লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৯
লিজা মনি
খোলা সমুদ্রের অবিশ্যস্ত বিস্তৃতি নাজলীর চোখের সামনে অদৃশ্য সীমারেখা অতিক্রম করে অগণন নীল তরঙ্গের খোঁচায় ভেঙে পড়ছে। সমুদ্রের বাতাস কাঁপিয়ে তুলে। লবণাক্ত ঘ্রাণ বাতাসের সাথে মিশে নাকের উপর ঝাপসা হয়ে যায়। ঠোঁট স্পর্শ করে তেমনই তীব্র।তীব্রতার মধ্যে এক অজ্ঞাত শূন্যতার অনুপ্রবেশ। সামনে আরিশ বসে আছে
মুখমণ্ডল গম্ভীর। সমুদ্রের বিশালতার মতোই অচল, অপ্রস্তুত অনুভূতির ভার বহন করছে সে।
সূর্যাস্তের ধোঁয়াটে আভা সমুদ্রের জলে প্রতিফলিত হয়ে নীরবতার ভাস্কর্য সৃষ্টি করছে।আলোর নরম বিকিরণ দু’জনের মাঝে অদৃশ্য রেখা আঁকছে। যেখানে স্পর্শের তাগিদ বাতাসে ভেসে আসে কিন্তু কোনো শব্দের জন্ম হয় না। সাগরের ঢেউগুলো যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে।প্রতিটি ঢেউ একটি অতলান্তিক নীরব ক্রন্দন। যা হৃদয়ে গাঢ় অনিশ্চয়তা ভরে দেয়।
নাজলীর চুল বাতাসের সাথে খেলছে।কিন্তু তার চোখে অদৃশ্য ভাবের ভার।আরিশের চোখের অচল গভীরতা।এই দুই ভিন্ন তরঙ্গের সঙ্গমে অজানা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। লালিমা ঘেরা আকাশের নিচে সমুদ্রের বিশালতা যেন কেবল আউটলাইন নয়।বরং তাদের মধ্যবর্তী অনুভূতির অঙ্গার। নীরবতা এতটাই ভর করে যে প্রতিটি শ্বাস যেন বিশাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফেটে পড়ছে। হ্রদয়কে চেপে ধরেছে। মস্তিষ্কে অচেনা অস্থিরতার সঞ্চার করছে।
তাদের চারপাশে রিসোর্টের অতি সূক্ষ্ম কাঠের চেয়ার
মৃদু বাতাসে দুলে ওঠা লাউড্রেসের হালকা নরমতা, সমুদ্রের নীলা ছায়ার সঙ্গে মিশে থাকে, কিন্তু সবই যেন ক্ষণস্থায়ী নিরবতার, বিশালতার, এবং অদৃশ্য উত্তেজনার এক একত্রিত ঝঞ্ঝা।
আরিশ, নাজলীর অবলোকনে স্থির দৃষ্টি নিয়ে স্বর ও অভিব্যক্তির মধ্যে গভীর গম্ভীরতার আভাস রেখে প্রস্ফুটিত করে বলে,
“এইভাবে ডেকে আনার কারণ কি, মিস নাজলী?”
নাজলী চোখের কোণে ক্ষণিকের চাতকচঞ্চল হাসি ফোটাতে ফোটাতে বিনয়ী স্বরকে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মৃদু-স্ফুটিত করে প্রতিউত্তর দিয়ে বলে,
“মাত্র ডেকেছি, জোর কখনো করি নি। বাট এমনভাবে এসেছেন যেন আমি আপনার গুরুত্বপূর্ন কেউ। ক্রিমিনাল গ্রুপের লিডার মি, আরিশ এইভাবে ছুটে আসার কারন?
আরিশের মণিস্বরে ক্রোধের অগ্নি জ্বলে উঠে। কিন্তু তা নিকের মতো অযথা প্রকাশিত নয়।বরং সংযমের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ। রাগ তার অন্তরের গভীরে স্থির। অথচ প্রতিটি শব্দে সূক্ষ্ম কামলিকা হয়ে স্পন্দিত। অধরের কোণে অর্ধহাসি ফুটিয়ে ত প্রতিস্বরে বলে,
“কারণটি আপনার অজানা নয়, মিস নাজলী। আপনি এনির বোন। আর আপনার ডাকে সাড়া দেওয়ার একমাত্র মাত্র কারন এইটাই।
নাজলী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বিনিময়ে আরিশের দিকে তাকিয়ে, ব্যস্তপ্রাণ হাওয়ায় নিঃশ্বাস জটিলভাবে ফেলে স্বর গভীর ও ক্ষুরধার করে বলে,
“বন্ধু অমানুষ, আর অপর বন্ধু — ডাক দেওয়া মাত্রই চলে এসেছে। বিষয়টি হজম হচ্ছে না।”
নাজলীর এ হেয়ালীপূর্ণ আবহ আরিশের কণ্ঠে বাঁকা হাসি ফোটায়। সংযমের মধ্যে ক্রোধ ও হাস্যরসের সূক্ষ্ম সমন্বয় রেখে তিনি প্রতিউত্তর দিয়ে বলে,
“আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকার চেষ্টা করবেন না, মিস নাজলী। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের নির্দিষ্ট কারণ আছে। তাই যা বলতে এসেছেন, সেটাই বলুন। অতিরিক্ত চিন্তা করে নিজেকে কেন অস্থির করছেন?”
নাজলী, দীর্ঘ শ্বাস টেনে। কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা ভেঙে অন্তর্নিহিত আবেগের ভারে অল্প-অল্প ভেসে ওঠা স্বরে বলে,
“আনাস্তাসিয়া এনি। ইরানের অন্তরাল থেকে বেড়ে উঠা সৌন্দর্যের নিখুঁত প্রতীক। সবসময় বাহ্যিক দুনিয়ার থেকে সুরক্ষিত রেখেছি। কারোর নজরে পড়তে দেয়নি। হয়ত আমি তার রক্তের কোনো আত্মীয় নই।কিন্তু তার সঙ্গে আমার আত্মার গভীর সম্পর্ক।”
আরিশ আচমকা চোখ তুলে তাকায়্য।অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন,
“এনি আপনার আপন বোন নয়?”
নাজলীর কণ্ঠে সূক্ষ্ম উপেক্ষা মেশানো সুর,
“তাতে কি?”
“উত্তর চেয়েছি আমি।”
নাজলী, গম্ভীর শ্বাস টেনে নিজের আবেগ আর আত্মনিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য রক্ষা করতে থাকে।
তার অভ্যন্তরীণ আবেগের গভীরতার ভার বহন করে। স্থির দৃষ্টিতে আরিশের চোখে চোখ রাখেন।স্বরে গভীর স্থিরতা ও অমোঘ সত্যের ছাপ রেখে বলে,
“না। এনি আমার রক্তের কেউ নয়। কিন্তু রক্ত দিয়ে সব সম্পর্ক তৈরি হয় না। আত্মার থেকে বড় সম্পর্ক আর কিছুই নেই। সর্বশেষ, এনি রক্তের কেউ না হলেও, সে আমার জীবন, আমার বোন।”
নাবিদ, নিঃশব্দ বিস্ময়ে চোখ ছোট ছোট করে আশেপাশে তাকালেন। নাজলীর কথাগুলো এতদিনের অজ্ঞাত সত্যের প্রক্ষেপণ।যা তার কল্পনার অতীতকে নাকচ করে দেয়। এই তথ্য তাদের কেউ আগে জানত না।
আরিশ, নাজলীর দিকে দৃঢ় দৃষ্টি স্থির রেখে কপালের উপর গভীর ভাঁজ ফেলে বলেন,
“তাহলে এনির আপনজন কেউ নেই?”
নাজলী, অজানার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় সংযম রক্ষা করে ধীর স্বরে প্রতিউত্তর দেন,
“অজানা বিষয় এটি।”
আরিশ, প্রতিটি অল্প ক্ষণিকের শব্দে অজানা ভাবনার ভেদ করে।চোখ ছোট ছোট করে ঘূর্ণন করলেন।যেন নতুন প্রাপ্ত সত্যের গভীরতাকে হজম করার চেষ্টা চলছে।
আরিশ চোখ ছোট ছোট করে ফেলে,
— কিন্তু আমি জানতে চাই। মুলত এনির সঠিক পরিচয় কি? এনি মোটেও ইরানের মেয়ে নয়। যদি সে ইরানের মেয়ে হত তাহলে এত ভালো বাংলা বলতে পারত না। বাঙ্গালী নারীদের মত চেহারায় এত কোমলতা থাকত না। সৌন্দর্যের জন্য শুধু দবদবে ফর্সা হলেই হয় না। কারোর নজরে আসার জন্য প্রয়োজন তার কোমলতা। যেটা আমি এনির মধ্যে দেখেছি। মুলত বিদেশী বেশিরভাগ মেয়েদের চোখের রং অন্য রকম হয়ে থাকে। নীল চোখের মনি ও অনেকের আছে। কিন্তু এনির চোখের মত গভীরতা কারোর নেই। এই নীল চোখ দিয়ে সে হাজার পুরুষকে ঘায়েল করতে সক্ষম। আর সেটা সে করেছে ও।
নাজলী, কণ্ঠের অন্তর্নিহিত খুনসুটি এবং চোখের কোণে ক্ষুদ্র বাঁকা হাসি রেখে ধীর স্বরে প্রশ্ন উত্থাপন করে বলে,
“আমার বোনের উপর তাহলে আপনিও প্রেমে পড়েছেন?”
আরিশ, কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে। তার অন্তরের উষ্ণতম অনুভূতি সংযমে রাখা অবস্থায় ধীরে অধরে অর্ধহাসি ফুটিয়ে প্রতিউত্তর দিয়ে বলে,
“একটু তো পড়েছি’ই। নাহলে আরিশ কখনো কোনো নারীর চেহারা এতটা গভীরভাবে দেখে না। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী হচ্ছে এনি।
— অথচ সেই নারীকেই নিজের বন্ধু রক্ষিতা হিসেবে একটা বদ্ধ রুমে বন্ধী করে রেখেছে। খারাপ লাগে না ভালোবাসার মানুষের এমন অবস্থা দেখে।
— আমাদের প্রফেশনে মায়া – মমতা বলতে কিছু নেই মিস নাজলী। কেউ যদি গলা কাটা মুরগীর মত ছটফট করে মরেও যায় তবুও এক ফোটা পানি দিব না তার মুখে।
— একই মুদ্রার কিন্তু এপিঠ -ওপিঠ থাকে আরিশ। অন্ধকারের হিংস্রতার আড়ালে একটা মায়া থাকে। সাময়িক ধামা- চাপায় পড়ে জানোয়ারে পরিনত হলেও একটু মায়া প্রতিটা মানুষের মধ্যে থাকত। যদি মায়া না থাকত তাহলে এই মুহূর্তে টুকরো টুকরো করে ফেলতেন। নিজের ভালোবাসাকে এত সহজে ছেড়ে দিলেন।ক্ষমতা তো আপনারও কম নয়। তাহলে ছেড়ে দেওয়ার মত ভুল কিভাবে করলেন?
আরিশ দাঁত কটমট করতে করতে আশে – পাশে তাকায়। নাজলীর এক হাতে টেবিলের উপরে রাখা। আরিশ রক্তলাল চোখে সেদিকে তাকায়। এরপর আচমকা একটা সরু চিকন ছুঁরি নাজলীর হাতের পাশে গেঁথে দেয়। হুট করে আক্রমনে নাজলী ভয়ে চেঁচিয়ে উঠে। আরিশ চোয়াল শক্ত করে বলে,
” অভিনয়টা ভালো ছিলো। কিন্তু আমার পছন্দ হয় নি। আমার মনে নিকের জন্য বিষ ঢালতে এসেছেন। কিন্তু আগে তো জেনে আসবেন আরিশ আর নিক কে? নিক যদি হয় দেহ তাহলে আরিশ তার ছাড়া। একজন মেয়ে হয়ে এসেছেন শরীর থেকে তার ছায়াকে আলাদা করতে। যদি বলেন ভালোবাসার কথা। তবে হ্যা আমি এনিকে ভালোবাসতাম।হয়ত এখনও বাসি। কিন্তু আমার অনুভুতি জন্মানোর আগে এনি নিকের সম্পদ। এক মাস আগে নয় আরও এক বছর আগে থেকেই। অনুভুতি জন্মানোটা আমার অপরাধ। নিজের ভাইয়ের বউকে ভালোবাসার নজরে দেখেছি এইটাও অপরাদ। তাই এখানে নিক নয় আমি অপরাধী। আর সেই অপরাধের মাশুল একটাই এনি আমার বোন সমতুল্য। ভালোবাসা একদম’ই নয়।
আরিশের প্রতিটা হুংকারে নাজলী থঁরথঁর করে কেঁপে উঠে। কিন্তু প্রতিটা বাক্যের মধ্যে একটা লাইন শুনে নাজলী অবাক হয়ে যায়। কোনোরকম শব্দ উচ্চারন করে বলে,
” এ.. ক বছর আগে থেকেই মানে? এনি নিখোঁজ আজ দুই মাস হতে চলল। তাহলে এক বছর আগে থেকেই নিক জেভরানের সম্পদ, এই কথার অর্থ কি?
আরিশ কপাল কুচকে নাজলীর চিন্তিত মুখটার দিকে তাকায়। এরপর আলতো করে সরু চিকন ছুঁরিটা সরিয়ে ফেলে। নিজের চেয়ারে বসে বলে,
” এত অর্থ জেনে কি করবে? এনি নিকের সম্পদ অনেক আগে থেকেই। এইসব পাচার – নিলাম যাস্ট উছিলা মাত্র।
নাজলীর চোখে পানি ভেসে যায়। বুকটা ধুক করে কেঁপে উঠে। চোখের পানির বাঁধ মানছে না। বহু কষ্টে উচ্চারন করে বলে,
” পাচার, নিলাম সব তাহলে একটা পরিকল্পনার অংশ?
আরিশ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” সামান্য এক লাইন বলেছি। অথচ তুমি নিজের মত করে সব ভেবে নিয়েছো। অনেক বুদ্ধিমতী তুমি।
নাজলী রেগে চোখের পানি মুছে বলে,
” একদম হেয়ালি করবেন না। উত্তর জানতে চাই আরিশ। এখন’ই বলবেন আমার বোনকে নিক কতদিন ধরে চিনে।
আরিশ গম্ভীর হয়ে বলে ,
” প্রশ্ন করাটা একদম পছন্দ নয়। আমি ঠিক ততটুকু বলব যতটুকু আমার ইচ্ছে হয়। এমনিতেও নারীদের সাথে বেশি কথা বলা উচিত নয়। একটু বেশি কথা বলে ফেলেছি। যা আমার রুলসের বাহিরে।
আরিশ রোদ চশমা পড়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়ে। এরপর সামনে এগিয়ে যেতেই এক অপ্রত্যাশিত কথায় থমকে যায়। পা দুইটা নাড়ানোর মত শক্তি নেই। কিন্তু পর মুহূর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয়ে তাকায় নাজলীর দিকে। বাতাসে নাজলীর লাল চুলগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। আরিশের তাকানো দেখে নাজলী পুনরায় একই বাক্য উচ্চারন করে,
” বিয়ে করবেন আমাকে?
আরিশ চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। রাগে কেঁপে উঠে শরীরটা। রাগটাকে না ফুটিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” ভালো মেয়ে ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম যেহেতু এনির বোন তাহলে নিশ্চই ভালোই হবে। তবে আজ শুনেছি তুমি ওর রক্তের কেউ নয়। স্বভাব এনির থেকে আলাদা হওয়াটাই স্বাভাবিক। সুন্দর ছেলে দেখে লোভ সামলাতে পারলে না। মাত্র দুই দিনের কথায় একদম বিয়ের প্রস্তাব। আমি তো ভেবেছলাম হয়ত প্রথমে বিছানার পারফরমেন্স চেক করব। বলা তো যায় না বিয়ের পর যদি আমাকে সামলাতে না পারো। রক্ত ক্ষরনে মরে যাওয়ার চান্স আছে।
নাবিদের এমন অশালীন বাক্যে নাজলী কান চেপে ধরে। ঠোঁট দুইটা কাঁপছে তিরতির করে। অশ্রু শিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলে,
” কতটা জঘন্য আপনি? এমন বাজে ইঙ্গিত দিতে লজ্জা করলো না? প্রস্টিটিউট ভেবেছেন আমাকে?
আরিশের মুখ লাল হয়ে গিয়েছে রাগে। দাঁত কটমট করে বলে,
” আগে ভাবিনি। তবে এখন ভাবছি তার কোনো সন্দেহ নেই। বিছানায় ডাকতে পারছো না তাই একদম বিয়ের প্রস্তাব। তবে…
আরিশ বাক্য শেষ করতে পারলো না। নাজলী ধমকে উঠে। রাগে ওর চোখ লাল হয়ে আছে। পুরো শরীর কাঁপছে। সে মোটেও এনির মত নরম নয়। নাজলী বরাবর এই সাহসী। আর এমন অকথ্য বাক্য শুনার মত মেয়েও সে নয়।
— যাস্ট সেট আপ! আর একটা নোংরা কথা বললে দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলব। নিজেকে এত স্মার্ট আর সুন্দর ভাবার কিছু নেই আরিশ। আপনার থেকে হাজার গুন সুন্দর ছেলে আমার পিছনে ঘুরে। আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার কারন আছে। নাহলে আপনাকে বিয়ে করার মত পাপ আমি জীবনেও করতাম না। পঁচিশ বছরের একজন মেয়ে পঞ্চাশ বছরের বুড়োকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে এতে শুক্রিয়া করুন।
আরিশ চোয়াল শক্ত করে ফেলে,
” পঞ্চাশ বছর কাকে বললে? থার্টি প্লাস আমি। বুড়ো বলছো কাকে? আমার এক রাতের বেড পার্টনার হওয়ার জন্য ঠিক কত মেয়ে চাতক পাখির মত ছটফট করে ধারনা আছে তোমার?
বয়স বেশি বলায় আরিশের রেগে যাওয়াটা দেখে নাজলীর পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে। এইটা ঠিক লোকটা প্রচুর সুন্দর।
কিন্তু আরিশের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলে,
” বারে গিয়ে মেয়ে নিয়ে ঢলাঢলি করলে মেয়েরাতো চাইবেই। তাদের যাস্ট ছেলের প্রয়োজন। হোক সেটা আশি বছরের অথবা ত্রিশ বছরের।
আরিশ নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে,
” একটু বেশি বলছো না। আমাকে অন্য লাইন বলতে বাধ্য করো না। আমি এক লাইন বললে তুমি দুই মিনিট ও আমার সামনে টিকতে পারবে না।
— আপনি প্রশ্ন করেছেন আর আমি বললেই দোষ। তবে এইটাও জানি আশে – পাশে অনেক মেয়ে বসে আছে। শরীরটাও ভালোভাবে ঢাকা নেই। তাকিয়ে দেখুন কেমন অর্ধনগ্ন। উহুম এদের অর্ধনগ্ন বললেও ভুল। একটুর জন্য পুরোটাই নগ্ন। এখন আপনি যদি হাত দিয়ে একটা ইশারা দিন, দেখবেন মৌঁমাছির মত উড়ে আসবে। আপনার সাথে নোংরামি করবে। আপনাদের ভাষায় এইটাকে উপভোগ করা বললেও আমার ভাষায় এইটা নষ্টামী আর নোংরামি ছাড়া কিছুই নয়। আপনি নিজেও ওদের সাথে তাল মিলাবেন। এক পর্যায়ে নষ্টামির চরম পর্যায়ে চলে যেতে পারেন। কিন্তু এখন আমাকে যদি ডাক দেন। হয়ত আমার মত কারোর হাতে সামান্য স্পর্শ ও করেন, আপনার গালে দাগ বসে যাওয়ার মত থাপ্পর পড়বে। এতে আমার মরন ও হতে পারে। বাট আই ডোন্ট কেয়ার।এখন এদের সাথে তো মেলালে তো হবে না মি, আরিশ।
আরিশ ভ্রঁ নাচিয়ে তাকায়। সামান্য শব্দ করে হেসে বলে,
” তাহলে সুশীল রমনী, একটু আগে বিয়ের প্রস্তাবটা কে দিয়েছে?
তোমার হৃদয়ে ভয় ডুকে নি। এই প্রস্তাবে আমি তোমার ঠিক কি করতে পারি।
নাজলী নিশ্বাস টেনে বলে,
” মরনের ভয় করলে কি আর আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করব। যাস্ট এক বছরের জন্য। নামে বিয়ে বাট কাজকর্মে অপরিচিত ব্যক্তি ছাড়া কিছুই নয়। আমার উদ্দেশ্য একটাই আমি এনির সান্নিধ্যে যেতে চাই। ওর কাছা- কাছি থাকতে চাই। প্লিজ আরিশ একটু সাহায্য করুন।
নাজলীর বোকা বোকা কথায় আরিশ ভ্রুঁ কুচকে ফেলে। মুলত সে রাগতে ভুলে গিয়েছে। সে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মনে করেছিলো মেয়েটাকে। কিন্তু আবার ও ভুল প্রমানিত হলো। মেয়েজাত কখনো বুদ্ধিমতী হয় না।তাদের মস্তিষ্কে সবসময় কু- চিন্তা থাকে। আরিশ না রেগে টানাটান হয়ে দাঁড়ায়,
” আমাকে কোনোভাবে নিজের গার্ডিয়ান ভেবে নিয়েছোন। তুমি একটা আবদার করবে। আর তোমার কান্না- কাটি দেখে আমি হুরহুর করে চলে যাব সেই আবদার পুরন করতে।
নাজলী নাক মুছে বলে,
” আবদার নয়। মিনতি করছি আপনার কাছে আরিশ। আমি জানি এনির উপর হওয়া টর্চারে আপনি নিজেও ব্যাথিত। প্লিজ সহায় হোন আমার। আমি জানি আপনি নিকের জন্য নিজের জীবন ও উৎসর্গ করে দিতে পারেন। কিন্তু ট্রাস্ট করুন আমি কিছু করব না। আমি যাস্ট আমার বোনকে দেখতে চাই।
— এরপর….
— বৈধতা নিয়ে আমি আপনার বাড়িতে যাব। আমার বোনটার সাথে দেখা করব..
— এরপর আমার বোনকে নিয়ে পালিয়ে যাব। দুধ খাইয়ে কালসাপ ঘরে তুলার প্রস্তাব কিভাবে দিচ্ছো। ভাবতেই রাগের বদলে হাসি পাচ্ছে।
নাজলী ঠোঁট ভিজিয়ে একদম আরিশের সম্মুখে দাঁড়ায়,
” একদম ভুল ভাবছেন আরিশ। এনি আর নিকের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া পালিয়ে যাব কোথায়? এনি নিকের বৈধ স্ত্রী। চাইলেও পালিয়ে বাঁচতে পারব না। বৈধতা আর ক্ষমতা দিয়ে ঠিক খুঁজে নিবে। সেটা আমার অজানা নয়। তাই এমন বোকামো আমি কোনোদিন ও করব না। আমি আপনাকে নাম মাত্র বিয়ে করে এনির কাছে যাব। আপনি জানেন আরিশ, আমাকে ছাড়া ও ঘুমাতে পারে না। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হয়। আর খাবার খাওয়ার সময় একা কখনো খেতে পারে না। সাথে একজন ঠিক থাকতে হয়। এখনও ভালোভাবে নিজের যত্ন নিতে পারে না।বয়সটাই কত বলুন। আঠারো হয়েছে মাত্র।আঠারো বছর জীবন থেকেই সংগ্রাম করে আসছে। ওর ইতিহাস শুনলেই হিংস্র ব্যক্তিদের ও আত্না কেঁপে উঠবে। আমি যাস্ট ওর কাছা- কাছি থাকতে চাই।
আরিশ নাজলীর কথায় প্রায় গলে যাচ্ছে। হিংস্র মনটা সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে চাইছে। এনির কষ্ট সে নিজেও সহ্য করতে পারে না। বোনকে পেলে হয়ত বাচ্চা মেয়েটার কষ্ট একটু কম হবে। কিন্তু নিক! এনির রুমে তো কাউকে এলাউ করে না। একমাত্র চিত্রা আর সে নিজেকে ছাড়া। আরিশ ঠান্ডা গলায় বলে,
” নিক তোমাকে এনির রুমে ডুকতে দিবে না।
— সেটাও আমি ম্যানেজ করে নিব। ধীরে ধীরে নিক জেভরানের মন জুগিয়ে নিব। একসময় ঠিক ডুকতে দিবে।
আরিশ শব্দ করে হেসে উঠে। নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে,
‘ খুব সরল তুমি নাজলী। আমি হয়ত একটু হলেও ছাড় দেয়। কারোর আকুতি একটু মায়া কাজ করে। তবে জীবনে কোনোদিন এই মায়াটার সম্মুখীন হয় নি। তবে নিককে চিনো না তুমি নাজলী? ওর অতীত ভবিষ্যত, বর্তমান নিয়ে তিল পরিমান ধারনা নেই তোমার। ধারনা থাকলে এমন বোকার মত কথা বলতে না ।
নাজলী ফুঁশ করে শ্বাস টেনে বলে,
‘ জানি আমি। শুধু আমি নয় পুরো দেশ জানে।উনার অতীত না জানলেও বর্তমান অনেকটা জানি। মানুষ রুপী জানোয়ার দেখতে চাইলে নিক জেভরান তার উদাহরন। নরপশুর মত লোকদের খুন করে। একেকটা খুনের স্টাইল এতটাই বিকৃত যে, নরমাল লোকে দেখলে হার্ট আ্যটাক করবে। যার ভেতরে দয়া, মায়া নেই। কারোর কান্না মন গলাতে পারে না। হার্টল্যাস নরপশু উনি। অতিরিক্ত রেগে গেলে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে লোকের তাজা রক্ত গিলে ফেলতেও পিছু হন না। উনার সাথে কথা বলা মানে বিশ্বযুদ্ধ করা। আপনি নিজেও কোনোদিক দিয়ে কম নয়।
আরিশ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
” আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নামেই এত সুনাম!
– বাস্তবতা শুনতে কষ্ট লাগে?
— উহুম। ভেতরে একটা পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া যায়। এমন কুৎসিত লোককে বিয়ে করে এক রুমে থাকতে ভয় করবে না?
নাজলী সামান্য হেসে বলে,
” সত্যি বলবো? বর্তমানে আপনার সামনে দাড়িয়ে এত কথা বলার সুবাধে আমার শরীর কাঁপছে। এখন এক বাড়িতে থাকাটা আমার জন্য আরও কষ্ট সধ্য। তবে মানিয়ে নিব সব কিছু। আমার একটাই চাওয়া। আমার বোনের সান্নিধ্য। আর সেটা আপনাকে বিয়ে করলেই সম্ভব। যাস্ট এক বছর আপনার বাড়িতে থাকব। এর ভেতরে আমি নিক জেভরানের নজরে আসব। সময় শেষ হলে আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দিব। এই এক বছরে অনেক কিছু বদলাবে। একবার যদি আমি নিকের চোখে ভালো হতে পারি। তখন এনির সাথে দেখা করতে নিক নিজেও আটকাবে না। এরপর আমি আমার বোনের কাছে যাওয়ার জন্য আপনার বউ সাজার কোনো প্রয়োজন নেই। কন্ট্রাক্ট ম্যারেজের এক বছর পুরন হলে আপনি আপনার পথে আর আমি আমার পথে।
আরিশ ঠোঁট চেপে তাকিয়ে আছে নাজলীর দিকে। নাজলী ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে বলে,
” এখানে একটা সাইন করে দিন।
— কিসের পেপার এইটা?
নাজলী কলম এগিয়ে দিয়ে বলে,
— কন্ট্রাক্ট পেপার।
আরিশ হতভম্ভ হয়ে যায়। এই মেয়ে তাহলে সব কিছু রেডি করেই এসেছে। আরিশ গম্ভীর হয়ে বলে,
‘ সব কিছুর ব্যবস্থা করেই এসেছো?
— সময় অপচয় করতে চাচ্ছি না।
— আমার লাভটা কি, তোমাকে সাহায্য করে?
— আপনাকে টাকা দিয়ে কেনার ক্ষমতা আমাদের কোনো কালেই হবে না। আপনার দিক দিয়ে একটাই লাভ। আপনি কিছুক্ষন আগে বলেছেন এনিকে নিজের বোন মনে করেন। এখন বোনকে খুশি দেখাটা কি একজন ভাইয়ের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না? আমাকে পেলে এনি ঠিক কতটা খুশি হবে সেটা আপনাদের ধারনার ও বাহিরে।
আরিশ নিচের ঠোঁট কামড়ে রাখে। এনিকে তার বোন হিসেবে ভাবতেই বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। জীবনের প্রথম কোনো নারীকে ভালোবেসেছিলো, সেই নারীকেই এখন বোন ভাবতে হচ্ছে। শালার জিন্দেহীহহহহ!
আরিশ কন্ট্রাক্ট পেপারটায় নজর দিয়ে বলে,
‘ তোমাকে সাহায্য করার একটাই কারন, এনির মুখে যাতে হাসি ফুটে উঠে। বর্তমানে এনি যে ট্রামার মধ্যে আছে এতে একসময় নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে। বদ্ধ রুমে বন্দিদশা থাকাটা ঠিক কতটা কষ্টকর সেটা আমার থেকে ভালো কেউ জানে না। তবে যায় হোক এই বদ্ধ রুম নিক জেভরানের। এখানে সুখে থাকার কোনো প্রশ্নেই আসে না।আমাদের জীবনে সুখ বলতে কিছু নেই, দুঃখ বলতে ও কিছু নেই। তোমাকে এনির কাছে যাওয়ার জন্য সাহায্য করছি যাতে এনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলে। কিন্তু মনে রেখো, তুমি যদি কোনো প্রকার চালাকি বা ছলনা করার চেষ্টা করো তাহলে নিক গলা চেপে ধরার আগে আমি নিজেই তোমার গর্দান নিব। এমন অবস্থা করব যে লাশটাও কেউ খুঁজে পাবে না। কুকুরের আহার হবে তুমি।
নাজলীর ভেতরটা কেঁপে উঠে। ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলে,
” মঞ্জুর করলাম এই দাবি।
আরিশ গম্ভীর হয়ে পেপারে সাইন করে দেয়। নাজলী মুচকি হেসে নিজেও সাইন করে ফেলে। হয়ে যায় নিজেদের এক বছরের চুক্তিবদ্ধ বিয়ে। আরিশ বড় বড় পা ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। নাজলী আরিশের দেওয়া সাইনের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে নাবিদের নম্বরে মেসেজ দিয়ে বলে,
” জিতে গিয়েছি আমি নাবিদ। কল্পনাও করে নি এত দ্রুত কাজ হয়ে যাবে সামান্য কিছু ইমোশনাল কথায় । লোকটা এখন ও এনিকে ভালোবাসে। বন্ধুত্ব সম্মানে অনুভুতি চাপিয়ে রেখেছে। তবে যায় হোক বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এখন পরবর্তী প্লান অনুসারে লোকটাকে নিজের ভালোবাসার ফাঁদে ফেলতে হবে। আশা করি চিত্রা মাসি এতক্ষনে এনিকে চিঠিটা দিয়েছে। তোমার সাথে আমার রাতে দেখা হচ্ছে। এখন ক্রিমিনাল স্বামীর বাড়িতে যেতে হবে।
টর্চার সেলের কালো অন্ধকারে বাতাস যেন শ্বাস নিতে অনিচ্ছুক। দেয়ালের প্রতিটি ইট জুড়ে জমাট রক্তের দাগ, শুকনো রক্তের সাথে পচা ঘামের গন্ধে পরিবেশ অসহনীয়। মেঝেতে লোহার শিকল পড়ে আছে।যার প্রতিটি কড়িকড় শব্দ মৃত্যুর রণসংগীতের মতো প্রতিধ্বনিত হয়।
শিকলে বাঁধা দু’জন মানুষের দেহ ধীরে ধীরে ক্ষত-বিক্ষত ছায়ার মতো নুয়ে পড়েছে। চোখে অসহায় আতঙ্ক, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, গলদেশে নিঃশ্বাসের শব্দ ভাঙা বাঁশির মতো কেঁপে কেঁপে বাজছে। তাদের শরীর হয়ে উঠেছে রক্তাক্ত যন্ত্রণার দলিল। চোখ দুইটা নেই। প্রতিটি ক্ষত যেন চিৎকার করে বলে মানবজীবন কত সহজে ভগ্ন হয়।
সেলের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে গ্যাংস্টার বস—চোখে হায়েনার ক্ষুধার্ত আগুন, ঠোঁটে বিকৃত ব্যঙ্গ, মুখে একরাশ দানবীয় স্থিরতা। তার দৃষ্টির নির্মম ঝলক যেন মানুষের মাংস ভেদ করতে পারে। সে নড়লেই বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশে মৃত্যু যেন আরও কাছে সরে আসে।
তার চারপাশে নিঃশব্দ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে অধিরাজ ও আরিশ। তাদের চোখে কোনো আলো নেই, মুখে কোনো শব্দ নেই।কেবল নিস্তব্ধতার ভৌতিক প্রতীক। চারপাশের আলো-আঁধারের খেলা তাদের মুখের রেখায় এক অদ্ভুত ছায়া এঁকে দিয়েছে
পুরো পরিবেশ শিরদাঁড়ায় হিমেল স্রোত নামিয়ে আনে। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয়এই সেলে রক্ত প্রবাহিত হবে। হাড় ভাঙবে, চিৎকার প্রতিধ্বনিতে দেয়াল কেঁপে উঠবে। নিক দাঁতে কটমট শব্দ করে পোষা কুকুর শ্যাডোর দিকে তাকায়। মালিকের চোখের ইশারা বুঝতে পেরেই কালো অন্ধকার থেকে যখন কুকুরটা বেরিয়ে আসে। মনে হয় যেন নরকের দরজা খুলে গেছে। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বলে অগ্নিশিখার মতো, অন্ধকার ভেদ করে ভয় ছড়ায়। দাঁতের ফাঁকে লালা ঝরছে, প্রতিটি শ্বাসে শোনা যায় হিংস্র গর্জন। মৃত্যু নিজেই শিকার খুঁজছে।
শরীরটা বিশাল, পেশী টানটান, কালো লোমে আলো পড়লেই ধাতব ঝলক দেয়। তার থাবার শব্দ কংক্রিটের মেঝেতে এমনভাবে প্রতিধ্বনিত হয় যেন প্রতিটি পদক্ষেপ মৃত্যুর আগমনী বার্তা। কুকুরটার ঘাড়ে ভারী লোহার চেইন ঝুলছে, কিন্তু তার টান এত শক্তিশালী যে মনে হয় মুহূর্তেই শিকল ছিঁড়ে রক্তের খোঁজে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
গ্যাংস্টার বস নিজের পেশিবহুল ড্রাগন ট্যাটুর হাত দিয়ে ইশারা । শ্যাডোর ঠোঁট কেঁপে ওঠে বিকট দাঁতের গর্জনে। শিকারি পশুর মতো দৃষ্টি গিয়ে পড়ে শিকলবন্দি দুইজন রক্তাক্ত মানুষের উপর। লোক দুইটা শ্যাডোর গর্জন শুনে কণ্ঠ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসে আতঙ্কের শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠস্বর। কুকুরটা দাঁত বের করে গর্জন তোলে, যেন সে শুধু বসের ইশারার অপেক্ষায়—তারপর ছিঁড়ে ফেলবে মাংস, চূর্ণ করবে হাড়, আর রক্তের গন্ধে সেল ভরে উঠবে।
নিক নিজের কুকুরের ভাষা বুঝলো। হিংস্র দাববের মত হেসে বলে,
” দুইজন জীবিত মানুষ রেখেছি। আজ যত ইচ্ছে খাও। বাঁধা নেই তোমার। শুধু রক্তগুলো রেখে দিও একজনের জন্য।
শ্যাডো নিকের ইশারা পাওয়া মাত্রই এক লাফে লোক দুইটার উপর। অন্ধকারে হঠাৎ যেন নরকদ্বারের দরজা খুলে যায়। মুহূর্তেই মাফিয়া বসের কুকুরটি বজ্রবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’জন দেহের উপর। শ্বাসরুদ্ধকর গর্জন ছিঁড়ে ফেলে রাতের নীরবতা। রক্তপিপাসু দাঁতের ঘর্ষণে মানুষের চামড়া ও পেশি যেন কাগজের মতো বিদীর্ণ হতে থাকে। ছিঁড়ে নেওয়া মাংসের টুকরো দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে ঝরতে থাকে লাল রক্তে ভিজে, আর কুকুরের চোখে জ্বলতে থাকে এক অমানবিক উন্মত্ততার দীপ্তি।
দু’জন মানুষের কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয় ভাঙা গলার আর্তচিৎকার।একটি সুর যা যেন হাহাকার হয়ে আঘাত হানে বাতাসের বুকে। তাদের হাত-পা ছটফট করে, শিরা-উপশিরার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু কুকুরটির দাঁতের করাল থাবার সামনে সেই প্রতিরোধ তুচ্ছ হয়ে পড়ে। প্রতিটি ছিঁড়ে নেওয়া টুকরোয় মানুষের মৃত্যু আরও কাছে এসে দাঁড়ায়।
সবকিছুর মাঝেই মাফিয়া বসের দৃষ্টি ভেদী, শীতল ও নির্মম। তার চোখ যেন অগ্নিশিখার মতো তীক্ষ্ণ।যেখানে নেই এক বিন্দু করুণা, নেই সামান্যতম দয়া। নিক নিশ্চুপ বসে থাকে। যেন হত্যাযজ্ঞ তার চোখে কেবল এক বিনোদনময় দৃশ্য। আর্তনাদ ও রক্তের গন্ধ মিশ্রিত সেই বিভীষিকাময় পরিবেশে তার চাহনি হয়ে ওঠে মৃত্যুর শপথপত্রের মতো অচল, নির্দয়, ভয়াল। শ্যাডো তৃপ্তিসহকারে মাংস খেতে থাকে। নিক তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলে,
” ইউ আর ভেরি ব্রেভ অ্যান্ড ফিয়ার্স, শ্যাডো। দ্যাটস হোয়াই ইউ আর সো ডিয়ার টু মি। থেমে যাও। বাকি মাংসগুলো আরেকজনের জন্য রেখে দাও।
এনি এদিক- সেদিক হাটছে। শরীরে প্রচুর ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেখানে হাত দিচ্ছে দেখানেই যখম। তবে বুঝতে পারে না রাতে ক্ষতস্থানে মেলম কে লাগিয়ে দেয়? প্রতিদিন সকালে উঠে মলমের গন্ধ আর আস্তরন অনুভব করে সে। প্রথমে নিক দিয়ে দিয়েছে ভাবলেও নাক – মুখ কুচকে ফেলে। সারাদিন রক্তাক্ত হয় কাতরালেও বলবে না, কি হয়েছে তোমার! সেখানে উনি নিজ হাতে মেডিসিন লাগিয়ে দিবে বিষয়টা হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়। পরমুহূর্ত চিত্রা লাগিয়ে দিয়েছে ভেবে একটা শান্তির নিশ্বাস ছাড়ে। উনি ছাড়া তো আর কেউ নেই, যে এনিকে দেখবে, মায়া করবে। নিশ্বঃন্দেহে চিত্রা মাসি’ই তার ক্ষতে মেডিসিন লাগিয়ে দিয়ে যায়। বিষয়টা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করার প্রয়োজন বোধ করলো না। এনি কিছুটা শান্ত হয়ে বিছানায় বসে। গোসল করার জন্য শরীর মেজ মেজ করছে। কিন্তু কাবার্ডে রাখা প্রতিটা কাপড় অনেক ঢিলা- ঢিলা। আর এইসব ঢিলা- ঢিলা কাপড়ের জন্য নিঃশ্বন্দেহে অন্য একটা কাপড় পড়া প্রয়োজন। কিন্তু এইসব একটাও কাবার্ডে নেই। এতদিনের মানসিক, শারীরিক নির্যাতে সব কিছু ভুলে বসেছে। এখন নিকের তীক্ষ্ণ চাহনি থেকে বাঁচার জন্যে হলেও পড়তে হবে। এনি লোকটার এমন ভয়ানক দৃষ্টিতে বার বার থমকায়। একজন মানুষের দৃষ্টি এতটা তীক্ষ্ণ কিভাবে হয় এইটাই এনি ভেবে পাচ্ছে না। ঘুমের মধ্যে তার হুশ থাকে না। পাগলের মত হাত – পা ছিটিয়ে সে ঘুমাতে অভ্যস্ত। হুট করে নিক রুমে প্রবেশ করলে নির্ঘাত লোকটা লুচ্চার মত অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। আর এনির সব কিছু পরখ করে। এইসব ভেবেই এনি চাপা কান্না করে ফেলে। দরজা খুলার শব্দ কানে আসতেই চট করে তাকায়। চিত্রাকে আসতে দেখে শান্তির নিশ্বাস ফেলে। যাক জানোয়ারটা আসে নি। চিত্রা এনির কপালে হাত দিয়ে বলে,
” কেমন লাগছে এখন? শরীর ব্যাথা করছে এখন ও?
এনি মলিন হেসে বলে,
” হালকা ব্যাথা করছে তবে সহ্যের ভিতরে।
চিত্রা চিন্তিত হয়ে বলে,
” চাবুকের আঘাত করা স্থানগুলো কি এখন ও আগের মত টনটন করছে।
এনি চোখ তোলে তাকিয়ে বলে,
” চিন্তার কিছু নেই। সহ্য করার মত ব্যাথা আছে।
চিত্রা নিশ্বাস টেনে এনির হাত ধরে। এরপর বসা থেকে উঠিয়ে বলে,
” আমার রুমে চলো।
এনি অবাক হয়ে বলে,
” কেনো চিত্রা মাসি?
চিত্রা মুচকি হেসে বলে,
” ভালো লাগবে তোমার।
চিত্রা রম থেকে বের হয়ে চারদিকে তাকায়। তেমন কাউকে দেখতে না পেয়ে শান্তির নিশ্বাস ছাড়ে। এরপর পাশের রুমে এনিকে নিয়ে ডুকে পড়ে। এনি রুমটাকে ভালোভাবে দেখে। রুমে রাজকীয় কোনো মাল নেই। অতি সাধরন একটা খাট আর আলমারি রাখা। তবে বেশ গুছানো। কিন্তু এই রুমের ও প্রতিটা জিনিস কালো। সব দিকে কালো দেখতে দেখতে সে অতিষ্ট। চিত্রা এনির বাহু ধরে বসিয়ে দেয়। এনি মুচকি হেসে বলে,
” দামী জিনিস না থাকা সত্তে ও রুমটা অনেক সুন্দর আর গুছানো।
চিত্রা সেসবে পাত্তা দিলো না। তার শরীর কাঁপছে। হাত- পা অসম্ভবভাবে কেঁপে উঠছে। চিত্রার অস্বাভাবিক রুপ দেখে এনি চিন্তিত হয়ে বলে,
” কি হলো মাসি? শরীর খারাপ লাগছে?
চিত্রা শুকনো ঢোক গিলে। কপালের ঘাম জামার এক অংশ দিয়ে মুছে। নিজেকে শক্ত করে জামার ভেতর থেকে একটা সাদা কাগজ বের করে এনির কাছে দেয়। এরপর সাবধানতা দিয়ে বলে,
‘ আমার রুমে সিসিক্যামেরা নেই। তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। তাই এখনে যা কিছু হোক বস দেখবে না। তোমাকে আমার রুমে আসা নিয়ে প্রশ্ন করলে বলবে শরীর ব্যাথা করছিলো তাই মাসির রুমটা দেখতে গিয়েছিলাম। আমিও সেইম উত্তর দিব।।
এনি কাগজটার দিকে তাকিয়ে কপাল কুচক বলে,
— কিন্তু মাসি এইটা কিসের কাগজ।
চিত্রা এনির পাশে বসে বলে,
” চিঠি! তোমার বোন তোমাকে চিঠি পাঠিয়েছে। নাবিদ নামক একটা ছেলে আজ বিকেলে আমার কাছে দিয়েছে তোমাকে দেওয়ার জন্য। আমি এখন ও খুলে দেখিনি। যেভাবে ছিলো ঠিক সেভাবেই নিয়ে এসেছি।
এনি অবাক হয়ে কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছে। খুশিতে চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে বলে,
” নাবিদ ভাইয়া দিয়েছে?
চিত্রা এনির মাথায় হাত রেখে বলে,
” হ.. হ্যা। তবে দ্রুত দেখো কি আছে। বেশিক্ষন থাকা যাবে না এখানে। বসের সন্দেহ গাঢ় হতে পারে।
এনি চোখের পানি মুছে কোনোরকম কাঁপা হাতে কাগজটা খুলে। প্রথমে “আমার ছোট পাখি” লেখাটা পড়তেই এনির কান্নার বেগ আরও বেড়ে যায়। কতটা ভালোবাসার মধ্যে ছিলো সে। আর আজ নরকবাস। বদ্ধ রুমে প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন আঘাত নিয়ে দিন পার করছে। এনি ধীরে ধীরে সবটা চিঠি পড়তে থাকে। প্রতিটা লাইন খুব মনযোগ সহকারে পড়ে। নাবিদে বলা প্রতিটা আদুরে বাক্য এনির হৃদয় কাঁপিয়ে তুলছে। চিঠিটা পড়া সমাপ্ত করে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলে। দুই গাল বেয়ে অজস্র পানি ঝরতে থাকে। নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে,
” আপনার ভালোবাসায় আমি বার বার মুগ্ধ হয় নাবিদ ভাই। তবে আমি আপনাকে ভাই ছাড়া কখনো কিছু ভাবি না। আপনার আগলে রাখা কোনো সুপুরুষের থেকে কম নয়। আমার দেখা সব থেকে শুদ্ধ পুরুষটি হচ্ছেন আপনি। যার হৃদয়ে উপর ওয়ালা শুধু ভালো গুনগুলো’ই দিয়েছে। আমার মত অপবিত্র, কলঙ্কিত মেয়ে আপনার ছায়ায় শোভা পায় না। আবার ও সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। পাঁচ বছর বয়স থেকে আমাকে আগলে রাখছেন। আপনাকে ধন্যবাদ জানালে এইটা ছোট করা হবে। খুব শ্রদ্ধা আর সম্মান করি আপনাকে।
চিত্রা এনিকে তাড়া দিয়ে বলে,
” কি বিরবির করছো? দ্রুত নিজের রুমে যেতে হবে। কাগজটা কি করবে এখন?
চিত্রার কথায় এনির ধ্যান ভাঙ্গে। সামান্য ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” পালাব মাসি। এই সপ্তাহে নিক জেভরান গ্যাংস্টার মিটিং এ থাকবে। আর এইটা নাকি প্রতিবছর একবার হয়ে থাকে, প্রতিটা দেশের মাফিয়াদের মধ্যে। সেখানে মোবাইল নিষিদ্ধ, বাহিরের লোক যাওয়া নিষিদ্ধ। আর সেইদিন রাতেই এই নরক থেকে আমি পালাব।
চিত্রা ভয়ে দুই পা পিছিয়ে যায়। আতঙ্কে জর্জরিত হয়ে বলে,
” এমন ভুল করো না মা। একবার চাবুক পিটা করেছে। পরের বার হাতের কাছে পেলে জবান নিয়ে আসবে। প্লিজ এমন করো না।
এনি সামান্য শব্দ করে হেসে বলে,
” মরে গেলেও সমস্যা নেই মাসি। এই নরক থেকে মুক্তি পাব আমি। চিন্তা করবেন না। এখন একবার বের হতে পারলে আমাকে আর খুঁজে পাবে না। প্রয়োজনে মাটির নিচে গর্ত করে থাকব। তার পরও এই জানোয়ারের সম্মুখে আসব না।
চিত্রা এনির রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” কিভাবে বের হবে এখানে থেকে। চার- পাশে হাজার ও গার্ড থাকে। ওইদিন রাতে কোনো এক কারনে সবাই একটা কাজে চলে গিয়েছিলো। তাই অতি সহজে তুমি দুইজনের সাথে পাল্লা দিয়ে পালাতে পেরেছো। কিন্তু বস যেদিন এইসব মিটিং এ যাবে সেদিন তো আরও সিকিউরিটি থাকবে।
— সমস্যা নেই।
চিত্রা অবাক হয়ে বলে,
” মানে?
এনি বড় করে নিশ্বাস টেনে বলে,
” প্রয়োজন খুন করব সবাইকে। এরপর রক্তাক্ত শরীর নিয়ে পালান।
চিত্রা ভয়ে পর পর শুকনো ঢোক গিলে। চিত্রাকে ভয় পেতে দেখে এনি হাসি দিয়ে বলে,
” অহহ মাসি ভয় কেনো পাচ্ছেন? মজা করেছি আমি। রক্তে আমার এক ধরনের ফোবিয়া আছে। সামান্য রক্ত দেখলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। সেখানে কাউকে খুন করাটা তো সপ্ন। অন্য উপায়ে যাব।
চিত্রা শান্তির নিশ্বাস ছাড়ে,
” কোন উপাই?
— যেদিন যাব সেদিন দেখে নিয়েন। আজ অন্তত সিক্রেট থাক।
চিত্রা এনির দিকে তাকিয়ে বলে,
” প্রথমে দেখে তোমাকে যতটা ভিতু ভেবেছিলাম, তুমি ঠিক ততটা ভিতু নও।
এনি ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” প্রয়োজনের তাগিদে আমি ঠিক কতটা নৃশ্যংস হতে পারি সেটা আমার অতীত ঘাটলেই বুঝা যাবে। এখন আপাযত এই কাগজটা পুড়িয়ে দিন। সাইকোটা দেখে ফেললে সব কিছু উল্টো হয়ে যাবে।
চিত্রা লাইটার দিয়ে কাগজটায় আগুন ধরিয়ে বলে,
” তোমার অতীত কি? আর পাচার কেন্দ্রে কিভাবে এসেছো?
এনি রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,
” অন্যদিন বলব মাসি। আজ কান্না করার মুড আসছে না।
এনি রুমে চলে যায়।ঘরটির নীরবতা যেন আচমকাই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। এনি appena বিছানায় বসতেই হঠাৎ একটি লোহার মতো শক্ত হাত তার বাহুর মাংস চেপে ধরে। চাপের তীব্রতা এতটাই হিংস্র যে মনে হয় হাড় থেকে মাংস ছিঁড়ে ঝরে পড়বে। ব্যথার বিষাক্ত তীক্ষ্ণতায় এনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে নাক-মুখ বিকৃত করে ফেলে।
নিকের দাঁতের ঘর্ষণে শব্দ ওঠে—যেন মৃত্যুর সুর বাজছে। তার দৃষ্টি উন্মত্ত, বন্য সিংহের মতো ক্রুদ্ধ। মুহূর্তেই সে গর্জে ওঠে,
“মিসেস চিত্রা!”
সে এক গর্জন নয়। পুরো ভাইপার মেনশনের দেয়ালরাশি পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়া ভূমিকম্পের মতো প্রতিধ্বনি। গর্জনের প্রতিটি স্রোতে আতঙ্কের শিকড় যেন এনি’র শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। তার বুক কেঁপে ওঠে। ভয় তাকে অচল করে ফেলে। মস্তিষ্কে শংকার ঝড়।লোকটা কি সব জেনে গেলো ? অথচ চিত্রা মাসি তো বলেছিলো, ওই কক্ষে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই।
এমন সময় এনির মনের সমস্ত আশঙ্কা যেন মূর্ত রূপ ধারণ করে। দরজার ফাঁক দিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত চিত্রা প্রবেশ করে। ভয়ে তার ঠোঁট কাঁপে, কণ্ঠরোধী স্বরে কোনো রকমে উচ্চারণ করে,
“ব… স ড… ডাকছিলেন?”
নিক ধীরে ঘাড় কাত করে।শিকারীর মতো ঈগল-চোখে তাকায় তার দিকে। ধূসর মনিগুলোতে জমাট বেঁধে থাকা সন্দেহ থেকে আগুনের দাহন বেরিয়ে আসে। সেই দৃষ্টি এমন যেন মিথ্যার ক্ষুদ্রতম ছায়াকেও ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। চিত্রা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কণ্ঠ একেবারেই স্তব্ধ।
নিকের দাঁত কটমট করে বাজে।ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বিষাক্ত শব্দ ঝরে পড়ে। তার কণ্ঠে জমাট রাগ, তার শরীরে ফুটন্ত হিংস্রতা একটি সামান্য ভুল হলেই মৃত্যুর দণ্ড ঘোষণা হয়ে যাবে। নিক হুংকার দিয়ে বলে,
” কার পারমিশনে আপনি ওকে নিজের রুমে নিয়ে গিয়েছেন? এর জন্য আপনার কি অবস্থা করতে পারি ধারনা আছে? অন্তরে ভয় নাই। কলিজা কাঁপে নি আপনার।
নিকের এমন ব্যবাহারে ভয় রেখে এনি প্রচুর অবাক হয়। মা সমতুল্য মহিলার সাথে কেমন অভদ্র ব্যবহার করছে। ছিহহহ! উফফ সরি। জানোয়ারের থেকে আর ভদ্রতা আশা করছি কোন আক্কেলে। মাঝে মাঝে আমি নিজের ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হয়ে যায়। একটা পশুর কাছে মনষ্যত্ব খুঁজতে যায়।
নিকের দৃষ্টি বাজপাখির মতো শিকারী ভেদ করে যাচ্ছে চিত্রার অস্তিত্বের প্রতিটি কোণ। গর্জনমিশ্রিত ধমকে তার শরীরের রক্ত জমে আসছে।কণ্ঠ আটকে গেছে।সঠিকভাবে শব্দ বেরোচ্ছে না। চিত্রার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাঁপছে ভয়ে। যেন জীবনের শেষ মুহূর্ত এসে দাঁড়িয়েছে।
এনি সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে নিকের দিকে সোজাসুজি বলে ওঠে,
“উনাকে কেন ধমকাচ্ছেন? আমি গিয়েছিলাম মেয়েলী কাজে। উনার কোনো দোষ নেই।”
নিক কিছুক্ষণ দাঁত চেপে।শ্বাস গিলে ক্রোধটাকে অল্প ধমিয়ে আনে। তবুও চোখের আগুন নিভে না। ঠাণ্ডা কন্ঠে শিকারীর মতো স্বরে বলে ওঠে
“এই রুমেই করতে পারতে না?”
এনি একইভাবে দৃষ্টি রেখে বলে,
” সেই সুযোগটা আমাকে দেন। শুধু মেয়েলী কাজ কেনো অনেক কিছুই করব। সিসিক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছেন প্রতিটা কোণায় কোণায়।
নিকের ঠোঁটের কোনায় তীব্রতা জমে ওঠে, ধূসর চোখ দু’টো তীক্ষ্ণ বর্শার মতো বিদ্ধ করে। গলায় হিমশীতল প্রশ্ন ঝরে বলে,
“কোন মেয়েলী কাজে গিয়েছিলে?”
প্রশ্নটা শুনেই এনি হঠাৎ ভড়কে যায়। বুক ধড়ফড় করতে থাকে।গলা শুকিয়ে কাঠ। সত্যিই তো কোন মেয়েলী কাজেই গিয়েছিল সে। কিন্তু এখন মাথায় একটাও সঠিক কথা আসছে না। ভেতরের আতঙ্ক লোকাতে হঠাৎ এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে তোলে। গলা সামান্য কেঁশে সাহস করে বলে ওঠে,
“আগে চিত্রা মাসিকে যেতে বলুন। স্বামী-স্ত্রীর কথার মাঝে তৃতীয় ব্যক্তির থাকা শোভা পায় না।”
নিকের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। এনির মুখে স্বামী- স্ত্রী সম্মোধন শুনতেই দাঁত কটমট করে উঠে। ভিতরটা অস্থির হয়ে উঠে। পাগল ছন্নছাড়ার মত নিক এদিক -সেদিক তাকায়। জানা নেই এই শব্দে কি এমন আছে যেটা শুনলে সে অস্থির হয়ে উঠে। যে শরীরে কোনো মায়া নেই, হার্ট নেই সেই হৃদয়টা অজানা এক অনুভুতিতে কেঁপে উঠে।
গভীর নিশ্বাস টেনে নিক হুকুমের সুরে বলে,
“দরজাটা ভালোভাবে লাগিয়ে দিয়ে যান।”
চিত্রার বুক থেকে যেন ভার নেমে যায়। সে তো বহুক্ষণ ধরে এই মুক্তির অপেক্ষাতেই ছিল। দ্রুত দরজা বন্ধ করে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ছুটে যায়। দরজা লাগার শব্দ কানে আসতেই এনির ভেতর ভয় তীব্র হয়ে ওঠে। সে হঠাৎ শিউরে ওঠে। একদম একা, এক জানোয়ারের সঙ্গে একই ঘরে আছে ! ভাবতেই ঘৃণায় শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠে।
নিক কোনো ভূমিকা না করে এনির বাহু ছেড়ে দেয়। কিন্তু তার জায়গায় আছড়ে ধরে এনির কোমর। আঙ্গুলগুলো লোহার থাবার মতো। নখ শিকারীর শলাকার মতো নরম মাংসে গেঁথে যায়। মুহূর্তেই ত্বক বিদীর্ণ হয়ে লাল তরল রক্ত গড়িয়ে পড়ে। তার আকার বিশাল।গায়ের প্রতিটি পেশী উন্মাদ শক্তিতে থরথর করছে। যেন খাঁচা ভেঙে বের হওয়া সিংহ হিংস্র খামচে শিকারকে বিদীর্ণ করছে।
ব্যথায় এনি চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে নিরুপায় স্বরে বলে ওঠে,
“লাগছে খুব… ছাড়ুন আমাকে।”
নিক এনিকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। এরপর এচমকা দেয়ালের সাথে ছোট শরীরটা ধ্বাক্কা লাগায়। হঠাৎ আক্রমনে এনি হতভম্ভ হয়ে যায়। নরম ব্যাথাতুত শরীরটা দেয়ালের সাথে ধাক্কা খাওয়াতে যেন হাড়গুলো ভেঙ্গে আসতে চাইছে।এনি তাকানো পূর্বেই নিক এক ঝটকায় এনিকে দেয়ালের সাথে পিছন থেকে চেপে ধরে। এনির মুখ গিয়ে ঠেকেছে দেয়ালের মধ্যে। আর পিঠ গিয়ে ঠেকেছে নিকের শক্ত চওড়া বক্ষে। নিক চোয়াল শক্ত করে এনির মাথার পিছনে চেপে ধরে কিড়মিড়িয়ে বলে,
” প্রতিটা লাইন সত্যি বলবে। একটা মিথ্যে বললে জ্যাঁন্ত পুঁতে দিয়ে আসব। কেনো গিয়েছিলে ওই রুমে।
এনি কথা বলতে পারছে না। এইভাবে চেপে ধরাতে মনে হচ্ছে জীবন বেরিয়ে আসবে। কোনোরকম আওয়াজ তুলে বলে ,
— কষ্ট হচ্ছে খুব। ছাড়ুন!
নিক কটমট করে বলে,
” কষ্ট দেখতে আমার ভালো লাগে। পৈশাচিক তৃপ্তি আসে।
— জানোয়ার আপনি। লোকের কান্না দেখে আনন্দে মেতে উঠেন।
— জানোয়ারের থেকেও খারাপ আমি। এখন সোজা- সাপ্টা বলবে। নয়ত দেয়ালের সাথে আঘাত করাতে করাতে মাথা ফাটিয়ে ফেলব।
” এইভাবে চেপে রাখলে বলব কিভাবে? কষ্ট হচ্ছে অনেক। মারলে একবারে মেরু ফেলুন আর নয়ত স্বাভাবিকভাবে দাড়াতে দেন।
এনির কথা শেষ হতেই নিক এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এরপর কোমরে চেপে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। তবে এখন স্পর্শ এনির সহ্যের ভেতরে ছিলো। এনি ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” আপনি ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না আমার সাথে? সবসময় এইভাবে হিংস্রভাবে চেপে ধরেন কেনো? আমার শরীরের হাড্ডি এমনিতেও নরম। কবে জানি আপনার অত্যাচারে সব ভেঙ্গে যায়।
— ভেঙ্গে গেলে ভেঙ্গে যাবে। এমন নরম শরীর রাখার প্রয়োজন নেই।
— শরীরটা আর নরম নেই। চব্বিশঘন্টার ভিতরে পঞ্চাশ বার শরীরের উপর দিয়ে যে ভুমিকম্প যায়, মনে হয় না হাড্ডি আর নরম আছে। আপনার হাড্ডির মত শক্ত না হলেও মোটামোটি হয়ে গেছে।
— আরও হবে।
— আমাকে এত অত্যাচার করতে আপনার মায়া লাগে না? মুলত যে আমাকে দেখতে সেই কপালে একটা চুমু খেত।সবাই বলত আমার মুখটা নাকি এতটাই মায়াবী যে শুধু চুমু খেতে ইচ্ছে হয়।
নিক বাঁকা হেসে বলে,
” খাবো তো, অবশ্যই চুমু খাব। একটা কেনো অজস্র চুমু খাব। শুধু কপালে নয় আরও অনেক জায়গাতেই খাব।
নিকের কথায় এনি প্রতিক্রিয়া করতে ভুলে গিয়েছে। কি জঘন্য কথা! এইসব শুনা শুধু বাকি ছিলো। এইসব শুনলে মেয়েরা লজ্জা পাওয়ার কথা। অথচ আমি কি রিয়্যাকশন দিব ভুলে গিয়েছি। নিক আচমকা আগের মত এনির কোমল মাংস চেপে ধরে বলে,
” তুমি কি কোনোভাবে কথা ঘুরাচ্ছো বেবিগার্ল!
এনি নিশ্বাস টেনে বল,
” বলছি, আগে কোমর থেকে হাতটা সরান। রক্ত বের হচ্ছে আপনার নখের আচরে।
নিক হাত সামান্য হালকা করে নেয়। এনি গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে। বলতে গিয়ে ও থেমে যাচ্ছে লজ্জায়। নিরুপায় হয়ে বলে,
” ই**** জন্য গিয়েছিলাম।
নিক ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” কি এইটা? কিসে ব্যবহার করা হয়?
নিকের প্রশ্নে এনির কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। লজ্জায় আর রাগে হাঁশ- ফাঁশ করতে থাকে। এনিকে এমন হাঁশ- ফাঁশ করতে দেখে ধমকে উঠে,
– ফা*ক অফ বেবিগার্ল। মৌন কেনো? জিজ্ঞাসা করছি কেনো ব্যবহার করা হয়?
নিকের ধমকে এনি কেঁপে উঠে। ইচ্ছে করছে নিকের ঘাড় ধরে বুঝাতে। শালা যখন চিনিস না তখন আগ বাড়িয়ে জানার এত ইচ্ছে কেনো? সারাজীন থেকেছে বাহিরের দুনিয়ায়, অসামাজিক পরিবেশে এখন এসে প্রশ্ন করছে , কি এইটা। এখন আমি কিভাবে উত্তর দিব। এনি চোখ বন্ধ করে এক বাক্যে বলে দেয়। এনির কথা কর্নে প্রবেশ করতেই নিক কপাল কুচকে বলে,
” প্রয়োজন নেই এইসব বাল*মার্কা জিনিসের। এইটা ছাড়া দেখতে বেশি ভালো লাগে।
এনির গাল দুইটা রক্তিম হয়ে উঠে। নিকের বাহু থেকে পালাতে ব্যার্থ ছটফট শুরু করে দেয়। নিক শক্ত করে আরও চেপে ধরে নিজের সাথে। এনি তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
” আপনি হার্টল্যাস হওয়ার সাথে সাথে নির্লজ্জ আর ঠোঁট কাটাও বটে।
নিক এনির কোমর সামান্য স্লাইড করে ছেড়ে দেয়। এনি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। নিক ব্লেজার খুলে বলে,
” নির্লজ্জ তো আমি বটেই বেবিগার্ল। সময়ের সাথে আরও অনেক কিছুর সাক্ষাত হবে।
এনি মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসে। সেই সময়টাই আর আসবে না গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। যাস্ট আর কয়েকটা দিন। আশার আলো পেয়েছি আজ আমি।
এনি কোমর থেকে টিস্যু দিয়ে রক্ত মুছে বলে,
‘ চল্লিশ বছরের বুড়োদের এত নির্লজ্জ হলে লোকে হাসবে গ্যাংস্টার বস।
বুড়ো শব্দটা যেন নিকের কর্নে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। শার্টের দুইটা বোতাম খুলে রাখা। উন্মুক্ত বক্ষে ড্রাগন ট্যাটুগুলো কেমন হিংস্র হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নিক পেশিগুলো টান টান করে রাগে উত্তেজিত হয়ে বলে,
” চল্লিশ বছরের বুড়ো কাকে বললি শালি মাদার্ফাক! থার্টি ওয়ান আমি। পুনরায় বুড়ো বললে গলা চেপে ধরব।
এনি সামান্য বাঁকা হেসে বলে,
” এত পবিত্র গালি। আই লাইক ইট। বাংলার সাথে ইংরেজী মিশ্রন। থার্টি ওয়ান আর চল্লিশ সেইম টু সেইম যাস্ট একটু ডিফারেন্ট। এত রিয়্যাক্ট করার কিছু নেই।
নিক কোনোমতে রাগ সামলিয়ে বলে,
” যাস্ট সেট আপ! একটা ইশারা দিলে হাজারটা মেয়ে এসে আছড়ে পড়বে আমার উপর। আর সেখানে বুড়ো বলার স্পর্ধা কিভাবে দেখাও তুমি।
নিকের কথায় ঘৃনায় ঘিন ঘিন করে উঠে শরীর। সামান্য হাসি দিয়ে মৌনতা নিয়ে বলে,
” এতগুলো মেয়ে সামলান কিভাবে? সাবধানে থাকবেন নিক জেভরান। মেশিনে জং ধরে যাওয়ার চান্স আছে। নিজের বউটার জন্য কিছু বাঁচিয়ে রাখুন। বেচারীকে কেনো নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন।
নিক ঠোঁট কামড়ে তাকায় এনির দিকে,
” নিক জেভরানের জিনিস এতটা নড়বড়ে নয়। নিজেই সব কিছু চেক করে দেখতে পারো বেবিগার্ল। সেই বৈধতা তোমার কাছে আছে। এতে আমার অসমাপ্ত কাজটা ও করা হয়ে যাবে। একদম বঞ্চিত করব না তোমাকে।
এনি চট করে তাকায় নিকের দিকে।।চোখে চোখে মিলন ঘটে। এনির চোখে তাকাতেই নিক আবার ও উন্মাদ হয়ে উঠে। নিশ্বাস ঘনঘন নিয়ে ধমক দিয়ে বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৮
” চোখ নামাও। দৃষ্টি ফেরাও নিজের।
— কেনো?
নিক নিশ্বাস টেনে বলে,
” এই দৃষ্টি আমার ধ্বংসের মুলমন্ত্র। এই চেহারা আমার হৃদয় কাঁপিয়ে তুলে। দ্বিতীবার আমার চোখে চোখ রাখবে না।
