মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬১
Tahmina Akhter
— আর কিছু বাকি আছে? বাড়িতে ফিরতে হবে না?
কথাটি বলেই মেঘালয় আড়চোখে তাকায় আলোর দিকে। আলোর নাকের পাটা ফুলে আছে। চোখের চাহনি দিয়ে পারছে না ফিওনাকে ভস্ম করে দেয়! মেঘালয়ের ইচ্ছে করল হো হো করে হাসতে কিন্তু…. তার বউটা যে একসমান অভিমানের পাহাড় বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে সেখানে নতুন করে এক চিমটি অভিমান বাড়ানো কি ঠিক হবে? তাই নিজেকে সংযত রাখা উত্তম সিদ্ধান্ত।
রিনি সামান্য এগিয়ে এসে আলোর কাঁধে হাত রেখে বলল,
— বাড়িতে চলো।
আলো রিনির দিকে ফিরে বলল,
— তোমরা যাও। আমি আসছি।
রিনি আরাফাতের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। মেঘালয় হাঁটতে শুরু করে। সবাই চলে যাওয়ার পর আলো গিয়ে ফিওনার পাশে দাঁড়ায়। তারপর, একগাল হেসে বলল,
— বাংলাদেশী ছেলে পছন্দ হবার কারণ কি? মিস. ফিওনা?
— আমি তো জানি না। বাট মেঘালয়ের চার্মিং আর কথাবার্তা জাস্ট অসাম।
ফিওনার কথাবার্তা মোটেও আলো’র সহ্য হচ্ছে না তবুও সহ্য করতে হচ্ছে।
— আপনাকে পাত্তা দেয় না নিশ্চয়ই?
— তুমি কিভাবে জানলে?
ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো ফিওনা। আলো মুচকি হেসে বলল,
—অনুমান থেকে বললাম। মেঘালয়কে ইমপ্রেস করতে চান?
— অফকোর্স।
উচ্ছ্বসিত কন্ঠে ফিওনা আলোকে জবাব দেয়। আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— তাহলে বাঙালীয়ানা স্বভাব নিজের মধ্যে ইনক্লুড করতে হবে। এসব ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে বড়োজোর সিডিউস করতে পারবেন মন জয় করতে পারবেন না।
—কিভাবে কি করব আমি?
ফিওনা হতাশ ভঙ্গিতে বলল, আলো আশ্বাস দিয়ে ফিওনাকে বলল,
— বাঙালি নারীদের মত ড্রেসআপ করুন। রান্নাবান্না শিখুন। এরপর গিয়ে মেঘালয়কে আপনার পরিবর্তন দেখান। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর সে অবশ্যই আপনার…
বাকি কথা কমপ্লিট করার সাহস হয় না আলো’র। ফিওনা এগিয়ে এসে আলোকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— তুমি তো মিষ্টি একটা মেয়ে। অথচ আমি ভুল বুঝেছিলাম তোমাকে। ধন্যবাদ তোমাকে আলো।
আলো মৃদু হেসে সরে আসে। তারপর, আলো বিদায় নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে। মূল ফটক পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই দেখা মিলল অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের। আলো হকচকিয়ে যায় মানুষটাকে দেখে। মানুষটা আলোকে দেখে খুব সাধারণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অথচ আলোর হৃদয় দ্রুত গতিতে ঢিপঢিপ করছে। এমন সময় তীব্র বেগে হাওয়া বয়। বাতাসের তোড়ে আলোর কপালের কয়েক গাছি চুল এলোমেলো হয়ে যায়। ঘাড়ের ওপরে অনাদরে পরে থাকা খোঁপা আর কপালের দুপাশের এলোমেলো কয়েক গাছি চুল যেন আলোর ঐশ্বরিক রুপ বেরিয়ে আসে। মেঘালয় শুকনো দুটো ঢোক গিলে মনে মনে বলল,
— এতটা আবেদনময়ী কবে থেকে হলে? আমি যে নিজেকে সামলাতে পারছি না। ইচ্ছে করছে তোমাতে মিশে যাই। যেমন করে মেঘ আলোর সঙ্গে মিশে যায়।
মেঘালয়ের দৃষ্টি আটকে আছে আলোর মুখের ওপর । সময় যেন থেমে গেছে। চারপাশের সব শব্দ নিঃশব্দ হয়ে গেছে। শুধু তার নিজের হৃদস্পন্দনই কানে বাজছে।
আলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে না কেন? কিন্তু মেঘালয়ের এই দৃষ্টি তার ভেতরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। বুকের ভেতর তীব্র কাঁপন আর অজানা এক অনুভূতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো শরীরে।
হাওয়া আবারও দোল খায়। আলোর শাড়ির আঁচল উড়ে এসে মেঘালয়ের হাতে ছুঁয়ে যায়।
মেঘালয় থমকে যায়। তার আঙুলগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও আঁচল ধরে ফেলে। দু’জনের চোখ আবারও এক হয়। কেউ কিছু বলছে না…কিন্তু এই নীরবতাই যেন হাজারটা কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে দিচ্ছে। হঠাৎ—
— আলো!
রিনির ডাক শুনে আলো চমকে উঠে দ্রুত সরে যায়। আলো অজান্তেই মেঘালয়ের আঙুলের ফাঁক দিয়ে আঁচলটা টেনে নেয়। চোখ নামিয়ে ফেলে। আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না দ্রুত পা চালিয়ে চলে যায়।
মেঘালয় স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাত এখনো শূন্য ভাসছে। হাতের দিকে তাকিয়ে মেঘালয়ের ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে। তারপর, চোখ তুলে আলোর হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য দেখছে আর বলছে,
— পালিয়ে গেলে? কিন্তু… এভাবে কতদিন?
রিনিদের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থেমে যায়। সবাই গাড়ি থেকে নেমে আসে। আলো সবার আগে হাঁটতে শুর করে। ফিওনার ব্যাপারটা ওর মাথা থেকে সরতে চাইছে না। এদিকে আরাফাত সবার চক্ষুর আড়ালে রিনির হাতটা ধরে ফিসফিস করে বলল,
— আজকের রাতটাও আমার নির্ঘুম কাটবে। জানি না ঠিক কবে আমার গভীর ঘুমের তুমি নামক টনিক আমার কাছে এসে ধরা দেবে।
কথাগুলো বলার সময় আরাফাত রিনির হাতের পিঠে চুমু দেয়। রিনি ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। আরাফাত সরে দাঁড়ায়। তারপর, রিনির কানের পাশে চুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে বলল,
— আমার বিদায়বেলায় দুটো সুন্দর শব্দ বলো তো রিনি।
রিনি আরাফাতের চোখের দিকে তাকায়। চোখদুটোতে কি যেন খুঁজছে! অতঃপর, আরাফাতের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি সুন্দর।
ব্যস, দুটো শব্দ বলার পর রিনি যেন এক সেকেন্ড এর মধ্যে হাওয়ায় মিশে গেছে। রিনির কাছ থেকে এমন দুটো শব্দ শোনার পর আরাফাত নিজেকে সামলে ওঠার পর রিনিকে খুঁজছে অথচ তার বউটা পালিয়ে গেছে। কি মনে করে রিনির ঘরের বারান্দার ওপর চোখ পরল। দেখল রিনি দাঁড়িয়ে আছে। আচমকা ফিক করে হেসে ফেলল আরাফাত। নিজের ঠোঁটজোড়ার ওপরে ডানহাতের দুটো আঙুল রেখে চুমু খেয়ে রিনির উদ্দেশ্য ছুঁড়ে দিলো উড়ন্ত চুমু। রিনি ভীষণ লজ্জা পেয়ে বুকের বা পাশে হাত রেখে নিজের ঘরে চলে গেল। আরাফাত হাসতে হাসতে পেছনে ফিরতেই মেঘালয়ের মুখোমুখি হয়৷ আচমকা মেঘালয়কে দেখে আরাফাত থতমত খেয়ে বলল,
— মানে…. আসলে!!
— শুভ রাত্রী, আরাফাত।
মেঘালয় আর একমিনিট দেরি করল না সেখান থেকে দ্রুত পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে যায় সে। তারপর, পেছনে ফিরে আরাফাতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— ফ্রেন্ড সার্কেলের সবচেয়ে নিরামিষ ছেলেটাকে হটাৎ করে আমিষ হতে দেখার পর নিজেকে বোঝাতে পারছি না, আরাফাত। আমি টোটালি শকড!!!
মেঘালয় কথাগুলো বলতে বলতে হেসে ফেলল। আরাফাত নিজের লজ্জা ঢাকতে অতিদ্রুত একটা ক্যাব নিয়ে রওনা হলো।
মেঘালয় বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর মুখোমুখি হলো রিনির বাবার সঙ্গে। ছোট চাচ্চুর শরীরের হালচাল জিজ্ঞেস করে নিজের ঘরের উদ্দেশ্য রওনা হলো মেঘালয়। ঘরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই উষ্ণ হাওয়া এসে গা ছুঁয়ে যায়। মেঘালয় বামহাতের ঘড়িটা খুলে ড্রেসিংটেবিলের ওপরে রেখেই বদ্ধ জানালা দুটো খুলে দিলো। জানালা খোলার পর ঠান্ডা হাওয়া এসে মেঘালয়ের গা ছুঁয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো। পুরো ঘরের উষ্ণতা কেটে মুহূর্তের মধ্যেই শীতলতায় ছেয়ে গেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো এক ফালি চাঁদকে। চাঁদের মধ্যে আজ আলোর মুখটা যেন ভেসে উঠলো। এলোমেলো কয়েকগাছি চুলের ফাঁকে শ্যামা মুখটা ভীষণ আবেদন নিয়ে তাকেই কাছে ডাকছে যেন। বহুবছর পর নিজের ভেতরকার প্রেমিক মেঘালয়কে আবিষ্কার করেছে। বহুবছর আগে যেমন করে আলো’র মাঝে নিজেকে আড়াল করে ফেলার পাগলামি ছিল আজও ঠিক তেমন করে নিজেকে আলো’র মাঝে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু….
মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, খালি বিছানার ওপরে দৃষ্টি পরল। ধীর পায়ে হেঁটে বিছানার একপাশে গিয়ে বসল। অচেতন আলো যেই বালিশে শুয়ে ছিল সেই বালিশটা হাতে তুলে নাকের কাছে আনল। আলো’র চুলের মিষ্টি ঘ্রাণটা যেন এখনও বালিশের কভারে লেগে আছে। মেঘালয় গভীর শ্বাস টেনে আলোর চুলের গন্ধ অনুভব করার চেষ্টা করে।
— তোমায় যে কেন এত করে চাইলাম!! আজও উত্তর পেলাম না। তোমাকে ভালোবেসে আমার প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাস কেমন ব্যাথাময় হয়ে উঠেছে। তোমাকে ভালোবেসে আমি কি পেয়েছি? ব্যাথা ছাড়া! তাহলে তোমার আমার ভালোবাসার নাম কি ব্যাথাবাসা?
রাত তখন ১১টা বাজে। রিনি আলোকে নিয়ে ছাঁদে চলল। রিনির আজ মন ভালো। আলোর সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছে থেকেই ছাঁদে যাওয়ার প্ল্যান করা। ছাঁদে প্রবেশ করার পর আলো রিনিকে প্রশ্ন করলো,
— ছাঁদ এত সাজানো গোছানো থাকতে পারে আমি কখনো স্বচক্ষে দেখিনি।
— অনেকে আছে না বৃষ্টিবিলাস কিংবা জোছনা বিলাস করে। আমার তেমন ছাঁদ বিলাসের শখ আছে। কয়েকশ ফুলের মধ্যে একটা দোলনা। আর সেই দোলনায় বসে আমি চাঁদকে দেখতে ভালোবাসি।
কথাগুলো বলার সময় রিনিকে অন্যজগতের মনে হলো। রিনির চোখেমুখে সুখী মানুষের ছাপ স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। আলো পূর্ণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমার কি কোনো কারণে আজ মন খারাপ?
রিনি খানিকটা বিস্মিত হয়ে বলল,
— তুমি জানলে কিভাবে?
আলো মুচকি হেসে বলল,
— আজ তুমি এই বাড়িটাকে, এই বাড়ির ছাঁদকে, এই বাড়ির প্রতিটা কোনাকে আর তোমার আপনজনদের জন্য মিস করছো। কারণ, এই বাড়িতে এই বাড়ির মেয়ে হিসেবে তোমার আজই শেষদিন…. ভবিষ্যতে এই বাড়িতে তুমি আসবে কিন্তু বিয়ের আগের রিনি আর বিয়ের পরের রিনির মাঝে তখন আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকবে।
রিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অদূর আকাশের ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আজ নিজেকে ছন্নছাড়া লাগছে। মনে হচ্ছে এতদিন আমি ঘোরের মাঝে ছিলাম। বিয়ে হবার পর আমার ঘোর ভেঙে গেছে।
রিনি থেমে যায়। ছাঁদ জুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সকল নীরবতাকে ভেঙে চুরমার করে রিনি শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—আচ্ছা আলো তোমারও কি এমন অনূভুতি হয়েছিল?
আলো রিনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল প্রশ্নটি শোনার পর। রিনির কৌতূহলী চোখদুটো দেখে আলো কথা বলতে লাগল বহুবছর পুরনো অক্ষত স্মৃতিদের নিয়ে।
— আমার শ্বাশুড়ির (মাহরীন) এর আগমন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি। আম্মু আমার জীবনে যখন এলেন তখন উনার সঙ্গে আমার একটা ঘটনার সূত্র ধরে দেখা হওয়া। সেই দেখা হওয়ার জের ধরে সেই মানুষটার ছেলের বউ হলাম। জানো না রিনি, আম্মু আমাকে যতটা মাথায় তুলে রেখেছিল তারচেয়ে বেশী আগলে রেখেছিল মেঘালয় নিজেই। বিয়ে হবার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত মানুষ যেন আমার মানুষই ছিল। তার কথাবার্তা শুনলে মনে হতো তার সঙ্গে আমার জন্মান্তরের পরিচয়। আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সে বিয়ের আগ অব্দি থেকে বিয়ের পর অব্দি প্রায়োরিটি দিয়েছে। এই যে দুই মা-ছেলে মিলে বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হবার পর থেকে যেমন করে আপন করে নিচ্ছিল যে অন্যকোনো কিছু ভাবার সময় পাইনি। আমি শুধু কখনো কখনো মুগ্ধ হয়ে কিংবা আকাশসম আশ্চর্য হয়ে ভাবতাম আমার ভাগ্যজুড়ে কাদের নাম জুড়ে গেল?
রিনি আলোর হাতটা ধরল শক্ত করে। কারণ আলো কাঁদছে। আলো কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
— আম্মু এবং মেঘালয়ের সঙ্গে পরিচয় হবার আগে আমি শুধু জানতাম বাবারা মেয়েদের নিস্বার্থভাবে ভালোবাসে। কারণ, আমাকে আমার বাবা যতটা ভালোবেসেছে অন্য কেউ ততটা বাসেনি। একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার কাঙাল আমি আচমকা আম্মুর কাছ থেকে এত এত ভালোবাসা পেয়ে….
আলোর কান্না দেখে ইতি ভাবির বলা একটি কথা রিনির মনে পড়ল।
“ জীবন বাঁচানোর পুরুষ্কার হিসেবে আমার শ্বাশুরি যে আলোকে মেঘালয়ের বউ বানিয়ে আনল আসলে এর পেছনে অন্য কারন আছে। কৃষ্ণবতী মেয়েটার চোখমুখে ভালোবাসা পাবার এক ব্যাকুলতা আছে। সেই ব্যাকুলতা আমার শ্বাশুড়িকে ছুঁয়ে গেছে, রিনি। একটা এতিম মেয়ের পায়ের সামনে পুরো দুনিয়ার ভালোবাসা এনে দেবার জন্য আম্মু এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
নতুন পুরনো কথাবার্তা শেষ করে রিনি আর আলো নীচে নেমে এলো। রিনি আলোর হাত ধরে তার নিজের ঘরে নিয়ে গেল। তারপর, আলোকে নিজের বিছানায় বসিয়ে দিয়ে আলোর পাশে বসল। আলো রিনির কান্ড দেখছে শুধু।
— আজ থেকে তুমি এই ঘরে থাকবে আলো। যতদিন না পর্যন্ত মেঘালয় তোমার সামনে পাহাড় সমান ভালোবাসা নিয়ে নত না হচ্ছে তুমি ততদিন অব্দি এই ঘরে থাকবে। সে থাকুক তার অভিমান নিয়ে। তুমি কেবল বসে বসে দেখবে কিভাবে তার অভিমানের পাহাড় ধ্বসে পড়ে? কি মনে থাকবে তো?
আলো মাথা নাড়ায়। রিনি আলোকে একপাশে জড়িয়ে ধরে মনে মনে বলল,
— তোমাদের দুজনের মিল হোক আমি খুব করে চাই আলো। তুমি তো জানো না পাগলটা তোমার জন্য তার হৃদয় হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি গিয়ে যদি একটিবার আদেশ করো সে অমনি তোমার কাছে হৃদয়ে সঁপে দেবে। এমন ভালোবাসা পাওয়ার জন্য একটুআধটু অপেক্ষা তে করাই যায়। আমরা একটু দেখি এই ভালোবাসা জয়ের খেলায় এবার পরাজয় কার হয়?
রাত তখন তিনটা বাজে। রিনির মোবাইল ভাইব্রেট হচ্ছে। রিনি ঘুমঘুম চোখে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল মেঘালয়ের নাম্বার থেকে কল এসেছে। রিনির ঘুম উড়ে গেছে। কোনোমতে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো দুটো বাক্য…
— রিনি, তোমার ঘরটায় আমার জায়গা হবে?? ঘুম আসছে না। বুকের বা পাশে খালি লাগছে। বলো তো এই রোগের ঔষুধ কি?
মেঘালয়ের কথাগুলো শুনে রিনি মুচকি হেসে ঘুমন্ত আলোর মুখেট দিকে তাকায়। তারপর, ধীরপায়ে বিছানা থেকে নেমে রুমের দরজা খুলে বের হয়ে যেতে যেতেই মেঘালয়কে বলল,
— তোমার রোগের ঔষুধের নাম হচ্ছে আলো। সকাল-দুপুর-রাতে তিনবেলা আলো নামক ঔষুধের ডোজ নেয়ার জন্য তোমাকে অনুরোধ করা হলো।
— আমি গরীব মানুষ। আপাতত রাতের ডোজ কমপ্লিট করতে পারব। ইনশাআল্লাহ অতিশীঘ্রই যখন আমার দূর্দশা কেটে যাবে তখন অবশ্যই সকাল-দুপুর-রাতের ডোজ কমপ্লিট করব।
মেঘালয়ের ঠাট্টার সুর মেশানো কথা শুনে রিনি হো হো করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে রিনি খেয়াল করল মেঘালয় দাঁড়িয়ে আছে। রিনি মোবাইলে কান থেকে সরিয়ে মেঘালয়ের সামনে গিয়ে হাসতে হাসতে আস্তে করে বলল,
— দেখো আবার ঔষুধ গ্রহণ করতে গিয়ে ধরা পরো না।
মেঘালয় রিনিকে কিছু না বলে রিনির ঘরে ঢুকে পরল। পূর্ণ চাঁদের আলো আংশিকভাবে ঘরটাকে আলোকিত করে রেখেছে। চাঁদের আলোর সাহায্য নিয়ে মেঘালয় তার ব্যক্তিগত আলোকে খুঁজে পেল। বিছানার যেই পাশে আলো ঘুমিয়ে আছে ঠিক সেই পাশে গিয়ে মেঘালয় বিনা শব্দে করে বসল। তারপর, আলোর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেঘালয় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। আচমকা আলোর ডানহাত তুলে হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বসল। এমসময় আলো ‘ওমা গো! চোর” বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বসল। মেঘালয় হতভম্ব হয়ে তড়িঘড়ি করে আলো’র হাত ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হবার জন্য উদ্ধত হবার সময় তার কপালের সঙ্গে দরজায় বাড়ি খেলো। “আহ্” শব্দ বের হবার আগেই নিজেকে সামলে বের হয়ে গেল এই ঘর থেকে। এদিকে আলো’র চিৎকার শুনে আর মেঘালয়কে ওভাবে বেরিয়ে যেতে দেখেই রিনি বুঝে ফেলল ঘটনা কি হতে পারে? তবুও তো আলো’র কাছ থেকে জানতে পারলে ভালো হয়। যেই ভাবা সেই কাজ অতি দ্রুত আলোর কাছে চলে যায় রিনি। আলো বেচারি ভয় পেয়ে রিনিকে বলছে,
— একটা চোর এসে আমার হাত হাতিয়েছে স্বর্ণের চুড়ি নেবার জন্য। আমি তো ভয়ে….
বেচারি বাকি কথা বলতে পারছে না। এদিকে রিনি বহুকষ্টে নিজের হাসি থামিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আহ!! বেচারা মেঘালয়। শেষমেশ কিনা রাতের আধারে বউকে লুকিয়ে-চুরিয়ে ভালোবাসতে এসে চোর উপাধি পেতে হলো???
এদিকে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেই মেঘালয় কপালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কপাল ফুলে গেছে।
— ধুররর! আমি কি করতে গেলাম!
আয়নার সামনে গিয়ে নিজের দিকে তাকায়। তারপর বলল,
— বাহ মেঘালয়! খুব ভালো! নিজের বউয়ের ঘরে ঢুকে চোরের মত কাজ করে এখন “চোর” উপাধি পেয়ে গেছো!
নিজেই নিজের মাথায় হালকা চাপড় দেয়।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে…
— তবুও… হাতটা…
চোখ বন্ধ করে সেই মুহূর্তটা মনে করে। আলোর হাতের নরম স্পর্শ, তার গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ,
মেঘালয় ধীরে বলে,
— আর একবার… শুধু একবার কাছে পেলে তোমাকে…
কথাটা শেষ না করেই থেমে যায়। চোখ খুলে ফেলে।
— না! আর না!
নিজেকেই কড়া গলায় বলে,
— ওর অভিমান ভাঙার আগে আমি এক পা-ও এগোবো না।
কিন্তু হৃদয় যেন তার কথা মানতে নারাজ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
পরদিন সকালে…..
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬০
নাশতার টেবিলে মেঘালয়ের ফোলার কপালের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেঁসে ফেলল রিনি। রিনির হাসি দেখে মেঘালয় চোখ পাকিয়ে তাকায়। আর আলো ওদের দুজনের কান্ড দেখে বোকার মতো তাকিয়ে আছে।
“মানুষটার কপাল ফুলল কি করে! ইশশ! অনেক ব্যাথা পেয়েছে নিশ্চয়ই? রিনিটাও না! কই বরফ এনে দেবে তা না। হি হি করে হাসছে!”
আলোর মন পুড়ছে মেঘালয়ের জন্য আর হাজারটা বকা বর্ষণ হচ্ছে রিনির নামে।
