খান সাহেব পর্ব ৯২ (২)
সুমাইয়া জাহান
রাত তখন নিঝুম। অফিসার আলিয়া আজই ফিরে গেছেন। সুমু অনেক অনুরোধ করেছিল থেকে যাওয়ার জন্য, কিন্তু আলিয়া থাকেননি। দায়িত্বের ভার তাকে থাকতে দেয়নি।
পিকনিক শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শেরাজ আজ অন্যরকম আচরণ শুরু করছিল। সে এক মুহূর্তের জন্যও শেখ বাড়িতে দাঁড়ায়নি। অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো ছিল তার মাঝে। সবাইকে সে কড়া নির্দেশ দিয়ে এসেছে যেন আজ রাতে তারা সবাই শেখ বাড়িতেই থাকে। এমনকি কলিজার টুকরো সিমরান আর শেরানকেও সে সঙ্গে আনেনি, তাদের সারবাজ আর ইনায়ার কাছে রেখে এসেছে।
বাংলোর বিশাল ড্রয়িংরুমে তখন ঘড়ির কাঁটার ‘টিক টিক’ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। শেরাজ রুমে এসে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে, চোখ দুটো বন্ধ কিন্তু কপাল জুড়ে চিন্তার গভীর রেখা। সুমু ধীর পায়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। আজ কেন জানি এই চেনা বাংলোটাকে তার খুব অচেনা আর ভয়ংকর মনে হচ্ছে।
শেরাজ চোখ না খুলেই খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল,
“দরজাটা লাগিয়ে দাও সুমু।”
সুমুর বুকটা ধক করে উঠল। সে কম্পিত হাতে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে শেরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ এবার চোখ খুলল। সে ধীরস্থিরভাবে সোফা থেকে উঠে সুমুর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। সুমু অনুভব করল শেরাজের শরীরের তপ্ত উত্তাপ। শেরাজ তার চিবুকটা খুব আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল, ঠিক যেভাবে সে ওমানের সেই দিনগুলোতে করত। খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলতে শুরু করল,
“আলিয়া কি তোমাকে সেই ডায়েরিটা দিয়ে গেছে, সুমু? যে ডায়েরিতে তুমি আমার পাঁচ বছরের দণ্ডাদেশ লিখে রেখেছিলে?”
সুমু কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সে শুধু বড় বড় চোখ করে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ এবার সুমুর কানের কাছে মুখ এনে বলল,
“তুমি ভেবেছিলে মেডিসিনের ডোজ দিয়ে আমাকে একটা জীবন্ত লাশে পরিণত করে তুমি শান্তি পাবে? তুমি ভেবেছিলে আমাকে ভুলিয়ে রেখে তুমি আমার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবে? সুমু… সবকিছু ভুলে থাকাটা আমার জন্য যত না সহজ ছিল, আমার স্মৃতি ফিরে আসার পর এই হাসিখুশি মানুষের মুখোশ পরে থাকাটা তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি যন্ত্রণার ছিল।”
তার গলার স্বর এবার একটু কেঁপে উঠল। সে সুমুর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমাকে মুক্তি দাওনি। তুমি আমাকে এমন এক কারাগারে বন্দি করেছ যার চাবিটা তুমি নিজের হাতে নিয়ে পাঁচ বছর জেলের ভেতরে বসে ছিলে। আমাকে জীবন্ত রেখে তুমি প্রতিদিন আমার আত্মাকে খুন করেছ। বলতে পারো… কেন আমার সাথে এই নিষ্ঠুরতা করলে?”
সুমু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে শেরাজের বুকে আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু আজ শেরাজের হাত দুটো সুমুকে জড়িয়ে ধরার জন্য আগের মতো এগিয়ে এলো না। সে বরফের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সুমুকে সরিয়ে দিল। উন্মাদের মতো পুরো ঘরে ভাঙচুর করতে শুরু করল। বাংলোর বিশাল ঘরটি মুহুর্তেই নরককুণ্ডে পরিণত হলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা হাতের এক ঝটকায় চুরমার করে দিল সে। কাচের টুকরোগুলো তার হাতে বিঁধে রক্ত ঝরছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। ঘরের কোণায় থাকা শোপিস, ফুলদানি—সবকিছু আছড়ে ফেলছে মেঝেতে। সুমু দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কাঁপছে, তার দুচোখ দিয়ে প্লাবনের মতো জল নামছে। শেরাজ সুমুর গায়ে হাত তুলছে না, কিন্তু নিজের প্রতিটি আঘাতেই যেন সে সুমুকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে।
হঠাৎ শেরাজ এসে সুমুর একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। তার চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেছে, সেখান দিয়েও যেন আগুনের সাথে সাথে জল ঝরছে। সে সুমুর পেছনের দেয়ালে সজোরে এক ঘুষি মারল।
“কোন সাহসে!” শেরাজের কণ্ঠস্বরটা ঘর কাঁপিয়ে গর্জে উঠল, “কোন সাহসে তুমি ওই জেলের কালকুঠুরিতে যাওয়ার কথা চিন্তা করলে সুমু? স্রেফ এই বিয়েটার জন্য আমি এতদিন নিজেকে শান্ত রেখেছিলাম, এই হাসিখুশি মানুষের মুখোশটা পরেছিলাম। কিন্তু এবার বলো… এতো বড় কলিজা কীভাবে হলো তোমার?” সে নিজের রক্তাক্ত হাতটা সুমুর চোখের সামনে ধরল, “কার পারমিশনে আমার অপরাধের শাস্তি তুমি নিজের মাথায় নিয়েছ? আমি অপরাধী ছিলাম, আমি খুন করেছি—তবে সেই দায় কেন আমার স্ত্রীর কাঁধে উঠবে? তুমি কি একবারও আমার ওই নিষ্পাপ সন্তানদের কথা ভাবোনি?”
সুমু কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। শেরাজ এবার সুমুর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরল।
“একবারও কি মাথায় আসেনি যে ভবিষ্যতে আমি যখন এসব জানতে পারব, তখন আমি তোমার সাথে কী করব? তুমি আমাকে মেডিসিন দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চেয়েছিলে? আমাকে একটা জীবন্ত জড় পদার্থ বানিয়ে তুমি মহান হতে চেয়েছিলে? ধিক্কার জানাই আমি তোমার এই ভালোবাসাকে।” সে পিছু হটে পাগলের মতো হাসতে শুরু করল, “কোন সাহসে আমার সন্তানদের দায়িত্ব ছেড়ে তুমি জেলের চার দেয়ালের মাঝে গিয়ে বসে রইলে? তুমি জানো, আমি বেঁচে থাকতে আমার সন্তানদের ‘কয়েদির সন্তান’ হিসেবে বড় হতে দিয়েছ তুমি। তুমি আমাকে তিলে তিলে মারতে চেয়েছ সুমু, আর তাতে তুমি সফল হয়েছ।”
শেরাজ মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে জানালার পর্দাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল। তার সারা শরীর থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুমি ভেবেছিলে আমি কিছুই জানব না? এই পাঁচটা বছর আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে যন্ত্রণা অনুভব করেছি। তুমি আমাকে বাঁচাওনি সুমু, তুমি আমাকে এমন এক দোজখে পাঠিয়েছ যেখানে প্রতিদিন শুধু তোমার এই ত্যাগের বোঝা আমাকে পিষে মারবে।”
সুমু আর্তনাদ করে শেরাজের পায়ে লুটিয়ে পড়ল,
“আমাকে মাফ করে দিন খান সাহেব! আমি শুধু আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”
শেরাজ সুমুকে না ছুঁয়েই কয়েক পা পিছিয়ে গেল,
“বাঁচাতে চেয়েছিলে? নাকি আমাকে এই নরকের আগুনে সারাজীবনের জন্য জ্বালিয়ে মারতে চেয়েছিলে? তোমার এই ত্যাগের ঋণ শোধ করার শক্তি তো আমার নেই সুমু। আমার সন্তানদের তুমি এতিম করেছিলে ওদের মা বেঁচে থাকতেও—এই অপরাধের কোনো ক্ষমা হয় না।”
সে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে বসে পড়ল, তার চারপাশটা রক্ত আর ভাঙা কাঁচের টুকরোয় ছড়ানো। সুমু ডুকরে কেঁদে উঠে তার দিকে এগোতে চাইলে শেরাজ হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। তার চোখে আজ যে ঘৃণা, সেটা সুমুর প্রতি নয়—সেটা নিজের প্রতি। সে রক্তভেজা হাতটা নিজের কপালে চেপে ধরে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
“আজ পর্যন্ত রাগের মাথায় কখনো তোমাকে আঘাত করা তো দূরে থাক… তোমাকে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ পর্যন্ত বলিনি। সবসময় আগলে রেখেছি যেন পৃথিবীর কোনো আঁচ তোমাকে ছুঁতে না পারে। আর তুমি? কী প্রমাণ করলে তুমি? তুমি অনেক মহান? তুমি খুব বড় আত্মত্যাগী?”
শেরাজ মাথা তুলে সুমুর দিকে তাকাল, সেই চাহনিতে আজ এক আকাশ সমান অভিমান। সে হাসল, তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপ মিশে আছে,
“আমাকে তুমি সারাজীবনের জন্য অপরাধী করে দিলে সুমু। জেলের ওই চার দেয়ালের প্রতিটা ইটে আমার নাম লেখা হয়ে গেছে। মানুষজন মনে মনে কি বলে জানো? বলে, শেরাজ খান আজ মুক্ত, আর তখন আমার কানে বাজে—হ্যাঁ, আমি সেই মানুষ যার জন্য আমার নিরপরাধ বউটা পাঁচটা বছর তিলে তিলে জেলের কালকুঠুরিতে শেষ হয়েছে।”
সে নিজের বুকটা সজোরে থাপ্পড় মেরে বলতে লাগল,
“আমি একটা লুজার! আমি স্বামী নামের কলঙ্ক। যে পুরুষ নিজের স্ত্রীকে রক্ষা করতে পারে না, বরং স্ত্রীর আঁচলের তলায় নিজের অপরাধ লুকিয়ে প্রাণ বাঁচায়, তার চেয়ে বড় কাপুরুষ এই পৃথিবীতে আর কে আছে? তুমি আমাকে এমন এক অন্ধকার গর্তে ফেলে দিয়েছো, যেখান থেকে আমি চাইলেও আর কোনোদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না।”
সুমু ফুপিয়ে কেঁদে উঠল,
“খান সাহেব, বিশ্বাস করুন… আমি শুধু আমাদের সন্তানদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে চেয়েছিলাম।”
“ভবিষ্যৎ?” শেরাজ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে উত্তর দিল, “যে ভবিষ্যতের ভিত্তিটা গড়ে উঠেছে মিথ্যে আর তোমার ওপর হওয়া এই অমানবিক অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই ভবিষ্যৎ দিয়ে আমি কী করব? আমার সন্তানরা যখন জানবে তাদের বাবা আসলে একজন খুনি, যে তার মাকে তার অপরাধের দায়ে জেলে পাঠিয়ে বাইরে রাজত্ব করেছে, তখন তারা আমাকে শ্রদ্ধা করবে? নাকি ঘৃণাভরে আমার মুখে থুতু দেবে?”
শেরাজ টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল। সে জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“তুমি আমাকে তিলে তিলে মারার সব আয়োজন করে রেখেছিলে সুমু। ওমানের সেই রাতের চেয়ে আজ আমার অনেক বেশি মরে যেতে ইচ্ছা করছে। তুমি আমাকে পৃথিবীর সব থেকে ঋণী আর সব থেকে ছোট মানুষ বানিয়ে দিলে।”
সুমু টলমল পায়ে শেরাজের দিকে এগিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা যেন শতধা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। যে মানুষটাকে সে পৃথিবীর সমস্ত কিছুর বিনিময়ে রক্ষা করতে চেয়েছিল, আজ সেই মানুষটাই নিজের অস্তিত্বের কাছে হেরে গিয়ে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। সুমু আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সে আছড়ে পড়ল শেরাজের বুকের ওপর। দুহাতে শক্ত করে জাপটে ধরল তার রক্তাক্ত আর বিধ্বস্ত খান সাহেবকে। সে শেরাজের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ভাঙা গলায় বলতে লাগল,
“আমায় মাফ করে দিন… আমায় মেরেই ফেলুন আপনি। আমি সইতে পারছি না। আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনি ভালো থাকুন। আমি শুধু আমাদের সংসারটা বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”
কিন্তু আজ এক অদ্ভুত পরিবর্তন। ওমানের সেই উত্তাল রাত হোক কিংবা বাংলাদেশ—সুমু যখনই কেঁদেছে, শেরাজের শক্ত দুটো হাত তাকে আগলে নিয়েছে। কিন্তু আজ সেই হাত দুটো নিথর। সে সুমুকে সরিয়ে দিল না ঠিকই, কিন্তু তাকে কাছে টেনেও নিল না। সে বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। সুমু অনুভব করল, শেরাজের এই নিস্পৃহতা তাকে হাজারটা চড়ের চেয়েও বেশি আঘাত করছে। সে শেরাজের শার্ট খামচে ধরে আরও জোরে কাঁদতে লাগল,
“আপনি আমায় বকুন, মারুন… যা ইচ্ছা করুন! কিন্তু এভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন না। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।”
শেরাজ এবারও নড়ল না। তার দৃষ্টি জানালার ওপারে অন্ধকারের দিকে নিবদ্ধ। তার শরীরটা সুমুর আলিঙ্গনে থাকলেও, মনটা যেন হাজার মাইল দূরে কোনো এক নির্জন প্রান্তরে চলে গেছে। সে খুব নিচু আর নিস্প্রাণ স্বরে বলল,
“ছেড়ে দাও সুমু। যে স্পর্শে একসময় আমার প্রাণ ফিরে আসত, আজ সেই স্পর্শ আমাকে দগ্ধ করছে। তুমি আমাকে স্পর্শ করার অধিকার হারিয়েছ কি না জানি না, তবে আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি।”
তার কণ্ঠস্বর এতোটাই নির্লিপ্ত, যে মনে হচ্ছিল তার ভেতরের সব অনুভূতি আজ মারা গেছে। সুমু অনুভব করল, সে যাকে আজ জড়িয়ে ধরে আছে, সে তার চেনা সেই ভালোবাসার মানুষটা নয় বরং এক চরম অপমানে বিদ্ধ হওয়া এক পরাজিত সত্তা। শেরাজ আলতো করে সুমুর হাত দুটো নিজের শরীর থেকে সরিয়ে দিল। কোনো জোর নেই, কোনো ঘৃণা নেই—আছে কেবল এক বুক শূন্যতা। সে সুমুর চোখের দিকে না তাকিয়েই ভাঙচুর করা সেই ঘরের মাঝখানে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চারপাশটা কাচের টুকরো ছড়ানো, ঠিক যেমন তার হৃদয়ের টুকরোগুলো ছড়িয়ে আছে। সে একনাগাড়ে বলে যাচ্ছে তার পরাজয়ের গল্প, তার লজ্জিত হওয়ার কাহিনী। একেকটি শব্দ যেন চাবুকের মতো সুমুর কানে বাজছে। সে আর সইতে পারছে না। এই মানুষটার মুখ থেকে নিজের প্রতি এমন ঘৃণা সে নিতে পারছে না।
শেরাজ যখন আবারও বলতে শুরু করল,
“আমি একটা অভিশপ্ত মানুষ সুমু, যার জীবন বাঁচাতে তার স্ত্রীকে…”
কথাটা শেষ করার আগেই সুমু ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। শেরাজের মুখ বন্ধ করার আর কোনো উপায় তার জানা ছিল না। সে উন্মাদের মতো নিজের অধর শেরাজের অধরে মিশিয়ে দিল। এক তীব্র হাহাকার আর অধিকারবোধ থেকে সে শেরাজকে আঁকড়ে ধরল। সে তার শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করল তাকে স্তব্ধ করতে। কামড়ের তীব্রতায় শেরাজের অধর ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো, নোনতা রক্তের স্বাদ সুমুর মুখে লাগল, তবুও সে ছাড়ল না।
শেরাজ প্রথমে পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকলেও, সুমুর এই বন্য ভালোবাসার কাছে সে হার মানল। তার ভেতরের জমে থাকা পাঁচ বছরের তৃষ্ণা আর আজকের এই বিষাক্ত অভিমান একাকার হয়ে গেল। সে সুমুর কোমর জাপ্টে ধরে তাকে এক ঝটকায় নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। কিছুক্ষণ পর, সুমু শেরাজকে আরও নিবিড়ভাবে পেতে চাইল, সে তাকে নিজের দিকে টানল। শেরাজও সেই আবেশে নিজেকে ছেড়ে দিল। কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে সুমু তাকে নিয়ে মেঝের ওপর শুয়ে পড়তে চাইল, কিন্তু শেরাজের অবচেতন মন সজাগ হয়ে উঠল। সে দেখল মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ধারালো কাচের শত শত টুকরো। নিজে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও, সুমুর গায়ে একটা আঁচড় লাগুক—তা শেরাজ কোনোদিন হতে দেয়নি, আজও দিল না। সুমুর পিঠ মেঝেতে স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তে শেরাজ বিদ্যুতবেগে নিজের রক্তাক্ত হাতদুটো সুমুর পিঠের নিচে পেতে দিল। সুমুর পুরো শরীরের ভার এখন শেরাজের হাতের ওপর।
কাচের টুকরোগুলো শেরাজের হাতের তালুতে গভীরভাবে বিঁধে গেল। নতুন করে তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হলো, কিন্তু শেরাজের মুখে কোনো যন্ত্রণার শব্দ নেই। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সুমু অনুভব করল সে কোনো শক্ত কিছুর ওপর নয়, বরং শেরাজের সুরক্ষার ঢালের ওপর শুয়ে আছে। শেরাজের হাতের রক্তে সুমুর পিঠ ভিজে উঠছে। সে চোখ খুলে দেখল শেরাজের মুখটা ব্যথায় কিছুটা কুঁচকে থাকলেও তার চোখে কেবল সুমুর জন্য এক গভীর, অতলান্ত প্রেম।
সুমু বুঝতে পারল, এই মানুষটা তাকে ঘৃণা করতে চাইলেও পারবে না, নিজেকে শেষ করে দিলেও তাকে সে ব্যথার ভাগ দেবে না। সে ফিসফিস করে বলল,
“কেন এতোটা ভালোবাসেন? কেন নিজেকে এভাবে শেষ করছেন আমার জন্য?”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু তার রক্তাক্ত হাত দিয়ে সুমুকে আরও শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল। সুমু শেরাজের ঘাড় জড়িয়ে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে, আরও গভীরভাবে নিজের সত্তায় মিশিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু শেরাজের শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা যেন এক মুহূর্তের জন্য বিদ্রোহ করে উঠল। সে হঠাৎ নিজেকে সামলে নিল। সে যেন নিজেকে এই মুহূর্তে সুমুর ভালোবাসার যোগ্য মনে করতে পারছে না। কোনো কথা না বলে, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সুমুকে মেঝে থেকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। সুমু ভেবেছিল শেরাজ হয়তো তাকে হৃদয়ের আরও কাছে টেনে নেবে, কিন্তু শেরাজের মুখ তখন থমথমে। সে সুমুকে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। সুমু যখন হাত টেনে ধরে তাকে কাছে টানতে চাইল, শেরাজ নিজের রক্তাক্ত হাতটা খুব সন্তর্পণে ছাড়িয়ে নিল। সে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমুর চোখের দিকে না তাকিয়েই দ্রুত পায়ে ঘরের বেলকনির দিকে চলে গেল। সুমু বিছানায় অর্ধশায়িত অবস্থায় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
বেলকনিতে গিয়ে শেরাজ রেলিংটা শক্ত করে ধরল। তার হাতের ক্ষত থেকে রক্ত গড়িয়ে রেলিং বেয়ে নিচে পড়ছে। বাইরের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস তার তপ্ত শরীরে এসে লাগছে, কিন্তু তার ভেতরের আগুন নেভাতে পারছে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে নিজেকেই যেন প্রশ্ন করছে—কেন সে বেঁচে ফিরল? কেন সুমু তাকে এমন এক দোজখে রেখে দিল যেখানে নিজের অস্তিত্বকে আজ তার সবথেকে বড় বোঝা মনে হচ্ছে?
পেছন থেকে সুমুর কান্নার আওয়াজটা তার মস্তিস্কের কোষে কোষে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে বেলকনির অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করে রাখল, যেন চাঁদের আলোও তার এই পরাজয় দেখতে না পায়। সে আজ সুমুর সামনে দাঁড়াতে লজ্জিত, তাকে ভালোবাসতে লজ্জিত।
বিছানায় পড়ে থাকা সুমু আর স্থির থাকতে পারল না। শেরাজের ওই রক্তাক্ত হাত আর বেলকনির নির্জনতায় তার একা ভেঙে পড়া—সুমুর কলিজায় তীরের মতো বিঁধছে। সে নিজের এলোমেলো চুল আর শাড়ি সামলে নিয়ে ধীর পায়ে আলমারি থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা বের করল। বেলকনিতে গিয়ে দেখল শেরাজ তখনো রেলিং ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। রক্তমাখা হাতটা ঝুলে আছে নিচে, আর টুপটুপ করে রক্ত নিচে পড়ছে। সুমু নিঃশব্দে শেরাজের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ টের পেলেও পেছনে ফিরল না, শুধু কর্কশ গলায় বলল,
“ভেতরে যাও সুমু। আজ আমার পাশে কোনো মানুষ নয়, শুধু অন্ধকার থাকা প্রয়োজন।”
সুমু কোনো কথা বলল না। সে জোর করে শেরাজের সেই রক্তাক্ত হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় নিল। শেরাজ হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু সুমু আজ দমবার পাত্রী নয়। সে দাঁত চেপে শেরাজের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখা অবস্থায় বলল,
“আমাকে পর ভাবলে হাত সরিয়ে নিন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত ঝরা মানে আমার আত্মা থেকে এক ফোঁটা পরমায়ু কমে যাওয়া। আপনি কি আমাকে মারতে চান?”
শেরাজ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সুমু খুব সাবধানে কটন আর অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে শেরাজের হাতের তালু আর শরীরের বাকি অংশ থেকে কাচের টুকরোগুলো বের করতে শুরু করল। একেকটা কাচ বের করার সময় শেরাজের শরীর যন্ত্রণায় কেঁপে উঠছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কাঁপছে সুমুর বুক। সুমুর চোখের জল টুপটুপ করে শেরাজের ক্ষতবিক্ষত হাতের ওপর পড়ছে।
শেরাজ একসময় নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল সুমু খুব যত্ন করে তার ক্ষতে ব্যান্ডেজ বাঁধছে। সুমুর চোখের জলে ভিজে তার হাতের রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে। শেরাজের পাষাণ হওয়া মনটা এবার আর পারল না। সে খুব নিচু স্বরে বলল,
“কেন করলে এসব? আমি তো সেদিন নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম।”
সুমু মুখ তুলল। সে ব্যান্ডেজটা শক্ত করে বেঁধে দিয়ে শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি নিজেকে শেষ করবেন আর আমি দাঁড়িয়ে দেখব? পাঁচটা বছর জেলের ওই অন্ধকার সেলে রাত কাটাতে কাটাতে আমি শুধু একটাই স্বপ্ন দেখতাম— ‘একদিন আমি আপনার পাশে থাকব, আপনার সেবা করব, আমাদের সন্তানদের নিয়ে একটা সুন্দর সংসার হবে আমাদের। আজ আপনি সেই স্বপ্নটাকে এভাবে কাচের মতো চুরমার করতে চাইছেন?” সে শেরাজের ব্যান্ডেজ করা হাতটা নিজের গালে চেপে ধরল, “আপনি আমাকে অপরাধী বলছেন কারণ আমি আপনাকে বাঁচিয়েছি? বেশ! তবে আমাকে আজীবনের সাজা দিন। কিন্তু আমাকে দূরে ঠেলে দেবেন না, খান সাহেব। আপনার এই ক্ষতগুলো আমার হাতেই সারতে হবে। কারণ এই ক্ষতগুলো আপনার শরীরে নয়, আমার হৃদয়ে হয়েছে।”
সে শেরাজের চোখের গভীরে নিজের দৃষ্টি ডুবিয়ে দিয়ে আবারও ফিসফিস করে বলল,
“বড় বেশি তৃষ্ণার্ত আমি খান সাহেব! এই পাঁচটা বছর জেলের ওই পাথুরে দেয়ালে কান পেতে আমি শুধু আপনার হৃদস্পন্দন শুনতে চেয়েছি। আজ যখন আপনি আমার সামনে, তখন দোহাই লাগে— এভাবে দূরে ঠেলে দিবেন না।” তার গলার স্বর কান্নায় ভেঙে আসছিল। সে শেরাজের শার্ট কলারটা খামচে ধরে আরও কাছে টেনে নিল, “আপনি আমাকে পাপী বলুন, নিষ্ঠুর বলুন, কিন্তু আপনার ওই বুকের প্রশস্ত আলিঙ্গন থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না। আমার পাঁচ বছরের সবটুকু দহন আজ আপনার ওই একটুখানি সান্নিধ্য পেলেই জুড়িয়ে যাবে। আমি তৃষ্ণার্ত আপনার ভালোবাসার জন্য, আপনার ওই শাসনের জন্য।”
শেরাজ নির্বাক। তার ভেতরে যে ক্রোধ আর অপরাধবোধের ঝড় বইছিল, সুমুর এই নিঃশর্ত আত্মনিবেদনের সামনে তা যেন মুহূর্তেই দিশেহারা হয়ে গেল। সে দেখল সুমুর চোখে এক গভীর শূন্যতা, যা কেবল সে-ই পূরণ করতে পারে। সুমুর ঠোঁট কাঁপছে, সারা শরীর কাঁপছে এক অজানা আশঙ্কায়—যদি শেরাজ সত্যিই তাকে ছেড়ে দেয়।
শেরাজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরের পাথরটা গলে জল হয়ে গেল। সে তার ব্যান্ডেজ করা আহত হাত দুটো দিয়েই সুমুকে সজোরে নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল। সুমু যেন এই আশ্রয়টুকুর জন্যই চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিল। সে শেরাজের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ছোট বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। শেরাজ তার চুলে মুখ ডুবিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস সুমুর মাথায় এক অদ্ভুত শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। সে সুমুর কপালে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিয়ে তাকে যেন এক পবিত্র বন্ধনে আবার বেঁধে নিয়ে আলতো করে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। এবার আর বিছানায় ফেলে দিতে নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিতে সে ঘরের ভেতরে পা বাড়াল।
সে সুমুকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে নিজেকে আজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সুমুর প্রতি তার ভালোবাসা আছে, কিন্তু সেই ভালোবাসার সাথে মিশে আছে পাঁচ বছরের প্রতারণার এক বিষাক্ত যন্ত্রণা। সে সুমুর ওপর উপুড় হয়ে নেমে এলো। তার আদরে আজ কোনো প্রেম নেই, আছে যেন কেবল এক পৈশাচিক অধিকারবোধ। সে যেন এই শরীরের ওপর নিজের সব রাগ, সব অভিমান আর সবটুকু হাহাকার উজাড় করে দিতে চাইল। তার প্রতিটি ছোঁয়ায় আজ নিষ্ঠুরতা। সুমুর কোমল ত্বকে শেরাজের আঙুলের ছাপ বসছে, তার দাঁতের আঘাতে সুমুর কাঁধ আর গলায় রক্তের দাগ ফুটে উঠছে। শেরাজের ব্যান্ডেজ করা হাত থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত সুমুর দেহে আলপনা তৈরি করছে। সুমু একবারের জন্যও তাকে বাধা দিল না। সে চোখ বন্ধ করে দাঁত চেপে সবটুকু দহন সহ্য করে নিচ্ছে। শেরাজ যখন তার বাহু কামড়ে ধরছে কিংবা তার পিঠের নখ বসিয়ে দিচ্ছে, সুমু তখন কেবল ডুকরে কেঁদে উঠছে—কিন্তু সেই কান্না কোনো যন্ত্রণার নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রাপ্তির। সে ভাবল, শেরাজ যদি এভাবে রাগ ঝেড়ে একটু শান্তি পায়, তবে সে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতেও রাজি।
শেরাজ উন্মাদের মতো সুমুর অধরে নিজের অধিকার দাবি করছে। তার প্রতিটি চুম্বনে যেন এক একটা প্রশ্ন, “কেন আমাকে লুজার বানালে? কেন আমাকে অপরাধী করলে?” সুমুর দেহ আজ এক রণক্ষেত্র। শেরাজের এই বন্য আদর তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে, তার শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে শেরাজকে আরও জাপ্টে ধরল। সে শেরাজের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিয়ে তাকে আরও গভীরে পেতে চাইল। শেরাজ যখন তার গলায় মুখ গুঁজে হিংস্রভাবে নিজের দাঁত বসাল, সুমু ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে শেরাজের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আরও… আরও কষ্ট দিন আমাকে। আপনার সবটুকু ঘৃণা দিয়ে আমাকে পুড়িয়ে ফেলুন। তবুও আমাকে ছেড়ে যাবেন না। বাঁচতে পারব না আপনাকে ছাড়া।”
শেরাজের হিতাহিতজ্ঞান আজ লোপ পেয়েছে। সে সুমুকে কোনো ফুলের মতো নয়, বরং কোনো এক যুদ্ধজয়ের লুটের মালের মতো নিজের করে নিচ্ছে। তাদের এই মিলন আজ কোনো বসন্তের গান নয়, বরং এক কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডব। বিছানার চাদর দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। রাতের সেই প্রহরগুলো যেন আর ফুরাতে চায় না। সময় থমকে গেছে সেই বিধ্বস্ত ঘরের ভেতর, যেখানে ভালোবাসার চেয়েও বেশি ছিল প্রতিশোধের হাহাকার। শেরাজ ধীরে ধীরে শান্ত হবার বদলে আরও হিংস্র হয়ে উঠছে। তার পুরুষালি সত্তা আজ সুমুর ওপর একাধিপত্য কায়েম করতে গিয়ে নিজের সমস্ত মানবিকতা বিসর্জন দিচ্ছিল।
সে সুমুর দুহাত মাথার ওপর সজোরে চেপে ধরল। তার হাতের তাজা রক্ত সুমুর কবজিতে গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু শেরাজ ভ্রুক্ষেপহীন। সে সুমুর কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলল,
“তুমি চেয়েছিলে না তোমার খান সাহেবকে কাছে পেতে? তুমি চেয়েছিলে না পাঁচ বছরের তৃষ্ণা মেটাতে? তবে সহ্য করো! আমার ভেতরের এই বিষাক্ত দহন সহ্য করো।”
সে কোনো দয়া দেখাল না। সে আবারও যখন সুমুর ক্ষতবিক্ষত অধরে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল, সুমু যন্ত্রণায় চিৎকার করতে চেয়েও পারল না। তার গলা বুজে এসেছে। সে শুধু দেখল, অন্ধকারের মাঝে শেরাজের চোখ দুটো পশুর মতো জ্বলছে—সেখানে আজ প্রেমের কোনো ছিটেফোঁটা নেই, আছে শুধু বছরের পর বছর জমানো অপমান আর অবহেলার তীব্র প্রতিচ্ছবি। শেরাজ তাকে বারবার উল্টে-পাল্টে নিজের কামনার লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছিল। কোনো আদরেই যেন তার শান্তি নেই। সুমুর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, তবুও শেরাজ থামছে না। এক সময় সে সুমুর বুকের ওপর সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে নিথর হয়ে পড়ল। তার ঘাম আর রক্ত মিশে একাকার হয়ে সুমুর শরীরে লেপ্টে গেছে। সুমু আধোবোজা চোখে দেখল, শেরাজ তার গলার খাঁজে মুখ লুকিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন এক একটা অভিশাপ ঝরে পড়ছে। সুমু নিজের সমস্ত যন্ত্রণা একপাশে সরিয়ে রেখে তার কম্পিত হাতটা শেরাজের পিঠে রাখল। সেখানেও রক্তের দাগ। সুমু ফিসফিস করে বলল,
“আপনার শান্তি হয়েছে, খান সাহেব? আপনার রাগ কি মিটেছে? পারলে আমাকে আরও ক্ষতবিক্ষত করুন, আমি তো আপনার পার্সোনাল প্রোপাটি। চাইলে এখনই মেরে ফেলুন, কিন্তু জীবিত রেখে দূরে সরিয়ে দিয়ে মরণযন্ত্রণা দিবেন না।”
শেরাজ উত্তর দিল না। সে কেবল সুমুর শরীরের সেই দগদগে নীল দাগগুলোর ওপর নিজের মুখ ঘষতে লাগল। একটি দীর্ঘ সময় পর, যখন ঝড় কিছুটা স্তিমিত হলো, শেরাজ তার বুকের ওপর মুখ রেখে শান্ত হয়ে পড়ল। সুমুর সারা শরীরে তখন দগদগে যন্ত্রণার চিহ্ন। নীল হয়ে যাওয়া দাগ আর রক্তের ছিটেফোঁটা বলে দিচ্ছে শেরাজ আজ কতটা নিষ্ঠুর ছিল। কিন্তু সুমু সেই যন্ত্রণাকেই পরম যত্নে নিজের শরীরে মেখে নিল। সে তার ক্লান্ত হাত দুটো দিয়ে শেরাজের মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। সে জানে, শরীর এক হলেও শেরাজের মনের ক্ষত সারতে আরও অনেকগুলো এমন কালবৈশাখী পার করতে হবে।
হঠাৎ শেরাজ এক ঝটকায় তাকে বিছানা থেকে নামিয়ে সে কাচের ওপর দাঁড়িয়ে সুমুকে তার পায়ের ওপর দাঁড় করাল। তার পায়ের নিচে কাচের টুকরোগুলো বিঁধে রক্ত ঝরছে। সে সুমুকে পেছন থেকে জাপ্টে ধরে তার ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দিল—ঠিক যেন এক ক্ষুধার্ত হিংস্র প্রাণী তার শিকারকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। সুমু ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেও শেরাজ তাকে ছাড়ল না, বরং তার হাত দুটোকে পেছনের দিকে টেনে এমনভাবে ধরল যেন সুমুর মনে হলো তার কাঁধের হাড় এখনই আলগা হয়ে যাবে। শেরাজ তার কানের কাছে পৈশাচিক স্বরে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
“ব্যথা পাচ্ছো? আমার এই পাঁচ বছরের প্রতিটা রাতের একাকীত্বের ব্যথার চেয়েও কি এটা বেশি? জেলের ওপার থেকে তুমি তো এভাবেই আমাকে রোজ ক্ষতবিক্ষত করতে চেয়েছিলে, তাই না? তবে আজ কেন তোমার চোখে অশ্রু?”
সে সুমুকে ঘুরিয়ে দেয়ালের সাথে সজোরে চেপে ধরল। দেয়ালের ঠাণ্ডা স্পর্শ আর শেরাজের শরীরের আগুনের মতো উত্তাপের মাঝে সুমু পিষ্ট হতে লাগল। শেরাজ তার সর্বশক্তি দিয়ে সুমুর ওপর চড়াও হলো। তার প্রতিটি স্পর্শে এখন ঘৃণার ছোঁয়া। সে সুমুর শাড়ির ছিন্নভিন্ন অংশগুলো দিয়ে সুমুর হাত দুটোকে দেয়ালের হুকের সাথে বেঁধে ফেলল। সুমু এখন এক অসহায় বন্দি, আর শেরাজ তার ওপর চালাচ্ছে এক মধ্যযুগীয় বর্বরতা। সে সুমুর পেটে আর পিঠে নিজের নখ দিয়ে আঁচড় কাটতে শুরু করল, যেন সে আজ সুমুর শরীরে নিজের নাম নয়, বরং নিজের যন্ত্রণার মানচিত্র লিখে দিতে চায়। সুমুর শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত যখন মেঝেতে থাকা রক্তের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল, শেরাজ তখন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল। সে সুমুর অধরে নিজের রক্তমাখা ঠোঁট চেপে ধরে তার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম করল। সুমু ঠোঁট ফেটে আবারও রক্ত বের হচ্ছে, শরীরের এখানে সেখানে কালচে নীল জখম। তবুও সে মুখ ফুটে একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। সে চেয়েছিল শেরাজের এই দানবীয় রূপটাকেও নিজের মধ্যে ধারণ করতে।
শেরাজ যখন তার শরীরে পৈশাচিক উল্লাসে নিজের অধিকার কায়েম করছিল, সুমু তখন কেবল অপলক চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের জল এখন শুকিয়ে গেছে, সেখানে এখন পাথরের মতো। এক সময় আবারও শেরাজ ক্লান্ত হয়ে তার ওপর নিজের সমস্ত ভার ছেড়ে দিল। সুমুর হাত তখনো দেয়ালের সাথে বাঁধা। শেরাজ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল,
“এই দেহটা তোমার হতে পারে সুইটহার্ট, কিন্তু এই আত্মাটাকে তুমি পাঁচ বছর আগেই মেরে ফেলেছো। এখন শুধু এই মাংসের স্তূপটাই পড়ে আছে। তৃষ্ণা কি মিটেছে তোমার? নাকি আমি আরও নরক দেখাবো তোমাকে?”
সুমু কোনো উত্তর দিল না। তার নিথর শরীরটা দেয়ালে ঝুলে আছে, আর শেরাজ সেই অন্ধকারের মাঝে নিজের রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি দিয়ে উঠল। সেই হাসি গাঁ ছমছম করা ভয়াবহ।
ভোরের অস্ফুট আলো যখন বাংলোর জানালার পর্দা চিরে ঘরের ভেতর ঢুকল, তখন ঘরটা দেখতে কোনো ধ্বংসস্তূপের চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছিল না। মেঝেতে রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে, চারদিকে কাচের গুঁড়ো আর আসবাবপত্রের অবশিষ্টাংশ। বিছানায় সুমু নিথর হয়ে পড়ে আছে। তার ফর্সা শরীরটা এখন কালশিটে আর নীল জখমে ঢাকা। তীব্র জ্বরে তার শরীরটা তপ্ত কড়াইয়ের মতো পুড়ছে, ঠোঁট দুটো ফেটে চৌচির।
শেরাজ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। তার নিজের অবস্থাও বিধ্বস্ত। হাতে সাদা ব্যান্ডেজটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে আছে। সে একবার আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। সুমুর এই অবস্থার জন্য দায়ী সে নিজে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, তার বুকের ভেতরের সেই বিষাক্ত জেদ এখনো কমেনি।
সুমু বিছানায় শুয়ে শেরাজের প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করছে। সে আর সহ্য করতে পারল না। সে কাঁপতে থাকা হাত বাড়িয়ে শেরাজের ব্যান্ডেজ করা হাতটা খপ করে ধরে ফেলল।
“খান সাহেব… একটা বার কথা বলুন। একটাবার গালি দিন আমাকে, তবুও চুপ করে থাকবেন না। আপনার এই নীরবতা আমার কলিজা চিরে ফেলছে।”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে খুব সাবধানে সুমুর হাতটা নিজের শরীর থেকে ছাড়িয়ে নিল। সে টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা সুমুর সামনে এগিয়ে ধরল।
“পানিটা খেয়ে নাও।”—এটুকুই। এর বাইরে একটি শব্দও সে খরচ করল না। সুমু ডুকরে কেঁদে উঠে গ্লাসটা সরিয়ে দিল। ঝনঝন শব্দে গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল, কিন্তু শেরাজের চোখের পলকও কাঁপল না। সে নিচু হয়ে ভাঙা কাঁচগুলো কুড়াতে লাগল।
সুমু বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করে আর্তনাদ করে উঠল,
“কেন এমন করছেন? আপনি কি আমাকে মেরে ফেলতে চান? তবে মেরেই ফেলুন! বাঁচিয়ে রেখেছেন কেন আমাকে? কেন এই নরক দেখাচ্ছেন? প্লিজ খান সাহেব, একটা বার ‘সুইটহার্ট’ বলে ডাকুন… একটা বার আমাকে শাসন করুন।”
শেরাজ ভাঙা কাঁচগুলো ডাস্টবিনে ফেলে হাত ধুয়ে আবার সুমুর সামনে এসে দাঁড়াল। সে সুমুর কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখল, তারপর খুব নিরাসক্ত গলায় বলল,
“জ্বর এখনো কমেনি।”
সুমু উন্মাদের মতো শেরাজের শার্টের কলার খামচে ধরল। তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে। সে শেরাজকে ঝাকিয়ে বলতে লাগল,
“আপনি কি ভাবছেন, কথা না বলে আপনি আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন? না! আপনি নিজেকে শাস্তি দিচ্ছেন। আপনার চোখের কোণে জমে থাকা ওই জলটা আমি দেখতে পাচ্ছি, খান সাহেব। আপনিও পুড়ছেন, আমিও পুড়ছি। তবে কেন এই দেয়াল তুলে রেখেছেন মাঝে?”
শেরাজ স্থির হয়ে সুমুর চোখের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে এক আকাশ সমান অভিমান। সে সুমুর হাত দুটো নিজের কলার থেকে সরিয়ে দিয়ে তাকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর চাদরটা তার গলা অবধি টেনে দিয়ে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শেরাজ অস্ফুট স্বরে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, যা সুমুর কানে পৌঁছাল না— “তুমি তো আমাকে আগেই মৌন করে দিয়েছো সুমু। যে স্বামী পাঁচ বছর ধরে জানত না তার স্ত্রী কোন নরকে আছে, সেই স্বামীর কথা বলার কোনো অধিকার আর অবশিষ্ট নেই।”
সুমু বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বারবার বলছে,
“একটা বার কথা বলুন… জাস্ট একটা বার আমার নামটা ধরে ডাকুন।”
শেরাজ পকেট থেকে ফোন বের করে তাদের ফ্যামিলি ডক্টরকে কল দিল,
“হ্যালো ডক্টর, এখনই একবার বাংলোয় আসুন। ইমার্জেন্সি।”
প্রায় বিশ মিনিট পর ডক্টর এসে ঘরে ঢুকলেন। ঘরের শ্রীহীন অবস্থা আর বিছানায় সুমুর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। শেরাজ জানালার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডক্টর সুমুর নাড়ি পরীক্ষা করতে করতে আঁতকে উঠে কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“শেরাজ! মামনির এই অবস্থা কীভাবে হলো? এতো হাই টেম্পারেচার! আর এই ক্ষতগুলো…”
শেরাজ ডক্টরের দিকে না তাকিয়েই জানালার ওপারে তাকিয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত। সে অত্যন্ত শীতল আর পেশাদার গলায় বলল,
“ওসব আপনার দেখার বিষয় নয়, ডক্টর। ওর প্রচণ্ড জ্বর, সাথে সারা শরীরজুড়ে গভীর কিছু ক্ষত আছে। গলায় আর ঘাড়েও বেশ কিছু ক্ষত আছে। আপনি শুধু সেগুলো পরীক্ষা করে যা যা মেডিসিন দরকার প্রেসক্রাইব করুন। দ্যাটস ইট।”
ডক্টর অবাক হয়ে শেরাজের দিকে তাকালেন। তিনি বুঝতে পারছেন এখানে কোনো ভয়াবহ ঝড় বয়ে গেছে। তিনি সুমুর গলার দগদগে কামড়ের দাগ আর হাতের নীল হয়ে যাওয়া জখমগুলো পরীক্ষা করলেন। সুমু জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করছে, মাঝে মাঝে ‘খান সাহেব’ বলে ফুঁপিয়ে উঠছে। কিন্তু শেরাজ বরফের মতো শীতল।
ডক্টর সুমুর খুব কাছে ঝুঁকে এসে একদম নিচু স্বরে, যেন শুধু সুমুই শুনতে পায়, এমনভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
“মা, আমি তোমার মায়ের বয়সী। তোমাকে আজ এই অবস্থায় দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এই যে সারা শরীরের ক্ষত… এগুলো কি ভালোবাসা থেকে করেছে, নাকি রাগ থেকে?”
সুমু জ্বরের ঘোরে কাঁপছিল। ডক্টরের প্রশ্নটা শোনার পর তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে বালিশে পড়ল। সে শেরাজের ওই পাথরের মতো পিঠটার দিকে একবার তাকাল। তারপর বুক চিরে আসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট স্বরে উত্তর দিল,
“এগুলো প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর অভিমান থেকে করা, ডক্টর।” সে খুব কষ্টে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে আবার বলল, “ভালোবাসার মানুষের যখন দীর্ঘদিনের জমানো অভিমানে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন সে জানোয়ার হয়ে ওঠে। কিন্তু এগুলো ওই জানোয়ারের করা আঘাত নয়… এগুলো একজন হেরে যাওয়া প্রেমিকের হাহাকার। আমার খান সাহেব তো আমাকে আঘাত করতে পারেন না, তিনি কেবল তার কষ্টগুলো আমার ওপর উগরে দিয়েছেন।”
ডক্টর স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, এই মেয়েটি কতটা সহ্য করতে পারে! যার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে, সে এখনো তার আঘাতকারীর পক্ষ নিয়ে কথা বলছে।
ওদিকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেরাজ যেন একটু কেঁপে উঠল। সুমুর প্রতিটি কথা তার কানে তীরের মতো বিঁধছে। সে বুঝতে পারছে, সুমু তাকে ঘৃণা করছে না, বরং তার এই নিষ্ঠুরতাকেও পরম মমতায় বরণ করে নিয়েছে। এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই যেন শেরাজকে আরও বেশি অপরাধী করে তুলছে।
ডক্টর প্রেসক্রিপশন লিখছেন, কিন্তু তার হাত কাঁপছে। প্রেসক্রিপশন লেখা শেষ হলে তিনি শেরাজের উদ্দেশ্যে বললেন,
“জ্বর কমানোর জন্য ইনজেকশন দিয়েছি। আর এই অয়েন্টমেন্টগুলো ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিতে হবে। তবে শরীরের চেয়ে ওর মনের ক্ষতগুলো বেশি গভীর। খুব সাবধানে রাখবেন, ওর মেন্টাল ট্রমা অনেক বেশি।”
ডক্টর চলে যেতেই শেরাজ যান্ত্রিকতায় ফিরে এলো। সে সুমুর কপালে ভেজা জলপট্টিটা বদলে দিয়ে খুব নিরাসক্ত গলায় বলল,
“কথা বলে নিজের শক্তি নষ্ট কোরো না। এমনিতেই শরীর খুব দুর্বল।”
সুমু এবার শেরাজের হাতটা নিজের গালের ওপর চেপে ধরল। শেরাজ হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু সুমু আজ ছাড়ল না। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আপনার অভিমান কি একটুও কমেনি, খান সাহেব? আপনার দেওয়া প্রতিটি ক্ষত আজ আমার কাছে এক একটা অলঙ্কার। কিন্তু আপনার এই নীরবতা… এটা তো বিষ। এটা আমি সহ্য করতে পারছি না।” সে হাত বাড়িয়ে শেরাজের শার্টের কোণাটা ধরতে চেয়ে খুব ক্ষীণ স্বরে ডাকল, “খান… সাহেব… খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। একটু… ধরবেন?”
শেরাজ তার হাতটা খুব অবহেলায় সরিয়ে দিল। একটি শব্দও তার মুখ দিয়ে বের হলো না। সে শুধু ওষুধের প্যাকেটটা পাশে রেখে আবারও সুমুর কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করল। সুমু ডুকরে কেঁদে উঠল,
“কথা বলুন প্লিজ! আমাকে মারুন, কিন্তু কথা বলুন। আপনার এই নীরবতা আমাকে জেলের ওই একাকিত্বের চেয়েও বেশি পোড়াচ্ছে।”
শেরাজ তার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
“ওষুধগুলো খেয়ে নাও। আমি চাই না তোমার কিছু হোক। কারণ, তুমি মরে গেলে তোমার ওই ত্যাগের ঋণের বোঝা আমি কার ওপর চাপাব?”
বলেই সে উঠে দাঁড়াল। ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দার এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। তার গলাটা ধরে এসেছে, কিন্তু সে চাইল না তার কণ্ঠস্বরের কোনো দুর্বলতা ওপাশ থেকে কেউ টের পাক। সে জানে, এই মুহূর্তে বাচ্চারা এই বাড়িতে আসা মানেই এক বীভৎস দৃশ্যের সম্মুখীন হওয়া। তারা তাদের হাসিখুশি মাম্মাকে এই রক্তাক্ত আর বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখলে সেই ট্রমা সারা জীবন বয়ে বেড়াবে।
সে সারবাজের নাম্বারে ডায়াল করল। ওপাশে ফোন রিসিভ হতেই খুব গম্ভীর আর চাপা গলায় বলতে শুরু করল,
“সারবাজ, শোন… সিমরান আর শেরানকে আজ ওখানেই রাখ। যেভাবে পারিস ওদের বুঝিয়ে-সুজিয়ে ওখানেই আটকে রাখিস। বলবি আমি আর সুমু একটু ব্যস্ত আছি।”
সারবাজ ওপাশ থেকে কৌতূহলী হয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেরাজ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“বেশি কিছু জিজ্ঞেস করিস না। শুধু জেনে রাখ, সুমুর শরীরটা বড্ড খারাপ। প্রচণ্ড জ্বর। আমি চাই না বাচ্চারা এই অবস্থায় ওদের মাম্মাকে দেখুক। ছোট মানুষ, ভয় পেয়ে যাবে। ওদের এসবের কিছু বলার দরকার নেই।”
শেরাজ এক মুহূর্ত থামল, তার চোখ চলে গেল ঘরের ভেতর বিছানায় পড়ে থাকা সেই নিথর শরীরটার দিকে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর গলায় বলল,
“সুমু সুস্থ হয়ে উঠুক… ও একটু স্বাভাবিক হলেই আমার চ্যাম্পদের মাম্মাকে আমি নিজেই ওদের কাছে নিয়ে যাব। তার আগে যেন ওরা কোনোভাবেই বাংলোর দিকে না আসে, এটা আমার অর্ডার।”
ফোনটা কেটে দিয়ে সে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথার ভেতরে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা হচ্ছে। সে ধীর পায়ে ঘরে ফিরে এলো। সুমু তখন জ্বরের ঘোরে কাঁপছে আর অসংলগ্নভাবে কিছু বিড়বিড় করছে। শেরাজ পাশে বসে ভেজা তোয়ালে দিয়ে সুমুর হাতের সেই নীল হয়ে যাওয়া কালশিটেগুলো মুছতে লাগল। সুমু আধোবোজা চোখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বাচ্চারা… ওরা আসবে না?”
শেরাজ সুমুর চোখের দিকে না তাকিয়েই খুব যান্ত্রিকভাবে বলল,
“না। ওদের আসতে বারণ করে দিয়েছি। আমি চাই না ওরা দেখুক ওদের পাপা কতটা অমানুষ হতে পারে। তুমি চুপচাপ ঘুমানোর চেষ্টা করো।”
সুমু শেরাজের হাতটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল। শেরাজ এবার আর হাতটা সরিয়ে নিল না, শুধু পাথরের মতো বসে রইল। তার চোখের অশ্রু আজ আর বাধা মানল না, সুমুর অগোচরেই তা টুপ করে সুমুর হাতের ওপর আছড়ে পড়ল। জ্বরের তোপে সুমু মূহুর্তেই ঘুমিয়ে পড়ল। শেরাজ তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“রাজহাঁস সাধারণত সারাজীবনের জন্য একটিই সঙ্গী বেছে নেয়, যা তাদের অগাধ বিশ্বস্ততার প্রতীক। ঠিক তেমনি, আমি আমার সারাজীবনের জন্য কেবল একজনকেই বেছে নিয়েছি—সেটা তুমি। ইউ আর মাই সোয়ান।”
সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলল, কিন্তু ঘরের ভেতরের গুমোট ভাবটা কাটল না। শেরাজ একটা ট্রিতে করে সুমুর জন্য হালকা খাবার আর ওষুধ নিয়ে ঘরে ঢুকল। সুমু দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে ছিল, তার শরীরটা জ্বরে এখনো নুয়ে আছে। শেরাজ ট্রে-টা সাইড টেবিলে রেখে খুব নিস্প্রাণ গলায় বলল,
“উঠে বসো। খেয়ে নাও।”
সুমু নড়ল না। সে আগের মতোই পড়ে থেকে ভাঙা গলায় বলল,
“খাব না। আপনি কথা না বললে আমি কিচ্ছু খাব না।”
শেরাজ কোনো কথা কাটাকাটি করল না। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে সুমুকে একপ্রকার পাঁজাকোলা করে বসালো। সুমুর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে চামচ দিয়ে জোর করে মুখে খাবার তুলে দিতে লাগল। সুমুর চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে খাবারে মিশছে, কিন্তু শেরাজের হাত কাঁপল না। সে যেন যান্ত্রিক এক রোবট। খাওয়া শেষ হতেই সে সুমুর হাতে ওষুধগুলো ধরিয়ে দিল। সুমু বাধ্য মেয়ের মতো ওষুধ গিলে নিয়ে একভাবে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেরাজ যখন খালি ট্রে-টা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, সুমু তার হাতটা খপ করে চেপে ধরল। পরক্ষণেই সে বিছানা থেকে ছিটকে এসে শেরাজকে পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তার তপ্ত ললাট শেরাজের পিঠে ঠেকিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। শেরাজ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে এলো। সে সুমুর হাতগুলো ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে অত্যন্ত যন্ত্রণাকাতর গলায় বলল,
“ছাড়ো সুমু! প্লিজ… আমাকে এইভাবে জড়িয়ে ধরবে না। খুব অস্থির লাগে আমার। আমি নিতে পারছি না এসব।”
সুমু আরও জোরে তাকে জাপটে ধরল। তার চোখের জলে শেরাজের শার্টের পেছনটা ভিজে গেছে। সে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“আপনি কথা না বললে, আমার কাছ থেকে দূরে থাকলে, আমার তার চেয়েও বেশি অস্থির লাগে খান সাহেব। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আপনি কেন বুঝতে পারছেন না?”
শেরাজ দাঁত চেপে নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সুমুকে সরিয়ে দিতে চাইল। তার ভেতরে এক তীব্র সংঘাত চলছে—একদিকে সুমুর প্রতি অসীম মায়া, অন্যদিকে চরম অপরাধবোধ। সে যখন সুমুকে দুহাত দিয়ে সরিয়ে দিতে গেল, ঠিক তখনই সুমুর শরীরটা হঠাৎ রি রি করে উঠল। সুমু কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক তীব্র বমির উদ্রেক হলো তার। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে শেরাজের বুকের ওপর বমি করে দিল। পরের মুহূর্তেই তার শরীরটা এলিয়ে পড়তেই শেরাজ তাকে ধরে নিল। সে দেখল সুমু ফ্যাকাশে মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখে একরাশ অপরাধবোধ আর অসহায়ত্ব। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“সরি… আমি… আমি ইচ্ছে করে করিনি।”
শেরাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দামি শার্টটা নষ্ট হয়ে গেছে, শরীর নোংরা হয়ে আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি তার পাথরের মতো মনটা মুহূর্তের জন্য টলে উঠল। সে দেখল সুমুর ঠোঁটের কোণে এখনো বমির অবশিষ্টাংশ লেগে আছে এবং সে কাঁপছে। শেরাজ ট্রে-টা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের নোংরা শরীর নিয়েই সুমুকে আরও শক্ত করে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। তার সমস্ত অভিমান যেন এই অসুস্থতার স্রোতে ভেসে যেতে চাইল।
সুমু ফ্যাকাশে মুখে শেরাজের বিধ্বস্ত অবস্থার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে কেঁদে উঠল। বমির অস্বস্তিতে তার নিজেরই নিঃশ্বাস আটকে আসছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি খারাপ লাগছে শেরাজের জন্য। সে কাঁপতে কাঁপতে নিজের আঁচল দিয়ে শেরাজের শার্ট মুছে দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল,
“আপনার খুব খারাপ লাগছে, তাই না? সরি… আমি জাস্ট সামলাতে পারিনি। দাঁড়ান, আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”
শেরাজ এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সুমুর এই অবস্থায় তার শরীর পরিষ্কার করার চেষ্টা দেখে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে সুমুর হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে থামিয়ে দিয়ে গভীর স্বরে বলল,
“চুপচাপ থাকো সুমু। তোমার নিজেরই দাঁড়ানোর শক্তি নেই, তুমি কি পরিষ্কার করবে?”
সে সুমুকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। সুমুর শরীরটা জ্বরে তখনো কাঁপছে। শেরাজ তাকে নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। পরম মমতায় সুমুকে কমোডের ওপর বসিয়ে সে শাওয়ারটা ছেড়ে দিল। কুসুম গরম পানি সুমুর শরীরে পড়তেই সে কিছুটা আরাম পেল। শেরাজ খুব যত্নে সুমুর মুখ, হাত আর কাপড় পরিষ্কার করে দিল। সুমু নিথর হয়ে বসে দেখছিল তার সেই ভয়ংকর অভিমানী ‘খান সাহেব’ কীভাবে আবার সেই আগের মতো তার সেবা করছে। সে আলতো করে শেরাজের ভেজা হাতটা ধরে বলল,
“নিজেও তো নোংরা হয়ে আছেন। আপনার ঘেন্না লাগছে না?”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে সুমুকে পরিষ্কার করা শেষ করে নিজের শার্টটা খুলে ফেলল। তার পেশিবহুল শরীরের উন্মুক্ত অংশগুলো এখন পানির নিচে। সে নিজেও পরিষ্কার হয়ে নিল। সুমু মুগ্ধ হয়ে দেখছিল—এই মানুষটা রাগ করে দূরে ঠেলে দিতে চাইলেও শেষমেশ তার কাছেই ফিরে আসছে।
পরিষ্কার হওয়া শেষে শেরাজ একটা বড় তোয়ালে দিয়ে সুমুকে জড়িয়ে নিল। তাকে ওয়াশরুম থেকে বের করে বিছানায় বসালো। সুমুর ভেজা চুলগুলো মুছে দিতে দিতে শেরাজ হঠাৎ করেই থমকে গেল। সুমুর পিঠে আর কাঁধে কাল রাতের সেই দাঁতের কামড় আর নখের আঁচড়গুলো ভেজা অবস্থায় আরও লাল হয়ে ফুটে উঠেছে। শেরাজের হাতটা কাঁপতে লাগল। সে তোয়ালেটা সরিয়ে নিয়ে খুব ধীরে সেই ক্ষতগুলোতে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সুমু শিউরে উঠে শেরাজের ঘাড় জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আপনার মন কি এবারও গলবে না? আপনি কি এখনো আমার সাথে কথা বলবেন না?”
শেরাজ সুমুর ভেজা চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার ভেতরের জমানো মেঘগুলো যেন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে চাইল। সে অত্যন্ত ধরা গলায় বলল,
“মন গলার আর জায়গা নেই, সুমু। আমি কেবল ভাবছি—এতটা ভালোবাসা আমি সইব কীভাবে?”
চুল মোছানো শেষ করে শেরাজ আলমারি থেকে সুমুর একটা নীল রঙের আনারকলি বের করে আনলো। সুমুর শরীর এতটাই দুর্বল যে সে নিজের হাতটাও ঠিকমতো তুলতে পারছে না। শেরাজ অতি সাবধানে যেন কোনো কাচের পুতুল ধরছে, সেভাবে সুমুকে কাপড় পরিয়ে দিল। এরপর সে তাকে বিছানায় হেলান দিয়ে বসিয়ে আবার কিচেন থেকে এক বাটি গরম স্যুপ নিয়ে এলো। সুমু এবার আর না করল না। শেরাজ যখন চামচ দিয়ে ফু দিয়ে দিয়ে তাকে খাইয়ে দিচ্ছিল, সুমুর মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব সুখ যেন এই এক বাটি স্যুপের মাঝে লুকিয়ে আছে। খাওয়া শেষ করে শেরাজ তাকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে সুমুর কাপড়গুলো আর নিজের শার্ট ধুয়ে ফেলল। তার মতো একজন মানুষ যার ইশারায় শত শত লোক চলে, সে আজ কোনো দ্বিধা ছাড়াই স্ত্রীর বমির কাপড় কাঁচছে।
কাপড়গুলো বারান্দায় মেলে দিয়ে সে একটা মপ আর ফিনাইল নিয়ে ঘরে ফিরে এলো। মেঝের নোংরা জায়গাটা সে খুব নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করতে লাগল। ঘরজুড়ে ফিনাইলের একটা পরিচ্ছন্ন ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। সুমু বিছানায় শুয়ে অবাক চোখে শেরাজের কাজ দেখছিল। সে ভাবতেই পারেনি শেরাজ নিজের হাতে এসব করবে। হঠাৎ সুমু অনেকক্ষণ আগের সেই প্রশ্নটা আবার করল,
“খান সাহেব, সত্যি করে বলুন তো, আপনার কি একটুও ঘেন্না লাগল না? আপনি আমার বমি পরিষ্কার করলেন, নিজের হাতে আমার নোংরা কাপড় ধুলেন…”
শেরাজ মেঝের শেষ অংশটুকু মুছে মপটা একপাশে রাখল। তারপর সুমুর দিকে না তাকিয়েই জানালার দিকে মুখ দিয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“ঘৃণা? ঘৃণা তো সেই জিনিসের প্রতি হয়, যা পর। তুমি তো আমারই একটা অংশ। নিজের শরীরের কোনো অংশ বিষাক্ত হয়ে গেলে মানুষ তাকে কেটে ফেলে দেয় ঠিকই, কিন্তু ঘৃণা করে না। গত পাঁচ বছরে তোমার ওপর দিয়ে যা গেছে, তার তুলনায় এইটুকু তো কিছুই না। আমি তোমার শরীর পরিষ্কার করেছি ঠিকই, কিন্তু নিজের আত্মার ওপর যে অপরাধবোধের দাগ লেগে আছে, সেটা তো আর ফিনাইল দিয়ে মোছা যাবে না।”
সে ঘুরে সুমুর দিকে তাকিয়ে খুব নিচু আর গভীর স্বরে বলল,
“তোমার জিনিসে আমার ঘেন্না লাগবে—এটা তুমি ভাবলে কী করে সুমু? তুমি কি ভুলে গেছো, আমাদের প্রথম বাচ্চার অ্যাবরশনের সময় তোমার সবথেকে সেনসিটিভ কাজগুলো আমিই করেছিলাম? তোমার শরীরের প্রতিটি কণা, এমনকি তোমার কষ্টগুলোও আমার পরিচিত।” সে ধীর পায়ে সুমুর কাছে এসে বসল এবং তার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল, “ভালোবাসার মানুষকে যখন কেউ নিজের আত্মা দিয়ে গ্রহণ করে, তখন তার বমি কিংবা রক্ত— কোনো কিছুই অশুচি মনে হয় হয় না। বরং এই সেবাটুকু করতে পারার মাঝে আমি এক ধরণের শান্তি খুঁজে পাই। তুমি তো আমার অর্ধাঙ্গিনী নও সুমু, তুমিই তো আমার সম্পূর্ণ সত্তা। নিজের শরীরের নোংরা পরিষ্কার করতে কি কারো ঘেন্না লাগে?”
একটু থেমে সুমুর সেই জখম হওয়া কবজিতে একটা আলতো চুমু খেয়ে আবার বলল,
“আমি হয়তো গতরাতে অমানুষ হয়ে উঠেছিলাম, হয়তো তোমার দেহে অনেকগুলো ক্ষত করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, সেই প্রতিটি আঘাত করার সময় আমার নিজের বুকেও সমান রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমি তোমাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ, সুমু। এই যে তুমি আজ অসুস্থ হয়ে পড়লে, এতে আমার ভেতরে যে কী তান্ডব চলছে তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তুমি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমার এই পৃথিবীটাই যেন থমকে আছে।”
সুমু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শেরাজের কথাগুলো শুনছিল। তার চোখে নতুন করে অশ্রু টলমল করে উঠল। শেরাজ তার চিবুকটা একটু উঁচিয়ে ধরে বলল,
“আর কোনোদিন ওসব ঘেন্নার কথা মনেও আনবে না। তোমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস, তোমার প্রতিটি চোখের অশ্রু আর তোমার এই অসুস্থতা— সবকিছুর অংশীদার আমি। আমি থাকতে তোমার কোনো কষ্ট একাকী হতে দেব না। এখন বিশ্রাম নাও। শরীর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো কথা নয়।”
সুমু বুঝল, শেরাজ হয়তো এখনো পুরোটা স্বাভাবিক হয়নি, কিন্তু তার ভালোবাসার গভীরতা আগের চেয়েও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে শেরাজের বুকে মাথা রাখল। সে জানে, তাদের সম্পর্কের মাঝে যে অভিমানের দেওয়ালটা ছিল, তা হয়তো পুরোপুরি ধসেনি, কিন্তু সেই দেওয়ালের ইটগুলো নড়বড়ে হতে শুরু করেছে।
শেরাজ দেখল সুমুর চোখের পাতাগুলো ঘুমের ঘোরে ভারি হয়ে আসছে, কিন্তু জ্বরের তপ্ত আঁচে সে বারবার কেঁপে উঠছে। সে খুব আলতো করে সুমুকে বিছানায় ঠিকমতো শুইয়ে দিল। সুমুর মাথাটা নিজের এক হাতের ওপর তুলে নিয়ে অন্য হাত দিয়ে তার কপালে আলতো করে বিলি কাটতে শুরু করে নিচু স্বরে বলতে লাগল,
“অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর দিয়ে। এবার একটু শান্ত হও, ঘুমিয়ে পড়ো।”
সুমু ঘুমের ঘোরেও শেরাজের শার্টের হাতটা খামচে ধরে ছিল, যেন চোখ বন্ধ করলেই এই স্পর্শটা হারিয়ে যাবে। শেরাজ সেটা বুঝতে পেরে সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কোথাও যাচ্ছি না, সুইটহার্ট। আমি এখানেই আছি, তোমার খুব কাছে। তোমার সবটুকু যন্ত্রণা আজ আমি নিজের বুকে টেনে নিব, তুমি শুধু নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”
শেরাজের হাতের সেই চেনা ছোঁয়া আর তার কণ্ঠস্বর সুমুর ওপর এক জাদুকরী প্রভাব ফেলল। তার দীর্ঘশ্বাসগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলো। শেরাজ পরম মমতায় সুমুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে তার কপালে আরও একবার ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিয়ে জানালার পর্দাগুলো টেনে দিয়ে সে ঘরটা অন্ধকার করে দিল, যাতে ভোরের ওই কড়া আলো সুমুর ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটায়। ঘরের এসিটা কমিয়ে দিয়ে শেরাজ তার গায়ের ওপর পাতলা চাদরটা টেনে দিল। সুমু যখন পুরোপুরি ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল, শেরাজ তখনো তার পাশে পাথরের মতো বসে রইল। সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সুমুর শান্ত মুখটার দিকে, যেখানে এখনো কাল রাতের ঝড়ের চিহ্নগুলো স্পষ্ট। শেরাজ মনে মনে ভাবল, “এই মেয়েটা আমার জন্য কতটা সইতে পারে। আমি নিজেকে যতবার ভাঙতে চেয়েছি, ও ততবার আমাকে ভালোবেসে গড়ে তুলেছে।”
শেরাজ তার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বিছানার পাশেই একটা চেয়ার টেনে বসল। আজ তার চোখেও ঘুম নেই, কেবল এক আকাশ সমান অনুশোচনা আর গভীর ভালোবাসা। সুমু আপাতত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওষুধের প্রভাবে তার শরীর এখন কিছুটা শিথিল, কিন্তু মুখশ্রীতে এখনো এক বিষণ্ণ ক্লান্তি লেগে আছে। শেরাজ কয়েক মুহূর্ত স্থাণুর মতো সুমুকে দেখল। তারপর খুব সাবধানে নিজের হাতটা সুমুর মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই তার বিশ্বস্ত বডিগার্ডদের ডাকল। শেরাজের কণ্ঠস্বরে এখন সেই পুরনো সিংহসুলভ গাম্ভীর্য। সে কড়া গলায় নির্দেশ দিল,
খান সাহেব পর্ব ৯২
“বাড়ির প্রতিটি কোণায় কড়া পাহারা থাকবে। মশা ঢোকারও যেন অনুমতি না পায়। সুমু ঘুমোচ্ছে, ওর ঘুমের যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। আর কেউ যদি এই সীমানা ডিঙানোর চেষ্টা করে, তবে তার পরিণতি কী হবে তা তোমরা ভালো করেই জানো।”
নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সে দ্রুত পায়ে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসল। তার বুকের ভেতরটা এখন হু হু করছে। সুমুর এই অবস্থার পর তার কলিজার টুকরো—সিমরান আর শেরানকে একপলক না দেখলে সে শান্ত হতে পারছে না। বাচ্চাদের নিরাপদ রাখা আর সুমুকে আগলে রাখা—এই দুই যুদ্ধের মাঝে সে আজ বড় একা।
