Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩
শ্রাবণী ইয়াসমিন

রাজধানী শহরের এক অভিজাত ভবনের ১৩ তলা।
ভিক্টর চেয়ারে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
তার চোখ ঠান্ডা। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
হাতের আঙুলে ধীরে ধীরে একটা রিং ঘুরিয়ে চলেছে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঢোকে তার বিশ্বস্ত সহকারী, রনি।
সে একবার দম নিয়ে বলে—

“স্যার…..
একটা মুহূর্ত নীরবতা।
“- আনায়া মেয়েটি পালিয়ে গিয়েছে।
ভিক্টরের ঠোঁটের কোণে হালকা এক বাঁকা হাসি খেলে যায়।
“পালিয়েছে?”
ভয়ংকর ঠান্ডা উচ্চারণ। তাতে না আছে রাগ, না উত্তেজনা। শুধু এক অদ্ভুত শীতল ব্যঙ্গ।
রনি গলা নামিয়ে বলে,
“- আপনার কথা মতো আজ সকালে মেয়েটার খোজ নিতে গিয়েছিলাম আর গিয়েই প্রতিবেশিদের থেকে এইসব শুনে এলাম। । তার মামা-মামি কথা দিয়েছিল… কিন্তু মেয়েটা সেদিনই ভোরের আলো ফোটার আগেই পালিয়ে গেছে। মেয়েটা কোথায় গিয়েছে… কেউ কিছু জানে না।”
ভিক্টর এবার চেয়ার থেকে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। একটু হেঁটে দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কাচের দেয়ালের ওপারে শহরের কোলাহল। কিন্তু তার ভেতর নীরব আগ্নেয়গিরি।

“কেউ কথা রাখেনি…”
তার ঠোঁট থেকে শব্দটা বের হয় বিষের মতো।
“তাহলে তাদের শাস্তি প্রাপ্য।”
তার চোখে এবার বিদ্যুৎ খেলে যায়।
সে ঘুরে রনির দিকে তাকায়। কণ্ঠস্থ স্বরে বলে—
“শেইলি—মেয়েটাকে তুলে আনো।”
রনি স্তব্ধ।
“স্যার… ওকে আনায়ার বদলে…”
“না,” ভিক্টর থামিয়ে দেয়।
“আনায়ার জায়গা কেউ নিতে পারবে না। শেইলি কে তুলে আনতে বলছি কারণ ওর মা-বাবা কথা দিয়েছিল আনায়াকে আমাকে দেবে। তারা ব্যর্থ হয়েছে। তাই তাদের হৃদয়ে আঘাত করা দরকার।
ওই মেয়েটা—শেইলি—তাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।
ওকে বন্দী করে রাখো। যতদিন না আনায়াকে ফেরত পাই, ততদিন শেইলি আমার ‘উপহার’।”
রনির মুখ শুকিয়ে যায়।
“খেয়াল রেখো, বাঁচিয়ে রেখো।
কিন্তু ভুলে যেও না… আমি কাকে শাস্তি দিচ্ছি, সেটা যেন তার পরিবার বুঝতে পারে প্রতিটা নিঃশ্বাসে।”
ভিক্টর আবার নিজের রিংটা ঘুরাতে থাকে।
“আমি কাউকে ক্ষমা করি না…
আর প্রতারণা আমার সামনে কেউ করে না দ্বিতীয়বার।”

আনায়া ছাদে দাঁড়িয়ে কোনো এক কল্পনার রাজ্যে ডুবে আছে। বিকেলের আলো গা ছুঁয়ে যাচ্ছে মৃদু স্পর্শে।
চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে, তার চোখে ঝুলে আছে অস্থিরতা।
হাতে ধরা সেই কালো খামে মোড়ানো চিঠি।
তীক্ষ্ণ হাতে লেখা ছোট্ট কয়েকটা শব্দই যেন একেকটা শ্বাসরোধকারী ছুরি—
“Be ready to be mine, My LOVE BIRD.”
চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকায় আনায়া। এতো সুন্দর একটা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থেকেও তার বুকের ভেতর কেমন অন্ধকার জমে আছে। কে লিখেছে চিঠিটা? কীভাবে এখানে এলো? এই বাড়ির ঠিকানা তো কেউ জানে না! আনায়ার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হয়।

হঠাৎ…
একটা শীতল স্রোত বয়ে যায় তার মেরুদণ্ড বেয়ে। হাওয়া থেমে গেছে যেন।পেছনে… কোথা থেকে যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। কেউ দাঁড়িয়ে আছে খুব কাছে… খুব, খুব কাছে।
এমনভাবে যেন…
সে বুঝতে পারছে আনায়ার নিঃশ্বাসের গতি। সে শুনতে পাচ্ছে তার বুকের ধুকপুকানি। আনায়া নিঃশ্বাস টেনে নেয়।
আনায়া ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। সেই মুহূর্তেই যেন সময়টা থেমে গেল।
চার-পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত পুরুষটি অন্ধকারে ঢেকে থাকা শহরের ব্যাকড্রপে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ আটকে যাওয়ার মতো দৃশ্য। যেন কেউ নিখুঁতভাবে তাকে এঁকে পাঠিয়েছে।
সে পরনে ছিল কালো ফুল স্লিভ শার্ট। বুকের দুটো বোতাম খোলা, হাতে গুটানো হাতার ফাঁকে কেবল দৃঢ়তা। নিচে ডিপ গ্রে ট্রাউজার, আর পায়ে চকচকে হালকা চামড়ার বুট। শরীরের গঠন ছিল পরিপাটি অথচ স্নিগ্ধ। যাকে বলে অভিজাত পুরুষের উপস্থিতি, তবু চোখে একটা রুক্ষ বিদ্যুৎ।
চুলগুলো এলোমেলো করে সেট করা, কিন্তু সেই এলোমেলোতাতেও ছিল শিল্পের ছোঁয়া।
চোখজোড়া…

আনায়ার শ্বাস কেঁপে উঠল।
অদ্ভুত তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি… তাকে না ছুঁয়েই যেন তার মনের গহীনে নেমে যাচ্ছিল। যেন এই মানুষটা শুধু তার চোখের ভাষা পড়ছে না, বরং প্রতিটি না বলা অনুভব গিলে নিচ্ছে।
জেভিয়ার এর ঠোঁটের কোণে একটুখানি শান্ত হাসি খেলে যায়। তারপর সে এগিয়ে আসে আর দু’হাত বাড়িয়ে দেয়।
এক হাতে একটা খাবারের বক্স। অন্য হাতে চকচকে গিফট পেপারে মোড়ানো ছোট্ট একটি বাক্স।
তার স্বর…
সেই গলার স্বরটা ছিল এতটাই ভারী, শান্ত আর মোহময় যে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আনায়ার বুকের ভেতর যেন ঢেউ খেলে যায়।

— “হ্যালো… আমি জেভিয়ার ড্রেভেন। গতকাল পাশের বাড়িতে নতুন এসেছি। এই এলাকায় তেমন কাউকেই দেখিনি। তবে তোমাকে দেখেছিলাম কাল এই ছাদে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে। তাই ভাবলাম পরিচিত হওয়া যাক।”
শব্দগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সন্ধ্যার হাওয়ায়।
আনায়া চুপ। তার ঠোঁট নড়ে না, শুধু চোখ দুটো ধীরে ধীরে ছেলেটার প্রতিটা রেখা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।
উচ্চতা ছেলেটির অন্তত ছয় ফুট এক ইঞ্চি। গায়ের রঙ ছিল ফর্সা, যেন চাঁদের আলো ছুঁয়ে গেছে গায়ে। চেহারার প্রতিটি রেখা নিখুঁত তীক্ষ্ণ চোয়াল, ধারালো নাক, অল্প চাপা ঠোঁট যার প্রতিটা ভাঁজ যেন কিছুর প্রতিশ্রুতি দেয়।
বয়স আন্দাজ করা কঠিন।২৬, বা হয়তো তার একটু কম কিংবা বেশি।তবে তাতে কিছুই যায় আসে না।
কারণ তার উপস্থিতি তা বয়সের হিসেব ছাড়িয়ে যায়।
তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি, কথা বলার ধরন, এমনকি নিঃশ্বাস নেওয়ার ছন্দেও এক ধরনের আত্মবিশ্বাস আর রহস্য খেলে যাচ্ছে।

আর সেই গলার স্বর শুধু কণ্ঠ নয় একটা মোহ। যেটা প্রথম শোনাতেই কাউকে আবদ্ধ করে ফেলতে পারে।
আনায়া বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কথা বলাও ভুলে যায়।শুধু মনে মনে ভাবে, এই লোকটা কে?
আর কেন… তার বুকের গভীরে অজানা এক অনুভূতির ঢেউ বইতে লাগল?.
আনায়ার চোখ আটকে আছে ছেলেটার ওপর। যেন কোনো নিঃশব্দ ঘোরে আটকে গেছে সে। তাকিয়ে আছে অবাক বিস্ময়ে, নিজের চারপাশ ভুলে।
হঠাৎ ছেলেটা একটুখানি গলা খাকারি দেয়।
— “এই যে মিস? শুনছেন?”
আনায়া যেন বাস্তবে ফেরে। চোখের পলক পড়ে। একটা হালকা লজ্জার আভা খেলে যায় মুখে। চুপিচুপি হাসে সে।
“সরি… আমি….আমি একটু বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আনায়া ম্যারি, নরম স্বরে বলে সে।
“এই বাড়িটা… আসলে আমার নানুর ছিল। আমি গতকালই এসেছি। উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি বাড়িটা। তাই কয়েক দিনের জন্য একটু একা থাকতে চেয়েছি।
জেভিয়ার চুপচাপ শুনছিল। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা, যেন প্রতিটি শব্দ গিলে নিচ্ছিল।
“আচ্ছা তাই নাকি?” হালকা হাসে সে, “তাহলে তো আমরা দুইজনই নতুন এসেছি। ভালোই মিল হয়ে গেল।
দুজনেই একটু চুপচাপ হেসে নেয়।

আকাশের রঙ আরও ঘন নীল হয়ে এসেছে। বাতাসে কিছুটা শীতলতা।
“এই যে নাও এইটা… জেভিয়ার সামনের বক্সটা আনায়ার দিকে এগিয়ে দেয়
“আমি নিজে কিছু রান্না করেছি। তেমন ভালো রান্না পারি না, তবে খাওয়ার মতো হবে আশা করি।”
আনায়া একটু অবাক হয়।
“এর কিছুই দরকার ছিল না, মিস্টার ড্রেভেন। আপনি তো চেনেনও না আমাকে।”
জেভিয়ার হাসে, এবার একটু গম্ভীর গলায় বলে-
“আমার পরিবারে একটা রীতি আছে। নতুন প্রতিবেশীর সঙ্গে পরিচিত হতে গেলে খালি হাতে যাওয়া যায় না। এটা সেই রীতিরই অংশ। আমি শুধু সেটা মেনে চলেছি।”
আনায়া চোখ নামিয়ে একটু হাসে। একটা অচেনা উষ্ণতা যেন ধীরে ধীরে জমে ওঠে দুইজনের মাঝখানে। কয়েকটা টুকটাক কথা হয় আরও। তারপর জেভিয়ার বিদায় নেয়।
“আচ্ছা, তাহলে আমি যাই মিস অ্যানা।কোনো দরকার হলে জানাবেন।পাশেই আছি…
আর ডাকে শুধু ‘জেভিয়ার’ বললেই চলবে।”
তার ঠোঁটের কোণে খেলে যাওয়া সেই হাসিটা এতটাই নিখুঁত, যেন সেটার পেছনেও ছিল কোনো রহস্য।
জেভিয়ার চলে যায়।

জেভিয়ারর চলে যেতেই আনায়া তার কিছুক্ষণ পর সে ও তার রুমে চলে যায় হাতে জেভিয়ার এর দেওয়া বক্স টা নিয়ে।
আনায়া দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই আচমকা থমকে দাঁড়াল।
সবকিছু কেমন অদ্ভুত লাগছে তার কাছে।তার মনে হচ্ছে সে তার রুম টা এইভাবে রেখে যায়নি।
সে ধীরে পা ফেলে ঘরের ভেতরে এগিয়ে গেল। হালকা বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে। পা থেমে যায় টেবিলের সামনে।
তার চুলের ব্রাশ, যা সবসময় সে ড্রেসারের টপ ড্রয়ারে রাখে সেটা আজ বাইরে।
তাতে একটা কালো চুল আটকে আছে বেশ বড়, কিন্তু আনায়ার চুল নয়।
ওয়াল শেলফের ওপর রাখা একজোড়া বই। তার প্রিয় ক্ল্যাসিক নভেল একটা বই এখন উল্টে রাখা, আর মাঝে একটা গাছের শুকনো পাতা গুঁজে দেওয়া।
কিন্তু সমস্যা হলো, সে এই পাতাটা কখনই রাখেনি।
বালিশের নিচে হাত রাখতেই তার আঙুলে লাগে কোনো কাগজের কিনারা।
বালিশের তলায় গুঁজে রাখা ছোট্ট একটা সাদা কাগজ।
তাতে লেখা—

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২

“Terror makes you glow, My LOVE BIRD”.
আনায়া যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। আনায়ার শরীর জমে যায়। শিরদাঁড়া দিয়ে হিম স্রোত নামে।
কে এসেছিল এখানে?
তার ঘরে… তার ঘরের প্রতিটা কোণে কার নিঃশ্বাস লেগে আছে?……….

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৪