অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২
শ্রাবণী ইয়াসমিন
ভোর গড়িয়ে সকাল হয়েছে। সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলে আনায়ার খালি ঘরে পড়ে আছে। হঠাৎ নিচতলার বসার ঘরে রেবেকার চিৎকার ভেসে আসে—
“– আনায়া! আনায়া কোথায়? এই মেয়ে কোথায় গেল?”
ঘরের এক কোনা থেকে অন্য কোণে, বারান্দা থেকে বাথরুম পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করে রেবেকা। বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে যায় তার চিৎকারে।
আনায়ার মামা রবিন উঠে এসে বলে, “কি হয়েছে রেবেকা ?”
রেবেকার চোখ আগুনের মতো—
“– আনায়া নেই! খাটে বিছানা ঠিকঠাক করা, দরজা খোলা, কিন্তু মেয়েটার কোন চিহ্ন নেই!
তিনি যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ পরেই তার চিৎকারে আশেপাশের কয়েকজন প্রতিবেশী চলে আসে। সবাই গুঞ্জন করতে থাকে—
“– শুনছেন? ওই মেয়েটা নাকি পালিয়ে গেছে?
“– কার সঙ্গে যেন পালিয়েছে বুঝি!
একেক জন একেক কথা বলতে থাকে।
সবার মাঝে একমাত্র যিনি চুপ করে আছেন, তিনি আনায়ার নানু আপা। তার মুখে কোনো আতঙ্ক নেই। চোখে নেই কোনো কৌতূহল। তিনি এক কোণায় কাঠের চেয়ারে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকেন। যেন কিছুই ঘটেনি। যেন তিনি অপেক্ষা করছিলেন এই মুহূর্তটির।
রেবেকা এবার সোজা হেঁটে এসে তার সামনে দাঁড়ালেন। চোখে ঝলকানো রাগ, গলায় বিদ্বেষ—
“– আপনি জানতেন না? ও কোথায় গেছে, কীভাবে গেছে? আপনার হাতেই তো ওর সব আদিখ্যেতা। আপনি নিশ্চয়ই ওকে পালাতে সাহায্য করেছেন? বলুন! কোথায় পাঠিয়েছেন ওকে?
নানু আপা কোনো উত্তর দেন না। মুখে একটুও ভয় নেই, একটুও লজ্জা নেই। যেন সব শব্দ তার কাছে ঠুনকো।
রেবেকা এবার আরও রেগে যান। ঠিক তখনই তার পাশে দাঁড়ানো মেয়ে শেইলি ফিসফিসিয়ে বলে—
“– মা… এখন তুমি ভিক্টর নামের লোকটাকে কী বলবে? সে তো আজ বা কাল আসবে!
এই কথাটা শুনে রেবেকার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সে যেন হঠাৎ করেই নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে। তার চোখে আতঙ্ক আর অস্থিরতা জমে যায়।
তখনও সবাই কথা বলছে, কেউ আনায়ার চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করছে, কেউ পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ খুঁজছে। কিন্তু নানু আপা নিঃশব্দে জানালার বাইরের রোদ্দুরে চোখ রাখেন।
তার ঠোঁটে অল্প হাসি… যেন চুপচাপ এক বিজয় ঘোষিত হচ্ছে।
তবে এই বিজয় শুধু একটা মেয়ের মুক্তির না—এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক ঝড়ো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তা কি কেউ জানে?
আনায়া দাঁড়িয়ে আছে একটা শান্ত, নির্জন বাংলো বাড়ির সামনে।
তার এক হাতে একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগ, আরেক হাতে কাগজের একটা টুকরো সেখানে এই বাড়ির ঠিকানাটা লেখা ছিলো।
চারপাশে সে একবার চোখ বুলায়। এই এলাকায় বাড়িঘর খুব কম। ধরে নিলে দুই-তিনটা মাত্র, তাও বেশ দূরে দূরে।
সারা জায়গাটা খুব শান্ত, যেন কেউ কোনো শব্দ না করেই হেঁটে চলে।
বাড়িটা দেখতে বেশ পরিপাটি। দেয়ালে হালকা সাদা রঙ, জানালাগুলো ঠিকঠাক লাগানো। বারান্দায় একটা দোলনচেয়ার রাখা, আর দরজার পাশে নামপ্লেট:
“ইলামঞ্জ”
নামটা পড়েই আনায়ার মনটা কেমন যেন করে ওঠে।
এই নামটা সে আগে কখনো শুনেছে কি?
ছোট্ট একটা গেট—খোলা। বাড়ির চারপাশে কিছু গাছপালা, কিন্তু তা ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়নি। দেখেই বোঝা যায়, কেউ না কেউ এই বাড়িটাকে ঠিকঠাক রাখে।
আনায়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে একবার পেছনে তাকায়।
চেনা কেউ নেই, ডাকার কেউ নেই। চারদিকের নীরবতা যেন তাকে বলছে—”এগিয়ে যাও”
আনায়া গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকে। বাড়ির ভেতরে পা রেখেই প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ে, তা হলো এক অদ্ভুত রকমের নীরবতা। না, ভয়ংকর কিছু নয়, বরং এক ধরনের শীতল প্রশান্তি।
তিন-চার ধাপ এগিয়ে আসতেই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ কণ্ঠে ডাক দেন,
“- আপা… আপনি নিশ্চয়ই আনায়া?”
আনায়া চমকে তাকায়।
বৃদ্ধ লোকটির মুখে মায়া মেশানো হাসি, গলায় নম্রতা।
পরনে সাদা লুঙ্গি , পাতলা সোয়েটার মতো জামা। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
“আমি রফিক মিয়া। আপনার নানার বন্ধুর ছোট ভাই। অনেক বছর ধরে এই বাড়ির দেখাশোনা করি। আপনার নানু ফোনে জানিয়েছিলেন যে আপনি আসবেন। এই
বলেই তিনি দরজাটা পুরোপুরি খুলে দেন।
আনায়ার কেমন যেন গলার কাছে আটকে থাকা কষ্টটা একটু হালকা হয়। এক কাপড়ে, এক ব্যাগে সে কত কষ্ট নিয়ে এসেছিল এখানে এখানে যেন কেউ অন্তত অপেক্ষায় ছিল তার জন্য।
বাড়ির ভেতরের সাজগোজ সাধারণ কিন্তু স্নিগ্ধ।ঘরগুলো ঝাঁঝালো গন্ধমুক্ত, জানালায় বাসন্তি রঙের পর্দা, মেঝেতে পরিচ্ছন্ন কার্পেট। সবকিছুতেই একটা যত্নের ছাপ।
রফিক মিয়া তাকে একটা ঘরে নিয়ে যান।
“এই ঘরটা আপনার জন্যই রাখা ছিল। আপনি হাত মুখ ধুয়ে নিন, আমি ততক্ষণে খাবার গরম করে দিচ্ছি।
ঘরটা ছিল উজ্জ্বল, পরিপাটি। জানালার পাশে কাঠের ডেস্ক, ছোট্ট একটা বুকশেলফ, আর এক কোণে আয়না।
আনায়া ব্যাগ রেখে একটু সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়।
নিচে নেমে এসে খেতে বসে। পাতে গরম ভাত, ডাল, ভাজি আর ডিমের ঝোল। সাধারণ খাবার, কিন্তু এতদিন পর এমন যত্নে সাজানো খাবার দেখে তার গলা ভার হয়ে আসে।
আবু চাচা চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছু বলছেন না, শুধু মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করছেন, “আর কিছু লাগবে?
আনায়া ধীরে ধীরে খেতে থাকে। বাইরের আলো তখন নরম হয়ে আসছে, দিন গড়িয়ে যাচ্ছে বিকেলের দিকে।
খাওয়া শেষে সে একবার ছাদে উঠে যায়। ছাদে হালকা বাতাস, চারপাশে গাছের ডাল ভেসে আসে দোল খেয়ে।
দূরে কয়েকটা পাখি ভেসে যাচ্ছে আকাশের গায়ে। আনায়া ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। সব কিছু এতটাই শান্ত যে সে যেন ভুলেই যায়, কতটা ঝড় পেরিয়ে এসেছে সে এখানে।
সন্ধ্যা নেমে এলে সে নিজের ঘরে ফিরে আসে। জানালার পর্দা টেনে, হালকা আলো জ্বালিয়ে ব্যাগ থেকে ডায়েরি বের করে। লিখতে চায় অনেক কিছু… কিন্তু শরীরটা কেমন দুর্বল লাগে। কলম ধরে রাখতে কষ্ট হয়।
তারপর হঠাৎ করেই নানুর মুখটা মনে পড়ে যায়। তাঁর সেই চুপচাপ চোখ, গলা নামিয়ে বলা কথা, আর শেষ মুহূর্তে বলেছিলেন—
“এই বাড়িটা তোর জন্য নরক, তুই এইখান থেকে পালিয়ে গেলেই বেচে যাবি রে।
আনায়া চোখ বন্ধ করে ফেলেন। নিরবভাবে রাতের খাবার খেয়ে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয়।
রাত গভীর।
ঘরটা অন্ধকার শুধু জানালার ফাঁক গলে চাঁদের আলো বিছানায় পড়ছে। ঘুমে ঢলে পড়া আনায়ার মনে হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়…
কেউ যেন তাকে খুব কাছ থেকে, গভীরভাবে দেখছে।
একদম নিঃশ্বাস ফেলার মতো দূরত্ব থেকে। চোখ হঠাৎ খুলে যায় তার।
বিছানার পাশে, অন্ধকারে, কেউ নেই। আলো জ্বলছে না, পিনপতন নীরবতা।
তবুও বুকের ভেতরে কাঁপুনি লাগে। একবারে নিঃশব্দে সে চারপাশে চোখ বুলায়।
হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় দরজার দিকে। দরজাটা হালকা ভাঁজ করা ভেতরে ঢোকার মতো না, কিন্তু পুরোপুরি লাগানোও না।
কিন্তু সে তো বন্ধ করেই ঘুমিয়েছিল!
আনায়ার ঠোঁট শুকিয়ে আসে। তারপর নিজেকে ধাতস্থ করে নেয়।
“হয়তো ভুলে গিয়েছিলাম… আজ অনেক ক্লান্ত ছিলাম তো,” নিজেকে বোঝায় সে।
ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দরজাটা ঠিক করে লক করে দেয়।
ঘরের বাতাসে তখনো এক অদ্ভুত ভারী অনুভব। সে আবার শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে।
কিন্তু এবার ঘুম আসতে একটু বেশি সময় লাগে।
আর মনে হতে থাকে…
আসলে কি সে একা? নাকি কারও চুপচাপ নজর সত্যিই তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে?
রোদটা এখনও ঝলমলে হয়নি।বাতাসে হালকা ঠাণ্ডা ছোঁয়া।
আনায়ার চোখ খুলে যায় আপনাতেই। কোনো ঘড়ির অ্যালার্ম নয়, তার নিজের ভেতরের অভ্যেসই যেন তাকে জাগিয়ে দেয়।
বিছানায় উঠে বসে সে একটু গা টানটান করে নেয়।
তারপর ধীরে পা মেলে জানালার কাছে যায়।
জানালা খুলতেই একটা ঠাণ্ডা, ভেজা-ভেজা বাতাস মুখে এসে লাগে।
সূর্যের কাঁচা আলো গায়ে মেখে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে আনায়া। এই কিছু মুহূর্ত—যা সে প্রতিদিন নিজের জন্য বাঁচে। যেখানে সে নিঃশব্দে চারপাশের প্রকৃতি শোনে।
পাখির ডাক, দূরের একটা পুকুরে বকের ওড়াউড়ি, আর গাছের পাতায় হালকা দোল।
তবে আজকের সকালে তার শান্তি ভাঙে খুব দ্রুতই।
চোখ খুলে ঘুরে দাঁড়াতেই তার চোখ আটকে যায় টেবিলের দিকে।
টেবিলের ওপর একটা কাগজ রাখা।
অদ্ভুত রঙের। কালো।
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১
একটা পুরু, রুক্ষ কাগজ—যা সে কাল রাতে দেখেনি, এবং তার মনে নেই সে কোনো কাগজ ওখানে রেখেছিল।
ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে কাগজটা তুলে নেয় আনায়া।
চোখের ভেতর জড়ো হয় প্রশ্ন।
এটা কে রাখলো? কখন? কীভাবে?
তার আঙুল কাঁপে না কিন্তু বুকের ভেতর যেন একটু চাপা ঠেলা লাগে।
সাদা কালি দিয়ে লেখা অদ্ভুত ভাবে জ্বলজ্বল করছে সেই লেখাগুলো –
“Be ready to be mine, My LOVE BIRD”………..
