মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩৩
তাসনিয়া নুর
— কি করছিস তোরা, ওকে মারছিস কেনো?
পিছন থেকে ভেসে আসা আবইয়াজের কন্ঠে সবাই থেমে যায়। ততক্ষণে আবইয়াজ লাইট অন করে ফেলেছিল। আহির, মাহির, মাইরা, চিত্রা, মেহু হাঁপাতে হাঁপাতে ঘুরে আবইয়াজের দিকে তাকালো । আর এদিকে বেচারা অর্ক এতক্ষণ গনধোলাই খাওয়ার পর শেষমেষ রেহাই পেয়ে ফ্লোরে লোটিয়ে পড়ে, দু-হাত দুপাশে ছড়িয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলছে। এদিকে ওদের এতো চিৎকার চেঁচামেচিতে ইতোমধ্যে সেখানে উপস্থিত হয় মির্জা বাড়ির কর্তা গিন্নিরা। সায়মা বেগম ওদের একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
— এতো রাতে চিৎকার চেঁচামেচি করার মানেটা কি? আর তোরা এখানে কি করছিস।
সায়মা বেগমের প্রশ্নে কিছুটা আমতা আমতা করতে দেখা গেল তাদের । এখন কি বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। ওদের চুপ করে থাকতে দেখে আনোয়ার মির্জা রাশভরী স্বরে,
— কিছু জিজ্ঞেস করা হয়েছে তোমাদের। এতো রাতে কি করছো?
মাইরা এবার আমতা আমতা করে বলল,
— আমার পিপাসা পেয়েছিল তাই পানি আনতে নিচে যাচ্ছিলাম।
মাইরার উত্তর শুনার পর সবাই আহিরের দিকে তাকায়। এতো জোড়া চোখ তার দিকে নিবদ্ধ হতে দেখে ভড়কে যায় সে । আহির ফট করে6প
বলে ফেলল,
— অনেক মশা কামড় দিচ্ছিল তাই মশা মারতে মারতে কখন যেনো রুম থেকে বের হয়ে পড়েছি, খেয়াল করিনি। হিহি।
কথাটা বলে দাঁত কেলিয়ে তাকিয়ে থাকে সে। আহিরের এমন উদ্ভট উত্তর শুনে সাফিন মির্জা বললেন,
— মশা মারতে মারতে এতো রাতে ঘুম ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়েছো এটা কেমন কথা? আর মশা আসবে কোথা থেকে?
— ওই আসলে রুমের জানালা খুলা ছিল তাই হয়তো আসতে পেরেছে।
ফিরোজা বেগম চিত্রার দিকে ইশারা করে বলল,
— এবার তুই বল তুই কেনো বের হয়েছিস?
এহেন প্রশ্নে তটস্থ হয় চিত্রা । এখন কিভাবে বলবে সে রাতের আধারে এক গাধার সাথে পিরিত করতে বেরিয়েছে।
— আসলে আমি স্বপ্নে দেখছিলাম ঘুরতে বেরিয়েছি তারপর কারো চিৎকারে ঘুম ভাঙতেই দেখি আমি ঘুমের মধ্যে হাঁটছি।
ফিরোজা বেগম আবইয়াজের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— এবার আপনার কি সমস্যা হয়েছিল সেটা বলুন মহাশয়।
— কারো চিৎকার এর শব্দ পেয়ে ছুটে এলাম।
আয়ুব মির্জা মাথা নিচু করে দুদিক নাড়েন ।এদের নিয়ে আর পারা গেল না। কথার চোটে কেউ এতক্ষণ মাহির ও অর্ক দিকে খেয়াল-ই করেনি।হটাৎ সায়মা বেগমের দৃষ্টি যায় নিচে পড়ে থাকা অর্কের দিকে। তিনি আর্তনাদ করে বললেন,
— হায় আল্লাহ এসব কি? অর্কের কি হয়েছে?
অর্কের কথা জিজ্ঞেস করতেই শুষ্ক ঢোক গিলে সবকটা । হুট করে মুন বেগম মাহিরকে দেখে চিৎকার করে বলেন,
— ওমাআ এটা কি? ভূত!!!!
ভূতের নাম শুনে মাইরা আবার চিৎকার উঠলে মাহির ভয়ে আবইয়াজের পিছনে লুকিয়ে বলে,
— কোথায় ভুত? কোথায়?
এমন উদ্ভট ড্রেস পড়া ছেলেটা মাহির বুঝতে পেরে মুন বেগম এগিয়ে গিয়ে মাহিরের কান মলে বললেন,
— হতচ্ছাড়া, ইতর, ফাজিল ছেলে রাতে এসব কাপড় পড়ে সবাইকে ভয় পাইয়ে মেরে ফেলার ধান্দা করেছিস।
মাহির নিজের কানে হাত দিয়ে আর্তনাদ করে বলল,
— আরে আম্মু আমিতো এমনি পড়েছিলাম হঠাৎ বাহির থেকে চিকচিক শব্দে বের হয়ে আসতেই দেখি এই চুন্নি মেয়ে চিৎকার করছে।
মাইরা মাহিরের কাছে গিয়ে পিঠে ধামধুম লাগিয়ে বলল,
— তার মানে সেটা তুমি ছিলে আর আমি কিনা কত ভয় পেলাম।
মাহির মুখ ভেংচি কেটে বলে,
— তুই তো নিজেই চুন্নি আবার ভয় ক্যান পাস।
দুজনকে মারামারি লাগতে দেখে মুন বেগম দুজনের পিঠে মেরে বলেন,
— এতো বড় হয়ে গিয়েছে তারপর ও এদের ঝগড়া থামেনা, সারাদিন এ নয়তো সে লেগেই থাকে। যা এখন সবকটা রুমে যা।
সবাই ভদ্র ছেলে মেয়ের মতো যার যার রুমে ঢুকে পড়ল। মুন বেগম মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
— এদের নিয়ে আর পারা যায়না। মানুষ নাকি দিন দিন বড় হয় আর এরা দিন দিন ছোট হচ্ছে।
সকাল সকাল ড্রয়িং রুমে কানামাছি খেলছে আহির, মাহির, আবইয়াজ, অর্ক, মেহু, মাইরা, ননী, চিত্রা । মূলত অর্কের মন ভালো করার জন্য মাইরার এই বুদ্ধি, কালকে তার জন্য ছেলেটা এতো মার খেলো।
কানামাছি খেলার সময় চোর হয়েছে মাহির। চোখে কাপড় বাধার পর সে এক একজনকে খুঁজেই চলেছে, কিন্তু কারো কোনো সারাশব্দ না পেয়ে মাহির কোমরে হাত রেখে বলল,
— ভাই একটু তো সাউন্ড কর নাহলে কিভাবে বুঝবো তোরা কোথায়?
আবইয়াজ বাঁকা হেসে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল,
— খা খা আমায় চুষে চুষে খা
আমায় গিলে গিলে খা।
আবইয়াজের গান শুনে মেহু রেগে বলে,
— ছি এসব কি ধরনের গান।
আহির এবার হেসে গেয়ে উঠে,
— সোনা বন্ধু তুই আমারে
বোতা দাওদা কাইট্টালা ।
অর্ক হেসে তাল মিলিয়ে বলল,
— ছি ছি ছি রে ননী ছি
ছি ছি ছি রে ননী ছি রে ছি রে ছি ।
— অর্ক ভাইয়া আমার নাম ননী।
অর্ক এবার জিভ কাটল ।সে বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল এখানে যে একজন ননী উপস্থিত আছে।
এদিকে এদের গান শুনে মাহির চিরবিড়িয়ে বলল,
— শালারা একটু তো লজ্জা হায়া রাখ । ছোট বাচ্চাদের সামনে এসব কি গাইছিস ।
আহির ও আবইয়াজ একসাথে বিড়বিড়য়ে বলল,
— কিছুদিন পর এই বাচ্চাদের সাথে হাডুডু খেলব।
আবইয়াজ তরিৎবেগে আহিরের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু উচিয়ে,
— কি বললি?
— কোথায় কিছু না তো। তুই কি বললি?
— আমি কিছু বলিনি।
খেলার পর্যায় আবারও শুরু হলো। সুযোগ বুঝে আহির চিত্রাকে, আবইয়াজ মেহুকে পিলারের পিছন নিয়ে গেল।
— কি সব অসভ্যতামি আমাকে এখানে এনেছেন কেনো?
— কোনো কিছু করার আগেই অসভ্যের তকমা লাগিয়ে দিলি? এই পাপ প্রকৃতি সইবে না কিন্তু জঙ্গলের মুরগি । এখন বল আই লাভ ইউ টু।
মেহু আবইয়াজের কলার ধরে,
— এতো সহজে না।
হনহনিয়ে চলে গেল মেহু ।আবইয়াজ মাথা চুলকে হেসে বলল,
— দেখা যাবে।
পিছনে ঘুরতেই আহির ও চিত্রাকে একসাথে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় আবইয়াজের । সে দ্রুত পায়ে তাদের কাছে পৌঁছে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— তোরা কি করছিস এখানে?
আহির থতমত খেয়ে যায় । পিছনে ফিরে আবইয়াজের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হেসে বলল,
— আসলে তোর পেত্নী বোন আমার পায়ে ধরে বলছিল সে যদি চোর হয় আমি যেনো তাড়াতাড়ি ধরা দিয়ে চোর হয়ে যাই। এই আর কি।
আহিরের মিথ্যা শুনে চিত্রা বেজায় রেগে গেল।কটমট দৃষ্টিতে আহিরের দিকে তাকালে আহির অসহায় চোখ দিয়ে আকুতি ভরা দৃষ্টিতে তাকায় । চিত্রা যেনো চোখ দিয়েই বলছে তোকে পরে দেখে নিবো।
আবইয়াজের বিশ্বাস হলো না আহিরের কথা। সে আহিরের কানের কাছে গিয়ে হুমকি স্বরে বলল,
— তুই আমার বোন থেকে একশত হাত দূরে থাকবি। বুঝতে পেরেছিস?
আহির ভদ্র ছেলের ন্যায় উপর নিচ মাথা করে। আবইয়াজ এবার একটু দূরে গিয়ে দু-আঙুল একবার নিজের চোখের দিকে অতঃপর আহিরের দিকে তাক করে। আহির এ যাত্রায় শুষ্ক ঢোক গিলে ।
দুপুরে নিজের রুমে টুকটাক কাজ করছিল মাইরা। দরজা খুলার শব্দে পিছনে ঘুরে দেখে অর্ক এসেছে। অর্ক আলতো করে দরজাটা লাগিয়ে মাইরার কাছে এগিয়ে আসে। মাইরা অস্বস্তি নিয়ে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বল,
— সরি, কালকে আমার জন্য আপনার এ অবস্থা হলো।
অর্ক এক আঙুল মাইরার ঠোঁটের উপর রেখে,
— হুশশ, সরি বলতে হবে না এখানে তোমার কোনো ফল্ট নেই।
অর্কের উত্তর শুনে মাইরা কেমন আবেগী নয়নে তার চোখে চোখ রাখে। অর্ক মুগ্ধ নয়নে তা দেখে গাল টিপে বলতে আরম্ভ করল,
— ওয়াও, তোমার গালগুলো একদম রসগোল্লার মতো নরম। দেখলেই মনে হয় টুপ করে কামড় দেই। can I take a little bite, please?
অর্কের রোমান্সের বারোটা বাজানোর জন্য মাইরার একটা চিৎকার যথেষ্ট ছিল। অর্কের কাঁধে টিকটিকি পরতে দেখে মাইরা মুলত চিৎকার দেয়। মাইরার রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল আহির ও মাহির ।বোনের চিৎকার শুনে ঠাস করে রুমে ঢুকে পড়ে। পিছন থেকে অর্ককে দেখে চিনতে পারেনি। ভেবেছে কে না কে, তাই দুই ভাই মিলে অর্কের উপর হামলে পড়ে। মাইরা কেবল হা হয়ে তাকিয়ে আছে । হঠাৎ সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। অর্ক খানিক জুরে বলল,
— তোদের মারার জন্য দুনিয়ায় মানুষের অভাব পরেছে? সবকটা শুধু কারনে অকারণে কেনো আমাকে ধৌস?
অর্কের স্বর শুনতে পেয়ে আহির জিজ্ঞেস করে,
— অর্ক তুই? এখানে কি করছিস? আর মাইরা চিৎকার কেনো দিল?
— ভাইয়া উনি আসলে আমার থেকে কলম নিতে এসেছিল হঠাৎ উনার কাঁধে টিকটিকি দেখে আমি চিৎকার দিয়ে ফেলেছি।
— কলম দিয়ে তুই কি করবি?
আহিরের প্রশ্নে অর্ক চোখ পাকিয়ে মাইরার দিকে তাকাল।মনে মনে ভাবলো মেয়েটা মিথ্যা ও বানিয়ে বলতে পারেনা।
— রান্না করে খাবো তাই নিতে এসেছি। আরে ভাই মানুষ কলম দিয়ে কি করে? মানুষ যা করে আমিও তাই করব। যা এখন সামনে সর, লাগবে না আমার কলম। শালা রোমান্সটা ও ঠিকমতো করতে দেয়না । প্রেম করে ধরা না পরে এতো মার খাওয়ার জন্য সেই হয়তো পৃথিবীর একমাত্র ব্যাক্তি।
অর্কের সব কথা শুনতে পেলে ও শেষের কথাগুলো শুনতে পেলো না কেউ।
মাইরার রুম থেকে বেরিয়ে আহির চলে যায় আবইয়াজের রুমে আর মাহির নিজের রুমে। আবইয়াজের রুমে ঢুকে তাকে উপেক্ষা করে টেবিলের উপর থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে বলল,
— পাসওয়ার্ডটা বল।
আবইয়াজ সোফার উপর বসে মোবাইল টিপতে টিপতে বলল,
— আমার পাসওয়ার্ড দিয়ে তুই কি করবি?
— কাজ আছে তাড়াতাড়ি বল।
— চুম্মা দে।
আহির ভ্রু কুঁচকে আবইয়াজের পানে তাকায়। অতপর ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে আবইয়াজের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আহিরকে মুখে দিকে ঝুঁকতে দেখে আবইয়াজ মুখে ঘুষি মেরে সরিয়ে দিয়ে রেগে বলল,
— শালা কি করছিলি তুই?
— তুই তো বললি চুম্মা দে।
— ওটা পাসওয়ার্ড ছিল বলদ।
আহির ল্যাপটপটাকে টেবিলের উপর রেখে,
— এমন পাসওয়ার্ড কে দেয় হ্যাঁ? এমন পাসওয়ার্ড দিলে তো বেডা মানুষ থেকে চুম্মা-ই খাবি।
— হ সবার চরিত্র কি আর তোর মতো।
আহির এবার রেগে বলল,
— দাড়াঁ তোকে দেখাচ্ছি আমার চরিত্র ।আজকে তোকে আমি চুমু দিয়েই ছাড়ব ।
আহির আবইয়াজের কলার ধরে কাছে টানতে থাকে। দুজনের মাঝে শুরু হয় ধস্তাধস্তি । আহির ঠোঁট বাঁকা করে চুমুর স্টাইল করে রেখেছে। এমন সময় কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে আহির ও আবইয়াজ দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে মেহু ও চিত্রা হা হয়ে তাকিয়ে আছে । বিস্ময়ে ওদের চোয়াল ঝোলে যাবার উপক্রম ।
আহির আবইয়াজের কলার ছেড়ে সাফাই গাওয়ার জন্য কিছু বলতে গেলে, মেহু ও চিত্রা কোনো কিছু না শুনে দৌড়ে চলে যায়। আবইয়াজ এসে আহিরের কলার ধরে বলে,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩২
— তোর কারণে আজকে আমার ইজ্জতের ফালুদা হয়ে গিয়েছে । আরো খা বেডা হয়ে বেডারে চুম্মা ।
— খালি কি তোর ইজ্জত গেছে? আমারটা যায়নি? আমি তো এমনি তোর সাথে মজা করছিলাম, আমার রুচির উপর ঠাডা পরেনাই যে তোকে কিস করব।
