সাঁঝের মায়া পর্ব ২১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
একমুহূর্তের জন্য মাথা শূন্য হয়ে গেলো তিতিরের।”ভালোবাসি না” শব্দটা তার কাছে স্বাভাবিক লেগেছে।কারণ জানতো এটা সে।তার দিক থেকে ও তো হুট করেই সব।সময় তো লাগবেই।তবে পরের কথাটা?অন্য কেউ আছে মানে! হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সে।
প্রকৃতি আজ সত্যিই রুষ্ট। বৃষ্টির প্রকোপ তো বেড়েছেই সাথে দমকা বাতাসের ঝাপটা।বাইরে প্রচন্ড শব্দ।গাছটাছ ভেঙেও পরছে বোধহয়। তিতির বিছানা থেকে ততক্ষণে উঠে এসে দাড়িয়েছে ইশানের মুখোমুখি। ছ ফুট লম্বা মানুষ টার সমানে দাড়িয়ে কথা বলতে তাকে খানিকটা ঘাড় উঁচিয়েই কথা বলতে হয়।
চোখেমুখে রাজ্যের বিষ্ময় বিরাজ করছে তিতিরের।ইশান মজা করার মানুষ নয়।একদমই নয়..
ঈশানের মুখের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো সে।ধীর গলায় বললো,
“বিয়ে টা আপনি করতে চাননি তাইনা?”
ইশান চোখে চোখ রাখলো না।মাথা উপর-নীচ করলো।গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো।“হ্যা।”
“সারাদিন কি তার কাছেই ছিলেন?”
“হ্যা ছিলাম।” এবারও ইশানের কাটকাট জবাব।
তিতির খেয়াল করলো তার গলাটা কেমন শুকিয়ে আসছে।বুকের ভিতরে এখনো ধড়ফড় করছে কিন্তু সেটা কেমন একটা যন্ত্রণা দায়ক।স্বাভাবিক গলায় বললো,
“না ফিরলেই তো পারতেন।বিয়েটা হতো না।”
ইশান এবার তাকালো তিতির এর দিকে।মাথার লাল দোপাট্টা দিয়ে টানা ঘোমটা তো সে নিজেই একটু আগে তুলেছে।সেটা অবহেলায় মেঝেতে পরে আছে।তিতির এর গায়ে ভেঙে বেনারসি পড়া।চুলগুলো পেছনে খোপা করা।কপালে টায়রা পরা।খোপায় কি ফুল ওগুলো!নাম জানে না সে।কামিনী বোধহয়!গা থেকে এখনো একটা গহনাও খোলা হয়নি।গলার কাছটা বেশ লাল হয়ে গেছে সারাদিন এতো ভাড়ি গহনা পরে থাকায়।ফর্শা ত্বকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেটা।বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকালো।গাছপালা এলিয়ে পরছে ঝড়ো বাতাসে।উদাস গলায় বললো,
“বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে না হলে দিদা…”
“ঈশান ভাই আপনি আমাকে কখনো ভালোই বাসেননি না?”
নিজের কথা শেষ হওয়ার আগেই তিতির এর এহেন প্রশ্ন থমকে গেলো সে।পিছনে থাকা হাতের মুঠো অস্বাভাবিক শক্ত হলো আরও।দু দিকে অপরাধীর মতো মাথা নাড়লো।
“আমার জীবনে রুষা ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই।সরি তিতির।”
তিতির এর মাথা কেমন একটা চক্কর কেটে উঠলো।ইশানের কথাটা কেমন দারুণ জোরে শোনালো।মেয়েটার নাম তাহলে রুষা!কই এ নাম তো সে কখনো শোনেনি।কেউ বলেনি তাকে,ঈশানও না।ধড়ফড় করা বুকটাকে শান্ত করতে চাইলো জোরে শ্বাস নিয়ে,হলো না।আর কিছু জিজ্ঞেস করতেও ভয় হচ্ছে তিতিরের।শোনার ক্ষমতা তার হবে তো!কাঁপা গলায় অবশেষে জিজ্ঞেস করলো,
“আর আমাদের বিয়েটা?”
“বাধ্য হয়ে।”
“আর আমাকে খুন করলেন কেনো তাহলে?”
“আমি তোকে বেধে রাখবো না।”
তিতির হেসে ফেললো।ইশান চমকে তাকালো সেদিকে। মেয়েটার চোখমুখে কোনো কঠিনতা নেই।চোখ দুটো কেমন একটা ছলছল করেছে।অসহায়ের হাসি,হেরে যাওয়ার হাসি।বেইমানির স্বীকার হওয়ার হাসি।
“বেধে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। তিন কবুলের মানে জানেন? “
“ডিভোর্স চাই আমার।মুক্তি দে আমাকে।প্লিজ।আমি রুষা কে ছাড়া আর কাউকে বউ হিসেবে মানতে পারবো না।”
তিতিরের নিজে অন্য গ্রহের মানুষ বলে মনে হলো।পায়ের নিচটা কেমনটা শূন্য শূন্য লাগছে।শরীরে বল পাচ্ছে না।কোনোমতে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,
“বিয়ের প্রথম রাতে বলছেন ডিভোর্স দেবেন?এতোটা স্বার্থপর কিভাবে হতে পারলেন আপনি?আমার জীবনটা কেনো নষ্ট করলেন?বিয়ের আগে একবার বলতে পারতেন অন্য কাউকে ভালোবাসেন।আপনি আমি এখানে থাকতাম না আজকে।”
ইশান সেই আগের মতো কঠিন মুখে দাড়িয়ে আছে।তিতিরের চোখে চোখ রাখছে না।অপরাধবোধ হচ্ছে কি সত্যি ! কি করতে পারে সে।কিচ্ছু তার হাতে নেই এই মূহুর্তে।
“ক্ষমা করিস আমাকে।আমি তোকে কখনো ভালোবাসতে পারবো না।”
তিতিরের বুক চিড়ে চিৎকার বেড়িয়ে এলো,আকাশপাতাল এক করে চিৎকার করতে ইচ্ছে হলো।এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো এই সময়টা যদি মিথ্যা হয়ে যেতো,কোনো দুঃস্বপ্ন হতো,চোখ খুলে দেখতোওই সাজানো গোছানো ফুলের রাজ্যে ওই পাষান মানুষ টার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।এমনটা তো হতেও পারতো। পারতো না কি!
“এ জীবন আপনার নামে করে দিলাম।আর আপনি এত সহজে বলে দিলেন ভালোবাসা নেই।কিচ্ছু নেই?”
ইশানের চোখজোড়া হঠাৎই রক্তিম বর্ণ ধারন করেছে।কারণটা কি ধরতে পারা গেলো!গেলো না।বাইরের ঝড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে ঘরের মধ্যে একজোড়া নবদম্পতির মনের ঝড়।উথাল-পাতাল হয়ে যাচ্ছে সব।এক নিমিষে মিথ্যা মনে হচ্ছে সব সম্পর্ক।ইশান তিতির এর কোনো প্রশ্নের বোধহয় গুছিয়ে জবাব দিতে পারছে না।আর না তো চোখে চোখ মেলাতে পারছে।গলা শুকিয়ে এসেছে অনেক আগেই,আচমকা শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। রক্তিম দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে একই গম্ভীর স্বরে বলতে গেলো কথা।কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে গলা ভেঙে আসছে,কন্ঠ কিছুতেই কঠিন হচ্ছে না।
“আমি তোকে ভালোবাসি না।আমি সারাদিন রুষার সাথে ছিলাম।বুঝতেই পারছিস নিশ্চয়ই। “
আর কেনো যেনো শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে না কিছুই,শুনতে পারছে না সে।ঠকে গেলো বোধহয় এ জীবনে,কঠিন ভাবে ঠকে গেলো।না তো তাকে যে ভালোবাসে সেই রাহাত ভাই তাকে পেলো,আর না তো সে যাকে ভালোবাসলো সেই ইশান তার হলো।বিয়ের প্রথম রাতে কোনো স্বামী যদি উপহার হিসেবে বিচ্ছেদ চায় সে নারীর ভাগ্য কে কি বলা যেতে পারে!কার ওপর অভিযোগ করা যেতে পারে?খোদার কাছে কি এই প্রশ্ন করা যাবে? নাকি সেটাও পাপ! তিতির এর তা জানা নেই।তিতির দু হাতে কান চেপে ধরলো।গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো নোনা জল।ফুপিয়ে উঠলো মেয়েটা।ভাঙা ভাঙা করে উচ্চারণ করলো কথাগুলো।
“আর বলবেন না দয়া করে।সহ্য করতে পারছি না।বুকটা এফোড় ওফোড় হয়ে যাচ্ছে।দয়া করুন এবার আমার ওপর একটু।দোহাই লাগে আপনার..”
ইশানের চোখ জ্বালা করছে।নিঃশ্বাস নিতেই পারছে না।পেটের কাটা অংশের ব্যাথা অনুভব করতে না পারলেও সেই ব্যাথাটা বুকের বা পাশে হচ্ছে। কারণ কি এটার?সে তো সত্যিই চায়নি প্রথমে বিয়েটা,মিথ্যাে ছবি দেখেও বিশ্বাস না করলেও রেগে গিয়েছিলো,ওর সেই প্রেমিক পুরুষ এর কথা বলায় একপ্রকার জেদেই রাজি হয়েছিলো বিয়েতে। তাহলে মেয়েটার আক্ষেপ এ তার… ইশান চুপ করে রইলো।মুখে কোনো কোমলতার ছাপ আনলো না।তিতির ততক্ষণে মেঝেতে বসে পরেছে।আশ্চর্যজনক ভাবে এখন কাঁদছে না। বসে আছে পাথরের মতো।স্থির নজর ইশানের পায়ের দিকে।ইশান নিচু হয়ে মেয়েটাকে তুলতে গিয়েও তুললো না।তিতির চোখদুটো মুছলো।কান্নার জলে চোখের কাজল ছড়িয়ে গেছে,তবুও কি স্নিগ্ধই না লাগছে মেয়েটাকে।হাসলো তিতির,সে হাসিতে বিদ্রুপ নাকি অবহেলা ইশান সেটা ধরতে পারলো না।মুখ তুললো ঈশানের দিকে।
“বেশ!আপনাকে ভালোবেসে যখন কলঙ্কই লাগলো তবে সে কলঙ্কই মঞ্জুর। ভালোবাসা ভালো থাকুক।আপনার অনুরোধই রইলো।দেবো মুক্তি।”
ভালোবেসে কলঙ্ক!ভালেবাসা..?ইশান চমকে তাকালো তিতির এর দিকে।তিতিরের মুখে আর কান্না নেই
কেমন একটা নির্জীব মনে হচ্ছে মেয়েটাকে।ইশান কথা বাড়াতে পারলো না।তিতির ঠায় দাড়িয়ে রইলো রোবটের মতো।
“তোর দায়িত্ব নেবো আমি চিন্তা করতে হবে না।আর সবার সমানে আমরা স্বাভাবিক কাপল হিসেবেই থাকবো।থাকতে হবে আরকি।ঘরের ভিতর আমাদের মধ্যে কি সম্পর্ক সেটা বাইরের কেউ জানবে না।সময় মতো সবাইকে সব জানিয়ে দেবো।এখন জানালে দিদা সহ্য করতে পারবে না।তার জন্যই যখন এতো কাহিনি করতে হলো নাটক টা না হয় চলতে থাক।তারপর তোর জীবন তোর মতো, যা চাইবি,যেভাবে চাইবি।হবে…”
তিতির কথা বললো না।ইশানের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো।অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো সামনের হৃদয়হীন, পাষান স্বামী নামক একটা মানুষ এর দিকে।
ইশান আলমারি খুলে জামাকাপড় বের করে ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে।কয়েক মিনিট এর মধ্যে বেড়িয়েও এলো।বেড সাইট টেবিল থেকে মেডিসিন বের করলো কিছু একটা।চোখের ওপর হাত রেখে বিছানায় সটানে শুলো।তিতির তাকিয়ে রইলো সেদিকে। কি করবে সে এখন,কার কাছে যাবে।এই দুঃখের ভাগ নেয়ার তো কেউ নেই।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইশানের সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না আর।কড়া ওষুধ এর ডোজে ঘুমিয়ে পরেছে।তবে সে যে আঘাত পেয়েছে সে কথা তিতির জানলো না,সে আঘাতের হদিস এখনো তিতির পায়নি ।তাই ইশানের ঘুমে অভিমান, নিজের ওপর মায়া,আক্ষেপ আরও দ্বিগুণ হলো।
ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো বেলকনির দিকে।দরজা খুললো।বাইরে প্রচন্ড ঝড় বইছে।আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসেবে দশ নাম্বার সতর্ক সংকেত টাইপের ঝড়।আজ হঠাৎ করেই সে খুব সাহসী হয়ে গেলো।,অন্ধকার ভয় পাওয়া,বিদ্যুৎ চমকানিতে চিৎকার করে মানুষ খোঁজা মেয়েটা আর ভয় পেলো না।ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলো ইশানকে।বারান্দায় তাই গ্লাস সরানোতে ঘরে দমকা বাতাস ঢুকছে।ইশানের বোধহয় ঠান্ডা লাগছে। মুচকি হাসলো।এসে দাড়ালো বারান্দায়, গ্লাসটা লাগিয়ে দিলো।মূহুর্তেই ভিজে একসাড় হয়ে গেলো সে।মুষলধারে বৃষ্টি, সে বৃষ্টির পানিতে তার দুঃখ,আজকের অপমান,সব কি মোছা সম্ভব? নয় বোধহয়। গায়ে এখনো বিয়ের বেনারসি টা,গা ভর্তি গহনা খোলেনি সে।চুলগুলো খুলে গেলো বৃষ্টির তোরে।একরাশ দীঘল কেশরাশি ছড়িয়ে গেলো কোমড় ছেড়ে,ধুয়ে যেতে লাগলো সাজসজ্জা। চোখের কাজল,ঠোঁট ভর্তি লাল টকটকে রং সব নিজ হাতে ডলে তোলার চেষ্টা করলো।বসে পরলো সেখানে।এক হাতে মুখ চেপে গগনবিদারী কান্নার শব্দ আটকালো।
এক অদ্ভুত ইচ্ছে হচ্ছে তার।দৌড়ে গিয়ে ইশানের বুকে টাই নেওয়ার ইচ্ছা। খুব করে ইচ্ছা টা হচ্ছে।
তিতির পাগলের মতো হেসে উঠলো,বেনারসির আঁচল খানা দু হাতে নিয়ে পরখ করলো,বুক চিড়ে চিৎকার বেড়িয়ে আসলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।
“খোদা কিসের শাস্তি দিলে তুমি?কিসের শাস্তি? বিয়ের রাতে স্বামী বলছে সে অন্য নারীকে ছুয়ে এসেছে।এটা প্রাপ্য ছিলো আমার?এটা? কি করবো এখন আমি।কার কাছে যাবো।কি করবো জবাব দাও।”
ঝড়ো বাতাসের তীক্ষ্ণ শব্দে ঢাকা পরে গেলো মেয়েটার সে কলিজা চেড়া আর্তনাদ। লুটিয়ে পরা শরীরটা ছেড়ে দিলো উন্মুক্ত টাইলস্ এর ওপর।উপুর হয়ে পরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো।গায়ের বেনারিসখানা টেনে ছিড়ে ফেলতে চাইলো।
প্রকৃতি আজ বোধহয় আর শান্ত হবার নয়,না বৃষ্টি একবিন্দু কমলো আর না তো ঝড়ের গতি।একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে দুটো।আচমকা কোথা থেকে এক গাছের ভাঙ্গা ডাল এসে ছুঁয়ে গেলো তার ডান হাত।মূহুর্তের মধ্যে চামড়া ছড়ে গেলো।গলগল করে রক্তে ভেসে গেলো আশপাশ।দূর্বল শরীর,মানসিক চাপ কোনোটাই আর তার ছোট্ট মস্তিষ্ক নিতে পারছে না যেনো।শরীর তো বলশূন্য সে কখন থেকেই।জোর করে উঠার চেষ্টাও করলো না।এই প্রলয়কারী আবহাওয়াও আজ তার মনের ওপর ভয় ধরাতে পারলো না বরঞ্চ আরও সে প্রলয়ে দৃষ্টি রেখে জড় পদার্থের মতো বসে রইলো মেয়েটা।অনূভুতি গুলো কাজ করতে চাইছে না,মাথার ভিতরা টা ফাঁকা হয়ে আসছে।ঘোর অন্ধকারের মধ্যে ঘর থেকে ভেসে আসা ফেইরি লাইটের সোনালির আলোর রশ্মি তার গায়ে পরেছে।আধখোলা লাল বেনারসি গায়ে,এলোমেলো চুলে জবজবে অবস্থায় পরে রইলো সেখানটায়।কতক্ষণ সে বরফশীতল বৃষ্টির ফোটাগুলো তার গায়ে পরতে অনুভব করলো তা জানা নেই।তবে জ্ঞান হারালো খুব দ্রুত।
সারাদিন বিয়ে বাড়ির এতো এতো কাজকর্মের পরেও এখনো নিজেদের রুমে ঘুমাতে যায়নি কেউ।রাত বাজে দেড় টা।সবাই মিলে আড্ডায় মেতেছে সাজিদ,অনিমার জন্য বরাদ্দকৃত রুমটায়।রিশা,রোশনি,রাফিকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ঘুমানোর জন্য। বাকিরা এখনো এখানেই।সবার আলোচনার বিষয়বস্তু অবশ্য ঈশান আর তিতির।সাজিদ চোখ কুচকে শুয়ে আছে অণিমার কোলে মাথা রেখে,তার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা।কিন্তু আড্ডা দেওয়ার মুড ও ষোলআনা।।বিছানার আরেক পাশে নিশি,নূরি আর রিতু বসা।সামনের সোফার ওপর নাইম আর নিয়াজ।
নিয়াজ বারবার আড়চোখে দেখছে নিশিকে,মেয়েটা গাল ফুলিয়ে বসা।আজ আবার সে কি করলো তার হিসেব তো কিছুতেই মিলছে না।মেয়ে মানুষ নিয়ে এই এক সমস্যা। কেনো রাগ করে নিজেরাও জানেনা।
“তোদের কি মনে হয় ঈশান কি করবে?”সাজিদ কপাল ডলে নাইম এর কথায়।ফিচলে হাসে।
“ সেটা কিভাবে বলি।ও শালা এক নাম্বার এর গিরগিটি। এই রেগে যায়,এই সব শান্ত।এখন কি করছে ওই জানে।”
“চল একবার দেখে আসি।শব্দ টব্দ তো পাওয়া যাবেই।এহেম এহেম..মানে কিছু হলে।”
নিয়াজের ঠোঁটকাটা কথায় কুশন ছুড়ে মারলো নিশি।চোখ রাঙিয়ে তাকালো।নিয়াজ বাঁকা হাসলো।কুশন টা জড়িয়ে নিলো বুকের মধ্যে।
“সবার মুখ ফাটা বেলুন এর মতো হলো কেনো!কি আশ্চর্য। নরমাল বিষয় এটা!শব্দ না হওয়াটাই তো আর খারাপ দেখায় তাইনা?পারফরম্যান্স ভালো হলে শব্দটাও জোশ হবে..”
“আহ নিয়াজ থামবি তুই।”নাইমের ধমকেও নিয়াজ থামলো না।বরঞ্চ সবার ধমক,নিশির চোখ রাঙানো সব উপেক্ষা করে একইরকম বিজ্ঞের মতো তার উল্টাপাল্টা বুলি গুলো আওড়াতে রইলো।
“ চল না। দেখে আসি।ওইরকম পুতুলের মতো বউ রেখে শালা কেমনে আজ রাগ দেখায় দেখবো।”
সাজিদ দু দিকে মাথা নাড়ে।একে একে সবার দিকে অসহায় দৃষ্টি বোলায় নিয়াজ।সবাই নাকচ করে দেয়।
নিয়াজ বেশ হতাশ হলো।নিশি মনে মনে এই বেয়াহা লোকটাকে নিয়ে মহা বিরক্ত। ভাইটাও তার,বোনটাও তার।তাদের বাসরে কি হচ্ছে সেটা শুনতে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে এই অসভ্য লোকটা।তাও আবার তারই সামনে।নূন্যতম লজ্জাবোধ যদি থাকে।এই নির্লজ্জ লোকের প্রেমে সে কিভাবে পরেছিলো ভাবতেই মেজাজ খারাপ হয়ে আসে।
নূরির ফোনে ক্রমাগত কল এসে যাচ্ছে।সে বারবার কেটে দিচ্ছে কলটা।উশখুশ করছে রুম থেকে বের হওয়ার।নিশির চোখ এড়ায় নি সেটা।আবার ব্যাস্ত ভঙ্গিতে কলটা কেটে দিতে দেখেই নিশি জিজ্ঞেস করে বসলো নূরিকে,”কে কল করছে।”
নূরি চমকে উঠলো।কেমন একট হাসলো।
“রং নাম্বার বড়পু।”
নিশি কথায় বাড়ায় না।
“ঘুম পাচ্ছে। রুমে যাবেনা।”
“তুই যা।আমরা আসছি।”
নূরি অপেক্ষা করে না আর।দ্রুত হাতে বেড়িয়ে যায় রুম থেকে।
নিজের রুমে এসে দরজা আটকে বুকে হাত দিয়ে শ্বাস ছাড়ে।অল্পের জন্য ধরা পরেনি আজকে।বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।কল ব্যাক করলো কাঙ্খিত নাম্বার টাতে।ওপাশের মানুষ টার অভিমান জরানো গলা শুনতে পাওয়া গেলেো।
“কখন থেকে কল করছিলাম ম্যাডাম।”
নূরি মিষ্টি হাসলো।”আমি তো বলেছিলামই সময় মতো কল করবো।”
“রাত দুটো বাজে।আপনার সময় কখন হতো?আমার বুঝি ঘুম পায়না।ঘুমাবো তো।”
“না করেছিলাম? “
“আপনার সাথে কথা না বলে এই তিন বছরে একদিন ও ঘুমিয়েছি আমি।”
নূরি হেসে ফেললো।প্রশান্তির হাসি।
“জানো ইয়াজ একটা মজার ঘটনা।আজকে লক্ষ্য করলাম হুট করে।”
“কি বলোতো।”
“বড়পুর বয়ফ্রেন্ড এর নাম নিয়াজ।বলেছিলাম না তোমাকে?নিয়াজ ভাই?বড় ভাইয়া বন্ধু?তোমার নাম ইয়াজ।মিল দেখছো?”
ইয়াজ শব্দ করে হাসলো।”কাকে ডাকতে কাকে ডাকবে খেয়াল রেখো।”
“তা ঠিক…শোনো না।”
ওপাশের পুরুষটাও মনোযোগ দিলো।”বলুন ম্যাডাম।”
“তোমার বাড়িতে আমাদের কথা জানিয়েছো?”
খানিকসময় নিয়ে জবাব এলো ওপাশ থেকে।
“জানাবো…”
নূরিকে অধৈর্য লাগলো।”আর কত পরে!তিন বছর হয়ে গেলো।”
“আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না।জোর করে বিয়েও দিচ্ছে না আমাকে।তাহলে এতো তাড়া কিসের? “
নূরি আহত গলায় বললো,”আমাকে তো দিতে পারে।তখন!”
“করে নেবে বিয়ে।”
“ইয়াজ!”
উচ্চস্বরে হাসির আওয়াজ এলো।”মজা করছিলাম তো।”
“আমি জানাবো বাসায়।”
“নাহ…”
এতো জোরে না শুনে চমকে উঠলো নূরি।কান থেকে ফোন খানিকটা সরাতে হলো।ইয়াজ সমালে নিলো সাথে সাথেই।গলা পরিষ্কার করলো।
“মানে আমি ছেলে।আমি আগে বলি।মেয়েদের বাড়িতে জানালে দেখবে দু দিন পর থেকে সম্মন্ধ নিয়ে আসছে তোমার পরিবার।”
“তা ঠিক বলেছো।”
“তা বললে না তো আজকে কিসের ব্যাস্ততা তোমার এতো?”
নূরি কপাল চাপড়ালো। এতো তাড়াহুড়োর মধ্যে বলতে ভুলেই গেছিলো।আফসোস এর সুরে বললো।
“তোমাকে জানাবো,তুমি তো কয়েকদিন ফোনই ধরছো না।তোমাকে নেটওয়ার্ক এই পাইনা।বড় ভাইয়া আর বার্বির বিয়ে হলো।”
ওপাশের ব্যাক্তি চমকে উঠলো বোধহয়।গলায় একরাশ বিষ্ময়।
“ঈশান এর বিয়ে!”
“হুম।”
“বার্বি মানে তোমার ওই ছোট ফুপাতো বোনটা না?”
“হ্যা গল্প করতাম না?”
“ওয়াও ইন্টারেস্টিং। কাজিন লাভ!”
নূরি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।”এখনো লাভ টাভ হয়নি।ভাইয়াকে তো জানোই।একরোখা।হুট করে বিয়ে করানোয় রেগে আছে।তবে সে রাগ ধরে রাখতে পারবে না দেখো…বার্বি কে কাছে পেলে সব কনট্রোল এ পানি ঠেলে ভাইয়া ঠিক গলে যাবে।
“ নূরি রাখি কেমন।সকালে আবার হসপিটাল এ ছুটতে হবে।”
তার কথাগুলো কি ইয়াজ শুনলো না!এভাবে এড়িয়ে গেলো কেনো!তবে সে কথা জিজ্ঞেস করা হলো না।
নূরি ব্যাস্ত হয়ে শুধালো, “ ফিরবে কবে?”
“সামনে সপ্তাহে সম্ভবত।”
“আন্টির শরীর…”
“এখন ঠিক আছে।”
কল কেটে গেলো।ফোনের হোম ওয়ালপেপার দেওয়া ছবিটায় ঠোঁট ছোয়ালো।বাসায় জানাবে সে।কাউকে না জানালেও অন্তত নিশি আর নয়ন আর ঈশান কে জানাবে।অনেকদিনই তো হলো।ইয়াজ বারবার চাকরির দোহাই দিচ্ছিলো,এখন সেটাও পেয়েছে,সেটেল হয়েছে।তার পড়াশোনা চলবে।বিয়ের পর কি পড়াশোনা করে না মানুষ! করে তো।এই যেমন তার বার্বিটার বিয়ে হলো।কত বয়স মেয়েটার।তার কি ওর জীবন আটকে থাকবে!থাকবে না তো।তার বড় ভাইয়া ঠিক পড়াশোনা করাবে।ইয়াজ ও তো তাকে পড়াশোনা করাবে,ক্যারিয়ারে সাপোর্ট করবে।সেটা সে খুব ভালো করে জানে।তাহলে সমস্যা কোথায় আর!তাছাড়া ইয়াজ এর মা অসুস্থ। সে ছেলে মানুষ হয়ে আর কতটা যত্ন নিতে পারে।সে বউ হয়ে গেলে মায়ের মতো আগলে রাখবে একদম।
পুরো দেওয়ান বাড়িতে নিস্তব্ধতা। মধ্যরাত।সবাই ক্লান্ত শরীরে অবশেষে যার যার রুমে চলে গিয়েছে। বাড়িতে এই মূহুর্তে একটা কাকপক্ষীও জেগে নেই।বলা বাহুল্য প্রকৃতির তান্ডব এখনও থামেনি।আর না তো বিন্দুমাত্র কমেছে।টানা বৃষ্টি তে বাইরে হাটু সমান পানি জমে গেছে প্রায়।অসময়ের এমন বৃষ্টির কারণ সবার অজানা।
ইশান চোখ পিটপিট করে তাকালো।ব্যাথায় মুখ কুচকে গেলো।ওষুধ এর ডোজ নেওয়ার টাইম হয়েছে।শরীরটা ভীষন ম্যাজম্যাজ করছে।ধীরে সুস্থে বিছানায় হেলান দিয়ে বসলো।বেড সাইট টেবিল থেকে ব্যাথার ওষুধ বের করে খেলো।হঠাৎ থমকে গেলো সে।মনে পরে গেলো আজ তার বিয়ে ছিলো।ঘরময় ফুলে ফুলে সজ্জিত।চমকে এদিকওদিক তাকালো ঈশান।তিতির কে কোথাও দেখতে পেলো না।বিছানা ছেড়ে উঠে দারালো।এগিয়ে গেলো দরজার দিকে।উঁহু, দরজা ভিতর থেকেই আটকানো।কিন্তু ঘরের কোত্থাও তিতির নেই।
বাইরে ঝড়ের শব্দ কানে বাজছে এখনো।সোফা,বিছানা এমনকি মেঝেতেও নেই।হঠাৎ বেলকনির থাই গ্লাসের দিকে চোখ পরতেই কি মনে করে ছুটে গেলো ওদিকে।দরজা বন্ধ, অথচ পুরো রুমে কেউ নেই।তার মানে একটাই দাড়ায়।গ্লাস ঠেলে সামনে তাকাতেই হতবিহ্বল হয়ে গেলো ঈশান।তার বিশাল বেলকনির মাঝ বরাবর কাত হয়ে পরে আছে তিতির।বৃষ্টির ফেটা আছড়ে পরছে মেয়েটার ওপর।গায়ের শাড়ি প্রায় আধখোলা।বুকের ভিতরটা একটা হার্ট বিট মিস করলো।শ্বাস নিতে ভুলে গেলো মেয়েটার এই অবস্থা দেখে।নিজের ব্যাথার কথা ভুলে ছুটে গেলো তিতির এর কাছে।হাঁটু ভেঙে বসে পরলো।
দমকা হাড়হীম করা ঠান্ডা বাতাসে দাড়িয়ে থাকা কষ্ট কর।সেখানে এই মেয়ে কতক্ষণ এমন পরে আছে কে জানে। দু হাতে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। শাড়ির আচল খানিকটা পেচিয়ে নিলো শরীরে।রুমে নিয়ে যাওয়া দরকার।পাঁজা কোলে তুলতে নিলো,পেটের কাটা থেকে গলগল রক্ত বেরোলো তার।ব্যাথা চোখমুখ খিচে নিলো।তুলতে পারলো না এ যাত্রায়।তার আঘাত অনেকটাই গভীর কিনা..।আঠারো টা সেলাই পরেছে,বাড়ির কাউকে এতো কথা জানায়নি ইচ্ছে করেই।
গালে হাত দিয়ে ডাকলো তিতির কে।প্রচন্ড জ্বর মেয়েটার গায়ে।ঈশানের বুকটা ধকধক করছে।এ কি অবস্থা।চোখমুখ কাজল,লিপস্টিক এ লেপটে আছে।
নিজের পায়ের ওপর মাথা রাখলো তিতিরের।বৃষ্টির তোরে তাকানো যাচ্ছে না।
ব্যাস্ত ভাবে ডাকলো সে,”তিতির, অ্যাই তিতির।”
উষ্ণ হাতের স্পর্শ গালে লাগতেই কিছুক্ষণ পর তাকানোর চেষ্টা করলে তিতির।পারলো না।ঈশানের ঘোলাটে মুখটা চোখের সামনে একবার দেখলো।সে মুখজুড়ে রাজ্যের উদ্বেগ। তিতির এর অবশ্য সেটা স্বপ্নই মনে হলো।চোখ বুজে এলো।দূর্বল হাতে জড়িয়ে ধরলো ইশানের গলা।মুখ গুজলো ঈশানের উন্মুক্ত গলায়।ঈশান এর শরীর কেঁপে উঠলো।
তিতির অস্ফুটস্বরে বললো,”আমার খুব শীত লাগছে ঈশান ভাই।জড়িয়ে ধরবেন একবার?”
ঈশান বাধ্যের মতো কোমড় টা জড়িয়ে ধরলো।তিতির এর শাড়ির বেশিরভাগ অংশই খোলা।নগ্ন পেট আর পিঠে ঈশানের ছোয়া লাগতেই শরীরে শিহরণ বয়ে গেলো তিতিরের।আরও ভিতরে ঢুকে যেতে চাইলো ঈশানের ।মুখ ঘষছে ইশানে বুকে।ঈশান চোখমুখ খিঁচে নিলো।অস্থির হয়ে ওঠা বুকটা তে শান্ত করার উপায় এখন তার নেই,এতো গভীর নারী স্পর্শে সে চেষ্টা করাও বৃথা।তবে নিমিষেই দূর্বল হাতের বাধন ঢিলে হয়ে আসলো তিতিরের।ঈশান আগলে নিলো।
“তুই মাঝরাতে এই ঝড়ের মধ্যে ভিজছিস।এসব বেনারসি পরে!মাথা খারাপ তোর?”
তিতির তখনও ইশানের ভাজ করা হাটুর ওপর।ঈশানের এক হাত তার কোমড়ে,অন্যটা পিঠে।তিতির দু হাত বাড়িয়ে দিলো ঈশানের দিকে।আকুল গলায় বললো,”জড়িয়ে নিন না একবার।”
ঈশান পরখ করলো গোটা নারী দেহকে।দমকা বাতাসে বুকের ওপর থেকে সরে গেছে খোলা শাড়ির আচলখানা।ভেজা শরীরে নারী দেহের ভাজ একদম সুস্পষ্ট। বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা মেয়েটার মুখচোখ,উন্মুক্ত গলায় আছড়ে পরছে।ঢোক গিললো ঈশান।এভাবে এখানে পরে থাকার মানেই হয়না।তিতিরকে আবার কোলে তুলতে উদ্দ্যৎ হলো।নিজের ব্যাথাকে তুচ্ছজ্ঞান করে দাঁতে দাঁত চেপে চুলে নিলো কোলে।
“গা পুরে যাচ্ছে জ্বরে।চল ভিতরে চল।”
তিতির হঠাৎই ছোটাছুটি শুরু করলো।কোলের ওপর।
“ছোবেন না আমাকে।নামান বলছি।এভাবে ওই রুষা কে কোলে তোলেন আপনাদের বিশেষ মূহুর্তের সময়?তাইনা?ঈশান ভাই?”
তিতির এর উল্টাপাল্টা কথায় হতভম্ব হয়ে গেলো ঈশান।মেয়েটা কিসব বলছে।নেহাৎ হুশে নেই।ঘরের দিকে নিয়ে গেলো।ধমকে উঠলো,”শাট আপ।জ্বরের ঘোরে কিসব উল্টাপাল্টা বকছিস!”
ঘরে ঢুকে পা দিয়ে ঠেলে দ্রুত গ্লাস আটকে দিলো।তিতির তখন ভয়াবহ ছোটাছুটি করছে, ঈশানকে সরতে বলছে।জ্বরের তীব্রতায় কথা আটকে আটকে আসছে।ঠোঁট নাড়াচ্ছে,কথা শুনতে প্রায় কান লাগিয়ে দিতে হচ্ছে।
“নামান আমাকে।আমি যাবো না আপনার সাথে। আপনি বেইমান,দুশ্চরিত্র। আমি চলে যাবো,মুক্তি দিয়ে যাবো।থাকবনা এখানে।”
ঈশান কিচ্ছু বললো না।সোজা নিয়ে গেলো ওয়াশরুমে।বসালো বাথটাবে।ভেজা জামাকাপড় না পাল্টালে তারও শরীরের বারোটা বাজবে।তিতির তো মাথাই তুলতে পারছে না।তিতির ঢুলতে ঢুলতে উঠতে চাইলো।জ্বরের প্রকোপে মাথা ঘুরে উঠলো।হেলিয়ে মাথা ঠেকালো বাথটাবে।ঈশান ঝুকলো তার দিকে।দু পাশে হাত রাখলো।তিতির লাল চোখ নিয়ে সরু চোখে তাকানোর চেষ্টা করছে।
“কোথায় যাবি?তোর ওই রাহাত এর কাছে?”
তিতির এর মুখটা চুপসে গেলো।কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো।দু হাতে ঈশানকে ঠেলে সামনে থেকে সরাতে চাইলো।ঈশান হাটু গেড়ে ততক্ষণে বসে পরেছে।আরও সামনে চলে এসেছে।দুজনের নিঃশ্বাস আছড়ে পরছে একে অপরের ওপর।তিতির আবার ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করলো।
,”রাহাত ভাই?তার কাছে আমি বেইমান হয়ে গেলাম তো।আর দেখুন না। না পেলাম আপনাকে।রাহাত ভাই খুব ভালো মানুষ জানেন?”
ঈশান বাঁকা হাসলো।”দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বললে কাকে নিবি?”
তিতির ধ্যান মেরে মাথা হেলিয়ে রাখলো।যেনো ভাবলো কিছু একটা।আবার ঠোট নাড়লো অস্ফুটে।
“আপনি ওই রুষা কে নিলে আমিও রাহাত ভাইকেই নিবো।চলে যাবো আপনাকে ছেড়ে। বহুদূরে যাবো।”
ঈশান আচমকা চেপে ধরলো তিতির এর গাল।ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠলো।দূর্বল হাতে সরাতে চাইলো ঈশানের হাত।ঈশান ছাড়লো না।তিতিরের ঠোঁট জোরা গোল হয়ে ফাঁকা হয়ে আছে ঈশানের হাতের চাপে।
ঈশান মুখ এগিয়ে নিয়ে গেলো। একদম এক ইঞ্চির দুরত্ব দুই জনের অধর জোড়ার মধ্যে। গরম নিঃশ্বাসে দুজনের শরীরে আন্দোলন তুলেছে।
ঈশান হিসহিসিয়ে উঠলো,”খুন করে ফেলবো তোকে।জান নিয়ে নেবো।আরেকবার বল এই কথাটা মরার শখ হয়েছে না?”
তিতির ব্যাথায় শব্দ করে।কেঁদে উঠলো।ঈশান ছেড়ে দিলো গালটা।হাতের দাগ বসে গেছে।দাড়িয়ে পরলো।পরখ করলো মেয়েটাকে। জ্বরের ঘোরে বারবার শাড়িটা সরিয়ে দিচ্ছে।ঠান্ডা লাগছে হয়তো,ভেজা কাপড়ে আরও অস্বস্তি হচ্ছে। ঈশান ঢোক গিললো।কি করবে সে!কাউকে ডাকবে!কি বলবে ডেকে এতরাতে।সে তিতির কে মানতে পারেনি?অন্য মেয়ের সাথে সময় কাটিয়ে এসেছে,তাকে ভালোবাসে এটা শুনে তিতির নিজের এ অবস্থা করেছে!অসম্ভব।
মেয়েটা নিজেও জামাকাপড় পাল্টানোর অবস্থায় নেই।জ্বরের ঘোরে মাতালের মতো কথাবার্তা বলছে,একদম গায়ে শক্তি নেই।ঈশানের কিন্তু একদম শীত লাগছে না।বরং নারী দেহের ছোয়ায় তার শীতল শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।কেমন হাসফাস লাগছে।দ্রুত হাতে গায়ের টি শার্ট খুলে ফেললো। তিতির এর দিকে এগিয়ে মাথার ওপরের শাওয়ার ট না ছাড়লো। বৃষ্টির পানি মাথায় থাকলে এ জ্বর আরও বাড়বে।তিতির শীতে কেঁপে কেঁপে উঠছে।অর্ধ জ্ঞান প্রায়…শাওয়ার বন্ধ করে কাছে ঝুকলো।কাঁপা হাতে শরীর থেকে ভাড়ি বেনারসি টা খুলে ফেললো।ঈশান সরে দারালো।চোখের সামনে বউ নামক নারীটি যদি এমন ভেজা শরীরে…
ঈশান চোখ ডলে।বুকের ভিতর টা স্থির নেই আর।শরীরে মনে হয় কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।তিতির বাথটাবে কাত হয়ে আছে।বা হাত হা বাইরে ঝুলছে।পেটিকেট আর ব্লাউজ গায়ে এই মূহুর্তে। নারী দেহের সমস্ত বাক ভাসছে ঈশানের চোখে।জ্বরে বারবার গুঙিয়ে গুঙিয়ে উঠছে মেয়েটা।সে শব্দও এই মূহুর্তে এত আবেদনময়ী লাগছে।ঈশান দ্রুত নিজের ভেজা প্যান্ট পাল্টে শুকনো প্যান্ট পরে নিলো।তিতির কে কোলে তুলে টুলে বসালো।আলতো হাতে গালে হাত দিয়ে ঝাকায়।
“তিতির…”
“হুমমম..”
“তাকা ভালো করে।দেখ এদিকে। “
“ঠান্ডা লাগছে খুব।”
“আমাকে পুড়িয়ে এখন তোর ঠান্ডা লাগে কিভাবে জবাব দে নির্বোধ… “
“ঠান্ডা..”
“উফফফ্।তাকা ভালো করে।”
তিতির নিভু নিভু চোখে তাকায়।চোখজোড়া রক্তিম একেবারে।পুরো মুখটাই জ্বরে লাল হয়ে এসেছে।
“বোস শক্ত হয়ে।আমি তোর জামা কাপড় নিয়ে আসছি কেমন?”
“বিছানায় যাবো…”
“এভাবে বলবি না।বিছানায় যাবো আবার কি!তাও এমন গুঙিয়ে গুঙিয়ে বলছিস।বুঝিস আমার যন্ত্রণা। মেরে।ফেলবে আমাকে।“
” বিছানা..”
“উফফফ আবার এক কথা।নেবো তো।এভাবে কিভাবে যাবি ভেজা গায়ে।একটু বস।”
তিতির মাথা নাড়ে।ঈশান ধীরে ধীরে ওকে ছেড়ে উঠে দাড়ায়।তিতির হেলেদুলে পরে যেতে যেতে ঈশান আবার ধরে ফেলে।
“মহা সমস্যায় পরলাম তো।এভাবে তোকে বিছানায় কিভাবে নেবো।একটু বোস।আমি কাপড় নিয়ে আসি।”
“কাপড় লাগবে না।ভেজা এগুলো খুলুন আগে।”
ঈশান খালি মুখে বেষম খেলো।তিতির এরইমধ্যে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের ব্লাউজ এর ওপরের দু টো বোতাম খুলে ফেলেছে।ঈশান ঝট করে ঘুরে দাড়ালো।চেঁচিয়ে উঠলো।
“খুলবি না বললাম।”
তিতির এর হাত থেমে গেলো।সে তো জ্বরের ঘোরে এ দুনিয়াতেই নেই।এমন ধমক তার পছন্দ হলো না।হু হু করে কেঁদে ফেললো।এমনিতেই মাথা যন্ত্রণা করছে তার ওপর শীতে শরীর হীম হয়ে আসছে।এখন বিছানায় লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর সময়।এখানে ভেজা কাপড়ে বসে থাকবে নাকি সে! কান্নার শব্দে বিরক্ত মুখে ঘুরে তাকালো ঈশান।তার শরীর এখন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই।অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল হয়ে উঠেছে কেমন।উত্তাপ বেরোচ্ছে শরীর থেকে।না চাইতেও চোখ চলে গেলো তিতিরের আধা উন্মুক্ত বক্ষজোড়ার দিকে।ভিতরের কালো ইনার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।ঈশান জোরে জোরে শ্বাস নিলো।দু হাতে মাথার চুল খামচে ধরে দ্রুত হাতে নিজের হাতের তোয়ালে তিতির এর বুকের ওপর ছড়িয়ে দিলো।
“এখানে বসতে বলেছি।আমি যাবো আর আসবো।আর কিছু খুললে কিন্তু আজ তোর সর্বনাশ করে ছাড়বো। তারপর সকালে উঠে দুশ্চরিত খেতাব আমার গলায় ঝোলালে আবার দ্বিতীয় দফা সর্বনাশ করে বাচ্চা ধরিয়ে দেবো একটা।একসাথে বড় হোস তখন দুজন।বেয়াদব মেয়ে।”
তিতির এর বোধগম্য হলো কি না সব কথাগুলো বোঝা গেলো না।তবে নাক ফোলালো।কেঁদে ফেলবে আবার।ঈশান ধমকে উঠলো।
“কাঁদবি না বললাম।আমাকে সিডিউস করার ধান্দা খালি।”
ঈশান দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে।পুরো আলমারি খুঁজে একটা নরমাল জামা পেলো না।সব শাড়ি। মেজাজ দারুণ খারাপ হচ্ছে এবার।রাতভর এভাবে জ্বরের মানুষ বসিয়ে রেখে তারওপর সে মেয়ে তো তাকে আজ পাগল করতে উঠেপড়ে লেগেছে।সন্ধ্যা রাতে ডিভোর্স চেয়ে মাঝরাতে কনট্রোল হারিয়ে বাসর সেরে ফেললে বিষয়টা নিশ্চয়ই ভালো দেখায় না।তার সব প্ল্যান এক ধাক্কায় জলে যাবে।তখন আরেক সমস্যা।
সাঁঝের মায়া পর্ব ২০
শাড়ি সে পড়াতে জানেনা।বাধ্য হয়ে নিজের শার্ট বের করলো আলমারি থেকে।বাথরুম এর দরজায় গিয়ে পা আটকে গেলো।খোদা জানে গিয়ে আবার বউ নামক নির্বোধ টাকে কি খোলা অবস্থায় দেখবে।ভয়ই করছে ঢুকতে।জোরেসোরে শ্বাস নিলো।এবার কিছু খুলে বসে থাকলে তারও কিছু করার থাকবে না আর।নিজের কোমড়ের বাকিটুকু খুলে ফেলে রাত টা এনজয় করা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না তার।সম্ভবই না আর কনট্রোল করা।আগুন এসে শরীর ঘেষবে আর সে পুড়বে না সেটা সম্ভব! পারবে সে!সে তো পুরুষ।হালাল এর সার্টিফিকেট নিয়ে এমন কাছে টানলে দিনদুনিয়া ভুলবে না সে! চোখ বন্ধ করে বাথরুম এ পা রাখলো সে।দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকালো সামনে।মূহুর্তে তার দুনিয়া থেমে গেলো।হৃদপিন্ড টা খাচা ছেড়ে বেড়িয়ে এলো বলে।দু হাতে বা পাশে চেপে ধরলো সে।চোখ বন্ধ করে পিছিয়ে গিয়ে ধাক্কা খেলো দেয়ালে।
