Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৮৩

খান সাহেব পর্ব ৮৩

খান সাহেব পর্ব ৮৩
সুমাইয়া জাহান

সুমু চোখ মেলে তাকাল। ঘুম ভেঙে যাওয়ার ঠিক পরের সেই কিছু সেকেন্ড—যখন মানুষ বুঝতে পারে না স্বপ্ন দেখছিল নাকি দুঃস্বপ্ন—সেই অবস্থায় সে একবার চারপাশে তাকাল। ঘরটা অদ্ভুত নীরব। শেরাজের বালিশটা ঠাণ্ডা। ঘড়ির টিকটিক শব্দটা কেমন যেন বেশি জোরে শোনা যাচ্ছে আজ। তার বুকটা হালকা ধক করে উঠল। মাথা একটু ঘুরছিল, তবু সে ধীরে উঠে বসল। চোখ তখনো আধঘুম-আধজাগা, কিন্তু একটা অদ্ভুত টান তাকে টেবিলের দিকে তাকাতে বাধ্য করল। টেবিলের উপর ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ। ঠিক এমনভাবে রাখা, যেন রেখে যাওয়া মানুষটি জানত, এটাই সুমুর প্রথম দৃষ্টি হবে। হৃদস্পন্দনটা তীব্র হয়ে উঠল। সুমু ধীরে হাত বাড়াল। আঙুল ছুঁতেই মনে হলো কাগজটা যেন বিপজ্জনক। সে চিঠিটা খুলল। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর একটা দম আটকে যাওয়া নিঃশ্বাস। চোখের পাতা হঠাৎ ভারী হয়ে ঝাপসা হয়ে গেল। গলার ভেতর একটা ব্যথা জমে উঠছে।

সে পড়তে লাগল, প্রতিটা লাইন যেন বুকের ওপর পাথর ফেলে দিচ্ছে। শেরাজের ভাঙাচোরা, শান্ত, নরম অথচ শেষ-সিদ্ধান্তের ভাষা তাকে ভেঙে দিতে লাগল। চিঠির মাঝের লাইনে এসে সুমুর হাত কেঁপে উঠল। যেখানে সিমরান আর শেরানের নাম—সেই জায়গায় তার চোখ থেকে প্রথম অশ্রু পড়ল। কাগজের ওপর গোল গোল দাগ ছড়িয়ে যেতে লাগল। শেষ লাইনে এসে সুমুর শ্বাস যেন আর ঠিকমতো উঠানামাই করছিল না। এক মুহূর্তের জন্য সে চিঠিটা চোখে চেপে ধরল। তারপর শক্ত করে ভাঁজ করল। তার চোখে এখন আর কান্না নেই, আছে দৃঢ়তা। এমন দৃঢ়তা, যা কোনো সম্পর্কের শেষকে মেনে নেয় না।
সে বেডের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিল। আঙুল কাঁপছে, কিন্তু ইচ্ছেটা দৃঢ়। এবার আর কান্না নয়, এবার খুঁজে বের করতে হবে। সে দ্রুত একটা নাম ডায়াল করল। ডায়াল বাটন চাপতেই সুমু নিঃশ্বাস চেপে ধরে অপেক্ষা করল। রিং বাজছে, একবার, দুইবার, তিনবার। এরপর লাইনটা রিসিভ হলো। রাতের নীরবতা যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। সুমু ফোনটা কানে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে খুব ধীরে, খুব স্পষ্ট গলায় বলল,

“সবকিছু রেডি?”
ওপাশে কারও নিঃশ্বাস শোনা গেল খুব ক্ষীণ, খুব বিচলিত, কিন্তু কথাগুলো ঠিক বোঝা গেল না। কেউ যেন একটু থমকে গেল—হয়তো ভয়, হয়তো দ্বিধা, হয়তো সুমুর এই হঠাৎ বদলে যাওয়া সুরে কেউ অবাক। সুমুর চোখে তখন অশ্রু নেই—বরং এক ভয়ংকর শান্ত অন্ধকার জমে উঠছে। সে কড়া, নিস্তরঙ্গ স্বরে বলল,
“হোক আমার বিপদ। আমি এবার এই ধ্বংসের খেলার শেষ টানতে চাই। অনেক হয়েছে, আর না। আপনাকে যেটা বলেছি, সেটা করুন। ইটস মাই অর্ডার।”
সে অপরপ্রান্তের মানুষটিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আরও নিচু স্বরে বলল,
“আমি আসছি।”
ফোনটা কেটে দিল সে। একটা নিঃশ্বাস নিল, যেটা ঠিক শ্বাস নয়, বরং দুঃসাহস জুগিয়ে নিল। কলটা কেটে সঙ্গে সঙ্গেই হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকল। স্ক্রিনে “গার্লস স্কোয়াড” নামের গ্রুপটা জ্বলজ্বল করছে। সে এক সেকেন্ডও দেরি করল না—গ্রুপ ভয়েস কল দিল। রিং হাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন, দু’জন, তারপর তিনজনের কল রিসিভের টোন একসাথে ভেসে এলো।

“হ্যালো সুমু? কি হয়েছে? এই টাইমে কল?”
সুমু শক্ত গলা বলল,
“ইমিডিয়েটলি আমার রুমে এসো।”
আর একটাও শব্দের ব্যাখ্যা নয়, একটাও আবেগ নয়, শুধু কঠিন নির্দেশ। সে মুহূর্তেই কল কেটে দিল। ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। পাঁচ মিনিটও হলো না, দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো। প্রথমে ইনায়া, সাথে ইশিতা, আর পেছনে নাতাশা। সকলের ঘুমে এলোমেলো চুল, মুখে উদ্বিগ্ন টান নিয়ে রুমে ঢুকে এলো। ইনায়া রুমে ঢুকেই বলল,
“সুমু, কী হয়েছে? এতোরাতে ডাকলে? ভাইয়া কো…”
বাকি কথা তার গলায় আটকে গেল। ওরা দেখল সুমুকে। সুমু বেডের ওপর বসে, চুল এলোমেলো, চোখ লাল টকটকে। সুমু ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে শ্বাস নিয়ে সরাসরি ইনায়ার দিকে হাঁটল। ইনায়া ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

“কি হয়েছে সুমু? তুমি…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সুমু তার দুই হাত ধরে ফেলল।
“আমাকে এক্ষুনি একটু বেরোতে হবে।”
ইশিতা আর নাতাশা একসাথে বলল,
“বেরোতে? এখন? কেন?”
সুমু কোনো উত্তর দিল না। সে ইনায়ার হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ ভিজে আছে, কিন্তু সেখানে ভয় নেই।
“যতক্ষণ পর্যন্ত আমি ফিরে না আসব, আমার সিমরান আর শেরানের দায়িত্ব আমি তোমার হাতে দিয়ে গেলাম, ইনায়া।”
ইনায়া একদম স্থির হয়ে গেল। তার চোখ বড় হয়ে গেল।

“কি… মানে? সুমু, তুমি কোথায় যাচ্ছো? এভাবে তো…”
সুমু মাথা নাড়ল। তার গলার স্বর অতল শান্ত,
“শুধু শুনো, ওদের কাছে তুমি ওদের মা হয়ে থেকো। ওরা যেন এক সেকেন্ডের জন‍্যও না বুঝতে পারে যে, আমি ওদের কাছে নেই।”
ইনায়া চোখের জল আটকে বলল,
“সুমু, আমি ভয় পাচ্ছি। তুমি এভাবে…”
সুমু ইনায়ার হাত আলতো করে ছাড়ল। সে একবার ঘুরে বাচ্চাদের শান্ত ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাল। চোখের পলকে বুকটা যেন চূর্ণ হয়ে গেল, কিন্তু সে কান্না আটকালো। ওদের দিকে নিঃশব্দে দৃষ্টি রেখে ফিসফিস করে বলল,
“মা একটু কাজে যাচ্ছে, বাবারা। তোমরা একটুও জ্বালাবে না তোমাদের বড়আম্মুকে।”
ইনায়া, নাতাশা আর ইশিতা—তিনজনেই বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইনায়া এগিয়ে এসে সুমুর দুই হাত শক্ত করে ধরে বলল,

“সুমু… প্লিজ। তুমি এভাবে কোথাও যেতে পারো না। আমরা তোমাকে একা যেতে দেব না। যা-ই হোক, সকালের পর যেও। এখন না, প্লিজ।”
“আজ আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না, ইনায়া। আমি আজ না গেলে কাল হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
নাতাশা এগিয়ে এসে দ্রুত বলল,
“এটা কি এস.কে স‍্যারের জন‍্য, ম‍্যাম?”
সুমু কন্ঠ শক্ত করে বলল,
“আমার বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য।”
ইশিতা এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল,
“ভাইয়া কোথায় গেছে, সুমু?”
সুমু চোখ নামিয়ে হেঁয়ালি করে বলল,
“যেখানে মানুষ নিজেকে শেষ করতে যায়।”
ইশিতা ভ্রু কুঁচকালো,
“মানে?”
সুমু থতমত খেয়ে হেসে বলল,

“কিছু না! আমাকে এখন যেতে হবে। অলরেডি অনেকটা লেট হয়ে গেছে।”
সুমুর কথায় ইশিতা চুপ করে গেল। ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
“কোথায় যাবে এই সময়?”
সুমু কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু হালকা মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল—এখন প্রশ্নের সময় নয়। সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নাটা ঠিক করে আবারও ইনায়ার হাতটা দু’হাতে ধরে শক্ত করে বলল,
“যতক্ষণ পর্যন্ত আমি ফিরে না আসব, আমার সিমরান আর শেরানের দায়িত্ব তোমার হাতে।”
ইনায়ার চোখ আবারও ভিজে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। নাতাশা এগিয়ে এসে সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ম‍্যাম, আমকে অন্তত নিয়ে চলুন।”
“এই লড়াইটা আমার একার, নাতাশা। তুমি বাড়িতেই থাকো। তোমাকে এখন এখানে বেশি প্রয়োজন।”
নাতাশা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সুমু একবার বেডের কাছে গেল। সে ঘুমন্ত সিমরান আর শেরানকে প্রাণভরে আদর করল। নাতাশারা তাকিয়ে রইল তার দিকে। সুমু বেড থেকে নেমে রুমের বাহিরে পা রাখল। ইশিতা তাকে আটকানোর জন‍্য এগিয়ে আসতেই সুমু চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

পাতালপুরীর বড় হলরুমটা আজ যেন দুঃস্বপ্নে ডুবে আছে। রুমগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বড়-সড় একটা ভয়ংকর ঝড় বয়ে গেছে। বাতাসে ধোঁয়া-মিশ্রিত নোংরা গন্ধ ভাসছে। কংক্রিটের মেঝেতে রক্তের ছোপ। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিক্ষিপ্ত লাশের সারি। বড় হলরুমের মাঝখানে আরিয়ান আর রায়য়ানকে রক্তাক্ত অবস্থায় বেধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের হাতে-পায়ে দড়ি, শরীর অচল। দেখে মনে হচ্ছে, কোনমতে জানটা এখনো আছে। মাথার ওপর একটাই লাইট জ্বলছে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লাশগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে, এরা সবাই শেরাজ আর রায়য়ানের লোক। কেউ চিৎকার করছে না, কেউ শ্বাসও নিতে পারছে না। আরিয়ান চোখ বোলানো ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকাল। রায়য়ান চুপচাপ, তার ঠোঁট কাঁপছে। তাদের দুজনের চোখে কোনো ভয় নেই, যেন মৃত্যুটাকেই আজ আপন করে নিতে চাইছে তারা।
চেয়ারের সামনে মৃদু আলোর নিচে শেরাজ বসে আছে পায়ের ওপর পা তুলে। রক্ত তার হাতে, পায়ের কিছু অংশে লেগে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, সে নিজেও ক্ষতবিক্ষত। তবুও সে চুপচাপ আর খুব শান্ত। আরিয়ান আর রায়য়ানকে বেঁধে রাখা হয়েছে, কিন্তু সেই বেঁধে থাকার মধ্যেও তাদের দু’জনের রাগ যেন শ্বাসে শ্বাসে জ্বলছে। আরিয়ান প্রথমে থুতু ফেলে বলল,

“কীসের রাজা সেজে বসে আছিস? নিজের রক্তে ভিজে থাকা অমানুষ একটা। যা করবি তাড়াতাড়ি কর।”
শেরাজ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
“তুই মুখটা বন্ধ রাখ, আরিয়ান। তোকে আমি বাঁচিয়ে রেখেছি শুধু দেখে নিতে, যে তুই কতটা কুকুরের মতো চিৎকার করিস। তোর এসব বাজে কথা শোনার জন‍্য তোকে এখনো বাঁচিয়ে রাখিনি।”
রায়য়ান তীব্র গলায় গর্জে উঠল,
“আমরা আজ স্বেচ্ছায় তোর হাত থেকে মৃত্যুকে গ্রহণ করছি, তবুও কী সেটা তোর সহ্য হচ্ছে না? এখনো বাঁচিয়ে রেখেছিস কেন আমাদের? তাড়াতাড়ি মেরে, চলে যা এখান থেকে।”
শেরাজ হেসে বলল,
“তোদের দেখছি মরার খুব তাড়া? এতো মার খাবার পরেও তোদের গলায় এতো জোর? একটু ওয়েট কর! এভাবে তোদের মারব নাকি? তোদের তো মারব তারপাতে তারপাতে। তোদের দুজনের চোখে একটা অপূর্ণতার জন‍্য ছটফটানি দেখে, তারপর তোদের মারব।”
রায়য়ান গর্জে উঠল,

“বাজে কথা বলিস না।”
শেরাজ মুচকি হেসে রায়য়ানের মুখের কাছে ঝুঁকে গেল।
“বাজে কথা না। তোরা এতো তাড়াতাড়ি মরতে চাইছিস কেন বল তো?”
আরিয়ানের মুখের রক্ত জমাট বাঁধা, তবুও সে তীব্র গলায় গালি ছুড়ল,
“সিবাল! সেও এখন আর তোকে চায় না, এস.কে। তুই ভাবিস, তুই ওকে ধরে রাখতে পারবি? আর বেশিদিন নয়। তুইও ওকে হারাবি।”
শেরাজ আরিয়ানের মুখে আঘাত করল। তার হাতের আঘাতে আরিয়ান চেয়ার নিয়ে উল্টে পড়ে মেঝের সাথে মাথার আঘাত পেল। চেয়ারের সাথে বাঁধা অবস্থায় সে কেঁপে উঠল। রক্ত ঝরতে লাগল কানের পাশ দিয়ে। শেরাজ খুব ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“সুইটহার্টকে নিয়ে মুখ খুলবি না। তার নাম তোর নোংরা জবান দিয়ে আর উচ্চারণ করবি না।”
আরিয়ান মাটিতে পড়ে ছটফট করছে, রক্তে ভেজা মুখ ওপরের দিকে তুলে দাঁত চেপে হাহাকারের মতো করে হাসল।

“এ…এস.কে, তুই যতই আমাদের মার, সত্যিটা বদলাবে না। তুই ওকে হারাবিই। আর এটাই তোর নিয়তি।”
তার হাসিতে যন্ত্রণার শব্দ মিশে। রায়য়ান বাঁধা হাত নড়াতে না পেরে শরীরটা জোরে ঝাঁকাল। তার চোখ জ্বলছে আগুনের মতো।
“তুই জানিস এস.কে, ও আমাদের দু’জনকেই ঘৃণা করে। তুই আমাদের যতটা ঘৃণা করিস, তার থেকেও বেশি ঘৃণা ও আমাদের করে। কিন্তু তোর মতো সাইকোর হাতে থাকাকেও ও মৃত্যু মনে করে।”
শেরাজ রায়য়ানের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখে রক্তের রেখা, নিঃশ্বাস ভারী। সে খুব ধীরে রায়য়ানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। আলোটা শেরাজের চোখে পড়তেই তার মুখটা যেন আরও অমানুষিক দেখাল।
“সুমুকে নিয়ে তোরা এতো কথা বলিস, কারণ তোরা এখন মরার আগে একটা জিনিস নিশ্চিত হতে চাইছিস, তাই না?”
রায়য়ান দাঁত কিঁচিয়ে বলল,
“কি?”
শেরাজ মাথা সামান্য কাত করে বলল,
“সে কাকে ভালোবাসে।”

রায়য়ান থমকে গেল। আরিয়ান মেঝেতে পড়ে শ্বাস নিতে নিতে রাগে ফুঁসতে লাগল। শেরাজ উঠে দাঁড়াল। তার জুতোর তলায় রক্ত লেগে আছে। সে দুইজনের মাঝখানে থামল। কর্কশ স্বরে বলল,
“আমি জানোয়ার হলেও, সুমু আমাকেই ভালোবাসে। দরকার পড়লে ও সারাজীবন সঙ্গীহীন থাকবে, তবুও আমার জায়গায় অন‍্যকোনো পুরুষকে বসাবে না। আর তোরা জানিস, এটাই আমার সবথেকে বড় পাওয়া। আর তাছাড়া, সুমু আমার চোখের আড়াল দিয়ে কোথায় যাবে? কোথাও যেতে পারবে না ও। ”
রায়য়ান ফোঁস করে উঠল,
“তুই তাকে বন্দী করে রাখিস, এটাকে ভালোবাসা বলে? ওকে তোকে ছাড়াই বাঁচতে দে।”
শেরাজ হাসল। ভয়ংকর, নীরব, রক্তমাখা একটা হাসি।
“বাঁচবে। কিন্তু আমার মতো করে।”
পাতালপুরীর ভারী দরজা ধাম করে খুলে গেল। শেরাজ পেছনে তাকাল। ধুলোর ঝড়ের মতো এক ছায়া ভেতরে ঢুকল। পাতালপুরীর লিভিং রুম থেকে ভেসে এলো একটা ডাক,
“খান সাহেব!”
ধ্বনিটা পুরো পাতালপুরীতে কেঁপে উঠল। রায়য়ান চেয়ারে বাঁধা থেকেও প্রায় লাফ দিয়ে উঠল। আরিয়ানের চোখ ভয়ংকরভাবে বড় হয়ে গেল। দুজনেই যেন সুমুকে শেষবারের জন‍্য একপলক দেখার আশায় মরিয়া হয়ে উঠল। শেরাজের সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার মুখে সেই শান্ত, ভীতিকর হাসিটা আবার ফুটে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল,
“এখন শুরু হবে আসল খেলা।”

ঘরটা ঠাণ্ডা। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে গন্ধটা যেন আজ একটু বেশি তীব্র। আলিয়া চুপচাপ একপাশে বসে আছেন। হাতে কাগজ-কলম, চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু স্থির। সুমু নিচের দিকে তাকিয়ে, হাত দুটো শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। কারাগারের আলো তার মুখে পড়ে আরও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। আলিয়া ধীরে বললেন,
“কাল তো তোমার মুক্তি, সুমু।”
সুমুর পলক কাঁপল। সে খুব ধীরে মুখ তুলল।
“হ্যাঁ… কাল!”
আলিয়া তার মুখ লক্ষ্য করছিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“এতোসব ঝড়ের পর তুমি বেড়িয়ে যাবে। কাল তুমি স্বাধীন। স্বস্তি লাগছে?”
সুমু হালকা হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু সেটা হাসি হলো না, সেটা যেন দুঃখ জমে থাকা একটা বেদনা প্রকাশের মাধ্যম।
“স্বাধীনতা কখনো কখনো কারাগারের থেকেও ভয়ংকর হয়, ম্যাম।”
আলিয়া ভ্রু কুঁচকালেন।

“কেন?”
সুমু ধীরে চোখ বন্ধ করল। পাতালপুরীর সেই রক্ত-মিশ্রিত মেঝে, বাঁধা রায়য়ান-আরিয়ান, আর রক্তমাখা শেরাজের মুখ—সবকিছু তার মাথায় আবার জ্বলে উঠেছে।
“কারাগার অন্তত মানুষকে আটকে রাখে। কিন্তু এখন বাইরে… বাইরে এমন কেউ নেই যে আমাকে আটকে রাখবে সেভাবে, যেভাবে সে রাখত।”
আলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“সে মানে? শেরাজ খান?”
সুমু চোখ খুলল। চোখদুটো লাল, কিন্তু সেখানে অশ্রু নেই—বরং একটা শুকিয়ে যাওয়া শূন্যতা।
“তাকে হারিয়ে পুরো পৃথিবীটাই আমার কাছে কারাগার হয়ে গেছে। এখন এই চার দেওয়াল হোক বা খোলা আকাশ— দুটোই আমার কাছে কারাগার।”
আলিয়া টেবিলে কলমটা টোকা দিতে দিতে বললেন,
“তুমিই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে সারেন্ডার করার। নিজেকে আইনের কাছে তুলে দেওয়ার। নিজের জন্য নয়—তোমার বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য।”
সুমুর ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“ওদের কাছে যদি আমি ফিরি, ওরা কি আমাকে সত্যি মেনে নিবে, ম্যাম?”
আলিয়া একটু ঝুঁকে এসে গলায় বললেন,
“তোমার সিমরান আর শেরান আজও প্রতিদিন দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, ওদের মা ফিরে আসবে বলে।”
সুমু চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কিন্তু যার কাছে আমি ফিরে যেতে চাই, সে তো নেই।”
“তুমি সত্যি জানো, সে নেই?
সুমু মাথা নাড়ল। চোখ দুটো হঠাৎ ভিজে উঠল।
“যেদিন পাতালপুরীর দরজা খুলে আমি তাকে ডাকলাম, ‘খান সাহেব’, সে সেদিন ফিরে তাকাল না আমার দিকে। ওই একটা মুহূর্তই আমাকে শেষ করে দিয়েছে, ম্যাম।”
আলিয়া সোজা হয়ে বসে বললেন,
“কষ্টটাকে জমিয়ে রেখো না। আজ অন্তত একটু কাঁদো। নিজের সমস্ত কষ্টকে এই কারাগারের মধ্যেই ফেলে রেখে যাও। তোমার মুক্তি কাল দুপুরে। এরপর তুমিই সিদ্ধান্ত নেবে—বাড়ি যাবে, নাকি নিজেকে খুঁজতে বের হবে। তার আগে নিজেকে প্রস্তুত কর।”
সুমু মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। আঙুলগুলো শক্ত করে পাকিয়ে ধরেছে। আলিয়া আবারও বললেন,
“কাল দুপুরে তুমি মুক্তি পাবে। এবার সব শেষ হবে, সুমু।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কিছুই শেষ হবে না, ম্যাম। যাকে নিয়ে বেঁচেছিলাম—সে তো আর নেই আমার কাছে।”
আলিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি একটু কাশি দিয়ে নিজের গলা পরিষ্কার করলেন।
“মাঝে মাঝে কেউ না থাকলেও, মানুষ বেঁচে থাকে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি আর আলো নিয়ে।”
সুমু তিক্ত হেসে উত্তর দিল,
“শেরাজ খান কোনো আলো রেখে যায়নি, ম্যাম। শুধু ভয় রেখে গিয়েছে। শেষদিনেও সে আমার দিকে তাকাল না। আমি ডাকলাম ‘খান সাহেব’, কিন্তু সে থামল না। তার হাতে সেদিন রক্ত ছিল, আর তার চোখে ছিল—বিদায়।”
আলিয়া চোখ বন্ধ করলেন এক মুহূর্তের জন‍্য। তিনি জানেন—এই সেই রক্ত, সেই চোখ, সেই বিদায়ের মুহূর্ত এবং বাস্তবের নির্মম শেষ পরিনীতি।
“সুমু,” তিনি নিচু গলায় বললেন, “তুমি অনেক শক্ত। তোমার মতো শক্ত মানুষ খুব কম দেখেছি। কিন্তু তুমিও মানুষ—তুমি ভেঙে পড়তে পারো। কাঁদতে পারো। নিজেকে হালকা করো। অন্যথায় বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোটা কঠিন হবে।”

খান সাহেব পর্ব ৮২ (২)

“আমি কাঁদতে পারছি না, ম্যাম। যত কাঁদা উচিত ছিল, সব কেঁদে ফেলেছি তার কাঁধে মাথা রেখে। এখন মনে হয়—আমার ভেতরে আর পানি নেই। শুধু পুড়ে যাওয়া ছাই আছে।”
আলিয়া নরম গলায় বললেন,
“তোমার সিমরান আর শেরান তোমার অপেক্ষায়। তারা তোমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত সেই দুটো নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচতে হবে তোমাকে।”
সুমু শুনল আলিয়ার কথা। সে মাথা নিচু করল। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক রহস্যময় হাসি, যেন সে অনেক কিছু নিজের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে লুকিয়ে রেখেছে। যেগুলোর হাজার চেষ্টা করলেও কেউ তার মধ্যে থেকে বের করতে পারবে না।

খান সাহেব পর্ব ৮৩ (২)