Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৪

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৪

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৪
লিজা মনি

প্রভাতের প্রথম রশ্মি আকাশের প্রান্তরেখা ভেদ করে পৃথিবীর বুকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বর্ষণ করে। রাতের অন্ধকারের সমস্ত ক্লান্তি ও নৈঃশব্দ্যকে বিদীর্ণ করে উদীয়মান সূর্য যেন নতুন প্রাণশক্তির দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়। প্রকৃতির প্রতিটি কণা আলোকিত হয়ে ওঠে সোনালি আভায়। যেখানে শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তার মতো ঝলমল করে ঘাসের ডগায় দীপ্তি ছড়ায়।

এনি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। পাশে নিক কে দেখতে না পেয়ে কপাল কুচকে ফেলে। রাতে নিক বেলকনি থেকে আর রুমে ফিরে নি। এনি অনেক্ষন সজাগ ছিলো। এরপর ধীরে ধীরে সেও ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়। পাশে বিছানার চাদর ঠিক আগের মতন ওই পড়ে আছে। তাহলে উনি নিশ্চই আর ঘুমাতে আসে নি। পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে তল্লাসি করে , নিক কে খুজে না পেয়ে শান্তির নিশ্বাস ফেলে। যাক সকালের এই পবিত্র সময়ে জালেমটার মুখ দেখতে হলো না। এনি বিছানা থেকে নামার জন্য এক পায়ের সাহায্যে উঠে দাঁড়ায়। পুড়ে যাওয়া স্থানটা আগের তুলনায় অনেকটা শুকিয়েছে। শরীরের ক্ষত গুলো শুকালে ও কালচে দাগ পড়ে যাচ্ছে। এনি ঠোঁট চেপে দেয়ালে হাত রেখে ধীর পেয়ে এগিয়ে যায়। এমন সময় দরজা খুলে চিত্রা মাসি ভেতরে প্রবেশ করে। এনির ঠোঁট সামান্য ফুলে আছে। এইটা সে বার বার অনুভব করছে। আর কেনো ফুলে আছে সেটা তার অজানা নয়। চিত্রাকে দেখে লজ্জায় পড়ে যায়। গলায় ঝুলিয়ে রাখা উড়নাটা দিয়ে মুখ অর্ধেক ঢেকে ফেলে। চিত্রা এনির বাহু চেপে ধরে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলে,

” স.. স্যার বেশি আঘাত করেছে ?
— আমার জন্য এইসব সয়ে গিয়েছে। তাই বেশি কি না জানা নেই।
এনি কিছুক্ষনের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে চিত্রার সাহায্যে বিছানায় এসে বসে। চিত্রা খাবার পরিবেশন করে বলে,
” খাব না মাসি। খাবার গুলো নিয়ে চলে যান।
– খাবার না খেলে দুর্বল হয়ে পড়বে।
– আমি এমনিতেও প্রচুর দুর্বল। এই দেখুন হাটার জন্য ও অন্যের সাহায্য নিতে হয়।
– জেদ করে না মা। তুমি খাবার না খেলে নিক স্যার রেগে যাবে।
এনি তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” উনার ক্ষমতা শুধু আমাকে আঘাত করা পর্যন্ত’ই। কি করবে? বেশি হলে আগুনের জ্বলন্ত আংরা দিয়ে হাটতে বলবে আর নাহলে ভাঙ্গা কাচের টুকরো শরীরের গেঁথে দিবে। যদি বেশি হয় তাহলে বিকৃতভাবে খুন করে ফেলবে। আর কি করবে মাসি? আর তো কিছু করতে পারবে না।
– মরার ভয় নেই তোমার মধ্যে মা?
এনি মুচকি হাসে। এরপর নিশ্বাস ছেড়ে বলে,

” পিতলকে পেটাতে পেটাতে একসময় সেটা পাত্রে পরিনত হয়। যেভাবে চাইবে সেই আকার ধারন করবে। আর আমি তো সাধারন মানুষ মাত্র। আমাকে তো দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ভাবে পেটানো হচ্ছে। আমিও ভয়হীন আকার ধারন করেছি। এই দেখুন একদম ভয় নেই। যে নিক জেভরানকে দেখে সবাই ভয় পায় আমি তার চোখে চোখে রেখে কথা বলি। মৃত্যু কামনা করি, জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলি অথচ আমাকে জানে মেরে ফেলছে না। শুনেছি উনার সামনে কেউ আঙ্গুল উচু করে কথা বললে ও তিনি তার আঙ্গুলটা কেটে ফেলেন। আমি ও চাচ্ছি আমাকে কেটে ফেলুক। কিন্তু আমাকে কোনোভাবে মারছে’ ই না। কিন্তু কেনো মারছে না, কে জানে?
চিত্রা এনিকে দেখছে। অন্যদিনের থেকে আজ প্রচুর অস্বাভাবিক লাগছে। আর কথা বলার ধরনটাও অন্যরকম। মনে হচ্ছে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কথা গুলো বলছে? কোনোভাবে মসিষ্কে আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে না তো? চিত্রা আৎকে উঠে। এনি মুচকি মুচকি হাসছে আর অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে।
চিত্রা কাঁপা হাতে এনির উড়ুর উপর স্পর্শ করে বলে,

– ত.. তুমি ঠিক আছো?
এনি চোখের পাতা ঝাপটে চিত্রার দিকে তাকায়। চিত্রা এই সরল অশ্রুশিক্ত মুখে যতবার তাকায় ততবার অন্য জগতে চলে যায়। প্রথম প্রথম সৌন্দর্যে ঘোর লেগে গেলে ও এখন নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে।
এনি চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে বলে,
” একদম ঠিক আছি আমি। তবে খাবার গুলো নিয়ে যান সামনে থেকে। হয় অনাহারে মরব আর নাহলে এখান থেকে মুক্তি কামনা করব। এই বদ্ধ রুম থেকে মুক্তি চাই আমি মাসি। দুনিয়া না দেখে, আপনজন না দেখে, আলো – বাতাস গায়ে না লাগিয়ে একটা মানুষ কিভাবে বাঁচবে বলুন? এর চেয়ে ভালো অনাহারে তিলে তিলে মরব। আমার সৌন্দর্য ও নষ্ট হবে সাথে নিক জেভরানের কামনা ও।
চিত্রা আর ও অনেক বার জোর করে। কিন্তু এনির কথায় থেমে যায়,
” আমি আপনাকে মাতৃত্বের স্থান দিয়েছি মাসি। আশা করি আমার পরিস্থিতি বুঝবেন? আমাকে জোর করবেন না প্লিজ।

– কিন্তু মা তোমার শরীর এমনিতেও অনেক দুর্বল। খাবার না খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।
এনি চিত্রার দিকে তাকায়। এরপর উনার বুকে মাথা রেখে বলে,
” এখানে সবাই তো নিক জেভরানের পোষা কুকুর। সবাই উনার কথায় উঠবস করে। তাহলে আপনার মনে আমার প্রতি এত মায়া কেনো বলোন তো? সামান্য রক্ষিতার জন্য এত ভালোবাসা শোভা পায় না কিন্তু।
– ভালোবাসা কি আর জাত ধর্ম বিচার করে হয় মা। আমি তো হিন্দু ধর্মের।তার উপর সামান্য কাজের লোক মাত্র। তুমিও তো আমাকে মায়ের সম্মান দিয়েছো। তাছাড়া তুমি নিজেকে কি মনে করো জানি না। বাট বাস্তবে তো তুমি এই সম্রাজ্যের মালকীন।নিক স্যারের স্ত্রী তুমি। ধর্মীয় শরিয়তে বিয়ে হয়েছে তোমাদের।
এনি ঘৃনায় নাক – মুখ কুচকে ফেলে। মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। নিকের স্ত্রী শুনলেই শরীরে জ্বালা দিয়ে উঠে। এই সম্রাজ্যের মালকীন মানে কি বুঝাতে চাইছে? এই পাপ রাজ্যের অর্ধেক অংশিধার আমি! এমন পরিস্থিতি গ্রহন করার আগে মৃত্যু কামনা করছি। প্রয়োজন কুটিরে বাস করব তবুও এমন নরক সমতুল্য স্থানটাকে কোনোদিন নিজের রাজ প্রাসাদ মনে করব না।
এনি চিত্রার বুক থেকে মাথা তুলে হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে। আর চিত্রাকে আদেশ করে বলে,

” বার বার স্ত্রী সম্মোধন করে কি বুঝাতে চাচ্ছেন? আমি ওই জানোয়ারটার বউ? ভুল ভাবছেন। না, নিয়তি এইটাকে মানছে আর না আমি নিজে। তাই ওইদিন রাতে যাস্ট একটা এক্সিডেন্ট ঘটেছে। এই বিয়ের কোনো প্রমান নেই, কোনো কাগজ নেই। অস্বীকার করছি বিয়েটাকে। মেয়েদের তালাক দেওয়ার নিয়ম থাকলে আমি সেদিন রাতেই তালাক দিয়ে দিতাম। আমার গোপন ভিডিও ক্যামারা বন্ধী করে এরপর ব্লেক মেইল করে বিয়ে করতে বাধ্য করেছে। আল্লাহ আছে তো, সব কিছুর বিচার হবে একদিন। পৃথিবীর বুকে প্রতিটা জালেমের ধ্বংস হয়েছে। সেভাবে নিক জেভরানের ও ধ্বংস হবে। আর সেদিন আমার থেকে বেশি খুশি কেউ হবে না।
চিত্রা অবাক হয় প্রচুর এনির কথা শুনে। গোপন ভিডিওর কথা সে জানত না।
– গ.. গোপন ভিডিও মানে?
এনি নিশ্বাস টেনে বলে,

” আমার শাওয়ার নেওয়া ভিডিও। বলেছে যদি এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করি বা কবুল বলতে রাজি না হয় তাহলে উনার কাছে থাকা ভিডিওটা পুরো দেশে ছড়িয়ে দিবে। বুঝতে পারছেন ঠিক কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমি।
চিত্রা প্রচুর অবাক হয়ে আছে। তবে নিজের অবাকতা বেশিক্ষন ধরে রাখতে পারে নি। দরজার ফাক দিয়ে ভেসে আসছে কারোর পায়ের আওয়াজ। আওয়াজটা ধীরে ধীরে প্রখঢ় হতে থাকে। চিত্রা কিছুক্ষনের জন্য চুপসে যায়। ভাবনার মধ্যেই গ্যাংস্টার বসের আগমন ঘটে। চিত্রাকে খাবার নিয়ে বসে থাকতে দেখে কপাল কুচকে যায়।
প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে ভ্রুঁ ভাঁজ করে এগিয়ে এসে গম্ভীর হয়ে বলে,
” খাবার নিয়ে বসে আছেন কেনো?
চিত্রা ভীত নিয়নে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো। হয়ত এনিকে রক্ষা করার জন্য’ই কোনো এক বাক্য। কিন্তু তার আগেই এনি তেজ নিয়ে বলে,
‘ কারন আমি খাই নি। আর আপনার এইসব কুখাদ্য খাব ও না।
নিকের মুখের ভাবভঙ্গি আরও বদলে যায়। রাগের আভাস ছড়িয়ে পুরো ফর্সা গম্ভীর মুখের মধ্যে। নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে,

” খাবে না কেনো?
– খেতে চাই না।
– ভেবে বলছো?
এনি কিছু বলে না। বড় বড় নিশ্বাস টানছে ঘন ঘন। নিক চিত্রাকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
” সারাদিন ও যাতে এই রুমে কোনো খাবার না আসে। যদি খাবার আসে আর আমার অবাধ্য হন তাহলে ঠিক কি অবস্থা হবে ধারনার ও বাহিরে। যদি এই মেয়ে নিজ সেচ্ছায় খাবার চাই তাহলেই খাবার দেওয়া হবে নচেৎ না। বের হন এখন আপনি রুম থেকে।
নিকের কর্কশ কন্ঠে চিত্রা কেঁপে উঠে। নিকের আদেশ পেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নিক চলে আসলে সেখানে পুনরায় শব্দ উচ্চারন করার মত ক্ষমতা মেনশনে উপস্থিত কারোর নেই। তাই চিত্রার যেতে ইচ্ছে না হলেও এক আদেশে বের হয়ে যেতে হয়েছে।
চিত্রা চলে যেতেই নিক কাবার্ড থেকে ফাইল বের করে। এরপর সেটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু কিছু একটা ভেবে হঠাৎ থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য পাশে তাকিয়ে থাকা এনির দিকে তাকায়।
এরপর ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,

” ক্ষুধার্ত থেকে যখন মাটি চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করবে তখন নিজেই চলে এসো খাবারের সন্ধানে বেবিগার্ল।
তবে ঠোঁটের উপরে দৃশ্যমান লাভ বাইট গুলো সুন্দর লাগছে।
এনি নাকের পাটা ফুলিয়ে নিকের দিকে তাকায়। এরপর রাগে দাঁত কটমট করে বলে,
” কুকুরের মত কামড়ালেই লাভ বাইট হয়ে যায় না। ক্ষমতা দিয়ে ঠোঁটে হামলে পড়েছিলেন।
নিক বাঁকা হেসে বলে,
” পুরো শরীরে কামড়ালে লাভ বাইট হত বেবিগার্ল? সমস্যা নেই এখন ঠোঁটে ক্ষমতা দেখিয়েছি অন্য কোনো সময় পুরো শরীরে দেখাব।
এনি ঠোঁট চেপে কান্না আটকিয়ে রাখে। কি বিশ্রি কথা ছিহহহ!
– কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক হয়ে যায় নিক জেভরান। আশা করব আমার শরীরে জলাতঙ্ক রোগ ছড়িয়ে দিবেন না।
নিক গভীর চোখে তাকায় এনির দিকে। কি আছে এই চোখে? এই তাকানোতে? শুধুই কি হিংস্রতা আর অবহেলা! এই রক্তিম চোখগুলো কি শুধুই ধ্বংস করতে জানে?

নিক কন্ঠের খাদ নামিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
” কবে থেকে মানুষ মনে করা শুরু করেছো বেবিগার্ল। কুকুর ভেবে থাকলে জলাতঙ্ক তো ছড়াবো”ই। আর যদি সেই সুবাধে একটা বাচ্চা চলে আসে তা….
নিক আর বলতে পারে নি। এনি চেঁচিয়ে উঠে ” না ” শব্দ উচ্চারন করে। আৎকার উঠে ওর ভিতরটা। বাচ্চা? তাও গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের বাচ্চা। এমন পরিস্থিতি সে কল্পনা ও করতে পারে না। এনির ছন্নছাড়া রুপ দেখে নিক পৈশাচিক হাসি দিয়ে কাগজটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। এনি চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন নিশ্বাস টানে। তার শরীর ঘেমে উঠে।

সমুদ্রীরে তীরে জঙ্গলের পাশে অবস্থিত গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের ব্লেক গ্লাস মিনার। চিকন আকৃতির কাউচে ঘেরা মিনারটি রাতের পূর্নিমায় চিকচিক করছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এইটা এক সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু ভিতরে হয়ে থাকে হাজারও অবৈধ কাজ। অস্ত্র, মাদকদ্রব্য, অবৈধ মাল থেকে শুরু করে সব কিছুর হিসেব আর স্থান হচ্ছে এই ব্লেক গ্লাস মিনার। এই মিনারের নিচে এক সুরঙ্গ পথের মত বিশাল গর্ত আছে। সেই গর্তে আছে তার থেকে ও ভয়াভহ গা ছমছমে পরিস্থিতি।
রাতের নিস্তব্দতাকে ভেদ করে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান লোহার দরজাটা খুলে সেই গর্তে প্রবেশ করে। সাথে আছে আরিশ আর অধিরাজ। তিন জনের মুখে’ই গম্ভীরতা আর পৈশাচিক ভাব। তারা প্রবেশ করতেই কুচকুচকে কালো দুইজন বিশাল দেহী ব্যক্তি ভেতরকার দরজা খুলে দেয়। দরজার সামনে ঝলঝল করছে,
” পাচার কক্ষ”

পাচারকেন্দ্রের দেয়ালগুলো যেন এক ভয়াল ইতিহাসের সাক্ষী। প্রতিটি ইটের ভেতর লুকিয়ে আছে কান্না, হাহাকার আর রক্তাক্ত স্মৃতি। স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতায় ভিজে থাকা ধূসর দেয়ালগুলোতে লেগে আছে অনাদিকালের ছোপধরা দাগ। দাগগুলো হয়তো মেয়েদের আঁচড়ে রাখা ক্ষতের মতোই অমোচনীয়। কোথাও ফাটল, কোথাও শ্যাওলার আস্তরণ, কোথাও বা কালচে লাল দাগ। এখানে অদৃশ্য আর্তনাদের অক্ষরখচিত দলিল। লোহার গরাদযুক্ত জানালা থেকে প্রবেশ করা ক্ষীণ আলো কেবলই মৃত্যুর আভাসকে ঘনীভূত করে। এখানে সূর্যকিরণও যেন কবরের মতো শীতল।বাতাসে মিশে থাকে স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সাথে শুকনো রক্তের তীব্র দুর্গন্ধ, যা শ্বাস-প্রশ্বাসকে রূপ দেয় শ্বাসরুদ্ধ মৃত্যুচুম্বনে।

এমন গা-ছমছমে পরিবেশেই প্রবেশ গ্যাংস্টার বস তার পদধ্বনি বজ্রের কাঁপন তৈরি করে। দেয়ালের ফাটল দিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে মৃত্যুর ঘন্টা বাজায়। ছায়ার মতো লম্বা দেহ তার। শীতল দৃষ্টির শূন্যতা আর তার ভেতরের হিংস্রতা পুরো কক্ষটিকে কাঁপিয়ে তোলে। দরজা খোলার শব্দে লোহার কপাট চিঁ চিঁ করে ওঠে। আর এই মুহূর্তেই সমস্ত আর্তনাদ স্তব্ধ হয়ে যায়। সবার ঘন ঘন ভিতু নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি গুঞ্জরিত হতে থাকে।
দেয়ালগুলো পর্যন্ত কেঁপে ওঠে গ্যাংস্টার বসের আগমনে। লোহার শিকলগুলো নড়েচড়ে ওঠে। আলো হঠাৎ আরও নিস্তেজ হয়ে যায়। বন্দী মেয়েদের স্থির দৃষ্টি আতঙ্কে জমাট বাঁধে উঠে । কেউ কাঁপতে কাঁপতে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেউ ঠোঁট চেপে রুদ্ধ কান্না আটকিয়ে রাখে। কিন্তু আজ কোনো নড়া- চড়া নেই। সবাই নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। গ্যাংস্টার বস প্রতিবারের মত বিনা বাক্যে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে অবস্থিত প্রতিটা মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে স্তব্দ হয়ে পড়ে আছে। সে প্রতি বছরে এক বার এই পাচার কেন্দ্রে পা রাখে। আর তখন সব মেয়েরা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে মেঝেতে। পাচার কেন্দ্রের কোনো মেয়ে তাকে সজ্ঞানে দেখে নি।
নিক সেদিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দেয়। আরিশ কালো দেহরক্ষীদের দিকে তাকিয়ে কপাল কুচকে বলে,
” ড্রাগস কখন দেওয়া হয়েছিলো?

— স্যার আপনি যখন সংবাদ পাঠিয়েছিলেন ঠিক তখন।
– গুড। তাহলে আর টেনশন নেই। জ্ঞান ফিরবে না এখন এত সহজে। যত দ্রুত সম্ভব জেটের কাছে নিয়ে যাও।
নিক সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে ভিন্ন দেশী কয়েকটা শব্দ ব্যবহার করে। এরপর আরিশের কাছে একটা কাগজের মত ফাইল দিয়ে বলে,
” সব কিছুর হিসেব এখানে। সাথে বত্রিশ কোটি টাকার হিসেব ও।
আরিশ গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ায়। নিক বিনা বাক্যে বদ্ধ রুমটা থেকে বেরিয়ে যায়। সাথে আরিশ ও চলে যায় সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে। অধিরাজ সব মেয়েদের গননা করে। দেহরক্ষীরা প্রতিটা মেয়েকে বাহিরে বের করতে থাকে।প্রাইভেট জেটের কেবিনে পা রাখে তারা । আকাশপথে চলমান ধবধবে সাদা বিমানের বাইরের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাহাকারের ভয়াল মহাফেজখানা। ঝলমলে নীল আলোয় ভেসে ওঠা বিলাসী আসনগুলোতে বসানো হয় নিস্তেজ আর জ্ঞানহীন কয়েকটি মেয়েকে। সবার চোখ বন্ধ। ঠোঁট নিস্তরঙ্গ হয়ে আছে। শরীর কেবলমাত্র বাতাসে ঝুলে থাকা শূন্যতার মতো ভারহীন। তাদের প্রতিটি দেহ মনে হচ্ছে নিছক বস্তু। এক একটি নিস্প্রাণ পুতুল। যাদের টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসছে গ্যাংয়ের হিংস্র হাত।

গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান দাঁড়িয়ে আছে মিনারের এক প্রান্তে। ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি লেগে আছে। ফোনের মাধ্যমে প্রতিটি আদেশ সে ছুড়ে দেয় বজ্রপাতের মতো আর তার গ্যাংরা তা পালন করে পশুত্বের উল্লাসে।
প্রতিটা মেয়েকে বিনা আচরে, বিনা আঘাতে জেটে তুলা হয়। একটা আচর ও যাতে না লাগে সেটা গ্যাংস্টার বস নিক জেভ রানের আদেশ। আর সেই আদেশ পালন করতে ব্লেক ভাইপার গ্যাং এর প্রতিটা সদস্য বাধ্য। জেটের মধ্যে আরিশ ও উপস্থিত। জেট ছেড়ে দেওয়া হয় স্পেনের উদ্দেশ্যে। হঠাৎ একটা মেয়ে নড়ে উঠে।
একজন দেহরক্ষী আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” স্যার একজন মেয়ে আঙ্গুল নাড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষনের মধ্যে উঠে যাবে।
আরিশ রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
– ভালোভাবে ড্রাগস দিস নি?
দেহরক্ষী মাথা নিচু করে অপরাধী সুরে বলে,

” দিয়েছিলাম বস। ভেবেছিলাম এরোপ্লেইনে দিয়ে নিয়ে যাবেন । তাই পরিমানে সবাইকে বেশি বেশি করে দিয়েছি। এইটা লাস্ট মেয়েটা ছিলো। হয়ত তাকে পরিমানে কম দিয়ে দিয়েছিলাম।
– এরোপ্লেইনের লোকজন কি তর আম্মা লাগে মাদা**** বাচ্চা !মাফিয়া সম্রাজ্যের দেহরক্ষী হয়ে কোন জ্ঞানে বললি যে পাচার করার জন্য মেয়েদের এইসবে করে নিয়ে যাব? এই তদের ট্রেনিং দেওয়া হয়?
– সরি বস। মাথায় ছিলো না।
” পুনরায় ড্রাগস পুশ করে দে।

রাত নামলে পৃথিবী এক অচেনা আবরণে ঢেকে যায়। চারদিকের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে নেমে আসে গভীর নিস্তব্ধতা। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকে অগণিত তারা। মাঝে মাঝে ম্লান চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে নিস্তব্ধ ভূমির উপর। বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক ধরনের শীতলতা। এই শীতলতা মনকে একইসাথে শান্ত আর রহস্যময় করে তোলে।
রাত দুইটার কাছা- কাছি। এনি এক পাশ থেকে বার বার অন্য পাশে যাচ্ছে। ক্ষুধার্ত থাকার কারনে কিছুতেই ঘুম আসছে না। ঠোঁটের ফোলাটা একটু কমেছে। সাথে ব্যাথাটাও উপশম হয়েছে। পুরো দিনে পেটে সামান্য পানি ও পড়ে নি। ফলে প্রচুর পেট ব্যাথা শুরু হয়ে গিয়েছে। পেটে কোনো দানা না থাকার কারনে মাথা ঘুরছে, বমি বমি পাচ্ছে। উদ্ভুত এক দুর্বলতা কাজ করছে। আর সহ্য করতে পারছে না। এখন ওই খাবার না পেলে অধৈর্য হয়ে পড়বে।

পায়ের ব্যাথাটা আগের থেকে কম। চামড়ার মধ্যে শুকিয়ে যাওয়ার জন্য টান পড়েছে। তাই আগের তুলনায় হালকা একটু পা রাখতে পারে। সকালে পা অবশ হয়ে থাকে ফলে তখন পা রাখাটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু পুরো দিনের নড়াচড়া, হাটাহাটি এইসবের কারনে শেষ সময়ে পা মেঝেতে রাখলে, খুব একটা ব্যাথা অনুভব হয় না। ব্যাথা হয় তবে সেটা সহ্য করার মত। এনি চুপিচুপি দরকার ফাকে ইদুররের মত আগে মাথাটা বের করে দেখে নেয় কেউ আছে কি না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কেউ নেই। কিন্তু সব সময় তো তাকে পাহারা দেওয়ার জন্য কালো জাম্বুবান দাঁড়িয়ে থাকে। আজ তাহলে কেউ নেই কেনো? সামান্য সন্দেহে এনি কপাল কুচকে ফেলে। কিন্তু পেটে ব্যাথা অনুভব হতেই সেসব মাথা থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর পা টিপে রুম থেকে বের হয়। কতদিন পর এই বন্ধ রুমটা থেকে সে বের হয়েছে। হোক সেটা রাতের নিস্তব্দতায়, তাতে কি যায় আসে। বের তো হয়েছে। এনি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। প্রতিটা পদক্ষেপে মনের ভেতর খাবারের সন্ধান করছে। পুরো বাড়ি অন্ধকার হয়ে আছে। বুকের ভিতরে ভয়ে দ্রিম দ্রিম শব্দ করছে। মস্তিষ্ক বার বার প্রশ্ন করছে,

” জানোয়ারটা কি আজ বাড়িতে আসে নি? হ্যা, আসে নি মেবি। আসলে তো তাকে ক্ষত – বিক্ষত করার জন্য রুমে থাকত। আর দানবের মত শরীরটা আমার উপর ফেলে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাত। আফ্রিকার জেব্রা!
এনি বক বক করতে করতে মৃদু আলোতে লিভিং রুমে চলে আসে। দুই একবার নিচে আসার সুবাধে একবার দেখেছিলো কিচেন রুম। সেই দেখাটাকেই কেন্দ্র করে নিশ্চুপে, শব্দহীনভাবে কিচেন রুমের দিকে অগ্রসর হয়। কিচেন রুমে এসে খাবারের গন্ধ নাকে আসতেই নিশ্বাস নেই।
কোনো ভয় ছাড়ায় হালকা আওয়াজে ফ্রিজ খুলে। ফ্রিজে বাহারি রকমের খাবার দেখে হালকা – পাতলা কিছু খাবার নিয়ে নেয়। ভাত নিতে গেলে এখন আবার গরম করতে হবে। সেজন্য মিষ্টান্ন হিসেবে ফালুদা, এক কাপ ডালিমের জুস, আর ও কিছু হালকা খাবার নেয়। খাবার গুলো দুই হাতে করে নিয়ে আসবে এমন সময় চোখ আটকে যায় একটা পাত্রের দিকে। পাত্রটা থেকে অনেক সুস্বাদু একটা ঘ্রাণ নাকে এসে বার বার আঘাত করছে। এনির পেট মুচর দিয়ে উঠে ক্ষুধার জ্বালায়। কোনো কিছু না ভেবে ঢাকনাটা খুলে। সাথে সাথে বিরিয়ানির গন্ধে নাক টেনে তৃপ্তির নিশ্বাস নেয়। বিরিয়ানির উপরে চিলি চিকেন রাখা। এনি ডালিমের জুসটা এক নিশ্বাসে খেয়ে রেখে দেয়। এরপর বিরিয়ানির বাটিটা হাতে নিয়ে চামচ দিয়ে মুখে দেয়। সারাদিন পর পেটে দানা – পানি না পড়ায় পেট ব্যাথা করে উঠে। এনি পেটে হাত দিয়ে কাচের পাত্রটা রেখে দেয়। এরপর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দেয়ালে হাত রেখে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে।

হঠাৎ করে পুরো বাড়ি আলোকিত হয়ে উঠে। অন্ধকারে ঢেকে থাকা কিচেন রুমটা উজ্জল আলোতে জ্বলজ্বল করে উঠে। এনি চমকে উঠে। মানুষের আগমন খুজার জন্য সামনে দৃষ্টি রাখে। মুহূর্তে দৃষ্টি আটকে যায় ডিভানে বসে থাকা বিশাল দেহী ব্যক্তিটার উপর। লোকটার ঠোঁটে বাঁকা হাসি। এনি তার দিকে ঘাবড়ে যাওয়া দৃষ্টিতে তাকালে নিক ঠোঁট কামড়ে বলে,
” হাই বেবিগার্ল!
এনি প্রথমে অবাক হলেও এখন লজ্জায় মাথা হাঁশ- ফাঁশ করতে থাকে। ছোট থেকেই সে ক্ষিদে সহ্য করতে পারে না।খাবারের পরিমান অল্প বাট কোনোভাবেই অভুক্ত থাকতে পারে না সে। তবুও আজ অনেক কষ্টে পুরোটা দিন থেকেছে। এখন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। এতক্ষন অভুক্ত থাকা যায় নাকি আজব। তাই তো ইগো, লজ্জা ভুলে এখানে এসেছে। কিন্তু এইভাবে নিকের সম্মুখে আসবে কল্পনা ও করে নি। ওতো ভেবেছিলো আজ নিক আসে নি। তাই সাহস করে আর ও এগিয়েছে। কিন্তু সাইকোটা তাহলে এখানেই ছিলো। আর এতক্ষন বসে বসে তামাসা দেখেছে! এনি লজ্জায় চোখ- মুখ খিঁচে ফেলে। নিক ডিভান থেকে উঠে বাঁকা হেসে এনির দিকে তাকিয়ে বলে,
” বলেছিলাম মাটি চিবিয়ে খাওয়ার মত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লে খাবারের সন্ধানে নিজেই চলে এসো। কিন্তু তুমি তো অনেক ফার্স্ট।
নিকের অপমান সূচক কথায় এনির সর্বাঙ্গে কাঁপিয়ে তুলে। চোখে পানি টলমল করছে। এনি আর দাড়ায় না। পেট চেপে ধরে বিনা শব্দে কিচেন রুম থেকে রুমের দিকে অগ্রসর হয়।

— খাবারটা খেয়ে যাও ববিগার্ল।
এনি থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে জেদি সুরে বলে,
” নিজের খাবার নিজে গলা ভর্তি করে খান। প্রয়োজন নেই আপনার খাবারের।
এনি আরেকটা সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে তার আগেই নিকের শক্ত হাতের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এনি ছটফট করে উঠে নিকের বাহুডরে। ছাড়া পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। নিক ডিভানে বসিয়ে দিয়ে বলে,
” বসে থাকো এখানে চুপচাপ। রুমে যেতে বাধ্য করো না। রুমে গেলে খারাপ কিছু হয়ে যাবে।
এনি চুপসে যায়। শান্ত হয়ে পড়ে তার অস্থির দেহখানা। নিক এনিকে ছেড়ে কিচেন রুমের দিকে অগ্রসর হয়। কিচেন রুমে পা রেখে বলে,
” এই প্রথম কিচেনে পা রাখলাম। তাও আবার একটা..
— একটা রক্ষিতার জন্য। অপমান বোধ হচ্ছে তাই না নিক জেভরান?
এনির কথাটা কর্নে প্রবেশ করতেই নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে রাগটাকে সংযত করে। কিন্তু এই কাজে সে বরাবর ব্যার্থ। কোনো কিছু না ভেবে দেয়ালে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করে। আঘাত করার বিকট শব্দে এনি কেঁপে উঠে। নিকের হাত সামান্য থেঁতলে যায়। কিছুক্ষন গম্ভীর হয়ে থেকে বিরিয়ানির কাচের পাত্রটা এক হাতে তুলে নেয়। আর অন্যহাতে নেয় ফালুদার পাত্র। এইসব খাবারের দিকে তাকিয়ে নিকের কপাল কুচকে আসে। নিক ডিভানের কাছে এসে টেবিলের উপর পাত্রগুলো রেখে দেয়। এরপর আদেশ সুরে বলে,

” দ্রত শেষ করো বেবিগার্ল।
— খাব না আমি।
– কি বলেছি আমি শুনতে পাও নি। রুমে যেতে বাধ্য করো না। অনেক খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে।
এনি থমথমে মুখে সন্দেহ দৃষ্টি নিয়ে বলে,
” তখন খাবার গুলোর দিকে এইভাবে নাক ছিটকিয়েছেন কেনো? কি আছে এর মধ্যে?
নিক বিরক্ত হয়ে তাকায় এনির দিকে। দাঁত দাঁত চেপে বলে,
” এত প্রশ্ন কেনো করছো?
— উত্তর দেওয়াটা আপনার দায়িত্ব।
— ভাবলে কিভাবে আমি এইসবের উত্তর দিব?
— তার মানে আপনি এখানে কিছু মিশিয়েছেন? নিশ্চই ড্রাকস অথবা বিষ!
নিক এইবার নিজের ধৈর্য হারায়। চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠে,
” আমি অয়েলী আর ঝাল খাবার খেতে পারি না । তাই উল্টা- পাল্টা ভাবলে জানে মেরে ফেলব।
এনি নিকের রেগে লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকায়। খুব করে বুঝতে পারছে বহু কষ্টে রাগ সংযত করছে। এনি কিছুক্ষন চুপ থেকে মুচকি হেসে উঠে। সামান্য গলা কেঁশে নিকের দিকে ঝুঁকে নীল চোখের গভীরতা নিকের দৃষ্টিতে রাখে। এনিকে এইভাবে ঝুঁকে পড়তে দেখে নিকের কপালে ভাঁজ পড়ে। এনি নিকের গোলাপি ঠোঁটে নিজের আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে বলে,

” একটু খাবার শেয়ার করে খেলে কি এমন ক্ষতি নিক জেভরান। একটু শেয়ার করেন খাবেন প্লিজ। অনেক দিন ধরে একা একা খাচ্ছি। খেতে একটুও ভালো লাগছে না। আপনি তো আমার স্বামী! স্ত্রীর সাথে সামান্য শেয়ার করে খেলে কি এমন হবে?
নিক ডিভানের অংশ শক্ত করে চেপে ধরে। কপাল দিয়ে চিকন ঘাম পড়ছে। এনির চোখের গভীরতায় সে হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এনি বাঁকা হেসে নিকের মুখে এক চামচ বিরিয়ানি ডুকিয়ে দেয়। নিক আচমকা গিলে ফেলে পুরোটা বিরিয়ানি। বিরিয়ানির উপরে রাখা শিদ্ধ মরিচটাকে ভেঙ্গে হালকা ভাবে ঠোঁটের চারদিকে লাগিয়ে দেয়। নিক নিজের সজ্ঞানে ফিরলে ধাক্কা মেরে এনিকে সরিয়ে দেয় । এনি পড়ে যেতে নিলেও নিজেকে সামলে নেয়। নিকের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে উঠে। নিক রক্তচক্ষু ন্যায় এনির দিকে তাকিয়ে আছে। ঝালে ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের উপর মরিচ লাগানোর ফলে গোলাপি ঠোঁটটা কেমন লালচে আকার ধারন করেছে। নিক হাত মুষ্টি করে ফেলে। হাতটা নিশ- পিশ করছে যাস্ট একটা থাপ্পর দেওয়ার জন্য।
এনি নিজের হাসি থামিয়ে নিকের উদ্দেশ্যে বলে,

” একটা মরিচ লাগিয়েছি তাতেই এই অবস্থা মি, জেভরান। ঝাল খেতে পারেন না সেটা আগের থেকেই জানি আমি। কিন্তু এমন বিধ্বস্ত হয়ে পড়বেন সেটা জানা ছিলো না। গ্যাংস্টার বসের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখলে জনগন কি আমাকে বকা দিবে নাকি ওরা খুশি হবে? হয়ত কেউ বকবে আবার হয়ত কেউ খুশিতে আত্নহারা হয়ে উঠবে। তবে যারা খুশি হবে আমি তাদের দলে আছি।
এনি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলে,

” তবে একটা ভুল শব্দ উচ্চারন করেছি। সেটা হলো আমাকে আপনার স্ত্রী সম্মোধন করে। কে জানত এইটা বললে আপনি বিরিয়ানিও গিলে ফেলবেন। তবে যায় হোক মানসিক প্রশান্তি পেয়েছি আপনাকে অপদস্থ করতে।
এনি টলতে টলতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। মাত্র আর একটা সিঁড়ি বাকি ছিলো। কিন্তু তার আগেই পুনরায় একইভাবে নিকের বাহুতে আবদ্ধ হয়ে যায়। নিক শূন্যে ভাসিয়ে নেয় এনির ছোটো- খাটো দেহটাকে। এনির মুখের রিয়্যাকশন বুঝা গেলো না। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নিক এনির ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দেয়। এনি ঘৃনায় ছটফটিয়ে উঠে। কিন্তু নড়ার শক্তি নেই। এনির ছোট দেহটা নিকের বিশাল দেহ আবদ্ধ করে ফেলে। নিক উন্মাদের মত চুম্বনে লিপ্ত হয়। এনির পুরো মুখ ঝালে জ্বলসে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে পারছে না। ছাড়া পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। নিক চুমু খাচ্ছে আর একটা একটা করে সিঁড়ি পার হচ্ছে। শ্বাস নেওয়ার জন্য এক মুহূর্তের জন্য ছাড় দিয়ে পুনরায় আবার ও উন্মাদের মত আকড়ে ধরে। প্রায় বিশ মিনিট অন্তর অন্তর এইভাবে ছেড়ে ছেড়ে এনির ঠোঁটগুলো শুষে নিতে থাকে। এরপর ডিভানের কাছে এসে এক প্রাকার ছিটকে ফেলে দেয়। এনি ডিভানের সাথে সামান্য ধাক্কা খেয়ে সামান্য ব্যাথা অনুভব করলেও এখন মিষ্টি জিনিসের খুব প্রয়োজন। ঝালে ওর পুরো মুখ জ্বলে যাচ্ছে। দবদবে ফর্সা মুখটা রক্তিম হয়ে উঠেছে। ঠোঁটে কাটাস্থান গুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এনি সামনে থাকা ফালুদার বাটিটা হাতে নিয়ে এক নিশ্বাসে সামান্য মুখে ঢেলে নেয়। চামচ ব্যবহার করার ও প্রয়োজন মনে করে নি। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অনবরত। হাঁপিয়ে উঠেছে সে। বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে ঘন ঘন।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৩

— আমাকে জালাতে এসো না বেবিগার্ল। নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কারন আমি নিজেই জ্বলন্ত আগুন। আগুনকে নতুন করে আবার কি জ্বালাবে।
এনি নেতিয়ে পড়া মুখটা নিয়ে তাকায় নিকের দিকে।নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে। এনি সেদিকে তাকিয়ে বলে,
” খুব খারাপ আপনি। খুব খারাপ।
— তোমার ভাবনার থেকেও বেশি।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৫