মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩০
তাসনিয়া নুর
মুন বেগমের মুখে অর্কের নাম শুনতেই চিত্রা তড়াক করে দরজার দিকে তাকায়। অর্ককে দেখে তার চোখ খুশিতে চকচক করে উঠে । বসা থেকে উঠে অর্কের কাছে গিয়ে বলে,
— অর্ক ভাই তুমি!! কখন আসলে? আমদের বলোনি কেনো?
— দুনিয়ার কি লীলাখেলা, তুই বুটকি আমারে ছাড়া হগ্গলরে ভাই ডাকলি ।
অর্কের পিছন থেকে আহিরের কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই চিত্রা নাক মুখ কুঁচকে বলে,
— তোকে দেখতে ভাই কম হনুমান বেশি লাগে।
— এই একদম তুই-তুকারি করবিনা, তোর বড় হই আমি। আর আজকে থেকে আমাকে ও ভাই ডাকবি।
— কচু ডাকব তোমাকে আমি হুহ।
— কেনো রে আমাকে আবার ছাইয়া বানানোর মতলব নিয়ে বসে থাকিস নি তো?
জনসম্মুখে আহিরের এমন প্রশ্নে লজ্জায় পড়ে গেল চিত্রা। বেত্তুমিজটাকে কি সে শুধু শুধু গাধা ডাকে নাকি এটা আসলেই একটা গাধা।
চিত্রা ও আহিরকে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে দেখে অর্ক খানিক হেসে বলল,
— আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে গরমের পরিবর্তে শীত আর শীতের পরিবর্তে গরম পড়া শুরু করল অথচ তোদের ঝগড়া করার স্বভাব আজ-ও গেল না ।
ফিরোজা বেগম হেসে এদিকে আসতে আসতে বললেন,
— এদের কথা বাদদে, এদের কাজ-ই হলো সারাদিন ঝগড়া করা । তুই কেমন আছিস? হুট করে না বলে চলে আসলি?
— কেনো আমি আসাতে কেউ খুশি হওনি?
— ছি বাবা এসব কি বলছিস, খুশি হবো না কেনো? আমরা অনেক খুশি হয়েছি। সেই যে তিন বছর আগে এসেছিলি তারপর তো আর না তুই এলি আর না তোর মা। আসবি-ই-বা কেনো কে হই আমরা তোদের।
ফিরোজা বেগমকে অভিমান করতে দেখে অর্ক হেসে বলল,
— জানেন-ই তো বাবার বিজনেস তার উপর আমাদের পড়ালেখা তাই এত বছর আসা হয়নি। তাই তো এখন সকলকে সারপ্রাইজ করার জন্য চলে এলাম।
সায়মা বেগম হেসে অর্কের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি ভিতরে ও আসবি।
সায়মা বেগমের কথা শুনে অর্ক, আবইয়াজ, মাহির, আহির সোফায় বসে পড়ে । সবাই গুল হয়ে বসে আড্ডা দিতে ব্যস্ত। অন্যদিকে একজনের চোখে তার বেবীডলকে দেখার তৃষ্ণা।
শায়লা বেগম আনোয়ার মির্জার চাচাতো বোন।ছোট বেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি আনোয়ার মির্জার বাবা রশিদ মির্জার কাছে বড় হয়েছেন। রশিদ মির্জা তাকে নিজের মেয়ের মতো বড় করেছেন। আনোয়ার মির্জাদের কাছে শায়লা বেগম ছিল নিজের বোন, কখনো তাকে চাচাতো বোনের চোখে দেখেননি। সাফায়েদ শেখের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার পর তিনি পাড়ি জমান সদূর ইতালিতে । সেখানেই জন্ম ইশতিয়াক শেখ অর্কের । অর্ক শায়লা বেগমের একমাত্র ছেলে ।
দেখতে দেখে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল কিন্তু মাইরার দেখা মিলল না। অর্ক ভেবেছিল হয়তো খাবার টেবিলে দেখতে পাবে কিন্তু মেয়েটা তা ও এল না। রাত ১টা বেজে ত্রিশ মিনিট পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে আছে, এমন সময় মাইরার দরজায় কেউ জুড়ে কড়া নাড়ে । প্রথম দিকে না খুললে ও শেষে বিরক্ত হয়ে চোখ কচঁলাতে কচলাতে দরজা খুলে । সামনে দন্ডয়মান ব্যক্তিটিকে দেখে যেই চিৎকার করতে যাবে হুট করে অর্ক তার মুখ চেপে ভিতরে ঢুকে দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে দিল। তারপর ধীর কন্ঠে মাইরার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
— বেবিগার্ল ইটস মি অর্ক ।
মুখ চেপে ধরে রাখায় মাইরা ছটফট করতে থাকে। মাইরার ছটফটের কারণ বুঝতে পেরে অর্ক তার মুখ ছেড়ে দিল। ছাড়া পেতেই মাইরা চোখ রাঙিয়ে বলল,
— এতো রাতে কেনো এসেছেন?
— তোমাকে আদর করতে ।
— এতদিন মনে ছিল না আমার কথা? না একটা কল রিসিভ করেছেন না মেসেজ সিন এখন হঠাৎ করেই আমার উপর আদর জেগে উঠছে? বেরিয়ে যান আমার রুম থেকে।
অর্ক মুখটা নরম করে মাইরার দিকে তাকায়, মেয়েটা এবার বেশ ক্ষেপেছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মাইরার হাতটা টেনে খাটে বসিয়ে নিজেও পাশে বসে পরে অর্ক। মাইরা তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে ।
— সরি ভুল হয়ে গিয়েছে। তোমাকে সারপ্রাইজ দিব বলে এমন করেছি সত্যি। আর কখনো করব না প্লিজ এবারের মত ক্ষমা করে দাও।
বেশ খানিকক্ষণ বোঝানোর পর মাইরা নরম হয়ে আসলো ।গাল ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— আর এমন করবেন না তো?
— না করব না।
— প্রমিস?
— পাক্কা প্রমিস ।
মাইরা এবার হেসে অর্কের গলা জড়িয়ে প্রশ্ন,
— আমার জন্য কিছু আনেননি?
— আমার বেবিডলের জন্য আমি কিছু আনব না সেটা হয় নাকি? কালকে সময় মতো সব পেয়ে যাবে।
মাইরা খুশি হয়ে আরেকটু এগিয়ে আসলো অর্কের দিকে ।
— এখন চলে যান, কেউ দেখলে সমস্যা হবে।
অর্ক হেসে মাথা নাড়ে। তারপর যেভাবে এসেছিল সেভাবেই বেরিয়ে পড়ে । অর্ক যাবার পর মাইরা দরজা লাগিয়ে দৌড়ে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ দাবিয়ে দিল ।কেনো যেনো খুব লজ্জা লাগছে। ওদের সম্পর্ক তো আর নতুন না গত তিন বছরের। সব কিছু ভাবতেই লজ্জা লাগছে।
রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আবইয়াজের নজর পড়ে সামনে গুটিয়ে বসে থাকা একটি বিড়ালের বাচ্চার উপর। সাদার মধ্যে একদম বিদেশী বিড়ালের মতো। আবইয়াজের খুব ইচ্ছে হলো বিড়ালটাকে ছুয়ে দেখার। আর দেখতে ও অনেক পরিষ্কার। আবইয়াজ দ্রুত কদমে বাচ্চাটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। যেই ছুতে যাবে অমনি কোথা থেকে এক বড় বিড়াল মিউ বলে তার দিকে তেড়ে আসলো। হঠাৎ আক্রমণে আবইয়াজ কিছুটা পিছিয়ে গেল। বড় বিড়ালটা তার দিকে কেমন চোখে যেনো তাকিয়ে আছে । বিড়ালটার তাকানোর ভঙ্গিমা দেখে আবইয়াজ দুহাত কোমরে রেখে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— ঢং দেখলে বাঁচিনা, এতো তেড়ে আসার কি আছে হ্যাঁ? আদর-ই তো করতে এসেছি এমন তেড়ে আসার কি আছে? নিয়ে তো ঘুরিস অবৈধ বাচ্চা, আবার তেজ কত। এই বিয়ে করেছিস তুই? তোর নামে পুলিশ কম্প্লেন করব আমি। করলাম না তোর বাচ্চাকে আদর, কি হবে আমরা? যা ভাগ।
নিজের কথা শেষ আবইয়াজ পা ঘুরিয়ে চলে যেতে থাকে। এদিকে বিড়ালটা কেমন ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুদূর যাবার পর আবইয়াজ পিছন ঘুরে দেখে বিড়ালটা এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। আবইয়াজ সুযোগটা কাজে লাগিয়ে দ্রুত পায়ে আবার পিছনে এসে বড় বিড়ালটার সামনে থেকে তার বাচ্চাটা উঠিয়ে নিয়ে দৌড় মারে। আর মা বিড়াল এখনো সেভাবেই তাকিয়ে আছে যেনো সব কিছু তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
বিড়ালের বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে আবইয়াজ। ড্রয়িং রুমেই ছিল মেহু, আবইয়াজের কোলে এতো কিউট একটা বিড়ালের বাচ্চা দেখতেই দৌড়ে আবইয়াজের কাছে এসে হাসি মুখে বলে,
— এতো কিউট বিড়ালের বাচ্চা কোথায় পেয়েছেন আপনি?
মেহুর উচ্ছ্বাস দেখে আবইয়াজ মনে মনে ভাবলো এই সুযোগ মেহুর সামনে হিরো সাজার। আবইয়াজ কিছুটা ভাব নিয়ে বলল,
— রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় খেয়াল করলাম একটা বিড়াল ড্রেনে পরে গিয়েছে । তারপর আমি গিয়ে এটাকে উদ্ধার করলাম।
— ড্রেনে পরলে এর দেহ তো একদম শুকনো।
— গাধী মাইয়া আমি এরে গোসল করিয়ে পরিষ্কার করে এনেছি।
— গোসল করালে-ও তো শরীর ভিজে থাকার কথা। তাহলে শুকনো কিভাবে?
— হেয়ার ড্রয়ার দিয়ে শুকিয়ে ফেলেছি ।
— কিন্তু আপনি তো মাত্র বাসায় ঢুকলেন।
মেহুর অতি প্রশ্নে বিরক্ত হলো আবইয়াজ । মেহুর দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
— সর আমার সামনে থেকে।
— ঠিক আছে যাব, আগে বিড়ালটা আমার কাছে দিন।
মেহুর কন্ঠে ছিল অনুনয়ের । আবইয়াজ এক ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— আমার বিড়াল তোকে কেনো দিবো?
— এমন কেনো করছেন একটু দিলে কি হয়?
— তোকে দিলে আমি কি পাবো?
আবারো একই কথা। মেহু বুঝতে পারে না এই লোক কি বিনিময় ছাড়া কিছু করতে জানে না। মেহু কন্ঠস্বর নরম করে বলল,
— আপনি যে কত খারাপ আপনি জানেন?
— না জানিনা। এসব জেনে আমার লাভ-ও নেই, এখন সামনে থেকে সর ।
আবইয়াজের এমন কর্কশ ব্যবহারে মেহু মুখটা নিষ্পাপ করে আবইয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহুর এমন দৃষ্টি আবইয়াজের বুকে গিয়ে লাগলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়ালের বাচ্চাটা মেহুকে দিয়ে বলল,
— খেয়াল রাখবি ওর। কিছু হলে তোর খবর আছে।
মেহু উপর নিচ মাথা নেড়ে বলে,
— আমি খেয়াল রাখব।
বিড়ালটা কে নিয়ে মাইরা, চিত্রা, ননী, মেহুর আনন্দের শেষ নেই। চারজন মিলে নাম-ও ডিসাইড করেছিল কিন্তু আবইয়াজের একটাই কথা তার বিড়ালের নাম সেই রাখবে। আবইয়াজের এমন উত্তরে মেহু মুখ ভেংচি কাটে।আবইয়াজ বিড়ালটার নাম রেখেছে নিনজা নুনু ।শরবত খাওয়ার সময় বিড়ালের এমন নাম শুনে শর্বত অর্কের নাকে মুখে উঠে যায়। চিত্রা নাক কুঁচকে বলে,
— ছি এটা কেমন নাম আবার।
কিন্তু কারো কথায় কান দেয়নি আবইয়াজ ।সে বলে দিয়েছে তার বিড়াল তার মন তার ইচ্ছে, কার কি।
বিড়ালটাকে এই নামে ডাকতে হবে ভাবলেই মেহুর গা গুলিয়ে আসছে।
ড্রয়িং ফাঁকা, মাহির আহির আর নিনজা নুনু ছাড়া কেউ নেই ।আহির একবার ফোন টিপছে আরেকবার বিড়ালটার দিকে তাকাচ্ছে ।নামটা মনে পড়লেই আহিরের চোখ উল্টে আসছে। আহির ও মাহিরের অপর সাইডে বাবু হয়ে সোফার উপর বসে আছে নিনজা নুনু। হুট করে একটা কালো কুকুর বাসায় ঢুকে ঘেউ ঘেউ শুরু করল। মাহির ভয়ে আহিরের কাছে চলে আসে। ক্ষেপে থাকা কুকুরটাকে দেখে আহির শুকনো ঢোক গিলে ।
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৯
হঠাৎ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই কুকুরটা আহির মাহিরের দিকে তেড়ে আসে। আহির ভয়ে মাহিরকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে সোফার পিছনে দৌড় মারে । মাহির ভয়ে চিৎকার দিয়ে কোনো রকমে উঠে উল্টো দিকে দৌড় দেয় । আহির সোফায় চারদিক দৌড়াচ্ছে আর কুকুরটা তার পিছন পিছন দৌড়াচ্ছে । মাহির যখন খেয়াল করে কুকুরটা শুধু আহিরকে দৌড়াচ্ছে সে সিঁড়ির কাছে গিয়ে রেলিংয়ে বসে পড়ে । কিছুক্ষন দৌড়ানোর পর কুকুরটা হঠাৎ মাহিরের দিকে তেড়ে আসতে শুরু করে। মাহির ভয়ে এক লাফ দিতেই রেলিংয়ের শেষ মাথায় থাকা নিউয়েল পোস্টের মধ্যে জায়গা মতো ব্যাথা পায়। তারপর কোনো রকমে সেখানে চেপে ধরে দুপা ফাক করে দৌড় লাগায়।
অন্যদিকে আহিরের খেয়াল নেই যে কুকুরটা তার পিছনে নেই সে এখনো চারদিকে দৌড়ে চক্কর লাগাচ্ছে।
