বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১
ইসরাত জাহান দ্যুতি
থামেল‚ কাঠমান্ডু | পহেলা মার্চ | রাত ১১: ২০
সরু পাহাড়ি রাস্তাটা বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। রাস্তাতে সারি সারি ট্যাক্সি‚ প্রাইভেট কার‚ ছোটো ছোটো ভ্যান আর মাঝে মাঝে মোটরবাইক হর্ন বাজাতে বাজাতে এগিয়ে চলেছে গন্তব্যে। রিকশাও আছে। তবে সংখ্যা কম। প্রধানত ছোটো গলিপথে চলছে তা। রাস্তাটা পুরোপুরি সোজা নয়। কোথাও খানিকটা উঁচু-নিচু‚ কোথাও আবার মোচড় খেয়ে গেছে। গাড়িগুলো একে অপরের গা ঘেঁষে চলছে। ভিড় এত ঘন যে একবার থেমে গেলে আবার চালু হতে কষ্ট হয়।
চারদিকে দোকানের সাইনবোর্ডে ঝলমলে রঙিন আলো। চোখে পড়ে ইংরেজি ও নেপালি অক্ষরে লেখা বিজ্ঞাপন‚ ট্রাভেল এজেন্সি‚ সুভেনির শপ‚ রেস্তোরাঁ আর হোটেলের নাম। দু’পাশের ফুটপাত একেবারেই সরু। ঠেলাঠেলি আর গা ঘেঁষে চলাচল করতে হচ্ছে সবাইকে। পথচারীরা কিছু আবার পর্যটকও। ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে‚ কিংবা ক্যামেরা হাতে ধীরে ধীরে গাড়ির ফাঁক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। স্থানীয় নারীদের দেখা যাচ্ছে সালোয়ার কামিজ বা কুর্তা-পায়জামা‚ পাশমিনার সঙ্গে চূড়িদার পোশাকে।
রাস্তার দুই পাশে লণ্ঠনের আলোতে ঝলমল করছে ছোটো হোটেল‚ ক্যাফে আর হ্যান্ডিক্রাফট দোকান৷ দোকানগুলো থেকে বাতাসে ভেসে আসছে মশলা‚ কফি‚ বেকড ব্রেডের গন্ধ। লোকজনের ভিড়ে চারপাশ গমগম করছে নেপালি গান‚ হিন্দি গান আর দোকানদারের ডাকাডাকিতেও৷ বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তার ধুলো আর মাটির গন্ধের মতো ভেজা পাথরের গন্ধও ছুটে আসছে বাতাসে।
যেতে যেতে রাস্তার একপাশে চোখে পড়ে পাহাড়ের ঢাল। ঢালের ওপর ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে কিছু গাঢ় সবুজ পাইন আর স্থানীয় বনজ। মাঝে মাঝে হালকা ঝোপঝাড় আর মৌসুমি ফুল ফোটা দেখা যায়। ঢালের মাঝখান দিয়ে নেমে গেছে ছোটো ঝরনা। পাথরের ফাঁক গলে পানি বয়ে যেতে যেতে মাঝে মাঝে তৈরি হচ্ছে হালকা ফেনা। আরও দূরে‚ ঢালের তলদেশে ছোটো একটি নদী বয়ে চলেছে শান্ত স্রোতে। নদীর ধারে কিছু গাছের ছায়া পানির সঙ্গে মিলেমিশে এক অদ্ভুত ছায়ায় রূপ নিয়েছে।
ট্যাক্সির মাঝে নিস্তব্ধতা ভেঙে ড্রাইভারের কণ্ঠ বেজে উঠল হঠাৎ। রেয়ার ভিউ মিররে যাত্রীকে দেখে সে ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল‚ “ম্যাডাম‚ ইউ নট টেলিং… হোয়ার ইউ গো?”
কাঁপা কাঁপা হাতে ইয়ারবাডটা কানে গুঁজল মেয়েটা। আইপ্যাডে চোখ রেখে‚ ফিসফিসিয়ে স্পষ্ট বাংলাতে স্বগতোক্তির মতো বলতে লাগল‚ “আমি… আমি ভুলে গেছি হোটেলের নামটা৷ ভুলে গেছি… মনে করতে পারছি না কোনোভাবেই৷ কলটা রিসিভ করো প্লিজ… জলদি রিসিভ করো।”
ড্রাইভার ট্যাক্সিটা থামিয়ে ফেলল। এই একই প্যাসেঞ্জার নিয়ে চলছে সে ঘণ্টা তিন হলো৷ শেষ ঘণ্টায় ট্যাক্সি মাঝ পথে থামিয়ে মেয়েটা বৃষ্টির মধ্যেই নেমে পড়ে চারটা হোটেলে ঢুকে আবার ফিরে এসেছে। প্রতিটি হোটেলই পরিপূর্ণ। কোনো রুম ফাঁকা নেই৷ এই সময়টাতে পর্যটকে ভরে ওঠে। অধিকন্তু হোটেলগুলো অনলাইন বুকিং নিয়ে থাকে বিধায় ফাঁকা পাওয়া অসম্ভবই বটে।
ফিসফিসানি কথাগুলোর কিছুটা কানে আসায় ড্রাইভার ভাবল‚ যাত্রী ভারতীয়৷ তাই এবার বলে উঠল‚ “ম্যাডাম‚ বিনা অ্যাড্রেস ম্যায় ক্যায়সে ঘুমুঙ্গা? মেরা কিরায়া পুড়া হোনা চাহিয়ে… আপ নিচে উতারিয়ে।”
চোখ তুলে তাকাল মেয়েটা‚ “কাইন্ডলি গিভ মি আ মোমেন্ট‚ প্লিজ! আই উইল শেয়ার দ্য হোটেল অ্যাড্রেস উইথ ইউ শর্টলি।” বলা শেষে আইপ্যাডের স্ক্রিনে চোখ নামাল আবার।
ড্রাইভার গাড়িটা আর চালু করল না৷ তবে সময় দিল যাত্রীকে। মিনিট পাঁচেক পরই যাত্রীর উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বরটা শুনতে পেল৷ কৌতুহলী চোখে সে দেখছিল তাকেই। ভেবেছিল যাত্রী পশ্চিমা হবে। কিন্তু কথাতে বাঙালি টের পেয়ে একটু অবাকই হলো বোধ হয়।
কলে কথা বলা শেষে মেয়েটা বলে উঠল‚ “হোটেল মাউন্টেইন মিস্ট ইন। হাউ লং’জ ইজ টু গোনা টেক?”
মাঝবয়সী ড্রাইভারটা হঠাৎ হেসে দিল৷ রাস্তার ডানে ইশারা করে বলল‚ “পাহুন্ছ গায়া। দেখো‚ রোড কে উস পার।”
ট্যাক্সির জানালা থেকে হোটেলটি দেখা মাত্রই চোখে পড়ল লাল ইটের দেওয়াল। দেওয়ালে ছোট্ট বোর্ডে লেখা Mountain Mist Inn-এর নামটা। হালকা নীল আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে বোর্ডটা৷ হোটেলের দরজাটা লাল রঙা কাঠের৷ দরজার পাশে ছোটো হ্যান্ডিক্রাফট ফুলদানি আর ওপরে ঝুলন্ত ছোটো লণ্ঠন। তার সোনালী আলো ছড়িয়ে পড়ছে সামনের গলিপথে। দরজার দুই ধারে ছোটো কাচের জানালা। আর হোটেলের সামনের অংশে ছোটো একটা প্ল্যাটফর্ম। সেটার এক ধাপ ওপরে ছোটো ব্যালকনি। সেখানে দাঁড়ালে বা বসলে হালকা ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাস এসে গায়ে লাগে। গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া শোধ করে সেখানেই দাঁড়াল মেয়েটা। হোটেলের দরজা খোলার পর ভেতরের হালকা গরম বাতাস গায়ে পড়তেই ঠান্ডা শরীরে তার আরাম দিল খু্ব।
লবিটা ছোটো আর সরু। কিন্তু স্বচ্ছন্দ পরিবেশের। লবির মধ্যে ছোটো একটি সোফা সেট। সোফার উপর রঙিন বালিশ‚ পাশে ছোটো কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর দুইটা হালকা বাতি। জানালার পাশে ছোটো পাত্রে কিছু স্থানীয় ফুল‚ তাদের সুবাস বাতাসে ভেসে আসছে। দেওয়ালে হালকা ক্রিম রঙের পেইন্ট‚ একপাশে কাঠের ছোটো কাউন্টার‚ রিসেপশনিস্টের ডেস্ক। মেয়েটা সোজা রিসেপশন কাউন্টারে এগিয়ে গেল। ডেস্কের পেছনে বসা লোকটা মাথা তুলে তাকাল তখন। শ্যামলা মুখ‚ পরনে নেভি ব্লু শার্ট‚ পাতলা গড়ন। বয়সটা ত্রিশের এপাশেই হবে রিসেপশনিস্টের। ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে মেয়েটা তাকে জানাল‚ “রাতের জন্য আমার একটি রুম বুকিং আছে। নাম মারিশা বারিশ সুলতান। দুদিন আগে কনফার্মেশন পেয়েছি। এখন চেক-ইন করতে চাই।”
শোনা মাত্রই লোকটা কম্পিউটারের কিবোর্ডে টাইপ করতে লাগল‚ “এক মিনিট‚ ম্যাডাম। আপনার বুকিং নিশ্চিত করতে কনফার্মেশন মেইল বা বুকিং আইডি দেখাতে পারবেন কি?”
মারিশা ব্যাগ থেকে আইপ্যাড বের করে স্ক্রিনে ই-মেইল খুলে দেখাল। রিসেপশনিস্ট মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিন চেক করল। চেক করার পর মুহূর্তের মধ্যে তার ভ্রু কুঁচকে গেল‚ চোখে অস্বস্তির ছাপও দেখা দিল হঠাৎ। মুখে দ্বিধাও স্পষ্ট‚ “ম্যাডাম…” মারিশাকে জানাল‚ “সমস্যা হয়েছে। আপনার নাম আর বুকিং সিস্টেমে আছে‚ রুম দুইশো তিন বরাদ্দ হওয়ার কথা। কিন্তু একই রুমে ইতোমধ্যেই অন্য একজন গেস্ট চেক-ইন করেছেন। মানে… রুমটা ডাবল বুক হয়ে গেছে।”
মারিশা হতভম্ব‚ “কী বলছেন! আমি দুদিন আগে বুক করেছি। ডাবল বুক হয়ে গেছে মানে কী?”
রিসেপশনিস্ট লজ্জিত মুখ করে বলল‚ “আসলে‚ ম্যাডাম… আমাদের হোটেল একসাথে কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রুম তালিকাভুক্ত করে তো। বুকিং ডট কম‚ আগোডা আর এক্সপেডিয়া। কাল রাতে সিস্টেম সিঙ্ক হতে দেরি করেছিল। একই সময়ে এক রুমে দুইজনের বুকিং চলে এসেছে। আমরা খেয়াল করার আগেই একজন গেস্ট এসে চেক-ইন করেছেন। তাই একই রুম ডাবল বুক হয়ে গেছে।”
খুবই বিরক্ত হলো মারিশা। ক্লান্ত কণ্ঠে জেদ নিয়ে বলল‚ “তাহলে ভুলটা আপনাদের। আমি কেন এখন এত রাতে দাঁড়িয়ে থাকব? বুকিং করেছি‚ কনফার্মেশন আছে। আমি রুম চাই। আমাকে আমার বুকিং রুমই দিতে হবে। কীভাবে দেবেন সেটা আপনারাই দেখবেন।”
রিসেপশনিস্ট বিপদে পড়ল যেন। আঙুল কিবোর্ডে ঠুকতে ঠুকতে বিড়বিড় করল‚ “আমি বুঝেছি‚ ম্যাডাম‚ ভুলটা আমাদেরই। কিন্তু আজ সব রুম ভর্তি। একটাও খালি নেই। সত্যিই খুব অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে গেছি।”
“এখন আমাকে কী করতে বলছেন?” চোখে তীক্ষ্ণতা ধরে বলল মারিশা‚ “আপনাদের ভুলে আমি এখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকব? অ্যাস ইউ ক্যান সি…” নিজের দিকে ইশারা করল সে‚ “আই’ম সো-কিং ওয়েট। আমার এক্ষুনি রুম চাই।”
লোকটা কাশল‚ গলায় জড়তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলল‚ “জি ম্যাডাম… আপনি একটু শান্ত হন। আমি এখনই দেখি যদি কাছের কোনো পার্টনার হোটেলে রুম থাকে। আমরা খরচ ম্যানেজ করব। অন্তত আজ রাতটা যেন কষ্ট না হয় আপনার।”
এখন আবার অন্য হোটেলে যেতে হবে শুনে বেজায় রাগ হলো মারিশার৷ কিন্তু মাথা ঠান্ডা রাখতে হলো পরিস্থিতি বিবেচনায়। প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল জানালার দিকে চেয়ে। বাইরে এখনো বৃষ্টি ঝরছে। সেই সাথে তার শরীরটাও কেমন ঝরে পড়তে চাইছে। ভীষণ খারাপ লাগছে তার।
এদিকে‚ রিসেপশনিস্ট দ্রুত কম্পিউটারের স্ক্রিনে চেক করতে লাগল। কিন্তু সময় যত গেল মুখে তার ততই অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল৷ একটা পর্যায়ে অপরাধীর মতো বলল‚ “আই’ম সো সরি‚ ম্যাডাম। আজ রাতে কাছাকাছি কোনো পার্টনার হোটেলেও খালি রুম পাওয়া যাবে না। সব বুকড।”
রাগে মাথা ফেটে যেতে চাইল মারিশার। প্রচণ্ড কঠিন স্বরে বলল এবার‚ “আমাকে আমার বুকিং করা রুমটাই দিতে হবে। কীভাবে দেবেন জানি না। পাঁচটা মিনিটও দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয় আমার।”
রিসেপশনিস্ট হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে। বিব্রত মুখভঙ্গিতে মারিশার দিকে তাকাল‚ “আমি বুঝতে পারছি‚ ম্যাডাম। আমাদের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমরা চেষ্টা করব। কিন্তু রুম তো সত্যিই ইতোমধ্যে অন্য একজন চেক-ইন করেছে। এটা খুব অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।”
অসুস্থতায় শরীরটা রীতিমতো কাঁপছে মারিশার৷ কষ্টেসৃষ্টে হাঁটুর শক্তি ধরে রাখল। ক্লান্তি নিয়ে বলল‚ “আমি জানি এটা অস্বাভাবিক। কিন্তু বুকিং আমার নামের। এখন আমি ঘুমাতে চাই। রুম চাই। আমি খুব সিক ফিল করছি। জলদি ব্যবস্থা করুন একটা। এটা আপনাদের দায়িত্ব।”
ফরসা ত্বক ফ্যাকাশে‚ রক্তিম চোখের চাউনিও দেখাচ্ছে দুর্বল৷ রিসেপশনিস্ট বুঝতে পারল‚ সত্যিই অসুস্থবোধ করছে মেয়েটা৷ বলল‚ “ম্যাডাম‚ আপনি কিছুক্ষণ বসুন। আমি অবিলম্বে দেখছি কীভাবে রুমটা প্রস্তুত করা যায়। আমাদের হোটেলের নিয়মে এটা সম্ভব না হলেও আপনার জন্য ব্যতিক্রম তৈরি করব।”
সোফার দিকে হেঁটে যেতেই মাথাটা হালকা ঘুরে উঠল মারিশার। জলদি গিয়ে বসল সে। ডায়াবেটিসে ভুগছে বছর চারেক হলো। অতিরিক্ত মানসিক চাপটা নেওয়ার মতো সামর্থ্য তার শরীরের নেই৷ কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে সে ধীরপদে চলছিল। দীর্ঘ ফ্লাইটের ক্লান্তি শরীর জুড়ে‚ মস্তিষ্কে যেন হালকা ঘুম-ঘোরের মতো এক অদ্ভুত আবেশ ভেসে বেড়াচ্ছিল। ফোনটা ছিল প্যান্টের পকেটেই। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে সে হোটেলের বুকিং দেখার জন্য ফোন বের করতে গিয়েই টের পেল ফোনটা নেই। ব্যাগ চেক করল‚ পকেট চেক করল। কিন্তু খুঁজে পেল না। হঠাৎ বুঝতে পারল‚ কেউ তার ফোন চুরি করে নিয়েছে। বুকিং তথ্য‚ হোটেলের নাম‚ সবই হাতছাড়া তখন। কারণ‚ বুকিংটা করেছিল বাংলাদেশে বসে ওর ঘনিষ্ঠ একটি মানুষ। বুকিং শেষে সকল তথ্য ওকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তাই অ্যাপটা সম্পর্কেও একরকম অজ্ঞাত সে।
মারিশা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কও কিছুটা বিভ্রান্ত তখন। কয়েক মুহূর্ত আগের ঘটনা মনে রাখা ওর জন্য কষ্টের। কারণ‚ সাম্প্রতিক স্মৃতি পুরোপুরি ধরে রাখতে অক্ষম ওর মস্তিষ্ক। তাই চেষ্টা করেও হোটেলের নাম মনে করতে পারে না সে। এয়ারপোর্ট থেকে তখন একটি টেম্পরারি প্রিপেইড সিম কিনে সেই ঘনিষ্ঠ মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে৷ কিন্তু সেই মুহূর্তে তাকেও কোনোভাবে পাওয়া গেল না ফোনে। তখন ট্যাক্সি ভাড়া করে ভিন্ন কোনো হোটেলে রুম খোঁজার চেষ্টা চালায় সে৷ সবখানে ব্যর্থ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ভাগ্য সদয় হয় ওর। যোগাযোগ করতে সফল হয় সে ঘনিষ্ঠ মানুষটির সঙ্গে।
রিসেপশনিস্ট গভীর নিশ্বাস নিয়ে একটা ফোন করল। ওপাশ থেকে রিসিভ হলো একটু সময় নিয়েই৷
“স্যার‚ দুঃখিত এত রাতে বিরক্ত করার জন্য। তবে একটু সাহায্য প্রয়োজন। আপনার বুক করা রুম দুইশো তিনে ইতোমধ্যেই অন্য একজন গেস্টও অবস্থান করছেন। আপনি কি একটু সময় দিয়ে নিচে এসে এই বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন?”
ফোনের ওপাশ থেকে শান্ত‚ ভারী কণ্ঠে পুরুষটি বলল‚ “ঠিক আছে‚ আসছি।”
কিছুক্ষণ পর লিফট নিচের লবিতে এসে দরজা খুলল। লিফট থেকে বের হলো একজন বাঙালি পুরুষ। গম্ভীরমুখে সে রিসেপশনিস্টের দিকে এগোল। পরনে তার ধূসর নাইট প্যান্ট আর কালো রঙা পোলো টি-শার্ট। রিসেপশনিস্ট আন্তরিক ভঙ্গিমায় তাকে বলল‚ “স্যার‚ সত্যিই খুব দুঃখিত। হোটেলের ভুলের কারণে আপনার রুমটি অন্য একজনের সঙ্গে ডাবল বুক হয়ে গেছে। আমরা চাইছি এটা সমাধান করতে। আপনার একটু সহযোগিতা প্রয়োজন।”
পুরুষটির চোখে হালকা বিরক্তি। ঠোঁট এঁটে চুপ রইল কয়েক মুহূর্ত৷ তারপর বলল‚ “ভুল আপনাদের৷ আমি এখানে কী করতে পারি?”
“জি স্যার…”‚ ক্ষমাপ্রার্থী সুরে বলল রিসেপশনিস্ট‚ “এটি আমাদেরই ভুল। কিন্তু গেস্টটি একজন মহিলা৷ আর তিনি অসুস্থও কিছুটা। এজন্যই বাধ্য হয়ে আপনার কাছে সহযোগিতা কামনা করছি৷ কাইন্ডলি অন্য কারও সঙ্গে… মানে আপনারা তো পাঁচজন এক সঙ্গে। তাই তাদের সঙ্গে রাতটা যদি মানিয়ে নেন…”
কথা শেষ করতে দিল না লোকটি৷ কটাক্ষ সুরে বলল‚ “আপনাদের ডাবল রুমের বেডগুলো কি কিং সাইজ? তিনজনের জন্য যথেষ্ট?”
কাঁচুমাচু মুখ করে ফেলল রিসেপশনিস্ট। ভারী দেহী পুরুষ মানুষের জন্য বিছানাগুলোতে তিনজনের জায়গা হওয়া সত্যিই কষ্টসাধ্য। তার নীরবতার ফাঁকে লোকটি বাঁকাভাবেই বলল‚ “ফ্লোরে থাকতে অনুরোধ করবেন না প্লিজ!”
“ছিঃ… ছিঃ! কী বলছেন‚ স্যার”‚ রিসেপশনিস্টের বিব্রতস্বর‚ “মাফ করবেন প্লিজ! কী যে করব এখন? অন্য কোনো হোটেলেও রুম ফাঁকা পেলাম না।”
কথাটা বলে অসহায় এবং অপরাধী দৃষ্টিতে মারিশার দিকে চাইল সে‚ তারপরই আঁতকে উঠল। আতঙ্কিত স্বরে ডেকে উঠল মারিশাকে‚ “ম্যাডাম‚ আপনি ঠিক আছেন?”
ঘাড় ফিরিয়ে ওই পুরুষটিও খেয়াল করল তখন মারিশাকে। সোফাতে অস্বাভাবিকভাবে ঢলে পড়ে আছে সে৷ দ্রুত শ্বাস টানছে আর চোখদুটোও নিভু নিভু করছে। রিসেপশনিস্ট ছুটে এল ওর কাছে৷ ঘেমে উঠেছে মারিশা… শরীরও কাঁপছে।
“ম্যাডাম…”‚ চিন্তিত হয়ে মারিশাকে ডাকতে লাগল রিসেপশনিস্ট‚ “ম্যাডাম‚ কী হয়েছে আপনার?”
কথা বলতে গিয়ে দম যেন ফুরিয়ে আসতে চাইল মারিশার৷ রিসেপশনিস্ট বুঝল না তাই কথাগুলো। সে বারবার ডাকাডাকি করে শেষে পানি আনতে ডেস্কের দিকে ছুটে গেল আবার৷ বাঙালি লোকটির একটুখানি মায়া হলো বোধ হয়। এসে দাঁড়াল মারিশার কাছে৷ রিসেপশনিস্টও এর মাঝে পানি নিয়ে হাজির হলো৷ কিন্তু পানিটা নিল না মারিশা। বলার চেষ্টা করল নিজের অসুখটার কথা। কিন্তু ইংরেজির বদলে বাংলাটাই বারবার মুখে এল ওর। তাই একেবারেই বুঝল না রিসেপশনিস্ট। তখনই বাঙালি পুরুষটা নির্বিকার স্বরে বলল‚ “ওনার সম্ভবত হালকা হাইপোগ্লাইসেমিয়া। ব্লাড শুগার লেভেল দ্রুত ঠিক করতে হবে।”
কথাটা শোনা মাত্রই মারিশা ইশারাতে নিজের ব্যাগটা দেখানোর চেষ্টা করল। কিন্তু রিসেপশনিস্ট তা দেখার অপেক্ষায় রইল না। সে ছুটে গিয়ে স্টাফকে ডেকে জুসের ব্যবস্থা করতে বলল। তবে বাঙালি পুরুষটি ওর ইশারা বুঝে নিয়েছে। ব্যাগটার কাছে এসে চেইন খুলল সে কয়েকটা পকেটের৷ তারপর খুঁজে পেল কিছু গ্লুকোজ ট্যাবলেট। সেগুলো এনে ওর হাতে দিল। মুখে দেওয়ার দশ-পনেরো মিনিট মধ্যে অনেকটা সুস্থবোধ করল মারিশা।
এরপরই তারা ফিরে এল সেই রুম সমস্যার সমাধান পর্বে। আর সমাধানটা মারিশার তরফ থেকেই এল৷ বাঙালি পুরুষটিকে তার হঠাৎ ভালো মানুষটি মনে হলো খুব। তাই সে অনুরোধ রাখল তার কাছে‚ “অচেনা কারও সঙ্গে রুম শেয়ার করতে বলাটা খুবই অকোয়ার্ড দেখাবে জানি। অনেকটা অফেনসিভও। আমি কেবল হেল্পলেস বলেই রিকুয়েস্টটা রাখছি‚ রাতটা আমাকে আপনার রুমে অ্যালাউড করুন‚ প্লিজ!”
এবং অনুরোধটা ওই পুরুষটির জন্য ছিল প্রথমত ভীষণ অবিশ্বাস্য। দ্বিতীয়ত‚ সত্যিই খুব অস্বস্তিতেও পড়ল সে রিসেপশনিস্টের মুখে চোরা হাসিটা দেখে। মাঝখান থেকে রিসেপশনিস্ট বেঁচেও গেল। আর ভাবতে লাগল‚ বলিষ্ঠ‚ সুপুরুষ বাঙালিকে পুতুলের মতো দেখতে বিদেশীনির বোধ হয় মনে ধরে গেছে।
শেষমেশ বাঙালি লোকটিও আর না করল না। মেয়েটিরই যদি আপত্তি না থাকে‚ তবে সে-ই বা কেন না করতে যাবে?
করিডরে নরম আলোগুলো ম্লান সোনালি আভা ছড়াচ্ছে। লিফট থেকে বেরিয়ে ওরা দুজন করিডর ধরেই এগোচ্ছে দুইশো তিন নম্বর রুমের দিকে। কার্পেটের ওপর মারিশার ভেজা জুতাতে চাপা শব্দ উঠছে। সরু করিডর জুড়ে দেওয়ালে টাঙানো ছোটো ছোটো ফ্রেম। হিমালয়ের শ্বেতশুভ্র চূড়া‚ স্থানীয় গ্রামের সরল দৃশ্য‚ পাহাড়ি প্রকৃতির ছবি৷ আর দূরের জানালা দিয়ে ভেসে আসছে পাহাড়ি কুয়াশার ধোঁয়াটে পরশ।
রুমের দরজাটা খুলে ভদ্রতা রক্ষার্থে মারিশাকেই আগে ভেতরে ঢুকতে দিল পুরুষটি। ভেতরে ঢুকে পায়ের নিচে নরম কাশ্মীরি কার্পেটের ছোঁয়া পেল সে। ঘরে হালকা হিটার চলছে বলে বাইরে ঠান্ডা হলেও ভেতরে উষ্ণতা দারুণ৷ রুমটা ডাবল বেডের। তাই বড়ো বিছানাটিতে দুটো কম্বল আর দুটো বালিশ। বিছানার এক পাশে ছোটো একটা টেবিল‚ তার ওপর টেবিল ল্যাম্প। পাশে একটা চেয়ার আর ব্যাকপ্যাক রাখার মতো জায়গা। দেওয়ালে ছোটো হুক আর হ্যাঙ্গার আছে। রুমে একটা ছোটো ফ্রিজও আছে। লোকটি এসে ফ্রিজ থেকে একটা পানির বোতল বের করে নিল। মারিশা ভাবল‚ ভদ্রলোক বোতলটা তাকেই এগিয়ে দেবে। তাই লোকটার কাছে এসে মুচকি হেসে বলল‚ “আপনার পরিচয়টা তো জানা হলো না‚ বাডি। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।”
“শেহনান”‚ শুষ্ক স্বরে নামটা বলেই সে বোতলটা খুলে মুখে লাগাল। ধন্যবাদের জবাবে কিছু তো বললই না‚ উপরন্তু তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিমাতে একটা গা ছাড়া ভাব কেমন।
মারিশার চেহারায় পড়ল বিব্রতপূর্ণ এক ছায়া। নিজের ভুল ধারণার জন্য অপ্রস্তুত হয়ে সরে এল সে শেহনানের থেকে৷ ভেজা উইন্ডব্রেকারটা গা থেকে খুলে ঝুলিয়ে রাখল হুকে। নিচে ছিল ওর সাদা রঙা একটা ট্যাঙ্ক টপ৷
অনাগ্রহেই চোখটা সেদিকে গেল শেহনানের। মেয়েটার মসৃণ গোলাপি ফরসা বাহু আর খোলা ঘাড়‚ গলাতে যতখানি না চোখ বিঁধল ওর‚ তার চেয়ে বেশি বিঁধল মেয়েটার বুকের খাঁজে এবং সুগোল উরোজে৷ মুখের মধ্যে থাকা পানিটুকু ওর গলা দিয়ে নামছিল সবে। কোনা চোখে মারিশাকে দেখতে গিয়ে গলায় আটকে গেল তা। কাশি উঠতেই দ্রুত নেমে গেল পানিটুকু৷ মারিশা ফিরে তাকাল সে মুহূর্তে। জিজ্ঞেস করল‚ “ঠিক আছেন?”
কোনো উত্তরই দিতে চাইল না সে। কিন্তু জবাবের আশায় মেয়েটা চেয়ে আছে বলে স্রেফ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝাল৷ তবে ফিরে আর তাকাল না। নিজের ওপর হঠাৎ রাগ হলো ওর৷ রাজি না হলেও তো পারত তখন। এখন এই খোলামেলা বেয়াদব সুন্দরীকে কতক্ষণ না দেখে থাকতে পারবে? কথাটা ভাবতে ভাবতেই ভুলবশত আবারও একবার কোনা চোখে তাকাল৷ অমনিই মেয়েটার চোখে চোখ পড়ে গেল। ভীষণ গভীর তার সেই চোখদুটো৷ ধূসর রঙা সরল দুটো বড়ো চোখে ঘন কালো পাপড়ি‚ ছোটো গোলাকৃতি মুখে নিখুঁত একজোড়া চিকন ঠোঁট‚ সরু নাক‚ দু গালের মাঝে তার গোলাপি আভা‚ পিঠের মাঝে পড়া সোজা চুলগুলো গাঢ় বাদামী আর কপালের ওপর কিছু ভেজা ফ্রিঞ্জ চুল হালকা ঢেউ খেয়ে পড়া। ওই চুলগুলোই যেন মুখটার সৌন্দর্যকে আরও কোমল করেছে। উচ্চতাও একদম নিখুঁত। পাঁচ ফিট ছয় কি সাত ইঞ্চির মতো। কিন্তু সব থেকে অপছন্দের হলো‚ মেয়েটা পশ্চিমা সংস্কৃতির এবং একজন পশ্চিমা নারীই। যাদের প্রতি ওর দীর্ঘ একটা সময়ের ঘৃণা আর রাগ। নেহাৎ অসুস্থ বলেই তখন না করতে পারেনি৷ মনটা হঠাৎ তিক্ত হয়ে উঠল ওর৷ সে সময়ই মারিশা বলল‚ “হট শাওয়ারের ব্যবস্থা আছে তো‚ তাই না? আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি।”
“যা খুশি করুন”‚ অপ্রত্যাশিত রূঢ় আচরণটা দিয়েই শেহনান দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
অবাক হলো মারশা। তারপর অপমানবোধ করল বেশ‚ যে বাথরুমে ঢুকে গরম পানির কথা ভুলেই গেল সে। ঠান্ডা পানি গায়ে পড়তেই শরীরে সুচ গাঁথার মতো অনুভব করল। বেশিক্ষণ আর দাঁড়াতে পারল না শাওয়ারের নিচে৷ রাতের পোশাকটা গায়ে ঢুকিয়েই বের হলো বাথরুম থেকে। শেহনান তখনো ঘরে ফেরেনি দেখে খারাপ লাগল তার। লোকটা তখন যে ভদ্রতার খাতিরেই না বলতে পারেনি‚ তা আর বুঝতে বাকি নেই। কাউকে বিরক্তি আর অস্বচ্ছন্দবোধের মাঝে ফেলাটা সত্যিই খুব কষ্টের আর অস্বস্তির। যতক্ষণ ঘরটাতে থাকবে‚ নিজেকে কেমন ঝামেলা লাগবে লোকটার কাছে৷ অবশ্য ঝামেলাই তো সে তার কাছে। তবে এবারের পথচলাটা যে তেমন সুখকর হবে না‚ এও তো সে জানতই৷
চুলগুলো মুছতে মুছতে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল সে। বাইরে বৃষ্টি আর পাহাড়ি বাতাস। অন্ধকারে উড়ে বেড়ানো কুয়াশার মাঝেও আবছা দেখতে পেল দূরে পাহাড়ের ঢাল আর টিলা। এইতো আর কয়েকটা ঘণ্টা। এরপরই ছুটে যাবে ওই দূর পাহাড়ের বুকে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মনের ভারটা কেমন হালকা হয়ে আসলো তার৷ ভুলে গেল সে শেহনানের অপমানটুকুও।
এর মাঝেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। মারিশা ফিরে তাকাতেই শেহনান একবার তার দিকে চাইল৷ তারপর মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিল চোখদুটো৷ মারিশা স্পষ্ট টের পেল তখন‚ তার প্রতি লোকটার বিরক্তিটুকু৷ ফ্যাকাশে মুখটা আরও বেশি বিবর্ণ দেখাল বিষণ্ণতায়। তাকে আশ্রয়টুকু দিতে গিয়ে ঝামেলা বহন করার জন্য একবার মাফ চাইবে ভাবল৷ কিন্তু সে সুযোগটা আর হলো না৷
প্যান্টের পকেটে দু হাত পুরে শেহনান বিছানার কাছে সটান দাঁড়িয়ে। সরাসরি মারিশার দিকে চেয়ে ভীষণ চাঁচাছেলা গলায় বলে বসল‚ “হোয়েন ইউ স্লিপ‚ প্লিজ স্লিপ ফার এনাফ আপার্ট।”
থমকে গেল মারিশা৷ সব থেকে অপ্রত্যাশিত ছিল এ অপমানটাই৷ এভাবে কেউ মুখের ওপর বলতে পারে কোনো নারীকে? হ্যাঁ পারে‚ যারা শিষ্টাচার জানে না… ভদ্রতা জানে না৷ কিন্তু এই লোকটিকে তো প্রথম দর্শনে এমনটা মনে হয়নি! স্রেফ বিরক্ত থেকেই কি এমন আচরণ করছে?
ব্যাপারটা এভাবেই ভেবে ছেড়ে দিতে পারত মারিশা। যেহেতু হঠাৎ করে এসে লোকটার ঘরে অধিকার বসিয়েছে সে। কিন্তু সে যে আদতে বেহেড‚ ধৈর্যহীন আর ছোটো ছোটো বিষয়েই চটে যাওয়া স্বভাবের। কেবল শরীরটা ঠিক ছিল না বলেই এতক্ষণ ধৈর্য‚ সহ্যের মুখোশটা পরে শান্ত মেয়েটা হয়ে ছিল।
হাতের তোয়ালেটা টেবিলের ওপর রেখে সে সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে এল বিছানার কাছে৷ আর শেহনান তার বিপরীত পাশে। ওকে প্রথমে শীতল গলাতেই বলল‚ “এক্ষেত্রে একজন মেয়ে একজন ছেলের থেকেও এলার্ট থাকে বেশি‚ রাইট?”
“সব মেয়েরাই না”‚ জবাবটা শেহনানও শান্ত স্বরেই দিল। তারপরই দখলে নিয়ে নিল নিজের পাশটা।
কোনো বাড়তি প্রতিক্রিয়া ছাড়া কেবল ঠান্ডাভাবেই লোকটা যে কাউকে অপমান করতে পটু‚ মাত্র আধা ঘণ্টাতেই বুঝে ফেলল মারিশা। কিন্তু তাকে অপমান করার পূর্বে একবার কি তার পরিস্থিতিটা বিবেচনা করবে না? তার মতো মেয়ে কতখানি নিরুপায় আর অসুস্থতায় অসহায় বোধ করলে যেচে পড়ে সে একজন ছেলের ঘরে থাকতে চাওয়ার অনুরোধ করতে পারে‚ তা কি বোঝা উচিত না লোকটার? অথচ তার অসহায়তাকে রীতিমতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে চলেছে সে!
“সব মেয়েরাই পারে না বলে আমাকে কেমন মেয়ে বোঝাতে চাইলেন‚ কাইন্ডলি সোজাসুজি বলবেন?”
বালিশে মাথা রাখতে রাখতে প্রশ্নটা শুনল শেহনান৷ কিন্তু উত্তর দিল একটু দেরিতে৷ রয়ে সয়ে গায়ে কম্বলটা আগে ছড়িয়ে নিল৷ তারপর মারিশার দিকে মুখ করে শুয়ে জবাব দিল‚ “আমার যতটুকু বলার বলে দিয়েছি৷ আশা করি কথাটুকু রাখবেন। আমি আর কথা বাড়াতে চাইছি না‚ মিস!”
শেষে মিস শব্দটা শুনতেই মারিশা নামটা জানাল নিজের৷ তারপরই সে স্বরূপে ফিরল। ওকে জিজ্ঞেস করল‚ “আপনি রুমটা বুকিং দিয়েছিলেন কবে এবং কখন?”
“দুদিন আগেই‚ রাতের বেলাতে।”
“আমার বুকিংটাও ছিল দুদিন আগেই রাতে। তাহলে আমি যদি আগে পৌঁছাতাম‚ রুমটাতে চেক-ইন করতাম আপনার আগেই। তখন আপনার মতো করেই বেডে ফুল রাইট নিয়ে শুয়ে থাকতে পারতাম। হোটেলের ভুল হোক আর যা-ই হোক‚ এই রুমটা আজকে রাতের জন্য আপনার যতটা‚ আমারও ততটা৷ সো কাইন্ডলি নিজেকে একক মালিক ভেবে আমাকে অস্বস্তিতে ফেলবেন না‚ আমাকে ছোটো করার চেষ্টা করবেন‚ প্লিজ!”
“ওয়েল… আপনার লজিক মেনে নিলাম৷ তবে আপনাকে আমি এখন অবধি কোনো অস্বস্তিতে ফেলিনি৷ অস্বস্তির ব্যাপারটা বরং আমি আপনাকে বলতে পারি। কিন্তু মাত্র কটা ঘণ্টায় তো কষ্টে মানিয়ে নিতে হবে। তাই আর কনভারসেশন দীর্ঘ করতে চাইছি না।” কথাগুলো শেষ করে সোজা হয়ে শুলো শেহনান‚ যেন ঘুমানোর প্রস্তুতি নেবে এক্ষুনি।
আর ওর এই বিকারহীন‚ শান্ত প্রতিক্রিয়টা দেখেই মেজাজটা আরও তেতে উঠল মারিশার‚ “আপনাকে অস্বস্তি ফেলেছি আমি? মনে করতে পারছি না কখন‚ কীভাবে?”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শেহনান৷ মেয়েটা দেখতে বাচ্চা হলেও আচরণেও যে বাচ্চাদের মতো হবে‚ এমনটা ভাবেনি সে৷ বরং ভেবেছিল ওর কথাতে যতটা অপমানিত হবে‚ ততটাই নিজেকে গুটিয়ে রাখবে৷ যেহেতু আশ্রয় দান করে সাহায্যটুকু করেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে একদম সমানে সমানে ঝগড়া করতে তৈরি!
“সেটা বলতেও আমার অস্বস্তি হবে‚ আপনার শুনতে অস্বস্তি না হলেও। কারণ‚ আমি এক টিপিক্যাল বাঙালি ছেলে”‚ বলেই একবার তাকাল শেহনান মারিশার দিকে৷ আপাদমস্তক তাকে দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিল বিরাগ নিয়ে। তার রাতের পোশাকটাও যে আরও বেশি আকৃষ্ট হওয়ার মতো!
যদিও পশ্চিমা সংস্কৃতি বহন করা মেয়েটার জন্য তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু শেহনানের কাছে আসল সমস্যাই যে স্বয়ং মারিশা। মেয়েটা ওকে একজন বেইমান‚ স্বার্থপর বিদেশীনিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে বারবার!
“আপনি অত্যন্ত নীচ ব্যবহার দিচ্ছেন আমাকে”‚ ক্ষিপ্ত স্বরে বলল মারিশা‚ “অথচ আপনাকে দেখে এমন ন্যারো মাইন্ডেড মনেই হয়নি।”
“আমি এমনই৷ যদি মানিয়ে নিয়ে থাকতে পারেন তো থাকুন‚ নয়তো খুঁজে নিন বেটার অপশন”‚ নির্বিকার ভঙ্গিতে কথাটা বলতে বলতে সে কম্বলের মধ্যে ডুব দিল।
তা দেখেই দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে মারিশা বলে উঠল‚ “ইউ আর আটারলি ইনসোলেন্ট! আ কমপ্লিটলি আনসিভিলাইজড পার্সোন! মেয়েদের সম্মান করার নূন্যতম জ্ঞানটুকু নেই।”
এবার কি চটল শেহনান? বোধ হয় এবার গায়ে লাগল গালিগুলো। কম্বলটা মুখের ওপর থেকে এক টানে নামিয়েই সে উঠে বসল৷ মারিশার ‘খেয়ে ফেলব’ ভঙ্গিমার চাউনিতে গাম্ভীর্যপূর্ণ চোখজোড়া রাখল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে‚ ঠান্ডা সুরেই জবাবটা দিল‚ “আই হ্যাভ নো অবজেকশন টু অ্যাকনলেজিং দ্যাট। কারণ‚ আমি আগে ওজন করি আমার সামনের মানুষটা কতখানি রেসপেক্ট ডিজার্ভ করে আমার থেকে৷ ফার্স্টলি‚ আমার ঘরে থাকার জন্য আপনার নির্দ্বিধা আবদার… সেকেন্ডলি‚ ইউ প্রেজেন্ট ইয়োরসেলফ ইন অ্যান অলিউরিং ম্যানার। কারণটা কী হতে পারে?” শেষ প্রশ্নটার পর মারিশার উদ্দেশ্যে ভ্রু জোড়া নাচাল সে।
তারপর জবাব রাখল নিজেই‚ “ইউ আর সাবটলি ট্রায়িং টু অ্যাট্রাক্ট মি৷ কিন্তু আমি অভদ্র বলে আপনাকে অভদ্রভাবেই রিজেকশনটা বোঝাচ্ছি। আপনার বদলে এখন যদি কোনো বাঙালি নারী থাকত‚ সে এত সহজে রাজি হত না এই রুম‚ বেড আমার সঙ্গে শেয়ার করতে। আর আমিও তাকে এভাবে অপমান করার সাহস পেতাম না।”
মারিশার ধৈর্য আর সহ্যের সবটুকু সীমা পেরিয়ে গেল এবারই। “ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ ইনসেইন ইউ আর?” তারস্বরে চিৎকার করে উঠল সে‚ “আপনার মধ্যে আছেটা কী‚ যা দেখে অ্যাট্রাক্ট করতে চেষ্টা করব আপনাকে?”
এমন তিরস্কারের পরও এতটুকুও অপমানবোধ করল না শেহনান। উজ্জ্বল গমবর্ণ চৌকা মুখে বরং দাম্ভিক এক হাসির রেখা ভাসল ওর। নিজেকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসটা ওর বরাবরই বেশি। তাছাড়া লবিতেই সে মারিশার মুগ্ধ চাউনি পড়ে নিয়েছিল যে! কিন্তু মেয়েটাকে অপমানটা বাড়াবাড়িই করে ফেলল বোধ হয়। তা আবার স্বীকারও করল মনে মনে৷ কেবল মুখেই তা প্রকাশ করল না৷
“থিঙ্ক হোয়াট ইউ উইল”‚ চাপা হাসিটা মুখে নিয়েই ছোট্ট জবাবটা দিল মারিশাকে। তারপরই মাথার স্টাইলিশ ফেড কাট চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে সে শুয়ে পড়ল আবার।
