সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
এলোমেলো অবস্থায় বিছানায় পরে আছে নূরি। শরীর জ্বর জ্বর লাগছে, সাথে দূর্বলও। খাওয়াদাওয়া হচ্ছে না ঠিকমতো কয়েকদিন হলো। না কিছুতে আগ্রহ পাচ্ছে,আর না আদতেই কিছু করছে সারাদিন এভাবে পরে থাকা ছাড়া।
ফোনটা অবিরত বেজে যাচ্ছে। বড্ড হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকে সেটাতে। পরিচিত নামটা বারবার ভেসে উঠছে। বন্ধ হয়ে আসছে তার হৃদ স্পন্দন। আর পারছে না সে। আর পারছে না নিজেকে আটকাতে। এভাবে প্রতিনিয়তই পুড়তে পুড়তে ধ্বংস দেখছে নিজের। ইয়াজ এর কর্মকান্ডের কথা মনে হতেই শরীর কাপে তার অজানা ঘৃনায়। কিন্তু তারপরও কষ্ট পাচ্ছে ওই মানুষ টার জন্যই। একটা সময় উঠে বসলো বিছানায়। দু হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছলো। রিসিভ করলো কলটা। ওপাশের মানুষ টা যেনো জানে পানি ফিরে পেলো। সেদিন এর পর অসংখ্য বার কল মেসেজ করে গেছে নূরি কে ঈয়াজ। কিছুতেই পায়নি মেয়েটাকে। আজকে কল ধরা মাত্র উত্তেজিত কন্ঠ শুনতে পেলো নূরি।
____”খুব সরি জান। সরি। আমি পাগলের মতো আচরন করেছি সেদিন। বদ্ধ উন্মাদ এর মতো কাজ করেছি।”
নূরি দাঁতে দাঁত চাপলো রাগে,দুঃখে। লোকটার এই নরম কথায় গলে পানি হয়ে যায় সে। নিজেকে ধিক্কার দিলো এবারেও। নূন্যতম আত্মসম্মান থাকলে কলটাই রিসিভ করার কথা ভাবতো না। ইয়াজের কথা শুধরে দিলো।
____”উন্মাদ নয়। চরিত্রহীন বলো।”
ওপাশ থেকে ইয়াজ খানিকটা থমকে গেলো। নূরির মুখে শব্দ টা শুনে। তবে সাথে সাথেই আবার আগের গলায় ক্ষমা চাইতে ব্যাস্ত ও হলো।
____”আমি কি রেখে কি করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমাকে অসম্মান করতে চাইনি। এই তিন বছরে আগে কখনো এমন হয়েছে বলো! হয়েছে? হয়নি তো। আমি রিসেন্ট একটু মানসিক চাপে আছি। সবসময়ই মনে হচ্ছে তোমাকে কাছে পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বিশ্বাস করো জান। ভুলেও বিয়ের আগে তোমার অনুমতি ছাড়া ছুয়ে দিয়ে তোমার অসম্মান আমি করতে চাইনি। ভুলেও চাইনি। জাস্ট মিসটেক…”
বিদ্রুপের হাসি হাসলো নূরি নিঃশব্দে। ওগুলো মিসটেক! সে বাঁধা দেওয়ার পরও,বারবার সতর্ক করে দেওয়ার পরও একই কাজ রিপিট করে সেটা মিসটেক বলে চালানো হবে!
____”আমি নারী, ইয়াজ। আমি স্পর্শের ধরন বুঝি। তোমার স্পর্শে আমি সেফ বোধ করিনা কেনো? জবাব দিতে পারো?”
____”আমি আর কতবার বলবো আমার মাথা ঠিক ছিলনা তখন। এতো মানসিক চাপে ছিলাম। তোমাকে কাছে পেলে মনে হচ্ছিলো সব সমাধান হয়ে যাবে। পরে হুশ ফিরতেই তো তোমাকে ছেড়েও দিলাম জান। আর এমন হবেনা। তোমার আমার বিয়ের আগে তোমার সাথে দেখা অবধি করবো না। তবুও আমাকে ভুল বুঝে যোগাযোগ বন্ধ করবে না প্লিজ।”
____”যেটা পাপ সেটা পাপই ইয়াজ। আমি যে মূহুর্তে নিষেধ করেছিলাম তোমার তখনই থেমে যাওয়া উচিত ছিলো না কি? তার থেকেও বড় কথা তুমি যেটার সাফাই গাচ্ছো সে কাজটা কে কি পৌরষ্যত্ব বলে?”
____” আমি মরে যাবো তোমাকে ছাড়া নূরি। “
ইয়াজ এর এমন আর্তনাদে বুক হাহাকারে ভরে ওঠে নূরির। ভালোবাসা কঠিন জিনিস। একবার কারোর মায়ায় আটকালে সেখান থেকে বের হওয়া কি এতই সহজ। ওপাশ থেকে একেরপর এক কথা বলেই যাছে। ইয়াজ।ক্রমাগত ক্ষমা চেয়েই যাচ্ছে। নূরি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ইয়াজ ধরা গলায় বললো,
____”বিয়ে করতে বলেছিলে না? আমি রাজি। যখন বলবে তখন রাজি। আজ, এক্ষুনি বললে এক্ষুনি রাজি।”
উতালপাতাল মন নিয়ে নূরি কঠিন গলায় বললো,
____”আমার এসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না ইয়াজ। মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত আমি। আমাকে আমার মতো ছেড়ে দাও দয়া করে। আর পারছি না।”
নূরি ইয়াজ কে আর কিছু বলারই সুযোগ দিলো না। কেটে দিলো কলটা। বিছানার অন্য প্রান্তে ফোনটা ছুড়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। ভালোবাসায় এসব নরমাল কি? ইয়াজ যা করেছে তা তো অহরহ হয়। তাহলে সে মানতে পারছে না কেনো! অন্যায় বলছে মুখে।।অথচ চূড়ান্ত জেদ দেখিয়ে সরে আসছে না কেনো সে? সরে আসা উচিত। নূন্যতম আত্মসম্মান থাকলে লোকটাকে ফেলে চলে যাওয়া উচিত। সে নারী, নারীরা অনেক কিছু বুঝতে পারে। কোনটা শরীর ছোঁয়ার বাহানা আর কোনটা ভালোবেসে শরীর ছোঁয়া। ইয়াজের ভালোবাসায় যদি সত্যি খাদ না থাকতো সে হয়তো বাধা দিতে পারতো না। পাপ কে পাপ স্বীকার করে ভুল করেই ফেলতো। কিন্তু এর আগেও ওই চোখের নজরে সে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।
কামড়ে ধরলো বালিশ। ফুঁপিয়ে উঠলো।কান্না বাইরে যেতে না দেওয়ার নিদারুণ চেষ্টা। মরেছে তো সে আসলে। ইয়াজ শরীর ছোয়ার ধান্দায় কাছে আসলেও ফেসে গেছে সে। পাগল হয়ে গেছে ওই পশুর প্রেমে। ছিহ্…মনে মনে নিজেকে শত ধিক্কার দিলো সে। নারী জাতীর কলঙ্ক সে। নিজের সবথেকে মূল্যবান জিনিস যে মানুষ ভালোবাসার দেোহাই দিয়ে কেড়ে নিতে চায়, সে জেনে-বুঝে টের পেয়েও ভালোবাসা মুছতে পারছে না নিজ মন থেকে! নূরির কাউকে জড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হলো খুব করে। বোনেদের বলতে পারলে কত যে শান্তি লাগতো। কিন্তু অন্যায় তো তার, সে দোষি আদতে। কি বলবে ওদেরকে!
___”ভালোবাসা চাইলেই ভোলা যায় ! নাকি মানুষ টাকে এক নিমিষে ঘৃণা করা যায়! যদি যায়ও, সে মহত্ত্বে আমি ব্যার্থ। দুটোতেই ব্যার্থ। তাকে ভালোবেসে আজ আমি নারী হিসেবেই ব্যার্থ…
সে আমাকে ভলাোবাসেনি হয়তোবা। নাকি বেসেছে! ভালোবাসা আদতে কি আজ তো সেটায় প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার। “
ছাদের কার্নিশ ধরে দাড়িয়ে সিগারেট টানছে নাঈম। টুকটাক মাঝেমধ্যে খাওয়া হয়। তবে আজকাল পরিমাণ বাড়ছে কেনো যেনো। রিতু এরই মধ্যে ডাকলো কয়েকবার এসে। বৃষ্টি নামবে, মা ডাকছে নিচে যেতে। নাঈম যাচ্ছে না। শীতল বাতাসে ভালো লাগছে তার। বেশ রাত হয়েছে। ঈশানদের বাড়ি থেকে আসার পর থেকে আজ অশান্তি লাগছে কেনো জানি। নূরির সাথে ও বাড়িতে আজ দু বার দেখা হয়েছে মাত্র। মেয়েটা বারাবরের মতোই তাকে এড়িয়ে গেছে। এটায় অবশ্য মন খারাপ হয় না তার। ও বরাবরই এমনই করে। তবে আজকে কারণ টা হলো মেয়েটার চোখমুখ অস্বাভাবিক শুকনো লাগলো। চোখের নিচে কেমন একটা কালি পরা পরা মনে হলো।
____”ভাই নিচে যাবি তো নাকি! বাজ পরছে। মা রাগ করছে তো।”
পিছন থেকে রিতুর কন্ঠ পেয়ে ঘুরে তাকালো নাঈম। হাতের সিগারেট লুকালো না। রিতু পাশে এসে দাড়ালো।
____”মা রাগ করবে সিগারেট খাচ্ছিস দেখলে। নিচে চল।”
____”যা আসছি।”
____”আজকাল সিগারেট বেশি খাচ্ছিস। তোরা সকলেই। সাজিদ না হয় অফিসের চাপে ,ঈশান ব্যাটা ভালোবাসা বুঝতে না পারার শোকে। তোর সমস্যা কি!”
____”নিচে যা। আসছি বললাম তো।”
____”নূরি?”
রিতুর দিকে চমকে তাকালো নাঈম। গম্ভীর গলায় বললো,
____”তোকে কে বললো?”
____”কি আশ্চর্য! ভালোবাসাআআ। চোখে দেখলেই বোঝা যায়। বুঝবো না!”
নাঈম এর একটুও অস্বীকার করতে ইচ্ছে হলো না এই মূহুর্তে। সিগারেট এ টান দিয়ে বাকি অংশ ফেলে দিলো। ধোয়া উড়াতে উড়াতে বললো,
____”আই থিংক ও আমাকে পছন্দ করে না। একদমই করেনা।”
____”এমন টা মনে হলো কেনো! বলেছিস ওকে কখনো?”
____”বলিনি। “
____”তবে?”
নাঈম হাসলো রিতুর দিকে তাকিয়ে। কপালে টোকা দিয়ে বললো,
____”ওইযে বললি ভালোবাসাআআআ। টের পাওয়া যায় না?হু?”
____”ঈশান কিন্তু জানে।”
আতকে উঠলো নাঈম। বিষ্ময়মাখা গলায় বললো,
____”তোকে এটা আবার কে বললো!”
____”আমি খেয়াল করেছি। ঈশান নূরির যেকোনো দরকারে তোকে ডাকে। তুই নূরির দিকে আড়ালে আবডালে তাকাস আমি খেয়াল করেছি ঈশানও তাকায় তোর দিকে। ইনফ্যাক্ট তোরা গাধা একেকটা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়াজ আর নিশির প্রেমের খবরও দেওয়ান সাহেব এর অজানা নয়। তোরা নিজেদের চালাক ভেবে একদিন ওর হাতে ধোলাই খাবি।”
নাঈমের কাধে দু বার আলতো থাপ্পড় দিয়ে মিটিমিটি হেসে ছাদ থেকে নামতে বলে সেও নামলো নিচে। রিতুর কথা যুক্তিযোগ্য। একসময় হয়তো তারা জানতে পারবে ঈশান বহু আগেই হয়তো টের পেয়েছে।
আকাশের ঝলমলে তারাগুলোর দিকে তাকালো নাঈম। নূরিকে প্রথম দেখেছিলো মেয়েটা অনেক ছোট তখন। ক্লাস সেভেনে পড়ে কি! হ্যা তাই। তাদের একটা পিকনিকে সব বোনদের নিয়ে এসেছিলো ঈশান। তখন দেখেছিলো। নিশি তখন আরেকটু বড়। তাদের নিয়াজ পেছন পেছন ঘোরে। নিয়াজও ভালোবাসে,তবে ঈশান এর ভয়ে নিশিকে পাত্তা দিতো না। সময়ের সাথে সাথে নিশি,নিয়াজ এর সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। তবে তার আর এগোনো হয়নি। ঈশানকে সংকেত দিয়েছে বহুবার। ঈশান স্পষ্ট টেরও পায়। তাকে আশকারাও দেয়। তবে নূরির দিক থেকে এক বিন্দু সংকেত সে পায়নি আজ অবধি।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। ওই তাঁরার আলোর ঝলমলিয়ে ওঠায় নূরির চেহারা ভাসছে কেনো! প্রেমে পাগল হয়েছে সে। আজব কাহিনি।
নূরির চোখমুখ ফুলে উঠেছে কান্নার তোরে। ফোনটা এক সেকেন্ড শান্ত হচ্ছে না। কল, মেসেজের শব্দে হাহাকার বাড়ছে আরও তার। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই তার। চাইলেই ফোনটা অনায়াসে বন্ধ করে রাখতে পারে। উচিতও তাই। অথচ সে তা করছে না। কেঁদে যাচ্ছে ফোন না ধরার আক্ষেপে।
এবারে কাঁপা হাতে ফোনটা হাতে নিলো। ফোন ধরবে না। মেসেজে ছোট্ট রিপ্লাই দিয়ে এবার ফোন বন্ধ করে ফেলবে। মেসেজ চেক করতেই মুখ রক্তশূণ্য হয়ে গেলো। রক্তে ভেসে গেছে মেঝে। ইয়াজ নিজের হাতে পাগলের মতো আঘাত করছে। আর্তনাদ করে উঠলো নূরি। শব্দ করে কান্না বের হলো তার। হাত অবশ হয়ে আসছে। তাইতো,ভুল তো হতেই পারে মানুষ এর। ভুল কেউ রিয়েলাইজ না করলে এতটা পাগলামি করে? তাও আবার পুরুষ মানুষ। ইয়াজ তাকে ভালোবাসে। এটা চিরন্তন সত্য। ভুল বুঝতে পেরে কতটা অনুতপ্ত ভাবা যায়। নূরি ক্ষমা না করলে মানুষ টা তো মরেই যাবে। ওইতো স্পষ্ট লেখা আছে মেসেজে।
বোকা মেয়েটা কোনোমতো কান্না গিলে ফোন করলো ইয়াজের নাম্বার টায়। আৎকানোর মাত্রা বাড়লো আরেকদফা। ইয়াজের ফোন বন্ধ। দ্রুত হাতে ইয়াজের পাঠানো মেসেজ গুলোর শেষ অবধি গেলো। ছোট্ট একটা দু লাইনের মেসেজ তিন মিনিট আগে পাঠানো।
____”জান, আমি মরে গেলে যদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় তবে ক্ষমা করবে আমায়? চরিত্রহীন ভেবে ভুল বোঝা বন্ধ করবে? তাহলে তাই সই। বিদায়। ঠিক আছে?”
শরীর অবশ হয়ে এলো নূরির। বল পেলো না হাতে। মাথা ঘুরে উঠলো। বেশি বেশি করে ফেললো সে! একটা মানুষ মরতে যাচ্ছে তার ভুল বোঝার কারণে? এতবড় বোঝার ভুল সে করলো কি করে। ভালোবাসার ওপর আঙুল তুললো সে। যা হয়েছে সম্ভবত সে সেনসিটিভ বলে বেশি বেশি লেগেছে। এটাই হয়তো নরমাল। তাছাড়া ইয়াজ বিয়ে করতে চাইলো যেকোনো মূহুর্তে। ভালো না বাসলে তো চাইতো না। দু হাতে মুখ চেপে কেঁদে উঠলো।
আরও কয়েকবার কল করেও নাগাল পেলো না ইয়াজের। যা ঘটার ঘটে গেছে! তার জন্য তার ভালোবাসার মানুষ আজকে নিজেকে শেষ করবে। সে সেটা মানবে? এত সহজে। বেঁচে থাকার অধিকার নেই তারও। একদম নেই। বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো। ড্রয়ারে হাতড়ে ব্লেট নিলো হাতে। বা হাতের কবজির ওপর চেপে ধরলো। চোখ দিয়ে অনবরত গড়িয়ে পরছে নোনাজল। বাবা, মা পরিবার, ভাইবোন সবার মুখ ভাসছে চোখের সামনে। ভালোবাসা এতো টক্সিক হতে পারে জানা ছিলো না তার। বিরবির করে বললো,
____”আমাকে ক্ষমা করবে সবাই কেমন? নিজের দোষে ভালোবাসার মানুষ টাকে হত্যা করে আমি বেঁচে থাকতে পারবো না।”
হাত চললো। তীব্র বেগে ছিটকে পরলো রক্ত। চোখের পলকে রক্তিম তরলে গলগলিয়ে গড়িয়ে পরলো। অন্ধকার হয়ে এলো চোখের আশপাশ। অনূভুতি লোপ পেলো। তীব্র যন্ত্রনা অনূভব করতে করতে লুটিয়ে পরলো মেঝেতে। বন্ধ হলো চোখজোড়া।
রিক্তা দেওয়ান তখনও ঘুমায়নি। সারাদিন ধকলে মাথা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। কেমন মনটাও অস্থির লাগছিলো। মেয়ের কাছে সম্ভবত ঝান্ডু বাম থাকে। সেটা নিতেই এসেছিলেন ওপরে। নূরির ঘরের দরজায় কড়া নাড়লেন কয়েকবার। সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। এ বাড়ির ছেলেমেয়েরা এতো জলদি ঘুমানোর পাত্রপাত্রী একজনও নয়। রমজান মাস এলে তো আরও নয়। সারারাত গুটুর মুটুর করে একদম সাহরী খেয়ে ঘুমায়। আজ কি ক্লান্ত বলে শুয়ে পরেছে জলদি! থাক তাহলে আর ডেকে কাজ নেই। চলে যেতে ঘুরতে উদ্ব্যত হতেই চোখ আটকালো মেঝেতে। বড় বড় হয়ে গেলো সে। দু পা পিছিয়ে গেলেন চমকে। পা কেঁপে উঠলো। অস্ফুটস্বরে বললেন,
____”র..র..রক্ত!”
ভিতর থেকে গড়িয়ে আসছে দরজার নিচ দিয়ে। তাজা রক্ত! হৃদপিন্ড বেড়িয়ে আসতে চাইলো। সজোরে আঘাত করলো দরজায়।
____”মা? অ্যাই নূরি…নূরিইই।”
ভিতর থেকে একটা সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকালো। নিশি বেড়িয়ে এসেছে পাশের রুম থেকে। ঘুমায়নি সে। দ্রুত পায় এসে দাড়াতেই হতভম্ব হলো সেও। রিক্তা দেওয়ান ততক্ষণে ছুটেছে ঈশানের রুমের দিকে। ক্রমাগত কড়া নাড়লেন।
দ্রুত পায়ে দরজা খুললো এসে ঈশান। তিতির পিছন পিছন ছুটে এসেছে। দরজা খুলতেই চোখে পরলো কান্নারত মুখ। রিক্তা দেওয়ান দাড়িয়ে। উদভ্রান্তের মতো দু হাতে চেপে ধরলো ঈশানের হাত।ফুঁপিয়ে উঠলো,
____”বড় আব্বা…আ..আমার…সর্বনাশ…”
তিতির ছুটে এসে ধরলো মেজো মামনীকে।
____”মেজো মা কি হয়েছে বলবে তো।”
রিক্তা দেওয়ান হাতের ইশারা করলো ওদিকটার একটা রুমের দিকে। নূরির রুম ওটা। কোনোমতে আউড়ালো,
____”আব্বা…আমার মেয়েটা..
ঈশান এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করলো না। ঝড়ের গতিতে এসে দাড়ালো বোনের ঘরের সামনে। কপাল
কুচকে এলো। তিতিরের দিকে ফিরলো। তিতির দু হাতে আগলো ধরে আছে মেজো মামনী কে। আদেশের সুরে বললো,
____”আলমারির বাম পাশের তিন নাম্বার ড্রয়ারে চাবির গোছা আনে। দ্রুত আন।”
তিতির এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে উঠলো। ঈশান দু হাতে ঠেললো দরজা। খুললো না। রিক্তা শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
____”মেজো মামনী। আস্তে। দেখতে দাও। বাড়িজুড়ে আত্মীয় সজন আছে। সবার কানে গেলে আগেই হৈ হৈ পরে যাবে। নিশি নয়ন কে ডাক।”
নিশি নয়নকে ডাকতে ছুটতে ছুটতেই তিতির চাবি নিয়ে এসে হাজির হলো। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে অনায়াসে খুলে ফেললো দরজা। ঘরের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকতেই দু হাতে মুখ চাপা দিলেন রিক্তা। হু হু করে কেঁদে উঠলেন। ঈশান ছুটে গিয়ে বসলো মেঝেতে। বা হাতের কবজির সামান্য ওপরে বিশাল কাটা। রক্তে ভেসে গেছে মেঝে। সময় নষ্ট না করে ওড়নায় বাঁধলো হাতটা।
____”তিতির, নাঈম কে কল কর। রিতু কে নিয়ে দ্রুত চলে আসতে বল।”
তিতির বাধ্যের মধ্যে ফোন করতে ছোটে নাঈম কে। রিতু সবেই শোয়ার পায়তারা করছিলো। নাঈমের কাছে শুনে ছুটছে দেওয়ান বাড়ির দিকে। নাঈম বাইকে নিয়ে বেড়িয়েছে। সে পিছনে বসা। কার কি হয়েছে সেটাও জানা হয়নি। নাঈমও জানেনা।
মিনিট দশেকের মধ্যে দেওয়ান বাড়িতে পৌছালো তারা। দরজার সামনে নয়ন দাড়িয়েই ছিলো। ওদের নিয়ে ছুটলো ওপরে। পুরো বাড়ি অন্ধকার। শুনশান। কার কি, কতটা কেটেছে বুঝলো না ওরা। তবে ওপরে এসে ঘরের ঢুকতেই থমকালো নাঈমের পা জোড়া। বিছানার ওপর নিথর শরীর একটা। বুকের বা পাশে তীর বিধলো এসে। গোটা মেঝে রক্তে মাখামাখি। শ্বাস আটকে গেলো কয়েক মূহুর্তে। রিতু ছলছল চোখে পেশাদারিত্ব ভুললো না। হাতের মেডিকেল কিট নিয়ে দ্রুত বসলো পাশে। নার্ভস চেক করলো। লো প্রচুর।কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করলো না। হাতের ওড়না পেচানো খুলে ফেললো।
ঈশান গম্ভীর, চিন্তিত গলায় বললো,
____”হসপিটালইজড্ করতে হবে?”
ঈশানের দিকে না তাকিয়েই হাতের কাজ সারতে সারতে রিতু জবাব দিলো,
____”রক্ত বেড়িয়েছে বেশ খানিকটা। তবে আশা করবো সময় বেশি নষ্ট হয়নি। দেখতে দে।”
এরইমধ্যে নিশি গিয়ে ডেকে এনেছে রাহেলা আর ছোট চাচি মুক্তা কে। ওনারা এসে সামলাচ্ছেন জা কে। বাড়ির কর্তাদের অতি সাবধানে এড়িয়ে এসেছেন। কেলেঙ্কারি ঘটবে না হলে। প্রায় ঘন্টাখানেক পর হাফ ছাড়লো রিতু। সেলাই এর কাজ শেষ। উঠে দাড়ালো। নয়নের হাতে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিলো।
____”ওষুধ গুলো এনে দে। “
নয়ন ছুটতেই ঈশানের দিকে ফিরলো সে।গম্ভীর গলায় বললে,
____”চিন্তার কিছু নেই। ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছি। জ্ঞান ফিরতে সময় লাগবে।”
____”ব্লাড লাগবে?”
____”নাহ। সময় মতো খোঁজ পেয়েছিলি। না হলে রিস্কি হয়ে যেতো। ততটাও ব্লাড লস্ট হয়নি। আমি স্যালাইন দিয়ে যাচ্ছি। শরীর দূর্বল।”
তিন জা মেয়ের কাছে গিয়ে বসলেন। কাঁদছেন তিনজনের। নিশি,তিতির হাত ধরাধরি করে দাড়িয়ে আছে পাশেই। তারাও কাঁদছে। করিডরে বাকরুদ্ধ হয়ে দাড়ানো নাঈম। রিতু, ঈশান বেড়িয়ে এসে পাশে দাড়াতেই হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে ফিরলো বন্ধুদের দিকে। রিতু বা ঈশানের কারোর চোখ এড়ালো না বিধ্বস্ত নাঈম কে। চোখ রক্তিম হয়ে আছে। মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করলো,
____”কি অবস্থা এখন?”
____”ঠিক আছে। ওষুধ এর ডোজ কাটলে জ্ঞান ফিরবে।”
নাঈম কথা বললো না। বলতে পারছে না সত্যি বলতে। শরীর থরথর করে কাপছে।কথাটা বলেই রিতু ফিরলো ঈশানের দিকে।
____”সুইসাইড এর ট্রাই করছিলো। সমস্যা কি। বুঝলাম না।আজ সারাদিন তো নরমাল কথাবার্তা বললো। রাগারাগি করেছিস কেউ?”
মাথা নাড়লো দুদিকে ঈশান। মুখটা ভীষন গম্ভীর করে বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে রাখা। ঘর থেকে নিশি রিতুকে ডাকতেই রিতু ছুটলো ঘরে।
ঈশান এসে দাড়ালো নাঈমের পাশে। ইশারা করলো বাইরের যেতে। বাড়ির সামনে নিস্তব্ধ রাস্তায় এসে দাড়ালো দুজন। হু হু করে বাতাস বইছে। নাঈম বন্ধুর দিকে তাকালো।
____”কি হয়েছিলো?”
____”যেটা ভাবছি সম্ভবত তাই।”
____”কি?”
____”মেয়েটা বড্ড বোকা। ভাই হয়ে চাইনি খোলামেলা মুখ ফুটে বলতে। অবশ্য আমিও দ্বিধাদ্বন্দে ছিলাম আমার ধারনা নিয়ে। তবে আজ আর কোনো সন্দেহ রইলো না। যা ভেবেছিলাম একশ ভাগ সত্যি। দোষটা আমারই। ওকে ইশারা ইঙ্গিতে সাবধান থাকতে বলার থেকে দুটো চড় মেরে সত্যি টা জানতে হতো।”
নাঈম অবাক চোখে তাকিয়ে রয়। ঈশানের কথা তার বোধগম্য হয়না।
____”কি সন্দেহ করেছিলি?”
____”একটা আননোন নাম্বার থেকে আমাকে ব্ল্যাকমেইল কর হতো নূরি,তিতিরকে নিয়ে। ওটার খোঁজ করছিলাম আমি। আমার খুব ধারনা ছিলো ওসব ফেক। নূরি এতোটা বোকা নয়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার ওপর নিষেধ করেছিলাম। ওদের ওপর চোখ রাখতে লোক পাঠিয়েছিলাম। কারণ ছেলেটাকে আমার অন্য সন্দেহ হতো। ভেবেছিলাম নূরিকে সোজাসাপটা বলে ট্রমায় ফেলার থেকে আমার মতো ট্রাই করি। কিন্তু ছেলেটা জাস্ট লাপাত্তা হয়ে যেতো। “
ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো নাঈম।
____”তুই কি বাই এনি চান্স ভয় পাচ্ছিলি ওরকম একটা লোককে!”
____”পাচ্ছিলাম।”
নাঈম যেনো আকাশ থেকে পড়লো। ঈশান কাউকে ভয় পাচ্ছিলো মানে কি! এটাও সম্ভব!
____”তুই আর ভয়!”
ঈশান অসহায় হাসলো। গলার স্বর নামিয়ে বললো,
____”বাড়ির মেয়েদের সম্মান এ হাত দিলে যেকোনো পুরুষ ভয় পায় নাঈম। সেটা যদি হয় বউ আর বোনেরা। তাহলে সেটার মাত্রা বাড়ে। আমার হাত পা বাধা এই মূহুর্তে। আমার কাছে এমন কিছু আছে যেগুলো দিয়ে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে। ভাবতে পারিস। এক মাস হয়ে গেলো অথচ সেই নাম্বার, মানুষ কোনোটাই এখনো ট্র্যাক করে উঠতে পারিনি।”
____”কি সেসব?”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো ঈশান। বন্ধুর অসহায় মুখে তাকালো। নূরিকে ছেলে টা ভালোবাসে। সে সেটা জানে। ভীষন ভালোবাসে তার বোনটাকে।অথচ তার বোকা বোনটা! তার বোকা বোনটা এক লম্পট, দুশ্চরিত্তর কাছে ধরা দিয়ে বসে আছে।
____”সেসব তোকে এই মূহুর্তে দেখানো সম্ভব নয় আমার নাঈম। কিন্তু আমার বাড়ির মেয়েগুলোর ওপর কারোর কু নজর আছে। যে কারণেই হোক আছে। ওই তথ্য আর কিছু ছবি আমি প্রপার সরিয়ে ফেলা না পর্যন্ত কিচ্ছু বলতে বা রাফ অ্যাকশন নিতে পারবো না ছেলেটার ওপর। মানুষ টা চালাক। হাত ফসকে গেলে প্রমান লোপাট হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। সাথে নূরি বা তিতিরের ক্ষতি। এতদিন বুঝতে পারিনি মানুষ টা নূরির সেই মানুষ টা কিনা। তবে খুব সম্ভবত আমাকে যা বলে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে একই কাজ আজ নূরির সাথে হয়েছে। যে কারণে ভয়ে মেয়েটা…”
ঈশান অন্যরকম আন্দাজ করে নিয়েছে নূরির সুইসাইড করতে চাওয়ার কারণ। তাদের বিয়ের প্রথম রাতে কল করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে চাওয়া লোকটির খবর সে আজও পায়নি। ছবিগুলোতে প্রথমে তিতিরকে দেখলেও পরে অরিজিনাল ছবি প্রিন্টআউট করে জানতে পারে সেটা তিতির নয়, নূরি। যে এই নোংরা খেলা খেলুক। মানসিক ভাবে ট্রর্চার বেশি করতে চায় তাদের। পরিবার,বোন,বউ সবার সম্মান সেফটির জন্য চুপ থেকে খুঁজতে হচ্ছে কালপ্রিট টাকে। তবে নূরি যার সাথে সম্পর্কে আছে এটা সেই ছেলে কি না সেটা জানতে পারা যায়নি এখনো। বিধায় ব্যবস্থাও নিতে পারছিলো না।
নাঈম কথা বললো বেশ খানিকক্ষণ এর নিরবতার পর।
____”তোর বোন অন্য কাউকে ভালোবাসে তাইনা?”
নাঈমের প্রশ্নের জবাব আসলো না ঈশান এর থেকে। ঈশান সিগারেট ধরিয়েছিলো। হাতের সিগারেট এর অবশিষ্ট অংশ ছুড়ে ফেললো রাস্তায়। নাঈম একই প্রশ্ন দ্বিতীয় বার করার প্রয়োজন বোধ করলো না। এতো বোকা সে নয়।
____”ছেলেটা খারাপ বুঝলি কি করে। নূরির সাথে কথা বল। জানতে চা বিস্তারিত। দরকার হলে ছেলেটার সাথেও দেখা কর,খোজ নে। তোর সদেহ যার ওপর সে তো এই ছেলে নাও হতে পারে তাইনা?ছেলে টাকে মানছিস না কেনো তুই?”
____”মানার মতো না। এটাই সেই ছেলে কিনা সেটা তো জানিনা। কারণ এই ছেলেকেও আমি দেখিনি এখনো। সাথে ছবির ছেলেটাও সঠিক আইডেনটিটি জানা নেই এখনো। এরা এক মানুষ আমার বিশ্বাস। তবে ছবিগুলো এই ছেলেই পাঠিয়েছে নাকি অন্য কেউ পাঠিয়ে ঝামেলা করছে সেটা প্রশ্ন। “
____” এখানে তিতির কি করে জড়িয়ে?”
____”অনেক ঘটনা। বাদ দে। আমি দেখছি। আর পার পেতে দিচ্ছি না। আমার অকর্মক লোকগুলোকে ছাটাই করে ফেলতে হবে। হয় আমার লোকগুলো বেশি বোকা নয়তো ওই কালপ্রিট বেশি চালাক। তবে আমি মাঠে নামলে দেখবো লড়াই টা জমে কি না। নূরিকে এসবে আর জড়াবো না। “
____”এটা তোর যুক্তি,তোর বোনের তো না।”
____”অ্যাম সরি নাঈম।”
নাঈম মলিন হাসলো বন্ধুর দিকে তাকিয়ে। ঈশান খুব সহজে সরি বলার ছেলে নয়। বুকের ভিতর টা দুমড়ে মুচড়ে আসছে নূরির মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই।
____”তুই কেনো সরি বলছিস! একতরফা ভালোবাসা দুনিয়াতে অহরহ। আমিই প্রথম ভিকটিম না। ইট’স ওকে…”
____”স্বীকার করলি আমার বোনকে ভালোবাসিস তুই।”
____”না করার কি আছে। আমি স্বীকার না করলেও তুই জানতিস। তাইনা? এবং আজ ক্লিয়ার হলাম নূরি যে অন্য কাউকে ভালোবাসে বা কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছে এটা টের পেয়েই তুই আমাকে বলেছিলিস ওর থেকে দূরে থাকতে।”
ঈশান গম্ভীর গলায় বললো,
____”আমি তোকে চিনি। কতটা পিওর সেটাও জানি। আমার একটা বন্ধুরও চরিত্র নিয়ে কেউ আঙুল তুলতে পারবে না। ভুলেও না। একই গর্ব আমার বোনদের নিয়েও আমার ছিলো। নূরিকে তুই ভালোবাসতিস। এটাতে আমার বিন্দু মাত্র সমস্যা ছিলো না। তোরা দুজন দুজনের যোগ্য এটা আমি জানতাম,মানতামও।তবে…
____”তবে?”
____”আমার বোনের ভুলত্রুটিও আমাকে দেখতে হবে। তুই ওর যোগ্য। ছিলি, আছিস। কিন্তু ও নেই। যতই আমার বোন হোক। অন্য পুরুষে আসক্ত সে। হয়তো গভীর ভাবেই। জেনে-বুঝে বন্ধুর গলায় ঝুলিয়ে দিতে পারি না আমি সেসব লুকিয়ে। তোর সামনে মুখ দেখাতে পারবনা তাহলে।”
নাঈম এর বুকটা কাঁপছে। নূরি অন্য কাউকে ভালোবাসে, গভীর ভাবে। তার থেকেও বড় কথা তার বন্ধু টা কতটা ভাবে তার জন্য। ঈশান চাইলেই সবটা লুকিয়ে আশকারা দিয়ে যেতে পারতো নূরিকে তার কাছে দিতে। তা সে করছে না। বোনের দোষ মোটেই আড়াল করার চেষ্টা করছে না।
____”দেখ নাঈম। এমন টা নয় যে আমি ওই ছেলের সাথে আমার বোনকে যেতে দেবো। কক্ষণো না। ওর জীবন আমি গোছাবো। তবে সেটা তোকে গুছিয়ে দিতে আমি আর বলবো না। তুই বছরের পর বছর আমার বোনকে চেয়ে এসেছিস। অন্য মেয়েদের দিকে চোখ তুলেও তাকাস নি। তুইও নিশ্চয় তেমন মেয়েই ডিজার্ভ করিস। আমার বোনকে আমি গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো না তোর ঘাড়ে।”
____”আমি যদি বলি এতকিছুর পরও তোর বোনের প্রতি আমার অনূভুতি একবিন্দু চিড় ধরেনি। তাহলে কি তুই আমাকে কাপুরষ বলবি?”
ঈশান অবাক চোখে তাকায় নাঈম এর দিকে। নাঈম মলিন হাসে।
____”আমি তোর বোনকে কখনো জানতেই দেইনি আমার ভালোবাসার কথা। ও অন্য কাউকে ভালোবেসেছে এটা সবার জানাশোনার অগচরে। এমন তো নয় ও আমার ভালোবাসা জেনে, বা আমাকে ঠকিয়ে অন্য কারোর কাছে গিয়েছে। ও জানতোই না আমার ভালোবাসার অস্তিত্ব। কাউকে ভালোবাসা দোষের না। ভুল মানুষ কে ভালোবাসা দোষ। তোর বোন বড্ড সাদাসিধা। তুই আমি সবাই জানে। শুধু নূরি নয়। একই বিষয় তিতির, নিশির ক্ষেত্রেও। তোর বাড়ির মেয়েরা মাটির দলা একেকজন। ওদের ভালোবাসায় মুড়িয়ে যেদিক ইচ্ছে চালনা করা যায়। নূরির দোষ নেই। ও তো ভালোই বেসেছিলো। জানিনা ও বুঝতে পেরেছে কি না সেই ভুল টা। আগে সেটা নিশ্চিত হ। ছেলেটা সত্যিই ফ্রড কিনা জান আগে। আগেই ছেলেটারও দোষ দেওয়া উচিত না। যদি দোষি হয়, নূরিকে অবশ্যই সরিয়ে আনবি। যদি দেখিস ছেলেটার মধ্যে সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য কিছুতে। তবে মেনে নিস ছেলেটাকে। তোর বোন ভালো থাকবে।”
বন্ধুর একেটা বুঝদারের মতো কথায় হতবাক হয় ঈশান। ছেলেটা কতটা কষ্ট বুকে পাথর চাপা দিয়ে ভালোবাসার মানুষ কে অন্য কারোর সাথে ভালো থাকার কথা বলতে পারে ভাবা যায়!
____”তোদের কোথা থেকে খুঁজে খুঁজে বন্ধু বানিয়েছিলাম বল তো?
নাঈম হেসে ফেলে হুট করে। কাধ জড়িয়ে ধরে ঈশানের।
____”তবে যদি সত্যিই তোর সব সন্দেহ সঠিক হয়। তোর বোন আমার তাহলে। দুনিয়ার যেকোনো কোনায় চলে যেতে চাক তোর বোন। তাকে আমি হারাতে দেবো না। ভুল মানুষ থেকে সরিয়ে এনে বুকে রাখবো। সত্যি ভালোবাসায় মুড়িয়ে ফেলবো। ওর সব ভুল ত্রুটি চাপা দেবো আমার বুকে।”
ঈশান দু হাতে আচমকা জড়িয়ে ধরলো বন্ধু কে। আলতো পিঠ চাপড়ালো।
____”আশা করবো ততটাও ভুল আমার বোন করেনি যতটায় তোর বুকটা সারাজীবন হাহাকার করবে। এটা আমার বিশ্বাস আমার বোনের ওপর। ওর সবটুকুর ওপর তোরই অধিকার থাকবে। প্রথম এবং শেষ সবটা যেনো তুই হতে পারিস।”
নাঈমের বুকটা সত্যি কাঁপলো। কল্পনায় ও ভাবতে পারে না তার নূরিকে অন্য পুরুষ গভীর থেকে গভীরে ছুয়েছে বা ছোবে। ছলছল চোখ বুজে নিলো জলদি।গলা খদে নামিয়ে কাঁপা গলায় বললো,
____”আমারও সেটাই বিশ্বাস। আর বাকি অযাচিত স্পর্শ করতে চাওয়া, সব ধুয়েমুছে ফেলবো আমার ভালোবাসায়।।”
রিক্তা দেওয়ান মেয়ের কাছে থাকবেন। বাকিদের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বললেন। তবে রাহেলা বা মুক্তা কেউ গেলো না নিজেদের রুমে। মেয়ের এ অবস্থায় তার শুয়ে ঘুমাবে ভাবতেই পারেননা। তাছাড়া শেষ সাহরীর জন্য উঠতেই হবে ঘন্টাখানেক পর। এখন আর ঘুম হবেও না। তবে নিশি, তিতির নয়নকে ঘরে পাঠালো তারা। ছেলেমেয়ে গুলো ঘরে যাক। নয়ন ওষুধ গুলো এনে দেওয়ার পর ঠিক মতো সব বুঝিয়ে দিয়ে একটু আগেই রিতুকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে নাঈম। বন্ধু কে রাস্তা থেকে বিদায় দিয়ে ঘরে আসতেই চোখে পরলো তিতিরকে। বিছানায় পা ভাজ করে ফুঁপিয়ে কেদে যাচ্ছে।
ঈশান দরজা আটকে ঘরে এলো। গায়ের জামাকাপড় চেঞ্জ করা দরকার। রক্ত লেগে আছে। তিতিরের মনের অবস্থা বুঝে বললো না কিছু আপাতত। শাওয়ার নিয়ে বের হলো। তিতির কান্না থামিয়েছে এখন। ঈশান বিছানায় এসে বসতেই বললো,
____”ইয়াজ কে?”
নামটা প্রথম শুনলো না ঈশান। এই নামের সন্ধান তার বহু আগে থেকে। তবে এই ছোট্ট নামে সে আজ অবধি খুঁজে পায়নি তাকে। আশ্চর্য জনক তার লোকজন গরু খোঁজা খুঁজেও পায়নি। এখানে যতবার এসেছে হোটেল গুলোয় কোনো নাম পায়নি। এমনকি স্পষ্ট কোনো ছবিও নেই ছেলেটার। গম্ভীর গলা বললো,
____”তুই কোত্থেকে শুনলি এ নাম?”
তিতির পা ভাজ করে বাবু হয়ে বসলো। নরম গলায় বললো,
____”ছোটপু ঘুমের ঘোরে উচ্চারণ করছিলো।”
____”চিনি না।”
____”ছোটপুর বয়ফ্রেন্ড? “
____”হতে পারে।”
____”তার সাথে ঝগড়া করে এটা করলো? “
____”হতে পারে।”
____”জ্ঞান ফিরলে রাগারাগি করবেন না কেমন? মানসিক চাপে থাকবে অনেক। ভালোমতো বুঝিয়ে…
ঈশানের তপ্ত দৃষ্টিতে থামলো তিতির। ঈশান ভারি গলায় বললো,
____”সে সেন্স আমার নেই? নাকি ভালো ব্যবহার করতে জানিনা আমি?”
____”সেটা কখন বললাম। তবুও জিজ্ঞেস করারই দরকার নেই।”
____”ঘুমা। এতো ভাবতে হবে না।”
____”এখন ঘুম ধরবে না।”
ঈশান ল্যাপটপ খুলে বসতেই কপালে ভাজ পরলো তিতিরের। সাড়ে তিনটে বাজে রাত্রির। সারাদিন খাটাখাটুনি গিয়েছে মানুষ টার ওপর। এই গরমে কি পরিমাণ ছুটতে হলো। তার ওপর রাতে একটা ফোটা ঘুম নেই।
____”এটা নিয়ে বসলেন কেনো। একটু শুয়ে রেস্ট নিন। অসুস্থ লাগবে তো।”
____”না বকবক করে ঘুমা। কাজ করতে দে।”
ধমকে ওঠে ঈশান। মাথায় হাজার একটা চিন্তা। কয়েকজন কে টেক্সট, ই মেইল করলো ইমারজেন্সি ভাবে। কাল দিন পর ঈদ। ঈদের দিনটা কেটে গেলেই পুরোদমে তার নামতে হবে মাঠে। বাড়িতে এতো এতো মানুষ জন এর মধ্যে, গ্রামের এত এত ঝামেলার মধ্যে ঢাকা যেতেও পারছে না। তাছাড়া সত্যি বলতে তিতিরকে রেখে যেতে ভয় হয় তার বড্ড। তার জীবনের অন্ধকার এর সাথে মেয়েটাকে জড়াতে চায়না সে মোটেই। আবার সর্বক্ষণ ছায়া সঙ্গী হয়ে তিতির বা বোনদের সাথে ঘুরঘুর করাও সম্ভব নয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনস্থির করলো ঈশান। নয়ন কেই খানিকটা জানাতে হবে নূরির বিষয়টা নিয়ে। তার অবর্তমানে বাড়িটা নয়নকেই সামলাতে জানতে হবে। অস্থির লাগছে সবেতে। সেই বিয়ের রাত থেকে নতুন এক অশান্তি। এমনিই কি জীবনে ঝামেলার কমতি ছিলো! মেয়েটা জড়ালো তার জীবনে, একটা মূহুর্ত কাছে টানতে পারেনা। তাদের এত দুরত্ব তো সেই প্রথম রাতে ওই ফোন কলটা পেয়ে তিতিরকে মিথ্যা বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া থেকেই। এখন চাইলেও শুধরাতে পারছে না সবটা। তিতির দূরে গেছে অনেকটা। ওকে সময় দিতেই হবে। তার নিজেরও দরকার সময় সম্ভবত। ভালোবাসা বোঝা কষ্ট, আগলে না রাখতে পারা তার থেকেও বড় কষ্টের।
তিতির শুতে গেলো না। বরং সাহস করে ঈশানের ল্যাপটপ টা বন্ধ করে দিলো। ঈশান কপাল কুচকে তাকালো। দৃষ্টি এতক্ষণ ল্যাপটপে থাকলেও কাজ শেষ হয়েছে খানিকটা আগে। ভাবছিলো সবটা। তিতির ল্যাপটপ টা ধীরেসুস্থে সরিয়ে রাখলো বের সাইট টেবিলে। ধীর গলায় সাহস নিয়ে বললো,
____”শুয়ে পড়ুন। “
____”তোকে তো ধরে রাখিনি।”
____”আপনার শরীর টা খারাপ লাগবে। সারাদিন কি দৌড়াদৌড়িই না গেলো।”
তিতিরের আদুরে কথায় চিন্তা কেমন সরে গেলো খানিকটা। তার টেনশন করছে মেয়েটা! খোজ খবর রাখছে! মাথাটা টনটন করছে এতো এতো শারিরীক, মানসিক চাপে। ওই স্নিগ্ধ মুখটার দিকে তাকালে কি যে প্রশান্তি লাগে! হঠাৎ হাস্কিস্বরে বলে উঠলো,
____”বুকে নিবি?”
আচমকা ঈশানের এ কথায় বুকের বা পাশ লাফিয়ে উঠলো। এই ধরনের আবদার করার সময় ঈশানের কন্ঠ বড্ড নেশালো শোনায়। ধড়ফড় করে ওঠে তার বুকটা তখন। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে শুকনো ঢোক গিললো তিতির। ঈশান একই প্রশ্ন আবার করলো।
____”বুকে নিবি? অশান্তি লাগছে খুব। শান্ত কর ।”
তিতিরের শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হলো। মানুষ টার মুখের দিকে তাকাতেই একরাশ মায়া কাজ করলো। মুখটা একদম মলিন। চোখটোখ ঘুমের অভাবে লাল হয়ে আছে। তিতির বিনাবাক্যে বিছানার হেডবোর্ডে বালিশ ঠেকিয়ে আধশোয়া হলো। ভীষন লজ্জা লাগছে তার। ঈশান বসে আছে স্থির হয়ে। তিতিরের জবাব এর অপেক্ষা করছে হয়তো। তিতির আধশোয়া হয়ে লজ্জায় দৃষ্টি দিতে পারলো না ঈশানের দিকে। ঈশান আসছে না কাছে। তিতির ঠোঁট কামড়ে এদিক ওদিক তাকায়। এখন কি আবার দু হাত বাড়িয়ে বাচ্চাদের মতো কাছে ডাকতে হবে! আশ্চর্য! বোঝাই তো যাচ্ছে বুকে নেবে বলেই এমন আধশোয়া হলো।
ঈশান গভীর ভাবে লক্ষ্য করছে লজ্জায় রক্তিম হয়ে যাওয়া ফরসা মুখটা। ল্যাম্পের হলুদ আলোয় জ্বলজ্বল করছে চাঁদ বদন মুখটা। ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে, তিরতির করে কাঁপছে চোখের পাপড়ি। নাকের পাটা লাল হয়ে গেছে। তবে তিতির উত্তর না পেয়ে সে আগ বাড়ালো না। নিজেকে কথা দিয়েছে এক বিন্দু জোর সে করবে না তিতির এর ওপর। আর না তো তিতির মুখে অনুমতি না দিলে সে এগোবে। মেয়েটাকে বিয়ের পর থেকে যথেষ্ট অসম্মান করেছে। সত্যিই তো। ভালোবাসি না বলে বারবার জোর করা,ছুঁতে চাওয়া এসব অশালীন। মেয়েটার জন্য তো অবশ্যই। তার ছোঁয়া যদি তিতিরের ইতস্ততার কারণ হয় সে কখনো নিজ থেকে আর এগোবে না। কখনো না।
হাত বাড়িয়ে নিজের বালিশ ঠিক করে পাশ ফিরে শুলো ঈশান। তিতির অবাক হলো। ঈশানের সাড়াশব্দ না পেয়ে এবারে ধীর গলায় ডাকলো,
____”ঈ..ঈশান ভাইই…”
____”ঘুমিয়ে নে কিছুটা সময়। “
তিতির চুপ করে তাকিয়ে রয় খানিকটা সময়। সে বলে নি বলে কি ঈশান আসলো না! তাই কি! লোকটা এতো ভালো হলো কবে থেকে। অবাক করার বিষয়ই।
কি করবে সে। ওভাবে আবদার করলো অথচ সে উত্তরই দিলো না তার জন্য বুঝি রাগ করেছে?
____”রাগ করেছেন?”
____”উহু। কথা না বলে রেস্ট নে।”
তিতিরের বুকটা এবারে অস্থির লাগছে। অশান্তি এবারে তার লাগছে। বুকটা ছটফট করছে। ঈশানে দিকে তাকালো। উল্টো ঘুরে আছে। মাথার চুলে হাত বুলাতে ইচ্ছে হলো। মাথাটা বুকে চেপে ধরতে পারলে ছটফট কমতো বুঝি!
চোখ বুঝে শ্বাস নেয় তিতির। কঠিন ভাবে উন্মাদ হয়েছে সে মানুষ টার প্রেমে। চন্দ্রা দেওয়ান বলতো। জীবনের কঠিন কঠিন মূহুর্ত তে ভালোবাসার মানুষ টাকে খুব পাশে লাগে। হাজার অশান্তি, চিন্তা এক নিমিষে দূর হয়ে যায় প্রিয় মানুষ টার সান্নিধ্যে। বুকটা শান্ত করতে সত্যিই দরকার হয় তাকে।
এই যে আজকে এতটা মানসিক ধাক্কা গেলো। কতটা ক্ষতি হয়ে যেতে পারতো নূরির। কথাগুলো মাথায় আসতেই শূন্য হচ্ছে মস্তিষ্ক। ভয় লাগছে কেমন একটা। তখনই জড়িয়ে ধরতে মন চাচ্ছে ওই বৈধ মানুষ টাকে। তাকে বুকে জড়িয়ে অথবা তার বুকে মুখ লুকিয়ে শান্ত করতে মন চাচ্ছে নিজেকে। তবে বরাবরের মতো ইতস্ততা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। সে কি করে আগ বাড়িয়ে বলবে। চায় তো সেও। কিন্তু লজ্জা লাগে না বুঝি তার! এতোটাও ভাব হয়ে যায়নি তাদের মধ্যে। যে দু হাত বাড়িয়ে বুকে জড়াবে।একটু তো সময় লাগবেই ইজি হতে। ঈশান যত দ্রুত ইজি হতে পারে সে তা পারেনা।
হাতের কাটা কাটা অংশগুলোতে যত্ন করে ওষুধ লাগাচ্ছে একটা সতেরো-আঠারো বছরের মেয়ে। ইয়াজ স্থির চোখে তাকিয়ে সেদিকে। মেয়েটা ছলছল চোখে ভ্রুর মাঝে ভাজ ফেলে আলতো হাতে সব কাজ করছে। ফু দিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। ইয়াজ ধীর গলায় বললো,
____”জলদি করো।আর বের হও ঘর থেকে।”
মেয়েটা দ্রুত কিভাবে করবে কাজ। এতো এতো রক্ত দেখে থরথরিয়ে কাঁপছে হাত তার। এমন কেনো করলো জিজ্ঞেস ও করতে পারছে না। সে কে জিজ্ঞেস করার! মেয়েটার নাম মিতু।সামান্য কাজের লোক। ইয়াজ এ বাড়িতে রাস্তা থেকে তুলে এনে কাজ দিয়েছে। তার কি কৈফিয়ত সাজে! তবে এবারে খুব সাহস নিয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করেই বসলো,
____”সাহেব?”
____”কি হয়েছে? জলদি করতে বললাম তো। “
____” এমনটা কি করে হলো?”
মহা বিরক্ত হলো ছেলেটা। সামান্য কাজের মেয়ে হয়ে তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে! ধমকে উঠলো,
____”তোমার যা কাজ তার বাইরে এতো বকবক করো কিভাবে! আমার কাছে কৈফিয়ত চাও!সমস্যা টা কোথায়। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে আসবো।”
মিতু আর একটা কথাও বাড়ায় না। চাইলেই বাড়াতে পারে। অনেক কিছু কৈফিয়ত চাইতে পারে। প্রায় প্রতি রাতে মাতাল হয়ে তার ঘরে এসে তাকে গভীর ভাবে ছুয়ে দেওয়ার কারণ জানতে চাইতেই পারে সে। অন্য এক নারীর নাম মুখে আওড়াতে আওড়াতে সারারাত তার শরীরের ওপর উন্মাদের মতো ধ্বংস যজ্ঞ চালানোর কৈফিয়ত সে চাইতে পারে না? সে সামান্য নারী। সেদিন বখাটে গুলোর হাত থেকে নিয়ে নিজের বাড়িতে আশ্রয় না দিকে সেদিন হয়তো চার পাঁচ জন পুরুষ ছিড়ে খেতো তাকে। খুব হতো সে।তবে সেখান থেকে বাঁচিয়ে এনে নিজে মাতাল এর ঘোরে সেই সবটা তো লুটেই নিলো।
নিঃশব্দে হাতের কাজটা শেষ করে বেড়িয়ে যায় মিতু। ইয়াজ চোখ বুজে রকিং চেয়ারে বসা। হাত টা সুন্দর মতো ব্যান্ডেজ করেছে সে। নিজের ঘরে এসে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। প্রথম যেদিন ইয়াজ তার ঘরে এসে ছিলো সেদিন প্রথম ইয়াজ কে নেশা করতে দেখেছিলো সে। তার আগে মাসখানেক হলো রয়েছে। কখনো ইয়াজ তা দিকে চোখও তোলেনি। তবে সেদিন সে আটকাতে পারেনি। পুরুষ মানুষ এর শক্তির সাথে পেরে ওঠা তার সম্ভব হয়নি। নিজের শেষ টুকু সম্বল হারিয়েছে ইয়াজের কাছে। তারপর যেদিনই নেশা করে সেদিনই হয় এই সর্বনাশ। সর্বনাশ হয় কি সেটা? যা হওয়ার তা তো প্রথম দিনই শেষ। মানুষ টার প্রতি কৃতজ্ঞতা ছিলো। যাওয়ার জায়গা ছিলো না তার। অনাথ একটা মেয়েকে যে পুরুষ সম্মান বাচিয়ে বাড়িতে জায়গা দেয়। তার প্রতি নিষিদ্ধ ভালোবাসা চেপে গেছিলো তার। ইয়াজ কে পরে জানাতে গিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারে কিচ্ছু মনে নেই লোকটার। লোভি সেও হয় এবারে। মানুষ টাকে নিজের করে পাওয়ার লোভ হয়। বামন হয়ে চাঁদ ধরতে ইচ্ছে হয় তার। আর বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করেনা সে। কি আছে তার জীবনে! কিচ্ছু নেই। পথের মেয়ে সে। ইয়াজ বের করে দিলে আজ বাদে কাল তার জায়গা হবে যেকোনো বাজে জায়গাতেই। একটা সংসার তার মতো চালচুলোহীন, পথের মেয়ের হয়না।বাম মায়ের পরিচয় ছাড়া মেয়ের সংসার হয়!
ইয়াজের বউ হওয়ার স্বপ্ন সে দেখেনা, আবার দেখেও বোধহয়। শুরু থেকেই দেখতো। তবে বুকের বা পাশ টা ক্ষতবিক্ষত হয় তো তখন যখন প্রতিরাতে াকছে এসে ইয়াজের মুখে অন্য নারীর নাম শোনে। লোকটা সেই মেয়েকে ভেবে তাকে কাছে টানে! নূরি! না কি একটা নাম শুনেছিলো একবার। আর…
মনে করতে চায়না সে সেসব। আজকাল হিংসেও হয় তার। ইয়াজ হয়তো কখনো জানবেও না সে কি করে তার সাথে। সে না জানালে হয়তো টেরও পাবে না।কখনো কি মানুষ টা সজ্ঞানে আসবে! না বোধহয়। রাস্তার মেয়ের সাথে এরকম একটা মানুষ থোরাই রাত কাটাতে আসবে সজ্ঞানে!
ইয়াজ বন্ধ ফোন খোলে। নূরির কল বেশ কয়েকটা। বাঁকা হাসে। মুখে আফসোস এর শব্দ করে সেদিকে তাকিয়ে। নূরি কি করতে পারে একটু একটু ধারনা আছে তার। এত সহজে পাশা উল্টাতে সে দেবে না। তিন বছরের সাজানো দাবার বোর্ডের দান এক ঝটকায় ঈশানের ফেবারে চলে যাবে। সেটা হতে দেওয়া যায়না। ইয়াজ মির্জা সেটা থোরাই হতে দেবে।
বিশ্রি ভঙ্গিতে হাসলো সে।
সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৩
____”দেওয়ান পরিবার কে আমি যন্ত্রণার বিষে নীল করে ফেলবো। না বিষ হজম করতে পারবে। না তো বের করতে পারবে। যন্ত্রণায় কাতরাবে সকলে। এক ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর তিন বছর আগে করা ভুলের মাশুল ওর গোটা পারিবার কে দিতে হবে। ওর বোন, ওর বউ সবার দিতে হবে।হবেইই।”

Matro 1ta besi kore dite paren na jate mon ta santi hoy koto wait kore thaki golpo porer jonno protidin ghum theke uthe aage dekhi golpo upload hoyeche ki na besi kore diben samne amar exam tao golpo porte chole aasi besi deri hole golpo shes hobe na r exam diteo mon bosbe na karon amar erokom aageo hoyeche kono golpo besi valo lagle golpo porer iccha hoyei thake exam time eo nije ke atkate pari na tai please besi besi kore golpo diben
Ajkeo dilen na Amara je pori ek fotao kono dam nei naki amader boller