রুপুর বিয়ে পর্ব ৬
Bobita Ray
বিথী রানী অসময়ে রুপুকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। বলল,
“তুমি এতরাতে এখানে কী করতে এসেছ?”
রুপু মিষ্টি করে হাসল। হাসির রেশ সহজে মিলিয়ে গেল না। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“জল নিতে এসেছি মা। এই দেখুন হাতে জলের বোতল। জল নিতে এসে দেখি আপনাদের ঘরের লাইট জ্বলছে। তাই দেখতে এলাম এতরাতে লাইট জ্বালিয়ে আপনারা কী করছেন।”
বিথী রানী হতভম্ব হয়ে গেল। মেয়েটাকে প্রথম দেখায় যতটা সহজ-সরল মনে হয়েছিল। মেয়েটা মোটেও সহজ-সরল না। এ মেয়ে সাংঘাতিক।
“আমার দিকে ওমন করে না তাকিয়ে শিগগিরই ঘরের লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়ুন। আপনিই তো বলেন, রাত জাগলে শরীর খারাপ করে। শরীরে নানান অসুখ-বিসুখে বাসা বাঁধে। এই বয়সে আপনাদের শরীরে কঠিন অসুখ বাসা বাঁধুক। তা আমি আপনাদের একমাত্র বড় ছেলের বউ হয়ে কখনো হতে দেব না। এই আমি এখানে দাঁড়ালাম। শিগগিরই লাইট অফ করুন। আপনারা লাইট অফ করলে আমি শুতে যাব।”
অতিরিক্ত রাগে বিথী রানীর শরীর জ্বলে গেল। এখন এই মেয়েটাকে কড়া করে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেওয়া উচিত। আশ্চর্য কোনো কড়া কথা বিথী রানীর মুখে আসছে না। শরীরে ঘাম দিচ্ছে। অসময়ে প্রেশার বেড়ে গেল নাকি। বিথী রানী থমথমে মুখে বলল,
“তুমি এখন ঘরে যাও।”
“যাব তো অবশ্যই। তার আগে…
“তুমি আর একটা কথা বললে আমি এখন বিনয়কে ডাকতে বাধ্য হবো।”
বিধান বাবু বলল,
“আহা.. বিনয়ের মা মেয়েটার সাথে এভাবে কথা বলছো কেন? মেয়েটা আমাদের ভালো চায় দেখেই তো…
“তুমি চুপ করো।”
বিধান বাবু অন্যদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল। বিথী তার নিজের পাতা জালে নিজেই কঠিন ভাবে ফেঁসে গেছে। এখন হাসফাস করেও আর কোন লাভ হবে না।
রুপু বলল,
“যে কথা বলতে এসেছি। সেই কথাই তো বলতে ভুলে গেছি। মা ফোন দিয়েছিল। আমরা অষ্টমঙ্গলায় কবে যাব। জিজ্ঞেস করল। মা বলল, আগামীকাল দিন ভালো। আপনারা যদি যেতে দেন। তাহলে আগামীকালই যেতে বলল।”
বিথী রানী কিছু বলার আগে বিধান বাবু হাসিমুখে বলল,
“যেতে না দেওয়ার কী আছে। আগামীকালই বরং যাও। ঘুরে এসো। ভালো লাগবে। আমি আগামীকাল সকালে বিনয়ের সাথে কথা বলব।”
“আমি তাহলে এখন আসি বাবা?”
“যাও মা।”
রুপু খুশিমনে চলে গেল।
রুপু ব্যাগ গোছাচ্ছে আর গুনগুন করে গান গাচ্ছে। বিনয় রুপুর মতিগতি ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বলল,
“তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে রুপু? আর রাতদুপুরে ব্যাগই বা গোছাচ্ছ কেন?”
রুপু দায়সারা ভাবে বলল,
“এতক্ষণ মায়ের ঘরে ছিলাম। আর বাড়ি যাব তাই ব্যাগ গোছাচ্ছি।”
বিনয় রুপুর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। বড্ড ইচ্ছে করছে রুপুর কাঁধে একহাত রাখতে। বিনয় করুণ কণ্ঠে বলল,
“মা কী তোমাকে কিছু বলেছে রুপু?”
“নাতো।”
“তাহলে বাড়ি যেতে চাচ্ছ কেন?”
বিনয়ের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে এই প্রথমবার রুপুর খুব মায়া হলো। বলল,
“আমি একা বাড়ি যাচ্ছি না। আমার সাথে তুমিও যাচ্ছ।”
“ঠিক বুঝতে পারছি না তোমার কথা।”
“আমরা অষ্টমঙ্গলায় যাব।”
“আমাকে তো এই ব্যাপারে একবারও জানালে না। তুমি নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তো হবে না।”
রুপু বলল,
“তুমি কী আমার সাথে ঝগড়া করতে চাচ্ছ?”
“ঠিক ঝগড়া না রুপু। আমি হয়তো তোমাকে সঠিকভাবে কথাটা বোঝাতেই পারছি না।”
“আমি বুঝেছি তুমি কী বলতে চাচ্ছ। তোমার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে। তবে তুমি কষ্ট পাবে দেখে বলতে চাচ্ছি না।”
“আমি মোটেও কষ্ট পাব না। তুমি বলো প্লিজ?”
“বাদ দাও।”
“না বাদ দেব না। তুমি বলো রুপু।”
“আমার বাবার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে তোমাকে আগে থেকে বলে কী লাভ হতো বলতো? আমি বললেই কী তুমি নিয়ে যেতে পারতে?”
“কেন পারতাম না। অবশ্যই পারতাম।”
“জীবনেও পারতে না। তোমার মা তোমাকে কোনভাবেই আমার সাথে যেতে দিতো না। একটা না একটা অজুহাত দিয়ে ঠিকই তোমাকে আটকে দিতো।”
“তুমি আমার মাকে এত খারাপ ভাবো?”
“এখানে ভালো-খারাপের কিছু নেই। তোমাকে আরও একটা তিক্ত সত্যি কথা বলি?”
বিনয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বলো।”
“এই-যে আমি এত আগ্রহ করে ব্যাগ গোছাচ্ছি। তারপরও আমাদের আগামীকাল যাওয়া হবে না। তোমার মা কোন না কোনভাবে ঠিকই আটকে দেবে দেখো…”
বিনয় রুপুর একহাত শক্ত করে চেপে ধরল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তোমার ভুল ধারণা আমি ভেঙে দেব রুপু। তোমাকে আগামীকাল তোমার বাড়িতে যেভাবেই হোক আমি নিয়ে যাব। এবং আমার মায়ের সামনে দিয়েই নিয়ে যাব। আমার মা হাসিমুখে আমাদের বিদায় যদি না দেয় তাহলে আমার নামও বিনয় না।”
রুপু দরজার দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কাজ হয়ে গেছে। এখন কোনোরকম বাঁধা-ঝামেলা ছাড়া বাবার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া যাবে। রুপু যখন কথাগুলো বিনয়কে বলছিল। তখন রুপুর শাশুড়ীমা ওদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিল। ঘরের সব কথাই ওনার কানে গেছে। রুপু যদি খুব ভুল না হয়ে থাকে। আগামীকাল শাশুড়ী মা ঝাক্কাস একটা ড্রামা করে রুপুদের ওই বাড়িতে পাঠাবে। নাহলে ছেলের সামনে যে ওনার ভালোমানুষির মুখোশটা খুলে পড়ে যাবে। ওনাকে ওনার কৌশলেই খুব সূক্ষ্ম ভাবে জব্দ করবে রুপু।
রুপু যা ভেবেছিল তাই। সকাল সকাল শাশুড়ীমা ঘুম থেকে উঠে বিনয়ের পছন্দের খাবার রান্না করছে। রান্নার এক ফাঁকে বিনয়ের জন্য চা নিয়ে এলো। বিনয় ঘুমে ছিল। মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। বিনয় ধড়ফড়িয়ে উঠে বলে বলল,
“তুমি এত সকালে উঠেছ কেন? তোমার শরীর খারাপ লাগছে নাকি মা?”
“না বাবা। আমি ঠিক আছি। চা খেয়ে তুই শিগগিরই উঠ তো।”
“কোথাও যেতে হবে নাকি?”
“যেতে তো হবেই। শ্বশুরবাড়ি।”
বিনয় মায়ের রসিকতায় লজ্জা পেল। বিথী রানী বলল,
“রাত করার দরকার নেই। সকাল সকাল চলে যাবি। আমি তোর বাবাকে ফল-মিষ্টি কেনার জন্য বলে দিয়েছি।”
গর্বে বিনয়ের বুকটা ভরে গেল। রুপুটা আশেপাশে নেই। থাকলে ভালো হতো। মাকে ও যতটা খারাপ ভাবে। মা ততটাও খারাপ না। বরং ভালো। খুব বেশি ভালো বিনয়ের মা। আফসোস, প্রথমদিনের সামান্য একটা ঘটনার জন্য রুপু মাকে শুধু শুধু ভুল বুঝছে।
বিনয় খেতে বসে দেখল, আজ ওর পছন্দের সব খাবার রান্না হয়েছে। বিথী রানী পাত পেরে ছেলেকে খাওয়াচ্ছে।
“আজ হঠাৎ এতকিছু রান্না করলে কেন মা?”
“শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কি না কি খাবি। আমি তো আর দেখতে পাব না। শাশুড়ীর হাতের রান্না খেয়ে যদি মায়ের হাতের রান্নার স্বাদই ভুলে যাস।”
বিনয় হেসে ফেলল। বলল,
“তুমি যে কী বলো না মা। তুমিও চলো না আমাদের সাথে। আমার খুব ভালো লাগবে।”
বিথী রানী বলল,
“নিয়ম নেই বাবা। অবশ্য এইসব নিয়ম কোন গ্রন্থে লেখা নেই। লোকমুখে প্রচলিত। নতুন করে নিয়ম বানালেই যাওয়া যায়।”
রুপু খেতে খেতে বলল,
“নতুন নিয়মের প্রচলণটা তাহলে আপনাকে দিয়েই শুরু হোক মা। প্লিজ মা প্লিজ.. আমাদের সাথে চলুন আপনি। আপনি গেলে আমার খুব ভালো লাগবে। গরীবের ঘরে বড়লোকের পাড়া পড়লে আমার গরীব বাবা ধন্য হয়ে যাবে। শুধু বাবা কেন আমার পুরো গুষ্টি ধন্য হয়ে যাবে।”
বিথী রানী বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুমি সবসময় এত বেশি কথা বলো?”
“একটু ভুল বললেন মা। আমি তো সবসময় কথা বলি না। তবে যখন কথা বলি, তখন প্রচুর কথা বলি। এটা আমার মুদ্রা দোষ মা।”
বিথী রানী হতাশ হয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন।
বিনয় রেডি হয়ে রুপুর সামনে এসে দাঁড়াল। বলল,
“কী বলেছিলাম না। আমার মা খুশি মনে আমাদের যেতে দেবে। মিলল তো আমার কথা?”
“খুশি না ছাই। গিয়ে দেখো তোমার মা তোমার ছোটবেলার ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে গুনগুন করে কাঁদছে।”
বিনয় কিছু না বলে রুপুর সামনে থেকে সরে গিয়ে জুতার ফিতে বাঁধতে বসল। এখন মায়ের ঘরে গেলে বিনয় দেখতে পেত। মা সত্যি সত্যি বিনয়ের ছোটবেলার ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
বিনয়রা প্রায় রুপুদের বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। আর দশ/পনেরো মিনিট পরই পৌঁছে যাবে। রুপুর মধ্যবিত্ত বাবা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাজারের সেরা মাছটা কিনেছে। তার বড়লোক মেয়েজামাইকে খাওয়াবে বলে। রুপুর মা এই চিটমিটে গরমে সকাল থেকে বড় মেয়ের জামাইয়ের জন্য বাহারি পদের খাবার রান্না করছে। রুপুর ছোটবোন রুপুর ঘরটা খুব সুন্দর করে গোছাচ্ছে। যদিও রুপুর আলাদা করে কোনো ঘর নেই। ওদের মোট দুটো ঘর। একটায় বাবা-মা থাকে। আরেকটায় রুপুরা দুবোন থাকতো। রুপু শ্বশুরবাড়ি চলে যাবার পর পুরো ঘরটা এখন অথৈয়ের দখলে। তারপরও ঘরটা একটুও বদলায়নি। রুপু যেভাবে ঘর গুছিয়ে রাখতো। অথৈও ঠিক সেভাবে ঘরটা গুছিয়ে রাখে। যেন রুপুর কখনো এই বাড়িতে এলে মনে নাহয় যে ঘরটা এখন আর রুপুর না।
এতকিছুর পরও শেষ রক্ষা হলো না। একটা ফোনকল পেয়ে বিনয় রুপুকে মাঝ রাস্তায় গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে উভ্রান্তের মতো বাড়ি চলে গেল। যদিও বিনয় ইচ্ছে করে নামিয়ে দেয়নি। রুপুকেও ওর সাথে যাওয়ার জন্য খুব জোড় করছিল। রুপু এমন জেদ ধরল। সে এখন মরে গেলেও ওই বাড়িতে যাবে না। বাবার বাড়ি আসবে বলে যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে বের হয়েছে। দুমিনিটের জন্য হলেও বাবা-মায়ের সাথে দেখা করে তবেই যাবে। বিনয়ের এত ধৈর্য নেই। সে এখন কিছুতেই রুপুর বাবার বাড়ি যাবে না। দরকার পড়লে আগামীকাল আসবে। কিন্তু এখন না। কোনভাবেই না। শেষমেশ রুপুর জেদের কাছে পরাজিত হয়ে রুপুকে মাঝ রাস্তায় ফেলে যেতে বাধ্য হলো বিনয়।
রুপুর খুব ক্লান্ত লাগছে। বিনয় অতি তাড়াহুড়োয় রুপুকে একটা টাকাও দিয়ে যায়নি। রুপুর টাকার ব্যাগটাও গাড়িতেই রয়ে গেছে। রুপুর বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে যেতেও নাহলে বিশ পঁচিশ মিনিট মতো সময় লাগবে। একটা রিকশা ডেকে অবশ্য উঠে পরা যায়। কিন্তু বাড়ির সামনে নামার পর বাবার কাছে রিকশা ভাড়া দেবার জন্য হাত পেতে টাকা চাইতে হবে। এই টাকা চাওয়াটা তখন সবাই অস্বাভাবিক ভাবে দেখবে। এমনিতেই একা একা বাড়িতে যাওয়ার জন্য হাজারটা কথা শুনতে হবে।
রুপুর বিয়ে পর্ব ৫
বিনয় অবশ্য একবার বলেছিল, তুমি যখন এতই জেদ করছো। তোমাকে তোমার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে তবেই যাই। রুপুর এমন রাগ উঠে গেল। অত্যন্ত ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
“এখন যদি গাড়িটা না থামাও আমি এখুনি গাড়ির দরজা খুলে লাফিয়ে নামব। আমি কারো দয়া চাই না। তোমার যখন এতই তাড়া। বেশ তো। আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়েই যাও।”
