Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৫

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৫

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৫
রানী আমিনা

আনাবিয়ার বিক্ষুব্ধ চিৎকার আর ভাঙচুরের প্রচন্ড আওয়াজে মুহুর্মুহু কেঁপে উঠছে রয়্যাল ফ্লোর! তছনছ করে ফেলেছে সে মীরের কামরার সমস্ত আসবাব! তাতেও ক্রোধ প্রশমিত না হওয়ায় এখন নিজের কামরাটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে নেমে পড়েছে। সমস্ত মেঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মীরের শখের মুরানো গ্লাসের রঙচঙা শোপিস গুলো, তার শখের পেপারওয়েটটি কয়েক খন্ডে বিভক্ত, টেবিলের ওপর থাকা কাগজপত্র গুলো সবই ভূলুণ্ঠিত, ইবোনির টেবলটির অবস্থাও করুণ, মধ্যিখান থেকে একাংশ গায়েব করে ফেলেছে সে হাতের একটি আঘাতে। শুভ্র আঙুলে রক্ত জমেছে তাতে।

তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ক্রোধে স্তব্ধ সম্পুর্ন প্রাসাদ, কোথাও কোনো টু শব্দটি হচ্ছে না৷ ফিলোমেলা আর মহসিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে বারান্দায়, আনাবিয়ার ক্রোধের দাবানল শীতল হওয়ার অপেক্ষায়।
ভেতরে আনাবিয়া নিজের সমস্ত পছন্দের পোশাকগুলো দুহাতে টেনে ছিড়ে, ফালাফালা করে অবশেষে দাঁড়াল স্থীর। শ্বাস পড়ছে তার হিংস্র অজগরটির মতন। রাগে, ক্ষোভে লাল হয়ে আছে চোখ জোড়া, পানি জমেছে তাতে! দুহাত শক্ত মুঠিতে ধরে রাখা, নখগুলো বিঁধছে হাতের তলায়, তবুও ক্ষান্ত দিচ্ছেনা সে৷
ধুপধাপ পা ফেলে এবার এগোল বিছানার নিকট, সাইড টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোন তুলে ডায়াল করল মীরের নম্বর। রিং হলনা, বন্ধ দেখাল আবারও। আচমকা ক্রোধে চিৎকার দিয়ে সজোরে আছাড় মারল সেটি মার্বেলের মেঝেতে, মুহুর্তেই শতটুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল যান্ত্রিক বস্তুটি।
ফিলোমেলা আর মহসিন চোখাচোখি করল তখনি। মহসিন ফিসফিসিয়ে বলল,

“শেহজাদীর দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে, কি করব এখন?”
“যেচে সবসময় বাঘের খাচায় কেন ঢুকতে চান আপনি, মহসিন চাচা?”
“শেহজাদী এক বেলা খাবার না খেলে কৈফিয়ত তো হিজ ম্যাজেস্টিকে দিতে হবে! এমনিতেই সকালেরটা গেছেগা, এখন দুপুরেরটাও যদি যায় তবে…..”
“আমি আর এই প্রাসাদেই থাকবনা! এবার সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাব জঙ্গলে, তারপর যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব! এমন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ নিয়ে আমি আর চলতে পারবনা চাচা!”
নাঁকি কান্নায় বলল ফিলোমেলা। মহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাতে, ফিলোমেলা পালিয়ে ঠিক কোনদিকে যাবে ভাবতে রইল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, মেয়েটিকে একদিন শিরো মিদোরির আসল চেহারাটা দেখিয়ে দেওয়া দরকার।

মৃদু শব্দে আনবিয়ার ঘুম ভাঙল, বেলা পড়ে গেছে ইতোমধ্যে, সূর্য ডুবি ডুবি। ভাঙচুর শেষে ক্লান্ত হয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানেনি। কামরায় অবশ্য ভাঙচুরের কোনো চিহ্ন নেই, ঝকঝক তকতক করছে চতুর্দিক।
আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াতেই মাথার ভেতর চক্কর দিয়ে উঠল ওর, টাল সামলাতে অক্ষম হয়ে তৎক্ষনাৎ বসে পড়ল আবার। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা, সকাল থেকে কিচ্ছুটি মুখে তোলেনি সে, পানি পর্যন্ত নয়। মাথা চেপে ধরে রইল কিছুক্ষণ।
দরজায় মৃদু করাঘাত পড়ল এমন সময়ে, আনাবিয়া বলে উঠল,
“এসো।”
দরজা ঠেলে ভেতরে এলো ফিলোমেলা, ছোট ছোট পা ফেলে সতর্কতার সাথে এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,
“শেহজাদী, আপনার খাবার তৈরি করব?”
প্রতিউত্তরে আনাবিয়া বলনা কিছুই, চোখে আঁধার দেখছে সে। শরীরটা হঠাৎ দুর্বল লাগছে প্রচন্ড। নিজের প্রতি কি সে খুব অবহেলা করে ফেলেছে?
আনাবিয়াকে এভাবে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গেলো ফিলোমেলা, চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“শেহজাদী, ঠিক আছেন আপনি?”
“ভালো লাগছেনা ফিলো, আমি আরেকটু ঘুমোবো।”
“শেহজাদী, সন্ধ্যা হয়ে এলো অথচ আপনার গোসল খাওয়া কিছুই হয়নি এখনো! হিজ ম্যাজেস্টি এমন অনিয়ম জানলে খুব রাগ করবেন!”
মীরের কথা মনে পড়তেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো আনাবিয়ার। যে তাকে ফেলে চলে গেছে, যার কাছে তার কথার কোনো মূল্য নেই তার কথা সে কেন শুনবে? কেন তার প্রতিটি আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে? করবেই না।
ফিলোমেলা আনাবিয়ার লাল হয়ে যাওয়া নাকের পাটার দিকে একবার তাকিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল বাথটাব প্রস্তুত করতে। এখন এই ঘুমের ঘোরে শেহজাদীকে বুঝিয়ে গোসল করিয়ে দুটো খাইয়ে দিতে পারলেই বেঁচে যায় সে, নইলে হিজ ম্যাজেস্টির চোখ রাঙানি দেখতে হবে তাদের সবাইকে।
দ্রুতহাতে সবকিছু প্রস্তুত করে ফিলোমেলা বাইরে এসে দেখল আনাবিয়া তখনও সেভাবেই বসে। গলা খাকারি দিয়ে সে বিনীত স্বরে বলে উঠলো,

“শেহজাদী, দয়া করে গোসল সেরে নিন। আমি এখুনি আপনার খাবার প্রস্তুত করছি।”
আনাবিয়া উঠে দাঁড়াল, চোখে আঁধার ঘনিয়ে মাথার ভেতর চক্কর দিয়ে উঠল আবারও। তাকে টালমাটাল হতে দেখেই ছুটে এসে ধরল ফিলোমেলা, শঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, সাবধানে! কি হাল করেছেন নিজের, এত অনিয়ম করলে তো এমন হবেই! আমি এখুনি হেকিমকে ডেকে পাঠাচ্ছি! হিজ ম্যাজেস্টি জানলে দেখবেন কি অবস্থা হয়!”
আনাবিয়া অস্বস্তিবোধ করল প্রচন্ড, দুর্বল পায়ে গোসলখানার দিকে এগোতে এগোতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো ফিলোমেলার থেকে। তাকে এলোমেলো পা ফেলতে দেখে ফিলোমেলা আবারও অবলম্বন দিতে গেলে বিরক্ত হয়ে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো তৎক্ষনাৎ।

“শেহজাদী, আমি….. আমি থাকি আপনার সাথে?”
অনুরোধের সুরে বলল ফিলোমেলা, কিন্তু আনাবিয়া দরজা বন্ধ করে দিলো তার মুখের ওপর৷ ফিলোমেলা বাহিরে ছুটে গিয়ে মহসিনকে হেকিম ডাকতে বলে আবারও ছুটে এলো কামরায়, কান পেতে রইল গোসলখানার দরজায়, বুক দুরুদুরু করতে রইল তার, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা যেন না ঘটে!
আনাবিয়া গোসল শেষ করল সময় নিয়ে, বাথটাবে বসে বসে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদল কিছুক্ষণ, জগতের সমস্ত দুঃখ যেন ভর করেছে আজ তার ওপর! ফোনটাও আছড়ে ভেঙেছে, মীরের সাথে যোগাযোগের উপায় নেই!
বাথটাব ছেড়ে ঝর্ণা খাটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ, তিরতিরে পানির স্রোত বয়ে গেলো তার উন্মুক্ত শরীর বেয়ে, মাথাটা একটু ঠান্ডা হলো বোধ হয়, কিন্তু মন তার কোনোমতেই শান্ত হতে চাইছেনা যে!
ঝর্ণা ছেড়ে এসে দাঁড়াল ফুল ভিউ মিররটির সম্মুখে, নিজের রক্তিম মুখখানা দেখে আচমকা ভয়ানক কান্না পেলো তার! টাওয়েল টা দুহাতে আঁকড়ে ধরে তাতে মুখ গুঁজে কাঁদল সে জোরে জোরে!

আচমকা তার চোখ পড়লো আয়নার পাশের ওপেন শেলফে রাখা খঞ্জরটির দিকে, খোদাইকৃত ক্ষুদ্র চুনি আর পান্না গুলো মৃদু আলোকে ঝকমকে দ্যুতি ছড়াতে ব্যাস্ত। কান্না থামিয়ে চোখ মুছে হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো সেটি, বহুদিন পর নিজের খঞ্জরটিকে হাতে পেয়ে পুরনো স্মৃতি গুলো তাজা হয়ে এলো তার। মুহুর্তেই স্মরণে এলো মীরের করা প্রতিটি বিশ্বাসঘাতকতা! মনে পড়ল তার হাতে প্রাণ যাওয়া প্রতিটি দাসীর মুখমণ্ডল, মনে পড়ল কিমালেবের রাস্তায় মীরের সাথে হওয়া সেই সংঘর্ষের স্মৃতি, সেই অন্তঃসত্ত্বা দাসীটির ঢাউস পেট!
শীতল জলে গোসল দিয়ে যেটুকু ক্রোধ প্রশমিত হয়েছিলো তা যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তরতরিয়ে! দাঁতে দাঁত চেপে চেষ্টা করল নিজেকে সংবরণের, কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা! ক্রোধে গর্জে উঠে হাতের বজ্রমুষ্ঠির এক আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলল ইবোনির ওপেন শেলফটির বক্ষ! ছড়ে যাওয়া হাতে নতুন করে আলগা হলো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক্ষতস্থান!

ভীষণ রোষে ফুলে ফুলে উঠতে রইল তার সুডৌল বক্ষ, খঞ্জরের দিকে একবার তাকিয়ে খুলে ফেলল সে রত্নখচিত খাপ, উন্মুক্ত করল ধারালো ক্ষুরধার। ডান হাতের মুষ্টিতে শক্ত করে ধরে ধারালো অংশের অগ্রভাগ রাখলো বা হাতের কব্জির নীলরঙা শিরার ওপর। চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল সে কবজি এবং ক্ষুরধারটির মিলনস্থলে। মাত্র একটি জোরালো টান, তারপরেই সব শান্ত! একটিবার সাহস করে এই অসাধ্য সাধন করতে পারলেই আর কখনো তাকে কোনো কষ্ট পেতে হবে না! কারো সামান্য অবহেলা, অনাদরে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার প্রয়োজন হবেনা, কেউ আর তাকে না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হতে পারবেনা, কারো অপেক্ষায় তাকে আর কখনো পথ চেয়ে থাকতে হবে না! কতইনা সুন্দর হবে সে দিনগুলো!
আনাবিয়া নিষ্পলকে চেয়ে রইল, বুকের হৃৎপিণ্ডটি ছটফট করছে, যেন চোখের সম্মুখে এই উন্মাদ মেয়েটির বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড দেখে সে বেরিয়ে যেতে চাইছে এই দেহ থেকে। আনাবিয়া দৃঢ় সংকল্পে চেয়ে রইল, আজ সে করেই ফেলবে! কেউ নেই তাকে ঠেকানোর, কেউ না! এখানে কেউ খুঁজতে আসবেনা তাকে, কেউ ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাবেনা। মীরও না!

শুকনো ঢোক গিলে খঞ্জরটি হাতের সাথে চেপে ধরতেই আচমকা চোখ গেলো আয়নার দিকে। তার মেদহীন, সুকোমল উদরের নিম্নভাগ ফেঁপে উঠেছে! আনাবিয়া বড়বড় চোখে চেয়ে রইলো সেদিকে, মুষ্টি গলিয়ে কখন খঞ্জরখানা মাটিতে পড়ল টের পেলনা৷ আয়নার দিকে এগিয়ে এসে নিজের উন্মুক্ত, ফাঁপা পেটে হাত বুলাল দ্বিধাভরে।
শেষবার কবে তার ঋতুরজ এসেছিলো স্মরণে নেই। এতসব বিবাদ বিচ্ছেদে সে ভুলে বসেছে সেসব! মীর….. মীর তো খেয়াল রাখত এসবের! সেও যে কিছুই জানালনা তাকে!
আনাবিয়া হাতের কর গুনে স্মরণ করার চেষ্টা করল শেষ চক্রের সময়টি। ইতোমধ্যে দুইটি মাস তার চক্র পেরিয়ে চলে গেছে টের পেয়েই আয়নাতে চেয়ে নিজের ফাঁপা, মোলায়েম পেটে হাত রেখে সে বিস্মিত, অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,

“হোয়াট দ্যা ফ্‌….. ফাইন থ্যাঙ্কিউ!”
দ্রুতহাতে গায়ে পোশাক চড়িয়ে বেরিয়ে এলো আনাবিয়া, চুল থেকে পানি পড়তে রইল টপটপিয়ে, ভ্রুক্ষেপ করলনা৷ ফিলোমেলা নেই কামরাতে, ভেতর থেকে কামরার নব ঘুরিয়ে তালাবদ্ধ করে ব্যালকনির দরজা খুলে লাফিয়ে নেমে পড়ল জঙ্গলের ভেতর। প্রাসাদের পেছন দিয়ে, সীমানা ঘেঁষে এগোতে রইল সামনের দিকে।
পায়ে জুতা নেই, মাটি ভেজা। একটু আগের কান্নাকাটির ফসল। কাঁদা থেকে বাঁচিয়ে সাবধানে হেটে চলল। পথিমধ্যে পাম গাছের গোঁড়ায় পেঁচিয়ে থাকা একটা কিং কোবরাকে তুলে নিলো হাতে। সাপটা ঘুম ভেঙে ফোস করে উঠেই আবার নিভে গেলো অপহরণকারিনীকে দেখে। আনাবিয়া ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
“তোমাকে কিছুক্ষণের জন্য হাওলাদ নিচ্ছি, পরে ঘুমিও।”
সতর্ক পায়ে এগোতে এগোতে এসে দাঁড়াল কাঙ্খিত স্থানটিতে। সুউচ্চ প্রাসাদের প্রতিটি তলাতে দাসী বাদী দের কন্ঠস্বর বাজছে। আনাবিয়া দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ হিসেব কষে নিলো, পরক্ষণেই মাটি ফুড়ে বেরিয়ে আসা লতানো ডালের সাহায্যে তরতরিয়ে উঠে পড়লো প্রাসাদের কাঙ্খিত তলাটিতে।

মহসিন দাঁড়িয়ে মেডিক্যাল জোনে, শেহজাদীর হঠাৎ অসুস্থতায় সে বড়ই চিন্তিত। তার চেয়েও বেশি দুঃশ্চিন্তা হিজ ম্যাজেস্টিকে নিয়ে। শেহজাদী মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে নিয়েছিলেন জানলে মহসিনের বারোটা বাজবে, ফিলোমেলার জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়ার শখও মিটবে। তার এই ভাবনার মাঝেই একজন নার্স এসে বিনীত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“মহসিন চাচা, আপনি আর অল্প একটু অপেক্ষা করুন, হেকিম এলেন বলে। উনি একটা অপরেশনে ফেঁসে গেছেন!”
“রয়্যাল মেডিকেলের হেকিম কোন কারণে প্রাসাদের দাসীদের চিকিৎসা দিবে? হেকিমের কি কমতি হয়ে গেছে এখানে? হ্যাঁ? আসুক হিজ ম্যাজেস্টি, তারপর আমি সব নালিশ করে দিবো। তখন মজা বুঝবে তোমরা হুহ্‌!”
বাঁজখাই, মেয়েলি গলাতে খেকিয়ে উঠলো মহসিন! মেজাজ সপ্তমে তার। একেই চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ে সে বাঁচেনা, তারওপর এই হেকিম গুলোর এমন মরণদশা!
নার্সটি মহসিনের এমন হুমকিতে চুপসে গেলো, বলল,

“মহসিন চাচা, আপনি ওয়্যেটিং রুমে গিয়ে বসুন, হেকিম এলেই আমি আপনাকে সংবাদ দিবো৷”
মহসিন ফুঁসতে ফুঁসতে গেলো ওয়্যেটিং রুমে। সেখানে প্রাসাদের বিভিন্ন রোগীদের ভিড়ে তার মেজাজ আরও গরম হলো। জানালার পাশের ফাঁকা চেয়ারে বসে পড়ল সে৷ রয়্যাল ফ্লোরের খাস রক্ষীকে দেখে রোগীরা একটু নড়েচড়ে বসল, গর্বে বুক ফুলে উঠল মহসিনের, সিনা টানটান করে সে মাথা উঁচু করে রইল।
সেই মুহুর্তেই জানালা দিয়ে লাফিয়ে মহসিনের গায়ের ওপর এসে পড়ল একটি বিরাট কিং কোবরা! আচমকা গায়ের ওপর ভারী, শীতল কিছু টের পেয়ে তাকাতেই ভয়ে এক প্রকার নেচে উঠে গগনফাটা চিৎকার দিয়ে উঠল মহসিন। রোগীরা সকলেই চমকে তাকাল তার দিকে, এমন বিশাল কোবরা দেখা মাত্রই আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার চেচামেচি জুড়ে দিলো সকলে, এলোমেলো ছোটাছুটি করে যে যার প্রাণ বাঁচানর জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ল। মহসিন নেচেও সাপটিকে সরাতে অক্ষম হয়ে আর এক বিকট চিৎকার দিয়ে আচমকা জ্ঞান হারাল সেখানেই।
মুহুর্তেই হুলস্থুল পড়ে গেলো সমস্ত মেডিক্যাল জোনে, ডাক্তার নার্সরা রোগীদের সাথেই কিছু না বুঝে ছোটাছুটি শুরু করল। কিং কোবরাটি ওয়্যেটিং রুম ছেড়ে এবার এঁকেবেঁকে বেরিয়ে পড়লো মেডিক্যাল জোন পরিদর্শনে। তাতে চিৎকার চেচামেচির পরিমাণ দ্বিগুণ হলো।

অন্য একটি জানালা দিয়ে সতর্কতার সাথে মেডিক্যাল জোনে ঢুকল আনাবিয়া। এদিকটা প্রায় শূণ্য, কয়েকজন দ্রুত পায়ে এদিক ওদিক ছুটে চলেছে, আনাবিয়ার দিকে খেয়াল দেওয়ার মতোন সময়ই নেই তাদের৷
আনাবিয়া মুখের ওপর চাদর টেনে দিলো। এরপর এ কামরা সে কামরা করে অবশেষে এসে পৌছোল গাইনকোলজি ডেপ্টে। কয়েকজন নার্স সেখানে তাড়াহুড়ায় জিনিসপত্র গুলো ড্রয়ার বন্দী করছে। আনাবিয়া দ্রুত এদিক সেদিক ঘুরে অবশেষে সকলের অগোচরে কয়েকটা প্রেগন্যান্সি কিট হাতে উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলো।
কোবরাটার কি দশা দেখার সময় নেই। ওদিকে হৈচৈ হচ্ছে, সকলে সেদিকেই এগোচ্ছে। যা হয় হোক, ভেবে আনাবিয়া বেরিয়ে গেলো কোনো একটি জানালা দিয়ে।
কামরায় ফিরে এসে সোজা ঢুকল ওয়াশরুমে। মিনিট পাঁচেক বাদেই বিস্ময়ে হতভম্ব চেহারা নিয়ে বেরিয়ে এলো সে। অজানা উত্তেজনায় গা কাঁপছে তার। মুখে হাত চেপে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,

“এ-এটা এখনি হওয়ার ছিলো!”
সাইড টেবিলে থাকা জগ উঁচিয়ে ঢকঢকিয়ে পানি খেয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। কামরা তালাবদ্ধ থাকায় ফিলোমেলা খাবার সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো বারান্দাতেই। আনাবিয়া বেরিয়ে এসে বলে উঠল,
“মহসিন কোথায়? আমার বাইক রেডি করতে বলো।”
বলেই আবার ঢুকতে নিলো কামরায়, ফিলোমেলা বিনীত, উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, কিন্তু এতরাতে আপনি কোথায় যাবেন? হিজ ম্যাজেস্টি-”
“বাইক রেডি করতে বলো, আমি বেরোবো।”
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, কিন্তু… হিজ ম্যাজেস্টি আপনাকে কোথাও একা বের হতে দিতে নিষেধ করে গেছেন! আপনি এই রাতের বেলা একা বের হলে উনি খুব রাগ করবেন।”

শুকনো ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলল ফিলোমেলা, কিন্তু তখনি আনাবিয়া গর্জে বলে উঠলো,
“তোমাকে বাইক রেডি করতে বলেছি! বেশি কথা বললে সোজা রেড জোনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আসব!”
পরক্ষণেই ঢুকে গেলো কামরায়। ফিলোমেলা আতঙ্কিত হয়ে এগোলো আনাবিয়ার বাইক প্রস্তুতির সংবাদ দিয়ে আসতে৷ কামরায় ফিরে দ্রুত হাতে ভেজা চুলগুলো মুছে নিয়ে, গায়ের ওপর একটা ফুল হাতা শার্ট জড়িয়ে খঞ্জরটা প্যান্টের পকেটে ভরে আবার বেরিয়ে এলো আনাবিয়া।
খাবারের ট্রেটার দিকে একনজর তাকিয়ে এগিয়ে গেলো রয়্যাল ফ্লোরের প্রবেশ পথের দিকে। কিন্তু কয়েক কদম এগিয়েই ফিরে এলো আবার। ট্রের ঢাকনা তুলে দেখলো আনাবিয়া, খাবারের সুঘ্রাণ যেন বিদ্যুৎ বেগে পাকস্থলীতে গিয়ে ধাক্কা দিলো তার, মুহুর্তেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো ক্ষুধা!
বসে পড়লো আনাবিয়া, কিছুক্ষণের ভেতরেই গোগ্রাসে সব খাবার খেয়ে সাফ করে ফেললো থালা। ফিলোমেলা ফিরল তখনি, আনাবিয়াকে তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সে। আনাবিয়া তাকে দেখে বলে উঠল,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৪

“আরও দুটো চিকেন।”
ফিলোমেলা বুঝলনা প্রথমটায়, দ্বিধাভরে বলে উঠল,
“জ্‌-জ্বী.. শেহজাদী?”
“আরও দুটো চিকেন, সাথে তিনখানা নান। এক কথা বার বার বলতে পারবোনা!”
“জ্‌-জ্বী আমি এখুনি নিয়ে আসছি!”
বিস্মিত ফিলোমেলা ছুটলো রয়্যাল কালিনারিতে। ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে তখুনি ফিরে এলো আবার। আনাবিয়া যেন ঝাপিয়ে পড়ল খাবারের ওপর। ফিলোমেলা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইল সেদিকে। খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আনাবিয়া বসল কিছুক্ষণ, পরক্ষণেই উঠে বেরিয়ে পড়ল প্রাসাদ ছেড়ে।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৬