সাঁঝের মায়া পর্ব ১৩
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
বসন্তের বিকেলগুলো এমনই হয়—হঠাৎ হাওয়ার বুকের ভেতরে অকারণ এক নরম উষ্ণতা ঢুকে পড়ে। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে আসা বাতাসে শিউলি নেই, কদম নেই, তবু অদ্ভুত এক ফুলের গন্ধ লেগে থাকে।
তিতির বিছানায় চুপ করে শুয়ে আছে। বিশাল খোলা চুল বালিশের উপর ছড়িয়ে।কিছুটা এলোমেলো, অবহেলায়, আর কিছুটা অজানা স্বীকারোক্তি দিতে চাইছে। ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথার মধ্যে হাজার একটা চিন্তাভাবনা ঘুরি ফিরে আসছে।
আজকাল কিছু একটা অন্য রকম হচ্ছে তার সাথে।
হঠাৎ করেই কারও কণ্ঠ ভেসে ওঠে, কোনো সাধারণ কথা অকারণে বিশেষ মনে হয়, আর কোনো হাসি বারবার মনে পড়ে।তিতির বাইরে তাকায়।জানালার বাইরে আমগাছের কচি পাতাগুলো বাতাসে কেঁপে কেপে উঠছে।বসন্ত বোধহয় এমনই, অকারণে মন খারাপ করে দেয়, আবার অকারণেই হাসায়।
তিতির চোখ বন্ধ করে।ভাবতে চায় না কিছু সে। তবু ভাবনা আসে,সে যদি এখন হঠাৎ পাশে বসত? চুলে হাত রাখত? না, কিছুই না… শুধু বসতো খানিকখন।নিঃশব্দে। কেমন হতো তবে! বাইরের বসন্ত গাছে গাছে নতুন পাতা আনে, আর ভেতরের বসন্ত মানুষের মধ্যে অচেনা অপেক্ষা।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।কেনো হচ্ছে এমন।।বসন্তের দোষ।কিন্তু কেন যেন আজ পৃথিবীটা একটু বেশি সুন্দর লাগছে…
সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে ধীরে। আকাশের নীল গাঢ় হয়ে বেগুনির দিকে ঝুঁকে পড়ে। দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে। বসন্তের দিনগুলো এমনই; আলো নিভে গেলেও মনের এই উদাস অনুভূতি নিভতে চায়না।
তিতির এখনও বিছানায় শুয়ে আছে।মনটা অস্থির হয়ে আছে।কাত হয়ে শোয়। চুল গুছিয়ে আবার এলোমেলো করে। নিজের ভেতরকার অস্থিরতাকে বোঝার চেষ্টা কর
সে উঠে জানালার কাছে দাঁড়ায়। বাইরে কৃষ্ণচূড়ার ডালে কচি পাতা। বাতাসে দুলছে। মনে হয় গাছটাও যেন নতুন কিছু শুরু করতে চাইছে
আজকাল প্রকৃতি তাকে অকারণে উদাস করে দেয়।
চোখের সমানে ভেসে ওঠে আজকে সারাদিন ঘটে যাওয়া সবকিছু।বসন্তের বাতাসের সাথে আরও কেউ একজন সারাদিন তাকে ছুয়ে ছিলো।চোখের আড়াল করেনি একমুহূর্ত।নিজ হাতে ফুল কিনে মানুষ টা গুজে দিয়েছে খোপায়,হাতে…হাটু গেড়ে বসে ঠিক করে দিয়েছে তার শাড়ির কুঁচি। ধর রেখেছে হাত।দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতির।সে খুব ভালো করে জানে ইশান ভাই এগুলো সব শুধু দায়িত্ববোধ থেকেই করেছে।কিন্তু তার ছটফটে মন সেটা মানলে তবে তে।সেই যে সকালে রিকশায় ইশানের ছোঁয়া অনূভব করে বুকের ভিতরে বা পাশের অঙ্গটা বিদ্রোহ শুরু করেছিলো সেটা থামেনি,বরঞ্চ আজ সারাদিন এ ইশানের যত্নে সেটা আর তিনগুণ বেড়েছে।
শীতল বাতাসে শরির শিউরে উঠলো। জানালা বন্ধ করে আলতো হাতে চুলগুলো গুছিয়ে খোপা করে এসে বসলো বিছানায়।ফোন হাতে নিলো।দু দিন হলো রাহাত ভাইয়ের কোনো খবর নেই।অবাক হওয়ার বিষয়।তার থেকেও অবাক হওয়ার বিষয়,তার এ দু দিনে রাহাত এর কথা সত্যি মনে পরেনি।এখন রাহাত ভাইয়ে ফেসবুক আইডি সামনে না পরলে বোধহয় এখনো মনে পরতো না।অথচ উঠতে বসতে চোখের সামনে ওই বিটকেল লোকটার মুখ ভাসছে।আজ সারাদিন ও তো।যত্নটা শুধু তিতির এর চোখে পরছে কেনো।হাজার একটা বকা যে দিয়েছে,কয়েকবার যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চেয়েছে,মাঝরাস্তায় রেখে চলে যাওয়ার জন্য পা বারিয়েছে।কই সেগুলো তার মনে পরছে না কেনো।কি মুসিবতে পরলো সে।
দিনের আলো নিভে ধরনীর বুকে আধার নেমেছে।ইশান বন্ধুদের সাথে স্থানীয় এক ক্যাফেতে বসে আছে।ছোটখাটো ক্যাফে।মফস্বলের দিকে যেমন হয় আরকি।কফি নিয়ে এলো দোকানের পুচকে রতন।ইশান দের দেখেই বত্রিশ পাটি দাত বের করে হাসলো।ছেলেটা ইশানদের দারুণ ভক্ত।ওরই বাবার দোকান এটা।সেই ছোট বেলা থেকেই বাবাকে সাহায্য করে।ইশানরা কলেজ থাকা কালিন এখানে এসেই আড্ডা দিতো।গিটার বাজাতো,গান গাইতো।ওর সেগুলো বড্ড ভাল্লাগতো।
“ইশান ভাই।আপনেরা আইছেন।আমি ভাবছি আর আইবেন না এনে।”
ইশান ভ্রু নাচালো।,”কেনো আসবো না।”
রতন একে একে সবাইকে চা কফি তুলে দিতে লাগলো।মুখটা সিরিয়াস বানিয়ে বললো,
“এহন সবাই শহরে থাকেন।বড় বড় হোটেলে খান।এনে কি আর আইবেন।তাই আরকি।”
অণিমা কান টেনে ধরলো রতনে।টেনে এনে বসালো পাশের চেয়ারটায়।, “বড় মানুষ এর মতো কথা শিখেছিস।বড়লোক তো আমরা সবসময়ই ছিলাম।শহরে যাওয়ার আগেও।তখন আসিনি এখানে?”
রতন বিজ্ঞের মতো মাথা ঝাকালো।”আইছেন তো।তয় মেলা দিন হইলো তো আহেন না কেউ।”
অণিমা রতনের চুল গুলো এলোমেলো করে দিলো।
“বড় হ।বুঝবি।চাকরি বাকরি, কাজকর্ম,সংসার কতটা দায়িত্ব। সারাজীবন চাইলেও একরকম থেকে যাওয়া যায়না।”.
রতন মাথা নাড়লো।ইশান সিগারেট ধরাললো।ভ্রু কুচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,” তুই স্কুলে যাসনা কেনো?এখানে কি?”
রতন চোরের মতো কাচুমাচু করলো।,”আসলে ভাই।”
“কি সমস্যা। “
রতন মাথা নামিয়ে ফেললো।”বাপজান অসুখ।আমার পরীক্ষার টাকা জমা দেওন লাগবো।মা একলা কাম কইরা সংসার চালাইতে পারে না।আমার বসনই লাগে দোকানে।তয় এই দেহেন পড়ি আমি।এইযে,বই আনছি।কাস্টমার না থাকলে পড়ি বইয়া বইয়া।”
কথাটা বলেই একগাদা বইয়ের দিকে ইশারা করলো রতন।
“আর বড় আপা বলছে পড়তে যাইতে।কিন্তু দোকান থুইয়া গেলে লস হইয়া যায়।”
বড় আপা মানে যে নিশি কে বোঝালো সেটা ওরা বুঝলো।এলাকায় দেওয়ান বাড়ির প্রভাব কোনায় কোনায়।এই যেমন এই দোকানের জমিটাও ঈশান এর দাদুর দান করা।ইশান মুখটা গম্ভীর করে বললো,
“টাকা দরকার বলিস নি কেনো।”
রতন দাতে জিব কাটলো।”আব্বায় বলছে আপনেরা মেলা সাহায্য করছেন।জমি দিছেন,দোকান কইরা দিছেন,বাড়ি কইরা দিছেন।এতকিছু দেওয়েনর পরও যদি আমরা চালায় খাইতে না পারি,হেইডা খারাপ দেহায়।”
ইশান পকেটে থেকে টাকা বের করলো।গুঁজে দিলো রতনের হাতে।”এটা রাখ এখন।বেশি আনিনি আজ।পরে আবার দেবো।কাল স্কুলে যাবি।ফি দিয়ে আসবি,কাল বিকেল থেকে তোর বড় আপার কাছে পড়তে যাবি।জলিল চাচাকে ডাক্তার দেখাবি।আর বাকিটা তোর মায়ের হাতে দিবি মনে থাকবে?এটা আমার আদেশ।না মানলে খবর আছে তোর আর তোর বুঝদার বাপের।”
রতন ছলছল চোখে মাথা নাড়লো।দেওয়ান বাড়ির মানুষ গুলের জন্যই এ গ্রামের অসহায় মানুষ খেয়ে পরে বেচে আছে।
রতন উঠে যেতেই নিজেদের আড্ডায় মন দিলো ওরা।সাজিদ অনিমাকে চোখে চোখে কিছু একটা ইশারা করতেই নড়েচড়ে বসলো সে।
“ইশান।আমার একটা ভাই আছে। আই মিন খালাতো আরকি।দারুণ ছেলে।সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার।খালাম্মা বিয়ের জন্য মেয়ে খুজছে।তোর তো এতগুলো বোন”
ইশান কিছু বললো না।কফিতে চুমুক দিতে।দিতে তাকিয়ে রইলো।নিয়াজ বড় বড় চোখে তাকালো।এ মেয়ে আবার বলে কি।ইশান আসার আগেই বললো ঈশানের দাদি যা যা বলেছে তাকে।সেটা তো তিতির কে বিয়ে করার কথা।তারা তো এখন মিশনে থাকবে তিতির আর ইশানকে নিয়ে।এখানে আর বোনদের কথা উঠলো কোত্থেকে। নিয়াজ হালকা করে পায়ে ধাক্কা দিলো অণিমার।অণিমা পাত্তা দিলো না তাকে।
“ইয়ারকি না দোস্ত।বিশ্বাস কর।ভাইটা আমার হাজারে একপিস।এইতো পরশু তার চাকরির খবর এসেছে।সে অবশ্য এখন একটু বাইরে আছে দরকারে।আমার খালা কে নিয়ে”
নিয়াজ ঘামছে রীতিমতো। দেওয়ান বাড়িতে বিয়ের কথা হলে নিশ্চয়ই আগে নিশির বিয়ের কথাই উঠবে।মেয়েটা কি ঝামেলা টা না পাকাতে চাইছে।ওদিকে রিতু,নাইম,সাজিদ সবাই বুঝতে পারছে নিয়াজ এর অস্থিরতা। সাথে অণিমা যে একটু প্ল্যান করে নিয়াজ কে এমন খেপানোর জন্যই অন্য ভাবে কথাটা শুরু করেছে সেটা সবাই বেশ ভালো বুঝতে পারছে।মিটিমিটি হাসছে সবাই।অণিমা টা সারাক্ষণ মজা করে ভয় দেখাতে থাকে নিয়াজ কে।নিশি আর নিয়াজ এর প্রেম অনেক বছরের।নিশি এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ার।প্রেম শুরু বোধহয় সে যখন এসএসসি দেবে।নিয়াজরা তখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে।তবে ইশানটার ভয়ে শান্তিমতো প্রেম করতে পারলে তবে তো।সারাক্ষণ তো ধরা পরার ভয়ে জানটা হাতে নিয়ে ঘুরতে হতো।শালা কখন জানি আবার খুন করে ফেলে।নিয়াজ মুখ ভাড় করে বসে রইলো।
“হঠাৎ তোরা আমার বোনদের নিয়ে পরলি কেনো বলতো।”
“কি আশ্চর্য। চোখের সামনে বন্ধুর এতোগুলো সুন্দরী বোন থাকলে দূরে নজর যাবে কেনো!”
ইশান গম্ভীর মুখে কফিতে চুমুক দিলো।একনজর দেখলো বন্ধুদের।সবকটা হা করে তাকিয়ে আছে তার উত্তর শোনার জন্য।
“নিশি টার সামনে ফাইনাল এক্সাম।এখন বিয়েশাদি নিয়ে এগোতে চাচ্ছি না।”
অনিমা মুখের সামনে অদৃশ্য মাছি তাড়ালো।মাথা নাড়লো দু দিকে।নিশি নয়।
ইশান মুখ তুললো।কপাল কুচকে বললো,
“নূরি?ওকেও দেবো না।ও তো আরও ছোট।নিশির আগে সম্ভব নয়।”
অনিমার চোখমুখ শুকিয়ে ফেললো।বাকিরা অণিমার অভিনয়ে পারছে না শব্দ করে হেসে ফেলতে।নিয়াজ এতক্ষণে শ্বাস নিচ্ছে যেনো।অণিমা যে তাকে জালানোর জন্য ওত রঙ্গ করে কথাটা বলেছে তা সে এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে।মুখটা হাসি-হাসি হয়ে গেছে তার।অণিমা মুখ যথাসম্ভব সিরিয়াস রাখলো।দু হাত টেবিলে রেখে ভারি গলায় বললো,”ইয়ে মানে ইশান।নূরিও নয়।”
ইশান চট করে তাকালো একবার অণিমার দিকে।তারপর বাকি সবার দিকে চোখ বুলালো।সাজিদ ইশানের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো।অনিমা চেয়ারটা এগিয়ে নিয়ে আরেকটু কাছে গিয়ে বসলো ইশানের।গলা নামিয়ে অবলিলায় মিথ্যাটা বলে বসলো,”আমার ভাই এর জন্য আমি তিতির এর কথা ভাবছিলাম।”
“হোয়াট ননসেন্স। “ইশান একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠলো।
অণিমা দু হাতে থামানোর ভঙ্গিতে বললো,” শেষ করতে দিবি তো আগে নাকি।”
“যেখানে নিশি,নূরির বিয়ের কথা ভাবছি না,সেখানে তিতির তো বাচ্চা।”
“কোথায় বাচ্চা।বিশ বছরের মেয়েকে বাচ্চা বলা যায়?ওর বয়সে গ্রামের বাকিদের দেখ,বিয়ে করে দু তিন বাচ্চার মা হয়ে বসে আছে।”
“স্টপ ইট নিয়াজ।”ইশান এর ধমকে চুপ করে গেলো নিয়াজ।অণিমার দিকে তাকালো।একবার।অনিমা মাথা নেড়ে চুপ করতে বললো।
“দেখ ইশান,তিতির বাচ্চা মানলাম।বয়স হলেও বাচ্চামো আছেই।কিন্তু আমার ভাই টা তো ম্যায়চুয়র।এটাই তো পারফেক্ট। আসলে আমার ফোনে ছবি দেখেছিলো তো।ওর দারুণ পছন্দ হয়েছে তিতির কে।জাস্ট পাগল করে ফেললো আমাকে।”
“তো পাগলই হতে বল তাকে।সম্ভব নয়।”
“কেনো সম্ভব নয়।শুধু বয়স নাকি অন্য কিছু।”
“কি অন্য কিছু।বয়সই।ও ছোট এখনো।তাছাড়া ওর বড় বাড়িতো কতজন রয়েছে দেখেছিস।”
“তো আমি কখন বললাম যে ওকে এখনই বিয়ে করে নিয়ে যাবে।জাস্ট ঠিকঠাক,আই মিন এনগেজমেন্ট করিয়ে।”
“পসিবল না।নিষেধ করে দে।তোরাও এসব চিন্তা ভুলে যা।”
অণিমা বাকা হাসলো।”বেশ তুই যা বলার বল।আমি দিদার সাথে আর আংকেল এর সাথে কথা বলবো।আমার ভাই খুব সিরিয়াস।আর একদম পারফেক্ট, তোদের ফ্যামিলির সাথেও,তিতিরের সাথে তো অবশ্যই।আমার বিশ্বাস না করবেন না তারা।”
ইশান তপ্ত চোখে তাকালো অণিমার দিকে।বাকিরা ভয় পেলো খানিকটা।অনিমার মধ্যে ভয়ের ছিটেফোঁটা দেখতে পাওয়া গেলো না যদিও।সে আপন মনে কাটলেট চিবুতে লাগলো।
“দেখ অনি,না করলাম তো আমি নাকি।”
“কি সমস্যা তোর ইশান।বারবার তো বলছি তোদের এতো সমস্যা হলে ওকে তুলে নিয়ে যেত নিষেধ করবো।জাস্ট কাবিন টা করিয়ে রাখবে,নিশি,নূরির বিয়ের পর ওকে তুলে নেবে।সমস্যা তো দেখছি না।”
“আমি দেখছি,অনেক সমস্যা। এই বিয়ে টিয়ে সম্ভব নয় এখন।”
ইশান শব্দ করে চেয়ার ঠেলে উঠলো।মুখটা কেমন লাল হয়ে আছে।রেগে গেছে বোঝা যাছে।অণিমা এটাই চাচ্ছিলো।মনে মনে খুব হাসলো।ইশান ঘুরে চলে যেতেই টেনে ধরলো সবাই।
“রাগ করছিস কেনো ভাই।আচ্ছা যা বলবো না আর তোর বোনের বিয়ের কথা।আমার ভাইকে চুপচাপ অপেক্ষা করতে বলবো আরও ১০ বছর।চলবে?”
ইশান চোখ রাঙিয়ে তাকালো আবার অণিমার দিকে।তবে চলে গেলো না।বসলো চেয়ারে।
হাসি ঠাট্টার পাট চুকলো যখন নাইম ব্যাস্ত ভঙ্গিতে চোখেমুখে অবিশ্বাস এর একরাশ ছাপ নিয়ে কারোর সাথে ফোনে কথা বলে এসে বসলো আবার।নিয়াজ কাঁধে হাত রাখলো। “কি হয়েছে। কে কল করেছিলো।”
“তেমন কেউ না।হ্যারে ইশান রুষা আর কল করেছিলো তোকে?”
ইশান দু দিকে মাথা নাড়লো।তারমানে করেনি।নাইম চায়ে চুমুক দিলো।উদাস গলায় বললো,”তাহলে করবে হয়তো।”
সবাই মুখের দিকে তাকালো নাইমের।
“এটা কেনো মনে হচ্ছে তোর?”সাজিদের কথায় নির্বিকার চোখে তাকালো নাইম।
“ জানিনা।”
বাকিরা কিছু টের পেলো হয়তো।কথা বাড়ালো না আর।তবে অনিমাই আবার কাঁধে হাত রাখলো ইশানের। “দেখ ইশান।রুষার বিষয়টা কিন্তু পাস্ট।কিছু বিষয় আছে তুই হয়তো জানতে ইন্টারেস্ট নোস।তাই আমরাও জানাতে চাইনা।ইভেন তুই জানতে চাইলেও বলবো দরকার নেই।”
“কি বলতে চাচ্ছিস বুঝতে পারছি না।ক্লিয়ারলি বল।”
অনিমা কিয়ৎপরিমাণ চুপ থাকলো।চোখ এদিকসেদিক সবার দিকে তাকালো।সবাই অনেকটা অসহায় মুখেই তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।কিছু একটা আছে যেটা সবাই জানে,ইশান জানেন শুধু। ইশান সেটা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে।
“তেমন কিছু নয়।শুধু বলবো সামনে যা হবে সেদিকেই থাকবি কেমন।পিছনে ফিরতে চাবি না কিন্তু। “
ইশান হাসলো।আয়েশী ভঙ্গিতে হেলান দিলো।”ইশান আরশাদ কখনো অতীত নিয়ে মাথা ঘামায় না।তার লাইফে এমন কোনো মিসটেক নেই যার জন্য তার পিছনে হাঁটতে হবে। ডোন্ট ওয়ারি।”
অনিমা মলিন হাসলো।মনের মধ্যে অন্য একটা কথাও ভেসে উঠছে।শুধু তার নয়।এখানে উপস্থিত সবারই।ইশান বাদে।ইশান টা বড্ড রাগী।সে জানতে পারলে কিভাবে রিঅ্যাক্ট করে কে জানে।তাছাড়া কি দরকার খারাপ মানুষ এর করা খারাপ কাজের খারাপ স্মৃতি বয়ে বেড়ানো।রুষা কে ইশান এর কাছে ঘেষতে দেবে না।কিছুতেই না।অনিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকালো ইশানের দিকে।সবার সাথে কি সুন্দর গল্প করছে ছেলেটা।বড্ড মায়া হলো তার।ইশানটার জন্য সে আর সাজিদ আজ একসাথে। না হলে এ জীবনে ভালোবাসার মানুষ টাকে কাছে পাওয়ার,নিজের করে পাওয়ার ভাগ্য তার হতো না।ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে এসেছে আজীবন ইশান টা।শুধু তার জন্য নয়।তাদের সবার জন্য। তিতির টা লক্ষী একটা মেয়ে, রুষার থেকে পিছু ছাড়াতে যদি তিতির এর সাথে জোর করে হলেও দিদা ইশানের বিয়ে দেয়।সে কোনো ক্ষতিই দেখছে না।এবং কাজটা দ্রুত করে ফেলতে হবে।কারণ বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যাবাদী দের ছলনা ভয়ংকর।খুব ভয়ংকর।
“নয়ন ভাই।”
নয়ন গার্ডেনে বসে অফিসের কিছু ফাইল পত্র দেখছিলো।সে আর ইশান দুজনেই ঠিক করেছে নিজেদের বিজনেস এই জয়েন করবে।বাবা চাচাদের বয়স হয়েছে,তারা একা আর কতদিন সামলাবে সব।মাস্টার্স এর রেজাল্ট বেড়িয়ে গেছে।আর যেহেতু ইশান নিজেই চাইছে জয়েন করতে,তার আর একা একা প্রেশার লাগবে না।দু ভাই মিলে ঠিক সামলে নেবে।মেয়েলি গলার আওয়াজে পিছন ফিরে তাকালো নয়ন।তমা দাড়িয়ে আছে।হাতে টিফিন বক্স।নয়ন সহাস্যে ডাকলো তাকে।
“কিরে টমটম। এদিকে আয়।”
তমা গাল ফুলালো।কতো সুন্দর তার নামটা।তাছাড়া আরও কত্তো নামেই তো ডাকা যায়।জান,আত্মা,কলিজা।তা নয়।টমটম।এটা কেমন কথা।
“আমার একটা সুন্দর নাম আছে নয়ন ভাই।নাম ধরে ডাকবেন। উল্টাপাল্টা নামে ডাকবেন না প্লিজ।”
নয়ন হাসলো।”কি জানি নাম তোর?”
“নুসাইবা তমা”।
” ইশশ এটা কোনো নাম?এর থেকে টমটম।দেখ কি সুন্দর নাম।”
তমার মুখটা পানসে করে রইলো।গটগট করে এসে বক্স টা বাড়িয়ে ধরলো নয়নের দিকে।নয়ন মাথা তুলে তাকালো।বাড়ানো বাটিটা হাতে নিলো।
“কি এটায়?”
“খুলে দেখুন।”
“বোমটোম নেই তো?এখনই পালাবি না তো আবার।”. “ “থাকলেও পালাতাম না।”
“মরার সখ বুঝি?”
“আপনার সাথে।”
“মানে।”
তমা এবার মুখটা কাচুমাচু করে ফেললো।মুখ ফসকে কিসব বলে ফেলছিলো না।ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বললো,”কিছু না।মজা করলাম।খুলুন না বাটিটা।মা গাজরের হালুয়া বানিয়েছে।আপনার পছন্দ। তাই পাঠিয়ে দিলেন।”
নয়নের চোখ চকচক করে উঠলো।গাজরের হালুয়া এ বাড়িতে একমাত্র তারই পছন্দ। আর তমার মায়ের হাতের হালুয়া জাস্ট অমৃত। সেই ছোট্টবেলা থেকে নয়নের পছন্দ। আজ অবধি যতবার সেটা বানায় তার জন্য নিয়মমতো পাঠিয় দেয়।নয়ন মুখে তুলে নেয় এক চামুচ।আবেশে চোখ বুঝে নেয়।
“চাচির হাতের রান্না।মাশাল্লাহ। “
তমা মুগ্ধ হয়ে দেখে মানুষ টার খাওয়া।বসে বেতের চেয়ারটায়।নয়ন একমনে খেয়েই যাচ্ছে।তমা মাথায় হাত রেখে ঘোর লাগা চোখে দেখে যাচ্ছে।ইশশ মানুষ টা কবে বুঝবে তার মনের কথা।সেই পুচকে কাল থেকে ঘুরঘুর করে পিছন পিছন।একটুও কি টের পায়না।লোকটা মহা বোকা।সে নাকি বোন।কে বলেছে সবাইকে বোন হতে হয়। বোনের নজরে কেনো দেখতে হবে।অন্য নজরেও তো দেখা যায় নাকি।
তমার হঠাৎ চোখ গেলো দোতলার বারান্দায়। রেলিং এর দু হাত বর দিয়ে বাঁকা হেসো কুটিকুটি হচ্ছে তিতির।তমার তাকাতেই হাত দিয়ে দুজনকে ইশারে করে চোখ মারলো সে।তমা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো।ফট করে উঠে পরলো।নয়ন মাথা তুললো তার দিকে।
“কি রে।বস।বাটিটা নিয়েই যা একেবারে।”
“আপনি খান নয়ন ভাই।আমি একটু তিতির এর কাছ থেকে ঘুরে আসি।যাওয়ার সময় নিয়ে যাবো।”
বলেই তমা আর দেরি করে না।বাড়ির ভিতরে চলে আসে।তিতির এর রুমে আসতেই তিতির তাকে দেখে খিলখিল করে হেসে ফেলে।
“তা ভাবিইইইি।ননদের কথা ভুলে গেলে চলবে?”
তমা ছুটে এসে মুখ চেপে ধরলো তিতির এর।হায় খোদা মেয়েটা বলে কি।বাড়ি ভর্তি মানুষ গিজগিজ করে সারাক্ষণ। কখন কার কানে চলে যায়।আল্লাহ মালুম।সর্বনাশ হয়ে যাবে তখন।
“চুপ কর বোন।কেউ শুনলে কেলেংকারী। “
তিতির হাত ছারিয়ে নিয়ে লাফিয়ে উঠলো বিছানায়।হাতের সাহায্য মাইক বানানোর ভঙ্গি করে ধরলো মুখের সামনে।,”শোনো শোনো শোনো।এ বাড়ির ছোট বউ এই মূহুর্তে…
কথাটা শেষ হতে দিলো না তমা।আবার গিয়ে টেনে ধরলো তিতিরকে বিছানায় একপ্রকার মারামারি লেগে গেলো দুজনের।হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে দুজনের।হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুলো দুজন।
“আমার ভাইটাকে বলে দিবি কবে?কতদিন আর লুকিয়ে লুকিয়ে চাচির কথা বলে নিজে রেঁধে খাওয়াবি।”
“তোর ভাইটা একটা হাঁদারাম। কিচ্ছু বোঝেনা।”
সাঁঝের মায়া পর্ব ১২
“খবরদার আআমার ভাইকে নিয়ে উল্টোপাল্টা বকবি না।বউ হতে চাও,আবার বিয়ের আগেই ননদের কাছে বরের নিন্দা করো।এটা তো ঠিক নয়।”.
তিতির এর কপট হুমকি তে তমাও হেসে ফেললো।
“আর কতোদিন এমন করে থাকবো বল তো ননদীনি।”
“যতদিন তুমি মুখ ফুটিয়া ভালোবাসি না বলো।”
