অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৩
শ্রাবণী ইয়াসমিন
আনায়া বিছানায় বসে রয়েছে স্তব্ধ হয়ে। চারপাশটা কেমন যেন ঘোলাটে, মাথা ঝিমঝিম করছে। বাতাসেও যেন রক্তের গন্ধ। ফ্লোরজুড়ে লাল দাগ ছড়িয়ে আছে, ছোট ছোট ফোঁটা হয়ে শুকিয়ে গেছে কিছু জায়গায়।
তার দৃষ্টি নিচের দিকে। নিজের পেটের উপর এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে তারপর কাঁপা হাতে আলতোভাবে সেখানে হাত বুলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করতেই ভেসে ওঠে একটু আগের দৃশ্য……..
“আমি এই বাচ্চা রাখবো না, জেভিয়ার। আমি তোমার কোনো অংশকে জন্ম দিয়ে এই পৃথিবীতে আরেকটা অমানুষ তৈরি করতে চাই না। তুমি আমাকে মুক্তি দাও….. মুক্তি দাও আমায়।”
কক্ষের ভেতর তখন নিস্তব্ধতা। জেভিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে যেন এক নিঃশব্দ আগুন দপদপ করছে। তারপর আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
জুতোর পাশ থেকে একটা ছোট, ধারালো ছুরি বের করল সে। হঠাৎই সেই ছুরিটা আনায়ার গলার বরাবর চেপে ধরে হিসহিস করে বলল,
“তোর কলিজা আমি টেনে ছিঁড়ে বের করে আনবো। আর একবার তুই আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার কথা বলে দেখিস। আমি শপথ করে বলছি, এই ঘরটা রক্তে ভাসিয়ে দেব।”
আনায়া প্রথমে এক পা পিছিয়ে গেল, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো ভয়ে। তারপর হঠাৎ চুপ করে গেল। চোখ স্থির করে তাকিয়ে রইল জেভিয়ারের মুখের দিকে।
জেভিয়ারের চোখে তখন ভয়ংকর রাগের ঝলক।
সে হঠাৎ আনায়ার পেছন থেকে চুল মুঠি করে ধরে টেনে ধরল। আনায়া ব্যথায় চিৎকার করে উঠল
তার মনে হলো মাথার চামড়া যেন চুলসহ খুলে যাচ্ছে।
“বল!” জেভিয়ার গর্জে উঠল।
“তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি? বল, যাবি?”
ছুরিটা এবার তার গলার কাছে সামান্য জোরে চেপে ধরল। ধারালো, ঠান্ডা ধাতব স্পর্শে আনায়ার শরীর কেঁপে উঠল।
চোখের পানি বাধ মানছে না। দীর্ঘদিন পর সে আবার দেখছে জেভিয়ারের সেই ভয়ঙ্কর রূপ। যে রূপে ভালোবাসা নেই, আছে কেবল ভয়, নিয়ন্ত্রণ আর উন্মাদনা।
তার ঠোঁট কাঁপছে, নিঃশব্দে কিছু বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
আনায়ার পুরো মুখ ব্যথায় লাল হয়ে উঠেছে।জেভিয়ার হঠাৎই থেমে গেল। আনায়ার মুখের দিকে তাকাতেই তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য জেগে উঠল অপরাধবোধের ছায়া।
সে আচমকাই আনায়াকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। নিজের চুল মুঠি করে শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
“আম… আমি সরি, লাভবার্ড… আমি তোমাকে হার্ট করতে চাইনি…
তুমি যখন বললে আমার থেকে দূরে চলে যেতে চাও আমার মাথা ঠিক ছিল না, আমি… আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
তার গলা কাঁপছে, নিঃশ্বাস জোরে জোরে উঠছে-নামছে। পরের মুহূর্তেই সে দেয়ালের দিকে ফিরে ঘুষি মারতে শুরু করল। প্রতিটা আঘাতে তার রক্তাক্ত হাত দেয়ালে লেগে শব্দ করছে।
সে বিরবির করতে বারবার বলতে লাগলো “আমি আমার লাভবার্ডকে ব্যথা দিয়েছি…আমি আমার লাভবার্ডকে ব্যথা দিয়েছি… আমি আমার লাভবার্ডকে ব্যথা দিয়েছি…”
হঠাৎই থেমে গিয়ে ছোট ছুরিটা আবার হাতে তুলে নিল সে। এরপর কোনো সতর্কতা ছাড়াই, জেভিয়ার নিজের হাতের উপর সেই ছুরিটা চালিয়ে দিল। রক্ত ছিটকে উঠল ।
আনায়া চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে ডেকে উঠলো, “জেভিয়াররররররর!”
সে দৌড়ে গিয়ে তার হাত চেপে ধরল, ততক্ষণে জেভিয়ার নিজের হাতে আরও কয়েকটা গভীর পোচ দিয়ে ফেলেছে।
রক্ত তার কব্জি বেয়ে ঝরছে, মেঝেতে লাল দাগ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আনায়া কেঁপে উঠল, চোখের পানি থামছে না।
“কি করছো তুমি!” সে কাঁপা গলায় বলল, “এইসব কেন করছো, জেভিয়ার? আমার কষ্ট হচ্ছে তো অনেক…. ”
পরের মুহূর্তেই আনায়া হঠাৎ তাকে জড়িয়ে ধরল। তার শরীর কাঁপছে, নিঃশ্বাস এলোমেলো। জেভিয়ার স্থির হয়ে গেল সেই আলিঙ্গনে। চোখ বন্ধ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর জেভিয়ার কিছু না বলেই আনায়াকে ছেড়ে দিল। তার চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই শুধু একরাশ শূন্যতা। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা যেন নিঃশ্বাস হারাল। আনায়া স্থির হয়ে বসে রইল বিছানায়। সব কিছু কেমন এলোমেলো, ঘোলাটে লাগছে। মাথার ভেতর বাজছে অসংখ্য চিৎকার, কান্না…
সব মিলেমিশে এক অচেনা নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে।
(বর্তমান)
সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে পড়ল নানু আপার মুখটা সেই মায়াভরা মুখ, সেই আশ্রয়ময় কোলে মাথা রেখে কাটানো দিনগুলো।
কিন্তু বিয়ের পর থেকে জেভিয়ার আর যেতে দেয়নি সেখানে। যতবার অনুরোধ করেছে, সে কথার ফাঁকে ফাঁকেই এড়িয়ে গেছে।
“নানু আপা…”
মুখে নামটা উচ্চারণ করতেই বুকের ভেতর হাহাকার উঠে এল।
আনায়া ধীরে ধীরে নিজের পেটের দিকে তাকাল। তাতে হাত বুলিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। তার কাঁধ কেঁপে উঠল হালকা, তারপর নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। চোখের পানি টুপটুপ করে পড়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ পায়ের কাছে ঠান্ডা কিছু একটা স্পর্শ করল।
আনায়া চমকে উঠল। মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিচে তাকাতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল,
জেভিয়ার।
সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, মাথাটা আনায়ার হাঁটুর গায়ে ঠেকানো। দেখে মনে হচ্ছে একটা বিশাল দানব যেন ভেঙে পড়েছে নিঃশেষ হয়ে।
আনায়া পা একটু সরাতেই জেভিয়ার ধীরে মাথা তুলল। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।
আনায়া আতকে উঠল। জেভিয়ারের চোখ দুটো ভয়ংকর রকম লাল ক্লান্তিতে, অনিদ্রায়, অনুশোচনায় পুড়ে যাওয়া চোখ। মুখটা শুকিয়ে গেছে, ঠোঁট ফেটে গেছে। তবু সেই চোখের গভীরে একটা অচেনা যন্ত্রণা ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন এমন এক কষ্ট, যা সে চাইলেও প্রকাশ করতে পারছে না।
আনায়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
জেভিয়ার ধীরে নিঃশ্বাস নিল, কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“তুমি জানো না, লাভবার্ড…
তোমাকে হারানোর ভয়টা কতটা ভয়ঙ্কর।”
আনায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না।
তার সামনে যে মানুষটা বসে আছে যে একসময় শক্ত, ভয়ংকর আর নিয়ন্ত্রণহীন ছিল আজ সে-ই ভেঙে পড়েছে টুকরো টুকরো হয়ে।
জেভিয়ার আনায়ার পায়ের কাছে বসে আছে, মাথা নত। তার কণ্ঠে এক ধরনের অচেনা নরমতা, এক অসহায় শিশুর মতো কম্পন।
“লাভবার্ড…? আমার বুকটা খুব জ্বলছে। তোমার বুকে একটু মাথা রাখতে দেবে আমায়?একবার তোমার দেহের উষ্ণতা অনুভব করতে চাই। তোমার বডি স্মেলটা নিতে চাই, একবারের জন্য।”
তার কথাগুলো শুনে আনায়ার বুকের ভেতর হাহাকার জেগে উঠল। আনায়ার চোখে পানি এসে গেল। তার নিজের ভিতরটা যেন গলে যাচ্ছে,
ভালোবাসা, ঘৃণা, ভয়, মায়া সব একসাথে জড়িয়ে যাচ্ছে এক অদ্ভুত ব্যথায়।
সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকল জেভিয়ারের দিকে। তার রক্তমাখা হাত, কাঁপা নিঃশ্বাস, ভাঙা চোখের দৃষ্টি সব কিছুই আনায়ার হৃদয়ে ব্যথার ঢেউ তুলল।
আনায়া আর কোনো দিক না ভেবেই জেভিয়ারের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জেভিয়ার যেন এই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল। সে আনায়ার ছোট্ট দেহটাকে গুটিয়ে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরল
যেন ভয় পাচ্ছে, এক মুহূর্তে এই মেয়েটা আবার হারিয়ে যাবে কোথাও।
তারপর ধীরে ধীরে জেভিয়ার আনায়ার কপালে, চোখে, গালে, ঠোঁটে পুরো মুখজুড়ে একের পর এক চুম্বনে ভরিয়ে দিলো। তার ঠোঁটে যেন দুঃখ, অপরাধবোধ আর ভালোবাসা একসাথে গলে যাচ্ছে। আনায়া চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে কেঁপে উঠল। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা শান্তির অশ্রু।
কয়েক মিনিট পর আনায়া ধীরে জেভিয়ারের চোয়ালে হাত রাখল। সে নরম কন্ঠে বলল,
“তোমার সব ভুল, সব পাপ আমি ক্ষমা করতে প্রস্তুত, জেভিয়ার। চলো না… আমরা সবকিছু নতুন করে শুরু করি?”
জেভিয়ার স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে চোখ ফুলে আছে কান্নায়, পাপড়ি ভেজা, ঠোঁট কাঁপছে অল্প।
হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে আনায়ার কোমর চেপে ধরল, এক মুহূর্তেই তাকে তুলে নিল নিজের বাহুবন্ধনে।আনায়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে পা দিয়ে জেভিয়ারের কোমর জড়িয়ে নিল।
জেভিয়ার আনায়ার ঠোঁটে নরম চুমু রেখে ফিসফিস করে বলল,
“সব রাজি আমি, লাভবার্ড… তোমার সব কথা মানতে প্রস্তুত আমি। আমি সব ছেড়ে দিতে পারি,
শুধু তোমাকে ধরে রাখার জন্য।”
আনায়া হালকা হেসে তার গলা জড়িয়ে ধরল।
অ্যালেক্স মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তার ঠোঁটে এক মুচকি হাসি খেলছে। মানুষের ভালোবাসা দেখতে কেমন ভালো লাগে, তাই না?
জেভিয়ার আর আনায়ার সমস্যা মিটে গেছে, আর হয়তো সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছে অ্যালেক্সই। ভাইয়ের কষ্ট, তার নিঃশব্দ যন্ত্রণা সে আর দেখতে পারছিল না।
চোখের সামনে জেভিয়ারের হাসিমুখ ভেসে উঠল, আর অ্যালেক্সের বুকটা কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল। সব ঠিকঠাক হয়ে যাচ্ছে অবশেষে।
তার মনে পড়ে গেল অ্যাশলির কথা।
“ও একা বাড়িতে কি করছে এখন?” ভাবল অ্যালেক্স। সময় তো অনেক হয়েছে।
একা একা ভয় পাচ্ছে না তো? এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সে অ্যাশলির দিকে ভালো করে নজর দিতে পারেনি।
সে গাড়ির স্পিড একটু বাড়িয়ে দিল। রাতের রাস্তা ফাঁকা, বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতা। গাড়ি যত এগোচ্ছে,অ্যালেক্সের বুক কেমন যেন কেঁপে উঠছে। কেন জানে না কোনো অজানা আশঙ্কা তার ভিতর গুঞ্জন তুলছে।
বাড়ির কাছে এসে গাড়ি থামাল সে। ইচ্ছে করেই ভেতরে নেয়নি। সে ভাবল কালই সে অ্যাশলিকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে। সবকিছু গুছিয়ে ফেলেছে সে মনে মনে।
কালই তাকে বিয়ের প্রপোজাল দিবে সে বিশেষভাবে, ভালোবাসায়, যত্নে। আর যদি সব ঠিক থাকে তাহলে এই সপ্তাহেই বিয়ে করে ফেলবে।
মনে এই ভাবনা নিয়েই রাস্তার ধারে হাঁটতে হাঁটতেবতার চোখে পড়ল একটি লাল গোলাপ। বাগানের পাশে বাহিরে ফুটে আছে, ফুলটি একদম চোখে পড়ার মতো সুন্দর।
অ্যালেক্স থেমে গেল। হেসে হাত বাড়িয়ে ফুলটা ছিঁড়ে নিলো। একটা উষ্ণ সন্তুষ্টির হাসি ছড়িয়ে পড়ল ঠোঁটে।
কিন্তু বাড়ির মূল ফটকের কাছে পৌঁছাতেই তার বুকটা কেমন থমকে গেল। হঠাৎ করে শরীরটা ভারী লাগছে।অ্যালেক্স স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“এই অনুভূতিটা কেন হচ্ছে…?” নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।
মূল ফটকটা আধখোলা। অ্যালেক্সের বুকের ভেতর কেমন যেন হালকা ঝাঁকুনি লাগল। সে তো এই ফটক বন্ধ করে রেখে গিয়েছিলো।
তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোখে সন্দেহের ছায়া ঘন হয়ে উঠল। গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে বন্দুকটা বের করে পকেটে ঢুকাল সে। গলার শিরাগুলো টানটান হয়ে উঠছে।
ধীরে ধীরে পা ফেলল বাড়ির ভেতর। বাগানের সামনে যেতেই তার নিঃশ্বাস থেমে গেল।
টাইসন আর ভেনম দুই পাহারাদার কুকুরের নিথর দেহ পড়ে আছে মাটিতে। তাদের চারপাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ।
অ্যালেক্সের চোখের সামনে ভেসে উঠল অ্যাশলির হাসিখুশি মুখটা সেই মায়াময় চোখ, দুষ্টুমি ভরা হাসি। এক মুহূর্তে বুকটা ভারী হয়ে উঠল।
“না… না, এটা হতে পারে না…” নিজের মুখেই বিড়বিড় করল সে, তারপর দৌড়ে গেল বাড়ির ভেতরে।
দরজাটা ভেজানো ছিল। অ্যালেক্স হাত বাড়িয়ে ঠেলতেই দরজাটা ধীরে খুলে গেল। আর পরের মুহূর্তে তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।
চারপাশের দুনিয়া দুলে উঠল। চোখের সামনে যা দেখছে, তা যেন বিশ্বাস করা যায় না।
তার হাত থেকে গোলাপটা ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। লাল পাপড়িগুলো ছড়িয়ে গেল চারদিকে।
অ্যালেক্সের পা আর এগোচ্ছে না। সেই জায়গাতেই যেন জমে গেল সে। চোখে স্থির ভয়, বুকের ভেতর ঝড়।
তার সামনে অ্যাশলি। যার ছোট্ট দেহটা পড়ে আছে মেঝেতে, ক্ষতবিক্ষত, রক্তে ভেজা, নিঃস্তব্ধ। তার গায়ের বুকের অংশ উন্মুক্ত। হয়ে আছে। তার স্ত/নের প্রান্ত কেটে ফেলা হয়েছে। এবং সেই বুকের কাটা স্থানে শুকনো মরিচ এবং লবণ মিশিয়ে লাগানো। পেটে বুকে গলায় ঘাড়ে ছুড়ি দিয়ে পোচানো হয়েছে। সেইসব জায়গায়ও একই ভাবে মরিচগুড়ো ও লবণ লাগানো।
অ্যালেক্স কাঁপতে কাঁপতে অ্যাশলির নিস্তেজ দেহকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে। সে এক হাত দিয়ে চোখ মুছে, আরেক হাতে হালকা চাপ দিয়ে অ্যাশলির গালে হালকা চাপড দিচ্ছে,
“অ্যাশ… অ্যাশ! তুমি কথা বলছো না কেন?”
তার ভাগ্য বোধহয় সহায় নয়। অ্যাশলির পুরো শরীর ঠান্ডা, নিস্তেজ। অ্যালেক্স হতভম্ব হয়ে ঝাঁকাতে থাকে, এতক্ষণ বুকের ভেতর থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ যেন চিৎকারে পরিণত হলো।
“অ্যাশ! কথা বলো তো! অ্যাশশশশ… এইটা কি হলো… এইটা কি হলো অ্যাশ! আমি… আমি কি করলাম!”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে চিৎকারে পরিণত হলো। তার মনে হচ্ছে তার দম আটকে যাচ্ছে। সে মনে প্রাণে চাচ্ছে এইসব কিছু তার ভ্রম প্রমাণিত হোক।
অ্যাশ একদম বদ্ধ উন্মাদের মত চিৎকার করতে থাকে,
“তুমি তো বলেছিলে, আমাদের আলাদা সংসার হবে… আমরা বিয়ে করব তো! আমার তো তোমার সাথে সংসার করা বাকি… অ্যাশ… আমি… আমি কি করব?”
অ্যালেক্স কাঁদতে কাঁদতে অ্যাশলিকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে। হাতের প্রতিটি স্পর্শ যেন বলতে চাইছে “আমি তোমাকে হারাতে পারব না… তুমি আমার সবকিছু।”
তার কণ্ঠের ভাঙা সুরে ঘরে নিস্তব্ধতা ভেসে আসে। চোখের পানি তার গাল ভিজিয়ে ফেলছে, আর হৃদয় যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।
অ্যালেক্স অ্যাশলি কে পাজাকোলে তুলে দাড়াতে চায়। কিন্তু হায়! তার শরীরও আজ তার সাথ দিচ্ছে না। তার পা ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। অ্যালেক্স গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে বলে,
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩২
“কেন এই নিয়তি আমাদের। আমি ওকে ছাড়া বাচবো কি করে। অ্যাশ আমি তোকে ছাড়া বিশ্বাস কর থাকতে পারবো না। আাাাাাাাাাাাাাাাাহ্….. আমি মরে যাচ্ছি তো। আমি মরে যাচ্ছি। আমার কলিজার সাথে এ কি হলো! কেন ওরে এত কষ্ট দিলো? কেন?
ওরা আমার কলিজা টা ছিড়ে নিয়ে গেলো রেহ্!”
