খান সাহেব পর্ব ৯০
সুমাইয়া জাহান
ভোরের অস্ফুট আলোয় পৃথিবীটা কেমন জানি ধূসর আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। শুনশান রাস্তা দিয়ে সুমুর গাড়িটা তীরের মতো এয়ারপোর্টের দিকে ছুটছে। চারপাশের নীরবতা যেন সুমুর বুকের ভেতরের হাহাকারটাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সুমু ড্রাইভিং সিটে বসে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে থাকলেও তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার।
কাউকে কিছু না জানিয়েই সে ওমানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই শহর, এই মানুষগুলো আর বিশেষ করে ওই পাথরের মতো মানুষটির অবহেলা বহন করার শক্তি এখন আর তার নেই। সিমরান আর শেরান, সারবাজ আর ইনায়ার কাছে বড্ড নিরাপদ—ওদের দেখলে সুমু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না, তাই ওদের ঘুমন্ত অবস্থায় রেখেই সে বেরিয়ে এসেছে। তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। সে ফ্যামিলি গ্রুপে একটা ছোট মেসেজ করল,
“আমি চললাম! জোর করে কাউকে পাওয়া যায় না, আর আমি চাই না আমার উপস্থিতিতে ওনার প্রতিটি মুহূর্ত বিষাক্ত হোক। ওমানে আমার একটা পরিবার আছে। ওমানের বালুচরেই এখন আমার শান্তি। সিমরান আর শেরানকে দেখে রেখো।
ইতি— সুমু।”
ভোরের সেই নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে সুমুর গাড়িটা তখন ফ্লাইওভারের কাছাকাছি। চারপাশটা বড্ড বেশি শান্ত, যেন কোনো এক বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। সুমুর চোখের জল শুকিয়ে গালটা নোনা হয়ে আছে, তার পুরো মস্তিস্ক এখন ওমানের সেই পুরনো দিনগুলোর কথা ভেবে অসাড়।
ঠিক তখনই আয়নায় সে দেখল, পেছন থেকে একটা দানবীয় গতির কালো রোলস-রয়েস অত্যন্ত বিপদজনকভাবে তাকে ওভারটেক করার চেষ্টা করছে। সুমু ভ্রু কুঁচকে গতি বাড়াতে চাইল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি সামনে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। সুমু সজোরে ব্রেক কষল, টায়ারের ঘর্ষণে কালো ধোঁয়া আর বিশ্রী একটা শব্দে ভারী হয়ে উঠল।
গাড়িটা পুরোপুরি থামার আগেই সামনের গাড়ি থেকে একজন লোক নেমে এলো। আপাদমস্তক কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেটে ঢাকা শরীর, মুখে কালো মাস্ক। লোকটার হাঁটাচলার মধ্যে এক দুর্ধর্ষ পেশাদারিত্ব। সুমু গাড়ির দরজা লক করতে চাইল, কিন্তু তার আগেই লোকটা জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে লকটা খুলে ফেলল।
সবকিছু ঘটল চোখের পলকে। সুমু চিৎকার করে ওঠার সুযোগটুকুও পেল না। লোকটা সুমুর ঘাড়ের একপাশে সজোরে চাপ দিতেই সুমুর শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলো। এক ঝটকায় তাকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে সেই কালো রোলস-রয়েসটার পেছনের সিটে ছুড়ে ফেলা হলো।
সুমু আধোবোজা চোখে শুধু একবার দেখল। সে অস্ফুট স্বরে বলতে চাইল,
“কে… কে আপনি?”
কিন্তু উত্তর দেওয়ার বদলে লোকটা ঠাণ্ডা গলায় পাশের একজনকে নির্দেশ দিল, “ক্লিন দ্য এরিয়া। ওর গাড়িটা এখান থেকে সরিয়ে ফেলো।”
গাড়িটা ঝড়ের গতিতে এয়ারপোর্টের উল্টো পথে চলতে শুরু করল। সুমুর ফোনটা গাড়ির মেঝেতে পড়ে রইল।
ঘরটা অন্ধকারে ভরা। সুমুকে একটা বেডের সাথে হাত-পা ছড়িয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। লেদার জ্যাকেট পরা লোকটা গ্লাস থেকে বরফ ঠাণ্ডা পানি নিয়ে ঝাপটা মারল সুমুর মুখে।
পানির ঝাপটায় সুমু ধড়ফড় করে চোখ মেলল। চোখের সামনে কুচকুচে কালো জ্যাকেট পরা যমদূতের মতো অবয়বটাকে ঝুঁকে থাকতে দেখে মুহূর্তের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে গেল, কিন্তু পরের সেকেন্ডেই তার রগে রগে আগুন চড়ে গেল। সে উন্মাদের মতো গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“হু দ্য হেল আর ইউ? আমার ওপর থেকে সর মা*দা*রফা*কা*রের বাচ্চা! আমাকে এভাবে বেঁধে রেখেছিস কেন? হোয়াই দ্য ফা*ক আর ইউ ডুইং দিস?”
লোকটা কোনো কথা না বলে সুমুর ক্রোধ মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সুমু হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতকড়া ছেঁড়ার চেষ্টা করল। তার দাঁতে দাঁত ঘষার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলে চলল,
“আমাকে জাস্ট একবার ছাড় কু*ত্তা*র বাচ্চা!। জাস্ট একবার আমার হাতটা খুলে দে, তারপর দেখ তোর ওই কলিজাটা আমি কীভাবে টেনে ছিঁড়ে বের করে ফেলি। ইউ ফা*কিং বা*স্টা*র্ড! তোর সাহস কী করে হলো আমার গায়ে হাত দেওয়ার? ডোন্ট ইউ নো হু মাই হাজব্যান্ড ইজ? উনি যদি একবার জানতে পারে, তবে তোর বডির এক একটা পার্ট সে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবে। ইউ ফা*কিং পিস অফ শিট।”
সুমুর রাগে কাঁপতে থাকা শরীর আর তার মুখ থেকে বের হওয়া ধারালো খিস্তিগুলো যেন ঘরের দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে ক্ষিপ্ত হয়ে আরও জোরে গর্জে উঠল,
“লিসেন টু মি কেয়ারফুলি ইউ ফা*ক ফেস। তুই মনে করেছিস আমাকে এভাবে বেঁধে রেখে ভয় দেখাবি? মাই ফা*কিং ফুট! তুই জানিস না তুই কার লেজে পা দিয়েছিস। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। দ্য মোমেন্ট আই গেট ফ্রি, আই উইল মেক ইউর লাইফ আ লিভিং হেল। ইউ আর ফা*কিং ডেড!”
লোকটা এবার সুমুর একদম কাছে ঝুঁকে এলো। তার নিঃশ্বাস সুমুর মুখে লাগছে। লোকটা ধীরস্থিরভাবে নিজের পকেট থেকে একটা চকচকে ছুরি বের করল। সুমু ভয় পাওয়ার বদলে থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বলল,
“ফা*ক ইউ! ছুরি দেখাচ্ছিস? আমাকে মারবি? মার! কিন্তু মনে রাখিস, আমার এক ফোঁটা রক্ত ঝরলে তোর পুরো গুষ্টির রক্ত দিয়ে এই মেঝে মুছবে আমার খান সাহেব।”
লোকটা ছুরিটা দিয়ে সুমুর গালের ওপর খুব আলতো করে স্লাইড করল। সুমুর শরীর রাগে ঘামছে, কিন্তু তার চোখে বাঘিনীর মতো তেজ। লোকটা এবার মুখ খুলল,
“চিল ম্যাম! এতো হাইপার হলে ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাবে। আপনার গালিগুলো বেশ মিষ্টি, কিন্তু কাজ হবে না। একটু পর কিছু একটা হবে তার জন্য এই এনার্জিটা জমিয়ে রাখুন।”
লোকটার নিচু আর শীতল কণ্ঠস্বর শুনে সুমুর সারা শরীর যেন এক মুহূর্তের জন্য বরফ হয়ে গেল। এই টোন, এই কথা বলার ভঙ্গি… বড্ড বেশি চেনা। সুমু কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে চোখের পলক না ফেলে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মস্তিস্ক যেন সংকেত দিচ্ছে যে এই লেদার জ্যাকেট আর মাস্কের আড়ালে থাকা মানুষটি কোনো সাধারণ অপহরণকারী নয়।
কিন্তু পরক্ষণেই সে মাথা ঝাকিয়ে ঘোর কাটানোর চেষ্টা করল। না, এটা সম্ভব নয়! তার খান সাহেব তো স্মৃতি হারিয়ে তাকে ঘৃণা করছে, সে তাকে উদ্ধার করতে কেন আসবে? আর আসবেই যদি, তবে এভাবে বেঁধে রাখবে কেন?
সুমু নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সে উন্মাদের মতো গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“শাট আপ! জাস্ট শাট দ্য ফা*ক আপ! তুই কি ভাবছিস তোর এইসব কথা শুনে আমি ভয় পাব? গেট দ্য ফা*ক অফ মি। আমার ওপর থেকে সর মা*দা*রফা*কা*রের বাচ্চা।”
লোকটি সরলো না, বরং আরও খানিকটা ঝুঁকে এলো সুমুর মুখের কাছে। সুমু তার হাতের বাঁধন খোলার জন্য পাগলের মতো মোচড়াচ্ছে। এবার সে তার শরীরের শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে লোকটার দিকে তাকিয়ে একটা ভয়ংকর হুমকি দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় বলল,
“লিসেন ইউ বা*স্টা*র্ড! তুই যদি এই মুহূর্তে আমার ওপর থেকে না সরিস, তবে তোর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা তুই করবি। আমার সাথে ভুলভাল কিছু করার চেষ্টা করলে, তোর মেইন পয়েন্টে এমন এক লাথি কষাব যে জীবনে আর কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে ফিরে তাকানোর ক্ষমতা থাকবে না তোর। আই উইল ফা*কিং ক্রাশ ইওর বলস।”
সুমুর এই কথা শুনে লোকটি হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মাস্কের আড়ালে যেন এক চিলতে হাসি খেলে গেল। সুমু সেটা লক্ষ্য করে আরও ক্ষেপে গেল। সে চিৎকার করে বলল,
“হাসছিস কেন কুত্তার বাচ্চা? তুই কি ভাবছিস আমি মজা করছি? জাস্ট একবার আমার পা দুটো খুলে দে, তোর পুরুষত্ব আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব। আই উইল কিক ইউ সো হার্ড দ্যাট ইউ উইল ফরগেট হাউ টু পি।”
লোকটি সুমুর দুই কানের পাশে হাত দিয়ে তাকে বেডের সাথে একদম চেপে ধরল। সুমু অনুভব করল লোকটার শরীরের ঘ্রাণ তার পরিচিত। তার হৃদস্পন্দন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। রাগে, ক্ষোভে আর এক অজানা আশঙ্কায় সে হাপাচ্ছে। লোকটি এবার খুব নিচু স্বরে সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বড্ড বেশি ধারালো তোমার জবান, সুমু। এই জিভটা কাটতে পারলে আমার শান্তি হতো। কিন্তু তার আগে তোমার ওই লাথিটা দেখার খুব শখ আমার।”
সুমু চোখ রাঙিয়ে লোকটা দিকে তাকাল। তার সমস্ত প্রতিরোধ আর হুমকির মুখে লোকটা যেন এক পৈশাচিক শান্তিতে মেতে উঠল। সে তখন হুট করেই কোনো এক আদিম তৃষ্ণায় সুমুর গলার খাঁজে মুখ গুঁজে দিল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস আর ভিজে ওষ্ঠের স্পর্শ সুমুর গলার নরম ত্বকে আছড়ে পড়তেই সে শিউরে উঠল। ঘৃণা আর যন্ত্রণায় তার শরীর রি রি করে উঠল। সে উন্মাদের মতো মাথা এদিক-ওদিক ঝাকাতে লাগল আর গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“ইউ ফা*কিং এনিমেল। তোর সাহস কত বড়? ছাড় বলছি! ছাড় আমায়! ওহ গড, কেউ বাঁচান। কুত্তার বাচ্চা, তোর এই মুখ আমি এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেব। হাউ ডেয়ার ইউ টাচ মি? আই উইল ফা*কিং কিল ইউ।”
সুমু একের পর এক নোংরা গালি দিয়ে যাচ্ছে আর লোকটা যেন সেই গালিগুলোকে উপভোগ করছে। সে সুমুর গলায় দাঁত বসিয়ে দিয়ে এক গভীর চিহ্ন এঁকে দিল। সুমু যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে গালি দিতে দিতেই কাঁদতে শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটা সুমুর গলা থেকে মুখ তুলল। তার মাস্কের আড়ালে চোখ দুটো অদ্ভুত নেশায় চিকচিক করছে। সে খুব আদুরে অথচ গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলল, “সুইটহার্ট…!”
এই একটিমাত্র শব্দ— যা সুমুর সারা শরীরে বিদ্যুতের মতো ঝটকা দিল। সুমু মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। তার গালিগালাজ, চিৎকার, ছটফটানি—সবই যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই ডাক… এই কণ্ঠস্বর… এই বিশেষ মাদকতা… এটা তো পৃথিবীর আর কারো হওয়ার কথা নয়। সুমু অস্ফুট স্বরে বলল, “খা… খান সাহেব?”
লোকটা সুমুর চিবুকটা এক হাতে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। সে সুমুর কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জ আর বোল্ড গলায় বলল,
“জানো সুইটহার্ট! এমন সব মুহূর্তে তোমার মুখ থেকে এই উরাধুরা গালি শুনলে আমার ভেতরে এক অন্যরকম ফিল আসে। তোমার গালিগুলো আমার শরীরে উন্মাদনার বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে তোমাকে আরও বেশি করে কষ্ট দেই, আর তুমি আরও বেশি করে আমাকে ফা*কিং বলো।”
সুমু বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। তার সামনে থাকা এই মানুষটি কি সত্যিই তার সেই স্মৃতিহীন খান সাহেব? নাকি অন্য কেউ তার খান সাহেবের রূপ ধরে তাকে নরক দেখাচ্ছে? এই অবস্থায় শেরাজের এই গম্ভীর আর রুক্ষ আচরণের আড়ালে এমন এক উন্মাদের মতো রূপ সুমু কখনো কল্পনাও করেনি। সে অবিশ্বাসের স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি… আপনি কি সত্যিই আমার খান সাহেব? নাকি কোনো শয়তান?”
লোকটা কোনো উত্তর দিল না। সে সুমুর হাতের বাঁধনটা আরও একটু টাইট করে দিয়ে তার দিকে এক রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীর হাতে তার মুখের কালো মাস্কটা সরিয়ে ফেলল। সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণ লম্বা নাক, ঘন ভ্রু আর চোখের সেই সম্মোহনী দৃষ্টি। সুমু মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। তার খান সাহেব! কিন্তু এই শেরাজের চোখে আজ কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অসহায়ত্ব নেই।
সুমু কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আবারও চিৎকার করে উঠল,
“খান সাহেব! এসব কী তামাশা করছেন আপনি? হোয়াট দ্য ফা*ক ইজ গোয়িং অন? আমাকে এভাবে পশুর মতো বেঁধে রেখে আপনি আনন্দ পাচ্ছেন? দিস ইজ নট ফেরায়। আমি না জেনে কত উল্টাপাল্টা কথা বললাম। পাপে ডুবিয়ে মারতে চান নাকি?”
শেরাজ কোনো কথা না বলে সুমুর হাতের বাঁধনটা আবারও একবার পরীক্ষা করে দেখল। তারপর ধীরপায়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সুমুর আপাদমস্তক একবার খুঁটিয়ে দেখল। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিদ্রূপের হাসি। সে খুব শান্ত গলায় বলল,
“তামাশা? না সুইটহার্ট, তামাশা তো তুমি করেছিলে। পরশু তুমি আমাকে বন্দুকের মুখে রেখে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করলে—সবার সামনে আমাকে জব্দ করলে। আর আজ আমি তোমাকে ওই ওমান যাওয়ার রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এলাম।”
সে সুমুর দিকে এক ধাপ এগিয়ে এসে তার গলার সেই দগদগে কামড়ের দাগটার ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল,
“পরশু তুমি যা করেছিলে সেটা ছিল ‘উদ্ধার অভিযান’, তাই না? তবে আজ আমি যা করছি সেটা হলো ‘অধিকার আদায়’। তুমি জোর করে আমাকে স্বামী বানালে, আর আজ আমি তোমাকে জোর করে তুলে নিয়ে এসে আমাদের বাসর করব। জাস্ট ইউ অ্যান্ড মি… এই নির্জন ঘরে।”
সুমু অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে মাথা নেড়ে বলল,
“আপ… আপনার কি স্মৃতি ফিরে এসেছে? আপনি কি সব মনে করতে পারছেন?”
শেরাজ সুমুর কপালে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
“স্মৃতি? ড্যাম দ্য মেমোরি! আমার ব্রেইন তোমাকে চিনতে পারছে কি না জানি না, কিন্তু আমার এই হাত দুটো তোমাকে ধরার জন্য ছটফট করছে। আমার শরীর তোমাকে চিনে নিয়েছে সুমু। তুমিই তো চেয়েছিলে আমি তোমার কাছে আসি, তাই না? তবে আজ কেন এতো গালি দিচ্ছ? কেন এতো ভয় পাচ্ছ?”
শেরাজ এবার সুমুর শাড়ির আঁচলটা ধরে এক টানে সরিয়ে দিল। সুমু কুঁকড়ে গিয়ে বলল,
“খান সাহেব, এটা ঠিক হচ্ছে না। আমাকে আগে খুলুন, তারপর আমরা কথা বলব। এভাবে পৈশাচিকতা করবেন না। আর আমি জেনে-বুঝে আপনাকে গালি দেইনি।”
শেরাজ সুমুর কানের লতিতে দাঁত দিয়ে হালকা কামড় দিয়ে বলল,
“উঁহু! তুমি যেভাবে আমাকে খাঁচায় বন্দি করেছিলে, আমিও আজ তোমাকে ঠিক সেভাবেই কাছে টেনে নিব।”
শেরাজ তার লেদার জ্যাকেটটা খুলে ধীরলয়ে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। এরপর তার শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করল। তার চোখের সেই নির্দয় চাউনি সুমুর শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া করে দিচ্ছে। সে আর্তনাদ করে বলল,
“খান সাহেব! আপনি সুস্থ নন। আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, আপনি প্লিজ নিজেকে সামলান। এভাবে নয়… আমি এভাবে আপনাকে চাই না।”
শেরাজ কোনো কথা শুনল না। সে এক ঝটকায় সুমুর খুব কাছে নেমে এলো। তার শরীরের উত্তাপ সুমু অনুভব করতে পারছে। শেরাজ সুমুর দুহাত মাথার ওপর চেপে ধরে তার ওষ্ঠে সজোরে নিজের ওষ্ঠ ডুবিয়ে দিল। সেই চুম্বনে আজ কোনো কোমলতা নেই, আছে কেবল এক বন্য জেদ। সুমু কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শেরাজের কঠোর ওষ্ঠের চাপে তার শব্দগুলো গোঙানি হয়ে মিলিয়ে গেল। শেরাজের হাতের বাঁধন সুমুর কবজিতে বসে যাচ্ছে, রক্ত জমে নীল হয়ে যাচ্ছে জায়গাটা, কিন্তু শেরাজ আজ এক অন্য জগতে।
বেশকিছু সময় যেতেই শেরাজ সুমুর গলার নিচের অংশে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল। সুমু যন্ত্রণায় ধড়ফড় করে উঠল, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। শেরাজ সুমুর শাড়ির ছিন্নভিন্ন অংশগুলো সরিয়ে দিয়ে তার সারা দেহে নিজের অধিকারের ছাপ এঁকে দিতে লাগল। তার হাত দুটো আজ সুমুর দেহের প্রতিটি ভাঁজে শাসনের চিহ্ন রেখে যাচ্ছে।
“লাগছে আমার!” সুমু ফিসফিস করে বলল।
শেরাজ সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল,
“লাগাটাই তো স্বাভাবিক, সুইটহার্ট। তুমি আমার শান্ত জীবনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছ, আর আজ সেই আগুনেই আমি তোমাকে পোড়াব।”
সে সুমুকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিল না। তার প্রতিটি ছোঁয়া সুমুর দেহে এক একটা দাহ সৃষ্টি করছে। সুমু অনুভব করল, শেরাজ আজ তাকে ভালোবাসছে না, বরং প্রতিশোধ নিচ্ছে। শেরাজ সুমুর দেহের প্রতিটি বিন্দু নিজের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য ব্যবহার করল। মিলনের সেই তীব্র মুহূর্তেও শেরাজের মুখ থেকে শুধু একটাই শব্দ বের হচ্ছিল— “মাই ফা*কিং কুইন!”
দীর্ঘ সময় ধরে চলা সেই তান্ডবের পর ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শেরাজ সুমুর বুকের ওপর মুখ রেখে হাঁপাতে লাগল। সুমুর পুরো দেহ নীল হয়ে গেছে, তার ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। সে নিথর হয়ে পড়ে রইল বিছানায়। তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল, শেরাজ আজ তার দেহে যে গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছে তা মুছতে অনেক সময় লাগবে।
শেরাজ সুমুর গলার কাছে মুখ ঘষে অস্ফুট স্বরে বলল,
“এখনো কি ওমান যেতে ইচ্ছে করছে? নাকি এই নরকটাই তোমার কাছে স্বর্গ মনে হচ্ছে?”
কথাটা বলে সে সুমুর দিক থেকে সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে আধবসা হয়ে বসল। তার শরীর ঘামে চটচট করছে, কিন্তু চোখের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এখনো সুমুর বিধ্বস্ত মুখের ওপর স্থির। সে সুমুর এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো নিজের আঙুলে জড়িয়ে এক টান দিল, যাতে সুমু ব্যথায় তার দিকে তাকাতে বাধ্য হয়।
সুমু রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। শেরাজ এক অদ্ভুত বিদ্রূপের হাসি হেসে আবারও বলল,
“সবই তো বুঝলাম, সুইটহার্ট। কিন্তু একটা জিনিস মেলাতে পারছি না। আমার যতদূর মনে পড়ে—মানে আমার অবচেতন মন যেটা বলছে—আগের সুমু তো প্রাইভেট মুহূর্তেও ‘গালি’ দিতে বললে লজ্জায় কুঁকড়ে যেত। মুখ ফুটে একটা কড়া শব্দ উচ্চারণ করতেও যার প্রাণ বের হয়ে যেত, সেই তোমার মুখের ভাষা আজ এতো ‘আস্তাগফিরুল্লাহ্’ মার্কা হলো কীভাবে?”
সুমু যন্ত্রণায় ফুঁসতে ফুঁসতে আবারও শেরাজের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত, কিন্তু চোখের তেজ কমেনি। সে কোনো উত্তর দিল না দেখে শেরাজ আরও একটু ঝুঁকে এলো। সে সুমুর গালের ওপর নিজের হাত বুলিয়ে বলল,
“আগে তো আমার সামনে কোনো কথা বলতে গেলে তোতলামি শুরু করতে, আর আজ নরমাল মুহূর্তেও তুমি যেভাবে অনর্গল এফ-ওয়ার্ডগুলো ছুঁড়ছিলে—তা শুনে তো আমারই কান গরম হয়ে যাচ্ছিল। পাঁচ বছরে আমিহীন ওই বিদেশের মাটি তোমাকে বেশ ভালোই ‘কালচার’ শিখিয়েছে দেখছি। গালিগালাজের কোনো কোর্স করেছিলে, নাকি ওমানের মরুভূমিতে থাকতে থাকতে তোমার ভেতরের ওই ভদ্র মেয়েটা মারা গেছে?”
সুমু দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় বলল,
“ভদ্রতা দিয়ে এই দুনিয়ায় টিকে থাকা যায় না, খান সাহেব। আপনি যখন ছিলেন না, তখন আপনার এই সুমুকে বাঘিনী হতে হয়েছে নিজের অস্তিত্ব আর আপনার সন্তানদের রক্ষা করার জন্য। জোর করে তুলে এনে অসভ্যতা করে— এখন আমার মুখের ভাষা আপনার কাছে আস্তাগফিরুল্লাহ্ মনে হচ্ছে?”
শেরাজ হো হো করে হেসে উঠল, সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছাড়া আর কিছুই নেই। সে সুমুর ঠোঁটের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল চেপে ধরে বলল,
“উঁহু! আমি কিন্তু কমপ্লিমেন্ট দিচ্ছি, সুইটহার্ট। তোমার এই ধারালো জবান আমাকে আরও বেশি পাগল করে। ওই লাজুক সুমুর চেয়ে এই ‘বেয়াদব’ আর ‘উদ্ধত’ সুমুকে কন্ট্রোল করতে আমার বেশি ভালো লাগছে। তবে মনে রেখো সুইটহার্ট, মুখের ভাষা যত নোংরা হবে, আমার শাসনের ধরণও তত বেশি নিষ্ঠুর হবে।”
সুমু রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আপনার স্মৃতি ফেরেনি ঠিকই, কিন্তু আপনার ভেতরের ওই জানোয়ারটা ঠিকই জেগে উঠেছে। ছিঃ!”
শেরাজ সুমুর গলার সেই কালশিটে পড়া দাগে আবার মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“জানোই তো, বাঘিনীকে কাবু করতে হলে জানোয়ার হতেই হয়।”
সুমু এবার শেরাজের চোখের গভীরে এক অদ্ভুত সার্থকতা খুঁজে পেল। সে বুঝতে পারল, এই যে নিষ্ঠুরতা, এই যে বাসর নিয়ে বিদ্রূপ—এসব কিছুর আড়ালে আসলে শেরাজের সেই পুরনো স্মৃতিগুলো ফিরে এসেছে। নাহলে সে কীভাবে জানবে আগের সুমু লজ্জায় কুঁকড়ে যেত?
সুমু যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা শরীরটা একটু নাড়ানোর চেষ্টা করে আর্দ্র গলায় বলল,
“আপনার সব মনে পড়ে গেছে, আমি জানি। এই নাটকটা না করলে কি চলত না? আপনার সুমুকে এভাবে কষ্ট দিয়ে আপনার কী লাভ হলো? হাত-পাগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার, দয়া করে এবার আমাকে ছাড়ুন। এভাবে পড়ে থাকতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে আমার।”
শেরাজ সুমুর চোখের দিকে কিছুক্ষণ স্থিরভাবে তাকিয়ে রইল। তারপর তার সেই দুর্ধর্ষ চাউনিটা বদলে গিয়ে এক পৈশাচিক প্রেমে রূপ নিল। সে সুমুর বাঁধন খুলে দেওয়া তো দূর, বরং তার ওপর আরও একটু বেশি ঝুঁকে এলো। সুমুর কপালে ঘাম ভেজা চুলে নাক ঘষে সে খুব শান্ত গলায় বলল,
“নাহ সুইটহার্ট! তোমাকে ছাড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। আসলে আমার স্মৃতি ফিরেছে কি ফেরেনি সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো— আই অ্যাম রিয়ালি এনজয়িং দিস ফোর্সফুল রোমান্স। ইট ফিলস সো গুড টু সি ইউ ডিফিটেড লাইক দিস,” সে সুমুর কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “আই লাভ ইউ সুইটহার্ট। আই ফা*কিং লাভ ইউ আমার বাচ্চাদের আম্মু।”
কথাটা শুনে সুমুর চোখে জল চলে এলো। দীর্ঘ পাঁচ বছরের অপেক্ষা, ঘৃণা আর যন্ত্রণার পর এই কথাটা শোনার জন্যই তো সে ওমান থেকে ফিরে এসেছিল। শেরাজ যখন তাকে ‘বাচ্চাদের আম্মু’ বলে ডাকল, তখন তার সারা শরীরের ক্ষতগুলো যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। শেরাজ সুমুর ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট আলতো করে ছুঁইয়ে দিয়ে আবার বলল,
“ইউ আর মাইন সুমু, আজীবনের জন্য।”
সে খুব ধীরে, অত্যন্ত সাবধানতার সাথে সুমুর হাতের আর পায়ের বাঁধনগুলো খুলে দিল। বাঁধনমুক্ত হতেই সুমুর অবশ হাত দুটো বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। কবজিতে হাতকড়ার ঘর্ষণে চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত জমে লাল হয়ে আছে।
শেরাজ আর দেরি করল না। সে সুমুর ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে পরম মমতায় নিজের দুই বাহুর শক্তিশালী বেষ্টনীতে টেনে নিল। সুমু কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু শেরাজের চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। এই কান্না যন্ত্রণার নয়, এই কান্না দীর্ঘ পাঁচ বছরের বিচ্ছেদ আর অপমানের পর পরম আশ্রয়ের এক তৃপ্তি। শেরাজ সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“সরি সুইটহার্ট… অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম, তাই না? আসলে তোমার ওই তেজ কমানোর জন্য এটুকুর দরকার ছিল।”
সে সুমুর গলার সেই দগদগে কামড়ের দাগটার ওপর আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সুমু যন্ত্রণায় একবার শিউরে উঠতেই শেরাজ তাকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরল। সে ধীরে ধীরে সুমুর দেহের ক্ষতগুলোতে, কবজির সেই নীল হয়ে যাওয়া কালশিটেগুলোতে এবং ঠোঁটের ফাটল ধরা অংশে অত্যন্ত কোমলভাবে নিজের ওষ্ঠের পরশ দিতে লাগল। প্রতিটি চুম্বনে যেন এক একটা ওষুধের প্রলেপ। শেরাজের এই শান্ত আর গভীর আদর সুমুর দেহের দহনকে শীতল করে দিচ্ছিল। শেরাজ সুমুর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“এই দাগগুলো সাক্ষী রইল সুমু, তুমি কতটা আমার। আজ থেকে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের আর আলাদা করতে পারবে না। আমি তোমাকে যতটা নরক দেখিয়েছি, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি স্বর্গের সুখ দেব।”
সুমু শেরাজের বুকে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে ধরা গলায় বলল,
“আপনার ওপর আমার কোনো রাগ নেই, খান সাহেব। আমি জানি, আপনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন।”
শেরাজ সুমুর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। সে সুমুর চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু ঠোঁট দিয়ে শুষে নিয়ে বলল,
“এখন চলো, আমার বাচ্চাদের আম্মুকে একটু ফ্রেশ করে দিই।”
অন্ধকার ঘরটাতে এখন আর কোনো পৈশাচিকতা নেই, আছে কেবল দুই অতৃপ্ত আত্মার এক পূর্ণাঙ্গ মিলন। শেরাজ সুমুকে একটা চাদরটা দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
ফ্রেশ হয়ে দুজনেই নিচে নেমে আসতেই দেখল ড্রয়িংরুমে যেন একটা ছোটখাটো কুরুক্ষেত্র বসেছে। স্যান্ডির ডাকে সবাই শেরাজের বাংলোতে হাজির হয়েছে। আপাতত সবাই খুব নিচু স্বরে আলাপ করছে।
শেরাজ আর সুমুকে একসাথে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে সবাই একদম চুপ হয়ে গেল। শেরাজ কোনো কথা না বলে সোজা গিয়ে সোফায় বসল। তার মুখমণ্ডল একদম ভাবলেশহীন। রিয়াজ আর ফিরোজা কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল। শেরাজ তাদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“রিয়াজ, ফিরোজা… কাম।”
রিয়াজ কাঁপাকাঁপা পায়ে এগিয়ে এলো। সে ভাবল ব্রো বোধহয় এবার ‘এস.কে’ মুডে তাকে ধমক দেবে। কিন্তু শেরাজ হঠাৎ রিয়াজকে টেনে জড়িয়ে ধরল। রিয়াজের পিঠে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
“পাঁচটা বছর তোদের বড্ড একা করে দিয়েছিলাম। পারবি তো তোদের এই অপদার্থ বড় ভাইটাকে ক্ষমা করতে?”
পুরো ড্রয়িংরুমে যেন একটা ইলেকট্রিক শক লাগল। রিয়াজ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফিরোজা অস্ফুট স্বরে বলল,
“লাভ… তুমি কি আমাদের চিনতে পারছ?”
শেরাজ ফিরোজার মাথায় হাত রেখে মুচকি হাসল,
“হ্যাঁ লাভ, আমি তোমাদের চিনতে পারছি। আমার সেই ছোট্ট আদুরে বোনটা যে এখন অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারে।”
আইয়ুব, সারবাজ আর পিয়াসরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। সারবাজ অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“না না, এটা এস.কে হতে পারে না। কালকের ওই পাথুরে লোকটা একদিনে বদলে গেল? এস.কে, কি আমাদেরও চিনতে পারছে?”
শেরাজ বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হাসল, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। সবাই ভাবল সুমু হয়তো শেরাজকে কোনো অভিনয় শিখিয়ে নিচে পাঠিয়েছে। সুমু সবার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। সে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বিশ্বাস করো সবাই, আমাদের খান সাহেব সত্যিই ফিরে এসেছে। এই মানুষটার সত্যি সব মনে পড়ে গেছে। শুধু তাই নয়, তার সবটা মনে পড়েছে কাল। কিন্তু সে আমাদের শিক্ষা দেবার জন্য কিছু না জানিয়ে অভিনয় করছিল।”
সুমুর কথা শেষ হতেই ড্রয়িংরুমে যেন খুশির জোয়ার বয়ে গেল। আইয়ুব-সারবাজরা শেরাজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পাঁচ বছরের হাহাকার যেন এক মুহূর্তে মিটে গেল। ঠিক সেই সময় স্যান্ডি কোণায় দাঁড়িয়ে রুমাল দিয়ে ঘাম মুছছিল। শেরাজ তার দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় ডাকল, “সান!”
স্যান্ডি লাফিয়ে উঠে সামনে এসে দাঁড়াল, “জি স্যার!”
শেরাজ গম্ভীর মুখে বলল,
“কাল সেদিন যে হাড় ভাঙার অ্যাক্টিং করে আমাকে জোর করে বিয়ে করালে, তার পানিশমেন্ট কী হবে জানো? এই মুহূর্তে তোমার চাকরিটা আমি খেয়ে নিলাম। বেইমান পি.এ আমার দরকার নেই।”
স্যান্ডির মুখটা মুহূর্তেই বাংলা পাঁচের মতো হয়ে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“স্যার! ম্যাম তো বন্দুক ধরেছিল। আমি কী করতাম?”
শেরাজ কিছুক্ষণ থমথমে মুখ করে থেকে হঠাৎ করে হেসে উঠে স্যান্ডিকে জড়িয়ে ধরল। তাদের অবস্থা দেখে সবাই হাসাহাসি শুরু করল। সবাই যখন হাসাহাসি করছে, তখন শেরাজের চোখ গেল দুই ছোট প্রাণ—সিমরান আর শেরানের দিকে। শেরান শান্ত হয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। আর সিমরান ঘনঘন চোখের পল্লব ঝাপটে তার পাপাকে দেখছে। শেরাজ হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমার কলিজার টুকরোগুলো কি তাদর পাপার কাছে আসবে না?”
শেরান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু সিমরান এক দৌড়ে গিয়ে শেরাজের গলায় ঝুলে পড়ল। সে শেরাজের গালে চুমু দিয়ে আধো আধো গলায় বলল,
“পাপা পাপা… তুমি আবালও আমাদেল ভুনে যাবে না তো? তুমি তত্তি আমাদেল চিনতে পালতো?”
শেরাজ, শেরান আর সিমরানকে একসাথে কোলে তুলে নিয়ে দুজনের নাকে নাক ঘষে বলল,
“আর কোনদিনও ভুলব না, ম্মামা।”
সিমরান কোলে থেকেই কোমরে হাত দিয়ে বলল,
“তুমি তিন্তু আমাল পচন্দেল ডলতা তিনে দাও নি। তোমাল তাছে আমি অনেত চতনেট আল ডল পাই।”
“সব দিব, মাম্মা! তোমার কতগুলো ডল চাই বলো? আমি তোমাকে সব এনে দিব।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“শুরু হয়ে গেল বাবা-মেয়ের। পাঁচ বছরের জমানো ডিমান্ড একবারে শুরু করল এই মেয়ে।”
সুমুর কথা শুনে শেরাজ সুমুর দিকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দিল। সুমুকে রাগানোর মোক্ষম সুযোগ সে হাতছাড়া করতে চাইল না। সে সিমরানকে আরও একটু উঁচুতে তুলে ধরে আদুরে গলায় বলল,
“শুনলে তো, মাম্মা? তোমার এই রাগী মাম্মাটা এখনই শুরু করে দিয়েছে। আরে বাবা, আমার প্রিন্সেস আমার কাছে আবদার করেছে, তাতে তোমার সমস্যা কী শুনি? হিংসা হচ্ছে বুঝি?”
সিমরান বাবার কথায় দ্বিগুণ উৎসাহ পেল। সে শেরাজের গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে ভ্যাংচালো। তারপর আধো আধো গলায় বেশ তেজ দেখিয়ে বলল,
“মাম্মা! তুমি আমাতে নিয়ে দেনাস?”
সুমু আকাশ থেকে পড়ল। এইটুকু পিচ্চি মেয়ে, অথচ এখনই বাপের প্রশ্রয় পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। সুমু কোমরে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি হিংসা করছি? কার ওপর? এই পিচ্চি একটা মেয়ের ওপর?”
শেরাজ পাশ থেকে ফোড়ন কাটল,
“তোমার হিংসা না হলে জেলাস শব্দটা আমার মেয়ে শিখল কোথায়? নিশ্চিত তোমার চোখেমুখের ওই আগুনের গোলা দেখেই ও বুঝে নিয়েছে যে তুমি ওর ওপর হিংসে করছ। কারণ এখন থেকে আমি তো শুধু আমার মাম্মাকে সব কিনে দেব, আর সব আদরও আমার মাম্মাকে করব।”
সিমরান খিলখিল করে হেসে উঠল। সে শেরাজের ঘাড় জড়িয়ে ধরে বলল,
“ইয়েস পাপা! মাম্মাকে এততাও ডল দিবে না। মাম্মা শুধু বতুনি দেয়।”
সুমু এবার রাগে গজগজ করতে করতে শেরাজের কোল থেকে শান্ত শেরানকে এক ঝটকায় কোলে নিল। শেরানের পিঠে হাত বুলিয়ে সে বলল,
“লাগবে না তোমাদের পুতুল। আমার এই চ্যাম্পই ভালো। আমার ছেলেটা অন্তত ওই পাকা বুড়ির মতো উল্টাপাল্টা বায়না ধরে না। ও জানে ওর মাম্মা ওকে কত ভালোবাসে, তাই না বেটা?”
শেরান তার স্বভাবজাত গম্ভীর মুখে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ মুচকি হেসে বলল,
“শেরানও তো আমারই কপি! ও এখন চুপ আছে কারণ ও দেখছে ওর সিস আর পাপা মিলে মাম্মাকে কেমন জব্দ করছে। ও মনে মনে আমাদের দলেই আছে, কী বলো চ্যাম্প?”
শেরান কিছু না বলে শুধু একটা মুচকি হাসি দিল। সিমরান শেরাজের কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলল, কিন্তু সবাই শুনতে পেল,
“পাপা! চনো আমরা লুতিয়ে লুতিয়ে চতনেট থাব। মাম্মাকে এততাও দিব না।”
শেরাজ হেসে উঠল। সুমু মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
“খাও! যত পারো চকলেট খাও। দাঁতে পোকা হয়ে যখন গাল ফুলে ঢোল হবে, তখন কিন্তু আমি ওই হিরো পাপার কাছেই পাঠিয়ে দিব। তখন পাপার কাছে বসে দাঁত ব্যথা নিয়ে কাঁদবে। আর পাপা তখন ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবে ইনজেকশন দেওয়ার জন্য।”
সিমরান ভয় পাওয়ার বদলে শেরাজের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,
“আমাল পাপা হিনো! পাপা থাততে আমাল কোনো ভয় নেই।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল,
“দেখলে তো? তোমার রাজত্ব শেষ। এখন থেকে শুধু আমার আর আমার প্রিন্সেসের হুকুম চলবে। যাও তো কাজের মহিলা, আমার জন্য এক কাপ কফি আর আমার মাম্মার জন্য এক গ্লাস মিল্কশেক নিয়ে আসো তো।”
সুমু এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। “কাজের মহিলা!”—এই শব্দটা শুনে তার চোখ যেন কপালে উঠল। সে কুশন তুলে নিয়ে সরাসরি শেরাজের দিকে ছুড়ে মারল। শেরাজ দক্ষ ফিল্ডারের মতো সেটা এক হাতে ধরে ফেলে সিমরানকে নিয়ে সোফায় আয়েশ করে বসল।
সুমু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী বললেন? আমি কাজের মহিলা? দাঁড়ান, আপনার কফিতে আজ যদি আমি চিনির বদলে নুন না মিশিয়েছি, তো আমার নামও সুমু না। আর এই বুড়িটাকে তো আজ আমি করলা সিদ্ধ খাওয়াব।”
সিমরান শেরাজের আড়ালে মুখ লুকিয়ে বলল,
“হিনো পাপা! দেথোতো, কাজেল মহিনাতা তোমাতে বততে।”
পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। আইয়ুব হাসতে হাসতে সোফা থেকে পড়ে যাওয়ার জোগাড়। সে বলল,
“এস.কে, সুমু ভাবিজিকে খেপিয়ে তুই আজ রাতে ডিনার পাবি তো?”
শেরাজ সিমরানের চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলল,
“ডিনার না পেলে আমি আর আমার মাম্মা বাইরে গিয়ে বিরিয়ানি খাব, তাই না মাম্মা?”
সিমরান মাথা নাড়িয়ে সায় দিল,
“হ্যাঁ পাপা! আমনা বিরনানি থাব। মাম্মাতে দিব না।”
সুমু হাসতে হাসতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। তবে যাওয়ার সময় বলে গেল,
“ঠিক আছে, যাও বিরিয়ানি খেতে। তবে মনে রাখবেন খান সাহেব, বিল দেওয়ার সময় যেন ওয়ালেটটা সাথে থাকে। কারণ আপনার ওয়ালেটটা কিন্তু এখনো এই কাজের মহিলার আলমারিতেই বন্দি আছে।”
শেরাজ হঠাৎ থমকে গেল। সে নিজের পকেটে হাত দিয়ে দেখল সত্যিই তো, তার তো নিজের বলতে কিছুই নেই। সবই তো সুমুর দখলে। শেরাজ আমতা আমতা করে সিমরানকে ফিসফিস করে বলল,
“মাম্মা, তোমার মাম্মাকে রাগানো কি একটু বেশি হয়ে গেল? বিল না দিতে পারলে তো আমাদের রেস্টুরেন্টে থালাবাসন পরিষ্কার করতে হবে। এর চেয়ে সুমু রানির কাছে মাফ চেয়ে কফি খেয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।”
সুমুর জয়ের হাসি আর সবার সম্মিলিত অট্টহাসিতে ড্রয়িংরুমটা যেন এক টুকরো স্বর্গ হয়ে উঠল। দীর্ঘ পাঁচ বছরের জমাটবদ্ধ অন্ধকার আজ এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
ফারিন, ফারিয়া আর ইফতিয়া পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে, সুমুকে নাস্তা তৈরিতে সাহায্য করতে। রুহি, নিশান, হাসফা, আহিয়া, সিমরান আর শেরান—ঘরের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করে খেলতে লাগল। সামিয়া সোফায় একটু গুছিয়ে বসে বলল,
“সবকিছু যখন ঠিকই হয়ে গেল, তাহলে আর এখানে অযথা অপেক্ষা কীসের? আজই আমরা সবাই মিলে আমাদের শেখবাড়িতে ফিরে যাই?”
শেরাজ জানালার বাইরে আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নাড়ল। তার চোখে এখন এক দায়িত্বশীল অভিভাবকের দৃষ্টি। সে শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ! সামিয়া একদম ঠিক বলেছে। তাই ভালো হবে।”
আচমকা আইয়ুব একটু গম্ভীর হয়ে নড়েচড়ে বসল। সে ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসিতে বলল,
“ফেরা তো হবেই, কিন্তু আমাদের আরও একটা বড় কাজ কিন্তু বাকি আছে।”
সারবাজ কৌতুহলবশত জিজ্ঞাসা করল,
“কী কাজ? তুই কি আবার নতুন কোনো ফন্দি আঁটছিস নাকি?”
শেরাজ আইয়ুবের মনের কথা বুঝতে পেরে মুচকি হাসল। সে উত্তরটা দিয়ে দিল,
“সান আর নাতাশার বিয়ে। অনেক হয়েছে প্রেম, এবার ওদের বিয়েটা দিয়ে দেওয়া দরকার।”
কথাটা শোনামাত্র নাতাশা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। ইনায়া, ইশিতা আর নাজমিন তৎক্ষণাৎ নাতাশাকে ঘিরে ধরল, তাকে খেপানোর জন্য। অপরদিকে স্যান্ডির অবস্থা তথৈবচ। অমিত, নিহাল, রিয়াদ, সাইফ, রিসান, ফাহিম—সবাই মিলে তাকে ঘিরে ধরেছে। কেউ তার পিঠ চাপড়াচ্ছে, কেউ আবার তার কানের কাছে বিয়ের গান গাইতে শুরু করেছে। স্যান্ডি আমতা আমতা করে শুধু হাসছে।
শেরাজ হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিল। তার চোখের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি। সে রহস্য বাড়িয়ে বলল,
“শোনো সবাই, শুধু সান আর নাতাশা নয়। ওদের সাথে আরও দুজনের বিয়ে একই দিনে ফিক্সড করতে হবে।”
সকলে এবার চরম কৌতুহলী হয়ে সমস্বরে জিজ্ঞাসা করল,
“কাদের? আমাদের মধ্যে আর কারা বাকি রইল?”
শেরাজ এবার আর রহস্য ভাঙল না। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“সারপ্রাইজ থাক! সময়মতো জানতে পারবে সকলে। আগে শেখবাড়িতে পা রাখি, তারপর সব খোলাসা হবে।”
সে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল পিয়াস আর সজীবের দিকে। এই পুরো বাহিনীতে সজীবই সবচেয়ে সিনিয়র এবং স্থিতধী। শেরাজ তাদের দুজনের সাথে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কুশল বিনিময় করল। শেরাজের ছোট ভাই শাহরুখ ফোন বের করল। সে আবেগী গলায় বলল,
“আমি বরং ড্যাডকে কল করে ব্রো-র স্মৃতি ফিরে আসার খরবটা জানাই। ড্যাড-মম, বড়মামনি-বড়আব্বু নিশ্চয়ই ওখানে বসে চিন্তা করছেন।”
আরবাজ পাশ থেকে সায় দিল,
“হ্যাঁ! তাই কর। আর তাদের বল যেন কালকের মধ্যেই বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশে চলে আসেন।”
বিকেলের পড়ন্ত রোদ যখন শেখবাড়ির সুউচ্চ তোরণ আর বিশাল আঙিনায় এসে পড়েছে, তখন পুরো বাড়িটা যেন এক দীর্ঘ তন্দ্রা ভেঙে জেগে উঠল। সারিবদ্ধ গাড়িগুলো যখন একে একে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল, বাড়ির ভেতরের প্রতিটি ইটের দেয়ালও যেন খুশিতে নেচে উঠল। গাড়ি থেকে সকলে নামতেই পুরো পরিবার যেন খুশিতে মেতে উঠল। সবার আগে গাড়ি থেকে নামল সুমু আর শেরাজ, দুই পাশে তাদের দুই কলিজার টুকরো সিমরান আর শেরান।
বাড়ির প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসি বেগম আর শামীম সাহেব। এতো বছর পর মেয়ের জামাইকে চোখের সামনে সুস্থ দেখে হাসি বেগম আঁচলে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। শামীম সাহেব পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তার চোখের কোণ দিয়ে একবিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে শেরাজকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“কেমন আছেন, আব্বু?”
“আলহামদুলিল্লাহ্, বাবা! তোমার শরীর এখন সুস্থ তো?”
“জি আব্বু! আপনাদের সকলের দোয়ায় এখন ভালো।”
একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন রুমা বেগম আর সাখাওয়াত সাহেব। সাখাওয়াত সাহেব তার চার ছেলেমেয়ে—নাজমিন, আশিক, শাহরুখ আর সজীবকে একসাথে দেখে এক অপার্থিব তৃপ্তি অনুভব করলেন। রুমা বেগম পরম মমতায় শেরাজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, যেন এক ছেলেটার প্রত্যাবর্তনে সকলের হৃদয়ের সব ক্ষত এক নিমেষে মুছে গেল।
একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মুস্তাক সিকদার আর সুমি বেগম। তারাও এগিয়ে এসে শেরাজের শরীরের ভালো-মন্দ খবর নিল। এদিকে খুশি বেগম আর ইফতিয়াক সাহেবও আজ খুশি। খুশি বেগম হাসি বেগমকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সাখাওয়াত সাহেব সবাইকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন।
ড্রয়িংরুমে সবার মধ্যমণি হয়ে আরামকেদারায় বসে ছিলেন বৃদ্ধা মাজেরা বেগম। তার তিন সন্তান—শামীম সাহেব, সুমি বেগম আর সাখাওয়াত সাহেবকে একসাথে দেখে কুঁচকে যাওয়া মুখটা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শেরাজ আর সুমু গিয়ে তাকে সালাম করতেই তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন। বাড়ির আঙিনায় বাচ্চাদের হুল্লোড়, গুরুজনদের চোখের পানি আর তরুণদের আনন্দের গুঞ্জনে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। যে বাড়িতে পাঁচ বছর ধরে কান্নার প্রতিধ্বনি শোনা যেত, আজ সেখানে শুধুই সুখের অঝোর ধারা।
শেরাজ সুমুর হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। সুমু তাকিয়ে দেখল তার পুরো পরিবার আজ এক সুতোয় গাঁথা। তার ত্যাগের বিনিময়ে আজ এই হাসিমুখগুলো ফিরে পাওয়া।
বাড়ির ভেতরটা মুহুর্তেই ব্যস্ততায় ভরে উঠল। রুমা বেগম আর হাসি বেগম কোমরে আঁচল গুঁজে রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন—এতো বড় বাহিনীর জন্য ঝটপট চা আর নাস্তা বানাতে হবে। এদিকে সুমি বেগম পরম যত্নে মাজেরা বেগমকে ধরে ধরে ঘরের ভেতর বিশ্রাম নিতে দিয়ে এলেন।
ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফাগুলোতে গিয়ে বসলেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব, মুস্তাক সিকদার, ইফতিয়াক সিকদার, পিয়াস আর সজীব—সবাই একসাথে সোফায় গিয়ে বসলেন। শেরাজ সোফায় গা এলিয়ে বসতেই খেলাধুলা ফেলে রেখে সিমরান এক দৌড়ে এসে পাপার কোলে ঝাপিয়ে পড়ল। তার যেন এক মুহূর্তের জন্যও পাপাকে চোখের আড়াল করার সময় নেই। শেরাজ আলতো করে মেয়ের কপালে চুমু খেল। আলাপের শুরুটা করলেন শামীম সাহেব। তিনি শেরাজের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ গলায় বললেন,
“বাবা শেরাজ, এখন তোমার মা আর বাবাকে বলো বাংলাদেশে চলে আসতে। ওনারা তো এখন পর্যন্ত এলেন না।”
শেরাজ সিমরানের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বিনীতভাবে উত্তর দিল,
“জি আব্বু! শাহরুখকে দিয়ে আজই তাদের সাথে কথা বলানো হয়েছে। আমি নিজেও কথা বলেছি। তারা সবকিছু গুছিয়ে কালকের মধ্যেই বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশে পৌঁছাবেন।”
সাখাওয়াত সাহেব খুশি হয়ে বললেন,
“খুবই ভালো খবর! কাল তবে শেখবাড়িতে এক বিশাল ভোজের আয়োজন করতে হবে। অনেকদিন পর সকলে একসাথে বসে এক টেবিলে খাব।”
মুস্তাক সিকদার মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন,
“শুধু ভোজ কেন? শেরাজ যখন ফিরেই এলো, এই খুশিতে বড় কোনো অনুষ্ঠানের কথাও তো ভাবা দরকার।”
পিয়াস একপাশে বসে চুপচাপ সব শুনছিল। তার চোখেমুখে সামিয়াকে হারানোর সেই পুরনো বিষাদ থাকলেও, পরিবারের সবার হাসি দেখে সে নিজের কষ্টটা আড়াল করে মৃদু হাসল। সে ভাবল, হয়তো এভাবেই জীবন সবাইকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়।
সজীব আড়মোড়া ভেঙে বলল,
“আব্বু, কালকে সকলের পছন্দের খাবার রান্না হোক। আমি, শাহরুখ আর আশিক মিলে কাল সকালেই সমস্ত বাজার করে ফেলব।”
সিমরান তখন পাপার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পাপা, গ্র্যান্ডমা আল গ্র্যান্ডপা তাল এনে তাদেল বনবে তো—আমাল ডলগুলো যেন ওমান থেতে নিয়ে আতে। না আননে তিন্তু আমি তাদেল তাতে ততা বনব না।”
শেরাজ আদুরে গলায় বলল,
“ওকে মাম্মা! আমি আনতে বলব।”
শামীম সাহেব নাতনির কথা শুনে হেসে বললেন,
“দাদুভাই, তোমার পুতুলের জন্য আলাদা একটা বিমানই না ভাড়া করতে হয়।”
রাত গভীর হয়ে এসেছে। সুমুদের রুফটপে এক অদ্ভুত নীরবতা। চারপাশে কোনো মানুষ নেই, কেবল দূরের বাড়িগুলোর জানালা থেকে ভেসে আসা হালকা আলো, আর ওপরে মেঘহীন আকাশে ভরপুর তারা। রুফটপে চারদিকে ঝোলানো ছোট ছোট লাইটগুলো নিভিয়ে রাখা হয়েছে। শুধু একপাশে রাখা হলুদ লণ্ঠনের ম্লান আলোয় ছায়ার খেলা। হাওয়ার পরশে দুলছে টবে লাগানো ফুলগাছগুলো। কখনো আবার শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে ছাদের মেঝেতে। আকাশটা যেন আজ অন্য রকম। চাঁদের আলো ছাদের কংক্রিটে পড়ছে। নিস্তব্ধ রাত, কেবল দূরের পাখির ডাক আর হালকা বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ।
শেরাজ একা দাঁড়িয়ে রেলিংয়ের পাশে। তার মনে এখনো পাঁচবছর আগের সবকিছু ঘুরছে। সেদিন রাতে তার সুইটহার্ট তার সাথে এমন কি করছিল, যে সে এখনো সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীর বুকে নিঃশ্বাস নিতে পারছে—এসব কিছু তাকে জানতে হবে। সুমু এই পাঁচবছর ওমান কি করছিল, সব তাকে জানতে হবে। তার ভাবনার মাঝে হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
“ব্রো!”
শেরাজ ধীরে ঘুরে তাকাল। লণ্ঠনের আলোয় দেখা গেল পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। কালো শার্টের হাতা গুটানো, মুখটা বরাবরের মতো গম্ভীর। তারা দুজন কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে কেউ নেই, কেবল চাঁদের আলো, হালকা হাওয়া আর তারাদের সাক্ষী হয়ে রইল তাদের নীরব উপস্থিতি। শেরাজ রেলিং থেকে সরে এসে ধীরে পিয়াসের পাশে দাঁড়াল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ শেরাজ মৃদু স্বরে বলল,
“সম্পর্কে তুমি আমার থেকে বড় হলেও, বয়সে আমরা সমবসয়ী হবো, তাই তুমি করেই বলছি। তো বলো, কি অবস্থা তোমার, ব্রো?”
পিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“এইতো চলছে বিন্দাস। যেমন আগে চলত, তেমনই।”
রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। ছাদের এক কোণে পড়ে থাকা শিউলি ফুলের গন্ধ ম ম করছে বাতাসে। পিয়াস আকাশের ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেরাজ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে পিয়াসের চোখের গভীরতা মাপার চেষ্টা করল। পিয়াসের কথায় এক ধরণের উদাসীনতা থাকলেও সেখানে চাপা হাহাকার স্পষ্ট। শেরাজ পিয়াসের কাঁধে হাত রেখে খুব ধীর গলায় বলল,
“অনেক তো হলো ব্রো, এবার জীবনটা একটু গুছিয়ে নাও। আর কতকাল এভাবে ছায়াকে জাপটে ধরে বাঁচবে?”
পিয়াস ম্লান হেসে আকাশের দিকে তাকিয়েই বলল,
“জীবন তো আমার অগোছালো নেই, ব্রো। চলছে তো যেমন চলা উচিত। এলোমেলো হওয়ার মতো তো কিছু নেই।”
শেরাজ একটু কঠোর স্বরেই বলল,
“এলোমেলো নেই মানে? তুমি আজও একজনের জন্য নিজের জীবনটাকে মরুভূমি বানিয়ে রেখেছ। অথচ অন্য একজন তোমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, তুমি তার কথা ভাবছই না। আর কতকাল সামিয়াকে এভাবে একতরফা ভালোবেসে যাবে? ও বিবাহিত, ওর সুন্দর একটা সংসার আছে, বাচ্চাও আছে। ওর স্মৃতিগুলোতে ধুলো জমতে দাও, পিয়াস।”
পিয়াস হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। তার চোখের কোণে চাঁদের আলো চিকচিক করে উঠল। সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“ওর বিয়ে হয়ে গেছে বলে কি আমার ভালোবাসা কমে গেছে? ভালোবাসলে পেতে হবে, এমনটা তো কোথাও লেখা নেই। না পাওয়ার মধ্যেও ভালোবাসা থাকে। সামু আমার কাছে কোনো শরীরের নাম নয়, ও একটা অনুভূতির নাম। যে অনুভূতিটা আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। একতরফা ভালোবাসা তো কোনো দরাদরি নয় যে ওকে আমি পায়নি বলে অন্য কাউকে খুঁজে নেব। ও সুখে আছে, এটাই তো আমার ভালোবাসার সার্থকতা। আমি না হয় ওর সুখ দেখেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিলাম।”
শেরাজ এবার পিয়াসের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে বড় ভাইয়ের মতো শাসনের সুর। সে বলল,
“পিয়াস, একতরফা ভালোবাসার কষ্টটা তো তুমি বোঝো। তাহলে সেই একই কষ্ট তুমি অন্য একজনকে কেন দিচ্ছ? যে তোমাকে ভালোবেসে নিজের স্বপ্ন সাজাচ্ছে, তাকে এভাবে অবহেলা করা কি ঠিক? তাকে কি একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?”
পিয়াস ভ্রু কুঁচকে শেরাজের দিকে তাকাল। কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল,
“আমাকে ভালোবাসে? কে সে? কার কথা বলছ তুমি?”
শেরাজ লণ্ঠনের ম্লান আলোয় পিয়াসের চোখের দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে উত্তর দিল,
“ইফতিয়া।”
পিয়াস যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“ইফতিয়া? কবে হলো এসব?।”
শেরাজ একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপ নেই। সে বলল,
“সেদিন থেকেই, যেদিন তুমি ওকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে সুস্থ অবস্থায় বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলে। তুমি ওকে জীবন দিয়েছিলে পিয়াস, আর ও সেই জীবনে তোমাকেই বসিয়ে নিয়েছে। তুমি সামিয়াকে ভালোবাসো তাই ও তোমার সেই ভালোবাসাটাকে সম্মান করে মুখ ফুটে হয়তো কিছু বলতে পারে না, কিন্তু ওর চোখগুলো সবসময় তোমাকেই খোঁজে।”
পিয়াস কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। সে ধরা গলায় বলল,
“কিন্তু শেরাজ, আমি তো সামিয়াকে ভালোবাসি। আমার মনের সবটুকু জায়গা তো ও দখল করে রেখেছে। আমি কি পারব নতুন করে সবটা শুরু করতে? একজনের স্মৃতি নিয়ে বাঁচা সহজ, কিন্তু অন্য কাউকে নিয়ে জীবন শুরু করা অনেক কঠিন। এইসব নতুন করে শুরু করা আমার পক্ষে সম্ভব না, ব্রো।”
শেরাজ পিয়াসের হাতটা শক্ত করে ধরল। সে বুঝতে পারছে পিয়াসের ভেতরের ঝড়। সে মৃদুস্বরে বলল,
“সম্ভব-অসম্ভবের বিচার পরে হবে। অন্তত নিজেকে একবার প্রশ্ন করো পিয়াস— ইফতিয়ার একতরফা ভালোবাসাটা কি তোমার সামিয়ার প্রতি ভালোবাসার চেয়ে কোনো অংশে কম?”
পিয়াস কোনো কথা বলতে পারল না। শেরাজ পিয়াসের ভেতরের দ্বিধাটুকু অনুভব করতে পারল। সে পিয়াসের কাঁধে দুই হাত রেখে তাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে খুব ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করল,
“শোনো পিয়াস, ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়া নয়, বরং কারো ভালোবাসার মর্যাদা দেওয়ার নামও এক ধরণের ভালোবাসা। তুমি সামিয়াকে ভালোবেসেছ, ওটা তোমার পবিত্রতা। কিন্তু সামিয়া এখন অন্য কারো স্ত্রী, অন্য কারো ভালোবাসা। তুমি সামিয়ার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করলে সামিয়া কি ফিরে আসবে? আসবে না! বরং তুমি যা করছ, তাতে ইফতিয়া নামের মেয়েটার জীবনটাও একতরফা যন্ত্রণায় বিষিয়ে তুলছ।”
শেরাজ একটু থামল, পিয়াস নিচু হয়ে শিউলি ফুলের স্তূপের দিকে তাকিয়ে আছে। শেরাজ আবারও বলল,
“তুমি নতুন করে শুরু করতে পারবে কি না, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো ইফতিয়াকে একটা সুযোগ দেওয়া। যে মেয়েটা তোমাকে নিঃশব্দে ভালোবেসে যাচ্ছে, তাকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া কি উচিত? একটা মানুষ যখন মরে যায়, তখন তাকে আমরা মাটি চাপা দিয়ে দেই। তাই বলে কি কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে? না, থেমে থাকে না। তোমার ভেতরের সামিয়াকেও এখন স্মৃতির কবরে রাখা দরকার, পিয়াস। একবার ইফতিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখো, দেখবে সেখানে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই।”
পিয়াস এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কিন্তু শেরাজ, আমি যদি ওকে সুখী করতে না পারি? আমার মনে তো এখনো অন্য কারো নাম লেখা।”
শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“পিয়াস, মন তো কোনো পাথরের ফলক নয় যে একবার লিখলে আর মোছা যাবে না। ইফতিয়ার ভালোবাসা যদি খাঁটি হয়, তবে ও নিজেই তোমার মনের ওই পুরনো নামটা ধুয়ে মুছে নিজের নাম লিখে নেবে। ভালোবাসা জোড়াতালি দিয়ে হয় না ঠিকই, কিন্তু মায়া দিয়ে নতুন করে সংসার গড়া যায়। তুমি ইফতিয়াকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখো পিয়াস, নিজেকেও একটা সুযোগ দাও। এভাবে একা একা পুড়লে শেষ পর্যন্ত ছাই ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।”
রাতের বাতাসটা হঠাৎ একটু জোরে বইতে শুরু করল। শিউলি ফুলের গন্ধটা যেন আরও তীব্র হলো। পিয়াস কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনের ভেতর দীর্ঘদিনের জমে থাকা পাহাড়টা যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, সামিয়াকে ভালোবেসে সে নিজেকে একটা জেলখানায় বন্দি করে ফেলেছে। আর ইফতিয়া হলো সেই জন, যে বাইরে দাঁড়িয়ে চাবি হাতে তার মুক্তির অপেক্ষা জন্য করছে।
পিয়াস ধীরে ধীরে চোখ মেলল। তার চোখের সেই কঠিন উদাসীনতা একটু নরম হয়ে এসেছে। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল,
“তুমি ঠিকই বলেছ, ব্রো। আমি বড্ড স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কষ্টের কথাই ভেবেছি। ইফতিয়ার ভালোবাসাকে আমি কোনোদিনও পাত্তাই দিইনি। আমি জানি না আমি কতটা ভালো স্বামী হতে পারব, তবে আমি চেষ্টা করব। অন্তত ওকে এই নরক যন্ত্রণায় একা ফেলে রাখব না।”
খান সাহেব পর্ব ৮৯
শেরাজ পিয়াসের বুক চাপড়ে দিয়ে আলতো হেসে বলল, “এই তো আমার ব্রো-র মতো কথা! কথা দিচ্ছি পিয়াস, তুমি পস্তাবে না। ইফতিয়া তোমাকে ঠিক আগলে নেবে।”
পিয়াস মাথা নাড়ল। তার মনের দীর্ঘদিনের গুমোট ভাবটা যেন এক পলকে হালকা হয়ে গেল। সে প্রথমবারের মতো অনুভব করল যে সামিয়ার স্মৃতিকে মনে রেখেও ইফতিয়ার হাতটা ধরা সম্ভব। পিয়াস বলল,
“ঠিক আছে ব্রো, আমি রাজি। তুমি যেভাবে চাও, সেভাবেই হবে। হয়তো একদিন ইফতিয়ার ভালোবাসা পেয়ে আমি সামুকে ভুলে যেতে পারব।”
শেরাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল। রাতের অন্ধকার কাটতে আর বেশি দেরি নেই, ঠিক যেমন পিয়াসের জীবনের দীর্ঘ অন্ধকার কাটতে শুরু করেছে।
