির সূরে বলল,
“আমার এসব ভালো লাগছেনা।”
“আমারও। কিন্তু তবুও আমি এখানেই থাকব। আর তুইও এখানেই থাকবি।”
আরিয়ান না চাইতেও বসে রইল। রায়য়ান তাকে চোখের ইশারাতে শান্ত থাকতে বলল।
হঠাৎ, নিহাল মাইক্রফোন হাতে স্টেজের দিকে এগোল। আলো তার ওপর পড়তেই পুরো পার্টির ফোকাস তার দিকে মোড় নিল। অতিথিরা তাকিয়ে রইল। নিহাল মৃদু হাসি দিয়ে মাইক্রফোন ঠোঁটের কাছে নিয়ে বলল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, টুডে ইজ আ ভেরি স্পেশাল ডে। উই আর হিয়ার টু সেলিব্রেট দ্য লাভ অ্যান্ড টুগেদারনেস অফ টু ওয়ান্ডারফুল পিপল—সুমু অ্যান্ড শেরাজ খান। ইটস দেইর উইডিং অ্যানিভার্সারি।
সুমু অ্যান্ড শেরাজ খান হ্যাভ শোন আস দ্য বিউটি অফ ট্রু পার্টনারশিপ, কেয়ার, অ্যান্ড এন্ডলেস লাভ। লেটস অল উইশ দেম জয়, হ্যাপিনেস, অ্যান্ড ম্যানি মোর ইয়ার্স ফিল্ড উইথ বিউটিফুল মেমরিজ টুগেদার।
হ্যাপি অ্যানিভার্সারি, সুমু অ্যান্ড শেরাজ খান।” (লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আজ একটি খুবই বিশেষ দিন। আমরা এখানে দুইজন অসাধারণ মানুষের—সুমু এবং শেরাজ খান—ভালবাসা এবং একসাথে কাটানো সময় উদযাপন করতে এসেছি। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। সুমু এবং শেরাজ খান আমাদের দেখিয়েছেন সত্যিকারের সঙ্গী, যত্ন, এবং অসীম প্রেমের সৌন্দর্য। আসুন সবাই তাদের আনন্দ, সুখ, এবং আরও অনেক সুন্দর মুহূর্তের জন্য শুভকামনা জানাই। শুভ বিবাহ বার্ষিকী, সুমু এবং শেরাজ খান।)
চারপাশে হাততালির বন্যা বয়ে গেল। নিহাল হেসে একটু সময় নিয়ে আবারও বলল,
“টুডে ইভনিং, অল অব আওর কাপলস উইল পারফর্ম এ স্পেশাল কাপল পারফরম্যান্স জাস্ট ফর দেইর এন্টারটেইনমেন্ট। “টুডে, উই হ্যাভ ড্যান্স পারফর্মেন্সেস ফর ইউ অল: ইশিতা অ্যান্ড আরবাজ, ইনায়া অ্যান্ড সারবাজ, ফারিয়া অ্যান্ড শাহরুখ, সামিয়া অ্যান্ড রাহিন, অ্যান্ড নাজমিন অ্যান্ড আইয়ুব। সো, লেটস গেট স্টার্টেড।” (আজ রাতের অনুষ্ঠানে, আমাদের সকল কাপলরা তাদের জন্য একটি বিশেষ কাপল পারফরম্যান্স উপস্থাপন করবে, শুধুই তাদের বিনোদনের জন্য। আজ আমাদের জন্য ড্যান্স পারফরম্যান্স করবে: ইশিতা এবং আরবাজ, ইনায়া এবং সারবাজ, ফারিয়া এবং শাহরুখ, সামিয়া এবং রাহিন, এবং নাজমিন এবং আইয়ুব। তো, চলুন শুরু করা যাক।)
চারপাশে আবারও হাততালি উঠল। কাপলরা একে একে ড্যান্সের জন্য রেডি হতে শুরু করল। দূর থেকে পিয়াস সামিয়া আর রাহিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে স্পষ্ট ব্যথা ফুটে উঠল। সে চাইল সব ছেড়ে বেরিয়ে যেতে, কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে সে দাঁড়িয়ে রইল।
রোজা এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। হঠাৎ সে শেরাজের দিকে এগিয়ে গেল। শেরাজ স্যান্ডির সাথে কথা বলছে। রোজা তার সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ড্যান্স উইথ মি, এস.কে?”
শেরাজ যেন পাত্তা দিল না। সে শুনেও না শোনার ভান করল। এদিকে, সুমু নাতাশার সাথে কথা বলছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল শেরাজদের দিকে। সে রোজাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। আর দাঁড়িয়ে না থেকে এগিয়ে এলো। শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
“ভাবছি, এবার ওমানে ফিরে গিয়ে তোমার একটা পার্মানেন্ট ব্যবস্থা করব ননদিনী।”
রোজা রাগে জ্বলে উঠল। সে হনহনিয়ে হেঁটে অন্য সাইডে চলে গেল। সুমু শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি ভালো মার্শাল আর্ট আর রিভলবার চালাতে জানি, বেইব।”
কথাটা বলে সুমু শেরাজকে নিয়ে সোফার ওপর বসল। শেরাজ বুকে ফুঁ দিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“এইটা বউ নাকি লেডি গুন্ডা।”
সুমু ঠোঁট টিপে হাসল। ড্যান্স পারফরম্যান্স শুরু হলো। অডিও স্পিকারে বেজে উঠল “জারা জারা বেহেকতা হ্যায়” গানটা। আইয়ুবরা তাদের পার্টনারদের নিয়ে কাপল ড্যান্স শুরু করল। হঠাৎ রায়য়ান আর আরিয়ান সুমুদের কাছে এলো। রায়য়ান মৃদু হেসে বলল,
“সকলেই তোমাদের গিফট দিল, শুধু আমরা দুজন ছাড়া।”
সে সুমুর সামনে “শুমুখ” এবং “ক্লাইভ ক্রিশ্চিয়ান নং ওয়ান ইম্পেরিয়াল ম্যাজেস্টি” পারফিউমের প্যাকেট রেখে বলল,
“তোমার ফেভারিট ব্র্যান্ডের পারফিউম।”
সুমু মৃদু হাসল। কিন্তু কোনো কথা বলল না। আরিয়ান সুমুর সামনে একটি ডায়মন্ডের লেকলেস রেখে বলল,
“পছন্দ হবে কিনা জানিনা। লাইফে কোনোদিনও মেয়েদের জন্য নিজে গিয়ে কিছু কিনিনি। এই প্রথম তোমার জন্য আনলাম। পছন্দ না হলেও রেখে দাও।”
দুজনেই চলে গেল। পাশ থেকে শেরাজ বাঁকা হাসল। হঠাৎ আইয়ুবরা ড্যান্স শেষ করে এসে শেরাজকে টেনে নিয়ে গেল। তারা শেরাজকে একসাইডে নিয়ে গিয়ে বলল,
“তুই আর ভাবিজি একটা পারফরম্যান্স কর।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল, “সুমু প্রেগনেন্ট, তুই জানিস না?”
আইয়ুব একটু ভেবে বলল,
“আচ্ছা, এস.কে! ভাবিজিকে ফিরিয়ে এনে বিয়ের করার পরেরদিন শুনলাম, সে নাকি প্রেগনেন্ট। আচ্ছা, একরাতেই ভাবিজি প্রেগনেন্ট হলো কীভাবে?”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমার স্পার্মের অনেক পাওয়ার তো। তাই আমাদের বিয়ের কয়েকমাস আগেই আমার স্পার্ম উড়ে গিয়ে তোর ভাবিজির মধ্যে ডোনেট হয়ে। আর এভাবে সে প্রেগনেন্ট হয়েছে। শা*লা, বিয়ে করেছিস, তাইনা?
আইয়ুব দাঁত বের করে হেসে বলল,
“হ্যাঁ!”
“বাসর হয়নি এখনো?”
আইয়ুব কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“তোরাই তো করতে দিলিনা।”
শেরাজ রাগ দেখিয়ে বলল,
“এরজন্যই তুই মাথা মোটা। বাসর করতে পারিসনি বলে যতটুকু বুদ্ধি ছিল, সব তোর বাসর না করতে পারার উত্তেজনার সাথে বেরিয়ে গিয়েছে। আগে বাসর কর, তারপর বুঝবি।”
কথাগুলো বলে শেরাজ চলে গেল। আইয়ুব আহাম্মকে মতো তাকিয়ে রইল।
পার্টির আলোঝলমলে ড্রয়িংরুমে আলিশার চোখ বারবার রায়য়ানের দিকে ঘুরে যাচ্ছে। সে মৃদু হাসি দিয়ে রায়য়ানকে দেখছে, যেন প্রতিটি মুহূর্তে রায়য়ানের দিকে নজর রাখাই তার একমাত্র কাজ।
কিন্তু রায়য়ান নিজেকে সম্পূর্ণ অন্য কোনো জগতে ডুবিয়ে রেখেছে। তার দৃষ্টি যেন চারপাশের আলো আর পার্টির মিউজিকের মধ্যে হারিয়ে গেছে। আলিশা যতই চেষ্টা করুক, সে তার দিকে চোখও তুলছে না।
খান সাহেব পর্ব ৭২ (২)
আলিশা বডি ল্যাঙ্গুয়েজে স্পষ্ট। সে হাত দিয়ে একটু অঙ্গভঙ্গি করে, হাসি দিয়ে তাকাচ্ছে, কিন্তু রায়য়ান কোনো সাড়া দিচ্ছে না। সে নিজেকে অন্যদিকে মাতিয়ে রেখেছে। তার দৃষ্টি সুমুর দিকে আটকে আছে। আর তার মন শুধুই সুমুর উপস্থিতিতে আবদ্ধ। সে যেন সবকিছু ভুলে সুমুকেই দেখছে, যেই দেখার কোনো শেষ নেই।
আলিশা উপরে থেকে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। তার মুখে হালকা হাসি, শরীরচলনে স্বাভাবিক ভঙ্গি ধরে রেখেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার হৃদয় কেঁপে উঠছে। তার ভেতরে একটা অদ্ভুত জ্বালা শুরু হয়েছে, যেটা এখন বরাবরের জন্য তার সঙ্গী হয়ে গেছে। সে জানে, রায়য়ান চৌধুরী কোনোদিনও তাকে ভালোবাসবে না, তবুও আলিশা চেষ্টা করে। কিন্তু বারবার সে ব্যর্থ হয়।
