Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৩১ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩১ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩১ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

ভালোবাসা আদতে কি! আমরা কতটুকু জানি এ সম্পর্কে! কখনো কখনো মনে হয় না যে ভালোবাসা বলতে আসলে কিছু হয়ই না? মনে হয়। আবার কখনো কখনো এটাও মনে হয় দুনিয়ার মানুষ বেচেই আছে মূলত ভালোবাসার ওপর ভর করে।
ঝড় বৃষ্টি থামার নাম গন্ধ নেই। ঘড়িতে সময় রাত্রির সোয়া দুইটা। দেওয়ান বাড়িতে এখনো গিন্নিরা ঘুম থেকে ওঠেনি। তিনটের দিকে উঠে নিচে আসবেন তারা।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো নিশির। রাতে শুয়েছেই এতো রাতে। এখন ঘুম ভাঙ্গার মানে হয় কোনো! ইলেক্ট্রিসিটি নেই, বাড়ির জেনারেটরও বন্ধ নাকি! হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশেই লাইটের সুইচ অন করলো। জ্বললো না। গোটা ঘরময় অন্ধকার। ফোন হাতে ফ্লাশ জ্বালাতে গিয়ে আরেক বিপত্তি। ফোনে চার্জ নেই। মহা সমস্যা। যেকোনো মূহুর্তে বন্ধ হবে ফোনখানা। তার পাওয়ার ব্যাংক টাও নিয়ে গেছে নূরি কালকে রাতে। ফেরত আনা হয়নি। তবে এখন না আনলেই না। ফোন তিন পারসেন্ট চার্জ।

ধীরে ধীরে ওই ফোনটারই মৃদু আলোয় এক পা দু পা করে নিশি এসে নক করলো নূরির রুমে। আচমকা খুলে গেলো দরজা। অবাক হলো সে। নূরি গত এক বছর যাবৎ দরজা লক করে শোয়। আজ করেনি কেনো! বাইরে থেকে ডাকাডাকি তে আর কারোর ঘুম ভেঙে যেতে পারে বিধায় না ডেকেই ঘরে ঢুকলো সে। নূরি বিছানায় নেই। টেবিলের ওপর নিভু নিভু জ্বলছে টেবিল ল্যাম্পখানা। ওটারও আয়ু শেষের দিকে আরকি। সারারাত জ্বলছিলো নাকি! নূরি আলোয় ঘুমাতে পারেনা। তাই ওটা সারারাত ধরে জ্বলার প্রশ্নই আসেনা, যদি না মেয়েটা সারারাত জেগে না থাকে। পাওয়ার ব্যাংক টা রাখা ল্যাম্প টার পাশেই। ওটা হাতে নিয়ে ফোনে লাগিয়ে ফ্লাশ অন করতেই সোজা দৃষ্টি গিয়ে ঠেকলো বাথরুমে। বাথরুম এর দরজা বন্ধ বাইরে থেকে। চট করে বারান্দার দরজায় তাকাতেও একই ঘটনা। নূরি ঘরে কোত্থাও নেই। তবে অস্বাভাবিক আগেই কিছু মাথায় এলো না। নিচে যেতে পারে পানি আনতে বা কোনো দরকারে। খিদে পেতে পারে!

নাকি তিতিরের রুমে শুয়েছে! দ্রুত গতিতে তিতিরের ঘরে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই আবার চমকালো। তিতিরও ঘরে নেই। ছাদে যেতে পারে দুজন কোনোভাবে! বারান্দায় থাই গ্লাসের দিকে দৃষ্টি গেলো। বাইরের বৃষ্টির পরিমাণ এতো বেশি যে কোনো মূল্যেই ছাদে যাওয়া সম্ভব নয়। মনটা অস্থির লাগলো। কিছু না ভেবেই ছুটলো নিচ তলায়। রাত বিরেতে অনেক সময়ই স্ন্যাকস্ এর ক্রেভিং হয় তাদের। তার জন্য কি না! আশ্চর্য হলো নিশি। কোত্তাও নেই। কাউকে ডাকবে! দুজনের একজনের ফোনও রিসিভ হলো না। কান্না পেলো নিশির আচমকা। নয়ন বা ঈশান ভাইকে ডাকা দরকার।হন্তদন্ত মেয়েটা আবার সিড়ি ভেঙে উঠে এলো ভাইদের ঘরে। এ কি কান্ড! এ বাড়ির কেউ বাড়ি নেই নাকি! তা কি করে হয়। নিচতলায় বাবা চাচাদের রুম থেকে দিব্যি ভেসে আসছিলো নাক ডাকার শব্দ। নেই শুধুমাত্র ওপরে কেউ। ঈশান কে নাকি নয়ন কে কাকে কল করবে ভেবে পেলো না নিশি শুরুতে। নয়নকেই করলো,তবে হতাশ হলো এবারেও।নয়নের ফোনও বন্ধ। কাঁপা হাতে ঈশানকে কল করতেই চারবারের বার কল রিসিভ হলো।

ঈশান তিতিরের গাড়ির চাকা আটকেছে কাঁদায়।কোনোমতে সেটাকে তোলা যাচ্ছে না। কাদায়,পানিতে মেখে একাকার অবস্থা ঈশানের।তিতির বেশ কয়েকবার নামতে চাইলো গাড়ি থেকে,কোনো ভাবে যদি সাহায্য করতে পারে। ঈশানের কড়া ধমকে পারলো না।এরই মধ্যে গাড়ির ভিতরে বাজছে ঈশানের ফোন। সে বেচারা নেমেছে একটু আগেই।সম্ভবত আশপাশ থেকে ইট পাথর এনে উচু করার চেষ্টা করছে গর্তটা। সিটে রাখা ফোনে উকি দিলো সে। নিশি! সর্বনাশ করেছে। কেনো কল করেছে এ সময় নিশি আপু। টের পেয়ে গেছে যে তারা নেই? কি করবে?ধরবে!
উঁকিঝুঁকি দিয়ে খুজতে চেষ্টা করলো ঈশানকে।অন্ধকার এ কিচ্ছু দেখা গেলো না।সামনে নেই,গাড়ির পিছনের দিকটায় বোধহয়। অনুমতি ছাড়া ধরলে আবার রাগারাগি করবে কি না কে জানে! তবে কল বন্ধ হচ্ছে না। তৃতীয় বারের মতো কেটে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই চতুর্থ বারের মতো বেজে উঠলো সে বস্তু খানা। তিতির খানিক ইতস্তত করলেও ধরলো ফোনটা।
ফেন রিসিভ হওয়াতে জানে পানি পেলো নিশি। উত্তেজিত গলায় বললো,

____”ভাইয়া?”
____”আমি তিতির বড়পু।”
____”তুই কোথায় হ্যা? রুমে নেই…”
কি বলবে তিতির! রাগ করে এতো রাতে চলে এসেছিলো শুনলে থাপড়ে কান লাল করে দেবে। মিথ্যা সে বলতে পারে না।তবুও বললো,
____”তোমার ভাই নিয়ে বেড়িয়েছে।”
____”এই বৃষ্টির মধ্যে! “
____”ওই আরকি।”
খানিক হাফ ছাড়লো নিশি। ঈশান এর সাথে থাকলে আর কিসের চিন্তা!
____”নয়ন ভাই আর নূরি তোদের সাথে তো?”
নয়ন ভাইয়ের কথা শুনে কিছু মনে না হলেও নূরির কথা কানে আসতে চমকালো তিতির। ব্যাস্ত গলায় বললো,
____”নয়ন ভাই ছিলো আমাদের সাথেই। তার গাড়ি আলাদা। কিন্তু… ছোটপু তো নেই সাথে। “
মাথায় বাজ পরলো নিশির। করিডরেরই ভূতের মতো দারিয়ে আছে সে। কারোর দেখা নেই। নূরিটা গেলো কোথায়।
____”বলিস কি! নেই মানে! ও তো গোটা বাড়িতে নেই।”
বড় বড় হয়ে গেলো তিতিরের চোখ। গোটা বাড়িতে নেই মানে কি!

____”ভালো করে খুজেছো?”
____”সব জায়গায়।”
____”সর্বনাশ। আমাদের সাথে তো নেই।”
____”ভাইয়া কোথায়?”
____”আমাদের গাড়ি খাদে আটকেছে। বাড়ি থেকে একটু দূরেই। তোমার রুমের বারান্দায় এলেই দেখতে পাবে আমাদের গাড়িটা। “
নিশি ফোন কানেই দৌড়ে গেলো নিজের বারান্দায়। বেশ দূরে দেখা যাচ্ছে একটা গাড়ি। হেডলাইটের আলোয় দেখা যাচ্ছে পিছনের চাকা আটেকেছে খাদে। সেখানে একজন মানুষ। সম্ভবত ঈশান।
তবে সঙ্গে সঙ্গেই চোখ আটকালো অন্য জায়গায়।তাদের বাড়ির বড় লন পার হলেই রাস্তাটা গেছে। বাড়ির সামনে দাড় করানো আরেকটা গাড়ি। এটার আলো নেভানো। তবে সেখান থেকে আঁকাবাকা কয়েকজমি পরের রাস্তায় ঈশানের গাড়ির মৃদু আলো এখানে দৃশ্যমান করছে গাড়ির জ্বলজলে অংশটা…
মাথায় আসলো অন্য কথা! নূরি প্রেম করতো।বেশ আন্দাজ করেছিলো সে। মেয়েটা কি ওখানে। সেও নিজেও মাঝেমধ্যে রাতবিরেতে দেখা করতে নামে নিয়াজ এর সাথে। অবশ্যই নূরি পাহারায় থাকে। নূরিও কি তেমন…মাথা কাজ করলো না।

____”তিতির,জলদি বাড়ি আয়। নূরি কোথায় গেলো দেখছি আমি!”
____”আসছি আমরা।”
নিশি ফোন রাখলো। চোখ ছলছল করছে। তবে এতো রাতে নূরি বাইরে বের হতে পারে। সে সাহস করতে পারে এ বিশ্বাস হতে চায়না। তবে যদি বের হয়! তাহলে! বাড়ির কেউ জানলে খুন করবে মেয়েটাকে। কি করবে,এগিয়ে যাবে!

পেটের ওপর ইয়াজের অবাধ্য হাতের স্পর্শ পেতেই শরীর হীম হলো নূরির। ছটফট করলো সরে যেতে। প্রেমিক এর স্পর্শে প্রেমিকাদের এহেন অনূভুতি আদতে হয় কি না জানা নেই নূরির। কারণ তার এমন কেনো হয়,আসলেই হওয়া উচিত কি না এ অবধি বুঝে আসেনি তার। অনূভুতি টা অসহ্যকর, ভয়ার্ত, অনিরাপদ। মোটেই আনন্দ অনূভুতি দেয়না,বরং ছোট বেলায় শেখানো ব্যাড টাচ আর গুড টাচ ফিল করতে পারে সে। ইয়াজকে সে ভালোবাসে। কালেভদ্রে আদুরে স্পর্শ অস্বাভাবিক হওয়ার কথা নয়।. কিন্তু ইয়াজের এ স্পর্শ গুলো অন্য রকম,বিষাক্ত লাগে।
____”ই..ই..ইয়াজ যেতে দাও। পাগল হয়ে গেলে!”

ইয়াজের উত্তেজিত শ্বাসপ্রশ্বাস ছারা আর কিচ্ছু কানে এলো না নূরির। এই অবস্থায় সাক্ষী সে আরও একবার হয়েছিলো। সে সেদিন কোনোমতে বাচিয়ে ছিলো নিজেকে। কিন্তু সেদিন না হয় ইয়াজ মাতাল ছিলো! আজ তো নেই।আজ স্বাভাবিক অবস্থায়…
ভাবার মধ্যে আচমকা সরে গেলো বুকের ওড়না। টান পরলো পিঠের চেইনে। আর্তনাদ করে উঠলো নূরি। চূড়ান্ত মোচড়ামুচড়ি করলো নিজেকে সরিয়ে নিতে। তবে পুরুষালি শক্তির সাথে পেরে উঠলো না সে। গায়ের জামা নেমে গেলো বেশ খানিকটা। ধস্তাধস্তি হচ্ছে একপ্রকার। ইয়াজের স্পর্শে বিন্দু মাত্র কোনো স্বাভাবিক প্রেমিক এর ছোঁয়া নেই। নূরি কেঁদে ফেললো হতভম্বতা কাটিয়ে।

____”প্লিজ ইয়াজ। ভালোবাসি আমি তোমাকে। এভাবে কলঙ্কিত করতে পারো না তুমি আমাকে। দোহাই লাগে। আমাদের ভালোবাসার কসম। আমাকে ছাড়ো। “
ইয়াজের মুখে এবারও শব্দ পাওয়া গেলো না। নূরি ঘুরে মুখোমুখি অবধি হতে পারছে না ইয়াজের। পেট ছেড়ে হাত উঠে এসেছে বক্ষজোড়ার। চিৎকার করে উঠলো নূরি, প্রেমিক নামক হিংস্র একটা কাপুরুষের থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না! হিংস্র থেকে হিংস্রতর হলো ইয়াজের স্পর্শ। নোংরামির স্পর্শ। নূরি এমন অসহায় এ জীবনে কখনো বোধ করেনি। এ ছোয়ায় এক বিন্দু ভালোবাসা, আদর থাকলে বোধহয় পাপ জেনেও খেই হারাতো সেও।
কিন্তু সেসব কিচ্ছু না। চিরাচরিত নারী অসম্মান এটা।বুঝতে বাকি রইলো না নূরির। আজ বোধহয় সব শেষ হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। একে একে ভেসে উঠলো হাস্যজ্জল পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ এর মুখের কায়া। ভাইয়ের নিষেধ, আদর।মা চাচিদের যত্ন,ভালোবাসা।বাবা,চাচাদের সেই দুনিয়াভুলানো “মা” ডাকটা…
আচমকা উন্মাদনা থেমে গেলো ইয়াজের। ছিটকে এলো নূরির থেকে। নূরি তখনও পাগলের মতো চিৎকার করেই যাচ্ছে ছাড়া পেতে। হঠাৎ একাই ইয়াজ কে থামতে দেখে কোনোমতে সুতি ওড়না টা জড়িয়ে সিটে বসলো। ইয়াজের ক্ষুধার্ত চোখে এখন ক্রোধ। তার কারণ বুঝতে দৃষ্টি অনুসরন করলো নূরি। তাদের বাড়ির ছোট গেটটার কাছে ছাতা মাথায় এসে দাড়িয়েছে নিশি। চিৎকার করে নিজের শেষ সম্বল টুকু বাচিয়ে নেওয়ার জন্য বোন কে ডাকতে চাইলো নূরি। মুখ চেপে ধরলো ইয়াজ।

____”অ্যাম সরি জান,সরি।ভুল হয়ে গেছে। নিজের মধ্যে ছিলাম না।”
ঝটকা দেয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো ইয়াজের হাতের থেকে। দু হাত আড়াআড়ি ভাবে বুকে ভাজ করা। যেখানে যেখানে লোকটা ছুয়েছে অসহ্য যন্ত্রণা করছে সেখানে। নূরি ফুপিয়ে যাচ্ছে। কোনোমতো বললো,
____”দরজার লক টা খোলো ইয়াজ। আমি বাড়ি যাবো।”
ইয়াজ তখন ব্যাতিব্যাস্ত নূরিকে বোঝানোর চেষ্টায়। কোনো কিছু শোনার মানসিক অবস্থায় এই মূহুর্তে নেই নূরি। কাঁপা হাতে কোনোমতো জামার চেইনটা তুললো। হাত দুটো বেকায়দায় চেপে ধরেছিলো। ব্যাথায় অবশ। সামনের নরপিশাচের সাথে শক্তিতে বা বুদ্ধিতে পারবে না সে। এখন শান্ত মস্তিষ্কে এখান থেকে বের হতে হবে। কান্না কোনোমতে গিলে নিলো নিজের। ওড়নায় চোখদুটো মুছে নিলো।

____”ইট’স ওকে জান। আমি কিছু মনে করিনি। “
ইয়াজ বিশ্বাস করলো কি না বোঝা গেলো না। তাকালো বাইরের দিকে। নিশি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে গেটের রড এর ফাঁকে এদিকে তাকিয়ে। এখানে নূরি আদতে আছে কি না বোঝার চেষ্টায়। ইয়াজ লক খুলে দিলো। নূরি নেমে এলো। মনে হলো নরক থেকে মুক্তি মিললো। দৌড়বে? নাকি স্বাভাবিক যাবে। ইয়াজের ব্যবহার কোনো সাধারণ মানুষ এর মতো লাগলো না তার। তবে নামা মাত্র আর দেরি করলো না সেখানে। আর না তো ইয়াজের সাথে আর কোনো ফরমালিটির নাটক করলো। দৌড়ের মতো করে এগোলো বাড়ির দিকে।
নিশি যেনো ধরে প্রান ফিরে পেলো। রাগ করবে এই নিয়তে গেট খুলে দিতেই বিধ্বস্ত নূরিকে দেখে থমকালো সে। চকিত তাকালো কার টার দিকে। ওটা ততক্ষণে পার হয়ে গেছে উল্টোদিকে। নিশি কিছু বলার আগেই খেয়াল করলো এদিকে আসতে শুরু করেছে ঈশানের গাড়ি। নূরি খেয়াল করেনি সেসব। সে তো এই দুনিয়াতেই নেই এই মূহুর্তে। কান্নার মধ্যে কোনোমতে উচ্চারণ করলো,

____”আ…আপু…
কথা শেষ করতে পারলো না সে। এরই মধ্যে বিনাবাক্য ব্যায়ে নূরির কবজি চেপে ছুটলো বাড়ির দিকে। ঈশানের সামনে পরলে সর্বনাশ…
গাড়ি দ্রুত ছুটিয়ে দেওয়ান বাড়ি থেকে দুরত্ব বাড়ালো ইয়াজ। শব্দ করে হেসে ফেললো। বিশ্রি সে হাসি। অশ্লীল সে হাসি। গা ছমছম করে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে। গাড়ির এসি ছেড়ে দিলো ফুল দমে। বাইরের ঝড়ো হাওয়ার থেকে দ্বিগুণ ঝড় তার বুকে চলছে।

____” ভুল একবারই হয় জান। বারবার না। তোমার ওইটুকুন বোনকে দেখে তোমাকে ছেরে দিলাম আমি! বোকা নাকি? চাইলে তোমাদের দু বোনকে একসাথে বেডে তুলতে পারতাম আজকে। যতই বল তোমার থেকে কয়েকগুণ সুন্দরী তোমার বড় বোনটা। কিন্তু কি বলোতো! তোমার বিটকেল ভাইটা কিছুদূরেই দাড়িয়ে। মজাটাই দিলো নষ্ট করে। দুজনকে নিয়ে খেলতে একটু টাইম লাগবে না আমার! আজ ছাড়া পেলে আমি চেয়েছি তাই! খেতে তো চাইনি, তোমার রুহ কাঁপাতে চেয়েছি। সয়নে স্বপ্নে, বাস্তবে সর্বক্ষণ তুমি কাঁপবে আমার ভয়ে…তাতে আমার ফায়দা কি বলোতো জান? “
একাই হাসলো কিছুক্ষণ ইয়াজ। শব্দ করে থাপ্পড় মারলো স্টিয়ারিং এ।হাসি থেমে মুখ হলো কঠিন।
____” মানসিক ট্রমা…এটা দিতে আমি বড্ড ভালোবাসি জান। সবে তোমাকে দিলাম। তোমার গোটা পারিবার রয়েছে এ আপ্যায়ন এর তালিকায়..আর সবচেয়ে যাকে নাচাবো সে হলো তোমার বড় ভাইয়া…
আজকের পরও আমার থেকে দূরে যেতে পারবে না তুমি। ভালো সেজে তোমাদের নাচিয়ে মজা নেই জান। জানবে আমি খারাপ,তারপরও ছাড়তে পারবে না আমায়।প্রতি মূহুর্তে ছটফট করবে আমার থেকে পালানোর,অথচ যাওয়ার পথ থাকবে না। আমাকে ঘৃনা করবে,অথচ আমার কথায় চলবে, সবাইকে চালাবে। তবেই না মজা জান…”

নূরিকে নিয়ে নিশি এসেছে নূরির রুমে। শব্দহীন ভাবে আটকালো দরজা। নূরি দাড়িয়ে থাকতে পারছে না। মাথার খোঁপা করা চুলগুলো এলোমেলো। ধমক দেবে আর কি বোনের এ অবস্থায় বুকের ভিতর ঝড় উঠেছে নিশির। ধরে কোনোমতে বসালো বিছানায়। নূরি কাঁপছে এখনো। শরীরটা ভেজা। গায়ে ওড়না জড়ানো। সে নিজেও ভিজে গেছে। তবে সবের আগে এত রাতে বের হওয়ার কৈফিয়ত জানতে হবে তার। নূরির মুখচোখ ফ্যাকাসে। একটু আগে কি ঘটে যাচ্ছিলো আর তখন নিশি না পৌছালে কি হতে পারতো ভেবে বেঁচে থাকার ইচ্ছে চলে যাচ্ছে তার! শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। নিশি বসলো বোনের পাশে।কঠিন গলায় বললো,
____”প্রেমে পরে বোধবুদ্ধি, জ্ঞান সব খুইয়েছিস নূরি? রাত কত? কোন হুশে এ সময় দেওয়ান বাড়ির মেয়ে হয়ে বাইরে বের হওয়ার সাহস করলি তুই? যদি কিছু হয়ে যেতো?”
চোখ বড় বড় হয়ে আসে নূরির। যদি কিছু হয়ে যেতো বাক্যটা মস্তিষ্ক জ্বালিয়ে দিলো যেনো। আচমকা দু হাতে জড়িয়ে ধরলো নিশিকে। কেঁদে উঠলো হু হু করে। হতভম্ব হলো নিশি। তবে নিজের আগলে নিলো বোনকে। ব্যাস্ত গলায় বললো,

____”বকছি তার কারণ আছে।কাঁদবে না আগেই।”
____”আ..আপু..সর্বনাশ..”
কান্নায় কথা জড়িয়ে এলো নূরির। নিশি ধমক গলায় বললো,
____”বাড়িতে কেউ জানলে সর্বনাশ তো হতোই। কাউকে ভালোবাসিস অনেক আগেই আন্দাজ করেছিলাম আমি। সেটা দোষের নয়। আমিও বাসি। তো? এতো রাতে এরকম সিচুয়েশনে, আবহাওয়ায় বেড়িয়ে গেলি দেখা করতে! আর ইউ ইনসেন?”
বোনের কথাগুলো কানেই আসছে না নূরির। শরীর থরথর করে কাঁপছে কিছুক্ষণ আগে ঘটতে যাওয়া সব ঘটনার কথা মনে হয়ে। এটা কোন ধরনের ভালোবাসার ধরন! এ ভালোবাসায় কোনো পজিটিভ কিছু পেলো না কেনো সে! যা দেখলো সবটাই উন্মাদনা, নোংরামি। নূরির কান্না থামার নাম নেই। গাড়িতে কি ঘটেছে তা সম্পর্কে ধারনা নেই নিশির। তার মনে হয়েছে এত রাতে বের হয়ে নিশি জানতে পেরেছে তাই ভয়ে কাঁদছে মেয়েটা। শরীর ভেজা। গরম ও লাগছে জ্বর চলে আসবে আর কিছুক্ষণ এমন থাকলে। নরম গলায় বললো,

____”ছেলেটাকে বলবে এতো রাতে আর কখনো দেখা করতে না আসতে। আমি বাড়ির কাউকে বলবো না। তবে এটা শুধুমাত্র আজই প্রথম,আজই শেষ। এরপর আর কখনো এরকম ছেলেমানুষী দেখলে আমি বড়ভাইয়াকে জানাতে বাধ্য হবো।”
____”হু।”
____”কিছু হয়েছে আর?”
____”না তো।”
____”কাদছিস কেনো! ছেলেটা কিছু করেছে?”
সজোরে দুদিকে মাথা নাড়লো নূরি।কোনোমতে বললো,
____”বাড়ির কাউকে জানিয়ে না।আর হবেনা।”
নিশি বোনের মুখটা তোলে। কেঁদেকেটে ফুলিয়ে ফেলেছে ভয়ে!

____”ঘরে যা। পোশাক পাল্টা। ছেলেটা কে হুম? সিক্রেট রাখা হয়েছে আমার থেকে! বাববাহ্…কাল সব কাহিনি শুনবো। কার জন্য আমার বোনের মন ঘরে থাকে না।রাত বিরেতে ছুটে বেড়িয়ে যায়, জানতে হবে না!”
নূরি খুব কষ্টে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। ইচ্ছে তো করছে চিৎকার করে জানিয়ে দিতে সবটা। জানাবে! কি মনে করবে নিশি! খারাপ ভাববে তাকে?
____”আমি কিচ্ছু মনে করিনি নূরি। এতো অপরাধী মুখ করে বসে থাকার কারণ নেই। তবে অপরাধ কিন্তু হয়েছে। অন্তত আমাকে আগে জানানো উচিত ছিলো তোর। সদ্য একা বের হওয়া টা কতটা অনিরাপদ! আমি জানি তোর পছন্দ কখনো ভুল হবে না। আমার বোনকে আমি চিনি। হিরেই পছন্দ করবে তারা। কিন্তু আশেপাশের পরিস্থিতি তো ভালো নয় তাইনা? তোর নিয়াজ ভাইয়ের সাথে কি আমি রাত বিরেতে দেখা করতাম না? কতদিন তোকে পাহারায় রেখে ওই পিছনের গেটে দেখা করতে গেছি, সেটা তখন আলাদা বিষয় ছিলো। এখন এগুলো সম্ভব নয়। এলাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। বাড়ির কেউ জানলে কেলেংকারী ঘটে যাবে।আশা রাখবো এ ভুল আর কখনো হবে না কেমন?”
মাথা নাড়ে নূরি। বোনের এত এত বিশ্বাস এ জল ঢালতে পারলো না সে। আটকে দিলো তাকে কিছু একটা। ধীর গলায় কান্না আটকে বললো,

____”আর কখনো এমন হবে না আপু।সরি।”
____”ঘরে গিয়ে মাথায় পানি দে।বৃষ্টির পানি মাথায় পরলে ঠান্ডাজ্বর কোনোটাই ছাড়বে না। আজ বাদে কাল ঈদ। এখন বিছানায় পরে থাকলে চলবে!
ধীরেসুস্থে কাঁপা কাঁপা পায়ে নিজের ঘরে এলো নূরি। দরজার ছিটকিনি আটকালো। হাতটা ব্যাথায় নড়াচড়া করতে পারছে না। দরজা আটকাতেই ধপ করে বসে পরলো মেঝেতে। তার সোজাসুজি আয়না টা। তাকালো সেদিকে। গায়ে জড়িয়ে রাখা ওড়না টা সরালো ধীর হাতে। গায়ের জামাটা ছেঁড়া ফাটা। জায়গায় জায়গায় টেনেহিঁচড়ে ছিড়ে ফেলা হয়েছে। পিটের আধখোলা চেইন টেনে আরও নামালো । কাধের ওপর থেকে জামা সরালো। অজস্র খামচি,কামড়ের দাগ। রক্ত জমাট বেধে বেধে আছে। শিওরে উঠলো শরীর। নরপিশাচরা বোধহয় এমন হয়! কানে বাজছে ইয়াজের গা ছমছমে হাসিগুলো। উন্মাদের মতো ছুঁচ্ছিল তাকে। কতবার বাধা দিলো,অসহায় এর মতো চিৎকার করলো। ইয়াজের কঠোরতা বাড়লো তত বার। ভয়ংকর সে মূহুর্ত। ওখানে ভালোবাসা, সম্মান, ধৈর্য এগুলো কোথায়? পেলো না কেনো সেগুলো ইয়াজের মাঝে! গত তিনবছরের তো কখন এ ধরনের হিংস্রতা দেখায়নি সে। সে ভালোমানুষি তো এক চুটকিতে এখন নাটক মনে হচ্ছে তার! নিজের বিধ্বস্ত শরীরের কাটাছেঁড়ার দিকে তাকিয়ে প্রথম ঘৃনা লাগলো নিজের ওপর। প্রথম দিন যেদিন এরকম ধরনের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিলো সেদিন ইয়াজের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো হোটেলে। এখানে আসলে ইয়াজ যেখানে স্টে করে। এখান একটা ফোর স্টার হোটেল। স্বাভাবিক ভাবেই গিয়েছিলো জাস্ট ঘন্টাখানেক এর নরমাল মিট আপ এর জন্য। সেদিনও ঘটতে যাচ্ছিলো এহেন দূর্ঘটনা। তবে এতোটা একদম নয়। ইয়াজ নেশাগ্রস্ত ছিলো, খাবারের ভুল করে খেয়ে ফেলেছিলো নাকি। সেদিন ঠোঁট ঠোঁট রেখে কয়েকমিনিটের উন্মাদনা ছিলো, সেদিন খব অল্পে থামাতে পেরেছিলো সে ইয়াজকে। রাগ করে চলে আসলেও ইয়াজ ক্ষমা চেয়েছে বারংবার সেদিন এর করা ভুলের জন্য।

কিন্তু আজ! আজ যেটা ঘটলো সেটায় কলঙ্ক লেপটালো তার শরীরে। ইয়াজ স্বামী হবে তার? মানতে পারবে ওই পুরুষকে! দু হাতে মুখ চেপে ধরে নূরি।আজকের ঘটনার পর কিছুতেই ওই মানুষ টাকে মানতে পারবে না সে, ওই জংলী পশু সম্মান করেতে জানেনা বিয়ের আগে মেয়েদের। তার সাথে সংসার সম্ভব! কখনো না। ভালোবাসলেই সম্মান ভুলে যেতে নেই।
ফুঁপিয়ে ওঠে নূরি।কামড়ে ধরে নিজের হাত। চিৎকার বুক চিড়ে বেড়িয়ে আসছে তার। খোদা কাকে তার ভাগ্যে রেখেছে! তাকে কি সে ঠকালো না? স্বামীর আগে অবিবাহিত কোনো মেয়েকে অন্য পুরুষ ছোয়া কঠিন পাপ নয়! পাপ তো। এ জীবনে আর ভালোবাসা অনূভব করবে সে কখনো ইয়াজের প্রতি? কখনো না,কখনো না।

ঈশানের এর চোখমুখ শক্ত। গাড়ি আর বউ এই দুটো আজ বড় ভোগান ভোগালো তাকে। শেষ তিন রাত হলো ঘুম নেই চোখে।আজ তিতির টা এমন কান্ড না করলে নিশ্চয় এতক্ষণ ঘুমন্ত বউটার বুকে লুকিয়ে মুখ গুজে ঘুমাতো। অসহ্য লাগছে মাথা যন্ত্রণায়।
গাড়ি এসে ঘুরিয়ে নিলো মেইন গেটে। দারোয়ান চাচাকে বলা হলো তাদের বাইরে যাওয়ার কথা রাইসুল দেওয়ান কে না জানাতে। অযথা খ্যাচখ্যাচ করবে। গাড়ি থামিয়ে এসে খুললো তিতিরের পাশের দরজা। তিতির একা নামতে যেতেই ঝড়ের গতিতে তুলে নিলো নিজের কোলে।
____”আমি পারবো।”
____”কথা কম।”

বিনা বাক্য ব্যায়ে বাড়ির ভিতর ঢুকলো তারা। ভাগ্যভালো কেউ নামেনি নিচতলায় এখনো। সম্ভবত মিনিট পনেরোর মধ্যে নামবে। তিতির কে নিয়ে সোজা চলে এলো নিজের রুমে। তিতির কে বসায় চেয়ারে। তিতির মেঝেতে পা রাখতেই খেয়াল করে পায়ের চিনচিন ব্যাথা। মোটেই হেটে এতদূর আসতে পারতো না সে।ঈশান ব্যাস্ত হাতে আলমিরা তে খুঁজলো তিতিরের জামাকাপড়। এ রুমে শুধু তিতিরের শাড়িগুলো রাখা। এই আবহাওয়ায়, এরকম মূহুর্তে আত্মহত্যা করার মানেই হয়না মেয়েটাকে শাড়ি পরতে দিয়ে। তিতিরের দিকে ফিরলো
____”জামাকাপড় নিয়ে আসি আমি।”
ব্যাস্ত হয় তিতির। দু হাত নাড়ে,

____”আপনার আনতে হবে না। আমি আমার ঘরেই যাচ্ছি। “
ঈশান এগিয়ে আসে। চেয়ারের দু পাশে হাত রেখে ঝুকে আসে তিতিরের মুখের দিকে। তিতিরও সঙ্গে সঙ্গে হেলে পিছনে।
____” আজ থেকে এই ঘরে থাকবি, এখন জামাকাপড় যা পরবি এনে দিচ্ছি। বাকিসব পরে নিয়ে আসবি একেবারে।”
____”আমি ওই ঘরেই কমফোর্টেবল। “
____”বলে লাভ নেই। আমার সাথে কমফোর্টেবল হতে হবে। অ্যাম ইওর হাসবেন্ড। আমার সাথে সবসময়, সবভাবে নিজেকে ইজি রাখতে হবে তোকে। আলাদা থাকলে সেটা এ জীবনে পসিবল নয়।”
তিতির নিজের বুকের ঢিপঢিপ স্পষ্ট শুনতে পায়। নিজের ঘরে গেলে নূরির খবরটা নিতে পারতো। ঈশানকে বলে ঝামেলা বাড়ানোর আগে জানা দরকার ছিলো।
____”কি পরবি এখন, কোথায় সেসব?”
____”আমি নিয়ে আসি। আপনি পারবেন না।”
____”সামান্য জামাকাপড় নিয়ে আসতে পারবো না এ কেমন কথা! আলমারিতে তো?”
তিতিরের জবাবের অপেক্ষা করে না সে। ভেজা শার্ট চোখের পলকে খুলে আলনা থেকে সফেদ তোয়ালে ঝোলায় গলায়। বেরিয়ে যায় জামাকাপড় আনতে।

তিতির সময় নষ্ট করে না। পাশেই সকেট, নিজের ফোনটা দ্রুত লাগায় চার্জারে। অন করতেই ভেসে ওঠে বেশ কয়েকটা মেসেজ। নিশি করেছে। ঘন্টাখানেক আগের কল,মেসেজও আছে। সাথে মিনিট কয়েক আগের মেসেজ দুটো। নূরিকে পাওয়া গেছে, ভালো আছে, বাড়িতেই ছিলো। হাফ ছাড়লো তিতির। অস্থির – লাগছিলো এতক্ষণ তার।
ঈশান বে আক্কেল এর মতো দাড়িয়ে আছে তিতিরের আলমারি খুলে। দু হাত কাঠের দু পাল্লায়। বুকের বা পাশের প্রচন্ড জোরেশোরে ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। তার কারণ বড় সড়। তিতিরের জিনিসপত্র। আলমারির ভিতরটা মেয়েলি জিনিসে ঠাসা। বেশ গোছানো সবটা। একপাশে জামাকাপড় গুলো পাশের ছোটছোট তাকে সব মেয়েলি আন্ডারগার্মেন্টস্, সব। চোখ বুজে শ্বাস নিলো সে। সত্যিই তিতিরকেই নিয়ে আসা উচিত ছিলো। এরকম বুফে টাইপের হয়ে গেলো বিষয়টা। কোনটা কোনটা লাগবে সেসব নিজে বেছে নিতে হবে! এর থেকে কোলে তুলে নিয়ে এলে নিজের মতো নিয়ে যেতে পারতো সব। ঈশান ইতস্তত করে খানিকটা। হাতবাড়িয়ে নিয়ে নেয় একে একে জিনিসপত্র গুলো।
তিতির শীতে কাপছে ঠকঠক করে। হাটু জড়িয়ে আছে দু হাতে। ঈশান ঘরে ঢুকতেই চেয়ার থেকে পা নামিয়ে বসলো। ঈশান হাত বাড়িয়ে দিলো কাপড় চোপড় গুলে। হাতে নিতে থমকালো তিতির। রেড টি শার্ট, পালাজো সাথে একটা পিংক ইনার…দু হাতে তড়িঘড়ি করে সেটা নেয় জামাকাপড় এর নিচে।আমতাআমতা করে ওঠে,

____”আমি বললাম আমার রুমে যাই।”
ঈশান ভ্রু কুচকায়। হাতের জামাকাপড় গুলো দিকে তাকায়। তিতিরের মুখও সেদিকেই।
____”ঠিকঠাক সব আনিনি?
তিতির হাতের জামাকাপড় গুলো আরও শক্ত করে ধরে। উঠতে উদ্যত হয়। ধীর গলায় বলে,
____”ভুল টা এনেছেন।”
____”ভুল কি আনলাম! এগুলোই তো পরিস। আলমারিতে যখন…
তিতির কাচুমাচু করে। কি বলবে এখন! ইনার টা বছর পাঁচেক আগেকার? এটার সাইজ এখন ব্যবহার করে না সে! ঈশান ভুল করে শতযুগ আগের জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে।
____”এটা পরিনা। আ..আপনি আমাকে আমার রুমে নিয়ে চলুন। আমি খুজে নিবো।”
ঈশান বিরক্ত হয় এবারে। এতো লজ্জা পাওয়ার কি আছে। এমন তো নয় ইনার আগে দেখেনি সে। প্রথমবার যখন এনে দিতে পেরেছে, পরেরবার ঠিকটাই এনে দেবে।
____”তোর এটা পরতে সমস্যা কি!”
এ আবার কি কথা। এসব নিয়ে এতো জেরা করে কেউ! বোধবুদ্ধি না থাকলে যা হয় আরকি।
____”সমস্যা আছে জন্যই বলছি।সরুন দেখি আমিই…
উঠার চেষ্টা দেখতেই ধমকে উঠলো ঈশান।
____”পাকনামি না করে বল কোন রঙ্গের লাগবে। ঢং এর শেষ নেই। এতো মিলিয়ে পরার কি আছে! আজ তো ঠিকই নিজে সাদার সাথে কালো পরে বেরিয়েছিলি। আর আমি লালের সাথে পিংক আনাতেই দোষ!”
কান ঝা ঝ করে উঠলো তিতিরের। গায়ের আধাশুকনা ওড়না খামচে ধরলো। লোকটা দেখেছে সেটা আবার সাউন্ড বক্স এনে ঘোষনা করছে।মাথা নিচু করে লজ্জায় লাল মুখ আড়াল করে বললো,

____”বেশি বোঝেন। রঙের কথা কখন বললাম আমি।”
____”তো?কি সমস্যা। জামাকাপড় অন্য আনবো?”
তিতির কন্ঠ খাদে নামায়।কথাগুলো মুখে এসে গুলিয়ে যাচ্ছে। এতদিন রাগ ছিলো,লজ্জা পেলেও এতো মিয়িয়ে যেতো না। ঈশানের আজকের স্বীকারোক্তির পর লোকটার দিকে তাকাতেই কেমন অন্যরকম ফিল হচ্ছে, মাথা বনবন করছে,উথালপাতাল হচ্ছে আগের থেকে কয়েকগুন বেশি।মিনমিন স্বরে বলে,
____”এটা আমার সাইজে হয়না।”
বিরক্ত মুখে আচমকা তিতিরের হাত থেকে টান দিয়ে বস্ত্র খানা নিলো নিজের হাতে। বড্ড আগ্রহ চোখে সামনে ঝুলিয়ে ধরলো। গভীরর মনোযোগ এ সে বস্তু পরখ করলো।
____”এটাও তোর বড় হয়! মানসম্মান রাখলি না। আচ্ছা মন খারাপ করিস না। রেখে দে। আমার সাথে ঘুমানো শুরু কর। কয়েকমাস পর পরতে পারবি। “

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো তিতির। কান দিয়ে টুংং টাংং দীর্ঘ একটা শব্দ সুর করে গেলো। ঘাম ছুটে গেলো চোখের পলকে। বেহায়া লোক টা বলে কি! একফোঁটা মুখে লাগাম নেই! তিতিরের গলা কাঠ হয়ে গেছে। লজ্জায় মাটি খুড়ে ঢুকে যেতে মন চাচ্ছে তার। পা ব্যাথা না হলে ছুট দিতো বোধহয়।অস্ফুটস্বরে বললো,
____”ছিহ্। কথায় ব্রেক নেই কেনো। আমি কখনো বললাম ওটা…
ঈশান দ্বিগুণ চিন্তিত হলো।আবার ঘুরিয়ে দেখলো হাতের জিনিসটা।
____”এখন বলিস না এটা তোর ছোট হয়।”
লজ্জায় আড়ষট তিতিরের মেজাজ খারাপ হলো এবারে।লজ্জায় রাঙা মুখ কুচকে কোনোমতে বললো,
____”হয়। তো? দিন আমার হাতে। অসভ্য লোক।”
____”মহা সমস্যা! আমি ছুতেই তো পারলাম না এখনো। সাইজ বাড়লো কি করে!”
লোকটা তিতিরকে এসব বেহায়া কথার নিচে ফেলে যেকোনো সময় খুন করে ফেলবে। এসব কথাবার্তার ছিড়ি! একটু তো রয়েসয়ে কথা বলা দরকার!

____”আ..আপনি একটা কথাও বলবেন না দয়া করে। পাচ বছর আগের জিনিস টেনেহিঁচড়ে নিয়ে এসে গবেষনা? অসহ্য। আপনার সাথে একঘরে এক সেকেন্ড থাকা আমার সম্ভব নয়। যেদিন সভ্য হবেন সেদিন আসবো।”
____”পাকনামি করে মারবো থাপ্পড়। বোস এখানে। সাইজ কত? সেটা বল। নিয়ে আসি।”
নিজের কপালে শত লাথি মারতে ইচ্ছে হলো তিতিরের।দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
____”এটা যেখান থেকে এনেছেন তার নিচের তাক থেকে আনবেন।”
____”এক কাজ কর । পরতে হবে না। ঘুমানোর সময় যত কম কাপড় তত শান্তি। আমাকে দেখিস না!
____”আপনার মতো বেহায়া আমি হতে পারবনা।আর আজ থেকে আপনিও কাপড় চোপড় পরেই শোবেন। একা আপনি থাকছেন না এ ঘরে। আমিও যেহেতু থাকবো। এতো নির্লজ্জ লোকের সাথে থাকা সম্ভব নয়। “
বাঁকা হাসলো ঈশান। হাতের আঙ্গুলে ইনারের ফিতে আটকে ঘুরলো গোল গোল। তিতির হতভম্ব হয়। কি পরিমাণ অসভ্য ভাবা যায়! তিতির তার মুখের দিকে তাকাতেই চোখ মারে ঈশান,ঈশান হাস্কিস্বরে বললো,

____”এখন আমাকে পরাবি কাপড়, দুদিন পর আমি তোর সেগুলো একে একে খুলবো… শোধবোধ… নে নে। নিয়ে নে সময়। কয়েকটা দিন না হয় চললো তোর রাজত্ব। এমনিতেও আমি রাজ্যের দায়িত্ব নিলে তুই তো হয়ে যাবি শয্যাশায়ী। তখন এসব ফালতু জিনিস গায়ে থাকার মানেই হয়না। বারবার কষ্ট হবে না আমার খুলতে?”
তিতির চোখমুখ খিচে বন্ধ করে ফেলে। কান চেপে ধরে দু হাতে। এ কার সাথে বিয়ে হলো তার! এ আবার কেমন গোছের লোক। ঝগড়া মিটমাট হলো খানিকটা সময়।তাই বলে এমন করে তাকে অশান্তিতে ফেলা শুরু করবে!

শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে তিতির কিছুক্ষণ হলো। নিচে মামনী দের কন্ঠ পাওয়া যাচ্ছে। সাহরীর জন্য খেতে ডাকবে আর মিনিট দশেক পরেই। ঈশান বের হলো জবজবে ভেজা চুল নিয়ে।তিতির না চাইতেও চোখ গেলো সেদিকে। ঈশানেের কোমড়ে সেদিন এর মতো একটা তোয়ালে পেচানো। দৃষ্টি সরিয়ে নিতে চাইলো তিতির,সম্ভব হলো না।
ঈশান দু হাতে ভেজা চুল গুলো এলেমেলো করে পানি ঝরাতে ব্যাস্ত। সম্ভবত একফোটাও মোছেনি মাথাটা। সেই কারুকার্য আকা পেশল শরীর। চোখে ঝাপসা দেখে তিতির। বিছানায় ঘুরে বসে তিতির।
____”মাথাটা মুছে নিন।
____”আরেকটা তোয়ালে পাচ্ছি না। খালা ধুতে নিয়েছিলো কাল। বৃষ্টির জন্য শুকায়নি হয়তো। তাই দিয়ে যায়নি।”
তিতির উল্টো ঘোরা অবস্থাতেই নিজের চুল থেকে তোয়ালে টা খুলে বাড়িয়ে ধরলো ঈশানের দিকে।
____”এটা নিতে পারেন।”

ঈশান গভীর চোখে তাকায়। নিজের ধৈর্যের ওপর বিরক্ত হয়। তিতিরের সামান্য একটা কাজে বুকের ভিতর এমন ঝড় ওঠাটা নেহাৎ কনট্রোললেস ব্যাক্তিদের কাজকারবার। ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর ক্যারেকটার হবে স্ট্রং। এসব সামান্য বিষয়ে বুকের উথালপাতাল প্রশ্রয় দিলে চলে! হাত বাড়িয়ে তিতিরের তোয়ালে টা নিয়ে চুল মুছতেই নাকে বাড়ি দিলো তিতিরের চুলের ঘ্রান। হার্টবিট দ্রুত চলছে তার। শ্বাস আটকে আসলো। নেশাটেশা মাখে নাকি! মাথাটা ধীরেসুস্থে মুছে তোয়ালে টা ছুড়ে দিলো তিতিরের পাশে। বিরক্ত মুখে তাকালো তিতির সেটার দিকে। উপকার এর জন্যই করতে নেই। বিপদে সাহায্য করলো তার কাজ শেষ হতেই মারলো ছুড়ে!
তিতির ঘুরে উঠে ঈশানকে কিছু বলবে ঠিক তখনই দু হাত বিছানায় ঠেকিয়ে একদম ঝুকে এলো ঈশান। তিতির আচমকা এমন হওয়ায় কনুই ভর দিয়ে আধশোয়া হয়ে গেলো বিছানায়। ঈশানের ভেজা চুলগুলো কপালে এসেছে পরেছে,সেখান থেকে টপটপ পানি এসে পরলো তার কন্ঠদেশে। শিরশির করে উঠলো শরীর। ঈশান নিজের দু হাতের অবস্থান এর দিকে ইশারা করে হাস্কিস্বরে বললো,

____”ছুইনি কিন্তু তোকে। এতো কাঁপছিস কেনো তাহলে।”
____”স…সরুন। নিচে চলুন। খেতে ডাকবে এক্ষুনি।”
ঈশান সরলো না বরং মাথা ঝুকে মুখ ডুবালো তিতিরের ভেজা চুলে। শ্বাস টানলো টানা কয়েকবার উন্মাদের মতো। তিতির হাত মুঠে করে ধরলো বিছানার চাদর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পারলে চোখে পরতো একই ভাবে চাদর ধরে রেখেছে ঈশানেরও হাত দুটো! তিতিরকে ছুতে না পারার আফসোসে লাগাম টানছে নিজের মধ্যে?
ঈশান মুখ তুললো। দুজনের ওষ্ঠজোড়ার মাঝে নামমাত্র ফাঁকা
____”তোর শ্যাম্পুতে কি আফিম মেশানো? কাছে এলে টানে কেনো এতো? এই শ্যাম্পু আপাতত ইউজ বন্ধ, যেদিন কাছে আসার পারমিশন দিবি সেদিন থেকে আবার ইউজ করবি।”
লজ্জায় রাঙিয়ে থাকা হরিণি বড় বড় চোখ জোড়া ঈশানের দিকে রাখতেই চোখাচোখি হলো দুজনের।
ঈশান শুকনো ঢোক গিললো। তিতিরের দৃষ্টি পরলো ঈশানের কন্ঠদেশের অ্যাডামস্ অ্যাপেলের দিকে। ওঠানামা করছে। চুম্বক এর মতো টানছে…
ঈশানের এর চোখ থেকে হাজার কথা বেড়িয়ে আসতে চাইছে, তিতিরকে বোঝাতে চাইছে অনেককিছু। ফিসফিস করে বললো,

____” ও হ্যা একই রেস্ট্রিকশন তোর তাকানোর ক্ষেত্রেও, খুন হয়ে যাই তো। খবরদার সময় অসময় ওভাবে তাকাবি না…”
তিতির বাকরুদ্ধ হয়ে থাকে লাজে। পাগল লোকটার পাগলের মতো কথাবার্তা শেনার শক্তি তার ছোট্ট শরীরের নেই। সে নিজেকে আজীবন কঠিন সংযোমি নারী ভেবে এসেছে। ঈশান এর সাথে পরিচয় হওয়ার পর টের পেয়েছে সেটা কত বড় মিথ্যা কথা। যদিও এমন অনূভুতি শুধুমাত্র এই অসভ্য লোকটার জন্যই হয়। আজকে কেনো জানি প্রতিবাদও করতে পারছে না,রাগ করে ধাক্কা মারতে পারছে না! সে তো রেগে ছিলো, এতে তাড়াতাড়ি অভিমান মুছে গেছে এটা বুঝতে দিলে চলবে নাকি! এতদিন তাকে যে কষ্ট দিলো। সে এর প্রতিশোধ নেবে না ভেবেছে নাকি ঈশান আরশাদ দেওয়ান ! হাহ্, সবে তো ধৈর্যর পরীক্ষা নেওয়া শুরু। ভালোবাসি উচ্চারণ না করিয়ে সে ছাড়ছে না। তার জন্য মাতাল না বানানো পর্যন্ত ছুঁতে দেবে সে! এতই সোজা তিতিরকে পাওয়া?
তিতির দু হাতে সরিয়ে দিলো ঈশানকে। ঈশানও সরেই গেলো। বাঁকা হাসি দিয়ে দ্রুত টি শার্ট আর ট্রাউজার জড়িয়ে নিলো গায়ে। সময় দেখলো। এখন নিচে না গেলে ডাকতে আসবে মা, চাচি কেউ একজন। বিনাবাক্য তিতিরকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা ধরলো নিচে যেতে। তিতির হতচকিত হলো।

____”আরেহ্ করছেন কি! “
____”সাহরী খাবি না?”
____”খাবো তো। কোলে নিলেন কেনো? নামান।”
তিতিরের ছটফট করা পাত্তা দিলো না সে। পা টা এখনো ফুলে আছে। গোসলে যাওয়ার আগে মুভ টা বের করে দিয়ে গিয়েছিলো পায়ে লাগিয়ে নিতে। অবাধ্য মেয়েটা লাগয়নি সেটা। দাঁতে দাঁত চাপলো ঈশান,
____”ওষুধ টা লাগাসনি কেনো!”
তাইতো! ওষুধ টা লাগায়নি সে। আদতে মনে নেই।মিনমিন গলায় বললো,
____”খেয়ে এসে লাগিয়ে নেবো। নামান দেখি। নিচে সবাই কি ভাববে।”
____”কি ভাববে!”
তিতির এর ছোট্ট শরীরের নড়াচড়া গ্রাহ্য না করে সিড়ি ভেঙে নিচে নামলো ঈশান।

চন্দ্রকাননের সকলেই ডায়নিং টেবিলে উপস্থিত। রাইসুল দেওয়ান রা তিন ভাই, গিন্নিরা,সব ছেলেমেয়েরাও এসে গেছে। নয়ন বাড়ি ফিরেছে কিছুক্ষণ আগেই। মায়ের সামনে পরলেও কোনোমতে ম্যানেজ করেছে। নিশি,নূরি শাওয়ার নিয়ে চুল শুকিয়ে নিচে নেমেছে। এমনকি আজকে সয়ং চন্দ্রা দেওয়ানও উপস্থিত। বলতে গেলে সবার পরে আসলো ঈশান আর তিতিরই। তিতিরকে কোলে নিয়ে ওভাবে নেমে আসা প্রথম চোখে পরলো রাফির। বেচারা চিকেন টিক্কা সবেই মুখে তুলেছিলো। সেটা মুখ থেকে টুপ করে পরলো পাতে। মুক্তা দেওয়ান চড় মারলেন ছেলের মাথায়।ধমকে উঠলেন,
____”মুখের খাবার পরে কি করে গাধা!”
রাফি কথা বলতে পারলো না।তার বার্বিকে কোলে নিয়ে নামা হচ্ছে। রোমান্টিসিজম না বুঝলেও বেশ লাগলো তার। চিৎকার করে হাতের ইশারা করলো ওদিকে,
____”বার্বিকে বড়ভাইয়া বার্বির মতো কোলে তুলে নিয়ে আসছে।”
ছোট্ট রাফির কথায় চকিত দৃষ্টি গেলো সকলের সিড়ির মাঝে। ততক্ষণে নেমে এসেছে ঈশান। তিতির লজ্জায় এতটুকুন হয়ে গেছে। বলাবাহুল্য হা হয়ে গেছে সকলেই। রাইসুল দেওয়ান সর্বপ্রথম কাশি দিয়ে স্ত্রীকে বললো খাবার দিতে। বাকি দুই কর্তাও তাই। গিন্নিরা আচলে মুখ চাপা দিয়ে খাবার বারতে লাগলো সবার প্লেটে। নিশি, নূরি মুখচাওয়া চাওয়ি করলো একে অন্যের দিকে।হতভম্ব তারাও। ঈশান তিতিরকে চেয়ারে বসিয়ে বসলো পাশের চেয়ারটায়। গম্ভীর গলায় বললো,

____”তোমাদের মেয়ে ওড়াউড়ি বেশি করে কিনা! পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। পা মচকেছে।”
সকলে অতি ব্যাস্ত হলো। তিতির কষ্টেসৃষ্টে বোঝালো তেমন কিছু নয়। সামন্যই ব্যাথা।
চন্দ্রা দেওয়ান মুগ্ধ হন। নাতি নাতনির দিকে কিয়ৎক্ষন তাকিয়ে থাকেন মুগ্ধ চোখে। কি সুন্দর মানায় দুটোকে। আদর সোহাগে পরিপূর্ণ থাকুক সারাজীবন এরা।
খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষের দিকে। চন্দ্রা দেওয়ান আগেই উঠতে নিষেধ করলো সকললে। গম্ভীর গলাতে বললো,
____”ঈদের দিন তোমাদের বাবার মৃত্যু বার্ষিকী পরেছে। তোমাদের দাদুর গ্রামের লোকজন আসবে।মানে আমার শশুর বাড়ির লোকজন। “
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিশি, নূরি রা। তাদের দিদার গ্রামের মানুষ মানে গন্ডগ্রামের কিছু ক্যাটক্যাট করা দিদা রা। তাদের দিদা দাদুর চাচাতো, খালাতো ভাইবোন না কি জেনো! এর আগেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসেছে তারা। কি যে অসহ্য! বলার বাইরে। রাইসুল দেওয়ান রা তিন ভাই মাথা নাড়লো। কোনো সমস্যা নেই কারোর। চন্দ্রা দেওয়ান একই স্বরে বললেন,

____” ঈদের তিনদিন আগেই আসবেন তারা। সব আত্মীয় সজনদেরই কাল পরুশুর মধ্যে চলে আসতে বলবে। যেহেতু একদিন আগে ইফতারের আয়োজন আছে একটা। আমার আশ্রয় এর ছেলেমেয়ে গুলো,বৃদ্ধাশ্রম থেকে সবাই আসবে। রাসু, তোমাদের যা যা আয়োজন করতে বলেছিলাম?”
রাইসুল সাহেব মাথা নাড়েন।নরম গলায় বলেন,
____”আমি, রাসেদ,রাহি সব মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছি মা। তাছাড়া বাদবাকি সব ঈশান আর নয়ন দেখে নেবে।”
চন্দ্রা দেওয়ান মেজো বউমার হাত থেকে ওষুধ গুলো নিয়ে খেয়ে একনজর তাকালো ঈশান-তিতিরের দিকে। তিতির পানির গ্লাস আকড়ে বসা। তার লজ্জা এখনো কাটেনি।চন্দ্রা দেওয়ান এর অভিজ্ঞ চোখ আটকালো তিতিরের ঠোঁট এর ওপর। দুই জায়গায় জখম হওয়া। তাছাড়া ওড়নার ফাঁক দিয়ে কালসিটে দাগ গলার ওই হাড়ের ওপরও দেখতে পেলেন তিনি। মনে মনে বেশ হাসলেন।
_____”বড় দাদুভাই…তোমার আর পুত্তুল এর বিয়েটার কথা জানানো হয়নি কাউকেই। তোমরা কি বলো? সকলে আসবেই এবার। জানিয়ে দেওয়া উচিত? আমার তো মনে হয় উচিত। “
তিতির মাথা নিচু করে থাকে। তার কিছু বলার নেই এখানে। তার নানুআপুর কোনো সিদ্ধান্তে সে দ্বিমত করেনি এ জীবনে কখনো। এটাতেও প্রশ্নই আসেনা।তাছাড়া আগে অথবা পরে জানাতেই হবে। তবে মাথা নাড়লো ঈশান। গম্ভীর গলাতে বললো,

____”এতো ব্যাস্ত হওয়ার কিছু হয়নি। অনেক সময় আছে জানানোর। জানানো যাবে। এখন না।”
রাইসুল দেওয়ান বিরক্তই হলো। না জানানোর কি আছে! পরে যখন আত্মীয় সজনরা জানবে তখন নিশ্চয় নানা কথা হবে। এর থেকে ভালো জানিয়ে দিলেই হয়। অনুষ্ঠান টা ধীরেসুস্থে করবে ক্ষন। তবে ঈশানের সাড়া পাওয়া গেলো না। সে জানাবে না কাউকে এখন। তার সিদ্ধান্তে অটল সে। তিতিরের এবার মেজাজ খারাপ হলো সামান্য। ঘরের ভিতর হম্বিতম্বি কাছে পেতে। বাইরের সকলকে জানাতে সমস্যা! আজব মানুষ।
____”ঠিক আছে। তোমরা যদি মনে করো আরও সময় লাগবে তোমাদের। নিতে পারো। আমরা জোরজবরদস্তি করবো না। সংসার তোমাদের, গুছিয়ে তোমাদেরই নিতে হবে। ঈদের হৈ চৈ যাক। আমি বলবো দুজন ঘুরে এসো কোথায়। এখানে সময় দিতে পারছো না একে অপরকে। বাড়ি ভর্তি মানুষ,নিজেদের মতো সময় কাটাতেও পারোনা।দেশের বাইরে চাইলে যেতে পারো মধুচন্দ্রিমায়।”
তিতির এবারে সত্যিই মরে যাবে লজ্জায়। যেমন দিদা তার তেমন নাতি। সবাই নির্লজ্জ। মামা,মামিদের সামনে এতো খুলে বলার মানে হয়!
ঈশান চেয়ার ছেড়ে উঠলো।দিদার দিকে তাকিয়ে বললো,

____”যখন দরকার মনে হবে নিশ্চয় জানাবে দিদা। আপাতত থাক। ব্যাস্ততা খুব।তাছাড়া এলাকার ঝামেলা তো একটা আছেই। এখানে থাকা দরকার আমারও। “
চন্দ্রা দেওয়ান মাথা নাড়তেই ঈশান ফিরলো তিতিরের দিকে।ধমক গলায় বললো,
____”খাওয়া হয়েছে তোর? ওপরে যাবো আমি।”
____”হয়েছে।”
শব্দটা শেষও হতে পারলো না। আরেকদফা নির্লজ্জতার প্রমান দেখিয়ে তিতিরকে কোলে নিয়ে ছুটলো ঘরের দিকে। পিছনে রেখে গেলো মিটিমিটি হাস্যজ্জল কয়েকজোড়া চোখ।

ঘরে এসে খুব যত্ন বসালো বিছানায়। পিঠের পাশে একটা বালিশ দিয়ে আরেকটা রাখলো ফুলো পা টার নিচে। টেবিলের ওপর থেকে মুভ নিয়ে হাত ছোয়ালো ফুলো জায়গাটায়। তিতিরের বাধা দিতে মন চাইলো না কেনো যেনো। ব্যাথা এতক্ষণ টের না পেলেও এখন পাচ্ছে। টনটন করছে। তবে বিন্দুমাত্র আওয়াজ করলো না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনের মানুষ টার দিকে।অচেনা লাগছে তার। এতো যত্ন,এতো খেয়াল!
____”শুয়ে পর। লাইট অফ করে আসি।”
লাইট অফ করে আসি মানে টা কি! এক বিছানায় শোবে তারা আবার! এটাই তো সমস্যা। একসাথে একদিনের স্মৃতিও স্বাভাবিক নয়।বড্ড অস্বাভাবিক। তিতির তোতলায়।
____”আ..আ..আপনি এখানেই শোবেন?”
ঈশান যেনো অবাকই হলো। লাইট অফ করে ড্রিম লাইট দিয়ে ওপাশ দিয়ে এসে বসলো বিছানায়।গায়ের চাদর মেলতে মেলতে বললো,
____”আমার ঘর আমি কোথায় শোবো! তিনরাত হলো ঘুমাই না।ঘুমাবো না?”
তিতির সরে আসে এদিকটা। এলোমেলো দৃষ্টি নিয়ে তাকায় সোফার দিকে,
____”আ..আমি তাহলে সোফায় শুই।”
____”ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবো কিন্তু। রাত বিরেতে নাটকের জায়গা পাসনা। শুয়ে পর জলদি। মাথা হাত বুলিয়ে দিবি।তোর জন্য বৃষ্টিতে ভিজে যন্ত্রনা করছে মাথা । “
ঈশানের ধমকে ভয় পেলেও ওপরে ওপরে
টললো না তিতির। কন্ঠ ঈশানের মতোই গম্ভীর করে বললো,

____”পারবো না আমি। “
____”মুখে মুখে তর্ক অসহ্য লাগে তিতির।”
____”এটা আমারও রুম।সুতরাং একা আপনার মর্জি চলবে না। আমি যেখানে ইচ্ছে শুতে পারি।”
ঈশানের এখন খ্যাচখ্যাচ করার একদম মুড নেই। তিতির টাকে ঘুম পারিয়ে লুকিয়ে মুখ গুজবে মেয়েটার নরম বুকে। না হলে আজকাল ঘুম হতে চায়না তার। মেয়েটা এতক্ষণে নাটক শুরু করেছে। খানিকটা ঘেষে আসলো তিতিরের দিকে। ফিচেল গলায় বললো,
____”এ ধরনের পাগলের প্রলাপ দিনের বেলায় তুই বকতেই পারিস। সকাল হয়ে গেছে তো। যাই হোক। তবে তোর রাতের মর্জির মালিক আমি। সেই তো আমার নামেই চিৎকার করবি। তাই সকাল হয়ে গেছে বলে ছেরে দেবো ভাবিস না। ধরলে আস্ত রাখবো না।যা বলছি শোন।”
তিতির হতভম্ব হয়।অসভ্য লোকটা কথা কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেলো এক ধাক্কায়। ঠোঁট উল্টায় তিতির,বিরক্ত মুখে বলে,

____”ছিহ্।আপনার মুখে কোনো ভালো ভদ্র কথা আসে না তাইনা?”
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।উদাশ গলায় বলে,
____”এখানে অভদ্র কোন শব্দটা?”
____”প্রত্যেকটা অক্ষর, যেগুলো আপনি উচ্চারণ করেন,সব।সব অভদ্র, অসভ্য।”
অশ্লীল হাসলো ঈশান। ভ্রু জোড়া ওপরে তুললো,
____”সে তুই বলতেই পারিস। তবে এখন ধরছি না তাই চেচাচ্ছিস না। যেদিন রোমান্স এর a b c d শেখাতে নামাবো সেদিন আমার নাম ধরে যদি প্রলাপ না ডাকিস সারারাত তাহলে আমার নাম ঈশান আরশাদ না।মিলিয়ে নিস তখন।”
গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে হলো তিতিরের। সবসময় এমন লজ্জায় পিষে ফেলতে লোকটার কি আনন্দ হয় কে জানে। তেতে উঠা গলায় বললো,

____”বরাবরই কি এমন অসভ্য? নাকি আমাকে বিরক্ত করতে নাটক করেন? কারন এ বংশে তো এমন আর কাউকে দেখিনা।”
তিতিরের কথায় শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। যেনো তিতির কোনো মজার কৌতুক শোনালো তাকে।ঝুকলো তিতিরের কানের কাছে।ফিচেল গলায় বললো,
____”দুটোই। বরাবররে অসভ্য। তবে তোকে দেখলে সেটা বারে এই যা…
সোজা হয়ে শুয়ে পরলো সটানে বালিশে মাথা রেখে।হেচকা টানে তিতিরকেও শোয়ালো পাশে।
____”আর গাধা তুই একটা।বংশের আর কারোর এমন রুপ দেখবি মানে! তুই বউ টা হলি আমার। আমার অসভ্যতামিই তো দেখবি…নাকি! তোর শশুর তার বউয়ের সাথে কি ইটিশপিটিশ করে তা তোকে দেখিয়ে করবে!?”
ঈশানের ব্রেকহীন কথায় আর সহ্য হয়না তিতিরের।সফেদ চাদর খানা দিয়ে ঢেকে ফেলে নিজের মুখখানা। চাদরের তলা থেকে বিরক্ত গলায় বলে,

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩১

____”আ…আ…আপনি একটা বিরক্ত। সরুন তো। বাপ মা কেও ছাড়ে না। বাজে লোক।”
____”কি আশ্চর্য। ভালো কথা,মন্দ কথার তফাত ও টের পাসনা। বাপ মায়ের নামে এটা বাজে কথা? তারা ইটিশপিটিশ না করলে তুই আমি আমরা সকলে দুনিয়ায় আসতাম। “
____”আল্লাহর দোহাই লাগে। রোজা রেখেছেন। লাগাম টানুন মুখে। ঘুমান আর আমাকেও ঘুমাতে দিন। কোলবালিশ টা টানাহেঁচড়া করবেন না। সকালে উঠে যেনো এটা দুজনের মাঝখানেই দেখি।”
ঈশান শব্দ করে কাত হলো।বাঁকা গলায় বললো,
____”ওসব ছোটখাটো কথা আমি দিতে পারলাম না। কথা দিয়ে কথা না রাখতে পারলে রোজা রমজান এর মাস। খোদা পাপ দেবে। “

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩২